Skip to content
রমাদান মাস সংক্রান্ত ছোটদের জন্য প্রশ্নোত্তর, যা বড়দের জন্যও জরুরী

রমাদান মাস সংক্রান্ত ছোটদের জন্য প্রশ্নোত্তর, যা বড়দের জন্যও জরুরী

পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি ভূমিকা সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি রমাদান মাসকে নির্ধারণ করেছেন এবং এটিকে অন্যান্য মাস ও দিনের তুলনায় অনেক মর্যাদা দান করেছেন। আমরা সালাত ও সালাম প্রেরণ করি মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহর প্রতি। আল্লাহ তার ওপর, তার পরিবারবর্গ এবং সাহাবীগণের ওপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন। অতপর: এটি রমাদান মাস সংক্রান্ত ছোটদের জন্য প্রশ্নোত্তর, যা বড়দের জন্যও জরুরী। এতে রমাদান মাসের ফরয, মুস্তাহাব ও করণীয় বিষয়সমূহ আলোচনা করা হয়েছে। একজন অভিভাবক শিশুর প্রকৃতি ও তার বয়স অনুযায়ী এখান থেকে উপযুক্ত বিষয় নির্বাচন করতে পারবেন।

Language: lang_bn
Prepared by: বিভিন্ন ভাষায় ইসলামী বিষয়বস্তুর সেবামূলক সংস্থা
Version: 1.0

রমাদান মাস সংক্রান্ত ছোটদের জন্য প্রশ্নোত্তর, যা বড়দের জন্যও জরুরী

বিভিন্ন ভাষায় ইসলামী বিষয়বস্তুর সেবামূলক সংস্থা

পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি

ভূমিকা

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি রমাদান মাসকে নির্ধারণ করেছেন এবং এটিকে অন্যান্য মাস ও দিনের তুলনায় অনেক মর্যাদা দান করেছেন। আমরা সালাত ও সালাম প্রেরণ করি মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহর প্রতি। আল্লাহ তার ওপর, তার পরিবারবর্গ এবং সাহাবীগণের ওপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন। অতপর:

এটি রমাদান মাস সংক্রান্ত ছোটদের জন্য প্রশ্নোত্তর, যা বড়দের জন্যও জরুরী। এতে রমাদান মাসের ফরয, মুস্তাহাব ও করণীয় বিষয়সমূহ আলোচনা করা হয়েছে। একজন অভিভাবক শিশুর প্রকৃতি ও তার বয়স অনুযায়ী এখান থেকে উপযুক্ত বিষয় নির্বাচন করতে পারবেন।

সাহাবায়ে কেরাম রদিয়াল্লাহু আনহুম তাদের সন্তানদেরকে ছোটবেলাতে সিয়াম পালন করাতেন যেন এ আনুগত্যের কাজে তাদের অভ্যাস গড়ে ওঠে।

হাদীসে এসেছে, রুবাই বিনতু মু‘আওয়িয ইবনু আফরা রদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশূরার দিন সকালে মদীনার আশপাশের আনসারদের গ্রামগুলোতে তাকে এই ঘোষণার জন্য পাঠালেন: “যে ব্যক্তি সকাল থেকে সিয়াম অবস্থায় রয়েছে, সে যেন তার সিয়াম পূর্ণ করে। আর যে ব্যক্তি সকাল বেলা সিয়াম রাখেনি, সে যেন বাকি দিনটি পূর্ণ করে।” তারপর থেকে আমরা আল্লাহর ইচ্ছায় আশুরার দিনে সিয়াম পালন করতাম এবং আমাদের ছোট ছোট শিশুদেরও সিয়াম পালন করাতাম। আমরা মসজিদে যেতাম এবং তাদের জন্য পশমের খেলনা বানিয়ে দিতাম। যখন তাদের কেউ ক্ষুধার কারণে কাঁদত, তখন আমরা তাদের সেই খেলনা দিয়ে দিতাম এমনিভাবে ইফতারের সময় হয়ে যেত। (((সহীহ বুখারী: ১৯৬০, সহীহ মুসলিম: ১১৩৬, শব্দগুলো মুসলিমের)))।

এই হাদীসে উল্লেখ রয়েছে যে, তারা শিশুদের জন্য পশমের তৈরি খেলনা রাখতেন, যা ছিল রঙিন উল দ্বারা তৈরি। যখন কোনো শিশু ক্ষুধার কারণে কাঁদত, তখন তারা তাকে সেই খেলনা দিতেন, যাতে সে তা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে পারে, এভাবে ইফতারের সময় আসা পর্যন্ত চলত; শিশুদের ইবাদতে অভ্যস্ত করা ও উৎসাহিত করার লক্ষ্যে।

এখানে সতর্কতার বিষয় হলো, যদি কোনো শিশুর ক্লান্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে তাকে জোর করে সিয়াম পূর্ণ করতে বাধ্য করা উচিত নয়; যেন তার মধ্যে ইবাদতের প্রতি বিরক্তি সৃষ্টি না হয়, অথবা মিথ্যার আশ্রয় নিতে বাধ্য না হয়, কিংবা তার স্বাস্থ্যের ক্ষতি না হয়। কারণ, সে এখনো শরীয়তের হুকুমপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত (মুকাল্লাফ) নয়। তাই এই বিষয়ে সতর্ক থাকা এবং তাকে সিয়ামের আদেশ প্রদানে বাড়াবাড়ি না করা উচিত।

পরিপূর্ণ ফায়িদা লাভের জন্য, আমরা এমন কিছু বিষয়ও উল্লেখ করেছি, যা বড়দের জানা জরুরী এবং ছোটদের শিক্ষা দেওয়ার সময় তা এড়িয়ে যাওয়া উচিত। এসব বিষয়ের প্রতি আমরা সংশ্লিষ্ট স্থানে এইভাবে বন্ধনীতে দিয়ে: ((বড়দের জন্য)) বিশেষভাবে ইঙ্গিত দিয়েছি।

আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন এর দ্বারা উপকৃত করেন এবং তা কবুল করেন।

প্রশ্নোত্তর

রমাদান মাস কী?

উত্তর: রমাদান মাস হলো বছরের সবচেয়ে ফযীলতপূর্ণ মাস। এটি চন্দ্র বছরের নবম মাস এবং এ মাসের সিয়াম পালন ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি স্তম্ভ।

ইবনু উমার রদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ইসলাম পাঁচটি ভিত্তির উপরে প্রতিষ্ঠিত: এই সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোন ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, বাইতুল্লাহতে হজ্জ পালন করা এবং রমাদানের সিয়াম পালন করা।” (((সহীহ বুখারী: ০৮, সহীহ মুসলিম: ১৬)))।

রমাদান মাসের সিয়াম কি ওয়াজিব?

উত্তর: হ্যাঁ, রমাদান মাসে সিয়াম পালন করা ওয়াজিব এবং এটি ইসলামের একটি অন্যতম রুকন।

দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “হে মুমিনগণ ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৩]

(তোমাদেরকে বিধান দেয়া হল), তথা: তোমাদের উপর ফরয করা হল।

আল্লাহর আরো বাণী: “সুতরাং তোমাদের মধ্য হতে যে এ মাসের সাক্ষাত পাবে সে যেন সিয়াম পালন করে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫]

সিয়াম কী?

উত্তর: সিয়াম হলো নিয়তের সাথে ফজর উদয়ের পর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাদ্য, পানীয় এবং অন্যান্য সকল সিয়াম ভঙ্গকারী বস্তু থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার ইবাদত পালন করা।

দলীল হলো আল্লাহ তা‘আলার বাণী: "আর তোমরা খাও এবং পান করো, যতক্ষণ না তোমাদের জন্য ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়, তারপর তোমরা রাত পর্যন্ত সিয়াম পূর্ণ করো।" [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৭]

অর্থাৎ: পুরো রাতজুড়ে খাও ও পান করো, যতক্ষণ না তোমাদের জন্য ফজরে সাদেকের উদয় স্পষ্ট হয়ে যায়— ফজরের শুভ্রতা রাতের অন্ধকার থেকে পৃথক হওয়ার মাধ্যমে-। এরপর সিয়াম পূর্ণ করো—ফজর উদয়ের পর থেকে সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত সকল ধরণের সিয়াম ভঙ্গকারী কাজ থেকে বিরত থাকার মাধমে।

রমাদান মাসের ফযীলতগুলো কী?

