আল-ঈমান; কুরআনুল কারীম ও সুন্নাহে বর্ণিত যেসব বিষয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর ফরয করেছেন।
আকীদার সকল মূলনীতি, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও মাসআলাহ সমৃদ্ধ এক ব্যাপক বিশ্বকোষ। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সংক্ষিপ্ত ও সামগ্রিক আকারে আকীদাকে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর গুরুত্ব প্রদানসহ আকীদাগত মাসআলাগুলোকে কুরআনুল কারীম ও পবিত্র সুন্নাহর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং তার্কিক ও দার্শনিকদের আলোচনা থেকে মুক্ত রেখে আকীদার মাসআলাগুলোকে সহজ সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেছে। এটির লক্ষ্য হলো আকীদার বিষয়গুলো এমনভাবে পেশ করা যাতে তা সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের বোঝা ও আয়ত্ব করা করা সহজ হয়।
আল-ঈমান বিশ্বকোষ; আল-কুরআনুল কারীম ও নববী সুন্নাহে বর্ণিত যেসব বিষয় আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর ফরয করেছেন।
আকীদার সকল মূলনীতি, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও মাসআলাহ সমৃদ্ধ এক ব্যাপক বিশ্বকোষ। এর বৈশিষ্ট্য হলো, এটি সংক্ষিপ্ত ও সামগ্রিক আকারে আকীদাকে প্রতিষ্ঠিত করার ওপর গুরুত্ব প্রদানসহ আকীদাগত মাসআলাগুলোকে কুরআনুল কারীম ও পবিত্র সুন্নাহর সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং তার্কিক ও দার্শনিকদের আলোচনা থেকে মুক্ত রেখে আকীদার মাসআলাগুলোকে সহজ সাবলীল ভাষায় উপস্থাপন করেছে।
বিশ্বকোষটির পরিচয়
পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি তাঁর বান্দার ওপর কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে কোনো বক্রতা রাখেননি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মাবুদ নেই, তিনি এক তাঁর কোনো শরীক নেই। কেবল তার জন্যেই রাজত্ব ও প্রশংসা। তিনি সকল জিনিসের ওপর ক্ষমতাবান। আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা, রাসূল ও তাঁর ওহীর আমানতদার।
অতঃপর, আকিদার জ্ঞান হলো সবচেয়ে সম্মানিত ও মহান জ্ঞান। কারণ, তা আলোচনা করে সর্বোত্তম বিষয় সম্পর্কে —আর তা হলো আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার সত্তা—, এবং সর্বোত্তম উদ্দেশ্য সম্পর্কে —আর তা হলো আল্লাহর তাওহীদ ও তাঁর প্রতি ঈমান আনয়ন করা—, এবং সর্বোত্তম আকাঙ্খা সম্পর্কে —আর তা হলো নিয়ামতপূর্ণ আবাস (জান্নাতে) মহান রবের দিদার লাভ এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য ও সরল পথে চলা সম্পর্কে-। এই জন্য আমরা এমন একটি কিতাব রচনা করার আগ্রহ প্রকাশ করেছি যা আকিদার মাসআলাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করবে, যাতে আমরা আল্লাহর কিতাব ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নতের অনুসরণ করতে পারি; আর আধুনিক দার্শনিকদের পরিভাষা, সংজ্ঞা, মূলনীতি ও শর্তসমূহ থেকে দূরে থাকব এবং একে সবার জন্য সহজলভ্য করে তুলব। যেন এর দ্বারা আলিম এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নরত ছাত্রগণ ও সাধারণ মুসলিমগণ উপকৃত হতে পারেন।
রচনার কারণ:
আমাদের সালফে সালেহীনগণ সহীহ আকিদা ও তার বিপরীত আকিদার বর্ণনা এবং বিরোধীদের জবাব দেওয়ার জন্য অনেক পরিশ্রম ব্যয় করেছেন। এই কিতাব মূলত সালাফগণ যা লিখেছেন, তা ছাত্র ও সাধারণের নাগালে নিয়ে আসার জন্যে রচিত। তাই আমরা আকিদার সকল মাসআলাকে একটি কিতাবে সন্নিবেশ করেছি, এবং শুধুমাত্র বিশুদ্ধ আকীদার বিবরণ দেওয়াতে সীমাবদ্ধ থেকেছি, বিরোধীদের উত্তর দেওয়ার আলোচনায় প্রবেশ করিনি। তেমনিভাবে আমরা তা সহজ ভাষায় সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করা ও তা বিষয়ভিত্তিক সাজানোর চেষ্টা করেছি। আশা করছি যে, তা দ্বারা আমরা দু’টি উদ্দেশ্য হাসিল করতে পেরেছি: প্রথমত, সালাফদের জ্ঞানকে সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। দ্বিতীয়ত, আকিদার লাইব্রেরীর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন পূরণ করা। আর তা হলো সহজ ভাষায় একটি কিতাব রচনা করা, যা আকিদার সকল বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করবে।
কিতাব রচনার ক্ষেত্রে অনুসৃত নীতি:
আকিদার প্রত্যেকটি বিষয়ের সঙ্গে সংম্লিষ্ট আয়াত ও হাদিসগুলো পেশ করা এবং তার সারাংশ বের করা।
আকিদার কিতাবসমূহের সকল বিষয়কে উপস্থাপন করা, হোক তা মুসনাদ (সনদসহ), অথবা মুতূন (টেক্স) অথবা মুতূনের ব্যাখ্যা; যাতে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, আমরা আয়াত ও হাদীস থেকে যে আকিদা সংগ্রহ করেছি, তা আকিদার গ্রন্থকারদের দ্বারা লিপিবদ্ধ বিষয়গুলোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
যখন আকিদার কোনো মাসআলা কুরআনুল কারীমে অথবা সুন্নাহে একইভাবে বর্ণিত হয়েছে তখন আমরা এমন একটি বা দু’টি দলিল উপস্থান করেই ক্ষান্ত হয়েছি যেখানে এই মাসআলার উল্লেখ রয়েছে। আর যদি মাসআলাটি কুরআনুল কারীম ও সুন্নাহে বিভিন্ন আঙ্গিকে বর্ণিত হয়ে থাকে, যেমন আল্লাহর কথা বলা, উঁচু হওয়া, হাত, এবং কিয়ামতের দিন ও জান্নাতে মুমিনদের আল্লাহকে দেখা—তাহলে আমরা প্রত্যেক আঙ্গিকের দলিল উল্লেখ করব, কিন্তু এই বিষয়ে সবকিছু উল্লেখ করতে হবে এমন নয়
কখনো আমরা একটি মাসআলার কিছু বিষয় এক অধ্যায়ে উল্লেখ করব, তারপর অপর অধ্যায়ে পুনরায় তা উল্লেখ করে বাকি আলোচনা পূর্ণ করব। যেমন আমরা ‘সৃষ্টির অধ্যায়ে’ ফেরেশতাদের সৃষ্টির বিষয়ে আলোচনা করেছি এবং পরে "ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান" পর্বে তাদের সম্পর্কে আলোচনা সম্পূর্ণ করেছি। আবার ‘আল্লাহর অস্তিত্বের ওপর ঈমান’ অধ্যায়ে আল্লাহর অস্তিত্ব সাব্যস্তকারী কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করেছি, আবার একই আয়াত উল্লেখিত হয়েছে ‘রুবুবিয়্যাত’ অধ্যায়ে। কারণ, উভয়ের মধ্যে মিল রয়েছে । অতএব باب الإيمان بوجود الله (আল্লাহর অস্তিত্বের ওপর ঈমান) অধ্যায় থেকে উদ্দেশ্য হলো রবের অস্তিত্বের দলিলগুলো পেশ করা যা নাস্তিকেরা অস্বীকার করে। যেখানে باب الربوبية (রুবুবিয়্যাত ) অধ্যায় থেকে উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর উলুহিয়্যার জন্য আবশ্যক রুবুবিয়্যাহকে সাব্যস্ত করা- যেই বিষয়ে মুশরিকরা বিবাদে জড়ায়। অনুরূপভাবে একটি আয়াত ও হাদিসকে একাধিক জায়গায় উল্লেখ করব তার প্রসঙ্গ ও প্রয়োজন অনুযায়ী
প্রয়োজনের সময় সালাফদের কিছু বক্তব্য উল্লেখ করব, যা আয়াত ও হাদীসের অর্থ স্পষ্ট করবে। যেই কথার দ্বারা হক স্পষ্ট হয় সেটিই উল্লেখ কবর, সংশয় এবং বিরোধীদের কথা উল্লখ করা ছাড়াই। যেন ছাত্ররা সংশয়ের সম্মুখীন না হয় এবং তাদের অন্তরে এই ইলম ও তার বুঝ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই বিরোধীদের কথার দ্বারা বিভ্রন্ত না হয়। আশা করছি যে, আল্লাহর ইচ্ছায় এটি আকিদার মাসআলায় পাঠককে বিচ্যুতি থেকে নিরাপত্তা দিবে। যেহেতু সে আকিদাগত প্রসিদ্ধ ইখতিলাফ আয়ত্ব করেছে, যেমন সিফাত, তাকদীর ও অন্যান্য মাসআলাহ।
ইবনু আবী যামানীন আল-মালেকী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: (তুমি যার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছো এবং তা ছাড়াও সুন্নাহের উসূল হতে যা জিজ্ঞেস করা হয় যেখানে প্রবৃত্তির অনুসারী গোমরাহ ব্যক্তিরা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতের বিরোধিতা করেছে তার সম্পর্কে হিদায়াতের ইমাম ও আহলুল ইলমদের বাণী দ্বারা তোমাকে জানিয়েছি। তাদের কোনো কথা লিখা হবে এবং কোনো কিতাবে তা স্থায়ী হবে এটি যদি বড় বড় আলেমগণ অপছন্দ না করতেন, আমি অবশ্যই তোমাকে তাদের ফিতনা ও গোমরাহী সম্পর্কে (লিখে) সংবাদ দিতাম, যা নি:সন্দেহে তাদের ব্যাপারে তোমার অনাগ্রহ আরো বেশী সৃষ্টি করত। আল্লাহর নিকট তাদের ফিতনা হতে পানাহ চাই। আল্লাহ আমাকে ও তোমাকে তাদের গোমরাহীর ফিতনা থেকে সুরক্ষা দিন, যেসব কথা ও আমল তাকে সন্তুষ্ট করবে তা করার তাওফীক এবং ধীরে ধীরে তার নৈকট্য দান করুন)। ইবনু আবী যামানীন, উসূলুস সুন্নাহ (৩০৯, ৩১০)
আমরা ইচ্ছে করেছি যে, দার্শনিকদের নব আবিষ্কৃত পরিভাষা ও সংজ্ঞা থেকে দূরে অবস্থান করব, যার ব্যাপারে আল্লাহ কোনো দলিল নাযিল করেননি।
আমরা কিতাবটিকে ‘কিতাব তথা পর্ব’ এবং ‘অধ্যায়’ আকারে সাজিয়েছি, শরয়ী ইলম বিষয়ে পূর্ববর্তী লেখকগণ যেমনটি করেছেন। বর্তমান যুগের পরিচ্ছেদ ও অনুচ্ছেদ জাতীয় বিভাজন ব্যবহার করিনি। কিতাবটিকে ঈমানের মূলনীতির ধারায় সাজিয়েছি। ইবনু আবুল ইজ্জ আল-হানাফী বলেছেন, (দীনের মূলনীতি বিষয়ক কিতাবকে সেই ধারাবাহিকতায় সাজানো উচিত, যেই ধারাবাহিকতায় রাসূল জিবরীলকে উত্তর দিয়েছেন, যখন তিনি তাকে ঈমান সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছেন, ”তুমি ঈমান আনবে আল্লাহর প্রতি ও ফেরেশতাদের প্রতি...” কাজেই প্রথমে তাওহীদ, সিফাত ও তৎসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করবে, তারপর ফেরেশতাদের বিষয়ে আলোচনা করবে, তারপর এভাবে অন্যান্য বিষয়ে। (শারহুল আকিদাহ আত-তাহাভিয়্যাহ (২/৬৮৯)।)
প্রত্যেক কিতাব তথা পর্বের শুরুতে তার সারাংশ উল্লেখ করেছি, যেখানে দলিল উল্লেখ করা ছাড়া সকল মাসআলা বর্ণনা করেছি।
আর হাদিসের তাখরীজের বিষয়ে, আমরা সংক্ষেপে এর তাখরীজ করেছি। এক্ষেত্রে আমরা ‘কুতুবুস সিত্তাহ’ তথা বিখ্যাত ছয়টি কিতাব দিয়ে শুরু করেছি, এগুলোর প্রসিদ্ধ তারতীব রক্ষা করে। তারপর লেখকের মৃত্যুর তারিখ অনুযায়ী সাজিয়েছি। আর কিতাবের ভলিয়ম ছোট রাখার তাগিদে হাদিসের ওপর একেবারে সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা ছাড়া শুধু তাখরীজের ওপর সীমাবদ্ধ থেকেছি।
এই কিতাবের বৈশিষ্ট্যসমূহ:
আকিদাগত মাসআলাগুলোকে কুরআনুল কারীম ও পবিত্র হাদীসের সঙ্গে যুক্ত করা, যেন শিক্ষার্থীর নিকট এসব মাসআলার ভিত্তি স্পষ্ট হয়ে উঠে।
আকিদার প্রতিটি অধ্যায়ের সাথে সম্পর্কিত প্রধান প্রধান মাসআলাগুলো উল্লেখ করা।
আকিদার মাসআলাগুলো ব্যাখ্যা ও বর্ণনা করার সময় সহজ ভাষায় সংক্ষিপ্ত ও সামগ্রিক আকারে আক্বীদাকে প্রতিষ্ঠিত করা, যাতে এটি আরও বোধগম্য হয় এবং আয়ত্তে আসে।
কিতাবটি দার্শনিক ও ফিলোসুফিদের আলোচনা থেকে মুক্ত, এর ভাষা সহজবোধ্য, এবং বিদআত শুরু হওয়ার পর থেকে আকিদার কতক কিতাবে পাওয়া শব্দাবলীর ব্যবহার থেকে বিরত থাকা হয়েছে।
আর আমরা দাবি করছি না যে, আকিদার সব মাসআলাকে সন্নিবেশিত করেছি, তবে আমরা তাতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করেছি। আমরা এই বইটির সবরকম সমৃদ্ধি, বা মূল্যায়ন, বা সংশোধনীর প্রত্যাশা করছি; যাতে আমরা বইটির পরবর্তী সংস্করণগুলিতে এর দ্বারা উপকৃত হতে পারি। আমরা মনে করি যে, আমরা ওহীর উৎসস্থলে অবস্থান করছি এবং তা থেকে সর্বোত্তম ইলমের বিষয়গুলো উদ্ভাবন করেছি। এবং এই বিষয়ের ছাত্রদের জন্য প্রতিটি বিষয়ে দলিল হিসেবে একটি আয়াত বা হাদিস অথবা উভয়ই উল্লেখ করেছি। আল্লাহ নিকট প্রার্থনা করি, তিনি এই আমলকে একমাত্র তাঁর জন্য নিবিষ্ট করুন, তাঁর নবী, খলীল ও ওহীর আমানতদারের সুন্নাতের মোতাবেক করে দিন, তাঁর বান্দাদের জন্য উপকারী করুন, এবং এটিকে আমরা যে দিন আমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাত করব সেই দিনের জন্যে হুজ্জত ও দলিল রূপে দাঁড় করান।
আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করছি যিনি এই ইলমকে আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন, আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত করেছেন এবং আল্লাহর প্রতি ঈমানের রুকনসমূহ সম্পর্কিত মাসআলার বিস্তারিত বর্ণনা করা এবং কিতাব ও সুন্নাহ থেকে এর দলিল উল্লেখ করার তাওফিক দান করেছেন।
আরো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি তাদের যারা আমাদের প্রতি ইহসান করেছেন। কৃতজ্ঞতা পাওয়ার সবচেয়ে হকদার হচ্ছেন আমাদের পিতা-মাতা। হে আল্লাহ! তুমি তাদের ক্ষমা কর, তাদের ওপর রহম কর এবং তাদেরকে আমাদের পক্ষ থেকে উত্তম বিনিময় দান কর, যেমনটি একজন সন্তানের পক্ষ থেকে একজন পিতাকে তুমি দিয়ে থাক।
অতঃপর আমরা সেসব সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি যারা বইটির পর্যালোচনা করেছেন এবং মূল্যবান মতামত ও সংশোধন উপস্থাপন করেছেন। তারা হলেন: প্রিন্স ডক্টর সৌদ বিন সালমান বিন মোহাম্মদ আলে সৌদ, কিং সৌদ ইউনিভার্সিটির আকিদার সহযোগী অধ্যাপক, ড. সাহল বিন রিফা আল ওতাইবি, কিং সৌদ ইউনিভার্সিটির আকিদার সহযোগী অধ্যাপক। প্রফেসর ডক্টর আব্দুল্লাহ বিন সালেহ আল-বারাক, কিং সৌদ ইউনিভার্সিটির আকিদার অধ্যাপক, এবং ডক্টর আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল আজিজ আল-আনকারি, কিং সৌদ ইউনিভার্সিটির আকিদার সহযোগী অধ্যাপক। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তারা যে আন্তরিক পরামর্শ ও সঠিক মতামত পেশ করেছেন তার বিনিময়ে আমাদের পক্ষ থেকে এবং ইলম ও আহলে ইলমদের পক্ষ থেকে তাদেরকে তিনি উত্তম বিনিময় দান করুন।
সমস্ত প্রশংসা বিশ্বের প্রতিপালক আল্লাহ তাআলার জন্য, আর সালাত, সালাম ও রবকত নাযিল করুন সৃষ্টির সেরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর এবং তার পরিবার ও সকল সাহাবীর ওপর।
মক্কা মুকাররামা,
৮ই যিলহজ,
১৪৩৯ হিজরী।
ভূমিকা
পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি
তাঁর দ্বারাই সাহায্য প্রার্থনা করি, মহান ও সুউচ্চ আল্লাহর শক্তি ও তাওফিক ছাড়া ভালো কাজ করার ক্ষমতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত থাকার কোনো সাধ্য নেই।
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য- যেমনটি তাঁর সম্মানিত চেহারা ও বিশাল রাজত্বের জন্য উপযুক্ত। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক তাঁর কোনো শরীক নেই, রাজত্ব তাঁর এবং সকল প্রশংসাও তাঁর, আর তিনি সব কিছুর ওপর ক্ষমতাশীল। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। তার ওপর আল্লাহ অসংখ্য সালাত ও সালাম নাযিল করুন। অতঃপর:
এই কিতাবে আমরা মুসলিমদের ওপর যেসব বিষয়ে ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব এবং যা কিতাব ও সুন্নাহে বর্ণিত হয়েছে তা উল্লেখ করব। কখনো আমরা আয়াত বা হাদীসের ব্যাখ্যার জন্য, অথবা আয়াত বা হাদীসের অর্থ নির্ণয় করার জন্যে কতক সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে তাবেয়ীর কথাও উল্লেখ করব। আমরা কিতাবটিকে ‘কিতাব’ তথা পর্ব এবং অধ্যায়ে ভাগ করেছি। আর তাতে আমরা যথাসম্ভব সংক্ষেপ করা এবং জরুরি মাসআলার ওপর সীমাবদ্ধ থাকার চেষ্টা করেছি। আর পরবর্তী আলেমগণ যেসব পরিভাষা নিয়ে ঘাটাঘাটি করেছেন, যা আল্লাহর কিতাব ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাতে বর্ণিত হয়নি সেগুলো থেকে দূরে অবস্থান করেছি। আল্লাহ তাআলা তাঁর দ্বীনের আনুগত্য, তাঁর রজ্জুকে মজবুতভাবে আঁকড়ে ধরা ও তাঁর রাসূলের অনুসরণের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেন: (আর তোমরা সকলে আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধারণ কর এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। আর তোমাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ স্মরণ কর, যখন তোমরা ছিলে পরস্পর শত্রু, অতঃপর তিনি তোমাদের হৃদয়ে প্রীতির সঞ্চার করেন, ফলে তাঁর অনুগ্রহে তোমরা পরস্পর ভাই হয়ে গেলে। তোমরা তো অগ্নিগর্তের দ্বারপ্রান্তে ছিলে, তিনি তোমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করেছেন। এভাবে আল্লাহ তোমাদের জন্য তাঁর নিদর্শনসমূহ স্পষ্টভাবে বিবৃত করেন যাতে তোমরা হেদায়াত পেতে পার।) [আলে ইমরান: ১০৩] আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তাআলা আরো বলেন: (আর তোমরা তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের কাছ থেকে উত্তম যা নাযিল করা হয়েছে তার অনুসরণ কর, তোমাদের উপর অতর্কিতভাবে শাস্তি আসার আগে, অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।) [আয-যুমার: ৫৫]
অতঃপর, আল্লাহর তাওফিক কামনা করে বলছি:
পর্ব: সৃষ্টির সূচনা
এই পর্বের সারসংক্ষেপ
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর সৃষ্টিকর্তা এবং আল্লাহ ছিলেন, তখন তিনি ছাড়া কিছুই ছিল না, তার পূর্বে কিছুই ছিল না। আর তার আরশ পানির ওপর। তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টির পূর্বে পানি সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, এ দুটি মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে, তারপর তিনি উভয়কে পৃথক করেছেন।
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ এই সৃষ্টিকে তাঁর রুবুবিয়্যাতের ওপর দলিল সাব্যস্ত করেছেন, যা তার উলূহিয়্যাহকে আবশ্যক করে। তিনিই সত্যিকারের স্রষ্টা আর তিনি ছাড়া যা কিছু রয়েছে সব মাখলুক (সৃষ্ট)। আমাদের রব বরকতময় ও সুউচ্চ। তিনিই সত্য ইলাহ, তিনি ছাড়া সবাই প্রতিপালিত, তারা কেউই ইবাদত, আশা বা লক্ষ্য হওয়ার যোগ্য নয়।
আমরা বিশ্বাস করি যে, সম্মানিত আরশ আল্লাহর সৃষ্টিসমূহ হতে মহান এক সৃষ্টি, বরং তা সবচেয়ে বড় সৃষ্টি।
আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে, ফেরেশতাগণ পরম দায়াময়ের আরশকে ঘিরে আছে, আর আল্লাহ তাআলা আছেন তাঁর আরশের ওপর, তাঁর আসমানসমূহের ওপর এবং তাঁর মাখলুক থেকে পৃথক।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহই কলম সৃষ্টি করেছেন, যা প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর লিপিবদ্ধ করেছে, আর তাকদীরের কলম একাধিক।
আমরা ঈমান রাখি যে, আল্লাহ কুরসি সৃষ্টি করেছেন, আর এটা আরশের পর সবচেয়ে বড় মাখলুক।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাআলা মাত্র ছয় দিনে আসমান, জমিন ও এতদুভয়ের মধ্যবর্তী সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। আর আল্লাহ খুটি ছাড়াই আসমানকে উর্দ্ধে তুলেছেন। তিনি এসব বিশাল সৃষ্টিকে মহান হিকমতের কারণে সৃষ্টি করেছেন যা আয়ত্ত করা সম্ভব নয়। আর আল্লাহ তাআলা এগুলোর সৃষ্টি ও নির্মাণকে নিখুঁতভাবে করেছেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, এই জগতের আসমান, জমিন ও পাহাড়-পর্বত এবং আরো যা কিছু রয়েছে, কিয়ামতের দিন সবকিছু আরেকটি অবস্থায় রূপান্তরিত হবে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ সূর্য ও চন্দ্রকে যথাযথভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং তার স্বীয় নির্দেশে এদেরকে অনুগত করেছেন। তিনি মহান হিকমতের জন্যে নক্ষত্র ও গ্রহসমূহকে সৃষ্টি করেছেন। নক্ষত্র ও গ্রহসমূহ কোনো উপকার বা অপকার করতে পারে না এবং আসমান ও জমিনের ঘটনায় কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে না। আর যে তাদেরকে স্বয়ংক্রিভাবে প্রভাব সৃষ্টিকারী বিশ্বাস করল সে শিরক ও কুফরি করল।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ ফেরেশতামন্ডলী সৃষ্টি করেছেন নূর থেকে এবং তাদের সৃষ্টিতে ভিন্নতা রেখেছেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ ধোঁয়াবিহীন অগ্নিশিখা থেকে জিনকে সৃষ্টি করেছেন। আর জিনদের সৃষ্টি আদমের সৃষ্টির পূর্বে হয়েছে। শয়তানদের সর্দর হলো ইবলিশ। সে-ই আমাদের পিতা-মাতা আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালামকে ফুসলিয়ে জান্নাত থেকে বের করেছে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, ইবলিশ অহংকারবশত সাজদা করতে অস্বীকার করেছে, ফলে আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত হয়েছেন, তাকে লা‘নত করেছেন ও বিতাড়িত করেছেন। আর জিনেরাও শরীয়তের বিধানের অধীন এবং দায়বদ্ধ।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাঁর ফেরেশতাদেরকে সংবাদ দিয়েছিলেন যে, তিনি ইবাদতের দ্বারা জমিন আবাদ করার জন্য খলিফা বা প্রতিনিধি সৃষ্টি করবেন। আর আরো বর্ণনা করেছেন যে, এই খলিফা হলো আদম। তিনি তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করবেন। আর এই মাটি আল্লাহ কাদায় পরিণত করেন এবং তাকে বিভিন্ন ধাপে সৃষ্টি করেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ স্বীয় পবিত্র হাত দ্বারা আদমকে সৃষ্টি করেছেন এবং ফেরেশতাদের দ্বারা তাকে সাজদা করিয়েছেন। আর তার জন্য তার থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যেন সে তার কাছে প্রশান্তি লাভ করে। আর তিনি হলেন হাওয়া। তিনি তাদের উভয়কে জান্নাতে বসবাস করিয়েছেন, অতঃপর সেখান থেকে তাদেরকে জমিনে অবতরণ করিয়েছেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, সকল মানুষই আদমের বংশধর। আর আদম হলেন মাটির সৃষ্টি। কাজেই তাকওয়া ছাড়া কারো ওপর কারো কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।
আমরা সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ মানুষকে ফিতরাতের ওপর সৃষ্টি করেছেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, রূহ আল্লাহর একটি নির্দেশ। আর মানুষেরা রুহ সম্পর্কে কিছুই জানে না, তবে এ সম্পর্কে তাদেরকে আল্লাহ যা জানিয়েছেন তা ছাড়া। বস্তুত সকল রূহ হলো আল্লাহর মাখলুক।
আমরা বিশ্বাস করি যে, রূহসমূহ মারা যায়, আর তার মারা যাওয়া হলো শরীর থেকে পৃথক হওয়া।
আমরা বিশ্বাস করি যে, জমিনে যা কিছুই বিচরণ করে সেগুলো আমাদের মতই জাতি।
আমরা জানি যে, আল্লাহ প্রত্যেক জাতিকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক জিনিসকে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। আর এসব মাখলুক ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে, তবে মহিমান্বিত আল্লাহ যাদের ব্যতিক্রম করেছেন, তারা ব্যতীত।
অধ্যায়: আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্টা।
আমরা সাক্ষ্য দেই যে, আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর স্রষ্ঠা। আল্লাহ তাআলা বলেন, (তিনিই তো আল্লাহ্ , তোমাদের রব; তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা; কাজেই তোমরা তাঁর ‘ইবাদত কর। আর তিনি সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক।) [আল-আনআম: ১০২] সুউচ্চে অধিষ্ঠিত মহান আল্লাহ আরো বলেন: (আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।) [আয-যুমার: ৬২] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আরো বলেন: (আর তিনিই, যিনি সৃষ্টিকে শুরুতে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, তারপর তিনি সেটা পুনরাবৃত্তি করবেন; আর এটা তাঁর জন্য অতি সহজ।) [আর-রূম : ২৭]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ ছিলেন, তখন তিনি ছাড়া কিছুই ছিল না, তার আগেও কিছু ছিল না। আল্লাহ তাআলা বলেন: (তিনিই প্রথম ও শেষ, প্রকাশ্য ও গোপন, আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।) [আল-হাদীদ: ৩]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “হে আল্লাহ, আপনিই প্রথম আপনার পূর্বে কিছুই নেই, আপনিই শেষ আপনার পরে কিছুই নেই, আপনিই প্রকাশ্য আপনার ওপরে কিছুই নেই, আপনিই গোপন, আপনার নিচে কিছু নেই।] {মুসলিম (২৭১৩), আবু দাউদ (৫০৫১), তিরমিযী (৩৪০০), ইবনু মাজাহ (৩৮৩১)}
ইমরান বিন হুসাইন রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ছিলাম। এমন সময় তার কাছে বনূ তামীম গোত্রের কিছু লোক আসল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: (হে বনূ তামীম। তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর।) উত্তরে তারা বলল, আপনি আমাদেরকে শুভ সংবাদ যখন দিচ্ছেন, তাহলে কিছু দান করুন। এ সময় ইয়ামানবাসী কতিপয় লোক সেখানে উপস্থিত হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন: (হে ইয়ামানবাসী! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। বনূ তামীম তা গ্রহণ করেনি।) তারা বলল, আমরা গ্রহণ করলাম। আমরা আপনার কাছে এসেছি দ্বীনি জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে এবং জিজ্ঞেস করার জন্য যে, এ দুনিয়া সৃষ্টির আগে কী ছিল? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: (আল্লাহ্ তখন ছিলেন, তাঁর আগে আর কিছুই ছিল না। তাঁর আরশ তখন পানির ওপর ছিল। অতঃপর তিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করলেন এবং লাওহে মাফফুযে সবকিছু লিখে রাখলেন।) {বুখারী (৭৪১৮), তিরমিযী (৩৯৫১)} অপর বর্ণনায় এভাবে এসেছে: (আল্লাহ ছিলেন, তখন তিনি ছাড়া কিছুই ছিল না, আর তার আরশ ছিল পানির ওপর।) {বুখারী (৩১৯১)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, জমিনে যা কিছুই বিচরণ করে সেগুলো আমাদের মতই জাতি। মহাসত্য ও সুউচ্চ সত্তা বলেন: (আর জমিনে বিচরণশীল প্রতিটি জীব বা দু’ডানা দিয়ে উড়ে এমন প্রতিটি পাখি, তোমাদের মতো এক একটি উম্মত। এ কিতাবে আমি কোনো কিছুই বাদ দেইনি। তারপর তাদেরকে তাদের রব-এর দিকে একত্র করা হবে।) [আল-আন‘আম: ৩৮] আমরা জানি যে, আল্লাহ প্রত্যেক জীবকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র ও সুউচ্চ আল্লাহ বলেন: (আর আল্লাহ্ সমস্ত জীব সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে, অতঃপর তাদের কিছু সংখ্যক পেটে ভর দিয়ে চলে, কিছু সংখ্যক দু‘পায়ে চলে এবং কিছু সংখ্যক চলে চার পায়ে। আল্লাহ্ যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন, নিশ্চয় আল্লাহ্ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।) [আন-নূর ৪৫] আর তিনি প্রত্যেক বস্তু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: (আর প্রত্যেক বস্তু আমি সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ কর।) [আয-যারিয়াত : ৪৯] মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (আর এই যে, তিনিই সৃষ্টি করেন যুগল-পুরুষ ও নারী।) [আন-নাজম: ৪৫]
আমরা বিশ্বাস করি যে, এসব সৃষ্টি -বৈচিত্রময় ও বহুসংখ্যক হওয়া সত্ত্বেও- ভারসাম্যপূর্ণ, এগুলোর একটি অপরটির ওপর এবং এক শ্রেণি অপর শ্রেণির ওপর সীমালঙ্ঘন করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: (আর যমীন, এটাকে আমি বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি এবং আমি তাতে প্রত্যেক বস্তু উদগত করেছি সুপরিমিতভাবে।) [আল-হিজর: ১৯]
আর এসব মাখলুকই ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: (ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে সবকিছুই নশ্বর।* আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব ।) [আর-রহমান ২৬,২৭] তবে মহা সম্মানিত ও সুউচ্চ রাজত্বের অধিপতি আল্লাহ তাআলা যাদেরকে নিম্নের বাণীতে বেহুশ হবে না বলে ঘোষণা দিয়েছেন তারা ব্যতিরেকে: (আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে আসমানসমূহে যারা আছে ও জমিনে যারা আছে তারা সবাই বেহুশ হয়ে পড়বে, যাদেরকে আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া। তারপর আবার শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে তৎক্ষণাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।) [আয-যুমার ৬৮]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ এই সৃষ্টিকে তাঁর রুবুবিয়্যাতের ওপর দলিল সাব্যস্ত করেছেন, যা তাঁর উলুহিয়্যাহকে আবশ্যক করে। কখনো তার সৃষ্টিকে এই সৃষ্টিজীবের জন্য তাঁর রুবুবিয়্যাহর ওপর দলিল সাব্যস্ত করেছেন। যেমন আল্লাহ তাআলার এই বাণীতে রয়েছে: (এটা আল্লাহর সৃষ্টি! সুতরাং তিনি ছাড়া অন্যরা কী সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও। বরং যালিমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।) [লুকমান: ১১] আবার কখনো আল্লাহ উল্লেখ করেন যে, এসবের ভেতর সবচেয়ে বড় মাখলুক হলো আরশ। এটিও তাঁর রুবুবিয়্যাহকে প্রমাণ করে। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণীতে রয়েছে: (আল্লাহ্, তিনি ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি মহা‘আরশের রব।) [আন-নামাল: ২৬] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আমি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি তাঁর অসংখ্য মাখলুকের পরিমাণ, আমি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি তাঁর সন্তুষ্টির সমান, আমি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি তাঁর আরশের ওজন পরিমাণ এবং আমি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি তাঁর কালিমাসমূহের সংখ্যার সমান।) {মুসলিম (২৭২৬), নাসায়ী (১/১৩৫১), তিরমিযী (৩৫৫৫), ইবনু মাজাহ (৩৮০৮)} কাজেই আরশের ওজন সবচেয়ে ভারী। কখনো তিনি বড় বড় মাখলুককে তার রুবুবিয়্যাহর দলিল সাব্যস্ত করেছেন। যেমনটি মহান আল্লাহর নিম্নের বাণীতে রয়েছে: (তিনিই জমিনে যা আছে সব তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি আসমানের প্রতি মনোনিবেশ করে সেটাকে সাত আসমানে বিন্যস্ত করেছেন; আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সবিশেষ অবগত।) [আল-বাকারাহ: ২৯] আবার কখনো তিনি এসব মাখলুক থেকে কোন কোন প্রকার উল্লেখ করে সেটাকে তাঁর রুবুবিয়্যাহর ওপর দলিল সাব্যস্ত করেছেন। যেমন পবিত্র ও মহান আল্লাহর এ বাণীতে রয়েছে: (আপনি কি দেখেন না, আল্লাহ্ আকাশ হতে বৃষ্টিপাত করেন, তারপর আমি তা দ্বারা বিচিত্র বর্ণের ফলমূল উদগত করি। আর পাহাড়ের মধ্যে আছে বিচিত্র বর্ণের পথ---শুভ্র, লাল ও নিকষ কালো।) [ফাতির: ২৭]
আবার কখনো তিনি সবচেয়ে দুর্বল ও ছোট মাখলুককে তার রুবুবিয়্যাহর ওপর দলিল সাব্যস্ত করেছেন। যেমনটি আল্লাহ তাআলার এ বাণীতে রয়েছে: (নিশ্চয় আল্লাহ্ মশা কিংবা তার চেয়েও ক্ষুদ্র কোনো বস্তুর উপমা দিতে সংকোচ বোধ করেন না। অতঃপর যারা ঈমান এনেছে তারা জানে যে , নিশ্চয়ই এটা তাদের রবের পক্ষ হতে সত্য। কিন্তু যারা কুফরী করেছে তারা বলে যে, আল্লাহ্ কী উদ্দেশে এ উপমা পেশ করছেন?) [আল-বাকারাহ: ২৬] অতএব তিনিই সত্যিকার স্রষ্টা, আর তিনি ছাড়া সবাই মাখলুক। আমাদের রব কতই না বরকতময় ও সুউচ্চ। আর তিনিই সত্য ইলাহ, তিনি ছাড়া সবাই পালিত, তারা ইবাদত এবং আশা ও আকাঙ্খার উপযুক্ত নয়।
অধ্যায়: মহান আরশের সৃষ্টি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আরশ আল্লাহর সৃষ্টিকুল হতে মহান সৃষ্টি। বরং আরশ তাঁর সৃষ্টিকুলের অন্যতম বড় সৃষ্টি। যখন মহান আল্লাহ কোনো বস্তুকে মহান বলেন, তখন তা সত্যিকার অর্থেই মহান হয়। আল্লাহ বলেন: (আল্লাহ্, তিনি ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি মহা‘আরশের রব।) [আন-নামাল: ২৬] তিনি আরশকে মাজীদ তথা মহিমান্বিত বলে সম্বোধন করেছেন। যেমন আল্লাহ বলেন: (তিনি মহিমান্বিত ‘আরশের অধিকারী।) [আল-বুরুজ: ১৫] ইবনু জারীর তার তাফসীর গ্রন্থে বলেছেন: কারীগণ আল্লাহর বাণী (المجيد) পাঠ করা নিয়ে দ্বিমত পোষণ করেছেন। মক্কা, মদীনা ও বসরার অধিকাংশ এবং কুফার কতক কারী (المجيد)কে আল্লাহ তা‘আলার বিশেষণ (সিফাত) হিসাবে (ذو العرش) এর উপর আতফ করে পেশ দিয়ে পাঠ করেছেন। আর কুফার অধিকাংশ কারী (المجيد)কে (العرش) এর সিফাত হিসাবে ‘দাল’-এর নিচে জের দিয়ে পাঠ করেছেন। আমাদের নিকট উভয় কিরাতই গ্রহণযোগ্য, তাই পাঠকারী যেটি পাঠ করবে সঠিক করবে। জামিউল বায়ান (২৪/৩৪৬) আরশ এতো মহান হওয়া সত্ত্বেও সৃষ্ট ও পালিত। আল্লাহ তাআলা বলেন: (বলুন, সাত আসমান ও মহা-‘আরশের রব কে?) [আল-মু‘মিনূন: ৮৬] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (...আল্লাহ তাঁর আরশকে পানির ওপর সৃষ্টি করেছেন।) {তিরমিযী (৩১০৯), ইবনু মাজাহ (১৮২), তায়ালিসী (১১৮৯), আহমাদ (১৬১৮৮), ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (৬২৫)} আরশের অনেক খুঁটি রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (কিয়ামতের দিন সকল মানুষ বেহুশ হবে। অতঃপর সর্বপ্রথম আমারই হুশ আসবে। তখন আমি মূসা-কে দেখতে পাব, তিনি আরশের খুঁটিগুলোর একটি খুঁটি ধরে রয়েছেন।) {বুখারী (৩৩৯৮), মুসলিম (২৩৭৪), আবু দাউদ (৪৬৬৮)}
আরশ রয়েছে আসমানসমূহের ওপর, আর আল্লাহ হলেন আরশের ওপর। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আল্লাহর আরশ আসমানের উপর এভাবে আছে। এ বলে তিনি তার আগুলসমূহে গম্বুজের মত করে ইশারা করেন। এতদসত্ত্বেও আসমান তাকে নিয়ে এমন চির-চির শব্দ করে, যেমন আরোহীর নীচে তার জীনপোষ-এর শব্দ হয়।) {আবূ দাউদ (৪৭২৬), উসমান বিন সাঈদ আদ-দারেমি, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (২৪), ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (৫৮৭), ইবনু খুজায়মাহ, আত-তাওহীদ (১৪৭)} অন্য বর্ণনায় এসেছে: (নিশ্চয় আল্লাহ হলেন তাঁর আরশের ওপর, আর তাঁর আরশ হলো তাঁর আসমানসমূহের ওপর।) {আবূ দাউদ (৪৭২৬), উসমান বিন সাঈদ আদ-দারেমি, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (২৪), ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (৫৮৮), ইবনু খুজায়মাহ, আত-তাওহীদ (১৪৭)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, আরশের নিচে আল্লাহর ধনভান্ডার রয়েছে, যার সঠিক পরিমাপ আল্লাহ ছাড়া কেউ করতে পারে না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আল্লাহর আরশের নিচের ধনভান্ডার থেকে সূরা বাকারার শেষের এই আয়াতগুলো আমাকে দেওয়া হয়েছে, তা আমার পূর্বের কোন নবীকে দেয়া হয়নি।) {মুসলিম (৫২২), মুসনাদ তায়ালিসী (৪১৮), মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ, (৩২৩০৬), আহমাদ (২৩২৫১), প্রমূখ, হাদীসের শব্দ মুসনাদে আহমাদের।}
আবু যার রাদিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন: আমার বন্ধু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে সাতটি বিষয়ের নির্দেশ দিয়েছেন, তন্মধ্যে: (তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যেন, لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ কথাটি বেশি বেশি পাঠ করি। কারণ, তা আরশের নিচের খাজানার অন্তর্ভুক্ত।) {মুসনাদে বাযযার (৩৯৬৬), মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ (৩৫৪৯১), হান্নাদ ইবনে সারী, আয-যুহদ (১০১৩), মুসনাদে আহমাদ (২১৪১৫), শব্দ তার থেকে গৃহীত, এবং তারই রচিত আয-যুহদ (৪০১)}
আমরা ঈমান রাখি যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন আরশের নিচে সাজদা করবেন, অবশেষে তিনি বড় শাফায়াত করবেন। শাফায়াতের দীর্ঘ হাদিসটিতে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (তখন আমি আরশের নিচে এসে আমার রবের সামনে সাজদায় লুটিয়ে পড়ব। তারপর আল্লাহ্ তাআলা তাঁর প্রশংসা ও গুণগানের এমন সুন্দর নিয়ম আমার সামনে খুলে দিবেন, যা এর পূর্বে অন্য কারও জন্য খোলেননি। এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! তোমার মাথা উঠাও। তুমি চাও, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ কবূল করা হবে। এরপর আমি আমার মাথা উঠিয়ে বলব, হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত।) {বুখারী (৪৭১২), মুসলিম (১৯৪), তিরমিযী (২৪৩৪), ইবনু মাজাহ (৩৩০৭)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, শহীদগণের রূহ আরশের ছায়ায় ঝুলানো ফানুসে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (উহুদ যুদ্ধের দিন যখন তোমাদের ভাইয়েরা শহীদ হয়, মহান আল্লাহ তাদের রূহগুলোকে সবুজ রঙের পাখির মধ্যে স্থাপন করলেন। তারা জান্নাতের ঝর্ণাসমূহের উপর দিয়ে যাতায়াত করে, সেখানকার ফলমূল খায় এবং আরশের ছায়ায় ঝুলানো সোনার ফানুসে বসবাস করে।...) {আবূ দাউদ (২৫২০), ইবনুল মুবারাক, আল-জিহাদ (৬২), মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বাহ (১৯৬৭৮), আহমাদ (২৩৮৮)}
ইবনুল মুবারাককে বলা হয়েছিল: আমরা আমাদের রবকে কিভাবে চিনবো? তিনি বললেন: (তিনি সাত আসমানের ওপরে আরশে তার মাখলুক থেকে পৃথক থাকবেন।) {আদ-দারেমি, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (পৃ.৪৭), বায়হাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩৩৬), ফাতোয়া হামাভিয়্যাহ আল-কুবরা (পৃ.৩৩৩), শারহুত তাহাভিয়্যাহ, প্রকাশক দারুস সালাম, (পৃ.২১৯)}
ইমাম দারেমী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: (আল্লাহ তাআলা তাঁর আসমানসমূহের ওপর আরশের উর্ধ্বে মাখলুক থেকে পৃথক রয়েছেন। যে ব্যক্তি এভাবে তার রবকে চিনল না, সে তার উপাস্য মাবুদকে চিনল না। আরশের ওপর থেকে তাঁর সর্বশেষ মাখলুক ও সর্বনিকটের মাখলুক সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান একই, কোন জিনিসই তাঁর থেকে দূরে নয়; (আসমানসমূহ ও জমিনে তাঁর অগোচরে নয় অণু পরিমাণ কিছু।) [সাবা: ৩] আল্লাহর সিফাত অস্বীকারকারীরা তাকে যেভাবে বিশেষিত করে তা থেকে তিনি অনেক অনেক পবিত্র ও উর্ধ্বে।) আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (পৃ.৪৭)
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, ফেরেশতাগণ আরশ বহন করে আছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (যারা আরশ ধারণ করে আছে এবং যারা এর চারপাশে আছে, তারা তাদের রবের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে প্ৰশংসার সাথে এবং তাঁর উপর ঈমান রাখে, আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, 'হে আমাদের রব! আপনি দয়া ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অবলম্বন করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন। আর জাহান্নামের শাস্তি হতে আপনি তাদের রক্ষা করুন।) [গাফের : ৭] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (আর ফেরেশতাগণ আসমানের প্রান্ত দেশে থাকবে এবং সেদিন আটজন ফেরেশতা আপনার রবের আরশকে বহন করবে তাদের উপরে।) [আল-হাক্কাহ: ১৭]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও আরশ বহনকারী ফেরেশতাদের কতক সিফাতের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি বলেন: (আরশ বহনকারী আল্লাহর ফেরেশতামন্ডলী হতে একজন ফেরেশতা সম্পর্কে বর্ণনা দিতে আমাকে অনুমতি দেয়া হয়েছে—তার কানের লতি থেকে ঘাড় পর্যন্ত- এর দূরত্ব হলো সাতশত বছরের রাস্তা।) {আবূ দাউদ (৪৭২৭), তাবরানী, আল-আওসাত (১৭০৯), আবুশ শায়খ, আল-আযামাহ (৪৭৬), ইবনু শাহীন, আল-ফাওয়ায়েদ (১৯)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, ফেরেশতাগণ রহমানের আরশকে ঘিরে রেখেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর আপনি ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তারা আরশের চারপাশ ঘিরে তাদের রবের সপ্ৰশংস পবিত্ৰতা ও মহিমা ঘোষণা করছে। আর তাদের মধ্যে বিচার করা হবে ন্যায়ের সাথে এবং বলা হবে, সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর প্রাপ্য।) [আয-যুমার: ৭৫]
আরশ এবং এই কিতাব যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নোক্ত বাণীতে উল্লেখিত হয়েছে: (আল্লাহ যখন সৃষ্টির কাজ শেষ করলেন, তখন তিনি তাঁর কিতাব যা আরশের উপর তাঁর নিকট আছে, তাতে লিখে রাখলেন: নিশ্চয়ই আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর প্রবল।) {বুখারী (৩১৯৪), মুসলিম (২৭৫১), তিরমিযী (৩৫৪৩), ইবনু মাজাহ (১৮৯, ৪২৯৫)} এই উভয়টিই সৃষ্টির মধ্যে সর্বোচ্চ মাখলুক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (...কাজেই যখন তোমরা আল্লাহর কাছে চাইবে, তখন ফিরদাউস জান্নাত চাইবে। কারণ, সেটি হচ্ছে সবচেয়ে প্রশস্ত ও সবচেয়ে উচুঁ জান্নাত এবং এর উপরই অবস্থিত পরম দয়াময়ের আরশ। আর সেখান থেকেই জান্নাতের ঝর্ণাগুলো প্রবাহিত।) সহীহ বুখারী (৭৪২৩)
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ আরশের ওপর উঠেছেন, যেভাবে উঠা তাঁর শানের সঙ্গে প্রযোজ্য সেভাবেই উঠেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন।) [আল-আরাফ : ৫৪] সুউচ্চে অধিষ্ঠিত মহান আল্লাহ আরো বলেন: (তিনি আসমানসমূহ, জমিন ও এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেন; তারপর তিনি আরশের উপর উঠলেন। তিনিই ‘রাহমান’, সুতরাং তাঁর সম্বন্ধে যে অবহিত তাকে জিজ্ঞেস করে দেখুন।) [আল-ফুরকান: ৫৯]
রাবিআ আল-রায়কে আল্লাহ তাআলার বাণী: {الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى} (দয়াময় (আল্লাহ্) আরশের উপর উঠেছেন) [ত্ব-হা: ৫] সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো: তিনি কিভাবে উঠেছেন? তখন তিনি বললেন: (এর ধরন জানা নেই, আর الاستواء তথা উঠার বিষয়টি বিবেক দ্বারা বোঝার বিষয় নয়, তবে আমার ও তোমার ওপর তাতে ইমান আনয়ন করা ওয়াজিব।) {বায়হাকি, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩০৬), শারহু উসূলী ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (৩/৫৮২)}
জনৈক ব্যক্তি মালিক বিন আনাস এর কাছে এসে বলেন, হে আবু আব্দুল্লাহ, {الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى} (দয়াময় (আল্লাহ্) আরশের উপর উঠেছেন): তিনি কিভাবে উঠেছেন? বর্ণনাকারী বলেন, তার কথায় মালিককে যতটুকু চিন্তিত হতে দেখলাম আর কোনো জিনিসের কারণে এতটুকু চিন্তিত হতে দেখিনি। তিনি প্রচুর ঘেমে গেলেন এবং মাথা নীচু করে নিলেন। আর আমরা অপেক্ষা করছিলাম যে, তিনি তার বিষয়ে কী নির্দেশ করেন। তিনি বলেন, অতঃপর মালিক চিন্তামুক্ত হলেন। আর বললেন: (ধরনটি বিবেক দ্বারা জানার মত নয়, আর الاستواء তথা উঠার বিষয়টি অজানা নয়, এর প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব এবং এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদআত। আর আমি আশঙ্কা করছি যে, তুমি গোমরাহ। অতঃপর তার ব্যাপারে নির্দেশ দিলেন এবং তাকে তার মজলিশ থেকে বের করে দেওয়া হলো।) {দারিমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (পৃ.৬৬), শারহু উসূলী ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (৩/৪৪১), হিলয়াতুল আউলিয়া ও তাবাকাতুল আসফিয়া (৬/৩২৫), বায়হাকি, আল-ইতিকাদ (পৃ.১১৬), আল-বগভী, শারহুস সুন্নাহ (১/১৭১), বায়হাকি, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩০৬)}
ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ الاستواء এর অর্থ সম্পর্কে বলতেন: (এটি হলো উচ্চতা ও ওপরে উঠা। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর আরশ সৃষ্টি করার পূর্ব থেকেই ওপরে ও উচ্চতায় ছিলেন। তিনি প্রত্যেক বস্তুর ওপরে ও প্রত্যেক বস্তু থেকে উচ্চতায়। আর আল্লাহ আরশকে খাস করেছেন তার ভেতর একটি বৈশিষ্ট্যের কারণে, যা অন্যান্য জিনিসের ভেতর নেই। আরশ হলো সবচেয়ে উত্তম ও ওপরের বস্তু। তাই আল্লাহ এভাবে নিজের প্রশংসা করেছেন যে, তিনি আরশের ওপরে উঠেছেন, অর্থাৎ এর উচ্চতায় উঠেছেন...। আব্দুর রহমান বিন মাহদি সূত্রে ইমাম মালিক থেকে বর্ণিত: (আল্লাহ তাআলা তার সম্মানীত আরশে উঠে আছেন যেমনটি তিনি সংবাদ দিয়েছেন। আর তার ইলম সব জায়গাতেই রয়েছে।) আবু বকর আল-খাল্লাল কর্তৃক বর্ণনাকৃত, আল-আকিদাহ (পৃ.১০৮)
মহান আরশের ওপর আল্লাহর কর্তৃত্ব প্রমাণ করে যে, কেবল তিনিই ইবাদতের উপযুক্ত, অন্য কেউ নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: (যদি এতদুভয়ের (আসমান ও জমিনের) মধ্যে আল্লাহ্ ব্যতীত আরো অনেক ইলাহ থাকত, তাহলে উভয়ই বিশৃংখল হত। অতএব, তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ্ কতই না পবিত্র।) [আল-আম্বিয়া: ২২] তিনি আরো বলেন: (বলুন, সাত আসমান ও মহা-আরশের রব কে?) [আল-মু‘মিনূন: ৮৬] মহা সম্মানিত আল্লাহ আরো বলেন: (বলুন, ‘যদি তাঁর সাথে আরও ইলাহ থাকতো যেমন তারা বলে, তবে তারা আরশ-অধিপতি পর্যন্ত পৌঁছার পথ তালাশ করত।) [আল-ইসরা: ৪২]
অধ্যায়: পানি সৃষ্টি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, মহান আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার পূর্বেই পানি সৃষ্টি করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (আল্লাহ ছিলেন তার পূর্বে কোনো জিনিস ছিল না, আর তার আরশ ছিল পানির ওপর, অতঃপর তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন।) {মুসলিম (২৭১৩), আবু দাউদ (৫০৫১), তিরমিযী (৩৪০০), ইবনু মাজাহ (৩৮৩১)} আর আল্লাহ তাআলা পানি থেকেই প্রত্যেক জীবিত বস্তু সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: (আর আমি প্রাণবান সব কিছু সৃষ্টি করলাম পানি থেকে।) [আল-আম্বিয়া: ৩০] আর আল্লাহ তাআলা পানিকে তাঁর রুবুবিয়্যাহ ও উলুহিয়্যার ওপর নিদর্শন করেছেন। তিনি বলেন: (যিনি জমিনকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আসমানকে করেছেন ছাদ এবং আকাশ হতে পানি অবতীর্ণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। কাজেই তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিও না।) [আল-বাকারাহ : ২২]
মহান আল্লাহ আরো বলেন: (আর জমিনে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন ভূখন্ড, আঙ্গুর বাগান, শস্যক্ষেত্র, একই মূল থেকে উদগত বা ভিন্ন ভিন্ন মূল থেকে উদগত খেজুর গাছ যেগুলো একই পানি দ্বারা সেচ করা হয়। আর স্বাদ-রূপের ক্ষেত্রে সেগুলোর কিছু সংখ্যককে আমি কিছু সংখ্যকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি। নিশ্চয় বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে নিদর্শন।) [আর-রাদ : ৪] আল্লাহ তাআলা আরো বলেন: (আর তিনিই দুই সাগরকে সমান্তরালে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট, সুপেয় এবং অন্যটি লোনা, খর; আর তিনি উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায় ও এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।* আর তিনিই মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি হতে; তারপর তিনি তাকে বংশগত ও বৈবাহিক সম্পর্কশীল করেছেন। আর আপনার রব হলেন প্রভূত ক্ষমতাবান।) [আল-ফুরকান: ৫৩, ৫৪] অতএব তিনিই পানির দ্বারা বিপরীতধর্মী দু’টি সমুদ্র তৈরি করেছেন এবং তাদের উভয়ের মাঝে করেছেন অন্তরায় ও অনতিক্রম্য আড়াল। তাই এরা একে অপরের ওপর সীমালঙ্ঘন করে না। তেমনিভাবে তিনি পানি দ্বারা মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের ভেতর করেছেন বংশ ধারা ও বৈবাহিক সম্পর্ক। কাজেই বরকতময় আল্লাহই সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টিকর্তা! আর এ ধরনের নিদর্শন অনেক রয়েছে।
অনুরূপভাবে আল্লাহ এটাকে পুনরুত্থানের ওপর দলিল সাব্যস্ত করেছেন। এ মর্মে তিনি বলেছেন: (আর তাঁর একটি নিদর্শন এই যে, আপনি ভূমিকে দেখতে পান শুষ্ক ও ঊষর, অতঃপর যখন আমি তাতে পানি বর্ষণ করি তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়। নিশ্চয় যিনি জমিনকে জীবিত করেন তিনি অবশ্যই মৃতদের জীবনদানকারী। নিশ্চয় তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।) [সূরা ফুসসিলাত : ৩৯]
আল্লাহ পানিকে তার বাহিনীসমূহ হতে একটি বাহিনী বানিয়েছেন। এর দ্বারা তিনি তাঁর অলীদেরকে সাহায্য করেন। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (স্মরণ কর, যখন তিনি তাঁর পক্ষ থেকে স্বস্তির জন্য তোমাদেরকে তন্দ্রায় আচ্ছন্ন করেন এবং আকাশ থেকে তোমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করেন যাতে এর মাধ্যমে তিনি তোমাদেরকে পবিত্র করেন, আর তোমাদের থেকে শয়তানের কুমন্ত্রণা দূর করেন, তোমাদের হৃদয়সমূহ দৃঢ় রাখেন এবং এর মাধ্যমে তোমাদের পা-সমূহ স্থির রাখেন।) [আল-আনফাল: ১১] আর এই পানি দ্বারা তিনি তার শত্রুদের লাঞ্ছিতও করেছেন। প্রশংসিত আল্লাহ বলেন: (তখন তিনি তাঁর রবকে আহবান করে বলেছিলেন, ‘নিশ্চয় আমি অসহায়, অতএব আপনি প্রতিবিধান করুন।’* ফলে আমি উন্মুক্ত করে দিলাম আকাশের দ্বারসমূহ প্রবল বর্ষণশীল বারিধারার মাধ্যমে,* এবং মাটি থেকে উৎসারিত করলাম ঝর্ণাসমূহ; ফলে সমস্ত পানি মিলিত হল এক পরিকল্পনা অনুসারে।) [আল-কামার: ১০-১২] এ ছাড়া আরো অনেক অবস্থা রয়েছে যেখানে আল্লাহ পানিকে তার অলীদের সাহায্য ও তার শত্রুদের লাঞ্ছনার বস্তু বানিয়েছেন।
অধ্যায়: কলম সৃষ্টি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ কলম সৃষ্টি করেছেন, যেই কলম তাকদীর লিপিবদ্ধ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (নিশ্চয় আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেছেন। তারপর তিনি তাকে বলেন, লিখ। সে বলল, হে আমার রব, কী লিখবো? তিনি বললেন, কিয়ামত অবধি প্রত্যেক জিনিসের তাকদীর লিখ।) {আবূ দাউদ (৪৭০০), তিরমিযী (২১৫৫,৩৩১৯), মুসনাদ তায়ালিসী (৫৭৮), আহমাদ (২২৭০৫, ২২৭০৭), ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (১১৫)}
আমরা এও বিশ্বাস করি যে, কলম একাধিক। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (অতঃপর আমাকে নিয়ে উর্ধ্বে আরোহণ করা হলো, আর আমি এতো উপরে উঠলাম যেখানে আমি কলমসমুহের আওয়াজ শুনতে পাই।) {বুখারী (৩৪৯), মুসলিম (১৬৩)}
ফেরেশতাগণ বান্দাদের কর্মসমূহ লিখেন এই সংবাদ কুরআনুল কারীম ও সুন্নাহতে অনেকবার উল্লেখ হয়েছে। যেমন আল্লাহর বাণীতে রয়েছে: (আর নিশ্চয় নিয়োজিত আছেন তোমাদের উপর সংরক্ষকদল;* সম্মানিত লেখকবৃন্দ;* তারা জানে তোমরা যা কর।) [আল-ইনফিত্বার: ১০-১২]
তিনি আরো বলেন: (যখন তার ডানে ও বামে বসা দু’জন ফেরেশতা পরস্পর (তার আমল লিখার জন্য) গ্ৰহণ করে;* “সে যে কথাই উচ্চারণ করে তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে।) [সূরা ক্বফ: ১৭-১৮]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (আর দুঃখ দৈন্য তাদেরকে স্পর্শ করার পর যখন আমি মানুষকে অনুগ্রহ আস্বাদন করাই তারা তখনই আমার আয়াতসমূহের বিরুদ্ধে অপকৌশল করে। বলুন, ‘আল্লাহ্ কৌশল অবলম্বনে আরো বেশি দ্রুততর।‘ নিশ্চয় তোমরা যে অপকৌশল কর তা আমার ফেরেশতারা লিখে রাখে।) [ইউনুস: ২১]
তিনি আরো বলেন: (নাকি তারা মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণা শুনতে পাই না? অবশ্যই হ্যাঁ। আর আমার ফেরেশতাগণ তাদের কাছে থেকে সবকিছু লিখছে।) [আয-যুখরূফ: ৮০]
“সহীহ” গ্রন্থে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (তোমাদের কেউ এমন নেই আর কোনো সৃষ্টিও এমন নেই জান্নাতে বা জাহান্নামে যার স্থান নির্দিষ্ট হয়নি। কিংবা তাকে ভাগ্যবান বা হতভাগা লেখা হয়নি।) {বুখারী (৪৯৪৮), মুসলিম (২৬৪৭), আবু দাউদ (৪৬৯৪), তিরমিযী (২১৩৬, ৩৩৪৪), ইবনু মাজাহ (৭৮)}
তিনি আরও বলেন: (তোমাদের মধ্যে কেউ যখন উত্তমরূপে ইসলামের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকে তখন সে যে আমলে সালেহ করে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে সাতশ গুণ পর্যন্ত (পুণ্য) লেখা হয়। আর সে যে পাপ কাজ করে তার প্রত্যেকটির বিনিময়ে তার জন্য ঠিক ততটুকুই পাপ লেখা হয়।) {বুখারী ৪২, ৭৫০১), মুসলিম (১২৮, ১২৯, ১৩০), তিরমিযী (৩০৭৩)}
অধ্যায়: কুরসীর সৃষ্টি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আরশের পরে কুরসীই হলো সবচেয়ে বড় মাখলুক (সৃষ্টি)। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বিশালতা বর্ণনা করে বলেন: (তাঁর কুরসী আসমানসমূহ ও জমিন বেষ্টন করে আছে।) [আল-বাকারাহ : ২৫৫]
আর কুরসী আরশের সামনে বিদ্যমান এবং তা হলো দুই পায়ের স্থান। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এই আয়াতের তাফসীরে বলেন: “কুরসী দুই পায়ের স্থান, আর আরশ- এর পরিমাণ নির্ধারণে কেউ সক্ষম নয়।” {ইমাম দারাকুতনী হাদিসটিকে ‘আস-সিফাত’ (৩৬) গ্রন্থে মারফু ও মাওকুফ উভয়সূত্রে বর্ণনা করেছেন। উসমান বিন সাঈদ আদ-দারিমী, আর-রাদ্দু আলা বিশর আল-মুরাইসী (৮৪, ৮৯), আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ (৫৮৬), ইবনু খুজাইমাহ, আত-তাওহীদ (১৫৪), আবুশ শায়খ, আল-আযামাহ (২১৬,২১৭)} রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (কুরসীতে বিদ্যমান সাত আসমান মরুভূমিতে পড়ে থাকা একটি আংটির চেয়ে বেশী কিছুই নয় এবং কুরসীর উপর আরশের শ্রেষ্ঠত্ব সেই আংটির ওপর মরুভূমির শ্রেষ্ঠত্বের মত।) {সহীহ ইবনে হিব্বান (৩৬১), আল-মাজরুহীন (৩/১৩০), আত-তাবরানী, মু’জাম আল-কাবীর (১৬৫১) এবং আল-মাকারিম (১), আজুররী, আল-আরবাউন (৪০), আবুশ শয়খ, আল-আযামাহ (২৫৯), আবু নুআইম, আল-হিলইয়াহ (১/১৮ এবং ১৬৬-১৬৮), বায়হাকি, আল-আসমা (পৃ.৫১০-৫১১) ও শুআবুল ঈমান (৪৩২৫ ও ৭৬৬৮), ইবনু আব্দুল বার, আত-তামহীদ (৯/১৯৯)। এটি অনেক বড় হাদীস। আমরা এখানে তার অংশমাত্র উল্লেখ করেছি। হাদীসটির অনেক সনদ রয়েছে, কিন্তু সেগুলো দুর্বল, সহীহ নয়। উকািইলী এসব সনদের কয়েকটি উল্লেখ করে তার দুর্বলতার দিকে ঈঙ্গিত করেছেন। ইবনু আদীও তা উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, (এই হাদীসটি ইবনু জুরাইজ আতা থেকে, তিনি উবাইদ বিন উমাইর থেকে, তিনি আবু যার থেকে বর্ণিত সনদে মুনকার। এই হাদীসের আর কোন সূত্র নেই আবু যার থেকে আবু ইদরীস খাওলানী ও কাসিম বিন মুহাম্মাদ-এর রেওয়ায়েত ব্যতীত। তৃতীয় সনদ ইবনু জুরাইজের রেওয়ায়েত, তবে এটি সবচেয়ে মুনকার।) কিন্তু হাদীসটি প্রসিদ্ধ, তিনি ছাড়া কেউ কুরসীর ব্যাপারে মারফু হিসেবে বর্ণনা করেননি। আর এই জন্যেই দুর্বল ও মুনকার হওয়া সত্ত্বেও হাদীসটি আমরা উল্লেখ করেছি।)
তেমনিভাবে ইমাম বায়হাকী আব্বাস বিন মুহাম্মাদ থেকে রেওয়ায়েত করেছেন, তিনি বলেন, আমি আবূ উবাইদকে বলতে শুনেছি: (এসব হাদীস, যেগুলোতে তিনি বলেছেন: ‘আমাদের রব তাঁর বান্দাদের হতাশা এবং তার দ্রুত পরিবর্তনের কারণে হেসেছেন’, এবং ‘যে পর্যন্ত না আপনার রব স্বীয় পা জাহান্নামে রাখবেন তা পূর্ণ হবে না।’ এবং ‘কুরসী হলো দুই পায়ের স্থান।’; আমাদের নিকট এই হাদীসগুলো বর্ণনার ক্ষেত্রে হক। কতক বর্ণনাকারী কতক বর্ণনাকারী থেকে গ্রহণ করেছেন, তবে তার তাফসীর (ব্যাখ্যা) সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে আমরা তার তাফসীর করব না এবং আমরা কাউকে তার ব্যাখ্যা করতে দেখিনি।) (ইমাম বায়হাকীর আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/১৯৮)
অধ্যায়: আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিন এবং উভয়ের মাঝে যা কিছু রয়েছে সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। তাকে কোনো ক্লান্তি ও বিরক্তি স্পর্শ করেনি। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (আর অবশ্যই আমি আসমানসমুহ, জমিন ও তাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আর আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।) [সূরা ক্বাফ: ৩৮] তিনি আরো বলেন: (যারা কুফরী করে তারা কি দেখে না যে, আসমানসমূহ ও জমিন মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে, তারপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম।) [আল-আম্বিয়া: ৩০] সুউচ্চে অধিষ্ঠিত মহান আল্লাহ আরো বলেন: (বলুন, তোমরা কি তাঁর সাথেই কুফরী করবে যিনি জমিন সৃষ্টি করেছেন দু'দিনে এবং তোমরা কি তাঁর জন্য সমকক্ষ নির্ধারণ করবে? তিনি সৃষ্টিকুলের রব!* আর তিনি স্থাপন করেছেন অটল পর্বতমালা ভূপৃষ্ঠে এবং তাতে দিয়েছেন বরকত এবং চার দিনের মধ্যে এতে খাদ্যের ব্যবস্থা করেছেন সমভাবে যাচনাকারীদের জন্য।* তারপর তিনি আসমানের প্রতি ইচ্ছে করলেন, যা (পূর্বে) ছিল ধোঁয়া। অতঃপর তিনি ওটাকে ও জমিনকে বললেন, 'তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।' তারা বলল, 'আমরা আসলাম অনুগত হয়ে।'* অত:পর তিনি সেগুলোকে দু’দিনে সাত আসমানে পরিণত করলেন এবং প্রত্যেক আসমানে তার নির্দেশ ওহীরূপে পাঠালেন। আমি নিকটবর্তী আসমানকে সুশোভিত করলাম প্ৰদীপমালা দ্বারা এবং করলাম সুরক্ষিত। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের ব্যবস্থাপনা।) [সূরা ফুসসিলাত : ৯-১২]
তিনি আরো বলেন: (তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিন, নাকি আসমান সৃষ্টি করা যা তিনিই নির্মাণ করেছেন?* তিনি এর ছাদকে সুউচ্চ করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন।* আর তিনি এর রাতকে করেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং প্ৰকাশ করেছেন এর সূর্যালোক;* আর জমিনকে এর পর বিস্তৃত করেছেন।* তিনি তা থেকে বের করেছেন তার পানি ও তৃণভূমি,* আর পর্বতকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করেছেন;* এসব তোমাদের ও তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুগুলোর ভোগের জন্য।) [সূরা আন-নাযিআত : ২৭-৩৩]
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ আসমানসমূহকে খুঁটি ছাড়াই উচ্চে উঠিয়েছেন। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (আল্লাহ্, যিনি আসমানসমূহ উপরে স্থাপন করেছেন খুঁটি ছাড়া, তোমরা তা দেখছ। তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন এবং সূর্য ও চাঁদকে নিয়মাধীন করেছেন; প্রত্যেকটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চলবে। তিনি সব বিষয় পরিচালনা করেন, আয়াতসমূহ বিশদভাবে বর্ণনা করেন, যাতে তোমরা তোমাদের রবের সঙ্গে সাক্ষাত সম্পর্কে নিশ্চিত বিশ্বাস করতে পার।) [আর-রাদ: ২] তিনি আরো বলেন: (তিনি আসমানসমূহ নির্মাণ করেছেন খুঁটি ছাড়া---তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ; তিনিই যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরনের জীব-জন্তু। আর আমি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করি, তারপর এতে উদ্গত করি সব ধরণের কল্যাণকর উদ্ভিদ।) [সূরা লুকমান : ১০]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা‘আলা আসমানসমূহ ও জমিনকে ধারণ করেন, যাতে এগুলো স্থানচ্যুত না হয়। মহান সত্ত্বা বলেন: (নিশ্চয় আল্লাহ্ আসমানসমূহ ও জমিনকে ধারণ করেন, যাতে তারা স্থানচ্যুত না হয়, আর যদি তারা স্থানচ্যুত হয়, তবে তিনি ছাড়া কেউ নেই যে, তাদেরকে ধরে রাখতে পারে। নিশ্চয় তিনি অতি সহনশীল, অসীম ক্ষমাপরায়ণ।) [সূরা ফাতির: ৪১]
আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে, পবিত্র সত্ত্বা আল্লাহই আসমানকে ধরে রাখেন যাতে তা জমিনে পড়ে না যায় তাঁর অনুমতি ছাড়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর তিনিই আসমানকে ধরে রাখেন যাতে তা পড়ে না যায় জমিনের উপর তাঁর অনুমতি ছাড়া।) [আল-হজ্জ :৬৫]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা‘আলা এসব মাখলুকাতের বিষয়গুলো পরিচালনা করেন, তা হিফাজত করেন এবং তা তাকে ক্লান্ত করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তাঁর ‘কুরসী’ আসমানসমূহ ও জমিনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ সুমহান।) [আল-বাকারাহ : ২৫৫]
আমরা ঈমান রাখি যে, আল্লাহ এসব বিশাল বিশাল সৃষ্টি তাঁর মহৎ হিকমতের জন্য সৃষ্টি করেছেন যা আয়ত্ব করা সম্ভব না। আর নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি ও গঠনকে সুদৃঢ় করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: (আর আপনি পর্বতমালা দেখছেন, মনে করছেন সেটা অচল, অথচ ওগুলো মেঘপুঞ্জের ন্যায় চলমান। এটা আল্লাহরই সৃষ্টি-নৈপুণ্য, যিনি সমস্ত কিছুকেই করেছেন সুষম। তোমরা যা কর নিশ্চয় তিনি সে সম্পর্কে সম্যক অবহিত।) [আন-নামাল : ৮৮] তিনি আরো বলেন: (আর আমরা আসমানসমূহ, জমিন ও এ দু’য়ের মধ্যকার কোনো কিছুই খেলার ছলে সৃষ্টি করিনি।) [সূরা আদ-দুখান : ৩৮] মহান আল্লাহ আরো বলেন: (আর জমিন, এটাকে আমি বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি; এবং আমি তাতে প্রত্যেক বস্তু উদগত করেছি সুপরিমিতভাবে।* আর আমি তাতে জীবিকার ব্যবস্থা করেছি তোমাদের জন্য এবং তোমরা যাদের রিযিকদাতা নও তাদের জন্যও।* আর আমার কাছেই আছে প্রত্যেক বস্তুর ভাণ্ডার এবং আমি তা পরিজ্ঞাত পরিমাণেই নাযিল করে থাকি।) [আল-হিজর : ১৯-২১]
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর আসমান ও জমিন সৃষ্টি দ্বারা তাঁর এমন রুবুবিয়্যাতের ওপর দলীল পেশ করেছেন যা তাঁর উলুহিয়্যাতকে আবশ্যক করে। এ মর্মে তিনি বলেন: (নাকি তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমানসমূহ ও জমিন এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্য বর্ষণ করেন বৃষ্টি, তারপর আমি তা দ্বারা মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করি, তার গাছ উদ্গত করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ্ আছে কি? বরং তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা (আল্লাহর) সমকক্ষ নির্ধারণ করে।) [আন-নামাল : ৬০] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, 'কে আসমানসমূহ ও জমিনকে সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন?' তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ্'। তাহলে কোথায় তাদের ফিরানো হচ্ছে !) [আল-আনকাবুত : ৬১] তিনি আরো বলেন: (আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞাস করেন, 'আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে কে ভূমিকে সঞ্জীবিত করেন তার মৃত্যুর পর?' তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ্'। বলুন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই'। কিন্তু তাদের অধিকাংশই এটা অনুধাবন করে না।) [আল-আনকাবুত : ৬৩]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ পৃথিবীকে পরীক্ষার স্থান নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর তিনিই আসমানসমূহ ও জমিনকে ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, আর তাঁর আরশ ছিল পানির উপর, তোমাদের মধ্যে কে আমলে শ্রেষ্ঠ তা পরীক্ষা করার জন্য।) [সূরা হুদ : ৭] তেমনিভাবে তিনি জমিনকে করেছেন অবস্থান স্থল, রিযকের স্থান ও ধারনকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আমি মাটি থেকে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তাতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দেব এবং তা থেকেই পুনর্বার তোমাদেরকে বের করব।) [সূরা ত্বহা : ৫৫] তিনি আরো বলেন: (আমি কি জমিনকে সৃষ্টি করিনি ধারণকারীরূপে,* জীবিত ও মৃতের জন্য?) [সূরা আল-মুরসালাত : ২৫-২৬]
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, বিশাল এই জগত বিশ্বপ্রভু আল্লাহর প্রশংসা ও গুণর্কীর্তন করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (সাত আসমান ও জমিন এবং এগুলোর অন্তর্বর্তী সব কিছু তাঁরই পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। আর এমন কিছু নেই যা তাঁর সপ্রশংস পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে না; কিন্তু তাঁদের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা তোমরা বুঝতে পার না; নিশ্চয় তিনি সহনশীল, ক্ষমাপরায়ণ।) [আল-ইসরা : ৪৪] এবং তাঁর বড়ত্বের সামনে নতিস্বীকার করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তারপর তিনি আসমানের প্রতি ইচ্ছে করলেন, যা (পূর্বে) ছিল ধোঁয়া। অতঃপর তিনি ওটাকে ও জমিনকে বললেন, 'তোমরা উভয়ে আস ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায়।' তারা বলল, 'আমরা আসলাম অনুগত হয়ে।') [সূরা ফুসসিলাত : ১১]
মহান আল্লাহর ওপর বান্দাদের বড়াই ও বড়ত্ব প্রকাশের কারণে এই জগত ভীত ও কম্পিত হয়। মহা সম্মানিত ও সুউচ্চ রাজত্বের অধিপতি বলেন: (যাতে আসমানসমূহ বিদীর্ণ হয়ে যাবার উপক্রম হয়, আর যমীন খণ্ড-বিখণ্ড এবং পর্বতমণ্ডলী চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে,* এ জন্য যে, তারা দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে।) [আল-মায়েদাহ : ৯০-৯১]
অধ্যায়: চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি।
আমরা ঈমান রাখি যে, আল্লাহ তা‘আলা চন্দ্র ও সূর্য সৃষ্টি করেছেন। মহাসত্য আল্লাহ বলেন: (আর আল্লাহই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চাঁদ; প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণ করে।) [আল-আম্বিয়া : ৩৩]
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, চাঁদ ও সূর্য উভয় চলাচল করে। যেমন আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতাআলা এ সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন: (আর সূর্য ভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে, এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নির্ধারণ।* আর চাঁদের জন্য নির্দিষ্ট করেছি বিভিন্ন মনযিল; অবশেষে সেটা শুষ্ক বাঁকা, পুরোনো খেজুর শাখার আকারে ফিরে যায়।* সূর্যের পক্ষে সম্ভব নয় চাঁদের নাগাল পাওয়া এবং রাতের পক্ষে সম্ভব নয় দিনকে অতিক্রমকারী হওয়া। আর প্রত্যেকে নিজ নিজ কক্ষপথে সাঁতার কাটে।) [ইয়াসিন : ৩৮-৪০] অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়!
বান্দাদের প্রতি তাঁর রহমতের নিদর্শন হচ্ছে যে, তিনি এই দু’টোকেই তাঁরই নির্দেশে অনুগত করে দিয়েছেন, যেন বান্দাদের উপকারসমূহ সাধিত ও বাস্তবায়িত হয়। মহান আল্লাহ বলেন: (আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চাঁদকে, যারা অবিরাম একই নিয়মের অনুবর্তী। আর তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত ও দিনকে।) [সূরা ইবরাহীম : ৩৩] তিনি আরো বলেন: (আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত।) [আল-আরাফ : ৫৪]
নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা চাঁদ ও সূর্যকে অনেক বড় হিকমতের জন্য সৃষ্টি করেছেন যা আয়ত্ব করা সম্ভব নয়। সেসব হিকমতের একটি আল্লাহর নিম্নের বাণীতে উল্লেখ হয়েছে: (তিনি প্রভাত উদ্ভাসক। আর তিনি রাতকে প্রশান্তি এবং সূর্য ও চাঁদকে সময় নিরুপক করেছেন; এটা পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী আল্লাহর নির্ধারণ।) [আল-আনআম : ৯৬] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, “আর সূর্য ও চাঁদকে সময়ের নিরুপক করেছেন”; এর অর্থ হলো দিন, মাস ও বছর গণনার জন্য।” {তাফসীর তাবারী (১১/৫৫৮)} আল্লাহ তা‘আলা চাঁদ ও সূর্য সৃষ্টির আরো কিছু হিকমত বর্ণনা করে বলেন: (তিনি সূর্যকে দীপ্তিময় ও চাঁদকে আলোকময় করেছেন এবং তার জন্য মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার। আল্লাহ্ এগুলোকে যথাযথ ভাবেই সৃষ্টি করেছেন। তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা জানে।) [সূরা ইউনুস : ৫]
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা‘আলা এই দু’টোকে তাঁর উলূহিয়্যাত আবশ্যকারী রুবুবিয়্যাহর ওপর মহান নিদর্শন সাব্যস্ত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, 'কে আসমানসমূহ ও জমিনকে সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন?' তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ্'। তাহলে কোথায় তাদের ফিরানো হচ্ছে !) [আল-আনকাবুত : ৬১] আল্লাহ সুবহানাহু আরো বলেন: (আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে রাত ও দিন, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজ্দা করো না, চন্দ্রকেও নয়; আর সিজ্দা কর আল্লাহ্কে, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদত কর।) [ফুসসিলাত: ৩৭] সহীহ গ্রন্থে এসছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (সূর্য ও চন্দ্র আল্লাহর নিদর্শনসমূহের মধ্যে দু’টি নিদর্শন। কারো মৃত্যু বা কারো হায়াতের কারণে এ দু’টির গ্রহণ হয় না। তবে এ দিয়ে আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর বান্দাদের সতর্ক করেন।) {বুখারী (১০৪৮), নাসায়ী (১৪৫৯)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, চাঁদ ও সূর্য উভয় বিশ্বপ্রভু আল্লাহর সিজদা করে, যেমন অন্যান্য মাখলুক সিজদা করে। আল্লাহ তাআলা বলেন: (আপনি কি দেখেন না যে, আল্লাহকে সিজদা করে যারা আছে আসমানসমূহে ও যারা আছে জমিনে, আর সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্রমণ্ডলী, পর্বতরাজি, বৃক্ষলতা, জীবজন্তু এবং সিজদা করে মানুষের মধ্যে অনেকে? আবার অনেকের প্রতি অবধারিত হয়েছে শাস্তি। আল্লাহ্ যাকে হেয় করেন তার সম্মানদাতা কেউই নেই; নিশ্চয় আল্লাহ্ যা ইচ্ছে তা করেন।) [আল-হাজ্জ : ১৮]
আমরা বিশ্বাস করি যে, সূর্য প্রতিদিন আরশের নিচে সিজদা করে। যেমনটি সত্যবাদী ও সত্যায়িত নবী এ সম্পর্কে যেমন সংবাদ দিয়েছেন। আবূ যার রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূর্য অস্ত যাবার সময় আবূ যার-কে বললেন: (তুমি কি জান, সূর্য কোথায় যায়? আমি বললাম, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, তা যেতে যেতে আরশের নীচে গিয়ে সিজদায় পড়ে যায়। অতঃপর সে আবার উদিত হবার অনুমতি চায় এবং তাকে অনুমতি দেয়া হয়। আর শীঘ্রই এমন সময় আসবে যে, সিজ্দা করবে কিন্তু তা কবূল করা হবে না এবং সে অনুমতি চাইবে কিন্তু তাকে অনুমতি দেয়া হবে না। তাকে বলা হবে, যে পথ দিয়ে আসলে ঐ পথেই ফিরে যাও। তখন সে পশ্চিম দিক হতে উদিত হবে— এটাই মহান আল্লাহর এ বাণীর মর্ম: ’’আর সূর্য নিজ গন্তব্যে (অথবা) কক্ষ পথে চলতে থাকে। এটা পরাক্রমশালী, সর্বজ্ঞের নিয়ন্ত্রণ।’’ [ইয়াসিন: ৩৮]) {বুখারী (৩১৯৯), মুসলিম (১৫৯), আবূ দাউদ (৪০০২), তিরমিযী (২১৮৬, ৩২২৭)}
অধ্যায়: নক্ষত্ররাজির সৃষ্টি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, মহৎ হিকমতের জন্য আল্লাহ নক্ষত্ররাজি ও তারকাসমূহ সৃষ্টি করেছেন। যার মধ্যে একটি তিনি নিচের বাণীতে উল্লেখ করেছেন: (এবং পথ নির্দেশক চিহ্নসমূহও। আর তারা নক্ষত্রের সাহায্যেও পথনির্দেশ পায়।) [আন-নাহল : ১৬] কাতাদাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “العلامات (পথ নির্দেশক চিহ্নসমূহ) হলো নক্ষত্ররাজি। আল্লাহ তা‘আলা এসব নক্ষত্ররাজি তিন কারণে সৃষ্টি করেছেন: এগুলোকে তিনি আসমানের জন্য সৌন্দর্য বানিয়েছেন, এগুলোকে এমন বানিয়েছেন যেন তা দ্বারা পথ চেনা যায় এবং এগুলোকে বানিয়েছেন শয়তানদের প্রতি নিক্ষেপের বস্তু । অতএব যে এ ছাড়া অন্য কোনো জ্ঞানের আদান-প্রদান করলো সে তার সঠিক মতটি খোয়ালো, বঞ্চিত হলো, নিজের কপাল নষ্ট করল এবং যেই বিষয়ে জ্ঞান নেই সেটাতে হস্তক্ষেপ করল। (তাফসীর তাবারী: (১৭/১৮৫))
আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মাগরিবের সালাত আদায় করলাম। তারপর আমরা বললাম, আমরা যদি তার সাথে ইশার সালাত আদায় করা পর্যন্ত উপবিষ্ট হতে পারতাম (তাহলে কতই না ভাল হত)। রাবী বলেন, আমরা বসে থাকলাম। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আসলেন। তারপর তিনি বললেন: তোমরা এখনো পর্যন্ত এখানে উপবিষ্ট আছ? আমরা বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা আপনার সাথে মাগরিবের সালাত আদায় করেছি। তারপর আমরা বললাম যে, ইশার সালাত আপনার সাথে আদায় করার জন্যে বসে অপেক্ষা করছি। তিনি বললেন: তোমরা অনেক ভাল করেছ, কিংবা তোমরা ঠিকই করেছ। তিনি (রাবী) বলেন, তারপর তিনি আকাশের দিকে মাথা তুললেন এবং তিনি অধিকাংশ সময়ই আকাশের পানে তার মাথা তুলতেন। অতঃপর তিনি বললেন, (তারকারাজি অবস্থানের কারণেই আকাশ স্থিতিশীল রয়েছে। তারকারাজি যখন বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়বে তখন আকাশের জন্য ওয়াদাকৃত বিপদ আসন্ন হবে। আর আমি আমার সাহাবাদের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা স্বরূপ। আমি যখন বিদায় নিব তখন আমার সাহাবাদের উপর ওয়াদাকৃত সময় এসে উপস্থিত হয়ে যাবে (অর্থাৎ- ফিতনা-ফাসাদ ও দ্বন্দ্ব-সংঘাত লেগে যাবে)। আর আমার সাহাবাগণ সকল উম্মতের জন্য রক্ষাকবচ স্বরূপ। আমার সাহাবীগণ যখন বিদায় হয়ে যাবে তখন আমার উম্মাতের উপর ওয়াদাকৃত বিষয় উপস্থিত হবে।) সহীহ মুসলিম: (২৫৩১)
মহান আল্লাহ বলেন: (আর অবশ্যই আমি নিকটবর্তী আসমানকে সুশোভিত করেছি প্রদীপমালা দ্বারা এবং সেগুলোকে করেছি শয়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।) [আল-মুলক : ৫]
আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণের মধ্যে জনৈক আনসার ব্যক্তি আমাকে সংবাদ দিয়েছে যে, তারা এক রাত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে বসা ছিলেন। সে সময় একটি নক্ষত্র পতিত হলো, যার দরুন আলোকিত হয়ে উঠল। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের বললেন, এ ধরনের (তারকা) পতিত হলে জাহেলী যুগে তোমরা কি বলতে? তারা বলল, আল্লাহ এবং তাঁর রসূলই অধিক ভাল জানেন। আমরা বলতাম, আজ রাতে কোনো মহান লোকের ভূমিষ্ঠ হয়েছে অথবা কোনো মহান লোক মৃত্যুবরণ করেছেন।তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: (জেনে রাখো যে, তা কারো মৃত্যু কিংবা কারো জন্মের কারণে পতিত হয় না; কল্যাণময় ও মহান নামের অধিকারী আমাদের প্রতিপালক যখন কোনো বিষয়ের সমাধান দেন, তখন আরশ বহনকারী ফেরেশতারা তাসবীহ পাঠ করে। অতঃপর তাসবীহ পাঠ করে সে আকাশের ফেরেশতারা, যারা তাদের পার্শ্ববর্তী। পরিশেষে তাসবীহ পাঠ এ নিকটবর্তী (পৃথিবীর) আসমানের অধিবাসীদের পর্যন্ত পৌছে। অতঃপর আরশ বহনকারীদের পার্শ্ববর্তী যারা তারা আরশ বহনকারীদের বলে তোমাদের রব কি বললেন? সে সময় তিনি তাদের যা কিছু বলেছেন, তারা সে সংবাদ বর্ণনা করে। বর্ণনাকারী বলেন, পরে আসমানসমূহের অধিবাসীরা একে অপরকে সংবাদ আদান-প্রদান করে। পরিশেষে এ নিকটবর্তী আকাশে সংবাদ পৌছে। সে সময় জিনেরা অতর্কিত গোপন খবরটি শুনে নেয় এবং তাদের দোসর জ্যোতিষীদের নিকট পৌঁছিয়ে দেয়, আর তার সাথে অতিরিক্ত কিছু জুড়ে দেয়। ফলে যা তারা ঠিকঠাকভাবে নিয়ে আসতে পারে, তাই ঠিক হয়; তবে তারা তাতে (কথামালা) সুবিন্যস্ত ও সংযোজন করে।) সহীহ মুসলিম: (২২২৯)
শয়তানরা (আসমানের) কথা চুরি করে শুনতো, যখন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করা হলো তখন তাদেরকে তাদের বসার স্থান থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হলো। সম্মানিত মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন: (এও যে, আমরা আগে আকাশের বিভিন্ন ঘাঁটিতে সংবাদ শুনার জন্য বসতাম, কিন্তু এখন কেউ সংবাদ শুনতে চাইলে সে তার উপর নিক্ষেপের জন্য প্রস্তুত জলন্ত উল্কাপিণ্ডের সম্মুখীন হয়।) [আল-জিন : ৯] তিনি আরো বলেন: (নিশ্চয় আমি কাছের আসমানকে নক্ষত্ররাজির সুষমা দ্বারা সুশোভিত করেছি।* এবং রক্ষা করেছি প্রত্যেক বিদ্রোহী শয়তান থেকে।* ফলে ওরা ঊর্ধ্ব জগতের কিছু শুনতে পারে না। আর তাদের প্রতি নিক্ষিপ্ত হয় সব দিক থেকে---* বিতাড়নের জন্য এবং তাদের জন্য আছে অবিরাম শাস্তি।* তবে কেউ হঠাৎ কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিণ্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।) [আস-সাফফাত : ৬-১০]
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, উর্ধ্ব জগতে জিনেরা যাতায়াত করত আকাশের সংবাদ সংগ্রহের জন্য। একটি কথা শুনতে পেলে তার সঙ্গে তারা নিজেদের পক্ষ হতে আরো নয়টি কথা সংযুক্ত করত। যার কারণে সেই একটি কথা সত্য হত এবং বাকি নয়টি কথা হত মিথ্যা। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াতপ্রাপ্ত হলে উর্ধ্ব জগতে তাদের উপবেশনে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়। সুতরাং (জিনেরা) এ ব্যাপারটি তারা ইবলিসকে অবহিত করে। আর ইতোপূর্বে কখনো তাদের প্রতি উল্কাপিণ্ড নিক্ষিপ্ত হয়নি। ইবলিস তাদেরকে বলল, পৃথিবীতে অবশ্যই নতুন কিছু ঘটেছে, যার কারণে এই প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং ইবলিস তার দলকে প্রেরণ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তারা দু’টি পাহাড়ের মাঝামাঝিতে সালাত আদায় করতে দেখে। (রাবী বলেন,) আমার ধারণা তা মক্কায় ছিল। তারপর তারা ইবলীসের সঙ্গে দেখা করে তাকে ব্যাপারটি জানায়। সে বলল, সেই নতুন ঘটনা এটাই যা দুনিয়াতে ঘটেছে।) {তিরমিযী (৩৩২৪), আহমাদ (২৪৮২), নাসায়ী, সুনানুল কুবরা (১১৫৬২), মুসনাদে আবূ ইয়ালা (২৫০২)}
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, তারকারাজি ও নক্ষত্রসমূহ কোনো উপকার ও ক্ষতি করতে পারে না এবং আসমান ও জমিনের ঘটনাবলীতে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। আর যে বিশ্বাস করল যে, তা নিজে নিজে প্রভাব বিস্তারকারী সে কুফরী করল অথবা শিরক করল। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় লোকদের উপর বৃষ্টি হলে তিনি বললেন, কতক লোক কৃতজ্ঞ হয়ে সকালে উপনীত হয়েছে এবং তাদের কতক আবার অকৃতজ্ঞ হয়েছে। তাদের কিছু সংখ্যক বলে এটা (বৃষ্টি) আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ ও রহমতে বর্ষিত হয়েছে। আর তাদের কতক লোক বলে, অমুক অমুক নক্ষত্ৰ সত্যে প্রমাণিত হলো। বর্ণনাকারী বলেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে নাযিল হয়েছে: {فَلاَ أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُوم} “সুতরাং আমি কসম করছি নক্ষত্ররাজির অস্তাচলের” ... এখান থেকে {وَتَجْعَلُونَ رِزْقَكُمْ أَنَّكُمْ تُكَذِّبُون} “আর তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের রিযিক করে নিয়েছো!” [আল-ওয়াকিয়াহ: ৭৫-৮২] এ পর্যন্ত।) মুসলিম: (৭৩)
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (আমি আমার উম্মতের শেষ জমানায় তাদের ওপর সবচেয়ে বেশী যা ভয় করি তা হলো নক্ষত্রে বিশ্বাস, তাকদীরে অবিশ্বাস ও শয়তানের কর্তৃত্ব।) {মুসনাদে রুয়ানি (১২৪৫), তাবরানী, মু’জাম আল-কাবীর (৮১১৩)}
আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নক্ষত্ররাজির জ্ঞান অন্বেষণ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: (যে ব্যক্তি জ্যোতিষবিদ্যার কিছু শিক্ষা করলো, সে যেন যাদুবিদ্যার একটা শাখা আয়ত্ত করলো। জ্যোতিষবিদ্যা যত বাড়বে যাদু বিদ্যাও তত বাড়বে।) {আবূ দাউদ (৩৯০৫), ইবনু মাজাহ (৩৭২৬), মুসান্নাফ ইবনু আবি শায়বাহ (২৬১৫৯), আহমাদ (২০০০), আব্দ ইবনু হুমাইদ (৭১৪)}
অতএব নক্ষত্ররাজির যতটুকু ইলম দ্বারা স্থল ও জলপথে রাস্তা চেনা যায় তার সম্পর্কে তার চেয়ে বেশী ইলম হাসিল করা বৈধ নয়। কারণ, তা শিক্ষা করা জ্যোতিষবিদ্যার দিকে ধাবিত করে। সাঈদ বিন জুবায়ের থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একজন ব্যক্তি আব্দুল্লাহ বিন আব্বাসের নিকট আসলেন আর বললেন, হে আবূ আব্বাস, আমাকে ওসিয়ত করুন। তিনি বললেন, আমি তোমাকে আল্লাহর তাকওয়ার ওসিয়ত করছি। আর খবরদার, তুমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীদের আলোচনার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করবে। কারণ, তাদের কী শ্রেষ্টত্ব অতীত হয়ে গিয়েছে তুমি তা জান না। আর অবশ্যই তুমি জ্যোতিষী কর্ম থেকে বিরত থাকবে, তবে যতটুকু দ্বারা জলে ও স্থলে পথ চেনা যায় তা ছাড়া। কারণ, তা গণকবিদ্যার দিকে ধাবিত করে। আর খবরদার, তাকদীর অস্বীকারকারীদের সঙ্গ থেকে দূরে থাকবে। আর যে পছন্দ করে যে, তার দোয়া কবুল করা হোক, তার আমল পরিশুদ্ধ হোক এবং তা কবুল হোক, সে যেন তার কথাকে সত্য রাখে, আমানত আদায় করে এবং মুসলিমদের জন্য নিজ অন্তরকে পরিচ্ছন্ন রাখে।” {ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (১৯৮৭)}
অধ্যায়: ফেরেশতামন্ডলীর সৃষ্টি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ ফেরেশাতাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। সহীহ গ্রন্থে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (ফেরেশাতাদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে আর জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে ধুয়া বিহিন অগ্নিশিখা হতে এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ঐ বস্তু হতে যে সম্পর্কে তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে।) মুসলিম: (২৯৯৬)
আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশাতাদেরকে বিভিন্ন ধরণে সৃষ্টি করেছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন: (সকল প্রশংসা আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহরই, যিনি দূত মনোনীত করেন ফেরেশতামন্ডলীকে, যারা দুই দুই, তিন তিন অথবা চার চার পক্ষবিশিষ্ট। তিনি সৃষ্টিতে যা ইচ্ছে বৃদ্ধি করেন। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।) [ফাতির : ১]
আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি জিবরীলকে দেখেছেন, আর তাঁর ছয়শত পাখা ছিল। তিনি অত্যন্ত বিশাল আকৃতির: আবূ ইসহাক শায়বানী থেকে বর্ণিতি, তিনি বলেন, আমি যির বিন হুবাইশকে মহান আল্লাহর এ বাণী সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম: {فَكَانَ قَابَ قَوْسَيْنِ أَوْ أَدْنَى * فَأَوْحَى إِلَى عَبْدِهِ مَا أَوْحَى} ‘‘অবশেষে তাদের মধ্যে দুই ধনুকের দূরত্ব রইল অথবা আরও কম। তখন আল্লাহ স্বীয় বান্দার প্রতি যা ওহী করার ছিল, তা ওহী করলেন’’- (আন্-নাজম ৯-১০)। তিনি বললেন, ইবনু মাসঊদ আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন যে, “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিব্রাঈল-কে দেখেছেন যে, তার ছয়শ’টি ডানা ছিল।” {বুখারী: (৩২৩২), মুসলিম (১৭৪), তিরমিযী (৩২৭৭)} ‘আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে ব্যক্তি মনে করবে যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রবকে দেখেছেন, সে ব্যক্তি মহা ভুল করবে। বরং তিনি জিব্রাঈলকে তার আসল আকার ও চেহারায় দেখেছেন। তিনি আকাশের দিকচক্রবাল জুড়ে অবস্থান করছিলেন।” {বুখারী: (৩২৩৪), মুসলিম (১৭৭), তিরমিযী (৩০৬৮)}
আর আমরা ‘ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান পর্বে’ ফেরেশতাদের সম্পর্কে আরো বিস্তারিত আলোচনা পেশ করবো ইনশাআল্লাহ। এখানে শুধু তাদের সৃষ্টির বিষয় নিয়েই আলোচনা শেষ করছি।
অধ্যায়: জিন ও শয়তানদের সৃষ্টি সম্পর্কে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ জিনদের সৃষ্টি করেছেন ধুয়া বিহীন অগ্নিশিখা থেকে। মহান আল্লাহ বলেন: (আর এর আগে আমি সৃষ্টি করেছি জিনদেরকে অতি উষ্ণ নির্ধুম আগুন থেকে।) [আল-হিজর : ২৭] তিনি আরও বলেন: (এবং জিনকে সৃষ্টি করেছেন নির্ধূম আগুনের শিখা থেকে।) [আর-রাহমান : ১৫] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (ফেরেশতাদেরকে নূর দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে আর জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে নির্ধুম অগ্নিশিখা হতে এবং আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে ঐ বস্তু হতে যে সম্পর্কে তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে।) মুসলিম: (২৯৯৬)
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা‘আলা জিন ও মানুষকে একমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।) [আয-যারিয়াত: ৫৬] আর জিনদের ভেতর সতর্ককারী রয়েছে, কিন্তু তাদের মাঝে রাসূল নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর স্মরণ করুন, যখন আমি আপনার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম জিনদের একটি দলকে, যারা মনোযোগসহকারে কুরআন পাঠ শুনছিল। অতঃপর যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হল, তারা বলল, ‘চুপ করে শুন।’ অতঃপর যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হল তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে।) [আল-আহকাফ: ২৯] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত: “আদম সন্তানদের থেকে রাসূল হন আর জিনদের থেকে সতর্ককারী হন।” তাফসীর ইবনে কাসীর: (৩/৩৪০)
আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী, {يَا مَعْشَرَ الْجِنِّ وَالإِنسِ أَلَمْ يَأْتِكُمْ رُسُلٌ مِّنكُمْ يَقُصُّونَ عَلَيْكُمْ آيَاتِي} “হে জিন ও মানুষের দল! তোমাদের মধ্য থেকে কি রাসূলগণ তোমাদের কাছে আসেনি যারা আমার নিদর্শন তোমাদের কাছে বিবৃত করত? এখানে উদ্দেশ্য হলো: মোটের ওপর তোমাদের থেকে, তোমাদের সবার থেকে নয়। এটি আল্লাহ তা‘আলার বাণী: {وَجَعَلَ الْقَمَرَ فِيهِنَّ نُورًا} (আর সেখানে চাঁদকে স্থাপন করেছেন আলোকরূপে: [নূহ : ১৬])এর মত।অনুরূপভাবে তাঁর অপর বাণী {فَكَذَّبُوهُ فَعَقَرُوهَا (কিন্তু তারা তার প্রতি মিথ্যারোপ করল এবং উষ্ট্রীকে জবাই করল। [আশ-শামস: ১৪]) এর মত। অথচ তাদের থেকে একজন মাত্র জবাই করেছে।
আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে, আদমের সৃষ্টির পূর্বে জিনদের সৃষ্টি করা হয়েছে। আর এ জন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: (আর এর আগে আমি সৃষ্টি করেছি জিনদেরকে অতি উষ্ণ নির্ধুম আগুন থেকে।) [আল-হিজর : ২৭] শয়তানদের সর্দার হলো ইবলিস—আল্লাহ তার থেকে আমাদেরকে নিরাপদ রাখুন—আল্লাহ তাকেও আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন, যেমন সকল জিন ও শয়তানকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা ইবলিস সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, সে বলেছে: {أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِين} ('আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদা থেকে৷') [আল-আরাফ: ১২] ইবলিস জিনদের দলভুক্ত ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর স্মরণ করুন, আমি যখন ফেরেশতাদেরকে বলেছিলাম, ‘আদমের প্রতি সিজদা কর’, তখন তারা সবাই সিজদা করল ইবলিস ছাড়া; সে ছিল জিনদের একজন, সে তার রবের আদেশ অমান্য করল।) [আল-কাহাফ : ৫০]
ইবলিসই আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালামকে প্ররোচিত করে অবশেষে জান্নাত থেকে বের করে এনেছে। সে তাদেরকে ফুঁসলিয়ে ছিল এবং শপথ করেছিল যে, সে তাদের জন্য সত্যিকার মঙ্গলকামী। ফলে সে তাদের বিভ্রান্ত করে, অবশেষে তারা গাছের ফল ভক্ষণ করে। মহাসত্য আল্লাহ বলেন: (আর হে আদম! আপনি ও আপনার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করুন, অতঃপর যেথা হতে ইচ্ছা খান, কিন্তু এ গাছের ধারেকাছেও যাবেন না, তাহলে আপনারা যালেমদের অন্তর্ভূক্ত হবেন।* তারপর তাদের লজ্জাস্থান, যা তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল তা তাদের কাছে প্রকাশ করার জন্য শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, ‘তোমাদের রব তোমাদেরকে কেবল এ জন্য এ গাছ থেকে নিষেধ করেছেন যে, (খেলে) তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা তোমরা চিরস্থায়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’।* আর সে তাদের উভয়ের কাছে শপথ করে বলল , ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের শুভাকাংখীদের একজন।'* অতঃপর সে তাদেরকে প্রবঞ্চনার দ্বারা অধঃপতিত করল। এরপর যখন তারা সে গাছের ফল খেল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগল। তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললেন, “আমি কি তোমাদেরকে এ গাছ থেকে নিষেধ করিনি এবং আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, নিশ্চয় শয়তান তোমাদের উভয়ের প্রকাশ্য শত্রু ?’* তারা বলল, ‘হে আমাদের রব ! আমারা নিজেদের প্রতি যুলুম করছি। আর যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’) [আল-আ’রাফ : ১৯-২৩]
আমরা বিশ্বাস করি যে, শয়তান সিজদা করতে অস্বীকার করেছে, ফলে আল্লাহ তার ওপর রাগান্বিত হয়েছেন, তাকে লা‘নত করেছেন এবং তাকে স্থায়ী জান্নাত থেকে বিতাড়িত করেছেন। সে আল্লাহর নিকট কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ চেয়েছে, ফলে আল্লাহ তাকে সেই অবকাশ দিয়েছেন। আর সে আল্লাহর ইজ্জতের কসম করে বলেছে যে, সে সকল আদম সন্তানকে ফিতনায় নিক্ষেপ করবে একমাত্র আল্লাহর মুখলিস বান্দাদের ছাড়া। আল্লাহ তাআলা তার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন: (স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদেরকে বলেছিলেন, 'আমি মানুষ সৃষ্টি করছি কাদা থেকে,* অতঃপর যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার পক্ষ থেকে রূহ সঞ্চার করব তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো,* অতঃপর ফেরেশতাগণ সবাই একত্রে সিজদা করল,* ইবলিস ছাড়া, সে অহংকার করল এবং কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত হল।* তিনি বললেন, 'হে ইবলিস! আমি যাকে আমার দু'হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সিজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন?'* (সে বলল, 'আমি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ। আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে সৃষ্টি করেছেন কাদামাটি থেকে৷'* তিনি বললেন, তবে তুমি এখান থেকে বের হয়ে যাও, কারণ নিশ্চয় তুমি বিতাড়িত;* ‘আর নিশ্চয় তোমার উপর আমার লা'নত থাকবে, কর্মফল দিন পর্যন্ত।’* সে বলল, হে আমার রব! যেদিন তাদের পুনরুত্থান করা হবে সেদিন পর্যন্ত আমাকে অবকাশ দিন।* তিনি বললেন, নিশ্চয় তুমি অবকাশপ্রাপ্তদের একজন,* সুনির্দিষ্ট সময় আসার দিন পর্যন্ত।* সে বলল, 'আপনার ক্ষমতা-সম্মানের শপথ! অবশ্যই আমি তাদের সবাইকে পথভ্রষ্ট করব,* তবে তাদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাগণ ছাড়া।) [সূরা সোয়াদ : ৭১-৮৩] আর শয়তান বলেছে, যেমনটি আল্লাহ আমাদেরকে তার সম্পর্কে জানিয়েছেন: (‘আপনি যেহেতু আমাকে পথভ্রষ্ট করলেন, সে কারণে অবশ্যই অবশ্যই আমি আপনার সরল পথে মানুষের জন্য বসে থাকব।’* ‘তারপর অবশ্যই আমি তাদের কাছে আসব তাদের সামনে থেকে ও তাদের পিছন থেকে, তাদের ডানদিক থেকে ও তাদের বাম দিক থেকে এবং আপনি তাদের অধিকাংশকে কৃতজ্ঞ পাবেন না।’) [আল-আরাফ : ১৬-১৭]
জিনদের জন্যও শরীয়ত প্রযোজ্য এবং তারাও এর বিধান পালনে দায়বদ্ধ। রাসূলগণ ও সতর্ককারীগণের মাধ্যমে ওহী শুনতে ও বুঝতে তারা সক্ষম। এ জন্যই তারা যখন ওহী শুনেছিলো তখন বলেছিলো -তাদের সম্পর্কে যেমনটি আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন-: (আর স্মরণ করুন, যখন আমি আপনার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম জিনদের একটি দলকে, যারা মনোযোগসহকারে কুরআন পাঠ শুনছিল। অতঃপর যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হল, তারা বলল, ‘চুপ করে শুন।’ অতঃপর যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হল তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে।* তারা বলেছিল, ‘হে আমাদের সম্প্রদায়! নিশ্চয় আমরা এমন এক কিতাবের পাঠ শুনেছি যা নাযিল হয়েছে মূসার পরে, এটা তার সম্মুখস্থ কিতাবকে সত্যায়ন করে এবং সত্য ও সরল পথের দিকে হেদায়াত করে।) [আল-আহকাফ : ২৯-৩০]
আমরা জানি যে, জিনদের ভেতর অনেক সৎকর্মশীল রয়েছেন, আবার তাদের ভেতর অন্যান্যরাও রয়েছে। কাজেই তাদের মধ্যে যে ঈমান আনল তার শেষ ঠিকানা হবে জান্নাত, আর তাদের মধ্যে যে কুফরি করল তার শেষ ঠিকানা হবে জাহান্নাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (এও যে, আমাদের কিছু সংখ্যক সৎকর্মপরায়ণ এবং কিছু সংখ্যক এর ব্যতিক্রম, আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথের অনুসারী।) [আল-জিন: ১১] অতঃপর আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (এও যে, আমাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক আছে মুসলিম আর কিছু সংখ্যক আছে সীমালঙ্ঘনকারী; অতঃপর যারা ইসলাম গ্ৰহণ করেছে তারা সুচিন্তিতভাবে সত্য পথ বেছে নিয়েছে।* ‘আর যারা সীমালঙ্ঘনকারী তারা তো হয়েছে জাহান্নামের ইন্ধন।’) [আল-জিন: ১৪-১৫]
কিয়ামতের দিন পাপী মানুষ ও জিনদেরকে ফেরেশতামন্ডলীর শাসানো সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: (হে জিন ও মানুষের দল! তোমাদের মধ্য থেকে কি রাসূলগণ তোমাদের কাছে আসেনি যারা আমার নিদর্শন তোমাদের কাছে বিবৃত করত এবং তোমাদেরকে এ দিনের সম্মুখীন হওয়া সম্বন্ধে সতর্ক করত ?) [আল-আনআম: ১৩০] তিনি আরো বলেন: (আল্লাহ্ বলবেন, ‘তোমাদের আগে যে জিন ও মানবদল গত হয়েছে তাদের সাথে তোমরা আগুনে প্রবেশ কর।) [আল-আরাফ: ৩৮]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতালা বর্ণনা করেছেন যে, তাদের আগুনে প্রবেশের কারণ হলো তারা হিদায়েতকে কবুল করার মত করে শ্রবণ করেনি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর আমি তো বহু জিন ও মানবকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি; তাদের হৃদয় আছে কিন্তু তা দ্বারা তারা উপলব্ধি করে না, তাদের চোখ আছে তা দ্বারা তারা দেখে না এবং তাদের কান আছে তা দ্বারা তারা শুনে না; তারা চতুষ্পদ জন্তুর মত, বরং তার চেয়েও বেশী বিভ্রান্ত। তারাই হচ্ছে গাফেল।) [আল-আরাফ: ১৭৯] এই আয়াত প্রমাণ করে যে, জিনদের অন্তর, কান ও চক্ষু রয়েছে। শয়তানদের শব্দ ও আওয়াজ রয়েছে যার দ্বারা মাখলুককে পথভ্রষ্ট করে তারা। আল্লাহ তায়ালা বলেন: (আর তোমার কণ্ঠ দিয়ে তাদের মধ্যে যাকে পারো পদস্খলিত কর, তোমার অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী দ্বারা তাদেরকে আক্রমণ কর।) [আল-ইসরা: ৬৪]
