তিনটি মূলনীতি ও তার দলীলসমূহ
কিতাবটিতে এমন মৌলিক নীতিমালা আলোচনা করা হয়েছে, যা সম্পর্কে একজন মুসলিমের জ্ঞান অর্জন করা আবশ্যক: আল্লাহ তা‘আলা সম্পর্কে জানা, দ্বীন ইসলাম সম্পর্কে জানা এবং নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জানা। এতে আল-কুরআনুল কারীম ও নবীর সুন্নাহ থেকে প্রামাণ্য দলীলের ভিত্তিতে ঈমানকে সুদৃঢ় করা ও সৎকর্ম প্রতিষ্ঠায় এসব নীতিমালার গুরুত্বকে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে। (আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে বহু আয়াতে নিজের জন্য সম্মানার্থে বহুবচন ব্যবহার করেছেন,যা মূলত আরাবী ভাষার একটি রীতি।বাংলায় এরীতির ব্যাবহার না থাকায় সে সব আয়াতের অনুবাদে বইটিতে একবচনই ব্যবহার করা হয়েছে।সম্পাদক,আব্দুর রব আফ্ফান)
তিনটি মূলনীতি ও তার দলীলসমূহ
শাইখ মুহাম্মাদ আত-তামীমী রাহিমাহুল্লাহ
بسم الله الرحمن الرحيمপরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি
(ভূমিকা - ১) জেনে রাখ, আল্লাহ তোমাকে দয়া করুন, আমাদের উপরে চারটি মাসআলা শিক্ষা করা ওয়াজিব:
এক: জ্ঞানার্জন; আর তা হচ্ছে দলিলসহ আল্লাহকে জানা, তাঁর নবীকে জানা ও দ্বীন ইসলাম কে জানা।
দুই: এর উপর আমল করা।
তিন: এর দিকে দাওয়াত দেওয়া।
চার: তাতে কষ্টের উপর সবর করা।
এর দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী:بِسۡمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحۡمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম وَٱلۡعَصۡرِ1“সময়ের শপথ,* إِنَّ ٱلۡإِنسَٰنَ لَفِي خُسۡرٍ2নিশ্চয় মানুষ অবশ্য অবশ্যই ক্ষতির মাঝে নিপতিত।* إِلَّا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ وَعَمِلُواْ ٱلصَّٰلِحَٰتِ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلۡحَقِّ وَتَوَاصَوۡاْ بِٱلصَّبۡرِ3﴾কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, আর পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে হকের এবং উপদেশ দিয়েছে সবরের।” [আল-‘আসর: ১-৩]
ইমাম শাফেয়ী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: ‘لَوْ مَا أنْزَلَ اللَّهُ حُجَّةً عَلَى خَلْقِهِ إِلَّا هَذِهِ السُّورَةَ، لَكَفَتْهُمْ".যদি আল্লাহ তাঁর মাখলুকের কাছে এই সূরা ছাড়া অন্য কোনো প্রমাণ (হুজ্জাত) নাযিল না করতেন, তবুও তা তাদের জন্য যথেষ্ট হত।’
ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: "بَابٌ: العِلْمُ قَبْلَ القَوْلِ وَالعَمَلِ؛ وَالدَّلِيلُ: قَوْلُهُ تَعَالَى: ﴿فَٱعۡلَمۡ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا ٱللَّهُ وَٱسۡتَغۡفِرۡ لِذَنۢبِكَ...﴾[محمد:9]، فَبَدَأَ بِالعِلْمِ" قَبْلَ القَوْلِ وَالعَمَلِ. অধ্যায়: কথা ও আমলের আগে ইলম অর্জন করতে হবে। দলীল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: “তুমি জেনে নাও যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য মাবূদ নেই এবং তোমার গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর...” [সূরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৯]। অতএব তিনি ইলমকে কথা ও আমলের আগে রেখেছেন।
(ভূমিকা - ২) তুমি জেনে রাখ -আল্লাহ তোমার উপর রহম করুন-: প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর উপর এই তিনটি মাসআলা শিক্ষা করা এবং তার উপর আমল করা ওয়াজিব:
প্রথম: নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, রিযিক দিয়েছেন এবং তিনি আমাদেরকে অনর্থক ছেড়ে দেননি; বরং তিনি আমাদের কাছে একজন রাসূল পাঠিয়েছেন। কাজেই যে তার অনুসরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে তার অবাধ্য হবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।
এর দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿إِنَّآ أَرۡسَلۡنَآ إِلَيۡكُمۡ رَسُولٗا شَٰهِدًا عَلَيۡكُمۡ كَمَآ أَرۡسَلۡنَآ إِلَىٰ فِرۡعَوۡنَ رَسُولٗا15“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের কাছে পাঠিয়েছি এক রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষীস্বরূপ যেমন রাসূল পাঠিয়েছিলাম ফির‘আউনের কাছে।* فَعَصَىٰ فِرۡعَوۡنُ ٱلرَّسُولَ فَأَخَذۡنَٰهُ أَخۡذٗا وَبِيلٗا16﴾কিন্তু ফির‘আউন সে রাসূলকে অমান্য করেছিল, ফলে আমি তাকে অত্যন্ত শক্তভাবে পাকড়াও করেছিলাম।” [আল-মুযযাম্মিল, আয়াত: ১৫-১৬]
দ্বিতীয়: নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট হবেন না যে, কাউকে তাঁর সাথে ইবাদতে শরীক করা হোক, না কোনো নৈকট্যপ্রাপ্ত ফিরিশতা আর না কোনো প্রেরিত নবীকে। এর দলীল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: ﴿وَأَنَّ ٱلۡمَسَٰجِدَ لِلَّهِ فَلَا تَدۡعُواْ مَعَ ٱللَّهِ أَحَدٗا18﴾“আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।”[১৮] [আল-জিন: ১৮]
তৃতীয়: যে ব্যক্তি রাসূলের অনুসরণ করে ও আল্লাহকেই একমাত্র মাবূদ জানে- তার জন্য এমন ব্যক্তির সাথে বন্ধুত্ব করা জায়েয হবে না,যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে; যদিও সে তার সবচেয়ে নিকটাত্মীয় হয়।
দলীল: আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿لَّا تَجِدُ قَوۡمٗا يُؤۡمِنُونَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ يُوَآدُّونَ مَنۡ حَآدَّ ٱللَّهَ وَرَسُولَهُۥ وَلَوۡ كَانُوٓاْ ءَابَآءَهُمۡ أَوۡ أَبۡنَآءَهُمۡ أَوۡ إِخۡوَٰنَهُمۡ أَوۡ عَشِيرَتَهُمۡۚ أُوْلَٰٓئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ ٱلۡإِيمَٰنَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٖ مِّنۡهُۖ وَيُدۡخِلُهُمۡ جَنَّٰتٖ تَجۡرِي مِن تَحۡتِهَا ٱلۡأَنۡهَٰرُ خَٰلِدِينَ فِيهَاۚ رَضِيَ ٱللَّهُ عَنۡهُمۡ وَرَضُواْ عَنۡهُۚ أُوْلَٰٓئِكَ حِزۡبُ ٱللَّهِۚ أَلَآ إِنَّ حِزۡبَ ٱللَّهِ هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ22﴾“আপনি পাবেন না আল্লাহ ও আখিরাতের উপর ঈমানদার এমন কোনো সম্প্রদায়, যারা ভালবাসে তাদেরকে যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে --- হোক না এ বিরুদ্ধাচারীরা তাদের পিতা, পুত্ৰ, ভাই অথবা এদের জ্ঞাতি-গোত্র। এদের অন্তরে আল্লাহ লিখে দিয়েছেন ঈমান এবং তাদেরকে শক্তিশালী করেছেন তাঁর পক্ষ থেকে রূহ দ্বারা। আর তিনি তাদেরকে প্ৰবেশ করাবেন এমন জান্নাতে, যার পাদদেশে নদীসমূহ প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহ্র দল। জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর দলই সফলকাম।” [আল-মুজাদালাহ: ২২].