উত্তর: রমাদানের অসংখ্য ফযীলত রয়েছে, যার মধ্যে:

১- এ মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “রমাদান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং সুস্পষ্ট পথনির্দেশ ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫]

২- এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়।

৩- এ মাসে জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়।

৪- শয়তানদেরকে শৃংখলাবদ্ধ ও বন্দি করা হয়। ফলে তারা মুসলিমদের বিভ্রান্ত করার সেই সুযোগ পায় না, যা অন্যান্য সময়ে পায়।

এ মর্মে আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন রমযান আসে তখন জান্নাতের দরজাসমূহ উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, আর জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানগুলোকে শিকলে বন্দী করা হয়।” (((সহীহ বুখারী (৩২৭৭) ও মুসলিম (১০৭৯)।)))

৫- এ মাসে লাইলাতুল কদর রয়েছে, যা এক হাজার মাসের চেয়ে উত্তম, ঐ ব্যক্তির জন্য যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের প্রত্যাশায় এ রাত ইবাদতে কাটাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “লাইলাতুল-কদর’ এক হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।” [আল-কাদর, আয়াত: ৩]

৬- আল্লাহ তা‘আলা এ মাসকে বিশেষভাবে সিয়ামের জন্য নির্ধারণ করেছেন, যা আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ ইবাদত।

আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: "আদম সন্তানের সকল আমল তার নিজের জন্য, কিন্তু সিয়াম আমার জন্য, আর আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব।” [এরপরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:] “সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! নিশ্চয়ই সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম।" (((সহীহ বুখারী (১৯০৪) ও মুসলিম (১১৫১)।)))

“সিয়াম পালনকারীর মুখে গন্ধ” তথা: তার মুখের (স্বাভাবিক) গন্ধের পরিবর্তন হয়ে যাওয়া।

৭- এ মাসে যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে সিয়াম পালন করবে এবং কিয়াম করবে, তার পূর্বের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।

এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি রমাদানে ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় সাওম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (((সহীহ বুখারী (৩৮) ও মুসলিম (৭৬০)।)))

এবং এই হাদীস- “যে ব্যক্তি রমযানে ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় কিয়ামুল লাইল (রাত জেগে সালাত আদায় করল) পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (((সহীহ বুখারী (৩৭) ও মুসলিম (৭৫৯)।)))

“ঈমানের সাথে” তথা: আল্লাহর উপর ঈমান রেখে এবং এটা তাঁর পক্ষ থেকেই ফরয করা হয়েছে এই বিশ্বাস নিয়ে।

“সাওয়াব লাভের আশায়” তথা: আল্লাহ তা‘আলার কাছ থেকেই এর পুরষ্কার ও সাওয়াব প্রত্যাশা করা, রিয়া তথা লৌকিকতা বা অন্য এমন কোন কারণে নয়, যা ইখলাসের বিপরীত।

৮- রমাদান মাসে উমরাহ পালন করার সাওয়াব হজের সাওয়াবের ন্যায়।

ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রমাদান মাসে উমরাহ করা হজের সমতুল্য অথবা আমার সঙ্গে হজের সমতুল্য।” (((সহীহ বুখারী (১৮৬৩), সহীহ মুসলিম (১২৫৬)।)))

“হজের সমতুল্য” তথা: এর সাওয়াব হজের সাওয়াবের সমান।

৯- এ মাসে যে ব্যক্তি কোন সিয়াম পালনকারীকে ইফতার করাবে, তার জন্যও সমপরিমাণ প্রতিদান রয়েছে।

এ ব্যাপারে যাইদ ইবনু খালিদ আল-জুহানী রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি কোন সিয়াম পালনকারীকে ইফতার করাবে, তার জন্যও সমপরিমাণ প্রতিদান রয়েছে, তবে এক্ষেত্রে সিয়াম পালনকারীর প্রতিদান থেকে কোন কমতি করা হবে না।” ((( তিরমিযী (৮০৭) ও ইবন মাজাহ (১৭৪৬)।)))

১০- আল্লাহ তায়ালা এ মাসের প্রতি রাতেই অসংখ্য ব্যক্তিকে জাহান্নাম (আগুন) থেকে মুক্ত করে দেন।

এ ব্যাপারে জাবির ইবনু আব্দিল্লাহ রদিয়াল্লাহু আনহুমা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রত্যেক ইফতারের সময় কিছু মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, এবং এটি প্রতি রাতেই ঘটে।” (((ইবন মাজাহ (১৬৪৩)।)))

১১- যদি কবীরা গুনাহগুলো থেকে বিরত থাকা হয়, তবে রমাদানের সিয়াম তার পূর্ববর্তী রমাদান থেকে সংঘটিত গুনাহসমূহ মোচনের কারণ হয়।

এ ব্যাপারে আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন: “পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, এক জুমু‘আ থেকে আরেক জুমু‘আ আদায় করা এবং এক রমাদান থেকে অপর রমাদানে সিয়াম পালন করা, এগুলোর মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের কাফফারা হয়ে যাবে; যদি সে কবীরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।” (((সহীহ মুসলিম (২৩৩)।)))

আর কবীরা গোনাহ থেকে তাওবাহ করা আবশ্যক।

সার্বিকভাবে, বিভিন্ন বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত যে, রমাদান মাস হলো ইবাদত, সৎকর্ম, উদারতা, দয়া, ক্ষমা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তির মাস।

সিয়ামের ফযীলতসমূহ কী কী?

উত্তর: সিয়ামের ফযীলতসমূহ নিম্নরূপ:

১- আল্লাহ তা‘আলা অন্যান্য আমলের মধ্য থেকে সিয়ামের জন্য বিশেষ প্রতিদান স্বয়ং নিজ থেকে প্রদান করবেন।

এ ব্যাপারে আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “সিয়াম ব্যতীত আদম সন্তানের প্রতিটি কাজই তার নিজের জন্য; কিন্তু সিয়াম আমার জন্য। তাই আমিই এর প্রতিদান দিব।” (((সহীহ বুখারী (১৯০৪) ও মুসলিম (১১৫১)।)))

২- এটি ঢাল স্বরূপ, অর্থাৎ জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষাকবচ ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

এ ব্যাপারে আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “সিয়াম হচ্ছে ঢাল স্বরূপ।” (((সহীহ বুখারী (১৯০৪) ও মুসলিম (১১৫১)।)))

৩- সিয়াম পালনকারীর মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও অধিক সুগন্ধিময়।

এ মর্মে আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “সেই সত্তার কসম, যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ! নিশ্চয়ই সিয়াম পালনকারীর মুখের গন্ধ আল্লাহর কাছে মিশকের সুগন্ধির চেয়েও উত্তম।" (((সহীহ বুখারী (১৮৯৪) ও সহীহ মুসলিম (১১৫১)।)))

৪- সিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টি খুশি রয়েছে।

এ ব্যাপারে আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “সিয়াম পালনকারীর জন্য দু’টি খুশী রয়েছে, একটি খুশী যখন সে ইফতার করে, আরেকটি খুশী যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাত করবে।” (((সহীহ বুখারী (১৯০৪) ও মুসলিম (১১৫১)।)))

৫- জান্নাতে একটি দরজা রয়েছে, যার মধ্য দিয়ে শুধুমাত্র সিয়াম পালনকারীরাই প্রবেশ করবে।

এ ব্যাপারে সাহল রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “জান্নাতের মধ্যে এমন একটি দরজা আছে, যার নাম হল ‘রাইয়ান’; যার মধ্য দিয়ে কেবলমাত্র সিয়াম পালনকারীগণই কিয়ামাতের দিনে প্রবেশ করবে। তারা ছাড়া আর কেউ সে দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা করা হবে: ‘সিয়াম পালনকারীগণ কোথায়?’ তখন তারা দাঁড়িয়ে যাবে এবং ঐ দরজা দিয়ে তারা ব্যতীত অন্য কেউ প্রবেশ করবে না। তারপর যখন তারা প্রবেশ করবে, তখন দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেখান থেকে আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। (((সহীহ বুখারী (১৮৯৬) ও সহীহ মুসলিম (১১৫২)।)))

৬- সিয়াম পালনকারীর দু‘আ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।

এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তিন ব্যক্তি এমন রয়েছে, যাদের দু‘আ ফিরিয়ে দেওয়া হয় না, তাদের মধ্যে রয়েছে: সিয়াম পালনকারী, যতক্ষণ না সে ইফতার করে।” ((( তিরমিযী (৩৫৯৮)।)))

সিয়ামের হিকমত ও উপকারিতা কী?