আল্লাহ তা‘আলা মানুষদেরকে উপদেশ দিয়েছেন, যেন শয়তান তাদেরকে ধোঁকায় ফেলতে না পারে যেমন তাদের (আদি) পিতা-মাতাকে ধোঁকায় ফেলেছে। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (হে বনী আদম! শয়তান যেন তোমাদেরকে কিছুতেই প্রলুব্ধ না করে- যেভাবে সে তোমাদের পিতামাতাকে জান্নাত থেকে বের করেছিল, সে তাদেরকে তাদের লজ্জাস্থান দেখাবার জন্য বিবস্ত্র করেছিল। নিশ্চয় সে নিজে এবং তার দল তোমাদেরকে এমনভাবে দেখে যে, তোমরা তাদেরকে দেখতে পাও না। নিশ্চয় আমি শয়তানকে তাদের অভিবাবক করেছি, যারা ঈমান আনে না।) [আল-আরাফ: ২৭]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, শয়তান—যদিও সে জানে যে, সে আল্লাহর মুখলিস বান্দাদের পথভ্রষ্ট করতে পারবে না, তবু—নিজে ও তার বাহিনী তাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে চেষ্টা করে এবং তাদের ইবাদতকে নষ্ট করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকে। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (আর এভাবেই আমি মানব ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবীর শত্রু করেছি, প্রতারণার উদ্দেশ্যে তারা একে অপরকে কুমন্ত্রণা দেয়। যদি আপনার রব ইচ্ছে করতেন তবে তারা এসব করত না; কাজেই আপনি তাদেরকে ও তাদের মিথ্যা রটনাকে পরিত্যাগ করুন।) [আল-আনআম : ১১২] হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (গত রাতে একটা অবাধ্য জিন হঠাৎ আমার সামনে প্রকাশ পেল -রাবী বলেন, অথবা তিনি অনুরূপ কোনো কথা বলেছেন-, যেন সে আমার সালাতে বাধা সৃষ্টি করে। কিন্তু আল্লাহ আমাকে তার উপর ক্ষমতা দিলেন। আমি ইচ্ছা করেছিলাম যে, তাকে মসজিদের খুঁটির সাথে বেঁধে রাখি, যাতে ভোর বেলা তোমরা সবাই তাকে দেখতে পাও। কিন্তু তখন আমার ভাই সুলায়মান-এর এই উক্তি আমার স্মরণ হলো, ‘‘হে প্রভু! আমাকে এমন রাজত্ব দান কর, যার অধিকারী আমার পরে আর কেউ না হয়’’। (বর্ণনাকারী) রাওহ্ বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই শয়তানটিকে অপমানিত করে ছেড়ে দিলেন।) {বুখারী (৪৬১), মুসলিম (৫৪১)} ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (তোমাদের এমন কেউ নেই যার সঙ্গে তার জিন সঙ্গী নিযুক্ত নেই।” তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আপনিও কী? তিনি বললেন, “আমিও, তবে আল্লাহ আমাকে তার ওপর সাহায্য করেছেন, ফলে সে ইসলাম গ্রহণ করেছে। এখন সে আমাকে কল্যাণ ছাড়া কোনো আদেশ করে না।) মুসলিম: (২৮১৪)
সাবুরা বিন আবু ফাকেহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “নিশ্চয় শয়তান আদম সন্তানের জন্যে তার সবগুলো রাস্তায় বসে গেলো। যেমন সে তার জন্য ইসলামের রাস্তায় বসে গেলো। আর বললো, তুমি কি ইসলাম গ্রহণ করবে আর তোমার দ্বীন, তোমার বাবার দ্বীন ও বাবার বাবাদের দ্বীন ত্যাগ করবে? কিন্তু সে তার অবাধ্য হলো ও ইসলামই গ্রহণ করলো। অতঃপর সে তার জন্য হিজরতের রাস্তায় বসে গেলো। আর বললো, তুমি কি হিজরত করবে আর তোমার দেশ ও আসমান পরিত্যাগ করবে, বস্তুত মুহাজিরের উদাহরণ হলো রশিতে বাধা ঘোড়ার উদাহরণ? কিন্তু সে তাকেও অমান্য করে হিজরত করল। অতঃপর সে তার জন্য জিহাদের রাস্তায় বসে গেলো। আর বললো, তুমি কি জিহাদ করবে, জিহাদ হলো জান ও নফসের পরীক্ষা, তুমি যুদ্ধ করবে, ফলে মারা যাবে, স্ত্রীর বিয়ে হয়ে যাবে ও মাল-সম্পদ বণ্টন করা হবে? তবু সে তাকে অমান্য করে জিহাদে বের হলো।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (যে তা করলো তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর হক হয়ে গেলো। আর যে নিহত হলো তাকে জাান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর হক হয়ে গেলো। যদিও সে ডুবে মারা যায়, তবু তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর হক হয়ে গেলো। অথবা তার বাহন তাকে পিষে মারল, তবু তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো আল্লাহর ওপর হক হয়ে গেলো।) {নাসাঈ (৩১৩৪), নাসাঈ, সুনানুল কুবরা (৪৩২৭), মুসান্নাফ ইবনু আবি শায়বাহ (১৯৬৭৫), আহমাদ (১৫৯৫৮), ইবনু হিব্বান (৪৫৯৩)}
খবীস শয়তান যখন নবীদের ওপর প্রভাব বিস্তার করা থেকে নিরাশ হয়নি, তাহলে অন্যদের থেকে তো আরো নিরাশ হবে না। আবুল আলা থেকে বর্ণিত, উসমান বিন আবুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, শয়তান আমার ও আমার সালাতের মাঝে প্রতিবন্ধক হয়ে গেছে এবং আমার কিরাতকে আমার ওপর সন্দেহযুক্ত করে দিয়েছে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: (এটা ঐ শয়তান যার নাম ’খিনযিব’। যে সময় তুমি তার উপস্থিতি বুঝতে পারবে তখন (আউয়ুবিল্লাহ পড়ে) তার অনিষ্ট হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চেয়ে তিনবার তোমার বাম পাশে থুথু ফেলবে।) তিনি বলেন, “তারপরে আমি তা করলাম আর আল্লাহ আমার হতে তা দূর করে দিলেন।” মুসলিম: (২২০৩)
সহীহ বুখারীতে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “নিশ্চয় শয়তান আদম সন্তানের রক্তের শিরায় শিরায় বিচরণ করে।” বুখারী (২০৩৮, ৭১৭১) ইবনু বাত্তাহ রাহিমাহুল্লাহ তার কিতাব (আল-ইবনাহ)-তে এই অর্থ বর্ণনা করার জন্য একটি অধ্যায় রচনা করেছেন। তিনি বলেন: “এই বিষয়ে ঈমানের অধ্যায় যে, শয়তান হচ্ছে সৃষ্ট প্রাণী, আদম সন্তানের ওপর প্রভাব বিস্তারকারী, সে তাদের শিরায় শিরায় চলে, তবে তার থেকে যাকে আল্লাহ হিফাজত করেন সে ব্যতীত। আর এটি যে অস্বীকার করল যে, ধ্বংসপ্রাপ্ত দলের অন্তর্ভুক্ত।” ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ আল-কুবরা (৪/৬১)
আমরা জানি যে, আদম সন্তানের নিকট ফেরেশতা আসেন এবং শয়তানও আসে। আমরা কিভাবে শয়তান সঙ্গী থেকে নিরাপদ থাকবো তা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বর্ণনা করে দিয়েছেন। যেমন আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আদম সন্তানের প্রতি শয়তানের এক স্পর্শ রয়েছে এবং ফেরেশতারও এক স্পর্শ রয়েছে। শয়তানের স্পর্শ হচ্ছে মন্দ কাজে প্ররোচনা দেয়া ও সত্যকে অস্বীকার করা। ফেরেশতার স্পর্শ হচ্ছে কল্যাণের কাজে উৎসাহিত করা এবং সত্যকে স্বীকার করা। কাজেই যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে এরূপ নেকীর স্পর্শ অনুভব করে সে যেন জ্ঞাত হয় যে, এটা আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে এবং এজন্য সে যেন আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে। আর কেউ নিজের মধ্যে এর বিপরীত স্পর্শ উপলব্ধি করলে সে যেন তখন শয়তান হতে আল্লাহ তা’আলার নিকট আশ্রয় চায়। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেন: {الشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الفَقْرَ وَيَأْمُرُكُمْ بِالفَحْشَاءِ} “শয়তান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়।"- (সূরা বাকারাহ ২৬৮)।) {তিরমিযী (২৯৮৮), ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ (১৪৩৫), আহমাদ, আয-যুহদ (৮৫৪), আবূ দাউদ, আয-যুহদ (১৬৪)}
আর আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা‘আলা তার মুমিন বান্দাদেরকে শয়তানের ষড়যন্ত্র থেকে হিফাযত করেন, যতক্ষণ তারা ইস্তিগফার করতে থাকবে। যেমন আল্লাহর রাসূল সাঃ বলেছেন: (নিশ্চয় শয়তান বলেছে, হে আমার রব, আপনার সম্মানের কসম, আমি আপনার বান্দাদেরকে যতক্ষণ তাদের শরীরে তাদের রূহ থাকবে গোমরা করতে থাকবো। রব বললেন, আমার ইজ্জত ও সম্মানের কসম, যতক্ষণ তারা আমার কাছে ইস্তেগফার করতে থাকবে আমি তাদেরকে ক্ষমা করতে থাকবো।) {আহমাদ (১১২৩৭), আব্দ ইবন হুমাইদ (৯৩২), মুসনাদে আবূ ইয়ালা (১২৭৩, ১৩৯৯), তাবরানী, আল-আওসাত (৮৭৮৮), এবং আদ-দোয়া (১৭৭৯)}
আমরা জানি যে, শয়তান মানুষের আকৃতি ধারন করতে পারে অথবা আল্লাহ তাকে যেসব আকৃতি ধারন করার অনুমতি প্রদান করেন তা সে ধারন করতে পারে। যেমন সহীহ বুখারীতে এসেছে, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে রমাযানের যাকাত (সদাকাতুল ফিতর) হিফাযতের দায়িত্ব প্রদান করলেন। অতঃপর আমার নিকট এক আগন্তুক আসল। সে তার দু’হাতের আঁজলা ভরে খাদ্যশস্য গ্রহণ করতে লাগল। তখন আমি তাকে ধরে ফেললাম এবং বললাম, আমি অবশ্যই তোমাকে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট নিয়ে যাব। -এভাবে তিনি হাদিসটি উল্লেখ করলেন-। তখন সে বলল, যখন তুমি বিছানায় শুতে যাবে, তখন আয়াতুল কুরসী পড়বে। তাহলে সর্বদা আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার জন্য একজন হিফাযতকারী থাকবে এবং সকাল হওয়া অবধি তোমার নিকট শয়তান আসতে পারবে না। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: (সে তোমাকে সত্য বলেছে, অথচ সে মিথ্যাচারী এবং শয়তান ছিল।) {বুখারী (৩২৭৫, ৫০১০), ইমাম বুখারী দু’জায়গাতে তার শায়খ উসমান ইবন আল-হায়সাম থেকে মুআল্লাক সূত্রে উল্লেখ করেছেন।}
জাহিলী যুগের লোকেরা—তাদের চরম মূর্খতার কারণে—জিনদের সরদারদের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করত, ফলে এটি তাদের ভীতি ও ক্লান্তি বাড়িয়ে দিতো। এ বিষয়ে সংবাদ দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন: (এও যে, কিছু কিছু মানুষ কিছু জিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।) [আল-জিন: ৬]
আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে, মূর্তিপূজারীরা জিনদের ইবাদত করে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের উপাস্যদের হাকিকত বর্ণনা দিয়ে বলেন: (আর স্মরণ করুন, যেদিন তিনি তাদের সকলকে একত্র করবেন, তারপর ফেরেশতাদেরকে জিজ্ঞাসা করবেন, 'এরা কি তোমাদেরই ইবাদত করত?'* তারা বলবে, 'আপনি পবিত্র, মহান! আপনিই আমাদের অভিভাবক, তারা নয়; বরং তারা তো ইবাদাত করত জিনদের। তাদের অধিকাংশই জিনদের প্রতি ঈমান রাখত।) [সাবা : ৪০-৪১]
আমরা জানি যে, শয়তান মানুষকে কুফরির দ্বারা প্ররোচিত করে, অতঃপর দুনিয়াতেই তার থেকে ছিটকে পড়ে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা তার সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেছেন: (এরা শয়তানের মত, সে মানুষকে বলে, ‘কুফরী কর’; তারপর যখন সে কুফরী করে তখন সে বলে, ‘তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, নিশ্চয় আমি সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহকে ভয় করি।’) [আল-হাশর: ১৬] শয়তান যেমনিভাবে তাকে কুফরি দ্বারা প্ররোচিত করে তেমন যাদুর দ্বারাও প্ররোচিত করে এবং তাকে তা শিক্ষা দেয়। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন: (বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল। তারা মানুষকে শিক্ষা দিত যাদু।) [আল-বাকারাহ: ১০২]
আমরা জানি যে, শয়তান আখিরাতে তার বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে এবং সে তাদেরকে তার আনুগত্য করার কারণে তিরস্কার করবে। আল্লাহ তা‘আলা শয়তান সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, সে জাহান্নামের আগুনে তাদের মাঝে ভাষণ দিয়ে বলবে: (আর যখন বিচারের কাজ সম্পন্ন হবে তখন শয়তান বলবে, ‘আল্লাহ্ তো তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলেন সত্য ওয়াদা, আমিও তোমাদেরকে ওয়াদা দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তোমাদেরকে দেয়া ওয়াদা ভঙ্গ করেছি। আমার তো তোমাদের উপর কোনো আধিপত্য ছিল না, আমি শুধু তোমাদেরকে ডাকছিলাম তাতে তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছিলে। কাজেই তোমরা আমাকে দোষারোপ করো না, তোমরা নিজেদেরই তিরস্কার কর। আমি তোমাদের উদ্ধারকারী নই এবং তোমরাও আমার উদ্ধারকারী নও। তোমরা যে আগে আমাকে আল্লাহর শরীক করেছিলে আমি তা অস্বীকার করছি। নিশ্চয় যালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।) [ইবরাহীম: ২২]
অধ্যায়: মানুষ সৃষ্টি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তার ফেরেশতাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি জমিনকে তাঁর ইবাদত দ্বারা আবাদ করার জন্যে খলীফা সৃষ্টি করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বললেন ‘নিশ্চয় আমি যমীনে খলীফা সৃষ্টি করছি’, তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাওকে সৃষ্টি করবেন যে ফাসাদ ঘটাবে ও রক্তপাত করবে? আর আমরা আপনার হামদসহ তাসবীহ পাঠ করি এবং পবিত্রতা ঘোষণা করি। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তা জানি, যা তোমরা জান না’।) [আল-বাকারাহ : ৩০] আল্লাহ তা‘আলা আরো সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন: (নিশ্চয় আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের মত, তিনি তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে বললেন, ‘হও’, ফলে সে হয়ে গেল।) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (নিশ্চয়ই আল্লাহ আদমকে একমুঠো মাটি দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যা তিনি সমগ্র পৃথিবী থেকে নিয়েছিলেন। তাই আদম সন্তান মাটির বিভিন্ন বর্ণ ও প্রকৃতি অনুসারে হয়েছে। এদের মধ্যে কেউ সাদা, কেউবা লাল, কেউ কালো এবং কেউবা এসবের মধ্যবর্তী বর্ণের হয়েছে। এরূপে কেউ অসৎ, কেউ সৎ, এবং কেউ কোমল, কেউ কঠোর, আর কেউ তার মধ্যবর্তী হয়েছে।) {আবূ দাউদ (৪৬৯৩), তিরমিযী (২৯৫৫), আব্দুর রাজ্জাক, আত-তাফসীর (৪১), আহমাদ (১৯৫৮২), মুসনাদে বাযযার (৩০২৫, ৩০২৬)} আল্লাহ এই মাটিকে কাদা বানিয়েছেন, অতঃপর তা পর্যায়ক্রমে ও ধাপেধাপে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: (আর অবশ্যই আমি মানুষ সৃষ্টি করেছি গন্ধযুক্ত কাদার শুস্ক ঠনঠনে কালচে মাটি হতে,* “আর এর আগে আমি সৃষ্টি করেছি জিনদেরকে অতি উষ্ণ নির্ধুম আগুন থেকে।”* আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদেরকে বললেন, নিশ্চয় আমি গন্ধযুক্ত কাদার শুস্ক ঠনঠনে কালচে মাটি হতে মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি;* অতঃপর যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার পক্ষ থেকে রূহ সঞ্চার করব তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো,* অতঃপর ফেরেশতাগণ সবাই একত্রে সিজদা করল।) [আল-হিজর ২৬-৩০] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির উপাদান থেকে।) [আল-মুমিনুন : ১২] মহা সম্মানিত আল্লাহ আরো বলেন: (সুতরাং তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, তারা সৃষ্টিতে দৃঢ়তর, না আমি অন্য যা কিছু সৃষ্টি করেছি তা? তাদেরকে তো আমি সৃষ্টি করেছি আঠাল মাটি হতে।) [আস-সাফফাত : ১১]
ইমাম আহমাদ-রাহিমাহুল্লাহ- যেসব আয়াতে আদম আলাইহিস সালামকে সৃষ্টি করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তা উল্লেখ করে বলেন: (আমরা বলব, এটি আদম সৃষ্টির সুচনা। আল্লাহ তাকে প্রথমে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারপরে লাল, কালো ও সাদা কাদামাটি থেকে এবং ভালো ও খারাপ কাদামাটি থেকে। তাই তার বংশধররা ভালো খারাপ এবং কালো, লাল আর সাদা। অতঃপর সেই মাটি ভিজে গিয়ে কাদায় পরিণত হলো। এটাই হলো আল্লাহর বাণী {مِّن طِين} [কাদামাটি থেকে]। যখন কাদামাটির কিছু অংশ তার অপর কিছু অংশের সাথে লেগে গেলো, তখন তা طينًا لازبًا-[আঠালো মাটিতে] পরিণত হলো। অর্থাৎ মিলিত। অতঃপর তিনি বললেন, {مِن سُلاَلَةٍ مِّن طِين} “কাদামাটির উপাদান থেকে।” কাদামাটির মত, যখন চাপা হয় তখন আঙ্গুলের ফাঁকা দিয়ে ফসকে যায়। পরে সেটি নষ্ট হয়ে যায় এবং কালো মাটি হয়ে যায়। এভাবে তিনি কালো মাটি থেকে সৃষ্টি করলেন। যখন তা শুকিয়ে গেলো তখন তা পোড়া মাটির ন্যায় শক্ত হয়ে গেলো। পোড়া মাটির ঝনঝন শব্দের ন্যায় তার ঝনঝন শব্দ তৈরি হয়। তার মাটির কলসীর মত ঝনঝন শব্দ আছে। এটি হলো আদম সৃষ্টির বর্ণনা। আর তাঁর বাণী: {مِن سُلاَلَةٍ مِّن مَّاء مَّهِين} [السجدة: 8] {দুর্বল পানির রেখা থেকে} [আল-সাজদাহ: ৮], এটি তার বংশের সৃষ্টির সূচনা। (সুলালাহ) থেকে, অর্থাৎ শুক্রাণু থেকে যখন তা পুরুষের থেকে নির্গত হয়। এটাই হলো তার বাণী: {مِّن مَّاء} অর্থাৎ বীর্য থেকে, {مَّهِين} অর্থাৎ দুর্বল।) আর রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ ওয়ায যানাদিকাহ (পৃ.১৭৯-১৮০), প্রকাশক: দাগাশ আল-আজমী।
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ পবিত্র হাতে আদমকে সৃষ্টি করেছেন এবং ফেরেশতাদের দ্বারা সিজদা করিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (অতঃপর যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার পক্ষ থেকে রূহ সঞ্চার করব তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো,* অতঃপর ফেরেশতাগণ সবাই একত্রে সিজদা করল।) [আল-হিজর: ২৯-৩০] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (কিয়ামতের দিন মুমিনগণ একসাথ হবেন আর বলবেন, যদি আমরা আমাদের রবের কাছে সুপারিশকারী গ্রহণ করি, (ভালো হবে), ফলে তারা আদমের কাছে আসবে এবং বলবে: আপনি মানুষদের বাবা, আল্লাহ নিজ হাতে আপনাকে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনাকে ফেরেশাদের দ্বারা সিজদা করিয়েছেন।) {বুখারী (৪৪৭৬), মুসলিম (১৯৩), ইবনু মাজাহ (৪৩১২)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ আদম আলাইহিস সালামকে তার আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আল্লাহ তা’আলা আদম-কে তার গঠনে সৃষ্টি করেছেন, তার উচ্চতা ছিল ষাট হাত।) {বুখারী (৬২২৭), মুসলিম (২৮৪১)} তার থেকে আরো বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (তোমাদের মধ্যে কেউ যখন তার ভাইয়ের সাথে যুদ্ধ করবে, তখন সে যেন মুখমন্ডলে আঘাত করা হতে বিরত থাকে। কারণ, আল্লাহ আদমকে তার আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন।) {বুখারী (২৫৫৯), মুসলিম (২৬১২), হাদিসটির শব্দ সহীহ মুসলিম থেকে গৃহীত।} আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (যখন তোমাদের কেউ প্রহার করে, সে যেন চেহারা থেকে বিরত থাকে। আর বলবে না যে, আল্লাহ তোমার চেহারাকে এবং তোমার চেহারার সাথে যার চেহারার মিল রয়েছে তার চেহারাকে নিকৃষ্ট করুক। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা আদমকে তার আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন।) {মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক (১৭৯৫২), মুসানাদ হুমাইদী (১১৫৩), আহমাদ (৭৪২০), বুখারী, আদাবুল মুফরাদ (১৭৩), ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (৫৩১)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ আদম থেকেই তার স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন যেন তিনি তার কাছে প্রশান্তি লাভ করেন। তিনি হলেন হাওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনিই তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন যাতে সে তার কাছে শান্তি পায়।) [আল-আরাফ: ১৮৯] তিনি আরো বলেন: (হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দেন।) [আন-নিসা: ১]
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ আদম ও হাওয়াকে সৃষ্টি করে জান্নাতে থাকতে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর আমি বললাম, ‘ হে আদম ! আপনি ও আপনার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করুন এবং যেখান থেকে ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দ্যে আহার করুন।) [আল-বাকারাহ : ৩৫] আর তিনি তাদেরকে গাছ থেকে খেতে নিষেধ করেছেন, কিন্তু হিংসার বশবর্তী হয়ে শয়তান তাদেরকে প্ররোচিত করল, ফলে তারা সেখান থেকে খেয়ে ফেলেন। আর আল্লাহ তাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দেন এবং জমিনে অবতরণ করান। আল্লাহ সে সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন: (আর হে আদম! আপনি ও আপনার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করুন, অতঃপর যেথা হতে ইচ্ছা খান, কিন্তু এ গাছের ধারে –কাছেও যাবেন না, তাহলে আপনারা যালেমদের অন্তর্ভূক্ত হবেন।’* তারপর তাদের লজ্জাস্থান, যা তাদের কাছে গোপন রাখা হয়েছিল তা তাদের কাছে প্রকাশ করার জন্য শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিল এবং বলল, ‘তোমাদের রব তোমাদেরকে কেবল এ জন্য এ গাছ থেকে নিষেধ করেছেন যে, (খেলে) তোমরা ফেরেশতা হয়ে যাবে অথবা তোমরা চিরস্থায়ীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’।* আর সে তাদের উভয়ের কাছে শপথ করে বলল , ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের শুভাকাংখীদের একজন।'* অতঃপর সে তাদেরকে প্রবঞ্চনার দ্বারা অধঃপতিত করল। এরপর যখন তারা সে গাছের ফল খেল, তখন তাদের লজ্জাস্থান তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে পড়ল এবং তারা জান্নাতের পাতা দিয়ে নিজেদেরকে আবৃত করতে লাগল। তখন তাদের রব তাদেরকে ডেকে বললেন, “আমি কি তোমাদেরকে এ গাছ থেকে নিষেধ করিনি এবং আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, নিশ্চয় শয়তান তোমাদের উভয়ের প্রকাশ্য শত্রু ?’* তারা বলল, ‘হে আমাদের রব ! আমারা নিজেদের প্রতি যুলুম করছি। আর যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।’* তিনি বললেন, ‘তোমরা নেমে যাও, তোমরা একে অন্যের শত্রু এবং যমীনে কিছুদিনের জন্য তোমাদের বসবাস ও জীবিকা রইল।’* তিনি বললেন, ‘সেখানেই তোমরা যাপন করবে এবং সেখানেই তোমরা মারা যাবে। আর সেখান থেকেই তোমাদেরকে বের করা হবে।’) [আল-আরাফ: ১৯-২৫]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ আদমকে জমিনে খলিফা বানিয়েছেন। তিনি বলেন: (আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বললেন ‘নিশ্চয় আমি জমিনে খলীফা সৃষ্টি করছি’, তারা বলল, ‘আপনি কি সেখানে এমন কাওকে সৃষ্টি করবেন যে ফাসাদ ঘটাবে ও রক্তপাত করবে ? আর আমরা আপনার হামদসহ তাসবীহ পাঠ করি এবং পবিত্রতা ঘোষণা করি। তিনি বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি তা জানি, যা তোমরা জান না’।) [আল-বাকারাহ : ৩০]
তিনি তাকে পরীক্ষা করলেন, সে ভুলে গেলো অতঃপর নাফরমানি করল। তারপর তার রব তাকে মনোনীত করলেন এবং সঠিক পথ দেখালেন। মহা সত্য আল্লাহ বলেন: (আর আমি তো ইতোপূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ দান করেছিলাম, কিন্তু তিনি ভুলে গিয়েছিলেন; আর আমরা তার মধ্যে সংকল্পে দৃঢ়টা পাইনি।) [ত্বহা : ১১৫] তারপর আদম তার রবের পক্ষ থেকে কিছু বাক্যপ্রাপ্ত হলেন, যা তার জন্য আল্লাহর ক্ষমা পাওয়া ও তার প্রতি আল্লাহর মনোনিবেশ করার কারণ হয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তারপর আদম তার রবের কাছ থেকে কিছু বাণী পেলেন। অতঃপর আল্লাহ্ তার তাওবা কবুল করলেন। নিশ্চয় তিনিই তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।* আমি বললাম, ‘তোমরা সকলে এখান থেকে নেমে যাও। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট কোনো হিদায়াত আসবে তখন যারা আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না’।) [আল-বাকরাহ: ৩৭,৩৮]
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করার চল্লিশ বছর আগেই তার ওপর এসব কিছু লিখে রেখেছেন। সহীহ হাদীসে এসেছে, আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আদম ও মূসা পরস্পরে বাদানুবাদ করেন। মূসা বলেন, হে আদম, আপনি আমাদের পিতা। আপনি আমাদেরকে বঞ্চিত করেছেন এবং জান্নাত থেকে আমাদেরকে বের করেছেন। আদম তাকে বললেন, হে মূসা! আল্লাহ্ আপনাকে তো নিজ কথার মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন এবং আপনার জন্য নিজ হাত দ্বারা লিখেছেন। অতএব আপনি কি আমাকে এমন একটি কাজের ব্যাপারে তিরস্কার করবেন যা আমাকে সৃষ্টি করার চল্লিশ বছর পূর্বেই আল্লাহ্ নির্ধারিত করে রেখেছেন। তখন আদম মূসার ওপর বিতর্কে জয়ী হলেন।) এ কথাটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বলেছেন। {বুখারী : (৬৬১৪), মুসলিম (২৬৫২), আবূ দাউদ (৪৭০১), তিরমিযী (২১৩৪), ইবনু মাজাহ (৮০)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, আদম সন্তানদের সৃষ্টির সূচনা তেমনভাবেই হয়েছে যেমন সংবাদ দিয়েছেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা: (হে মানুষ! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক তবে নিশ্চয়ই জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্র থেকে, তারপর আলাকা (এমন কিছু যা যুক্ত হয়ে থাকে) থেকে, তারপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট অথবা অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট গোশত থেকে- যাতে আমি বিষয়টি তোমাদের কাছে সুস্পষ্টরূপে প্ৰকাশ করি। আর আমি যা ইচ্ছা করি তা একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত মাতৃগর্ভে অবস্থিত রাখি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, পরে যাতে তোমরা যৌবনে উপনীত হও। তোমাদের মধ্যে কারো কারো মৃত্যু দেয়া হয় এ বয়সেই, আবার কাউকে কাউকে ফিরিয়ে নেয়া হয় হীনতম বয়সে, যাতে সে জ্ঞান লাভের পরও কিছু না জানে।) [আল-হাজ্জ : ৫] মহাসত্য আল্লাহ আরো বলেন: (আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির উপাদান থেকে,* তারপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ ভাণ্ডারে;* পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি রক্তপিন্ডে, অতঃপর রক্তপিন্ডকে পরিণত করি গোশতপিণ্ডে, অতঃপর গোশতপিণ্ডকে পরিণত করি অস্থিতে; অতঃপর অস্থিকে ঢেকে দেই গোশত দিয়ে; তারপর তাকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে। অতএব (দেখে নিন) সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ্ কত বরকতময়!) [আল-মুমিনূন : ১২-১৪] আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, সত্যবাদী হিসেবে গৃহীত আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট হাদীস বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন: (নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। ঐভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। অতঃপর তা গোশতপিন্ডে পরিণত হয়ে (আগের মত চল্লিশ দিন) থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। আর তাকে চারটি বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়। তাকে লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তার আমল, তার রিযিক, তার আয়ু এবং সে কি পাপী হবে না নেককার হবে। অতঃপর তার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দেয়া হয়।) {বুখারী : (৩২০৮), মুসলিম (২৬৪৩), আবূ দাউদ (৪৭০৮), তিরমিযী (২১৩৭), ইবনু মাজাহ (৭৬)}
সন্তান কিভাবে কখনো বাপের সাদৃশ্য আবার কখনো মায়ের সাদৃশ্য গ্রহণ করে তাও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন, যখন আবদুল্লাহ ইবনু সালাম তাকে এই বলে জিজ্ঞাসা করেছিলে যে, আমি আপনাকে তিনটি প্রশ্ন করছি। এগুলোর ঠিক উত্তর নবী ছাড়া অন্য কেউ জানে না। (১) কিয়ামতের সর্বপ্রথম ‘আলামত কী? (২) জান্নাতবাসীদের সর্বপ্রথম খাদ্য কী? (৩) কী কারণে সন্তান আকৃতিতে কখনও পিতার মত কখনো বা মায়ের মত হয়? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ বিষয়গুলি সম্পর্কে এই মাত্র জিব্রাঈল আমাকে জানিয়ে গেলেন। আবদুল্লাহ ইবনু সালাম একথা শুনে বললেন, সে তো ফেরেশতাদের মধ্যে ইয়াহূদীদের দুশমন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ( (১) কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার সর্বপ্রথম আলামত লেলিহান অগ্নি যা মানুষকে পূর্বদিক হতে পশ্চিম দিকে ধাবিত করে নিয়ে যাবে এবং সবাইকে একত্র করবে। (২) সর্বপ্রথম খাদ্য যা জান্নাতবাসী খাবে তা হল মাছের কলিজার বাড়তি অংশ (৩) যখন পুরুষের বীর্যের ওপর নারীর বীর্য জয়ী হয়, তখন সন্তান নারীর মত হয়।) আবদুল্লাহ ইবনু সালাম বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ্ ছাড়া সত্য কোনো মাবুদ নেই এবং নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল।” বুখারী (৩৯৩৮)
আমরা বিশ্বাস করি যে, সকল মানুষই আদমের বংশধর। আর আদম হলেন মাটির সৃষ্টি। কাজেই তাকওয়া ছাড়া কারো ওপর কারো কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যাক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।) [আল-হুজুরাত : ১৩] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (মহান আল্লাহ তোমাদের জাহিলী যুগের মিথ্যা অহংকার ও পূর্বপুরুষদেরকে নিয়ে গর্ব করার প্রথাকে বিলুপ্ত করেছেন। মু’মিন হলো আল্লাহভীরু, আর পাপী হলো দুর্ভাগা। তোমরা সকলে আদম সন্তান, আর আদম মাটির তৈরী...।) {আবূ দাউদ (৫১১৬), তিরমিযী (৩৯৫৬), মুআফা ইবন ইমরান, আয-যুহদ (১৪৭), ইবনু ওয়াহাব, আল-জামি (৩০), আহমাদ (৮৭৩৬)}
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ আদমকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর তার থেকে তারই স্ত্রী হাওয়া আলাইহিমাস সালামকে সৃষ্টি করেছেন। আর অবশিষ্ট মানুষকে ঘৃণিত পানি (বীর্য) থেকে সৃষ্টি করেছেন, তবে ঈসা আলাইহিস সালাম ছাড়া। আল্লাহ তাকে পিতা ছাড়াই মা থেকে সৃষ্টি করেছেন। যেমন তার সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিয়ে বলেছেন: (স্মরণ করুন, যখন ফেরেশতাগণ বললেন, ‘হে মারিয়াম! নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আপনাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিচ্ছেন। তার নাম মসীহ্, মারিয়াম তনয় ঈসা, তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তগণের অন্যতম হবেন।’* আর তিনি দোলনায় ও বয়োঃপ্রাপ্ত অবস্থায় মানুষের সাথে কথা বলবেন এবং তিনি হবেন পুণ্যবানদের একজন।’* সে বলল, ‘হে আমার রব! আমাকে কোনো পুরুষ স্পর্শ করেনি, এমতাবস্থায় আমার সন্তান হবে কিভাবে?’ তিনি বললেন, ‘এভাবেই’, আল্লাহ্ যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন। তিনি যখন কিছু স্থির করেন তখন বলেন, ‘হও’, ফলে তা হয়ে যায়।) [আলে-ইমরান : ৪৫-৪৭]
আমরা বিশ্বাস করি যে, ঈসা আলাইহিস সালাম—যদিও তার সৃষ্টি একটি আশ্চর্য বিষয়—আল্লাহর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তাআলা বলেন: (তিনি তো কেবল আমারই এক বান্দা, যার উপর আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং তাকে বানিয়েছিলাম বনী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত।) [আয-যুখরুফ: ৫৯] তিনিও একজন মানুষ, খাবার গ্রহণ করতেন, তিনি ইলাহ নন। আল্লাহ বলেন: (মারিয়াম-তনয় মসীহ শুধু একজন রাসূল। তার আগে বহু রাসূল গত হয়েছেন এবং তাঁর মা অত্যন্ত সত্যনিষ্ঠা ছিলেন। তারা দুজনেই খাওয়া-দাওয়া করতেন। দেখনু আমি তাদের জন্য আয়াতগুলোকে কেমন বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি; তারপরও দেখুন, তারা কিভাবে সত্যবিমুখ হয়!) [আল-মায়েদা: ৭৫]
আমরা আমাদের রবের কিতাবে পাই যে, মাসীহকে যে ইলাহ মনে করে তাকে আল্লাহ তাআলা বহু দলিল দ্বারা প্রতিবাদ করেছেন। এসব দলিলের কয়েকটি হলো: আল্লাহর বাণী: (আল্লাহ্ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই; যদি থাকত তবে প্রত্যেক ইলাহ স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যে গুণে তাকে গুণান্বিত করে তা থেকে আল্লাহ্ কত পবিত্র- মহান!) [আল-মুমিনুন: ৯১] এবং তাঁর বাণী: (অবশ্যই তারা কুফরী করেছে যারা বলে ‘নিশ্চয় মারিয়াম পুত্র মাসীহই আল্লাহ’। বল, যদি আল্লাহ ধ্বংস করতে চান মারিয়াম পুত্র মাসীহকে ও তার মাকে এবং জমিনে যারা আছে তাদের সকলকে তাহলে কে আল্লাহর বিপক্ষে কোনো কিছুর ক্ষমতা রাখে? আর আসমানসমূহ, জমিন ও তাদের মধ্যবর্তী যা রয়েছে, তার রাজত্ব আল্লাহর জন্যই। তিনি যা ইচ্ছা তা সৃষ্টি করেন এবং আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।) [আল-মায়েদা : ১৭]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ মানুষকে ফিতরাতের ওপর সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (কাজেই আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজ চেহারাকে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দ্বীন ইসলাম), যার উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।) [সূরা আর-রূম : ৩০] ইবনু যায়েদ, মুজাহিদ ও ইকরিমা বলেছেন: “ফিতরাত হলো ইসলাম।” তাফসীর তাবারী: (২০/৯৮)
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা, ইবরাহীম নাখয়ী, সাঈদ বিন জুবায়ের, মুজাহিদ, ইকরিমাহ, কাতাদাহ, যাহহাক ও ইবনু যায়েদ আল্লাহ তা‘আলার বাণী: {لاَ تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ} প্রসঙ্গে বলেন, অর্থাৎ আল্লাহর দ্বীনের কোনো পরিবর্তন নেই। ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থে অধ্যায় রচনা করেছেন: «باب {لاَ تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ} لدين الله، {خُلُقُ الأَوَّلِين}: دين الأولين، والفطرة: الإسلام». অর্থাৎ: “অধ্যায় {لاَ تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ} অর্থ আল্লাহর দ্বীনের কোনো পরিবর্তন নেই। {خُلُقُ الأَوَّلِين} অর্থ পূর্ববর্তীদের দ্বীন। আর ফিতরাত হলো ইসলাম।”
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (সকল মানব শিশুই ফিতরাত (ইসলাম)-এর ওপর জন্ম নেয়। তারপর তার পিতা ও মাতা তাকে ইয়াহূদী, নাসারা অথবা অগ্নি উপাসক করে ফেলে। যেমন পশু পূর্ণ বাচ্চারই জন্ম দেয়। তোমরা কি তার মধ্যে কোন ত্রুটি দেখতে পাও?) তারপরে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: (এটা আল্লাহর ফিতরাত যে ফিতরাত বা প্রকৃতি মুতাবিক তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল দ্বীন।) [সূরা আর-রূম : ৩০] {বুখারী (৪৭৭৫), মুসলিম (২৬৫৮), আবূ দাউদ (৪৭১৪), তিরমিযী (২১৩৮)}
ইয়ায বিন হিমার আল-মুজাশিয়ী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা তার এক খুতবায় বলেন: (মনে রাখো, তোমরা যা জান না তা শিক্ষা দিতে আমার রব আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। আজকের এই দিনে তিনি আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, যেসব সম্পদ আমি কোনো বান্দাকে দিয়েছি তা হালাল। আমি আমার সব বান্দাকে একনিষ্ট দ্বীনের উপর সৃষ্টি করেছি। আর শয়তান তাদের কাছে এসে তাদেরকে তাদের দ্বীন থেকে বিচ্যুত করেছে এবং আমি তাদের জন্য যা হালাল করেছি তা সে তাদের ওপর হারাম করেছে এবং সে তাদের নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা আমার সাথে এমন কিছেুকে শরীক করে যার ব্যাপারে কোনো দলীল নাযিল করা হয়নি। ...) মুসলিম: (২৮৬৫)
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ পুনরুত্থান অস্বীকারকারীদের দাবিয়ে দিয়েছেন এই কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে যে, তাদের সৃষ্টির সূচনা হলো মাটি থেকে। এ মর্মে তিনি বলেন: (আর সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়। সে বলে, 'কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে যখন তা পচে গলে যাবে?’* বলুন, 'তাতে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।') [সূরা ইয়াসিন: ৭৮-৭৯]
যেমন তিনি তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে তুচ্ছ পানি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। কাজেই তারা কিভাবে তাদের রবের ওপর অহংকারে এবং তাদেরকে পুনরায় উঠানো ও উপস্থিত করানোকে অসম্ভব মনে করে?! আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (যিনি তাঁর প্রত্যেকটি সৃষ্টিকে সৃজন করেছেন উত্তমরূপে এবং কাদা হতে মানব সৃষ্টির সূচনা করেছেন।* তারপর তিনি তার বংশ উৎপন্ন করেন তুচ্ছ তরল পদার্থের নির্যাস থেকে।* পরে তিনি সেটাকে করেছেন সুঠাম এবং তাতে ফুঁকে দিয়েছেন তাঁর রূহ থেকে। আর তোমাদেরকে দিয়েছেন কান, চোখ ও অন্তঃকরণ, তোমরা খুব সামান্যই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।* আর তারা বলে, 'আমরা মাটিতে হারিয়ে গেলেও কি আমরা হবো নূতন সৃষ্টি?' বরং তারা তাদের রবের সাক্ষাতের সাথে কুফরিকারী।* বলুন, তোমাদের জান কবজ করবে মৃত্যুর ফেরেশতা যাকে তোমাদের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। তারপর তোমাদের রবের নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।) [আস-সাজদাহ: ৭-১১]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা'আলার বান্দাদের সৃষ্টি করা এ প্রমাণ বহন করে যে তিনিই একমাত্র ইবাদতের উপযুক্ত। মহান আল্লাহ বলেন: (হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রব রবের ‘ইবাদত করো যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও।) [আল-বাকারাহ: ২১]
যেমন আল্লাহ কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেন যে, নূহ তার কওমকে এই বলে উপদেশ দিয়েছেন যে, আল্লাহ তাদেরকে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন। কাজেই তারা কিভাবে তাঁর শ্রেষ্ঠত্বের পরোয়া করছে না?! আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তোমাদের কী হল যে, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের পরোয়া করছ না!* ‘অথচ তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন পৰ্যায়ক্রমে।) [সূরা নূহ: ১৩-১৪]
বারযাখে (কবরের জীবনে) ও আখিরাতে মানুষের অনেক অবস্থা হবে, যার বিস্তারিত বর্ণনা অচিরেই “আখিরাতের ওপর ঈমান পর্বে” আসছে।
অধ্যায়: রূহ সৃষ্টি।
আমরা জানি যে, রূহ আল্লাহর একটি নির্দেশ। আর আল্লাহ মানুষকে রুহ সম্পর্কে যা জানিয়েছেন তা ছাড়া তারা কিছুই জানে না। মহান আল্লাহ বলেন: (আর আপনাকে তারা রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। বলুন, ‘রূহ আমার রবের আদেশঘটিত, আর তোমাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে অতি সামান্যই।) [আল-ইসরা: ৮৫] আবদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: (একদা আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে একটি ক্ষেতের মাঝে উপস্থিত ছিলাম। তিনি একটি খেজুরের লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়েছিলেন। এমন সময় কিছু সংখ্যক ইয়াহূদী যাচ্ছিল। তারা একে অন্যকে বলতে লাগল, তাকে রূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। কেউ বলল, কেন তাকে জিজ্ঞেস করতে চাইছ? আবার কেউ বলল, তিনি এমন উত্তর দিবেন না, যা তোমরা অপছন্দ কর। তারপর তারা বলল যে, তাকে প্রশ্ন কর। এরপরে তাকে রূহ সম্পর্কে প্রশ্ন করল। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরত থাকলেন, এ সম্পর্কে তাদের কোন উত্তর দিলেন না। (বর্ণনাকারী বলছেন) আমি বুঝতে পারলাম, তার ওপর ওহী অবতীর্ণ হবে। আমি আমার জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর যখন ওহী অবতীর্ণ হল, তখন তিনি বললেন, وَيَسْئَلُوْنَكَ عَنِ الرُّوْحِ قُلِ الرُّوْحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّيْ ’’আর তারা আপনাকে ’রূহ’ সম্পর্কে প্রশ্ন করে। আপনি বলে দিন: রূহ আমার রবের আদেশঘটিত।’’) {বুখারী: (৪৭২১), মুসলিম (২৭৯৪), তিরমিযী (৩১৪১)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, সকল রূহ সৃষ্ট। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।) [আয-যুমার: ৬২] আল্লাহ যখন আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টি সম্পন্ন করেন তখন তার ভেতর নিজের পক্ষ থেকে রূহ ফুঁকে দেন। সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (অতঃপর যখন আমি তাকে সুঠাম করব এবং তাতে আমার পক্ষ থেকে রূহ সঞ্চার করব তখন তোমরা তার প্রতি সিজদাবনত হয়ো।) [আল-হিজর: ২৯] মায়ের পেটে ভ্রুণের বয়স চার মাস হলে আল্লাহ তার কাছে ফেরেশতা প্রেরণ করেন, আর সে তাতে রূহ ফুঁকে দেয়। যেমন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদেরকে সত্যবাদি ও সত্যায়িত আল্লাহর রাসূল বলেছেন: (নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। ঐভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। অতঃপর তা গোশতপিন্ডে পরিণত হয়ে (আগের মত চল্লিশ দিন) থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। আর তাকে চারটি বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়। তাকে লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তার আমল, তার রিয্ক, তার আয়ু এবং সে কি পাপী হবে না নেককার হবে। অতঃপর তার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দেয়া হয়।) {বুখারী (৩২০৮), মুসলিম (২৬৪৩), আবূ দাউদ (৪৭০৮), তিরমিযী (২১৩৭), ইবনু মাজাহ (৭৬)} একমাত্র ঈসা মাসীহ আলাইহিস সালাম ছাড়া। তার গর্ভের সূচনা হয়েছিল ফেরেশতার ফুঁকের কারণে। আল্লাহ তাআলা বলেন: (এবং স্মরণ করুন সে নারীকে, যে নিজ লজ্জাস্থানের হেফাজত করেছিল, অতঃপর তার মধ্যে আমি আমার রূহ ফুঁকে দিলাম এবং তাকে ও তার পুত্রকে করেছি সৃষ্টিজগতের জন্য এক নিদর্শন।) [আল-আম্বিয়া: ৯১] তিনি আরো বলেন: (মারিয়াম-তনয় ঈসা মসীহ কেবল আল্লাহর রাসূল এবং তাঁর বাণী, যা তিনি মারিয়ামের কাছে পাঠিয়েছিলেন ও তাঁর পক্ষ থেকে রূহ।) [আন-নিসা: ১৭১]
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, রূহসমূহ নিন্দ্রাবস্থায় কবজ করা হয়, অতঃপর তার শরীরে ফেরত দেওয়া হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আল্লাহ্ই জীবসমূহের প্রাণ হরণ করেন তাদের মৃত্যুর সময় এবং যাদের মৃত্যু আসেনি তাদের প্রাণও নিদ্রার সময়। তারপর তিনি যার জন্য মৃত্যুর সিদ্ধান্ত করেন তার প্রাণ তিনি রেখে দেন এবং অন্যগুলো ফিরিয়ে দেন, এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে।) [আয-যুমার : ৪২]
আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ কাতাদাহ্ তার পিতা আবূ কাতাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, এক রাতে আমরা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম। কেউ কেউ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! রাতের এ শেষ প্রহরে আমাদের নিয়ে যদি একটু বিশ্রাম নিতেন। রাসুলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: (আমার ভয় হচ্ছে সালাতের সময়ও তোমরা ঘুমিয়ে থাকবে। বিলাল বললেন, আমি আপনাদের জাগিয়ে দিব। কাজেই সবাই শুয়ে পড়লেন। এ দিকে বিলাল তার হাওদার গায়ে একটু হেলান দিয়ে বসলেন। এতে তার দু’চোখ মুদে আসলো। ফলে তিনি ঘুমিয়ে পড়লেন। সূর্য কেবল উঠতে শুরু করেছে, এমন সময় আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাগ্রত হলেন এবং বিলালকে ডেকে বললেন, হে বিলাল! তোমার কথা গেলো কোথায়? বিলাল বললেন, আমার এতো অধিক ঘুম আর কখনও পায়নি। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: আল্লাহ্ তা‘আলা যখন ইচ্ছা করেছেন তখন তোমাদের রূহ্ কবয করে নিয়েছেন; আবার যখন ইচ্ছা করেছেন তখন তা তোমাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন।) {বুখারী (৫৯৫), আবূ দাউদ (৪৩৯, ৪৪০) নাসাঈ (৮৪৬)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (যদি তোমাদের কোন ব্যক্তি শয্যা গ্রহণ করতে যায়, তখন সে যেন তার লুঙ্গির কিনারা দিয়ে নিজ বিছানাটা ঝেড়ে নেয়। কারণ, সে জানে না যে, বিছানার উপর তার অনুপস্থিতিতে পীড়াদায়ক কোন কিছু আছে কিনা। তারপর পড়বেঃ হে আমার রব! আপনারই নামে আমার শরীরটা বিছানায় রাখলাম এবং আপনারই নামে আবার উঠবো। যদি আপনি ইতোমধ্যে আমার জান কবয করে নেন তাহলে তার উপর রহম করবেন। আর যদি তা আমাকে ফিরিয়ে দেন, তবে তাকে এমনভাবে হিফাযত করবেন, যেভাবে আপনি আপনার নেক বান্দাদের হিফাযত করে থাকেন।) {বুখারী : (৬৩২০), মুসলিম (২৭১৪), আবূ দাউদ (৫০৫০), তিরমিযী (৩৪০১), ইবনু মাজাহ (৩৮৭৪)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, মৃত্যুর সময় রূহ শরীর থেকে পৃথক হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (জীব মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণকারী ; তারপর তোমরা আমারই কাছে প্রত্যাবর্তিত হবে।) [আল-আনকাবূত : ৫৭] রূহ মৃত্যুর মাধ্যমে শরীর থেকে পরিপূর্ণরূপে পৃথক হয়ে যায়। আর তখন রূহের অনুগামী হয় চোখ। যেমন উম্মু সালামাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ সালামার কাছে আসলেন। তখন তার চোখ খোলাবস্থায় ছিল। তিনি তা বন্ধ করে দিলেন। অতঃপর বললেন, “নিশ্চয় রূহকে যখন কবজ করা হয় তখন চোখ তার পিছু নেয়।” {মুসলিম (৯২০), আবূ দাউদ (৩১১৮), ইবনু মাজাহ (১৪৫৪)} রূহ শরীরের মত মৃত্যু বরণ করে না, তার মৃত্যু হলো শরীর থেকে পৃথক হওয়া।
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, ফেরেশতাগণ মৃত্যুর সময় রূহকে শরীর থেকে বের নিয়ে আসেন। আর তার ওপর নিয়ামত বা শাস্তি বর্ষিত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “যদি আপনি দেখতে পেতেন, যখন যালিমরা মৃত্যু যন্ত্রনায় থাকবে এবং ফেরেশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলবে, ‘তোমাদের প্রাণ বের কর। আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দেয়া হবে, কারণ তোমরা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াতসমূহ সম্পর্কে অহংকার করতে।) [আল-আনআম: ৯৩]
অতএব ফেরেশতা নফস বের করে আনেন, অতঃপর তার ওপর শাস্তি অথবা নিয়ামত অবতীর্ণ হয়, যেমন শরীরের ওপর শাস্তি পতিত হয়। বারা বিন আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে এক আনসারী ব্যক্তির জানাযায় বের হলাম। আমরা কবরস্থানে গিয়ে পৌঁছলাম, তখনো লাহাদ কবর খনন করা হয়নি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বসলেন আর আমরাও তার পাশে বসে পড়লাম, যেন আমাদের মাথার ওপর পাখি রয়েছে। আর তার হাতে একটি কাঠি ছিল যা দ্বারা মাটিতে খোচাচ্ছিলেন। তিনি তার মাথা উঠিয়ে বললেন, তোমরা আল্লাহর কাছে কবরের আযাব থেকে পানাহ চাও। তিনি দুইবার বা তিনবার এ কথা বললেন। অতঃপর বললেন: (যখন মুমিন বান্দা দুনিয়া থেকে প্রস্থান ও আখিরাতে প্রত্যাগমন করার ভেতর থাকে তখন আসমান থেকে সাদা চেহারাবিশিষ্ট ফেরেশতাগণ তার কাছে আগমন করেন। যেন তাদের চেহারা সূর্যের ন্যায়। তাদের সাথে জান্নাতের কাফন থাকে এবং জান্নাতের সুগন্ধি থাকে। তারা তার কাছে চোখের দৃষ্টির দূরত্ব পর্যন্ত বসে যায়। তারপর মালাকুল মাউত আলাইহিস সালাম আসেন এবং তার মাথার কাছে বসেন। তিনি বলেন, হে পবিত্র নফস, তুমি বের হয়ে আল্লাহর মাগফিরাত ও সন্তুষ্টির দিকে চলে আসো। তিনি বলেন, ফলে রূহটি মশকের মুখ থেকে পানির ফোটা গড়িয়ে আসার মতই বের হয়ে আসে। তিনি তাকে গ্রহণ করেন। আর তিনি তাকে গ্রহণ করে চোখের পলক পরিমাণ সময়ও নিজ হাতে না রেখে ঐ কাফনে ও ঐ সুগন্ধিতে রেখে দেন। আর তার থেকে দুনিয়াতে বিদ্যমান সবচেয়ে পবিত্র মিসকের ঘ্রাণ বের হয়। তিনি বলেন, তারা তাকে নিয়ে ওপরে ওঠে যান। তারা তাকে নিয়ে ফেরেশতাদের এমন কোনো জামাত অতিক্রম করেন না যারা বলে না যে, এই পবিত্র রূহ কী? তারা বলেন, অমুকের পুত্র অমুক। তাকে দুনিয়াতে সবচেয়ে সুন্দর যে নামে ডাকা হতো সে নাম উল্লেখ করেন। অবশেষে তারা দুনিয়ার আসমানে গিয়ে পৌঁছেন। তারা তার জন্য দরজা খোলার অনুমতি প্রার্থনা করেন, ফলে তাদের জন্য দরজা খুলে দেওয়া হয়। আর প্রত্যেক আসমানের নিকটবর্তী ফেরেশতারা পরবর্তী আসমান পর্যন্ত তাকে এগিয়ে দেন। অবশেষে তাকে নিয়ে সপ্তম আসমানে পৌঁছা হয়। তারপর আল্লাহ বলেন, আমার বান্দার কিতাব ইল্লিয়ীনদের ভেতর লিখে রাখ এবং তাকে জমিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাও। কারণ, আমি তাদেরকে তার থেকেই সৃষ্টি করেছি এবং তাদেরকে তাতেই ফিরিয়ে নিব তারপর আবার তা থেকেই তাদেরকে বের করবো। তিনি বলেন, ফলে তার রূহ তার শরীরে ফিরিয়ে দেওয়া হয়...) {আবূ দাউদ (৩২১২), নাসাঈ (২০০১), ইবনু মাজাহ (১৫৪৮), মুসনাদ আবূ দাউদ তায়ালিসী (৭৮৯), মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক (৬৩২৪, ৬৭৩৭), আহমাদ (১৮৫৩৪), হাদীসের শব্দ মুসনাদে আহমাদ থেকে গৃহীত।} নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীসে উল্লেখ করেছেন যে, রূহ বের হয়, গড়িয়ে আসে, কবয করা হয়, তাকে কাফন পড়ানো হয় এবং তাকে নিয়ে ওপরে ওঠা হয় ও নিচে নামা হয়। আর এসবই হলো মাখলুকের অবস্থা।
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, রূহসমূহ শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর কিয়ামত পর্যন্ত নিয়ামতে অথবা শাস্তিতে অবস্থান করে। যেমন কা‘ব ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (মুমিনের রূহ জান্নাতের গাছে পাখির ন্যায় থাকে, আল্লাহ যতক্ষণ না কিয়ামতের দিন তাকে তার শরীরে ফিরিয়ে দিবেন।) {নাসাঈ (২০৭৩), তিরমিযী (১৬৪১) ইবনু মাজাহ (৪২৭১), আব্দুর রাজ্জাক, আত-তাফসীর (৪৮৪, ২৬৮১), মুসনাদ আল-হুমাইদী (৮৯৭), আহমাদ (১৫৭৭৬, ১৫৭৭৭)}
মাসরূক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আব্দুল্লাহ বিন মাসউদকে এই আয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি: {وَلاَ تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ قُتِلُواْ فِي سَبِيلِ اللّهِ أَمْوَاتًا بَلْ أَحْيَاء عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُون} অর্থ : (আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়েছে তাদেরকে কখনোই মৃত মনে করো না; বরং তারা জীবিত এবং তাদের রবের কাছ থেকে তারা জীবিকাপ্রাপ্ত।) [আলে-ইমরান : 169] তিনি বললেন: আমরাও এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি, ফলে তিনি বলেছেন: (তাদের রুহসমূহ সবুজ পাখির উদরে রক্ষিত থাকে, যা আরশের সাথে ঝুলন্ত দীপাধারে বাস করে। জান্নাতের সর্বত্র তারা যেখানে চায় সেখানে বিচরণ করে। অবশেষে সে দীপাধারগুলোতে ফিরে আসে...।) {মুসলিম (১৮৮৭), তিরমিযী (৩০১১), ইবনু মাজাহ (২৮০১)}
পর্ব : দ্বীন (ইসলাম ধর্ম)
এ পর্বের সারাংশ
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ দ্বীন হিসেবে ইসলামকে পছন্দ করেছেন। ইসলামই হলো সকল নবী ও রাসূল আলাইহিস সালামদের দ্বীন। এটি এমন দ্বীন (ফিতরাত) যার ওপর মানুষকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। এটি সেই অঙ্গীকার যা আদম ও তার বংশধর থেকে আল্লাহ গ্রহণ করেছেন।
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার সন্তানদেরকে এই ইসলামেরই অসিয়ত করে গেছেন। এটি ইয়াকুব আলাইহিস সালামেরও তার সন্তানদের প্রতি অসিয়ত ছিল। এটা সবচেয়ে সুন্দর, পরিপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ দ্বীন। আল্লাহ এই দ্বীন ছাড়া কোনো দ্বীনই গ্রহণ করবেন না।
আমরা বিশ্বাস করি যে, এই সেই দ্বীন জিবরীল আমীন যা নিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতরণ করেছেন। এই দ্বীনের কয়েকটি স্তর রয়েছে, তা হলো: ইসলাম, ঈমান ও ইহসান। এগুলো প্রত্যেকটির অনেক রোকন রয়েছে।
আর অবশ্যই এই দীন হলো সকল কল্যাণের সমষ্টি এবং অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলকে অন্তর্ভুক্তকারী।
আমরা জানি যে, ঈমান হলো কথা, কর্ম ও বিশ্বাসের সমষ্টি। আর ঈমানওয়ালারা তাদের আমল অনুযায়ী পরস্পর শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী হয়। আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, ঈমান বাড়ে ও কমে। নেকির দ্বারা বাড়ে আর পাপের দ্বারা কমে।
আমরা সাক্ষ্য দেই যে, ঈমানদারেরাই দুনিয়া ও আখিরাতে সফল। আর এই সত্য দ্বীনের অনুসারীদের স্তর ও মর্যাদার ভিন্নতাসহ তাদের সবারই শেষ ঠিকানা হলো জান্নাত।
আমরা আরো জানি যে, সুন্নাহ মেনে চলা ও তা আঁকড়ে ধরার নির্দেশ সম্বলিত এবং এর বিরোধিতা থেকে সতর্কীকরণ মর্মে বহু পবিত্র আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। তেমনিভাবে দলাদলি ও মতবিরোধ থেকেও নিষেধ করেছে।
অধ্যায়: নিশ্চয় আল্লাহর কাছে একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর আমি তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করেছি।) [আল-মায়েদা : ৩] তিনি আরে বলেন: (নিশ্চয় আল্লাহর কাছে একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম) [আলে ইমরান : ১৯] ইসলাম হলো সকল নবী ও রাসূলগণের দ্বীন। আল্লাহ তা‘আলা নূহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেছেন: (আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হতে আদিষ্ট হয়েছি।) [ইউনুস : ৭২] আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন: (স্মরণ করুন, যখন তার রব তাকে বলেছিলেন, ‘আত্মসমর্পণ করুন’, তিনি বলেছিলেন, ‘আমি সৃষ্টিকুলের রব-এর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম’।)
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ দ্বীনকে আমাদের জন্য পরিপূর্ণ করেছেন। অতএব তাতে কোনো ধরনের ত্রুটি নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আজকের দিন আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করছি। আর তোমাদের ওপর আমার নিআমতকে সম্পন্ন করছি। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করছি।) [আল-মায়েদা : ৩] ইসলাম হলো সবচেয়ে সুন্দর,পরিপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ দ্বীন। এই দ্বীন হলো ইবরাহীম আলাইহিস সালামের একনিষ্ঠ ধর্ম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তার চেয়ে দ্বীনে আর কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের মিল্লাতকে অনুসরণ করে? আর আল্লাহ ইবরাহীমকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।) [আন-নিসা : ১২৫] তিনি আরো বলেন: (আর যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ছাড়া ইবরাহীম এর মিল্লাত হতে আর কে বিমুখ হবে ! দুনিয়াতে তাকে আমি মনোনীত করেছি, আর আখেরাতেও তিনি অবশ্যই সৎ কর্মশীলদের অন্যতম।) [আল-বাকারাহ : ১৩০] মহা সম্মানিত ও পবিত্র নামসমূহের অধিকারী আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম সম্পর্কে বলেন: (ইবরাহীম ইয়াহূদীও ছিলেন না, নাসারাও ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।) [আলে ইমরান : ৬৭]
এটিই সেই ফিতরাত (দ্বীন) যার ওপর মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (কাজেই আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজ চেহারাকে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দ্বীন ইসলাম), যার উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।) [আর-রূম : ৩০]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (সকল মানব শিশুই ফিতরাত (ইসলাম)-এর ওপর জন্ম গ্রহন করে। তারপর তার পিতা ও মাতা তাকে ইয়াহূদী, নাসারা অথবা অগ্নি উপাসক বানায়। যেমন কোন জন্তু পূর্ণ বাচ্চার জন্ম দেয়। তোমরা কি তার মধ্যে কোনো ত্রুটি দেখতে পাও?) অতঃপর আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু এ আয়াত পাঠ করলেন: (আল্লাহর প্রকৃতির অনুসরণ কর) যে প্রকৃতি মুতাবিক তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল দ্বীন।) [আর-রূম : ৩০] {বুখারী (১৩৮৫), মুসলিম (২৬৫৮), আবূ দাউদ (৪৭১৪), তিরমিযী (২১৩৮)} এটি সেই অঙ্গিকার যা আদম ও তার সন্তানদের থেকে আল্লাহ তা‘আলা গ্রহণ করেছেন। সম্মানিত মহাসত্য আল্লাহ বলেন: (আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব আদম-সন্তানের পিঠ থেকে তার বংশধরকে বের করেন এবং তাদের নিজেদের সম্বদ্ধে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেন এবং বলেন, ‘আমি কি তোমাদের রব নই?’ তারা বলেছিল, ‘ হ্যাঁ অবশ্যই, আমরা সাক্ষী রইলাম।’ এটা এ জন্য যে, তোমরা যেন কিয়ামতের দিন না বল, ‘আমারা তো এ বিষয়ে গাফেল ছিলাম।‘) [আল-আরাফ: ১৭২]
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, ইসলাম ছাড়া কোনো দ্বীনই আল্লাহ গ্রহণ করবেন না। পবিত্র ও সুমহান আল্লাহ বলেন: (আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।) [আলে ইমরান : 85]
অধ্যায়: ইসলাম
আমরা বিশ্বাস করি যে, এটিই সেই দ্বীন যা নিয়ে জিবরীল আমীন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর অবতরণ করেছেন। এই দ্বীনের কতক স্তর রয়েছে, আর তা হলো ইসলাম, ঈমান ও ইহসান এবং তার প্রত্যেকটির অনেকগুলো রোকন রয়েছে। উমার বিন খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একদা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট উপস্থিত ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি আমাদের সামনে আবির্ভূত হলো। তার পরনের কাপড়-চোপড় ছিল ধবধবে সাদা এবং মাথার চুলগুলো ছিল মিশমিশে কালো। সফর করে আসার কোনো চিহ্নও তার মধ্যে দেখা যায়নি। আমাদের কেউ তাকে চিনেও না। অবশেষে সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে বসলো। সে তার হাটুদ্বয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাটুদ্বয়ের সাথে মিলিয়ে দিলো এবং দুই হাতের তালু তার উরুর উপর রাখলো এবং বলল, হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্বন্ধে বলুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ইসলাম হচ্ছে এই– তুমি সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত কায়িম করবে, যাকাত আদায় করবে, রমযানের সওম পালন করবে এবং যদি পথ অতিক্রম করার সামর্থ্য হয় তখন বাইতুল্লাহর হজ্জ করবে। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন। বর্ণনাকারী বলেন, আমরা তার কথা শুনে আশ্চর্যাম্বিত হলাম। কেননা সে (অজ্ঞের ন্যায়) প্রশ্ন করছে আর (বিজ্ঞের ন্যায়) সমর্থন করছে। এরপর সে বললো, আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর ফেরেশতাকুল, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতিও ঈমান রাখবে। সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন। এবার সে বললো, আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ইহসান এই যে, তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদাত করবে যেন তাকে দেখছো, যদি তাকে না দেখো তাহলে তিনি তোমাকে দেখছেন বলে অনুভব করবে। এবার সে জিজ্ঞেস করলো। আমাকে কিয়ামত সম্বন্ধে বলুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাকারীর চেয়ে জিজ্ঞাসিত ব্যক্তি বেশি কিছু জানে না। অতঃপর সে বলল, তাহলে আমাকে এর কিছু নির্দশন বলুন। তিনি বললেন, দাসী তার মনিবকে জন্ম দিবে এবং নগ্নপদ, বস্ত্রহীন, দরিদ্র ও বকরীর রাখালদের বড় দালান-কোঠা নির্মাণের প্রতিযোগিতায় গৰ্ব-অহংকারে মত্ত দেখতে পাবে। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর লোকটি চলে গেলো। আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে উমর! তুমি জান, এ প্রশ্নকারী কে? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি জিবরীল। তোমাদের কাছে তিনি তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।) {মুসলিম (৮), আবূ দাউদ (৪৬৯৫), তিরমিযী (২৬১০), নাসাঈ (৪৯৯০), ইবনু মাজাহ (৬৩)}
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের রোকনগুলো অন্যান্য হাদীসে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: (ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি। সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া সত্যিকার কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। সালাত কায়েম করা, যাকাত আদায় করা, হজ করা এবং রমযানের সাওম আদায় করা।) {বুখারী (৮), মুসলিম (১৬), তিরমিযী (২৬০৯), নাসাঈ (৫০০১)} ত্বলহা বিন উবাইদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, জনৈক নাজ্দবাসী আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট এলো। তার মাথার চুল ছিল এলোমেলো। আমরা তার কথার মৃদু আওয়ায শুনতে পাচ্ছিলাম, কিন্তু সে কী বলছিল, আমরা তা বুঝতে পারছিলাম না। এভাবে সে নিকটে এসে ইসলাম সম্পর্কে প্রশ্ন করতে লাগল। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ’দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত’। সে বলল, ’আমার উপর এ ছাড়া আরো সালাত আছে?’ তিনি বললেনঃ ’না, তবে নফল আদায় করতে পার।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ’আর রমাযানের সওম।’ সে বলল, ’আমার উপর এছাড়া আরো সওম আছে?’ তিনি বললেন: ’না, তবে নফল আদায় করতে পার।’ বর্ণনাকারী বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিকট যাকাতের কথা বললেন। সে বলল, ’আমার উপর এছাড়া আরো আছে?’ তিনি বললেন: ’না; তবে নফল হিসেবে দিতে পার।’ বর্ণনাকারী বলেন, ’সে ব্যক্তি এই বলে চলে গেলেন; ’আল্লাহর শপথ’’ আমি এর চেয়ে অধিকও করব না এবং কমও করব না।’ তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ’সে কৃতকার্য হবে যদি সত্য বলে থাকে।’ {বুখারী (৪৬), মুসলিম (১১), আবূ দাউদ (৩৯১), নাসাঈ (৪৫৮)}
মহান আল্লাহ বলেন: (আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে এবং সালাত কায়েম করে ও যাকাত প্ৰদান করে। আর এটাই সঠিক দ্বীন।) [আল-বায়্যিনাহ: ৫] আল্লাহ আরো বলেন: (কিন্তু যদি তারা তাওবা করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও; নিশ্চয় আল্লাহ্ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।) [আত-তাওবাহ : ৫] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরো বলেন: (অতএব তারা যদি তাওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তবে দ্বীনের মধ্যে তারা তোমাদের ভাই।) [আত-তাওবাহ: ১১] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আমাকে লোকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করবে ও যাকাত প্রদান করবে। যখন তারা এ কাজগুলো সম্পাদন করবে, তখন তারা আমার নিকট থেকে তাদের রক্ত (জান) এবং মাল বাঁচিয়ে নেবে; কিন্তু ইসলামের হক ব্যতীত। আর তাদের হিসাব আল্লাহর ওপর ন্যস্ত হবে।) {(বুখারী (২৫), মুসলিম (২২)}
আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তারা (সাহাবাগণ) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! ইসলামে কোন্ জিনিসটি উত্তম? তিনি বললেন: (যার জিহবা ও হাত হতে মুসলিমগণ নিরাপদ থাকে।) {বুখারী (১১), মুসলিম (৪২), তিরমিযী (২৫০৪), নাসাঈ (৪৯৯৯)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (বান্দা যখন ইসলাম গ্রহণ করে এবং তার ইসলাম উত্তম হয়, আল্লাহ্ তা‘আলা তার পূর্বের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেন। অতঃপর শুরু হয় বদলা; একটি পুণ্যের বিনিময় দশ হতে সাতশ গুণ পর্যন্ত; আর একটি পাপ কাজের বিনিময়ে ঠিক ততটুকু মন্দ প্রতিফল। অবশ্য আল্লাহ্ যদি ক্ষমা করে দেন তবে তা অন্য ব্যাপার।) {বুখারী, মুআল্লাক হিসেবে বর্ণনা করেছেন (৪১), নাসাঈ (৪৯৯৮)}
অধ্যায়: ঈমান
আমরা বিশ্বাস করি যে, দীনের স্তরসমূহ হতে দ্বিতীয় স্তর হলো ঈমান। আর ঈমানের সংজ্ঞা জিবরীল যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই বলে জিজ্ঞেস করেছেন যে, আমাকে ঈমান সম্পর্কে বলুন, তখন তিনি যে উত্তর দিয়েছেন তাতে রয়েছে। তিনি বলেছেন: (ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর ফেরেশতাকুল, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতিও ঈমান রাখবে।) সে বললো, আপনি সত্যই বলেছেন,... এরপর লোকটি চলে গেলো। আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, হে উমার! তুমি জান, এ প্রশ্নকারী কে? আমি আরয করলাম, আল্লাহ ও তার রাসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তিনি জিবরীল। তোমাদের কাছে তিনি তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছিলেন।) {মুসলিম (৮), আবূ দাউদ (৪৬৯৫), তিরমিযী (২৬১০), নাসাঈ (৪৯৯০), ইবনু মাজাহ (৬৩)}
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পূর্বে উল্লিখিত জিবরীল আলাইহিস সালামের হাদীসে যদিও বিশেষ অর্থে ঈমানের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, আর তা হলো: “ঈমান এই যে, তুমি আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং তাঁর ফেরেশতাকুল, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল এবং তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতিও ঈমান রাখবে।” তবে ঈমান আরো ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হয়, যা সকল কল্যাণকে অন্তর্ভুক্তকারী এবং অন্তর ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমলকে অন্তর্ভুক্তকারী। পবিত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করা হলে কম্পিত হয় এবং তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হলে তা তাদের ঈমান বর্ধিত করে। আর তারা তাদের রব–এর উপরই নির্ভর করে,* যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।* তারাই প্রকৃত মুমিন। তাদের রব এর কাছে তাদেরই জন্য রয়েছে উচ্চ মর্যাদাসমূহ, ক্ষমা এবং সম্মানজনক জীবিকা।) [আল-আনফাল: ২-৪]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আব্দুল কায়েস এর প্রতিনিধি দলের জন্য বাহ্যিক আমলগুলো দ্বারা ইসলামের ব্যাখ্যা করেছেন। সহীহ গ্রন্থে ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবদুল কায়েস-এর একটি প্রতিনিধি দল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আগমন করলে তিনি বললেন: তোমরা কোন গোত্রের? কিংবা বললেন, কোন্ প্রতিনিধিদলের? তারা বলল, ‘রাবী‘আ গোত্রের।’ তিনি বললেন: স্বাগতম সে গোত্র বা সে প্রতিনিধি দলের প্রতি, যারা অপদস্থ ও লজ্জিত না হয়েই আগমন করেছে। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! হারাম মাসগুলো ব্যতীত অন্য কোনো সময় আমরা আপনার নিকট আগমন করতে পারি না। আমাদের এবং আপনার মধ্যে মুযার গোত্রীয় কাফিরদের বসবাস। তাই আমাদের কিছু স্পষ্ট নির্দেশ দিন, যাতে আমরা যাদের পিছনে ছেড়ে এসেছি তাদের অবগত করতে পারি এবং যাতে আমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারি। তারা পানীয় সম্বন্ধেও জিজ্ঞেস করল। তখন তিনি তাদেরকে চারটি বিষয়ের আদেশ এবং চারটি বিষয় হতে নিষেধ করলেন। তাদেরকে এক আল্লাহ্তে বিশ্বাস স্থাপনের নির্দেশ দিয়ে বললেন: ‘এক আল্লাহর প্রতি কিভাবে বিশ্বাস স্থাপন করা হয় তা কি তোমরা অবগত আছ?’ তারা বলল, ‘আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত।’ তিনি বললেন: (তা হচ্ছে এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ্ ব্যতীত প্রকৃত কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল, সালাত প্রতিষ্ঠা করা, যাকাত আদায় করা, রমাযানের সিয়াম পালন করা; আর তোমরা গানীমাতের সম্পদ হতে এক-পঞ্চমাংশ আদায় করবে।) তিনি তাদেরকে চারটি বিষয় হতে বিরত থাকতে বললেন: “হানতাম হতে, (হানতাম হলো: তৈল মালিশ করা কলস যার ভেতর মদ বহন করা হতো। ‘আন-নিহায়াহ ফি গারিবিল হাদীস’ (১/৪৪৮)।), দুব্বা হতে, (দুব্বা হলো: শুকনো কদুর খোল, তাতে তারা নাবিয তৈরি করত এবং এর ভেতর দ্রুত তেজস্ক্রিয়া তৈরি হত। আন-নিয়াহ ফি গারিবিল হাদীস (১/৯৬)।), নাকীর হতে, (নাকীর হলো: খেজুর বৃক্ষের গুড়ি হতে তৈরী বাসন। তাতে খেজুর ও পানি রেখে দেয়া হয় যেন নেশাদার নাবীয তৈরি হয়। আন-নিহায়াহ ফি গারিবিল হাদীস (৫/১০৪)।), এবং মুযাফফাত হতে, (মুযাফফাত হলো: আলকাতরা দ্বারা রাঙানো পাত্র। রাবী বলেন, বর্ণনাকারী (মুযাফ্ফাত-এর স্থলে) কখনও মুকাইয়ার উল্লেখ করেছেন (দু‘টি শব্দের অর্থ একই)। তিনি আরো বলেন, তোমরা এ বিষয়গুলো ভালো করে জেনে নাও এবং অন্যদেরও এগুলো অবগত কর।) {বুখারী (৫৩), মুসলিম (১৭), আবূ দাউদ (৩৬৯২), তিরমিযী (২৬১১), নাসাঈ (৫০৩১)}
ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ তার সহীহ বুখারীতে বিষয়ে একটি অধ্যায় কায়েম করেছেন। তাতে তিনি বলেন, “অধ্যায়: ঈমানের বিভিন্ন বিষয় এবং আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফিরানোই সৎকর্ম নয়, কিন্তু সৎকর্ম হলো যে ব্যক্তি আল্লাহ্, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনবে। আর সম্পদ দান করবে তার ভালবাসায় আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও দাসমুক্তির জন্য এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত দিবে, ওয়াদা দিয়ে তা পূর্ণ করবে, অর্থ-সংকটে, দুঃখ-কষ্টে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করবে। তারাই সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী।) [আল-বাকারাহ : ১৭৭]
আমরা বিশ্বাস করি যে, ঈমান হলো কথা, আমল ও বিশ্বাসের সমষ্টি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (ঈমানের সত্তর অথবা ষাটের বেশি শাখা রয়েছে। তার মধ্যে সর্বোত্তম শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা, আর সর্বনিম্ন হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিস দূরীভূত করা। আর লজ্জা ঈমানের একটি শাখা।) {বুখারী (৯), মুসলিম (৩৫), হাদিসের শব্দ সহীহ মুসলিম থেকে গৃহীত, আবূ দাউদ (৪৬৭৬), তিরমিযী (২৬১৪), নাসাঈ (৫০০৫), ইবনু মাজাহ (৫৭)}
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, ঈমানদারদের মধ্যে তাদের আমলগত দিক থেকে পার্থক্য রয়েছে। যেমন, আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (জান্নাতবাসীরা জান্নাতে এবং জাহান্নামীরা জাহান্নামে প্রবেশ করবে। অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা মালায়েকাদের বলবেন, যার অন্তরে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান আছে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করে আনো। ফলে সেখান থেকে তাদেরকে বের করে আনা হবে এমন অবস্থায় যে, তারা পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে। অতঃপর তাদেরকে হায়াতের নহরে অথবা উর্বরতার নহরে [বর্ণনাকারী মালিক এর সন্দেহ] নিক্ষেপ করা হবে। ফলে তারা নালার পাশে গজিয়ে উঠা চারা গাছের ন্যায় সতেজ হয়ে উঠবে। তুমি কি দেখনি সেগুলো ঘন হলুদ হয়ে বের হয়?!) {বুখারী (২২), মুসলিম (১৮৪)}
আবূ উমামাহ বিন সাহাল ইবন হানীফ থেকে বর্ণিত, তিনি আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলতে শুনেছেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (একবার আমি নিদ্রাবস্থায় (স্বপ্নে) দেখলাম যে, লোকদেরকে আমার সামনে আনা হচ্ছে। আর তাদের পরনে রয়েছে জামা। কারো জামা বুক পর্যন্ত আর কারো জামা এর নীচ পর্যন্ত। আর উমার ইবনুল খাত্তাব-কে আমার সামনে আনা হল এমন অবস্থায় যে, তিনি তার জামা (অধিক লম্বা হওয়ায়) টেনে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সাহাবীগণ আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি এর কী তা’বীর করেছেন? তিনি বললেন: “দ্বীন”।) {বুখারী (২৩), মুসলিম (২৩৯০), তিরমিযী (২২৮৫), তিরমিযীর সনদে রয়েছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কতক সাহাবী থেকে বর্ণিত। নাসাঈ (৫০১১)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, ঈমান বাড়ে ও কমে। সৎকাজের দ্বারা বাড়ে ও পাপের দ্বারা কমে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আমি আপনার কাছে তাদের বৃত্তান্ত সঠিকভাবে বর্ণনা করছি; তারা তো ছিল কয়েকজন যুবক, তারা তাদের রবের উপর ঈমান এনেছিল এবং আমি তাদের হিদায়াত বৃদ্ধি করে দিয়েছিলাম।) [আল-কাহাফ : ১৩] তিনি আরো বলেন: (আর ঈমানদারদের ঈমান বেড়ে যায়) [আল-মুদ্দাসসির: ৩১]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (যে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকে, তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে। যে ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকে তাকে জাহান্নাম হতে বের করা হবে। আর যে ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলবে আর তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকী থাকে তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে।) {বুখারী (৪৪), মুসলিম (১৯৩), তিরমিযী (২৫৯৩)}
উমর বিন আব্দুল আযীয আদী বিন আদীর প্রতি লিখেছেন: (নিশ্চয় ঈমানের কিছু ফরয, বিধান, সীমা ও সুন্নাত রয়েছে। যে এগুলো পূর্ণ করলো সে ঈমানকে পূর্ণ করলো। আর যে তা পূর্ণ করল না সে ঈমানকে পূর্ণ করল না। যদি আমি বেঁচে থাকি, তাহলে তা তোমাদের জন্য বর্ণনা করে দিব যেন তার ওপর তোমরা আমল করতে পারো। আর যদি মারা যাই, তাহলে তোমাদের সঙ্গী হওয়ার প্রতি আমি তেমন আগ্রহী নই।) {বুখারী, মুআল্লাক হিসেবে (১/১০), ইবনু আবি শায়বাহ, আল-মুসান্নাফ (৩১০৮৪) এবং আল-ঈমান (১৩৫), খাল্লাল, আস-সুন্নাহ (১১৬২, ১৫৫৩) ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (১১৬৬), আল-লালেকায়ী, শারহু উসূলী ই‘তিকাদি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (১৫৭২)}
মা‘মার, সুফিয়ান সাওরী, মালিক বিন আনাস, ইবনু জুরাইজ, সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ প্রমুখ বলেন: (ঈমান হলো কথা ও কর্মের সমষ্টি এবং তা বাড়ে ও হ্রাস পায়।) {আল-ইবানাতুল কুবরা (২/৮০৬), আল-আজুররী, আশ-শারিয়াহ (২/৬০৬)}
হাফিয আবূ বকর আব্দুল্লাহ বিন যুবাইর আল-হুমাইদি বলেন: (...ঈমান হলো কথা ও কর্মের সমষ্টি, তা বাড়ে ও কমে। আমল ছাড়া কথা কোনো উপকারে আসবে না। আর কোনো আমল ও কথা নিয়ত ছাড়া উপকার করবে না। আবার কোনো কথা, আমল ও নিয়ত সুন্নাত ছাড়া উপকার করবে না।) আল-হুমাইদি, উসূলুস সুন্নাহ (পৃ.৩৭)
খাল্লাল বলেন: (আমাকে আব্দুল মালিক আল-মায়মুনী সংবাদ দিয়েছেন, তিনি বলেন, আমাকে ইয়ালা বিন উবাইদ ষাট বছর যাবত বলেছেন, ঈমান হলো কথা ও আমলের সমষ্টি। আর যে ব্যক্তি সিয়াম রাখে, সালাত আদায় করে ও নেক আমল করে সে নিশ্চয় যেনাকারী ও চোরের চেয়ে বেশী ঈমানের অধিকারী।) আবূ বকর বিন খাল্লাল, আস-সুন্নাহ (৩/৫৯০)
ইবনু আবী হাতিম বলেন: (আমি আমার বাবা ও আবূ যুরআকে দ্বীনের উসূল সম্পর্কে আহলুস সুন্নাহর মাযহাব এবং তারা বিভিন্ন অঞ্চলের আলেমদেরকে যার ওপর পেয়েছেন, আর তারা দু’জন যা বিশ্বাস করেন সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তখন তারা বললেন, আমরা সকল অঞ্চলের, যেমন হিজাজ, ইরাক, শাম এবং ইয়েমেনের আলেমদের পেয়েছি যে, তাদের মাযহাব ছিল: ঈমান হলো কথা ও কর্মের সমষ্টি এবং তা বাড়ে ও কমে।) {শারহু উসূলি ইতিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (১/১৯৮), ইবনু আবূ জায়েদ আল-কায়রাওয়ানী, আল-রিসালাহ কিতাবের ভূমিকায় লিখিত “আকিদাতুস সালাফ”। (পৃ.২৯)}
ইমাম লালেকায়ী বলেন: “ঈমান হলো কথা ও কর্মের সমষ্টি। এ কথাটি অসংখ্য ফকিহ বলেছেন, যেমন: মালিক বিন আনাস, আব্দুল আযীয বিন আবূ সালামাহ আল-মাজেশুন, লাইস বিন সা‘দ, আওযায়ী, সাঈদ বিন আব্দুল আযীয, ইবনু জুরাইজ, সুফিয়ান বিন উয়াইনাহ, ফুযাইল বিন ইয়ায, নাফি বিন ওমর আল-জুমাহী, মুহাম্মাদ বিন মুসলিম আত-তায়েফী, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ বিন আমর বিন উসমান বিন আফফান, মুসান্না বিন সাব্বাহ, শাফেয়ী, আব্দুল্লাহ বিন যুবায়ের আল-হুমাইদী, আবূ ইবরাহীম আল-মুযানী, সুফিয়ান আস-সাওরী, শারীক, আবূ বকর বিন আইয়াশ, ওয়াকী, হাম্মাদ বিন সালামাহ, হাম্মাদ বিন জায়েদ, ইয়াহইয়া বিন সায়ীদ আল-কাহতানী, আব্দুল্লাহ বিন মুবারক, আবূ ইসহাক আল-ফাযারী, নাযর বিন মুহাম্মাদ আল-মারওয়াযী, নাযর বিন শুমাইল, আহমাদ বিন হাম্বল, ইসহাক বিন রাহুয়াহ, আবূ সাউর ও আবূ উবাইদ প্রমূখ।” {ইমাম আল-লালেকায়ী, শারহু উসূলী ই‘তিকাদি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (৪/৯১৩)}
আবূ আব্দুল্লাহ বিন আবূ যামানীন “উসূলুস সুন্নাহ” নামক কিতাবে বলেন: “অধ্যায়: ঈমান হলো কথা ও কর্মের সমষ্টি। আহলুস সুন্নাহর বক্তব্য অনুযায়ী: ঈমান হলো অন্তরে আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠতা, মুখে সাক্ষ্যদান, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা সৎকর্ম সম্পাদন- উত্তম নিয়তের সাথে ও সুন্নাহর যথার্থতা অনুযায়ী।” উসূলুস সুন্নাহ (পৃ.২০৭)
অধ্যায়: ইহসান
আমরা বিশ্বাস করি যে, দ্বীনের তৃতীয় স্তর হলো ইহসান। আর ইহসানের সংজ্ঞা জিবরীল যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এই বলে জিজ্ঞেস করেছেন যে, আমাকে ইহসান সম্পর্কে বলুন, তখন তিনি যে উত্তর দিয়েছেন তাতে রয়েছে। তিনি বলেছেন: (তুমি এমনভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে যেন তুমি তাকে দেখছো। যদি তুমি তাকে না দেখ তাহলে তিনি অবশ্যই তোমাকে দেখছেন।...) উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন: এরপর লোকটি চলে গেলো। আমি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে বললেন, হে উমর! তুমি জান, এ প্রশ্নকারী কে? আমি আরয করলাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই অধিক জ্ঞাত আছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তিনি জিবরীল। তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের দ্বীন শিক্ষা দিতে এসেছেন।) {মুসলিম (৮), আবূ দাউদ (৪৬৯৫), তিরমিযী (২৬১০), নাসাঈ (৪৯৯০), ইবনু মাজাহ (৬৩)}
মহা সম্মানিত আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন যে, এই সত্য দ্বীনের অনুসারীদের স্তর ও মর্যাদার অনুপাতে শেষ ঠিকানা হলো জান্নাত। তারা আহলুল ইসলাম হোক বা আহলুল ঈমান হোক বা আহলুল ইহসান হোক। মহা সম্মানিত ও মহা উচ্চ রাজত্বের অধিকারী আল্লাহ বলেন: (আর আমি কিতাব হতে আপনার প্রতি যে ওহী করেছি তা সত্য, এর আগে যা রয়েছে তার প্রত্যয়নকারী। নিশ্চয় আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবহিত, সর্বদ্রষ্টা।* তারপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম তাদেরকে, যাদেরকে আমার বান্দাদের মধ্য থেকে আমি মনোনীত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যমপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণের কাজে অগ্রগামী। এটাই তো মহাঅনুগ্রহ।* স্থায়ী জান্নাত, যাতে তারা প্রবেশ করবে, সেখানে তাদেরকে স্বর্ণ নির্মিত কংকন ও মুক্তা দ্বারা অলংকৃত করা হবে এবং সেখানে তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ হবে রেশমের।* এবং তারা বলবে, 'প্রশংসা আল্লাহর যিনি আমাদের দুঃখ-দুর্দশা দূরিভূত করেছেন; নিশ্চয় আমাদের রব তো পরম ক্ষমাশীল, অসীম গুনগ্রাহী।) [ফাতির: ৩১-৩৪]
অধ্যায়: সুন্নাত মেনে চলা ও তা আঁকড়ে ধরার নির্দেশ।
সুন্নাত মেনে চলা ও তা আঁকড়ে ধরার নির্দেশ, আর তার বিরোধিতা থেকে সতর্ক এবং বিচ্ছিন্নতা ও বিরোধ থেকে নিষেধ করে অনেক আয়াত ও হাদীস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আর্দশ, তার জন্য যে আসা রাখে আল্লাহ্ ও শেষ দিনের এবং আল্লাহ্কে বেশী স্মরণ করে।) [আল-আহযাব: ২১] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (নিশ্চয় যারা তাদের দ্বীনকে খণ্ড-বিখণ্ড করেছে, তাদের ব্যাপারে তোমার কোন দায়িত্ব নেই।) [আল-আন‘আম: ১৫৯] তিনি আরো বলেন: (তিনি তোমাদের জন্য দ্বীন নির্ধারণ করেছেন, যার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন নূহকে। আর যা আমি ওহী হিসেবে নাযিল করেছি তোমার কাছে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা এবং ঈসাকেও। এ বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি করো না।) [আশ-শুরা : ১৩]
জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (অতঃপর, সবচেয়ে ভালো কথা হলো আল্লাহর বাণী, আর সবচেয়ে উত্তম আদর্শ হলো মুহাম্মাদের আদর্শ। আর সবচেয়ে খারাপ বিষয় হলো বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআতই গোমরাহী।) {মুসলিম (৮৬৭), নাসাঈ (১৫৭৮), আবূ দাউদ (২৯৫৪), ইবনু মাজাহ (৪৫)}
আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আমার সকল উম্মাতই জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যে অস্বীকার করবে সে ছাড়া। তারা বললেন, কে অস্বীকার করবে। তিনি বললেন: যারা আমার অনুসরণ করবে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে আমার অবাধ্য হবে সে-ই অস্বীকার করবে।) বুখারী (৭২৮০)
ইরবায বিন সারিয়াহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ফজরের সালাতের পর একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে জ্বালাময়ী ভাষণ দিলেন, তাতে চোখগুলো অশ্রুসিক্ত হলো এবং অন্তরগুলো বিগলিত হলো। তখন এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ যেন কারো বিদায়ী ভাষণ! অতএব আপনি আমাদেরকে কি নির্দেশ দেন? তিনি বলেন: (আমি তোমাদেরকে আল্লাহভীতির, শ্রবণ ও আনুগত্যের উপদেশ দিচ্ছি, যদিও সে (আমীর) একজন হাবশী গোলাম হয়। কারণ তোমাদের মধ্যে যারা আমার পরে জীবিত থাকবে তারা অচিরেই প্রচুর মতবিরোধ দেখবে। তখন তোমরা অবশ্যই আমার সুন্নাত এবং আমার হিদায়াতপ্রাপ্ত খলীফাহগণের সুন্নাত অনুসরণ করবে, তা দাঁত দিয়ে কামড়ে আঁকড়ে থাকবে।) {আবূ দাউদ (৪৬০৭), তিরমিযী (২৬৭৬), ইবনু মাজাহ (৪২), আহমাদ (১৭৪১৬), দারিমী (৯৬), হাদীসটিকে ইমাম তিরমিযী সহীহ বলেছেন।}
ইমাম বুখারী তার সহীহ গ্রন্থের (পর্ব: কিতাব ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা)-তে বলেন, “অধ্যায়: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অনুসরণ করা এবং আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার বাণী: {وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا} অর্থ: (আমাদেরকে মুত্তাকীদের ইমাম বানিয়ে দাও), অর্থাৎ, এরূপ ইমাম যে আমরা আমাদের পূর্ববর্তীদের অনুসরণ করব, আর আমাদের পরবর্তীরা আমাদের অনুসরণ করবে। ইবনু আউন বলেন: তিনটি বিষয় আমি আমার নিজের জন্য ও আমার ভাইদের জন্য পছন্দ করি: এই সুন্নাহ- তারা যেন তা শিখে এবং জানার জন্য এ বিষয়ে প্রশ্ন করে, এই কুরআন- তারা যেন তা ভালভাবে বুঝতে চেষ্টা করে এবং জানার জন্য এ বিষয়ে প্রশ্ন করে, এবং তারা যেন মানুষকে একমাত্র কল্যাণের দিকে আহবান জানায়।” সহীহ বুখারী : (৮/১৩৯)
পর্ব: আল্লাহর প্রতি ঈমান।
পর্বটির সারাংশ
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহই হলেন প্রথম, তার পূর্বে কিছু নেই। তিনিই হলেন সর্বশেষ, তার পরে কিছুই নেই। আর তিনিই আমাদেরকে তার নিজের সম্পর্কে পরিচয় দিয়েছেন যে, তিনি আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। আর তিনিই আসমানসমূহ ও জমিনের সত্যিকার মালিক। তিনিই দিনের ভেতর রাতকে আবার রাতের ভেতর দিনকে অনুপ্রবেশ করান। তিনি পবিত্র ও মহা উচ্চ। আর দৃশ্যমান এই জগত সাক্ষ্য বহন কর যে, তিনিই হলেন এটার আস্তিত্বদানকারী, একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, তার সঙ্গে কোনো স্রষ্টা নেই।
তিনি এমন অনেক নিদর্শন উল্লেখ করেছেন, যা প্রমাণ করে যে, তিনিই এই জগতের অস্তিত্বদানকারী, স্রষ্টা। অনেক দলিল উল্লেখ করেছেন যা সমীক্ষায় আনা সম্ভবপর নয়। আর আমরা আমাদের মাঝে যা দেখি এবং আমাদের চার পাশে যা দেখি তার দ্বারা তিনি আমাদের ওপর দলিল পেশ করেছেন।
নবী ও রাসূলগণ যার প্রতি ঈমান এনেছেন আমরাও সেগুলোর প্রতি ঈমান আনয়ন করি এবং তারা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সত্ত্বাকে প্রমাণকারী যেসব দলিল ও প্রমাণ নিয়ে এসেছেন তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, কেবল আল্লাহ হলেন সৃষ্টিকর্তা। তিনি তাঁর মাখলুককে অযথা সৃষ্টি করেননি, বরং তার নিপুণ সৃষ্টির পেছনে রয়েছে মহান উদ্দেশ্য।
এগুলো ছাড়াও কুরআনুল কারীমে যেমন সূরা আনআম ও সূরা আন-নাহল প্রভৃতিতে অনেক দলিল রয়েছে যা গণনা করা সম্ভব নয় এবং অনেক প্রমাণ রয়েছে যা আয়ত্বে আনা কারো সাধ্যের বিষয় নয়। সবগুলো প্রমাণই আল্লাহর অস্তিত্ব ও রুবুবিয়্যাতকে প্রমাণ করে। আর সবগুলোই যুক্তিসম্মত প্রমাণ এবং বিশাল সাক্ষ্য। কেউ এগুলোর মত কিংবা এর কাছাকাছি দলিল পেশ করতে সক্ষম নয়। এসব দলিল ভিন্নতাসহ সকল মাখলুকের জন্য উপযোগী এবং তাদের সবার ওপর দলিল পেশ করতে সক্ষম। যদিও কাফিররা তা অস্বীকার করে এবং বাতিলপন্থীরা তা অপছন্দ করে। বস্তুত কাফিরদের অস্বীকার করা ও প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া কোনো দলিল আছে কী?!
আমরা বিশ্বাস করি যে,আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রুবুবিয়্যাতে এক এবং তিনি একাই সৃষ্টিকর্তা। তিনিই সৃষ্টির সূচনা করেছেন তাতে কেউ তাঁর শরীক ছিল না। আল্লাহ তাঁর সুমহান ও পবিত্র নির্দেশ দ্বারাই সৃষ্টি করেন। সুমহান ও পবিত্র আল্লাহ যেসব উপকরণ ইচ্ছে করেন সৃষ্টি করেন। আর তিনি ছাড়া যা কিছু রয়েছে সবই মাখলুক।
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ সব বস্তুর প্রতিপালক, স্রষ্টা, পরিকল্পনাকারী, মালিক এবং তিনি তাতে কর্তৃত্বকারী। আর কোনো মাখলুকই নিজের কোনো বিষয় অথবা অপরের কোনো বিষয় পরিচালনা করতে পারে না আল্লাহ তার ওপর যা নির্ধারণ করেছেন তার বাইরে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ সত্যিকার মালিক এবং তিনি ছাড়া যা কিছু রয়েছে সব তার মালিকানাধীন। আর প্রত্যেক বাদশাহর বাদশাহী বাতিল অথবা ক্ষণস্থায়ী।
আমরা বিশ্বাস করি যে, কেবল আল্লাহই জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা। তিনি এক ও পবিত্র। তিনিই জীবন ও মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন। আর তিনিই নফসসমূহকে মৃত্যু দান করেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ হলেন রিযিকদাতা, সুদৃঢ় শক্তিশালী। তিনি ছাড়া কেউ রিযিকদাতা নয়। তিনি ছাড়া কেউ যথেষ্ট নয়। আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাঁর ইলম দ্বারা সবকিছুকে বেষ্টন করে আছেন। কাজেই কোনো ছোট বা বড় তার ইলম থেকে আড়াল হতে পারে না। সুমহান ও পবিত্র আল্লাহ দৃশ্য ও অদৃশ্য সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমতা ও হিকমত দ্বারা সবকিছুকে অধীন করে রেখেছেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, সৃজন ও আদেশ সম্মানিত রবেরই। তিনি ছাড়া কোনো রব নেই, তিনি ছাড়া কোনো বিধানদাতা নেই। তিনিই মাখলুক সৃষ্টি করেছেন, শরীয়ত প্রবর্তন করেছেন, ফরযগুলোকে আবশ্যক করেছেন, দ্বীনকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনিই তাদের সকলের মালিক এবং তিনি একাই তাদের হিসাব গ্রহণ ও বিনিময় প্রদানে সক্ষম।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের স্রষ্টা এবং তাদের কর্মেরও স্রষ্টা।
আমরা বিশ্বাস করি যে, একজন মানুষের মুমিন হওয়ার জন্য আল্লাহর শুধু রুবুবিয়্যাতের প্রতি ঈমান আনাই যথেষ্ট নয়, আর এই ঈমান ব্যক্তিকে জান্নাতেও প্রবেশ করাবে না। কারণ, সে (এর দ্বারা) এক আল্লাহই সত্যিকার মা‘বূদ এবং এক আল্লাহ ছাড়া আর কারো ইবাদত করা যাবে না তার প্রতি আনয়ন করেনি।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাঁর উলূহিয়্যাতে একক, তিনি ছাড়া সত্য কোনো মাবূদ নেই, তিনি একক তাঁর কোনো শরীক নেই। কেবল তিনিই হক আর তারা তাকে ছাড়া যাদেরকে আহ্বান করে তারা সবাই বাতিল। এটাই সেই মহান বিষয় যার জন্য তিনি কিতাব নাযিল করেছেন, রাসূলদের প্রেরণ করেছেন, জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। আর এর ওপর উম্মতের সবাই একমত, মানুষের প্রকৃতি এটিই প্রমাণ করে আর সুস্থ বিবেকও এর সাক্ষ্য বহন করে। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, নবীগণ তাদের কওমকে যে দাওয়াত দিয়েছেন তার মূল হলো, এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে তাদেরকে আহ্বান করা এবং তিনি ছাড়া সব কিছুর ইবাদত ত্যাগ করা।
সত্যিকার ইবাদত হলো যা বিশ্বজাহানের রব আল্লাহর জন্য হবে এবং রাসূলদের সরদারের হিদায়েত মোতাবিক হবে। কারণ, তিনি ছাড়া সকল মাবূদের ইবাদত বাতিল।
আল্লাহর দ্বীনের মজবুত রোকন ও সুদৃঢ় খুঁটি হলো একমাত্র আল্লাহর জন্যে উলূহিয়্যাহকে সাব্যস্ত করা এবং তিনি ছাড়া সবার থেকে ইবাদতকে অসাব্যস্ত করা। এটাই দ্বীনের চাকা এবং রাসূলদের দাওয়াতের ভীত। আর তার অর্থ হলো মাখলূকের আমলসমূহকে কেবল আল্লাহর জন্য নিবিষ্ট করা।
আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআনের অনেক জায়গায় তাঁর রুবুবিয়্যাতের এমন সব নিদর্শন ও আয়াত দ্বারা বান্দাদের ওপর দলিল পেশ করেছেন, যা একমাত্র তাঁর ইবাদতকে আবশ্যক ও জরুরি করে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, এই মহাজাগতিক নিদর্শনগুলির স্রষ্টা তিনি একা, তিনিই মহিমান্বিত। অতএব যেমন তাঁর সঙ্গী কোনো স্রষ্টা নেই, তেমন তাঁর সঙ্গে অন্য কাউকে ইবাদাত করা উচিত নয়।
আল্লাহ তা‘আলা যেসব দলিলকে তাঁর উলূহিয়্যাত প্রমাণ করার জন্য স্থির করেছেন সেগুলোতে এমন বৈচিত্র্য এনেছেন যার দ্বারা দলিল সাব্যস্ত হয় এবং প্রমাণগুলো স্পষ্ট হয়। যেন আল্লাহর বিপক্ষে মানুষের জন্য কোনো দলিল বাকি না থাকে।
আল্লাহর জন্য উলূহিয়্যার স্বীকারুক্তি প্রদান করার সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করাকে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর প্রতি মানুষের ঈমান ও কুফরের মাঝে সীমা নির্ধারণ করেছেন।
আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের সঙ্গে তাগুতকে অস্বীকার করা এবং শিরক ও শিরককারীদের থেকে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করা জরুরি।
এই ঈমান কেবল অন্তরে থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং তা মুখে উচ্চারণ করা জরুরি। আর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা তার ওপর আমল করা ছাড়া ঈমান বাস্তবায়িত হবে না। অন্তরের ঈমান কম-বেশীর ভিত্তিতে তারতম্য হয়ে থাকে।
এই ঈমানের ক্ষেত্রে বান্দাকে অবশ্যই দু’জাহানের রব আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ এবং সংশয়হীন দৃঢ় বিশ্বাসী হতে হবে। ইলম, ইখলাস ও গ্রহণ করার নীতিতে এই ঈমান হতে হবে। আর কথা, কর্ম ও বিশ্বাসে আত্মসমর্পণ, সততা ও সত্যবাদিতা থাকতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে এই দ্বীনের প্রতি, যে এই দ্বীন প্রবর্তন করেছেন তাঁর প্রতি, যিনি এই দ্বীন নিয়ে এসছেন তার প্রতি এবং যে এই দ্বীনকে মেনে নিয়েছেন তার প্রতি মহব্বত ও ভালোবাসা প্রদর্শন করতে হবে।
ঈমানের হাকিকত, দাবি, রোকন ও শর্তসমূহ আল্লাহ যেমন বর্ণনা করেছেন, তেমন বিরুদ্ধাচারী মুশরিকদের সন্দেহ দূর করে দিয়েছেন এবং তাদের শিরক করার ভেতর তাদের জন্য কোনো দলিল নেই সেটিও বর্ণনা করে দিয়েছেন। কারণ, তাদের শরীকরা সৃষ্ট বস্তু, অপরের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং তারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না, আর তারা আসমান ও জমিনে বিন্দু পরিমাণ বস্তুরও মালিক নয়।
মহা সত্য সত্ত্বা বর্ণনা করেছেন যে, যারা আল্লাহ ছাড়া এসব উপাস্যদের আহ্বান করে তারা তাদের আহ্বান শুনতে পায় না। যদি তারা শুনতেও পায়, কিন্তু তাদের ডাকে সাড়া দিতে পারে না। কিয়ামতের দিন তারা তাদের শিরককে অস্বীকার করবে এবং তাদের থেকে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করবে।
মহা সত্য আল্লাহ আরো বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ ছাড়া এসব উপাস্যরা কোনো উপকার ও অপকার করতে পারে না। কাজেই আল্লাহ ছাড়া তাদের কিভাবে ইবাদত করা হয়?!
আল্লাহ তা‘আলা ফেরেশতাদের ইবাদতকে বাতিল করে দিয়েছেন। আর তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তারা আল্লাহর নৈকট্যপ্রাপ্ত, তারা তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করবে না। কাজেই ফেরেশতাদের এই অবস্থা হলে কিভাবে আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য সত্ত্বার ইবাদত করা হয়?!
নবী ও রাসূলগণ দুনিয়া ও আখিরাতে উচুঁ মর্যাদার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও তারা নিজেদের উপকার ও অপকার করার ক্ষমতা রাখেন না, অতএব তাদের চেয়ে নিম্নশ্রেণীর যারা আছে তারা কীভাবে পারবে?!