( ভূমিকা - ৩) জেনে রাখ -আল্লাহ তোমাকে তাঁর আনুগত্যে পরিচালিত করুন-: নিশ্চয়ই হানিফিয়্যাহ - ইবরাহীমী মিল্লাত হচ্ছে যে: তুমি এক আল্লাহর ইবাদাত করবে, ইবাদতকে তাঁর জন্য খালিস করে। আল্লাহ সকল মানুষকে এরই আদেশ করেছেন, আর এ কারণেই তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ﴿وَمَا خَلَقۡتُ ٱلۡجِنَّ وَٱلۡإِنسَ إِلَّا لِيَعۡبُدُونِ56﴾“আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।” [সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত: ৫৬] «يعبدونِ» এর অর্থ হলো, يوَحِّدونِ অর্থাৎ (ইবাদতে) তারা আমারই একত্ব প্রতিষ্ঠা করবে)।
আর আল্লাহ যার নির্দেশ দিয়েছেন তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাওহীদ, আর তা হচ্ছে: কেবল আল্লাহর জন্য ইবাদতকে খাঁটি করে নেয়া।
আর তিনি যা থেকে সবচেয়ে কঠিনভাবে নিষেধ করেছেন, তা হলো শিরক। আর তা হচ্ছে: আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে আহবান করা।
এর দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡـٔٗا...﴾“আর তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত কর ও কোনো কিছুকে তাঁর শরীক করো না...।” [আন-নিসা: ৩৬]
( বইটির মূল বিষয় বস্তু) যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়: সেই তিনটি মূলনীতি কী, যা মানুষের জানা ওয়াজিব?
তখন তুমি বল, বান্দার তার রবকে, তার দ্বীনকে ও তার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানা।
[প্রথম মূলনীতি]
যখন তোমাকে জিজ্ঞেস করা হয়: তোমার রব কে?
তখন তুমি বল, আমার রব আল্লাহ। যিনি আমাকে এবং সকল সৃষ্টিজগতকে প্রতিপালন করেন তাঁর নি‘আমাত দ্বারা। তিনিই আমার একমাত্র মাবূদ, তিনি ছাড়া আমার আর কোনো মাবূদ নেই। দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿ٱلۡحَمۡدُ لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ2﴾“সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই।” [আল-ফাতিহা: ২] বস্তুত, আল্লাহ্ ছাড়া যা কিছু আছে, সবই হলো সৃষ্টিজগৎ, আর আমি সেই জগতেরই একজন।
যখন তোমাকে বলা হয়: তুমি কিভাবে তোমার রবকে চিনেছো?
তখন তুমি বল: তাঁর আয়াতসমূহ (নিদর্শনাবলী) ও মাখলূকদের দ্বারা।
আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে: রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদ।
আর তাঁর মাখলুকের অন্তর্ভুক্ত হলো: সাত আসমান ও তাতে যা কিছু আছে, সাত জমিন ও তাতে যা কিছু আছে, আর এ দুটির মধ্যে যা কিছু আছে।
দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿وَمِنۡ ءَايَٰتِهِ ٱلَّيۡلُ وَٱلنَّهَارُ وَٱلشَّمۡسُ وَٱلۡقَمَرُۚ لَا تَسۡجُدُواْ لِلشَّمۡسِ وَلَا لِلۡقَمَرِ وَٱسۡجُدُواْۤ لِلَّهِۤ ٱلَّذِي خَلَقَهُنَّ إِن كُنتُمۡ إِيَّاهُ تَعۡبُدُونَ37﴾“আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে রাত ও দিন, সূর্য ও চাঁদ। তোমরা সূর্যকে সাজ্দা করো না, চাঁদকেও নয়; আর সাজ্দা কর আল্লাহকেই, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদত কর।” [ফুসসিলাত: ৩৭]
আল্লাহর আরেকটি বাণী: ﴿إِنَّ رَبَّكُمُ ٱللَّهُ ٱلَّذِي خَلَقَ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٖ ثُمَّ ٱسۡتَوَىٰ عَلَى ٱلۡعَرۡشِۖ يُغۡشِي ٱلَّيۡلَ ٱلنَّهَارَ يَطۡلُبُهُۥ حَثِيثٗا وَٱلشَّمۡسَ وَٱلۡقَمَرَ وَٱلنُّجُومَ مُسَخَّرَٰتِۭ بِأَمۡرِهِۦٓۗ أَلَا لَهُ ٱلۡخَلۡقُ وَٱلۡأَمۡرُۗ تَبَارَكَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلۡعَٰلَمِينَ54﴾“নিশ্চয়ই তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ কত বরকতময়!” [আল-আরাফ: ৫৪]
আর রবই হলেন মা‘বূদ। দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ ٱعۡبُدُواْ رَبَّكُمُ ٱلَّذِي خَلَقَكُمۡ وَٱلَّذِينَ مِن قَبۡلِكُمۡ لَعَلَّكُمۡ تَتَّقُونَ21“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবেরই ‘ইবাদাত করো যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও।* ٱلَّذِي جَعَلَ لَكُمُ ٱلۡأَرۡضَ فِرَٰشٗا وَٱلسَّمَآءَ بِنَآءٗ وَأَنزَلَ مِنَ ٱلسَّمَآءِ مَآءٗ فَأَخۡرَجَ بِهِۦ مِنَ ٱلثَّمَرَٰتِ رِزۡقٗا لَّكُمۡۖ فَلَا تَجۡعَلُواْ لِلَّهِ أَندَادٗا وَأَنتُمۡ تَعۡلَمُونَ22﴾যিনি যমীনকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আসমানকে করেছেন ছাদ এবং আকাশ হতে পানি অবতীর্ণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। কাজেই তোমরা জেনে-শুনে কাউকে আল্লাহ্র সমকক্ষ দাঁড় করিও না।” [আল-বাকারা: ২১-২২]
ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহু তা‘আলা বলেন: "الخَالِقُ لِهَذِهِ الأَشْيَاءِ، هُوَ المُسْتَحِقُ لِلْعِبَادَةِ".“এসব বস্তুর যিনি সৃষ্টিকর্তা, কেবল তিনিই ইবাদাতের যোগ্য।”
আল্লাহ যেসব ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছেন সেগুলো নানা প্রকারের: যেমন: ইসলাম, ঈমান ও ইহসান। এর মধ্যে আরো রয়েছে: দু‘আ, ভয়, আশা, তাওয়াক্কুল, আগ্রহ, ভীতি, নম্রতা, আশংকা,আল্লাহর দিকে গভীরভাবে প্রত্যাবর্তন, সাহায্য প্রার্থনা করা, আশ্রয় চাওয়া, ফরিয়াদ করা, যবেহ করা, মানত করা সহ আরো অন্যান্য ইবাদাত, যেগুলোর ব্যাপারে আল্লাহ আদেশ করেছেন- এগুলো সবই আল্লাহর জন্য। দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।” [আল-জিন: ১৮]