উত্তর: সিয়ামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিকমত রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হল:

১- তার মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হিকমত, যা আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করেছেন, তা হলো: এটি তাকওয়া অর্জনের একটি মাধ্যম। আর তাকওয়া হলো আল্লাহ তা‘আলা যা আদেশ করেছেন তা পালন করা এবং যা নিষেধ করেছেন তা পরিহার করা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “হে মুমিনগণ ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেওয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেওয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৩]

২- সিয়াম মানুষকে সবর (ধৈর্যধারণে) অভ্যস্ত করে তোলে, যা সব বিষয়ের নিয়ন্ত্রক। সবর (ধৈর্যধারণ) তিন প্রকার: আল্লাহর আদেশ পালন করার ক্ষেত্রে ধৈর্যধারণ করা, আল্লাহর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকার জন্য ধৈর্যধারণ করা এবং আল্লাহর নির্ধারিত তাকদীরের উপরে ধৈর্যধারণ করা।

৩- রমাদানের সিয়ামের একটি উপকারিতা হল, এতে সমাজে সামগ্রিকভাবে আল্লাহর ইবাদতের প্রকাশ ঘটে; তাই আপনি দেখতে পাবেন, পূর্ব থেকে পশ্চিম তথা সমগ্র পৃথিবীজুড়ে মুসলিমরা একসাথে এই মাসের সিয়াম পালন করে।

৪- আনুগত্য এবং ইবাদতের অভ্যাস গড়ে তোলা, বিশেষ করে সিয়াম।

৫- আল্লাহর তা‘আলার জন্য কোন বস্তু পরিত্যাগ করার অভ্যাস গড়ে তোলা।

৬- সিয়াম পালনকারী তার উপর আল্লাহর অনুগ্রহ অনুভব করতে পারে, যার মধ্যে অন্যতম হল পানাহারের অনুগ্রহ।

৭- সিয়াম এর পালনকারীকে দুর্বল, গরীব ও মিসকিনদের অবস্থা অনুভব করতে সাহায্য করে এবং তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তোলে; কারণ সে ক্ষুধার যন্ত্রণা অনুভব করে।

৮- সিয়াম শয়তানের প্রভাব ও তার কুমন্ত্রণা দুর্বল করে দেয়।

৯- সিয়াম ইখলাস ও পর্যবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দেয়, কারণ সিয়াম পালনকারীকে খাবার বা পানীয় থেকে কেবল আল্লাহর পর্যবেক্ষণই বিরত রাখে।

১০- সিয়াম শরীরকে সুস্থতা এবং শক্তি প্রদান করে, যেমনটি চিকিৎসকদের নিকট স্বীকৃত।

সিয়াম ভঙ্গকারী বিষয়গুলি কী কী?

উত্তর: ১- ইচ্ছাকৃতভাবে রমাদান মাসে দিনের বেলায় খাওয়া বা পান করা; যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “অতপর তোমরা তোমাদের সিয়ামকে রাত পর্যন্ত পূর্ণ করো।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৭]

তবে যে ব্যক্তি ভুলে খায় অথবা পান করে তার সিয়াম সহীহ হবে এবং তাকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে যখন তার মনে হবে অথবা তাকে স্মরিয়ে দেওয়া হবে যে সে সিয়াম পালনকারী; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “সিয়াম পালনকারী ভুলক্রমে যদি আহার করে বা পান করে, তাহলে সে যেন তার সিয়াম পূর্ণ করে নেয়। কেননা আল্লাহই তাকে পানাহার করিয়েছেন।” (((সহীহ বুখারী (১৯৩৩) ও মুসলিম (১১৫৫)।)))

২- ইচ্ছাকৃতভাবে বমি করা, অর্থাৎ নিজের ইচ্ছায় পেটের খাবার বা পানীয় মুখের মাধ্যমে বের করা, কিন্তু যদি বমি তার ইচ্ছার বাইরে হয় এবং তার উপরে প্রবল হয়ে পড়ে, তাহলে তার সিয়ামে কোনো প্রভাব পড়বে না।

কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কারো সিয়াম পালনকালে অনিচ্ছাকৃত বমি হলে তাকে কাযা করতে হবে না। কিন্তু কেউ যদি ইচ্ছাকৃত বমি করে তবে তাকে কাযা করতে হবে।” (((তিরমিযী (৭২০)।)))

“অনিচ্ছাকৃত বমি হওয়া” তথা: বমি যদি তার ইচ্ছায় না হয়ে, তার উপরে প্রভাব বিস্তারকারী এবং প্রবল হয়ে পড়ে।

৩- মুরতাদ হওয়া বা কুফুরী করা, যেহেতু এগুলো ইবাদতের সাথে সাংঘর্ষিক। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আপনি যদি শিরক করতেন, তাহলে আপনার আমল অবশ্যই ধংস হয়ে যেত।” [আয-যুমার, আয়াত: ৬৫]

৪- হিজামা লাগানো, এটি হচ্ছে চামড়া হতে রক্ত বের করা।

কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “হিজামা প্রদানকারী ও তা গ্রহণকারীর সিয়াম ভেঙ্গে গেছে।” ((( আবূ দাঊদ (২৩৬৭)।)))

আর হিজামার অনুরূপ হল: রক্তদান করা।

কিন্তু আঘাত লেগে রক্ত বের হওয়া, দাঁত তুলে ফেললে বা নাক থেকে রক্ত পড়লে তা ক্ষতি করবে না; কারণ তা হিজামার অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এর অর্থও বহন করে না।

৫- (বড়দের জন্য), সহবাস অথবা বীর্যপাত সিয়াম ভঙ্গ করে দেয়।

৬- (বড়দের জন্য), হায়েয ও নেফাসের রক্ত বের হওয়া। যখনই কোনো মহিলা হায়েয বা নেফাসের রক্ত দেখতে পাবে, তখন তার সিয়াম ভঙ্গ হয়ে যাবে এবং পরবর্তী সময়ে এর কাযা আদায় করা আবশ্যক হবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারীদের বিষয়ে বলেছেন: “...এমন নয় কি, সে ঋতুবতী হলে সালাত পড়ে না এবং সাওমও পালন করে না?” ((( সহীহ বুখারী (৩০৪)।)))

৭- যা খাবার ও পানীয়ের অর্থ বহন করে: যেমন পুষ্টিকর ইনজেকশন বা স্যালাইন গ্রহণ করা, যা শরীরকে খাদ্য ও পানীয়ের বিকল্প হিসেবে শক্তি যোগায়।

সিয়ামের মুস্তাহাবসমূহ কী কী?

উত্তর: সিয়াম পালনকারীর জন্য মুস্তাহাব ও সুন্নাত হল সে নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলোর খেয়াল রাখবে:

১- সাহরী গ্রহণ করা: কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা সাহরী গ্রহণ করো; কেননা সাহরীতে বরকত রয়েছে।” (((সহীহ বুখারী (১৯২৩) ও মুসলিম (১০৯৫)।)))

সাহরী কম হোক বা বেশি, এমনকি এক ঢোক পানিতেও আদায় হয়ে যায়। সাহরীর সময় মধ্যরাত থেকে ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত।

২- সাহরীকে বিলম্ব করা: কেননা যাইদ ইবনু ছাবিত রদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেছেন: “আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে সাহরী করে সালাতে দাঁড়াতাম। আমি বললাম: এর মধ্যে কতটুকু সময় ছিল? তিনি বললেন: পঞ্চাশ আয়াত।” (((সহীহ বুখারী (৫৭৫) ও মুসলিম (১০৯৭)।)))

"পঞ্চাশ আয়াত" অর্থ: সাহরী ও ফজরের আযানের মধ্যবর্তী সময়ে পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করা যায়। এতে সাহরী ফজরের আগ পর্যন্ত দেরী করার প্রতি উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।