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাঁর সিফাত ও গুণাবলীতে একক। তাঁর জন্যে রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম ও সুউচ্চ গুণাবলী। পরিপূর্ণ বিবেক তার সাক্ষ্য প্রদান করে এবং সুস্থ স্বভাব তার প্রতি আত্মসমর্পণ করে। মুসলিম উম্মাহর সকল আলেম তাতে ঐক্যমত পোষণ করেছেন, বরং সকল আসমানী রিসলাতে আল্লাহর সিফাত, নাম ও কর্মসমূহের বর্ণনা এসেছে। আর আল্লাহ মুশরিকদের ইলাহসমূহের নিন্দা করে বলেছেন যে, তারা শুনতে ও দেখতে পায় না।
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ যেমন নিজের সিফাত বর্ণনা করেছেন এবং যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সিফাত বর্ণনা করেছেন তিনি তেমনই। তিনি পবিত্র ও সুমহান সত্ত্বা, তাঁর মত কিছুই নেই, তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। অতএব আল্লাহ নিজেই নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন এবং তাঁর রাসূল তাঁর জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন আমরা তা সাব্যস্ত করব। আর তিনি নিজেই নিজের থেকে যা অসাব্যস্ত করেছেন অথবা তাঁর রাসূল তাঁর থেকে অসাব্যস্ত করেছেন আমরা তা তাঁর থেকে অসাব্যস্ত করবো- কোন প্রকার বাতিল করা ছাড়া, সাদৃশ্য বর্ণনা করা ছাড়া, ধরন বর্ণনা করা ও বিকৃত করা ছাড়া।
আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, মাখলূক সৃষ্টি করার পূর্ব থেকেই আল্লাহ তাঁর গুণে গুণান্বিত। আর তিনি সেই থেকে সব সময়ের জন্য অতীব পরিপূর্ণ, মহান ও চির সুন্দর। তিনিই সর্বপ্রথম আর তিনিই সর্বশেষ। তিনিই প্রথম থেকে আছেন তাঁর পূর্বে কিছু ছিল না, আর তিনিই সর্বশেষ তাঁর পরে কিছু নেই। তিনি স্বীয় নাম ও সিফাতসহ পরিপূর্ণ ও সম্মানিত হওয়ার দিক থেকে সর্বপ্রথম এবং তিনি স্বীয় নাম ও সিফাতসহ পরিপূর্ণ ও সম্মানিত হওয়ার দিক থেকে সর্বশেষ।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহর সিফাতসমূহ হতে কতক সিফাত তাঁর সত্ত্বার সঙ্গে আবশ্যক, যেমন হায়াত, ইলম, শোনা, দেখা, হাত ও আঙ্গুলসমূহ। আর কতক সিফাত তাঁর ইচ্ছার সঙ্গে সম্পৃক্ত, যেমন গোস্বা, সন্তুষ্টি ও অবতরণ করা।
আমরা বিশ্বাস করি যে, তিনি যা চান তাই করতে সক্ষম। তিনি যখন চান, যা চান এবং যেভাবে চান করতে সক্ষম। তিনি যাকে ইচ্ছে সম্মানিত করেন আর যাকে ইচ্ছে অসম্মানিত করেন। তাঁর নির্দেশ রদকারী কেউ নেই, আর কেউ তাঁর সিদ্ধান্ত ও ফয়সালার খণ্ডনকারী নেই।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহর কতক সিফাত ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো দ্বারা আল্লাহকে ব্যাপকভাবে বিশেষিত করবো, যেমন শোনা, দেখা, হায়াত প্রভৃতি। আর কতক সিফাত বর্ণিত হয়েছে শর্তযুক্তভাবে, সেগুলো তার শর্তের সাথেই থাকবে, যেমন আল্লাহ সুবহানাহু তাঁর শত্রুদের সাথে ষড়যন্ত্র করেন, যখন তারা শত্রুতা করে এবং তিনি তাঁর শত্রুদের ভুলে যান যখন তারা তাকে ভুলে যায়।
তাঁর কতক সিফাত হলো: জ্ঞান, শোনা, দেখা, হায়াত, চিরঞ্জীব হওয়া, কথা বলা। তিনি মাখলুক সৃষ্টির পূর্বে এবং তাদের সাথে কথা বলার পূর্ব থেকেই এই গুণে গুণান্বিত। আমাদের রবের কালাম তাঁর নিজের ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত, তিনি যখন চান কথা বলেন। কথা বলার গুণটি আল-কুরআনে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন এসছে যে, তিনি তাঁর বান্দাদের সাথে কথা বলেন এবং মাখলুক থেকে যার সাথে ইচ্ছে গোপনে বলেন ও যাকে ইচ্ছে সম্বোধন করেন। তিনি কিয়ামতের দিন মাখলুকের সাথে কথা বলবেন এবং কিয়ামতের দিন মাখলূক তাঁর কথা শুনবে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ সুবহানাহু স্বীয় মাখলূক থেকে নূরের পর্দার আড়ালে আছেন। কাজেই দুনিয়াতে কেউ তাকে দেখবে না, যদিও কতক নবী পর্দার আড়াল থেকে আল্লাহর কথা শুনেছেন যখন তাদের সাথে তিনি কথা বলেছেন। যেমন তিনি মূসা আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলেছেন।
আমাদের রবের কালাম এভাবে বিশেষিত করা যায় যে, তাঁর কতক কথা কতক কথার পূর্বে হয়েছে এবং তাঁর কতক কথা কতক কথা থেকে উত্তম।
আল্লাহর কালামের একটি অংশ হলো আল-কুরআন এবং তাঁর রাসূলদের ওপর নাযিল করা প্রত্যেক আসমানী কিতাব, যেমন ইবরাহীম ও মূসা আলাইহিমাস সালামের সাহিফা, তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবূর—প্রত্যেকটিই আল্লাহর কালাম। এসব দ্বারা আল্লাহ কথা বলেছেন এবং তাঁর থেকে কোনো মাধ্যম ছাড়াই জিবরীল শ্রবণ করেছেন। জিবরীলই এগুলো নিয়ে আল্লাহর নবী ও রাসূলদের ওপর অবতরণ করেছেন। তাওরাতের বৈশিষ্ট হলো, আল্লাহ তা কাঠের ভেতর লিখিত অবস্থায় নাযিল করেছেন। আল্লাহর কালাম ও শব্দসমূহ সৃষ্ট বস্তু নয়। আল্লাহর কালাম তাঁর মাখলূক নয়। আপনি লক্ষ্য করেননি যে, তিনি সৃষ্টি ও নির্দেশের মাঝে পার্থক্য করেছেন? আর আমরা আল্লাহর জাগতিক কালিমা ও তাঁর শরয়ী কালিমার মাঝে পার্থক্য নির্ণয় করি।
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার গুণাবলীর মধ্যে রয়েছে: ইজ্জত (সম্মান), পরাভূত করা, আধিপত্য, রাজত্ব, অহংকার, মহানুভবতা, ইচ্ছা, চাওয়া, ক্ষমতা এবং করুণা (রহমত)। রহমত হলো তাঁর সিফাতসমূহ থেকে একটি সিফাত। এটিকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করা হয় অনেকটা সিফাতকে মাওসূফের সাথে সম্পৃক্ত করার মত।
তাঁর একটি সিফাত হলো: উচ্চতা, তা হলো আধিপত্যের উচ্চতা, মর্যাদার উচ্চতা, এবং সত্ত্বার উচ্চতা। এই তিনটি গুণই তাঁর পূর্ণতার ইঙ্গিত দেয়। বিভিন্নভাবে আল্লাহর উচ্চতার বিষয়টি আল-কুরআন, নবীর পবিত্র সুন্নাত, বিবেক ও স্বভাব দ্বারা প্রমাণিত। বরং আল্লাহর উচ্চতার পক্ষে যে সকল প্রমাণ রয়েছে, সেগুলোর প্রকার অনেক এবং প্রতিটি প্রকারের অধীনে অসংখ্য দিক রয়েছে যা গণনা করা সম্ভব নয়।
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার আরেকটি সিফাত বা গুণ হলো: আরশের ওপর ওঠা। এ বিষয়টি আল্লাহ তাঁর কিতাবের সাত জায়গায় উল্লেখ করেছেন।
অনুরূপভাবে তাঁর সিফাতসমূহের ভেতর রয়েছে মুহাব্বাত করা, তাঁর আরেক সিফাত হলো সন্তুষ্ট হওয়া, তাঁর আরেক সিফাত হলো তাঁর শত্রুদের অপছন্দ করা, কারণ তারা তাঁর সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করেছে এবং আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর যা নাযিল করেছেন তা অপছন্দ করেছে।
তাঁর আরেক সিফাত হলো স্বীয় শত্রুদের ওপর গোস্বা করা ও অভিসম্পাত করা। অর্থাৎ কাফিরদের ওপর অভিসম্পাত করা।
তাঁর আরেক সিফাত হলো: তাঁর সেসব শত্রুদের বিরুদ্ধে কৌশল করা, যারা তার অলীদের সাথে ষড়যন্ত্র করে। তাঁর আরেকটি সিফাত হলো, ক্ষোভ প্রকাশ করা, তা গোস্বার চেয়েও কঠিন। তাঁর আরেক সিফাত হলো, যে তাকে ধোঁকা দেয় তিনি তাকে প্রবঞ্চনায় ফেলেন। যেমন আল্লাহ মুনাফিকদের প্রবঞ্চনায় ফেলেন যারা তাকে ধোঁকা দিতে চায়। তাঁর আরেক সিফাত হলো, যে আল্লাহর সাথে উপহাস করে আল্লাহ তার সাথে উপহাস করেন। তিনি পবিত্র ও সুমহান।
তাঁর আরেক সিফাত হলো: হাসা, আশ্চর্য হওয়া এবং কিয়ামতের দিন মানুষের মাঝে ফয়সালা করার জন্যে আসা ও আগমন করা।
আমরা তাঁর ‘অবতরণ করা’ সিফাতের উপর বিশ্বাস করি। আমাদের রব বাস্তবিকপক্ষে তাঁর শান ও মর্যাদা মোতাবেক দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। তাঁর অবতরণ মাখলূকের অবতরণ করার মত নয়। বরং এটা তাঁর অন্যান্য সিফাতের ন্যায় একটি সিফাত যার প্রতি আমরা ঈমান আনয়ন করি এবং যা আমরা জানি। আমরা এর ধরন বর্ণনা করতে চেষ্টা করব না অথবা তা প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করব না, বরং আমাদের সত্যবাদী ও সত্যায়িত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে যেমন সংবাদ দিয়েছেন তেমন তা বিশ্বাস করব।
আমরা দু’জাহানের রব আল্লাহর সাথীত্ব (সঙ্গী হওয়ার) সিফাতে বিশ্বাস করি। আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির সঙ্গেই আছেন। এই সঙ্গ দুই প্রকার: এক. বিশেষ সঙ্গ, এটি আল্লাহর অলী ও রাসূলদের জন্য। এর দাবি হলো সাহায্য করা ও সমর্থন দেওয়া। আর অপরটি হলো সকল মাখলূকের সাথে সাধারণ সঙ্গ, তারা মুমিন হোক বা কাফির হোক। আর এর দাবি হলো, ইলম, বেষ্টন করে নেওয়া, ক্ষমতা ও রাজত্ব।
এই সাথীত্ব একে অপরের ভেতর অনুপ্রবেশ করা ও একে অপরের সাথে মিশে যাওয়াকে আবশ্যক করে না এবং তা আল্লাহর উচ্চতার বিপরীত নয়। কারণ, আলেমদের ঐক্যমতে এর অর্থ হলো ইলম ও বেষ্টন করে নেওয়া। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর জ্ঞান, আয়ত্ব ও ক্ষমতার দ্বারা আমাদের সাথে আছেন।
আমরা আল্লাহর জন্য তাঁর শান ও মর্যাদার সাথে উপযুক্ত চেহারা সাব্যস্ত করি এবং তাঁর মর্যাদা ও পরিপূর্ণতা মোতাবেক তাঁর হাত সাব্যস্ত করি। এ সম্পর্কে সংবাদ কুরআন ও হাদীসে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। যেমন তাঁর দুই হাতের কথা উল্লেখ হয়েছে, তিনি কখনো তা সম্প্রসারণ করেন এবং কখনো তা সংকুচিত করেন। রব স্বীয় হাত দ্বারা আসমানসমূহকে গুটিয়ে ফেলবেন, আর জমিন তার কব্জায় থাকবে। আল্লাহর হাতকে আঙ্গুলসহ বর্ণনা করা হয়েছে। এসব কিছু প্রমাণ করে যে, কুরআন ও সুন্নাতে বর্ণিত হাত হাতটি বাস্তবিক যা তাঁর মহিমার সাথে উপযুক্ত। আমরা এর ব্যাখ্যা বা তুলনা করতে অথবা এ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদিসকে বিকৃত করতে যাব না। তাঁর আরেকটি গুণ হলো আঙ্গুলের গুণ।
আমরা বিশ্বাস করি যে, মুমিনগণ কিয়ামতের দিন তাদের রবকে দেখবেন। কুরআন দ্বারা প্রমাণিত এবং আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুতাওয়াতিরভাবে বর্ণিত হয়েছে, তিনি মুমিনদের সুসংবাদ দিয়েছেন যে, তারা কিয়ামতের দিন সরাসরি তাদের রবকে দেখবেন।
আল্লাহ যেমন নিজের নফসকে পূর্ণতা, সৌন্দর্য, বড়ত্ব, ইজ্জত ও অহংকার গুণে গুণান্বিত করেছেন, তেমন তিনি নিজের নফসকে ত্রুটির বিশেষণ থেকে মুক্ত ঘোষণা করেছেন। তবে কুরআন ও সুন্নাতে বিশেষণ বর্ণনার ক্ষেত্রে না করা মূল নয়। কারণ, মূল হলো সিফাত সাব্যস্ত করা। কাজেই কুরআন ও সুন্নাহ আল্লাহর বড়ত্ব, সম্মান ও পূর্ণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল সিফাত বর্ণনায় ভরপুর। মহান রব যখন নিজের থেকে কোনো গুণ অস্বীকার করেন, তা তিনি করেন এজন্য যে সেই গুণের বিপরীতের মধ্যেই পূর্ণতা বিদ্যমান, অথবা তার কারণ মানুষেরা সম্মান ও বড়ত্বের অধিকারী আল্লাহর সঙ্গে ত্রুটিকে সম্পৃক্ত করেছে। তাই রব তাঁর নিজের সাথে সম্পৃক্ত করা সেই ত্রুটিকে না করেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্য সুন্দর নামসমূহ রয়েছে, আর তাঁর নামগুলো সৌন্দর্যের শেষ সীমায় গিয়ে পৌঁছেছে, কাজেই তাঁর চেয়ে বেশি সুন্দর কিছু নেই। আল্লাহর প্রত্যেক নাম থেকেই একেকটি সিফাত নির্গত হয়। আর তার নামসমূহ অসংখ্য।
আমাদের রব আমাদেরকে তাঁর নামসমূহ বিকৃতি করা , অথবা তা অস্বীকার করা , অথবা তার অর্থ অস্বীকার করা অথবা তা বাতিল করা থেকে সতর্ক ও সাবধান করেছেন।
আল্লাহর যেসব নাম ও সিফাতসমূহ যা কুরআন ও সুন্নাতে বর্ণিত হয়েছে তা এত বেশি যে কোনো কিতাবে তা একত্রিত করা সম্ভবপর নয়। আমরা এসব নাম ও সিফাত দ্বারা আল্লাহ এবং আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা উদ্দেশ্য নিয়েছেন তার ওপরই ঈমান আনয়ন করি। আমরা জানি যে, এগুরোর হাকিকত কোনো মানুষ জানে না, তারা তা আয়ত্বেও আনতে পারে না এবং তাদের বুঝ সেই পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম নয়। আর আমরা তা ব্যাখ্যা করতে যাবো না।
অধ্যায়: আল্লাহর অস্তিত্বের প্রতি ঈমান।
আমরা ঈমান রাখি যে, আল্লাহই হলেন প্রথম, তাঁর পূর্বে কিছু নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনিই প্রথম ও শেষ; প্রকাশ্য (উপরে) ও গোপন (নিকটে) আর তিনি সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।) [আল-হাদীদ: ৩] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আল্লাহ ছিলেন তাঁর পূর্বে কিছুই ছিল না, আর তার আরশ ছিল পানির ওপর।) {(বুখারী (৭৪১৮), তিরমিযী (৩৯৫১)} ইমাম বুখারী ইমরান বিন হুসাইন সূত্রে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, তার আরেক বর্ণনায় এসেছে: (আল্লাহ ছিলেন তিনি ছাড়া কিছুই ছিল না, আর তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর।) বুখারী (৩১৯১) আল্লাহ নিজেই নিজের সম্পর্কে আমাদেরকে জানিয়েছেন যে, তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। তিনি আসমানসমূহ ও জমিনের মালিক। তিনি রাতকে দিনে আর দিনকে রাতে প্রবেশ করান। তিনি সুউচ্চ ও পবিত্র সত্ত্বা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনি জানেন যা কিছু জমিনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উখিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন-তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।* আসমানসমূহ ও জমিনের সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁরই এবং আল্লাহর দিকে সব বিষয় প্রত্যাবর্তিত হবে।* তিনিই রাতকে প্রবেশ করান দিনে আর দিনকে প্ৰবেশ করান রাতে এবং তিনি অন্তরের বিষয়াদি সম্পর্কে সম্যক অবগত।) [আল- হাদীদ ৪-৬]
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা গুরুত্বসহ বলেছেন যে, দৃশ্যমান এই জগত সাক্ষ্য দেয় যে এককভাবে আল্লাহ এর স্রষ্টা ও অস্তিত্বদানকারী। তাঁর সাথে অন্য কোনো স্রষ্টা নেই। আল্লাহ বলেন: (এটা আল্লাহর সৃষ্টি! সুতরাং তিনি ছাড়া অন্যরা কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও। বরং যালিমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।) [লুকমান: ১১] এ কারণেই তিনি তাঁর অনেক নিদর্শন উল্লেখ করেছেন, যা প্রমাণ করে যে তিনিই এই মহাবিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ও অস্তিত্বে আনয়নকারী। তন্মধ্যে: তিনি মৃত থেকে জীবিতকে আর জীবিত থেকে মৃতকে বের করেন, তিনি মাটি দ্বারা সকল মানুষকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাদের জন্যে আমাদের থেকেই জোড়া সৃষ্টি করেছেন, সৃষ্টির মাঝে ভাষা ও রঙের ভিন্নতা, বান্দাদের রাতে ঘুমানো ও দিনে তাদের রিযিক অন্বেষণ করা, এছাড়াও, তিনি বজ্রপাতকে ভয় ও আশার উপকরণ বানিয়েছেন এবং আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, তিনিই প্রথমবার মাখলূক সৃষ্টি করেছেন। যেমন মহা প্রশংসিত আল্লাহ বলেন: (তিনিই মৃত থেকে জীবিতকে বের করেন এবং তিনিই বের করেন মৃতকে জীবিত থেকে, আর জমিনকে জীবিত করেন তার মৃত্যুর পর এবং এভাবেই তোমাদেরকে বের করে আনা হবে।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর এখন তোমরা মানুষ, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছ।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে তো অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে রাতে ও দিনে তোমাদের নিদ্রা এবং তাঁর অনুগ্রহ থেকে তোমাদের (জীবিকা) অন্বেষণ। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য যারা শোনে।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদেরকে প্রদর্শন করান বিদ্যুৎ, ভয় ও আশার সঞ্চারকরূপে এবং আসমান থেকে পানি নাযিল করেন অতঃপর তা দিয়ে জমিনকে পুনর্জীবিত করেন সেটার মৃত্যুর পর; নিশ্চয় এতে বহু নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা অনুধাবন করে।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তাঁরই আদেশে আসমান ও জমিন স্থিতিশীল থাকে; তারপর আল্লাহ্ যখন তোমাদেরকে জমিন থেকে উঠার জন্য একবার ডাকবেন তখনই তোমরা বেরিয়ে আসবে।* আর আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে তা তাঁরই। সবকিছু তাঁরই অনুগত।* আর তিনি-ই, যিনি সৃষ্টিকে শুরুতে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, তারপর তিনি সেটা পুনরাবৃত্তি করবেন; আর এটা তাঁর জন্য অতি সহজ।) [আর-রূম: ১৯-২৭]
আরো যেমন, তিনি মাখলুকের ওপর প্রমাণ দাঁড় করিয়েছেন যে, তিনি একজন থেকে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। এ মর্মে তিনি বলেছেন: (তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একই ব্যক্তি হতে। তারপর তিনি তার থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি চতুষ্পদ জন্তু থেকে তোমাদের জন্য দিয়েছেন আট জোড়া। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভের ত্ৰিবিধ অন্ধকারে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব; সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁরই; তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। অতঃপর তোমাদেরকে কোথায় ফিরানো হচ্ছে?) [আয-যুমার: ৬] কাজেই তিনি সৃষ্টির শুরু উল্লেখ করেছেন এবং সকল জন্তু আল্লাহু সুবহানাহুর সৃষ্টি। অতঃপর আমাদের ওপর দলিল কায়েম করেছেন যে, তিনি আমাদেরকে মাতৃগর্ভের ভেতর অন্ধকারে সৃষ্টি করেছেন। তিনি ব্যতীত কেউ বীর্যকে মানুষ রূপে সৃষ্টি করতে পারে না।
তিনি পূর্বের আয়াতগুলোতে এমন দলিল উল্লেখ করেছেন যা তাঁর অস্তিত্বের ওপর সবচেয়ে বড় দলিল। আর তা হলো আসমান, জমিন এবং তাদের ভেতরে ও উপরে যা কিছু রয়েছে সব তিনি সৃষ্টি করেছেন।
আরো যেমন, তিনি এই হিসেবে মাখলূকের ওপর দলিল কায়েম করেছেন যে, তিনি তাদের প্রতি এবং তারা নিজেদের ভেতর ও তাদের সন্তানদের ভেতর যা দেখতে পায় তার প্রতি যত্নশীল। আর তা হলো, তিনি তাদেরকে তাদের মায়েদের পেট থেকে এমন অবস্থায় বের করেছেন যে, তারা কিছুই জানত না এবং তিনি তাদের লালন-পালন করেছেন, ফলে তাদের সৃষ্টি ও ইলম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (আর আল্লাহ্ তোমাদেরকে নির্গত করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না এবং তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয়, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।) [আন-নাহাল : ৭৮] তিনি যেমন প্রত্যেক বস্তুকে সৃষ্টি করেছেন ও প্রস্তুত করেছেন, তেমনি তিনি প্রত্যেক মাখলূককে তাদের কল্যাণের দিকে হিদায়েত (নির্দেশনা) দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা ফিরআউন সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেছেন যে, সে বলেছে: (সে বলল, ‘হে মূসা! তাহলে কে তোমাদের রব?’) [সূরা ত্বহা: ৪৯] তখন ঐশী উত্তরটি ছিল: (মূসা বললেন, ‘আমাদের রব তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তাঁর আকৃতি দান করেছেন, তারপর পথনির্দেশ করেছেন।) [ত্বহা : ৫০]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা জমিনকে প্রসারিত করেছেন এবং তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছেন এবং তাতে প্রত্যেক বস্তু পরিমিতভাবে উদ্গত করেছেন। তাতে দৃশ্যমান পরিমিত অবস্থা উত্তম সাক্ষ্য বহন করে যে, কেবল তিনিই এগুলোর স্রষ্টা। যেমন বিশেষ নিয়মে বৃষ্টি বর্ষণ করা, যা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভবপর নয় এবং আসমান থেকে যা নাযিল হয় তা সংরক্ষণ করাও কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি সাক্ষ্য দেয় যে, স্রষ্টা কেবল মহা প্রতাবশালী আল্লাহ। তিনি বলেন: (আর জমিন, এটাকে আমি বিস্তৃত করেছি, তাতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি; এবং আমি তাতে প্রত্যেক বস্তু উদগত করেছি সুপরিমিতভাবে।* আর আমি তাতে জীবিকার ব্যবস্থা করেছি তোমাদের জন্য এবং তোমরা যাদের রিযিকদাতা নও তাদের জন্যও।* আর আমার কাছেই আছে প্রত্যেক বস্তুর ভাণ্ডার এবং আমি তা নির্দিষ্ট পরিমাণেই নাযিল করে থাকি।* আর আমি বৃষ্টি-গর্ভ বায়ু পাঠাই, তারপর আকাশ হতে পানি নাযিল করে তা তোমাদেরকে পান করতে দেই; অথচ তোমরা নিজেরা তা ভাণ্ডারে জমাকারী নও।) [আল-হিজর: ১৯-২২]
নবী ও রাসূলগণ যার প্রতি ঈমান আনয়ন করেছেন আমরাও তার প্রতি ঈমান আনয়ন করি। আর তারা আল্লাহু সুবহানাহুর ওপর প্রমাণ স্বরূপ যেসব দলিল ও প্রমাণ নিয়ে এসেছেন আমরা তার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করি। যেমন মহাসত্য আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন যে, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম নমরুদের বিপক্ষে দলিল পেশ করেছেন যে, আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব থেকে উদিত করেন, তিনি ছাড়া কেউ তা পশ্চিম দিক থেকে উদিত করতে সক্ষম নয়। মহা প্রশংসিত আল্লাহ বলেন: (ইবরাহীম বললেন, আমার রব তিনিই যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান। সে বলল, ‘আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই।’ ইব্রাহীম বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদয় করান, তুমি সেটাকে পশ্চিম দিক থেকে উদয় করাও তো।’) [আল-বাকারা : ২৫৮]
অনুরূপভাবে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বীয় কওমের ওপর প্রমাণ পেশ করেছেন যে, আল্লাহই তাকে হিদায়েত দিয়েছেন এবং তিনিই তাকে খাদ্য ও পানীয় দান করেছেন আর তিনি যখন অসুস্থ হন, তখন আল্লাহই তাকে সুস্থ করেন। আর তিনিই তাকে মৃত্যু দান করবেন ও জীবিত রাখবেন, যেমন আল্লাহ তার সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন: (যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে হেদায়াত দিয়েছেন।* আর ‘তিনিই আমাকে খাওয়ান ও পান করান।* ‘এবং রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন;* ‘আর তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন, তারপর আমাকে পুনর্জীবিত করবেন।) [আশ-শুআরা : ৭৮-৮১] আল্লাহ তাআলা মুসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, তিনি ফিরআউনকে এই বলে ঘায়েল করেছেন যে, তার রব একমাত্র তিনিই: (যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার আকৃতি প্রদান করেছেন অতঃপর তাকে হিদায়াত দিয়েছেন।) [ত্বহা : ৫০] কুরআনে এসেছে যে, আল্লাহ নিজেই নিজের নফসকে সকল ত্রুটি থেকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন এবং আমাদেরকে তাঁর নফস সম্পর্কে জানিয়েছেন। পবিত্র ও সু-উচ্চ সত্ত্বা বলেন: (আপনি আপনার সুমহান রবের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন,* যিনি সৃষ্টি করেন অতঃপর সুঠাম করেন।* আর যিনি নির্ধারণ করেন অতঃপর পথনির্দেশ করেন।) [আল-আ‘লা: ১-৩]
কেবল আল্লাহ এই জগতকে অস্তিত্বদানকারী তিনি ছাড়া অন্য কেউ নহে- এর ওপর আল্লাহ এভাবে দলিল পেশ করেছেন যে, তিনিই মনোরম বাগানসমূহ উদ্গত করেছেন। মানুষেরা তার গাছ উদ্গত করার সক্ষমতা রাখে না। তার ওপর আরো দলিল পেশ করেছেন যে, তিনিই জমিনকে আবাস উপযোগী বানিয়েছেন এবং তাতে স্থাপন করেছেন নহর ও সুদৃঢ় পাহাড়সমূহ। আর তিনি দুই সমুদ্রের মাঝে আড়াল তৈরি করেছেন যেন একটা অপরটার সাথে মিশে না যায়। আর একমাত্র তিনিই নিরুপায়কে সাড়া দেন যখন সে তাকে আহ্বান করে—যদিও সে মুমিন না হয়—, আর তিনিই মানুষকে স্থলে ও সমুদ্রের অন্ধকারে পথ দেখান। তিনিই সুসংবাদ স্বরূপ বৃষ্টির পূর্বে বাতাস প্রবাহিত করেন। তিনিই আমাদেরকে রিযিক দান করেন, তিনি ছাড়া কোনো রিযিকদাতা নেই, তিনি ছাড়া কোনো রব নেই, তিনি ছাড়া কোনো স্রষ্টা নেই। পবিত্র ও সুমহান আল্লাহ বলেন: (নাকি তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমানসমূহ ও জমিন এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্য বর্ষণ করেন বৃষ্টি, তারপর আমি তা দ্বারা মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করি, তার গাছ উদ্গত করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ্ আছে কি? বরং তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা (আল্লাহর) সমকক্ষ নির্ধারণ করে।* নাকি তিনি, যিনি জমিনকে করেছেন বসবাসের উপযোগী এবং তার মাঝে প্রবাহিত করেছেন নদীনালা এবং তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বত ও দুই সাগরের মাঝে সৃষ্টি করেছেন অন্তরায়; আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহ আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।* (তোমাদের উপাস্যরা উত্তম) নাকি তিনি যিনি নিরুপায়কে সাড়া দেন যখন সে তাকে ডাকে এবং বিপদ দূরীভূত করেন আর তোমাদেরকে জমিনের প্রতিনিধি বানান। আল্লাহর সাথে কোনো ইলাহ আছে কি? তোমরা উপদেশ অতি সামান্যই গ্রহণ করে থাকো।* নাকি তিনি, যিনি তোমাদেরকে স্থলভূমি ও সমূদ্রের অন্ধকারে পথ দেখান এবং যিনি তাঁর অনুগ্রহের প্রাক্কালে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন। আল্লাহর সাথে অন্য কোন ইলাহ আছে কি? তারা যাকে শরীক করে আল্লাহ্ তা থেকে বহু ঊর্ধ্বে।* নাকি তিনি, যিনি প্রথম সৃষ্টি করেন, তারপর সেটার পুনরাবৃত্তি করবেন এবং যিনি তোমাদেরকে আসমান ও জমিন থেকে রিযিক দান করেন, আল্লাহর সাথে কি কোনো ইলাহ আছে? বলুন, “তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ কর।) [আন-নামল: ৬০-৬৪]
মহা প্রশংসিত ও পবিত্র নামসমূহের অধিকারী আল্লাহ বলেন: (আর তিনিই জমিনকে বিস্তৃত করেছেন এবং তাতে সুদৃঢ়পর্বত ও নদী সৃষ্টি করেছেন এবং সব রকমের ফল সৃষ্টি করেছেন জোড়ায় জোড়ায়। তিনি দিনকে রাত দ্বারা আচ্ছাদিত করেন। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য।* আর জমিনে রয়েছে পরস্পর সংলগ্ন ভূখন্ড, আঙ্গুর বাগান, শস্যক্ষেত্র, একই মূল থেকে উদগত বা ভিন্ন ভিন্ন মূল থেকে উদগত খেজুর গাছ যেগুলো একই পানি দ্বারা সেচ করা হয়, আর স্বাদ-রূপের ক্ষেত্রে সেগুলোর কিছু সংখ্যককে আমরা কিছু সংখ্যকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে থাকি। নিশ্চয় বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এতে রয়েছে নিদর্শন।) [আর-রা‘দ : ৩-৪] কাজেই মহান আল্লাহ সাব্যস্ত করেছেন যে, তিনি একাই জমিনকে বিস্তৃত করেছেন এবং প্রত্যেক গাছ ও ফল দু’টি করে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন। তিনি একাই দিনকে রাত দ্বারা আচ্ছাদিত করেন। আর তার ওপর দলিল পেশ করেছেন যে, জমিনে পরস্পর সংলগ্ন ভূখন্ড সাদৃশ্যপূর্ণ ও বৈসাদৃশ্যপূর্ণ অনেক ফল উদগত করে, অথচ তা একই পানি দ্বারা সেচ করা হয়। অতএব সে আল্লাহ পবিত্র যিনি ছাড়া কোনো রব নেই এবং যিনি ছাড়া কোনো স্রষ্টা নেই।
তিনি বর্ণনা করেছেন যে, পাহাড়সমূহ—কঠিন হওয়া সত্বেও—এর ভেতর রয়েছে আশ্চর্য ধরনের সৃষ্টি, যা স্রষ্টার অপূর্ব সৃষ্টিশীলতার প্রমাণ বহন করে। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (আর পাহাড়ের মধ্যে আছে বিচিত্র বর্ণের পথ---শুভ্র, লাল ও নিকষ কালো।) [ফাতির: ২৭]
এর প্রমাণ স্বরূপ তিনি আমাদের নিকট আরো যা বর্ণনা করেছেন তা হলো: তিনিই এসব জগতকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা মানুষের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন। এগুলোর একটি হলো সমুদ্রে নৌযানসমূহ পরিচালনা করা। মহা প্রশংসিত আল্লাহ বলেন: (আল্লাহ, যিনি সাগরকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন, যেন তাঁর আদেশে তাতে নৌযানসমূহ চলাচল করতে পারে। আর যেন তোমরা তাঁর অনুগ্রহ তালাশ করতে পার এবং যেন তোমরা (তাঁর প্রতি) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।* আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও জমিনের সমস্ত কিছু নিজ অনুগ্রহে, নিশ্চয় এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে, এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।) [আল-জাসিয়াহ: ১২-১৩]
আল্লাহু সুবহানাহু তার নিজের অস্তিত্বের ওপর আমাদেরকে প্রমাণ দিয়েছেন যে, তিনি আমাদের জন্য এসব জন্তু থেকে বাহন, পোশাক, খাদ্য ও পানীয় সৃষ্টি করেছেন। তিনিই আসমানে পাখিগুলোকে ধরে রাখেন। তিনি বলেন: (তারা কি লক্ষ্য করে না আকাশের শুন্য গর্ভে নিয়ন্ত্রণাধীন বিহংগের প্রতি? আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউই সেগুলোকে ধরে রাখেন না। নিশ্চয় এতে এমন সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা ঈমান আনে।* আর আল্লাহ্ তোমাদের ঘরসমূহকে করেছেন তোমাদের জন্য আবাসস্থল এবং তিনি তোমাদের জন্য পশুর চামড়ার ঘর তাঁবুর ব্যবস্থা করেছেন, তোমরা সেটাকে সহজ মনে করে থাক তোমাদের ভ্রমণকালে এবং অবস্থানকালে। আর (ব্যবস্থা করেছেন) তাদের পশম, লোম ও চুল থেকে কিছু কালের গৃহ-সামগ্রী ও ব্যবহার-উপকরণ।* আর আল্লাহ্ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তা থেকে তিনি তোমাদের জন্য ছায়ার ব্যবস্থা করেছেন এবং তোমাদের জন্য পাহাড়ে আশ্রয়স্থল বানিয়েছেন এবং তোমাদের জন্য ব্যবস্থা করেছেন পরিধেয় বস্ত্রের; তা তোমাদেরকে তাপ থেকে রক্ষা করে এবং তিনি ব্যবস্থা করেছেন তোমাদের জন্য বর্মের, তা তোমাদেরকে যুদ্ধে রক্ষা করে। এভাবেই তিনি তোমাদের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ পূর্ণ করেছেন যাতে তোমরা আত্মসমর্পণ কর।) [আন-নাহল: ৭৯-৮১] এসব দলিল তাঁর অস্তিত্ব ও রব হওয়ার ওপর প্রত্যক্ষ প্রমাণ বহন করে। পবিত্র সত্ত্বা তিনি ছাড়া কে এগুলো সৃষ্টি করেছেন?! কাজেই তিনি ছাড়া কোনো অস্তিত্বদানকারী নেই এবং তিনি ছাড়া কোনো রব নেই।
তিনি আমাদের জন্যে অনেক বড় সাক্ষী স্থাপন করেছেন যা প্রতিদিন ঘটে এবং তাঁর অস্তিত্ব ও রব হওয়ার ওপর সাক্ষ্য প্রদান করে। আর তা হলো, তিনিই প্রভাতকে উদ্ভাবন করেছেন এবং বীজ ও আঁটি বিদীর্ণ করেছেন। তিনি বলেন: (নিশ্চয় আল্লাহ্ শস্য-বীজ ও আঁটি বিদীর্ণকারী, তিনিই প্রাণহীন থেকে জীবন্তকে বের করেন এবং জীবন্ত থেকে প্রাণহীন বেরকারী। তিনিই তো আল্লাহ্, কাজেই তোমাদেরকে কোথায় ফিরানো হচ্ছে?* তিনি প্রভাত উদ্ভাসক। আর তিনি রাতকে প্রশান্তি এবং সূর্য ও চাঁদকে সময় নিরুপক করেছেন; এটা পরাক্রমশালী, মহাজ্ঞানী আল্লাহর নির্ধারণ।) [আল-আনআম: ৯৫-৯৬]
অনুরূপভাবে তিনি সূর্য ও চাঁদকে দু’টি নিদর্শন এবং রাত ও দিনকে আরো দু’টি নিদর্শন করেছেন যা তাঁর অস্তিত্ব ও রব হওয়ার ওপর প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর আমি রাত ও দিনকে করেছি দুটি নিদর্শন তারপর রাতের নিদর্শনকে মুছে দিয়েছি এবং দিনের নিদর্শনকে আলকপ্রদ করেছি।) [আল-ইসরা: ১২]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বর্ণনা করেছেন যে, তিনি সমুদ্রকে করেছেন সুমিষ্ট (সুপেয়) অথবা লোনা (খর)। আর তা থেকে বের করা হয় তাজা গোস্ত ও অলংকার, যা তাঁর অস্তিত্বের ওপর দলিল। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন: (আর তিনিই সাগরকে নিয়োজিত করেছেন যাতে তোমরা তা থেকে তাজা (মাছের) গোশত খেতে পার এবং যাতে তা থেকে আহরণ করতে পার রত্নাবলী যা তোমরা ভূষণরূপে পরে থাক; এবং তোমরা দেখতে পাও, তার বুক চিরে নৌযান চলাচল করে।) [আন-নাহল: ১৪] আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন: (আর তিনিই দুই সাগরকে সমান্তরালে প্রবাহিত করেছেন, একটি মিষ্ট, সুপেয় এবং অন্যটি লোনা, খর; আর তিনি উভয়ের মধ্যে রেখে দিয়েছেন এক অন্তরায়, এক অনতিক্রম্য ব্যবধান।) [আল-ফুরকান: ৫৩]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বর্ণনা করেছেন যে, স্বাভাবিক বিবেকসমূহ অনুধাবন করতে পারে যে, এই জগত স্রষ্টা ছাড়া অস্তিত্বে আসতে পারে না। এ মর্মে তিনি বলেছেন: (আর তিনিই জীবিত করেন এবং মৃত্যু দেন আর তাঁরই অধিকারে রাত ও দিনের পরিবর্তন। তবুও কি তোমরা বুঝবে না?) [আল-মুমিনূন: ৮০] সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (তিনি বললেন, তবে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে এমন কিছুর ইবাদত কর যা তোমাদের কোনো উপকার করতে পারে না এবং অপকারও করতে পারে না?* ধিক তোমাদের জন্য এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদাত কর তাদের জন্য! তবুও কি তোমরা অনুধাবন করবে না?) [আল-আম্বিয়া: ৬৬-৬৭] আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার অস্তিত্ব ও রুবুবিয়্যাত প্রমাণকারী এসব দলিলের চেয়ে বড় দলিল দেখেছো কী?!
আল্লাহ তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছেন যারা তিনি ছাড়া অন্যদের সাথে সৃষ্টিকে সম্পৃক্ত করেছে এবং তিনি তাদেরকে ধমক ও শাসানোর স্বরে প্রশ্ন করেছেন: তাদেরকে কি অস্তিত্বহীন থেকে সৃষ্টি করা হয়নি? নাকি তারাই নিজেদেরকে সৃষ্টি করেছে এবং আরো সৃষ্টি করেছে আসমান ও জমিনকে? নাকি তাদের কাছে আল্লাহর গুপ্তভাণ্ডার রয়েছে? নাকি তারা নিয়ন্ত্রণকারী? আল্লাহ বলেন: (তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা?* নাকি তারা আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না।* আপনার রবের গুপ্তভাণ্ডার কি তাদের কাছে রয়েছে, নাকি তারা এ সবকিছুর নিয়ন্তা?) [আত-তূর: ৩৫-৩৭] এ নিদর্শনটি স্রষ্টার অস্তিত্বের ওপর সবচেয়ে বড় নিদর্শন। এই জন্যই প্রমাণিত আছে যে, জুবাইয়ের ইবনু মুতয়িম বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মাগরিবের সালাতে সূরা আত-তূর পড়তে শুনেছি। যখন তিনি এই আয়াতের নিকট পৌঁছলেন: (তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা?* নাকি তারা আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না।* আপনার রবের গুপ্তভাণ্ডার কি তাদের কাছে রয়েছে, নাকি তারা এ সবকিছুর নিয়ন্তা?), তিনি বলেন, “আমার অন্তর উড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।”) {বুখারী (৪৮৫৪), মুসলিম (৪৬৩), আবূ দাউদ (৮১১), নাসায়ী (৯৮৭) ও ইবনু মাজাহ (৮৩২)} জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু এই আয়াতটি শুনেছিলেন তার ইসলাম গ্রহণ করার পূর্বে। কাজেই স্পষ্ট হলো যে, তারা সৃষ্ট, লালিত, অধীনস্ত। আল্লাহ সেসব থেকে পবিত্র যা দ্বারা তারা তাকে বিশেষিত করে।
মহান আল্লাহ বলেন: (আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টিকালে আমি তাদেরকে সাক্ষী করিনি এবং তাদের নিজেদের সৃষ্টির সময়ও নয়, আর আমি পথভ্রষ্টকারীদেরকে সাহায্যকারীরূপে গ্রহণকারী নই।) [আল-কাহাফ: ৫১] যখন মানুষ আসমানসমূহের সৃষ্টি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে এবং নিজের সৃষ্টির বিষয়ে জানে না, তবে সে কীভাবে তার স্রষ্টা এবং অস্তিত্ব দানকারীকে অস্বীকার করতে পারে?
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাঁর মাখলূককে অযথা সৃষ্টি করেননি, বরং মহান উদ্দেশ্যে সুদৃঢ়ভাবে সৃষ্টি করেছেন। মহা সম্মানিত আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর আমি আসমানসমূহ, জমিন ও এ দু’য়ের মধ্যকার কোনো কিছুই খেলার ছলে সৃষ্টি করিনি;* আমি যদি খেলার উপকরণ গ্রহণ করতে চাইতাম তবে আমি আমার কাছ থেকেই তা গ্রহণ করতাম; কিন্তু আমি তা করিনি।) [আল-আম্বিয়া: ১৬,১৭]
“মাসীহ হলো সৃষ্টিকারী ইলাহ এবং এই জগতের পরিকল্পনাকারী রব” নাসারাদের এই ধারনাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। আর তিনি বর্ণনা করেছেন যে, আসমান ও জমিনের কোনো জিনিস আল্লাহর ওপর গোপন নেই। তিনিই মায়ের পেটে মানুষকে আকৃতি প্রদান করেন। আল্লাহ যাদেরকে মাতৃগর্ভে সৃষ্টি করেছেন ও আকৃতি দিয়েছেন তাদের ভেতর একজন হলেন মাসীহ আলাইহিস সালাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (নিশ্চয় আসমান ও জমিনের কোনো কিছুই আল্লাহর কাছে গোপন থাকে না।* তিনিই মাতৃগর্ভে যেভাবে ইচ্ছে তোমাদের আকৃতি গঠন করেন। তিনি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ্ নেই; তিনি প্রবল পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।) [আলু-ইমরান: ৫, ৬] এ ছাড়াও আল-কুরআনে বর্ণিত অন্যান্য আয়াত, যেমন সূরা আল-আনআম, সূরা আন-নাহল প্রভৃতিতে অনেক দলিল রয়েছে যা গণণা করা সম্ভব না এবং অনেক প্রমাণ রয়েছে যা আয়ত্বে আনা সম্ভব নয়। এসব কিছুই আল্লাহর অস্তিত্ব ও রুবুবিয়্যাতের ওপর প্রমাণ সাব্যস্ত করে।
অধ্যায়: আল্লাহর রুবিয়্যাতের প্রতি ঈমান।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাঁর রুবুবিয়্যাতে একক এবং তিনিই একমাত্র স্রষ্টা। তিনি নিজেই সৃষ্টির শুরু করেছেন, তাতে কেউ অংশীদার ছিল না। মহা সত্য আল্লাহ বলেন: (আল্লাহ্ সৃষ্টির সূচনা করেন, তারপর তিনি এর পুনরাবৃত্তি করবেন, তারপর তোমাদেরকে তাঁরই কাছে প্রত্যাবর্তন করানো হবে।) [আর-রূম: ১১] তিনি আরো বলেন: (বলুন, ‘তোমরা যাদের শরীক কর তাদের মধ্যে কি এমন কেউ আছে, যে সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনে ও পরে সেটার পুনরাবৃত্তি ঘটায়?’ বলুন, ‘আল্লাহ্ই সৃষ্টিকে অস্তিত্বে আনেন ও পরে সেটার পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন’। কাজেই (সত্য থেকে) তোমাদেরকে কোথায় ফেরানো হচ্ছে?) [ইউনুস: ৩৪]
আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় হুকুমে মাখলূক সৃষ্টি করেন। তিনি বলেন: (তাঁর ব্যাপার শুধু এই যে, তিনি যখন কোনো কিছুর ইচ্ছে করেন, তিনি বলেন, 'হও', ফলে তা হয়ে যায়।) [ইয়াসীন: ৮২] আর তিনিই নিজ ইচ্ছানুযায়ী উপকরণ সৃষ্টি করেন। তিনি বলেন: (তারপর আমি তার দ্বারা বিভিন্ন প্রকার উদ্ভিদ জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।) [ত্বহা : ৫৩] মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (প্রত্যেক প্রকারের ফলই তাতে দু’টি করে জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি।) [আর-রা‘দ: ৩] তিনি আরো বলেন: (আর প্রত্যেক বস্তু আমি সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়, যাতে তোমরা উপদেশ গ্ৰহণ কর।) [আয-যারিয়াত : ৪৯]
আল্লাহু সুবহানাহু সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা, আর তিনি ছাড়া যা কিছু রয়েছে সবই সৃষ্ট মাখলূক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।) [আয-যুমার: ৬২]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা ও পরিচালনাকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবের ‘ইবাদাত করো যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও।* যিনি জমিনকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আসমানকে করেছেন ছাদ এবং আকাশ হতে পানি অবতীর্ণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। কাজেই তোমরা জেনে শুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিও না।( [আল-বাকারা: ২১-২২] আল্লাহ তায়ালা বলেন: (নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনি কর্মসমূহ পরিচালনা করেন।) [ইউনুস: ৩] কাজেই আল্লাহু সুবহানাহু আসমান ও জমিনের স্রষ্টা এবং তাদের উভয়ের মালিক। তিনিই তাতে কর্তৃত্বকারী। মহা সম্মানিত সত্য সত্ত্বা বলেন: (আসমানসমূহ ও জমিনের চাবিসমূহ তাঁরই কাছে। আর যারা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।) [আয-যুমার: ৬৩] আল্লাহ মাখলূককে যা ক্ষমতা দিয়েছেন তার বাইরে কেউ নিজের কোনো বিষয় অথবা অপরের কোনো বিষয় পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধান করতে পারে না। বিশ্ব জগতে কোনো কর্তৃত্ব কিংবা কোনো উপকার সাধন কিংবা কোনো অপকার সাধন না ফেরেশতাগণ পারেন, না নবীগণ বা অলীগণ পারেন। আল্লাহ বলেন: *(বলুন, 'তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ্ মনে করতে তাদেরকে ডাক। তারা আসমানসমূহে অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়, জমিনেও নয়। আর এ দু'টিতে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সহায়কও নয়।') [সাবা : ২২]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ সত্যিকার মালিক। আর তিনি ছাড়া যা কিছু রয়েছে সব মালিকানাধীন এবং প্রত্যেক বাদশাহর বাদশাহী ক্ষণস্থায়ী ধ্বংসশীল। মহান আল্লাহ বলেন: (বিচার দিনের মালিক।) [আল-ফাতিহাহ: ৪] তিনি আরো বলেন: (বলুন, ‘হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন এবং আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন, আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান’।) [আলে ইমরান : 26] তিনি ছাড়া যা কিছু রয়েছে সবই পালিত ও আশ্রিত। আল্লাহ বলেন: (আসমানসমূহ ও জমিনে এমন কেউ নেই, যে দয়াময়ের কাছে বান্দারূপে উপস্থিত হবে না।) [মারয়াম: ৯৩]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ নিজেই আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, তিনি রাত দ্বারা দিনকে আচ্ছাদিত করেন এবং রাতকে আচ্ছাদিত করেন দিন দ্বারা। তিনিই সূর্য ও চাঁদকে অনুগত করেছেন। প্রত্যেকে পরিভ্রমণ করে তার নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত। মহান আল্লাহ বলেন: (তিনি যথাযথভাবে আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছেন। তিনি রাত দ্বারা দিনকে আচ্ছাদিত করেন এবং রাতকে আচ্ছাদিত করেন দিন দ্বারা। সূর্য ও চাঁদকে তিনি করেছেন নিয়মাধীন। প্ৰত্যেকেই পরিক্রমণ করে এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত। জেনে রাখো, তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।) [আয-যূমার : ৫] তিনিই সূর্যকে দীপ্তিময় ও চাঁদকে আলোকময় করেছেন। আর রাত ও দিনের পরিবর্তনকে তার মহান সৃষ্টি ও সুন্দর পরিকল্পনার ওপর দলিল বানিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনি সূর্যকে দীপ্তিময় ও চাঁদকে আলোকময় করেছেন এবং তার জন্য মনযিল নির্দিষ্ট করেছেন যাতে তোমরা বছর গণনা ও সময়ের হিসাব জানতে পার। আল্লাহ্ এগুলোকে যথাযথ ভাবেই সৃষ্টি করেছেন। তিনি এসব নিদর্শন বিশদভাবে বর্ণনা করেন এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা জানে।* নিশ্চয় দিন ও রাতের পরিবর্তনে এবং আল্লাহ্ আসমানসমূহ ও জমিনে যা সৃষ্টি করেছেন তাতে নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা তাকওয়া অবলম্বন করে।) [ইউনুস: ৫-৬] তিনিই আমাদেরকে একই নফস থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার স্ত্রীকে বানিয়েছেন। তিনি সকল প্রকার জন্তু সৃষ্টি করেছেন। প্রশংসিত ও পবিত্র নামের অধিকারী আল্লাহ বলেন: (তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন একই ব্যক্তি হতে। তারপর তিনি তার থেকে জোড়া সৃষ্টি করেছেন। আর তিনি তোমাদের জন্য নাযিল করেছেন আট জোড়া চতুষ্পদ জন্তু। তিনি তোমাদেরকে তোমাদের মাতৃগর্ভের ত্ৰিবিধ অন্ধকারে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করেছেন। তিনিই আল্লাহ; তোমাদের রব; সর্বময় কর্তৃত্ব তাঁরই; তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। অতঃপর তোমাদেরকে কোথায় ফিরানো হচ্ছে?) [আয-যুমার: ৬]
আমরা বিশ্বাস করি যে, তিনি রিযিকদাতা, প্রবল শক্তিধর, তিনি ছাড়া কোনো রিযিকদাতা নেই, তিনি ছাড়া কেউ যথেষ্ট নন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (নিশ্চয় আল্লাহ, তিনিই তো রিযিকদাতা, প্রবল শক্তিধর, পরাক্রমশালী।) [আয-যারিয়াত: ৫৮] তিনি আরো বলেছেন: (আর জমিনে বিচরণকারী সবার জীবিকার দায়িত্ব আল্লাহরই এবং তিনি সেসবের স্থায়ী ও অস্থায়ী অবস্থিতি সম্বন্ধে অবহিত; সবকিছুই সুস্পষ্ট কিতাবে আছে।) [সূরা হুদ: ৬]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক বস্তুকে তাঁর জ্ঞান দ্বারা বেষ্টন করে নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: (তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না।) [আল-বাকারাহ : ২৫৫] কাজেই তাঁর ইলম থেকে কোনো ছোট অথবা বড় বস্তু গোপন থাকে না। মহা সম্মানিত ও মহান রাজত্বের অধিকারী আল্লাহ বলেন: (তিনি গায়েব সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত; আসমানসমূহ ও জমিনে তাঁর অগোচরে নয় অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তার চেয়ে ছোট বা বড় কিছু; এর প্রত্যেকটিই আছে সুস্পষ্ট কিতাবে।) [আস-সাবা: ৩] তাঁর ইলম এই জগতের সব কিছুকে বেষ্টন করে আছে। আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন: (আর গায়েবের চাবি তাঁরই কাছে রয়েছে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত রয়েছেন, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অংকুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।) [আল-আনআম : ৫৯] তিনি তার বেষ্টনকারী ইলম সম্পর্কে আরো স্পষ্ট করে বলেন: (আর জমিনে বিচরণশীল প্রতিটি জীব বা দু’ডানা দিয়ে উড়ে এমন প্রতিটি পাখি ,তোমাদের মতো এক একটি উম্মত। এ কিতাবে আমি কোনো কিছুই বাদ দেইনি; তারপর তাদেরকে তাদের রব-এর দিকে একত্র করা হবে।) [আল-আন‘আম: ৩৮]
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ সুবহানাহু দৃশ্য ও অদৃশ্যের সম্যক দ্রষ্টা। তিনি বলেন: (তিনি গায়েব ও প্রকাশ্যের জ্ঞানী, মহান, সর্বোচ্চ।) [আর-রা‘দ: ৯] তিনি তাঁর অদৃশ্যের জ্ঞান কাউকে অবগত করান না, তবে রাসূলদের থেকে যাকে জানাতে ইচ্ছে করেন তাকে ছাড়া। আল্লাহু সুবহানাহু বলেন: (তিনিই গায়েবী বিষয়ের জ্ঞানী, তিনি তাঁর গায়েবের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না,* তাঁর মনোনীত রাসূল ছাড়া। সে ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের সামনে এবং পিছনে প্রহরী নিয়োজিত করেন।) [আল-জিন: ২৬,২৭] যে কেউ গায়েবের ইলমের দাবি করল সে মিথ্যাবাদী ও মিথ্যা রটনাকারী। রাসূলগণ গায়েব জানতেন না, আল্লাহ তাঁর নবীকে বলতে নির্দেশ দিয়েছেন যে: (বলুন, আমি বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর খাজানা (ধনভাণ্ডার) রয়েছে এবং আমি গায়েব জানি না।) [আল-আনআম: ৫০]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ সুবহানাহু একাই জীবন ও মৃত্যু দানকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (নিশ্চয় আল্লাহ্, আসমান ও জমিনের মালিকানা তাঁরই; তিনি জীবন দান করেন এবং তিনি মৃত্যু ঘটান। আর আল্লাহ্ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই, সাহায্যকারীও নেই।) [আত-তাওবাহ: ১১৬] তিনি আরো বলেন: (আর তিনিই তোমাদেরকে জীবিত করেছেন; তারপর তিনিই তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন, পুনরায় তিনিই তোমাদের জীবিত করবেন। মানুষ তো খুব বেশী অকৃতজ্ঞ।) [আল-হাজ্জ: ৬৬] কেবল আল্লাহ-ই জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য --- কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম? তিনি পরাক্রমশালী, ক্ষমাশীল।) [আল-মুলক: ২] একমাত্র তিনিই নসফসমূহকে মৃত্যু দান করেন। আল্লাহ বলেন: (আল্লাহ-ই নফসসমূহকে তাদের মৃত্যুর সময় মৃত্যু ঘটান।) [আয-যুমার : ৪২]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক বস্তুকে ক্ষমতা ও হিকমত দ্বারা বেষ্টন করে আছেন। যেমন তিনি তার বাণীতে আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন: (আর আল্লাহর প্রতিই সিজদাবনত হয় আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে ইচ্ছায় ও অনিচ্ছায় এবং তাদের ছায়াগুলোও সকাল ও সন্ধ্যায়।) [আর-রা‘দ: ১৫] মহান আল্লাহ বলেন: (যেদিন তারা (লোকসকল) প্রকাশিত হবে সেদিন আল্লাহর কাছে তাদের কিছুই গোপন থাকবে না। আজ কর্তৃত্ব কার? আল্লাহরই, যিনি এক, প্ৰবল প্ৰতাপশালী।) [গাফির: ১৬]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ আসমানকে সৃষ্টি করেছেন এবং বিনা খুঁটিতেই তা উচ্চে উঠিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনি আসমানসমূহ নির্মাণ করেছেন খুঁটি ছাড়া---তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ; তিনিই জমিনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে।) [লুকমান: ১০] আর তিনি মাখলূকের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও জমিনের সমস্ত কিছু নিজ অনুগ্রহে। তিনি পবিত্র ও মহান। তিনি বলেন: (আর তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন আসমানসমূহ ও জমিনের সমস্ত কিছু নিজ অনুগ্রহে, নিশ্চয় এতে অনেক নিদর্শন রয়েছে, এমন সম্প্রদায়ের জন্য যারা চিন্তা করে।) [আল-জাসিয়াহ: ১৩]
আমরা ঈমান আয়ন করি যে, মহা সম্মানিত প্রতিপালকেরই সকল সৃষ্টি ও নির্দেশ। মহান আল্লাহ বলেন: (জেনে রাখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। আল্লাহ মহান, যিনি সকল সৃষ্টির রব।) [আল-আরাফ : ৫৪] অতএব তিনি ছাড়া কোনো রব নেই আর তিনি ছাড়া কোনো শরীয়ত প্রণেতা নেই। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছন: (তিনি তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন দ্বীন, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন নূহকে, আর যা আমি ওহী করেছি আপনাকে।) [আশ-শুরা : ১৩] তিনি আরো বলেন: (তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটা করে শরীয়ত ও স্পষ্টপথ নির্ধারণ করে দিয়েছি।) [আল-মায়িদাহ : ৪৮] কেবল তিনিই শরীয়ত প্রণয়ন করেন, ফরযসমূহ অবধারিত করেন এবং দ্বীনকে স্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন। মহা সত্য আল্লাহ তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছেন যারা নিজেদের আলেম ও ইবাদতকারীদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছিলো এবং তাদের জন্য যে দ্বীন তারা প্রবর্তন করেছিলো তা তাদের থেকে কবুল করেছিলো। আল্লাহ বলেন: (তারা আল্লাহকে ছাড়া তাদের আলেম ও ইবাদতকারীদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করে নিয়েছে।) [আত-তাওবাহ: ৩১] তিনি আরো বলেন: (নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক রয়েছে, যারা এদের জন্য দ্বীন থেকে বিধান প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি?) [আশ-শুরা: ২১]
আল্লাহ তা‘আলা যেমন মাখলূক সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই তাদের মালিক, তাদের জন্যে শরীয়ত প্রবর্তন করেছেন, তেমনি তিনি একাই তাদের থেকে হিসাব গ্রহণ ও তাদেরকে প্রতিদান প্রদানে সক্ষম। আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন: (আর আল্লাহ্ আসমানসমূহ ও জমিনকে সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং যাতে প্রত্যেক ব্যাক্তিকে তার কাজ অনুযায়ী ফল দেয়া যেতে পারে। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।) [আল-জাসিয়াহ : ২২] সম্মানিত আল্লাহ বলেছেন: (কেয়ামত তো অবশ্যম্ভাবী, আমি এটা গোপন রাখতে চাই যাতে প্রত্যেককে নিজ নিজ অনুযায়ী প্রতিদান দেয়া যায়।) [সূরা ত্বহা: ১৫]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের স্রষ্টা এবং তাদের কর্মেরও স্রষ্টা। তিনি বলেন: (অথচ আল্লাহ্ই তোমাদেরকে এবং তোমরা যা কর তা সৃষ্টি করেছেন।) [আস-সাফফাত: ৯৬]
আমরা মহা সত্য আল্লাহর জন্য সত্যিকার সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি তাঁর পার্থিব জগতের প্রত্যেক নিদর্শনকে এ কথার সাক্ষী ও দলিল বানিয়েছেন যে, তিনিই একমাত্র স্রষ্টা। আল্লাহ নিম্নের বাণীতে তা খুব গুরুত্বসহ বর্ণনা করেছেন: (কাজেই যিনি সৃষ্টি করেন, তিনি কি তার মত যে সৃষ্টি করে না? তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না?) [আন-নাহল: ১৭] আল্লাহু জাল্লা শানুহু যারা তাঁর রুবুবিয়্যাতে অথবা তাঁর উলুহিয়্যাতে শরীক সাব্যস্ত করে তাদেরকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। কারণ, একমাত্র তিনিই স্রষ্টা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তবে কি তারা আল্লাহর সাথে এমন শরীক সৃষ্টি করেছে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মত সৃষ্টি করেছে, যে কারণে সৃষ্টি তাদের কাছে সদৃশ মনে হয়েছে? বলুন, ‘আল্লাহ্ সকল বস্তুর স্রষ্টা; আর তিনি এক, মহা প্রতাপশালী।) [আর-রা‘দ: ১৬]
মুশরিকরা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের প্রতি ঈমান আনয়ন করতো এবং তারা জানতো যে, কেবল আল্লাহ-ই সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, জীবনদাতা ও মৃত্যুদাতা। তিনিই উপকারকারী ও ক্ষতিসাধনকারী। আর তাদের মূর্তিগুলো ও তাদের ইলাহগুলো কোনো উপকার ও ক্ষতি করতে পারে না, তবে তারা কেবল আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছানেওয়ালা উসিলা মাত্র। তবু তিনি তাদের থেকে তা কবূল করেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, 'কে আসমানসমূহ ও জমিনকে সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন?' তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ্'। তাহলে কোথায় তাদের ফিরানো হচ্ছে !* আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছে তার রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছে সীমিত করেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।* আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞাস করেন, 'আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে কে ভূমিকে সঞ্জীবিত করেন তার মৃত্যুর পর?' তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ্'। বলুন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই'। কিন্তু তাদের অধিকাংশই এটা অনুধাবন করে না।) [আল-আনকাবূত: ৬১-৬৩] এদতসত্বেও যখন তাদেরকে মসিবত স্পর্শ করত তখন তারা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করত এবং তাঁর কাছেই তারা ফিরে যেত। তাও তাদের কোনো উপকার করেনি; যেহেতু তারা তাদের শিরকে ও কুফরিতে বিদ্যমান ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (অতঃপর তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা আনুগত্যে বিশুদ্ধ হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্কে ডাকে। তারপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়;* আমি তাদেরকে যা দিয়েছি, তার সাথে কুফরী করার এবং ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকার উদ্দেশ্যে; সুতরাং শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।) [আল-আনকাবূত: ৬৫-৬৬]
অধ্যায়: আল্লাহর উলূহিয়্যাতের প্রতি ঈমান।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাঁর উলূহিয়্যাতে একক, তিনি ছাড়া সত্য কোনো মাবূদ নেই, তিনি এক তাঁর কোনো শরীক নেই। কেবল তিনিই হক আর তারা তাকে ছাড়া যাদেরকে আহ্বান করে তারা সবাই বাতিল। এটাই সেই মহান বিষয় যার জন্যে তিনি কিতাব নাযিল করেছেন, রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং জান্নাত ও জাহান্নাম সৃষ্টি করেছেন। মানুষের প্রকৃতি এটিই প্রমাণ করে আর সুস্থ বিবেকও তারই সাক্ষ্য বহন করে। আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, নবীগণ তাদের কওমকে যে দাওয়াত দিয়েছেন তার মূল হলো, এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে তাদেরকে আহ্বান করা এবং তিনি ছাড়া সব কিছুর ইবাদত ত্যাগ করা। আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন: (আর তোমার পূর্বে এমন কোনো রাসূল আমি পাঠাইনি যার প্রতি আমি এই ওহী নাযিল করিনি যে, ‘আমি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমার এবাদত করো।) [আল-আম্বিয়া: ২৫] তিনি আরো বলেন: (আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং পরিহার কর তাগূতকে।) [আন-নাহল: ৩৬] তিনি আরো বলেন: (আর আপনার পূর্বে আমি আমার রাসূলগণ থেকে যাদেরকে প্রেরণ করেছিলাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, আমি কি রহমান ছাড়া ইবাদত করা যায় এমন কোনো ইলাহ স্থির করেছিলাম?) [আয-যুখরূফ: ৪৫] প্রথম নবী নূহ থেকে সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ ‘আলাইহিমুস সালাম পর্যন্ত প্রত্যেকেই তার কওমকে বলেছেন: তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই। যেমন আল্লাহ নূহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, তিনি বলেছেন: (হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহ ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো সত্য ইলাহ নেই।) [আল-আরাফ: ৫৯] আর তাদের সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সংবাদ দেন যে, তিনি বলেছেন: “বলুন, 'আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র এবং সত্য কোনো ইলাহ্ নেই আল্লাহ ছাড়া, যিনি এক, প্রবল প্ৰতাপশালী।” [সূরা সাদ: ৬৫] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন: (তিনিই তো আল্লাহ্ , তোমাদের রব; তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনিই সবকিছুর স্রষ্টা; কাজেই তোমরা তাঁর ‘ইবাদত কর; তিনি সবকিছুর তত্ত্বাবধায়ক।) [আল-আনআম: ১০২]
এটিই সেই মহান বিষয় যার জন্যে আল্লাহ সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যেই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।” [আয-যারিয়াত: ৫৬] «يعبدون» এর অর্থ হলো, يوَحِّدون অর্থাৎ আমাকে (ইবাদতে) এক জানবে। ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের তাফসীরের সময় বলেন, “আমি দুই দলের মধ্যে যারা ভাগ্যবান তাদেরকে একমাত্র আমার তাওহীদের জন্যেই সৃষ্টি করেছি।” {বুখারীতে কথাটি কারো সাথে সম্পৃক্ত না করে এভাবেই বলা হয়েছে: (৬/৪৯), ইবনু হাজার ‘ফাতহুল বারীতে’ উল্লেখ করেছেন যে, কথাটি ফাররা-এর, (৮/৬০০)}
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মু‘আয বিন জাবাল-কে শাসনকর্তা হিসেবে ইয়ামান দেশে পাঠান, তখন বলেছিলেনঃ তুমি আহলে কিতাব লোকদের নিকট যাচ্ছো। সেহেতু প্রথমে তাদের আল্লাহর ‘ইবাদাতের দাওয়াত দিবে। {বুখারী (১৪৫৮), মুসলিম (১৯)} বুখারী রাহিমাহুল্লাহ তার ওপর এভাবে অধ্যায় রচনা করেছেন: “অধ্যায়: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক তার উম্মাতকে তাওহীদের দিকে দাওয়াত দেওয়া প্রসঙ্গে যা বর্ণিত হয়েছে তা প্রসঙ্গে।”
সত্যিকার ইবাদত হলো যা দু’জাহানের রব আল্লাহর জন্য হবে এবং রাসূলদের সরদারের পদ্ধতি মোতাবিক হবে। কারণ, তিনি ছাড়া সকল মাবূদের ইবাদত বাতিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (এগুলো প্রমাণ যে, আল্লাহ্ তিনিই সত্য এবং তারা তাঁকে ছাড়া যাকে ডাকে, তা মিথ্যা।) [আল-হাজ্জ: ৬২] লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এর অর্থ হলো, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই। কারণ পূর্বের আয়াত এই অর্থকেই প্রমাণ করে।
এক আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এবং তিনি ছাড়া সবাইকে বাদ দিয়ে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা হলো: «لا إله إلا الله» এর মূল বিষয়। মহান এই কালিমাটি আল্লাহ ছাড়া সকল মা‘বূদের ইবাদতের হকদার না হওয়াকে অন্তর্ভূক্ত করেছে। অনুরূপভাবে আল্লাহ ছাড়া সকল মা‘বূদ থেকে সত্যিকার উলূহিয়্যাকে না করা হয়েছে এবং আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য সত্যিকার উলুহিয়্যাকে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এটিও সাব্যস্ত করা হয়েছে যে, আল্লাহ ছাড়া কারো জন্যই বিশুদ্ধ ইবাদত হতে পারে না। এই কালিমাটি হুবহু এই শব্দে কুরআনুল কারীমে অনেক বার এসেছে এবং ইবাদতকে (আল্লাহর জন্য) সাব্যস্ত করা ও (গায়রুল্লাহের জন্য) সাব্যস্ত না করার অর্থে অনেক আয়াত বর্ণিত হয়েছে। যেমন আল্লাহর বাণীতে এসেছে: “আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাগুতকে পরিহার কর।” [আন-নাহল: ৩৬] আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন: “আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না” [আন-নিসা : ৩৬]
এই মজবূত রুকন ও শক্তিশালী ভিত্তিই হলো আল্লাহর দ্বীন। আর তা হলো এক আল্লাহর জন্য উলূহিয়্যাকে সাব্যস্ত করা এবং তিনি ছাড়া অন্যদের থেকে ইবাদতকে অস্বীকার করা। এটিই দ্বীনের মূল কেন্দ্রবিন্দু এবং রাসূলগণের দাওয়াতের ভিত্তি। তার অর্থ হলো, মাখলূকের আমলসমূহ দ্বারা স্রষ্টাকে একক সাব্যস্ত করা। তুমি কুরআনের কোনো সূরাকেই ভিত্তি স্থাপন হিসেবে হোক অথবা গুরুত্ব প্রদান হিসেবে হোক এই বিষয় থেকে খালি পাবে না। আর আল্লাহ তাঁর মাখলূকের ওপর অনেক প্রমাণ ও সাক্ষ্য দ্বারা দলিল পেশ করেছেন যা গণনা করা অথবা আয়ত্বে আনা সম্ভবপর নয়। এই বিষয়ে সবচেয়ে বড় দলিল হলো খোদ আল্লাহু সুবাহানাহু ওয়া তা‘আলার সাক্ষ্য, যেমন তিনি বলেন: (বলুন, ‘কোন জিনিস সবচেয়ে বড় সাক্ষী’ ? বলুন, ’আল্লাহই আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্যদাতা। আর এ কুরআন আমার নিকট ওহী করা হয়েছে যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট তা পৌঁছবে তাদের এ দ্বারা সতর্ক করতে পারি। তোমারা কি এ সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহও আছে? বলুন, ‘ আমি সে সাক্ষ্য দেই না ’। বলুন , ’তিনি তো একমাত্র প্রকৃত ইলাহ এবং তোমরা যা শরীক কর তা থেকে আমি অবশই বিমুক্ত’।) [আল-আনআম: ১৯]
সবচেয়ে বড় সাক্ষ্যের ওপর আল্লাহু সুবহানাহু সাক্ষ্য দিয়েছেন, তাঁর সবচেয়ে সম্মানিত মাখলুক তথা ফেরেশতাগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন, এবং আহলুল ইলমগণও। সেই সাক্ষ্য হলো আল্লাহর একত্ব এবং তাঁর উলূহিয়্যাহর উপর। আল্লাহ বলেন: “আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই, আর মালায়েকা ও জ্ঞানীগণও। তিনি ন্যায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আলে ইমরান : 18] আল্লাহ নিজের জন্য যে সাক্ষ্য দিয়েছেন সেই সাক্ষ্য ফেরেশতা ও জ্ঞানীগণও প্রদান করেছেন। “আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” [আন-নিসা: ৭৯]
এই জগতের ভেতর যা কিছু রয়েছে তার স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তার দ্বারা তিনি মাখলূকের ওপর দলিল পেশ করেছেন, বরং পার্থিব প্রত্যেকটি নিদর্শনকে তাঁর উলূহিয়্যাহ ও ইবাদতের হকদার হওয়ার ওপর সাক্ষী বানিয়েছেন। এই জন্যই কুরআনে এই বিষয়ে তাদেরকে অনেক প্রশ্ন করা হয়েছে এবং তারা স্বীকার করেছে যে, কেবল আল্লাহ-ই হলেন স্রষ্টা, রিযিকদাতা, জীবন ও মৃত্যুদানকারী। অতঃপর তিনি তাঁর ইবাদত না করা কিংবা তাঁর সাথে অন্যদের ইবাদত করাকে তাদের ওপর অস্বীকার ও অপছন্দ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, 'কে আসমানসমূহ ও জমিনকে সৃষ্টি করেছেন এবং চন্দ্র-সূর্যকে নিয়ন্ত্রিত করেছেন?' তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ্'। তাহলে কোথায় তাদের ফিরানো হচ্ছে !* আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছে তার রিযিক বাড়িয়ে দেন এবং যার জন্য ইচ্ছে সীমিত করেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সবকিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।* আর যদি আপনি তাদেরকে জিজ্ঞাসা করেন, 'আকাশ হতে বারি বর্ষণ করে কে ভূমিকে সঞ্জীবিত করেন তার মৃত্যুর পর?' তারা অবশ্যই বলবে, 'আল্লাহ্'। বলুন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহরই'। কিন্তু তাদের অধিকাংশই এটা অনুধাবন করে না।) [আল-আনকাবূত: ৬১-৬৩] তিনি আরো বলেন: (আর আপনি যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন, ‘কে আসমানসমূহ ও জমিন সৃষ্টি করেছে?’ তারা অবশ্যই বলবে, ‘এগুলো তো সৃষ্টি করেছেন পরাক্রমশালী সর্বজ্ঞ।’* যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে বানিয়েছেন শয্যা এবং তাতে বানিয়েছেন তোমাদের চলার পথ, যাতে তোমরা সঠিক পথ পেতে পার;* আর যিনি আসমান থেকে বারি বর্ষণ করেন পরিমিতভাবে। অতঃপর তা দ্বারা আমি সঞ্জীবিত করি নির্জীব জনপদকে। এভাবেই তোমাদেরকে বের করা হবে।* আর যিনি সকল প্রকারের জোড়া যুগল সৃষ্টি করেছেন এবং যিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এমন নৌযান ও গৃহপালিত জন্তু যাতে তোমরা আরোহণ কর।) [আয-যুখরুফ: ৯-১২]
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের ওপর আরো দলিল পেশ করেছেন যে, তিনি তাদের ওপর তাঁর নিয়ামতসমূহের স্বীকৃতি আদায় করেছেন যা তাদের ওপর নিয়ামতসমূহের দাতা ও তার স্রষ্টার ইবাদতকে ওয়াজিব করে। আল্লাহু সুবাহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন: “বলুন, ‘কে তোমাদেরকে আসমান ও জমিন থেকে জীবনোপকরণ সরবারহ করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, জীবিতকে মৃত থেকে কে বের করেন এবং মৃতকে কে জীবিত হতে কে বের করেন এবং সব বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন?’ তখন তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ্’। সুতরাং বলুন, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?* অতএব, তিনিই আল্লাহ্, তোমাদের সত্য রব। সত্য ত্যাগ করার পর বিভ্রান্তি ছাড়া আর কী থাকে? কাজেই তোমাদেরকে কোথায় ফেরানো হচ্ছে?” [ইউনূস : ৩১-৩২]
কুরআনের অনেক জায়গায় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রুবুবিয়্যাতের নিদর্শনসমূহ দ্বারা বান্দাদের ওপর দলিল পেশ করেছেন যা একমাত্র আল্লাহর ইবাদতকে আবশ্যক করে। আর তিনি একাই এসব বড় বড় নিদর্শনের স্রষ্টা। কাজেই তাঁর সাথে যেমন কোনো স্রষ্টা নেই তেমন তাঁর সাথে কারো ইবাদত করাও সমীচীন নয়। এ জন্যই নিচের এই আয়াতগুলোকে সমাপ্ত করেছেন তার বাণী: {أَإِلَهٌ مَّعَ اللَّهِ} (কোনো ইলাহ কী রয়েছে আল্লাহর সাথে?!) দ্বারা। সেসব বাণীগুলো হলো: (নাকি তিনি, যিনি সৃষ্টি করেছেন আসমানসমূহ ও জমিন এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্য বর্ষণ করেন বৃষ্টি, তারপর আমি তা দ্বারা মনোরম উদ্যান সৃষ্টি করি, তার গাছ উদ্গত করার ক্ষমতা তোমাদের নেই। আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ্ আছে কি? বরং তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা (আল্লাহর) সমকক্ষ নির্ধারণ করে।* নাকি তিনি, যিনি জমিনকে করেছেন বসবাসের উপযোগী এবং তার মাঝে মাঝে প্রবাহিত করেছেন নদীনালা এবং তাতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বত ও দুই সাগরের মাঝে সৃষ্টি করেছেন অন্তরায়; আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ আছে কি? বরং তাদের অধিকাংশই জানে না।* নাকি তিনি যিনি নিরুপায়কে সাড়া দেন যখন সে তাকে ডাকে এবং বিপদ দূরীভূত করেন আর তোমাদেরকে জমিনের প্রতিনিধি বানান। আল্লাহর সাথে কোনো ইলাহ আছে কি? তোমরা উপদেশ অতি সামান্যই গ্রহণ করে থাকো।* নাকি তিনি, যিনি তোমাদেরকে স্থলভূমি ও সমূদ্রের অন্ধকারে পথ দেখান এবং যিনি তাঁর অনুগ্রহের প্রাক্কালে সুসংবাদবাহী বাতাস প্রেরণ করেন। আল্লাহর সাথে অন্য কোনো ইলাহ আছে কি? তারা যাকে শরীক করে আল্লাহ্ তা থেকে বহু ঊর্ধ্বে।) [আন-নামল: ৬০-৬৩]
যখন সূরা রুমে আল্লাহ তাআলা তাঁর রুবুবিয়্যাত প্রমাণকারী যা তাঁর উলূহিয়্যাকে আবশ্যক করে, এমন বড় বড় মাখলূক উল্লেখ করেছেন, যেমন আল্লাহু সুবাহানাহু ওয়া তা‘আলার বাণী: (আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর এখন তোমরা মানুষ, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছ।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য। এতে তো অবশ্যই বহু নিদর্শন রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে রাতে ও দিনে তোমাদের নিদ্রা এবং তাঁর অনুগ্রহ থেকে তোমাদের (জীবিকা) অন্বেষণ। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য যারা শোনে।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদেরকে প্রদর্শন করান বিদ্যুৎ, ভয় ও আশার সঞ্চারকরূপে এবং আসমান থেকে পানি নাযিল করেন অতঃপর তা দিয়ে জমিনকে পুনর্জীবিত করেন সেটার মৃত্যুর পর; নিশ্চয় এতে বহু নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা অনুধাবন করে।* আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তাঁরই আদেশে আসমান ও জমিনের স্থিতি থাকে; তারপর আল্লাহ্ যখন তোমাদেরকে জমিন থেকে উঠার জন্য একবার ডাকবেন তখনই তোমরা বেরিয়ে আসবে।* আর আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে তা তাঁরই। সবকিছু তাঁরই অনুগত। আর তিনি-ই, যিনি সৃষ্টিকে শুরুতে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, তারপর তিনি সেটা পুনরাবৃত্তি করবেন; আর এটা তাঁর জন্য অতি সহজ। আসমানসমূহ ও জমিনে সর্বোচ্চ গুণাবলী তাঁরই এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।* আল্লাহ্ তোমাদের জন্য তোমাদের নিজেদের মধ্যে একটি দৃষ্টান্ত পেশ করছেনঃ তোমাদেরকে আমি যে, রিযিক দিয়েছি, তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের কেউ কি তাতে অংশীদার? ফলে তোমরা কি এ ব্যাপারে সমান? তোমরা কি তাদেরকে সেরূপ ভয় কর যেরূপ তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভয় কর? এভাবেই আমরা নিদর্শনাবলী বিস্তারিত বর্ণনা করি সে সম্প্রদায়ের জন্য, যারা অনুধাবন করে।* বরং যালিমরা অজ্ঞতাবশত তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করে, কাজেই আল্লাহ্ যাকে পথভ্রষ্ট করেন কে তাকে হিদায়াত দান করবে? আর তাদের কোন সাহাযাকারী নেই।) [আর-রূম: ২০-২৯] এখানে প্রত্যেকটি আয়াত শুরু হয়েছে: {وَمِنْ آيَاتِهِ} (তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে) এই কথা দ্বারা; অর্থাৎ আল্লাহর রুবুবিয়্যাহ প্রমাণকারী মহাজাগতিক প্রমাণসমূহ যা তাঁর উলূহিয়্যাহকেও আবশ্যক করে তা হলো যা উল্লেখ করা হয়েছে তা। অতঃপর যে ব্যক্তি আল্লাহর মাখলুক থেকে কোনো বস্তুকে তাঁর সমকক্ষ স্থির করে তার জন্য উল্লিখিত দলিলসমূহের পশ্চাতে এই উদাহরণটি উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “তোমাদের কেউ কী তার বিছানায় তার দাসীতে ও তার স্ত্রীতে কাউকে শরীক করবে?! অনুরূপভাবে আল্লাহর মাখলুক থেকে কাউকে তাঁর সমকক্ষ করাকে তিনি পছন্দ করেন না।” এটি কাতাদাহ বলেছেন। তাফসীর তাবারী: (২০/৯৮৫) অতঃপর তিনি তা সমাপ্ত করেছেন সুস্থ স্বভাবের (মানবিক প্রকৃতির) দাবি একমাত্র আল্লাহু সুবাহানাহু ওয়াতালার ইবাদত করা তা বর্ণনা করে । এই জন্য তিনি বলেন: (কাজেই আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজ চেহারাকে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দ্বীন ইসলাম), যার উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।) [আর-রূম : ৩০]
আল্লাহ তাঁর উলূহিয়্যার ওপর সাক্ষী স্বরূপ বিভিন্ন প্রকার দলিল পেশ করেছেন যার দ্বারা প্রমাণ ও সঠিক রাস্তা স্পষ্ট হয়, যেন আল্লাহর ওপর মানুষের কোনো দলিল বাকি না থাকে। ঠিক যেমন আল্লাহ তাঁর তাওহীদের ওপর চূড়ান্ত প্রমাণ, উজ্জ্বল যুক্তি এবং দীপ্তিময় সাক্ষীসমূহ স্থাপন করেছেন, তেমন তিনি অনেক উদাহরণও দিয়েছেন এবং তা তিনি বর্ণনা করেছেন। মহান ও সর্বোচ্চ আল্লাহ বলেন: (আর আল্লাহ্ আরো উপমা দিচ্ছেন দু ব্যক্তির, তাদের একজন বোবা, কোনো কিছুরই শক্তি রাখে না এবং সে তার অভিভাকের উপর বোঝা; তাকে যেখানেই পাঠানো হোক না কেন সে কোনো কল্যাণ নিয়ে আসতে পারে না; সে কি সমান ঐ ব্যক্তির, যে ন্যায়ের নির্দেশ দেয় এবং যে আছে সরল পথে?) [আন-নাহল: ৭৬] ইবনু জারির এই আয়াতের তাফসীরে বলেন: (এই উদাহরণটি আল্লাহ নিজের জন্য এবং তিনি ছাড়া যাদের ইবাদত করা হয় তাদের জন্য পেশ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, {وَضَرَبَ اللّهُ مَثَلاً رَّجُلَيْنِ أَحَدُهُمَا أَبْكَمُ لاَ يَقْدِرُ عَلَىَ شَيْءٍ} [তাদের একজন বোবা, কোনো কিছুরই শক্তি রাখে না।] তার দ্বারা উদ্দেশ্য করেছেন মূর্তি, যা কিছু শোনে না এবং কোনো কথা বলতে পারে না। কারণ, হয়তো তা খোদাই করা কাঠের তৈরি অথবা তামার তৈরি। সে তার সেবাকারীর কোনো কল্যাণ করতে পারে না এবং তার থেকে কোনো অনিষ্টও দূর করতে পারে না, অধিকন্তু সে তার মনিবের ওপর বোঝা। তিনি বলেন, বোবা তার চাচাতো ভাই, আত্মীয় ও তার অভিভাবকদের ওপর বোঝা। তার মত ঠিক মূর্তিও যে তার ইবাদত করে তার ওপর সে বোঝা। তাকে বহন করা, তাকে বসানো ও তার সেবা সব পরনির্ভরশীল। মানুষের ভেতর বোবা যেমন কিছু করতে পারে না, সে তার অভিভাবক যেমন চাচাতো ভাই ও অন্যদের ওপর বোঝা। {أَيْنَمَا يُوَجِّههُّ لاَ يَأْتِ بِخَيْرٍ} [তাকে কোথাও পাঠানো হলে সে কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারে না।] তিনি বলেন, সে তাকে যেখানে পাঠাবে কোনো কল্যাণ বয়ে আনবে না। কারণ, তাকে কী বলা হয় তা সে বুঝে না এবং সে নিজে যা চায় তার মন থেকে তা ব্যক্ত করতে পারে না। বস্তুত সে নিজে বুঝে না এবং তারটাও বুঝা যায় না। মূর্তি তো এমনই, তাকে যা বলা হয় তা সে বোঝে না, ফলে যে তাকে আদেশ করে তার আদেশ সে পালন করতে পারে না এবং আদেশ করা অথবা নিষেধ করার জন্য কথাও বলতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,{هَلْ يَسْتَوِي هُوَ وَمَن يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ} [সে কি সমান ঐ ব্যক্তির, যে ন্যায়ের নির্দেশ দেয়।] অর্থাৎ এই বোবা যে অভিভাবকের ওপর বোঝা এবং যেখানে তাকে পাঠোনো হয় কোনো কল্যাণ নিয়ে আসতে পারে না, সে কি তার সমান যে কথা বলতে সক্ষম ও কথা বলে এবং সত্যের আদেশ করে ও তার দিকে আহ্বান করে। আর তিনি হলেন মহা প্রতাপশালী এক আল্লাহ, যিনি তাঁর বান্দাদেরকে তাঁর তাওহীদ ও ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন? তিনি বলেন, মহা সম্মানিত আল্লাহ এবং উল্লিখিত দোষ-ত্রুটি সম্পন্ন মূর্তি কখনোই সমান হতে পারে না।) তাফসীর তাবারী: (১৭/১৮৫)
আল্লাহ তা‘আলা বাতিল ইলাহ ও সত্য ইলাহেরও উদাহরণ পেশ করেছেন, যেমনটি মুজাহিদ বলেছেন। তাফসীর তাবারী: (২১/২৮৫) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন: (আল্লাহ্ একটি দৃষ্টান্ত পেশ করছেন: এক ব্যক্তির প্রভু অনেক, যারা পরস্পর বিরুদ্ধভাবাপন্ন এবং আরেক ব্যক্তি, যে এক প্রভুর অনুগত; এ দু'জনের অবস্থা কি সমান? সমস্ত প্ৰশংসা আল্লাহরই; কিন্তু তাদের অধিকাংশই জানে না।) [আয-যুমার: ২৯]
এই বিষয়টি - আর তা হল আল্লাহর আল্লাহর একত্বের স্বীকারোক্তি প্রদান করা, সাথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্য প্রদান করা- এটাকে আল্লাহ তা‘আলা আল্লাহর প্রতি মানুষের ঈমান ও কুফরের মধ্যবর্তী সীমা নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (অতঃপর নিষিদ্ধ মাস অতিবাহিত হলে মুশরিকদেরকে যেখানে পাবে হত্যা কর, তাদেরকে পাকড়াও কর, অবরোধ কর এবং প্রত্যেক ঘাঁটিতে তাদের জন্য ওঁৎ পেতে থাক; কিন্তু যদি তারা তাওবা করে, সালাত কায়েম করে এবং যাকাত দেয়, তবে তাদের পথ ছেড়ে দাও; নিশ্চয় আল্লাহ্ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।) [আত-তাওবাহ : ৫] তিনি আরো বলেন: (অতএব তারা যদি তাওবা করে, সালাত কায়েম করে ও যাকাত দেয় তবে দ্বীনের মধ্যে তারা তোমাদের ভাই।) [আত-তাওবাহ: ১১] ইবনু ওমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (আমাকে লোকেদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার আদেশ দেওয়া হয়েছে; যতক্ষণ না তারা সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর তারা সালাত প্রতিষ্ঠা করবে ও যাকাত প্রদান করবে। যখন তারা এ কাজগুলো সম্পাদন করবে, তখন তারা আমার নিকট থেকে তাদের রক্ত (জান) এবং মাল বাঁচিয়ে নেবে; কিন্তু ইসলামের হক ব্যতীত। আর তাদের হিসাব আল্লাহর ওপর ন্যস্ত হবে।) {বুখারী: (১৩৯৯,৭২৮৪), মুসলিম: (২০), আবূ দাউদ: (১৫৫৬), তিরমিযী: (২৬০৭), নাসাঈ: (২৪৪৩)}
এই ঈমান অন্তরে থাকাই যথেষ্ট নয়, বরং মুখে তা উচ্চারণ করা জরুরি। এই জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমি মানুষদের সাথে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা বলবে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই।” {বুখারী (২৫), মুসলিম (২২)} আর ঈমান ততক্ষণ পর্যন্ত পরিপূর্ণ হবে না যতক্ষণ না এর দাবি অনুযায়ী অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা আমল বাস্তবায়িত হবে। মহা সত্য আল্লাহ বলেছেন: (মুমিন তো তারাই যাদের হৃদয় আল্লাহকে স্মরণ করা হলে কম্পিত হয় এবং তাঁর আয়াতসমূহ তাদের নিকট পাঠ করা হলে তা তাদের ঈমান বর্ধিত করে। আর তারা তাদের রবের উপরই নির্ভর করে,* যারা সালাত কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যা রিযিক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে।* তারাই হলো প্রকৃত মুমিন।) [আল-আনফাল: ২-৪] তিনি আরো বলেন: (পূর্ব ও পশ্চিম দিকে তোমাদের মুখ ফিরানোই সৎকর্ম নয়, কিন্তু সৎকর্ম হলো যে ব্যক্তি আল্লাহ্, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাবসমূহ ও নবীগণের প্রতি ঈমান আনবে। আর সম্পদ দান করবে তার ভালবাসায় আত্মীয়-স্বজন, ইয়াতীম, অভাবগ্রস্ত, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থী ও দাসমুক্তির জন্য এবং সালাত প্রতিষ্ঠা করবে, যাকাত দিবে, প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা পূর্ণ করবে, অর্থ-সংকটে, দুঃখ-কষ্টে ও সংগ্রাম-সংকটে ধৈর্য ধারণ করবে। তারাই সত্যাশ্রয়ী এবং তারাই মুত্তাকী।) [আল-বাকারাহ : ১৭৭]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ যবান দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তরের দ্বারা পরিবর্তন করবে (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।” {মুসলিম (৪৯), আবূ দাউদ (১১৪০), তিরমিযী (২১৭২), নাসাঈ (৫০০৮), ইবনু মাজাহ (১২৭৫)} এই হাদীস প্রমাণ করে যে, ঈমান অন্তরের ভেতর কম-বেশী হয়।
আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়ন করার সাথে তাগুতকে অস্বীকার করা জরুরি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (অতএব, যে তাগূতকে অস্বীকার করবে ও আল্লাহর উপর ঈমান আনবে সে এমন এক দৃঢ়তর রজ্জু ধারন করল যা কখনো ভাঙ্গবে না। আর আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞানী।) [আল-বাকারাহ : ২৫৬] শিরক ও মুশরিকদের থেকে সম্পর্কহীনতা ঘোষণা করাও জরুরী। কারণ, শিরক ও মুশরিকদের থেকে সম্পর্কমুক্ত হওয়া ছাড়া কখনো তাওহীদবাদী হতে পারবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম তার পিতা এবং তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘তোমরা যেগুলোর ইবাদত করো নিশ্চয় আমি তাদের থেকে সম্পৰ্কমুক্ত।) [আয-যুখরুফ: ২৬]
বান্দাকে অবশ্যই এই ঈমানে বিশ্বপ্রভু আল্লাহর জন্য খালিস হতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনি চিরঞ্জীব, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ্ নেই। কাজেই তোমরা তাকেই ডাক, তাঁর আনুগত্যে একনিষ্ঠ হয়ে। সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই।) [গাফির: ৬৫] তিনি আরো বলেন: (আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে।) [আল-বায়্যিনাহ: ৫] আবূ হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হল: হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (আবূ হুরাইরা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদীসের প্রতি তোমার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠচিত্তে বলবে لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোনো ইলাহ নেই)।) বুখারী (৯৯, ৬৫৭০)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: (যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলে আল্লাহ তাআলা তার ওপর জাহান্নাম হারাম করে দিয়েছেন।) {বুখারী (৪২৫), মুসলিম (৩৩), নাসাঈ (৭৮৮), ইবনু মাজাহ (৭৫৪)}
এবং তাকে দৃঢ় বিশ্বাসী হতে হবে, সন্দেহ-সংশয় পোষণকারী হওয়া যাবে না। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা বলেন: (নিশ্চয়ই সত্যিকার মু’মিন ওরা যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান এনেছে অতঃপর তাতে তারা কোনো ধরনের সন্দেহ করেনি।) [আল-হুজুরাত : ১৫] আল্লাহ এক বাগানের জনৈক কাফির মালিক সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, সে বলেছিল: (আমি মনে করি না যে, কেয়ামত সংঘটিত হবে। আর আমাকে যদি আমার রব-এর কাছে ফিরিয়ে নেয়াও হয়, তবে আমি তো নিশ্চয় এর চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল পাব।) [আল-কাহাফ: ৩৬]
অনুরূপভাবে তার ঈমানটা জ্ঞানে সমৃদ্ধ হতে হবে। তাহলেই সে ঈমানের হাকিকত, তার দাবি এবং এর বিপরীত বিষয় সম্পর্কে জানবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (জেনে রেখো, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কোনো সত্য মাবুদ নেই।) [মুহাম্মাদ: ১৯]
ইলম ও ইখলাসের সাথে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা নিয়ে এসছেন, ঈমান যেসব বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে এবং {لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ} বাক্যটি যা প্রমাণ করে, যেমন এক আল্লাহর ইবাদত করা এবং তিনি ছাড়া সকল কিছুর ইবাদত পরিহার করা প্রভৃতিকে কবুল করা জরুরি। আর যে এ বাক্যটি মুখে বলল, কিন্তু এক আল্লাহর ইবাদত গ্রহণ করল না, সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হবে যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন: (তাদেরকে 'আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই’ বলা হলে তারা অহংকার করত।* এবং বলত, 'আমরা কি এক উন্মাদ কবির কথায় আমাদের ইলাহদেরকে বর্জন করব?') [আস-সাফফাত: ৩৫, ৩৬]
সেই সাথে মেনে নিবে ও আনুগত্য প্রকাশ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর যে ব্যক্তি একনিষ্ঠ ও বিশুদ্ধচিত্তে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে, সে তো শক্ত রশি আকড়েঁ ধরে।) [লুকমান: ২২]
আর সে কথা, কাজে ও বিশ্বাসে সত্যবাদী হবে, যেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার নিম্নের বাণীতে যা সুসংবাদ দিয়েছেন তা অর্জন করতে পারে: (যে কোনো বান্দা খাঁটি মনে সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো (সত্য) উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল, তাকে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন।) {বুখারী (১২৮), মুসলিম (৩২)}
এই দ্বীন এবং যিনি এই দ্বীনকে প্রবর্তন করেছেন ও যিনি তা নিয়ে এসেছেন আর যে এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে- তাদের সবাইকে ভালোবাসতে হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তাদেরকে আল্লাহকে ভালবাসার মত ভালবাসে। পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালবাসে।) [আল-বাকারাহ: ১৬৫] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয়পাত্র হই।) {বুখারী (১৫), মুসলিম (৪৪), নাসাঈ (৫০১৩), ইবনু মাজাহ (৬৭)} রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে, সে তা দ্বারা ঈমানের মিষ্টতা লাভ করে: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় হবে, কাউকে ভালোবাসলে কেবল আল্লাহর জন্যই ভালবাসবে, আর কুফরী থেকে তাকে আল্লাহ বাঁচানোর পর পুনরায় তাতে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করবে যেমন সে নিজেকে আগুনে নিক্ষিপ্ত করাকে অপছন্দ করে।” {বুখারী: (১৬), মুসলিম: (৪৩), তিরমিযি (২৬২৪), নাসাঈ (৪৯৮৭), ইবনু মাজাহ (৪০৩৩)}
আল্লাহ যেমন ঈমানের হাকিকত, দাবি, রোকন ও শর্তসমূহ বর্ণনা করেছেন, তেমন বিরুদ্ধাচারী মুশরিকদের সন্দেহ দূর করে দিয়েছেন এবং তাদের শিরকী কর্মকান্ডের জন্য কোনো দলিল নেই সেটিও বর্ণনা করে দিয়েছেন। কারণ, তাদের শরীকরা সৃষ্ট বস্তু, অপরের দ্বারা পরিচালিত হয় এবং তারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না এবং আসমান ও জমিনে বিন্দু পরিমাণ বস্তুরও তারা মালিক নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তারা কি এমন বস্তুকে শরীক করে যারা কিছুই সৃষ্টি করে না? বরং ওরা নিজেরাই সৃষ্ট,* ওরা না তাদেরকে সাহায্য করতে পারে আর না নিজেদেরকে সাহায্য করতে পারে ।* আর তোমরা তাদেরকে সৎপথে ডাকলেও তারা তোমাদেরকে অনুসরণ করবে না; তোমরা ওদেরকে ডাক বা চুপ থাক, তোমাদের জন্য উভয়ই সমান।* আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে আহবান কর তারা তো তোমাদেরই মত বান্দা; সুতরাং তোমরা তাদেরকে ডাক, অতঃপর তারা যেন তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।* তাদের কি পা আছে যা দিয়ে ওরা চলে? তাদের কি হাত আছে যা দিয়ে ওরা ধরে ? তাদের কি চোখ আছে যা দিয়ে ওরা দেখে? কিংবা তাদের কি কান আছে যা দিয়ে ওরা শুনে? বলুন, ‘তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক করেছো তাদেরকে ডাক তারপর আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কর এবং আমাকে অবকাশ দিও না;* নিশ্চয় আমার অভিভাবক তো আল্লাহ্ যিনি কিতাব নাযিল করেছেন এবং তিনিই সৎকর্মপরায়ণদের অভিভাবকত্ব করে থাকেন।* আর আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে ডাক তারা তো তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে না এবং তারা তাদের নিজেদেরকেও সাহায্য করতে পারে না।* আর যদি আপনি তাদেরকে সৎপথে ডাকেন তবে তারা শুনবে না এবং আপনি দেখতে পাবেন যে, তারা আপনার দিকে তাকিয়ে আছে; অথচ তারা দেখে না।) [আল-আরাফ: ১৯১-১৯৮] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: (বলুন, 'তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ্ মনে করতে তাদেরকে ডাক। তারা আসমানসমূহে অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়, জমিনেও নয়। আর এ দু'টিতে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সহায়কও নয়।* আর আল্লাহ যাকে অনুমতি দেবেন, সে ছাড়া তাঁর কাছে কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না।) [সাবা: ২২, ২৩] এই আয়াত সকল শিরকী সম্পর্ক ছিন্ন করে দিয়েছে।
মহান আল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, যারা আল্লাহ ছাড়া এসব উপাস্যদের আহ্বান করে তারা তাদের আহ্বান শুনতে পায় না। যদি শুনেও সাড়া দেওয়ার সামর্থ রাখে না। আর তারা কিয়ামতের দিন তাদের শিরককে অস্বীকার করবে এবং তাদের থেকে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করবে। সম্মানিত ও সুউচ্চ রাজত্বের অধিকারী আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না। আর তোমরা তাদেরকে যে শরীক করেছ তা তারা কিয়ামতের দিন অস্বীকার করবে। সর্বজ্ঞ আল্লাহর মত কেউই আপনাকে অবহিত করতে পারে না।) [সূরা ফাতির: ১৪]
তিনি আরো বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ ছাড়া এসব উপাস্যরা কোনো উপকার ও অপকার করতে পারে না। কাজেই আল্লাহ ছাড়া তাদের কিভাবে ইবাদত করা হয়?! আল্লাহ বলেন: (আর তারা তাঁর পরিবর্তে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে অন্যদেরকে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং তারা নিজেদের অপকার কিংবা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। আর মৃত্যু, জীবন ও উত্থানের উপরও কোনো ক্ষমতা রাখে না।) [আল-ফুরকান: ৩]
তেমনিভাবে পবিত্র ও সুউচ্চ আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, এসব শরিকরা তাদের অনুসারীদের জন্য রিযিকের মালিক নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর তারা ইবাদাত করে আল্লাহ্ ছাড়া এমন কিছুর, যেগুলো আসমান ও জমিন হতে তাদের কোনো জীবনোপকরণের মালিক নয় এবং হতেও সক্ষম নয়।) [আন-নাহল: ৭৩] অতএব, তারা কীভাবে এমন কিছুর ইবাদত করে, যে কোনো কিছুর মালিক নয়, যে না রিজিক দিতে পারে, না উপকার করতে পারে, আর না ক্ষতি করতে পারে?
আল্লাহ তাদের বিপক্ষে দলিল পেশ করেছেন যে, তাদেরকে যখন বিপদ স্পর্শ করে, অথবা তারা মুসিবতে পতিত হয়, তখন তারা আল্লাহর জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে তাঁর আশ্রয়প্রার্থী হয়। আর যখন তিনি তাদেরকে নাজাত দেন তখনই তারা শিরকে ফিরে আসে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (অতঃপর তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা আনুগত্যে বিশুদ্ধ হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্কে ডাকে। তারপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়।) [আল-আনকাবূত: ৬৫]
অনুরূপভাবে মহাসত্য আল্লাহ মুশরিকদের শরীক সাব্যস্ত করার দাবিকে বাতিল করে দিয়েছেন। আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করেছেন এরূপ দাবিকেও তিনি বাতিল করে দিয়েছেন। এ মর্মে তিনি বলেন: (আল্লাহ্ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই; যদি থাকত তবে প্রত্যেক ইলাহ স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যে গুনে তাকে গুণান্বিত করে তা থেকে আল্লাহ্ কত পবিত্র- মহান!) [আল-মুমিনুন: ৯১] তিনি আরো বলেন: (যদি এতদুভয়ের (আসমান ও জমিনের) মধ্যে আল্লাহ্ ব্যতীত আরো অনেক ইলাহ থাকত, তাহলে উভয়ই বিশৃংখল হত। অতএব, তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ্ কতই না পবিত্র।) [আল-আম্বিয়া: ২২] মহান আল্লাহ ইহুদি ও খ্রস্টানদের সম্পর্কে স্পষ্ট করেছেন যে, তারা আল্লাহর সন্তান রয়েছে ধারণা করে। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন: (আর ইহুদিরা বলে, ‘উযাইর আল্লাহর পুত্র’, এবং নাসারারা বলে, ‘মসীহ্ আল্লাহর পুত্র।’ এটা তাদের মুখের কথা আগে যারা কুফরী করেছিল তারা তাদের মত কথা বলে। আল্লাহ্ তাদেরকে ধ্বংস করুন। কোন্ দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে!) [আত-তাওবাহ: ৩০] আল্লাহ তাদের বিশ্বাসকে এভাবে মূল থেকে উপড়ে ফেলেছেন যে, যে মানুষ খাবার গ্রহণ করে সে কিভাবে ইলাহ হতে পারে?! কেননা যিনি ইলাহ তিনি খাবার খান না, পানীয় পান করেন না, এবং মানুষের মতো কোনো প্রয়োজনও তাঁর নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (মারইয়াম-তনয় মসীহ শুধু একজন রাসূল। তার আগে বহু রাসূল গত হয়েছেন এবং তাঁর মা অত্যন্ত সত্যনিষ্ঠা ছিলেন। তারা দুজনেই খাওয়া-দাওয়া করতেন। দেখনু আমি তাদের জন্য আয়াতগুলোকে কেমন বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করি; তারপরও দেখুন, তারা কিভাবে সত্যবিমুখ হয়!* বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ ছাড়া এমন কিছুর ‘ইবাদাত কর যার কোনো ক্ষমতা নেই তোমাদের ক্ষতি বা উপকার করার? আর আল্লাহ তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’।) [আল-মায়েদাহ: ৭৫,৭৬]
আল্লাহ ফেরেশতাদের ইবাদত করাকেও বাতিল করে দিয়েছেন। আর স্পষ্ট করেছেন যে, তারা আল্লাহর নিকটবর্তী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর অনুমতি ছাড়া সুপারিশ করার ক্ষমতা রাখে না। আমাদের রব আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর আসমানসমূহে বহু ফেরেশতা রয়েছে; তাদের সুপারিশ কোন ফলপ্রসূ হবে না, তবে আল্লাহর অনুমতির পর, যার জন্য তিনি ইচ্ছে করেন ও যার প্রতি তিনি সন্তুষ্ট।) [আন-নাজম: ২৬] তারা ভয় করে তাদের উপরস্থ তাদের রবকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর আল্লাহ্কেই সিজদা করে যা কিছু আছে আসমানসমূহে ও জমিনে, যত জীবজন্তু আছে সেসব এবং ফিরিশতাগণও, তারা অহংকার করে না।* তারা ভয় করে তাদের উপরস্থ তাদের রবকে এবং তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তারা তা পালন করে।) [আন-নাহাল: ৪৯, ৫০] তিনি আরো বলেছেন: (মসীহ আল্লাহর বান্দা হওয়াকে কখনো হেয় মনে করেন না, এবং ঘনিষ্ঠ ফেরেশতাগণও করে না। আর কেউ তাঁর ইবাদাতকে হেয় জ্ঞান করলে এবং অহংকার করলে তিনি অচিরেই তাদের সবাইকে তাঁর কাছে একত্র করবেন।) [আন-নিসা: ১৭২] অতএব ফেরেশতাদের অবস্থা যখন এমন দাঁড়ালো তাহলে আল্লাহ ছাড়া অন্যদের ইবাদত কিভাবে করা হয়?