কাজেই যে ব্যক্তি এগুলোর কোনটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য পালন করবে, সে কাফির-মুশরিক। দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿وَمَن يَدۡعُ مَعَ ٱللَّهِ إِلَٰهًا ءَاخَرَ لَا بُرۡهَٰنَ لَهُۥ بِهِۦ فَإِنَّمَا حِسَابُهُۥ عِندَ رَبِّهِۦٓۚ إِنَّهُۥ لَا يُفۡلِحُ ٱلۡكَٰفِرُونَ117﴾“আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র সাথে অন্য কোন মাবূদ কে ডাকে, এ বিষয়ে তার নিকট কোনো প্ৰমাণ নেই; তার হিসাব তো তার রবের নিকটই আছে। নিশ্চয়ই কাফেররা সফলকাম হবে না।” [আল-মু’মিনূন: ১১৭]
হাদীসে এসেছে: “দু‘আ হচ্ছে ইবাদাতের মূল।”
দলীল: আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ إِنَّ ٱلَّذِينَ يَسۡتَكۡبِرُونَ عَنۡ عِبَادَتِي سَيَدۡخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ60﴾“আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা একমাত্র আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয়ই যারা অহংকারবশে আমার 'ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।” [গাফির: ৬০]
ভয়ের দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿...فَلَا تَخَافُوهُمۡ وَخَافُونِ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ﴾“...অতএব তোমরা তাদেরকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় কর যদি তোমরা মুমিন হও।” [আলে ইমরান: ১৭৫]
আশা-আকাঙ্খার দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿...فَمَن كَانَ يَرۡجُواْ لِقَآءَ رَبِّهِۦ فَلۡيَعۡمَلۡ عَمَلٗا صَٰلِحٗا وَلَا يُشۡرِكۡ بِعِبَادَةِ رَبِّهِۦٓ أَحَدَۢا﴾“কাজেই যে তার রবের সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে ও তার রবের ‘ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে।” [আল-কাহাফ: ১১০]
তাওয়াক্কুলের দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿...وَعَلَى ٱللَّهِ فَتَوَكَّلُوٓاْ إِن كُنتُم مُّؤۡمِنِينَ﴾“... এবং আল্লাহর উপরই তোমরা নির্ভর কর যদি তোমরা মুমিন হও।” [আল-মায়েদা: ২৩] এবং আল্লাহর বাণী: ﴿...وَمَن يَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱللَّهِ فَهُوَ حَسۡبُهُ...﴾“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে তার জন্য আল্লাহ্ই যথেষ্ট।” [আত-ত্বলাক: ৩]।
আগ্রহ, ভীতি ও বিনম্রতার দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “নিশ্চয় তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত, আর তারা আমাকে ডাকত আগ্রহ ও ভীতির সাথে এবং তারা ছিল আমার প্রতি ভীত-অবনত।” [আল-আম্বিয়া: ৯০]
আশংকা (জনিত ভয়) এর দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “... সুতরাং তাদেরকে ভয় করো না,একমাত্র আমাকে ভয় কর।” [আল-মায়েদা: ৩]
আল্লাহর দিকে গভীরভাবে প্রত্যাবর্তন এর দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: "আর তোমরা তোমাদের রবের অভিমুখী হও এবং তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ কর...।" [আয-যুমার: ৫৪]
সাহায্য প্রার্থনার দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿إِيَّاكَ نَعۡبُدُ وَإِيَّاكَ نَسۡتَعِينُ5﴾"আমরা শুধু আপনারই ‘ইবাদাত করি, এবং শুধু আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।" [আল-ফাতিহাহ: ৫] হাদীসে এসেছে: "إِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ".“যখন তুমি সাহায্য প্রার্থনা করবে, তখন আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করবে।”
আশ্রয় প্রার্থনার দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: "বলুন, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের।" [আল-ফালাক: ১], ও ﴿قُلۡ أَعُوذُ بِرَبِّ ٱلنَّاسِ1﴾"বলুন, ‘আমি আশ্ৰয় প্রার্থনা করছি মানুষের রবের।" [আন-নাস: ১]।
ফরিয়াদ করার দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿إِذۡ تَسۡتَغِيثُونَ رَبَّكُمۡ فَٱسۡتَجَابَ لَكُمۡ...﴾"স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের রবের নিকট উদ্ধার প্রার্থনা করছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন...।" [আল-আনফাল: ৯]
যবেহ এর দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿قُلۡ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحۡيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ162"বলুন, ‘আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।* لَا شَرِيكَ لَهُ...﴾তাঁর কোনো শরীক নেই...। [সূরা আল-আনআম: ১৬২-১৬৩] আর হাদীস থেকে দলীল হচ্ছে: "لَعَنَ اللَّهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللَّهِ".“যে ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া কারো জন্য যবেহ করে, আল্লাহ তাকে লানত করেন।”
মানতের দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿يُوفُونَ بِٱلنَّذۡرِ وَيَخَافُونَ يَوۡمٗا كَانَ شَرُّهُۥ مُسۡتَطِيرٗا7﴾"তারা মানত পূর্ণ করে এবং সে দিনের ভয় করে যার অকল্যাণ হবে ব্যাপক।" [আল-ইনসান: ৭]
[দ্বিতীয় মূলনীতি]
দলীল-প্রমাণসহ দ্বীন ইসলাম কে জানা; আর সেটি হলো: তাওহীদের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার কাছে আত্মসমর্পণ করা, ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর আনুগত্য করা এবং শিরক ও মুশরিক থেকে পবিত্র থাকা।