৩- দ্রুত ইফতার করা: সূর্যাস্ত নিশ্চিত হওয়া মাত্রই সিয়াম পালনকারীর জন্য দ্রুত ইফতার করা মুস্তাহাব।

কেননা সাহল ইবনু সা’দ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “লোকেরা যতদিন দ্রুত ইফতার করবে, ততদিন তারা কল্যাণের উপর থাকবে।” (((সহীহ বুখারী (১৯৫৭) ও মুসলিম (১০৯৮)।)))

৪- তাজা খেজুরের মাধ্যমে ইফতার করা: যদি তা না পাওয়া যায় তাহলে শুকনো খেজুরের মাধ্যমে, যদি তাও না পাওয়া যায়, তাহলে কয়েক ঢোক পানির মাধ্যমে ইফতার করা।

যেহেতু আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণনা করেছেন: “রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের আগে কিছু তাজা খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। যদি তাজা খেজুর না পেতেন, তবে শুকনা খেজুর দ্বারা ইফতার করতেন। আর যদি খেজুরও না মিলত, তবে কয়েক ঢোক পানি পান করতেন।" (((আবূ দাঊদ (২৩৫৬)।)))

“কয়েক ঢোক পানি পান করতেন” তথা: তিনবার পানি পান করতেন।

যদি কেউ এমন স্থানে থাকেন যেখানে ইফতারের সময় হয়ে যায়, কিন্তু ইফতারের জন্য কিছুই পাওয়া যায় না, তাহলে তিনি মনে মনে ইফতারের নিয়ত করবেন, আর এটাই তার জন্য যথেষ্ট হবে।

৫- ইফতারের সময়ে এবং সিয়ামের মধ্যে দু‘আ করা।

কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তিন ব্যক্তির দু‘আ ফেরত দেওয়া হয় না: ন্যায়পরায়ণ শাসক, সিয়ামপালনকারীর ইফতারের সময়ে দু‘আ এবং মজলুমের দু‘আ।” (((তিরমিযী (৩৫৯৮)।)))

৬- অধিক পরিমাণে সদকা করা, কুরআন তেলাওয়াত করা, সিয়াম পালনকারীদেরকে ইফতার করানো এবং অন্যান্য সৎকাজ করা।

ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত লোকের চেয়ে অধিক দানশীল ছিলেন। আর মাহে রমযানে যখন জিব্রাঈল তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তখন তিনি আরো বেশী বদান্য প্রদর্শন করতেন। জিব্রাঈল মাহে রমযানের প্রত্যেক রজনীতে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং তার কাছে কুরআন পুনরাবৃত্তি করতেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই প্রেরিত বায়ু অপেক্ষা অধিক দানশীল ছিলেন।” (((সহীহ বুখারী (৬) ও মুসলিম (২৩০৮)।)))

৭- রাতের সালাতে পরিশ্রম করা: বিশেষ করে রমাদানের শেষ দশ রাতে।

আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: "যখন শেষ দশক প্রবেশ করত, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোমর বেঁধে নিতেন, রাত জাগরণ করতেন এবং তার পরিবারকে জাগিয়ে তুলতেন।" (((সহীহ বুখারী (২০২৪) ও মুসলিম (১১৭৪)।)))

“যখন শেষ দশক প্রবেশ করত” তথা: রমাদানের শেষ দশক।

“কোমর বেঁধে নিতেন” এর অর্থ হলো ইবাদতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এবং সাধারণ সময়ের তুলনায় আরও বেশি পরিশ্রম করা।

“রাতকে জাগরণ করতেন” তথা: রাতে জাগরণ করে সালাত ও অন্যান্য ইবাদতে নিমগ্ন থাকা।

“পরিবারকে জাগিয়ে তুলতেন” তথা: রাতে সালাতের জন্য তাদেরকে জাগিয়ে তুলতেন।

৮- উমরাহ আদায় করা:

কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন রমাদান আসে, তখন তুমি উমরাহ আদায় করো; কেননা এ মাসে উমরাহ হজের সমতুল্য।” (((সহীহ বুখারী (১৭৮২) ও মুসলিম (১২৫৬)।)))

৯- যদি কেউ তাকে গালি দেয়, তাকে "আমি সিয়াম পালন করছি" বলা এবং মানুষের সঙ্গে ভালো কথা বলা এবং খারাপ কথা না বলা।

কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন তোমাদের কেউ কোনো দিনে সিয়াম পালনকারী অবস্থায় সকালে উপনীত হয় , তখন সে অশ্লীল কথা বলবে না এবং মূর্খের মতো আচরণ করবে না। যদি কেউ তাকে গালি দেয় বা তার সঙ্গে লড়াই করে, তবে সে যেন বলে: ‘আমি সিয়াম পালনকারী, আমি সিয়াম পালনকারী।” ((( সহীহ বুখারী (১৯০৪) ও মুসলিম (১১৫১)।)))

“অশ্লীল কথা বলবে না” তথা: সে কোন ফাহেশা কথা উচ্চারণ করবে না।

“মুর্খের মতো আচরণ করবে না” মুর্খতা হল: হিকমাহ বিরোধী এবং সঠিকের বিপরীত কথা ও কাজ।

১০- সিয়াম পালনকারীর জন্য ইফতারের সময়ে এ দু‘আ পড়া মুস্তাহাব: উচ্চারণ: (যাহাবায-যামাউ, ওয়াবতাল্লাতিল-‘উরূকু, ওয়া সাবাতাল-আজরু ইন শাআল্লাহ।) অর্থ: “পিপাসা দূরীভূত হয়েছে, রগসমূহ সিঞ্চিত হয়েছে এবং যদি আল্লাহ চান তাহলে পুরষ্কারও নির্ধারিত হয়েছে।” (((আবূ দাঊদ (২৩৫৭)।)))

সিয়ামের মাকরুহ কাজসমূহ কী কী?

উত্তর: কিছু কাজ এমন রয়েছে যা সিয়াম পালনকারীর জন্য মাকরুহ, যে কাজগুলো তার সিয়ামকে বিনষ্টের দিকে ধাবিত করে অথবা এর পুরষ্কার হ্রাস করে, সেগুলো হল:

১- কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা।

এটা এ আশঙ্কার কারণে যে পানি তার পেটে চলে যাবে; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ভালোভাবে নাকের মধ্যে পানি প্রবেশ করাবে, তবে সিয়াম পালনকারী হলে ভিন্ন কথা।” (((আবূ দাঊদ (২৩৬৬)।)))

২- শ্লেষ্মা গিলে ফেলা, অর্থাৎ যা কিছু মানুষের মুখ থেকে থুতু আকারে বা শ্বাসনালী থেকে বের হয়, কারণ এটি পেটের ভিতরে পৌঁছায় এবং তা দ্বারা শক্তি লাভ করা হয়, এর পাশাপাশি এই কাজটি নোংরা এবং এর দ্বারা ক্ষতি হয়ে থাকে।

৩- প্রয়োজন ব্যতীত খাবারের স্বাদ গ্রহণ করা: তবে যদি প্রয়োজন থাকে, যেমন কোনো রাঁধুনি যদি রান্নার লবণ বা অন্য কিছু পরীক্ষা করতে চায়, তবে তাতে কোনো সমস্যা নেই, তবে সতর্ক থাকতে হবে যাতে কিছু গলা পর্যন্ত চলে না যায়।

৪- দিনের বেলায় অতিরিক্ত ঘুমানো, সময়ের অপচয় করা এবং অপ্রয়োজনীয় কথা বলা ও কাজ করা। এর পরিবর্তে দিনের সময়টিকে ইবাদতে কাজে লাগানো উচিত।

৫- ((বড়দের জন্য)), যে ব্যক্তির যৌন অনুভূতি প্রবল এবং যে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে সক্ষম নয়, তার জন্য সিয়াম অবস্থায় স্ত্রীকে চুমু দেওয়া মাকরূহ। কারণ এটি যৌন উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে, যা বীর্যপাত অথবা যৌন সম্পর্কের (সহবাসের) মাধ্যমে সিয়ামের নষ্টের দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবে যদি সে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে সক্ষম হয় এবং সিয়াম অক্ষুন্ন রাখতে পারে, তাহলে এতে কোনো ক্ষতি নেই।

৬- ((বড়দের জন্য)), সহবাসের চিন্তা করা অথবা যৌন উদ্দীপক কথাবার্তা বলা।

বিনা ওযরে রমাদানে সিয়াম ভঙ্গ করার হুকুম কী?