নবী ও রাসূলগণও—দুনিয়া ও আখিরাতে উচুঁ মর্যাদার হওয়া সত্ত্বেও—তারা নিজেদের উপকার ও অপকার করার ক্ষমতা রাখেন না। অতএব তাদের নিচে যারা আাছে তাদের কী অবস্থা হবে?! আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা সংবাদ দিয়েছেন যে, নবীগণ ভয় ও আশা নিয়ে তাদের রবের ইবাদত করেন: (নিশ্চয় তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত, আর আমাকে আশা ও ভীতিসহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।) [আল-আম্বিয়া : ৯০] আর আল্লাহ নিম্নের বাণী দ্বারা সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি তাঁর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে নির্দেশ দিয়েছেন: (বলুন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা ছাড়া আমার নিজের ভালো মন্দের উপরও আমার কোনো অধিকার নেই। আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম তবে তো আমি অনেক কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ছাড়া আমি তো আর কিছুই নই।) [আল-আরাফ: ১৮৮] আর যখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহুদের যুদ্ধে মুশরিকদের ওপর বদদোয়া করেছিলেন তখন আল্লাহ তার ওপর এ বাণী নাযিল করেন: (তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন বা তাদেরকে শাস্তি দেবেন– এ বিষয়ে আপনার করণীয় কিছুই নেই; কারণ তারা তো যালেম।) [আলে ইমরান : ১২৮] জুহরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সালিম তার বাবা (আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু) সূত্রে আমাকে বর্ণনা করেন, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেন যে, তিনি ফজরের দ্বিতীয় রাকাতে রুকু থেকে যখন মাথা তুললেন তখন «سَمِعَ اللَّهُ لِمَنْ حَمِدَهُ، رَبَّنَا وَلَكَ الحَمْدُ» বলার পর «اللَّهُمَّ العَنْ فُلَانًا وَفُلَانًا وَفُلَانًا» বললেন। ফলে আল্লাহ তা‘আলা {لَيْسَ لَكَ مِنَ الأَمْرِ شَيْءٌ} থেকে {فَإِنَّهُمْ ظَالِمُون} পর্যন্ত নাযিল করেন। {বুখারী (৪৫৫৯), নাসায়ী (১০৭৮)}
অধ্যায়: আল্লাহর নাম ও সিফাতসমূহের প্রতি ঈমান
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাঁর সিফাতে এবং পরিপূর্ণতা ও বড়ত্বের গুণাবলীতে একক। কিতাব ও সুন্নাতের অনেক দলিল প্রমাণ করে যে, আল্লাহু তাআলার অনেক নাম ও সিফাত রয়েছে। পরিপূর্ণ বিবেক এবং সুস্থ স্বভাবও তার ওপর সাক্ষ্য প্রদান করে এবং মুসলিম উম্মাহর সকল আলেম এর ওপর ঐক্যমত, বরং আসমানি সকল রিসালাত আল্লাহুর সিফাত, নামসমূহ ও কর্মসমূহ বর্ণনার উদ্দেশ্যেই নাযিল হয়েছে। আল্লাহ মূর্তির ইবাদত করার কারণে মুশকিদের তিরস্কার করেছেন, কারণ তারা তাদের মতই সৃষ্ট মাখলুক, বরং তাদের চেয়েও কম এবং ত্রুটিপূর্ণ। তারা দেখে না, শুনেও না, বরং তাদের চলার পা এবং ধরার হাতও নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন: (আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে আহবান কর তারা তো তোমাদেরই মত বান্দা; সুতরাং তোমরা তাদেরকে ডাক, অতঃপর তারা যেন তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।* তাদের কি পা আছে যা দিয়ে ওরা চলে? তাদের কি হাত আছে যা দিয়ে ওরা ধরে ? তাদের কি চোখ আছে যা দিয়ে ওরা দেখে? কিংবা তাদের কি কান আছে যা দিয়ে ওরা শুনে? বলুন, ‘তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক করেছো তাদেরকে ডাক তারপর আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কর এবং আমাকে অবকাশ দিও না।) [আল-আরাফ: ১৯৪-১৯৫] তিনি আরো বলেন: (আর মূসার সম্প্রদায় তার অনুপস্থিতিতে নিজেদের অলংকার দিয়ে একটি বাছুর তৈরী করল, একটা দেহ, যা 'হাম্বা’ শব্দ করত। তারা কি দেখল না যে, এটা তাদের সাথে কথা বলে না এবং তাদেরকে পথও দেখায় না? তারা এটাকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করল এবং তারা ছিল যালেম।) [আল-আরাফ: ১৪৮]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ নিজের গুণাবলী নিজে যেমন বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে যেভাবে বিশেষিত করেছেন তিনি তেমনই। আল্লাহু সুবহানাহুর মত কিছু নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তাঁর মতো কিছু নেই আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।) [আশ-শূরা : ১১] কাজেই আল্লাহ নিজে নিজের জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন অথবা তাঁর রাসূল তাঁর জন্য যা সাব্যস্ত করেছেন আমরা তার সাদৃশ্য ও ধরন বর্ণনা না করে এবং তা বিকৃত ও অর্থহীন না করে তাঁর জন্য সাব্যস্ত করব এবং তিনি নিজে নিজের থেকে যা না করেছেন, অথবা তাঁর রাসূল তাঁর ব্যাপারে যা না করেছেন আমরা তাঁর জন্যে তা সাব্যস্ত করব না। আমরা নিশ্চিতভাবে বিশ্বাস করি যে, আমাদের রব মাখলূক সৃষ্টি করার আগেই তার সিফাতে ভূষিত ছিলেন। তিনি সেই আদি থেকে চিরকাল পর্যন্ত চূড়ান্ত পূর্ণতা, উচ্চতা ও সৌন্দর্যমণ্ডিত। তিনিই সর্বপ্রথম এবং তিনিই সর্বশেষ। তিনিই প্রথম তার পূর্বে কিছু নেই এবং তিনিই সর্বশেষ তাঁর পরে কিছু নেই। তিনি তাঁর সম্মান ও পূর্ণতাসহ তাঁর নাম ও সিফাতসহ সর্বপ্রথম এবং তিনি তাঁর সম্মান ও পূর্ণতাসহ তাঁর নাম ও সিফাতসহ সর্বশেষ।
আমরা বিশ্বাস করি যে, মাখলূক যেমনভাবে আল্লাহু সুবহানাহুকে ইলম দ্বারা বেষ্টন করতে পারে না তেমনি তাদের চোখ তাকে আয়ত্ত্বে আনতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে, তা তিনি অবগত, কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাকে বেষ্টন করতে পারে না।) [ত্ব-হা: ১১০] মহা সম্মানিত আল্লাহ আরো বলেন: (দৃষ্টিসমূহ তাকে আয়ত্ব করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে আয়ত্ব করেন এবং তিনি সূক্ষদর্শী, সম্যক অবহিত।) [আল-আন‘আম: ১০৩] ইমাম ইবনু কুতাইবাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “আমাদের ওপর ওয়াজিব হলো আল্লাহ নিজের সিফাতে যেখানে গিয়ে শেষ করেছেন, অথবা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে শেষ করেছেন আমরা সেখানেই শেষ করব। আর আরবরা শব্দ দ্বারা যা বুঝে এবং শব্দকে যার ওপর প্রয়োগ করে আমরা শব্দকে তাঁর থেকে বিচ্যুত করব না এবং তার বাইরের বিষয় থেকে বিরত থাকবো।” {ইবনু কুতাইবাহ, আল-ইখতিলাফ ফিল লাফয ওয়ার রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ: (পৃ.৪৪)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহর সিফাতসমূহ তাঁর সত্ত্বার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, যেমন জীবন, ইলম, শোনা, দেখা, হাত, আঙ্গুলসমূহ। আর কিছু সিফাত রয়েছে তাঁর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত, যেমন ক্রোধ, সন্তুষ্টি, অবতরণ। আমরা বিশ্বাস করি যে, তিনি যা চান তাই করেন। তিনি যখন চান যেভাবে চান যা চান তাই করেন। যাকে চান সম্মানিত করেন আর যাকে চান অসম্মানিত করেন। কেউ তাঁর নির্দেশ প্রতিরোধকারী নেই এবং কেউ তার সিদ্ধান্ত ও ফয়সালার রদকারী নেই।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহর কতক সিফাত ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো দ্বারা আল্লাহকে ব্যাপকভাবে বিশেষিত করবো, যেমন শোনা, দেখা, হায়াত প্রভৃতি। আর কতক সিফাত বর্ণিত হয়েছে শর্তযুক্তভাবে, তা তাঁর শর্তের সাথেই বিদ্যমান থাকবে, যেমন আল্লাহ নিজের বিশেষণ বর্ণনা করেছে যে, যখন তাঁর শত্রুরা ষড়যন্ত্র করে তখন তিনি তাদের সাথে শত্রুতা করেন এবং তাঁর শত্রুরা যখন তাকে ভুলে যায় তখন তিনি তাদেরকে ভুলে যান।
আমরা বিশ্বাস করি যে, কতক সিফাতে আল্লাহকে একভাবে বিশেষিত করা হয়েছে,যেমন হায়াতের সিফাত, স্থায়ীত্বের সিফাত ও মহত্বের সিফাত। ফলে তা কুরআনে অথবা সুন্নাতে একভাবেই বর্ণিত হয়। আর কতক সিফাতকে দেখি যে, কুরআনে অথবা সুন্নাতে তার ব্যাপারে বিভিন্নভাবে সংবাদ প্রদান করা হয়েছে, যেমন কথা বলার সিফাত, উচ্চে থাকার সিফাত, হাতের সিফাত এবং কিয়ামতের ময়দানে ও জান্নাতে মুমিনদের তাদের রবকে দেখার সিফাত।
আল্লাহর কতক সিফাত হলো: ইলম ও শোনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনি বললেন, ‘আসমানসমূহ ও জমিনের সমস্ত কথাই আমার রব-এর জানা আছে এবং তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।) [আল-আম্বিয়া: ৪]
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো: দৃষ্টি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (নিশ্চয় আল্লাহ, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা।) [গাফির: ২০] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর গোলাম আবূ ইউনুস সুলাইম ইবন জুবাইর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: আমি আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে এ আয়াতটি পড়তে শুনেছিঃ ’’নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমানতসমূহ তার প্রাপকের নিকট পৌঁছিয়ে দিতে আদেশ করছেন ... আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা’’ (আন-নিসাঃ ৫৮) পর্যন্ত। আবূ হুরায়রা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে তার বৃদ্ধাঙ্গুলকে কানে এবং তর্জনীকে দু’ চোখের উপর রাখতে দেখেছি। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে (আয়াতটি) পড়তে দেখেছি এবং তাঁর আঙ্গুল দু’টি রাখতে দেখেছি। ইবনু ইউনুস বলেন, আল-মুকরী বলেছেন, অর্থাৎ ’’আল্লাহ নিশ্চয়ই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা’’- এর অর্থ হলো, আল্লাহর শ্রবণশক্তি ও দর্শনশক্তি আছে। {আবূ দাউদ: (৪৭২৮), হাফস ইবন ওমর, জুযউ কিরাআতিন নবী: (৩৩), ইবনু খুযায়মাহ, আত-তাওহীদ: (৪৯), ইবনু আবি হাতিম, আত-তাফসীর: (৫৫২৪)}
আল্লাহর আরেকটি সিফাত হলো: চোখ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর যাতে আপনি আমার চোখের সামনে প্রতিপালিত হন।) [ত্বহা: ৩৯] তিনি আরো বলেছেন: (আর আপনি ধৈর্যধারণ করুন আপনার রবের সিদ্ধান্তের উপর; নিশ্চয় আপনি আমার চক্ষুর সামনেই রয়েছেন।) মহান আল্লাহ আরো বলেন: (আর আপনি আমার চাক্ষুষ তত্ত্বাবধানে ও আমার ওহী অনুযায়ী নৌকা নির্মাণ করুন।) [হুদ: ৩৭] তিনি আরো বলেন: (যা চলত আমার চোখের সামনে।) [আল-কামার: ১৪] নাফি আব্দুল্লাহ ইবন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দাজ্জালের আলোচনা করা হল। ফলে তিনি বললেন, “আল্লাহ্ তোমাদের কাছে গোপন থাকবেন না। আল্লাহ্ অন্ধ নন। এর সঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর হাত দিয়ে স্বীয় চোখের দিকে ইশারা করলেন। মাসীহ্ দাজ্জালের ডান চোখ কানা। তার চোখটি যেন আংগুরের মত ভাসমান।” {বুখারী (৭৪০৭), মুসলিম (১৬৯), আবূ দাউদ (৪৭৫৭), তিরমিযী (২২৪১)}
আল্লাহ তা‘আলার আরেকটি সিফাত হলো: হায়াত এবং চিরস্থায়ী হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত কোনো প্রকৃত ইলাহ্ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক।) [আলে ইমরান : 2]
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো: আল-কালাম (কথা বলা)। তিনি মাখলূক সৃষ্টি এবং তাদের সাথে কথা বলার পূর্ব থেকেই কথা বলার গুণে গুণান্বিত। আমাদের রবের কথা তাঁর ইচ্ছার সাথে সম্পৃক্ত। তিনি যখন চান কথা বলেন। আল্লাহর কথা বলার বিশেষণটি আল-কুরআনুল কারীমে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা নিজের সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আদেশ করেন অথবা নিষেধ করেন। তা তার কথা বলাকে প্রমাণ করে। যেমন আল্লাহ তাআলার বাণী: (নিশ্চয় আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণতা, সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।) [আন-নাহল : ৯০] আল্লাহ নিজের সম্পর্কে যেসব সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি বলেছেন, অথবা বলেন, তা তার কথা বলাকে প্রমাণ করে। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (স্মরণ করুন, যখন আল্লাহ্ বললেন, ‘হে ‘ঈসা! নিশ্চয় আমি আপনাকে পরিগ্রহণ করব, আমার নিকট আপনাকে উঠিয়ে নিব।) [আলে ইমরান : ৫৫] আর যেসব আয়াত ও হাদীসে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে إنباء (সংবাদ দেওয়া) কথাটি বর্ণিত হয়েছে, সেটিও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের “কালাম” সিফাতকে প্রমাণ করে। মহাসত্য আল্লাহ বলেন: (সে বলল, ‘কে আপনাকে এটা জানালো?’ নবী বললেন, ‘আমাকে জানিয়েছেন তিনি, যিনি সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।) [আত-তাহরীম: ৩]
আর যেসব আয়াত ও হাদীসে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে النداء (ডাকা) অথবা المناجاة (গোপনে কথা বলা) বর্ণিত হয়েছে, সেটিও আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের “কালাম” সিফাতকে প্রমাণ করে। যেমন আল্লাহর বাণীতে এসেছে: (আর তাকে আমি ডেকেছিলাম তূর পর্বতের ডান দিক থেকে এবং আমি অন্তরঙ্গ আলাপে তাকে নৈকট্য দান করেছিলাম।) [মারইয়াম: ৫২] অনুরূপভাবে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করে যেসব القول (কথা) বর্ণিত হয়েছে অথবা কুরআনের যেখানে الكلام (কালাম) শব্দটি আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে বর্ণিত হয়েছে, তা তাঁর কালামের সিফাতকে প্রমাণ করে। এগুলো অগণিত। তার একটি হলো, আল্লাহ ফেরেশতাদের সাথে কথা বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বললেন ‘নিশ্চয় আমি জমিনে খলীফা সৃষ্টি করছি’।) [আল-বাকারা : ৩০] তিনি আদমের সাথে কথা বলেছেন: (আর আমি বললাম, ‘ হে আদম ! আপনি ও আপনার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করুন এবং যেখান থেকে ইচ্ছা স্বাচ্ছন্দ্যে আহার করুন।) [আল-বাকারাহ : ৩৫] তিনি মূসা আলাইহিস সালামের সাথে কথা বলেছেন: (তিনি বললেন, ‘হে মূসা! আমি আপনাকে আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দিয়ে মানুষের উপর বেছে নিয়েছি।) [আল-আরাফ : ১৪৪]
আমাদের রবের কিছু কথা হয় সম্বোধনসূচক, যেমন তিনি ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালামকে সম্বোধন করেছেন। তিনি বলেন: (তখন আমরা তাকে ডেকে বললাম, ‘হে ইবরাহীম!) [আস-সাফফাত: ১০৪] আর তাঁর কিছু কথা হয় গোপনে সংলাপস্বরূপ, যেমন আমাদের রব মূসা আলাইহিস সালামের সাথে গোপনে কথা বলেছেন: (আর তাকে আমি ডেকেছিলাম তূর পর্বতের ডান দিক থেকে এবং আমি অন্তরঙ্গ আলাপে তাকে নৈকট্য দান করেছিলাম।) [মারইয়াম: ৫২] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা এই আয়াতের তাফসীরে বলেন: ”এমনকি তিনি কলমের আওয়াজ শুনেছেন।” {মুসান্নাফ ইবনু আবূ শায়বাহ: (৩২৫০৬), হান্নাদ, আয-যূহদ (১৪৯), আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১২৩১), তাবরানী, আত-তাফসীর (১৫/৫৫৯), মুস্তাদরাক হাকিম (৩৪৭২)} সুদ্দী বলেন: “এবং আমি অন্তরঙ্গ আলাপে তাকে নৈকট্য দান করেছিলাম।” তিনি বলেন, অর্থাৎ “তাকে আসমানে প্রবেশ করিয়ে কথা বলা হয়েছে।” {ইবনু কাসীর, আত-তাফসীর (৫/২৩৮), আদ-দুররুল মানসূর ফিত তাফসীর বিল মা‘সূর (৫/৫১৫)} ফেরেশতাগণ আমাদের রবের কথা শ্রবণ করেন, যেমন আল্লাহর বাণীতে রয়েছে: “অবশেষে যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় বিদূরিত হয়, তখন তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে, 'তোমাদের রব কী বললেন?' তার উত্তরে তারা বলে, যা সত্য তিনি তা-ই বলেছেন' আর তিনি সমুচ্চ, মহান।” [সাবা: ২৩] মাসরুক সূত্রে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন মহান আল্লাহ ওহী প্রেরণের কথা বলেন, তখন এক আকাশের অধিবাসীগণ অন্য আকাশ থেকে সাফা পর্বতের উপর দিয়ে শিকল টানা শব্দের মতই শব্দ শুনতে পান। আর আওয়াজ শুনে তারা বেহুশ হয়ে যায় এবং জিবরীল (আঃ) তাদের নিকট উপস্থিত হলে তাদের অন্তর থেকে ভয় বিদূরীত হয়ে তারা হুশ ফিরে পায়। অতঃপর তারা বলে, হে জিবরীল! আপনার রব কি বলেছেন? তিনি বললেন, যা সত্য তাই বলেছেন। তখন তারা বলে, সত্যই বলেছেন, সত্যই বলেছেন।” {আবূ দাউদ (৪৭৩৮), উসমান ইবনু সাঈদ আদ-দারিমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (১৫৮), আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ (৫৩৬), মুহাম্মাদ ইবনু নাসর, তা‘জীমু কাদরিস সালাহ (২১৭)}
তিনি কিয়ামতের দিন সকল মাখলূকের সাথে কথা বলবেন, যেমন তার সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম: “তোমাদের প্রত্যেকের সঙ্গে শীঘ্রই তার প্রতিপালক কথা বলবেন, তখন প্রতিপালক ও তার মাঝে কোনো অনুবাদক ও আড়াল করে এমন পর্দা থাকবে না।” {বুখারী (৭৪৪৩), মুসলিম (১০১৬), তিরমিযী (২৪১৫), ইবনু মাজাহ (১৮৫)}
কিয়ামতের দিন সকল মাখলূক আল্লাহর কালাম শুনবে, যেমন আব্দুল্লাহ ইবনু উনাইস রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “বান্দাদেরকে হাজির করা হবে এবং তাদেরকে এমন আওয়াজে আহ্বান করা হবে, যা কাছের মানুষ যেমন শুনবে দূরের মানুষও তেমন শুনবে: আমি বাদশাহ! আমিই প্রতিদান প্রদানকারী।” {বুখারী, তা‘লীক হিসেবে (৯/১৪১), আদাবুল মুফরাদ (৯৭০), খালকু আফআলিল ইবাদ (৯০), আহমাদ (১৬০৪২)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতাআলা তাঁর মাখলূক থেকে আড়াল গ্রহণ করেছেন। কাজেই দুনিয়াতে তারা তাকে দেখবে না। তিনি তার ফেরেশতা ও রাসূলগণ হতে যার সাথে ইচ্ছে করেন পর্দার আড়াল থেকে কথা বলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর কোনো মানুষেরই এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ্ তার সাথে কথা বলবেন ওহীর মাধ্যম ছাড়া, অথবা পর্দার আড়াল ছাড়া, অথবা এমন দূত প্রেরণ ছাড়া, যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ওহী করেন, তিনি সর্বোচ্চ, প্রজ্ঞাবান।) [আশ-শুরা: ৫১]
আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে পাঁচটি কথা বললেন: “আল্লাহ কখনো নিদ্রা যান না, নিদ্র যাওয়া তার জন্য সাজেও না। তিনি তাঁর ইচ্ছানুসারে মীযান (দাড়িপাল্লা) নামান এবং উত্তোলন করেন। দিনের পূর্বেই রাতের সকল আমল তার কাছে পেশ করা হয়। রাতের পূর্বেই দিনের সকল আমল তার কাছে পেশ করা হয়। তিনি নূরের পর্দায় আচ্ছাদিত। যদি সে আবরণ খুলে দেয়া হয়, তবে তাঁর নূরের আলোচ্ছটা সৃষ্টি জগতের দৃশ্যমান সব কিছু ভস্ম করে দিবে।” {মুসলিম (১৭৯), ইবনু মাজাহ (১৯৫)}
আমাদের রবের কালাম এভাবে বিশেষিত করা যায় যে, তাঁর কতক কথা কতক কথার পূর্বে সংঘঠিত হয়েছে। মহা সত্য আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (যখনই তাদের কাছে তাদের রব-এর কোনো নতুন উপদেশ আসে তখন তারা তা শোনে কৌতুকচ্ছলে।) [আল-আম্বিয়া: ২] আর তাঁর কতক কতক অপেক্ষা উত্তম। আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, এক ব্যক্তি আরেক ব্যক্তিকে {قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَد} পড়তে শুনলেন। সে বার বার তা মুখে উচ্চারণ করছিল। পরদিন সকালে তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে এ ব্যাপারে বললেন। যেন ঐ ব্যক্তি তা কম মনে করল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “সেই সত্তার কসম, যার হাতে আমার জীবন। এ সূরা হচ্ছে সমগ্র কুরআনের এক-তৃতীয়াংশের সমান।” {বুখারী (৫০১৩), আবূ দাউদ (১৪৬১), নাসাঈ (৯৯৫)}
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একদিন জিবরীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বসেছিলেন। সে সময় তিনি উপর দিক থেকে দরজা খোলার একটা প্রচণ্ড আওয়াজ শুনতে পেয়ে মাথা উঠিয়ে বললেনঃ এটি আসমানের একটি দরজা। আজকেই এটি খোলা হ’ল- ইতোপূর্বে আর কখনো খোলা হয়নি। আর এ দরজা দিয়ে একজন ফেরেশতা পৃথিবীতে নেমে আসলেন। আজকের এ দিনের আগে আর কখনো তিনি পৃথিবীতে আসেননি। তারপর তিনি সালাম দিয়ে বললেনঃ আপনি দু’টি নূর বা আলোর সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আপনার পূর্বে আর কোনো নবীকে তা দেয়া হয়নি। আর তা হলো: সূরা ফাতিহা এবং সূরা আল বাকারাহ-এর শেষাংশ। এর যে কোনো হরফ আপনি পড়বেন তার মধ্যকার চাওয়া বিষয়গুলো অবশ্যই আপনাকে দেয়া হবে।) {মুসলিম (৮০৬), নাসাঈ (৯১২)}
আল-কুরআনুল কারীম এবং রাসূলদের ওপর নাযিলকৃত সকল আসমানী কিতাব, যেমন ইবরাহীম ও মূসা আলাইহিমাস সালামদের সফিহাসমূহ এবং তাওরাত, ইঞ্জিল ও জাবূর সবই আল্লাহর কালাম। সবগুলো দ্বারাই আল্লাহ কথা বলেছেন এবং জিবরীল আলাইহিস সালাম কোনো মাধ্যম ছাড়াই তাঁর থেকে তা শ্রবণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা কাঠে লিখিত অবস্থায় তাওরাত নাযিল করেছেন। আর নবী ও রাসূলদের ওপর ওহী নিয়ে অবতরণ করেছেন জিবরীল। আল্লাহ তা‘লা বলেন: (বিশ্বস্ত রূহ (জিবরাঈল) তা নিয়ে নাযিল হয়েছেন।* আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।) [আশ-শুআরা : ১৯৩-১৯৪] মহা সম্মানীত আল্লাহ আরো বলেন: (কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূল উম্মী নবীর প্রতি যিনি আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।’) [আল-আরাফ : ১৫৮] আল্লাহর কালাম এবং তাঁর শব্দসমূহ গায়রে মাখলূক (অসৃষ্ট)। এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াল্লাম আল্লাহর কালিমাসমূহ দ্বারা আশ্রয় প্রার্থনা করেছেন। তিনি বলেছেন, (যে ব্যক্তি কোথাও অবতরণ করল, তারপর (أعوذ بكلمات الله التَّامَّات من شرِّ ما خلَق) পাঠ করল, সে যতক্ষণ না সেখান থেকে প্রস্থান করবে কোনো কিছুই তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।) {সহীহ মুসলিম (২৭০৮), তিরমিযী (৩৪৩৭), ইবনু মাজাহ (৩৫৪৭)} যদি আল্লাহর কালিমাগুলো মাখলূক হত, তাহলে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো তার দ্বারা আশ্রয় প্রার্থনা করতেন না। মূলত আল্লাহর কালাম মাখলূক নয়। আপনি কি লক্ষ্য করছেন না যে, “আল্লাহ ‘তাঁর কথা’ ও ‘তাঁর সৃষ্টি’ এর মাঝে পার্থক্য করেছেন এবং সৃষ্টিকে কথা নামকরণ করেননি। যেমন তিনি বলেছেন, {أَلاَ لَهُ الْخَلْقُ وَالأَمْرُ} “জেনে রেখ, আল্লাহর জন্যই হলো সৃজন ও নির্দেশ।” [আল-আরাফ: ৫৪] তিনি যখন বললেন: {أَلاَ لَهُ الْخَلْقُ} তখন কোনো মাখলূকই তার ভেতর প্রবেশ না করে বাকি থাকল না। অতঃপর যা মাখলূক নয় তা উল্লেখ করলেন এবং {وَالأَمْرُ} বললেন। কাজেই তাঁর আমরই হলো তাঁর কাওল (বাণী)। বিশ্বাজাহানের প্রতিপালক কত বরকতময় যার বাণী (কাওল) মাখলূক হওয়া হতে মুক্ত। ইমাম আহমাদ, আর-রাদ্দু আলাল-জাহমিয়াহ: (পৃ.২২৪)
আমরা আল্লাহর এই জাতীয় বাণীতে উল্লিখিত আল্লাহর পার্থিব কালিমার মাঝে প্রার্থক্য করি: (আর আপনার আগেও অনেক রাসূলের উপর মিথ্যারোপ করা হয়েছিল; কিন্তু তাদের উপর মিথ্যারোপ করা ও কষ্ট দেয়ার পরও তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল, যে পর্যন্ত না আমার সাহায্য তাদের কাছে এসেছে। আর আল্লাহর বাণীসমূহের কোন পরিবর্তনকারী নেই। আর অবশ্যই রাসূলগণের কিছু সংবাদ আপনার কাছে এসেছে।) [আল-আনআম: ৩৪] এবং আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (বলুন, ‘আমার রবের কথা লিপিবদ্ধ করার জন্য সাগর যদি কালি হয়, তবে আমার রবের কথা শেষ হওয়ার আগেই সাগর নিঃশেষ হয়ে যাবে—আমরা এর সাহায্যের জন্য এর মত আরো সাগর আনলেও।) [আল-কাহাফ: ১০৯] আর আল্লাহর এই জাতীয় বাণীতে উল্লিখিত তাঁর শরয়ী কালামের মাঝেও পার্থক্য করি: (আর সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে আপনার রবের বাণী পরিপূর্ণ, তাঁর বাক্যসমূহের পরিবর্তনকারী কেউ নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।) [আল-আনআম: ১১৫] এবং তাঁর বাণী: (আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীমকে তাঁর রব কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করেছিলেন, অতঃপর তিনি সেগুলো পূর্ণ করেছিলেন।) [আল-বাকারাহ: ১২৪]
ইমাম দারিমী রহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা বাতিল করতে চায় একমাত্র সেই আল্লাহর কথা অস্বীকার করতে পারে। আশ্চর্য, যিনি বান্দাদের কথা বলতে শিখিয়েছেন ও সৃষ্টিকুলকে বাকশক্তি দিয়েছেন তিনি কিভাবে কথা বলতে অক্ষম হবেন?!” ঈমাম দারিমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (পৃ.১১৫৫)
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার আরেকটি সিফাত হলো: ইজ্জত (সম্মান, ক্ষমতা)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, (তারা যা আরোপ করে, তা থেকে পবিত্র ও মহান আপনার রব, সকল ক্ষমতার অধিকারী।) [আশ-শুরা: ১৮০] তিনি আরো বলেন: (যে কেউ সম্মান চায়, তবে সকল সম্মানের মালিক তো আল্লাহ্ই।) [ফাতির: ১০]
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো: আল-কাহর (প্রতাপশালীতা)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (বলুন, 'আমি তো একজন সতর্ককারী মাত্র এবং সত্য কোনো ইলাহ্ নেই আল্লাহ ছাড়া, যিনি এক, প্রবল প্ৰতাপশালী।) [সোয়াদ: ৬৫]
তাঁর আরো কতক সিফাত হলো: আল-জাবারূত (মহাশক্তিধর); আল-মালাকূত (মহারাজত্বের অধিকারী), আল-কিবরিয়া (অহংকারের মালিক), আল-আজামাহ (বড়ত্বের মালিক)। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রুকুতে বলতেন: (“سُبْحَانَ ذِي الْجَبَرُوتِ وَالْمَلَكُوتِ وَالْكِبْرِيَاءِ وَالْعَظَمَةِ” অর্থ: পবিত্রতা বর্ণনা করছি তাঁর যিনি মহাশক্তিধর, মহারাজত্বের অধিকারী, অহংকার ও বড়ত্বের মালিক।) {আবূ দাউদ: (৮৭৩), নাসাঈ: (১০৪৯), আহমাদ: (২৩৯৮০), তিরমিযী, আশ-শামায়েল: (৩১৪), আল-বাযযার: (২৭৫০)} রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (মহান আল্লাহ বলেন, অহংকার হলো আমার চাদর এবং মহত্ব হলো আমার লুঙ্গি। যে কেউ এর কোনো একটি নিয়ে আমার সাথে ঝগড়া করবে, আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।) {আবূ দাউদ: (৪০৯০), ইবনু মাজাহ: (৪১৭৪), হুমাইদী: (১১৮৩), ইবনু আবি শায়বাহ: (২৭১১১) ও আহমাদ: (৭৩৮২)}
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার আরো সিফাত হলো: ইচ্ছা ও চাওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজ চান এবং তোমাদের জন্য কষ্ট চান না।) [আল-বাকারা : ১৮৫] এবং তাঁর বাণী: (আর আল্লাহ্ চাচ্ছিলেন যে, তিনি সত্যকে তাঁর বাণী দ্বারা প্রতিষ্ঠিত করেন এবং কাফেরদেরকে নির্মূল করেন।) [আল-আনফাল: ৭] এবং তাঁর বাণী: (আর তোমরা ইচ্ছে করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ ইচ্ছে করেন।) [আত-তাকভীর : ২৯]
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো: কুদরত (সক্ষমতা)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর তাঁর অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে আসমানসমূহ ও জমিনের সৃষ্টি এবং এ দুয়ের মধ্যে তিনি যে সকল জীব-জন্তু ছড়িয়ে দিয়েছেন সেগুলো; আর তিনি যখন ইচ্ছে তখনই তাদেরকে সমবেত করতে সক্ষম।) [আশ-শুরা: ২৯] এবং তাঁর বাণী: (নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাশীল।) [আল-বাকারা: ২০]
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো: রহমত (দয়া)। মহা পবিত্র রহমান ও রাহীম বলেন: (আর আমার রহমত প্রত্যেক বস্তুকে বেষ্টন করে নিয়েছে।) [আল-আরাফ: ১৫৬] তিনি আরো বলেন: (তোমাদের রব নিজের নফসের ওপর রহমতকে আবশ্যক করে নিয়েছেন।) [আল-আনআম: ৫৪] এই রহমত হলো আল্লাহর একটি সিফাত বা গুণ। আর এটি আল্লাহর দিকে সম্বোধিত- বিশেষণকে বিশেষ্যের দিকে সম্বোধন হিসেবে। আবার কুরআন ও সুন্নাহে কখনো রহমতকে আল্লাহর দিকে সম্পৃক্ত করা হয়- সৃষ্টিকে স্রষ্টার সাথে সম্বোধন হিসেবে। যেমন আল্লাহর তা‘আলার বাণী: (আর তিনিই তাঁর রহমতের বৃষ্টির আগে সুসংবাদবাহীরূপে বায়ু প্রেরণ করেন এবং আমি আকাশ হতে পবিত্ৰ পানি বর্ষণ করি।) [আল-ফুরকান: ৪৮] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “নিশ্চয় আল্লাহ যেদিন রহমত সৃষ্টি করেছেন সেদিন একশটি রহমত সৃষ্টি করেছেন।” {বুখারী (৬৪৬৯), মুসলিম (২৭৫২), তিরমিযী (৩৫৪১), ইবনু মাজাহ (৪২৯৩)} এই রমহমত হলো মাখূলক, মাখলূককে যেমনভাবে তার স্রষ্টার সাথে সম্পৃক্ত করা হয় তেমনভাবে এটিকেও আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।
আল্লাহু সুবহানাহুর আরেকটি সিফাত হলো: (العلو) উচ্চে থাকা, অর্থাৎ ক্ষমতার উচ্চতা, সম্মানের উচ্চতা ও সত্ত্বার উচ্চতা। এই তিনটিই আল্লাহর বিশেষণ। এগুলো তার পরিপূর্ণতাকে প্রমাণ করে। আল-কুরআনুল আজীম, হাদীস শরীফ, বিবেক এবং স্বভাব সব কিছু বিভিন্নভাবে আল্লাহর উচ্চে হওয়াকে সাব্যস্ত করে। অতএব আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- আল্লাহ সুমহান, সুউচ্চ এবং তিনি ওপরে রয়েছেন মর্মে যেসব সংবাদ প্রদান করেছেন তা তাঁর উচ্চে হওয়াকে প্রমাণ করে। আর যেসব সংবাদে আল্লাহর কাছ থেকে নিচে অবতরণ করা বর্ণিত রয়েছে, যেমন ওহী অবতীর্ণ করা, নির্দেশ অবতরণ করা এবং তিনি কিয়ামতের দিন ফয়সালার জন্যে আগমন করবেন, অথবা তিনি প্রতি রাতে অথবা আরাফার সন্ধ্যা বেলা অবতরণ করেন এবং ফেরেশতাগণ অবতরণ করেন, তা সবই তাঁর ওপরে হওয়াকে প্রমাণ করে। অনুরূপভাবে যেসব সংবাদে রয়েছে যে, তিনি আসমানে আছেন, অথবা তিনি আসমানের ওপরে আছেন, অথবা তিনি আরশের ওপরে আছেন, অথবা তিনি আরশের ওপরে ওঠেছেন, তাও তাঁর ওপরে হওয়াকে প্রমাণ করে। অনুরূপভাবে যেসব সংবাদে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলার দিকে ওঠা রয়েছে তার দ্বারাও আল্লাহর ওপরে হওয়া প্রমাণিত হয়।
তন্মধ্যে, যেমন ফেরেশতাগণ তাদের রবকে তাদের ওপর থেকে ভয় করেন, তারা তাঁর দিকে ওঠেন, আমলগুলোকে তাঁর কাছে ওঠানো হয়, তাঁর দিকে ওপরে তোলা হয়, তিনি নিজের দিকে ঈসা আলাইহি সালামকে উঠিয়ে নিয়েছেন। আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিয়ে ইসরা করা হয়েছে এবং তাকে আসমানে ওঠানো হয়েছে। এসব বিষয় তাঁর ওপরে হওয়াকে প্রমাণ করে। বরং আল্লাহ ওপরে রয়েছেন তার ওপর অনেক প্রকার দলিল রয়েছে। আর প্রত্যেক প্রকারের অধীনে অনেক সংখ্যা রয়েছে যা পরিশ্রম করা ছাড়া আয়ত্তে আনা সম্ভবপর নয়।
এসব দলীলগুলোর মধ্যে রয়েছে, যেমন আল্লাহর বাণী: (আসমানসমূহে যা আছে ও জমিনে যা আছে তা তাঁরই। তিনি সুউচ্চ, সুমহান।) [আশ-শুরা: ৪] আল্লাহর বাণী: (এটা এজন্যে যে, নিশ্চয় আল্লাহ্, তিনিই সত্য এবং তারা তাঁর পরিবর্তে যাকে ডাকে তা তো অসত্য। আর নিশ্চয় আল্লাহ্, তিনিই সমুচ্চ, সুমহান।) [আল-হাজ্জ: ৬২] তাঁর আরেকটি বাণী: (তাঁরই দিকে পবিত্র বাণীসমূহ হয় সমুত্থিত এবং সৎকাজ, তিনি তা করেন উন্নীত।) [ফাতির: ১০] তাঁর আরেকটি বাণী: (আর এ কিতাব , যা আমি নাযিল করেছি – বরকতময়। কাজেই তোমারা তার অনুসরণ কর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, যাতে তোমরা রহমতপ্রাপ্ত হও।) [আল-আনআম: ১৫৫] এবং তাঁর বাণী: (নিশ্চয় আমি এটা নাযিল করেছি কুরআন হিসেবে আরবি ভাষায় যাতে তোমরা বুঝতে পারো।) [ইউসুফ : ২] আল্লাহ তা‘আলার আরও বাণী: (তারা ভয় করে তাদের উপরস্থ তাদের রবকে এবং তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তারা তা করে।) [আন-নাহল: ৫০] তাঁর আরেকটি বাণী: (হে ঈসা! নিশ্চয় আমি আপনাকে পরিগ্রহণ করব, আমার নিকট আপনাকে উঠিয়ে নিব।) [আলে ইমরান : ৫৫] এবং তাঁর বাণী: (ফেরেশতাগণ এবং রূহ আল্লাহর দিকে উর্ধ্বগামী হয় এমন এক দিনে, যার পরিমাণ পঞ্চাশ হাজার বছর।) [আল-মাআরিজ: ৪] তাঁর এ বাণীও: (তিনি আল্লাহ্, যিনি সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং অনুরূপ জমিন, তাদের মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ; যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান এবং জ্ঞানে আল্লাহ্ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।) [আত-তালাক : ১২] এবং তাঁর বাণী: (বরং আল্লাহ তাকে তাঁর নিকট তুলে নিয়েছেন এবং আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।) [আন-নিসা: ১৫৮] আমাদের রব সুবহানাহু ওয়াতালার এ বাণীও: (পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করালেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশকে আমি করেছি বরকতময়, যেন আমি তাকে আমাদের নিদর্শন দেখাতে পারি, তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।) [আল-ইসরা: ১]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: (আল্লাহ্ যখন তাঁর মাখলূকাত সৃষ্টি করলেন, তাঁর কাছে একটি কিতাব লিপিবদ্ধ রাখলেন। আমার গযবের উপর আমার রহমত অগ্রগামী হয়েছে’ এটি তাঁর কাছে আরশের ওপর আছে।) {বুখারী (৭৫৫৩), মুসলিম (২৭৫১), তিরমিযী (৩৫৪৩), ইবনু মাজাহ (১৮৯)} মু’আবিয়া বিন হাকাম আস-সুলামী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: একদা আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে সালাত আদায় করি। সালাতরত অবস্থায় লোকজনের মধ্যকার এক ব্যক্তি হাঁচি দিলে জবাবে আমি ’’يَرْحَمُكَ اللَّه‘‘ ইয়ারহামুকাল্লাহ বলায় সকলেই আমার প্রতি (রাগের) দৃষ্টিতে তাকালো। তখন আমি মনে মনে বললাম, তোমাদের মাতা তোমাদেরকে হারাক। তোমরা আমার দিকে এভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করছো কেন? তারা সকলেই রানের উপর সজোরে হাত মেরে শব্দ করতে থাকলো। আমি যখন দেখলাম যে, তারা আমাকে চুপ করাতে চাচ্ছিলো, তখন (অনিচ্ছা) সত্ত্বেও আমি চুপ হলাম। অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত শেষ করলেন- আমার পিতা-মাতা তার জন্য কুরবান হোক! তিনি আমাকে প্রহার করলেন না, রাগ করলেন না এবং গালিও দিলেন না। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: সালাতের অবস্থায় তাসবীহ, তাকবীর ও কুরআন তিলাওয়াত ব্যতীত কোনো কথা বলা মানুষের জন্য বৈধ নয়। অথবা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেরূপ বলার বললেন। অতঃপর আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা সদ্য জাহিলিয়্যাত ছেড়ে আসা একটি সম্প্রদায়। আল্লাহ আমাদেরকে ইসলাম গ্রহণের তাওফিক দিয়েছেন। আমাদের মধ্যকার কতিপয় ব্যক্তি গণকের নিকট যায়। তিনি বললেন: তোমরা তাদের নিকটে যাবে না। আমি বললাম, আমাদের মধ্যকার কতিপয় লোক পাখি উড়িয়ে ভাগ্য নির্ণয় করে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ এটা তাদের মনগড়া কাজ, এরূপ (কুসংস্কার) যেন তাদেরকে তাদের কাজ থেকে বিরত না রাখে। সাব্বাহ বলেন, তা যেন তোমাদেরকে বিরত না রাখে। তিনি বলেন, আমি বললাম, আমাদের মধ্যকার এমনও কিছু লোক আছে যারা রেখা টেনে ভাগ্য নির্ণয় করে। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: নবীগণের মধ্যকার একজন নবী রেখা টানতেন। সুতরাং কারো রেখা তার নবীর মত হলে সঠিত হতে পারে। তিনি বলেন, আমি বললাম, আমার এক দাসী উহুদ ও জাওয়ানিয়ার আশেপাশে বকরী চরাচ্ছিলো। আমি দেখলাম যে, বাঘ এসে সেখান থেকে একটি বকরী নিয়ে গেছে। আমিও তো আদম সন্তান। কাজেই আমিও তাদের মত দুঃখ পাই। কিন্তু আমি তাকে জোরে একটি থাপ্পর দিলাম। এ কথাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গুরুত্ববহ মনে হওয়ায় আমি তাঁকে বললাম, আমি কি তাকে মুক্ত করে দিবো? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তাকে আমার কাছে নিয়ে আসো। আমি তাকে নিয়ে এলে তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে জিজ্ঞেস করলেন: আল্লাহ কোথায়? সে জবাবে বলালো, আকাশে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: আমি কে? সে জবাবে বললো, আপনি আল্লাহর রসূল! তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তাকে আযাদ করে দাও। কারণ সে ঈমানদার মহিলা।) {মুসলিম: (৫৩৭), আবূ দাউদ: (৯৩০), নাসাঈ: (১২১৮)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (ফেরেশতাগণ পালা বদল করে তোমাদের মাঝে আগমন করেন; একদল দিনে, একদল রাতে। ‘আসর ও ফজরের সালাতে উভয় দল একত্র হন। অতঃপর তোমাদের মাঝে রাত যাপনকারী দলটি উঠে যান। তখন তাদের প্রতিপালক তাদের জিজ্ঞেস করেন, আমার বান্দাদের কোন্ অবস্থায় রেখে আসলে? অবশ্য তিনি নিজেই তাদের ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত। উত্তরে তারা বলেন, আমরা তাদের সালাতে রেখে এসেছি, আর আমরা যখন তাদের নিকট গিয়েছিলাম তখনও তারা সালাত আদায়রত অবস্থায় ছিলেন।) (বুখারী: (৫৫৫), মুসলিম: (৬৩২), নাসাঈ: (৪৮৫)) আবূ রাযীন আল-উকাইলী রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন: আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করার আগে আমাদের প্রতিপালক কোথায় ছিলেন? তিনি বলেন: (তিনি মেঘমালার মধ্যে ছিলেন। এর নিচেও বাতাস ছিল না এবং উপরেও বাতাস ছিল না। তিনি পানির উপর তাঁর আরশ তৈরী করেন।) {তিরমিযী (৩১০৯), ইবনু মাজাহ (১৮২), তায়ালিসী (১১৮৯), আহমাদ (১৬১৮৮), ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (৬২৫)} এগুলো এবং এ ছাড়া আরো অনেক আয়াত ও হাদীস আল্লাহর ওপরে হওয়াকে প্রমাণ করে।
(আল্লাহর) ওপরে হওয়ার দলিল অগণিত। ইসলামের সকল আলিম তা সাব্যস্ত করার বিষয়ে একমত। যেরূপভাবে বিবেক ও সুস্থ স্বভাব সেটি প্রমাণ করে। ইমাম ইবনু বাত্তাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সাহাবী ও তাবেঈদের থেকে সকল মুসলিম এবং মুমিনদের থেকে সকল আলিম একমত যে, আল্লাহু তাবারাকা ওয়া তাআলা তাঁর মাখলূক থেকে পৃথক তাঁর আসমানের ওপর আরশে রয়েছেন। আর তাঁর ইলম তাঁর সকল মাখলূককে বেষ্টন করে আছে” ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ আল-কুবরা (৭/১৩৬)
ইমাম দারিমী রাহিমাহুল্লাহ ইবনুল মুবারক-এর কথা বর্ণনা করেছেন, যখন তাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো: আমরা আমাদের রবকে কিভাবে চিনবো? তিনি বললেন, “তিনি আরশের ওপরে, সাত আসমানের ওপরে আরশে এবং তিনি তার মাখলুক থেকে পৃথক।” আদ-দারিমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহিমিয়্যাহ (পৃ.৯৮)
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার আরেকটি সিফাত হলো: আরশের ওপর ওঠা। আল্লাহ তাঁর কিতাবের সাত জায়গায় তা উল্লেখ করেছেন। তন্মধ্যে আল্লাহর বাণী: (নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও জমিন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখ , সৃজন ও আদেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ কত বরকতময়!) [আল-আরাফ : ৫৪] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ্ যখন তাঁর মাখলূকাত সৃষ্টি করলেন, তাঁর কাছে একটি কিতাব লিপিবদ্ধ রাখলেন: আমার রহমত আমার গযবের উপর বিজয়ী হয়েছে অথবা বলেছেন অগ্রগামী হয়েছে’। এটি তাঁর কাছে আরশের ওপর আছে।” {বুখারী (৭৫৫৩), মুসলিম (২৭৫১), তিরমিযী (৩৫৪৩), ইবনু মাজাহ (১৮৯)} লালেকায়ী ইবনু উয়ায়নাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাবিআ‘-কে আল্লাহর বাণী: {الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى} “রহমান আরশের ওপর ওঠেছেন।” সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিলো যে, তিনি কিভাবে ওঠেছেন? তিনি বললেন: “ওপরে ওঠা অজানা কিছু নয়, তবে ধরন বোধগম্য নয়। আল্লাহর পক্ষ থেকে রিসালাত আগমণ করে, আর রাসূলদের দায়িত্ব পৌঁছানো, এবং আমাদের দায়িত্ব বিশ্বাস করা।” {শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আহ: (৩/৪৪২), আয-যাহাবী: আল-আরশ: (২/২১৩)} দারুল হিজরত তথা মদিনার ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ থেকেও অনুরূপ কথা বর্ণিত হয়েছে। {আবূ নুআইম, আল-হিলইয়াহ: (৬/৩২৫,৩২৬), বায়হাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত: (২/৩০৪), ইবনু আব্দুল বার, আত-তামহীদ: (৭/১৩৮), ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: (আলিমগণ ইমাম মালিকের এই কথা: “ওপরে ওঠা জানা বিষয়, ধরন অজানা, এর ওপর ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব এবং এ সম্পর্কে প্রশ্ন করা বিদআত।” থেকে একটি নীতি গ্রহণ করেছেন, এই অধ্যায়ে তারা এর ওপরই চলেন।) দেখুন: আয-যাহাবী, আল-উলুউ: (১/১১৭)}
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো: মহব্বত করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (নিশ্চয়ই আল্লাহ এমন এক সম্প্রদায় আনবেন যাদেরকে তিনি ভালোবাসবেন এবং যারা তাকে ভালোবাসবে।) [আল-মায়েদা: ৫৪] ইমাম দারেমী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “তিনি একই জায়গায় স্রষ্টার মহব্বত ও সৃষ্টির মহব্বত পাশাপাশি একত্র করেছেন। অতঃপর কী মহব্বত করা হবে আর কী মহব্বত করা হবে না তার মাঝে পৃথক করেছেন। যেন তাঁর মাখলূক জানে যে, দু’টি বিষয় বিপরীতমুখী, এক নয়। যেমন তিনি বলেছেন: {لَا يُحِبُّ اللَّهُ الْجَهْرَ بِالسُّوءِ مِنْ الْقَوْل} “মন্দ কথার প্রচারণা আল্লাহ পছন্দ করেন না।” [নিসা: ১৪৮] তিনি আরো বলেছেন: {إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِين} “নিশ্চয় তিনি অপচয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না।” [আনআম: ১৪১] নাকযুদ-দারিমী: (২/৮৬৫)
তিনি আরো বলেছেন: (নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবাকারীদেরকে এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালোবাসেন।) [আল-বাকারাহ: ২২২] সাহল ইবন সা‘দ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, খায়বারের দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আগামীকাল আমি এমন এক ব্যক্তির হাতে পতাকা দিব, যার হাতে আল্লাহ্ তা‘আলা বিজয় দিবেন। সে আল্লাহ্ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলকে ভালবাসে, আর আল্লাহ্ তা‘আলা ও তাঁর রাসূলও তাকে ভালবাসেন।” {বুখারী (৩০০৯), মুসলিম (২৪০৬), আবু দাউদ (৩৬৬১)} রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা, তার সন্তান ও সব মানুষ অপেক্ষা অধিক প্রিয় হই।” {বুখারী (১৫), মুসলিম (৪৪), নাসাঈ (৫০১৩), ইবনু মাজাহ (৬৭)}
আল্লাহ তা‘আলার আরেকটি সিফাত হলো: সন্তুষ্ট হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন।) [আত-তাওবাহ: ১০০] আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি এক রাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিছানায় পেলাম না। আমি তাকে খোঁজ করতে লাগলাম। হঠাৎ আমার হাত তার উভয় পায়ের তালুতে গিয়ে ঠেকল। তিনি সাজদায় ছিলেন এবং তার পা দু’টো দাঁড় করানো ছিল। এ অবস্থায় তিনি বলেছেন: "হে আল্লাহ! আমি তোমার অসন্তুষ্টি থেকে তোমার সন্তুষ্টির আশ্রয় চাই। তোমার শাস্তি থেকে তোমার শান্তি ও স্বস্তির আশ্রয় চাই। আমি তোমার নিকট তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি। তোমার প্রশংসার হিসাব করা আমার সম্ভব না। তুমি নিজে তোমার যেরূপ প্রশংসা বর্ণনা করেছ, তুমি ঠিক তদ্রুপ।" {মুসলিম (৪৮৬), আবূ দাউদ (৮৭৯), তিরমিযী (৩৪৯৩), নাসাঈ (১৬৯), ইবনু মাজাহ (৩৮৪১)}
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো, নিজ দুশমনকে অপছন্দ করা। কারণ, তারা তাঁর সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করেছে এবং আল্লাহ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর যা নাযিল করেছেন তাও অপছন্দ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (এটা এজন্যে যে, তারা এমন সব বিষয় অনুসরণ করেছে যা আল্লাহর অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে এবং তারা তাঁর সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করেছে ; সুতরাং তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।) [মুহাম্মাদ: ২৮] এ মর্মে তাঁর আরেকটি বাণী: (তবে তাদের অভিযাত্রা আল্লাহ্ অপছন্দ করলেন। কাজেই তিনি তাদেরকে অলসতার মাধ্যমে বিরত রাখেন এবং তাদেরকে বলা হল, ‘যারা বসে আছে তাদের সাথে বসে থাক।) [আত-তাওবাহ: ৪৬] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ্ বলেন, আমার বান্দা আমার সাক্ষাত পছন্দ করলে আমিও তার সাক্ষাত পছন্দ করি। আর সে আমার সাক্ষাত অপছন্দ করলে, আমিও তার সাক্ষাত অপছন্দ করি।” {সহীহ বুখারী (৭৫০৪), নাসায়ী (১৮৩৫)}
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো: নিজ দুশমনের ওপর গোস্বা করা। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতালা বলেন: (তিনি তাদের ওপর গোস্বা করেছেন এবং তাদেরকে অভিশম্পাত করেছেন।) [আল-ফাতহ: ৬] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “যে ব্যক্তিকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পথে হত্যা করেছেন, তার জন্য আল্লাহর গযব ভয়াবহ। আর যে সম্প্রদায় আল্লাহর নবীর চেহারাকে রক্তাক্ত করেছে তাদের প্রতিও আল্লাহর গযব ভয়াবহ।” সহীহ বুখারী (৪০৭৪)
আল্লাহ তা‘আলার আরেকটি সিফাত হলো: অসন্তোষ হওয়া। আর তা হলো কাফিরদের প্রতি তাঁর অসন্তোষ হওয়া। মহা সত্য আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে তাদেরকে উচ্চ কণ্ঠে বলা হবে, 'তোমাদের নিজেদের প্রতি তোমাদের অসন্তোষের চেয়ে আল্লাহর অসন্তোষ ছিল অধিকতর।) [গাফির: ১০]
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো: আল্লাহর ওলীদের সাথে যারা চক্রান্ত করেন তিনি তাদের সাথে কৌশল অবলম্বন করেন। মহা সম্মানীত মাওলা বলেন: (আর তারা এক চক্রান্ত করেছিল এবং আমিও এক কৌশল অবলম্বন করলাম, অথচ তারা উপলব্ধিও করতে পারেনি।* অতএব দেখুন, তাদের চক্রান্তের পরিণাম কি হয়েছে---আমি তো তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়ের সকলকে ধ্বংস করেছি।) [আন-নামল: ৫০-৫১]
আল্লাহ তা‘আলার আরেকটি সিফাত হলো: ক্রোধান্বিত হওয়া। এটি গোস্বা থেকে কঠিন। মহা সত্য আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (অতঃপর যখন তারা আমাকে ক্ৰোধাম্বিত করল তখন আমি তাদের থেকে প্ৰতিশোধ নিলাম এবং নিমজ্জিত করলাম তাদের সকলকে একত্রিতভাবে।) [আয-যুখরুফ: ৫৫] কাতাদাহ ও সুদ্দী বলেন, «{فَلَمَّا آسَفُونَا}». [যখন তারা আমাকে ক্রোধান্বিত করল] অর্থ হলো: আমাকে কঠিনভাবে রাগিয়ে দিল। তাফসীরুত তাবারী: (২১/৬২২)
আল্লাহর আরেকটি সিফাত হলো: যে তাকে প্রতারিত করে আল্লাহ্ তাকে ধোঁকায় ফেলেন। কাজেই যেসব মুনাফিক আল্লাহর সাথে প্রতারণা করে আল্লাহ তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। যেমন মহান আল্লাহ বলেন: (আল্লাহ্ এবং মুমিনদেরকে তারা প্রতারিত করে। বস্তুতঃ তারা নিজেদেরকেই নিজেরা প্রতারিত করছে, অথচ তারা তা বুঝে না।) [আল-বাকারা: ৯] তিনি আরো বলেছেন: (নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে ধোঁকাবাজি করে; বস্তুতঃ তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন।) [আন-নিসা: ১৪২]
আল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তার শত্রুদের ভুলে যাবেন যেমন তারা তাঁর সাক্ষাতকে ভুলে গিয়েছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (যারা তাদের দ্বীনকে খেলা-তামাশা বানিয়ে নিয়েছিল আর দুনিয়ার জীবন যাদেরকে প্রতারিত করেছিল।’ কাজেই আজকের দিনে তাদেরকে আমি ভুলে যাব যেভাবে তারা এ দিনের সাক্ষাৎকে ভুলে গিয়েছিল।) [আল-আরাফ: ৫১]
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো: যে মহান আল্লাহর সাথে উপহাস করে আল্লাহ তার সাথে উপহাস করেন। মহাসত্য আল্লাহ বলেন: (আল্লাহ্ তাদের সাথে উপহাস করেন, এবং তাদেরকে তাদের অবাধ্যতার মধ্যে বিভ্রান্তের মত ঘুরে বেড়াবার অবকাশ দেন।) [আল-বাকারাহ: ১৫] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন: “তিনি তাদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করার নিমিত্তে তাদের সাথে উপহাস করেন।” {তাফসীর তাবারী: (১/৩০৪), ইবনু হাতিম, আত-তাফসীর: (১৪৩)}
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো: হাসা। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (এমন দু’ব্যক্তির ক্ষেত্রে আল্লাহ্ হাসেন, যারা একে অপরকে হত্যা করেও উভয়েই জান্নাতবাসী হবে।) {বুখারী (২৮২৬), মুসলিম (১৪৯০), নাসাঈ (৩১৬৬), ইবনু মাজাহ (১৯১)} কিয়ামতের দিন আল্লাহকে দেখার ব্যাপারে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত লম্বা এক হাদীস রয়েছে, যেখানে সর্বশেষ জান্নাতে প্রবেশকারীর ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে: (... তখন আল্লাহ্ বলবেন, হে আদম সন্তান, কি আশ্চর্য! তুমি কত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গকারী! তুমি কি আমার সঙ্গে অঙ্গীকার করনি এবং প্রতিশ্রুতি দাওনি যে, তোমাকে যা দেওয়া হয়েছে তা ছাড়া আর কিছু চাইবে না? তখন সে বলবে, হে আমার রব! আপনার সৃষ্টির মধ্যে আমাকে সবচাইতে হতভাগ্য করবেন না। এতে আল্লাহ্ হেসে দেবেন। অতঃপর তাকে জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দিবেন...।) সহীহ বুখারী (৮০৬)
ইমাম ওয়াকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যখন তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে: আমাদের রব কি হাসেন? তখন তোমরা বলো: এমনই আমরা শুনেছি।” শারহু উসূলুল ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ: (৩/৪৭৭)
হাফিয ইবনু বাত্তাহ রাহিমাহুল্লাহ তার কিতাব (আল-ইবানাহ)-তে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন, যার শিরোনাম হলো: “অধ্যায়; আল্লাহ তা‘আলা হাসেন এ প্রসঙ্গে ঈমান আনা।” আর তিনি তাতে বলেছেন, “আপনারা জেনে রাখুন—আল্লাহ আপনাদের ওপর রহম করুন—, আহলে হক মুমিনদের সিফাতসমূহের একটি হলো সহীহ হাদীসগুলোকে সত্যারোপ করা এবং তা মেনে নেওয়া ও কিয়াসের ওপর ভিত্তি করে তার ওপর আপত্তি না করা, আর মত ও প্রবৃত্তির দ্বারা কথা না বলা। কারণ, ঈমান হলো বিশ্বাস করা ও মুমিন হলো বিশ্বাসকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচারভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।) [আন-নিসা : ৬৫] কাজেই মুমিনদের আলামত হলো, তারা আল্লাহকে বিশেষিত করে সেসব বিশেষণ দ্বারা যা দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ নিজেকে এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিশেষিত করেছেন এবং আলিমগণ ও নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীগণ যা বর্ণনা করেছেন তা দ্বারাও -যারা হালাল, হারাম, সুন্নাত ও হাদীসের বর্ণনার ক্ষেত্রে আস্থাবান-। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত হয়েছে তার ব্যাপারে কখনো বলা যাবে না: কিভাবে? এবং কেনো? বরং তারা অনুসরণ করে, বিদআত করে না এবং মেনে নেয়, বিরোধিতা করে না, তারা সেগুলো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, সন্দেহ ও সংশয় করে না। অতএব মুমিনদের পক্ষে যাদের বর্ণনা গ্রহণ করা এবং যাদের বিরোধিতা না করা ওয়াজিব সেই নীতিবান বর্ণনাকারীগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ হাসেন। কাজেই আলিমগণের নিকট নিকৃষ্ট বিদআতি খারাপ অবস্থার লোক ছাড়া কেউ তা অস্বীকার ও পরিহার করতে পারে না।” ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ আল-কুবরা (৭/৯১)
তাঁর আরেকটি সিফাত হলো, আগমন করা এবং কিয়ামতের দিন মানুষের মাঝে ফয়সালা করার জন্যে আসা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তারা শুধু এরই তো প্রতীক্ষা করে যে, তাদের কাছে ফেরেশতা আসবে, কিংবা আপনার রব আসবেন।) [আল-আনআম: ১৫৮] তিনি আরো বলেন, (আর যখন আপনার রব আগমন করবেন ও সারিবদ্ধভাবে ফেরেশ্তাগণও।) [আল-ফাজর: ২২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, (তারা কি শুধু এর প্রতীক্ষায় রয়েছে যে, আল্লাহ্ ও ফেরেশতাগণ মেঘের ছায়ায় তাদের কাছে উপস্থিত হবেন? এবং সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে। আর সমস্ত বিষয় আল্লাহর কাছেই প্রত্যাবর্তিত হবে।) [আল-বাকারাহ: ২১০] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন মানুষদেরকে জমা করবেন এবং তিনি ঘোষণা দিবেন, যে ব্যক্তি যে জিনিসের ইবাদত করত সে তাকেই অনুসরণ করুক।” এবং তিনি হাদীসটি নিম্নের বাণী পর্যন্ত বর্ণনা করেন: “আর বাকী থাকবে শুধুমাত্র এই উম্মাহ্, তখন তারা বলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রব আগমন না করবেন, ততক্ষণ আমরা এখানেই থাকব। আর যখন আমাদের রব আগমন করবেন তখন আমরা অবশ্যই তাঁকে চিনতে পারব। অতঃপর তখন তাদের মাঝে মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ্ আগমন করবেন এবং বলবেন, ‘‘আমি তোমাদের রব।’’ তারা বলবে, হাঁ, আপনিই আমাদের রব। আর তারা তাকে অনুসরণ করবে।” {বুখারী (৮০৬), মুসলিম (১৮২), আবূ দাউদ (৪৭৩০), তিরমিযী (২৫৫৪), ইবনু মাজাহ (১৭৮)}
আবূল আলিয়া থেকে আল্লাহ তা‘আলার নিম্নের বাণী প্রসঙ্গে বর্ণিত হয়েছে যে: {هَلْ يَنظُرُونَ إِلاَّ أَن يَأْتِيَهُمُ اللّهُ فِي ظُلَلٍ مِّنَ الْغَمَامِ وَالْمَلآئِكَةُ} “তারা কি শুধু এর প্রতীক্ষায় রয়েছে যে, আল্লাহ্ ও ফেরেশতাগণ মেঘের ছায়ায় তাদের কাছে উপস্থিত হবেন।” [আল-বাকারাহ: ২১০] আবুল আলিয়া বলেন: (ফেরেশতাগণ মেঘের ছায়ায় আসবেন এবং সুমহান আল্লাহ যেভাবে চান আগমন করবেন।) আল-বায়হাকী, আল-আসমা ওয়াস সিফাত (২/৩৭০)
আল্লাহর আরেকটি সিফাত হলো যে, তিনি প্রকৃত অর্থে তাঁর শান ও মর্যাদা মোতাবেক দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন। তাঁর অবতরণ করা মাখলূকের অবতরণ করার মত নয়। বরং তা তাঁর অন্যান্য সিফাতের ন্যায় একটি সিফাত যার প্রতি আমরা ঈমান আনয়ন করি এবং আমরা যা জানি। আমরা তার ধরন বর্ণনা করতে গিয়ে বাহানা অন্বেষণ করব না এবং তা প্রত্যাখ্যান করার চেষ্টা করব না, বরং আমাদের সত্যবাদী ও সত্যায়িত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেভাবে সংবাদ দিয়েছেন সেভাবে তার প্রতি ঈমান রাখবো। তিনি বলেন: “রাতের অর্ধেক অথবা দু’ তৃতীয়াংশ অতিক্রম হলে মহান ও বরকতময় আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করে বলতে থাকেন: কোন প্রার্থনাকারী আছে কি যাকে দেয়া হবে? কোন আহবানকারী আছে কি যার আহবানে সাড়া দেয়া হবে? কোন ক্ষমা প্রার্থনাকারী আছে কি, যাকে ক্ষমা করা হবে? আল্লাহ তা’আলা ভোর প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত এরূপ বলতে থাকেন।” মুসলিম: (৭৫৮)
ইমাম ইবনু খুযায়মাহ রাহিমাহুল্লাহ স্বীয় কিতাব (আত-তাওহীদ)-এ এই শিরোনামে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন: “অধ্যায়: হিজাজ ও ইরাকের আলেমগণ সুমহান প্রতিপালকের প্রতিরাতে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসা সংক্রান্ত যেসব হাদীস নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন তা সনদের বিচারে প্রমাণিত এবং তার অর্থও সহীহ। আমরা এসব হাদীসে আল্লাহর নেমে আসার ধরন ও আকৃতি বর্ণনা করা ছাড়া দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে অন্তর থেকে সত্য জেনে মুখের স্বীকৃতি দ্বারা সাক্ষ্য প্রদান করি। কারণ আমাদের নবী মুস্তফা আমাদের স্রষ্টা কিভাবে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন তার ধরন বর্ণনা করেননি, তবে তিনি নেমে আসেন তা আমাদেরকে অবহিত করেছেন। অথচ আল্লাহ ও তাঁর নবী আলাইহিস সালাম মুসলিমরা তাদের দ্বীনি বিষয়ে যার মুখাপেক্ষী হয় তার ব্যাখ্যা বাদ দেননি। অতএব আমরা এসব হাদীসে নেমে আসার ধরন বা তার আকৃতি বর্ণনা করার চেষ্টা না করেই তা স্বীকার করি ও তাতে বিশ্বাস করি। যেহেতু নেমে আসার ধরন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বলেননি।” ইবনু খুযায়মাহ, আত-তাওহীদ: (১/২৮৯)
হাফিয ইবনু বাত্তাহ রাহিমাহুল্লাহ স্বীয় কিতাব (আল-ইবানাহ)-তে একটি শিরোনাম রচনা করেছেন: “এ কথার উপর ঈমান ও স্বীকৃতির অধ্যায় যে, আল্লাহ তা‘আলা প্রতিরাতে দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন ধরন ও স্থান ত্যাগ করা ছাড়াই।” অতঃপর তিনি বলেন, “জেনে রাখুন —আল্লাহ আপনাদের উপর রহম করুন— আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মুমিন বান্দাদের ওপর তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা, তিনি যা বলেন ও যা নিয়ে আসছেন তা কবুল করা ফরয করে দিয়েছেন। আর যা কিছু তার থেকে বিশুদ্ধ সনদে বর্ণিত হবে তার প্রতি ঈমান আনা, বিনা আপত্তিতে তা মেনে নেওয়া, উপমা ও তুলনা না করা এবং কীভাবে? ও কেনো? এ জাতীয় প্রশ্ন না করে মেনে নেওয়া আবশ্যক করে দিয়েছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ সনদে বর্ণিত, তিনি বলেছেন: “আমাদের মহান ও বরকতময় রব প্রতি রাতে যখন তার শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকে পৃথিবীর আসমানে অবতরণ করেন আর বলেন, কে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দিবো, কে আমার কাছে চাইবে আমি তাকে দান করব, কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আমি তাকে ক্ষমা করব?” এটি একটি দীর্ঘ হাদীসের বর্ণনা অতিশীঘ্রই যার পুরোটা আমরা উল্লেখ করব—ইনশাআল্লাহ—। হাদীসটি নির্ভরযোগ্য মুহাদ্দিসগণ, প্রমাণকারীগণ ও মুত্তাকী ফকিহগণ বর্ণনা করেছেন, যারা আমাদের কাছে ইসলামী শরীয়ত ও তার রোকনগুলো যেমন সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ, জিহাদ এবং এতদসংশ্লিষ্ট বিবাহ, তালাক, বেচাকেনা, হালাল ও হারামসহ সকল বিধান বর্ণনা করেছেন।” {ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (৭/২০১), হাদিসটি তাখরীজ করেছেন: বুখারী (১১৪৫), মুসলিম (৭৫৮), আবূ দাউদ (১৩১৫), তিরমিযী (৪৪৬), ইবনু মাজাহ (১৩৬৬)}
আমরা দু’জাহানের রব আল্লাহর ‘সাথে থাকা’র সিফাতের প্রতি ঈমান আনয়ন করি। তিনি স্বীয় ইলম, ইচ্ছা ও বেষ্টন করার দ্বারা তাঁর মাখলূকের সাথেই রয়েছেন। আল্লাহর এ সিফাতটি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা বলেন: (আপনি কি লক্ষ্য করেন না যে, আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে আল্লাহ তা জানেন? তিন ব্যক্তির মধ্যে এমন কোন গোপন পরামর্শ হয় না যাতে চতুর্থ জন হিসেবে তিনি থাকেন না এবং পাঁচ ব্যক্তির মধ্যেও হয় না যাতে ষষ্ট জন হিসেবে তিনি থাকেন না। তারা এর চেয়ে কম হোক বা বেশী হোক তিনি তো তাদের সঙ্গেই আছেন তারা যেখানেই থাকুক না কেন। তারপর তারা যা করে, তিনি তাদেরকে কিয়ামতের দিন তা জানিয়ে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সব কিছু সম্পর্কে সম্যক অবগত।) [আল-মুজাদালাহ: ৭]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমরা তোমাদের জীবনের উপর সদয় হও। কেননা তোমরা তো কোন বধির অথবা অনুপস্থিত সত্তাকে ডাকছে না। নিশ্চয়ই তোমরা ডাকছো সর্বশ্রোতা, নিকটবর্তী সত্তাকে যিনি তোমাদের সাথেই আছেন।” {বুখারী (৪২০৫), মুসলিম (২৭০৪), আবূ দাউদ (১৫২৬), তিরমিযী (৩৪৬১)}
এই সাথীত্ব দু’প্রকার:
বিশেষ সাথীত্ব: এটি আল্লাহর রাসূলগণ ও তাঁর অলীদের জন্য হয়। এর দাবি হলো: সাহায্য ও শক্তিশালী করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনি বললেন , ‘আপনারা ভয় করবেন না, আমি তো আপনাদের সংগে আছি, আমি শুনি ও দেখি।) [ত্ব-হা: ৪৬]
অপরটি হলো, সাধারণ সাথীত্ব: অর্থাৎ আল্লাহ মুমিন ও কাফির সকল মাখলূকের সাথে রয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনি তোমাদের সাথেই আছেন তোমরা যেখানেই থাকো।) [আল হাদীদ : ৪] এই সাথীত্বের অর্থ হলো: ইলম, বেষ্টন করা, শক্তি ও কর্তৃত্ব।
এই সাথীত্ব আল্লাহর ওপরে থাকার বিপরীত নয়। কারণ, আলেমদের ঐক্যমতে তার অর্থ হলো: ইলম ও বেষ্টন করা। অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা তাঁর ইলম ও বেষ্টন করা দ্বারা তাঁর মাখলুকের সাথে আছেন।
আল্লাহু সুবাহানাহু ওয়াতা‘লার আরেকটি সিফাত হলো: আশ্চর্য হওয়া। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ্ তা‘আলা সে সকল লোকের উপর আশ্চর্য হন, যারা শৃঙ্খলিত অবস্থায় জান্নাতে দাখিল হবে।” {বুখারী (৩০১০), আবূ দাউদ (২৬৭৭)} উকবাহ ইবনু আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “যখন কোনো বকরীর রাখাল পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থানকালে আযান দিয়ে সালাত আদায় করে তখন মহান আল্লাহ তার উপর অবাক হয়ে বলেন: (হে ফেরেশতামন্ডলী!) তোমরা আমার বান্দার দিকে তাকিয়ে দেখো, সে আযান দিয়ে সালাত আদায় করছে। সে তো আমাকে ভয় করার কারণেই এরূপ করছে। কাজেই আমি আমার এ বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবো।” {আবূ দাউদ (১২০৩), নাসাঈ (৬৬৬), আহমাদ (১৭৩১২), ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (৫৮৪), আর-রুয়ানী (২৩২)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, মুমিনগণ কিয়ামতের দিন তাদের রবকে দেখবেন। কুরআন ও সুন্নাতে এর প্রমাণ রয়েছে এবং এটি আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুতাওয়াতিরভাবে (অনেক সূত্রে) বর্ণিত হয়েছে। তিনি মুমিনদের সুসংবাদ দিয়েছেন যে, তারা কিয়ামতের দিন সরাসরি তাদের রবকে দেখবেন। আল্লাহর কসম, এটি জান্নাতীদের অনেক বড় নিআমত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (সেদিন কোনো কোনো মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে,* তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।) [আল-কিয়ামাহ: ২২-২৩] তিনি আরো বলেন: (যারা ভালো কাজ করে তাদের জন্যে রয়েছে শুভ পরিণাম (জান্নাত) এবং আরো বেশী।) [ইউনুস: ২৬] অন্যত্র আল্লাহ বলেন: (কখনো নয়; নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব হতে অন্তরিত থাকবে।) [আল-মুতাফফিফীন : ১৫] ইমাম মালিককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, হে আবূ আব্দুল্লাহ, কিয়ামতরে দিন মুমিননগণ কি তাদের রবকে দেখবেন? তিনি বললেন, যদি মুমিনগণ তাদের রবকে না-ই দেখতেন, আল্লাহ কাফিরদেরকে পর্দার আড়ালে রাখার ধমক দিতেন না। তিনি তো বলেছেন: (কখনো নয়; নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব হতে অন্তরিত থাকবে।) শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ: (২/৪৬৮)
আবূ সা’ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কিয়ামতের দিন আমাদের রবের দর্শন লাভ করব কি? তিনি বললেন: মেঘহীন আকাশে সূর্যকে দেখতে তোমাদের অসুবিধা হয় কি? আমরা বললাম, না। তিনি বললেন: সেদিন তোমাদের রবকে দেখতে তোমাদের কোন অসুবিধা হবে না, এতটুকু ব্যতীত যতটুকু সূর্য দেখার সময় পেয়ে থাক। সেদিন একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবেন, যারা যে জিনিসের ’ইবাদত করতে, তারা সে জিনিসের কাছে গমন কর। এরপর যারা ক্রোশপূজারী ছিল, তারা যাবে তাদের ক্রোশের কাছে। মূর্তিপূজারীরা যাবে তাদের মূর্তির সঙ্গে। সকলেই তাদের উপাস্যের সঙ্গে যাবে। বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতকারীরা। নেক্কার ও বদকার সকলেই এবং আহলে কিতাবের কতক লোকও থাকবে। অতঃপর জাহান্নামকে আনা হবে। সেটি তখন থাকবে মরীচিকার মত। ইয়াহূদীদেরকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কিসের ইবাদত করতে? তারা উত্তর করবে, আমরা আল্লাহর পুত্র উযায়র (আঃ)-এর ইবাদত করতাম। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। কারণ আল্লাহর কোন স্ত্রীও নেই এবং নেই তাঁর কোন সন্তান। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমরা চাই, আমাদেরকে পানি পান করান। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা পানি পান কর। এরপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। তারপর নাসারাদেরকে বলা হবে, তোমরা কিসের ইবাদত করতে? তারা বলবে, আমরা আল্লাহর পুত্র মসীহের ইবাদত করতাম। তখন তাদেরকে বলা হবে, তোমরা মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কোন স্ত্রীও ছিল না, সন্তানও ছিল না। এখন তোমরা কী চাও? তারা বলবে, আমাদের ইচ্ছা আপনি আমাদেরকে পানি পান করতে দিন। তাদেরকে উত্তর দেয়া হবে, তোমরা পান কর। তারপর তারা জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। অবশেষে বাকী থাকবে একমাত্র আল্লাহর ইবাদতকারীগণ- তাদের মধ্যে নেক্কার ও বদকার সকলেই। তাদেরকে লক্ষ্য করে বলা হবে, কোন্ জিনিস তোমাদেরকে আটকে রেখেছে? অথচ অন্যরা তো চলে গেছে। তারা বলবে, আমরা তো সেদিন তাদের থেকে আলাদা রয়েছি, যেদিন আজকের চেয়ে তাদের অধিক প্রয়োজন ছিল। আমরা একজন ঘোষণাকারীর এ ঘোষণাটি দিতে শুনেছি যে, যারা যাদের ইবাদাত করত তারা যেন ওদের সঙ্গে যায়। আমরা অপেক্ষা করছি আমাদের রবের। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: এরপর মহাক্ষমতাশালী আল্লাহ্ তাদের কাছে আসবেন। এবার তিনি সে সুরতে আসবেন না, যেভাবে তাঁকে প্রথমে ঈমানদারগণ দেখেছিলেন। এসে তিনি ঘোষণা দেবেন- আমি তোমাদের রব, সবাই তখন বলে উঠবে আপনিই আমাদের প্রতিপালক। আর সেদিন নবীগণ ছাড়া তাঁর সঙ্গে কেউ কথা বলতে পারবে না। আল্লাহ্ তাদেরকে বলবেন, তোমাদের এবং তাঁর মাঝখানে পরিচয়ের জন্য কোন আলামত আছে কি? তারা বলবেন, পায়ের নলা। তখন পায়ের নলা খুলে দেয়া হবে। এই দেখে ঈমানদারগণ সবাই সিজদা্য় পড়ে যাবে। {বুখারী (৭৪৩৯), মুসলিম (১৬৩)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “অচিরেই তোমরা তোমাদের রবকে দেখতে পাবে যেমন তোমরা এ চাঁদকে দেখছো, আর একে দেখতে তোমাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে না।" {বুখারী (৫৫৪), মুসলিম (৬৩৩), আবূ দাউদ (৪৭২৯), তিরমিযী (২৫৫১), ইবনু মাজাহ (১৭৭)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত যে, সাহাবীগণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি কিয়ামতের দিন আমাদের রবকে দেখতে পাব? তিনি বললেন: মেঘমুক্ত পুর্ণিমার রাতের চাঁদকে দেখার ব্যাপারে তোমরা কি সন্দেহ পোষণ কর? তারা বললেন, না, হে আল্লাহর রাসূল! তিনি বললেন, মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখার ব্যাপারে কি তোমাদের কোন সন্দেহ আছে? সবাই বললেন, না। তখন তিনি বললেন: (নিঃসন্দেহে তোমরাও আল্লাহকে তেমনিভাবে দেখতে পাবে। কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে সমবেত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা বলবেন, যে যার উপাসনা করতে সে যেন তার অনুসরণ করে। তাই তাদের কেউ সূর্যের অনুসরণ করবে, কেউ চন্দ্রের অনুসরণ করবে, কেউ তাগুতের অনুসরণ করবে। আর বাকী থাকবে শুধুমাত্র এই উম্মত, তবে তাদের সাথে মুনাফিকরাও থাকবে। তাদের মাঝে এ সময় আল্লাহ তা‘আলা আগমন করবেন এবং বলবেন: ‘‘আমি তোমাদের রব।’’ তখন তারা বলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রবের আগমন না হবে, ততক্ষণ আমরা এখানেই থাকব। আর তাঁর যখন আগমন হবে তখন আমরা অবশ্যই তাঁকে চিনতে পারব। তখন তাদের মাঝে মহা পরাক্রমশালী আল্লাহ্ তা‘আলা আগমন করবেন এবং বলবেন, ‘‘আমি তোমাদের রব।’’ তারা বলবে, হাঁ, আপনিই আমাদের রব। তিনি তাদের ডাকবেন। আর জাহান্নামের উপর একটি সেতু স্থাপন করা হবে। রাসূলগণের মধ্যে আমিই সবার আগে আমার উম্মাত নিয়ে এ পথ অতিক্রম করব। সেদিন রাসূলগণ ব্যতীত আর কেউ কথা বলবে না। আর রাসূলগণের কথা হবে: (আল্লাহুম্মা সাল্লিম সাল্লিম) হে আল্লাহ্! রক্ষা করুন, রক্ষা করুন।) {বুখারী (৮০৬), মুসলিম (১৮২), আবূ দাউদ (৪৭৩০), তিরমিযী (২৫৫৪), ইবনু মাজাহ (১৭৮)}
অতএব আল্লাহর দিদারের হাদীসসমূহ—আল-হামদুলিল্লাহ—রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত। আর আল্লাহর বাণী: {قَالَ رَبِّ أَرِنِي أَنظُرْ إِلَيْكَ قَالَ لَن تَرَانِي وَلَـكِنِ انظُرْ إِلَى الْجَبَلِ فَإِنِ اسْتَقَرَّ مَكَانَهُ فَسَوْفَ تَرَانِي} অর্থ: “তখন তিনি বললেন, ‘হে আমার রব! আমাকে দর্শন দান করুন, আমি আপনাকে দেখব’। তিনি বললেন, ‘আপনি আমাকে দেখতে পাবেন না। আপনি বরং পাহাড়ের দিকেই তাকিয়ে দেখুন, সেটা যদি নিজের জায়গায় স্থির থাকে তবে আপনি আমাকে দেখতে পাবেন।’ [আল-আরাফ: ১৪৩] এ আয়াত দ্বারা আল্লাহর দিদারকে অস্বীকার করা হয়নি; কারণ, এটি দুনিয়ার কথা। এটি অনেকটা আবূ যর রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রশ্নের উত্তরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথার মত, যখন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনি আপনার রবকে দেখেছেন কী? তিনি বললেন, “তিনি তো নূর কীভাবে দেখবো?” {মুসলিম: (১৭৮), তিরমিযী: (৩২৮২)} অতএব ইসরার রাতে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রবকে দেখেননি। হ্যাঁ, আল্লাহ তা‘আলা ইসরার রাতে তাকে যেসব নিদর্শন দ্বারা সম্মানিত করেছেন তার সংবাদ দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেছেন: (পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় ভ্রমণ করালেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি দিয়েছি বরকত, যেন আমি তাকে আমার নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয় তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।) [আল-ইসরা: ১] কিন্তু তিনি উল্লেখ করেননি যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রবকে দেখেছেন। যদি তিনি তার রবকে দেখতেন তাহলে তার ওপর অনুগ্রহ করা স্বরূপ তাও উল্লেখ করতেন।
অনুরূপভাবে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: (দৃষ্টিসমূহ তাকে আয়ত্ব করতে পারে না, অথচ তিনি সকল দৃষ্টিকে আয়ত্ব করেন এবং তিনি সূক্ষদর্শী, সম্যক অবহিত।) [আল-আন‘আম: ১০৩] এই আয়াতও না-দেখার ওপর প্রমাণ বহন করে না। কারণ, الإدراك (আয়ত্ত করা) الرؤية (দেখা) এর চেয়ে বেশী অর্থের ধারক। অধিকন্তু এই আয়াতের পূর্বের আয়াতগুলো তাওহীদকে প্রতিষ্ঠিত এবং সন্তান অস্বীকার করার বর্ণনার ধারায় এসেছে। এটি পরকাল সম্পর্কীয় বিষয়ে বর্ণনা নয় যে, আয়াতটি (আখেরাতে) আল্লাহকে দেখার সাথে সম্পৃক্ত।
ইমাম দারেমী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “এসব হাদীস—যার অধিকাংশ— আল্লাহকে দেখা প্রসঙ্গে। আমরা আমাদের ফকীহ ও দূরদর্শী আলেম শায়খদেরকে এসবের প্রতি বিশ্বাসী ও স্বীকারকারী হিসেবে পেয়েছি। মুসলিমগণ পূর্বাপর তা বর্ণনা করেছেন ও তার প্রতি ঈমান এনেছেন। তারা তা অপছন্দ কিংবা অস্বীকার করেননি। বিপথগামীরা যারা তা অস্বীকার করেছে তাদেরকে তারা গোমরাহ বলেছেন। বরং তাদের সবচেয়ে বড় আশা এবং তাদের ওপর আল্লাহর সবচেয়ে বড় প্রতিদান মনে করতেন স্বীয় রবকে দেখাকে। তারা এর সাথে জান্নাতের কোনো নিআমতকে তুলনা করতেন না।” ঈমাম আদ-দারিমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (পৃ.১২২)
মুফাসসিরদের ঈমাম ইবনু জারীর তাবারী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কিয়ামতের দিন মুমিনগণ কর্তৃক তাদের রবকে দেখা প্রসঙ্গে সঠিক কথা - যা আমাদের দ্বীন, যেই দ্বীন দ্বারা আল্লাহর ইবাদত করি এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতকে যার ওপর পেয়েছি- হলো জান্নাতীরা তাদের রবকে দেখবেন। যেহেতু এর ওপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিশুদ্ধ প্রমাণ রয়েছে।” আত-তাবারী, সারীহুস সুন্নাহ (পৃ.২০)
ইবনু বাত্তাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তারা আল্লাহর দর্শণকে অস্বীকার করে তাঁর রুবুবিয়াতকে বাতিল করতে চেয়েছে। কারণ, তারা যখন আল্লাহর দর্শনকে স্বীকার করবে তখন তো তাঁর রুবুবিয়্যাহকেও স্বীকার করতে হবে। কারণ, যে ব্যক্তি না দেখেই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে তার জন্য আল্লাহ তাআলা সাওয়াব নির্ধারণ করেছেন যে, সে তাকে স্বচক্ষে দেখবে।” ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ আল-কুবরা (২/৭)
অলীদ ইবনু মুসিলম বলেন: আমি যেসব হাদীসে আল্লাহকে দেখা ও অন্যান্য বিষয় রয়েছে তা সম্পর্কে আওযায়ী, মালিক ইবন আনাস, সুফয়ান সাওরী, লাইস ইবনু সা‘আদকে জিজ্ঞেস করেছি, তারা বলেছেন: “এসবকে ধরন বর্ণনা করা ছাড়া চালিয়ে নাও।” দারাকুতনী, আস-সিফাত: (পৃ.৭৫)
আমরা আল্লাহর জন্য চেহারা সাব্যস্ত করি, যেমনভাবে তাঁর বড়ত্ব ও মহত্বের সাথে সামঞ্জস্য হয়। যেমন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আল্লাহর চেহারা ছাড়া সব কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই এবং তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।) [আল-কাসাস : ৮৮] তিনি আরো বলেন: (আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।) [আর-রহমান : ২৭] সম্মানিত আল্লাহ অন্যত্র বলেছেন: (আর যারা তাদের রবের সস্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্য্য ধারণ করে।) [আর-রা‘দ: ২২] এবং তিনি বলেছেন: (শুধু তার মহান রবের সস্তুষ্টির প্ৰত্যাশায়।) [আল-লাইল: ২০] তিনি আরো বলেন: (যারা তাদের রব-কে তাঁর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ডাকে।) [আল-আনআম: ৫২] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “(জান্নাতের মধ্যে) দু’টি বাগান থাকবে। এ দু’টির সকল পাত্র এবং এর ভিতরে সকল বস্তু রৌপ্য নির্মিত হবে এবং তাতে আরো দু’টি উদ্যান থাকবে। এ দু’টির সকল পাত্র এবং ভিতরের সকল বস্তু সোনার তৈরী হবে। জান্নাতে আদনের মধ্যে জান্নাতী লোকেরা তাদের রবের দর্শন লাভ করবে। এ জান্নাতবাসী এবং তাদের রবের এ দর্শনের মাঝে আল্লাহর সত্তার ওপর জড়ানো তাঁর বড়ত্বের চাদর ছাড়া আর কোন জিনিস থাকবে না।” {সহীহ বুখারী (৪৮৭৮), মুসলিম (১৮০), তিরমিযী (২৫২৮), ইবনু মাজাহ (১৮৬)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “আল্লাহ কখনো নিদ্রা যান না। নিদ্রি যাওয়া তাঁর সাজেও না। তিনি তাঁর ইচ্ছানুসারে মীযান (দাড়িপাল্লা) নামান এবং উত্তোলন করেন। দিনের পূর্বেই রাতের সকল আমল তাঁর কাছে পেশ করা হয়। রাতের পূর্বেই দিনের সকল আমল তাঁর কাছে পেশ করা হয়। তিনি নূরের পর্দায় আচ্ছাদিত। যদি সে আবরণ খুলে দেয়া হয়, তবে তাঁর নূরের আলোচ্ছটা সৃষ্টি জগতের দৃশ্যমান সব কিছু ভস্ম করে দিবে।” {সহীহ মুসলিম: (১৭৯), ইবনু মাজাহ: (১৯৫, ১৯৬)}
আবূ উসমান সাবূনী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “অনুরূপভাবে তারা আল্লাহর যেসব সিফাত আল-কুরআন এবং সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যেমন- শোনা, দেখা, চোখ, ইলম, শক্তি, কুদরত, ইজ্জত, বড়ত্ব, ইচ্ছা, চাওয়া, কথা, বাক্য, সন্তুষ্টি, অসন্তুষ্টি, জীবন, জাগ্রত থাকা, খুশী হওয়া, হাসা প্রভৃতির ব্যাপারে তারা বলেন, এসব সিফাতকে সৃজিত বস্তুসমূহের সিফাতের সাথে সাদৃশ্য না দিয়ে আল্লাহর জন্য সাব্যস্ত করতে হবে। বরং তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব সিফাতের ব্যাপারে যা কিছু বলেছেন তাতে হ্রাস-বৃদ্ধি এবং তার আকৃতি, সাদৃশ্য, বিকৃতি, পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা ছাড়াই তাঁর জন্য সাব্যস্ত করেন। আরবরা শব্দের যে অর্থ জানেন তার থেকে বিকৃতি না করে এবং তার ওপর অপব্যাখ্যা না করে সেগুলোকে বাহ্যিক অবস্থার ওপর চালিয়ে নেন এবং এর ইলমকে আল্লাহর দিকে সোপর্দ করেন এবং স্বীকার করেন যে, এর ব্যাখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। যেমন গভীর জ্ঞানের অধিকারীদের সম্পর্কে আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন যে, তারা বলেন, (আর যারা জ্ঞানে সুগভীর, তারা বলে, ‘আমরা এগুলোতে ঈমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে’; এবং জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা ছাড়া আর কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।) [আলু ইমরান :৭] আবূ উসমান আস-সাবূনী, আকিদাতুস সালাফ আসহাবুল হাদীস: (পৃ.১৬, ১৭)
আল্লাহ তা‘আলার আরেকটি সিফাত হলো: হাত। এ সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহতে বিভিন্নভাবে সংবাদ এসেছে। কখনো দ্বিবচন দ্বারা উল্লেখ করা হয়েছে। কখনো সংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, তিনি হাতকে প্রসারিত ও সংকুচিত করেন, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর হাত দিয়ে জমিনকে কব্জা করবেন এবং তাঁর ডান হাত দিয়ে আসমানকে গুটিয়ে নিবেন। কখনো তাঁর হাত আঙ্গুলবিশিষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কিছু প্রমাণ করে যে, আল্লাহর যে হাতের উল্লেখ কুরআন ও সুন্নাহতে এসেছে, তা আল্লাহর সত্ত্বার সাথে সামঞ্জস্যশীল বাস্তবিক হাত। আমরা এর ব্যাখ্যা, অথবা সাদৃশ্য বর্ণনা অথবা এ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীসকে বিকৃতি করার দিকে ধাবিত হবো না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনি বললেন, 'হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু'হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সিজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন?) [সোয়াদ: ৭৫] তিনি আরো বলেন: (নিশ্চয় যারা আপনার কাছে বাই’আত করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বাই’আত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর।) [আল-ফাতহ: ১০] মহান আল্লাহ আরো বলেন: (আর তারা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করেনি অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত জমিন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে এবং আসমানসমূহ থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের উর্ধ্বে।) [আয-যুমার: ৬৭]
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আদম ও মূসা আলাইহিমাস সালাম (পরস্পরে) বাদানুবাদ করেন। তখন আদম মূসা-এর উপর বিতর্কে জয়ী হলেন। মূসা বলেন, আপনি তো সেই আদম আল্লাহ যাকে নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন এবং আপনার ভেতর তার রূহ ফুঁকে দিয়েছেন।” {সহীহ বুখারী (৬৬১৪), মুসলিম (২৬৫২), আবূ দাউদ (৪৭০১), তিরমিযী (২১৩৪), ইবনু মাজাহ (৮০)} অন্য বর্ণনায় এসেছে: আদম ও মূসা (পরস্পরে) বাদানুবাদ করেন। মূসা বলেন, হে আদম, আপনি আমাদের পিতা। আপনি আমাদেরকে বঞ্চিত করেছেন এবং জান্নাত থেকে আমাদেরকে বের করেছেন। আদম তাকে বললেন, হে মূসা! আল্লাহ্ আপনাকে তো নিজ কথার মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন এবং আপনার জন্য নিজ হাত দ্বারা লিখেছেন।” {সহীহ বুখারী (৬৬১৪), মুসলিম (২৬৫২), আবূ দাউদ (৪৭০১), তিরমিযী (২১৩৪), ইবনু মাজাহ (৮০)}
সহীহ হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ন্যায় বিচারকগণ (কিয়ামতের দিন) আল্লাহর নিকটে নূরের মিম্বারসমূহে মহামহিম দয়াময় প্রভুর ডানপাৰ্শ্বে উপবিষ্ট থাকবেন। তার উভয় হাতই ডান হাত (অর্থাৎ- সমান মহিয়ান)। এরা তারা যারা তাদের শাসনকার্যে তাদের পরিবারের লোকদের ব্যাপারে এবং তাদের উপর ন্যস্ত দায়িত্বসমূহের ব্যাপারে সুবিচার করে।” সহীহ মুসলিম: (১৮২৭), নাসাঈ: (৫৩৭৯)
আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা তাঁর হাত রাতে প্রসারিত করেন যেন দিনের অপরাধীরা তাওবা করে এবং দিনে তার হাত প্রসারিত করেন যেন রাতের অপরাধীরা তাওবা করে, যে পর্যন্ত না পশ্চিম আকাশে সূর্য উঠবে।” সহীহ মুসলিম: (২৭৫৯)
সহীহ গ্রন্থে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমরা কি দেখ না, যখন থেকে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, তখন থেকে তিনি কী পরিমাণ খরচ করেছেন? কিন্তু এত খরচ করার পরও তাঁর হাতের সম্পদ কমে যায়নি। আর আল্লাহ তা’আলার ’আরশ পানির উপর ছিল। তাঁর হাতেই রয়েছে দাঁড়িপাল্লা। তিনি নিচু করেন, তিনি উপরে তোলেন।” {সহীহ বুখারী (৪৬৮৪), মুসলিম (৯৯৩), তিরমিযী (৩০৪৫), ইবনু মাজাহ (১৯৭)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন আল্লাহ তা’আলা আদম-কে সৃষ্টি করে তার মাঝে রূহ (আত্মা) সঞ্চার করেন, সে সময় তার হাঁচি আসে এবং তিনি আলহামদুলিল্লাহ’ বলেন। তিনি আল্লাহ তা’আলার অনুমতি নিয়েই তার প্রশংসা করেন...” অবশেষে বলেন, “এবার আল্লাহ তা’আলা তার দুটি হাত মুষ্টিবদ্ধ করে তাকে বললেন: দু’টি হাতের মাঝে যেটি ইচ্ছা বেছে নাও। তিনি বললেন: আমার রবের ডান হাত আমি বেছে নিলাম। আর আমার রবের প্রত্যেক হাতই ডান হাত এবং বরকাতময়, অতঃপর আল্লাহ তা’আলা তাঁর মুষ্টিবদ্ধ হাত খুললে দেখা গেল যে, তাতে আদম এবং তার সন্তানরা রয়েছে।” {তিরমিযি: (৩৩৬৮), ইবনু আবূ আসিম, আস-সুন্নাহ (৫৯৬), বাযযার (৮১৯৪), নাসাঈ, আল-কুবরা (৯৯৭৭)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আদম সন্তানের কলবসমূহ পরম দয়াময় আল্লাহ তা’আলার দু’আঙ্গুলের মধ্যে এমনভাবে আছে যেন তা একটি কলব। তিনি যেভাবে চান সেভাবেই তা উলট পালট করেন।” সহীহ মুসলিম: (২৬৫৪)
আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ (আস-সুন্নাহ) গ্রন্থে স্বীয় সনদে ওয়াকী থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, “এসব হাদীস যেভাবে এসেছে সেভাবেই মেনে নেই। আমরা বলি না: এটা কীভাবে? এরূপ কেনো? তার উদ্দেশ্য আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস: “নিশ্চয় আল্লাহ সব আসমানকে এক আঙ্গুলে এবং পাহাড়সমূহকে আরেক আঙ্গুলে বহন করবেন।” এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, তিনি বলেন: “নিশ্চয় আদম সন্তানদের অন্তরসমূহ রহমানের আঙ্গুলসমূহ হতে দু’আঙ্গুলের মাঝে রয়েছে।” সহীহ মুসলিম: (২৬৫৪) এ জাতীয় আরো অনেক হাদীস। আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/২৬৭)
ইমাম শারীক রাহিমাহুল্লাহ সিফাতের কতক হাদীস অস্বীকারকারীর প্রশ্নের উত্তরে বলেছেন, “যারা এসব হাদীস বর্ণনা করেছেন তারাই কুরআন, পাঁচ ওয়াক্ত সালাত, বায়তুল্লাহর হজ করা, রমযানের সিয়াম রাখা বর্ণনা করেছেন। আমরা এসব হাদীস ছাড়া আল্লাহকে জানতে পারি না।” আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১/২৭৩)
হাফিয ইবনু বাত্তাহ রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহু রাব্বুল আলামীনের হাতের সিফাত প্রমাণকারী হাদীসসমূহ উল্লেখ করে বলেন: “দ্বীনের পরিপূর্ণতা ও সম্পূর্ণতায় বর্ণিত এসব হাদীস এবং তার সমকক্ষ ও তার অর্থে বর্ণিত অন্যান্য হাদীস ইত্যাদির প্রতি: ঈমান আনা, তা কবূল করা এবং তার ওপর প্রশ্ন করা ছাড়া তা গ্রহণ করে নেওয়া এবং কীভাবে ও কেনো প্রশ্ন করা ছাড়া তা বর্ণনা করার ক্ষেত্রে সালাফদের পদাঙ্গ অনুসরণ করা আবশ্যক।” ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (৩/৩১৩)
আল্লাহ যেমন নিজেকে পূর্ণতা, সৌন্দর্য, বড়ত্ব, ইজ্জত ও অহংকার গুণে গুণান্বিত করেছেন, তেমন তিনি নিজের উপর থেকে ত্রুটির বিশেষণকে অস্বীকার করেছেন। তবে কুরআন ও সুন্নাতে সিফাত অস্বীকার করা মুলনীতি নয়, বরং মূলনীতি হলো সিফাত সাব্যস্ত করা। কারণ, কুরআন ও সুন্নাহ আল্লাহর বড়ত্ব, সম্মান ও পূর্ণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল সিফাত দ্বারা পরিপূর্ণ। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা যখন নিজের থেকে কোনো সিফাত অসাব্যস্ত করেন, তখন উদ্দেশ্য হয় তার বিপরীত পূর্ণতা বর্ণনা করা। অথবা মানুষ ইজ্জত ও সম্মানের অধিকারী সত্ত্বার সাথে যেসব ত্রুটিকে সাব্যস্ত করেছেন, তিনি নিজের সত্ত্বা থেকে তা অসাব্যস্ত করেন।
মহান রব নিজের উপর থেকে অস্বীকার করেছেন তার অন্যতম হলো: তন্দ্রা ও ঘুম। যেমন তাঁর বাণীতে রয়েছে: (আল্লাহ্, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়।) [আল-বাকারাহ: ২৫৫] তিনি নিজের থেকে ভুলে যাওয়াকেও অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “আর আপনার রব বিস্মৃত হন না।” [সূরা মারয়াম: ৬৪] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা নিজের থেকে ক্লান্তিকে অসাব্যস্ত করেছেন; কারণ ইহুদিরা —তাদের ওপর আল্লাহর লানত হোক—মাখলুক সৃষ্টি করার পর আল্লাহর সাথে ক্লান্তিকে সম্পৃক্ত করেছেন। অনুরূপভাবে তিনি মাখলুক সৃষ্টি সম্পন্ন করার পর আরাম গ্রহণ করার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন: (আর অবশ্যই আমি আসমানসমুহ, জমিন ও তাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আর আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।) [সূরা কাফ: ৩৮]
আমাদের রব সাব্যস্ত করেছেন যে, তিনি মহান হিকমতের জন্য মাখলুক সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাঁর মাখলুককে অনর্থক সৃষ্টি করেননি। কাজেই আমাদের রব নিজের নফস থেকে অনর্থক কর্মকে না করেছেন। তিনি বলেছেন: (তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?) [আল-মুমিনুন : ১১৫] আল্লাহ সুবহানাহু বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর যাবতীয় হুকুম ইনসাফপূর্ণ এবং তাঁর কথাই চুড়ান্ত। তাঁর পরিপূর্ণ ইনসাফের কারণে তিনি কারো ওপর জুলম করেন না। আমাদের সম্মানিত রব বলেন: (আর তারা যা আমল করেছে তা সামনে উপস্থিত পাবে; আর আপনার রব তো কারো প্রতি জুলুম করেন না।) [আল-কাহাফ: ৪৯] এবং তিনি আরো বলেছেন: (আর আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি মোটেও জুলুমকারী নন।) [সূরা ফুসসিলাত : ৪৬]
ইহুদি ও খ্রিস্টানরা তাদের পূর্বে যারা কুফরী করেছে তাদের সাথে মিল রেখে আল্লাহর প্রতি সন্তান সম্পৃক্ত করেছেন। কাজেই আল্লাহ নিজের থেকে সন্তানকে অস্বীকার করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (আল্লাহ্ কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোনো ইলাহও নেই।) [আল-মুমিনুন: ৯১] আল্লাহু সুবহানাহু স্পষ্ট করেছেন যে, যার সন্তান রয়েছে তার স্ত্রী থাকা জরুরি। আর আল্লাহ স্ত্রী ও সন্তান থেকে পবিত্র। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: (তিনি আসমান ও জমিনের স্রষ্টা, তাঁর সন্তান হবে কিভাবে? তাঁর তো কোন সঙ্গিনী নেই। আর তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং প্রত্যেক বস্তু সম্বন্ধে তিনি সবিশেষ অবগত।) [আল-আনআম: ১০১] এবং তিনি বলেছেন, (আর নিশ্চয়ই আমাদের রবের মর্যাদা সমুচ্চ; তিনি গ্ৰহণ করেননি কোন সঙ্গিনী এবং না কোন সন্তান।) [আল-জিন: ৩]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার সুন্দর সুন্দর নামসমূহ রয়েছে। আর তাঁর নামগুলো সৌন্দর্যের শেষ সীমায় পৌঁছেছে। কাজেই তাঁর থেকে বেশি সুন্দর কিছু নেই। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন: (আল্লাহ্, তিনি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, সুন্দর নামসমূহ তাঁরই।) [ত্ব-হা: ৮] তন্মধ্যে আল্লাহ তা‘আলার বাণীতে আরো বর্ণিত হয়েছে: (সকল ‘প্রশংসা’ আল্লাহর, যিনি সৃষ্টিকুলের রব।* দয়াময়, পরম দয়ালু্।* বিচার দিনের মালিক।) [আল-ফাতিহা: ২-৪] এবং আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার বাণীতে: (তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি গায়েব ও উপস্থিত বিষয়াদির জ্ঞানী; তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু।* তিনি আল্লাহ্, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনিই অধিপতি, মহাপবিত্র, শান্তি, নিরাপত্তা বিধায়ক, রক্ষক, পরাক্রমশালী, প্রবল, অতীব মহিমান্বিত। তারা যা শরীক স্থির করে আল্লাহ্ তা হতে পবিত্র, মহান।* তিনিই আল্লাহ সৃজনকর্তা, উদ্ভাবন কর্তা, তাঁরই সকল উত্তম নাম। আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু আছে, সবকিছুই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়। [আল-হাশর: ২২-২৪]
আল্লাহর নামগুলো মুস্তাক (গঠিত) এবং প্রত্যেক নাম থেকে আল্লাহর জন্য একটি সিফাত নির্গত হয়। কাজেই রাহীম হল নাম, তা থেকে রহমত সিফাত, আযীয থেকে ইজ্জত সিফাত, হাকীম থেকে হিকমত সিফাত, হাইয়ূন থেকে হায়াত সিফাত নির্গত করা হয়। এভাবে অন্যান্য নাম থেকেও।
আল্লাহর নামসমূহের কোন নির্ধারিত সংখ্যা নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমি আপনার প্রত্যেক নাম যার দ্বারা আপনি নিজের নফসের নামকরণ করেছেন, অথবা আপনি যা আপনার কিতাবে নাযিল করেছেন, অথবা যা আপনার মাখলুকের কাউকে শিখিয়েছেন, অথবা যা আপনার কাছে অদৃশ্যে ইলমে সংরক্ষণ করেছেন - তার দ্বারা আপনার কাছে প্রার্থনা করি “ (আদ্দাবী, আদ-দুয়া (৬), ইবনু আবি শায়বাহ, আল-মুসান্নাফ (২৯৯৩০), এবং আল-মুসনাদ (৩২৯), আহমাদ (৩৭১২), হারিস ইবন আবি উসামাহ, আল-মুসনাদ, বুগইয়াতুল বাহিস (১০৫৭)।) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “আল্লাহর নিরানব্বইটি- এক কম একশ’টি নাম রয়েছে, যে ব্যক্তি সেগুলো আয়ত্তে রাখবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” {বুখারী (২৭৩৬), মুসলিম (২৬৭৭), তিরমিযী (৩৫০৬), ইবনু মাজাহ (৩৮৬০)}
আমাদের রব আমাদেরকে তাঁর নামসমূহে বক্রতা করা থেকে নিষেধ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন: (আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাকে সেসব নামেই ডাক; আর যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন কর; তাদের কৃতকর্মের ফল অচিরেই তাদেরকে দেয়া হবে।) [আল আরাফ : ১৮০]
আল্লাহর নামসমূহে বক্রতা অবলম্বন কয়েক প্রকার হয়; তন্মধ্যে: আল্লাহর এমন নামে মানুষকে নামকরণ করা যা বৈধ নয়, যেমন খালিক, রহমান ইত্যাদি। আরো যেমন, আল্লাহর নামসমূহ থেকে নির্গত শব্দ দ্বারা মূর্তির নামকরণ করা, যেমন আল্লাহ শব্দ থেকে লাত এবং আযীয শব্দ থেকে উজ্জা নামকরণ করা। আরো যেমন, আল্লাহর নামসমূহ অস্বীকার করা, অথবা তার অর্থ অস্বীকার করা, অথবা তার অর্থহীন বলা।
আল্লাহর যেসব নাম ও সিফাত কুরআন ও সুন্নাহে বর্ণিত হয়েছে সেগুলো আয়ত্তে আনা কোনো কিতাব সামর্থ্য রাখে না, তবে মর্যাদার জন্য আমাদের পক্ষে এতটুকু যথেষ্ট যে, আমরা এই অধ্যায়ে তার কয়েকটি বাক্যে সেগুলোর ইঙ্গিত করেছি।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, যার দ্বারা আল্লাহ নিজের নফসকে বিশেষিত করেছেন অথবা নামকরণ করেছেন, অথবা যার দ্বারা তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিশেষিত করেছেন, অথবা নামকরণ করেছেন তা ছাড়া অন্য কিছু দ্বারা তাকে বিশেষিত না করা অথবা তাঁর নামকরণ না করা মুসলিমের ওপর ওয়াজিব। এবং যা তিনি নিজের থেকে না করেছেন অথবা যা তাঁর থেকে তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম না করেছেন তা তাঁর জন্য না করতে হবে এবং তার বাইরের বিষয় থেকে চুপ থাকতে হবে।
আমরা এসব নাম ও সিফাতের প্রতি সে অর্থে ঈমান আনয়ন করি যে অর্থ উদ্দেশ্য করেছেন আমাদের রব আল্লাহ এবং আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আমরা জানি যে, মানুষ তার হাকিকত জানে না, তা আয়ত্ত করার ক্ষমতা রাখে না, তাদের বুঝ সে পর্যন্ত পৌঁছতে সক্ষম নয় এবং আমরা তার ব্যাখ্যায় চলচাতুরি করি না। কারণ, আল্লাহ তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে নির্দেশ দিয়েছেন: (এবং আমি কৃত্রিমতাশ্রয়ীদের অন্তর্ভুক্ত নই।) [সোয়াদ: ৮৬] যেমন কুরআন ও সুন্নাহতে জান্নাতের বিভিন্ন প্রকার নিআমতের কথা উল্লেখ রয়েছে যেগুলোর নামের সাথে দুনিয়ার নিআমতের নামের মিল রয়েছে, তবে উভয়ের মাঝে এতো পার্থক্য ও ব্যবধান যা কোনো মানুষের পক্ষে আয়ত্তে আনা সম্ভবপর নয়। কাজেই যখন আমরা জান্নাতের নিআমত না দেখে এবং তার ধরন ও হাকিকত না জেনে তার প্রতি ঈমান আনয়ন করি, তখন কেবল নাম ও সিফাতে অংশী হওয়ার কারণে মানুষের সাথে আল্লাহর সাদৃশ্য হওয়া অসম্ভব। অনুরূপভাবে কেবল শাব্দিক মিলের কারণে আল্লাহর থেকে নাম ও সিফাতসমূহ অস্বীকার করা আবশ্যক হয় না।
হেদায়েত ও জ্ঞানসম্পন্ন ইমামগণ বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। ইবনু আবি যামনিন বলেন, “আমাদের রবের এসব সিফাত যার দ্বারা তিনি স্বীয় কিতাবে নিজেকে বিশেষিত করেছেন এবং যার দ্বারা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বিশেষিত করেছেন, তার কোনো জিনিসে সীমাবদ্ধতা, সাদৃশ্যতা ও পরিমাপ নেই। তিনি পবিত্র সত্তা তাঁর মত কোনো জিনিস নেই। তিনি সর্বশ্রোতা ও সর্বদ্রষ্টা। চোখসমূহ তাকে দেখেনি যে, তার অস্তিত্ব কেমন তার বিবরণ দিতে সক্ষম হবে। তবে অন্তরসমূহ তার প্রতি ঈমানের হাকিকতের ভেতর তাকে দেখেছে।” ইবনু আবি যামনিন, উসূলুস সুন্নাহ (পৃ.৭৪)
আব্দুর রহমান ইবনু কাসিম বলেন, “কুরআনে আল্লাহ নিজেকে যা দ্বারা বিশেষিত করেছেন কারো জন্য অন্য কিছু দ্বারা তাকে বিশেষিত করা বৈধ নয়। তাঁর দুই হাতকে এবং তাঁর চেহারাকে কোনো জিনিসের সাথে সাদৃশ্য দিবে না। তবে বলবে যে, তাঁর দু’টি হাত রয়েছে, যেমনভাবে কুরআনে তিনি নিজেকে বিশেষিত করেছেন। তার চেহারাও রয়েছে যেমনভাবে তিনি নিজেকে বিশেষিত করেছেন- কুরআনের যেখানে তিনি নিজেকে তা দ্বারা বিশেষিত করেছেন সেখানে সেভাবেই থামবে। কারণ, বরকতময় আল্লাহ তা‘আলার কোনো সাদৃশ্য ও সমকক্ষ নেই, তবে তিনিই আল্লাহ যিনি ছাড়া সত্য কোনো মাবূদ নেই, তিনি তেমনই যেমন নিজেকে বিশেষিত করেছেন, আর তাঁর দুই হাত প্রশস্ত যেমনটি তিনি বর্ণনা দিয়েছেন: “অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত জমিন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে এবং আসমানসমূহ থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে।) [আয-যুমার: ৬৭] এমনিভাবে তিনি নিজেকে বিশেষিত করেছেন।” ইবনু আবি যামনিন, উসূলুস সুন্নাহ (পৃ.৭৫)
ইমাম হুমাইদী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “এবং যার বিবরণ দিয়েছে কুরআন ও হাদীস, যেমন: (আর ইয়াহুদীরা বলে, ‘আল্লাহর হাত রুদ্ধ’। তাদের হাতই রুদ্ধ করা হয়েছে।) [আল-মায়েদাহ: ৬৪] এবং যেমন: (এবং আকাশসমূহ তাঁর ডান হাতে ভাঁজ করা থাকবে।) [আয-যুমার: ৬৭] “কুরআন ও হাদীসে বর্ণিত এ জাতীয় আরো সিফাত এসেছে; আমরা তাতে বৃদ্ধি করব না এবং তার ব্যাখ্যাও দিব না, বরং কুরআন ও হাদীস যেখানে ক্ষান্ত হয়েছে আমরা সেখানেই ক্ষান্ত করব।” আয-যাহাবী, আল-উলুউ লিল আলীয়িল আযীম: (পৃ.১৬৮)
ইমাম আহমাদ বলেন, “আমরা আল্লাহর সিফাতের মাধ্যমে তাঁর ইবাদত করি, যেমনভাবে তিনি নিজেকে তা দ্বারা বিশেষিত করেছেন। তিনি নিজের নফসের জন্য সিফাতকে সংক্ষেপ করেছেন। এ ক্ষেত্রে আমরা কুরআন ও হাদীস লঙ্ঘন করি না। বরং তিনি যেমন বলেছেন আমরা তেমন বলি এবং তিনি নিজের নফসকে যেমনভাবে বিশেষিত করেছেন আমরা সেভাবে তাকে বিশেষিত করি এবং আমরা তা লঙ্ঘন করি না। আমরা স্পষ্ট ও অস্পষ্ট পুরো কুরআনের প্রতি ঈমান আনয়ন করি। আমরা কারো নিন্দা করার কারণে খারাপ ভেবে সম্মানিত ও সুউচ্চ আল্লাহর কোনো সিফাতকে অস্বীকার করি না। আল্লাহ নিজের নফসকে যা দ্বারা বিশেষিত করেছেন যেমন, কথা বলা, অবতরণ করা, কিয়ামতের দিন বান্দার সাথে একাকী হওয়া এবং তার পর্দা তার ওপর রেখে দেওয়াকে আমরা অস্বীকার করি না। এসব বিষয় প্রমাণ করে যে, আল্লাহকে আখিরাতে দেখা যাবে। এতে সীমা নির্দিষ্ট করা বিদআত। বরং আল্লাহর আদেশ-নিষেধসহ তাঁর নিকট আত্মসমর্পণ করি। আল্লাহ সর্বদাই কথা বলার গুণে গুণান্বিত, তিনি সবজান্তা, ক্ষমাশীল, দৃশ্য-অদৃশ্যের জ্ঞানের ধারক এবং সব গায়েব জানেন। এসব সিফাত দ্বারা আল্লাহ নিজেকে বিশেষিত করেছেন যা প্রত্যাখ্যান ও অস্বীকার করা যায় না। তিনি বলেছেন: (আল্লাহ্, তিনি ব্যতীত কোনো প্রকৃত ইলাহ্ নেই, তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক।) [আল-বাকারাহ: ২৫৫] (তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনিই অধিপতি, মহাপবিত্র, ক্রটিমুক্ত, নিরাপত্তা বিধায়ক, রক্ষক, পরাক্রমশালী, প্রবল, অতীব মহিমান্বিত।) [আল-হাশর: ২৩] এসব হলো আল্লাহর সিফাত এবং তাঁর নামসমূহ।” ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ আল-কুবরা (৭/৩২৬)
কিয়ামুস সুন্নাহ ইমাম আবূল কাসিমকে আল্লাহর সিফাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, “মালিক, সাওরী, আওযায়ী, শাফেয়ী, হাম্মাদ ইবন সালামাহ, হাম্মাদ ইবন জায়েদ, আহমাদ ইবনু হাম্বল, ইয়াহইয়া ইবনু সায়ীদ, আব্দুর রহমান ইবনু মাহদী, ইসহাক ইবনু রাহওয়াইহ প্রমূখের মাযহাব হলো: যেসব সিফাত দ্বারা আল্লাহ নিজেকে বিশেষিত করেছেন, কিংবা যেসব সিফাত দ্বারা তাঁর রাসূল তাকে বিশেষিত করেছেন, যেমন শোনা, দেখা, চেহারা, দুই হাত এবং তার অন্যান্য বিশেষণ তা পরিচিত প্রসিদ্ধ বাহ্যিক অর্থের ওপর রয়েছে, তবে তাতে যে আকৃতির ধারণা হয় সে ধারনা ব্যতীত এবং তার সাদৃশ্য বর্ণনা ও ভুল ব্যাখ্যা করা ছাড়া।” আয-যাহাবী, আল-উলুউ লিল আলীয়িল আযীম: (পৃ.২/৪৫৯)