দ্বীনের স্তর তিনটি: ইসলাম, ঈমান ও ইহসান।
আর প্রত্যেক স্তরেরই কতিপয় রুকন রয়েছে।
ইসলামের রুকন পাঁচটি: সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য মাবূদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, রমাযানে সিয়াম পালন করা এবং আল্লাহর সম্মানীত ঘরের হজ্জ পালন করা।
প্রথম রুকন সাক্ষ্য দেওয়ার দলীল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: ﴿شَهِدَ ٱللَّهُ أَنَّهُۥ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ وَأُوْلُواْ ٱلۡعِلۡمِ قَآئِمَۢا بِٱلۡقِسۡطِۚ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡعَزِيزُ ٱلۡحَكِيمُ18﴾"আল্লাহ্ সাক্ষ্য দেন যে, নিশ্চয় তিনি ছাড়া কোনো সত্য মাবূদ নেই। আর ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানীগণও; আল্লাহ্ ন্যায়নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া অন্য কোনো সত্য মাবূদ নেই, (তিনি) পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" [আলে ইমরান: ১৮]
এর অর্থ হচ্ছে: আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মা‘বূদ নেই।
‘লা ইলাহা’ অংশটি আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত করা হয় তাদের সবাইকে নাকচ করে দেয়।
(إِلَّا اللَّهُ)ইল্লাল্লাহ অংশটি একমাত্র আল্লাহ তা‘আলারই জন্য ইবাদতকে সাব্যস্ত করে।
তাঁর ইবাদতে কোনো শরীক নেই, যেমন তাঁর রাজত্বে কোনো শরীক নেই।
এর ব্যাখ্যাকে আরো স্পষ্ট করে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿وَإِذۡ قَالَ إِبۡرَٰهِيمُ لِأَبِيهِ وَقَوۡمِهِۦٓ إِنَّنِي بَرَآءٞ مِّمَّا تَعۡبُدُونَ"আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম তার পিতা এবং তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা যেগুলোর ইবাদাত কর নিশ্চয় আমি তাদের থেকে সম্পৰ্কমুক্ত।* إِلَّا ٱلَّذِي فَطَرَنِي..﴾তবে তিনি ব্যতীত যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন..।" [আয-যুখরুফ: ২৬, ২৭] আল্লাহর আরো বাণী: ﴿قُلۡ يَٰٓأَهۡلَ ٱلۡكِتَٰبِ تَعَالَوۡاْ إِلَىٰ كَلِمَةٖ سَوَآءِۭ بَيۡنَنَا وَبَيۡنَكُمۡ أَلَّا نَعۡبُدَ إِلَّا ٱللَّهَ وَلَا نُشۡرِكَ بِهِۦ شَيۡـٔٗا وَلَا يَتَّخِذَ بَعۡضُنَا بَعۡضًا أَرۡبَابٗا مِّن دُونِ ٱللَّهِۚ فَإِن تَوَلَّوۡاْ فَقُولُواْ ٱشۡهَدُواْ بِأَنَّا مُسۡلِمُونَ64﴾"আপনি বলুন। ‘হে আহলে কিতাবগণ! এস সে কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা একমাত্র আল্লাহ্ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্ ছাড়া একে অন্যকে রব হিসেবে গ্রহণ না করি। ’ তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তোমরা বল, তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম।’" [আলে ইমরান : ৬৪]
‘মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল’ সাক্ষের দলীল আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿لَقَدۡ جَآءَكُمۡ رَسُولٞ مِّنۡ أَنفُسِكُمۡ عَزِيزٌ عَلَيۡهِ مَا عَنِتُّمۡ حَرِيصٌ عَلَيۡكُم بِٱلۡمُؤۡمِنِينَ رَءُوفٞ رَّحِيمٞ128﴾"অবশ্যই তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হতেই একজন রাসূল এসেছেন, তোমাদের যে দুঃখ-কষ্ট হয়ে থাকে তা তার জন্য বড়ই বেদনাদায়ক। তিনি তোমাদের মঙ্গলকামী, মুমিনদের প্রতি তিনি করুণাশীল ও অতি দয়ালু।" আত-তাওবাহ: ১২৮]
‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল’ এ কথার সাক্ষ্য দেওয়ার অর্থ হচ্ছে: তিনি যা আদেশ করেছেন তা মান্য করা, তিনি যা কিছুর ব্যাপারে সংবাদ দিয়েছেন তা অন্তরে বিশ্বাস করা, তিনি যা হতে নিষেধ করেছেন ও সতর্ক করেছেন তা হতে দূরে থাকা এবং তিনি যেভাবে শরী‘আত প্রণয়ন করেছেন সেভাবেই আল্লাহর ইবাদত করা।
সালাত, যাকাত ও তাওহীদের ব্যাখ্যার দলীল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: ﴿وَمَآ أُمِرُوٓاْ إِلَّا لِيَعۡبُدُواْ ٱللَّهَ مُخۡلِصِينَ لَهُ ٱلدِّينَ حُنَفَآءَ وَيُقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَيُؤۡتُواْ ٱلزَّكَوٰةَۚ وَذَٰلِكَ دِينُ ٱلۡقَيِّمَةِ5﴾“আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দীনকে একনিষ্ঠ করে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত প্ৰদান করে। আর এটাই সঠিক দীন।” [সূরা আল-বায়্যিনাহ: ৫]
সিয়াম পালনের দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “হে মুমিনগণ ! তোমাদের জন্য সিয়াম ফরজ করা হল, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার।” [আল-বাকারাহ : ১৮৩]
হজ্জের দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿وَلِلَّهِ عَلَى ٱلنَّاسِ حِجُّ ٱلۡبَيۡتِ مَنِ ٱسۡتَطَاعَ إِلَيۡهِ سَبِيلٗاۚ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ ٱللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ ٱلۡعَٰلَمِينَ97﴾“আর মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছে, আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে ঐ ঘরের হজ্ব করা তার জন্য অবশ্য কর্তব্য। আর যে কেউ কুফরী করল সে জেনে রাখুক, নিশ্চয় আল্লাহ সৃষ্টিজগৎ সমূহের মুখাপেক্ষী নন।” [সূরা আলে ইমরান: ৯৭]