উত্তর: যদি কোনো মুসলিম রমাদানের কোনো একটি দিন কোনো বৈধ কারণ ছাড়া সিয়াম ভঙ্গ করে, তবে তাকে আবশ্যিকভাবে আল্লাহর কাছে তওবা করতে হবে এবং ক্ষমা চাইতে হবে; কারণ এটি একটি গুরুতর অপরাধ এবং বড় একটি গুনাহ। তওবা এবং ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি, তাকে রমাদানের পর সংখ্যা অনুযায়ী সিয়ামের কাযা করতে হবে।

যার রমাদান মাসে কাদের জন্য সিয়াম ভঙ্গ করার অনুমতি আছে? এবং তার করণীয় কী?

উত্তর: প্রথম অবস্থা: যে ব্যক্তি এমন কোনো রোগে আক্রান্ত যার কারণে সে সিয়াম রাখতে সক্ষম নয়, অথবা সফররত ব্যক্তি, অথবা গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারী মা— হোক তারা নিজেদের অথবা তাদের সন্তানের জন্য ক্ষতির আশঙ্কা করুক- কিংবা অন্য কোনো বৈধ কারণে সিয়াম ভঙ্গ করা জায়িয হবে। তবে রমাদানের পর উক্ত দিনগুলোর কাযা করা আবশ্যক। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “সুতরাং তোমাদের কেউ অসুস্থ থাকলে অথবা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করবে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৪]।

তথা: তোমাদের মধ্যে কেউ যদি এমন অসুস্থ হয় যে তার জন্য সিয়াম রাখা কষ্টকর হয়ে পড়ে, অথবা যদি কেউ মুসাফির হয়ে থাকে, তবে তার জন্য সিয়াম ভঙ্গ করা বৈধ। তবে পরে সে যতদিন সিয়াম ভঙ্গ করেছে, ততদিন কাযা করা আবশ্যক হবে।

দ্বিতীয় অবস্থা: যদি কারো এমন অসুস্থতা থাকে যা সাধারণত আর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নেই, বরং তা স্থায়ীভাবে থেকে যায়, অথবা যদি কেউ এত বৃদ্ধ হয়ে যায় যে সে সিয়াম রাখতে সক্ষম নয়, তাহলে তার জন্য কাযা আবশ্যক নয়; সে তা পালনে অক্ষম হওয়ার কারণে। তবে তার উপর প্রতি দিনের বিনিময়ে একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়ানো আবশ্যক। প্রতিদিনের জন্য অর্ধ সা‘ (প্রায় দেড় কেজি) খাদ্য দান করতে হবে। উল্লেখ্য, এক সা‘ প্রায় তিন কেজি।

কেননা মহান আল্লাহ বলেন: “আর যারা সিয়াম পালনে অক্ষম, তাদের জন্য কর্তব্য ফিদইয়া—একজন মিসকিনকে খাদ্য প্রদান করা।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৪] এ আয়াত সম্পর্কে ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন: “এটি মানসূখ (রহিত) হয়নি। এটি অতি বৃদ্ধ এবং এমন নারীদের জন্য প্রযোজ্য যারা সিয়াম পালন করার সামর্থ রাখে না। সুতরাং তারা প্রতিদিনের বিপরীতে একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবে।” (((সহীহ বুখারী (৪৫০৫)।)))

কবে সিয়ামের কাযা আদায় করবে? এবং যদি বিলম্ব করে পরবর্তী রমাদান এসে যায়, তবে কী করণীয়?

যে ব্যক্তি শরয়ী ওযরের কারণে রমাদানে সিয়াম ভঙ্গ করেছে, তাকে অবশ্যই তা কাযা আদায় করতে হবে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার এই আদেশের আনুগত্য স্বরূপ: “আর তোমাদের কেউ অসুস্থ থাকলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করবে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫]

তার অবশ্যই সেই বছরের মধ্যেই কাযা আদায় করতে হবে, দ্বিতীয় রমাদানের পর পর্যন্ত বিলম্ব করা যাবে না। কারণ, আয়েশা রদিয়াল্লাহু ‘আনহা বলেছেন: "আমার ওপর রমাদানের সিয়ামের কাযা থাকত, কিন্তু আমি তা শা‘বান মাস ছাড়া কাযা করতে পারতাম না, কারণ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাজে ব্যস্ত থাকতাম।" (((সহীহ বুখারী (১৯৫০) ও মুসলিম (১১৪৬)।)))

আয়েশা রদিয়াল্লাহু আনহার বাণী: "কিন্তু আমি তা শা‘বান মাস ছাড়া কাযা করতে পারতাম না“ প্রমাণ করে যে, সিয়ামের কাযা দ্বিতীয় রমাদানের আগেই আদায় করতে হবে।

কিন্তু যদি সিয়ামের কাযা দ্বিতীয় রমাদানের পরেও বিলম্বিত হয়, তবে তাকে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে, তওবাহ করতে হবে এবং তার ভুলের জন্য অনুশোচনা করতে হবে। তারপর তাকে সেই সিয়ামটি কাযা করতে হবে, কারণ কাযা বিলম্বিত হওয়ার কারণে কোনভাবেই যিম্মামুক্ত হয় না। সুতরাং সে সিয়ামের কাযা করবে, এমনকি যদি তা দ্বিতীয় রমাদানের পরও হয়।

সিয়ামের ওয়াজিব আদবসমূহ কী কী?

উত্তর: আমরা এগুলোর মধ্য হতে কয়েকটি উল্লেখ করব। এই আচার-আচরণগুলো সব সময়েই গুরুত্বপূর্ণ, তবে রমাদান মাসে এবং সিয়াম পালনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ:

১- আনুগত্যের কাজগুলো ও ওয়াজিব আমলগুলোর প্রতি যত্নবান হওয়া, এর মধ্যে অন্যতম হলো সঠিক সময়ে এবং জামাআতের সাথে সালাত আদায় করা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “নিশ্চয় নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১০৩]

২- সিয়াম পালনকারী আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক হারামকৃত সকল বিষয় থেকে বিরত থাকবে, যেমন: মিথ্যা বলা, গীবত, পরচর্চা, প্রতারণা, গান শোনা এবং অন্যান্য গুনাহ ও পাপ কাজ।

এ ব্যাপারে আবু হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা এবং তা বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত হয়নি, তার খাবার এবং পানীয় পরিত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” (((সহীহ বুখারী (১৯০৩)।)))

« الزُّور » অর্থ হলো: মিথ্যা, সত্য হতে বিমুখ হওয়া এবং অসৎ (বাতিল) অনুযায়ী কাজ করা।

“আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই” তথা: আল্লাহ তা‘আলা তার সিয়ামের দিকে ফিরেও তাকাবেন না এবং তা কবুলও করবেন না। এর অর্থ এমন নয় যে, তাকে সিয়াম ছেড়ে দেওয়ার আদেশ করা হবে বরং এর উদ্দেশ্য হচ্ছে মিথ্যা বলা থেকে সতর্ক করা।

সিয়াম পালনকারীর জন্য কোন কোন কাজ করা বৈধ?

উত্তর: এমন অনেকগুলো বিষয় রয়েছে যেগুলোর বৈধতার ব্যাপারে আলিমগণ মত দিয়েছেন, যেমন:

১- গোসল করা এবং পানির দ্বারা ঠান্ডা গ্রহণ করা।

২- মিসওয়াক ব্যবহার করা।

৩- বাড়াবাড়ি না করে কুলি করা এবং নাকে পানি দেওয়া।

৪- পরীক্ষার জন্য অল্প পরিমাণ রক্ত দেওয়া।

৫- চোখ এবং কানের ড্রপ ব্যবহার করা।

৬- চিকিৎসার জন্য ইঞ্জেকশন গ্রহণ করা যা শক্তিবর্ধক নয়।

৭- প্রয়োজনে খাবারের স্বাদ নেওয়া, তবে শর্ত হচ্ছে তা গিলে না ফেলা এবং পরে মুখ থেকে ফেলে দেওয়া।

৮- সুগন্ধি লাগানো এবং সুগন্ধি গ্রহণ করা।

৯- চোখে সুরমা লাগানো।

রমাদানে কিয়ামুল লাইলের ফযীলত কী?