তিনি আরও বলেন, “আমি আল্লাহর তাওফীকে আমাদের সালাফদের থেকে একদল ইমামদের উল্লেখ করছি, যারা আল্লাহর সিফাতের ক্ষেত্রে উক্ত অর্থের প্রতি স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাদের একজন হলেন, আবূ আব্দুল্লাহ সুফিয়ান ইবন সাঈদ ইবনু মাসরুক আস-সাউরী। তিনি তার মাযহাব ও বিশ্বাসকে একাধিক জায়গায় স্পষ্ট করেছেন এবং তারই ছাত্র শুআইব ইবনু হারবকে তা লিখিয়েছেন। আরেকজন হলেন, আবূ মুহাম্মাদ সুফিয়ান ইবনু উয়াইনাহ আল-হিলালী, তাকে যখন সিফাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো তিনিও অনুরূপ উত্তর দিয়েছেন। আর এটি বর্ণনা করেছেন মুহাম্মাদ ইবনু ইসহাক আস-সাকাফী। আরেকজন হলেন, শামবাসীদের ইমাম আবূ আমর আব্দুর রহমান ইবন আমর আল-আওযায়ী, তিনিও তার জমানায় স্বীয় বিশ্বাসকে স্পষ্ট করেছেন। আর এটি বর্ণনা করেছেন ইবনু ইসহাক ফাযারী। আরো হলেন, খুরাসানবাসীদের ইমাম আবূ আব্দুর রহমান ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক, ফুযাইল ইবনু ইয়ায, ওয়াকী ইবনুল জাররাহ, ইউসূফ ইবনু আসবাত। তারাও এ বিষয়ে সুন্নাহের উপর নিজ-নিজ মাযহাব ও বিশ্বাসকে স্পষ্ট করেছেন। আরো হলেন, শারীক ইবনু আব্দুল্লাহ আন-নাখয়ী, ইয়াহইয়া ইবনু সায়ীদ আল-কাত্তান এবং আবূ ইসহাক ফাযারী। আরেকজন হলেন, দারুল হিজরতের ইমাম ও হারামাইনের ফকীহ আবূ আব্দুল্লাহ মালিক ইবনু আনাস আল-আসবাহী আল-মাদানী। তিনিও ঈমান ও কুরআনের বিষয়ে নিজের আকীদাকে (বিশ্বাসকে) স্পষ্ট করেছেন। আরেকজন হলেন, নিজে যুগের ফকীহদের সরদার আবূ আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনু ইদরীস আশ-শাফেয়ী আল-মুত্তালিবী। আরো হলেন, আবূ উবাইদ আল-কাসিম ইবনু সালাম, নাযর ইবনু শুমাইল। আর কুরআন সৃষ্ট না অসৃষ্ট এ নিয়ে যখন ফেতনা সংঘটিত হয় তখন ইমাম শাফেয়ীর ছাত্র আবূ ইয়াকূব ইউসূফ ইবনু ইয়াহইয়া আল-বুওয়াইতী নিজের বিশ্বাসকে স্পষ্ট করেছেন। আরেকজন হলেন, স্বীয় জমানায় আহলুল হাদীসদের সরদার আবূ আব্দুল্লাহ আহমাদ ইবনু হাম্বল,... আর খুরাসানে যেসব আলিম ও ফকীহ ছিলেন তাদের ভেতর অন্যতম ছিলেন আবূ আহমাদ ইবনু আবি উসামাহ আল-কুরাশী আল-হারাওয়ী, তিনিও নিজের বিশ্বাস লিখিয়েছেন। তিনি বলেছেন: পরবর্তীদের ভেতর যাকে আল্লাহ হিদায়াত ও সুন্নাতের ইলম দ্বারা অনুগ্রহ করেছেন তাদের উচিত পূর্ববর্তী সৎকর্মশীলদের পথ অনুসরণ করা। আমাদের ও আমাদের আহলুল হাদীস ইমামদের মাযহাব হলো: আমরা বলি আল্লাহ এক তাঁর কোনো শরীক নেই, তাঁর কোনো সমকক্ষ নেই, তাঁর কোনো সাদৃশ্য নেই, তিনি অমুখাপেক্ষী ও এক ইলাহ, তিনি স্ত্রী ও সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তিনি স্বীয় বিধানে কাউকে শরীক করেননি।” আল-হুজ্জাহ ফি বায়ানিল মাহিজ্জাহ: (২/৫০৮)
তিনি আরো বলেন, “সিফাতের ক্ষেত্রে যেসব দলিল বর্ণিত হয়েছে তার ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত হলো: তার প্রতি ঈমান আনতে হবে এবং তার উপর আপত্তি করা যাবে না এবং সালাফগণ উদাহরণ ও অপ-ব্যাখ্যা ছাড়া যেভাবে তা চালিয়ে গেছেন (পড়েছেন) সেভাবে তা চালিয়ে নিতে হবে।” কিওয়ামুস সুন্নাহ, আত-তারগীব ওয়া আত-তারহীব: (১/২৫৩)
ইবনু কুতাইবা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সিফাতের এসব দলিলের ক্ষেত্রে ইনসাফপূর্ণ কথা হলো, নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের মাধ্যমে যা প্রমাণিত, আমরা তার প্রতি ঈমান আনয়ন করি। কাজেই আমরা আল্লাহর দর্শন, তাজাল্লী (নূরের ঝলক) এবং তিনি আশ্চর্য হন, দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন, তিনি আরশে ওঠেছেন এবং তাঁর নফস ও দুই হাতের প্রতি ঈমান আনয়ন করি, তবে তাতে আকৃতি নির্ধারণ করি না, অথবা সীমা নির্ধারণ করি না, অথবা বর্ণিত না হওয়া বিষয়কে বর্ণিত হওয়া বিষয়ের ওপর কিয়াস করি না। আশা করছি যে, সিফাতের ব্যাপারে এই কথা ও বিশ্বাস পোষণ করে পরকালে মুক্তি পাব, ইনশাআল্লাহ।” ইবনু কুতাইবাহ, আল-ইখতিলাফ ফিল লাফয ওয়ার রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ: (পৃ.৫৩)
ইমাম জুহুরী বলেন, “আল্লাহর জিম্মায় হলো ব্যাখ্যা করা, রাসূলেরর জিম্মায় হলো পৌঁছানো এবং আমাদের জিম্মায় হলো মেনে নেওয়া।” আল-হুজ্জাহ ফি বায়ানিল মাহিজ্জাহ (২/৫১২), আল-বাগাভী, শারহুস সুন্নাহ: (১/১৭১)
পর্ব: মালায়েকাদের প্রতি ঈমান
পর্বটির সারাংশ
আমরা মালায়েকা তথা ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আনয়ন করি এবং দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে, মালায়েকাদের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ঈমানের দ্বিতীয় রোকন।
মালায়েকাদের প্রতি ঈমান কয়েকটি অর্থকে অন্তর্ভুক্ত করে:
প্রথমটি হলো: তাদের অস্তিত্বের প্রতি ঈমান আনয়ন করা।
দ্বিতীয়টি হলো: তাদেরকে তাদের মর্যাদায় রাখা এবং এটা সাব্যস্ত করা যে, তারা মানুষ ও জিনের মত আল্লাহর বান্দা ও মাখলূক। তারা আদেশপ্রাপ্ত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত। আল্লাহ তাদেরকে যার ওপর ক্ষমতা দান করেন তা ছাড়া অন্য কিছুর তারা ক্ষমতা রাখেন না। তাদের ওপর মৃত্যু অবধারিত, তবে আল্লাহ তাদের জন্যে একটি দীর্ঘ সময় নির্ধারণ করেছেন। তারা সেই সময় পর্যন্ত না পৌঁছালো তাদেরকে তিনি মৃত্যু দেন না। তাদেরকে এমন কিছু দ্বারা বিশেষিত করা যাবে না যা দ্বারা বিশেষিত করলে সম্মানিত মহান আল্লাহর সাথে তাদেরকে শরীক করা হয়। তাদের ইলাহ ডাকা যাবে না। মুশরিকরা যেমনটি দাবি করেছিলো।
তৃতীয়টি হলো: স্বীকার করা যে, মালায়েকাদের ভেতর আল্লাহর কিছু রাসূল রয়েছেন, তিনি যাদেরকে মানুষদের থেকে যার নিকট ইচ্ছা প্রেরণ করেন। আবার এক ফেরেশতাকে আরেক ফেরেশতার নিকট প্রেরণ করাও ঠিক আছে। সেই সাথে এটাও স্বীকার করা যে, তাদের কেউ আরশ বহনকারী, কেউ কাতারবন্দী, কেউ জাহান্নামের জিম্মাদার, কেউ আমল লিপিবদ্ধকারী, কেউ মেঘমালা হাঁকান। আল-কুরআন তার সবকিছু কিংবা তার আধিাকাংশই উল্লেখ করেছে। শুআবুল ঈমান (১/২৯৬)
চতুর্থটি হলো: মালায়েকাদের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে ঈমান আনয়ন করা। আমরা মালায়েকাদের অস্তিত্বের প্রতি সংক্ষিপ্তভাবে ঈমান আনয়ন করি। আর কিতাব ও সুন্নাতে যাদের নাম, গুণাবলি ও কর্মসমূহ উল্লেখ হয়েছে তাদের প্রতি বিস্তারিতভাবে ঈমান আনয়ন করি।
আমরা মালায়েকাদের থেকে যাদেরকে জানি এবং যাদেরকে জানি না সবার প্রতি ঈমান আনয়ন করি। আমরা তাদের আমল ও গুণাবলীর প্রতি ঈমান আনয়ন করি। আমরা জানি যে, আমাদের থেকে তাদের যে সংখ্যা, আমল ও গুণাবলী গোপন রয়েছে তা আমরা যা জানি তার চেয়ে অনেক বেশী, তবে তাদের সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে যেভাবে সংবাদ দিয়েছেন আমরা তার সবকিছুর প্রতি সেভাবে ঈমান আনয়ন করি। আমরা তার আকৃতি তলব করি না, আমরা তা আমাদের বিবেক দ্বারা প্রত্যাখ্যান করি না, আমরা তা আমাদের চিন্তা দ্বারা ধারনা করি না এবং আমরা আমাদের গবেষণা দ্বারা তাতে ব্যাখ্যা করি না, বরং আমরা বলি: আমরা ঈমান এনেছি, সত্যায়ন করেছি ও মেনে নিয়েছি।
আমরা ইমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ মালায়েকাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারা আল্লাহর মাখলূকসমূহ হতে একপ্রকার মাখলূক। আল্লাহ তাদেরকে বিশেষ এক আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন, তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না। তারাও লালিত-পালিত বান্দা। তিনি তাদেরকে তাঁর ইবাদত ও তাঁর নির্দেশাবলি আঞ্জাম দেওয়ার জন্য সৃষ্টি করেছেন। তারা তাঁর ইবাদত করেন এবং তার ইবাদত থেকে অহংকার করেন না।
তাদের কতক ইবাদত হলো: তাসবীহ পাঠ করা, সাজদাহ করা, ভয় করা, ভীত হওয়া। তারা -অনেক ইবাদত করা সত্ত্বেও- তাদের রবকে খুব ভয় করেন। তাদের আরেকটি ইবাদত হলো: তারা আল্লাহর জন্য সম্পর্ক করেন এবং আল্লাহর জন্য মহব্বত করেন।
আমরা আরো ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাদেরকে এমন আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন যা তাদেরকে সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কেউ আয়ত্বে আনতে পারে না।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাদেরকে ডানা দিয়েছেন এবং তাদেরকে মানুষের আকৃতিতে নবী ও রাসূলগণ -আলাইহিমুস সালাম-এর নিকট আসতে অনুমতি দিয়েছেন। মুশরিকদের থেকে যারা মালায়েকাদের আল্লাহর মেয়ে ধারণা করে আল্লাহ তাদেরকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, মালায়েকাগণ খান না এবং পান করেন না, কারণ তাদের প্রবৃত্তি নেই। তাদের স্বভাবের একটি হলো লজ্জা করা এবং আদম সন্তান যে কারণে কষ্ট পায় তারাও সে কারণে কষ্ট পায়।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাদের ভেতর এমন ক্ষমতা ও শক্তি রেখেছেন যা আয়ত্বে আনা যায় না। মালায়েকাগণ অনেক, তাদের সংখ্যা তাদেরকে যিনি সৃষ্টি করেছেন তিনি ছাড়া কেউ আয়ত্বে আনতে পারে না।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন এবং তাদেরকে অনেক প্রকার গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক হলো: তারা আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মাঝে দূত হিসেেবে কাজ করেন এবং তাদের কাছে ওহী পৌঁছান। আল্লাহর নবী ও রাসূলগণের নিকট ওহী প্রেরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন জিবরীল আলাইহিস সালাম। আল্লাহ তাদেরকে নবী ছাড়া অন্যদের কাছেও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য প্রেরণ করেন।
মালায়েকাদের কিছু কাজ হলো: আরশ বহন করা, তাকদীর লিখা, রেহেম ও তার ভেতরে যা রয়েছে তদসংশ্লিষ্ট দায়িত্ব পালন করা -আকৃতি দান, রূহ ফুঁৎকারের দায়িত্ব আঞ্জাম দেওয়া-, বান্দাদের মৃত্যু ঘটানো, দুনিয়া ও আখিরাতে শরীরসমূহে রূহ ফুঁকে দেওয়া, মুমিনদের সাথে জিহাদ করা, মুমিনদের জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার করা, মুমিনদের ইবাদাতে হাজির হওয়া, তাদের পবিত্র কালিমাগুলো ওপরে তুলা এবং রবকে তাদের আমল সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া- যদিও রব সব খবর রাখেন ও জানেন, কোনো খবরদাতার খবরের মুখাপেক্ষী নন তিনি।
তাদের আরো কিছু কাজ হলো: ঈমানের মৌসুমসমূহে জমিনে নেমে আসা, যেমন জুমার দিন, আরাফার দিন ও কদরের রাতে।
তাদের আরেকটি দায়িত্ব হলো: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর প্রেরিত তার উম্মতের সালামসমূহ তাঁর নিকট পৌঁছানো।
তাদের আরো কিছু কাজ হলো: বনু আদমকে হিফাজত করা, ভালো ও খারাপ আমলসমূহ লিখা, দাজ্জাল থেকে মদীনাকে হিফাজত করা, মৃতদের কবরে প্রশ্ন করা, মুমিনদের মৃত্যুর সময় মহা সফলতার সুসংবাদ প্রদান করা, তাদেরকে পরকালে স্বাগত জানানো এবং জান্নাতের দরজাসমূহ দিয়ে তাদের কাছে প্রবেশ করা এবং তারা কিয়ামতের দিন কাতারে কাতারে আল্লাহর সাথে অবতরণ করবেন।
তাদের আরো কিছু দায়িত্ব হলো: তাদের কেউ আছেন জান্নাতের দায়িত্বশীল আবার কেউ আছেন জাহান্নামের দায়িত্বশীল।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ মালায়েকাদের জন্যে অনেক স্তর ও মর্যাদা নির্ধারণ করেছেন। মর্যাদার দিক থেকে সবচেয়ে বড় মালায়েকা হলো জিবরীল, মিকাঈল, ইসরাফীল। তাদের ভেতর বিশেষ সম্মানিত হলেন: আরশ বহনকারীগণ, অনুরূপভাবে যেসব মালায়েকা বদর যুদ্ধে হাজির হয়েছিলেন তারা। প্রত্যেক আসমানে অনেক মালায়েকা রয়েছেন, তাদের সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এসব মালায়েকার সবারই নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে এবং তাদের ভেতর অনেকে আছেন নৈকট্যপ্রাপ্ত।
অধ্যায়: মালায়েকাদের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব।
আমরা মালায়েকাদের প্রতি ঈমান আনয়ন করি এবং দৃঢ়ভাবে জানি যে, মালায়েকাদের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ঈমানের রোকনসমূহ হতে দ্বিতীয় রোকন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “রাসূল তার নিকট তার রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি ঈমান এনেছে, আর মুমিনগণও। প্রত্যেকে ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর মালায়েকা, কিতাবসমূহ ও তাঁর রাসূলগণের উপর।” [আল-বাকারাহ : ২৮৫] তিনি আরো বলেন, “ভালো কাজ শুধু এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভালো কাজ হল যে ব্যক্তি ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের উপরে।" [আল-বাকারাহ : ১৭৭] আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, একদিন রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, ঈমান কী? তিনি বললেন, ’“তুমি ঈমান আনয়ন করবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর মালায়িকাহ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর সাক্ষাত এবং তাঁর রাসূলগণের প্রতি এবং আরো ঈমান আনয়ন করবে পুনরুত্থানের প্রতি।” {বুখারী (৪৭৭৭), মুসলিম (৯), ইবনু মাজাহ (৬৪)}
ইমাম বায়হাকী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “মালায়েকাদের প্রতি ঈমান কয়েকটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে: এক: তাদের অস্তিত্বকে সত্যারোপ করা। দুই: তাদেরকে তাদের মর্যাদায় রাখা এবং সাব্যস্ত করা যে, তারা মানুষ ও জিনের মত আল্লাহর বান্দা ও মাখলূক। তারা আদেশপ্রাপ্ত ও দায়িত্বপ্রাপ্ত। আল্লাহর তাদেরকে যার ওপর ক্ষমতা দান করেন তা ছাড়া অন্য কিছুর ক্ষমতা তারা রাখে না। তাদের ওপর মৃত্যু বৈধ, তবে আল্লাহ তাদের জন্য একটি দীর্ঘ সময় নির্ধারণ করেছেন। তারা সেই পর্যন্ত না পৌঁছালে তাদেরকে মৃত্যু দেন না তিনি। তাদেরকে এমন কিছু দ্বারা বিশেষিত করা যাবে না যা দ্বারা বিশেষিত করলে তাদেরকে সম্মানিত মহান আল্লাহর সাথে শরীক করা হয়। পূর্বের কিছু লোকেরা যেমন তাদেরকে ইলাহ ডেকেছিল তেমন ডাকা যাবে না। (তারা ‘পূর্বের কিছু লোক’ বলে দার্শনিকদের উদ্দেশ্য করতেন।) তৃতীয়টি হলো: স্বীকার করা যে, তাদের ভেতরও আল্লাহর রাসূলগণ রয়েছেন। তিনি তাদেরকে মানুষদের থেকে যার নিকট ইচ্ছা প্রেরণ করেন। এক ফেরেশতাকে আরেক ফেরেশতার নিকট প্রেরণ করাও বৈধ। এটা স্বীকার করার অন্তর্ভুক্ত বিষয় এগুলোও যে, তাদের কতক আরশ বহনকারী রয়েছেন, কেউ কাতারবন্দী অবস্থায় আছেন, কেউ জাহান্নামের দায়িত্বে আছেন, কেউ আমল লিপিবদ্ধকারী রয়েছেন, কেউ মেঘমালাকে হাঁকিয়ে নিয়ে যান। এসব কিছু অথবা তার ধিাকাংশ কুরআনে উল্লেখ হয়েছে।” শুআবুল ঈমান (১/২৯৬)
অতএব, ইমাম বায়হাকী মালায়েকাদের প্রতি ঈমানের তিনটি অর্থ উল্লেখ করেছেন।
চতুর্থটি হলো: মালায়েকাদের প্রতি সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিতভাবে ঈমান আনয়ন করা। কাজেই আমরা মালায়েকাদের অস্তিত্বের প্রতি সংক্ষিপ্তভাবে ঈমান আনয়ন করি এবং কুরআন ও সুন্নাতে বর্ণিত তাদের নাম ও গুণাবলি যেভাবে আমরা জানতে পেরেছি সেভাবেই তাদের প্রতি বিস্তারিতভাবে ঈমান আনয়ন করি।
আমরা জানি যে, আমাদের কাছে তাদের যে সংখ্যা, আমল ও গুণাবলি গোপন রয়েছে তা আমরা যা জানি তার চেয়ে অনেক বেশী, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তাদের সম্পর্কে যেভাবে সংবাদ দিয়েছেন আমরা তার সবকিছুর প্রতি সেভাবে ঈমান আনয়ন করি, তার আকৃতি তলব করি না এবং আমরা আমাদের বিবেক দ্বারা তা প্রত্যাখ্যান করি না এবং আমাদের মতামত দিয়ে তা ধারণা করি না এবং আমাদের গবেষণা দ্বারা তাতে ব্যাখ্যা করি না, বরং আমরা বলি: আমরা ঈমান এনেছি, সত্যারোপ করেছি ও মেনে নিয়েছি।
অধ্যায়: মালায়েকাদের সৃষ্টি এবং তাদের অধিক সংখ্যা ও গুণাবলির বর্ণনা।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ মালায়েকাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মালায়েকাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে।” সহীহ মুসলিম: (২৯৯৬) তারা আল্লাহর মাখলূকসমূহ হতে এক প্রকার মাখলূক। তিনি তাদেরকে বিশেষ আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন, তবে তারা কেবলই রূহ নয় এবং কেবলই শক্তি নয়, বরং তারা অদৃশ্য একটি জগত এবং পালিত বান্দা। তিনি তাদেরকে তাঁর ইবাদত এবং তাঁর নির্দেশসমূহ আঞ্জাম দেওয়ার জন্য সৃষ্টি করেছেন। কাজেই তারা তাঁর ইবাদত করেন এবং তাঁর ইবাদত থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন না।
তাদের ইবাদত হলো: তাসবীহ পাঠ করা, সাজদা করা, ভয় করা, ভীত হওয়া প্রভৃতি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আল্লাহ তাদের যা নির্দেশ করেন সে বিষয়ে তারা তাঁর নাফরমানি করেন না, আর তাদের যা আদেশ করা হয় তাই করেন।” [আত-তাহরীম : ৬] তিনি আরও বলেন, “আর আল্লাহ্কেই সিজদা করে যা কিছু আছে আসমানসমূহে ও যমীনে, যত জীবজন্তু আছে সেসব এবং ফিরিশতাগণও, তারা অহংকার করে না।” [আন-নাহল: ৪৯] মহান আল্লাহ আরো বলেন, “আর আপনি ফেরেশতাদেরকে দেখতে পাবেন যে, তারা আরশের চারপাশে ঘিরে তাদের রবের সপ্ৰশংস পবিত্ৰতা ও মহিমা ঘোষণা করছে।” [আয-যুমার: ৭৫] তারা—তাদের এতো মহান ইবাদতসহ—তাদের রবকে অনেক ভয় করেন। আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন, “তারা ভয় করে তাদের উপরস্থ তাদের রবকে এবং তাদেরকে যা আদেশ করা হয় তারা তা-ই করে।” [আন-নাহল: ৫০]
তাদের আরো ইবাদত হলো: তারা আল্লাহর জন্য সম্পর্ক কায়েম করেন এবং আল্লাহর জন্য ভালোবাসেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ যখন কোনো বান্দাকে ভালোবাসেন, তখন তিনি জিবরীলকে ডেকে বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা অমুককে ভালবাসেন, অতএব তুমিও তাকে ভালোবাস।’ ফলে জিবরীলও তাকে ভালোবাসেন। অতঃপর তিনি আকাশবাসীদের মধ্যে ঘোষণা করে দেন যে, ‘আল্লাহ অমুক বান্দাকে ভালোবাসেন। কাজেই তোমরাও তাকে ভালবাসো।’ তখন আকাশবাসীরা তাকে ভালোবাসে। অতঃপর যমীনেও তার জন্য কবুলিয়্যাত রেখে দেওয়া হয়।” {বুখারী: (৩২০৯), মুসলিম (২৬৩৭), তিরমিযী (৩১৬১)} তারা আল্লাহর জন্য ঘৃণা ও গোস্বা করেন এবং আল্লাহর হারামসমূহের ওপর তিরস্কার করেন এবং আল্লাহ যাকে লানত করেছেন তারা তাকে লানত করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয়ই যারা কুফরী করেছে এবং কাফের অবস্থায় মারা গেছে, তাদের উপর আল্লাহ্, ফেরেশতাগণ ও সকল মানুষের লা'নত।” [আল-বাকরা: ১৬১] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “মালায়েকা সে ঘরে প্রবেশ করে না, যে ঘরে কুকুর ও ছবি রয়েছে।” মুসলিম: (২১১২)
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাদেরকে বিশেষ এক আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন যা তাদের স্রষ্টা ছাড়া কেউ আয়ত্ত করতে পারে না। জাবির বিন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আরশ বহনকারী আল্লাহর মালায়েকাদের থেকে একজন ফেরেশতা সম্পর্কে বর্ণনা দিতে আমাকে বলা হয়েছে—তার কানের লতি থেকে ঘাড় পর্যন্তের দূরত্ব হলো সাতশত বছরের রাস্তা।” {আবূ দাউদ (৪৭২৭), ইবনু তাহমান, আল-মাশিখাহ (২১), তাবারানী, আল-আওসাত (১৭০৯), আবূশ শায়খ, আল-আযামাহ (৩১৩)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের জন্য ডানা সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যিনি রাসূল করেন ফিরিশতাদেরকে যারা দুই দুই, তিন তিন অথবা চার চার পক্ষবিশিষ্ট। তিনি সৃষ্টিতে যা ইচ্ছে বৃদ্ধি করেন।” [ফাতির : ১] আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, “মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম জিবরীলকে ছয়শত পাখা বিশিষ্ট দেখেছেন।” {বুখারী: (৪৮৫৭), মুসলিম (১৭৪), তিরমিযী (৩২৭৭)} আর তাদেরও অন্তর রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, “অবশেষে যখন তাদের অন্তর থেকে ভয় বিদূরিত হয়, তখন তারা পরস্পরের মধ্যে জিজ্ঞাসাবাদ করে, 'তোমাদের রব কী বললেন?' তার উত্তরে তারা বলে, যা সত্য তিনি তা-ই বলেছেন' আর তিনি সমুচ্চ, মহান।” [সাবা: ২৩]
আল্লাহ তা‘আলা মালায়েকাদের নবী ও রাসূলদের নিকট মানুষের আকৃতিতে আগমন করার অনুমতি দিয়েছেন। ফলে তারা ইবরাহীম ও লূত আলাইহিমাস সালামদের নিকট মেহমানের সুরতে এসেছেন যে, তারা তাদেরকে চিনতে পারেননি। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, “আপনার কাছে ইবরাহীমের সম্মানিত মেহমানদের বৃত্তান্ত এসেছে কি?* যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হয়ে বলল, ‘সালাম’। উত্তরে তিনি বললেন, ‘সালাম’। এরা তো অপরিচিত লোক।” [আয-যারিয়াত: ২৪,২৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “আর যখন আমাদের প্রেরিত ফিরিশতাগণ লূতের কাছে আসল তখন তাদের আগমনে তিনি বিষণ্ণ হলেন এবং নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করলেন এবং বললেন ‘এটা বড়ই বিপদের দিন।” [হূদ: ৭৭] জিবরীল আলাইহিস সালাম মারইয়াম আলাইহাস সালামের নিকট এমন সুরতে এসছেন প্রথম ধাপে তাকে তিনি চিনতে পারেননি। যেমনটি আল্লাহ তা‘আলা নিম্নের বাণীতে বর্ণনা করেছেন: “তখন আমি তার কাছে আমার রূহকে পাঠালাম, সে তার নিকট পূর্ণ মানবাকৃতিতে আত্মপ্রকাশ করল।* সে বলল, আমি তোমার থেকে দয়াময়ের আশ্রয় প্রার্থনা করছি, (আল্লাহ্কে ভয় কর) যদি তুমি ‘মুত্তাকী’ হও।” [মারইয়াম: ১৭-১৯] ইবনু ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “আর জিবরীল আলাইহিস সালাম নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট দিহয়ার সুরতে আসতেন।” {আহমাদ, আল-মুসনাদ (৫৮৫৭), মুহাম্মাদ ইবন নাসর আল-মারওয়াজী, তা‘জীমু কাদরিস সালাত (৩৭২), ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (৮৩১)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, মালায়েকাগণ খান না ও পান করেন না; কারণ তাদের কোনো প্রবৃত্তি নেই। এ কারণে তারা যখন ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কাছে এসেছিলেন এবং তিনি তাদের জন্য খাবার পেশ করলেন, তারা খায়নি। আল্লাহ তাআলা সেই ঘটনার সংবাদ দিয়ে বলেন, “অতঃপর ইবরাহীম তার স্ত্রীর কাছে দ্রুত চুপিসারে গেলেন এবং একটি মোটা-তাজা গো-বাছুর (ভাজা) নিয়ে আসলেন,* অতঃপর তিনি তা তাদের সামনে রেখে বললেন, ‘তোমরা কি খাবে না?’* এতে তাদের সম্পর্কে তার মনে ভীতির সঞ্চার হল। তারা বলল, ‘ভীত হবেন না।’ আর তারা তাকে এক জ্ঞানী পুত্ৰ সন্তানের সুসংবাদ দিল।” [আয-যারিয়াত: ২৬-২৮] তাদের একটি স্বভাব হলো লজ্জা করা। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “মালায়েকাগণ যার থেকে লজ্জা করেন, তোমরা কী তার থেকে লজ্জা করবে না?” মুসলিম: (২৪০১)
আর মানুষেরা যা থেকে কষ্ট পায় তারাও তা থেকে কষ্ট পায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে এ জাতীয় গাছ (রসুন) খেল, তিনি কখনো বলেছেন, পেঁয়াজ, রসুন ও দুর্গন্ধযুক্ত কিছু খেল, সে আমাদের মসজিদের কাছে আসবে না। কারণ, মানুষেরা যা থেকে কষ্ট পায় মালায়েকারাও তা থেকে কষ্ট পায়।” {বুখারী (৮৫৪), মুসলিম (৫৬৪), হাদিসের শব্দ সহীহ মুসলিম থেকে গৃহীত, আবূ দাউদ (৩৮২২), তিরমিযী (১৮০৬), নাসাঈ (৭০৭), ইবনু মাজাহ (৩৩৬৫)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের ভেতর এমন শক্তি ও ক্ষমতা রেখেছেন যা আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যে সামর্থ্যশালী, আরশের মালিকের কাছে মর্যাদাসম্পন্ন।” [আত-তাকভীর: ২০] মহা সম্মানিত আল্লাহ আরো বলেন, “যেখানে নিয়োজিত আছে নির্মম-কঠোর ফেরেশতাগণ, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন তা তারা অমান্য করে না। আর তারা যা করতে আদেশপ্ৰাপ্ত হয় তা-ই করে।” [আত-তাহরীম : ৬] আল্লাহ লূতের কওমের জনপদে -যা ছিল সাতটি গ্রামের সমন্বয়ে- একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেছিলেন। সে ঐ জনপদকে তাদের উপর উল্টিয়ে দেয়। এ মর্মে আল্লাহ বলেন, “অতঃপর যখন আমার আদেশ আসল তখন আমি জনপদকে উল্টে দিলাম এবং তাদের উপর ক্রমাগত বর্ষণ করলাম পোড়ামাটির পাথর।” [হূদ: ৮২]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, মালায়েকাগণ অনেক। যিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তিনি ছাড়া কেউ তাদের সংখ্যা আয়ত্তে আনতে পারে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার জন্য বায়তুল মামূরকে উম্মোচন করা হলো। আমি জিবরীলকে জিজ্ঞাসা করলাম, ফলে তিনি বললেন, এটি হলো বায়তুল মা‘মূর। প্রতিদিন এখানে সত্তর হাজার মালায়েকা সালাত আদায় করেন। এরা এখান হতে একবার বাহির হলে দ্বিতীয়বার ফিরে আসেন না। এটাই তাদের শেষ প্রবেশ। .. “ {বুখারী (৩২০৭), মুসলিম (১৬৪), তিরমিযী (৩৩৪৬), নাসাঈ (৪৪৮)}
আবূ যার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমি (অদৃশ্য জগতের) যা দেখি তোমরা তা দেখ না, আর আমি যা শুনতে পাই তোমরা তা শুনতে পাও না। আসমান তো চড়চড় শব্দ করছে, আর সে এই শব্দ করার যোগ্য। তাতে এমন চার আঙ্গুল পরিমাণ জায়গাও নেই যেখানে কোন ফিরিশতা আল্লাহ্ তা’আলার জন্য অবনত মস্তকে সাজদায় পড়ে না আছে।” {তিরমিযী (২৩১২), ইবনু মাজাহ (৪১৯০), ইবনু আবি শায়বাহ (২৭০৪৪), আহমাদ (২১৫১৬), বাযযার (৩৯২৪,৩৯২৫)}
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কিয়ামতের দিন জাহান্নামকে নিয়ে আসা হবে। সেদিন তার সত্তর হাজার লাগাম থাকবে। প্রতিটি লাগামের সাথে থাকবে সত্তর হাজার ফিরিশতা। তারা তা টেনে নিয়ে যাবে।” {মুসলিম: (২৮৪২), তিরমিযী: (২৫৭৩)}
মুশরিকরা মিথ্যা দাবি করে যে, মালায়েকাগণ হচ্ছে আল্লাহর কন্যা। আল্লাহ নিম্নের বাণীতে তাদেরকে মিথ্যা সাব্যস্ত করেছেন: “অথবা আমরা কি ফেরেশতাদেরকে নারীরূপে সৃষ্টি করেছিলাম আর তারা দেখেছিল?” [আস-সাফফাত: ১৫০] তিনিএই বাণী দ্বারা তাদের কথার প্রতিবাদ করেছেন: “তোমাদের রব কি তোমাদেরকে পুত্র সন্তানের জন্য নির্বাচিত করেছেন এবং তিনি নিজে কি ফিরিশতাদেরকে কন্যারুপে গ্রহণ করেছেন? তোমরা তো নিশ্চয়ই ভয়ানক কথা বলে থাক!” [আল-ইসরা: ৪০]
অধ্যায়: মালায়েকাদের কর্মসমূহ।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাদেরকে সম্মানিত করেছেন এবং তাদেরকে অনেক প্রকার বড় ও গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো: তারা আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মাঝে দূত হিসেবে কাজ করেন এবং তাদের কাছে ওহী পৌঁছান। আল্লাহর নবী ও রাসূলগণের নিকট ওহী প্রেরণের দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেন জিবরীল আলাইহিস সালাম। যেমন মহান আল্লাহ বলেছেন, “বলুন, ‘আপনার রবের কাছ থেকে রূহুল কুদুস- জিবরীল- যথাযথভাবে একে নাযিল করেছেন।” [আন-নাহল: ১০২] তিনি আরো বলেন, “আর নিশ্চয় এটা (আল-কুরআন) সৃষ্টিকুলের রব হতে নাযিলকৃত।* বিশ্বস্ত রূহ (জিবরাঈল) তা নিয়ে নাযিল হয়েছেন।* আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।* সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়।” [আশ-শু‘আরা : ১৯২-১৯৫]
আল্লাহ তা‘আলা কখনো মালায়েকাদেরকে যারা নবী নয় তাদের কাছেও পরীক্ষাস্বরূপ প্রেরণ করেন। যেমনটি বনু ইসরাইলের তিন ব্যক্তির ঘটনায় রয়েছে। আব্দুর রহমান ইবনু আবূ আমরাহ থেকে বর্ণিত, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেছেন যে, তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসামকে বলতে শুনেছেন, “বানী ইসরাইলের তিনজন লোক ছিল। তাদের একজন শ্বেতরোগী, একজন মাথায় টাকওয়ালা, আর একজন অন্ধ। মহান আল্লাহ তাদেরকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। কাজেই, তিনি তাদের নিকট একজন ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতা প্রথমে শ্বেত রোগীটির নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নিকট কোন্ জিনিস অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, সুন্দর রং ও সুন্দর চামড়া। কেননা, মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। ফেরেশতা তার শরীরের উপর হাত বুলিয়ে দিলেন। ফলে তার রোগ সেরে গেল। তাকে সুন্দর রং এবং সুন্দর চামড়া দান করা হল। অতঃপর ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ ধরনের সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, ’উট’, অথবা সে বলল, ’গরু’। এ ব্যাপারে বর্ণনাকারীর সন্দেহ রয়েছে যে, শ্বেতরোগী না টাকওয়ালা, দু’জনের একজন বলেছিল ’উট’ আর অপরজন বলেছিল ’গরু’। অতএব তাকে একটি দশ মাসের গর্ভবতী উটনী দেয়া হল। তখন ফিরশতা বললেন, ’’এতে তোমার জন্য বরকত হোক।’’ বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা টাকওয়ালার নিকট গেলেন এবং বললেন, তোমার নিকট কী জিনিস পছন্দনীয়? সে বলল, সুন্দর চুল এবং আমার হতে যেন এ রোগ চলে যায়। মানুষ আমাকে ঘৃণা করে। বর্ণনাকারী বলেন, ফেরেশতা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন এবং তৎক্ষণাৎ মাথার টাক চলে গেল। তাকে সুন্দর চুল দেয়া হল। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, ’গরু’। অতঃপর তাকে একটি গর্ভবতী গাভী দান করলেন, এবং ফেরেশতা দু’আ করলেন, এতে তোমাকে বরকত দান করা হোক। অতঃপর ফেরেশতা অন্ধের নিকট আসলেন এবং তাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ জিনিস তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে বলল, আল্লাহ্ যেন আমার চোখের জ্যোতি ফিরিয়ে দেন, যাতে আমি মানুষকে দেখতে পারি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তখন ফেরেশতা তার চোখের উপর হাত ফিরিয়ে দিলেন, তৎক্ষণাৎ আল্লাহ্ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন। ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, কোন্ সম্পদ তোমার নিকট অধিক প্রিয়? সে জবাব দিল, ’ছাগল’। তখন তিনি তাকে একটি গর্ভবতী ছাগী দিলেন। উপরে উল্লেখিত লোকদের পশুগুলো বাচ্চা দিল। ফলে একজনের উটে ময়দান ভরে গেল, অপরজনের গরুতে মাঠ পূর্ণ হয়ে গেল এবং আর একজনের ছাগলে উপত্যকা ভরে গেল। অতঃপর ঐ ফেরেশতা তার আকৃতি ও প্রকৃতি ধারণ করে শ্বেতরোগীর নিকট এসে বললেন, আমি একজন নিঃস্ব ব্যক্তি; আমার সফরের সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ আমার গন্তব্য স্থানে পৌঁছার জন্য আল্লাহ্ অতঃপর তুমি ব্যতীত কোন উপায় নেই। আমি তোমার নিকট ঐ সত্তার নামে একটি উট চাচ্ছি, যিনি তোমাকে সুন্দর রং, কোমল চামড়া এবং সম্পদ দান করেছেন। আমি এর উপর সাওয়ার হয়ে আমার গন্তব্যে পৌঁছাব। তখন লোকটি তাকে বলল, আমার উপর বহু হক ও দায়িত্ব রয়েছে। তখন ফেরেশতা তাকে বললেন, সম্ভবত আমি তোমাকে চিনি। তুমি কি এক সময় শ্বেতরোগী ছিলে না? মানুষ তোমাকে ঘৃণা করত। তুমি কি ফকীর ছিলে না? অতঃপর আল্লাহ্ তা’আলা তোমাকে দান করেছেন। তখন সে বলল, আমি তো এ সম্পদ আমার পূর্বপুরুষ হতে ওয়ারিশ সূত্রে পেয়েছি। ফেরেশতা বললেন, তুমি যদি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ্ তোমাকে সেরূপ করে দিন, যেমন তুমি ছিলে। অতঃপর ফেরেশতা মাথায় টাকওয়ালার নিকট তার সেই বেশভূষা ও আকৃতিতে গেলেন এবং তাকে ঠিক তেমনই বললেন, যেরূপ তিনি শ্বেতরোগীকে বলেছিলেন। এও তাকে ঠিক অনুরূপ জবাব দিল যেমন জবাব দিয়েছিল শ্বেতরোগী। তখন ফেরেশতা বললেন, যদি তুমি মিথ্যাচারী হও, তবে আল্লাহ্ তোমাকে তেমন অবস্থা করে দিন, যেমন তুমি ছিলে। শেষে ফেরেশতা অন্ধ লোকটির নিকট তাঁর আকৃতিতে আসলেন এবং বললেন, আমি একজন নিঃস্ব লোক, মুসাফির মানুষ; আমার সফরের সকল সম্বল শেষ হয়ে গেছে। আজ বাড়ি পৌঁছার ব্যাপারে আল্লাহ্ অতঃপর তুমি ব্যতীত কোন গতি নেই। তাই আমি তোমার নিকট সেই সত্তার নামে একটি ছাগী প্রার্থনা করছি যিনি তোমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আর আমি এ ছাগীটি নিয়ে আমার এ সফরে বাড়ি পৌঁছতে পারব। সে বলল, প্রকৃতপক্ষেই আমি অন্ধ ছিলাম, আল্লাহ্ আমার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমি ফকীর ছিলাম, আল্লাহ্ আমাকে সম্পদশালী করেছেন। এখন তুমি যা চাও নিয়ে যাও। আল্লাহর কসম! আল্লাহর জন্য তুমি যা কিছু নিবে, তার জন্যে আজ আমি তোমার নিকট কোন প্রশংসাই দাবী করব না। তখন ফেরেশতা বললেন, তোমার সম্পদ তুমি রেখে দাও। তোমাদের তিন জনের পরীক্ষা নেয়া হল মাত্র। আল্লাহ্ তোমার উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন আর তোমার সাথীদ্বয়ের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন।” {বুখারী (৩৪৬৪), মুসলিম (২৯৬৪)}
মালায়েকাদের কেউ কেউ আরশ বহনকারী। আল্লাহ বলেন, “আর মালায়েকাগণ আসমানের প্রান্তদেশে থাকবে এবং সেদিন আটজন মালায়েকা আপনার রবের ‘আরশকে ধারণ করবে তাদের উপরে।” [আল-হাক্কাহ: ১৭]
তাদের কিছু কর্ম হলো: তাকদীর লিপিবদ্ধ করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। ঐভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। অতঃপর তা গোশতপিন্ডে পরিণত হয়ে (আগের মত চল্লিশ দিন) থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। আর তাকে চারটি বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়। তাকে লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তার ‘আমল, তার রিয্ক, তার আয়ু এবং সে কি পাপী হবে না নেককার হবে।” {বুখারী (৩২০৮), মুসলিম (২৬৪৩), আবূ দাউদ (৪৭০৮), তিরমিযী (২১৩৭), ইবনু মাজাহ (৭৬)}
তাদের আরো কিছু কর্ম হলো: মাতৃগর্ভ এবং তাতে যা রয়েছে সে বিষয়ে দায়িত্ব পালন করা—গঠন ও আকৃতি দান এবং তাতে রূহ ফুঁকে দেওয়া—। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যখন (মাতৃগর্ভে) শুক্ৰকীটের উপর বিয়াল্লিশ দিন চলে যায় তখন আল্লাহ তা’আলা একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। তিনি ওটাকে (শুক্রকে) একটি রূপ দান করে, তার কান, চোখ, চামড়া, গোশত ও হাড় সৃষ্টি করে দেয়। তারপর ফেরেশতা বলে, হে আমার রব! সেটা কি পুরুষ, না মহিলা হবে? তখন তোমার প্রভু যা চান সিদ্ধান্ত দেন এবং ফেরেশতা আদেশ অনুসারে তা লিখে ফেলেন। তারপর সে বলতে থাকে, হে আমার রব! তার মৃত্যুক্ষণ কত হবে? তখন তোমার রব যা চান তাই বলেন এবং সে অনুযায়ী ফেরেশতা লিখেন।” মুসলিম: (২৬৪৫)
আনাস রাদিয়াল্লাহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ্ মাতৃগর্ভে একজন ফেরেশতা নিযুক্ত করেছেন। তিনি বলেন, হে প্রতিপালক! এটি বীর্য। হে প্রতিপালক! এটি রক্তপিন্ড। হে প্রতিপালক! এটি গোশতপিন্ড। আল্লাহ্ যখন তার সৃষ্টি পূর্ণ করতে চান, তখন ফেরেশতা বলে, হে প্রতিপালক! এটি নর হবে, না নারী? এটি দুর্ভাগা হবে, না ভাগ্যবান? তার রিযক্ কী পরিমাণ হবে? তার জীবনকাল কী হবে? তখন (আল্লাহর নির্দেশমত) তার মায়ের পেটে থাকাকালে ঐ রকমই লিখে দেয়া হয়।” {বুখারী (৬৫৯৫), মুসলিম (২৬৪৬)}
তাদের আরো কিছু কাজ হলো: বান্দাদের রূহ কবজ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ّ“অবশেষে তোমাদের কারও যখন মৃত্যু উপস্থিত হয় তখন আমার রাসূল (ফিরিশতা)গণ তার মৃত্যু ঘটায় এবং তারা কোনো ত্রুটি করে না।" [আল-আনআম: ৬১] আল্লাহ আরো বলেন, “সুতরাং কেমন হবে তাদের দশা ! যখন ফেরেশতারা তাদের চেহারা ও পৃষ্ঠাদেশে আঘাত করতে করতে প্ৰাণ হরণ করবে।” [মুহাম্মাদ: ২৭]
তাদের কর্মের অন্তর্ভুক্ত হলো: দুনিয়া ও আখিরাতে শরীরে রূহ ফুঁকে দেওয়া। রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “নিশ্চয় তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টির উপাদান নিজ নিজ মায়ের পেটে চল্লিশ দিন পর্যন্ত বীর্যরূপে অবস্থান করে, অতঃপর তা জমাট বাঁধা রক্তে পরিণত হয়। ঐভাবে চল্লিশ দিন অবস্থান করে। অতঃপর তা গোশতপিন্ডে পরিণত হয়ে (আগের মত চল্লিশ দিন) থাকে। অতঃপর আল্লাহ একজন ফেরেশতা প্রেরণ করেন। আর তাঁকে চারটি বিষয়ে আদেশ দেয়া হয়। তাঁকে লিপিবদ্ধ করতে বলা হয়, তার ‘আমল, তার রিয্ক, তার আয়ু এবং সে কি পাপী হবে না নেককার হবে। অতঃপর তার মধ্যে আত্মা ফুঁকে দেয়া হয়।” {বুখারী : (৩২০৮), মুসলিম (২৬৪৩), আবূ দাউদ (৪৭০৮), তিরমিযী (২১৩৭), ইবনু মাজাহ (৭৬)} আর আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তারপর আবার শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে তৎক্ষণাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।” [আয-যুমার: ৬৮]
তাদের কর্মের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে: মুমিনদের পক্ষে জিহাদ করা এবং যুদ্ধের ময়দানে ও জীবন যুদ্ধে মুমিনদের দৃঢ় রাখা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফিরিশতাদের প্রতি ওহী প্রেরণ করেন যে, ‘নিশ্চয় আমি তোমাদের সাথে আছি, সুতরাং তোমরা মুমিনদেরকে অবিচল রাখ’। যারা কুফরী করেছে অচিরেই আমি তাদের হৃদয়ে ভীতির সঞ্চার করব; কাজেই তোমরা আঘাত কর তাদের ঘাড়ের উপরে এবং আঘাত কর তাদের প্র্যত্যক আঙ্গুলের অগ্রভাগে।” [আল-আনফাল: ১২] তাছাড়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আদম সন্তানের প্রতি শয়তানের এক স্পর্শ রয়েছে এবং ফেরেশতারও এক স্পর্শ রয়েছে। শয়তানের স্পর্শ হচ্ছে মন্দ কাজের প্ররোচনা দান ও সত্যকে অস্বীকার করার। ফেরেশতার স্পর্শ হচ্ছে কল্যাণের কাজে উৎসাহিত করা এবং সত্যকে স্বীকার করার। কাজেই যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে এরূপ নেকীর স্পর্শ অনুভব করে সে যেন জ্ঞাত হয় যে, এটা আল্লাহ তা’আলার পক্ষ হতে এবং এজন্য সে যেন আল্লাহর প্রতি শুকরিয়া আদায় করে। আর কেউ নিজের মধ্যে এর বিপরীত স্পর্শ উপলব্ধি করলে সে যেন তখন শয়তান হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় চায়। তারপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিম্নোক্ত আয়াত তিলাওয়াত করেনঃ (لشَّيْطَانُ يَعِدُكُمُ الْفَقْرَ وَيَأْمُرُكُم بِالْفَحْشَاء) “শাইতান তোমাদেরকে দারিদ্র্যের ভয় দেখায় এবং অশ্লীল কাজের নির্দেশ দেয়।"- (সূরা বাকারাহ: ২৬৮)।” {তিরমিযী (২৯৮৮), ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ (১৪৩৫), আহমাদ, আয-যুহদ (৮৫৪), আবূ দাউদ, আয-যুহদ (১৬৪)}
তাদের আরেকটি দায়িত্ব হলো, মুমিনদের জন্য দোয়া ও ইস্তেগফার করা। আল্লাহ বলেন, “যারা ‘আরশ ধারণ করে আছে এবং যারা এর চারপাশে আছে, তারা তাদের রবের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে প্ৰশংসার সাথে এবং তাঁর উপর ঈমান রাখে, আর মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে বলে, 'হে আমাদের রব! আপনি দয়া ও জ্ঞান দ্বারা সবকিছুকে পরিব্যাপ্ত করে রেখেছেন। অতএব যারা তাওবা করে এবং আপনার পথ অবলম্বন করে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করুন। আর জাহান্নামের শাস্তি হতে আপনি তাদের রক্ষা করুন।” [গাফের (মু‘মিন): ৭]
তাদের আরো দায়িত্ব হলো: ঈমান ও কল্যাণের মৌসুমে এবং উত্তম সময়গুলোতে মুমিনদের ইবাদত পর্যবেক্ষণ করা, যেমন আরাফার দিন, জুমার দিন, লাইলাতুল কদর এবং ফজর ও আসরের সালাতে এবং তাদের পবিত্র বাক্যগুলো ওপড়ে উঠানো এবং রবকে তাদের আমল সম্পর্কে সংবাদ দেওয়া -যদিও তিনি সবজান্তা ও পর্যবেক্ষণকারী, তিনি কোনো সংবাদদাতার সংবাদের মুখাপেক্ষী নন-। মহা সম্মানিত আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর ফজরের কুরআন পাঠ; নিশ্চয় ফজরের কুরআন পাঠ উপস্থিতির সময়।” [আল-ইসরা : ৭৮] তিনি আরো বলেন, “সে রাতে ফিরিশতাগণ ও রূহ্ নাযিল হয় তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে।” [আল-কাদর: ৪]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ফেরেশতাগণ পালা বদল করে তোমাদের মাঝে আগমন করেন; একদল দিনে, একদল রাতে। ‘আসর ও ফজরের সালাতে উভয় দল একত্র হন। অতঃপর তোমাদের মাঝে রাত যাপনকারী দলটি উঠে যান। তখন তাদের প্রতিপালক তাদের জিজ্ঞেস করেন, আমার বান্দাদের কোন্ অবস্থায় রেখে আসলে? অবশ্য তিনি নিজেই তাদের ব্যাপারে সর্বাধিক অবগত। উত্তরে তারা বলেন, আমরা তাদের সালাতে রেখে এসেছি, আর আমরা যখন তাদের নিকট গিয়েছিলাম তখনও তারা সালাত আদায়রত অবস্থায় ছিলেন।” {বুখারী: (৫৫৫), মুসলিম: (৬৩২), নাসাঈ: (৪৮৫)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “আল্লাহর একদল ফেরেশতা আছেন, যারা আল্লাহর যিকিররত লোকেদের খোঁজে পথে পথে ঘুরে বেড়ান। যখন তারা কোথাও আল্লাহর যিকররত লোকদের দেখতে পান, তখন ফেরেশতারা পরস্পরকে ডাক দিয়ে বলেন, তোমরা আপন আপন কাজ করার জন্য এগিয়ে এসো। তখন তারা তাদের ডানাগুলো দিয়ে সেই লোকদের ঢেকে ফেলেন নিকটবর্তী আকাশ পর্যন্ত।” {বুখারী (৬৪০৮), মুসলিম (২৬৮৯)}
মালায়েকাগণ বিশেষ বিশেষ ইবাদতের মৌসুমগুলোতে হাজির হন, যেমন জুমার দিন, আরাফার দিন এবং লাইলাতুল কদরে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যখন ইমাম বের হন, তখন মালায়েকাগণ যিকির শুনতে উপস্থিত হন।” {বুখারী (৮৮১), মুসলিম (৮৫০), আবূ দাউদ (৩৫১), তিরমিযী (৪৯৯), নাসাঈ (১৩৮৮)}
তাদের আরো কিছু কাজ হলো, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে তার উম্মতের সালাত ও সালাম পেশ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আর তোমরা আমার ওপর সালাত পাঠ কর, কারণ তোমরা যেখানেই থাক তোমাদের সালাত আমার নিকট পৌঁছে।” {আবূ দাউদ (২০৪), আহমাদ (৮৮০৪), তাবারানী, আল-আওসাত (৮০৩০), বায়হাকি, শুআবুল ঈমান (৩৮৬৫)}
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, “নিশ্চয় জমিনে আল্লাহর কিছু বিচরণকারী মালায়েকা রয়েছেন, তারা আমার উম্মতের পক্ষ থেকে আমার নিকট সালাম পৌঁছায়।” {নাসাঈ (১২৮২), আব্দুর রাজ্জাক, আল-মুসান্নাফ (৩১১৬), ইবনু আবি শায়বাহ, আল-মুসান্নাফ (৮৭৯৭) এবং আল-মুসনাদ (২৬৯), আহমাদ (৩৬৬৬)}
তাদের আরেকটি দায়িত্ব হলো, বনু আদমকে সুরক্ষা দেওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর মানুষের জন্য রয়েছে তার সামনে এবং পিছনে একের পর এক আগমনকারী প্রহরীগণ, তারা আল্লাহর আদেশে তাকে হিফাজত করে।” [আর-রা‘দ: ১১] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা সূত্রে আলী ইবনু তালহা বলেন, “মুআক্কিবাত” হলো: “আল্লাহর নির্দেশের অংশবিশেষ, আর তা হলো মালায়েকাগণ।” {তাবারানী, আত-তাফসীর (১৩/৪৬৩), ইবনু আবি হাতীম, আত-তাফসীর (১২১৯৮)}
তাদের আরেকটি দায়িত্ব হলো, ভালো-মন্দ কৃতকর্ম লিপিবদ্ধ করা। মহান আল্লাহ বলেন: “সম্মানিত লেখকবৃন্দ।” [আল-ইনফিতার: ১১] তিনি আরো বলেন, “যখন তার ডানে ও বামে বসা দু’জন ফেরেশতা পরস্পর (তার আমল লিখার জন্য) গ্ৰহণ করে;* সে যে কথাই উচ্চারণ করে তার কাছে সদা উপস্থিত সংরক্ষণকারী রয়েছে।” [ক্ব-ফ: ১৭-১৮] তিনি আরো বলেছেন, “এবং তিনি তোমাদের উপর প্রেরণ করেন হেফাজতকারীদেরকে।” [আল-আনআম: ৬১] আল্লাহ তা‘আলা তাদের বিষয়ে আরো বলেন, “নাকি তারা মনে করে যে, আমি তাদের গোপন বিষয় ও মন্ত্রণা শুনতে পাই না? অবশ্যই হ্যাঁ। আর আমার ফেরেশতাগণ তাদের কাছে থেকে সবকিছু লিখছে।” [আয-যুখরূফ: ৮০] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ্ বলেন, আমার বান্দা কোন গুনাহর কাজ করতে চাইলে তা না করা পর্যন্ত তার গুনাহ্ লেখো না। আর যদি তা করেই ফেলে, তাহলে তা সমপরিমাণ লেখো। আর যদি আমার কারণে তা ত্যাগ করে, তাহলে তার পক্ষে একটি নেকী লেখো এবং যদি বান্দা কোন ভাল কাজের ইচ্ছা করে, কিন্তু তা না করে, তবুও তোমরা তার জন্য একটি নেকী লেখো। তারপর যদি তা করে, তবে তোমরা তার জন্য কাজটির দশগুণ থেকে সাত’শ গুণ পর্যন্ত লেখো।” {বুখারী (৭৫০১), মুসলিম (১২৮), তিরমিযী (৩০৭৩)} রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “ফেরেশতারা বললেন- হে প্ৰভু! তোমার অমুক বান্দা একটি মন্দ কাজ করার ইচ্ছা করেছে -অথচ তিনি তার চেয়ে ভালভাবে তা দেখেন-, তখন তিনি তাদেরকে (ফেরেশতাদেরকে) বলেন: তাকে পাহারা দাও (অর্থাৎ দেখ সে কি করে)। যদি সে এ কাজটি করে, তাহলে একটি গুনাহ লিখ। আর যদি সে তা বর্জন করে, তাহলে তার জন্য একটি নেকি লিখ। কেননা সে আমার ভয়েই তা বর্জন করেছে।” সহীহ মুসলিম: (১২৯)
তাদের আরো কিছু দায়িত্ব হলো, দাজ্জাল থেকে মদীনা মোনাওয়ারাকে সুরক্ষা প্রদান করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মদিনার প্রবেশ পথসমূহে ফেরেশথা পাহারায় নিয়োজিত আছে। তাই প্লেগ রোগ এবং দাজ্জাল মদিনায় প্রবেশ করতে পারবে না।” {বুখারী (১৮৮০), মুসলিম (১৩৭৯)}
তাদের আরেকটি দায়িত্ব হলো, মৃত ব্যক্তিকে কবরে প্রশ্ন করা। বারা’আ ইবনু আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, মানুষকে তার কবরে রাখার পরবর্তী অবস্থা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতঃপর তার নিকট দু’জন ফিরিশতা এসে তাকে বসিয়ে উভয়ে প্রশ্ন করেন, তোমার রব কে? তখন সে বলে, আমার রব আল্লাহ। তারা উভয়ে তাকে প্রশ্ন করে, তোমার দ্বীন কি? সে বলে, আমার দ্বীন হলো ইসলাম। তারা প্রশ্ন করে, এ লোকটি তোমাদের মধ্যে প্রেরিত হয়েছিলেন, তিনি কে? সে বলে, তিনি আল্লাহর রাসূল।” {আবূ দাউদ (৪৭৫৩), নাসাঈ (২০০১), ইবনু মাজাহ (১৫৪৮), মুসনাদ তায়ালিসী (৭৮৯), মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক (৬৭৩৭), মুসান্নাফ ইবনু আবি শায়বাহ (১২১৮৫)}
তাদের আরো দায়িত্ব হলো, তাদের ভেতর কেউ রয়েছেন জান্নাতের দায়িত্বশীল। আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামত দিবসে আমি জান্নাতের কাছে এসে দরজা খোলার অনুমতি চাইবো। তখন দ্বাররক্ষী বলবেন, আপনি কে? আমি উত্তর করবো, মুহাম্মাদ। দ্বাররক্ষী বলবেন, "আপনার জন্যই আমি আদিষ্ট হয়েছি, যাতে আপনার পূর্বে অন্য কারোর জন্য দরজা না খুলি।" মুসলিম: (১৯৭) আরো রয়েছেন জাহান্নামের দায়িত্বশীল, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তারা চিৎকার করে বলবে: ‘হে মালেক, তোমার রব যেন আমাদেরকে নিঃশেষ করে দেন।’ সে বলবে: ‘নিশ্চয় তোমরা অবস্থানকারী হবে।“ [যুখরুফ: ৭৭] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “এর তত্ত্বাবধানে রয়েছে ঊনিশজন প্রহরী।* “আর আমি তো জাহান্নামের প্রহরী কেবল ফেরেশতাদেরকেই করেছি।” [আল-মুদ্দাচ্ছির: ৩০-৩১] সহীহ গ্রন্থে প্রমাণিত, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জাহান্নামকে এভাবে উপস্থিত করা হবে যে, সেদিন তাতে সত্তর হাজার লাগাম থাকবে। প্রতিটি লাগামের সাথে সত্তর হাজার ফেরেশতা থাকবে, তারা তাকে টেনে নিয়ে যাবে।” {মুসলিম: (২৮৪২), তিরমিযী: (২৫৭৩)} তাফসীর তাবারী (১৯/৮০)
অধ্যায়: মালায়েকাদের বিভিন্ন স্তর।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ মালায়েকাদের জন্য বিভিন্ন স্তর ও মর্যাদা রেখেছেন। তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা সংবাদ দিয়ে বলেছেন, “আর (জিবরীল বললেন) আমাদের প্রত্যেকের জন্য নির্ধারিত স্থান রয়েছে* আর আমরা তো সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান।” [আস-সফফাত: ১৬৪-১৬৫]
মর্যাদার বিবেচনায় সবচেয়ে বড় ফেরেশতা হলেন, জীবরীল, মিকাঈল ও ইসরাফীল। এই কারণে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই তিনজনের ওপর আল্লাহর রুবুবিয্যাতকে উসিলা বানিয়েছেন। যেমন আবূ সালামাহ ইবনু ’আবদুর রহমান ইবনু আওফ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উন্মুল মু’মিনীন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে জিজ্ঞেস করলাম, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতের বেলা যখন সালাত আদায় করতেন তখন কীভাবে তার সালাত শুরু করতেন? জবাবে তিনি বললেন: রাতে যখন তিনি সালাত আদায় করতে উঠতেন তখন এ দু’আটি পড়ে সালাত শুরু করতেন: (’’اللهُمَّ رَبَّ جَبْرَائِيلَ، وَمِيكَائِيلَ، وَإِسْرَافِيلَ، فَاطِرَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، عَالِمَ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ، أَنْتَ تَحْكُمُ بَيْنَ عِبَادِكَ فِيمَا كَانُوا فِيهِ يَخْتَلِفُونَ، اهْدِنِي لِمَا اخْتُلِفَ فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِكَ، إِنَّكَ تَهْدِي مَنْ تَشَاءُ إِلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ‘‘ অর্থাৎ- হে আল্লাহ! জিবরীল, মিকাঈল ও ইসরাফীলের প্রতিপালক, আসমান ও জমিনের স্রষ্টা, প্রকাশ্য ও গোপন বিষয়সমূহের জ্ঞানের অধিকারী। তোমার বান্দারা যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করে তুমিই সেগুলোর ফায়সালা করবে। সত্য ও ন্যায়ের যেসব বিষয়ে মতানৈক্য পোষণ করা হয়েছে সে বিষয়ে তুমি আমাকে পথ দেখাও। তুমিই তো যাকে ইচ্ছা সরল-সহজ পথ দেখিয়ে থাকো।)। {মুসলিম (৭৭০), আবু দাউদ (৭৬৭), নাসাঈ (১৬২৫), ইবনু মাজাহ (১৩৫৭)}
তাদের ভেতর আরো সম্মানিত হলো আরশ বহনকারী মালায়েকাগণ। অনুরূপভাবে যেসব মালায়েকা বদর যুদ্ধে হাজির হয়েছিলেন তারাও। মুয়ায ইবনু রিফাআহ ইবন রাফি আয-যারকী তার পিতা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণনা করেন —তার পিতা বদরী সাহাবী ছিলেন—, তিনি বলেন: জিবরীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন এবং বললেন, “আপনারা বদর যুদ্ধে যোগদানকারী মুসলিমদেরকে কিরূপ গণ্য করেন? তিনি বললেন, তারা সর্বোত্তম মুসলিম -অথবা এরূপ কোন শব্দ তিনি বলেছিলেন-। জিবরীল বললেন, মালায়িকাদের মধ্যে বদর যুদ্ধে যোগদানকারীগণও তেমনি মর্যাদার অধিকারী।” বুখারী (৩৯৯২)
প্রত্যেক আসমানে অসংখ্য মালায়েকা রয়েেছেন, তাদের সংখ্যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এসব মালায়েকার প্রত্যেকের নির্দিষ্ট স্থান রয়েছে। তাদের ভেতর কেউ রয়েছেন নৈকট্যপ্রাপ্ত। এই জন্য মুমিনের মৃত্যুর পর তার রূহ ওপরে ওঠা ও উর্ধ্বে আরোহণ সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ফেরেশতারা তাকে নিয়ে ওপরে ওঠে যান এবং তারা মালায়েকাদের যে কোনো দলের পাশ দিয়ে অতিক্রম করেন, সবাই অবশ্যই বলেন, এই পবিত্র রূহটি কার? তারা বলেন, অমুকের ছেলে অমুক, তাকে দুনিয়াতে যেই সুন্দর নামে ডাকা হত সেই নামেই তারা উল্লেখ করেন। এভাবে তারা দুনিয়ার আসমানে গিয়ে পৌঁছেন, তারা তার জন্য দরজা খোলার অনুমতি চান, ফলে তাদের জন্যে দরজা খুলে দেওয়া হয়। আর প্রত্যেক আসমানের নিকটবর্তীরা তাকে তার পরবর্তী আসমানে এগিয়ে দিয়ে আসেন।” {আবূ দাউদ (৩২১২), নাসাঈ (২০০১), ইবনু মাজাহ (১৫৪৮), মুসনাদে আবূ দাউদ তায়ালিসী (৭৮৯), মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক (৬৩২৪, ৬৭৩৭), আহমাদ (১৮৫৩৪), হাদিসের শব্দ মুসনাদে আহমাদ থেকে গৃহীত।}
পর্ব: কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান।
পর্বটির সারাংশ
আমরা কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন করি। অর্থাৎ নবী ও রাসূলগণের ওপর আল্লাহর নাযিল করা কিতাবসমূহ। তন্মধ্যে আমরা যা জানি তা হলো, ইবরাহীম ও মূসার সহিফাসমূহ এবং তাওরাত, যাবূর, ইঞ্জিল ও কুরআন। আমরা যা জানি আর যা জানি না সব কিতাবের ওপর ঈমান আনয়ন করি।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, এসব কিতাব হলো আল্লাহর কালাম এবং তাঁর ওহী। আল্লাহ নিজ হাতেই তাওরাত লিখেছেন। এসব কিতাব আল্লাহ রাসূলগণের ওপর নাযিল করেছেন। জিবরীল আমীন এসব কিতাব নিয়ে অবতরণ করেছেন। এগুলো আল্লাহ প্রদত্ত বিধিবিধান, সংবাদ, ওয়াজ এবং আদেশ ও নিষেধ অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রত্যেক কিতাব যে উম্মতের ওপর নাযিল করা হয়েছিল সে উম্মতের জন্য সে যুগে তা এমন ওহী ছিল- যার ওপর আমল করা এবং যার সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া তাদের ওপর ওয়াজিব ছিল।
আমরা বিশ্বাস করি যে, কতক কিতাব কতক কিতাবের চেয়ে উত্তম। যেমন তাওরাত আল্লাহ নিজ হাতে লিখেছেন।
আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান হলো ঈমানের রোকনসমূহের তৃতীয় রোকন। কাজেই আমরা সকল কিতাবের প্রতি ঈমান আনয়ন করি। আমরা তাদের মত হবো না যারা কতক কিতাবের প্রতি ঈমান আনয়ন করে আর কতক কিতাবকে অবিশ্বাস করে।
আমরা আরো ঈমান আনয়ন করি যে, কুরআনের পূর্বে যত কিতাব অতীত হয়েছে আল্লাহ তার হিফাজতের দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। যাদের ওপর তা নাযিল করেছেন তাদেরকে তার সংরক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছেন। এ কারণে তাতে বিকৃতি অনুপ্রবেশ করেছে। আর সেসব আসমানী কিতাব ধ্বংস ও বিস্মৃতির সম্মুখীন হয়েছে। মিথ্যুকেরা তা লিখে মিথ্যা ও অপবাদস্বরূপ আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করেছে। তারা নিজ হাতে তা লিখে এবং মাখলূককে ধোঁকায় ফেলার জন্য তাদের মুখে তা তিলাওয়াত করে, যেন তারা তা আল্লাহর পক্ষ থেকে মনে করে!
আমরা আরো ঈমান আনয়ন করি যে, কুরআনুল কারীম হলো সবচেয়ে বড় পরিপূর্ণ ও সম্মানিত এবং সর্বশেষ আসমানী কিতাব। জীবরীল আলাইহিস সালাম স্পষ্ট আরবী ভাষায় তা নিয়ে আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কলবে নাযিল করেছেন। আল্লাহ তার জন্য সবচেয়ে উত্তম ভাষা বাছাই করেছেন। কারণ, আরবী ভাষা হলো সবচেয়ে বিশুদ্ধ, স্পষ্ট, ব্যাপক ও অধিক অর্থবোধক ভাষা। এ কারণেই শ্রেষ্ঠ কিতাব শ্রেষ্ঠ ভাষায় শ্রেষ্ঠ দূতের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ রাসূলেরর ওপর সর্বোত্তম জায়গায় নাযিল করেছেন। বছরের সর্বোত্তম মাস অর্থাৎ রমযান মাসে তা নাযিল হওয়া শুরু হয়। কাজেই সব দিক থেকে কিতাবটি পরিপূর্ণ। তার মধ্যে সর্বপ্রথম নাযিল হয় আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “{اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَق} অর্থ: পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” [আল-আলাক: ১] এ কিতাবের সর্বশেষ নাযিল হয়েছে আল্লাহর বাণী: “{الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا} অর্থ: আজকের দিন আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করছি। আর তোমাদের ওপর আমার নিআমতকে সম্পন্ন করছি। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনিত করছি।” [আল-মায়েদা : ৩] এই কুরআন পৃথক পৃথকভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের বছরগুলোতে তার ওপর নাযিল হয়েছে। তার কিছু অংশ হলো মাক্কী, আর কিছু অংশ হলো মাদানী। তাতে সূরার সংখ্যা হলো একশত চৌদ্দটি। সবচেয়ে মহান সূরা হলো সূরাতুল ফাতিহা। আর সূরাতুল ইখলাস হলো কুরআনের এক তৃতীয়াংশের সমান এবং এর সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত হলো আয়াতুল কুরসি।
আল্লাহ তা‘আলা এই মহাগ্রন্থের প্রশংসা করেছেন এবং মুমিনদের জন্য এটাকে নূর, হিদায়াত ও রহমত বানিয়েছেন, আর উপদেশ এবং অন্তর ও শরীরের রোগের প্রতিষেধক করেছেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, এই মহান কিতাব হলো আসমানী কিতাবসমূহের ভেতর সবচেয়ে পরিপূর্ণ ও ব্যাপক কিতাব। এটা এমন দলিল, প্রমাণ ও উদাহরণ সমৃদ্ধ যা দ্বারা কিয়ামত কায়েম হওয়া পর্যন্ত সকল মাখলুকের ওপর হুজ্জত সাব্যস্ত হয়। এটি পূর্বের সকল কিতাবের বিষয়বস্তুকে অন্তর্ভুক্ত করেছে এবং তার ওপর আরো বৃদ্ধি করেছে। সৃষ্টিজগত ঈমানের যেসব মূলনীতি, শরীয়ত, দলিল, হিকমত, উপদেশ ও সংবাদের মুখাপেক্ষী হয় তার সব কিছুকে সন্নিবিষ্ট করেছে এবং তাতে চূড়ান্ত পর্যায়ের সাহিত্যপূর্ণ ও সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। এই কুরআন যে দু’জাহানের রব আল্লাহর কালাম তার ওপর সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো একজন নিরক্ষর রাসূল, যিনি পড়তে ও লিখতে জানেন না তার ওপর সবচেয়ে মহান, সাহিত্যভরা ও সবচেয়ে সুস্পষ্ট এই কিতাব নাযিল হয়েছে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, কুরআন তার শব্দে ও অর্থে স্পষ্ট নির্দশন। আল্লাহ তা‘আলা এই কুরআনের মত কুরআন, অথবা তার মত দশটি সূরা অথবা একটি সূরা নিয়ে আসার জন্য সকল জিন ও মানুষের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নাযিলকৃত এই কুরআন আল্লাহর কালাম এবং তা মাখলূক নয়। এটি বক্ষে সুরক্ষিত ও মুসহাফসমূহে লিখিত, মিহরাব ও মসজিদসমূহে পঠিত। এগুলো কুরআনকে আল্লাহর কালাম হওয়া থেকে বের করে দেয় না। আল্লাহর কালাম মূলত তার সিফাতসমূহ থেকে একটি সিফাত। আর যা আল্লাহর সিফাত তা মাখলূক হতে পারে না। কারণ, যদি তা মাখলূক হয়, তাহলে মাখলূকের ওপর যে ধ্বংস, নিঃশেষ হওয়া ও পরিবর্তন হওয়া আপতিত হয় তার ওপরও তা আপতিত হবে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহই এই কুরআন সংরক্ষণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, কোনো মাখলূকের ওপর তা ন্যাস্ত করেননি। এটিকে চূড়ান্ত পর্যায়ের স্পষ্ট করার সাথে দ্ব্যর্থবোধকও করেছেন। আর তিনি বর্ণনা করেছেন যে, বক্রতাপূর্ণ লোকেরা তার ভেতর থেকে যা দ্ব্যর্থবোধক তার অনুসরণ করে, আর মুমিনগণ তার থেকে যা স্পষ্ট অর্থবোধক ও যা দ্ব্যর্থবোধক সবটুকুর ওপর ঈমান আনয়ন করেন।
আল্লাহ এটাকে পূর্বের সকল কিতাবের ওপর বিচারক এবং সেগুলোর ওপর তদারককারী বানিয়েছেন। এই কিতাব আমাদের কাছে পূর্ববর্তী উম্মতের ঘটনাসমূহ বর্ণনা করে এবং কিতাবিরা যেসব বিষয়ে মত বিরোধ করেছে তাতে ফয়সালা দেয়।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, মহান এই কুরআন বিশ্বপ্রভু আল্লাহর কালাম, যা রুহুল আমীন (জীবরীল) নিয়ে অবতরণ করেছেন। এটি মুসলিমদের দ্বীনের একটি জানা ও জরুরি বিষয়। মুসলিমদের সকল আলেম ও সাধারণ লোক তার ওপর একমত। তাদের কেউ তাতে দ্বিমত পোষণ করেননি। আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, এই কুরআন তার পক্ষ থেকে এবং মালায়েকাগণও সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, এই কুরআন প্রশংসিত প্রজ্ঞাময়ের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমসাময়িক কিতাবিরাও সাক্ষ্য দিয়েছেন। আল্লাহ এই সাক্ষ্যকে তার নাযিলকৃত সুস্পষ্ট কিতাবে উল্লেখ করেছেন। জিনদের সাক্ষীগণও সাক্ষ্য দিয়েছে যে, এই কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত এবং তা মূসা আলাইহিস সালাম যা নিয়ে এসেছেন তার সাথে সহমত পোষণকারী। অধিকন্তু কুরাইশদের কাফিররাও সাক্ষ্য দিয়েছে যে, এই কুরআন মানুষের কালাম নয় এবং তা তাদের কালামের বিপরীত।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, কুরআন যেসব ইলাহী ইলম, শরয়ী বিধান ও পালনীয় আদবসমূহ অন্তর্ভুক্ত করেছে তা মানুষের স্বভাবের ভেতর স্থির রয়েছে এবং নবীগণ যা নিয়ে এসেছেন তার সাথে তা একমত। আর কুরআনুল কারীমের ভেতর যেসব নীতির ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে নবীগণ তার প্রতিই আহ্বান করেছেন এবং তাতেই গুরুত্ব দিয়েছেন।
মহান কুরআন আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা মাখলূক থেকে যা চান তার সাথে একমত পোষণকারী এবং মাখলূক সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে যা চায় তার সাথে একমত পোষণকারী। কারণ আল্লাহ হলেন একমাত্র স্রষ্টা; তিনি জানেন বান্দাদের কী প্রয়োজন এবং তিনি জানেন তাদের ধর্ম, তাদের শরীর, তাদের সম্পদ এবং তাদের বাড়ি-ঘরের জন্য কী উপযোগী। তিনি যে নির্দেশ দিয়েছেন তাতে রয়েছে চূড়ান্ত স্বার্থ-উপকার। আর তিনি যে কোনো বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন- তার নিষেধের মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা ও সুরক্ষা।
বিবেক যা দাবি করে আল-কুরআনুল কারীম তার সাথে একমত। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা যখন “সূরা আল-আনআম”-এ হারাম বস্তুসমূহের মূলনীতি উল্লেখ করেছেন, তখন তাঁর বাণী: {لَعَلَّكُم تَعْقِلُونَ} “যাতে তোমরা বুঝ” দ্বারা শেষ করেছেন।
কুরআনুল কারীমে যেসব দলিল বর্ণিত হয়েছে তা চূড়ান্ত পর্যায়ের স্পষ্ট, সাহিত্যপূর্ণ, শক্তিশালী, বুঝার কাছাকাছি ও সহজ। প্রত্যেকে তা বুঝতে পারেন। কেউ তাতে ছিদ্রান্বষেণ করতে অথবা তা প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম নয়। এরূপ কোনো মানুষের কথার ভেতর হতে পারে না এবং কোনো অবস্থাতেই তার দলিলগুলো দ্বারা বাতিল প্রমাণ করা যায় না।
কুরআনুল কারীম হলো বিশ্বজগতের রব আল্লাহর কালাম। তবু তা প্রত্যেকের জন্য সহজ। মানুষের চিরাচরিত নিয়ম থেকে জানা যায়নি যে, কেউ একটি কিতাব লিখবেন আর তা সবার জন্য সহজ হবে এবং তার দ্বারা সবাইকে সম্বোধন করা যাবে। অতএব এই বৈশিষ্ট্য মহাগ্রন্থ আল-কুরআন ছাড়া কোনো কিছুর জন্য হতে পারে না।
কুরআনুল কারীম পরিবর্তন-পরিবর্ধন ও বৈপরিত্য থেকে সুরক্ষিত। আল্লাহ তার জন্য কিয়ামত পর্যন্ত স্থায়ীত্ব ও অবিনশ্বরতা অবধারিত করে দিয়েছেন। এই স্থায়ীত্ব, অবিনশ্বরতা ও পরিবর্তন না হওয়া প্রজ্ঞাময় প্রশংসিত আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হওয়ার প্রমাণ। এই কিতাব স্থায়ী, অবিনশ্বর ও সুরক্ষিত হওয়া সত্ত্বে তাতে বিদ্যমান এমন কোনো বিষয় আমরা পাইনি যা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও আবিস্কারের সাথে বিরোধপূর্ণ। বরং কুরআনের যেখানে বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনা রয়েছে বিজ্ঞান তার সাথে একমত পোষণ করেছে, যেমন আসমান, মানুষ ও অন্যান্য বিষয়ের সৃষ্টি প্রসঙ্গ।
আল-কুরআন সরল, সুদৃঢ় পথের হিদাযেত করে, তা প্রত্যেক কল্যাণকে অন্তর্ভুক্ত করে। এটি স্রষ্টা ও সৃষ্টি, দুনিয়া ও আখিরাত, জিন ও মানুষ, আদেশ ও নিষেধ, শিষ্টাচারিতা ও কর্তব্যসমূহ, জান্নাত ও জাহান্নামের সংবাদ সম্বলিত। এটি ঈমান, আমল ও প্রতিদানকে অন্তর্ভুক্তকারী।
কুরআনুল কারীম রোগসমূহের প্রতিষেধক। মানুষের কথায় এমন কিছু নেই যা হৃদয় ও শরীরের রোগের নিরাময় করে, যেমন এই মহান কুরআনে আছে- যা দু’জাহানের রবের কালাম।
আল-কুরআন আমাদের সামনে পূর্ববর্তী উম্মতের ঘটনাসমূহ হুবুহু বর্ণনা করে। তাদের ঘটনাগুলো মক্কাবাসীদের মাঝে প্রচারিত ছিল না। কিন্তু আমাদের নিকট আল্লাহ নিজেই তা যেমন ঘটেছে তেমন বর্ণনা করেছেন। এটিই সাক্ষ্য বহন করে যে, এটি প্রশংসিত প্রজ্ঞাময় আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।
চূড়ান্ত পর্যায়ের সুস্পষ্ট ও সাহিত্যপূর্ণ বর্ণনা, আদৃশ্য সংবাদ ও রাব্বানী শরীয়ত সম্বলিত আল-কুরআন একজন নিরক্ষর রাসূল নিয়ে এসেছেন, যিনি পড়তে ও লিখতে জানতেন না। এটি প্রমাণ করে যে, তা প্রশংসিত প্রজ্ঞাময়ের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। কুরআনুল কারীমের একটি সূরা বিভিন্ন সময়ে ও বিভিন্ন স্থানে নাযিল হয়েছে, তবু একবারে নাযিল হওয়ার মতই একেকটি সূরা পাঠ করা হয়। অথচ মানুষের চিরাচরিত স্বভাব হলো বিভিন্ন সময় কিতাব লিখা হলে তাদের যোগ্যতার তফাৎ হয় এবং তাদের পদ্ধতিও বিভিন্ন হয়।
আল্লাহ তা‘আলা রাসূলকে সুন্নাত দান করেছেন যেমন তাকে কুরআন দান করেছেন। যে ব্যক্তি কুরআন ও সুন্নাতে দৃষ্টি দিবে সে অনায়েসে উভয়ের মাঝে পার্থক্য বুঝতে সক্ষম হবে যা কারো নিকট গোপন নয়।
কুরআন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াল্লামকে তারই নির্দেশ দেয় যা হওয়া উচিত অথবা যা করা ওয়াজিব।
অধ্যায়: কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব।
আমরা কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনয়ন করি। অর্থাৎ আল্লাহর সেসব কিতাব যা তাঁর রাসূল ও নবীগণের -আলাইহিমুস সালাম- ওপর নাযিল করা হয়েছে।
তন্মধ্য থেকে আমরা যা জানি তা হলো: ইবরাহীমের সহীফা, মূসার সহীফা, তাওরাত, যাবূর, ইঞ্জিল ও কুরআন।
আমরা সেসব কিতাবের মধ্য থেকে যা জানি আর যা জানি না তার সবকুটুর ওপর ঈমান আনয়ন করি।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, এসব কিতাব হলো আল্লাহর কালাম এবং তাঁর ওহী। তিনি তা রাসূলগণের ওপর নাযিল করেছেন যা নিয়ে জিবরীল আমীন অবতরণ করেছেন। এগুলো ইলাহী শরীয়ত, সংবাদ, ওয়াজ এবং আদেশ ও নিষেধ অন্তর্ভুক্ত করেছে। প্রত্যেক কিতাব স্বীয় যামানায় এমন ওহী ছিল যার ওপর আমল করা এবং যার সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়া ওয়াজিব ছিল।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, কতক কিতাব কতক কিতাব থেকে উত্তম। যেমন তাওরাত আল্লাহ নিজ হাতে লিখেছেন। সুউচ্চ মহান আল্লাহ বলেন, “আর আমি তার জন্য ফলকসমূহে সর্ববিষয়ে উপদেশ ও সকল বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা লিখে দিয়েছি।” [আল-আরাফ: ১৪৫] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, আদম আলাইহিস সালাম মূসা আলাইহিস সালামকে বলেছেন: “হে মূসা, আল্লাহ তোমাকে নিজের কালামের জন্য মনোনীত করেছেন এবং তোমার জন্য নিজ হাতে লিখেছেন।” {বুখারী (৬৬১৪), মুসলিম (২৬৫২), আবূ দাউদ (৪৭০১), তিরমিযী (২১৩৪), ইবনু মাজাহ (৮০)} আল্লাহ তাওরাত প্রসঙ্গে বলেছেন, “নিশ্চয় আমি তাওরাত নাযিল করেছিলাম; এতে ছিল হেদায়াত ও আলো; নবীগণ, যারা ছিলেন অনুগত, তারা ইয়াহুদীদেরকে তদানুসারে হুকুম দিতেন।” [আল-মায়িদাহ: ৪৪] মহান আল্লাহ ইঞ্জিল প্রসঙ্গে বলেন, “আর আমি তাকে ইঞ্জীল দিয়েছিলাম, এতে রয়েছে হেদায়াত ও আলো; আর তা ছিল তার সামনে অবশিষ্ট তাওরাতের সত্যতা প্রতিপন্নকারী এবং মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত ও উপদেশস্বরূপ।” [আল-মায়েদাহ: ৪৬]
কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আল্লাহর প্রতি ঈমানের রোকনসমূহের তৃতীয় রোকন। মহান আল্লাহ বলেন, “রাসূল তার প্রভুর পক্ষ থেকে যা তার কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল।” [আল-বাকারাহ : ২৮৫] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, একদিন রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল, ঈমান কী? তিনি বললেন, ’’আল্লাহ্তে ঈমান আনবে এবং তাঁর মালায়িকাহ, তাঁর কিতামসমূহের প্রতি এবং তাঁর সাক্ষাতের প্রতি এবং তাঁর নবী-রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনবে এবং পুনরুত্থানের ওপর ঈমান আনবে।’’ {বুখারী (৪৭৭৭), মুসলিম (৯), ইবনু মাজাহ (৬৪)} আমরা তাদের মত হবো না যারা কতক কিতাবের ওপর ঈমান এনেছেন ও কতক কিতাবের সাথে কুফরী করেছেন। যেমন তাদের সম্পর্কে আল্লাহ সংবাদ দিয়ে বলেছেন, “নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের সাথে কুফরী করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে (ঈমানের ব্যাপারে) তারতম্য করতে চায় এবং বলে, ‘আমরা কতক-এর উপর ঈমান আনি এবং কতকের সাথে কুফরী করি’। আর তারা মাঝামাঝি একটা পথ অবলম্বন করতে চায়।” [আন-নিসা: ১৫০] অথবা তাদের মত হবো না যারা আল্লাহ তাঁর রাসূলগণের ওপর যেসব কিতাব নাযিল করেছেন তা মিথ্যারোপ করেছে। যেমন আল্লাহ স্বীয় বাণী দ্বারা তাদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, “যারা কিতাব এবং আমার রাসূলগণকে যা দিয়ে আমি প্রেরণ করেছি তা অস্বীকার করে; অতএব, তারা শীঘ্রই জানতে পারবে।” [গাফির: ৭০]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, কুরআনের পূর্বে যত কিতাব অতীত হয়েছে তার হিফাজতের দায়িত্ব আল্লাহ গ্রহণ করেননি। বরং আল্লাহ তা যেই কওমের ওপর নাযিল করেছেন তাদেরকেই তার হিফাজতের দায়িত্ব প্রদান করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয় আমি তাওরাত নাযিল করেছিলাম; এতে ছিল হেদায়াত ও আলো; নবীগণ, যারা ছিলেন অনুগত, তারা ইয়াহুদীদেরকে তদানুসারে হুকুম দিতেন। আর রব্বানী ও বিদ্বানগণও (তদানুসারে হুকুম দিতেন), কারণ তাদেরকে আল্লাহর কিতাবের রক্ষক করা হয়েছিল। আর তারা ছিল এর উপর সাক্ষী।” [আল-মায়িদাহ: ৪৪] আর এ কারণে তাতে বিকৃতি অনুপ্রবেশ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “অতঃপর তাদের অঙ্গীকার ভঙ্গের জন্য আমি তাদেরকে লা’নত করেছি ও তাদের হৃদয় কঠিন করেছি; তারা শব্দগুলোকে আপন স্থান থেকে বিকৃত করে এবং তাদেরকে যে উপদেশ দেয়া হয়েছিল তার একাংশ তারা ভুলে গেছে।” [আল-মায়েদাহ: ১৩]
এসব ইলাহী কিতাব ধ্বংস ও বিস্মৃতির সম্মুখীন হয়েছে। আর মিথ্যা রচনাকারীরা লিখেছে যা লিখার, তারপর তা আল্লাহর প্রতি মিথ্যা ও অপবাদ স্বরূপ সম্পৃক্ত করেছে। মহাসত্য আল্লাহ বলেন, “কাজেই দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে অতঃপর সামান্য মূল্য পাওয়ার জন্য বলে, ‘এটা আল্লাহর কাছ থেকে’। অতএব, তাদের হাত যা রচনা করেছে তার জন্য তাদের ধ্বংস এবং যা তারা উপার্জন করেছে তার জন্য তাদের ধ্বংস।” [আল-বাকারাহ: ৭৯] এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য তারা তাদের জিহ্বা দিয়ে তা পাঠ করে, যেন মানুষ তা আল্লাহর কাছ থেকে মনে করে। আল্লাহ স্বীয় বাণী দ্বারা সে সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছেন: “আর নিশ্চয়ই তাদের মধ্যে একদল আছে যারা কিতাবকে জিহ্বা দ্বারা বিকৃত করে যাতে তোমরা সেটাকে আল্লাহর কিতাবের অংশ মনে কর; অথচ সেটা কিতাবের অংশ নয়। আর তারা বলে, ‘সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে’; অথচ সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নয়। আর তারা জেনে-বুঝে আল্লাহর উপর মিথ্যা বলে।” [আলে ইমরান: ৭৮]
অধ্যায়: মহাগ্রন্থ আল-কুরআনের প্রতি ঈমান।
আমরা ঈমানআনয়ন করি যে, আল-কুরআন ইলাহী কিতাবসমূহের ভেতর সবচেয়ে মহান, পরিপূর্ণ ও সম্মানিত কিতাব এবং কিতাবসমূহের ভেতর তা সর্বশেষ কিতাব। জিবরীল আলাইহিস সালাম তা নিয়ে আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অন্তরে অবতরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর নিশ্চয় এটা (আল-কুরআন) সৃষ্টিকুলের রব হতে নাযিলকৃত।* বিশ্বস্ত রূহ (জিবরাঈল) তা নিয়ে নাযিল হয়েছেন।* আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন।” [আশ-শুআরা : ১৯২-১৯৪] আল্লাহ তার জন্যে সবচেয়ে উত্তম ভাষা মনোনীত করেছেন। ফলে তা স্পষ্ট আরবী ভাষায় নাযিল করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আমি এটা নাযিল করেছি কুরআন হিসেবে আরবী ভাষায় যাতে তোমরা বুঝতে পারো।” [ইউসুফ : ২] ইবন কুতায়বাহ বলেন, “কেবল তিনিই কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব জানতে পারবেন যিনি বারবার দৃষ্টি দেন, যার ইলম বিস্তৃত, যিনি আরবদের (ভাষারীতির) পদ্ধতি ও বাচন-ভঙ্গির ভিন্নতা বুঝেন এবং আল্লাহ আরবদের ভাষাকে সকল ভাষা থেকে যেভাবে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন তা জানেন। কারণ আল্লাহর পক্ষ থেকে আরবদেরকে যে ভাষাশক্তি, স্পষ্টবাদিতা ও প্রকাশভঙ্গীর প্রশস্ততা দান করা হয়েছে তা অন্য কোনো জাতিকে দেওয়া হয়নি। যেহেতু তিনি তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ওহী করেছেন এবং কিতাব দ্বারা তার নবুওয়তের ওপর দলিল পেশ করার ক্ষেত্রে আরবী ভাষাকে চয়ন করেছেন, তাই এর জ্ঞানকে তার নিদর্শন স্থির করেছেন, যেমন প্রেরিত প্রত্যেক নবীর নিদর্শন করেছেন তাদের প্রেরিত হওয়ার যুগের সবচেয়ে স্পষ্ট বস্তুকে। তা’বীলু মুশকিলিল কুরআন: পৃ.১৭।
কুরআন থেকে সর্বপ্রথম যা নাযিল হয়েছে তা হলো: আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “{اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَق} অর্থ:পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।” [আল-আলাক: ১] উম্মুল মু’মিনীন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট সর্বপ্রথম যে ওহী আসে, তা ছিল: এভাবে ‘হেরা’ গুহায় অবস্থানকালে তার নিকট ওহী আসলো। তার নিকট ফেরেশতা এসে বললো, “পাঠ করুন। তিনি বললেন, ’আমি পড়তে জানি না। তিনি বললেনঃ [অতঃপর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলো যে, আমার খুব কষ্ট হলো। অতঃপর সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললো, ’পাঠ করুন’। আমি বললামঃ আমি তো পড়তে জানি না।’ সে দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলো যে, আমার খুব কষ্ট হলো। অতঃপর সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললোঃ ’পাঠ করুন’। আমি উত্তর দিলাম, ’আমি তো পড়তে জানি না।’ তিনি বললেন, অতঃপর তৃতীয়বারে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। তারপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, “পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন* সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক’ হতে।* পড়ুন, আর আপনার রব মহিমান্বিত।” [আল-আ‘লাক: ১-৩] অতঃপর এ আয়াতগুলো নিয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রত্যাবর্তন করলেন। তার অন্তর তখন কাঁপছিল। {বুখারী: (৩), মুসলিম (১৬০), তিরমিযী (৩৬৩২)} এবং সর্বশেষ নাযিল হওয়া আয়াতগুলোর মধ্য থেকে হচ্ছে: আল্লাহর বাণী, “{الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الإِسْلاَمَ دِينًا} অর্থ: আজকের দিন আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করছি। আর তোমাদের ওপর আমার নিআমতকে সম্পন্ন করছি। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনিত করছি।” [আল-মায়েদা : ৩]
আল-কুরআন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর তার নবুওয়তের সময়ব্যাপী পৃথক পৃথকভাবে নাযিল হয়েছে। তার কিছু অংশ মাক্কী আর কিছু অংশ মাদানী। সূরা সংখ্যা হলো একশত চৌদ্দটি। আর সবচেয়ে মহান সূরা হলো “সূরাতুল ফাতিহা”। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন জিবরীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে বসেছিলেন। সে সময় তিনি উপর দিক থেকে দরজা খোলার একটা প্রচণ্ড আওয়াজ শুনতে পেয়ে মাথা উঠিয়ে বললেনঃ “এটি আসমানের একটি দরজা। আজকেই এটি খোলা হ’ল- ইতোপূর্বে আর কখনো খোলা হয়নি। আর এ দরজা দিয়ে একজন মালায়িকাহ পৃথিবীতে নেমে আসলেন। আজকের এ দিনের আগে আর কখনো তিনি পৃথিবীতে আসেননি। তারপর তিনি সালাম দিয়ে বললেনঃ আপনি আপনাকে দেয়া দু’টি নূর বা আলোর সুসংবাদ গ্রহণ করুন। আপনার পূর্বে আর কোনো নবীকে তা দেয়া হয়নি। আর ঐ দু’টি নূর হল ফাতিহাতুল কিতাব বা সূরা ফাতিহা এবং সূরা আল বাকারাহ-এর শেষাংশ। এর যে কোনো হরফ আপনি পড়বেন তার মধ্যকার প্রার্থিত বিষয় আপনাকে দেয়া হবে।” {মুসলিম: (৮০৬), নাসাঈ: (৯১২)} আর “সূরা ইখলাস” কুরআনুল কারীমের এক তৃতীয়াংশের সমপরিমাণ। আবূ হুরায়রাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে এসে বললেন: আমি তোমাদেরকে এক তৃতীয়াংশ কুরআন পড়ে শুনাচ্ছি। তারপর তিনি "কুল হুয়াল্ল-হু আহাদ, আল্ল-হুস সামাদ" সূরাটি শেষ পর্যন্ত পড়ে শোনালেন।” সহীহ মুসলিম: (৮১২)
তার সবচেয়ে মহান আয়াত হলো আয়াতুল কুরসী। উবাই ইবনু কাব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন আবূল মুনযিরকে লক্ষ্য করে বললেনঃ “হে আবূল মুনযির আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি তোমার কাছে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ? আবূল মুনযির বলেন, জবাবে আমি বললামঃ এ বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই সর্বাধিক অবগত। তিনি আবার বললেনঃ হে আবূল মুনযির! আল্লাহর কিতাবের কোন আয়াতটি তোমার কাছে সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ? তখন আমি বললাম, اللَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ الْحَىُّ الْقَيُّومُ [আল-বাকারা: ২৫৫] আয়াতটি আমার কাছে বেশী গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা শুনে তিনি আমার বুকের উপর হাত মেরে বললেনঃ হে আবূল মুনযির! তোমার ইলমকে স্বাগতম।” {মুসলিম (৮১০), আবূ দাউদ (১৪৬০)}
আল্লাহ এই কিতাব নাযিল করে নিজের প্রশংসা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, “যাবতীয় প্রশংসা আল্লাহরই যিনি তাঁর বান্দার উপর এই কিতাব নাযিল করেছেন এবং তাতে তিনি বক্রতা রাখেননি।” [আল-কাহাফ: ১] অনুরূপভাবে তিনি এই মহান কিতাবেরও প্রশংসা করেছেন। যেমন তিনি বলেন, “যদি আমি এ কুরআন পর্বতের উপর নাযিল করতাম তবে আপনি তাকে আল্লাহর ভয়ে বিনীত বিদীর্ণ দেখতেন। আর আমি এসব দৃষ্টান্ত বর্ণনা করি মানুষের জন্য, যাতে তারা চিন্তা করে।” [আল-হাশর: ২১] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “আর যদি কুরআন এমন হত যা দ্বারা পৰ্বতকে গতিশীল করা যেত অথবা যমীনকে টুকরো টুকরো করা যেত অথবা মৃতের সাথে কথা বলা যেত।” [আর-রা‘দ: ৩১] তিনি কুরআনকে মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত বানিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “এ কুরআন মানুষের জন্য আলোকবর্তিকা এবং হেদায়াত ও রহমত এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা নিশ্চিত বিশ্বাস করে।” [আল-জাসিয়াহ: ২০] এটা উপদেশ এবং অন্তর ও শরীরের রোগসমূহের প্রতিষেধক স্বরূপ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে লোকসকল! তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে উপদেশ ও অন্তরসমূহে যা আছে তার আরোগ্য এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।” [ইউনুস : ৫৭] তিনি আরো বলেন, “আর আমি নাযিল করি কুরআন, যা মুমিনদের জন্য আরোগ্য ও রহমত, কিন্তু তা যালিমদের ক্ষতিই বৃদ্ধি করে।” [আল-ইসরা: ৮২]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, এই মহান কিতাব ইলাহী কিতাবসমূহের ভেতর সবচেয়ে পরিপূর্ণ ও ব্যাপক। এটি এতো দলিল, প্রমাণ ও উদাহরণ সন্নিবিষ্ট করেছে যার দ্বারা কিয়ামত পর্যন্ত সকল মাখলূকের ওপর প্রমাণ সাব্যস্ত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে লোকসকল! তোমাদের রবের কাছ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি স্পষ্ট জ্যোতি নাযিল করেছি।” [আন-নিসা : ১৭৪] তিনি আরো বলেন, “আর তারা আপনার কাছে যে বিষয়ই উপস্থিত করে না কেন, আমি সেটার সঠিক সমাধান ও সুন্দর ব্যাখ্যা আপনার কাছে নিয়ে আসি।” [আল-ফুরকান: ৩৩] তিনি আরো বলেন, ‘আর অবশ্যই আমি মানুষের জন্য এ কুরআনে বিভিন্ন উপমা বিশদভাবে বর্ণনা করেছি; কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ কুফরী করা ছাড়া ক্ষান্ত হয়নি।’ [আল-ইসরা: ৮৯] আল্লাহ আরো বলেন, “আর অবশ্যই আমি এ কুরআনে (বহু বিষয়) বারবার বিবৃত করেছি যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু এতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়।” [আল-ইসরা: ৪১] ইবনে জারির বলেন, “মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন, আল্লাহর বিপক্ষে মিথ্যা রচনাকারী এসব মুশরিকদের জন্য “এ কুরআনে” অনেক উপদেশ, নিদর্শন ও দলিল “বারবার বিবৃত করেছি আমি” এবং তাদের জন্য এতে অনেক উদাহরণ বর্ণনা করেছি, তাদেরকে অনেক সতর্ক ও সাবধান করেছি; “যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” তিনি বলেন, যেন তারা তাদের বিপক্ষে ঐসব দলিলে চিন্তা করে এবং তারা যেসব ভুলের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছে তা বুঝতে পারে আর উপদেশ থেকে উপদেশ গ্রহণ করে এবং তারা তার দ্বারা নসিহত হাসিল করে ও তাদের মূর্খতা থেকে ফিরে আসে। বস্তুত তাদের বিপক্ষে যেসব নিদর্শন ও সতর্কবার্তা উপস্থিত হয় তার দ্বারা তারা উপদেশ গ্রহণ করে না ও সতর্ক হয় না।” তাফসীর তাবারী: (১৭/৪৫৩)
এই মহাগ্রন্থ আল-কুরআন পূর্বের আসমানী কিতাবসমূহ যা রয়েছে তা সবকিছু সন্নিবিষ্ট করেছে এবং তার ওপর বৃদ্ধি করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর সত্য ও ন্যায়ের দিক দিয়ে আপনার রব-এর বাণী পরিপূর্ণ, তাঁর বাক্যসমূহের পরিবর্তনকারী কেউ নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” [আল-আনআম: ১১৫] এবং সৃষ্টিকুল ঈমানের যেসব মূলনীতি, শরীয়ত, দলিল, বিধান, উপদেশ ও সংবাদের মুখাপেক্ষী হয় তা সবকিছু সন্নিবিষ্ট করেছে। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় এ কুরআন হিদায়াত করে সে পথের দিকে যা সরল-সুদৃঢ়।” [আল-ইসরা : ৯] তিনি আরো বলেন, “আমি আপনার কাছে উত্তম কাহিনি বর্ণনা করছি, ওহীর মাধ্যমে আপনার কাছে এ কুরআন পাঠিয়ে।” [ইউসূফ: ৩] এটি চূড়ান্ত পর্যায়ের সাহিত্যপূর্ণ ও স্পষ্টবাদী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব যা সুসামঞ্জস্য এবং যা পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা হয়।” [আয-যুমার: ২৩] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “অল্প শব্দে ব্যাপক অর্থবোধক বাক্য বলার শক্তি সহ আমাকে পাঠানো হয়েছে এবং শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চারের মাধ্যমে আমাকে সাহায্য করা হয়েছে।” {বুখারী (২৯৭৭), মুসলিম (৫২৩), তিরমিযী (১৫৫৩), নাসাঈ (৩০৮৭)}
এই কুরআন দু’জাহানের রবের কালাম তার ওপর সবচেয়ে বড় দলিল হলো: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরক্ষর, পড়তে ও লিখতে জানতেন না। আর তার ওপরই সবচেয়ে মহান, সবচেয়ে সাহিত্যপূর্ণ ও স্পষ্টবাদী কিতাব নাযিল হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর আপনি তো এর আগে কোনো কিতাব পড়েননি এবং নিজ হাতে কোনো কিতাবও লেখেননি যে, বাতিলপন্থীরা সন্দেহ পোষণ করবে।” [আল-আনকাবূত: ৪৮] তিনি আরো বলেন, “কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূল উম্মী নবীর প্রতি যিনি আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।” [আল-আরাফ : ১৫৮]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, কুরআন তার শব্দে ও অর্থে স্পষ্ট নির্দশন। আল্লাহ তা‘আলা এই কুরআনের মত কুরআন, অথবা তার মত দশটি সূরা অথবা একটি সূরা নিয়ে আসার জন্য সকল জিন ও মানুষের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। মহা সত্য সত্ত্বা বলেন, “বলুন, ‘যদি কুরআনের অনুরূপ কুরআন আনার জন্য মানুষ ও জিন সমবেত হয় এবং যদিও তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর অনুরূপ আনতে পারবে না।” [আল-ইসরা : ৮৮] তিনি আরো বলেন, “নাকি তারা বলে, ‘তিনি এটা রচনা করেছেন?’ বলুন, ‘তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য যাকে পার ডাক, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” [সূরা হুদ : ১৩] মহা সম্মানীত আল্লাহ আরো বলেন, “আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” [আল-বাকারা : ২৩]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ এই কুরআন সংরক্ষণ করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন এবং তা তাঁর কোনো মাখলূকের ওপর ন্যাস্ত করেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমি অবশ্যই তার সংরক্ষক।” [আল-হিজর : ৯] তিনি আরো বলেন, “বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না---সামনে থেকেও না, পিছন থেকেও না। এটা প্রজ্ঞাময়, চিরপ্ৰশংসিতের কাছ থেকে নাযিলকৃত।” [ফুসসিলাত: ৪২] কুরআনকে তিনি ব্যাপক অর্থে পুরোপুরি সুষ্পষ্ট করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আলিফ–লাম-রা, এ কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত সত্তার কাছ থেকে।” [সূরা হুদ : ১] অনুরূপভাবে পুরো কুরআনকে তিনি সুসামঞ্জস্যপূর্ণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব যা সুসামঞ্জস্য এবং যা পুনঃ পুনঃ আবৃত্তি করা হয়।” [আয-যুমার: ২৩] তার কিছু অংশ ‘মুহ্কাম’ (সুস্পষ্ট) আর কিছু অংশ ‘মুতাশাবিহ্’ (দ্ব্যর্থক) বানিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তিনিই আপনার প্রতি এই কিতাব নাযিল করেছেন যার কিছু আয়াত ‘মুহ্কাম’, এগুলো কিতাবের মূল; আর অন্যগুলো ‘মুতাশাবিহ্’, সুতরাং যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে শুধু তারাই ফেৎনা এবং ভুল ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে মুতাশাবিহাতের অনুসরণ করে। অথচ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কেউ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে সুগভীর তারা বলে, ‘আমরা এগুলোতে ঈমান রাখি, সবই আমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে’; এবং জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা ছাড়া আর কেউ উপদেশ গ্রহণ করে না।” [আলে ইমরান : ৭] তিনি বর্ণনা করেছেন যে, বক্র অন্তরবিশিষ্টরা তা থেকে যা দ্ব্যর্থক তার অনুসরণ করে। আর মুমিনরা সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থক সবার ওপর ঈমান আনয়ন করেন।
আল্লাহ এটাকে পূর্বের সকল কিতাবের ওপর ফায়সাল ও তদারককারী বানিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যথাযথভাবে, এর পূর্বের কিতাবের সত্যায়নকারী ও তার উপর তদারককারীরূপে।” [আল-মায়িদাহ : ৪৮] তিনি বর্ণনা করেছেন যে, এই কিতাব আমাদের নিকট পূর্বের উম্মতের ঘটনাবলি বর্ণনা করে। যেমন তাঁর এ বাণীতে রয়েছে: “এটা গায়েবের সংবাদ যা আপনাকে আমি ওহী দ্বারা জানাচ্ছি; ষড়যন্ত্রকালে যখন তারা মতৈক্যে পৌঁছেছিল, তখন আপনি তাদের সাথে ছিলেন না।” [ইউসূফ: ১০২] এই জাতীয় অনেক সংবাদ রয়েছে। কিতাবীরা যে বিষয়ে মতভেদ করেছে কুরআন তাতে ফয়সালা করে দেয়। মহা সম্মানিত মাওলা বলেন, “বনী ইসরাঈল যে সব বিষয়ে মতভেদ করে, নিশ্চয় এ কুরআন তার অধিকাংশ তাদের কাছে বিবৃত করে।” [সূরা আন-নামাল : ৭৬]
ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু তার মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলেছেন, “হে লোক সকল, এই কুরআন হলো আল্লাহর কালাম। অতএব তোমরা এটাকে যথাযথ মুল্যায়ন করো এবং এতে তোমাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। ” {আহমাদ, আয-যুহদ (১৯১), দারিমী (৩৩৯৮), আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ (১১৭), আল-আজুররি, আশ-শারীয়াহ (১৫৫), শব্দ তার থেকে নেওয়া এবং ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ (২৩)}
ওমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো বলেছেন, ““আল-কুরআন হলো আল্লাহর কালাম। কাজেই তোমরা তা তোমাদের প্রবৃত্তির ওপর ব্যাখ্যা কর না।” আল-আজুররী, “আশ-শারীয়াহ” : ১৫০।
ফারওয়াহ ইবন নাওফাল আল-আশজায়ী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “খাব্বাব ইবন আরত রাদিয়াল্লাহ আনহু আমার প্রতিবেশী ছিলেন। তিনি আমাকে একদিন বললেন, হে হানা, তুমি তোমার সাধ্যমত আল্লাহর নৈকট্য হাসিল কর। আর তুমি জেনে রেখো যে, তুমি এমন কোনো জিনিসের দ্বারা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করবে না যা তার নিকট তার কালামের চেয়ে বেশী প্রিয়।” {আবূ উবাইদ, ফাযায়েলুল কুরআন: (পৃ.৭৭), মুসান্নাফ ইবনু আবি শায়বাহ: (৩০৭২২), আহমাদ, আয-যুহদ: (১৯২), উসমান ইবনু সাঈদ আদ-দারিমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ: (১৬০), আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ: (১১১)।}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, এই কুরআন হলো আল্লাহর কালাম। তার পক্ষ থেকে নাযিলকৃত, সৃষ্ট মাখলূক নয় এবং তা মানুষের অন্তরে সংরক্ষিত। আল্লাহ বলেন, “বরং যাদেরকে জ্ঞান দেয়া হয়েছে বস্তুত তাদের অন্তরে এটা স্পষ্ট নিদর্শন। আর শুধু যালিমরাই আমার নিদর্শনসমূহ অস্বীকার করে।” [আল-আনকাবূত: ৪৯] এই কুরআন মুসহাফসমূহে লিখা, অথবা মিহরাব ও মাসজিদসমূহে তিলাওয়াত করার ফলে আল্লাহর কালাম হওয়া থেকে বের হবে না। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যারা আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং সালাত কায়েম করে, আর আমি তাদেরকে যে রিযিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারাই আশা করে এমন ব্যবসার, যার ক্ষয় নেই।” [ফাতির: ২৯] তিনি আরো বলেন, “নিশ্চয় এটা মহিমান্বিত কুরআন,* যা আছে সুরক্ষিত কিতাবে।* যারা সম্পূর্ণ পবিত্র তারা ছাড়া অন্য কেউ তা সম্পর্শ করে না।* এটা সৃষ্টিকুলের রবের কাছ থেকে নাযিলকৃত।” [আল-ওয়াকিয়াহ: ৭৭-৮০]
কুরআন হলো আল্লাহর কালাম। আর তাঁর কালাম হলো তাঁর সিফাতসমূহের একটি সিফাত। আর তাঁর সিফাত কখনো মাখলূক হতে পারে না। কারণ, যদি তা মাখলূক হয়, তাহলে সকল মাখলূকের ওপর যে পরিবর্তন, ধ্বংস ও বিলুপ্তি আপতিত হয় তার ওপরও তা হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তবে কি তারা কুরআনকে গভীরভাবে অনুধাবন করে না? যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত, তবে তারা এতে অনেক অসঙ্গতি পেত।” [আন-নিসা : ৮২] তিনি আরো বলেন, “আর মুশরিকদের মধ্যে কেউ আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করলে আপনি তাকে আশ্রয় দিন; যাতে সে আল্লাহর বাণী শুনতে পায়, তারপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছিয়ে দিন; কারণ তারা এমন এক সম্প্রদায় যারা জানে না।” [আত-তাওবাহ : ৬]
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইনের জন্য নিরাপত্তার দোয়া করতেন আর বলতেন, “তোমাদের পিতা ইবরাহীম, ইসমাঈল ও ইসহাক-এর জন্য দু‘আ পড়ে পানাহ চাইতেন। আমি আল্লাহর পরিপূর্ণ কালিমার দ্বারা প্রত্যেক শয়তান, বিষাক্ত প্রাণী এবং প্রত্যেক কুদৃষ্টির অনিষ্ট হতে পানাহ চাচ্ছি।” {বুখারী (৩৩৭১), আবূ দাউদ (৪৭৩৭), তিনি বলেন, কুরআন মাখলূক নয় এটি তার প্রমাণ। তিরমিযি (২০৬০), ইবনু মাজাহ (৩৫২৫)}
ইসমাইল ইবন আবি উওয়াইস কুরআন মাখলূক নয়- এর ওপর মদিনাবাসীর ঐকমত্য বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “মালিক এবং আমাদের শহরের লোকেরা বলতেন যে, আল-কুরআন হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো জিনিস মাখলূক হতে পারে না। মালিক বিন আনাসের যুগে মদিনার আলেমগণ হলেন: মুহাম্মাদ ইবন আব্দুর রহমান ইবন আবি যি‘ব, আব্দুল আজীজ ইবন আবি সালামাহ আল-মাজিশুন, আবূ বকর ইবন আবি সাবুরাহ, ইবরাহীম ইবন সা‘দ আয-যুহরী, সায়ীদ ইবন আব্দুর রহমান আল-জুমহী, হাতিম ইবন ইসমাইল, আব্দুল্লাহ ইবন আব্দুল আজীজ আল-ওমরী, আবূ যমরাহ আনাস ইবনু ইয়ায, মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল ইবন আবি ফুদাইক।” শারহু উসূলুল ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ: (২/৩০০)
শুআইব ইবন হারব বলেন, আমি আবূ আব্দুল্লাহ সুফিয়ান ইবন সায়ীদ আস-সাওরীকে বললাম, “আমাকে সুন্নাতসমূহ থেকে একটি হাদীস বলুন, যার দ্বারা আল্লাহ আমাকে উপকৃত করবেন। যখন আমি আল্লাহ তা‘আলার সামনে দাঁড়াবো এবং তিনি আমাকে তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন ও বলবেন: এটি কার থেকে গ্রহণ করেছো? আমি বলব: হে আমার রব, সুফিয়ান সাওরী আমাকে এই হাদীস বলেছেন। আমি তার থেকেই তা গ্রহণ করেছি। ফলে আমি নাজাত পাবো আর আপনি পাকড়াও হবেন। তিনি বললেন, হে শুআইব, এটি নিশ্চিতকরণ, পূর্ণ নিশ্চিতকরণ, আপনি লিখুন, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম: “কুরআন আল্লাহর কালাম, মাখলূক নয়। তাঁর থেকে এসেছে এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।” শারহু উসূলুল ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ: (১/১৭০)
ইমাম ইবনু জারীর তাবারী বলেন, “ইবনু উয়াইনাহ আমাদেরকে বলেছেন, আমি আমর ইবন দিনারকে বলতে শুনেছি: আমি সত্তর বছর যাবত আমাদের শায়খদেরকে বলতে দেখছি: আল-কুরআন হলো আল্লাহর কালাম। তাঁর থেকে এসেছে এবং তাঁর কাছেই ফিরে যাবে।” আত-তাবারী, সারীহুস সুন্নাহ (পৃ.১৯)
হাসান ইবন আইয়ূব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি আহমাদ ইবনু হাম্বলকে ফিরয়াবী সূত্রে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, আমি সাওরীকে—অর্থাৎ সুফিয়ানকে— বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি বলল: কুরআন মাখলূক সে নাস্তিক। আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ ইবন হাম্বল থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার বাবাকে বলতে শুনেছি, আমার কাছে ইবরাহীম ইবন সা‘দ, সাঈদ ইবন আব্দুর রহমান আল-জামহী, ওহাব ইবন জারীর, আবু নযর হাশিম ইবন কাসিম ও সুলাইমান ইবন হারব প্রমুখ থেকে পৌঁছেছে, তারা সবাই বলেছেন: আল-কুরআন মাখলূক নয়।” শারহু উসূলুল ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ: (২/২৭৭)
ইমামদের ইমাম মুহাম্মাদ ইবনু খুযায়মাহ রাহিমাহুল্লাহ এই মাসআলার ওপর একটি অধ্যায় কায়েম করেছেন এবং বলেছেন: “অধ্যায়: এমন দলিল প্রসঙ্গে যা প্রমাণ করে যে, কুরআন সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর কালাম এবং তাঁর কালাম মাখলূক নয়।” ইবনু খুযায়মাহ, আত-তাওহীদ: (১/৪০৪)
আবূ সাঈদ দারিমী বলেছেন, “এসব হাদীসে স্পষ্ট রয়েছে যে, আল-কুরআন মাখলূক নয়। কারণ, ফজিলতের ক্ষেত্রে আল্লাহ এবং তাঁর মাখলূকের মাঝে ব্যবধানের মত কুরআন ও মাখলূকের ফজিলতের মাঝে ব্যবধান রয়েছে, যা কোনো মাখলূকের পরস্পরের মাঝে নেই। কারণ, মাখলূকের মধ্যকার ফজিলত আয়ত্ত্ব করা যায়, কিন্তু মাখলূকের ওপর আল্লাহর ফজিলত আয়ত্ত্ব করা যায় না এবং কেউ তা আয়ত্ত্বে আনতেও পারে না। মাখলূকের কালামের ওপর তাঁর কালামের ফজিলত এরূপ। যদি কুরআন সৃষ্ট বাণী (কালাম) হত, তাহলে আল্লাহর মাখলূকের ওপর আল্লাহর ফজিলতের ব্যবধানের মত সকল কালামের ওপর কুরআনের ফজিলতের ব্যবধান হত না। হাজার হাজার থেকে দশমাংশের এক দশমাংশও ব্যবধান হত না এবং তার কাছাকাছির ব্যবধানও হত না। কাজেই বিষয়টি তোমরা ভালো করে বুঝ। কারণ, আল্লাহর মত কোনো জিনিস নেই এবং তাঁর কালামের মত কোনো কালাম নেই। আর এরূপ নিয়ে আসা কখনো সম্ভব নয়।” আদ-দারিমি, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (পৃ.১৮৮)
আর আবূ ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আর কুরআন হলো আল্লাহ তা‘আলার কালাম এবং তাঁর ওহী ও নাযিলকৃত। ইমাম আবূ হানিফা ও ইমামগণকে এর ওপর পেয়েছি। তাদের মতে কুরআন মাখলূক ও খালিক নয়।” আন-নিসাপুরী, আল-ই‘দিকাদ : (পৃ.১৩৫)
অধ্যায়: আল-কুরআন বিশ্বপ্রভুর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, এই মহান কুরআন দু’জাহানের রবের কালাম। রুহুল আমীন জিবরীল তা নিয়ে অবতরণ করেছেন। এটি মুসলিমদের দ্বীনের অকাট্যভাবে জানা বিষয়। সকল মুসলিম তার ওপর একমত। তাদের কেউ এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেননি। এই বিষয়টি অর্থাৎ কুরআন দু’জাহানের রবের কালাম হওয়ার বিষয়টির ওপর অনেক দলিল রয়েছে, যা গণনা করা এবং যা আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়। তন্মধ্যে হলো:
এই কুরআনের জন্য আল্লাহর নিজের সাক্ষ্য যে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে। মহাসত্য আল্লাহ বলেন: “বলুন, ‘কোন জিনিস সবচেয়ে বড় সাক্ষী’? বলুন, ’আল্লাহ আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষ্যদাতা। আর এ কুরআন আমার নিকট ওহী করা হয়েছে যেন তোমাদেরকে এবং যার নিকট তা পৌঁছবে তাদেরকে এ দ্বারা সতর্ক করতে পারি।" [আল-আনআম: ১৯] তিনি আরো বলেন, “কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন আপনার প্রতি যা তিনি নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে। তিনি তা নাযিল করেছেন নিজ জ্ঞানে।” [আন-নিসা : ১৬৬]
তন্মধ্যে: মালায়েকাদের সাক্ষ্য যে, এই কুরআন প্রশংসিত প্রজ্ঞাময়ের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, যা তোমার নিকট তিনি নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে। তিনি তা নাযিল করেছেন নিজ জ্ঞানে এবং ফেরেশতারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে। আর আল্লাহই সাক্ষীরূপে যথেষ্ট।” [আন-নিসা : ১৬৬]
তন্মেধ্যে: এই কুরআন নবীগণ যা নিয়ে এসছেন তার সাথে একমত পোষণকারী। যেমন আল্লাহর বাণীতে রয়েছে: “আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে 'উফ' বল না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বল।” [আল-ইসরা : ২৩] নিম্নের বাণী পর্যন্ত: “আপনার রব ওহীর দ্বারা আপনাকে যে হিকমত দান করেছেন এগুলো তার অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ স্থির করো না, করলে নিন্দিত ও বিতাড়িত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।” [আল-ইসরা : ৩৯]
তিনি আরো বলেন, “তিনি সত্যসহ আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন, পূর্বে যা এসেছে তার সত্যতা প্রতিপন্নকারীরুপে। আর তিনি নাযিল করেছিলেন তাওরাত ও ইঞ্জীল।” [আলে ইমরান : ৩] গুরুত্বারোপকৃত এসব মূলনীতির দিকেই রাসূলগণ আহ্বান করেছেন এবং তার ওপর তারাও গুরুত্বারোপ করেছেন।
তন্মধ্যে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের কিতাবীদের সাক্ষ্য। আল্লাহ নিজেও তাঁর নাযিল করা সুদৃঢ় বাণীতে এই সাক্ষ্য উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “বলুন, ‘তোমরা আমাকে জানাও, যদি এ কুরআন আল্লাহর কাছ থেকে নাযিল হয়ে থাকে এবং তোমরা তার সাথে কুফরী কর, আর বনী ইসরাঈলের একজন অনুরূপ কিতাবের আয়াতের উপর সাক্ষ্য দিয়ে তাতে ঈমান আনল; আর তোমরা ঔদ্ধত্য প্ৰকাশ করলে, (তাহলে তোমাদের পরিণাম কি হবে?) নিশ্চয় আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না।” [আল-আহকাফ: ১০] সহীহ বুখারী ও মুসলিমে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা দেখেছেন তা সম্পর্কে ওরাকাকে সংবাদ দেওয়ার পর ওরাকা তাকে বললেন,“ এ হলো ঐ নামুস আল্লাহ যাকে মূসার ওপর নাযিল করেছিলেন।” {বুখারী (৩৩৯২), মুসলিম (১৬০)}
জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহুর সংবাদে রয়েছে, যখন নাজ্জাশী তাকে জিজ্ঞেস করেছিলো: মুহাম্মাদ যা নিয়ে এসেছেন তার কিছু তোমার সাথে আছে কী? তখন তিনি তাকে তিলাওয়াত করে শোনালেন। অতঃপর নাজ্জাশী বললেন, “আল্লাহর কসম, নিশ্চয় এই কালাম এবং মূসা যে কালাম নিয়ে এসেছেন তা একই উৎস থেকে এসেছে।” {ইসহাক ইবনু রাহুয়াহ (১৮৩৫), আহমাদ (২২৪৯৮), ইবনু খুযায়মাহ (২২৬০), তাহাভী, শরহু মুশকিলুল আসার (৫৫৯৮), আবূ নুআইম, আল-হিলয়াহ (১/১১৫), দালায়েলুন নুবুওয়াহ (১৯৪)}
তন্মধ্যে: জিনদের সাক্ষ্য যে, এই কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত এবং এটি মূসা যা নিয়ে এসেছেন তার সাথে সহমত পোষণকারী: “আর স্মরণ করুন, যখন আমি আপনার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম জিনদের একটি দলকে, যারা মনোযোগ সহকারে কুরআন পাঠ শুনছিল। অতঃপর যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হল, তারা বলল, ‘চুপ করে শুন।’ অতঃপর যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হল তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে।* তারা বলেছিল, ‘হে আমাদের সম্প্রদায়! নিশ্চয় আমরা এমন এক কিতাবের পাঠ শুনেছি যা নাযিল হয়েছে মূসার পরে, এটা তার সম্মুখস্থ কিতাবকে সত্যায়ন করে এবং সত্য ও সরল পথের দিকে হেদায়াত করে।” [আল-আহকাফ : ২৯-৩০] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “বলুন, ‘আমার প্রতি ওহী নাযিল হয়েছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগের সাথে শুনেছে। অতঃপর বলেছে, ‘আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শুনেছি,* যা সত্যের দিকে হেদায়াত করে; ফলে আমরা এতে ঈমান এনেছি। আর আমরা কখনো আমাদের রবের সাথে কাউকে শরীক করব না।” [সূরা আল-জিন : ১-২]
তন্মধ্যে: কুরাইশ কাফিরদের সাক্ষ্য যে, এটি মানুষের কালাম নয় এবং এটি তাদের কথার বিপরীত। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত: “ওয়ালীদ ইবনুল মুগিরাহ নবী সাল্লাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসেন, আর তিনি তাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনান। তাতে যেন তিনি কুরআনের প্রতি বিগলিত হয়ে গেলেন। ঘটনাটি আবূ জাহিলের নিকট পৌঁছালো। তিনি ওয়ালীদের কাছে আসলেন এবং বললেন, হে চাচা, আপনার কওম আপনার জন্য সম্পদ জমা করার ইচ্ছে করেছে। তিনি বললেন, কেনো? সে বলল: আপনাকে দেওয়ার জন্য। কারণ, আপনি মুহাম্মাদের কাছে এসেছেন সে যা গ্রহণ করেছে তা প্রচার করার নিমিত্তে। তিনি বললেন, কুরাইশরা জানে যে, আমি তাদের ভেতর অধিক সম্পদের অধিকারী। আবূ জাহিল বললেন, মুহাম্মাদের ব্যাপারে কিছু বলুন যেন আপনার কওম জানে যে, আপনি তাকে অস্বীকার করেন কিংবা তাকে অপছন্দ করেন। তিনি বললেন, আমি কী বলবো?! আল্লাহর কসম, কবিতা সম্পর্কে, ছন্দ সম্পর্কে, দীর্ঘ কবিতা প্রসঙ্গে এবং জিনদের কবিতা প্রসঙ্গে তোমাদের ভেতর আমার চেয়ে বেশী কেউ জানে না। আল্লাহর কসম, সে যা বলে এসবের সাথে তার কোনো মিল নেই। আল্লাহর কসম, সে যা বলে তার ভেতর রয়েছে এক মিষ্টতা এবং তার ওপর রয়েছে কমনীয়তা। তার ওপরের অংশ ফলবান আর তার নিচের অংশ পানিতে ভরপুর। তা উচ্চে ওঠবে তাকে নিচে নামানো যাবে না এবং সে তার নিচের সবকিছুকে ধ্বংস করে দিবে।” মুস্তাদরাক হাকিম (৩৮৭২), বায়হাকি, শুআবুল ঈমান (১৩৩), দালায়েলুন নুবুওয়াহ (২/১৯৮)
তন্মধ্যে: আল্লাহ মাখলূক থেকে যা চান আল-কুরআন তার সাথে একমত পোষণকারী। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “আর এ পথই আমার সরল পথ। কাজেই তোমরা এর অনুসরণ কর এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। এভাবে আল্লাহ্ তোমাদেরকে নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও।” [আল-আন‘আম : ১৫৩]
তন্মধ্যে: আল-কুরআন যেসব ইলাহী জ্ঞান, শরয়ী বিধান ও পালনীয় আদবকে অন্তর্ভুক্ত করেছে তা সবই মানুষের স্বভাবে প্রোথিত ও স্থিরকৃত। আল্লাহ জাল্লা শানুহু বলেন, “কাজেই আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজ চেহারাকে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দ্বীন ইসলাম), যার উপর (চলার যোগ্য করে) তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [সূরা আর-রূম : ৩০]
তন্মধ্যে: যেসব জিনিসের ভেতর মাখলূকের স্বার্থ রয়েছে তার সাথে আল-কুরআন একমত পোষণকারী। কারণ, আল্লাহ হলেন স্রষ্টা। কাজেই বান্দাগণ কিসের মুখাপেক্ষী তা তিনি ভালো করেই জানেন। কিসের দ্বারা তাদের দ্বীন, শরীর, সম্পদ ও বাড়ি-ঘর ঠিক থাকবে তাও তিনি ভালো জানেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “যিনি সৃষ্টি করেছেন, তিনি কি জানেন না? অথচ তিনি সূক্ষ্মদর্শী, সম্যক অবহিত।” [আল-মুলক: ১৪] তিনি যা নির্দেশ করেছেন তাতে চূড়ান্ত কল্যাণ রয়েছে এবং তিনি যা থেকে বারণ করেছেন তাতে চূড়ান্ত সতর্কতা ও সুরক্ষা রয়েছে।
তন্মধ্যে: বিবেকসমূহ যা দাবি করে আল-কুরআন তার সাথে একমত পোষণকারী। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা যখন “সূরা আল-আনআ‘ম”-এ হারাম বস্তুসমূহের মূলনীতি উল্লেখ করেছেন, তখন “যাতে তোমরা বুঝতে পার” বলে তাঁর বাণী শেষ করেছেন। তিনি বলেছেন: “বলুন, ‘এস, তোমাদের রব তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন তোমাদেরকে তা তিলাওয়াত করি। তা হচ্ছে , ‘তোমারা তাঁর সাথে কোন শরীক করবে না, পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্রতার ভয়ে তোমার তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, আমিই তোমাদেরকে ও তাদেরকে রিযক দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল কাজের ধারে-কাছেও যাবে না। আল্লাহ্ যা হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা তাকে হত্যা করবে না।’ তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা বুঝতে পার।” [আল-আন‘আম: ১৫১]
আল-কুরআন বিবেকবানদেরকে এতো বেশী সম্বোধন করেছেন যা গুণে শেষ করা যাবে না। যেমন আল্লাহ যেসব আদেশ করেছেন এবং যা থেকে নিষেধ করেছেন বান্দাদেরকে তাতে চিন্তা, গবেষণা ও গভীর দৃষ্টি দিতে আদেশ করেছেন।
তন্মধ্যে: কুরআনুল কারীম যেসব দলিল নিয়ে এসেছে তা চূড়ান্ত পর্যায়ের স্পষ্ট, সাহিত্যপূর্ণ, শক্তিশালী, কাছাকাছি ও সহজ। প্রত্যেকে তা বুঝতে পারেন। এমনটি কোনো মানুষের কথার ক্ষেত্রে বলা যায় না। যেমন আল্লাহর বাণীতে রয়েছে: “এটা আল্লাহর সৃষ্টি! সুতরাং তিনি ছাড়া অন্যরা কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও। বরং যালিমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।” [লুকমান: ১১] অন্যত্র আল্লাহ বলেন: “যদি এতদুভয়ের (আসমান ও যমীনের) মধ্যে আল্লাহ্ ব্যতীত আরো অনেক ইলাহ থাকত, তাহলে উভয়ই বিশৃংখল হত। অতএব, তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ্ কতই না পবিত্র।” [আল-আম্বিয়া: ২২] কুরআনের দলিলগুলো যেমন কোনো অবস্থাতেই বাতিলকে প্রমাণ করে না, তেমন তার দলিলগুলো শক্তিশালী হওয়ার কারণে কখনো খন্ডন অথবা প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর বলুন, ‘হক এসেছে ও বাতিল বিলুপ্ত হয়েছে; ‘নিশ্চয় বাতিল বিলুপ্ত হওয়ারই ছিল।” [আল-ইসরা: ৮১]
তন্মধ্যে: আল-কুরআন হলো দু’জাহানের রবের কালাম এবং প্রত্যেকের জন্যে তা সহজ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর অবশ্যই আমি কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি উপদেশ গ্রহণের জন্য, অতএব উপদেশ গ্রহণকারী কেউ আছে কি?” [আল-কামার: ১৭] আর মানুষের চিরাচরিত নিয়ম থেকে জানা যায়নি যে, কেউ একটি কিতাব লিখবেন আর তা সবার জন্যে সহজ হবে এবং তার দ্বারা সবাইকে সম্বোধন করা যাবে। কাজেই এ বৈশিষ্ট্য আল-কুরআন ছাড়া কোনো কিছুর জন্য হতে পারে না।
তন্মধ্যে: আল-কুরআনুল আজীম বিকৃতি ও পরিবর্তন থেকে সুরক্ষিত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমি অবশ্যই তার সংরক্ষক।” [আল-হিজর : ৯] আল্লাহ কিয়ামত পর্যন্ত তার জন্য স্থায়ীত্ব ও অমরত্ব অবধারিত করে দিয়েছেন। কাজেই এই স্থায়ীত্ব, অমরত্ব ও পরিবর্তন না হওয়া প্রজ্ঞাময় প্রশংসিতের পক্ষ থেকে তার নাযিল হওয়া প্রমাণ করে। মহাসত্য আল্লাহ বলেন, “তবে কি তারা কুরআনকে গভীরভাবে অনুধাবন করে না? যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত, তবে তারা এতে অনেক অসঙ্গতি পেত।” [আন-নিসা : ৮২]
এক দিকে কুরআন স্থায়ী, অমর ও সংরক্ষিত অপর দিকে নতুন নতুন বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও আবিষ্কার। তবু আমরা এমন কোনো ইলম পাইনি কুরআন যা নিয়ে এসেছে তার সাথে যার দ্বন্দ্ব রয়েছে। বরং কুরআনের যেখানে জ্ঞান-বিজ্ঞানের কোনো বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞান সেখানে কুরআনের সাথে একমত পোষণ করেছে। যেমন আসমানের সৃষ্টি, মানুষের সৃষ্টি প্রভৃতি।
তন্মধ্যে: আল-কুরআন সরল, সুদৃঢ় পথের হিদাযেত করে, যা প্রত্যেক কল্যাণকে অন্তর্ভুক্তকারী। এটি স্রষ্টা ও সৃষ্টি, দুনিয়া ও আখিরাত, জিন ও মানুষ, আদেশ ও নিষেধ, আদব ও ওয়াজিব, জান্নাত ও জাহান্নামের সংবাদ সম্বলিত। এটি ঈমান, আমল ও প্রতিদানকে অন্তর্ভুক্তকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “এ কিতাবে আমি কোনো কিছুই বাদ দেইনি।” [আল-আন‘আম: ৩৮] তিনি আরো বলেন, “নিশ্চয় এ কুরআন হিদায়াত করে সে পথের দিকে যা সরল-সুদৃঢ়।” [আল-ইসরা : ৯]
তন্মধ্যে: আল-কুরআনুল কারীম রোগসমূহের প্রতিষেধক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে লোকসকল! তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের কাছ থেকে এসেছে উপদেশ ও অন্তরসমূহে যা আছে তার আরোগ্য এবং মুমিনদের জন্য হিদায়াত ও রহমত।” [ইউনুস : ৫৭] মানবজাতির কথার মধ্যে এমন কোনো কথা নেই যা হৃদয় ও দেহের রোগের নিরাময় দিতে পারে যেমন এই মহান কোরআনে রয়েছে যা দু’জাহানের রবের কালাম।
তন্মধ্যে: আল্লাহ জিন ও মানুষের প্রতি এই কুরআনের মত কুরআন অথবা তার একটি সূরার মত সূরা নিয়ে আসার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নাকি তারা বলে, ‘সে এটা নিজে রটনা করেছে?’ বলুন, ‘তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সূরা রচনা করে নিয়ে আস এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য যাকে পার ডেকে নাও।” [ইউনুস : ৩৮] তিনি আরো বর্ণনা করেছেন যে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, “আর এ কুরআন আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো রচনা হওয়া সম্ভব নয়। বরং এর আগে যা নাযিল হয়েছে এটা তার সত্যায়ন এবং কিতাবের বিশদ ব্যাখ্যা। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা সৃষ্টিকুলের রবের পক্ষ থেকে।” [ইউনুস : ৩৭]
তন্মধ্যে: এই কুরআন পূর্বের জাতিসমূহের ঘটনা যেমন সংঘটিত হয়েছে তেমন আমাদের কাছে বর্ণনা করে। এমন ছিল না যে, তাদের ঘটনাগুলো মক্কায় প্রচারিত ছিল আর আল্লাহ তা আমাদেরকে বর্ণনা করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণীতে এসেছে: “আমি আপনার কাছে উত্তম কাহিনি বর্ণনা করছি, ওহীর মাধ্যমে আপনার কাছে এ কুরআন পাঠিয়ে; যদিও এর আগে আপনি ছিলেন অনবহিতদের অন্তর্ভুক্ত।” [ইউসূফ: ৩] এটি সাক্ষী যে, এই কিতাব প্রশংসিত প্রজ্ঞাময়ের পক্ষ থেকে।
তন্মধ্যে: রব্বানী শরীয়ত, গায়েবী সংবাদ এবং চূড়ান্ত পর্যায়ের সাহিত্য ও স্পষ্ট বর্ণনা সম্বলিত এই আল-কুরআন নিয়ে এসেছেন একজন নিরক্ষর রাসূল, যিনি পড়তে ও লিখতে জানেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর আপনি তো এর আগে কোনো কিতাব পড়েননি এবং নিজ হাতে কোনো কিতাবও লেখেননি যে, বাতিলপন্থীরা সন্দেহ পোষণ করবে।” [আল-আনকাবূত: ৪৮] তিনি আরো বলেন, “যারা অনুসরণ করে রাসূলের, উম্মী নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জীলে লিপিবদ্ধ পায়।” [আল-আরাফ: ১৫৭]
তন্মধ্যে: আল-কুরআনুল কারীম থেকে একটি সূরা দীর্ঘ বিরতিতে ও বিভিন্ন স্থানে নাযিল করা হয়, তবু তা এমনভাবে পড়া হয় যেন এক সাথেই নাযিল করা হয়েছে। পক্ষান্তরে মানুষের চিরাচরিত স্বভাব হলো যে, তারা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কিতাব রচনা করলে তাদের যোগ্যতা ও বর্ণনাভঙ্গির ভিন্নতা প্রকাশ পায়।
তন্মধ্যে: আল্লাহ যেমন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরআন দান করেছেন তেমন সুন্নাত দান করেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “জেনে রাখো! আমাকে কিতাব এবং তার সঙ্গে অনুরূপ কিছু দেয়া হয়েছে।” {আবূ দাউদ (৪৬০৪), তিরমিযী (২৬৬৪), ইবনু আবি শায়বাহ, আল-মুসান্নাফ (২৪৮১৬), আল-মুসনাদ (৯২৭) এবং আহমাদ (১৭১৭৪)}
তন্মধ্যে: কুরআন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তারই নির্দেশ দেয় যা হওয়া উচিত অথবা যা তার করা ওয়াজিব। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণীতে রয়েছে: “আল্লাহর পূর্ব বিধান না থাকলে তোমরা যা গ্রহণ করেছ সে জন্য তোমাদের উপর মহাশাস্তি আপতিত হত।” [আল-আনফাল: ৬৮] আল্লাহ তা‘আলার আরেকটি বাণী: “হে নবী! আল্লাহ্ আপনার জন্য যা বৈধ করেছেন আপনি তা নিষিদ্ধ করছেন কেন? আপনি আপনার স্ত্রীদের সস্তুষ্টি চাচ্ছেন; আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আত-তাহরীম: ১] তাঁর আরেকটি বাণী: “তিনি ভ্ৰকুঞ্চিত করলেন এবং মুখ ফিরিয়ে নিলেন,* কারণ তাঁর কাছে অন্ধ লোকটি আসল।* আর কিসে আপনাকে জানাবে যে, --- সে হয়ত পরিশুদ্ধ হত,* অথবা উপদেশ গ্ৰহণ করত, ফলে সে উপদেশ তার উপকারে আসত।* আর যে পরোয়া করে না,* আপনি তার প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন।* অথচ সে নিজে পরিশুদ্ধ না হলে আপনার কোন দায়িত্ব নেই।” [আবাসা: ১-৭] আল্লাহর আরেকটি বাণী: “আর আমি অবিচলিত না রাখলে আপনি অবশ্যই তাদের দিকে প্রায় কিছুটা ঝুঁকে পড়তেন;* তাহলে অবশ্যই আমি আপনাকে ইহজীবনে দ্বিগুন ও পরজীবনে দ্বিগুণ শাস্তি আস্বাদন করাতাম; তখন আমার বিরুদ্ধে আপনার জন্য কোন সাহায্যকারী পেতেন না।” [আল-ইসরা: ৭৪,৭৫] কুরআন যদি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে হত তাহলে তো এটি তিনি নিজের বিপক্ষে রচনা করতেন না। কুরআনে যেহেতু নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি এ ধরনের নির্দেশনা বর্ণিত হয়েছে, তাই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয় যে, এটা তার পক্ষ থেকে নয়। বরং তা সবজান্তা প্রজ্ঞাময়ের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।
পর্ব: নবী ও রাসূলগণ -আলাইহিমুস সালাম-।
পর্বটির সারাংশ
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করা আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ঈমানের রোকনসমূহের চতুর্থ রোকন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, রাসূলগণের দাওয়াতের মূল ভিত্তি ছিল আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর নাম, সিফাত ও কর্মসমূহ সম্পর্কে ইলম। তারা সকলেই তাওহীদসহ প্রেরিত হয়েছেন এবং তারা সকলে এক আল্লাহর ইবাদত করা ও তিনি ছাড়া অন্যদের ইবাদত পরিত্যাগ করার দাওয়াত দিয়েছেন। কাজেই তাওহীদ ও ঈমানের বিবেচনায় নবী ও রাসূলগণ মানুষের ভেতর সবচেয়ে পরিপূর্ণ। তারাই স্রষ্টা সম্পর্কে এবং তার জন্য যা বাঞ্চনীয় ও যা বাঞ্ছনীয় নয় তা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশী জানেন।
প্রত্যেক নবী তার কওমকে দু’টি মূলনীতির প্রতি দাওয়াত দিয়েছেন, তা হলো: এক আল্লাহর ইবাদত করা এবং পরকাল দিবস ও তাতে আল্লাহ তাঁর অলীদের জন্য যেসব নিআমত ও তার শত্রুদের জন্যে যেসব শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন তার প্রতি ঈমান আনয়ন করা।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবীগণ সকলেই বড় বড় মৌলিক বিষয়ে একমত ছিলেন যার দিকে তারা সবাই আহ্বান করেছেন। তারা সবাই আল্লাহ, মালায়েকা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল দিবস এবং তাকদীরের ভালো ও মন্দের প্রতি ঈমানের দাওয়াত দিয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই মৌলিক ইবাদতের প্রতি যেমন সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ ও প্রশংসিত আচরণের প্রতি আহ্বান করেছেন এবং মৌলিক নিন্দিত আচরণ থেকে নিষেধ করেছেন। অতএব নবীগণ সকলেই মৌলিক বিষয়ে একমত ছিলেন, তবে তারা যেসব শরীয়তের দিকে আহ্বান করেছেন তার বিধি-বিধান ও ব্যাখ্যা ভিন্ন ভিন্ন ছিল।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, সকল নবী আলাইহিমুস সালামদের প্রতি ঈমান আনা, তারা গায়েব সম্পর্কে যেসব সংবাদ দিয়েছেন তাতে তাদেরকে সত্যারোপ করা, যেসব বিষয়ে আদেশ বা নিষেধ করেছেন তা যথাযথ মেনে চলা, তাদেরকে মহব্বত করা, সম্মান করা, অনুসরণ করা এবং তারা যে রিসালাত পৌঁছিয়েছেন, আমানত আদায়, আল্লাহ ও বান্দাদের জন্যে নসিহত পেশ এবং আল্লাহর রাস্তায় যথাযথ জিহাদ করেছেন প্রভৃতিতে তার সাক্ষ্য প্রদান করা ওয়াজিব। প্রত্যেক উম্মতের কাছে যেই রাসূলকে প্রেরণ করা হয়েছে তার শরীয়ত মোতাবেক আমল করা তাদের ওপর ওয়াজিব। আর এই উম্মত অর্থাৎ উম্মতে মুহাম্মাদীর জিন ও মানুষদের ওপর নবী ও রাসূলগণের সর্বশেষ নবী ও রাসূল মুহাম্মাদের শরীয়তের ওপর আমল করা ওয়াজিব। কারণ, তিনি সকল জিন ও মানুষের নিকট প্রেরিত হয়েছেন।
সকল নবী ও রাসূল মানুষদেরকে কুফর, শিরক ও মূর্খতার অন্ধকার থেকে বের করার জন্যেই এসেছেন। যদিও তারা কেউ কেউ দুনিয়াবী জীবনে সম্মান, রাজত্ব ও ক্ষমতাবান ছিলেন, কেউ কষ্ট-মসিবতে ছিলেন, কেউ ক্ষেত-খামার ও শিল্প-কারখানায় করেছেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাদেরকে সুসংবাদতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছেন, যেন রাসূলদের পর আল্লাহর ওপর মানুষদের জন্য কোনো প্রমাণ বাকি না থাকে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ প্রত্যেক উম্মতের নিকট রাসূল প্রেরণ করেছেন, তাদের থেকে যার নাম জানব তার ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব, আর যার নাম না জানব তাদের ওপরও সমষ্টিকভাবে ঈমান আনয়ন করব। কাজেই প্রত্যেক মুসলিম নর ও নারীর ওপর সকল নবী ও রাসূলদের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব। যে ব্যক্তি একজন নবীকে অস্বীকার করল সে সকল নবীকে অস্বীকার করল।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাঁর হিকমতের দাবী মোতাবেক তাঁর বান্দাদের থেকে যাদের কাছে ইচ্ছে রাসূল প্রেরণ করেন। তাঁর আদেশ রদ করার কেউ নেই, তিনি যা চান তাই করেন ও মনোনীত করেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবুওয়ত হলো ইলাহী অনুগ্রহ এবং রাব্বানী রহমত। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের থেকে যাকে চান তাকেই তা দান করেন। বস্তুত আল্লাহ মালায়েকা ও মানুষদের থেকে রাসূলদের মনোনীত করেন।
নবী ও রাসূলগণ আলাইহিমুস সালাম একে অপরের চেয়ে শ্রেষ্টত্বের অধিকারী। তাদের ভেতর সবচেয়ে উত্তম হলো উলুল আজম নবীগণ। তাদের ভেতর উত্তম হলো দুই খলীল: ইবরাহীম ও মুহাম্মাদ আলাইহিমাস সালাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাতীয়তা, পক্ষপাত অথবা হেয় প্রতিপন্ন করার নিমিত্তে নবীগণের মাঝে শ্রেষ্টত্ব দিতে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ যেমন ইবরাহীম ও মুহাম্মাদ আলাইহিমাস সালামকে খলীল হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তেমন তাঁর রিসালাত ও কালামের জন্য মূসা আলাইহিস সালামকে মনোনীত করেছেন ও তাকে মানুষের ওপর বাছাই করেছেন। আমাদের নবী মুহাম্মাদ খুল্লাহ (ঘনিষ্ঠ বন্ধু) হওয়ার এবং ইসরার রাতে পর্দার আড়াল থেকে তার রবের সাথে কথা বলার মর্যাদাও হাসিল করেছেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবীগণ হলেন মানুষদের মধ্যে সর্বোত্তম। কেউ নবীর মর্যাদায় উপনীত হতে পারে না; না অলী, না অন্য কেউ। কোনো মানুষকে কোনো নবীর ওপর শ্রেষ্টত্ব প্রদান করা বৈধ নয়। নবুওয়ত উপার্জন করার বিষয় নয়। কোনো বান্দা প্রচুর ইবাদত করে, আত্মশুদ্ধি ও মুজাহাদা করে, অন্তরকে পরিশুদ্ধ ও পবিত্র করে এবং আচার-আচরণকে সুগঠিত করে নবুওয়ত লাভ করতে পারে না।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ পুরুষ ছাড়া কাউকে রেসালাত দিয়ে প্রেরণ করেননি। আরো ঈমান আনয়ন করি যে, নবীগণ অন্যান্য মানুষের মতই মানুষ। তারা ধর্মীয়, বিবেক ও আচরণে মানুষের ভেতর সবচেয়ে পরিপূর্ণ, তবে তাদের কাছে ওহী করা হয়। তারা আল্লাহর বিধান পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নিষ্পাপ। যদি কোনো নবী এমন বিষয়ে গবেষণা করেন যে বিষয়ে ওহী করা হয়নি আর তাতে তিনি ভুল করেন, তাহলে আল্লাহ তাকে তার ভুল গবেষণার ওপর রাখেন না, বরং তাকে শুধরানোর জন্য তার ওপর ওহী নাযিল করেন।
নবী ও রাসূলগণ নিজেরা নিজেদের উপকার ও অপকার করার ক্ষমতা রাখেন না, যদিও তাদের জন্য রয়েছে অনেক উঁচু স্থান, সুউচ্চ মর্যাদা এবং দুনিয়া ও আখিরাতে প্রশংসিত স্থান। কাজেই যখন তারা নিজেদের উপকার ও অপকার করার ক্ষমতা রাখেন না, তখন অন্যদেরতো প্রশ্নই আসে না। তারা তাদের জীবিত অবস্থায় যখন নিজেদের ও অন্যদের উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা রাখেন না, তখন মৃত্যুর পর অন্যদের উপকার বা অপকার করার ক্ষমতা রাখার প্রশ্নই আসে না।
তারা গায়েব জানেন না, তবে ততটুকুই আল্লাহ তাদেরকে যতটুকু জানান এবং যতটুকুর ব্যাপারে অনুমতি প্রদান করেন।
নবী ও রাসূলগণ ভয় ও আশা নিয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন এবং তারা আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতালার নৈকট্যে পৌঁছার উপায় অনুসন্ধান করেন ও তার নিকটবর্তী হন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, মানুষেরা যে অসুখ ও মুসিবতের সম্মুখীন হন নবী ও রাসূলগণও তার সম্মুখীন হন। তাদেরও দুশ্চিতা ও মৃত্যু স্পর্শ করে। তাদের স্ত্রী ও সন্তান থাকে। তারা পানাহার করেন ও বাজারে চলাচল করেন। আমরা জানি যে, মাসীহ আলাইহস সালামকে যখন তার কওম হত্যা করার ইচ্ছে করে তখন আল্লাহ তাকে জীবিত ওঠিয়ে নেন।
আমরা সাক্ষ্য দেই যে, তারা মাখলূকের কল্যাণ কামনা করেছেন, আমানত আদায় করেছেন এবং তারা তাদের রবের রিসালাত পৌঁছিয়েছেন। তাদের ডাকে অনুসারীদের সাড়া না দেওয়া এবং তাদের ওপর নেতাদের অহঙ্কার করা তাদের কোনো ক্ষতি করে না।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ প্রত্যেক নবীকে অনেক নিদর্শন ও প্রমাণ প্রদান করেছেন যার ওপর মানুষেরা ঈমান আনয়ন করে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ কোনো নবীকে তার সত্যতার ওপর প্রমাণ ছাড়া প্রেরণ করেননি, আমরা তা জানি বা না-জানি। তবে আল্লাহ আল-কুরআনে তার কিছু আমাদের জন্য উল্লেখ করেছেন। আমরা আরো জানি যে, অনেক নিদর্শন রয়েছে যার দ্বারা আল্লাহ তার পূর্ববর্তী নবীদেরকে শক্তিশালী করেছেন, যা তিনি আমাদের জন্য উল্লেখ করেননি। আল্লাহ কখনো স্পষ্ট নিদর্শন উল্লেখ করেন আর কখনো প্রমাণ উল্লেখ করেন। আমরা জানি যে, আল্লাহ যেসব নিদর্শন ও প্রমাণ দ্বারা তাঁর নবী ও রাসূলগণকে সমর্থন ও শক্তিশালী করেছেন তার সংখ্যা অনেক।
তাদের সত্যতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো যে, তারা সেই তাওহীদের প্রতি তাদের আহবান করেন যা মানুষের স্বভাবের মধ্যে প্রগাঢ়ভাবে অবস্থিত, যার সৌন্দর্যের ওপর বিবেকসমূহ সাক্ষ্য দেয় এবং তারা যে উপকারী ইলম, নেক আমল, হিদায়েত, সত্য দীন ও মিজান নিয়ে এসছেন তার ওপর সাক্ষ্য দেয়। রাসূলদের সত্যতার ওপর আল্লাহ তাআলারও সাক্ষ্য রয়েছে যে, তারা সত্যের ওপর রয়েছেন এবং তারা যা নিয়ে এসছেন তাও সত্য। নবীগণের সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো অহী, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর নাযিল হয়। আর অহীর ভেতর সবচেয়ে বড় হলো আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিদর্শন আল-কুরআনুল আজীম। এই অহীর মত কিছু পেশ করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভবপর নয়। কারণ, তা আল্লাহর কালাম ও তাঁর অহী এবং তাতে রয়েছে গায়েবী সংবাদ, হিদায়েত, নূর, রহমত ও হিকমত।
আল্লাহ্ যা দিয়ে তাঁর রাসূলগণকে শক্তিশালী করেছেন তার মধ্যে রয়েছে যুক্তিপূর্ণ প্রমাণ, যা দ্বারা আল্লাহ্ তাদেরকে সাহায্য করেন। ফলে কাফির লা-জাওয়াব হয় এবং তার মিথ্যা ধ্বংস হয়।
তাদের বড় নিদর্শনগুলোর ভেতর রয়েছে গায়েব সম্পর্কে সংবাদ প্রদান করা, যে সংবাদ দিতে আল্লাহ তাদেরকে অনুমতি দেন। তন্মধ্যে: পূর্ববর্তী নবীগণ ও তাদের অনুসারীদেরকে তাদের শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তি প্রদান করা, দাম্ভিক বিদ্বেষপোষণকারীদের ধ্বংস করা এবং পূর্ববর্তীদের সাথে কী আচরণ করা হয়েছিল যাদেরকে দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে তাদেরকে তা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। কারণ, আল্লাহর নীতি চলমান। তন্মধ্যে: তাদের পরিপূর্ণ স্বভাব এবং তাদের সুন্দর আচরণ, কর্ম ও জীবন চরিত এবং তাদের সত্য কথন বলে তাদের পক্ষে মিথ্যা কথা বলা অসম্ভব। তন্মধ্যে: নবীগণের নিদর্শন এবং তারা যেসব ইলম, হিদায়েত ও সত্য দ্বীন নিয়ে এসেছেন তা বর্ণনায় অনেক সূত্রের সমাহার, যা প্রমাণ করে যে, তাদের সবাই মিলে মিথ্যা বর্ণনা করা অসম্ভব। তন্মধ্যে: নবীগণ তাদের রিসালাতের ওপর কোনো বিনিময় চান না এবং তারা রাজত্বও অন্বেষণ করেন না। তন্মধ্যে: নবীগণের নবুওয়তে ছিদ্রান্বেষণ করেছেন এমন কাউকে না পাওয়া যাওয়া, তবে মূর্খ ছাড়া যে তাদের আনীত দ্বীন, ইলম ও হিদায়েতে দৃষ্টি দেয়নি, অথবা দাম্ভিক বিদ্বেষপোষণকারী ছাড়া।
তাদের আরো বড় নিদর্শন হলো ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য দলিল যা চোখ প্রত্যক্ষ করে এবং বিবেক সমর্থন করে, যেমন নূহের কওমের ডুবে যাওয়া, সালাহের উট এবং হুদের তার কওমের সবাই মিলে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া, আগুন থেকে ইবরাহীমের মুক্তি এবং মুসার নিদর্শনসমূহ, তন্মধ্যে: লাঠি, টিড্ডি, উকুন, ব্যাঙ, রক্ত, তুফান এবং ফিরআউন ও তার কওমের ডুবে মারা যাওয়া, এবং দাউদ আলাইহিস সালামের নিদর্শনসমূহ, যেমন পাহাড়ের তাসবীহ পাঠ করা, লোহা নরম হয়ে যাওয়া, এবং সুলাইমান আলাইহিস সালামের নিদর্শনসমূহ, যেমন তার জন্য জিন ও বাতাসকে অনুগত করে দেওয়া, পাখিদের কথা বুঝা, এবং ঈসা মাসীহ আলাইহিস সালামের নিদর্শনসমূহ, যেমন : কুষ্ঠরোগী, জন্মান্ধ ও অন্ধকে ভালো করা এবং মৃতকে জীবিত করা। আর তিনি মাটির দ্বারা পাখির আকৃতি তৈরি করতেন এবং তাতে ফুঁ দিতেন, ফলে আল্লাহর অনুমতিতে তা পাখি হয়ে যেত। এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিদর্শনসমূহ। আর এর সংখ্যা অনেক, যা বিনা কষ্টে গণনা করা সম্ভব নয়, যেমন চাঁদ দু টুকরো হওয়া, ইসরা ও মিরাজ, খাবার বেড়ে যাওয়া, চতুষ্পদ জন্তুর কথা বলা, পাথরের তাসবীহ পাঠ করা, খেজুর গাছের কান্ডের ক্রন্দন করা এবং শত্রুর বিপক্ষে তাকে আল্লাহর সাহায্য করা, ইত্যাদি।
নবীগণের আরো নিদর্শন হলো: সত্যের দিকে আহ্বানকারী নবীর অবস্থা। কারণ, মানুষেরা স্বীয় কথায় সত্যবাদী ও সত্যের দিকে আহ্বানকারীর কথার মাঝে এবং স্বীয় কথায় মিথ্যাবাদী ও মিথ্যার দিকে আহ্বানকারীর মাঝে পার্থক্য করতে জানে। ... এ ছাড়া আরো অনেক নিদর্শন রয়েছে।
নবীগণের সব নিদর্শন মুছে গেছে, কেবল আল-কুরআন ও আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত বাদে। এই দু’টি এখনো বাকি। কারণ, এ দু’টো হলো অহী, যা হিফাজত করার দায়িত্ব আল্লাহ নিজে গ্রহণ করেছেন। এ দু’টোতে রিসালাতের সত্যতা ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতার সবচেয়ে বড় দলিল ও প্রমাণ নিহিত রয়েছে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাঁর হিকমতের দাবি মোতাবেক পার্থিব ও শরয়ী বিভিন্ন নিদর্শন ও দলিল দ্বারা তাঁর রাসূলগণকে সমর্থন ও শক্তিশালী করেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে যাকে চান হিদায়েত দান করেন এবং যাকে চান ইনসাফের ভিত্তিতে গোমরাহ করেন। তবে নিদর্শনগুলো বিদ্বেষ পোষণকারীদের বিদ্বেষ ও দাম্ভিকতাই বৃদ্ধি করে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ চাইলে সকল মানুষকে হিদায়েত দিয়ে দিতেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবীগণ যেসব নিদর্শন ও দলিল নিয়ে এসেছেন এবং আল্লাহ তাদেরকে যেসব প্রমাণ দিয়ে শক্তিশালী করেছেন, তা কোনো নবুওয়তের দাবিদার অথবা যাদুকর অথবা মিথ্যাবাদীর পক্ষে পেশ করা সম্ভব নয়। কারণ, আল্লাহ সিদ্ধান্ত করেছেন যে, কোনো বাতিলকে সত্য দলিল দ্বারা সাহায্য করবেন না এবং সত্য দলিল দ্বারা কোনো মিথ্যাবাদীকে সত্যারোপ করবেন না। কারণ, তিনি তাঁর শরীয়ত ও নির্দেশ হিকমতপূর্ণ। আল্লাহর চলমান হিকমত ও সুন্নাত তা নিষেধ করে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ দু’জাহানের রবের রাসূল। তিনি সর্বশেষ নবী ও রাসূল। আদম সন্তানদের সরদার ও দু’জাহানের রবের খলীল (ঘনিষ্ঠ বন্ধু)।
আমরা জানি যে, তাকে এতো নিদর্শন দেওয়া হয়েছে যা অন্যান্য রাসূলদের কাউকে দেওয়া হয়নি। তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো আল-কুরআন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বপ্রথম ঘুমের ভেতর নেক স্বপ্ন দ্বারা অহী শুরু করা হয়। তিনি কোনো স্বপ্ন দেখলে ভোর বিদীর্ণ হওয়ার মতই তা বাস্তবায়িত হত। অহী থেকে তার ওপর সর্বপ্রথম সূরা আলাকের প্রথমাংশ অবর্তীণ হয়। তারপর নাযিল হয় আল-মুদ্দাস্সির। তারপর অহী চালু হয় এবং ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে। তিনি মক্কায় ১৩ বছর অবস্থান করে তাওহীদের দিকে দাওয়াত দিয়েছেন। আর মদিনায় ১০ বছর অবস্থান করে আল্লাহর শরীয়ত বর্ণনা, তাঁর দ্বীনের দিকে আহ্বান ও তাঁর রাস্তায় জিহাদ করেন। অবশেষে ৬৩ বছর বয়সে আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করেন -আমার মা ও বাবা তার প্রতি উৎসর্গ হোক-।
আমরা জানি যে, আল-কুরআনের পর তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো ইসরা ও মিরাজ। তার আরেক নিদর্শন হলো চাঁদ দু’টুকরো হওয়া। আল্লাহ তাকে আরো অনেক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত করেছেন। আলেমগণ এসব বৈশিষ্ট্য কখনো তাদের কিতাবের বিষয়বস্তুর সাথে উল্লেখ করেছেন। আবার কখনো তা স্বতন্ত্রভাবে রচনা করেছেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, তার ওপর জিন ও ইনসানের প্রত্যেকের ঈমান আনয়ন করা আবশ্যক, তিনি যে সংবাদ দিয়েছেন তা বিশ্বাস করা এবং তিনি যা নির্দেশ দিয়েছেন তা মেনে নেওয়া ওয়াজিব।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, তিনি যা অনুমোদন দিয়েছেন তা ভিন্ন অন্য পদ্ধতিতে আল্লাহর ইবাদত করা যাবে না। আল্লাহ আমাদেরকে তার বিরোধিতা থেকে সতর্ক করেছেন এবং তাকে সম্মান ও মহব্বত করতে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রত্যেক ব্যক্তির নিকট তার নিজের নফস, পিতা, সন্তান ও সকল মানুষের চেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশী প্রিয় হওয়া ওয়াজিব।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা দুই সাক্ষী ও আযানে নিজের নামের সাথে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম মিলিত করেছেন। পূর্বের কিতাবসমূহ ও আল-কুরআনে তার নাম অনেকবার উল্লেখ হয়েছে। আর ইসলামের ইমামগণ তার সুন্নাত, সীরাত, অবয়ব, আখলাক-আচরণ ও যুদ্ধসমূহের ওপর বিভিন্ন প্রকার কিতাব রচনা করেছেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাকে সকল মাখলূকের নিকট প্রেরণ করেছেন। তিনি জিন ও ইনসান (মানুষ) উভয় শ্রেণির নিকট প্রেরিত রাসূল। আল্লাহ তা‘আলা জিনদের এক শ্রেণিকে তার নিকট শোনার জন্যে প্রেরণ করেছেন, যেন তারা তাদের পশ্চাতে থাকা জাতির জন্য সতর্ককারী হয় এবং তাদের ওপর প্রমাণ সাব্যস্ত হয়। আল্লাহ প্রত্যেক নবী ও রাসূলদের থেকে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করেছেন যে, যদি তাদের জীবদ্দশায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রেরিত হয় তারা অবশ্যই তার ওপর ঈমান আনয়ন করবে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবীগণ তাদের কওমকে তার সুসংবাদ দিয়েছেন। তাওরাত ও ইঞ্জিলে তার সিফাত ও তার সাহাবীদের সিফাত বর্ণিত হয়েছে। বিশেষভাবে মাসীহ আলাইহিস সালাম বনু ইসরাইলকে তার সুসংবাদ দিয়েছেন। বনু ইসরাইল নিজের সন্তানদের চেনার মতই তাকে চিনতেন। কিতাবীদের নিকট তার নবুওয়তের যে আলামত পরিচিত ছিল তা হলো তার পবিত্র কাঁধের ওপর নবুওয়তের মোহর।
আমরা তার রিসালাতের ব্যাপকতায় বিশ্বাস করি। এই জন্য তিনি এক আল্লাহর ইবাদত এবং তার রিসালাতের প্রতি ঈমান ও তাকে সত্যারোপ করার আহ্বান জানিয়ে রাজা-বাদশাহ ও নেতাদের নিকট পত্র পাঠিয়েছেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ আমাদের নবীর জন্য জমিনকে গুটিয়ে দিয়েছিলেন, ফলে সে পর্যন্ত দেখেছিলেন যে পর্যন্ত তার উম্মতের রাজত্ব পৌঁছবে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের ব্যাপকতার আরেকটি দলিল হলো, নাজরানের খৃস্টানদের মোবাহালা থেকে ফিরে আসা এবং নত স্বীকার করে জিজিয়া প্রদান করতে সম্মত হওয়া। কারণ, তারা জানতো তিনি নবী।
তার রিসালাতের ব্যাপকতার আরেকটি দলিল হলো, অনেক ইহুদী পাদ্রী ও খ্রিস্টান সন্ন্যাসীর ইসলাম গ্রহণ করা, বরং ইসলামের দিকে ধাবিত হওয়া হাজার হাজার কিতাবী। তার রিসালাতের ব্যাপকতার আরেকটি দলিল হলো, তিনি রোমকদের সাথে যুদ্ধ করেছেন এবং তার সাহাবীদেরকে তার পরে পারস্য ও রোমকদের সাথে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তার রিসালাতের ব্যাপকতার আরেকটি দলিল হলো, তিনি সুরাকাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, সে অচিরেই কিসরার দুটি চুরি/ব্রেসলেট পরবে। ফলে ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর খিলাফতকালে তিনি তা পরিধান করেছিলেন।
আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, আল্লাহর হিকমতের দাবি: তিনি যাকে চান নিজ অনুগ্রহে হিদায়েত দান করেন, আর যাকে চান নিজ ইনসাফের ভিত্তিতে গোমরাহ করেন। যেমন তার হিকমতের দাবি হলো, প্রত্যেক নবীর জন্য দুশমন হওয়া এবং এসব দুশমন বাতিলের ওপর একে অপরকে অসিয়ত করবে এবং তাদের কথায় মিল থাকবে। কাজেই প্রত্যেক উম্মতের দাম্ভিক নেতাদের কথা সামঞ্জস্যশীল: একসময় তারা বলেন: নবী হলেন যাদুকর অথবা গণক অথবা মিথ্যাবাদী। কখনো তাদের কাছে নবীর নিদর্শনসহ আসাকে অস্বীকার করেন, কখনো তারা ধারনা করেন যে, তিনি আল্লাহর ওপর মিথ্যা রচনা করেছেন। কখনো তারা তাকে পাগল বলে বিশেষিত করেন—আল্লাহর রাসূল আলাইহিস সালামগণ কখনো তা নয়— অথচ তারা মানুষের চেয়ে বিবেকে পরিপূর্ণ এবং অন্তরে বিশুদ্ধতম। কখনো তারা নবীগণ যে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করেন সেটাকে অসম্ভব মনে করে। কখনো তারা নবীর দাওয়াতকে তার ওপর প্রত্যাখ্যান করে। কারণ, তিনি তাদের মতই একজন মানুষ। কখনো তারা নবীদের কাছে এমন কিছু দাবি করে যা কোনো মাখলূকের সাধ্যের বিষয় নয়—কিন্তু অহংকার ও বিদ্বেষবশতঃ—যেমন তারা আমাদের নবীকে জমিন থেকে ফোয়ারা বের করার দাবি করেছে, অথবা তার বাগান হওয়াকে দাবি করেছে, অথবা তাদের ওপর আসমানকে টুকরো টুকরো করে নিক্ষেপ করার দাবি করেছে, অথবা তাদের নিকট আল্লাহ ও মালায়েকাদেরকে নিয়ে আসতে বলেছে, অথবা নবীর জন্য স্বর্ণের ঘর হওয়াকে দাবি করেছে, অথবা আসমানে ওঠা ও তাদের ওপর কিতাব নাযিল করার দাবি করেছে। কখনো তারা নবীর নিকট দাবি করেছে যে, তিনি যার ওয়াদা করেন তা এনে পেশ করুন। কখন তারা তাকে আল্লাহর রাস্তা থেকে বিরত রাখে এবং তাদের অনুসারীদের বলে: তোমরা এই কুরআন শ্রবণ করো না এবং হট্টগোল কর। কখনো তারা রাসূলকে মিথ্যার দ্বারা মোকাবিলা করে, অথবা তারা রাসূলকে অপবাদ দেয় যে, কোনো মানুষ হয়তো তাকে শিক্ষা দেয়, আর তার কাছে যা আসে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী নয়।
তারা কখনো এই কারণে রাসূলদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় যে, যারা তাদের অনুসরণ করছে তারা দুর্বল, গরীব। তারা কখনো রাসূলদের সাথে ঠাট্টা ও উপহাস করে, কখনো রাসূলকে ধোকা দেয় এবং তারা চায় যে, রাসূল তাদের সাথে আপোষ করুক অথবা তাদের দিকে ঝুঁকে যাক। কখনো তারা বাক্যের দ্বারা ধোকা দেয়, যাতে বিদ্বেষ পোষণকারী জানতে পারে তিনি তার কথায় মিথ্যাবাদী। যেমন ফিরআউন মূসাকে কাফির বলে সম্বোধন করেছে।
কখনো দাম্ভিক নেতারা নবীকে জমিন থেকে বের করে দেওয়ার হুমকি প্রদান করে। কুরাইশ কাফিররা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তার সাথে যারা ছিল ও বনু হাশিমকে গিরিপথে তিন বছর আবদ্ধ করে রেখেছিল এবং তাকে তার শহর থেকে বের করে দিয়েছিল। ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কওম তাকে আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু তাকে নাজাত দিয়েছেন। বনু ইসরাইল নবীদেরকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে, বরং তাদের অনেককেই হত্যা করেছে...
এই হলো রাসূলদের সাথে অহংকারকারীদের স্বভাব ও কর্মসমূহ। এটি একটি বিদ্যমান নীতি যা প্রত্যেক উম্মতের দাম্ভিকেরা তাদের সংস্কারকারীগণের সাথে করে থাকে।
অধ্যায়: রাসূলদের প্রতি ঈমান।
রাসূলগণ আলাইহিমুস সালামদের প্রতি ঈমান- ঈমানের চতুর্থ রোকন। মহান আল্লাহ বলেন, “রাসূল তার প্রভুর পক্ষ থেকে যা তার কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না।” [আল-বাকারাহ: ২৮৫] তিনি আরো বলেন, “ভালো কাজ শুধু এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভালো কাজ হল যে ব্যক্তি ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের উপরে।" [আল-বাকারাহ: ১৭৭] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, একদিন রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। এক ব্যক্তি তাঁর নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, ঈমান কী? তিনি বললেন, “আল্লাহ্তে ঈমান আনবে এবং তাঁর মালায়িকাহ ও কিতাবসমূহের প্রতি এবং তাঁর সাক্ষাত, রাসূলগণ এবং পুনরুত্থানের ওপর ঈমান আনবে।’’ {বুখারী (৪৭৭৭), মুসলিম (৯), ইবনু মাজাহ (৬৪)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, রাসূলদের দাওয়াতের মূল ভিত্তি হলো আল্লাহ তা‘আলা এবং তাঁর নাম, সিফাত ও কর্মসমূহ সম্পর্কে ইলম। তারা সবাই তাওহীদসহ প্রেরিত হয়েছেন এবং তারা এক আল্লাহর ইবাদত করা ও তিনি ছাড়া সবার ইবাদত পরিত্যাগ করার দাওয়াত দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর তোমার পূর্বে এমন কোনো রাসূল আমি পাঠাইনি যার প্রতি আমি এই ওহী নাযিল করিনি যে, ‘আমি ছাড়া কোনো (সত্য) ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমার এবাদত করো।” [আল-আম্বিয়া: ২৫] প্রত্যেক নবী তার কওমকে বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ব্যতীত তোমাদের অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই। তোমারা কি তাকওয়া অবলম্বন করবে না।” [আল-আরাফ: ৬৫] বস্তুত নবী ও রাসূলগণ তাওহীদ ও ঈমানে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে পরিপূর্ণ। তারা পবিত্র ও মহান স্রষ্টা সম্পর্কে এবং তাঁর জন্য কী বাঞ্চনীয় ও কী বাঞ্চনীয় না সবকিছু সম্পর্কে মানুষের চেয়ে বেশী জানেন।
প্রত্যেক নবী তার কওমকে দু’টি মূলনীতির প্রতি দাওয়াত দিয়েছেন, তা হলো: একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং পরকাল দিবসের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ও তাতে আল্লাহ তাঁর অলীদের জন্য যেসব নিআমত ও শত্রুদের জন্য যেসব শাস্তি প্রস্তুত করে রেখেছেন তার প্রতি ঈমান আনয়ন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “অবশ্যই আমি নূহ্কে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের কাছে। অতঃপর তিনি বলেছিলেন, 'হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।’ [আল-আরাফ: ৫৯] তিনি আরো বলেন, “আর মাদ্ইয়ানবাসীদের কাছে তাদের ভাই শু’আইবকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোনো সত্য ইলাহ্ নেই, আর মাপে ও ওজনে কম করো না; নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে কল্যাণের মধ্যে দেখছি, কিন্তু আমি তোমাদের উপর আশংকা করছি এক সর্বগ্রাসী দিনের শাস্তির।” [হুদ: ৮৪] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরো বলেন, “আর স্মরণ করুন, ‘আদ সম্প্রদায়ের ভাইয়ের কথা, যখন সে আহকাফে স্বীয় সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিল। যার আগে এবং পরেও সতর্ককারী এসেছিল (এ বলে) যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারোও ইবাদত করো না। নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।” [আল-আহকাফ: ২১]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবীগণ সকলেই দাওয়াতের ক্ষেত্রে বড় বড় সমস্ত মূলনীতিতে একমত ছিলেন। তারা সবাই আল্লাহ, মালায়েকা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, পরকাল এবং তাকদীরের ভালো ও মন্দের প্রতি ঈমানের দাওয়াত দিয়েছেন। তারা প্রত্যেকেই মৌলিক ইবাদত যেমন সালাত, যাকাত, সিয়াম, হজ ও প্রশংসিত আচরণের প্রতি আহ্বান করেছেন এবং মৌলিক নিন্দিত আচরণ থেকে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তিনি তোমাদের জন্য দ্বীন নির্ধারণ করেছেন, যার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন নূহকে। আর যা আমি অহী হিসেবে নাযিল করেছি তোমার কাছে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা এবং ঈসাকেও। এ বলে যে, তোমরা দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করো এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি করো না।” [আশ-শুরা : ১৩] অতএব নবীগণ সকলেই মৌলিক বিষয়গুলোতে একমত ছিলেন। তবে তারা যে শরীয়তের দিকে আহ্বান করেছেন তার বিধি-বিধান ও ব্যাখ্যা ভিন্ন ভিন্ন ছিল। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “আর আমি আপনার প্রতি সত্যসহ কিতাব নাযিল করেছি পূর্বেকার কিতাবসমূহের সত্যায়নকারী ও সেগুলোর তদারককারীরূপে। সুতরাং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন সে অনুযায়ী তাদের বিচার নিষ্পত্তি করুন এবং যে সত্য আপনার নিকট এসেছে তা ছেড়ে তাদের খেয়াল-খুশীর অনুসরণ করবেন না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটা করে শরীয়ত ও স্পষ্টপথ নির্ধারণ করে দিয়েছি।” [আল-মায়িদাহ : ৪৮]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, সকল নবীর প্রতি ঈমান আনা আবশ্যক। তারা গায়েব সম্পর্কে যেসব সংবাদ দিয়েছেন তাতে তাদেরকে সত্যারোপ করা এবং যেসব বিষয়ে আদেশ করেছেন তাতে তাদের আনুগত্য করা আর তারা যেসব বিষয় থেকে নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকা এবং তাদেরকে মহব্বত করা, সম্মান করা, তাদের অনুসরণ করা এবং তারা রিসালাত পৌঁছিয়েছেন, আমানত আদায় করেছেন এবং আল্লাহ ও বান্দাদের জন্য নসিহত পেশ করেছেন এবং আল্লাহর রাস্তায় যথাযথ জিহাদ করেছেন তার সাক্ষ্য প্রদান করাও ওয়াজিব। প্রত্যেক উম্মতের ওপর তাদের কাছে যেই রাসূল প্রেরণ করা হয়েছে তার শরীয়ত মোতাবেক আমল করা ওয়াজিব। আর এই উম্মতের ওপর অর্থাৎ উম্মতের মুহাম্মাদীর জিন ও মানুষের ওপর নবী ও রাসূলগণের সর্বশেষ মুহাম্মাদের শরীয়তের ওপর আমল করা ওয়াজিব। কারণ, তিনি জিন ও মানুষের নিকট প্রেরিত হয়েছেন।
সকল নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালাম মানুষদেরকে কুফর, শিরক ও মূর্খতার অন্ধকার থেকে বের করার জন্যেই এসেছেন। যদিও তারা দুনিয়াবী জীবনে সম্মানে, রাজত্বে, শক্তিতে, অপ্রতিরোধ্য ক্ষমতায়, ক্ষেত-খামার ও শিল্প-কারখানায় অবস্থান করেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা মূসা আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বলেছেন, “আর আমি মূসাকে আমার নিদর্শনসহ পাঠিয়েছিলাম এবং বলেছিলাম, ‘আপনার সম্প্রদায়কে অন্ধকার থেকে আলোতে নিয়ে আসুন, এবং তাদেরকে আল্লাহর দিনগুলোর দ্বারা উপদেশ দিন।’ এতে তো নিদর্শন রয়েছে প্রত্যেক পরম ধৈর্য্যশীল ও কৃতজ্ঞ ব্যক্তির জন্য। [ইবরাহীম: ৫] তিনি আরো বলেন, “তোমরা কি প্রতিটি উচ্চ স্থানে স্তম্ভ নির্মাণ করছ নিরর্থক?* আর তোমরা প্রাসাদসমূহ নির্মাণ করছ যেন তোমরা স্থায়ী হবে।* আর যখন তোমরা আঘাত হান তখন আঘাত হেনে থাক স্বেচ্ছাচারী হয়ে।” [আশ-শুআরা: ১২৮-১৩০] তিনি আরো বলেন, “তারা কি জমিনে ভ্রমন করে না? তাহলে তারা দেখত যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল। তারা শক্তিতে তাদের চেয়েও প্রবল ছিল। আর তারা জমি চাষ করত এবং তারা এদের আবাদ করার চেয়েও বেশী আবাদ করত। আর তাদের কাছে তাদের রাসূলগণ সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এসেছিল। বস্তুতঃ আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তাদের প্রতি যুলুম করবেন, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজদের প্রতি যুলম করত।” [সূরা রূম : ৯]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাদেরকে সুসংবাদতা ও সতর্ককারী রূপে প্রেরণ করেছেন, যেন রাসূলদের পর আল্লাহর ওপর মানুষদের জন্য কোনো প্রমাণ বাকি না থাকে। আল্লাহ বলেন: “সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণ আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আন-নিসা : ১৬৫]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ প্রত্যেক উম্মতের মাঝে রাসূল প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং পরিহার কর তাগূতকে।” [আন-নাহল: ৩৬] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “বনু ইসরাইলকে পরিচালিত করত নবীগণ। যখন একজন নবী মারা যেতেন তার পশ্চাতে আরেকজন নবী আসতেন। আর আমার পরে কোনো নবী নেই।” {বুখারী (৩৪৫৫), মুসলিম (১৮৪২), ইবনু মাজাহ (২৮৭১)} অধিকন্তু আল্লাহ আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন যে, আল্লাহ একই সময় কোনো এক গ্রামে তিনজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যখন আমি তাদের কাছে পাঠিয়েছিলাম দুজন রাসূল, তখন তারা তাদের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল, তারপর আমি তাদেরকে শক্তিশালী করেছিলাম তৃতীয় একজন দ্বারা। অতঃপর তারা বলেছিলেন, 'নিশ্চয় আমরা তোমাদের কাছে প্রেরিত হয়েছি।” [ইয়াসিন: ১৪]
আমরা তাদের থেকে যার নাম জানি তার প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব। আর আমরা তাদের থেকে যার নাম জানি না তার প্রতি মোটের ওপর ঈমান আনব। কাজেই সকল নবী ও রাসূল আলাইহিস সালামদের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর অনেক রাসূল, যাদের বর্ণনা আমি আপনাকে পূর্বে দিয়েছি এবং অনেক রাসূল, যাদের বর্ণনা আমি আপনাকে দেইনি। আর অবশ্যই আল্লাহ মূসার সাথে কথা বলেছেন।” [আন নিসা : ১৬৪] তিনি আরো বলেন, “রাসূল তার প্রভুর পক্ষ থেকে যা তার কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল।” [আল-বাকারাহ : ২৮৫] তিনি আরো বলেন, “বল, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং যা নাযিল করা হয়েছে আমাদের উপর, আর যা নাযিল হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাদের সন্তানদের উপর। আর যা দেয়া হয়েছে মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীকে তাদের রবের পক্ষ থেকে, আমরা তাদের কারো মধ্যে পার্থক্য করি না এবং আমরা তারই প্রতি আত্মসমর্পণকারী।” [আলে ইমরান : ৮৪]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাঁর হিকমতের দাবী মোতাবেক তাঁর বান্দাদের থেকে যাদের কাছে ইচ্ছে রাসূল প্রেরণ করেন। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “আর আমি ইচ্ছে করলে প্রতিটি জনপদে একজন সতর্ককারী পাঠাতে পারতাম।” [আল-ফুরকান: ৫১] মহাসম্মানীত আল্লাহ আরো বলেন, “এরপর আমি একের পর এক আমার রাসূলগণকে প্রেরণ করেছি। যখনই কোন জাতির কাছে তার রাসূল এসেছেন তখনই তারা তার প্রতি মিথ্যারোপ করেছে। অতঃপর আমি তাদের একের পর এককে ধ্বংস করে তাদেরকে কাহিনীর বিষয় করে দিয়েছি। কাজেই যারা ঈমান আনে না সে সমস্ত সম্প্রদায়ের জন্য ধ্বংসই রইল!” [আল-মুমিনূন: ৪৪] কাজেই তাঁর বিধান প্রত্যাখ্যানকারী কেউ নেই। তিনি যা ইচ্ছে করেন এবং যা ইচ্ছে মনোনীত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর আপনার রব যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন এবং যা ইচ্ছে মনোনীত করেন, এতে ওদের কোন হাত নেই। আল্লাহ্ পবিত্র, মহান এবং তারা যা শরীক করে তা থেকে তিনি ঊর্ধ্বে!” [আল-কাসাস: ৬৮]
যে একজন নবীকে অস্বীকার করল সে যেন সকল নবীকে অস্বীকার করল। এ জন্য আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “নূহের সম্প্রদায় রাসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল।” [আশ-শুআরা : ১০৫] এই আয়াতটি আল্লাহর নিম্নের বাণীর মত: “তারা সকলেই রাসূলগণের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল, ফলে তাদের উপর আমার শাস্তি যথার্থভাবে আপতিত হয়েছে “ [ক্বাফ: ১৪]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবুওয়ত হলো ইলাহী অনুগ্রহ এবং রাব্বানী রহমত। আল্লাহ তাঁর বান্দাদের থেকে যাকে চান তাকেই তা দান করেন। বস্তুত আল্লাহ মালায়েকা ও মানুষদের থেকে রাসূলদের মনোনীত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আল্লাহ্ ফিরিশতাদের মধ্য থেকে মনোনীত করেন রাসূল এবং মানুষের মধ্য থেকেও; নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।” [আল-হজ্জ : ৭৫] তিনি আরো বলেন, “আল্লাহ্ এ বিষয়ে সুপরিজ্ঞাত যে, কোথায় স্বীয় রেসালাত প্রেরণ করতে হবে”। [আল-আনআম: ১২৪] কাজেই নবুওয়ত উপার্জন করার বিষয় নয় এবং কোনো বান্দা ইবাদতে পরিশ্রম করে ও আত্মশুদ্ধি, অন্তরকে পবিত্র, আচার-আচরণকে পরিশুদ্ধ ও পরিপাটি করে তা হাসিল করতে পারে না।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবী ও রাসূলগণ একজন অপরজন থেকে মর্যাদায় কম-বেশী আছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “ঐসব রাসুলগণ, আমরা তাদের কাওকে অপর কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি। তাদের মধ্যে এমন কেউ রয়েছেন যার সাথে আল্লাহ্ কথা বলেছেন, আবার কাউকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। আর মারইয়াম-পুত্র ‘ঈসাকে আমি স্পষ্ট প্রমাণাদি প্রদান করেছি ও রুহুল কুদুস দ্বারা তাকে শক্তিশালী করেছি।” [আল-বাকারাহ: ২৫৩] নবীদের ভেতর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ হলো দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ। আল্লাহর নিম্নের বাণীতে তাদের উল্লেখ রয়েছে: “আর স্মরণ করুন, যখন আমরা নবীদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলাম এবং আপনার কাছ থেকেও, আর নূহ, ইব্রাহিম, মূসা, ও মারইয়াম পুত্র ঈসার কাছ থেকেও। আর আমরা তাদের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলাম দৃঢ় অঙ্গীকার।” [আল-আহযাব: ৭] আল্লাহ নিম্নের বাণীতে তাদের প্রতি ইশারা করেছেন: “অতএব, আপনি ধৈর্য ধারণ করুন যেমন ধৈর্য ধারণ করেছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলগণ।” [আল-আহকাফ: ৩৫] দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলগণের ভেতর শ্রেষ্ঠ হলো দু’জন খলীল (ঘনিষ্ঠ বন্ধু): ইবরাহীম ও মুহাম্মাদ আলাইহিমাস সালাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তার চেয়ে দ্বীনে আর কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের মিল্লাতকে অনুসরণ করে? আর আল্লাহ ইবরাহীমকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।” [আন-নিসা : ১২৫] জুনদুব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার মারা যাওয়ার পাঁচ দিন আগে বলতে শুনেছি: “আমি আল্লাহর কাছে এ ব্যাপারে মুক্ত ঘোষণা করছি যে, তোমাদের মধ্যে থেকে আমার কোন খলীল বা একান্ত বন্ধু নেই। কারণ মহান আল্লাহ ইবরাহীমকে যেমন খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন, সেরকমভাবে আমাকেও খলীল বা একান্ত বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন।” মুসলিম: (৫৩২)
আমরা সাক্ষ্য দেই যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী ও রাসূলগণের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। তিনি বলেন, “আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের সরদার হব।” {মুসলিম: (২২৭৮); আবূ দাউদ: (৪৬৭৩)}
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জাতীয়তা, পক্ষপাত অথবা হেয় করার জন্য নবীদের মাঝে অগ্রাধিকার দিতে নিষেধ করেছেন। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, দু’ ব্যক্তি একে অপরকে গালি দিয়েছিল। তাদের একজন ছিল মুসলিম, অন্যজন ইয়াহূদী। মুসলিম লোকটি বলল, তাঁর কসম যিনি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সমস্ত জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করেছেন। আর ইয়াহূদী লোকটি বলল, সে সত্তার কসম, যিনি মূসা-কে সমস্ত জগতের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন। এ সময় মুসলিম ব্যক্তি নিজের হাত উঠিয়ে ইয়াহূদীর মুখে চড় মারল। এতে ইয়াহূদী ব্যক্তিটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে গিয়ে তার এবং মুসলিম ব্যক্তিটির মধ্যে যা ঘটেছিল অবহিত করল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তোমরা আমাকে মূসা-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না। কারণ কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়বে, তাদের সাথে আমিও বেহুঁশ হয়ে পড়ব। তারপর সকলের আগে আমার হুঁশ আসবে, তখন (দেখতে পাব) মূসা আরশের একপাশ ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, তিনি বেহুঁশ হয়ে আমার আগে হুঁশে এসেছেন অথবা আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে বেহুঁশ হওয়া হতে রেহাই দিয়েছেন, তিনি তাদের মধ্যে ছিলেন?” {বুখারী (২৪১১), মুসলিম (২৩৭৩), আবূ দাউদ (৪৬৭১), তিরমিযী (৩২৪৫), ইবনু মাজাহ (৪২৭৪)} অপর শব্দে বর্ণিত হয়েছে: “ফলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগান্বিত হলেন। এমনকি গোস্বা তার চেহারাতে দেখা গিয়েছে। অতঃপর তিনি বলেন, “নবীদের মাঝে অগ্রাধিকার দিয়ো না।” মুসলিম: (২৩৭৩)
আর আল্লাহ যেমন ইবরাহীম ও মুহাম্মাদ আলাইহিমাস সালামকে খলীল (একান্ত বন্ধু) হিসেবে গ্রহণ করেছেন, তেমন মূসা আলাইহিস সালামকে স্বীয় রিসালাত ও কথার জন্য মানুষদের মধ্য থেকে মনোনীত ও বাছাই করেছেন। যদিও আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খলীল (একান্ত বন্ধু) হওয়ার মর্যাদা লাভ করেছেন এবং ইসরার রাতে তার রব তার সাথে পর্দার আড়াল থেকে কথা বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তখন আল্লাহ্ তাঁর বান্দার প্রতি যা ওহী করার তা ওহী করলেন।” [আন-নাজম: ১০] অতএব আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুল্লাহ (একান্ত বুন্ধ) হওয়ার ও কথা বলার উভয় মর্যাদা লাভ করেছেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবীগণ হলেন মানুষদের থেকে শ্রেষ্ঠ। কোনো অলী ও অন্য কারো পক্ষে নবীর মর্যাদায় উন্নীত হওয়া সম্ভব নয়। মানুষদের কাউকে নবীদের কারো ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া বৈধ নয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ইউনুস ইবনু মাত্তা-র চেয়ে উত্তম বলে মনে করা কারো জন্য শোভনীয় নয়।” বুখারী (৪৮০৪)
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ পুরুষ ছাড়া কাউকে রেসালত দিয়ে প্রেরণ করেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর আপনার আগে আমি ওহীসহ পুরুষদেরকেই পাঠিয়েছিলাম।” [আল-আম্বিয়া: ০৭]
আমরা জানি যে, নবী ও রাসূলগণ আলাইহিমুস সালাম মানুষের মধ্যে মনোনীত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আল্লাহ্ ফিরিশতাদের মধ্য থেকে মনোনীত করেন রাসূল এবং মানুষের মধ্য থেকেও; নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।” [আল-হজ্জ : ৭৫] তারা দ্বীন, বিবেক ও আচার-আচরণে মানুষের ভেতর সবচেয়ে পরিপূর্ণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বলুন, আমি তো কেবল তোমাদের মতোই একজন মানুষ। তবে আমার নিকট ওহী প্রেরণ করা হয়।” [আল-কাহাফ : ১১০] তারা অন্যান্য মানুষের মতই মানুষ, তবে তাদের নিকট ওহী করা হয়। তারা আল্লাহর যেসব নির্দেশ পৌঁছান তাতে তারা নিষ্পাপ। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর খলীল ও নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেন, “আর তিনি মনগড়া কথা বলেন না।* তাতো কেবল ওহী, যা তার প্রতি ওহীরূপে প্রেরিত হয়,* তাকে শিক্ষা দান করেছেন প্ৰচণ্ড শক্তিশালী।” [আন-নাজম : ৩-৫]
যে বিষয়ে ওহী করা হয়নি সে বিষয়ে নবী যদি ইজতিহাদ করেন এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পারেন, তাহলে আল্লাহ তাকে ভুলের ওপর রাখেন না, রবং তাকে সংশোধন করার জন্যে ওহী নাযিল করেন। যেমন আল্লাহর নিম্নের বাণীতে রয়েছে: “কোনো নবীর জন্য সংগত নয় যে তার নিকট যুদ্ধবন্দি থাকবে, যতক্ষণ না তিনি যমীনে (তাদের) রক্ত প্রবাহিত করেন। তোমরা কামনা কর পার্থিব সম্পদ এবং আল্লাহ্ চান আখেরাত; আর আল্লাহ্ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আল-আনফাল: ৬৭] তিনি আরো বলেন, “হে নবী! আল্লাহ্ আপনার জন্য যা বৈধ করেছেন আপনি তা নিষিদ্ধ করছেন কেন? আপনি আপনার স্ত্রীদের সস্তুষ্টি চাচ্ছেন; আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আত-তাহরীম: ০১]
দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের জন্যে রয়েছে উঁচু মাকাম, বড় মর্তবা এবং প্রশংসিত স্থান, তবু তারা নিজেদের ক্ষতি ও উপকার করার ক্ষমতা রাখেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বলুন, ‘আল্লাহ্ যা ইচ্ছা করেন তা ছাড়া আমার কোনো অধিকার নেই আমার নিজের ক্ষতি বা মন্দের।’ প্রত্যেক উম্মতের জন্য এক নির্দিষ্ট সময় আছে; যখন তাদের সময় আসবে তখন তারা মুহূর্তকালও পিছাতে বা এগুতেও পারবে না।” [ইউনুস: ৪৯]
এবং যদি তারা নিজেদের জন্য কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে না পারেন, তবে অবশ্যই তারা অন্যদের জন্যও কিছু করতে সক্ষম নন। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী ও খলীল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে বলেন, “তিনি তাদের তাওবা কবুল করবেন বা তাদেরকে শাস্তি দেবেন– এ বিষয়ে আপনার করণীয় কিছুই নেই; কারণ তারা তো যালেম।” [আলে ইমরান : ১২৮] তিনি মাসীহ আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বলেছেন, “বলুন, ‘আল্লাহ যদি মারইয়াম-তনয় মসীহ, তার মাতা এবং দুনিয়ার সকলকে ধ্বংস করতে ইচ্ছে করেন তবে তাকে বাঁধা দেবার শক্তি কার আছে?” [আল-মায়েদাহ : ১৭]
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ফুফু ও মেয়ে ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে বলেছেন, “হে কুরায়শ সম্প্রদায়! -কিংবা অনুরূপ শব্দ বললেন-, তোমরা আত্মরক্ষা কর। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে বানূ আব্দ মানাফ! আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমাদের কোন উপকার করতে পারব না। হে ’আব্বাস ইবনু ’আবদুল মুত্তালিব! আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোন উপকার করতে পারব না। হে সাফিয়্যাহ! আল্লাহর রাসূলের ফুফু, আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোন উপকার করতে পারব না। হে ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ! আমার ধন-সম্পদ থেকে যা ইচ্ছা চেয়ে নাও। আল্লাহর আযাব থেকে রক্ষা করতে আমি তোমার কোন উপকার করতে পারব না।” {বুখারী (২৭৫৩), মুসলিম (২০৬), তিরমিযী (৩১৮৫), নাসাঈ (৩৬৪৬)} যদি তারা জীবিত অবস্থায় নিজেদের জন্য এবং অন্যদের জন্য কোনো উপকার বা ক্ষতি করতে না পারেন, তবে মৃত্যুর পরও তারা অন্যদের জন্য কিছু করতে পারবেন না, এ কথা আরো নিশ্চিত।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাদেরকে যতটুকু জানান এবং যতটুকুর ব্যাপারে অনুমতি প্রদান করেন তার বাইরে তারা গায়েব জানেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বল, ‘তোমাদেরকে আমি বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভান্ডারসমূহ রয়েছে এবং আমি গায়েব জানি না, এবং তোমাদেরকে এও বলি না যে, আমি ফেরেশতা। আমি কেবল তাই অনুসরণ করি যা আমার কাছে ওহী প্রেরণ করা হয়’।” [আল-আনআম: ৫০] তিনি আরো বলেন, “বলুন, ‘আল্লাহ যা ইচ্ছে করেন তা ছাড়া আমার নিজের ভালো মন্দের উপরও আমার কোনো অধিকার নেই। আমি যদি গায়েবের খবর জানতাম তবে তো আমি অনেক কল্যাণই লাভ করতাম এবং কোনো অকল্যাণই আমাকে স্পর্শ করত না। ঈমানদার সম্প্রদায়ের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদদাতা ছাড়া আমি তো আর কিছুই নই।” [আল-আরাফ: ১৮৮] তিনি আরো বলেন, “তিনিই গায়েবী বিষয়ের জ্ঞানী, তিনি তাঁর গায়েবের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না,* তবে তাঁর মনোনীত রাসূল ছাড়া। সে ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের সামনে এবং পিছনে প্রহরী নিয়োজিত করেন।” [আল-জিন: ২৬, ২৭]
নবী ও রাসূলগণ ভয় ও আশা নিয়ে আল্লাহর ইবাদত করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত, আর আমাকে আশা ও ভীতিসহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।” [আল-আম্বিয়া : ৯০] তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে এবং তাঁর নৈকট্যে এগিয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তারা যাদেরকে ডাকে তারাই তো তাদের রবের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে কত নিকটতর হতে পারে, আর তারা তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয় আপনার রবের শাস্তি ভয়াবহ।” [আল-ইসরা : ৫৭]
মানুষেরা যেসব মসবিত, রোগ-বালাই ও মৃত্যুর সম্মুখীন হন, নবী ও রাসূলগণও সেসবের সম্মুখীন হন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আপনি তো মরণশীল এবং তারাও মরণশীল।” [আয-যুমার: ৩০] আল্লাহ তা‘আলা আইয়ূব আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, দুঃখ-কষ্ট তাকে স্পর্শ করেছে। “আর স্মরণ করুন আইয়ূবকে, যখন তিনি তার রবকে ডেকে বলেছিলেন আমি তো দুঃখ-কষ্টে পড়েছি, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু!” [আল-আম্বিয়া : ৮৩] তাদের স্ত্রী ও সন্তান রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর অবশ্যই আমি আপনার আগে অনেক রাসূল পাঠিয়েছিলাম এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছিলাম।” [আর-রা‘দ: ৩৮] তারা খাবার খান ও হাঁটে-বাজারে যান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর তোমার পূর্বে যত নবী আমি পাঠিয়েছি, তারা সবাই আহার করত এবং হাট-বাজারে চলাফেরা করত।” [আল-ফুরকান: ২০] তারা চিন্তাগ্রস্ত হতেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা ইয়াকুব আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, “আর তিনি তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন এবং বললেন, ‘আফসোস ইউসুফের জন্য।’ শোকে তার চোখ দু’টি সাদা হয়ে গিয়েছিল এবং তিনি ছিলেন সংবরণকারী।” [ইউসূফ: ৮৪] বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ের ঘরের ছেলের মৃত্যু সংবাদেে এসেছে যে, তিনি বলেন: তিনি যখন বসলেন, শিশুটিকে তাঁর সামনে আনা হল। তিনি তাকে নিজের কোলে নিয়ে বসালেন, আর শিশুটির শ্বাস নিঃশেষ হয়ে আসছিল। এতে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দু’চোখ অশ্রু প্রবাহিত করল। তখন সা’দ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! এ কী ব্যাপার? তিনি বললেন: “এ হল রহমত, যা আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের যাকে ইচ্ছা তার মনের ভিতরে দিয়ে থাকেন। আর আল্লাহ্ কেবলমাত্র তাঁর দয়ালু বান্দাদের ওপরই দয়া করে থাকেন।” {বুখারী (৬৬৫৫), মুসলিম (৯২৩), আবূ দাউদ (৩১২৫), নাসাঈ (১৮৬৮) ও ইবনু মাজাহ (১৫৮৮)} হাদীসে উল্লেখিত جئث এর অর্থ فزع (অর্থ আতঙ্কিত হলো), এর মাফঊল হলো مجئوث: ভীত ও আতঙ্কিত। ফাতহুল বারী (৮/৭২২), আন-নিহায়াহ ফি গারীবিল হাদীস (১/২৩২)
আমরা জানি যে, তারা মাখলূকের কল্যাণ কামনা করেছেন, আমানত আদায় করেছেন এবং তারা তাদের রবের রিসালাত পৌঁছিয়েছেন। তাদের ডাকে অনুসারীদের সাড়া না দেওয়া এবং তাদের ওপর নেতাদের অহঙ্কার করা তাদের কোনো ক্ষতি করে না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার সামনে সকল উম্মাতকে পেশ করা হয়েছিল। তখন আমি দেখেছি যে, কোন নবীর সঙ্গে রয়েছে লোকজনের ছোট একটি দল।কোন কোন নবী এমনও আছেন যার সঙ্গে এক বা দুইজন ব্যক্তি রয়েছেন, আবার কোন নবী এমনও আছেন যার সঙ্গে একজনও নেই।” {বুখারী (৫৭০৫), মুসলিম (২২০), তিরমিযী (২৪৪৬)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, ঈসা আলাইহিস সালামকে যখন তার কওম হত্যা করতে চেয়েছিল তখন আল্লাহ তাকে জীবিতাবস্থায় ওপরে উঠিয়ে নিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যখন ‘ঈসা তাদের থেকে কুফরী উপলব্ধি করলেন তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী?’ হাওয়ারীগণ বলল, ‘আমরাই আল্লাহর সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহ্তে ঈমান এনেছি। আর আপনি সাক্ষী থাকুন যে নিশ্চয় আমরা মুসলিম।* হে আমাদের রব! আপনি যা নাযিল করেছেন তার প্রতি আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা এ রাসূলের অনুসরণ করেছি। কাজেই আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।* আর তারা কুটকৌশল করেছিল, আল্লাহ্ও কৌশল করেছিলেন; আর আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠতম কৌশলী।” [আলে ইমরান : ৫২-৫৪] তিনি আরো বলেন, “আর নিশ্চয় সে কিয়ামতের নিশ্চিত নিদর্শন; কাজেই তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ করো না। আর তোমরা আমারই অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।” [আয-যুখরূফ: ৬১] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এবং কাতাদাহ ও মুজাহিদ থেকে বর্ণিত: “এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ঈসা আলাইহিস সালামের জীবিত অবতরণ করা।” তাবরানী, আত-তাফসীর: (২০/৬৩১-৬৩৩)
আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “কিতাবীদের মধ্য থেকে প্রত্যেকে তার মৃত্যুর পূর্বে তার উপর ঈমান আনবেই। আর কেয়ামতের দিন তিনি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন।” [আন-নিসা: ১৫৯] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, তাঁর বাণী: {قَبْلَ مَوْتِهِ} অর্থ হলো: “ঈসা ইবন মারয়ামের মৃত্যুর পূর্বে।” তাবরানী, আত-তাফসীর: (৯/৩৮০)
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, তিনি শেষ জমানায় ন্যায়পরায়ণ বিচারক হিসেবে অবতরণ করবেন। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “শপথ সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ। অচিরেই তোমাদের মাঝে ন্যায় বিচারকরূপে মারইয়ামের পুত্র অবতরণ করবেন। তারপর তিনি ক্রূশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন, জিযিয়া রহিত করবেন এবং ধন-সম্পদের এরূপ প্রাচুর্য হবে যে, কেউ তা গ্রহণ করবে না।” {বুখারী (২২২২), মুসলিম (১৫৫), আবূ দাউদ (৪৩২৪), তিরমিযী (২২৩৩), ইবনু মাজাহ (৪০৭৮)}
ঈসা আলাইহিস সালামের অবতরণ সম্পর্কে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “এ সময় আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঈসা ইবনু মারইয়ামকে প্রেরণ করবেন। তিনি ওয়ারস ও জাফরান রং এর জোড়া কাপড় পরিহিত অবস্থায় দামেশক নগরীর পূর্ব দিকের উজ্জ্বল মিনারে অবতরণ করবেন, {مَهْرُودَتَيْنِ অর্থ হলো: দু’টুকরো কাপড় অথবা দু’টি পোশাক। আর কেউ বলেছেন: الثوب المهرود অর্থ হলো: ওয়ারস ও জাফরান রঙ্গের কাপড়। “আন-নিহায়াহ ফি গারিবিল হাদীস (৫/২৫৮)} দু’জন ফেরেশতার কাঁধের উপর ভর করে। যখন তিনি মাথা ঝুঁকাবেন তখন ফোটা ফোটা পানি পড়বে, যখন তিনি মাথা উঠাবেন তখন তার থেকে মুক্তার মত রত্ন ঝরবে ...।” {মুসলিম (২৯৩৭), আবু দাউদ (৪৩২১), তিরমিযী (২২৪০), ইবনু মাজাহ (৪০৭৫)}
অধ্যায়: নবীগণ আলাইহিমুস সালামদের নিদর্শন ও তাদের নবুওয়তের প্রমাণসমূহ।
আমরা জানি যে, আল্লাহ প্রত্যেক নবীকে অনেক নিদর্শন ও প্রমাণ দান করেছেন, যার ওপর মানুষেরা ঈমান আনয়ন করতে পারে। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক নবীকে তার যুগের প্রয়োজন মুতাবিক কিছু মুজিযা দান করা হয়েছে, যা দেখে ঈমান আনা হয়েছে, অথবা লোকেরা তার প্রতি ঈমান এনেছে। আমাকে যে মুজিযা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে, ওহী- যা আল্লাহ্ আমার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। কাজেই আমি আশা করি, কিয়ামতের দিন তাদের অনুসারীদের অনুপাতে আমার অনুসারীদের সংখ্যা অধিক হবে।” {বুখারী (৭২৭৪), মুসলিম (১৫২)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ কোনো নবীকে তার সত্যতার প্রমাণকারী দলিল ছাড়া প্রেরণ করেননি, আমরা তা জানি বা না জানি। আল্লাহ আমাদের জন্য আল-কুরআনুল কারীমে তার কিছু উল্লেখ করেছেন। আমরা আরো জানি যে, এখানে আরো অনেক নিদর্শন রয়েছে যার দ্বারা আল্লাহ তাঁর পূর্ববর্তী রাসূলদেরকে শক্তিশালী করেছেন, কিন্তু তিনি তা আমাদের জন্যে উল্লেখ করেননি। যেমন আল্লাহর নিম্নের বাণীতে রয়েছে: “আর যারা কুফরী করে এবং আমার আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী।” [আল-মায়েদাহ: ১০] যেমন তাঁর আরেকটি বাণী: “তাদের অভ্যাস ফির’আউনী সম্প্রদায় ও তাদের পূর্ববর্তীদের অভ্যাসের ন্যায়, তারা আমার আয়াতগুলোতে মিথ্যারোপ করেছিল, ফলে আল্লাহ্ তাদের পাপের জন্য তাদেরকে পাকড়াও করেছিলেন। আর আল্লাহ্ শাস্তি দানে অত্যন্ত কঠোর।” [আলু-ইমরান: ১১] কখনো আল্লাহ সুষ্পষ্ট নির্দেশনাবলি ও প্রমাণ উল্লেখ করেন। যেমন আল্লাহর নিম্নের বাণীতে রয়েছে: “আর অবশ্যই আমি মূসাকে আমাদের নির্দেশনাবলি ও প্রমাণসহ পাঠিয়েছিলাম।” [হুদ: ৯৬] আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “আল্লাহ্ বললেন, ‘অচিরেই আমি আপনার ভাইয়ের দ্বারা আপনার বাহুকে শক্তিশালী করব এবং আপনাদের উভয়কে প্রাধান্য দান করব। ফলে তারা আপনাদের কাছে পৌঁছতে পারবে না।” [আল-কাসাস: ৩৫] ইকরিমাহ বলেন, “আল-কুরআনে যত জায়গায় “সুলতান” শব্দটির উল্লেখ রয়েছে তার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো প্রমাণ।” তাফসীরুত তাবারী (৮/৩০), (৯/৩৩৭)
আমরা জানি যে, আল্লাহ যেসব নিদর্শন ও প্রমাণাদিসহ তাঁর রাসূল ও নবীগণ আলাইহিমুস সালামকে প্রেরণ করেছেন তা অনেক বেশী। আর তাদের সত্যতার ওপর সবচেয়ে বড় দলিল হলো তারা যে অহী নিয়ে এসেছেন তা। আল্লাহর নবী ও রাসূলগণের ওপর তাঁর অহী নাযিল হয় কখনো বিনা মাধ্যমে , যেমন স্বপ্নযোগে। যেমন আল্লাহ ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, তিনি বলেছেন: “অতঃপর তিনি যখন তার পিতার সাথে কাজ করার মত বয়সে উপনীত হলেন, তখন ইবরাহীম বললেন, 'হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি।” [আস-সাফফাত: ১০২] অথবা কখনো রাসূল কোনো মাধ্যম ছাড়াই পর্দার আড়াল থেকে আল্লাহর কথা শ্রবণ করেন, যেমন আল্লাহর নিম্নের বাণীতে রয়েছে: “আর কোনো মানুষেরই এমন মর্যাদা নেই যে, আল্লাহ্ তার সাথে কথা বলবেন ওহীর মাধ্যম ছাড়া অথবা পর্দার আড়াল ছাড়া।” [আশ-শুআরা: ৫১] আরো যেমন মূসা আলাইহিস সালামের সাথে আল্লাহর কথোপকথনে রয়েছে। যেমন আল্লাহর নিম্নের বাণীতে এসেছে: “তিনি বললেন, ‘হে মূসা! আমি আপনাকে আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দিয়ে মানুষের উপর বেছে নিয়েছি; কাজেই আমি আপনাকে যা দিলাম তা গ্রহণ করুন এবং শোকর আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হোন।” [আল-আরাফ : ১৪৪] অথবা কখনো ফেরেশতা তার সাথে কথা বলেন, যেমন আল্লাহর নিম্নোক্ত বাণীতে এসেছে: “অথবা এমন দূত প্রেরণ ছাড়া, যে দূত তাঁর অনুমতিক্রমে তিনি যা চান তা ওহী করেন।” [আশ-শুআরা: ৫১]
আমরা জানি যে, তাদের সত্যতার অন্যতম প্রধান প্রমাণ হলো যা তারা প্রচার করেন, তা হল তাওহীদ যা মানুষের প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবে রয়েছে, এবং যা মানুষের বুদ্ধি দ্বারা স্বীকৃত। এছাড়া, তারা যে উপকারী জ্ঞান, সৎ কাজ, সঠিক পথ, সঠিক ধর্ম এবং ন্যায়সংগত মিজান নিয়ে এসেছেন, তাও তাদের সত্যতার প্রমাণ। উবায়দুল্লাহ ইবনু আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা তাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি বলেন, আবূ সুফিয়ান আমাকে খবর দিয়েছেন যে, হিরাক্লিয়াস তাকে বলেছিলেন, তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি [নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)] তোমাদের কী কী আদেশ করেন? তুমি বললে যে, তিনি তোমাদেরকে সালাতের, সত্যবাদিতার, পবিত্রতার, ওয়াদা পূরণের ও আমানত আদায়ের আদেশ দেন। হিরাক্লিয়াস বললেন, এটাই নবীগণের সিফাত।” {বুখারী (২৬৮১), মুসলিম (১৭৭৩), তিরমিযী (২৭১৭)}
নাজ্জাশীর নিকট যখন জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহু সূরা মারয়ামের প্রথমাংশ পাঠ করলেন তখন তিনি বলেছেন, “আল্লাহর কসম, নিশ্চয় এই কালাম এবং মূসা যে কালাম নিয়ে এসেছেন তা একই স্থান থেকে এসেছে।” {মুসনাদে ইসহাক ইবনু রাহুয়াহ (১৮৩৫), আহমাদ (২২৪৯৮), ইবনু খুজায়মাহ (২২৬০), তাহাভী, মুশকিলুল আসার (৫৫৯৮), আবূ নুআইম, আল-হিলয়াহ (১/১১৫), দালায়েলুন নুবুওয়াহ (১৯৪)}
আরও একটি প্রমাণ হলো: আল্লাহ্র সাক্ষ্য যে, তাঁর রাসূলরা সত্যের পথে আছেন, এবং তারা যা নিয়ে এসেছেন তা সত্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, যা তোমার নিকট তিনি নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে। তিনি তা নাযিল করেছেন নিজ জ্ঞানে এবং ফেরেশতারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে। আর আল্লাহই সাক্ষীরূপে যথেষ্ট।” [আন-নিসা : ১৬৬] তিনি আরো বলেন, “আর যারা কুফরী করেছে তারা বলে, তুমি আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত নও। বলুন, আল্লাহ্ এবং যাদের কাছে কিতাবের জ্ঞান আছে, তারা আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে যথেষ্ট।” [আর-রা‘দ: ৪৩]
তাদের সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো: আল্লাহর পক্ষ থেকে তাদের ওপর নাযিল হওয়া অহী। আর সবচেয়ে বড় অহী হলো আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিদর্শন আল-কুরআনুল আজীম। এই অহীর মত অহী নিয়ে আসা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, তা আল্লাহর কালাম ও অহী। তাতে আরো রয়েছে গায়েবী খবর এবং হিদায়েত, নূর, রহমত ও হিকমাত।
তাদের আরো সুস্পষ্ট নিদর্শন হলো: যুক্তিসম্মত দলিলসমূহ যা দ্বারা আল্লাহ তাঁর নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালামদেরকে শক্তিশালী করেছেন, ফলে কাফির হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল আর বাতিল ধ্বংস হয়েছিল। যেমন আল্লাহর নিম্নের বাণীতে রয়েছে: “আপনি কি ঐ ব্যক্তিকে দেখেননি, যে ইব্রাহীমের সাথে তাঁর রব সম্বন্ধে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিল, যেহেতু আল্লাহ্ তাকে রাজত্ব দিয়েছিলেন। যখন ইব্রাহীম বললেন, ‘আমার রব তিনিই যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান, সে বলল, ‘আমিও তো জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই। ইব্রাহীম বললেন , ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদয় করান, তুমি সেটাকে পশ্চিম দিক থেকে উদয় করাও তো। তারপর যে কুফরী করেছিল সে হতবুদ্ধি হয়ে গেল। আর আল্লাহ্ যালিম সম্প্রয়ায়কে হিদায়াত করেন না।” [আল-বাকারা : ২৫৮] অন্যত্র মহান আল্লাহ বলেন, “সৃষ্টিকুলের রব ব্যতীত এরা সবাই তো আমার শত্ৰু।* যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনিই আমাকে হেদায়াত দিয়েছেন।* আর ‘তিনিই আমাকে খাওয়ান ও পান করান।* এবং রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন;* আর তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন, তারপর আমাকে পুনর্জীবিত করবেন।* এবং যার কাছে আশা করি যে, তিনি কিয়ামতের দিন আমার অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন।” [আশ-শুআরা: ৭৭-৮২] মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে তাঁর বাণী, তিনি ফিরআউনকে বলেছেন, “আমাদের রব তিনি, যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার সৃষ্টি আকৃতি দান করেছেন, তারপর পথনির্দেশ করেছেন।” [ত্ব-হা : ৫০] তন্মধ্য আল্লাহ তা‘আলার আরেকটি বাণী: “যদি এতদুভয়ের (আসমান ও যমীনের) মধ্যে আল্লাহ্ ব্যতীত আরো অনেক ইলাহ থাকত, তাহলে উভয়ই বিশৃংখল হত। অতএব, তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ্ কতই না পবিত্র।” [আল-আম্বিয়া: ২২] তাঁর আরেকটি বাণী, “আল্লাহ্ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই; যদি থাকত তবে প্রত্যেক ইলাহ স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যে গুণে তাকে গুণান্বিত করে তা থেকে আল্লাহ্ কতই না পবিত্র- মহান!” [আল-মুমিনুন: ৯১] এরকম দলিল অনেক রয়েছে। আমরা তার কিছু রুবুবিয়্যাহ ও উলূহিয়্যার অধ্যায়ে উল্লেখ করেছি। তাদের বড় নিদর্শনের আরেকটি হলো গায়েব সম্পর্কে তাদের খবর দেওয়া, যে সংবাদ দিতে আল্লাহ তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন।
তাদের আরেকটি উজ্জ্বল নিদর্শন হলো: পূর্ববর্তী নবীগণ ও তাদের অনুসারীদেরকে তাদের শত্রুদের ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তি প্রদান করা, অহঙ্কারকারী বিদ্বেষ পোষণকারীদের ধ্বংস করা এবং পূর্ববর্তীদের সাথে কী আচরণ করা হয়েছিল তা দাওয়াতী উম্মতকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া এবং এটাও যে, আল্লাহর সুন্নাত চলমান। আল্লাহ তা‘আলা সূরা আম্বিয়ার শুরুতে বলেছেন, “তারপর আমি তাদের প্রতি কৃত ওয়াদা সত্য করে দেখলাম, ফলে আমি তাদেরকে ও যাদেরকে ইচ্ছে রক্ষা করেছিলাম এবং সীমালংঘনকারীদেরকে করেছিলাম ধ্বংস।” [আল-আম্বিয়া: ৯] এই সূরার শেষে তিনি বলেন, “আর উপদেশ দেয়ার পর আমি যাবূরে লিখে দিয়েছি যে, ‘আমার যোগ্যতর বান্দাগণই পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে’।” [আল-আম্বিয়া: ১০৫] তিনি আরো বলেন, “তারা আমার সব নিদর্শনে মিথ্যারোপ করল, সুতরাং আমি মহাপরাক্রমশালী ও সর্বশক্তিমানরূপে তাদেরকে পাকড়াও করলাম।* তোমাদের মধ্যকার কাফিররা কি তাদের চেয়ে ভাল? না কি তোমাদের অব্যহতির কোন সনদ রয়েছে পূর্ববতী কিতাবে?” [আল-কামার: ৪২-৪৩] সূরা শুআরা-তে আল্লাহ যখনই পূর্বের নবীগণ আলাইহিমুস সালামদের নাজাত ও তাদের শত্রুদের ধ্বংস হওয়া উল্লেখ করেছেন, তখনই প্রত্যেক সংবাদের পরে আল্লাহ নিম্নের বাণীটি উল্লেখ করেছেন: “নিশ্চয় এতে আছে নিদর্শন, আর তাদের অধিকাংশই মুমিন নয়।” [আশ-শুআরা: ৬৭] মহান আল্লাহ বলেন, “অতঃপর তারা যদি মুখ ফিরিয়ে নেয় তবে বলুন, 'আমি তো তোমাদেরকে সতর্ক করছি এক ধ্বংসাত্মক শাস্তি সম্পর্কে, ‘আদ ও সামুদের শাস্তির অনুরূপ।” [ফুসসিলাত: ১৩] তিনি আরো বলেন, “তারা কি জমিনে ভ্রমন করে না? তাহলে তারা দেখত যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল। তারা শক্তিতে তাদের চেয়েও প্রবল ছিল। আর তারা জমি চাষ করত এবং তারা এদের আবাদ করার চেয়েও বেশী আবাদ করত। আর তাদের কাছে তাদের রাসূলগণ সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ এসেছিল। বস্তুতঃ আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তাদের প্রতি যুলুম করবেন, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজদের প্রতি যুলম করত।” [সূরা রূম : ৯]
তাদের নবুওয়ত প্রমাণকারী আরো নিদর্শন হলো: তাদের বৈশিষ্ট্যের পরিপূর্ণতা, তাদের সুন্দর ব্যবহার, কর্ম ও জীবন এবং তাদের সত্য কথন যার সাথে তাদের ওপর মিথ্যা বলা অসম্ভব। আল্লাহ তা‘আলা সালিহ আলাইহিস সালামের কওম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, তারা বলেছিলো: “হে সালেহ্! এর আগে তুমি ছিলে আমাদের আশাস্থল। তুমি কি আমাদেরকে নিষেধ করছ ‘ইবাদাত করতে তাদের, যাদের ‘ইবাদাত করত আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা? নিশ্চয় আমরা বিভ্রান্তিকর সন্দেহে রয়েছি সে বিষয়ে, যার প্রতি তুমি আমাদেরকে ডাকছ।” [হুদ: ৬২] আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তারা বলল, ‘হে শু’আইব! তোমার সালাত কি তোমাকে নির্দেশ দেয় যে, আমাদের পিতৃ-পুরুষেরা যারা ‘ইবাদত করত আমাদেরকে তা বর্জন করতে হবে অথবা আমরা আমাদের ধন-সম্পদ সম্পর্কে যা করি তাও? তুমি তো বেশ সহিষ্ণু, সুবোধ !” [হুদ: ৮৭]
হিরাকল আবূ সুফিয়ানকে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পর বলেছিলেন, “আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি-এর পূর্বে কখনো তোমরা তাকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছ কিনা? তুমি বলেছ, ‘না।’ এতে আমি বুঝলাম, এমনটি হতে পারে না যে, কেউ মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা পরিত্যাগ করবে আর আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলবে।” {বুখারী (৭), মুসলিম (১৭৭৩)}
তন্মধ্যে: নবীগণের নিদর্শনসমূহ এবং তারা যে ইলম, হিদায়েত ও সত্য দ্বীন নিয়ে এসেছেন তা বর্ণনা করার ক্ষেত্রে অনেক বর্ণনাকারীর পরম্পরা, যেই পরম্পরাসহ তাদের সবার মিথ্যার ওপর একমত হওয়া অসম্ভব মনে হয়।
তন্মধ্যে: তারা তাদের রিসালাতের ওপর বিনিময় অন্বেষণ করেন না ও রাজত্ব তালাশ করেন না। আল্লাহ অনেক নবী সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তারা প্রত্যেকেই তাদের কওমকে বলেছেন, “হে আমার সম্প্রদায়! আমি এর পরিবর্তে তোমাদের কাছে পারিশ্রমিক চাই না। আমার পারিশ্রমিক আছে তাঁরই কাছে, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। এরপরও কি তোমরা বুঝবে না?” [সূরা হুদ: ৫১]
তন্মধ্যে: নবীগণের নবুওয়তে ছিদ্রান্বেষণকারী ব্যক্তি জাহিল ছাড়া কেউ নয়, যে তাদের আনীত দ্বীন, ইলম ও হিদায়েতে দৃষ্টি দেয়নি, অথবা বিদ্বেষ পোষণকারী দাম্ভিক ছাড়া কেউ নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে নিশ্চিত সত্য বলে গ্ৰহণ করেছিল।” [আন-নামল: ১৪] তিনি আরো বলেন, “আমি অবশ্যই জানি যে, তারা যা বলে তা আপনাকে নিশ্চিতই কষ্ট দেয়; কিন্তু তারা আপনার প্রতি মিথ্যারোপ করে না, বরং যালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।“ [আল-আনআম: ৩৩]
তন্মধ্যে: কিছু নিদর্শন হয় ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য যা চোখ দেখে এবং বিবেক তা মেনে নেয়, যেমন কওমে নূহের ডুবে যাওয়া, সালেহের উট, হুদের তার কওমকে সকলে মিলে যড়যন্ত্র করার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়া, আগুন থেকে ইবরাহীমকে মুক্তি দেওয়া এবং মূসার নিদর্শনসমূহ, যেমন লাঠি, টিড্ডি, উঁকুন, ব্যাঙ, রক্ত, তুফান, ফিরআউন ও তার কওমের ডুবে যাওয়া, এবং দাউদ আলাইহিস সালামের নিদর্শনসমূহ, যেমন পাহাড়ের তাসবীহ পাঠ করা, লোহার নরম হয়ে যাওয়া, এবং সুলাইমান আলাইহিস সালামের নিদর্শনসমূহ, যেমন তার জন্য জিন ও বাতাসকে অনুগত করা, পাখিদের ভাষা বুঝা, এবং ঈসা আলাইহিস সালামের নিদর্শনসমূহ, যেমন কুষ্ঠ, জন্মান্ধ, অন্ধকে সুস্থ করা এবং মৃতকে জীবিত করা। এবং তিনি মাটি থেকে পাখির আকৃতি তৈরি করতেন এবং তাতে আল্লাহর অনুমতিতে ফু দিতেন, ফলে তা পাখি হয়ে যেত এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিদর্শনসমূহ। তার সংখ্যা অনেক, তা বিনা কষ্টে আয়ত্তে আনা সম্ভব নয়, যেমন চাঁদে দ্বিখন্ডিত হওয়া, ইসরা ও মিরাজ, খাবার বেশী হওয়া, চতুষ্পদ জন্তুর কথা বলা, কঙ্করের তাসবীহ পাঠ করা, খেজুর গাছের কাণ্ডের ক্রন্দন করা এবং শত্রুদের বিরুদ্ধে তার জন্য আল্লাহর সাহায্য, ইত্যাদি।
তন্মধ্যে: সত্যের দিকে আহ্বানকারী নবীর অবস্থা। কারণ, মানুষেরা নিজ কথায় সত্যবাদী ও সত্যের দিকে আহ্বানকারীর কথার মাঝে এবং নিজ কথায় মিথ্যাবাদী আহ্বানকারীর মাঝে পার্থক্য করতে জানে। এজন্য আব্দুল্লাহ ইবন সালাম বলেছেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় এসে পৌছলেন, মানুষ তখন দলে দলে তার নিকট দৌড়ে গেল। বলাবলি হতে লাগলো যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসেছেন, অতএব তাকে দেখার জন্য আমিও লোকদের সাথে উপস্থিত হলাম। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখে বুঝতে পারলাম যে, এই চেহারা কোনো মিথ্যুকের চেহারা নয়।” {তিরমিযী (২৪৮৫), ইবনু মাজাহ (১৩৩৪), ইবনু আবি শায়বাহ (২৫৮৯৮), আহমাদ (২৩৭৮৪), আব্দ ইবনু হুমাইদ (৪৯৬)} এ ছাড়া আরো অনেক নিদর্শন রয়েছে।
আল-কুরআন এবং আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত ছাড়া নবীদের কোনো নিদর্শনই বাকি নেই। এই দু’টি অবশিষ্ট আছে। কারণ, দু’টোই অহী এবং আল্লাহ তা হিফাজত করার দায়িত্ব নিয়েছেন। মহা সম্মানিত আল্লাহু বলেন, “নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমি অবশ্যই তার সংরক্ষক।” [আল-হিজর : ৯] এ দু’টোর ভেতর রিসালাত ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সত্যতার ওপর সবচেয়ে বড় দলিল ও প্রমাণ রয়েছে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাঁর হিকমতের দাবি মোতাবেক পার্থিব ও শরয়ী বিভিন্ন নিদর্শন ও দলিল দ্বারা তাঁর রাসূলগণকে শক্তিশালী করেন। ফলে তাঁর অনুগ্রহে যাকে চান হিদায়েত দান করেন এবং যাকে চান ইনসাফের ভিত্তিতে গোমরাহ করেন। তবে নিদর্শনগুলো বিদ্বেষ পোষণকারীদের বিদ্বেষ ও দাম্ভিকতা বৃদ্ধি করা ছাড়া কিছুই করে না। আল্লাহ বলেন, “আর অবশ্যই আমি এ কুরআনে (বহু বিষয়) বারবার বিবৃত করেছি যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে। কিন্তু এতে তাদের বিমুখতাই বৃদ্ধি পায়।” [আল-ইসরা: ৪১] তিনি আরো বলেন, “আর আপনার রবের কাছ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে তা তাদের অনেকের অবাধ্যতা ও কুফরীই বৃদ্ধি করবে।” [আল-মায়েদাহ : ৬৮] তিনি আরো বলেন, “আর তারা দৃঢ়তার সাথে আল্লাহর শপথ করে বলত যে, তাদের কাছে কোন সতর্কাকারী আসলে এরা অন্য সকল জাতির চেয়ে সৎপথের অধিকতর অনুসারী হবে; অতঃপর যখন এদের কাছে সতর্ককারী আসল, তখন তা শুধু তাদের বিমুখতা ও দূরত্বই বৃদ্ধি করল-- “ [ফাতির: ৪২] তিনি আরো বলেন, “আর তারা আল্লাহর নামে কঠিন শপথ করে বলে, তাদের কাছে যদি কোন নিদর্শন আসত তবে অবশ্যই তারা এতে ঈমান আনত। বলুন, ‘নিদর্শন তো আল্লাহর কাছেই’। আর কিভাবে তোমাদের উপলব্ধিতে আসবে যে, যখন তা (নিদর্শন) এসে যাবে, তখন তারা ঈমান আনবে না “ [আল-আনআম: ১০৯] তিনি আরো বলেন, “আর আমি শিক্ষাপ্রদ নিদর্শনস্বরূপ সামূদ জাতিকে উষ্ট্রী দিয়েছিলাম, অতঃপর তারা সেটার প্রতি যুলুম করেছিল। আর আমি তো শুধু ভয় দেখানোর জন্যই নিদর্শন পাঠিয়ে থাকি।” [আল-ইসরা: ৫৯]
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “মক্কাবাসীরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট সাফা পাহাড়কে স্বর্ণে রূপান্তর করা এবং অন্যান্য পাহাড়সমূহকে তাদের কাছ থেকে হটিয়ে দেওয়ার আহ্বান করল, যেন তারা চাষাবাদ করতে পারে। তাকে বলা হলো: যদি আপনি চাইলে তাদের সাথে নরম আচরণ করুন, আর যদি চান তারা যা চেয়েছে তা তাদেরকে দিয়ে দিব, তাহলে তা দিব এবং যদি তারা কুফরি করে, তাহলে তাদের পূর্ববর্তীদের যেমন ধ্বংস করে দিয়েছি তাদেকেও তেমন ধ্বংস করে দিব। তিনি বললেন, না, বরং আমি তাদের সাথে নরম আচরণ করব। তখন আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করলেন, “আর আমাকে নিদর্শন প্রেরণ করা থেকে শুধু এটাই বিরত রেখেছে যে, তাদের পূর্ববর্তীগণ তাতে মিথ্যারোপ করেছিল। আর আমি শিক্ষামূলক নিদর্শনস্বরূপ সামূদ জাতিকে উষ্ট্রী দিয়েছিলাম।” [আল-ইসরা: ৫৯] {আহমাদ (২৩৩৩), বাযযার (৫০৩৬), নাসায়ী, আল-কুবরা (১১২২৬), হাকিম (৩৪৩৭), বায়হাকি, দালায়েলুন নুবুওয়াহ (৬০৫)}
আমরা জানি যে, আল্লাহ চাইলে সকল মানুষকে হিদায়েত দিয়ে দিতেন। তিনি বলেন, “আর আল্লাহ্ ইচ্ছা করলে তোমাদেরকে এক জাতি করতে পারতেন, কিন্তু তিনি যাকে ইচ্ছে বিভ্রান্ত করেন এবং যাকে ইচ্ছে সৎপথে পরিচালিত করেন।” [আন-নাহাল: ৯৩] আল্লাহ্ আরো বলেন, “আর আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে তাদের সবাইকে অবশ্যই সৎপথে একত্র করতেন। কাজেই আপনি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।” [আল-আনআম: ৩৫]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবীগণ যেসব নিদর্শন ও দলিল নিয়ে এসেছেন এবং আল্লাহ তাদেরকে যেসব প্রমাণ দিয়ে শক্তিশালী করেছেন, তা কোনো নবুওয়ত দাবিদার অথবা যাদুকর অথবা মিথ্যাবাদীর পক্ষে পেশ করা সম্ভব নয়। কারণ, আল্লাহ সিদ্ধান্ত করেছেন যে, কোনো বাতিলকে সঠিক দলিল দ্বারা সাহায্য করবেন না এবং সত্য দলিল দ্বারা কোনো মিথ্যাবাদীকে সত্যারোপ করবেন না। কারণ, তিনি তাঁর বিধানে ও নির্দেশে হিকমতপূর্ণ। আর আল্লাহর চলমান হিকমত ও সুন্নাত তা নিষেধ করে। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “তিনি যদি আমাদের নামে কোনো কথা রচনা করে চালাতে চেষ্টা করতেন,* তবে অবশ্যই আমি তাকে পাকড়াও করতাম ডান হাত দিয়ে,* তারপর অবশ্যই আমি কেটে দিতাম তার হৃদপিণ্ডের শিরা।” [আল-হাক্কাহ : ৪৪-৪৬]
অধ্যায়: আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়ত।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ দু’জাহানের রবের রাসূল এবং তিনি নবী ও রাসূলগণের সর্বশেষ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নন; তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী।” [আল-আহযাব : ৪০] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমার ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের উপমা হচ্ছে সে লোকের মতো, যে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করলো। আর প্রাসাদটি খুব সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন করল, তবে তার একপার্শ্বে মাত্র একটি ইটের স্থান খালি রেখে দিলো। লোকেরা প্রাসাদটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এর প্রশংসা করতে লাগলো এবং বলতে লাগলো, কেন এ ইটটি স্থাপন করা হলো না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি হলাম সেই ইট। আমিই সর্বশেষ নবী”। {বুখারী (৩৫৩৫), মুসলিম (২২৮৬)}
তিনি আদম সন্তানদের সরদার। রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের সরদার হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর বিদীর্ণ হবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও সুপারিশ গৃহীত প্রথম ব্যক্তি।” {মুসলিম (২২৭৮); আবূ দাউদ (৪৬৭৩)} তিনি দু’জাহানের রবের খলীল (অন্তরঙ্গ বন্ধু), রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমি আমার উম্মাতের কাউকে যদি আন্তরিক বন্ধুরূপে গ্রহণ করতাম, তবে আবূ বকরকেই গ্রহণ করতাম। তবে তিনি আমার ভাই ও আমার সাহাবী।” বুখারী (৩৬৫৬)
আমরা জানি যে, তাকে এতো নিদর্শন দেওয়া হয়েছে যে তার মত অন্যান্য রাসূলদের কাউকে এতো প্রদান করা হয়নি। তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো আল-কুরআনুল কারীম। আর তার ওপর সর্বপ্রথম যা নাযিল হয় তা সূরা আলাকের শুরুর কিছু অংশ। যেমন এ ব্যাপারে সহীহ হাদীসে এসেছে: উম্মুল মু’মিনীন আয়িশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট সর্বপ্রথম যে ওহী আসে, তা ছিল নিদ্রাবস্থায় বাস্তব স্বপ্নরূপে। যে স্বপ্নই তিনি দেখতেন তা একেবারে প্রভাতের আলোর ন্যায় প্রকাশিত হতো। অতঃপর তাঁর নিকট নির্জনতা পছন্দনীয় হয়ে দাঁড়ায় এবং তিনি ’হেরা’র গুহায় নির্জনে অবস্থান করতেন। আপন পরিবারের নিকট ফিরে এসে কিছু খাদ্যসামগ্রী সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পূর্বে- এভাবে সেখানে তিনি একটানা বেশ কয়েক দিন ’ইবাদাতে মগ্ন থাকতেন। অতঃপর খাদীজা-এর নিকট ফিরে এসে আবার একই সময়ের জন্য কিছু খাদ্যদ্রব্য নিয়ে যেতেন। এভাবে ’হেরা’ গুহায় অবস্থানকালে তাঁর নিকট ওহী আসলো। তাঁর নিকট ফেরেশতা এসে বললো, ’পাঠ করুন’। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: ’’আমি বললাম, ’আমি পড়তে জানি না।” তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেন: অতঃপর সে আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলো যে, আমার খুব কষ্ট হলো। অতঃপর সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললো, ’পাঠ করুন’। আমি বললাম: আমি তো পড়তে জানি না।’ সে দ্বিতীয়বার আমাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে চাপ দিলো যে, আমার খুব কষ্ট হলো। অতঃপর সে আমাকে ছেড়ে দিয়ে বললো: ’পাঠ করুন’। আমি উত্তর দিলাম, ’আমি তো পড়তে জানি না।’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, অতঃপর তৃতীয়বারে তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে চাপ দিলেন। তারপর ছেড়ে দিয়ে বললেন, {اقْرَأْ بِاسْمِ رَبِّكَ الَّذِي خَلَق * خَلَقَ الإِنسَانَ مِنْ عَلَق * اقْرَأْ وَرَبُّكَ الأَكْرَم} ’’পাঠ করুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিন্ড থেকে, পাঠ করুন, আর আপনার রব অতিশয় দয়ালু’’- (সূরা ’আলাক্ব:১-৩) অতঃপর এ আয়াত নিয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -প্রত্যাবর্তন করলেন। তার হৃদয় তখন কাঁপছিল।” বুখারী (৩), মুসলিম (১৬০), তিরমিযী (৩৬৩২)} এরপর তার ওপর সূরা আল-মুদ্দাসসির নাযিল হয়। যেমন জাবির ইবনু ’আবদুল্লাহ্ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি রাসূলসাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ওয়াহী বন্ধ হওয়া সম্পর্কে আলোচনা করতে শুনেছেন। তিনি বলেছেন, “একদা আমি পথ চলছিলাম, এমন সময় আকাশ থেকে একটি আওয়াজ শুনতে পেলাম। এরপর আমি আকাশের দিকে চোখ তুলে দেখলাম, যে ফেরেশতা হেরা গুহায় আমার কাছে আসত, সে আসমান-যমীনের মাঝে একটি কুরসীতে উপবিষ্ট আছে। তাকে দেখে আমি ভীষণ ভয় পেলাম। এমনকি যমীনে পড়ে গেলাম। তারপর আমি আমার স্ত্রীর কাছে গেলাম এবং বললাম, আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। আমাকে বস্ত্রাবৃত কর। তারা আমাকে বস্ত্রাবৃত করল।” এরপর আল্লাহ্ অবতীর্ণ করলেন: {يَا أَيُّهَا الْمُدَّثِّر * قُمْ فَأَنذِر} থেকে {فَاهْجُر} পর্যন্ত। আবূ সালামাহ বলেন, الرِّجْزَ মূর্তিসমূহ। এরপর অধিক হারে ওহী অবতীর্ণ হতে লাগল এবং লাগাতার ওহী আসতে থাকল। {বুখারী (৪৯২৬), মুসলিম (১৬১), তিরমিযী (৩৩২৫)}
উম্মুল মু’মিনীন আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, হারিস ইবনু হিশাম রাদিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলেন, ’হে আল্লাহর রাসূল! আপনার নিকট ওহী কিরূপে আসে?’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: [কোন কোন সময় তা ঘণ্টা বাজার মত আমার নিকট আসে। আর এটি-ই আমার উপর সবচেয়ে কষ্টকর হয় এবং তা শেষ হতেই ফেরেশতা যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নেই, আবার কখনো ফেরেশতা মানুষের রূপ ধারণ করে আমার সাথে কথা বলেন। তিনি যা বলেন আমি তা মুখস্থ করে নেই।] আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি তীব্র শীতের সময় ওহী নাযিলরত অবস্থায় তাকে দেখেছি। ওহী শেষ হলেই তার ললাট হতে ঘাম ঝরে পড়ত।” {বুখারী (২), মুসলিম (২৩৩৩), তিরমিযী (৩৬৩৪), নাসাঈ (৯৩৩)}