দ্বিতীয় স্তর: ঈমান; যার শাখা সত্তরটিরও বেশি। তার মধ্যে সর্বোত্তম হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা, আর সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূরীভূত করা। আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।
ঈমানের রুকন ছয়টি: আল্লাহর প্রতি ঈমান, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, তাঁর রাসূলগণের প্রতি ঈমান, পরকালের প্রতি ঈমান এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান।
এই ছয়টি রুকনের দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿لَّيۡسَ ٱلۡبِرَّ أَن تُوَلُّواْ وُجُوهَكُمۡ قِبَلَ ٱلۡمَشۡرِقِ وَٱلۡمَغۡرِبِ وَلَٰكِنَّ ٱلۡبِرَّ مَنۡ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَٱلۡيَوۡمِ ٱلۡأٓخِرِ وَٱلۡمَلَٰٓئِكَةِ وَٱلۡكِتَٰبِ وَٱلنَّبِيِّـۧنَ...﴾“পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফিরানোই সৎকর্ম নয়, কিন্তু সৎকর্ম হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহ্, শেষ দিবস, ফেরেশ্তাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনবে, ...।” [আল-বাকারাহ: ১৭৭]
তাকদীরের দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿إِنَّا كُلَّ شَيۡءٍ خَلَقۡنَٰهُ بِقَدَرٖ49﴾“নিশ্চয় আমি প্রত্যেক কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।” [আল-কামার: ৪৯]
তৃতীয় স্তর: ইহসান- এর একটিমাত্র রুকন, তা হলো: তুমি আল্লাহর ইবাদাত এমনভাবে করবে যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ। আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে তিনি তোমাকে দেখছেন।
দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿إِنَّ ٱللَّهَ مَعَ ٱلَّذِينَ ٱتَّقَواْ وَّٱلَّذِينَ هُم مُّحۡسِنُونَ128﴾“নিশ্চয় আল্লাহ্ তাদের সঙ্গে আছেন যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যারা মুহসিন।” [সূরা আন-নাহল: ১২৮।]
এবং আল্লাহর এ বাণী: ﴿وَتَوَكَّلۡ عَلَى ٱلۡعَزِيزِ ٱلرَّحِيمِ217“আর আপনি নির্ভর করুন পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহ্র উপর,* ٱلَّذِي يَرَىٰكَ حِينَ تَقُومُ218যিনি আপনাকে দেখেন যখন আপনি দাঁড়ান,* وَتَقَلُّبَكَ فِي ٱلسَّٰجِدِينَ219﴾এবং সাজদাকারীদের মাঝে আপনার উঠাবসা।” [আশ-শু‘আরা : ২১৭-২১৯]
এবং আল্লাহর এ বাণী: ﴿وَمَا تَكُونُ فِي شَأۡنٖ وَمَا تَتۡلُواْ مِنۡهُ مِن قُرۡءَانٖ وَلَا تَعۡمَلُونَ مِنۡ عَمَلٍ إِلَّا كُنَّا عَلَيۡكُمۡ شُهُودًا إِذۡ تُفِيضُونَ فِيهِ...﴾“আর আপনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন এবং আপনি সে সম্পর্কে কুরআন থেকে যা-ই তিলাওয়াত করেন এবং তোমরা যে আমলই কর না কেন, আমি তোমাদের সাক্ষী থাকি... যখন তোমরা তাতে প্রবৃত্ত হও।” [ইউনুস: ৬১] আয়াতটি শেষ পর্যন্ত।
সবগুলোর সুন্নাহ হতে দলীল হলো: প্রসিদ্ধ হাদীসে জিবরীল, যা উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: "بَيْنَمَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ يَوْمٍ، إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا رَجُلٌ، شَدِيدُ بَيَاضِ الثِّيَابِ، شَدِيدُ سَوَادِ الشَّعَرِ، لَا يُرَى عَلَيْهِ أَثَرُ السَّفَرِ، وَلَا يَعْرِفُهُ مِنَّا أَحَدٌ، حَتَّى جَلَسَ إِلَى النَّبِيِّ ﷺ فَأَسْنَدَ رُكْبَتَيْهِ إِلَى رُكْبَتَيْهِ، وَوَضَعَ كَفَّيْهِ عَلَى فَخِذَيْهِ، وَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ !“একবার আমরা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকটে ছিলাম। এমন সময় একজন লোক আমাদের কাছে এসে হাজির হলেন। তার পরিধানের কাপড় ছিল ধবধবে সাদা, মাথার কেশ ছিল কাল কুচকুচে। তার গায়ে সফরের কোনো চিহ্ন ছিল না, আর আমরা কেউ তাকে চিনি না। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে বসে পড়লেন; নিজের দুই হাঁটু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই হাঁটুর সাথে লাগিয়ে দিলেন এবং তার দুই হাত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই উরুর উপর রাখলেন, তারপর তিনি বললেনঃ হে মুহাম্মাদ!
أَخْبِرْنِي عَنِ الإِسْلَامِ؟আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন?
فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: الإِسْلَامُ: أَنْ تَشْهَدَ أَلَّا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ، وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ، وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ، وَتَصُومَ رَمَضَانَ، وَتَحُجَّ البَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلًا، قَالَ: صَدَقْتَ - فَعَجِبْنَا لَهُ، يَسْأَلُهُ وَيُصَدِّقُهُ –.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “ইসলাম হচ্ছে: তুমি এ কথার সাক্ষ্য দেবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। তুমি সালাত কায়েম করবে, যাকাত প্রদান করবে, রমযান মাসে সিয়াম পালন করবে, আর বাইতুল্লাহতে পৌঁছানোর সামর্থ থাকলে হজ্জ পালন করবে।” সে বলল, “আপনি সত্য বলেছেন।” ফলে আমরা তার ব্যাপারে বিস্মিত হলাম- সে তাঁকে প্রশ্ন করছে, আবার তাঁর কথাকে সত্যায়নও করছে।
قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنِ الْإِيمَانِ؟তিনি বললেন: এবার আমাকে ঈমান সম্পর্কে সংবাদ দিন?