উত্তর: রমাদানের কিয়াম, যা তারাবীহ নামে পরিচিত, এর রয়েছে বিশাল মর্যাদা;

এ ব্যাপারে আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি রমাদানে ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় কিয়ামুল লাইল পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (((সহীহ বুখারী (৩৭) ও মুসলিম (৭৫৯)।)))

“ঈমানের সাথে” তথা: আল্লাহর উপর ঈমান রেখে এবং এটা তাঁর পক্ষ থেকেই ফরয করা হয়েছে এই বিশ্বাস নিয়ে।

“সাওয়াব লাভের আশায়” তথা: আল্লাহ তা‘আলার কাছ থেকেই এর পুরষ্কার ও সাওয়াব প্রত্যাশা করা, রিয়া তথা লৌকিকতা বা অন্য এমন কোন কারণে নয়, যা ইখলাসের বিপরীত।

এবং সে যেন জামাআতে তারাবীহ সালাত আদায় করার প্রতি যত্নবান থাকে, এমনকি ইমাম সালাত শেষ করা পর্যন্ত তার সঙ্গে থাকে; যাতে সে পুরো রাত কিয়ামের সওয়াব পায়; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি ইমামের সাথে কিয়াম করবে, যতক্ষণ না ইমাম শেষ করে। তার জন্য সারা রাতের কিয়াম লিপিবদ্ধ করা হয়।” (((তিরমিযী (৮০৬)।)))

রমাদানের শেষ দশদিন ও লাইলাতুল কদরে কোন আমলগুলো করা মুস্তাহাব?

উত্তর: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদানের শেষ দশ দিনে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি ইবাদতে মনোনিবেশ করতেন এবং এই সময়ের মধ্যে লাইলাতুল কদর তালাশ করতেন। নিম্নে কিছু আমল উল্লেখ করা হলো, যা এ সময়ে করা মুস্তাহাব:

১- এ সময় অধিক পরিশ্রম করা।

এ ব্যাপারে আয়েশা রদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: "যখন শেষ দশক প্রবেশ করত, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোমর বেঁধে নিতেন, রাত জাগরণ করতেন এবং তার পরিবারকে জাগিয়ে তুলতেন।" (((সহীহ বুখারী (২০২৪) ও মুসলিম (১১৭৪)।)))

আয়েশা রদিয়াল্লাহু আনহার বাণী: “কোমর বেঁধে নিতেন” এর অর্থ হলো ইবাদতের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া এবং সাধারণ সময়ের তুলনায় এতে আরও বেশি পরিশ্রম করা।

তার থেকে আরো বর্ণিত হয়েছে: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ দশকে এতো পরিশ্রম করতেন যা তিনি অন্য সময় করতেন না।” (((সহীহ মুসলিম (১১৭৫))))

লাইলাতুল কদর রমাদানের শেষ দশকে হয়ে থাকে, তাই মুসলিম ব্যক্তির উচিত লাইলাতুল কদর পাওয়ার জন্য এই দশ রাতের প্রতিটিকে মূল্যায়ন করা। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "তোমরা লাইলাতুল কদরকে রমাদানের শেষ দশকের মধ্যে অনুসন্ধান কর।" (((সহীহ বুখারী (২০২১)।)))

২- লাইলাতুল কদরে কিয়াম করা।

আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও নেকীর আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়াম করবে, তার অতীতের গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হবে।” (((সহীহ বুখারী (১৯০১) ও সহীহ মুসলিম (৭৬০)।)))

৩- মসজিদে ই‘তিকাফ করা।

এ মর্মে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদানের শেষ দশকে ই‘তিকাফ করতেন।” (((সহীহ বুখারী (২০৩৩) ও সহীহ মুসলিম (১১৭২)।)))

আর ই‘তিকাফ হলো ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে আবদ্ধ হওয়া, সৃষ্টিজগতের সাথে ব্যস্ততা থেকে দূরে থাকা এবং দুনিয়ার ব্যাপারগুলো থেকে অন্তরকে মুক্ত করে একমাত্র আল্লাহর প্রতি আত্মনিয়োগ করা।

সূরাতুল কদর পাঠ করুন এবং এর ব্যাখ্যা করুন।

পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি ‘লাইলাতুল কদরে’; আর আপনাকে কিসে জানাবে ‘লাইলাতুল-কদর’ কী ? ‘লাইলাতুল-কদর’ হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেস্তাগণ ও রূহ্ নাযিল হয় তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে। শান্তিময় সে রাত, ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত। [সূরা আল-কদর, আয়াত: ১-৫]

এ সূরার তাফসীর:

নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি ‘লাইলাতুল কদরে’; [সূরা আল-কদর, আয়াত: ১] নিশ্চয় আমি কুরআনকে একত্রে (দুনিয়ার) নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ করেছি, ঠিক যেমনভাবে নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপরে রমাদান মাসে লাইলাতুল কদরে আমি এটির নাযিলের সূচনা করেছি।

আর আপনাকে কিসে জানাবে ‘লাইলাতুল-কদর’ কী ? [সূরা আল-কদর, আয়াত: ২] আর হে নবী, আপনি কী অবগত আছেন যে এ রাতে কত কল্যাণ ও বরকত রয়েছে?!

লাইলাতুল-কদর’ এক হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। [সূরা আল-কদর, আয়াত: ৩] এই রাতটি অত্যন্ত কল্যাণময়, যারা ঈমানের সাথে ও সওয়াবের আশায় এ রাতে কিয়ামুল লাইল পালন করবে, তাদের জন্য এটি হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এটি এক বরকতময় রাত, এই রাতে করা সৎকর্ম হাজার মাসের আমলের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।

সে রাতে ফেরেস্তাগণ ও রূহ্ নাযিল হয় তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে। [সূরা আল-কদর, আয়াত: ৪] এই রাতে ফেরেস্তারা এবং জিবরীল (আলাইহিমুস সালাম) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে সেসকল বিষয় সহকারে অবতরণ করেন, যা আল্লাহ ঐ বছরের জন্য নির্ধারণ করেন; তা হোক রিযিক, মৃত্যু, জন্ম বা অন্যান্য বিষয় যা আল্লাহ নির্ধারণ করেন তার।

শান্তিময় সে রাত, ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত। [সূরা আল-কদর, আয়াত: ৫] এই বরকতময় রাত সম্পূর্ণটাই কল্যাণময়, এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত, ফজর উদিত হওয়া পর্যন্ত।

যাকাতুল ফিতর কী এবং এর হুকুম কী?

উত্তর: এটি এমন একটি যাকাত ব্যবস্থা যা ইসলাম রমাদানের সমাপ্তি উপলক্ষ্যে ফরয করেছে।

প্রত্যেক মুসলিমের জন্য যাকাতুল ফিতর প্রদান করা ওয়াজিব, ছোট-বড়, পুরুষ-নারী সকলের জন্য। একজন মুসলিম তা নিজের পক্ষ থেকে এবং তার উপর যাদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব, যেমন স্ত্রী ও সন্তানদের পক্ষ থেকেও আদায় করবে।

ইবনু উমার রদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “প্রত্যেক গোলাম, স্বাধীন, পুরুষ, নারী, প্রাপ্ত বয়স্ক, অপ্রাপ্ত বয়স্ক মুসলিমের উপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদাকাতুল ফিতর হিসেবে খেজুর হোক অথবা যব হোক এক সা’ পরিমাণ আদায় করা ফরয করেছেন।” (((হীহ বুখারী (১৫০৩) ও সহীহ মুসলিম (৯৮৪)।)))

যাকাতুল ফিতর দেশের প্রধান খাদ্যদ্রব্য থেকে প্রদান করতে হয়, যেমন চাল বা অনুরূপ বস্তু দ্বারা। এর জন্য সর্বোত্তম সময় হল, ঈদের সকালে ঈদের সালাতের আগে তা আদায় করা, তবে এক বা দুই দিন আগেও দেওয়া জায়িয আছে। এর পরিমাণ প্রায় ৩ কেজি।

যাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার হিকমত কী?