তিনি মক্কায় ১৩ বছর অবস্থান করে তা মানুষকে ওহীদের দিকে আহ্বান করেছেন। আর মদিনায় ১০ বছর অবস্থান করে আল্লাহর শরীয়ত বর্ণনা, তাঁর দ্বীনের দিকে আহ্বান করা ও তাঁর রাস্তায় জিহাদ করেছেন। অতঃপর ৬৩ বছর বয়সে আল্লাহ তাকে মৃত্যু দান করেন। তার প্রতি আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ।
আমরা জানি যে, আল-কুরআনুল কারীমের পর ইসরা ও মিরাজ হলো তার সবচেয়ে বড় নিদর্শন। আল্লাহু তা‘আলা বলেন, “পবিত্র মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলায় ত্ৰমণ করালেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার আশপাশে আমি দিয়েছি বরকত। যেন আমি তাকে আমার নিদর্শন দেখাতে পারি। নিশ্চয় তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [আল-ইসরা: ০১]
আনাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমার জন্য বুরাক পাঠানো হল। বুরাক গাধা থেকে বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট একটি সাদা রঙের জন্তু। যতদূর দৃষ্টি যায় এক পদক্ষেপে সে ততদূর চলে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: আমি এতে আরোহণ করলাম এবং বাইতুল মাকদাস পর্যন্ত এসে পৌঁছলাম। তারপর অন্যান্য নবীগণ তাদের বাহনগুলো যে খুঁটির সাথে বাঁধতেন, আমি সে খুঁটির সাথে আমার বাহনটিও বাঁধলাম। তারপর মসজিদে প্রবেশ করলাম ও দু’ রাকাআত সালাত আদায় করে বের হলাম। জিবরীল (আঃ) একটি শরাবের পাত্র এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমার কাছে এলেন। আমি দুধ গ্রহণ করলাম। জিবরীল (আঃ) আমাকে বললেন, আপনি ফিতরাতকেই গ্রহণ করলেন। তারপর জিবরীল আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে গেলেন এবং আসমান পর্যন্ত পৌঁছে দ্বার খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কে? তিনি বললেন, আমি জিবরীল। জিজ্ঞেস কলা হলো, আপনার সাথে কে? বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ, পাঠানো হয়েছিল। অতঃপর আমাদের জন্য দরজা খুলে দেয়া হল। সেখানে আমি আদম (আঃ) এর দেখা পাই তিনি আমাকে মুবারাকবাদ জানালেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন। তারপর জিবরীল আমাকে উর্ধ্বলোক নিয়ে চললেন এবং দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছে দরজা খুলতে অনুরোধ করলেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, তাকে কি আনতে পাঠানো হয়েছিল? বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে আমি ঈসা ইবনু মারইয়াম ও ইয়াহইয়া ইবনু যাকারিয়া (আঃ) দুই খালাত ভাইয়ের দেখা পেলাম। তারা আমাকে মারহাবা বললেন, আমার জন্য কল্যাণের দু’আ করলেন। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে ঊর্ধ্বলোকে চললেন এবং তৃতীয় আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে ইউসুফ (আঃ) এর দেখা পেলাম। সমুদয় সৌন্দর্যের অর্ধেক দেয়া হয়েছিল তাকে। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে ইদরীস (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন। আল্লাহ তা’আল তার সম্পর্কে ইরশাদ করেছেনঃ “এবং আমি তাকে উন্নীত করেছি উচ্চ মর্যাদায়" (সূরা আল হাদীদ: ১৯)। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে পঞ্চম আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনি কে?” তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। অতঃপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে হারূন (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন। তারপর জিবরীল (আঃ) আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে মূসা (আঃ) এর দেখা পেলাম। তিনি আমাকে মারহাবা বললেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু’আ করলেন। তারপর জিবরীল (আঃ) সপ্তম আসমানের দ্বারপ্রান্তে পৌছে দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ। জিজ্ঞেস করা হলো, আপনাকে কি তাকে আনতে পাঠানো হয়েছিল? তিনি বললেন, হ্যাঁ! পাঠানো হয়েছিল। তারপর আমাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়া হল। সেখানে ইবরাহীম (আঃ)-এর দেখা পেলাম। তিনি বাইতুল মামুরে পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছেন। বাইতুল মামুরে প্রত্যেহ সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন যারা আর সেখানে পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ পান না। তারপর জিবরীল আমাকে সিদরাতুল মুনতাহায় নিয়ে গেলেন। সে বৃক্ষের পাতাগুলো হাতির কানের ন্যায় আর ফলগুলো বড় বড় মটকার মত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, সে বৃক্ষটিকে যখন আল্লাহর নির্দেশ আচ্ছাদিত করে তখন তা পরিবর্তিত হয়ে যায়। সে সৌন্দর্যের বর্ণনা আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে কারোর পক্ষে সম্ভব নয়। এরপর আল্লাহ তা’আলা আমার উপর যে ওহী করার তা ওহী করলেন। আমার উপর দিনরাত মোট পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করলেন, এরপর আমি মূসা (আঃ) এর কাছে ফিরে আসলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনার প্রতিপালক আপনার উপর কি ফরয করেছেন। আমি বললাম, পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত। তিনি বললেন, আপনার প্রতিপালকের নিকট ফিরে যান এবং একে আরো সহজ করার আবেদন করুন। কেননা আপনার উম্মত এ নির্দেশ পালনে সক্ষম হবে না। আমি বনী ইসরাঈলকে পরীক্ষা করেছি এবং তাদের বিষয়ে আমি অভিজ্ঞতা লাভ করেছি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তখন আমি আবার প্রতিপালকের কাছে ফিরে গেলাম এবং বললাম, হে আমার রব! আমার উম্মতের জন্য এ হুকুম সহজ করে দিন। পাঁচ ওয়াক্ত কমিয়ে দেয়া হল। তারপর মূসা (আঃ)-এর নিকট ফিরে এসে বললাম, আমার থেকে পাঁচ ওয়াক্ত কমানো হয়েছে। তিনি বললেন, আপনার উম্মত এও পারবে না। আপনি ফিরে যান এবং আরো সহজ করার আবেদন করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এভাবে আমি একবার মূসা (আঃ) ও একবার আল্লাহর মাঝে আসা-যাওয়া করতে থাকলাম। শেষে আল্লাহ তা’আলা বললেন: হে মুহাম্মাদ! যাও দিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নির্ধারণ করা হল। প্রতি ওয়াক্ত সালাতে দশ ওয়াক্ত সালাতের সমান সাওয়াব রয়েছে। এভাবে (পাঁচ ওয়াক্ত হল) পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাতের সমান। যে ব্যক্তি কোন নেক কাজের নিয়ত করল এবং তা কাজে রূপায়িত করতে পারল না, আমি তার জন্য একটি সাওয়াব লিখব। আর তা কাজে রূপায়িত করলে তার জন্য লিখব দশটি সাওয়াব। পক্ষান্তরে যে কোন মন্দ কাজের নিয়ত করল অথচ তা কাজে পরিণত করল না তার জন্য কোন গুনাহ লিখা হয় না। আর তা কাজে পরিণত করলে তার উপর লিখা হয় একটি মাত্র গুনাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তারপর আমি মূসা (আঃ) এর নিকট নেমে এলাম এবং তাকে এ বিষয়ে অবহিত করলাম। তিনি তখন বললেন, প্রতিপালকের কাছে ফিরে যান এবং আরো সহজ করার প্রার্থনা করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, এ বিষয়টি নিয়ে বারবার আমি আমার প্রতিপালকের নিকট আসা-যাওয়া করেছি, এখন আবার যেতে লজ্জা হচ্ছে।” {বুখারী (৭৫১৭), মুসলিম (১৬২), হাদিসের শব্দ সহীহ মুসলিম থেকে গৃহীত, তিরমিযী (৩১৩১), নাসাঈ (৪৫০), ইবনু মাজাহ (১৩৯৯)}
তার আরেকটি নিদর্শন হলো: চাঁদের দ্বিখণ্ডিত হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “কিয়ামত কাছাকাছি হয়েছে, আর চাঁদ বিদীর্ণ হয়েছে।” [আল-কামার: ০১] আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সময় চাঁদ দ্বি-খন্ডিত হয়েছে। এর এক খন্ড পর্বতের উপর এবং অপর খন্ড পর্বতের নিচে পড়েছিল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা সাক্ষী থাক।” {বুখারী (৪৮৬৪), মুসলিম (২৮০০), তিরমিযী (৩২৮৫)}
আল্লাহ তাকে অনেক বৈশিষ্ট্য দ্বারা বিশেষিত করেছেন, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “অন্য সব নবীদের চাইতে আমাকে ছয়টি বিশেষ মর্যাদা দান করা হয়েছে। আমাকে সংক্ষিপ্ত অথচ ব্যাপক অর্থবোধক কথা বলার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। আমাকে অত্যন্ত প্রভাব দ্বারা সাহায্য করা হয়েছে। আমার জন্য গনীমতের (যুদ্ধলব্ধ) অর্থ হালাল করা হয়েছে। আমার জন্য গোটা পৃথিবীর ভূমিকে পবিত্রকারী এবং মসজিদ করা হয়েছে। আমাকে সমগ্র সৃষ্টির জন্য (নবী করে) পাঠানো হয়েছে। আর আমাকে দিয়ে নবীদের আগমন-ধারা সমাপ্ত করা হয়েছে।” {মুসলিম: (৫২৩), তিরমিযী: (১৫৫৩)} আলেমগণ এসব বৈশিষ্ট্য কখনো তাদের রচনায় অন্তর্ভুক্ত করেছেন, আবার কখনো তার জন্যে স্বতন্ত্র কিতাব রচনা করেছেন।
আমরা বিশ্বাস করি যে, প্রত্যেক মুমিন নর ও নারীর উপর আবশ্যক হচ্ছে তার ওপর ঈমান আনয়ন করা, তিনি যে সংবাদ দিয়েছেন তা বিশ্বাস করা এবং তিনি যা নির্দেশ দিয়েছেন তা মেনে নেওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং তাঁর শক্তি যোগাও ও তাঁকে সম্মান কর; আর সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা কর।” [আল-ফাতহ: ৯] তিনি আরো বলেন, অতএব তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও যে নূর আমি নাযিল করেছি তাতে ঈমান আন। আর তোমাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে আল্লাহ্ সবিশেষ অবহিত।” [আত-তাগাবুন: ৮]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব ইবাদত অনুমোদন করেছেন তা ছাড়া আল্লাহর ইবাদত করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর যা রাসূল তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছেন, তোমরা তা গ্রহণ করো। আর যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করেছেন, তা হতে বিরত থাকো। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর।” [আল-হাশর : ৭] মহাসত্য আল্লাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরোধিতা করা থেকে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, “যারা তার আদেশের বিপরীত করে তাদের এ ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত যে, যেন তাদেরকে কোন ফিতনা কিংবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি না পেয়ে বসে।” [আন-নুর: ৬৩]
তাকে সম্মান করা ও ভালবাসা ওয়াজিব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আলে ইমরান : ৩১]
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে মুহাব্বত করা ঈমানের মৌলিক বিষয়ের একটি। আল্লাহ নিজের মহব্বতের সাথে তার মহব্বতকে মিলিয়েছেন এবং যে ব্যক্তি স্বভাবগত প্রিয় বস্তুকে যেমন আত্মীয়, সম্পদ, জন্মভূমি ও অন্যান্য কিছুকে তার মহব্বতের ওপর প্রাধান্য দিবে তাকে সতর্ক করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বলুন, ‘তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তান, তোমাদের স্ত্রী, তোমাদের গোত্র, তোমাদের সে সম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছ, আর সে ব্যবসা যার মন্দা হওয়ার আশঙ্কা তোমরা করছ এবং সে বাসস্থান, যা তোমরা পছন্দ করছ, যদি তোমাদের কাছে অধিক প্রিয় হয় আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তাঁর পথে জিহাদ করার চেয়ে, তবে তোমরা অপেক্ষা কর আল্লাহ তাঁর নির্দেশ নিয়ে আসা পর্যন্ত’। আর আল্লাহ ফাসিক সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।” [আত-তাওবাহ : ২৪]
মুমিনের নিকট তার নিজের নফস, পিতা-মাতা, সন্তান ও সকল মানুষ থেকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহব্বত বেশী হওয়া ওয়াজিব। ’আবদুল্লাহ ইবনু হিশাম রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলাম। তিনি তখন ’উমার ইবনুল খাত্তাব (রাঃ)-এর হাত ধরেছিলেন। উমার তাকে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার জান ছাড়া আপনি আমার কাছে সব কিছুর চেয়ে অধিক প্রিয়। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: না, যার হাতে আমার প্রাণ ঐ সত্তার কসম! তোমার কাছে আমি যেন তোমার প্রাণের চেয়েও প্রিয় হই। তখন উমার তাকে বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার কাছে আমার প্রাণের চেয়েও বেশি প্রিয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: হে উমর! এখন (তুমি সত্যিকার ঈমানদার হলে)।” বুখারী (৬৬৩২)
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা শাহাদাতাইন ও আযানে নিজের নামের সাথে আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাম মিলিত করেছেন। পূর্বের কিতাবসমূহ ও আল-কুরআনে তার নাম অনেকবার উল্লেখ হয়েছে। আর ইসলামের ইমামগণ তার সুন্নাত, সীরাত, আবয়ব, আখলাক-আচরণ ও যুদ্ধসমূহের ওপর বিভিন্ন প্রকার কিতাব রচনা করেছেন। তবে আমরা এখানে কেবল সেসব বিষয় উল্লেখ করেই যথেষ্ট করব নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ক্ষেত্রে যা বিশ্বাস করা ওয়াজিব।
কাযী ইয়ায রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আমরা যা উল্লেখ করেছি তা হলো পরিপূর্ণতা ও মহিমার গুণাবলি এবং আমরা দেখছি যে, কোনো যুগে আমাদের একজনকে যদি তার একটি অথবা দু’টি গুণ দ্বারা ধন্য করা হয়: যেমন বংশ, সৌন্দর্য, শক্তি, সহনশীলতা, সাহসিকতা, অথবা দানশীলতা, তাহলে তার সম্মান অনেক বেড়ে যায় এবং তার নামকে প্রবাদ হিসেবে ব্যবহার করা হয় এবং সে গুণের কারণে তার জন্য অন্তরে বড় প্রভাব তৈরি হয়, আর তা অতীত ও আদিমকাল থেকেই। অতএব এ সকল গুণ যার ভেতর একত্রিত হয় তার মহান মর্যাদা সম্বন্ধে আপনি কী মনে করেন? যা কোনো গণনায় আয়ত্তে আনা যায় না এবং যা কোনো লিখনি দ্বারা ব্যক্ত করা যায় না এবং যা সুউচ্চ মহান সত্তার দান করা ছাড়া উপার্জন ও কৌশল দ্বারা হাসিল করা যায় না! যেমন: নবুওয়ত, রিসালাত, অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব, মহব্বত, মনোনীতকরণ, ইসরা, দিদার লাভ, (ইসরার রাতে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের তার রবকে দেখার বিষয়টি মতবিরোধপূর্ণ। বিশুদ্ধ হলো আমাদের রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসরার রাতে তার রবকে দেখেননি।) নিকটে যাওয়া, কাছাকাছি হওয়া, অহী, সুপারিশ, অসীলা, শ্রেষ্টত্ব, উচ্চ মর্যাদা, মাকামে মাহমূদ, বোরাক, মিরাজ, সাদা-কালো সবার নিকট প্রেরিত হওয়া, নবীদের নিয়ে সালাত আদায় করা, নবীগণ ও উম্মতদের মধ্যে সাক্ষ্য প্রদান করা, আদম সন্তানের নেতৃত্ব, প্রশংসার পতাকা বহন, সুসংবাদ ও সতর্কবার্তা, আরশের নিকটে স্থানলাভ, সেখানে আনুগত্য করা, আমানতদারিতা, হেদায়েত, বিশ্ববাসীর প্রতি রহমত, সন্তুষ্টি ও প্রার্থিত বস্তু প্রদান করা, কাওসার, কথা শোনানো, নিআমত পূর্ণ করা, পূর্বাপর গোনাহ ক্ষমা পাওয়া, বক্ষ প্রসারিত হওয়া, ভার দূর করা, খ্যাতী সমুন্ন করা, বিজয়ের সম্মান দান, প্রশান্তি নাযিল হওয়া, ফেরেশতাদের দ্বারা শক্তিশালী করা, কিতাব, হিকমত, সাবউল মাসানী ও মহান কুরআন প্রদান , উম্মতকে পবিত্র করা, আল্লাহর কাছে দোয়া করা, তার প্রতি আল্লাহ তা‘আলা ও ফেরেশতাদের সালাত পাঠ করা, আল্লাহ যা শিখিয়েছেন তার দ্বারা মানুষের মধ্যে বিচার করা, তাদের থেকে বোঝা ও শিকল সরিয়ে ফেলা, আল্লাহর নামে শপথ করা, তাঁর ডাকে সাড়া দেওয়া, জড় বস্তু ও বোবা প্রাণীর সাথে কথা বলা... বধিরদের কথা শোনানো, তাঁর আঙ্গুলের মধ্যে থেকে পানির ঝর্ণা বের হওয়া, অল্প জিনিস বৃদ্ধি পাওয়া, চাঁদের বিদীর্ণ হওয়া, সূর্যকে পশ্চাদে ফিরিয়ে দেওয়া, বস্তুকে উল্টে দেওয়া এবং ভয়ের মাধ্যমে বিজয় দান করা... আরো অনেক বিষয়। যিনি তাকে এসব দান করেছেন ও এসব দ্বারা তাকে সম্মানি করেছেন এবং যিনি ছাড়া কোনো মাবূদ নেই, সেই সত্তা ছাড়া কেউ তা সংরক্ষণ করতে পারবে না। আর আখিরাতে তার জন্য আরো প্রস্তুত করেছেন উচ্চ মর্যাদা, সৌভাগ্যবান স্তর, নেকি এবং আরো অনেক কিছু যার সামনে বিবেকসমুহ থমকে দাঁড়ায় এবং তা আয়ত্তে আনার আগেই চিন্তাগুলো ক্লান্ত হয় যায়।” আশ-শিফা বি তারিফী হুকুকিল মুস্তাফা : (১/৫৫-৫৭)
অধ্যায়: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের বিস্তৃত পরিধি, যা সমস্ত সৃষ্টির জন্য প্রযোজ্য।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সকল মাখলূকের নিকট প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ বলেন, “বলুন, ‘হে মানুষ! নিশ্চয় আমি তোমাদের সবার প্রতি আল্লাহর রাসূল, যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী।তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই; তিনি জীবিত করেন ও মৃত্যু ঘটান। কাজেই তোমরা ঈমান আন আল্লাহর প্রতি ও তাঁর রাসূল উম্মী নবীর প্রতি যিনি আল্লাহ ও তাঁর বাণীসমূহে ঈমান রাখেন। আর তোমরা তার অনুসরণ কর, যাতে তোমরা হিদায়াতপ্রাপ্ত হও।” [আল-আরাফ: ১৫৮] তিনি আরো বলেন, “আর আমি তো আপনাকে সমগ্ৰ মানুষের জন্যই সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [সাবা : ২৮]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় প্রদান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে কোন নবীকে দেয়া হয়নি: আমাকে এমন প্রভাব দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে যা একমাসের দূরত্ব পর্যন্ত অনুভূত হয়। সমস্ত যমীন আমার জন্য সালাত আদায়ের স্থান ও পবিত্রতা অর্জনের উপায় করা হয়েছে। কাজেই যেখানেই সালাতের ওয়াক্ত হয় (সেখানেই) আমার উম্মত যেন সালাত আদায় করে নেয়। আমার জন্য গানীমত হালাল করা হয়েছে। অন্যান্য নবী নিজেদের বিশেষ গোত্রের প্রতি প্রেরিত হতেন আর আমাকে সকল মানবের প্রতি প্রেরণ করা হয়েছে। আমাকে সার্বজনীন সুপারিশের অধিকার প্রদান করা হয়েছে।” {সহীহ বুখারী: (৪৩৮), মুসলিম: (৫২১), নাসাঈ: (৪৩২)}
সকল মুসলিম একমত যে, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দু’টি বৃহৎ জাতি: মানুষ ও জিনের নিকট প্রেরণ করেছেন। জিনেরা কুরআন শুনেছে তারপর সতর্ককারীরূপে তাদের কওমের নিকট ফিরে গেছে। সে সর্ম্পকে আল্লাহ তাঁর রাসূলকে নিম্নের বাণীতে সংবাদ দিয়েছেন: “আর স্মরণ করুন, যখন আমি আপনার দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম জিনদের একটি দলকে, যারা মনোযোগসহকারে কুরআন পাঠ শুনছিল। অতঃপর যখন তারা তার কাছে উপস্থিত হল, তারা বলল, ‘চুপ করে শুন।’ অতঃপর যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হল তারা তাদের সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে।* তারা বলেছিল, ‘হে আমাদের সম্প্রদায়! নিশ্চয় আমরা এমন এক কিতাবের পাঠ শুনেছি যা নাযিল হয়েছে মূসার পরে, এটা তার সম্মুখস্থ কিতাবকে সত্যায়ন করে এবং সত্য ও সরল পথের দিকে হেদায়াত করে।* হে আমাদের সম্প্রদায়! আল্লাহর দিকে আহবানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তার উপর ঈমান আন; তিনি তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হতে তোমাদেরকে রক্ষা করবেন।* আর যে আল্লাহর দিকে আহ্বানকারীর প্রতি সাড়া না দেয় তবে সে তো যমীনে আল্লাহ্কে অপারগকারী নয়। আর আল্লাহ ছাড়া তার কোনো অভিভাবক নেই। তারাই সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।” [আল-আহকাফ: ২৯-৩০]
আল্লাহ তা‘আলা সকল নবী-রাসূল থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছেন যে, যদি তাদের জীবিত থাকাবস্থায় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করা হয়, তাহলে তারা তার ওপর অবশ্যই ঈমান আনবে। আল্লাহ আজ্জা শানুহু বলেন, “আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার নিয়েছেন- আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমাত দিয়েছি, অতঃপর তোমাদের সাথে যা আছে তা সত্যায়নকারীরূপে একজন রাসূল তোমাদের কাছে আসবে- তখন অবশ্যই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেন, ‘তোমরা কি স্বীকার করেছ এবং এর উপর আমার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছ’? তারা বলল, ‘আমরা স্বীকার করলাম’। আল্লাহ বললেন, ‘তবে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম’।” [আলে ইমরান : ৮১] আলী ইবন আবী তালিব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন: “আল্লাহ আদম ও তার পরে এমন কোনো নবী প্রেরণ করেননি যার থেকে মুহাম্মাদের ব্যাপারে এই অঙ্গীকার নেননি যে, যদি তিনি প্রেরিত অবস্থায় সে জীবিত থাকে, তাহলে অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনয়ন করবে, তাকে সাহায্য করবে। আর আল্লাহ তাকে আদেশ করবেন, ফলে সে স্বীয় কওমের নিকট থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করবে। এ মর্মে আল্লাহ বলেন: “আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার নিয়েছেন- আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমাত দিয়েছি, অতঃপর তোমাদের সাথে যা আছে তা সত্যায়নকারীরূপে একজন রাসূল তোমাদের কাছে আসবে- তখন অবশ্যই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে।...” [আলে ইমরান: ৮১] শেষ পর্যন্ত।” তাফসীর তাবারী: (৫/৫৪০)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমার পিতা ইবরাহীমের দোয়া, ঈসা কর্তৃক তার কওমকে দেওয়া সুসংবাদ এবং আমার মায়ের স্বপ্ন যাতে তিনি দেখেছেন যে, তার থেকে একটি নূর বের হয়ে শাম দেশের অট্টালিকাগুলো আলোকিত করেছে।” {আহমাদ (১৭১৬৩), উসমান ইবন সাঈদ আদ-দারিমী, আর-রাদ্দু আলাল জাহমিয়্যাহ (২৬১), ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (৪১৮), আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ (৮৬৫), ইবনু হিব্বান (৬৪০৪), তাবারানী, মুসনাদে শামিয়্যীন (১৪৫৫)} রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন, “আমি আমার পিতা ইবরাহীমের দোয়া।” এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালামের দোয়া যার সংবাদ আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দিয়েছেন। আর তা হলো তাঁর বাণী: “হে আমাদের রব! আর আপনি তাদের মধ্য থেকে তাদের কাছে এক রাসূল পাঠান, যিনি আপনার আয়াতসমূহ তাদের কাছে তিলাওয়াত করবেন; তাদেরকে কিতাব ও হেকমত শিক্ষা দেবেন এবং তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন। আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আল-বাকারা: ১২৯]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, সকল নবী তাদের কওমকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সুসংবাদ প্রদান করেছেন। তার এবং তার সাহাবীদের গুণাবলি তাওরাত ও ইঞ্জিলে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, “মুহাম্মদ আল্লাহর রাসূল এবং তার সাথে যারা আছে তারা কাফিরদের প্রতি অত্যন্ত কঠোর; পরস্পরের প্রতি সদয়, তুমি তাদেরকে রুকূকারী, সিজদাকারী অবস্থায় দেখতে পাবে। তারা আল্লাহর করুণা ও সন্তুষ্টি অনুসন্ধান করছে। তাদের আলামত হচ্ছে, তাদের চেহারায় সিজদার চিহ্ন থাকে। এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইনজীলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো একটি চারাগাছের মত, যে তার কঁচিপাতা উদগত করেছে ও শক্ত করেছে, অতঃপর তা পুষ্ট হয়েছে ও স্বীয় কান্ডের উপর মজবুতভাবে দাঁড়িয়েছে, যা চাষীকে আনন্দ দেয়। যাতে তিনি তাদের দ্বারা কাফিরদেরকে ক্রোধান্বিত করতে পারেন। তাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপ্রতিদানের ওয়াদা করেছেন।” [আল-ফাতহ: ২৯] মহা সম্মানীত আল্লাহ আরো বলেন, “যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী; যার গুণাবলী তারা নিজেদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল- যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং তার সাথে যে নূর নাযিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।” [আল-আরাফ: ১৫৭] মাসীহ আলাইহিস সালাম বনু ইসরাইলকে তার সুসংবাদ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা তার সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি তাদেরকে বলেছেন: “হে বনী ইসরাঈল ! নিশ্চয় আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল এবং আমার পূর্ব থেকে তোমাদের কাছে যে তাওরাত রয়েছে আমি তার সত্যায়নকারী এবং আমার পরে আহমাদ নামে যে রাসূল আসবেন আমি তার সুসংবাদদাতা। পরে তিনি যখন সুস্পষ্ট প্রমাণাদিসহ তাদের কাছে আসলেন তখন তারা বলতে লাগল, এটা তো স্পষ্ট জাদু।” [আস-সাফ্: ৬] আহলে কিতাবরা নিজেদের সন্তানকে যেমন চিনতো তেমনি তাকেও চিনতো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আমি যাদেরকে কিতাব দিয়েছি তারা তাকে সেরূপ জানে যেরূপ তারা নিজেদের সন্তানদেরকে চিনে। আর নিশ্চয় তাদের একদল জেনে-বুঝে সত্য গোপন করে থাকে।” [আল-বাকারা: ১৪৬]
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়তের আরেকটি আলামত হলো: তার কাঁধের ওপর নবুওয়তের মোহর, যা কিতাবীদের নিকটও প্রসিদ্ধ ছিল। যেমন সায়েব ইবন ইয়াজিদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “তারপর তার পিছনে দাঁড়ালাম। তখন আমি তার উভয় কাঁধের মধ্যস্থলে নুবূওয়াতের মোহর দেখতে পেলাম। তা ছিল পর্দার ঘুণ্টির মত।” {সহীহ বুখারী (১৯০), মুসলিম (২৩৪৫), তিরমিযী (৩৬৪৩)}
জাবির ইবন সামুরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি তার পিঠের উপরিভাগে কবুতরের ডিম সদৃশ নুবুওয়াতের মোহর দেখেছি। এটির রং ছিল তার গায়ের রংয়ের মতো।” {সহীহ মুসলিম (২৩৪৪), তিরমিযী (৩৬৪৪), নাসায়ী (৫১১৪)}
আমরা তার রিসালাতের ব্যাপকতায় বিশ্বাস করি। এ জন্যই তিনি কেবলমাত্র এক আল্লাহর ইবাদত, তার রিসালাতের প্রতি ঈমান এবং তাকে সত্যারোপ করার দাওয়াত দিয়ে রাজা-বাদশাহদের নিকট চিঠি-পত্র প্রেরণ করেছেন। যেমন আবূ বুরদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নাজ্জাসীর দেশে হিজরত করতে নির্দেশ দেন। -অতঃপর বর্ণনাকারী পরবর্তী ঘটনা বর্ণনা করেন।- নাজ্জাসী বললেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, তিনি আল্লাহর রাসূল। তিনি সেই রাসূল, যার সম্পর্কে ঈসা ইবনু মারইয়াম সুসংবাদ প্রদান করেছেন। আমি যদি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে না থাকতাম তবে আমি তার কাছে গিয়ে তার জুতো জোড়া বহন করতাম।” {আবূ দাউদ (৩২০৫), মুসান্নাফ ইবনু আবি শায়বাহ (৩৭৭৯৫), আব্দ ইবনু হুমাইদ (৫৫০), ইবনু আবী আসিম, আল-আহাদ ও আল-মাসানী (৩৬৬), মুসনাদে রুয়ানী (৫০২), হাকিম (৩২৬৮)}
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পত্র পেয়ে হিরাকল বলেছিল: “আমি জানতাম, তার আগমন ঘটবে। কিন্তু তিনি তোমাদের মধ্যে আসবেন, সে ধারণা আমার ছিল না। তুমি যা যা বললে, তা যদি সত্য হয়, তবে অচিরেই তিনি আমার এই পায়ের নীচের জায়গার মালিক হয়ে যাবেন। আমি যদি আশা করতে পারতাম যে, তার নিকট পৌঁছতে পারবো, তবে কষ্ট করে তার সাক্ষাতের চেষ্টা করতাম। যদি আমি তার নিকট থাকতাম, তবে তার দু’টি পা ধুয়ে দিতাম।” {সহীহ বুখারী (২৯৪১), আবূ দাউদ (৫১৩৬)}
হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নাজরান এলাকার দু’জন সরদার আকিব এবং সাইয়িদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তার সঙ্গে মুবাহালা করতে চেয়েছিল। বর্ণনাকারী হুযাইফাহ বলেন, তখন তাদের একজন তার সঙ্গীকে বলল, এরূপ করো না। কারণ আল্লাহর কসম! তিনি যদি নবী হয়ে থাকেন আর আমরা তার সঙ্গে মুবাহালা করি, তাহলে আমরা এবং আমাদের পরবর্তী সন্তান-সন্ততি কেউ রক্ষা পাবো না। তারা উভয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলল, আপনি আমাদের নিকট হতে যা চাবেন আপনাকে আমরা তা-ই দেব। তবে এর জন্য আপনি আমাদের সঙ্গে একজন আমানতদার ব্যক্তিকে পাঠিয়ে দিন। আমানতদার ব্যতীত অন্য কোন ব্যক্তিকে আমাদের সঙ্গে পাঠাবেন না। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সঙ্গে অবশ্যই এমন একজন আমানতদার পাঠাবো যে প্রকৃতই আমানতদার। এ পদে ভূষিত হওয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ আগ্রহী হলেন। তখন তিনি বললেন, হে আবূ ‘উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ্! তুমি উঠে দাঁড়াও। তিনি যখন দাঁড়ালেন, তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: এ হচ্ছে এই উম্মতের সত্যিকার আমানতদার।” {সহীহ বুখারী (৪৩৮০), মুসলিম (২৪২০), তিরমিযী (৩৭৯৬), ইবনু মাজাহ (১৩৫)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ জমিনকে আমাদের নবীর জন্য সে পর্যন্ত গুটিয়ে পেশ করেছেন, যে পর্যন্ত তার উম্মতের রাজত্ব পৌঁছবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ তাআলা গোটা যমীনকে একত্রিত করে আমার সামনে পেশ করলেন। তখন আমি যমীনের পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্ত দেখে নিলাম। পৃথিবীর ততটুকু স্থান আমাকে দেখানো হয়েছে আমার উম্মতের শাসন বা রাজত্ব যে পর্যন্ত বিস্তার লাভ করবে।” {সহীহ মুসলিম (২৮৮৯), আবু দাউদ (৪২৫২), তিরমিযী (২১৭৬), ইবনু মাজাহ (৩৯৫২)}
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের ব্যাপকতার আরেকটি প্রমাণ হলো: অনেক ইহুদি পাদ্রী ও খ্রিস্টান সন্ন্যাসীদের ইসলাম গ্রহণ করা, বরং হাজারো কিতাবীদের ইসলাম গ্রহণ।
অধিকন্তু, তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোমকদের সাথে যুদ্ধ করেছেন এবং তারপরে তার সাহাবীদেরকে রোম ও পারস্যদের সাথে যুদ্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন।
অধ্যায়: রিসালাত ও রাসূলগণ আলাইহিমুস সালামদের বিরোধীদের কথাবার্তা সম্পর্কিত।
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “আর এভাবেই আমি মানব ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবীর শত্রু করেছি, প্রতারণার উদ্দেশ্যে তারা একে অপরকে কুমন্ত্রণা দেয়। যদি আপনার রব ইচ্ছে করতেন তবে তারা এসব করত না; কাজেই আপনি তাদেরকে ও তাদের মিথ্যা রটনাকে পরিত্যাগ করুন।” [আল-আনআম : ১১২] মহা প্রশংসিত ও পবিত্র নামসমূহের অধিকারী সত্ত্বা আরো বলেন, “আর এভাবেই আমি প্রত্যেক নবীর জন্য অপরাধীদের থেকে শত্রু বানিয়ে থাকি। আর আপনার রবই পথপ্রদর্শক ও সাহায্যকারীরূপে যথেষ্ট।” [আল-ফুরকান: ৩১]
আল্লাহর হিকমতের দাবি হলো, তিনি নিজ অনুগ্রহে যাকে ইচ্ছে হিদায়াত দিবেন এবং নিজ ইনসাফে যাকে ইচ্ছে গোমরাহ করবেন। যেমন তাঁর হিকমতের দাবি হলো প্রত্যেক নবীরই শত্রু হবে এবং এসব শত্রুরা বাতিলের ওপর একে অপরকে ওসিয়ত করবে এবং তাদের কথা-বার্তায় ঐকমত্য পোষণ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আপনাকে শুধু তা-ই বলা হয়, যা বলা হতো আপনার পূর্ববর্তী রাসূলগণকে। নিশ্চয় আপনার রব একান্তই ক্ষমাশীল এবং যন্ত্রণাদায়ক শাস্তিদাতা।” [ফুসসিলাত: ৪৩] প্রত্যেক জাতির নেতৃস্থানীয়দের কথাবার্তা সামঞ্জস্যশীল ছিল। কখনো তারা বলতো: তিনি যাদুকর, অথবা গণক, অথবা মিথ্যাবাদী। যেমন ফিরআউন সম্পর্কে আল্লাহ যে সংবাদ দিয়েছেন তাতে ফিরআউন মূসাকে বলেছে: “আর অবশ্যই আমি মূসাকে আমার নির্দেশনাবলি ও প্রমাণসহ পাঠিয়েছিলাম।* ফিরআউন, হামান ও কারূনের কাছে। অতঃপর তারা বলল, 'জাদুকর, চরম মিথ্যাবাদী ৷” [গাফির: ২৩-২৪] কখনো তারা তাদের নিকট (নবীগণের) নিদর্শনসহ আসাকে অস্বীকার করতো। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তারা বলল, ‘হে হূদ! তুমি আমাদের কাছে কোন স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে আসনি, তোমার কথায় আমরা আমাদের উপাস্যদেরকে পরিত্যাগকারী নই এবং আমরা তোমার প্রতি বিশ্বাসীও নই।” [হুদ: ৫৩] তারা কখনো মনে করতো যে, তিনি আল্লাহর ওপর মিথ্যা রচনা করেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদের খারাপ কথার সংবাদ দিয়ে বলেন: “আর তাদের কাছে যখন আমার সুস্পষ্ট আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করা হয় তখন তারা বলে, 'তোমাদের পূর্বপুরুষ যার 'ইবাদাত করত এ ব্যক্তিই তো তার ইবাদাতে তোমাদেরকে বাধা দিতে চায়।' তারা আরও বলে, 'এটা তো মিথ্যা উদ্ভাবন ছাড়া আর কিছুই নয়’। আর কাফিরদের কাছে যখন সত্য আসে তখন তারা বলে, 'এ তো এক সুস্পষ্ট জাদু।” [সাবা: ৪৩]
কখনো তারা তাকে পাগল বলে আখ্যায়িত করতো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর তারা বলে, ‘হে ঐ ব্যক্তি, যার প্রতি কুরআন নাযিল হয়েছে! তুমি তো নিশ্চয় উন্মাদ।” [আল-হিজর: ৬] মহান আল্লাহ তাদের কথা-বার্তার সংবাদ দিয়ে বলেন, “ফির‘আউন বলল, ‘তোমাদের প্রতি প্রেরিত তোমাদের রাসূল তো অবশ্যই পাগল।” [আশ-শুআরা: ২৭] কখনো নয়, আল্লাহর রাসূলগণ সকলেই অন্যান্য মানুষদের থেকে বিবেক-বুদ্ধিতে পরিপূর্ণ এবং পরিশুদ্ধ অন্তরের অধিকারী ছিলেন।
কখনো তারা নবীগণ যে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে দাওয়াত দিতেন তাকে বড় মনে করতেন। আল্লাহ তাদের কথাগুলোর সংবাদ দিয়ে বলেন, তারা বলেছে: “তুমি কি আমাদের কাছে এ উদ্দেশ্যে এসেছ যে, আমরা যেন এক আল্লাহর ইবাদত করি এবং আমাদের পিতৃপুরুষরা যার ইবাদত করত তা ছেড়ে দেই? কাজেই তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যা ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এস।” [আল-আরাফ: ৭০] তারা আরো বলে: “সে কি বহু ইলাহকে এক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? এটা তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার!” [সোয়াদ: ৫]
কখনো তারা নবীর দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ তিনিও তাদের মতই মানুষ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “অতঃপর তার সম্প্রদায়ের নেতারা যারা কুফরী করেছিল, তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাকে আমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছু দেখছি না।” [হুদ: ২৭] আল্লাহ আরো বলেন, “তাদের অন্তর থাকে অমনোযোগী। আর যারা যালেম তারা গোপনে পরামর্শ করে, (বলে:) ‘এ তো তোমাদের মতই একজন মানুষ, তবুও কি তোমরা দেখেশুনে জাদুর কবলে পড়বে?” [আল-আম্বিয়া: ৩]
তারা কখনো (নবীদের নিকট) এমন কিছু তলব করে যা সৃষ্টির ক্ষমতায় নেই- তবে সেটা হলো তাদের অহংকার ও একঘোঁয়েমী। যেমন তারা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করা, অথবা তার জন্য বাগান হওয়া, অথবা আসমানকে খণ্ড-বিখণ্ড করে তাদের ওপর ফেলা, অথবা তাদের সামনে আল্লাহ ও মালায়েকাদের নিয়ে আসা, অথবা নবীর সোনার তৈরির ঘর হওয়া, অথবা আসমানে ওঠা এবং তাদের ওপর কিতাব নাযিল করা তলব করেছে। যেমনটি আল্লাহর নিম্নের বাণীতে রয়েছে: “আর তারা বলে, ‘আমরা কখনই তোমার উপর ঈমান আনব না, যতক্ষণ না তুমি আমাদের জন্য ভূমি হতে এক প্রস্রবণ উৎসারিত করবে,* ‘অথবা তোমার খেজুরের ও আঙ্গুরের এক বাগান হবে যার ফাঁকে ফাঁকে তুমি অজস্র ধারায় প্রবাহিত করে দেবে নদী-নালা।* অথবা তুমি যখন বলে থাক, সে অনুযায়ী আকাশকে খণ্ড-বিখণ্ড করে আমাদের উপর ফেলবে, অথবা আল্লাহ্ ও ফিরিশতাদেরকে আমাদের সামনে উপস্থিত করবে* অথবা তোমার একটি সোনার তৈরি ঘর হবে, অথবা তুমি আকাশে আরোহণ করবে, কিন্তু তোমার আকাশ আরোহণে আমরা কখনো ঈমান আনবো না যতক্ষণ তুমি আমাদের প্রতি এক কিতাব নাযিল না করবে যা আমরা পাঠ করব।’ বলুন, ‘পবিত্র মহান আমার রব! আমি তো হচ্ছি শুধু একজন মানব রাসুল।” আর যখন মানুষের কাছে হিদায়াত আসে, তখন তাদেরকে ঈমান আনা থেকে বিরত রাখে কেবল তাদের এ কথা যে, ‘আল্লাহ্ কি মানুষকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন?* বলুন, ‘ফিরিশতাগণ যদি নিশ্চিত হয়ে যমীনে বিচরণ করত তবে আমি আসমান থেকে তাদের কাছে অবশ্যই ফিরিশতা রাসুল করে পাঠাতাম।” [আল-ইসরা: ৯০-৯৫]
কখনো তারা নবী তাদেরকে যে আযাবের প্রতিশ্রুতি দিতেন সেটা পেশ করার দাবি করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তারা বলল, ‘তুমি কি আমাদের কাছে এ উদ্দেশ্যে এসেছ যে, আমরা যেন এক আল্লাহর ইবাদত করি এবং আমাদের পিতৃপুরুষরা যার ইবাদত করত তা ছেড়ে দেই? কাজেই তুমি সত্যবাদী হলে আমাদেরকে যা ভয় দেখাচ্ছ তা নিয়ে এস।” [আল-আরাফ: ৭০] মহা সম্মানীত আল্লাহ আরো বলেন, “অতঃপর তারা সে উষ্ট্রীকে হত্যা করে এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করে ও বলে, ‘হে সালিহ! তুমি আমাদেরকে যার ভয় দেখাচ্ছ, তা নিয়ে এস, যদি তুমি রাসূলদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাক।” [আল-আরাফ: ৭৭]
তারা কখনো রাসূলদেরকে পথভ্রষ্ট বা নির্বোধ বলে অপবাদ দিতো। যেমন আল্লাহ তাদের যেসব কথা আমাদের নিকট বর্ণনা করেছেন তাতে রয়েছে: “তার সম্প্রদায়ের প্রধানরা যারা কুফরী করেছিল, তারা বলেছিল, ‘আমরা তো তোমাকে নির্বুদ্ধিতায় নিপতিত দেখছি। আর আমরা তো তোমাকে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করি।” [আল-আরাফ: ৬৬]
তারা কখনো আল্লাহর রাস্তা থেকে বিরত রাখতো এবং তাদের অনুসারীদের বলতো, তোমরা এই কুরআনকে শ্রবণ করো না এবং তাতে হট্টগোল কর। যেমন আল্লাহ তাদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, “আর কাফিররা বলে, 'তোমরা এ কুরআনের নির্দেশ শোন না এবং তা আবৃত্তির সময় শোরগোল সৃষ্টি কর, যাতে তোমরা জয়ী হতে পার।” [ফুসসিলাত: ৩৬]
তারা কখনো মিথ্যা প্রতিপন্ন করে রাসূলদের মোকাবিলা করেছে। যেমন আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন যে, তারা বলেছে: “আর আমরা তো তোমাকে মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করি।” অথবা তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অপবাদ দিত যে, তাকে যিনি শিক্ষা দেন তিনি একজন মানুষ এবং তার কাছে যা আসে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহী নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর আমি অবশ্যই জানি যে, তারা বলে, ‘তাকে তো কেবল একজন মানুষ শিক্ষা দেয়’। তারা যার প্রতি এটাকে সম্পর্কযুক্ত করার জন্য ঝুঁকছে তার ভাষা তো আরবী নয়; অথচ এটা (কুরআন) হচ্ছে সুস্পষ্ট আরবী ভাষা।” [আন-নাহল: ১০৩]
কখনো তারা এই বলে রাসূলদের থেকে ফিরে যেত যে, যারা তাকে অনুসরণ করেছে তারা সবাই দূর্বল। যেমন আল্লাহ তা‘আলা নূহ-এর কওম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, “অতঃপর তার সম্প্রদায়ের নেতারা যারা কুফরী করেছিল, তারা বলল, ‘আমরা তো তোমাকে আমাদের মত একজন মানুষ ছাড়া কিছু দেখছি না; আমরা তো দেখছি, তোমার অনুসরণ করছে তারাই, যারা আমাদের মধ্যে বাহ্যিক দৃষ্টিতেই অধম এবং আমরা আমাদের উপর তোমাদের কোন শ্রেষ্ঠত্ব দেখছি না, বরং আমরা তোমাদেরকে মিথ্যাবাদী মনে করি।” [হুদ: ২৭] হিরাকল আবূ সূফিয়ানকে বলল, “আমি তোমাকে জিজ্ঞাসা করেছি, মানুষদের থেকে নেতারা তাকে অনুসরণ করে নাকি তাদের দূর্বলেরা? তুমি বললে, দূর্বলরা তার অনুসরণ করে। বস্তুত তারাই রাসূলদের অনুসারী হন।” {বুখারী (৭), মুসলিম (১৭৭৩)}
তারা কখনো রাসূলদেরকে তিরস্কার ও ঠাট্টা করতো। যেমন আল্লাহর বাণীতে রয়েছে: “বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে?” [আত-তাওবাহ: ৬৫] অনুরূপভাবে আল্লাহর এ বাণীতেও উল্লিখিত হয়েছে: “আর তিনি নৌকা নির্মাণ করতে লাগলেন এবং যখনই তার সম্প্রদায়ের নেতারা তার পাশ দিয়ে যেত, তাকে নিয়ে উপহাস করত; তিনি বললেন, ‘তোমরা যদি আমাদেরকে নিয়ে উপহাস কর, তবে নিশ্চয় আমরাও তোমাদেরকে উপহাস করব, যেমন তোমরা উপহাস করছ।” [হুদ: ৩৮] কখনো তারা রাসূলদের ধোকা দিত এবং তাদের সাথে মিশে ও তাদের দিকে ঝুঁকে তাদের সাথে আপোষ করার চেষ্টা করতো। যেমন আল্লাহর বাণীতে রয়েছে: “তারা কামনা করে যে, আপনি আপোষকামী হোন, তাহলে তারাও আপোষকামী হবে।” [আল-কালাম: ৯] তিনি আরো বলেন, “আর আমি অবিচলিত না রাখলে আপনি অবশ্যই তাদের দিকে প্রায় কিছুটা ঝুঁকে পড়তেন।” [আল-ইসরা: ৭৪]
কখনো তারা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে নবীর ওপর অহংকার প্রদর্শন করেছে। যেমন ফিরআউন মূসা আলাইহিস সালামকে বলেছে: “নাকি আমি এ ব্যক্তি হতে শ্রেষ্ঠ নই, যে হীন এবং স্পষ্ট কথা বলতেও প্রায় অক্ষম!” [আয-যুখরূফ: ৫২]
আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আবূ সূফিয়ানের কথা যখন সে শামে ছিল: “যখন আমরা বের হলাম তখন আমি আমার সাথীদের বললাম: আবূ কাবশার সন্তানের তো বিস্তার এতদূর ঘটেছে যে, রোমের রাষ্ট্রনায়ক পর্যন্ত তাকে ভয় পায়।” {সহীহ বুখারী (৪৫৫৩), মুসলিম (১৭৭৩), তিরমিযী (২৭১৭)}
কখনো নেতারা নবীকে দেশান্তর করার হুমকি প্রদান করে। যেমন শুআইবের কওম সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “তার সম্প্রদায়ের অহংকারী নেতার বলল, হে শু'আইব! আমরা অবশ্যই তোমাকে ও তোমার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে আমাদের জনপদ থেকে বের করে দেব অথবা তোমাদেরকে আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আসতে হবে। তিনি বললেন, যদিও আমরা সেটাকে ঘৃণা করি তবুও?” [আল-আরাফ: ৮৮]
তিনি আরো বলেন, “আর কাফিররা তাদের রাসূলদেরকে বলেছিল, আমরা তোমাদেরকে আমাদের দেশ হতে অবশ্যই বহিষ্কৃত করব অথবা তোমরা আমাদের ধর্মাদর্শে ফিরে আসবে।” [ইবরাহীম: ১৩] আল্লাহ আমাদেরকে সংবাদ দিয়েছেন, লূতের সম্প্রদায় লূত আলাইহিস সালাম এবং তার সাথে যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে বলেছে: “এদেরকে তোমাদের জনপদ থেকে বহিস্কার কর, এরা তো এমন লোক যারা অতি পবিত্র হতে চায়।” [আল-আরাফ: ৮২] কুরাইশ কাফিররা আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথে যারা ছিল তাদেরকে এবং বনু হাশিমকে শিআবে আবি তালেবে তিন বছর অবরুদ্ধ করে রেখেছিল। তারা তাকে নিজ দেশ থেকে বের করেও দিয়েছিল:
ইবনু মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনের গানীমত বণ্টন করলেন, তখন আনসারদের এক ব্যক্তি বলে ফেলল যে, এই বণ্টনের ব্যাপারে তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করেননি। কথাটি শুনে আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলাম এবং তাকে কথাটি জানিয়ে দিলাম। তখন তার চেহারার রং পরিবর্তিত হয়ে গেল। এরপর তিনি বললেন, “আল্লাহ, মূসা-এর উপর রহমত বর্ষণ করুন। তাঁকে এর চেয়েও অধিক কষ্ট দেয়া হয়েছিল। তাতে তিনি ধৈর্য ধারণ করেছিলেন।” {বুখারী (৪৩৩৫), মুসলিম (১০৬২), তিরমিযী (৩৮৯৬)}
ইবরাহীমের কওম তাকে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার অপচেষ্টা করেছে। আর আল্লাহ তা‘আলা তাকে মুক্ত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “উত্তরে ইবরাহীমের সম্প্রদায় শুধু এটাই বলল, ‘একে হত্যা কর অথবা অগ্নিদগ্ধ কর।” [আল-আনকাবূত: ২৪] বনু ইসরাইল তাদের নবীগণের সাথে যেসব আচরণ করেছে সে সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে আল্লাহ বলেন, “তবে কি যখনি কোনো রাসূল তোমাদের কাছে এমন কিছু এনেছে যা তোমাদের মনঃপুত নয় তখনি তোমরা অহংকার করেছ ? অতঃপর একদলের উপর মিথ্যারোপ করেছ এবং একদলকে করেছ হত্যা?” [আল-বাকারা: ৮৭]
এই হলো রাসূলদের সাথে অহংকারকারীদের আচরণ। এটি একটি চিরন্তন নিয়ম যা প্রত্যেক উম্মতের দাম্ভিক ও নেতারা তাদের সংস্কারকারীদের সাথে প্রয়োগ করে থাকে।
কিন্তু আল্লাহর নীতি হলো, তিনি তাঁর রাসূল ও নবীগণকে সাহায্য করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সাহায্য করব দুনিয়ার জীবনে, আর যেদিন সাক্ষীগণ দাঁড়াবে।” [গাফির: ৫১] তিনি আরো বলেন, “তারপর আমি তাদের প্রতি কৃত ওয়াদা সত্য করে দেখালাম, ফলে আমি তাদেরকে ও যাদেরকে ইচ্ছে রক্ষা করেছিলাম এবং সীমালংঘনকারীদেরকে করেছিলাম ধ্বংস।” [আম্বিয়া: ৯]
পর্ব: পরকাল দিবস।
পর্বটির সারাংশ
আমরা পরকাল দিবসের প্রতি ঈমান আনয়ন করি এবং তা ঈমানের ছয়টি রোকনের একটি। এটাকে ইয়াওমুল আখির তথা সর্বশেষ দিন বা পরকাল নামকরণ করা হয়, কারণ তা দুনিয়ার সর্বশেষ দিন, তারপর আর কোনো দিন নেই। তার আরো নাম রয়েছে, যেমন: ইয়াওমুল কিয়ামাহ, ইয়াওমুল বা‘স, ইয়াওমুল হিসাব, ইয়াওমুদ্দিন, আত-তাম্মাহ, আল-হাক্কাহ, আল-ওয়াকিয়াহ, আস-সাখখাহ, আল-গাশিয়াহ। আল্লাহ তাঁর সম্মানিত কিতাবের একাধিক জায়গায় ইয়াওমুল আখিরাহকে উল্লেখ করেছেন।
পরকাল দিবসের প্রতি ঈমানের অংশ হলো: তার আলামতসমূহ- অর্থাৎ কিয়ামতের আলামতসমূহের প্রতি এবং মৃত্যুর পর যা হবে তার প্রতি ঈমান আনয়ন করা। আমরা প্রথম কিয়ামতের আলামত, অতঃপর মৃত্যুর পরের বিষয় নিয়ে কথা বলব। কারণ, তা পরকালের আগে সংঘটিত হয়।
কিয়ামতের আলামত হলো: যেসব আলামত কিয়ামত সন্নিকটে হওয়ার প্রমাণ বহন করে। কিয়ামতের আলামতগুলো গায়েবী বিষয়, তার প্রতি ঈমান আনতে আমরা আদিষ্ট হয়েছি।
কিয়ামতের আলামতগুলো তিনভাগে বিভক্ত:
এক: কিয়ামতের যেসব আলামত প্রকাশ পেয়েছে এবং শেষ হয়ে গেছে। এগুলো অনেক।
দুই: কিয়ামতের যেসব আলামত প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু শেষ হয়নি, বরং তা এখনো চলমান আছে।
তিন: কিয়ামতের যেসব আলামত এখনো প্রকাশ পায়নি, তবে তা কিয়ামতের সামনে ও তার কাছাকাছি সময়ে প্রকাশ পাবে।
পরকাল দিবসের প্রতি ঈমান আনয়নের অংশ হলো: এই মর্মে ঈমান আনা যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলার চেহারা ছাড়া সবকিছু ধ্বংস হয়ে যাবে এবং মালাকুল মউত রূহসমূহ কবজ করবেন। তাছাড়া মৃত্যুর পর যা ঘটবে, যেমন মৃত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা, কবরের শাস্তি ও নিয়ামত ইত্যাদির প্রতি ঈমান আনা।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ যখন এই দুনিয়া নিঃশেষ ও তার পরিসমাপ্তির ইচ্ছা করবেন, তখন তিনি ফেরেশতাকে নির্দেশ দিবেন, তিনি প্রথমবারের মত সিঙ্গায় ফুঁ দিবেন, আর আসমান ও জমিনে যারা থাকবে সবাই বেহুশ হয়ে যাবে, তবে আল্লাহ যাদের চাইবেন তারা ছাড়া। তারপর আল্লাহ বৃষ্টিবর্ষণ করবেন, তা থেকে মানুষের শরীর গজাবে। অতঃপর আল্লাহ ফেরেশতাকে নির্দেশ দিবেন, আর তিনি দ্বিতীয়বারের মত সিঙ্গায় ফূঁ দিবেন, ফলে কবরে থাকা সবাই ওঠে দাঁড়াবে এবং মানুষেরা দু’জাহানের রব আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হবে। জমিন সর্বপ্রথম আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বিদীর্ণ হবে, সর্বপ্রথম আমাদের নবীরই হুঁশ ফিরে আসবে। আর সর্বপ্রথম আল্লাহর নবী ইবরাহীমকে কাপড় পরিধান করানো হবে, যিনি হলেন রহমানের খলীল। মানুষদেরকে খালী পায়ে উলঙ্গ শরীরে খাতনাবিহীন হাজির করা হবে। আর হাশরের মাঠ হবে সাদা।
আমরা আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশের প্রতি ঈমান আনয়ন করি। আরো ঈমান আনয়ন করি যে, আমলনামা পেশ করা হবে, হিসাব গ্রহণ করা হবে ও বিনিময় প্রদান করা হবে এবং আল্লাহু দ্রুত হিসেবে গ্রহণকারী। বান্দাদের থেকে আল্লাহর হিসেব গ্রহণ করার বিভিন্ন স্তর ও ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা রয়েছে। তিনি কোনো বান্দা থেকে কঠিন হিসেব গ্রহণ করবেন, কোনো বান্দা থেকে সহজ হিসেব গ্রহণ করবেন এবং মুমিনদের অনেকে বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন।
সেদিন কারো প্রতি জুলম করা হবে না। কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের হিসেব গ্রহণ করা হবে এবং মানুষের মাঝে সর্বপ্রথম রক্তপাতের ফয়সালা করা হবে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, এই দিনে সাক্ষীগণকে পেশ করা হবে। ফলে মালায়েকাগণ সাক্ষ্য দিবেন, জমিনের ওপর বান্দাগণ যে আমল করেছে জমিন তার সাক্ষ্য দিবে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সাক্ষ্য দিবে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের আমল ওজন করার জন্য বাস্তবিকপক্ষেই মিজান (পাল্লা) স্থাপন করবেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাউজ হবে, তার উম্মাতগণ তাতে উপস্থিত হবেন। অতঃপর বান্দাদেরকে জান্নাত অথবা জাহান্নামের দিকে হাঁকিয়ে নেওয়া হবে-আল্লাহর নিকট পানাহ চাই- এবং জাহান্নামের ওপর পুল স্থাপন করা হবে। তাতে সা‘দান কাঁটার মত বরশি হবে এবং মানুষদেরকে তাদের আমল অনুযায়ী ছোবল মেরে নিয়ে নিবে। সর্বপ্রথম আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুলটি অতিক্রম করবেন।
অধ্যায়: শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনয়ন করার দলিলসমূহ।
আমরা শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনয়ন করি। এটি আল্লাহ তা‘আলার নিম্নের বাণীতে উল্লিখিত ঈমানের ছয়টি রোকনের একটি: “ভালো কাজ শুধু এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভালো কাজ হল যে ব্যক্তি ঈমান আনে আল্লাহ ও শেষ দিবসের উপরে। [আল-বাকারা: ১৭৭] তাঁর এ বাণীতেও রয়েছে: “কিন্তু তাদের মধ্যে যারা জ্ঞানে মজবুত তারা ও মুমিনগণ আপনার প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে এবং আপনার আগে যা নাযিল করা হয়েছে তাতে ঈমান আনে। আর সালাত প্রতিষ্ঠাকারী, যাকাত প্রদানকারী এবং আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান আনয়নকারী, তাদেরকে অচিরেই আমরা মহা পুরস্কার দেব।” [আন-নিসা: ১৬২]
শেষ দিবসের প্রতি ঈমান আনয়ন করার ব্যাপারে আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদিসেও দলিল রয়েছে, তিনি বলেন, একদিন রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম লোকদের সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলেন। এক ব্যক্তি তার নিকট এসে জিজ্ঞেস করল, ঈমান কী? তিনি বললেন, “আল্লাহ্তে ঈমান আনবে এবং তাঁর মালায়িকাহ, তাঁর নবী-রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনবে এবং আল্লাহর দর্শন ও পুনরুত্থানের ওপর ঈমান আনবে।’’ {বুখারী (৪৭৭৭), মুসলিম (৯), ইবনু মাজাহ (৬৪)}
এমনকি এর ওপর যুক্তিমূলক দলিলও প্রমাণ বহন করে। যেমন আল্লাহর নিম্নের বাণীতে রয়েছে: “আর সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়। সে বলে, 'কে অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে যখন তা পঁচে গলে যাবে?* বলুন, 'তাতে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।” [ইয়াসিন: ৭৮-৭৯] তেমনি তাঁর এ বাণীতেও রয়েছে: “হে মানুষ! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক তবে নিশ্চয়ই জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্র থেকে, তারপর রক্তপিন্ড থেকে, তারপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট অথবা অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট গোশত থেকে; তোমাদের নিকট বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করার নিমিত্তে। আর আমি যা ইচ্ছা করি তা একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত মাতৃগর্ভে অবস্থিত রাখি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, পরে যাতে তোমরা যৌবনে উপনীত হও। তোমাদের মধ্যে কারো কারো মৃত্যু দেয়া হয় এ বয়সেই, আবার কাউকে কাউকে ফিরিয়ে নেয়া হয় হীনতম বয়সে, যাতে সে জ্ঞান লাভের পরও কিছু না জানে। তুমি জমিনকে দেখতে পাও শুষ্কাবস্থায়, অতঃপর যখনই আমি তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদগত করে সকল প্রকার সুদৃশ্য উদ্ভিদ।” [আল-হাজ্জ : ৫] মহা সম্মানিত আল্লাহর এ বাণীতেও রয়েছে: “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিন, না আসমান সৃষ্টি? তিনিই তা নির্মাণ করেছেন।” [আন-নাযিআত: ২৭] আল্লাহ তা‘আলার আরেকটি বাণী, “আর তাঁর একটি নিদর্শন এই যে, আপনি ভূমিকে দেখতে পান শুষ্ক ও ঊষর, অতঃপর যখন আমি তাতে পানি বর্ষণ করি তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়। নিশ্চয় যিনি যমীনকে জীবিত করেন তিনি অবশ্যই মৃতদেরও জীবন দানকারী। নিশ্চয় তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।” [ফুসসিলাত: ৩৯] তাঁর আরেকটি বাণী, “আর তিনি-ই, যিনি সৃষ্টিকে শুরুতে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, তারপর তিনি সেটা পুনরাবৃত্তি করবেন; আর এটা তাঁর জন্য অতি সহজ।” [আর-রূম: ২৭] মহান আল্লাহর আরেকটি বাণী: “যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সুচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব; এটা আমার কৃত প্রতিশ্রুতি, আর আমি তা পালন করবই।” [আল-আম্বিয়া: ১০৪]
শেষ দিবস নামকরণ করার কারণ হলো, তা দুনিয়ার সর্বশেষ দিন। তারপর কোনো দিন নেই। এর আরো অনেক নাম রয়েছে: কয়েকটি নাম হলো: ইয়াওমুল কিয়ামাহ, ইয়াওমুল বা‘স (পুনরুত্থানের দিন), ইয়াওমুল হিসাব (চুড়ান্ত হিসাবের দিন), ইয়াওমুদ্দীন্ (বিচার দিবস), আত-তাম্মাহ (মহাসংকটের দিন), আল-হাক্কাহ (অবশ্যম্ভাবী ঘটনার দিন), আল-ওয়াকিয়াহ (সংঘটিতব্য দিন), আল-সাখখাহ (তীক্ষ্ণ আওয়াজের দিন), আল-গাশিয়াহ (আচ্ছন্নকারী দিন)। আল্লাহ তাঁর সম্মানিত কিতাবের একাধিক জায়গায় শেষ দিবসকে উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী, “যেদিন দাঁড়াবে সমস্ত মানুষ সৃষ্টিকুলের রবের সামনে !” [আল-মুতাফফিফীন: ৬] তাঁর আরেকটি বাণী, “সেদিন তারা কবর থেকে বের হবে দ্রুতবেগে, মনে হবে তারা কোন লক্ষ্যস্থলের দিকে ধাবিত হচ্ছে।” [আল-মা‘আরিজ: ৪৩] অন্যত্র আল্লাহ বলেন: “অতঃপর যখন মহাসংকট উপস্থিত হবে।” [আন-নাযিআত: ৩৪] এবং তাঁর বাণী: “অতঃপর যখন তীক্ষ্ন আওয়াজ আসবে,* সেদিন মানুষ পালিয়ে যাবে তার ভাইয়ের কাছ থেকে,* এবং তার মাতা, তার পিতা,* তার পত্নী ও তার সন্তান থেকে,* সেদিন তাদের প্রত্যেকের হবে এমন গুরুতর অবস্থা যা তাকে সম্পূর্ণরূপে ব্যস্ত রাখবে।” [আবাসা: ৩৩-৩৭] এবং আল্লাহর বাণী: “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় কেয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।* যেদিন তোমরা তা দেখতে পাবে সেদিন প্রত্যেক স্তন্যদাত্রী বিস্মৃত হবে তাদের দুগ্ধপোষ্য শিশুকে এবং প্রত্যেক গর্ভবতী তাদের গর্ভপাত করে ফেলবে; মানুষকে দেখবেন নেশাগ্রস্থের মত, যদিও তারা নেশগ্রস্থ নয়। বরং আল্লাহর শাস্তি কঠিন।” [আল-হাজ : ১-২] মহান আল্লাহর আরেকটি বাণী: “স্মরণ করুন, যেদিন তিনি তোমাদেরকে সমবেত করবেন সমাবেশের দিনে, সেদিন হবে লোকসানের দিন।” [আত-তাগাবুন: ৯]
অধ্যায়: কিয়ামতের আলামতসমূহের প্রতি ঈমান প্রসঙ্গে।
পরকালের প্রতি ঈমানের অংশ হলো: এর নিদর্শনের প্রতি ঈমান আনয়ন করা—অর্থাৎ কিয়ামতের আলামত—আর তা হলো: কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার নিদর্শনসমূহ। যেমন আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, “সুতরাং তারা কি শুধু এজন্য অপেক্ষা করছে যে, কিয়ামত তাদের কাছে এসে পড়ুক আকস্মিকভাবে? কিয়ামতের লক্ষণসমূহ তো এসেই পড়েছে !” [মুহাম্মাদ: ১৮] এটি একটি গায়েবী বিষয় যার প্রতি ঈমান আনয়ন করতে আমরা আদিষ্ট হয়েছি।
কিয়ামতের কিছু আলামত প্রকাশ পেয়েছে এবং শেষও হয়ে গেছে। তার সংখ্যাও অনেক, তন্মধ্যে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “আমার আগমন এবং কিয়ামতের মাঝে দূরত্ব এ আঙ্গুল থেকে এ আঙ্গুলের দূরত্বের মত, কিংবা এ দু’টির দূরত্বের মত: এই বলে তিনি শাহাদাত ও মধ্যমা আঙ্গুল দু’টি মিলিত করলেন।” {বুখারী (৫৩০১), মুসলিম (২৯৫০)} তার আরেকটি বাণী: “কিয়ামতের আগের ছয়টি নিদর্শন গণনা করে রাখো: আমার মৃত্যু, অতঃপর বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়, অতঃপর তোমাদের মধ্যে ঘটবে বকরীর পালের মহামারীর মত মহামারী, সম্পদের প্রাচুর্য, এমনকি এক ব্যক্তিকে একশ’ দীনার দেয়ার পরেও সে অসন্তুষ্ট থাকবে।...” {সহীহ বুখারী (৩১৭৬), ইবনু মাজাহ (৪০৪২)} রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরেকটি বাণী: “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ দু’টি বড় দল অভিন্ন দাবিতে পরস্পরে মহাযুদ্ধে লিপ্ত না হবে এবং যতক্ষণ ত্রিশের কাছাকাছি মিথ্যাচারী দাজ্জাল প্রকাশ না পাবে যারা প্রত্যেকেই নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল বলে দাবি করবে এবং যতক্ষণ ইলম উঠিয়ে নেয়া ও ভূমিকম্প অধিক হারে না হবে। আর যতক্ষণ যামানা (কাল) সংক্ষিপ্ত না হবে এবং (ব্যাপক হারে) ফিতনা, হত্যা ও ধন-সম্পদ বৃদ্ধি না পাবে। তখন সম্পদের এমন সয়লাব শুরু হবে যে, সম্পদের মালিক তার সদকা কে গ্রহণ করবে- এ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়বে। এমন কি যার নিকট সে সম্পদ আনা হবে সে বলবে আমার এ মালের কোনই প্রয়োজন নেই। আর যতক্ষণ মানুষ উঁচু উঁচু প্রাসাদ নির্মাণের জন্য পরস্পর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ না হবে...।” {সহীহ বুখারী (৭১২১), মুসলিম (১৫৭), তিরমিযী (২২১৮)}
কিয়ামতের কিছু আলামত সংঘটিত হয়েছে, তবে এখনো তা শেষ হয়নি, বরং চলমান রয়েছে। তন্মধ্যে হলো, উম্মাতের মাঝে ফিতনা। (সহীহ দু’টি গ্রন্থে ফিতনাহ প্রসঙ্গে অনেক হাদীস রয়েছে, তবে তা স্পষ্টভাবে নয় যে, ফিতনা হলো কিয়ামতের আলামত। এই জন্য সুনান গ্রন্থ থেকে সামনের দু’টি হাদীস উল্লেখ করছি। কারণ, সেখানে তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।) তার সংখ্যাও অনেক, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “নিশ্চয় কিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে অন্ধকার রাতের টুকরার ন্যায় বিপদ আসতে থাকবে। তখন সকালবেলা যে ঈমানদার ছিলো, সন্ধ্যাকালে সে কাফির হয়ে যাবে। আর সন্ধ্যাবেলা যে ঈমানদার ছিলো, সে সকালবেলা কাফির হয়ে যাবে। তখন দাঁড়ানো ব্যক্তির চাইতে বসা ব্যক্তি এবং হেঁটে চলার লোক দৌঁড়ে চলা লোকের চাইতে উত্তম হবে। তখন তোমরা তোমাদের ধনুকগুলো ভেঙ্গে চুরমার করে ফেলো, ধনুকের ছিলাগুলো কেটে ফেলো এবং তরবারিগুলো পাথরে আঘাত করে চূর্ণ-বিচূর্ণ করো। তবুও যদি তোমাদের কারো কারো নিকট কেউ এসে পড়ে, তবে যেন সে আদম (আঃ)-এর দু’পুত্রের মধ্যে উত্তমটির (হাবীলের) মতো হয়।” {আবূ দাউদ (৪২৫৯), তিরমিযী (২২০৪), ইবনু মাজাহ (৩৯৬১), মুসান্নাফ ইবনু আবি শায়বাহ (৩০৯৭৮), আহমাদ (১৯৬৬২), মুসনাদ রু‘য়ানী (৫৮৫)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “কিয়ামতের নিকটতম সময়ে অন্ধকার রাতের টুকরার মতো বিপর্যয়ের আত্মপ্রকাশ ঘটবে। তখন মানুষ সকাল বেলায় মু’মিন থাকবে কিন্তু সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যাবে। আর যে সন্ধ্যা বেলায় মু’মিন থাকবে সকালে সে কাফির হয়ে যাবে। একদল লোক দুনিয়াবী স্বার্থের বিনিময়ে তাদের ধর্ম বিক্রয় করবে।” {তিরমিযী (২১৯৭), ইবনু আবি শায়বাহ, আল-মুসান্নাফ (৩১০৫৩), এবং আল-ঈমান (৬৪), ফিরয়াবী, সিফাতুন নিফাক ও যাম্মুল মুনাফিকীন (৯৭)}
তিনি আরো বলেছেন: “কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ ত্রিশের কাছাকাছি মিথ্যাচারী দাজ্জাল-এর প্রকাশ না ঘটবে। তারা প্রত্যেকেই নিজেকে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল বলে দাবি করবে।” {বুখারী (৭১২১), মুসলিম (১৫৭), তিরমিযী (২২১৮)}
আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহ বলেন: একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মজলিসে জনসম্মুখে কিছু আলোচনা করছিলেন। ইতোমধ্যে তাঁর নিকট জনৈক বেদুঈন এসে জিজ্ঞেস করল, ’কিয়ামত কখন সংঘটিত হবে?’ আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার আলোচনায় রত থাকলেন। এতে কেউ কেউ বললেন, লোকটি যা বলেছে তিনি তা শুনেছেন কিন্তু তার কথা পছন্দ করেননি। আর কেউ কেউ বললেন বরং তিনি শুনতেই পাননি। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আলোচনা শেষে বললেন: ’কিয়ামত সম্পর্কে প্রশ্নকারী লোকটি কোথায়?’ সে বলল, ’এই যে আমি, হে আল্লাহর রাসূল!’ তিনি বললেন: যখন আমানত বিনষ্ট করা হয় তখন কিয়ামতের প্রতীক্ষা কর। সে বলল, কিভাবে আমানত নষ্ট করা হয়? তিনি বললেন: যখন কোন অনুপযুক্ত ব্যক্তির উপর কোন কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়, তখন তুমি কিয়ামতের অপেক্ষা করবে।” বুখারী (৫৯)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “কিয়ামতের কিছু আলামত হল: ’ইলম হ্রাস পাবে, অজ্ঞতা প্রসারতা লাভ করবে, মদপানের মাত্রা বৃদ্ধি পাবে এবং যেনা ব্যভিচার বিস্তার লাভ করবে।” {বুখারী (৮০), মুসলিম (২৬৭১), তিরমিযী (২২০৫), ইবনু মাজাহ (৪০৪৫)}
তিনি আরো বলেছেন: “অবশ্যই কিয়ামতের আগে এমন কিছু দিন আসবে যখন সর্বত্র মূর্খতা ছড়িয়ে পড়বে এবং ইলম উঠিয়ে নেয়া হবে। সে সময় হত্যাযজ্ঞ বৃদ্ধি পাবে।” {বুখারী (৭০৬২), মুসলিম (২৬৭২), তিরমিযী (২২০০), ইবনু মাজাহ (৩৯৫৯, ৪০৫০)}
কিয়ামতের কিছু আলামত রয়েছে যা এখনো সংঘটিত হয়নি, তবে কিয়ামতের আগে তা সংঘটিত হবে। তন্মধ্যে যেমন: ঈসা ইবন মারয়াম মাসীহ আলাইহিস সালামের অবতরণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “কিতাবীদের মধ্য থেকে প্রত্যেকেই তার (ঈসা আঃ) মৃত্যুর পূর্বে তার উপর ঈমান আনবে। আর কেয়ামতের দিন তিনি তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী হবেন।” [আন-নিসা: ১৫৯] ইয়াজুজ ও মাজুজের বের হওয়া। যেমন আল্লাহ বলেন, “অবশেষে যখন ইয়াজুজ ও মাজুজকে মুক্তি দেয়া হবে এবং তারা প্রতিটি উচ্চভূমি হতে দ্রুত ছুটে আসবে।” [আল-আম্বিয়া: ৯৬] দাব্বাহ (চুতষ্পদ জন্তু) বের হওয়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর যখন তাদের উপর ঘোষিত শাস্তি আসবে তখন আমি তাদের জন্য যমীন থেকে এক জীব বের করব, যা তাদের সাথে কথা বলবে যে, মানুষ আমার নিদর্শনসমূহে নিশ্চিত বিশ্বাস করত না।” [আন-নামাল: ৮২]
হুযাইফা ইবনু আসীদ আল গিফারী থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, তিনি বলেন, একদিন আমরা আলোচনা করছিলাম, এমন সময় রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের কাছে আসলেন এবং প্রশ্ন করলেন, তোমরা কী বিষয়ে আলোচনা করছ? উত্তরে তারা বললেন, আমরা কিয়ামতের ব্যাপারে আলোচনা করছি। এ কথা শুনে তিনি বললেন: “ততক্ষণ পর্যন্ত কিয়ামত সংঘটিত হবে না যতক্ষণ না তোমরা দশটি বিশেষ আলামত দেখবে। তারপর তিনি ধোঁয়া, দাজ্জাল, জন্তু, পশ্চিমাকাশ হতে সূর্যোদয় হওয়া, মারইয়াম পুত্র ঈসা (আঃ) এর অবতরণ, ইয়াজুজ-মাজুজ এবং তিনবার ভূখণ্ড ধ্বসে যাওয়া তথা পূর্ব দিকে ভূখণ্ড ধ্বস, পশ্চিম দিকে ভূখণ্ড ধ্বস এবং আরব উপদ্বীপে ভূখণ্ড ধ্বসের কথা বর্ণনা করলেন। এ আলামতসমূহের পর এক অগ্ন্যুৎপাতের প্রকাশ হবে, যা তাদেরকে ইয়ামান থেকে হাশরের মাঠ পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যাবে।” {মুসলিম (২৯০১), আবু দাউদ (৪৩১১), তিরমিযী (২১৮৩), ইবনু মাজাহ (৪০৪১)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত কিয়ামত অনুষ্ঠিত হবে না। লোকেরা যখন তা দেখবে, তখন পৃথিবীর সকলেই ঈমান আনবে। কিন্তু সেদিন “কারো ঈমান কোনো কাজে আসবে না, যে পূর্বে ঈমান আনেনি অথবা যে ব্যক্তি ঈমানের মাধ্যমে কল্যাণ লাভ করেনি।” [আল-আনআম: ১৫৮]” {বুখারী (৪৬৩৫), মুসলিম (১৫৭), আবূ দাউদ (৪৩১২), ইবনু মাজাহ (৪০৬৮)}
তিনি আরো বলেছেন: “শপথ সেই সত্তার, যার হাতে আমার প্রাণ! অচিরেই তোমাদের মাঝে ন্যায় বিচারকরূপে মারইয়ামের পুত্র অবতরণ করবেন। তারপর তিনি ক্রুশ ভেঙ্গে ফেলবেন, শূকর হত্যা করবেন, জিযিয়া রহিত করবেন এবং ধন-সম্পদের এরূপ প্রাচুর্য হবে যে, কেউ তা গ্রহণ করবে না।” {বুখারী (২২২২), মুসলিম (১৫৫), আবূ দাউদ (৪৩২৪), তিরমিযী (২২৩৩), ইবনু মাজাহ (৪০৭৮)}
তিনি আরো বলেছেন: “আল্লাহ্ এমন কোন নবী পাঠাননি যিনি তার জাতিকে কানা মিথ্যুকটির ব্যাপারে সতর্ক করেননি। সে কানা (দাজ্জাল), আর তোমাদের রব কানা নন। তার দু’চোখের মাঝখানে ’কাফির’ লেখা থাকবে।” {বুখারী (৭৪০৮), মুসলিম (২৯৩৩), আবূ দাউদ (৪৩১৬), তিরমিযী (২২৪৫)}
অধ্যায়: মৃত্যুর পর যা ঘটতে তার প্রতি ঈমান প্রসঙ্গে
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, পরকালের প্রতি ঈমানের অংশ হলো: আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার চেহারা ছাড়া সব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার প্রতি ঈমান আনয়ন করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “প্রতিটি বস্তুই ধ্বংস হবে, তবে তাঁর চেহারা ছাড়া।” [আল-কাসাস : ৮৮] তিনি আরো বলেন, “ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে সবকিছুই নশ্বর।* আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।” [আল-রহমান: ২৬, ২৭] আর মালাকুল মউত রূহসমূহ কবজ করবেন। মহান আল্লহ বলেন, “বলুন, তোমাদেরকে মৃত্যু দেবে মৃত্যুর ফেরেশতা যাকে তোমাদের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। তারপর তোমাদের রবের নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।” [আস-সাজদাহ : ১১]
আমরা মৃত্যুর পর যা কিছু ঘটবে, যেমন মৃত ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা, কবরের আযাব ও নিয়ামত ইত্যাদির প্রতি ঈমান আনয়ন করি। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণীতে রয়েছে: “আগুন, তাদেরকে সকাল-সন্ধ্যায় তার সামনে উপস্থিত করা হয়, আর যেদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে (সেদিন ঘোষণা করা হবে), ‘ফির‘আউনের অনুসারীদেরকে কঠোরতম আযাবে প্রবেশ করাও।” [গাফির: ৪৬] আল্লাহ তা‘আলার আরেকটি বাণী: “অচিরেই আমি তাদেরকে দু’বার শাস্তি দেব, তারপর তাদেরকে মহাশাস্তির দিকে প্রত্যাবর্তন করানো হবে।” [আত-তাওবাহ: ১০১] তাঁর আরেকটি বাণী: “আর আপনি যদি দেখতে পেতেন যখন ফিরিশতাগণ যারা কুফরী করেছে তাদের প্রাণ হরণ করেছিল, তাদের মুখমন্ডলে ও পিঠে আঘাত করছিল। আর বলছিল ‘তোমরা দহনযন্ত্রণা ভোগ কর।* এ হচ্ছে তোমাদের কৃতকর্মের ফল এবং এটা এ কারণে যে, আল্লাহ বান্দাদের প্রতি মোটেই যালেম নন।” [আল-আনফাল: ৫০-৫১] তাঁর আরেকটি বাণী: “যদি আপনি দেখতে পেতেন, যখন যালিমরা মৃত্যু যন্ত্রনায় থাকবে এবং ফিরিশতাগণ হাত বাড়িয়ে বলবে, ‘তোমাদের প্রাণ বের কর। আজ তোমাদেরকে অবমাননাকর শাস্তি দেয়া হবে, কারণ তোমারা আল্লাহর উপর অসত্য বলতে এবং তাঁর আয়াতসমূহ সম্পর্কে অহংকার করতে।” [আল-আনআম: ৯৩] আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “আর নিশ্চয় যারা যুলুম করেছে তাদের জন্য রয়েছে এছাড়া আরো শাস্তি।“ [আত-তূর: ৪৭]
বারা ইবনু আযিব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর বাণী: {يُثَبِّتُ اللهُ الَّذِينَ آمَنُوا بِالْقَوْلِ الثَّابِتِ} "যারা শাশ্বত বাণীতে ঈমান রাখে তাদেরকে আল্লাহ সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন" সম্পর্কে বলেন, এ আয়াত কবরের আযাব সম্পর্কে অবতীর্ণ হয়েছে। কবরে তাকে প্রশ্ন করা হয়, তোমার রব কে? সে বলে, আমার রব আল্লাহ এবং আমার নবী মুহাম্মাদ। এটাই আল্লাহর নিম্নবর্ণিত বাণীর মর্ম, "যারা শাশ্বত বাণীতে ঈমান রাখে তাদেরকে আল্লাহ দুনিয়া ও পরকালে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন"। [ইবরাহীম: ২৭]” {সহীহ বুখারী (১৩৬৯), মুসলিম (২৮৭১), সহীহ মুসলিম থেকে হাদিসের শব্দ গৃহীত, তিরমিযী (৩১২০), নাসাঈ (২০৫৬,২০৫৭), ইবনু মাজাহ (৪২৬৯, ৪৭৫০)}
আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে যেভাবে কুরআন মাজীদের সূরা শিখাতেন ঠিক তেমনিভাবে এ দু’আটিও শিখাতেন: “اللهُمَّ إِنَّا نَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَسِيحِ الدَّجَّالِ، وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ” /অর্থ- হে আল্লাহ আমরা তোমার কাছে জাহান্নামের আযাব থেকে আশ্রয় চাই। আমি তোমার কাছে মাসীহ দাজ্জালের ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই। আর আমি তোমার কাছে জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে আশ্রয় চাই।) {সহীহ মুসলিম (৫৯০), আবূ দাউদ (১৫৪২), তিরমিযী (৩৪৯৪), নাসাঈ (২০৬৩), ইবনু মাজাহ (৩৮৪০)}
ইবনু ’আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনার কোন বাগানের বাইরে গেলেন। তখন তিনি এমন দু’জন লোকের শব্দ শুনলেন, যাদের কবরে আযাব হচ্ছিল। তিনি বললেন: তাদের দু’জনকে আযাব দেয়া হচ্ছে, তবে বড় কোন কারণে শাস্তি দেয়া হচ্ছে না। অথচ তা কবীরা গুনাহ। এদের একজন প্রস্রাবের সময় সতর্ক থাকত না। আর অন্য ব্যক্তি চোগলখোলী করে বেড়াতো। তারপর তিনি একটা কাঁচা ডাল আনিয়ে তা ভেঙ্গে দু’ টুকরো করে, এক কবরে এক টুকরো আর অন্য কবরে এক টুকরো গেড়ে দিলেন এবং বললেন: দু’টি যতক্ষণ পর্যন্ত না শুকাবে ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের আযাব হালকা করে দেয়া হবে।” {বুখারী (৬০৫৫), মুসলিম (২৯২), আবূ দাউদ (২০), তিরমিযী (৭০), নাসাঈ (৩১), ইবনু মাজাহ (৩৪৭)}
আবূ সায়ীদ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যায়দ ইবনু সাবিত রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বলেন, একদিন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নাজ্জার গোত্রের একটি প্রাচীর ঘেরা বাগানে তার একটি খচ্চরের উপর আরোহী ছিলেন। আমরাও তার সাথে ছিলাম। অকস্মাৎ তা লাফিয়ে উঠল এবং তাকে ফেলে দেয়ার উপক্রম করল। দেখা গেল, সেখানে ছয়টি কিংবা পাঁচটি অথবা চারটি কবর রয়েছে। -বর্ণনাকারী বলেন, জুরাইরী এমনটিই বর্ণনা করতেন।- অতঃপর তিনি প্রশ্ন করলেন, এ কবরবাসীদেরকে কে চিনে? তখন এক ব্যক্তি বললেন, আমি চিনি। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, তারা কখন মৃত্যুবরণ করেছে? তিনি বললেন, তারা শিরকের অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। অতঃপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, এ উম্মাতকে তাদের কবরের মধ্যে পরীক্ষা করা হবে। তোমরা মৃত ব্যক্তিকে দাফন করা বর্জন করবে, এ আশঙ্কা না হলে আমি আল্লাহর নিকট দু’আ করতাম যেন তিনি তোমাদেরকেও কবরের আযাব শুনান যা আমি শুনতে পাচ্ছি। তারপর তিনি আমাদের প্রতি মনোনিবেশ করে বললেন, তোমরা সবাই জাহান্নামের আযাব হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করো। সাহাবাগণ বললেন, জাহান্নামের শাস্তি হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। তারপর তিনি বললেন, তোমরা সকলে কবরের শাস্তি হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করো। সাহাবাগণ বললেন, কবরের আযাব হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা প্রকাশ্য ও গোপন সকল প্রকার ফিতনাহ হতে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করো। তারা বললেন, প্রকাশ্য ও গোপন সকল প্রকার ফিতনাহ্ হতে আমরা আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাই। তিনি আবারো বললেন, তোমরা দাজ্জালের ফিতনাহ হতে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাও। সাহাবাগণ বললেন, দাজ্জালের ফিতনাহ হতে আমরা আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই।” সহীহ মুসলিম: (২৮৬৭)
আবূ আইয়ুব রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার সূর্য ডুবে যাওয়ার পর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বের হলেন। তখন তিনি একটি আওয়াজ শুনতে পেয়ে বলেন: ইয়াহূদীদের কবরে আযাব দেয়া হচ্ছে।” {সহীহ বুখারী: (১৩৭৫), মুসলিম: (২৮৬৯), নাসাঈ: (২০৫৯)}
’আয়িশাহ রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমার কাছে মদিনার দু’জন ইয়াহূদী বৃদ্ধা মহিলা আসলেন। তারা আমাকে বললেন যে, কবরবাসীদেরকে তাদের কবরে আযাব দেয়া হয়ে থাকে। তখন আমি তাদের এ কথা মিথ্যা বলে জানালাম। আমার বিবেক তাদের কথাটিকে সত্য বলে সায় দিল না। তারা দু’জন বেরিয়ে গেলেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার নিকট এলেন। আমি তাকে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট দু’জন বৃদ্ধা এসেছিলেন। অতঃপর আমি তাকে তাদের কথা জানালাম। তখন তিনি বললেনঃ তারা দু’জন ঠিকই বলেছে। নিশ্চয়ই কবরবাসীদেরকে এমন আযাব দেয়া হয়, যা সকল চতুষ্পদ জীবজন্তু শুনে থাকে। এরপর থেকে আমি তাকে সব সময় প্রতি সালাতে কবরের আযাব হতে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতে দেখেছি।” {সহীহ বুখারী: (৬৩৬৬), মুসলিম: (৫৮৬), নাসাঈ: (২০৬৭)}
যেমনিভাবে কাফির, মুনাফিক এবং কতক মুসলিম পাপীকে তাদের কবরে শাস্তি প্রদান করা হয়, তেমনিভাবে মুমিনগণ কবরে নিয়ামতপ্রাপ্ত হন। আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “বান্দাকে যখন তার কবরে রাখা হয় এবং তার সাথীরা এতটুকু মাত্র দূরে যায় যে, সে তখনও তাদের জুতার আওয়াজ শুনতে পায়। এ সময় দু’জন ফেরেশতা তার নিকট এসে তাকে বসান এবং তাঁরা বলেন, এ ব্যক্তি অর্থাৎ মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে তুমি কী বলতে? তখন মু’মিন ব্যক্তি বলবে, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রাসূল। তখন তাকে বলা হবে, জাহান্নামে তোমার অবস্থান স্থলটির দিকে নযর কর, আল্লাহ্ তোমাকে তার বদলে জান্নাতের একটি অবস্থান স্থল দান করেছেন। তখন সে দু’টি স্থলের দিকেই তাকাবে। তিনি [আনাস] বলেন, আর মুনাফিক বা কাফির ব্যক্তিকেও প্রশ্ন করা হবে তুমি এ ব্যক্তি (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সম্পর্কে কী বলতে? সে উত্তরে বলবে, আমি জানি না। লোকেরা যা বলত আমি তা-ই বললাম। তখন তাকে বলা হবে, তুমি না নিজে জেনেছ, না তিলাওয়াত করে শিখেছ। আর তাকে লোহার মুগুর দ্বারা এমনভাবে আঘাত করা হবে, যার ফলে সে এমন বিকট চিৎকার করে উঠবে যে, দু’ জাতি (মানুষ ও জ্বিন) ছাড়া তার আশপাশের সকলেই তা শুনতে পাবে।” {সহীহ বুখারী (১৩৭৪), মুসলিম (৭৩১৮)}
অধ্যায়: পুনরুত্থান এবং এর পরবর্তী বিষয়ে ঈমান প্রসঙ্গে
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ যখন এই দুনিয়া নিঃশেষ ও ধ্বংসের ঘোষণা দিবেন, তখন আল্লাহ ফেরেশতাকে নির্দেশ করবেন আর তিনি শিংগায় ফুঁ দিবেন। ফলে আসমানসমূহে যারা আছে ও যমীনে যারা আছে তারা সবাই বেহুশ হয়ে পড়বে, যাদেরকে আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে আসমানসমূহে যারা আছে ও যমীনে যারা আছে তারা সবাই বেহুঁশ হয়ে পড়বে, যাদেরকে আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া। তারপর আবার শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে তৎক্ষণাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।” [আয-যুমার: ৬৮] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “...তারপর শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। যে এ আওয়াজ শুনবে সেই তার ঘাড় একদিকে অবনমিত করবে এবং অন্যদিকে উত্তোলন করবে। তিনি বলেন, এ আওয়াজ সর্বপ্রথম ঐ লোকই শুনতে পাবে, যে তার উটের জন্য হাওয সংস্কারের কাজে নিযুক্ত থাকবে। তিনি বলেন, আওয়াজ শুনামাত্রই সে অজ্ঞান হয়ে লুটে পড়বে। সাথে সাথে অন্যান্য লোকেরাও অজ্ঞান হয়ে যাবে...।” মুসলিম: (২৯৪০) (আর “অন্যদিকে উত্তোলন করবে।” অর্থাৎ তার দিকে তার গর্দান ঘোরাবে। আন-নিহায়াহ ফি গারীবিল হাদীস (৩/৩৩)।)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “...অবশ্যই কিয়ামত সংঘটিত হবে এ অবস্থায় যে, তখন দু’ব্যক্তি (বেচা কেনার) জন্য পরস্পরের সামনে কাপড় ছড়িয়ে রাখবে। কিন্তু তারা বেচাকেনার সময় পাবে না। এমন কি তা ভাঁজ করারও সময় পাবে না। আর কিয়ামত এমন অবস্থায় অবশ্যই সংঘটিত হবে যে, কোন ব্যক্তি তার উষ্ট্রীর দুধ দোহন করে রওয়ানা হবে কিন্তু তা পান করার সুযোগ পাবে না। আর কিয়ামত এমন অবস্থায় সংঘটিত হবে যে, কোন ব্যক্তি (তার পশুকে পানি পান করানোর জন্য) চৌবাচ্চা তৈরি করবে কিন্তু সে এ থেকে পানি পান করানোর সময়ও পাবে না। আর কিয়ামত এমন অবস্থায় কায়েম হবে যে, কোন ব্যক্তি তার মুখ পর্যন্ত লোকমা উঠাবে, কিন্তু সে তা খাওয়ার সময় ও সুযোগ পাবে না।”
তারপর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মাখলূকের ভেতর যাদের ওপর ধ্বংস ও নিঃশেষ হওয়া লিপিবদ্ধ করেছেন তারা সবাই ধ্বংস হবে। অবশেষে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ছাড়া কেউ জীবিত থাকবে না। আল্লাহ বলেন, “ভূপৃষ্ঠে যা কিছু আছে সবকিছুই নশ্বর।* আর অবিনশ্বর শুধু আপনার রবের চেহারা, যিনি মহিমাময়, মহানুভব।” [সূরা আল-রহমান: ২৬,২৭] তিনি আরো বলেন, “আর আপনি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ্কে ডাকবেন না, তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ্ নেই। আল্লাহর সত্তা ছাড়া সমস্ত কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই এবং তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” [সূরা আল-কাসাস: ৮৮] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “যেদিন তারা প্রকাশিত হবে সেদিন আল্লাহর কাছে তাদের কিছুই গোপন থাকবে না। আজ কর্তৃত্ব কার? আল্লাহরই, যিনি এক, প্ৰবল প্ৰতাপশালী।” [সূরা গাফির: ১৬]
তারপর আল্লাহ বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, ফলে তা দ্বারা মানুষের শরীর গজাতে শুরু করবে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অতঃপর মহান আল্লাহ শিশিরের ন্যায় গুঁড়ি গুঁড়ি অথবা ছায়ার ন্যায় বৃষ্টি বর্ষণ করবেন -হাদীস বর্ণনাকারী নুমান সন্দেহ প্রকাশ করেছেন-, এতে মানুষের শরীর পরিবর্ধিত হবে। আবার শিঙ্গায় ফুৎকার দেয়া হবে। আকস্মাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে...।” মুসলিম: (২৯৪০)
তারপর আল্লাহ ফেরেশতাকে নির্দেশ দিবেন, ফলে তিনি শিংগায় দ্বিতীয়বার ফুঁ দিবেন। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “তারপর আবার শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে [৩], ফলে তৎক্ষণাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।” [সূরা আয-যুমার: ৬৮]
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুই বার ফুঁ দেওয়ার মধ্যবর্তী পরিমাণটি বলেছেন। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “দু’বার ফুঁর মাঝে ব্যবধান চল্লিশ। তিনি বললেন, শিরদাঁড়ার হাড় বাদে মানুষের সবকিছুই ধ্বংস হয়ে যাবে। এ দ্বারাই মানুষকে আবার সৃষ্টি করা হবে।” {বুখারী (৪৮১৪), মুসলিম (২৯৫৫)}
আমরা সেসবের প্রতিও ঈমান আনয়ন করি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিনে আসমান ও জমিনের যেসব অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন। যেমন ইবনু মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন, “ইয়াহূদীদের এক আলিম রাসূল সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বলল, হে মুহাম্মাদ! আমরা (তাওরাতে দেখতে) পাই যে, আল্লাহ্ তা’আলা আকাশসমূহকে এক আঙ্গুলের উপর যমীনকে এক আঙ্গুলের উপর, বৃক্ষসমূহকে এক আঙ্গুলের উপর, পানি ও কাঁদামাটি এক আঙ্গুলের উপর এবং অন্যান্য সৃষ্টিজগত এক আঙ্গুলের উপর স্থাপন করবেন। তারপর বলবেন, আমিই বাদশাহ। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সমর্থনে হেসে ফেললেন; এমনকি তার সামনের দাঁত প্রকাশ পেল। এরপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লাম পাঠ করলেন: “আর তারা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করেনি অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে এবং আসমানসমূহ থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের উর্ধ্বে।” [আয-যুমার: ৬৭] {সহীহ বুখারী (৪৮১১), মুসলিম (২৭৮৬), তিরমিযী (৩২৩৮)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, মানুষদেরকে তাদের কবর থেকে উত্তোলন করা হবে এবং যখন দ্বিতীয়বার শিংগায় ফুঁ দেওয়া হবে তখন আল্লাহ মৃতদেরকে জীবিত করবেন। আর মানুষেরা দু’জাহানের রব আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “এরপর তোমরা নিশ্চয় মরবে,* তারপর কেয়ামতের দিন নিশ্চয় তোমাদেরকে উত্থিত করা হবে।” [আল-মুমিনূন: ১৫,১৬] তিনি আরো বলেন, “আর যখন শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে তখনই তারা কবর থেকে ছুটে আসবে তাদের রবের দিকে।* তারা বলবে, 'হায়! দুর্ভোগ আমাদের! কে আমাদেরকে আমাদের নিদ্রাস্থল থেকে উঠাল? দয়াময় আল্লাহ্ তো এরই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্যই বলেছিলেন।* এটা হবে শুধু এক বিকট শব্দ; তখনই এদের সকলকে উপস্থিত করা হবে আমার সামনে।” [ইয়াসীন: ৫১-৫৩]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “আর আমিই জীবন দান করি ও মৃত্যু ঘটাই এবং আমিই চুড়ান্ত মালিকানার অধিকারী।* আর অবশ্যই আমি তোমাদের মধ্য থেকে যারা অগ্রগামী হয়েছে তাদেরকে জানি এবং অবশ্যই জানি তাদেরকে যারা পশ্চাতে গমনকারী।* আর নিশ্চয় আপনার রব তাদেরকে সমবেত করবেন; নিশ্চয় তিনি প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ।” [আল-হিজর: ২৩-২৫]
তিনি আরো বলেন, “আর তারা বলে, ‘আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও কি নুতন সৃষ্টিরুপে উত্থিত হবে?* বলুন, ‘তোমরা হয়ে যাও পাথর বা লোহা* অথবা এমন কোন সৃষ্টি যা তোমাদের অন্তরে খুবই বড় মনে হয়; তবুও তারা বলবে, ‘কে আমাদেরকে পুনরুত্থিত করবে? বলুন, ‘তিনিই, যিনি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন।’ অতঃপর তারা আপনার সামনে মাথা নাড়বে ও বলবে , ‘সেটা কবে?’ বলুন, সম্ভবত সেটা হবে শীঘ্রই,* যেদিন তিনি তোমাদেরকে ডাকবেন, এবং তোমরা তাঁর প্রশংসার সাথে তাঁর ডাকে সাড়া দেবে এবং তোমরা মনে করবে, তোমরা অল্পকালই অবস্থান করেছিলে।” [আল-ইসরা: ৪৯-৫২] তিনি আরো বলেন, “আর আল্লাহ্ যাদেরকে পথ নির্দেশ করেন তারা তো পথপ্রাপ্ত এবং যাদেরকে তিনি পথভ্রষ্ট করেন আপনি কখনো তাদের জন্য তাকে ছাড়া অন্য কাউকে অভিভাবক পাবেন না। আর কিয়ামতের দিন আমি তাদেরকে সমবেত করব তাদের মুখে ভর দিয়ে চলা অবস্থায় অন্ধ, বোবা ও বধির করে। তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম; যখনই তা স্তমিত হবে তখনই আমি তাদের জন্য আগুনের শিখা বৃদ্ধি করে দেব।* এটাই তাদের প্রতিদান, কারণ তারা আমার নিদর্শন অস্বীকার করেছিল ও বলেছিল, ‘অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হলেও আমরা কি নতুন সৃষ্টিরূপে পুনরুত্থিত হব?* তারা কি লক্ষ্য করে না যে, নিশ্চয় আল্লাহ্, যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন তিনি তাদের অনুরূপ সৃষ্টি করতে ক্ষমতাবান? আর তিনি তাদের জন্য স্থির করেছেন এক নির্দিষ্ট কাল, যাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু যালিমরা কুফরি করা ছাড়া ক্ষান্ত হয়নি।” [আল-ইসরা: ৯৭-৯৯] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “যখন আখিরাতের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবে তখন তোমাদের সবাইকে আমি একত্র করে উপস্থির করব।” [আল-ইসরা: ১০৪] পুনরুত্থান ও হাশরে উপস্থিতির ওপর আরো অনেক আয়াত রয়েছে।
সর্বপ্রথম আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর থেকে বের হবেন। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমি কিয়ামতের দিন আদম সন্তানদের সরদার হব এবং আমিই প্রথম ব্যক্তি যার কবর খুলে যাবে এবং আমিই প্রথম সুপারিশকারী ও প্রথম সুপারিশ গৃহীত ব্যক্তি।” {মুসলিম: (২২৭৮); আবূ দাউদ: (৪৬৭৩)}
সর্বপ্রথম আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুঁশ ফিরে পাবেন। তিনি বলেন, “... তোমরা আমাকে মূসা-এর উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিও না। কারণ কিয়ামতের দিন সমস্ত মানুষ বেহুঁশ হয়ে পড়বে, তাদের সাথে আমিও বেহুঁশ হয়ে পড়ব। তারপর সকলের আগে আমার হুঁশ আসবে, তখন (দেখতে পাব) মূসা আরশের একপাশ ধরে রয়েছেন। আমি জানি না, তিনি বেহুঁশ হয়ে আমার আগে হুঁশে এসেছেন নাকি আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে বেহুঁশ হওয়া হতে রেহাই দিয়েছেন, তিনি তাদের মধ্যে ছিলেন।” {বুখারী (২৪৪১), মুসলিম (২৩৭৩)}
সর্বপ্রথম আল্লাহর নবী ইবরাহীম খলীলকে পোশাক পরিধান করানো হবে। তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম ইবরাহীমকে কাপড় পরিধান করানো হবে।” {বুখারী (৩৩৪৯), মুসলিম (২৮৬০), তিরমিযী (২৪২৩), নাসাঈ (২০৮২)}
আর মানুষদেরকে খালি পা, উলঙ্গ ও খাতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত করা হবে।যেমন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কিয়ামতের দিন নগ্নপদ, উলঙ্গ এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় সমস্ত মানুষকে একত্র করা হবে।” {বুখারী (৬৫২৭), মুসলিম (২৮৫৯), নাসাঈ (২০৮৩), ইবনু মাজাহ (৪২৭৬)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, বান্দাদেরকে যে জমিনের ওপর উপস্থিত করা হবে তা এই জমিনের চেয়ে ভিন্ন হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “যেদিন এ যমীন পরিবর্তিত হয়ে অন্য যমীন হবে এবং আসমানসমূহও; আর মানুষ উন্মুক্তভাবে উপস্থিত হবে এক, একচ্ছত্র অধিপতি আল্লাহর সামনে।” [ইবরাহীম: ৪৮]
হাশরের ময়দান হবে সাদা। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কিয়ামতের দিন মানুষকে সাদা ধবধবে রুটির ন্যায় যমীনের ওপর একত্রিত করা হবে।” {বুখারী (৬৫২১), মুসলিম (২৭৯০)}
আবূ সা’ঈদ হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন যমীন একটি রুটির ন্যায় হয়ে যাবে। আর আল্লাহ্ তাকে হাতের মধ্যে নিয়ে এমনভাবে উল্টা পাল্টা করবেন যেমন তোমাদের কেউ দস্তরখানে হাতে নিয়ে রুটি নাড়াচাড়া করে।.. ” {বুখারী (৬৫২০), মুসলিম (২৭৯২)}
জমিন পরিবর্তনের সময় মানুষেরা কোথায় থাকবে তার বর্ণনায় অনেক সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে: যেমন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুক্তিপ্রাপ্ত গোলাম সাওবান (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, একজন ইয়াহুদী কিছু জিজ্ঞেস করার জন্য রাসূলের কাছে আসলেন, তাতে রয়েছে: “...ইয়াহুদী বলল, যেদিন এ জমিন ও আকাশমণ্ডলী পাল্টে গিয়ে অন্য জমিন ও আকাশমণ্ডলীতে পরিণত হবে (অর্থাৎ কিয়ামত হবে) সেদিন লোকজন কোথায় থাকবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তারা সেদিন পুলসিরাতের কাছে অন্ধকারে থাকবে।” মুসলিম: (৩১৫)
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহর বাণী: {يَوْمَ تُبَدَّلُ الأَرْضُ غَيْرَ الأَرْضِ وَالسَّمَاوَاتُ} "যেদিন এ পৃথিবী পরিবর্তিত হয়ে অন্য পৃথিবী হয়ে যাবে এবং আকাশমণ্ডলীও"- (ইবরাহীম: ৪৮) সম্পর্কে প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রসূল! তবে সেদিন লোকেরা কোথায় থাকবে? তিনি বললেন, সেতুর উপরে অবস্থান করবে।” মুসলিম: (২৭৯১)
আমরা জানি যে, এই দিনটি অনেক মহান হবে। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “তারা কি বিশ্বাস করে না যে, তারা পুনরুত্থিত হবে।* এক মহাদিনে?” [আল-মুতাফফিফীন: ৪,৫] তিনি আরো বলেন, “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবের তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় কেয়ামতের প্রকম্পন এক ভয়ংকর ব্যাপার।” [আল-হাজ্জ: ১]
আর এ দিনটির পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান, যেমনটি সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি ধন-সম্পদ সঞ্চয় করে কিন্তু তার যাকাত আদায় করে না, ... -তারপর বলেন-, অবশেষে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মাঝে ফয়সালা করবেন এমন একদিনে যার পরিমাণ হবে তোমাদের গণনায় পঞ্চাশ হাজার বছরের সমান। অতঃপর তাদের কেউ পথ ধরবে জান্নাতের, আর কেউ জাহান্নামের দিকে।” {বুখারী (২৩৭১), মুসলিম (৯৮৭), আবূ দাউদ (১৬৫৮), তিরমিযী (১৬৩৬), নাসাঈ (৩৫৬৩), ইবনু মাজাহ (২৭৮৮)}
সেদিন সূর্য জমিনের নিকটবর্তী হবে, যেমন আবূ উমামা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন সূর্যকে মানুষের নিকটবর্তী করে দেয়া হবে। অবশেষে তা মানুষের এক মাইল দূরত্বে চলে আসবে। -বর্ণনাকারী সুলায়ম ইবনু আমের বলেন, আল্লাহর শপথ আমি জানি না, মাইল শব্দ দ্বারা কি বুঝানো হয়েছে, জমিনের দূরত্ব, না ঐ শলাকা যা দিয়ে চোখে সুরমা লাগানো হয়।- মানুষ তাদের আমল অনুসারে ঘামে ডুবে থাকবে। তাদের কারো ঘাম পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত হবে, কারো হাঁটু পর্যন্ত হবে, কারো কোমর পর্যন্ত, আর কারো মুখ পর্যন্ত হবে।” {মুসলিম: (২৮৬৪), তিরমিযী: (২৪২১)}
আর মুমিনগণ তাদের পূর্বের নেক আমল দ্বারা সূর্যের তাপ থেকে রক্ষা পাবেন। তাদের কেউ আরশের ছায়ায় ছায়া গ্রহণ করবেন, যেমন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সাতজন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাঁর (আরশের) ছায়া দান করবেন, যে দিন তার ছায়া ছাড়া আর কোনো ছায়া থাকবে না।” {বুখারী (৬৬০), মুসলিম (১০৩১)}
তাদের কাউকে সূরা বাকারা ও সূরা আলে-ইমরান ছায়া দান করবে এবং তার পক্ষে তর্ক করবে। তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ কিয়ামতের দিন তার পাঠকারীর জন্য সে শাফা’আতকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দুটি উজ্জ্বল সূরা অর্থাৎ সূরা আল বাকারা এবং সূরা আলি ইমরান পড়। কিয়ামতের দিন এ দুটি সূরা এমনভাবে আসবে যেন তা দু খণ্ড মেঘ অথবা দু’টি ছায়াদানকারী অথবা দুই ঝাক উড়ন্ত পাখি যা তার পাঠকারীর পক্ষ হয়ে কথা বলবে। আর তোমরা সূরা আল বাকারা পাঠ কর; এ সূরাটিকে গ্রহণ করা বরকতের কাজ এবং পরিত্যাগ করা পরিতাপের কাজ। আর বাতিলের অনুসারীগণ এর মোকাবেলা করতে পারে না।” সহীহ মুসলিম: (৮০৪) তাদের কেউ নিজের সদকার ছায়ায় ছায়া গ্রহণ করবেন। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক ব্যক্তি তার সদকার ছায়ায় অবস্থান করবেন, যতক্ষণ না মানুষের মাঝে ফয়সালা করা হয়।” {আহমাদ (১৭৩৩৩), মুসনাদে আবূ ইয়ালা (১৭৬৬), ইবনু খুজাইমা (২৪৩১), ইবনু হিব্বান (৩৩১০), ইবনু খাজায়মা ও ইবনু হিব্বান হাদীসটি সহীহ বলেছেন।}
অধ্যায়: কিয়ামতের দিন সুপারিশ করা, রবের আগমণ করা এবং বান্দাদের মাঝে তাঁর ফয়সালা করা প্রসঙ্গে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, সুপারিশের মালিক একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। মহান আল্লাহ বলেন, “বলুন, সকল শাফা‘আত (সুপারিশ) আল্লাহরই মালিকানাধীন, আসমানসমূহ ও যমীনের মালিকানা তাঁরই, তারপর তাঁরই কাছে তোমরা প্রত্যাবর্তিত করা হবে।” [আয-যুমার: ৪৪]
আমরা আরো ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ তাঁর নিকট সুপারিশ করতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেন, “কে আছে তাঁর কাছে শাফা‘আত করবে তাঁর অনুমতি ব্যতীত?” [আল-বাকারাহ: ২৫৫] সুপারিশকারীগণ একমাত্র তার জন্যই সুপারিশ করবে যার কথায় ও কর্মে আল্লাহ সন্তুষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন, “আর তারা সুপারিশ করে শুধু তাদের জন্যই যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত।” [আল-আম্বিয়া: ২৮] তিনি আরো বলেন, “দয়াময় যাকে অনুমতি দেবেন ও যার কথায় তিনি সন্তুষ্ট হবেন, সে ছাড়া কারো সুপারিশ সেদিন কোন কাজে আসবে না।” [ত্বহা: ১০৯]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, কিয়ামতের দিন সুপারিশ দ্বারা ইখলাস ও তাওহীদপন্থীরা সবচেয়ে বেশী ভাগ্যবান হবেন। আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীসে রয়েছে, তিনি বলেন: একদা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করা হল, হে আল্লাহর রাসূল! কিয়ামতের দিন আপনার সুপারিশ লাভের ব্যাপারে কে সবচেয়ে অধিক সৌভাগ্যবান হবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আবূ হুরাইরা! আমি মনে করেছিলাম, এ বিষয়ে তোমার পূর্বে আমাকে আর কেউ জিজ্ঞেস করবে না। কেননা আমি দেখেছি হাদীসের প্রতি তোমার বিশেষ লোভ রয়েছে। কিয়ামতের দিন আমার শাফা‘আত লাভে সবচেয়ে সৌভাগ্যবান হবে সেই ব্যক্তি যে একনিষ্ঠচিত্তে لآ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ (আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন ইলাহ নেই) বলে।” সহীহ বুখারী (৯৯, ৬৫৭০)
আমরা আরো ঈমান আনয়ন করি যে, সুপারিশকারীদের সুপারিশ কাফিরদের স্পর্শ করবে না। আল্লাহ বলেন, “ফলে সুপারিশকারীদের সুপারিশ তাদের কোন উপকার করবে না “ [আল-মুদ্দাস্সির: ৪৮]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাঁর ইচ্ছানুযায়ী বান্দাদের মধ্যে যাদের চান তাদের সুপারিশ করার অনুমতি দেন; এটি সুপারিশকারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং যার জন্য সুপারিশ করা হচ্ছে, তার প্রতি রহমত হিসেবে। আমরা জানি যে, কিয়ামতের দিন সবচেয়ে বড় সুপারিশকারী হবেন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি বিভিন্ন প্রকার সুপারিশ করবেন। আর হাশরের ময়দানে অবস্থানকারীদের মাঝে ফয়সালা শুরু করার সুপারিশই হবে তার সবচেয়ে বড় ও মহান সুপারিশ। সেটিই হলো মাকামে মাহমূদ, যার কথা আল্লাহ তাঁর কিতাবে উল্লেখ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন, এটা আপনার জন্য অতিরিক্ত। আশা করা যায় আপনার রব আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করবেন প্রশংসিত স্থানে (মাকামে মাহমূদ)।” [আল-ইসরা: ৭৯] সহীহ বুখারীতে বর্ণিত ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার হাদীসে রয়েছে: “...অতঃপর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সৃষ্টির মধ্যে ফয়সালা করার জন্য সুপারিশ করবেন। তিনি যেতে যেতে জান্নাতের ফটকের কড়া ধরবেন। সেদিন আল্লাহ তাকে মাকামে মাহমূদে পৌঁছে দিবেন। হাশরের ময়দানে সমবেত সকলেই তার প্রশংসা করবে।” সহীহ বুখারী (১৪৭৫) এই হাদীসে ফয়সালা শুরু করার সুপারিশ উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহও সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি ফায়সালা করার জন্য আগমন করবেন, যেমন তাঁর বাণীতে রয়েছে: “তারা কি শুধু এর প্রতীক্ষায় রয়েছে যে, আল্লাহ্ ও ফেরেশতাগণ মেঘের ছায়ায় তাদের কাছে উপস্থিত হবেন? এবং সবকিছুর মীমাংসা হয়ে যাবে। আর সমস্ত বিষয় আল্লাহর কাছেই প্রত্যাবর্তিত হবে।” [আল-বাকারা: ২১০] আরেক জায়গায় আল্লাহ বলেন: “আর যখন আপনার রব আগমন করবেন ও সারিবদ্ধভাবে ফেরেশতাগণও।” [আল-ফাজর: ২২] তাঁর আরেকটি বাণী: “তারা শুধু এরই তো প্রতীক্ষা করে যে, তাদের কাছে ফিরিশতা আসবে, কিংবা আপনার রব আসবেন, কিংবা আপনার রবের কোনো নিদর্শন আসবে?” [আল-আনআম: ১৫৮]