قَالَ: أَنْ تُؤْمِنَ بِاللَّهِ، وَمَلَائِكَتِهِ، وَكُتُبِهِ، وَرُسُلِهِ، وَاليَوْمِ الْآخِرِ، وَتُؤْمِنَ بِالقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ، قَالَ: صَدَقْتَ.তিনি বললেন: “তুমি আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, আখেরাত দিবস ও তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান আনবে।” তিনি বললেন, আপনি সত্যই বলেছেন।
قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنِ الْإِحْسَانِ؟তিনি বললেন, আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন।
قَالَ: أَنْ تَعْبُدَ اللَّهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ، فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ.তিনি বললেন: তুমি আল্লাহর ইবাদাত করবে এমনভাবে যেন তুমি তাঁকে দেখতে পাচ্ছ, আর যদি তুমি তাঁকে দেখতে না পাও, তবে তিনি তোমাকে দেখছেন।
قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنِ السَّاعَةِ؟তিনি বললেন: এখন আমাকে কিয়ামত সম্পর্কে জানান?
قَالَ: مَا المَسْؤُولُ عَنْهَا بِأَعْلَمَ مِنَ السَّائِلِ.তিনি বললেন: এ বিষয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি প্রশ্নকারীর চেয়ে বেশি জানে না।
قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنْ أَمَارَاتِهَا؟তিনি বললেন, ‘তাহলে এর কিছু আলামত সম্পর্কে আমাকে বলুন?’
قَالَ: أَنْ تَلِدَ الأَمَةُ رَبَّتَهَا، وَأَنْ تَرَى الحُفَاةَ العُرَاةَ العَالَةَ رِعَاءَ الشَّاءِ، يَتَطَاوَلُونَ فِي البُنْيَانِ.তিনি বললেন: যখন কৃতদাসী তার মালকিনকে প্রসব করবে, আর যখন তুমি নগ্নপদ, বস্ত্রহীন ও দরিদ্র ছাগলের রাখালদেরকে অট্টালিকার ওপর গর্ব করতে দেখবে।
قَالَ: ثُمَّ انْطَلَقَ فَلَبِثْتُ مَلِيًّا، ثُمَّ قَالَ لِي: يَا عُمَرُ! أَتَدْرِي مَنِ السَّائِلُ؟ قُلْتُ: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: فَإِنَّهُ جِبْرِيلُ، أَتَاكُمْ يُعَلِّمُكُمْ دِينَكُمْ".এরপর তিনি চলে গেলেন। আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর তিনি আমাকে বললেন, “হে উমার! তুমি জানো, এই প্রশ্নকারী কে?” আমি বললাম, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন।” তিনি বললেন, “তিনি হচ্ছেন জিবরীল; তোমাদের কাছে তিনি তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।”
তৃতীয় মূলনীতি
তোমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানা: তিনি হলেন মুহাম্মাদ ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনু আব্দিল মুত্তালিব ইবনু হাশিম। আর হাশিম হলেন কুরাইশের মধ্য হতে, কুরাইশ আরবদের মধ্য হতে, আর আরব ইবরাহীম খলীলের পুত্র ইসমাঈলের বংশধর। তার উপরে এবং আমাদের নবীর উপরে আল্লাহর সর্বোত্তম সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক।
তার মোট তেষট্টি বছর বয়স হয়েছিল, যার মধ্যে চল্লিশ বছর নবুওয়তের আগে এবং তেইশ বছর নবী ও রসূল হিসেবে।
‘اقرأ’ ইক্বরা দ্বারা তিনি নবুওয়াত প্রাপ্ত হয়েছেন আর ‘المدثر’ সম্মধন দ্বারা তিনি রিসালাত লাভ করেছেন। আর তার জন্মস্থান হলো মক্কা।
আল্লাহ তাকে শিরক সম্পর্কে সতর্কতা এবং তাওহীদের দিকে আহ্বানকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡمُدَّثِّرُ1يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡمُدَّثِّرُ1হে বস্ত্ৰাচ্ছাদিত!* قُمۡ فَأَنذِرۡ2'উঠুন, অতঃপর সতর্ক করুন,* وَرَبَّكَ فَكَبِّرۡ3আর আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করুন।* وَثِيَابَكَ فَطَهِّرۡ4আর আপনার পরিচ্ছদ পবিত্ৰ করুন,* وَٱلرُّجۡزَ فَٱهۡجُرۡ5আর শির্ক পরিহার করে চলুন,* وَلَا تَمۡنُن تَسۡتَكۡثِرُ6আর বেশী পাওয়ার প্রত্যাশায় ইহসান প্রকাশ করবেন না।* وَلِرَبِّكَ فَٱصۡبِرۡ7﴾আর আপনার রবের জন্যই ধৈর্য ধারণ করুন।” [আল-মুদ্দাসসির: ১-৭]
আর উদ্দেশ্য 201﴿قُمۡ فَأَنذِرۡ﴾:এর: ’উঠুন, অতঃপর সতর্ক করুন [১], তিনি শিরক হতে সতর্ক করেন এবং তাওহীদের দিকে দা‘ওয়াত দেন।
“আর আপনার রবের বড়ত্ব ঘোষণা করুন।” অর্থাৎ: তাওহীদের মাধ্যমে তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন কর।
﴿وَثِيَابَكَ فَطَهِّرۡ﴾“আর আপনার পরিচ্ছদ পবিত্ৰ করুন।” অর্থাৎ আপনার আমলসমূহকে শিরক হতে পবিত্র করুন।
﴿وَٱلرُّجۡزَ فَٱهۡجُرۡ﴾“আর শির্ক পরিহার করে চলুন।” الرِّجز শব্দের অর্থ: মূর্তিসমূহ। আর তা পরিহার করা হলো, তা থেকে ও তার পূজারীদের থেকে মুক্ত থাকা।
এর উপর ভিত্তি করে তিনি দশ বছর তাওহীদের দিকে আহবান করেন।দশ বছর পরে তাঁকে আসমানে নেওয়া হয় এবং তাঁর উপরে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরজ করা হয়। তিনি মক্কায় তিন বছর সালাত আদায় করেন এবং তারপর তাকে মদীনায় হিজরত করার আদেশ দেওয়া হয়।
হিজরত হচ্ছে: শিরকের এলাকা থেকে ইসলামের এলাকাতে স্থানান্তর হওয়া।