উত্তর: এর হিকমতের মধ্যে রয়েছে:

১- এটি সিয়াম পালনকারীর জন্য এক ধরনের পবিত্রতা; যা তার সিয়ামের মধ্যে ঘটে যেতে পারে এমন অনর্থক কথা ও অশালীনতা থেকে।

২- ঈদের দিনে গরিব ও অভাবগ্রস্তদের ভিক্ষাবৃত্তি থেকে মুক্ত রাখা এবং তাদেরকে আনন্দিত করা, যাতে ঈদ সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য আনন্দ ও খুশির দিন হতে পারে। এ ব্যাপারে ইবনু আব্বাস রদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন: “আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সদকাতুল ফিতরকে ফরয করেছেন, সিয়াম পালনকারীর অনর্থক ও অশালীন কথাবার্তা থেকে পবিত্রতা অর্জন এবং মিসকিনদের জন্য খাদ্য প্রদানের লক্ষ্যে।” (((আবূ দাঊদ (১৬০৯)।)))

৩- এতে আল্লাহর সেই মহান নি‘আমাতের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়, যা তিনি তাঁর বান্দার প্রতি দান করেছেন, রমাদান মাসের সিয়াম ও কিয়াম পূর্ণ করা এবং এই বরকতময় মাসে যতটুকু সম্ভব নেক কাজ করার সুযোগ প্রদানের মাধ্যমে।

৪- নির্ধারিত সময়ে প্রাপ্যদের কাছে তা পৌঁছানোর মাধ্যমে সওয়াব এবং বিপুল প্রতিদান লাভ করা।

ঈদের সুন্নাতসমূহ কী?

উত্তর: ইসলামী ঐতিহ্যে ঈদ হল আল্লাহর অনুগ্রহ এবং দয়ায় আনন্দ প্রকাশের একটি মাধ্যম। ঈদের দিনে মুসলিমদের পালনীয় গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাতগুলো হলো নিম্নরূপ:

১- ঈদের সালাতে বের হওয়ার আগে গোসল করা।

মুয়াত্তাসহ অন্যান্য কিতাবে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, আবদুল্লাহ ইবনু উমর রদিয়াল্লাহু আনহুমা ঈদের দিন ঈদগাহে যাওয়ার আগে গোসল করতেন। (((মুয়াত্তা মালিক, (১/১৭৭)।)))

২- ঈদুল ফিতরের সালাতের জন্য ঈদগাহে যাওয়ার আগে কিছু খাওয়া, তিনি সাঃ ঈদের সালাতের জন্য কয়েকটি খেজুর খাওয়ার আগে বের হতেন না। আনাস ইবনু মালিক রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন সকালে খেজুর না খেয়ে বের হতেন না এবং তিনি সেগুলো বিজোড় সংখ্যায় খেতেন।” ((( সহীহ বুখারী (৯৫৩)।)))

৩- ঈদের দিনে তাকবীর বলা।

ঈদুল ফিতরের তাকবীরের সময় শুরু হয় ঈদের রাতে – অর্থাৎ রমাদানের শেষ রাতে মাগরিব থেকে – এবং শেষ হয় যখন ইমাম ঈদুল ফিতরের সালাতের জন্য ঈদগাহে প্রবেশ করেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূর্ণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন সে জন্য তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫]

৪- শুভেচ্ছা জানানো: ঈদের একটি আদব হলো, শুভেচ্ছা বিনিময় করা, যা মানুষ একে অপরের মধ্যে আদান-প্রদান করে। এর মধ্যে কোনো বিশেষ শব্দের বাধ্যবাধকতা নেই, যেমন: "তাকবালাল্লাহু মিন্না ও মিনকুম" বা "ঈদ মুবারক" অথবা এ ধরনের অন্যান্য বৈধ শুভেচ্ছাবাণী।

এ ব্যাপারে যুবাইর ইবনু নুফাইর রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ যখন ঈদের দিনে একে অপরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন, তখন তারা বলতেন: “তুকুব্বিলা মিন্না ও মিনকা” (অর্থাৎ, আল্লাহ আমাদের ও তোমার পক্ষ থেকে কবুল করুন)। (((এটি মাহামিলী বর্ণনা করেছেন, যেমনটি ফাতহুল বারী (২/৪৪৬)-তে রয়েছে। ইবনু হাজার বলেন: এর সনদ হাসান।)))

৫- দুই ঈদে সাজগোজ করা:

এ ব্যাপারে উমার ইবনুল খাত্তাব রদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন: “হে আল্লাহর রাসূল, আমি ‘উতারিদ নামক ব্যক্তিকে রেশমের কাজ করা হুল্লা (পোষাক বিশেষ) বিক্রি করতে দেখেছি, যদি আপনি সেটা ক্রয় করতেন এবং আগমনকারীদের আগমনে অথবা ঈদের জন্য পরিধান করতেন।” (((সহীহ বুখারী (৯৪৮) ও সহীহ মুসলিম (২০৬৮)।)))

এবং নাফি থেকে বর্ণিত: ইবনু উমার রদিয়াল্লাহু আন্হুমা ঈদের দিন তার সেরা পোশাকটি পরিধান করতেন। (((এটি বাইহাকী সুনানে কুবরাতে (৬১৪৩) বর্ণনা করেছেন।)))

৬- ঈদের সালাতে এক রাস্তা গমন করা এবং অন্য রাস্তা দিয়ে প্রত্যাবর্তন করা।

এ বিষয়ে জাবির রদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেছেন: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিনে রাস্তা পরিবর্তন করতেন।” (((সহীহ বুখারী (৯৮৬)।)))

শাওয়ালে ছয়টি সিয়াম পালনের ফযীলত কী?

উত্তর: রমাদানের ফরয সিয়াম পালনের পর শাওয়ালে ছয়টি সিয়াম পালন করা মুস্তাহাব। আর এতে মহা ফযীলত ও বড় পুরষ্কার রয়েছে। আর তা হচ্ছে: যে ব্যক্তি শাওয়ালের ছয়টি সিয়াম পালন করবে, তার জন্য পুরো একটি বছরের সিয়ামের পুরষ্কার লিখা হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি রমাদানের সিয়াম পালন করল এরপর শাওয়াল মাসে এর অনুগামী ছয়টি সিয়াম পালন করল, তাহলে এটি তার সম্পূর্ণ বছরের সিয়ামের ন্যায়।” (((সহীহ মুসলিম (১১৬৪)।)))

রমাদান আমাদেরকে কী শিক্ষা দেয়? এবং রমাদানের পরে করণীয় কী?

উত্তর: এই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে আমরা সমাপ্তি টানব। সিয়াম হল ইসলামের অন্যতম মহৎ শিক্ষালয়, যা থেকে মুসলিমরা তরবিয়তী শিক্ষা গ্রহণ করেন। এটি দ্বীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ এবং মূল ভিত্তি। এখানে কিছু শিক্ষা এবং শিক্ষণীয় বিষয় উল্লেখ করা হলো, যা একজন বান্দা রমাদান মাসের সিয়াম থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে, যাতে সে রমাদানের পরেও তার উপর অবিচল থাকতে পারে।

প্রথম শিক্ষা:

রমাদান মাস আমাদের সবর করতে শিখিয়েছে, যা সবচেয়ে মহান ইবাদত এবং নৈকট্য লাভের অন্যতম মাধ্যম। যখন বান্দা খাদ্য ও পানীয় থেকে সবর করে (বিরত থাকে), তখন সে ধৈর্যের গুণটি অর্জনে অভ্যস্ত হয়ে যায়, যা সব ভালো কাজের মূল। এই সবর ইবাদতের ক্ষেত্রে ধৈর্য্য, পাপ থেকে বিরত থাকার ধৈর্য্য, এবং কষ্টদায়ক তাকদীরের উপর ধৈর্য্যকে সমন্বিত করে। আল্লাহ তাআলা সবর বা ধৈর্যের ফযীলত সম্পর্কে বলেছেন: “ধৈর্যশীলদেরকেই তো তাদের পুরস্কার পূর্ণরূপে দেওয়া হবে বিনা হিসাবে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ১০]।

দ্বিতীয় শিক্ষা:

রমাদান মাস আমাদের আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদেশ ও নিষেধের প্রতি সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করতে শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আর আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল কোন বিষয়ের ফায়সালা দিলে কোন মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর জন্য সে বিষয়ে তাদের কোন (ভিন্ন সিদ্ধান্তের) ইখতিয়ার সংগত নয়। আর যে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করল সে স্পষ্টভাবে পথভ্রষ্ট হলো।” [সূরা আল-আহযাব, আয়াত:৩৬]

তৃতীয় শিক্ষা:

রমাদান মাস আমাদের আল্লাহ তা‘আলার সন্তুষ্টির জন্য জিহ্বা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও প্রবৃত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখার মাধ্যমে তাকওয়া অর্জনের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “হে মুমিনগণ! তোমাদের জন্য সিয়ামের বিধান দেয়া হল, যেমন বিধান তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে দেয়া হয়েছিল, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হতে পার।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৩]

আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ তা‘আলা বলেন: সিয়াম আমার জন্য। তাই আমিই এর প্রতিদান দিব। কেননা সে আমার জন্যই তার যৌনতা ও পানাহার ত্যাগ করেছে, আর সিয়াম হচ্ছে ঢাল স্বরূপ।” (((সহীহ বুখারী (৭৪৯২) ও সহীহ মুসলিম (১১৫১)।)))

আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি মিথ্যা বলা এবং তা বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত হয়নি, তার খাবার এবং পানীয় পরিত্যাগের আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই।” (((সহীহ বুখারী (১৯০৩)।)))

চতুর্থ শিক্ষা:

রমাদান মাস আমাদের ইবাদত ও তার স্বাদ উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে, যাতে আমরা রমাদানের পরেও কিয়াম, সিয়াম ও কুরআন তিলাওয়াত অব্যাহত রাখতে পারি।

সিয়ামের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি রমাদানে ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় সাওম পালন করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (((সহীহ বুখারী (৩৮) ও সহীহ মুসলিম (৭৬০)।)))

কিয়ামের ফযীলের ব্যাপারে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি রমাদানে ঈমানের সাথে ও সাওয়াব লাভের আশায় কিয়ামুল লাইল আদায় করে, তার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।” (((সহীহ বুখারী (৩৭) ও সহীহ মুসলিম (৭৫৯)।)))

কুরআন তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন, “রমাদানে যখন জিবরীল তার সাথে সাক্ষাত করতেন, তখন তিনি আরো বেশী দানশীল হয়ে উঠতেন। জিবরীল তার সাথে প্রতি রাতে সাক্ষাৎ করতেন এবং কুরআন চর্চা করতেন।” (((সহীহ বুখারী (৬) ও মুসলিম (২৩০৮)।)))

অতএব বান্দা এসব ইবাদত তথা সিয়াম, কিয়াম ও কুরআন তিলাওয়াত ইত্যাদি অব্যাহত রাখবে, যদিও তা রমাদানের মতো না হয়।

পঞ্চম শিক্ষা:

রমাদান মাস আমাদের আল্লাহর নজরদারি ও ইহসানের মর্যাদা সম্পর্কে শিক্ষা দেয়; আর ইহসান হলো: আমরা আল্লাহর ইবাদত এমনভাবে করবো যেন আমরা তাঁকে দেখছি। আর যদি তাঁকে দেখতে না পাই, তবে তিনি অবশ্যই আমাদের দেখছেন (এ অনুভুতি রাখা)। কেননা সিয়াম পালনকারী নিজেকে আল্লাহ তা‘আলার নজরদারিতে অভ্যস্ত করে তোলে; সে তার মন যা চায় তা পরিত্যাগ করে, যদিও সে তা করার ক্ষমতা রাখে, কারণ সে জানে যে, আল্লাহ তাকে দেখছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর তিনি তোমাদের সাথে আছেন তোমরা যেখানেই থাকো না কেন। আর তিনি তোমরা যা করো, তা সম্পর্কে সম্যক দৃষ্টির অধিকারী।” [সূরা আল-হাদীদ, আয়াত: ০৪]

ষষ্ঠ শিক্ষা:

রমাদান মাস আমাদের শিখিয়েছে যে, আমাদের দ্বীন সহজ, এবং আল্লাহ কোনো ব্যক্তিকে তার সামর্থ্যের বাইরে কোনো কিছু আদায়ের দায়িত্ব দেন না। যে ব্যক্তি সিয়াম পালনে সক্ষম, সে তা পালন করবে; আর যে সক্ষম নয়, সে সিয়াম ভঙ্গ করবে এবং পরবর্তী সময়ে তা কাযা করবে বা তার অবস্থা অনুযায়ী কাফফারা প্রদান করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “কাজেই তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে সে যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে। তবে তোমাদের কেউ অসুস্থ হলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান এবং তোমাদের জন্য কষ্ট চান না। আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূর্ণ করো এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন সে জন্য তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো এবং যাতে তোমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৮৫]

সপ্তম শিক্ষা:

রমাদান মাস আমাদের দানশীলতা ও দরিদ্র-মিসকিনদের প্রতি অনুগ্রহ করা এবং তাদের অনুভূতি বোঝার শিক্ষা দেয়। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমাদান মাসে সবচেয়ে বেশী দানশীল হতেন। (((সহীহ বুখারী (৬) ও সহীহ মুসলিম (২৩০৮)।)))

আর যখন বান্দা ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করে, তখন তা তাকে দরিদ্রদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে বাধ্য করে। আর এটি তাকওয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

অষ্টম শিক্ষা:

রমাদান মাস আমাদেরকে আল্লাহ তা‘আলার অসীম ক্ষমা, দয়া ও অনুগ্রহ সম্পর্কে শিক্ষা দেয়। এ মাসের সম্পূর্ণ অংশই রহমত, মাগফিরাত এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি। এই মাসের মধ্যে রয়েছে লাইলাতুল কদর, যা এক হাজার মাসের চেয়েও উত্তম; অর্থাৎ এটি আশি বছরেরও বেশি সময়ের ইবাদতের সমতুল্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: আর আপনাকে কিসে জানাবে ‘লাইলাতুল-কদর’ কী ? ‘লাইলাতুল-কদর’ হাজার মাসের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেস্তাগণ ও রূহ্ নাযিল হয় তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে। শান্তিময় সে রাত, ফজরের আবির্ভাব পর্যন্ত। [সূরা আল-কদর, আয়াত: ২-৫]

দারস সমূহের উপসংহার:

রমাদানের পর করণীয় কী? আল্লাহ শুধু রমাদানের রব নন, বরং তিনি সব মাস ও দিনের রব। তাই বান্দার উচিত সর্বাবস্থায় ও সময়ে একটি মূলনীতির ওপর অটল থাকা, আর তা হলো: আল্লাহ তা‘আলার তাকওয়া অবলম্বন।

উপসংহার

পরিশেষে আমি কিছু উপকারী সূত্র ও গ্রন্থের প্রতি ইঙ্গিত করছি, যেগুলোর মাধ্যমে এই বিষয়ে আরও বিশদভাবে জ্ঞানার্জন করা সম্ভব। যারা সিয়ামের মাসায়েল সম্পর্কে গভীরভাবে জানতে চান, তারা এসব গ্রন্থ পড়তে পারেন।

আব্দুল আযীয ইবনু বাযের “সিয়াম ও যাকাত বিষয়ক সংক্ষিপ্ত দুটি পুস্তিকা”।

মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল-উছাইমীনের “রমাদান মাসের আসরসমূহ”।

সালিহ ইবনু ফাউযান আল-ফাউযানের “বরকতময় রমাদান মাসের মজলিসসমূহ” এর সাথে রয়েছে: “ইতহাফু আহলিল ঈমান বিদুরূসি শাহরি রমাদান” নামক পুস্তিকা।

শাইখ সা‘দ ইবনু তুরকী আল-খছলানের “উকুদুল জামান ফী দুরূসি শাহরি রমাদান” গ্রন্থ।

শইখ মুহাম্মাদ ইবনু শামী শাইবাহর “দুরূসি শাহরি রমাদান” গ্রন্থ।

হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল, দয়ালু, আপনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, অতএব আমাদের ক্ষমা করুন। আমাদের নেতা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার ও সকল সাহাবীর প্রতি শান্তি ও বরকত বর্ষিণ করুন।