এই উম্মাহর উপর শিরকের এলাকা থেকে ইসলামের এলাকায় হিজরত করা ফরয। আর তা কিয়ামত কায়েম হওয়ার আগ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿ إِنَّ ٱلَّذِينَ تَوَفَّىٰهُمُ ٱلۡمَلَٰٓئِكَةُ ظَالِمِيٓ أَنفُسِهِمۡ قَالُواْ فِيمَ كُنتُمۡۖ قَالُواْ كُنَّا مُسۡتَضۡعَفِينَ فِي ٱلۡأَرۡضِۚ قَالُوٓاْ أَلَمۡ تَكُنۡ أَرۡضُ ٱللَّهِ وَٰسِعَةٗ فَتُهَاجِرُواْ فِيهَاۚ فَأُوْلَٰٓئِكَ مَأۡوَىٰهُمۡ جَهَنَّمُۖ وَسَآءَتۡ مَصِيرًا97“যারা নিজেদের উপর যুলুম করে তাদের প্রাণ গ্রহণের সময় ফিরিশতাগণ বলে, ‘তোমরা কী অবস্থায় ছিলে?’ তারা বলে, ‘দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম;’ তারা বলে, ‘আল্লাহর যমীন কি এমন প্রশস্ত ছিল না যেখানে তোমরা হিজরত করতে?’ এদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম, আর তা কত মন্দ আবাস!* إِلَّا ٱلۡمُسۡتَضۡعَفِينَ مِنَ ٱلرِّجَالِ وَٱلنِّسَآءِ وَٱلۡوِلۡدَٰنِ لَا يَسۡتَطِيعُونَ حِيلَةٗ وَلَا يَهۡتَدُونَ سَبِيلٗا98﴾তবে যেসব অহসায় পুরুষ, নারী ও শিশু কোনো উপায় অবলম্বন করতে পারে না এবং কোনো পথও পায় না (তারা ব্যতীত)।” [আন-নিসা: ৯৭-৯৮]
আল্লাহর বাণী: “হে আমার মুমিন বান্দাগণ! নিশ্চয়ই আমার যমীন প্রশস্ত; কাজেই তোমরা আমারই ইবাদাত কর।” [আল-আনকাবূত: ৫৬]
ইমাম বাগাভী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: “যেসব মুসলিম হিজরত না করে মক্কায় রয়ে গিয়েছিল তারাই এই আয়াতটি নাযিল হওয়ার কারণ। আল্লাহ তাদেরকে ঈমানের নামে (মুমিন বলে) আহবান করেছেন।”
সুন্নাহ হতে হিজরতের দলীল হচ্ছে: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর বাণী: "لَا تَنْقَطِعُ الهِجْرَةُ حَتَّى تَنْقَطِعَ التَّوْبَةُ، وَلَا تَنْقَطِعُ التَّوْبَةُ حَتَّى تَطْلُعَ الشَّمْسُ مِنْ مَغْرِبِهَا".“হিজরত ততদিন পর্যন্ত শেষ হবে না যতদিন না তাওবার পথ বন্ধ হয়। আর তাওবা ততদিন পর্যন্ত বন্ধ হবে না, যতদিন না সূর্য তার পশ্চিম দিক থেকে উদিত হবে।”
যখন তিনি মদীনায় স্থির হলেন, তখন তাকে শরীয়তের বাকি বিধানগুলো দেওয়া হয়, যেমন: যাকাত, সিয়াম, হজ্জ, আজান, জিহাদ, সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজ হতে নিষেধ। আর এর উপর তিনি দশ বছর অবস্থান করেন।
তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মারা গেছেন কিন্তু তার দ্বীন অবশিষ্ট। এটাই তার দ্বীন। এমন কোনো কল্যাণ নেই, যার প্রতি তিনি উম্মতকে দিকনির্দেশ দেননি; আর এমন কোনো অকল্যাণ নেই, যার ব্যাপারে তিনি তাদেরকে সতর্ক করেননি।
আর তিনি তার উম্মাতকে যে কল্যাণের পথ দেখিয়েছেন তা হচ্ছে তাওহীদ এবং এমন সকল কাজ যাতে আল্লাহ খুশি ও সন্তুষ্ট হন।
আর যে অকল্যাণ হতে তিনি তার উম্মাতকে সতর্ক করেছেন তা হচ্ছে শিরক এবং যা আল্লাহ অপছন্দ করেন ও প্রত্যাখ্যান করেন।
আল্লাহ তাকে সমস্ত মানুষের জন্য প্রেরণ করেছেন। এবং সমস্ত জিন ও ইনসানের উপরে তার আনুগত্য ফরয করেছেন। দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿قُلۡ يَٰٓأَيُّهَا ٱلنَّاسُ إِنِّي رَسُولُ ٱللَّهِ إِلَيۡكُمۡ جَمِيعًا...﴾“বলুন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয় আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহ্র রাসূল...।” [আল-আরাফ : ১৫৮]
আল্লাহ তা‘আলা তার মাধ্যমে দীনকে পূর্ণ করেছেন। দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿...ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ...﴾“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” [আল-মায়েদা : ৩]
তার মৃত্যুর দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿إِنَّكَ مَيِّتٞ وَإِنَّهُم مَّيِّتُونَ30“আপনি তো মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।* ثُمَّ إِنَّكُمۡ يَوۡمَ ٱلۡقِيَٰمَةِ عِندَ رَبِّكُمۡ تَخۡتَصِمُونَ31﴾তারপর কিয়ামতের দিন নিশ্চয় তোমরা তোমাদের রবের সামনে পরস্পর বাক-বিতণ্ডা করবে।” [আয-যুমার:৩০-৩১]
আর মানুষেরা যখন মারা যাবে, তখন তাদেরকে পুনরুত্থিত করা হবে, দলীল হচ্ছে আল্লাহর বাণী: ﴿مِنۡهَا خَلَقۡنَٰكُمۡ وَفِيهَا نُعِيدُكُمۡ وَمِنۡهَا نُخۡرِجُكُمۡ تَارَةً أُخۡرَىٰ55﴾“আমি মাটি থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেব এবং তা থেকেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করব।” [সূরা ত্বহা,আয়াত: ৫৫] এবং আল্লাহর এ বাণী: ﴿وَٱللَّهُ أَنۢبَتَكُم مِّنَ ٱلۡأَرۡضِ نَبَاتٗا17“আর আল্লাহই তোমাদেরকে উদ্ভূত করেছেন মাটি হতে।* ثُمَّ يُعِيدُكُمۡ فِيهَا وَيُخۡرِجُكُمۡ إِخۡرَاجٗا18﴾তারপর তিনিই তাতে তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেবেন এবং পরে নিশ্চিতভাবে বের করে নিবেন।” [সূরা নূহ: ১৭-১৮]
পুনরুত্থানের পরে তাদের হিসাব হবে এবং তাদের আমল অনুসারে প্রতিদান পাবে। দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: 245﴿...لِيَجۡزِيَ ٱلَّذِينَ أَسَٰٓـُٔواْ بِمَا عَمِلُواْ وَيَجۡزِيَ ٱلَّذِينَ أَحۡسَنُواْ بِٱلۡحُسۡنَى﴾“... যাতে তিনি তাদের কাজের প্রতিফল দিতে পারেন যারা মন্দ কাজ করে এবং তাদেরকে তিনি উত্তম পুরস্কার দিতে পারেন যারা সৎকাজ করে।” [আন-নাজম: ৩১]
যে ব্যক্তি পুনরুত্থানকে মিথ্যা মনে করল, সে কুফুরী করল। দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿زَعَمَ ٱلَّذِينَ كَفَرُوٓاْ أَن لَّن يُبۡعَثُواْۚ قُلۡ بَلَىٰ وَرَبِّي لَتُبۡعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلۡتُمۡۚ وَذَٰلِكَ عَلَى ٱللَّهِ يَسِيرٞ7﴾“কাফিররা ধারণা করে যে, তাদেরকে কখনো পুনরুত্থিত করা হবে না। বলুন, ‘অবশ্যই হ্যাঁ, আমার রবের শপথ! তোমাদেরকে অবশ্যই পুনরুত্থিত করা হবে। তারপর তোমরা যা করতে সে সম্বন্ধে তোমাদেরকে অবশ্যই অবহিত করা হবে। আর এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।’” [সূরা আত-তাগাবুন: ০৭]
আর আল্লাহ তা‘আলা সকল রসূলকে সুসংবাদ দানকারী ও ভীতি প্রদর্শণকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: 251﴿رُّسُلٗا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةُۢ بَعۡدَ ٱلرُّسُلِۚ...﴾“সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণ আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে।” [আন-নিসা : ১৬৫]
তাদের প্রথমজন হলেন নূহ আলাইহিস সালাম।
আর তাদের সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম; তিনি নবীদের মধ্যে সর্বশেষ—তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই। আর প্রমাণ হলো, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: 255﴿مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَآ أَحَدٖ مِّن رِّجَالِكُمۡ وَلَٰكِن رَّسُولَ ٱللَّهِ وَخَاتَمَ ٱلنَّبِيِّـۧنَ...﴾“মুহাম্মদ তোমাদের মধ্যে কোনো পুরুষের পিতা নন; ববং তিনি আল্লাহর রাসূল এবং শেষ নবী...।” [আল-আহযাব : ৪০]
নূহ ‘আলাইহিস সালাম তাদের মধ্যে প্রথম এর দলীল হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿إِنَّآ أَوۡحَيۡنَآ إِلَيۡكَ كَمَآ أَوۡحَيۡنَآ إِلَىٰ نُوحٖ وَٱلنَّبِيِّـۧنَ مِنۢ بَعۡدِهِ...﴾“নিশ্চয় আমি আপনার নিকট ওহী প্রেরণ করেছিলাম, যেমন নূহ ও তার পরবর্তী নবীগণের প্রতি ওহী প্রেরণ করেছিলাম...।” [আন-নিসা: ১৬৩]
আর আল্লাহ তা‘আলা নূহ থেকে মুহাম্মাদ পর্যন্ত রাসূলদেরকে যেসব উম্মাতের কাছে প্রেরণ করেছেন তারা তাদের উম্মতকে এক আল্লাহর ইবাদাতের আদেশ করতেন এবং তাদেরকে তাগুতের ইবাদাত হতে নিষেধ করতেন। দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿وَلَقَدۡ بَعَثۡنَا فِي كُلِّ أُمَّةٖ رَّسُولًا أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱجۡتَنِبُواْ ٱلطَّٰغُوتَ...﴾“আর অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছি এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্র ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর...।” [আন-নাহল ৩৬]
আল্লাহর উপরে ঈমান আনা ও তাগুতকে অস্বীকার করা আল্লাহ তা‘আলা সকল বান্দার উপরে ফরয করেছেন।
ইবনুল কাইয়্যেম রাহিমাহুল্লাহু বলেন: তাগুতের অর্থ হচ্ছে: বান্দা যাকে নিয়ে তার সীমা অতিক্রম করে- চাই তা মা‘বূদ হোক, অথবা অনুসরণীয়, অথবা আনুগত্য প্রাপ্ত ব্যক্তিত্ব।
তাগুত অসংখ্য। আর তাদের প্রধান হলো পাঁচজন: অভিশপ্ত ইবলিস, যার সম্মতিতে তার ইবাদত করা হয়, যে মানুষকে তার নিজের ইবাদাতের দিকে আহ্বান করে, যে গাইবী ইলমের দাবী করে, আর যে আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানকে বাদ দিয়ে বিচার ফায়সালা করে।
দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী: ﴿لَآ إِكۡرَاهَ فِي ٱلدِّينِۖ قَد تَّبَيَّنَ ٱلرُّشۡدُ مِنَ ٱلۡغَيِّۚ فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ لَا ٱنفِصَامَ لَهَاۗ وَٱللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ256﴾“দীন গ্রহণের ব্যাপারে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই; সত্য পথ সুস্পষ্ট হয়েছে ভ্রান্ত পথ থেকে। অতএব, যে তাগূতকে অস্বীকার করবে ও আল্লাহ্র উপর ঈমান আনবে সে এমন এক দৃঢ়তর রজ্জু ধারন করল যা কখনো ভাঙ্গবে না। আর আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।” [আল-বাকারাহ : ২৫৬] আর এটাই লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ (আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই) এর অর্থ। তাছাড়া হাদীসে এসেছে: "رَأْسُ الأَمْرِ: الإِسْلَامُ، وَعَمُودُهُ: الصَّلَاةُ، وَذِرْوَةُ سَنَامِهِ: الجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ".“সকল কাজের শ্রেষ্ঠ হল ইসলাম, যার স্তম্ভ হল সালাত এবং সর্বোচ্চ শিখর হল আল্লাহর পথে জিহাদ।”
আল্লাহই অধিক জ্ঞাত।