অতঃপর জান্নাতিদের জান্নাতে প্রবেশ করানোর সুপারিশ করা হবে। এই সুপারিশের ওপর অনেক মুতাওয়াতির হাদীস রয়েছে। তন্মধ্যে আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর প্রসিদ্ধ হাদীস, যেখানে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যখন কিয়ামতের দিন হবে তখন মানুষ সমুদ্রের ঢেউয়ের মত বিপর্যন্ত অবস্থায় এদিক-সেদিক ছুটাছুটি করতে থাকবে। তাই তারা আদম (আঃ)-এর কাছে এসে বলবে, আমাদের জন্য আপনার রবেবর নিকট সুপারিশ করুন। তিনি বলবেন: এ কাজের জন্য আমি নই। বরং তোমরা ইব্রাহীম-এর কাছে যাও। কারণ, তিনি হলেন আল্লাহর খলীল। তখন তারা ইব্রাহীম (আঃ)-এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন: আমি এ কাজের জন্য নই। তবে তোমরা মূসা-এর কাছে যাও। কারণ তিনি আল্লাহর সঙ্গে কথা বলেছেন। তখন তারা মূসা (আঃ)-এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন: আমি তো এ কাজের জন্য নই। তোমরা ’ঈসা-এর কাছে যাও। কারণ তিনিই আল্লাহর রূহ ও বাণী। তারা তখন ’ঈসা (আঃ)-এর কাছে আসবে। তিনি বলবেন: আমি তো এ কাজের জন্য নই। তোমরা বরং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে যাও। এরপর তারা আমার কাছে আসবে। আমি বলব, আমিই এ কাজের জন্য। আমি তখন আমার রবের নিকট অনুমতি চাইব। আমাকে অনুমতি দেয়া হবে। আমাকে প্রশংসাসূচক বাক্য ইলহাম করা হবে যা দিয়ে আমি আল্লাহর প্রশংসা করব, যেগুলো এখন আমার জানা নেই। আমি সেসব প্রশংসা বাক্য দিয়ে প্রশংসা করব এবং সিজদা্য় পড়ে যাব। তখন আমাকে বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। তুমি বল, তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখন আমি বলবো, হে আমার রব! আমার উম্মত! আমার উম্মত! বলা হবে, যাও, যাদের হৃদয়ে যবের দানা পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আমি গিয়ে এমনই করব। তারপর আমি ফিরে আসব এবং পুনরায় সেসব প্রশংসা বাক্য দ্বারা আল্লাহর প্রশংসা করবো এবং সিজদা্য় পড়ে যাবো। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। তখনো আমি বলব, হে আমার রব! আমার উম্মাত! আমার উম্মাত! তখন বলা হবে, যাও, যাদের অন্তরে এক অণু কিংবা সরিষা পরিমাণ ঈমান আছে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আমি গিয়ে তাই করব। আমি আবার ফিরে আসব এবং সেসব প্রশংসা বাক্য দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করবো। আর সিজদা্য় পড়ে যাবো। আমাকে বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। সুপারিশ কর, গ্রহণ করা হবে। আমি তখন বলবো, হে আমার রব, আমার উম্মত! আমার উম্মত! এরপর আল্লাহ্ বলবেন, যাও, যাদের অন্তরে সরিষার দানার চেয়েও অতি ক্ষুদ্র পরিমাণ ঈমান আছে, তাদেরকেও জাহান্নাম থেকে বের করে আন। আমি যাবো এবং তাই করবো। আমরা যখন আনাস-এর নিকট থেকে বের হয়ে আসছিলাম, তখন আমি আমার সঙ্গীদের কোন একজনকে বললাম, আমরা যদি আবূ খলীফার বাড়িতে নিজেকে গোপনে রাখা হাসান বসরীর কাছে গিয়ে আনাস ইবনু মালিক-এর বর্ণিত হাদীসটি তাঁর কাছে বর্ণনা করতাম। এরপর আমরা হাসান বসরীর কাছে এসে তাঁর কাছে অনুমতি চাওয়ার সালাম দিলাম। তিনি আমাদেরকে প্রবেশের অনুমতি দিলেন। আমরা তাকে বললাম, হে আবূ সা’ঈদ! আমরা আপনারই ভাই আনাস ইবনু মালিক-এর নিকট হতে আপনার কাছে আসলাম। শাফাআত বিষয়ে তিনি যেমন বর্ণনা দিয়েছেন, তেমন বর্ণনা করতে আমরা আর কাউকে দেখিনি। তিনি বললেন, আমার কাছে সেটি বর্ণনা কর। আমরা তাকে হাদীসটি বর্ণনা করে শোনালাম। এরপর আমরা শেষ পর্যন্ত বর্ণনা শেষ করলাম। তিনি বললেন, আরো বর্ণনা কর। আমরা বললাম, তিনি তো এর অধিক আমাদের কাছে বর্ণনা দেননি। তিনি বললেন, জানি না, তিনি কি ভুলেই গেলেন, না তোমরা নির্ভরশীল হয়ে পড়বে বলে বাকীটুকু বর্ণনা করতে অপছন্দ করলেন। বিশ বছর আগে যখন তিনি শক্তি সামর্থ্যে ও স্মরণশক্তিতে দৃঢ় ছিলেন, তখন আমার কাছেও হাদীসটি বর্ণনা করেছিলেন। আমরা বললাম, হে আবূ সা’ঈদ! আমাদের কাছে হাদীসটি বর্ণনা করুন। তিনি হাসলেন এবং বললেন, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে, খুব বেশি ত্বরাপ্রবণ করে। আমি তো বর্ণনার উদ্দেশেই তোমাদের কাছে বিষয়টি উল্লেখ করলাম। তিনি তোমাদের কাছে যা বর্ণনা করেছেন, আমার কাছেও তা বর্ণনা করেছেন, তবে পরে এটুকুও বলেছিলেন: আমি চতুর্থবার ফিরে আসবো এবং সেসব প্রশংসা বাক্য দিয়ে আল্লাহর প্রশংসা করব এবং সিজদায় পড়ে যাবো। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উঠাও। বল, তোমার কথা শোনা হবে। চাও, দেয়া হবে। শাফাআত কর, গ্রহণ করা হবে। আমি বলব, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে তাদের সম্পর্কে শাফাআত করার অনুমতি দান কর, যারা ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলেছে। তখন আল্লাহ্ বলবেন, আমার ইজ্জত, আমার পরাক্রমতা, আমার বড়ত্ব ও মহত্ত্বের শপথ! যারা ’লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্’ বলেছে, আমি অবশ্য অবশ্যই তাদের সবাইকে জাহান্নাম থেকে বের করব।” {সহীহ বুখারী (৭৫১০), সহীহ মুসলিম (১৯৩), ইবনু মাজাহ (৪৩১২)}
তন্মধ্যে আরো রয়েছে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস। এটিও আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর বর্ণিত হাদীসের মত। এর শেষে রয়েছে: “... তোমরা মুহাম্মাদের নিকট যাও। অবশেষে তারা আমার কাছে আসবে এবং বলবে: হে মুহাম্মাদ! আপনি আল্লাহর রাসূল, শেষ নবী, আল্লাহ আপনার পূর্বাপর সকল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। দেখছেন না, আমরা কোন অবস্থায় আছি এবং আমাদের অবস্থা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে? তখন আমি সুপারিশের জন্য যাব এবং আরশের নীচে এসে রবের উদ্দেশে সিজদাবনত হব। আল্লাহ আমার অন্তরকে খুলে দিবেন এবং সর্বোত্তম প্রশংসা ও হামদ জ্ঞাপনের ইলহাম করবেন, যা ইতোপূর্বে আর কাউকে খুলে দেননি। এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! মাথা উত্তোলন করুন, প্রার্থনা করুন, আপনার প্রার্থনা কবুল করা হবে। সুপারিশ করুন, আপনার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। তারপর আমি মাথা তুলব। বলব, হে রব! আমার উম্মত, আমার উম্মত। তারপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! আপনার উম্মতের যাদের উপর কোন হিসাব নেই তাদেরকে জান্নাতের দরজার ডান দিক দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। তারা এছাড়াও অন্য দরজায় মানুষের সঙ্গে শারীক হবে। কসম ঐ সত্ত্বার যার হাতে মুহাম্মাদের প্রাণ, নিশ্চয় জান্নাতের দু’ চৌকাঠের মধ্যকার দূরত্ব মক্কা ও হাজরের (বাহরাইনের একটি জনপদের) দূরত্বের মতো। অথবা মক্কা ও বসরার দূরত্বেরে ন্যায়।” {সহীহ বুখারী (৩৩৪০), মুসলিম (১৯৪)}
তন্মধ্যে আরো রয়েছে, আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “জান্নাতের ব্যাপারে আমিই হবো সর্বপ্রথম সুপারিশকারী এবং এত অধিক সংখ্যক মানুষ আমার প্রতি ঈমান এনেছে যা অন্য কোন নবীর বেলায় হবে না। নবীদের কেউ কেউ তো এমতাবস্থায়ও আসবেন যার প্রতি মাত্র এক ব্যক্তিই ঈমান এনেছে।” {সহীহ মুসলিম (১৯৬), সুনানে দারিমী (৫২)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “প্রত্যেক নবীকে যে দু’আর অধিকার দেয়া হয়েছিল তিনি সে দু’আ করে নিয়েছেন এবং তা কবূলও করা হয়েছে। কিন্তু আমি আমার দু’আকে কিয়ামতের দিনে আমার উম্মাতের শাফায়াতের জন্য রেখে দিয়েছি।” সহীহ বুখারী (৬৩০৫) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “প্রত্যেক নবীর জন্য এমন একটি দু’আ রয়েছে, যা গৃহীত হয়। আমার ইচ্ছা, আমি আমার সে দু’আর অধিকার আখিরাতে আমার উম্মাতের শাফায়াতের জন্য লুকিয়ে রাখি।” {সহীহ বুখারী (৬৩০৫), মুসলিম (১৯৯), তিরমিযী (৩৬০২), ইবনু মাজাহ (৪৩০৭)}
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ যেমন আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সুপারিশ দ্বারা সম্মানিত করেছেন, তেমন তিনি নবীগণ, মালায়েকা ও মুমিনগণকেও সম্মানিত করবেন। যেমন আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তারপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন: ফেরেশতারা সুপারিশ করলেন, নবীগণও সুপারিশ করলেন এবং মুমিনরাও সুপারিশ করেছে, কেবলমাত্র পরম দয়াময়ই রয়ে গেছেন। এরপর তিনি জাহান্নাম থেকে এক মুঠো তুলে আনবেন, ফলে এমন একদল লোক মুক্তি পাবে যারা কখনো কোন সৎকর্ম করেনি।” {সহীহ বুখারী (৭৪৩৯), মুসলিম (১৮৩)}
অধ্যায়: উপস্থাপন, হিসেব গ্রহণ ও আমলনামা বিতরণ করা প্রসঙ্গে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, প্রত্যেক মানুষকে তার আমলনামা প্রদান করা হবে। কেউ ডান হাতে তার আমলনামা গ্রহণ করবে। যেমন আল্লাহ বলেন, “তখন যাকে তার ‘আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, ‘লও, আমার ‘আমলনামা পড়ে দেখ।” [আল-হাক্কাহ: ১৯]
আর কেউ বাঁ হাতে তার আমলনামা গ্রহণ করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “কিন্তু যার ‘আমলনামা তার বাম হাতে দেয়া হবে, সে বলবে, ‘হায়! আমাকে যদি দেয়াই না হত আমার ‘আমলনামা।” [আল-হাক্কাহ: ২৫] অথবা সে পেছন থেকে আমলনামা গ্রহণ করবে। মহান সত্তা বলেন, “আর যাকে তার ‘আমলনামা তার পিঠের পিছনদিক থেকে দেয়া হবে।” [আল-ইনিশকাক: ১০] এবং তাকে বলা হবে: “তুমি তোমার কিতাব পাঠ করো, আজ তুমি নিজেই তোমার হিসেব-নিকেশের জন্য যথেষ্ট।” [আল-ইসরা: ১৪] আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, “আর উপস্থাপিত করা হবে ‘আমলনামা, তখন তাতে যা লিপিবদ্ধ আছে তার কারণে আপনি অপরাধীদেরকে দেখবেন আতংকগ্রস্ত এবং তারা বলবে, ‘হায়, দুর্ভাগ্য আমাদের! এটা কেমন গ্রন্থ! এটা তো ছোট বড় কিছু বাদ না দিয়ে সব কিছুই হিসেব করে রেখেছে। আর তারা যা আমল করেছে তা সামনে উপস্থিত পাবে; আর আপনার রব তো কারো প্রতি যুলুম করেন না।” [আল-কাহাফ: ৪৯]
আমরা এটাও বিশ্বাস করি যে, আমাদেরকে আল্লাহর সামনে উপস্থিত করা হবে। যেমন মহাসত্য আল্লাহ বলেন, “সেদিন উপস্থিত করা হবে তোমাদেরকে এবং তোমাদের কোন গোপনই আর গোপন থাকবে না।” [আল-হাক্কাহ: ১৮] তিনি আরো বলেন, “আর তাদেরকে আপনার রব-এর কাছে উপস্থিত করা হবে সারিবদ্ধভাবে এবং আল্লাহ্ বলবেন, ‘তোমাদেরকে আমি প্রথমবার যেভাবে সৃষ্টি করেছিলাম সেভাবেই তোমরা আমার কাছে উপস্থিত হয়েছ, অথচ তোমরা মনে করতে যে, তোমাদের জন্য আমি কোন প্রতিশ্রুত সময় নির্ধারণ করব না।” [আল-কাহাফ: ৪৮] আদি ইবনু হাতিম বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন তোমাদের প্রত্যেক লোকের সাথে আল্লাহ্ কথা বলবেন। আর সেদিন আল্লাহ ও বান্দার মাঝে কোন দোভাষী থাকবে না। অতঃপর সে তার ডানদিকে তাকাবে, তার আমল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পাবে না। সে বামদিকে তাকাবে, সেদিকেও তার কৃত আমল ছাড়া কিছুই দেখতে পাবে না। অতঃপর সে তার সামনে দৃষ্টি ফেরাবে। তখন তার সামনে জাহান্নাম ছাড়া কিছু দেখতে পাবে না। অতএব, তোমরা এক টুকরা খেজুর দিয়ে হলেও জাহান্নাম থেকে বাঁচার চেষ্টা কর।” {সহীহ বুখারী (৬৫৩৯), মুসলিম (১০১৬)}
আমরা হিসাব-নিকাশেও বিশ্বাস করি এবং আল্লাহ নিশ্চয় তাঁর বান্দাদের থেকে হিসেব গ্রহণ করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় তাদের ফিরে আসা আমারই কাছে;* তারপর তাদের হিসেব-নিকেশ আমারই কাজ।” [আল-গাশিয়াহ: ২৫-২৬] অতএব যে ভাল কিছু পাবে সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে এবং যে তার বিপরীত কিছু পাবে সে যেন নিজেকে ছাড়া কাউকে তিরস্কার না করে। এমনটিই বিশুদ্ধ সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত: “...হে আমার বান্দারা। আমি তোমাদের আমলই তোমাদের জন্য সংরক্ষিত রাখি। এরপর পুরোপুরিভাবে তার বিনিময় প্রদান করে থাকি। সুতরাং যে ব্যক্তি কোন কল্যাণ অর্জন করে সে যেন আল্লাহর প্রশংসা করে। আর যে তা ব্যতীত অন্য কিছু পায়, তবে সে যেন নিজেকেই দোষারোপ করে।” সহীহ মুসলিম: (২৫৭৭)
আল্লাহ তাআলা দ্রুত হিসেবে গ্রহণকারী। তিনি বলেন, “আজ প্রত্যেককে তার অর্জন অনুসারে প্রতিফল দেয়া হবে; আজ কোন যুলুম নেই। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসেব গ্রহণকারী।” [গাফির: ১৭]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, কতক মুমিন বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবেন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আমার উম্মাত থেকে সত্তর হাজার লোক বিনা হিসেবে জান্নাতে প্রবেশ করবে...” {বুখারী (৫৮১১), মুসলিম (২১৬) হাদিসের শব্দ সহীহ মুসলিম থেকে গৃহীত।}
বান্দাদের থেকে আল্লাহর হিসেব গ্রহণ করার বিভিন্ন স্তর ও ভিন্ন ভিন্ন অবস্থা হবে। যেমন তিনি কোনো কোনো বান্দার কঠিন হিসেবে নিবেন, আবার কোনো বান্দার হিসেবে সহজভাবে নিবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “অতঃপর যাকে তার ‘আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে।* তার হিসেব-নিকেশ সহজেই নেয়া হবে।” [আল-ইনশিকাক: ৭, ৮]
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কিয়ামতের দিন যারই হিসাব খতিয়ে দেখা হবে সেই ধ্বংস হবে।” {বুখারী (৬৫৩৭), মুসলিম (২৮৭৬)} তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ তা‘আলা কি বলেননি যে: “অতঃপর যাকে তার ‘আমলনামা তার ডান হাতে দেয়া হবে।* তার হিসেব-নিকেশ সহজেই নেয়া হবে।”? [আল-ইনশিকাক: ৭, ৮] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “তা কেবল পেশ করা মাত্র। কিয়ামতের দিন যার হিসাব খতিয়ে দেখা হবে তাকে অবশ্যই আযাব দেয়া হবে।” বুখারী (৬৫৩৭) সেদিন কারো ওপর যুলুম করা হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর তোমরা সেই দিনের তাকওয়া অবলম্বন কর যেদিন তোমাদেরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে নেয়া হবে। তারপর প্রত্যেককে সে যা অর্জন করেছে তা পুরোপুরি প্রদান করা হবে। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।” [আল-বাকারাহ: ২৮১]
সেদিন সর্বপ্রথম উম্মাতে মুহাম্মাদীর হিসেব গ্রহণ করা হবে। কেননা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “...আমরা পৃথিবীবাসীর মধ্যে শেষে আগমনকারী উম্মত এবং কিয়ামতের দিন হব অগ্রগামী; যাদের সমগ্র সৃষ্টির মধ্যে সর্বপ্রথম বিচার অনুষ্ঠিত হবে।” সহীহ মুসলিম: (৮৫৬)
মানুষের মাঝে সর্বপ্রথম রক্তের ফয়সালা গ্রহণ করা হবে। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন মানুষের মাঝে প্রথমেই রক্ত সংক্রান্ত বিচার করা হবে।” {সহীহ বুখারী (৬৮৬৪), মুসলিম (১৬৭৮)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, এই দিনে সাক্ষীগণকে পেশ করা হবে। ফলে মালায়েকাগণ সাক্ষ্য দিবেন, জমিনের ওপর বান্দাগণ যে আমল করেছে জমিন তার সাক্ষ্য দিবে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও সাক্ষ্য দিবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আমি আমার রাসূলদেরকে এবং যারা ঈমান এনেছে তাদেরকে সাহায্য করব দুনিয়ার জীবনে, আর যেদিন সাক্ষীগণ দাঁড়াবে।” [গাফির: ৫১] মহাসত্য আল্লাহ আরো বলেন, “আর যমীন তার প্রভুর নূরে উদ্ভাসিত হবে এবং আমলনামা পেশ করা হবে। আর নবীগণকে ও সাক্ষীগণকে উপস্থিত করা হবে এবং সকলের মধ্যে ন্যায়বিচার করা হবে এমতাবস্থায় যে, তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।” [আয-যুমার: ৬৯] তিনি আরো বলেন, “সেদিন যমীন তার বৃত্তান্ত বৰ্ণনা করবে।” [আয-যিলযাল: ৪] তিনি আরো বলেন, “আমি আজ এদের মুখে মোহর মেরে দেব, আর এদের হাত কথা বলবে আমার সাথে এবং এদের পা সাক্ষ্য দেবে এদের কৃতকর্মের।” [ইয়াসীন: ৬৫]
সহীহ গ্রন্থে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে বান্দার বিপক্ষে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে, তাতে রয়েছে: “... তারপর তাকে বলা হবে, এখনই আমি তোমার উপর আমার সাক্ষী উপস্থিত করব। তখন বান্দা মনে মনে চিন্তা করতে থাকবে যে, কে তার বিপক্ষে সাক্ষী দিবে? তখন তার জবান বন্ধ করে দেয়া হবে এবং তার উরু, মাংস ও হাড়কে বলা হবে, তোমরা কথা বলো। ফলে তার উরু, মাংস ও হাড় তার আমলের ব্যাপারে বলতে থাকবে। এ ব্যবস্থা এজন্য করা হবে, যেন আত্মপক্ষ সমর্থন করার কোন সুযোগ তার অবশিষ্ট না থাকে। এ ব্যক্তি হচ্ছে মুনাফিক যার প্রতি আল্লাহ তা’আলা অসন্তুষ্ট।” সহীহ মুসলিম: (২৯৬৮)
আনাস ইবনু মালিক থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ছিলাম। এ সময় তিনি হেসে বললেন, তোমরা কি জান, আমি কেন হাসলাম? আমরা বললাম, এ সম্পর্কে আল্লাহ ও তাঁর রসূলই ভাল জানেন। অতঃপর তিনি বললেন, বান্দা তার রবের সঙ্গে যে কথা বলবে, এজন্য হাসলাম। বান্দা বলবে, হে আমার রব! তুমি কি আশ্রয় দাওনি আমাকে অত্যাচার হতে? রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ আল্লাহ তা’আলা বলবেন, হ্যাঁ, আমি কারো প্রতি অত্যাচার করি না। এরপর বান্দা বলবে, আমি আমার ব্যাপারে স্বীয় সাক্ষ্য ছাড়া অন্য কারো সাক্ষী হওয়াকে বৈধ মনে করি না। তখন মহান আল্লাহ বলবেন, আজ তুমি নিজেই তোমার সাক্ষী হওয়ার জন্য যথেষ্ট এবং সম্মানিত কিরামান কাতিবীন (লিপিকারবৃন্দও) যথেষ্ট। তারপর বান্দার জবান বন্ধ করে দেয়া হবে এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে নির্দেশ দেয়া হবে যে, তোমরা বলো। তারা তার আমল সম্পর্কে বলবে। তারপর বান্দাকে কথা বলার অনুমতি দেয়া হবে। তখন বান্দা তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে উদ্দেশ্য করে বলবে, অভিসম্পাত তোমাদের প্রতি, তোমরা দূর হয়ে যাও। আমি তো তোমাদের জন্যই বিবাদ করছিলাম।” সহীহ মুসলিম: (২৯৬৯)
অধ্যায়: দাঁড়িপাল্লার প্রতি ঈমান
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা বান্দাদের আমল ওজন করার জন্যে দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করবেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “আর কিয়ামতের দিনে আমি ন্যায়বিচারের পাল্লাসমূহ স্থাপন করব, সুতরাং কারো প্রতি কোন যুলুম করা হবে না এবং কাজ যদি শস্য দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও তা আমরা উপস্থিত করব; আর হিসেব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট।” [আল-আম্বিয়া : ৪৭] তিনি আরো বলেন, “আর সেদিন ওজন হবে যথাযথ, সুতরাং যাদের পাল্লা ভারী হবে তারাই সফলকাম।* আর যাদের পাল্লা হালকা হবে, তারাই সেসব লোক যারা নিজেদের ক্ষতি করেছে, যেহেতু তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি যুলুম করত।” [আল-আরাফ: ৮-৯] এটি বাস্তবিক পাল্লা হবে এবং তার দু’টি হাতল ও একটি জবান থাকবে এবং এটা দ্বারাই বান্দাদের আমলগুলো ওজন করা হবে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, পাল্লায় বান্দাদের আমলসমূহ ওজন করা হবে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “দু’টি কলেমা যা জবানে অতি হালকা, মীযানে ভারী, আর রহমানের নিকট খুব পছন্দনীয়; তা হচ্ছে ’সুবহানাল্লাহু ওয়া বিহামদিহী, সুবহানাল্লাহিল আযীম’।” {বুখারী (৬৬৮২), মুসলিম (২৬৯৪), তিরমিযী (৩৪৬৭), ইবনু মাজাহ (৩৮০৬)}
তিনি আরো বলেন, “পবিত্রতা হল ঈমানের অর্ধেক। আর আলহামদুলিল্লাহ মিযানের পরিমাপকে পরিপূর্ণ করে দিবে...” {মুসলিম (২২৩), তিরমিযী (৩৫১৭), নাসাঈ (২৪৩৭), ইবনু মাজাহ (২৮০)}
আমরা জানি যে, আমলকারীকে তার আমলসহ ওজন করা হবে। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কিয়ামতের দিন একজন খুব মোটা ব্যক্তি আসবে; কিন্তু সে আল্লাহর কাছে মশার পাখার চেয়েও ক্ষুদ্র হবে।” তারপর তিনি বলেন, পাঠ করো, “সুতরাং আমি তাদের জন্য কিয়ামতের দিন কোন ওজনের ব্যবস্থা রাখব না।” [আল-কাহাফ: ১০৫] {বুখারী (৪৭২৯), মুসলিম (২৭৮৫)} অনুরূপভাবে আমলনামার দফতরসমূহ মীযানে (পাল্লায়) ওজন করা হবে। যেমনটি চিরকুট সম্পর্কিত হাদিসে এর প্রমাণ রয়েছে। {তিরমিযী (২৬৩৯), ইবনু মাজাহ (৪৩০০), ইবনুল মুবারাক, আল-মুসনাদ (১০০), আয-যুহদ (২/১০৯) এবং আহমাদ (৬৯৯৪)}
অধ্যায়: হাউজের প্রতি ঈমান
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আমাদের রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি হাউজ হবে এবং সেখানে তার উম্মাতগণ উপস্থিত হবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আমি আপনাকে কাউসার দান করেছি।” [আল-কাউসার: ১]
আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। হঠাৎ তার উপর অচৈতন্য ভাব চেপে বসল। অতঃপর তিনি মুচকি হেসে মাথা তুললেন। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার হাসির কারণ কী? তিনি বললেন: এইমাত্র আমার উপর একটি সূরা অবতীর্ণ হয়েছে। তিনি পাঠ করলেন: বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম, {إِنَّا أَعْطَيْنَاكَ الْكَوْثَر * فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَر * إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الأَبْتَر} “নিশ্চয়ই আমি তোমাকে কাওসার দান করেছি। অতএব তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় কর এবং কুরবানী দাও। তোমার কুৎসা রটনাকারীরাই মূলত শিকড়কাটা, নির্মূল।” [আল-কাউসার: ১-৩] অতঃপর তিনি বললেন, তোমরা কি জান কাওসার কি? আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই বেশি ভালো জানেন। তিনি বললেন: এটা একটা ঝর্ণা। আমার মহান প্রতিপালক আমাকে তা দেয়ার জন্য ওয়া’দা করেছেন। এর মধ্যে অশেষ কল্যাণ রয়েছে, আমার উম্মতের লোকেরা কিয়ামতের দিন এ হাওযের পানি পান করতে আসবে। এ হাওযে রয়েছে তারকার মত অসংখ্য পানপাত্র (গ্লাস)। এক ব্যক্তিকে সেখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হবে। আমি তখন বলব: প্রভু! সে আমার উম্মতেরই লোক। আমাকে তখন বলা হবে, তুমি জান না, তোমার মৃত্যুর পর এরা কী অভিনব কাজ (বিদ’আত) করেছে।” মুসলিম: (৪০০)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমার হাউযের প্রশস্ততা এক মাসের পথের সমান। এর পানি দুধের চেয়ে সাদা, এর ঘ্রাণ মিশক-এর চেয়ে বেশি সুগন্ধযুক্ত এবং এর পানপাত্রগুলো হবে আকাশের তারকার মত। তা থেকে যে পান করবে সে আর কক্ষনো তৃষ্ণার্ত হবে না।” {সহীহ বুখারী (৬৫৭৯), মুসলিম (২২৯২)}
তিনি আরো বলেছেন: “আমার হাওযে কাওসার হবে আদান (ইয়ামানের বন্দর নগরী) থেকে আইলা (আরবের উত্তরাঞ্চলীয় শহর) এর যত দূরত্ব তার থেকেও বেশি দীর্ঘ। আর তা হবে বরফের থেকেও বেশি সাদা এবং দুধ-মধু থেকেও বেশি মিষ্টি। আর এর পাত্রের সংখ্যা হবে তারকারাজির চেয়েও অধিক। আমি কিছু সংখ্যক লোককে তা থেকে ফিরিয়ে দিবো যেমনিভাবে লোকে তার হাওয থেকে অন্যের উট ফিরিয়ে দেয়। সাহাবায়ে কিরাম আরয করলেন, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! সেদিন কি আপনি আমাদেরকে চিনতে পারবেন? তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তোমাদের এমন চিহ্ন হবে যা অন্য কোন উম্মতের হবে না। ওয়ূর বিনিময়ে তোমাদের মুখমণ্ডল জ্যোতির্ময় ও হাত-পা দীপ্তিমান অবস্থায় তোমরা আমার কাছে আসবে"। সহীহ মুসলিম: (২৪৭)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “এক সময় আমি (হাশরের ময়দানে) দাঁড়িয়ে থাকব। হঠাৎ দেখতে পাব একটি দল এবং আমি যখন তাদেরকে চিনে ফেলব, তখন আমার ও তাদের মাঝ থেকে একটি লোক বেরিয়ে আসবে এবং সে বলবে, আপনি আসুন। আমি বলব, কোথায়? সে বলবে, আল্লাহর কসম জাহান্নামের দিকে। আমি বলব, তাদের অবস্থা কী? সে বলবে, নিশ্চয় এরা আপনার মৃত্যুর পর দ্বীন থেকে পেছনে সরে গিয়েছিল। এরপর হঠাৎ আরেকটি দল দেখতে পাব। আমি তাদেরকে চিনে ফেলব। তখন আমার ও তাদের মধ্য হতে একটি লোক বেরিয়ে আসবে। সে বলবে, আসুন! আমি বলব কোথায়? সে বলবে আল্লাহর কসম, জাহান্নামের দিকে। আমি বলব, তাদের অবস্থা কী? সে বলবে, নিশ্চয়ই এরা আপনার মৃত্যুর পর থেকে পেছনে ফিরে গিয়েছিল। অতি নগণ্য সংখ্যক ছাড়া তারা নাজাত পাবে বলে আমার মনে হয় না।” সহীহ বুখারী (৬৫৮৭)
আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যখন নবী সাল্লাল্লাহু ’আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আসমানের দিকে মিরাজে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন সে সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি একটি নহরের ধারে পৌঁছলাম, যার উভয় তীরে ফাঁপা মোতির তৈরি গম্বুজসমূহ রয়েছে। আমি বললাম, হে জিব্রীল! এটা কী? তিনি বললেন, এটাই (হাওযে) কাউসার।” সহীহ বুখারী (৪৯৬৪)
অধ্যায়: পুল সিরাত ও প্রতিদান।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, জাহান্নামের পিঠের ওপর পুলসিরাত স্থাপন করা হবে। তা হবে পিচ্ছিল পদস্খলন স্থান। বান্দাগণ তাদের আমল মোতাবেক তার ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে। জাহান্নামে সা’দান কাঁটার ন্যায় বরশি রয়েছে। সেগুলো মানুষকে তাদের আমল অনুযায়ী ছোবল মেরে নিয়ে নিবে। সর্বপ্রথম আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুলসিরাত অতিক্রম করবেন। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “... কিয়ামতের দিন সকল মানুষকে সমবেত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা বলবেন, যে যার উপাসনা করতে সে যেন তার অনুসরণ করে। তাই তাদের কেউ সূর্যের অনুসরণ করবে, কেউ চন্দ্রের অনুসরণ করবে, কেউ তাগুতের অনুসরণ করবে। আর বাকী থাকবে শুধুমাত্র এই উম্মাহ্, তবে তাদের সাথে মুনাফিকরাও থাকবে। তাদের মাঝে এ সময় আল্লাহ তা‘আলা আগমন করবেন এবং বলবেন: ‘‘আমি তোমাদের রব।’’ তখন তারা বলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আমাদের রবের আগমন না হবে, ততক্ষণ আমরা এখানেই থাকব। আর তাঁর যখন আগমন হবে তখন আমরা অবশ্যই তাকে চিনতে পারব। তখন তাদের মাঝে মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ্ তা‘আলা আগমন করবেন এবং বলবেন, ‘‘আমিই তোমাদের রব।’’ তারা বলবে, হাঁ, আপনিই আমাদের রব। আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের ডাকবেন। আর জাহান্নামের উপর একটি সেতু স্থাপন করা হবে। রাসূলগণের মধ্যে আমিই সবার আগে আমার উম্মাত নিয়ে এ পথ অতিক্রম করব। সেদিন রাসূলগণ ব্যতীত আর কেউ কথা বলবে না। আর রাসূলগণের কথা হবে: (আল্লাহুম্মা সাল্লিম সাল্লিম) হে আল্লাহ্! রক্ষা করুন, রক্ষা করুন।” {সহীহ বুখারী (৮০৬), মুসলিম (১৮২), আবূ দাউদ (৪৭৩০), তিরমিযী (২৫৫৪), ইবনু মাজাহ (১৭৮)}
আর আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “...এমন সময় জাহান্নামের উপর পুল স্থাপন করা হবে। সাহাবীগণ বললেন, সে পুলটি কেমন হবে হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন: দুর্গম পিচ্ছিল স্থান। এর ওপর আংটা ও হুক থাকবে, শক্ত চওড়া উল্টো কাঁটা বিশিষ্ট হবে, যা নাজ্দ দেশের সাদান বৃক্ষের কাঁটার মত হবে। সে পুলের উপর দিয়ে ঈমানদারগণের কেউ পার হয়ে যাবে চোখের পলকের মতো, কেউ বিদ্যুতের মতো, কেউ বাতাসের মতো, আবার কেউ দ্রুতগামী ঘোড়া ও সাওয়ারের মতো। তবে মুক্তিপ্রাপ্তরা কেউ নিরাপদে চলে আসবেন, আবার কেউ জাহান্নামের আগুনে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে। একেবারে শেষে অতিক্রম করবে যে লোকটি, সে হেঁচড়িয়ে কোন ভাবে পার হয়ে আসবে...”। সহীহ বুখারী (৭৪৩৯)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “...সিরাতের উভয় পাশে ঝুলানো থাকবে কাটাযুক্ত লৌহ শলাকা। এরা আল্লাহর নির্দেশক্রমে চিহ্নিত পাপীদেরকে পাকড়াও করবে। তন্মধ্যে কাউকে তো ক্ষত-বিক্ষত করেই ছেড়ে দিবে; অতঃপর সে নাজাত পাবে। আর কতক আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে জাহান্নামের গর্ভে নিক্ষিপ্ত হবে।” সহীহ মুসলিম: (১৯৫)
আবূ যুবাইর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, জাবির ইবনু আবদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহুকে কুরআনে উল্লেখিত الْوُرُودِ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন আমরা এরূপে আসব। তিনি মাথা উচু করে দেখালেন। এরপর একে একে প্রত্যেক জাতিকে তাদের নিজ নিজ দেব-দেবী ও উপাস্যের নামসহ ডাকা হবে। তারপর আল্লাহ আমাদের (মু’মিনদের) নিকট এসে জিজ্ঞেস করবেন, তোমরা কার অপেক্ষায় রয়েছ? মুমিনগণ বলবে, আমাদের রবের অপেক্ষায় আছি। তিনি বলবেন, আমিই তো তোমাদের রব। তারা বলবে, যতক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে না দেখব (আমরা তা মানছি না)। এরপর আল্লাহ তখন এমনভাবে উদ্ভাসিত হবেন যে, তিনি হাসছেন। অনন্তর তিনি তাদের নিয়ে চলবেন এবং মুমিনগণ তাঁর অনুসরণ করবে। মুনাফিক, মুমিন প্রত্যেক মানুষকেই নূর প্রদান করা হবে। তারপর তারা এর অনুসরণ করবে। জাহান্নামের পুলের উপর থাকবে কাটাযুক্ত লৌহ শলাকা। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে সেগুলো পাকড়াও করবে। তারপর মুনাফিকদের নূর নিভে যাবে। আর মুমিনগণ নাজাত পাবেন...”। সহীহ মুসলিম: (১৯১)
মুমিনগণ যখন সিরাত থেকে মুক্ত হবেন, তখন তাদেরকে জান্নাত ও জাহান্নামের মাঝে একটি ঘাঁটির ওপর দাঁড় করানো হবে। যেমন আবূ সা’ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “মু’মিনগণ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়ার পর একটি ঘাঁটির ওপর তাদের দাঁড় করানো হবে, যা জান্নাত ও জাহান্নামের মধ্যস্থলে অবস্থিত। দুনিয়ায় তারা একে অপরের উপর যে যুলুম করেছিল তার প্রতিশোধ গ্রহণ করানো হবে। তারা যখন পাক-সাফ হয়ে যাবে, তখন তাদের জান্নাতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হবে। সেই সত্তার কসম! যার হাতে মুহাম্মাদ-এর প্রাণ, প্রত্যেক ব্যক্তি তার দুনিয়ার বাসস্থানের তুলনায় জান্নাতের বাসস্থানকে উত্তমরূপে চিনতে পারবে।” সহীহ বুখারী (৬৫৩৫)
অধ্যায়: জান্নাত ও জাহান্নাম
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, জান্নাত ও জাহান্নাম হলো প্রতিদানের ঘর। কুরআন ও সুন্নাতে জান্নাতী ও জাহান্নামীদের বর্ণনা এবং তাদের থাকা, খাওয়া, পান করা ও পোশাকের বর্ণনাও এসেছে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, জান্নাত ও জাহান্নাম দু’টিই মাখলূক। আর আদম আলাইহিস সালাম জান্নাতুল খুলদে ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর, অতঃপর যেথা হতে ইচ্ছা খাও, কিন্তু এ গাছের ধারেকাছেও যাবে না, তাহলে তোমরা যালেমদের অন্তর্ভূক্ত হবে।” [আল-আরাফ: ১৯] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আদম ও মূসা পরস্পরে বাদানুবাদ করেন। মূসা বলেন, হে আদম, আপনি আমাদের পিতা। আপনি আমাদেরকে বঞ্চিত করেছেন এবং জান্নাত থেকে আমাদেরকে বের করেছেন। আদম তাকে বললেন, হে মূসা! আল্লাহ্ আপনাকে তো নিজ কথার মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন এবং আপনার জন্য নিজ হাত দ্বারা লিখেছেন। অতএব আপনি কি আমাকে এমন একটি কাজের ব্যাপারে তিরস্কার করছেন যা আমাকে সৃষ্টি করার চল্লিশ বছর পূর্বেই আল্লাহ্ নির্ধারিত করে রেখেছেন? তখন আদম মূসা-এর উপর বিতর্কে জয়ী হলেন।” এ কথাটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বলেছেন। {সহীহ বুখারী (৬৬১৪), মুসলিম (২৬৫২), আবূ দাউদ (৪৭০১), তিরমিযী (২১৩৪), ইবনু মাজাহ (৮০)}
জান্নাত হলো চিরস্থায়ী নিয়ামতের স্থান। মহান আল্লাহ বলেন, “তাদেরই পুরস্কার হলো তাদের রবের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও জান্নাত, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা স্থায়ী হবে। আর সৎকর্মশীলদের পুরস্কার কতইনা উত্তম!” [আলে ইমরান: ১৩৬] আল্লাহ তা‘আলা জান্নাতে যেসব নিয়ামত রয়েছে তার প্রতি উৎসাহ প্রদান করে বলেন, “অতএব কেউই জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কার স্বরূপ!” [আস-সাজদাহ: ১৭]
আমরা আরো বিশ্বাস করি যে, জান্নাতের সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো জান্নাতুন নাঈমেআল্লাহ তা‘আলার চেহারার দিকে দৃষ্টিপাত করা, তথা দিদার লাভ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সেদিন কোনো কোনো মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে,* তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।” [আল-কিয়ামাহ: ২২-২৩] এবং তিনি বলেছেন, “কখনো নয়; নিশ্চয় সেদিন তারা তাদের রব হতে অন্তরিত থাকবে।” [আল-মুতাফফিফীন: ১৫] সুহাইব আর-রুমি রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা কি চাও আমি আরো অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেই? তারা বলবে, আপনি কি আমাদের চেহারাগুলো আলোকজ্জ্বল করে দেননি, আমাদের জান্নাতে দাখিল করাননি এবং জাহান্নাম থেকে নাজাত দেননি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর আল্লাহ তা’আলা আবরণ তুলে নিবেন। ফলে আল্লাহর দর্শন লাভের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় জিনিস আর কিছুই তাদের দেয়া হয়নি।” সহীহ মুসলিম: (১৮১)
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, জান্নাতের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। জান্নাতের সবচেয়ে নিম্ন ও সর্বোচ্চ স্তর সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “মূসা আলাইহিস সালাম তার রবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, জান্নাতের সর্বনিম্ন অবস্থান কেমন? তখন তিনি বলেছিলেন: জান্নাতীরা জান্নাতে প্রবেশ করার পরে, এক ব্যক্তি আসবে। তাকে বলা হবে: তুমি জান্নাতে প্রবেশ কর। সে বলবে: হে আমার রব! তা কিভাবে? অথচ সব লোকেরা তাদের অবস্থানে স্থান গ্রহণ করে ফেলেছে এবং তাদের প্রাপ্তিও গ্রহণ করেছে? তখন তাকে বলা হবে: তুমি কি এতে খুশি হবে যে, দুনিয়ার রাজা-বাদশাদের কারো রাজত্ব পরিমাণ স্থান তোমাকে দেয়া হবে? সে বলবে: আমি খুশি, হে আমার রব! তোমাকে দেয়া হল, ঐ পরিমাণ, এবং তার সাথে আরো সমপরিমাণ, আরো সমপরিমাণ... পঞ্চমবারে ঐ ব্যক্তি বলবে: হে আমার রব! আমি খুশি। তখন আল্লাহ বলবেন: নাও, এই দশগুণ পরিমাণ তোমার। এছাড়াও তোমার জন্য রয়েছে, যা তোমার অন্তর প্রত্যাশা করবে, এবং তোমার চোখ জুড়িয়ে যাবে। তখন সে বলবে: হে আমার রব, আমি খুশি! তখন মূসা আলাইহিস সালাম জিজ্ঞাসা করলেন: জান্নাতীদের সর্বোচ্চ অবস্থান কেমন হবে? আল্লাহ বললেন: এরা তারা, যাদের মর্যাদাকে আমি রোপন করার ইচ্ছা করেছি, আর তার উপরে মোহর দ্বারা বদ্ধ করে দিয়েছি। সুতরাং, কোন চোখ তা দেখেনি, কোন কান তা শোনেনি, আর না তা কোন মানুষের অন্তরে উদিত হয়েছে।” তিনি বলেন, আল্লাহ তা‘আলার কিতাবে তার সত্যতার প্রমাণ হলো: "কেউ জানে না তাদের জন্য নয়নপ্রীতিকর কি লুকায়িত রাখা হয়েছে।" (আস-সাজদাহ: ১৭)। সহীহ মুসলিম: (১৮৯)
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “তোমাদের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের জান্নাতীকে বলা হবে যে, তুমি কামনা কর। সে কামনা করতে থাকবে এবং আরো কামনা করবে। আল্লাহ তাকে বলবেন, তোমার যা কমন করার তা কি করেছ? সে বলবে, জ্বী! আল্লাহ বলবেন, যা কামনা করেছ তা এবং এর অনুরূপ তোমাকে প্রদান করা হল।” মুসলিম: (১৮২)
আমরা জানি যে, জান্নাতের আটটি দরজা রয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি সাক্ষ্য দিল, ‘আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোন ইলাহ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই, আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্ল তাঁর বান্দা ও রাসূল, আর নিশ্চয়ই ঈসা আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর সেই কালিমা যা তিনি মারইয়ামকে পৌঁছিয়েছেন এবং তাঁর নিকট হতে একটি রূহ মাত্র, আর জান্নাত সত্য ও জাহান্নাম সত্য’, সে জান্নাতের আটটি দরজার যেকোনটি দিয়ে চাইবে আল্লাহ্ তাকে প্রবেশ করাবেন।” {সহীহ বুখারী (৩৪৩৫), মুসলিম (২৮)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নিয়ামতের ঘর জান্নাতের সংখ্যা একাধিক। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “আর যে তার রবের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।” [আর-রাহমান: ৪৬] তিনি আরো বলেন, “এ দুটি ছাড়া আরো দুটি জান্নাত রয়েছে।” [আর-রাহমান: ৬২] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “দু’টি জান্নাতের পাত্রসমূহ ও অন্যান্য জিনিসপত্র হবে রূপার তৈরি। আর দু’টি জান্নাতের পাত্রসমূহ ও অন্যান্য জিনিসপত্র হবে সোনার তৈরি। আদন নামক জান্নাতে জান্নাতীগণ ও তাদের মহান প্রভুকে দেখার মাঝে রবের চেহারার উপর বড়ত্বের চাদরের প্রতিবন্ধক ব্যতীত কিছুই থাকবে না।”
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, জান্নাতের নিয়ামতসমূহ চিরস্থায়ী, তা কখনো নিঃশেষ হবে না। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে জান্নাতে প্রবেশ করবে সে নিয়ামপ্রাপ্ত হবে, নিরাশ হবে না। তার কাপড় পুরানো হবে না এবং তার যৌবনও শেষ হবে না।”
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করবে যে, তোমাদের জন্য এখন চির সুস্থতা; তোমরা আর কখনো অসুস্থ হবে না। তোমাদের জন্য এখন অনন্ত জীবন; তোমরা আর কখনো মরবে না। তোমাদের জন্য এখন চির যৌবন; তোমরা আর কখনো বৃদ্ধ হবে না। তোমাদের জন্য এখন চির সুখ ও পরমানন্দ; তোমরা আর কখনো দুঃখ-কষ্ট পাবে না। এ অর্থেই আল্লাহর এ বাণী: “আর তাদেরকে সম্বোধন করে বলা হবে, "তোমরা যা করতে তারই জন্য তোমাদেরকে এ জান্নাতের ওয়ারিস করা হয়েছে।” [আল-আ’রাফ: ৪৩]
আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নাম এবং তাতে যেসব শাস্তি ও প্রতিশোধ রয়েছে তা সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আমি যালেমদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি আগুন, যার বেষ্টনী তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রেখেছে। তারা পানীয় চাইলে তাদেরকে দেয়া হবে গলিত ধাতুর ন্যায় পানীয় যা তাদের মুখমণ্ডল দগ্ধ করবে; এটা নিকৃষ্ট পানীয়! আর জাহান্নাম কত নিকৃষ্ট বিশ্রামস্থল।” [আল-কাহাফ: ২৯] তিনি আরো বলেন, “যা দ্বারা তাদের পেটে যা আছে তা এবং তাদের চামড়া বিগলিত করা হবে।* এবং তাদের জন্য থাকবে লোহার হাতুড়ি।” [আল-হাজ্জ: ২০, ২১] আল্লাহ আরো বলেন, “নিশ্চয় যারা আমার আয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে অবশ্যই তাদেরকে আমি আগুনে পোড়াব; যখনই তাদের চামড়া পুড়ে পাকা দগ্ধ হবে তখনই তার স্থলে নতুন চামড়া বদলে দেব, যাতে তারা শাস্তি ভোগ করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আন-নিসা: ৫৬]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, জাহান্নামেরও বিভিন্ন স্তর রয়েছে। আর আল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “মুনাফিকরা তো জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে থাকবে এবং তাদের জন্য আপনি কোন সহায় পাবেন না।” [আন-নিসা: ১৪৫] আল-কুরআনুল কারীমে এসেছে যে, জাহান্নামের সাতটি দরজা রয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন, “সেটার সাতটি দরজা আছে, প্রত্যেক দরজা দিয়ে প্রবেশ করার জন্য (শয়তানের অনুসারীদের) নির্দিষ্ট অংশ রয়েছে।” [আল-হিজর: ৪৪], জাহান্নাম হলো স্থায়ী শাস্তির ঘর। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে ও যুলুম করেছে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে কোন পথও দেখাবেন না,* জাহান্নামের পথ ছাড়া; সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে এবং এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।” [আন-নিসা: ১৬৮, ১৬৯]
পর্ব: তাকদীরের প্রতি ঈমান
পর্বটির সারাংশ
আমরা তাকদীর ও ভাগ্যে বিশ্বাস করি এবং নিশ্চিতভাবে জানি যে, তাকদীর ও ভাগ্যে বিশ্বাস করা ঈমানের ছয়টি স্তম্ভের একটি। তাকদীরের প্রতি ঈমান মূলত আল্লাহর প্রতি ঈমান। কারণ, তাকদীর হলো আল্লাহর ইলম, পরিকল্পনা, পরিচালনা, ইচ্ছা ও সৃষ্টির নাম।
সকল মুসলিম একমত যে, ঈমানের রোকনসমূহের একটি হলো তাকদীরের প্রতি ঈমান।
আমরা জানি যে, তাকদীর ও ভাগ্যে বিশ্বাস করা আল্লাহর সর্বব্যাপী ও পরিপূর্ণ জ্ঞানের প্রতি ঈমান রাখাকে অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে জ্ঞাত, এবং তাঁর জ্ঞান বৃহৎ ও মহৎ বিষয় থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয় পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। এমন কিছুই নেই, যা বর্তমানে বিদ্যমান, ভবিষ্যতে বিদ্যমান হবে, বা এখনও সৃষ্টি হয়নি, যা "লওহে মাহফুজ"-এ লিপিবদ্ধ নয়। এতে সবকিছু লিখিত রয়েছে—তার সংখ্যা, পরিমাণ, সৃষ্টির নির্ধারিত সময় এবং ধ্বংস হওয়ার অবস্থা পর্যন্ত।
নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাআলা জানেন যা অতীতে ঘটেছে, ভবিষ্যতে যা ঘটবে, এবং যা ঘটেনি কিন্তু ঘটলে কেমন হবে। আল্লাহ তা‘আলা আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর আগে সকল মাখলূকের তাকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন, তখন তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ যা কিছু হবে তা সব লাওহে মাহফুজে লিপিবদ্ধ করেছেন।
আমরা আরো ঈমািন আনয়ন করি যে, আল্লাহ যা চান তা লিখেন এবং যা চান তা মুছে ফেলেন ও সাব্যস্ত করেন। আর তাঁর কাছেই রয়েছে উম্মুল কিতাব (লাওহে মাহফূজ)।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহর তাকদীর ছাড়া কোনো কিছু হয় না এবং তা ছাড়া কোনো কিছু প্রতিহত করাও যায় না। তিনি যা নির্ধারণ করেছেন তা অবশ্যই ঘটবে আর তিনি যা ফিরিয়ে রেখেছেন কেউ তা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। কাজেই আল্লাহ যা লিখেননি পুরো মাখলূক তা করতে সক্ষম নয় এবং আল্লাহু সুবহানাহু যা লিখেছেন কেউ তা প্রতিহতকারী নয়। অতএব বান্দাকে যা স্পর্শ করেনি তা কখনো তাকে স্পর্শকারী ছিল না এবং যা তাকে স্পর্শ করেছে তা কখনো এড়িয়ে যাবার ছিল না।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ যা চেয়েছেন তা হয়েছে এবং তিনি যা চাননি তা হয়নি। তাঁর চাওয়া পরিপূর্ণ এবং তাঁর কুদরত কার্যকর। তিনি যা চান তা ছাড়া কিছুই তাঁর রাজত্বে সংঘটিত হয় না। আমরা আরো ঈমান আনয়ন করি যে, বান্দাদের বাস্তবিকপক্ষে ইচ্ছে রয়েছে এবং তাদের ইচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছার অনুগামী।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা যাকে ইচ্ছে নিজ অনুগ্রহে হিদায়াত দান করেন এবং যাকে ইচ্ছে নিজ ইনসাফে অপদস্ত করেন। তিনি স্বীয় কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন না, তবে অন্যরা জিজ্ঞাসিত হবে। প্রত্যেক আনুগত্যকারীর আনুগত্য আল্লাহর তাওফিকে সম্পন্ন হয় এবং প্রত্যেক পাপীর পাপ পূর্ব থেকে আল্লাহ কর্তৃক লাঞ্ছিত হওয়ার কারণে সংঘটিত হয়। পূর্বে যার ভাগ্যবান হওয়া লিপিবদ্ধ হয়েছে সেই ভাগ্যবান এবং পূর্বে যার হতভাগা হওয়া লিপিবদ্ধ হয়েছে সেই হতভাগা। বান্দাদের ভালো ও মন্দ কর্ম তাদের নিজেরই কর্ম, তবে তাদের স্রষ্টার সৃষ্টি।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ আনুগত্য ও আনুগত্যকারীদের পছন্দ করেন। আমরা আরো ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ অবাধ্যতা ও অবাধ্যদের অপছন্দ করেন। আল্লাহ যখন কোনো বান্দার কল্যাণের ইচ্ছে করেন, তিনি তাকে তাঁর পছন্দ, আনুগত্য এবং তিনি যার ফলে তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন তা সম্পাদনের তাওফিক দান করেন। আর তিনি যার সাথে অন্য কিছুর ইচ্ছে করেন, তার ওপর তিনি হুজ্জত (প্রমাণ) পূর্ণ করেন। তারপর অন্যায়বিহীন ভাবে তাকে শাস্তি প্রদান করেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ অশ্লীলতার নির্দেশ দেন না এবং তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ প্রত্যেক জিনিসের স্রষ্টা এবং আল্লাহ বান্দাদেরকে ও তাদের কর্মসমূহকে সৃষ্টি করেছেন। কেউ তাঁর সৃষ্টিতে অংশী নয়, যেমন কেউ তাঁর রাজত্বে অংশী নয়। আল্লাহ তাঁর মাখলূকের ওপর দলিল পেশ করেছেন যে, তিনি একাই স্রষ্টা। কাজেই যিনি একাই সৃষ্টিকারী তাঁর সৃষ্টিতে কারো অংশী হওয়ার দাবি করার সুযোগ নেই।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, শরীয়ত, নির্দেশ ও সৃষ্টির মাঝে কোনো বৈপরীত্ব নেই। আল্লাহ তা‘আলার জন্য সকল সৃষ্টি এবং নির্দেশও তাঁরই। যেমন তিনি যা চান তাই করেন আর তিনি যা করেন সে ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন না। কাজেই তিনি নির্দেশ করেন। কেউ তাঁর ফয়সালা প্রত্যাখ্যানকারী নেই এবং কেউ তাঁর নির্দেশ রদকারী নেই।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই সকল মাখলূকের তাকদীর নির্ধারণ করেছেন। তবুও তিনি তাঁর এবং তাঁর রাসূল ও নবীগণের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি তাঁর এবং তাঁর রাসূল ও নবীগণের অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করেছেন। এভাবে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবে তাঁর তাকদীর সম্পর্কে সংবাদ এবং তাঁর অহী ও নির্দেশ মানার আদেশ একসঙ্গে জমা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, হিদায়াতের অনুসরণ করা ফরজ এবং তিনি যাকে ইচ্ছা তাঁর অনুগ্রহে সৎপথে পরিচালিত করেন এবং যাকে ইচ্ছা তাঁর ইনসাফের ভিত্তিতে পথভ্রষ্ট করেন। তিনি তাঁর ব্যাপক ইচ্ছে, বিরোধীদের তাঁর ধমক প্রদান এবং মুমিন বান্দাদের প্রতি তাঁর ইবাদত করার নির্দেশ ও তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করার আদেশের সংবাদগুলোকে জমা করেছেন। তাকদীরের প্রতি ঈমান আনা ও শরীয়ত অনুযায়ী আমল করার মাঝে সমন্বয় করা সম্ভব ও সাধ্যের বিষয়। মহান মাওলা স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি কোনো নফসের ওপর তার সাধ্যের বাইরে কিছু চাপিয়ে দেন না।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, যেমনভাবে সৃষ্টি করা, আদেশ করা ও শরীয়তের মাঝে কোনো বৈপরীত্ব নেই, তেমনভাবে শরীয়ত, আদেশ ও বিবেকের মাঝেও কোনো বৈপরীত্ব নেই। কাজেই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব জিনিসের আদেশ করেছেন, অথবা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা থেকে নিষেধ করেছন, অথবা আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, অথবা তিনি যা সংবাদ দিয়েছেন, তা কখনো বিবেক বিরোধী নয়, বরং তা বিবেকের দাবির অন্তর্ভুক্ত এবং এটাই চুড়ান্ত প্রজ্ঞা।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা মাখলূকের ওপর প্রমাণ পূর্ণ করার জন্য কিতাব নাযিল করেছেন এবং রাসূলদের প্রেরণ করেছেন। আর শরীয়ত, আদেশ ও তাকদীর পরস্পর সম্পূরক, একটি অপরটিকে পূর্ণ করে। এটিই চূড়ান্ত পর্যায়ের সুন্দর (পরিকল্পনা), বরং তার চেয়ে সুন্দর কিছু নেই।
আল্লাহ তা‘আলার যে কিতাব শরীয়ত ও আদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে তিনি তাকে আহসানুল হাদীস (সর্বোত্তম কথা) বলে বিশেষিত করেছেন এবং এর প্রশংসা করেছেন। কাজেই আল্লাহ যা বিধান দিয়েছেন অথবা তিনি যা নির্ধারণ করেছেন, তা-ই চূড়ান্ত পর্যায়ের পরিপূর্ণ ও সুন্দর; বিবেকসমূহ তা বুঝতে সক্ষম হোক অথবা তা অনুধাবন ও বুঝতে অক্ষম হোক। আমরা কখনো আমাদের বিবেক ও মতামতকে আল্লাহর শরীয়ত ও তাকদীরের ওপর মীমাংসক নির্ধারক করব না; কখনো ভালো বলে আবার কখনো খারাপ বলে। বরং আল্লাহ যা কিছুই শরীয়তরূপে সাব্যস্ত করেছেন ও তাকদীর নির্ধারণ করেছেন, তা চূড়ান্ত পর্যায়ের সুন্দর ও পরিপূর্ণ।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, শরীয়ত ও তাকদীর পুরোটাই কল্যাণকর। আল্লাহ কখনো নিরেট অকল্যাণকে নির্ধারণ করেন না, তবে তাঁর ব্যাপক নির্ধারিত বস্তুর আওতায় অকল্যাণ অনুপ্রবেশ করে। যার থেকে অকল্যাণ প্রকাশ পায় কুরআন তার সাথে অকল্যাণকে সম্পৃক্ত করে, তবে আদব রক্ষার্থে আল্লাহর সাথে অকল্যাণকে সম্পৃক্ত করা হয় না।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, উপকরণ গ্রহণ করা তাকদীরের প্রতি ঈমানের বিপরীত নয়, বরং উপকরণ গ্রহণ করাই হলো তাকদীর ও ভাগ্যের প্রতি ঈমানের পূর্ণতার রূপ। আমাদের রব উপকরণ গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সবচেয়ে বড় উপকরণ হলো দোয়া। তিনি আমাদেরকে দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন, আর দোয়া তাকদীরের ওপর বিজয়ী হয়।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা ইনসাফের নির্দেশ করেন এবং ইনসাফের ভিত্তিতে শরীয়ত, তাকদীর ও প্রতিদানের ফয়সালা করেন। তিনি নিজের থেকে জুলমকে না করেছেন এবং পরিপূর্ণ ইনসাফকে সাব্যস্ত করেছেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, পূর্ব থেকে তাকদীর নির্ধারণ থাকা জুলমকে অপরিহার্য করে না; কারণ আল্লাহ কিতাব নাযিল করেছেন ও রাসূলদের প্রেরণ করেছেন, যেন রাসূলদের পর আল্লাহর ওপর মানুষের জন্য কোনো প্রমাণ বাকি না থাকে। তিনি তাকদীরকে গোপন রহস্য বানিয়েছেন। আর বান্দাদের জন্য ইচ্ছে ও স্বাধিনতা তৈরি করেছেন। কাজেই যে হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে, সে নিজের জন্যই হিদায়াতপ্রাপ্ত হবে, আর যে গোমরাহ হবে, এর দায়ভার তার ওপরই।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, পাপ করা অথবা ইবাদত ত্যাগ করার ওপর তাকদীরকে দলিল হিসেবে পেশ করা বৈধ নয়। কারণ, যেসব মুশরিকরা তাদের শিরকে পতিত হওয়ার ওপর তাকদীরকে দলিল হিসেবে পেশ করেছে, আল্লাহ তাদেরকে মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত করেছেন এবং তাদেরকে তাঁর শাস্তি আস্বাদন করিয়েছেন। যদি তাদের শিরকের ওপর তাকদীর দলিল হত, তাহলে কখনো আল্লাহ তাদেরকে তাঁর শাস্তি আস্বাদন করাতেন না।
আমরা এও বিশ্বাস করি যে, বান্দা তাওবা করার পর পাপের বিষয়ে তাকদীরকে দলিল হিসেবে পেশ করতে পারে। আর মুসিবতের ওপরও তাকদীরকে দলিল হিসেবে পেশ করতে পারে।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, মুসিবতের সময় মুমিন যখন বিষয়টিকে আল্লাহর ওপর সোপর্দ করে এবং ইন্নালিল্লাহ পড়ে, তখন তার জন্য তিনটি কল্যাণ লিপিবদ্ধ করা হয়: আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাত, রহমত ও হিদায়াতের রাস্তা সুগম হওয়া।
অধ্যায়: তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ওয়াজিব।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, যা হয়েছে এবং যা হবে সবকিছু আল্লাহ জানেন এবং সবকিছু তিনি লিখেছেন, চেয়েছেন, সৃষ্টি করেছেন ও তা সুন্দরভাবে নির্ধারণ করেছেন।
আমরা নিশ্চিতভাবে জানি যে, তাকদির ও ভাগ্যে বিশ্বাস করা ঈমানের ছয়টি রূকনের একটি। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আমি প্রত্যেকটি বস্তু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।” [আল-কামার: ৪৯] তিনি আরো বলেন, “আর আল্লাহর ফয়সালা সুনির্ধারিত, অবশ্যম্ভাবী।” [আল-আহযাব: ৩৮] তিনি আরো বলেন, ”তিনি সব কিছু সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তা নিপুণভাবে নিরূপণ করেছেন।” [আল-ফুরকান : ২] মহা সম্মানীত আল্লাহ আরো বলেন, “রাসূল তার নিকট তার রবের পক্ষ থেকে নাযিলকৃত বিষয়ের প্রতি ঈমান এনেছে, আর মুমিনগণও। প্রত্যেকে ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর মালায়েকা ও তাঁর কিতাবসমূহের উপর।” [আল-বাকারাহ: ২৮৫] অতএব, তাকদীরের প্রতি ঈমান আল্লাহর প্রতি ঈমানেরই অংশ। কারণ, তাকদীর হলো আল্লাহ ইলম, পরিকল্পনা-নির্ধারণ ও তাঁর পরিচালনার অংশ।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “তিনিই জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান এবং যখন তিনি কিছু করা স্থির করেন তখন তিনি তার জন্য বলেন 'হও', ফলে তা হয়ে যায়।” [গাফির: ৬৮] তিনি আরো বলেন, “আর গায়েবের চাবি তাঁরই কাছে রয়েছে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। স্থল ও সমুদ্রে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অংকুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই “ [আল-আনআম: ৫৯]
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীসে জিবরীল-এর অংশ হলো: জিবরীল বললেন, আমাকে ঈমান সম্পর্কে সংবাদ দিন, তিনি বললেন, “তুমি আল্লাহর প্রতি, তাঁর মালায়েকা, কিতাবসমূহ, রাসূলগণ, আখেরাত দিবস ও তাকদীরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান আনবে।” তিনি বললেন, আপনি সত্যই বলেছেন। {মুসলিম (৮), আবূ দাউদ (৪৬৯৫), তিরমিযী (২৬১০), নাসাঈ (৪৯৯০), ইবনু মাজাহ (৬৩)}
মুসলিমগণ একমত যে, ঈমানের রোকনসমূহ থেকে তাকদীরের প্রতি ঈমান হলো একটি রোকন। হাফিয আবূল কাসিম আল-লালেকায়ী বলেন, “দুনিয়াতে যদি বিনা বাঁধায় কোনো ঐকমত্য থাকে, তাহলে তা এই মাসআলায় (আর্থাৎ তাকদীরের মাসআলা) রয়েছে। এই মাসআলায় যার কথা বিপরীত হবে সে হলো একগুঁয়ে ও মুসলিম ঐক্যে ফাটল সৃষ্টিকারী। তাকে শাস্তি স্পর্শ করবে এবং আল্লাহর নিম্নের বাণীর অন্তর্ভুক্ত: {وَمَن يُشَاقِقِ الرَّسُولَ مِن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُ الْهُدَى وَيَتَّبِعْ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ نُوَلِّهِ مَا تَوَلَّى وَنُصْلِهِ جَهَنَّمَ وَسَاءتْ مَصِيرًا} অর্থ: “আর কারো নিকট সৎপথ প্রকাশ হওয়ার পর সে যদি রাসূলের বিরুদ্ধাচরণ করে এবং মুমিনদের পথ ছাড়া অন্য পথ অনুসরণ করে, তবে যেদিকে সে ফিরে যায় সে দিকেই তাকে আমরা ফিরিয়ে দেব এবং তাকে জাহান্নামে দগ্ধ করাব, আর তা কতই না মন্দ আবাস।” [আন-নিসা: ১১৫]” শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ: (৪/৭২৬)
আমর ইবনু শুআইব সূত্রে তিনি তার বাবা থেকে এবং তিনি তার দাদা থেকে বর্ণিত: “কিছু লোক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরজায় বসেছিলো। তখন তাদের কেউ বলল: আল্লাহ কি এরূপ ও এরূপ বলেননি? অন্য কেউ বলল: আল্লাহ কি এরূপ ও এরূপ বলেননি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা শুনলেন এবং বের হয়ে আসলেন, যেন ডালিমের দানা তাঁর মুখমন্ডলে ছিটিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি বললেন: “তোমাদের কি এ কাজের নির্দেশ দেয়া হয়েছে অথবা এর জন্য কি তোমাদের প্রেরণ করা হয়েছে? তোমরা কুরআনের কিছু অংশকে অন্য অংশের বিরুদ্ধে পেশ করছো। এ কারণেই তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতগণ ধ্বংস হয়েছে। তোমরা এর কোনোটির ব্যাপারে আদিষ্ট না। তোমাদেরকে যা নির্দেশ দেওয়া হয়েছে তার দিকে তাকাও এবং তার ওপর আমল করো। আর তোমাদেরকে যা থেকে নিষেধ করা হয়েছে তা থেকে বিরত থাকো।” {ইবনু মাজাহ (৮৫), আহমাদ (৬৮৪৫), হাদিসের শব্দ মুসনাদে আহমাদ থেকে গৃহীত, ইবনু আবূ আসিম, আস-সুন্নাহ (৪০৬)}
আব্দুল মালিক—ইবনু জুরাইজ—সূত্রে আতা ইবনু আবি রাবাহ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি ইবনু আব্বাসের নিকট আসলাম। তখন তিনি যমযম থেকে পানি তুলছিলেন আর তার কাপড়ের নিচের অংশ ভিজে গিয়েছিল। আমি তাকে বললাম: তাকদীর বিষয়ে (নেতিবাচক) কথাবার্তা বলা হয়েছে! তিনি বললেন, তারা কি তা করেছে? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম এই আয়াত কেবল তাদের ব্যাপারেই নাযিল হয়েছে: {ذُوقُوا مَسَّ سَقَر * إِنَّا كُلَّ شَيْءٍ خَلَقْنَاهُ بِقَدَر} অর্থ “‘জাহান্নামের যন্ত্রণা আস্বাদন কর।* নিশ্চয় আমি প্রত্যেক কিছু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।” [আল-কামার: ৪৮,৪৯] তাদের রোগীদের দেখতে যাবে না, তাদের মৃতদের জানাযা পড়বে না। আর যদি তুমি তাদের কাউকে আমাকে দেখাও, তাহলে আমি তার চোখ ছিদ্র করে দেব।” শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ: (৩/৫৯৭)
উবাদাহ ইবনু সামিত রাদিয়াল্লাহু আনহু তার ছেলেকে বললেন, হে আমার পুত্র! তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত প্রকৃত ঈমানের স্বাদ পাবে না যতক্ষণ না তুমি জানতে পারবে “’যা তোমার উপর ঘটেছে তা ভুলেও এড়িয়ে যাওয়ার ছিলো না। পক্ষান্তরে, যা এড়িয়ে গেছে তা তোমার উপর ভুলেও ঘটবার ছিলো না। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি: “মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম যে বস্তু সৃষ্টি করেছেন তা হচ্ছে কলম। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, লিখো! কলম বললো, হে রব! কি লিখবো? তিনি বললেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর লিখো।” হে আমার পুত্র! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি: “যে ব্যক্তি এরূপ বিশ্বাস ছাড়া মারা যায় সে আমার (উম্মাতের) নয়।” {আবূ দাউদ (৪৭০০), ইবনু আবূ আসিম, আস-সুন্নাহ (১/৫১)}
ইয়াহইয়া ইবনু ইয়া’মার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, বসরার অধিবাসী মা’বাদ জুহাইনা প্রথম ব্যক্তি যে তাকদীর অস্বীকার করেছে। আমি ও হুমায়দ ইবনু ’আবদুর রহমান উভয়ে হজ্জ -অথবা উমরাহ-র উদ্দেশে রওয়ানা করলাম। আমরা বললাম, যদি আমরা এ সফরে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কোন সাহাবার সাক্ষাৎ পেয়ে যাই তাহলে ঐসব লোক তাকদীর সম্বন্ধে যা কিছু বলে সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করব। সৌভাগ্যক্রমে আমরা আবদুল্লাহ ইবনু উমর ইবনুল খাত্তাবকে মসজিদে ঢুকার পথে পেয়ে গেলাম। আমি ও আমার সাথী তাকে এমনভাবে ঘিরে নিলাম যে, আমাদের একজন তার ডান এবং অপরজন তার বামে থাকলাম। আমি মনে করলাম আমার সাথী আমাকেই কথা বলার সুযোগ দেবে। আমি বললাম: "হে আবূ আবদুর রহমান! আমাদের এলাকায় এমন কিছু লোকের আবির্ভাব ঘটেছে, তারা কুরআন পাঠ করে এবং জ্ঞান অন্বেষণও করে। ইয়াহইয়া তাদের বিষয়ে কিছু কথা উল্লেখ করে বললেন: তাদের ধারণা হচ্ছে, তাকদীর বলতে কিছু নেই এবং প্রত্যেক কাজ হঠাৎ সংঘটিত হয়।" ইবনু উমর বললেন: “যখন তুমি এদের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, তাদের সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই, আর আমার সাথেও তাদের কোন সম্পর্ক নেই। আবদুল্লাহ ইবনু উমার আল্লাহর নামে শপথ করে বললেন, এদের কারো কাছে যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণ থাকে এবং তা দান-খয়রাত করে দেয় তবে আল্লাহ তার এ দান গ্রহণ করবেন না যতক্ষণ পর্যন্ত সে তাকদীরের উপর ঈমান না আনবে...”। {ইমাম মুসলিম তার সহীহ গ্রন্থের ভূমিকাতে এটা উল্লেখ করেছেন (৮), আল-আজুররি, আশ-শারিয়াহ (২/৮৫১)}
আবূ হারুন আল-উবুল্লী থেকে বর্ণিত—তিনি সাহল ইবনু আব্দুল্লাহর সাথী/ছাত্র ছিলেন—, তিনি ছিলেন ভালো লোক। তিনি আমাদেরকে জামে মসজিদে কুরআন শিক্ষা দিতেন। তিনি বলেন, “সাহল ইবনু আব্দুল্লাহকে তাকদীর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেন, তাকদীরের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ফরয, তা অস্বীকার করা কুফরী, তাতে (নেতিবাচক) কথা বলা বিদআত এবং তার থেকে চুপ থাকা সুন্নাত।” {শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ: (৪/৭৮৬)}
হাসান বাসরী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “কলম শুকিয়ে গেছে আর ফয়সালাও হয়ে গেছে। কিতাবের সাক্ষী ও রাসূলদের সত্যারোপ দ্বারা তাকদীর সম্পন্ন হয়ে গেছে। কাজেই যে আমল করল ও তাকওয়া অবলম্বন করল তার জন্য সৌভাগ্য, আর যে জুলম করল ও সীমালঙ্ঘন করল তার জন্য দুর্ভাগ্য। মুমিনদের জন্য আল্লাহর বন্ধুত্ব ও মুশরিকদের জন্য আল্লাহর বিচ্ছেদ।” আল-আজুররি, আশ-শারিয়াহ (২/৮৮১)
ইবনু বাত্তাহ আল-আকবারী বলেন, “অতঃপর, তাকদীরের ভালো ও মন্দ, মিষ্টতা ও তিক্ততা, কম ও বেশী আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। তা বান্দার ওপর অবশ্যই আপতিত হবে, তিনি যখন চান তা আপতিত হবে, আগ-পিছ হবে না- তাঁর পূর্ব ইলম মোতাবেক। বান্দাকে যা স্পর্শ করেছে কখনো তা এড়িয়ে যেতো না, আর যা তাকে এড়িয়ে গেছে কখনো তা তাকে স্পর্শ করত না। যা আগে হয়েছে কখনো তা পরে হত না, আর যা পরে হয়েছে কখনো তা আগে হত না...। কাজেই এর প্রতি ঈমান আনয়ন বরা আবশ্যক এবং এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার ওপর ফরয। কাজেই যে এর বিরোধিতা করল, অথবা তা থেকে বেড়িয়ে গেলো, অথবা তাতে ছিদ্রান্বেষণ করল এবং আল্লাহর তাকদীর সাব্যস্ত করল না এবং তাকদীর ও ইচ্ছাকে তাঁর সাথে সম্পৃক্ত করল না সে-ই তো প্রথম নাস্তিক।” ইবনু বাত্তাহ, আশ-শারহু ওয়াল-ইবানাহ ‘আলা উসূলিস সুন্নাহ ওয়াদ দিয়ানাহ (২১৩-২১৬)
অধ্যায়: তাকদীরের প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্ত বিষয়সমূহ।
আমরা বিশ্বাস করি যে, তাকদীরে ঈমান রাখা মানে আল্লাহর পরিপূর্ণ ও সর্বব্যাপী জ্ঞানের প্রতি ঈমান রাখা। তিনি আসমান ও যমীনের সমস্ত বিষয় সম্পর্কে অবগত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আপনি কি জানেন না যে, আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ্ তা জানেন। এসবই তো আছে এক কিতাবে; নিশ্চয় তা আল্লাহর নিকট অতি সহজ।” [আল-হজ্জ: ৭০] আর আল্লাহ তআলা প্রত্যেক বস্তুকে তাঁর জ্ঞান দ্বারা বেষ্টন করে নিয়েছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “তিনি আল্লাহ্, যিনি সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং অনুরূপ যমীন, তাদের মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ; যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান এবং জ্ঞানে আল্লাহ্ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।” [আত-তালাক : ১২]
এবং তাঁর জ্ঞান মহৎ ও বড় বিষয় থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও তুচ্ছ বিষয় পর্যন্ত সবকিছুকে বেষ্টনকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর গায়েবের চাবি তাঁরই কাছে রয়েছে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। স্থল ও সমুদ্রে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অংকুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।” [আল-আনআম : ৫৯] ইবনু জারির রহিমাহুল্লাহ এই আয়াতের তাফসীরে বলেন, “অধিকন্তু যা কিছু মওজুদ রয়েছে অথবা যা এখনো মওজুদ নেই, তবে অতি শীঘ্র তা মওজুদ হবে, তার সবকিছু লাওহে মাহফূজে সাব্যস্ত রয়েছে। তাতে তার সংখ্যা, তার চূড়ান্ত পর্যায় এবং যখন তা পাওয়া যাবে ও যখন তা ধ্বংস হবে তা সবকিছু লেখা রয়েছে। আর তার বাণী: {مُّبِين} দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তাতে যা কিছু রয়েছে, যা লেখা হয়েছে, যেভাবে লেখা হয়েছে তা যথাযথ থাকার বর্ণনা দিবে।” তাফসীরুত তাবারী (১১/৪০৩)
আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তিনি জানেন যা যমীনে প্রবেশ করে এবং যা তা থেকে নিৰ্গত হয়, আর যা আসমান থেকে নাযিল হয় এবং যা কিছু তাতে উত্থিত হয়। আর তিনি পরম দয়ালু, অতিশয় ক্ষমাশীল।* আর কাফিররা বলে, 'আমাদের কাছে কিয়ামত আসবে না।' বলুন, অবশ্যই হ্যাঁ, শপথ আমার রবের, নিশ্চয় তোমাদের কাছে তা আসবে।’ তিনি গায়েব সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত; আসমানসমূহ ও যমীনে তাঁর অগোচরে নয় অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তার চেয়ে ছোট বা বড় কিছু; এর প্রত্যেকটিই আছে সুস্পষ্ট কিতাবে।” [সাবা: ২-৩]
’ইমরান ইবনু হুসাইন রদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে ছিলাম। এমন সময় তার কাছে বনূ তামীম গোত্রের একদল লোক আসল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে বনূ তামীম! তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর। উত্তরে তারা বলল, আপনি আমাদেরকে শুভ সংবাদ যখন দিচ্ছেন, তাহলে কিছু দান করুন। এ সময় ইয়ামানবাসী কতিপয় লোক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সেখানে উপস্থিত হল। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে বললেন, হে ইয়ামানবাসী! তোমাদের জন্য সুসংবাদ, বনূ তামীম তা গ্রহণ করল না। তারা বলল, আমরা গ্রহণ করলাম শুভ সংবাদ। আমরা আপনার কাছে এসেছি দ্বীনি জ্ঞান লাভের উদ্দেশ্যে এবং জিজ্ঞেস করার জন্য এসেছি যে, এ দুনিয়া সৃষ্টির আগে কী ছিল? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহ্ তখন ছিলেন, তাঁর আগে আর কিছুই ছিল না। তাঁর আরশ তখন পানির ওপর ছিল। অতঃপর তিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করলেন এবং লাওহে মাহফুযে সব বস্তু লিখে রাখলেন।” রাবী বলেন, এরপর আমার কাছে এক লোক এসে বলল, হে ’ইমরান! তোমার উটনী পালিয়ে গিয়েছে, তার খবর লও। আমি উটনীর খোঁজে চললাম। দেখলাম, উটনী মরীচিকার আড়ালে আছে। আমি আল্লাহর কসম করে বলছি! আমার মন চাচ্ছিল উটনী চলে যায় যাক তবুও আমি মজলিস ছেড়ে যেন না উঠি।” {বুখারী (৭৪১৮), তরিমিযী (৩৯৫১)}
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা জানেন যা হয়েছে, যা হবে এবং যা হলে কিভাবে হবে, তার সবকিছু। আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, যদি তারা মুমিনদের সাথে বের হতো, তাহলে তারা তাদের বিপর্যয়ই বৃদ্ধি করত, অথচ তারা তখনও তাদের সাথে বের হয়নি-: “যদি তারা তোমাদের সাথে বের হত, তবে তোমাদের ফাসাদই বৃদ্ধি করত এবং ফিৎনা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তোমাদের মধ্যে ছুটোছুটি করত। আর তোমাদের মধ্যে তাদের জন্য কথা শুনার লোক রয়েছে। আর আল্লাহ্ যালিমদের সম্বন্ধে সবিশেষ অবগত।” [আত-তাওবাহ: ৪৭]
আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামীদের সম্পর্কে বলেছেন: “আপনি যদি দেখতে পেতেন যখন তাদেরকে আগুনের উপর দাঁড় করানো হবে তখন তারা বলবে, ‘হায়! যদি আমাদেরকে ফেরত পাঠানো হত, আর আমারা আমাদের রবের আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ না করতাম এবং আমারা মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।’ বরং আগে তারা যা গোপন করত তা এখন তাদের কাছে প্রকাশ হয়ে গিয়েছে। আর তাদের আবার (দুনিয়ায়) ফেরৎ পাঠানো হলেও তাদেরকে যা করতে নিষেধ করা হয়েছিল আবার তারা তাই করত এবং নিশ্চয়ই তারা মিথ্যাবাদী “ [আল-আনআম: ২৭,২৮] এভাবে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, যদি তাদেরকে দুনিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়, তাহলে তারা কুফরীতেই ফিরে যাবে। অথচ তাদেরকে তখনো আগুনে পেশ করা হয়নি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর কাফিররা বলে, 'আমাদের কাছে কিয়ামত আসবে না।' বলুন, অবশ্যই হ্যাঁ, শপথ আমার রবের, নিশ্চয় তোমাদের কাছে তা আসবে।’ তিনি গায়েব সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত; আসমানসমূহ ও যমীনে তাঁর অগোচরে নয় অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তার চেয়ে ছোট বা বড় কিছু; এর প্রত্যেকটিই আছে সুস্পষ্ট কিতাবে।” [সাবা: ৩]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, যা কিছু অস্তিত্বশীল তা সবকিছু আল্লাহ লাওহে মাহফুজে লিখে রেখেছেন। তিনি বলেন, “তিনি গায়েব সম্পর্কে সম্যক পরিজ্ঞাত; আসমানসমূহ ও যমীনে তাঁর অগোচরে নয় অণু পরিমাণ কিছু কিংবা তার চেয়ে ছোট বা বড় কিছু; এর প্রত্যেকটিই আছে সুস্পষ্ট কিতাবে।” [ইউনুস: ৬১] তিনি আরো বলেন, “আপনি কি জানেন না যে, আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে আল্লাহ্ তা জানেন। এসবই তো আছে এক কিতাবে; নিশ্চয় তা আল্লাহর নিকট অতি সহজ।” [আল-হজ্জ: ৭০] তিনি আরো বলেন, “যমীনে বা ব্যক্তিগতভাবে তোমাদের উপর যে বিপর্যয়ই আসে তা সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই আমি তা কিতাবে লিপিবদ্ধ রেখেছি। নিশ্চয় আল্লাহর পক্ষে এটা খুব সহজ।” [আল-হাদীদ: ২২]
আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে আল্লাহ তা‘আলা মাখলুকের ভাগ্য লিপিবদ্ধ করেন। আর তাঁর আরশ ছিল পানির ওপর।” {মুসলিম: (২৬৫৩), তিরমিযী: (২১৫৬)}
তিনি আরো বলেছেন: “মহান আল্লাহ সর্বপ্রথম যে বস্তু সৃষ্টি করেছেন তা হচ্ছে কলম। অতঃপর তিনি তাকে বললেন, লিখো! কলম বললো, হে রব! কি লিখবো? তিনি বললেন, কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত প্রত্যেক বস্তুর তাকদীর লিখো।” {আবূ দাউদ (৪৭০০), তিরমিযী (২১৫৫,৩৩১৯), মুসনাদে তায়ালিসী (৫৭৮), আহমাদ (২২৭০৫, ২২৭০৭), ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (১১৫)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ্ যখন তাঁর মাখলূকাত সৃষ্টি করলেন, তাঁর কাছে একটি কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখলেন: আমার রহমত আমার গযবের উপর বিজয়ী হয়েছে -অথবা বলেছেন অগ্রগামী হয়েছে-’। এটি তাঁর কাছে আরশের ওপর আছে।” {বুখারী (৭৫৫৩), মুসলিম (২৭৫১), তিরমিযী (৩৫৪৩), ইবনু মাজাহ (১৮৯)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ যা চান তা লিখেন এবং যা চান তা মুছে ফেলেন ও সাব্যস্ত করেন। আর তাঁর কাছেই রয়েছে উম্মুল কিতাব (লাওহে মাহফূজ)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আল্লাহ্ যা ইচ্ছে তা মিটিয়ে দেন এবং যা ইচ্ছে তা প্রতিষ্ঠিত রাখেন এবং তাঁরই কাছে আছে উম্মুল কিতাব।” [আর-রা‘দ: ৩৯]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহর তাকদীর ছাড়া কোনো কিছু হয় না এবং আল্লাহর তাকদীর ছাড়া কোনো কিছু প্রতিহত করাও যায় না। তিনি যা নির্ধারণ করেছেন তা অবশ্যই ঘটবে আর তিনি যা প্রতিহত করেছেন কেউ তা বাস্তবায়ন করতে পারবে না। কাজেই আল্লাহ যা লিখেননি পুরো মাখলূক তা করতে সক্ষম নয় এবং তিনি যা লিখেছেন কেউ তা প্রতিহতকারী নয়। অতএব বান্দাকে যা স্পর্শ করেনি তা কখনো তাকে স্পর্শকারী ছিল না এবং যা তাকে স্পর্শ করেছে তা কখনো তাকে এড়িয়ে যাওয়ার ছিল না। যেমন আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে ছিলাম। তিনি বললেন, “হে তরুণ! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিখিয়ে দিচ্ছি- তুমি আল্লাহ্ তা’আলার (বিধি-নিষেধের) রক্ষা করবে, আল্লাহ তা’আলা তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহ্ তা’আলার সন্তুষ্টির প্রতি লক্ষ্য রাখবে, আল্লাহ্ তা’আলাকে তুমি কাছে পাবে। তোমার কোন কিছু চাওয়ার প্রয়োজন হলে আল্লাহর নিকট চাও, আর সাহায্য প্রার্থনা করতে হলে আল্লাহর নিকটেই কর। আর জেনে রাখো, যদি সকল উন্মতও তোমার কোন উপকারের উদ্দেশ্যে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তা’আলা তোমার জন্যে লিখে রেখেছেন। অপরদিকে যদি সকলে তোমার কোনো ক্ষতি করতে ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে ততটুকু ক্ষতিই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ্ তা’আলা তোমার তাকদীরে লিখে রেখেছেন। কলম তুলে নেয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে।” {তিরমিযী (২৫১৬), ইবনু ওয়াহাব, আল-কাদার (২৮), আহমাদ (২৬৬৯), আবদ ইবনু হুমাইদ (৬৩৬)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ যা চেয়েছেন তা হয়েছে এবং তিনি যা চাননি তা হয়নি এবং তাঁর ইচ্ছে পরিপূর্ণ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর আপনার রব যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন এবং যা ইচ্ছে মনোনীত করেন, এতে ওদের কোন হাত নেই। আল্লাহ্ পবিত্র, মহান এবং তারা যা শরীক করে তা থেকে তিনি ঊর্ধ্বে।” [আল-কাসাস: ৬৮] তিনি আরো বলেন, “আর তোমরা ইচ্ছে করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ ইচ্ছে করেন “ [আত-তাকভীর : ২৯] তাঁর ক্ষমতা বাস্তবায়নশীল। তিনি বলেন, “আর আল্লাহ্ এমন নন যে, তাঁকে অক্ষম করতে পারে কোনো কিছু আসমানসমূহে আর না যমীনে। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাবান।” [ফাতির: ৪৪] তিনি আরো বলেন, “যদি আপনার রব ইচ্ছে করতেন তবে তারা এসব করত না; কাজেই আপনি তাদেরকে ও তাদের মিথ্যা রটনাকে পরিত্যাগ করুন।” [আল-আনআম : ১১২]
তিনি যা চান তা ছাড়া তাঁর রাজত্বে কিছুই সংঘটিত হয় না। আল্লাহ বলেনে, “আর আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে তাদের পরবর্তীরা তাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণাদি সমাগত হওয়ার পরও পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হত না; কিন্তু তারা মতভেদ করল। ফলে তাদের কেউ কেউ ঈমান আনল এবং কেউ কেউ কুফরী করল। আর আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে তারা পারস্পরিক যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত হত না; কিন্তু আল্লাহ্ যা ইচ্ছে তা করেন।” [আল-বাকারাহ: ২৫৩]
আমরা বিশ্বাস করি যে, বান্দাদের বাস্তবিক ইচ্ছে রয়েছে। আর তা আল্লাহর ইচ্ছার অনুগামী। সম্মানিত মাওলা বলেন, “আর তোমরা ইচ্ছে করতে সক্ষম হবে না যদি না আল্লাহ্ ইচ্ছে করেন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [আল-ইনসান: ৩০] তিনি আরো বলেন, “তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায়, তার জন্য।* আর তোমরা ইচ্ছে করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ ইচ্ছে করেন।” [আত-তাকভীর: ২৮-২৯] মহা সম্মানীত আল্লাহ আরো বলেন, “নিশ্চয় এটা এক উপদেশ, অতএব যে চায় সে তার রবের পথ অবলম্বন করুক !” [আল-ইনসান: ২৯] তিনি আরো বলেন, “এ দিনটি সত্য; অতএব যার ইচ্ছে সে তার রবের নিকট আশ্রয় গ্ৰহণ করুক।” [আন-নাবা: ৩৯]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ যাকে ইচ্ছে নিজ অনুগ্রহে হিদায়াত দান করেন এবং যাকে ইচ্ছে নিজ ইনসাফে গোমরাহ করেন। তিনি তাঁর কর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবেন না, তবে তারা জিজ্ঞাসিত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর যারা আমার আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করে, তারা বধির ও বোবা , অন্ধকারে রয়েছে। যাকে ইচ্ছে আল্লাহ্ বিপদগামী করেন এবং যাকে ইচ্ছে তিনি সরল পথে স্থাপন করেন।” [আল-আনআম: ৩৯] তিনি আরো বলেন, “সুতরাং আল্লাহ্ কাউকে সৎপথে পরিচালিত করতে চাইলে তিনি তার বক্ষ ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন এবং কাউকে বিপদ্গামী করতে চাইলে তিনি তার বক্ষ সংকীর্ণ করে দেন; (তার কাছে ইসলামের অনুসরণ) মনে হয় যেন সে কষ্ট করে আকাশে উঠেছে।” [আল-আনআম: ১২৫] মহান আল্লাহ আরো বলেন, “আর আমি ইচ্ছে করলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার হেদায়াত দিতাম; কিন্তু আমার পক্ষ থেকে এ কথা অবশ্যই সাব্যস্ত যে, আমি নিশ্চয় কতক জিন ও মানুষের সমন্বয়ে জাহান্নাম পূর্ণ করব।” [আস-সাজদাহ: ১৩]
আবূ বকর আল-মারওয়াযী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি আবূ আব্দুল্লাহ —অর্থাৎ আহমাদ ইবন হাম্বল-কে বলতে শুনেছি, তোমরা আব্দুর রহমান ইবনু মাহদীকে তাকদীর সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। তিনি তাদেরকে বললেন, ভালো ও মন্দ সবই তাকদীর দ্বারা সংঘটিত হয়।” ইবনু বাত্তাহ, আল-ইবানাহ আল-কুবরা (৪/২৬১)
আবূ বকর ইবনু আবি আসিম বলেন, “তুমি আমাকে জিজ্ঞেস করেছো সুন্নাত কী? সুন্নাত হলো আহকাম ও অন্যান্য অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্তকারী একটি ব্যাপক নাম। আর আহলুল ইলম যেসব বিষয়কে সুন্নাতের সাথে সম্পৃক্ত করতে একমত হয়েছেন, তন্মধ্যে হলো: তাকদীর সাব্যস্ত করা, কর্মের সামর্থ্যকে কর্মের সাথেই যুক্ত করা, এবং তাকদিরে বিশ্বাস রাখা—তা ভালো বা মন্দ, সুখকর বা কষ্টকর যাই হোক না কেন, আনুগত্যকারীর প্রত্যেক আনুগত্য আল্লাহর তাওফিকে হয় এবং প্রত্যেক পাপী ব্যক্তির পাপ আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্ব নির্ধারিত বঞ্চনা ও সাহায্য প্রত্যাহারের কারণে ঘটে। পূর্ব থেকে যার সৌভাগ্য লিখিত হয়েছে সেই সৌভাগ্যবান এবং পূর্ব থেকে যার হতভাগা হওয়া লিপিবদ্ধ হয়েছে সেই হতভাগা। কোনো জিনিস আল্লাহর ইচ্ছা ও অনুমিতর বাইরে নয়। আর বান্দাদের ভালো ও মন্দ কর্মসমূহ তাদেরই কর্ম, তবে তাদের রবের সৃষ্ট মাখলূক।” ইবন আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (২/৬৪৫)
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ আনুগত্যসমূহ এবং আনুগত্যকারীদেরকে পছন্দ করেন। প্রশংসিত আল্লাহ বলেন, “কিন্তু আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করেছেন এবং সেটাকে তোমাদের হৃদয়গ্রাহী করেছেন। আর কুফরী, পাপাচার ও অবাধ্যতাকে করেছেন তোমাদের কাছে অপ্ৰিয়। তারাই তো সত্য পথপ্ৰাপ্ত।” [আল-হুজুরাত: ৭] তিনি আরো বলেন, “আর কেউ আল্লাহ এবং রাসূলের আনুগত্য করলে সে নবী, সিদ্দীক (সত্যনিষ্ঠ), শহীদ ও সৎকর্মপরায়ণ– যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন তাদের সঙ্গী হবে এবং তারা কত উত্তম সঙ্গী।” [আন-নিসা: ৬৯] তিনি আরো বলেন, “আর তোমরা ইহ্সান কর, নিশ্চয় আল্লাহ্ মুহসীনদের ভালোবাসেন। “ [আল-বাকারাহ: ১৯৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবাকারীদেরকে এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদেরকে ভালোবাসেন।” [আল-বাকারাহ: ২২২] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “নিশ্চয় আল্লাহ হাঁচিকে পছন্দ করেন, আর হাই তোলাকে অপছন্দ করেন।” {বুখারী (৬২২৩), মুসলিম (২৯৯৪), আবূ দাউদ (৫০২৮), তিরমিযী (২৭৪৬), ইবনু মাজাহ (৯৬৮)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ কোনো বান্দাকে মহব্বত করলে জিবরীল ঘোষণা করেন: নিশ্চয় আল্লাহ অমুককে মহব্বত করেন, কাজেই তোমরাও তাকে মহব্বত কর...”। {বুখারী (৬০৪০), মুসলিম (২৬৩৭), তিরমিযী (৩১৬১)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ অবাধ্যতা ও অবাধ্যকে অপছন্দ করেন। তিনি বলেন, “হে ঈমানদারগণ ! কোন মুমিন সম্প্রদায় যেন অপর কোন মুমিন সম্প্রদায়কে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে এবং নারীরা যেন অন্য নারীদেরকে উপহাস না করে; কেননা যাদেরকে উপহাস করা হচ্ছে তারা উপহাসকারিণীদের চেয়ে উত্তম হতে পারে। আর তোমরা একে অন্যের প্ৰতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একে অন্যকে মন্দ নামে ডেকো না; ঈমানের পর মন্দ নাম অতি নিকৃষ্ট। আর যারা তওবা করে না তারাই তো যালিম।” [আল-হুজুরাত: ১১] তিনি আরো বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” [আল-বাকারাহ: ১৯০] তিনি আরো বলেন, ”নিশ্চয় আল্লাহ ফ্যাসাদ পছন্দ করেন না।” [আল-বাকারাহ: ২০৫]
উসমান আল-বাত্তি থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি ইবনু সিরিনের নিকট গেলাম। তিনি আমাকে বললেন, “মানুষেরা তাকদীর প্রসঙ্গে কী বলে? তিনি বললেন, আমার মনে নেই কী উত্তর তাকে দিয়েছিলাম। তিনি বলেন, তারপর তিনি জমিনের কিছু মাটি তুললেন এবং বললেন, আমি যা বলি তার বিনিময়ে এরূপ কিছুও চাই না।” আল-আজুররি, আশ-শারিয়াহ (২/৮৮৭) নিশ্চয় আল্লাহ যখন কোনো বান্দার ভালো ইচ্ছে করেন, তিনি তাকে তাঁর মহব্বতের বস্তু, তাঁর আনুগত্য এবং তিনি তার যে কর্মে সন্তুষ্ট হন তার তাওফিক দান করেন। আর যার সাথে অন্য কিছু ইচ্ছে করেন, তার ওপর দলিল পেশ করেন। তারপর তাকে অন্যায়বিহীন ভাবে শাস্তি প্রদান করেন।” আল-ফিরয়াবী, আল-কাদার (পৃ.২৬৩)
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ অশ্লীলতার নির্দেশ দেন না এবং তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না। তিনি বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” [আল-আরাফ: ২৮] তিনি আরো বলেন, “আর তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য কুফরী পছন্দ করেন না এবং যদি তোমরা কৃতজ্ঞ হও তবে তিনি তোমাদের জন্য তা-ই পছন্দ করেন “ [আয-যুমার: ৭]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ সবকিছুর স্রষ্টা। তিনি বলেন, “আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।” [আয-যুমার: ৬২] আর নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাদেরকে এবং তাদের কর্মসমূহকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “অথচ আল্লাহ্ই তোমাদেরকে এবং তোমরা যা কর তা সৃষ্টি করেছেন।” [আস-সাফফাত: ৯৬] আর তাঁর সৃষ্টিতে কেউ তাঁর অংশী নেই, যেমন তাঁর রাজত্বে কেউ তাঁর অংশী নেই। মহান আল্লাহ বলেন, “যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী; তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি; সার্বভৌমত্বে তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ অনুপাতে।” [আল-ফুরকান : ২]
আল্লাহ তাঁর মাখলূকের ওপর দলিল পেশ করেছেন যে, তিনিই একমাত্র স্রষ্টা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আমিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি, তবে কেন তোমরা বিশ্বাস করছ না?* তোমরা কি ভেবে দেখেছ তোমাদের বীর্যপাত সম্বন্ধে?* সেটা কি তোমরা সৃষ্টি কর, না আমি সৃষ্টি করি?” [আল-ওয়াকিয়াহ: ৫৭-৫৯] এসব যদিও পুনরুত্থানের ওপর দলিল, তবু আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার এককভাবে স্রষ্টা হওয়ারও দলিল।
অধ্যায়: আদেশ, শরীয়ত, সৃষ্টি ও বিবেকের মাঝে কোনো বৈপরিত্য নেই।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, শরীয়ত, আদেশ ও সৃষ্টির মাঝে কোনো বৈপরীত্ব নেই। আল্লাহর জন্যই সৃষ্টি এবং আদেশও তাঁরই। যেমন তিনি যা চান তাই করেন এবং তিনি যা করেন তার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবেন না। কাজেই তিনি আদেশ করেন, কেউ তাঁর আদেশ প্রত্যাখ্যানকারী নেই এবং কেউ তাঁর আদেশের রদকারী নেই। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখ , সৃজন ও আদেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ কত বরকতময়!” [আল-আরাফ: ৫৪]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার পঞ্চাশ হাজার বছর আগেই সকল মাখলূকের তাকদীর লিপিবদ্ধ করেছেন। তবুও তিনি তাঁর এবং তাঁর রাসূল ও নবীগণের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তারঁ ও তাঁর রাসূল ও নবীগণের অবাধ্য হতে নিষেধ করেছেন। পবিত্র নামসমূহের অধিকারী আল্লাহ বলেন, “আর যদি আল্লাহ্ আপনাকে কোন ক্ষতির স্পর্শ করান, তবে তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর যদি আল্লাহ্ আপনার মঙ্গল চান, তবে তাঁর অনুগ্রহ প্রতিহত করার কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে তার কাছে সেটা পৌঁছান। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।* বলুন, ‘হে লোকসকল ! অবশ্যই তোমাদের রবের কাছ থেকে তোমাদের কাছে সত্য এসেছে। কাজেই যারা সৎপথ অবলম্বন করবে তারা তো নিজেদেরই মঙ্গলের জন্য সৎপথ অবলম্বন করবে এবং যারা পথভ্রষ্ট হবে তারা তো পথভ্রষ্ট হবে নিজেদেরই ধ্বংসের জন্য এবং আমি তোমাদের উপর কর্মবিধায়ক নই।* আর আপনার প্রতি যে ওহী নাযিল হয়েছে আপনি তার অনুসরণ করুন এবং আপনি ধৈর্য ধারণ করুন যে পর্যন্ত না আল্লাহ্ ফয়সালা করেন, আর তিনিই সর্বোত্তম ফয়সালা প্রদানকারী।” [ইউনুস: ১০৭-১০৯] কাজেই আল্লাহ তা‘আলা এসব আয়াতে তাঁর তাকদীর সম্পর্কে সংবাদ এবং তাঁর অহী ও নির্দেশের আনুগত্য করার আদেশকে একত্রিত করেছেন। তিনি বলেন, “আপনার রব-এর কাছ থেকে আপনার প্রতি যা ওহী করা হয়েছে আপনি তারই অনুসরণ করুন, তিনি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই এবং মুশরিকদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিন।* আর আল্লাহ্ যদি ইচ্ছে করতেন তবে তারা শির্ক করত না। আর আমি আপনাকে তাদের হিফাযতকারী বানাইনি এবং আপনি তাদের তত্ত্বাবধায়কও নন।” [আল-আনআম: ১০৬-১০৭] কাজেই আল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, হিদায়াতের অনুসরণ করা ওয়াজিব। আর তিনি যাকে চেয়েছেন নিজ অনুগ্রহে হিদায়াত দান করেছেন এবং যাকে চেয়েছেন নিজ ইনসাফে গোমরাহ করেছেন। তিনি সুউচ্চ ও পবিত্র। তিনি বলেছেন, “আর আপনার রব ইচ্ছে করলে সমস্ত মানুষকে এক জাতি করতে পারতেন, কিন্তু তারা পরস্পর মতবিরোধকারীই রয়ে গেছে।* তবে তারা নয়, যাদেরকে আপনার রব দয়া করেছেন। এবং তিনি তাদেরকে এজন্যই সৃষ্টি করেছেন। আর ‘আমি জিন ও মানুষ উভয় দ্বারা জাহান্নাম পূর্ণ করবই’, আপনার রবের এ কথা পূর্ণ হয়েছে।* আর রাসূলদের ঐসব বৃত্তান্ত আমি আপনার কাছে বর্ণনা করেছি, যা দ্বারা আমি আপনার চিত্তকে দৃঢ় করি। এর মাধ্যমে আপনার কাছে এসেছে সত্য এবং মুমিনদের কাছে এসেছে উপদেশ ও স্মরণ।* আর যারা ঈমান আনে না তাদেরকে বলুন, ‘তোমরা স্ব স্ব অবস্থানে কাজ করতে থাক, আমরাও কাজ করছি।* এবং তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমরাও প্রতীক্ষা করছি।* আসমানসমুহ ও যমীনের গায়েব আল্লাহরই মালিকানায় এবং তাঁরই কাছে সবকিছু প্রত্যাবর্তন করানো হবে। কাজেই আপনি তাঁর ইবাদত করুন এবং তাঁর উপর নির্ভর করুন। আর তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আপনার রব গাফিল নন।” [হুদ: ১১৮-১২৩] অধিকন্তু আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা এসব আয়াতে তাঁর ব্যাপক ইচ্ছা, বিরোধীদের প্রতি তাঁর ধমক এবং তাঁর মুমিন বান্দাদের প্রতি ইবাদত করা ও তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল করার নির্দেশকে এক সাথে উল্লেখ করেছেন।
তাকদীরের প্রতি ঈমান এবং শরীয়ত অনুযায়ী আমলের মাঝে সমন্বয় সাধন করা সম্ভবপর ও সামর্থের অধীন। এজন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে দায়িত্ব দেন না।” [আল-বাকারাহ: ২৮৬] তিনি আরো বলেন, “আর আমি কাউকেও তার সাধ্যের বেশী দায়িত্ব দেই না।” [আল-মুমিনূন: ৬২]
আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে তাঁর তাঁর বেদনাদায়ক তাকদীরের প্রতি ধৈর্যশীল থাকার আদেশ দিয়েছেন। এ মর্মে তিনি বলেন, “আর আমি তোমাদেরকে অবশ্যই পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং ধন-সম্পদ, জীবন ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি দ্বারা। আর আপনি সুসংবাদ দিন ধৈর্যশীলদেরকে।” [আল-বাকারাহ: ১৫৫] তিনি আরো বলেন, “ধৈর্যশীলদেরকেই তো তাদের পুরস্কার বিনা হিসেবে পূর্ণরূপে দেয়া হবে। [আয-যুমার: ১০]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিপদ-পরীক্ষার সম্মুখীন হন নবীগণ, তারপর তাদের সাথে যুক্তরা, তারপর তাদের সাথে যুক্ত, তারপর তাদের সাথে যুক্তরা”। {ইসহাক ইবনু রাহুয়াহ (২৪১৩), আহমাদ, আল-মুসনাদ (২৭০৭৯), ইবনু আবিদ দুনিয়া, আল-মারায ওয়াল কাফফারাত (৬), নাসায়ী, আল-কুবরা (৭৪৪০)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “মুমিন নারী-পুরুষের উপর, তার সন্তানের উপর ও তার ধন-সম্পদের উপর অনবরত বিপদাপদ লেগেই থাকে। সবশেষে আল্লাহ্ তা’আলার সাথে সে গুনাহমুক্ত অবস্থায় মিলিত হয়।” {তিরমিযী (৭৮৫৯), মুসান্নাফ ইবনু আবি শায়বাহ (১০৯১৬), আহমাদ, আল-মুসনাদ (৭৮৫৯), হান্নাদ ইবনু সারী, আয-যুহদ (৪০২)}
আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা বাকীউল গারক্বাদ (কবরস্থানে) এক জানাযায় উপস্থিত ছিলাম। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আগমন করলেন। তিনি বসলে আমরাও তার চারদিকে বসে পড়লাম। তার হাতে একটি ছড়ি ছিল। তিনি নীচের দিকে তাকিয়ে তার ছড়িটি দ্বারা মাটি খুঁড়তে লাগলেন। অতঃপর বললেন: তোমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, অথবা বললেন: এমন কোন সৃষ্ট প্রাণী নেই, যার জন্য জান্নাত ও জাহান্নামে জায়গা নির্ধারিত করে দেয়া হয়নি, আর এ কথা লিখে দেয়া হয়নি যে, সে দুর্ভাগা হবে কিংবা ভাগ্যবান। তখন এক ব্যক্তি আরয করল, হে আল্লাহর রাসূল! তা হলে কি আমরা আমাদের ভাগ্যলিপির উপর ভরসা করে ’আমল করা ছেড়ে দিব না? কেননা, আমাদের মধ্যে যারা ভাগ্যবান তারা অচিরেই ভাগ্যবানদের ’আমলের দিকে ধাবিত হবে। আর যারা দুর্ভাগ্য তারা অচিরেই দুর্ভাগাদের ’আমলের দিকে ধাবিত হবে। তিনি বললেন: যারা ভাগ্যবান, তাদের জন্য সৌভাগ্যের ’আমল সহজ করে দেয়া হয়, আর ভাগ্যাহতদের জন্য দুর্ভাগ্যের ’আমল সহজ করে দেয়া হয়। অতঃপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করলেন: {فَأَمَّا مَن أَعْطَى وَاتَّقَى * وَصَدَّقَ بِالْحُسْنَى } ’’কাজেই যে দান করে এবং তাক্ওয়া অবলম্বন করে আর ভাল কথাকে সত্য বলে বুঝেছে’’- (লাইল:৫-৬) “ {বুখারী (১৩৬২), মুসলিম (২৬৪৭), আবূ দাউদ (৪৬৯৪), তিরমিযী (৩৩৪৪)}
ইমরান ইবনু হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! জাহান্নামীদের থেকে জান্নাতীদেরকে চেনা যাবে কি? তিনি বললেন: হ্যাঁ। সে বলল, তাহলে ’আমলকারীরা ’আমল করবে কেন? তিনি বললেন: প্রতিটি লোক ঐ ’আমলই করে যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে, অথবা যা তার জন্য সহজ করা হয়েছে।” {বুখারী (৬৫৯৬), মুসলিম (২৬৪৯), আবু দাউদ (৪৭০৯)}
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, সুরাকা ইবনু মালিক ইবনু জু’শুম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসলেন, অতঃপর বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের সামনে আমাদের দ্বীন সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করুন, যেন আমরা এইমাত্র সৃষ্ট হয়েছি। আজকের ’আমল কি ঐ বিষয়ের উপর যার সম্পর্কে কলম লিখে শুকিয়ে গেছে এবং তাকদীর তার উপর চলছে? নাকি আমরা ভবিষ্যতে তার সামনাসামনি হব? তিনি বললেন, “না; বরং কলম যা কিছু লিখার লিখে শুকিয়ে গেছে ও সে অনুযায়ী তাকদীর জারী হয়ে গেছে। সুরাকা বললেন, তাহলে কিসের জন্য ’আমল করার প্রয়োজন? যুহায়র বলেন, অতঃপর আবূ যুবায়র কিছু কথা বললেন, যা আমি বুঝতে পারিনি। অতঃপর আমি (লোকেদের) প্রশ্ন করলাম, তিনি কি বললেন। জবাবে বললেন, তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, তোমরা আমল করতে থাকো; প্রত্যেকের জন্য স্বীয় পথ সহজ করা হয়েছে।” মুসলিম: (২৬৪৮)
সাহাল ইবনু সা‘দ আস-সায়িদী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “কোন লোক এমন কাজ করে, যা দেখে লোকেরা একে জান্নাতী লোকের কাজ মনে করে। কিন্তু (আসলে) সে জাহান্নামবাসীদের অন্তর্ভুক্ত। আর কোন বান্দা এমন কাজ করে , যা দেখে লোকেরা একে জাহান্নামীদের কাজ বলে মনে করে। অথচ সে জান্নাতী লোকদের অন্তর্ভুক্ত। বস্তুতঃ শেষ অবস্থার উপরই ’আমলের ফলাফল নির্ভর করে।” {বুখারী (৬৪৯৩), মুসলিম (১১২)}
ইমাম আ-জুররী আল্লাহ সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, “তিনি তাঁর বান্দাদের থেকে ইবাদতকে পছন্দ করেন এবং এর প্রতি নির্দেশও দিয়েছেন। ফলে যারা তাঁর ইবাদত করে তারা তাঁর পক্ষ থেকে তাওফিকপ্রাপ্ত হয়ে ইবাদত করে। তিনি পাপ অবাধ্যতা নিষেধ করেছেন এবং ইচ্ছে করেছেন যে, পাপগুলো তার সন্তুষ্টি-মহব্বত ও নির্দেশ ছাড়া সংঘটিত হবে। আল্লাহ অশ্লীলতার নির্দেশ প্রদান করা অথবা তা মহব্বত করা থেকে অনেক পবিত্র। আমাদের রবের রাজত্বে এমন কিছু ঘটা অসম্ভব যা সংঘটিত হওয়া তিনি চাননি, অথবা যা সংঘটিত হওয়ার আগে তিনি নিজ জ্ঞানে তা বেষ্টন করে নেননি। তিনি ফয়সালা ও তাকদীরের ভিত্তিতে মাখলূক সৃষ্টি করার আগে মাখলূক কী করবে তা জানেন এবং তাদের সৃষ্টি করার পর তাদের কর্মসমূহ সম্পাদিত হওয়ার আগেই সে সম্পর্কে জানেন। কলম ভালো অথবা মন্দ যা কিছু হবে তা আল্লাহর নির্দেশে লাওহে মাহফূজে লিপিবদ্ধ করেছে। বান্দাদের মধ্যে যে তাঁর আনুগত্য করে তিনি তার প্রশংসা করেন এবং আনুগত্য করাকে (কর্ম হিসেবে) বান্দার সাথে সম্পৃক্ত করেন এবং তার ওপর মহা প্রতিদানের ওয়াদা করেছেন। আল্লাহর তাওফিক না হলে তারা যেসব কর্মের ফলে সাওয়াবের উপযুক্ত হয়েছে তা করত না; {ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَن يَشَاء وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيم} “এটা আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছে তিনি এটা দান করেন; আর আল্লাহ মহাঅনুগ্রহশীল।” [আল-হাদীদ: ২১] অনুরূপভাবে যারা তাঁর নাফরমানি করেছে, তিনি তাদেরকে তাদের কর্মের জন্যে তিরস্কার করেছেন এবং তাদের কর্মের ওপর তাদেরকে শাসিয়েছেন। এবং তাদের কর্মকে তাদের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। এসবও তাকদীরের কারণে তাদের ওপর প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি যাকে ইচ্ছে গোমরাহ করেন এবং যাকে ইচ্ছে হিদায়াত দান করেন।” আ-জুররি, আশ-শারিয়াহ (২/৭০২)
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, যেমনভাবে সৃষ্টি , আদেশ ও শরীয়তের মাঝে কোনো বৈপরীত্ব নেই, তেমনভাবে শরীয়ত, আদেশ ও বিবেকের মাঝেও কোনো বৈপরীত্ব নেই। কাজেই আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেসব জিনিসের আদেশ করেছেন, অথবা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা থেকে নিষেধ করেছন, অথবা আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, অথবা তিনি যা সংবাদ দিয়েছেন, তা কখনো বিবেক বিরোধী নয়, বরং তা বিবেকের দাবি এবং চূড়ান্ত হিকমত। প্রজ্ঞাময় সর্বজ্ঞানী আল্লাহ বলেন, “আপনার রব ওহীর দ্বারা আপনাকে যে হিকমত দান করেছেন এগুলো তার অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহ স্থির করো না, করলে নিন্দিত ও বিতাড়িত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।” [আল-ইসরা : ৩৯] তিনি আরো বলেন, “এটা পরিপূর্ণ হিকমত, কিন্তু ভীতিপ্রদর্শন তাদের কোনো কাজে লাগেনি।” [আল-কামার : ৫] তিনি আরো বলেন, “আল্লাহ আপনার প্রতি কিতাব ও হিকমত নাযিল করেছেন।” [আন-নিসা: ১১৩] আর এর দ্বারাই মাখলূকের ওপর দলিল সাব্যস্ত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বলুন, ‘ চূড়ান্ত প্রমাণ তো আল্লাহরই; সুতরাং তিনি যদি ইচ্ছে করতেন, তবে তোমাদের সবাইকে অবশ্যই হিদায়াত দিতেন।” [আল-আনআম: ১৪৯] আর এই শরীয়ত, আদেশ ও তাকদীর- এতেই রয়েছে চূড়ান্ত সৌন্দর্য, বরং তার চেয়ে সুন্দর কিছু নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তবে কি তারা জাহেলিয়াতের বিধি-বিধান কামনা করে? আর দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে আর কে শ্রেষ্ঠতর?” [আল-মায়েদা: ৫০]
ইবনুদ দায়লামী হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি উবাই ইবনু কা’ব-এর নিকট এসে তাকে বললাম, তাকদীর সম্পর্কে আমার মনে একটা দ্বিধার উদ্রেক হয়েছে। তাই আপনি আমাকে এমন কিছু বলুন যার বিনিময়ে আশা করি মহান আল্লাহ আমার দ্বিধা-সংশয় দূর করবেন। তিনি বললেন, মহান আল্লাহ তাঁর আসমান ও পৃথিবীবাসী সকলকে শাস্তি দিতে পারেন। তারপরও তিনি তাদের প্রতি অন্যায়কারী সাব্যস্ত হবেন না। পক্ষান্তরে তিনি যদি তাদের সকলকে দয়া করেন তাহলে তাঁর এ দয়া তাদের জন্য তাদের নেক আমল থেকে উত্তম হবে। সুতরাং যদি তুমি উহুদ পাহাড় পরিমাণ স্বর্ণও আল্লাহর পথে দান করো আর তাকদীরে বিশ্বাস না রাখো, তবে তা গ্রহণ করা হবে না যতক্ষণ না তুমি পুনরায় তাকদীরে বিশ্বাস করবে এবং উপলদ্ধি করবে যে, যা তোমার ঘটেছে তা ভুলেও তোমাকে এড়িয়ে যাওয়ার ছিলো না। আর যা তোমার হাতছাড়া হয়েছে তা কখনো তোমাকে স্পর্শ করার ছিল না। আর এ বিশ্বাস ছাড়া তুমি মারা গেলে জাহান্নামে যাবে। ইবনুদ দায়লামী বলেন, অতঃপর আমি আব্দুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ-এর নিকট গিয়ে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সূত্রে একই কথা বললেন। অতঃপর আমি হুযায়ফা ইবনু ইয়ামান-এর নিকট আসলাম। তিনিও একই কথা বললেন। অতঃপর আমি যায়েদ ইবনু সাবিত-এর নিকট আসলাম। তিনিও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সূত্রে একই কথা বললেন।” {আবূ দাউদ (৪৬৯৯), ইবনু মাজাহ (৭৭), আহমাদ (২১৫৮৯), আবদ ইবনু হুমাইদ (২৪৭), ফিরয়াবী, আল-কাদর (১৯০),শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (৪/৬৭৬)}
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর কিতাবকে আহসানুল হাদীস তথা সর্বোত্তম বাণী বলে প্রশংসা করেছেন- যা শরীয়ত ও আদেশকে অন্তর্ভুক্ত করে। তিনি বলেন, “আল্লাহ নাযিল করেছেন উত্তম বাণী সম্বলিত কিতাব।” [আয-যুমার: ২৩] কাজেই আল্লাহ যা শরীয়ত হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন অথবা তিনি যা নির্ধারণ করেছেন, তা চূড়ান্ত পর্যায়ের পরিপূর্ণ ও সুন্দর; বিবেকসমূহ তা বুঝতে সক্ষম হোক অথবা তা অনুধাবন ও বুঝতে অক্ষম হোক। আমরা কখনো আমাদের বিবেক ও মতামতকে আল্লাহর শরীয়ত ও তাকদীরের ওপর মীমাংসক নির্ধারক করব না: কখনো ভালো বলে আবার কখনো খারাপ বলে। বরং আল্লাহ যা কিছুই শরীয়ত সাব্যস্ত করেছেন ও তাকদীর করেছেন, তা চূড়ান্ত পর্যায়ের সুন্দর ও পরিপূর্ণ।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, শরীয়ত ও তাকদীর পুরোটাই কল্যাণকর। আল্লাহ কখনো নিরেট অকল্যাণকে নির্ধারণ করেন না। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কল্যাণ পুরোটা আপনার হাতে; আর অ-কল্যাণ আপনার সাথে সম্পৃক্ত নয়।” {মুসলিম (৭৭১), আবূ দাউদ (৭৬১), তিরমিযী (২৬৬), নাসায়ী (৮৯৭)}
তবে তাকদীরের ব্যাপকতার ভেতর অ-কল্যাণও অন্তর্ভুক্ত। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আমি প্রত্যেকটি বস্তু সৃষ্টি করেছি নির্ধারিত পরিমাপে।” [আল-কামার: ৪৯] যে ব্যক্তি খারাপকর্ম করে তার সাথে অকল্যাণকে সম্পৃক্ত করে কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন আল্লাহ বলেন: “বলুন, ‘আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি ঊষার রবের।* তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট হতে।” [আল-ফালাক : ১-২]
শিষ্টাচারিতার খাতিরে অকল্যাণকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করা যাবে না। আল্লাহ তা‘আলা জিনদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, তারা বলেছে: “আর নিশ্চয় আমরা জানি না, যমীনে যারা রয়েছে তাদের জন্য অকল্যাণ চাওয়া হয়েছে, নাকি তাদের রব তাদের ব্যাপারে মঙ্গল চেয়েছেন।” [আল-জিন: ১০] আল্লাহ তাআলা ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, তিনি বলেছেন, ‘এবং রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।” [আশ-শুআরা: ৮০] তিনি অসুস্থতাকে নিজের সাথে আর আরোগ্যকে আল্লাহর সাথে সম্পৃক্ত করেছেন।
অধ্যায়: উপকরণ গ্রহণ করা তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, উপকরণ গ্রহণ করা তাকদীরের প্রতি ঈমানের বিপরীত নয়, বরং উপকরণ গ্রহণ করা তাকদীর ও ভাগ্যের প্রতি ঈমানের পূর্ণতার অংশ। আল্লাহ আমাদেরকে রিযিক অন্বেষণ করার নির্দেশ দিয়েছেন; আবার তিনি আমাদের রিযিক নির্ধারণ করেছেন তারও সংবাদ দিয়েছেন। মহা সত্য আল্লাহ বলেন, “তিনিই তো তোমাদের জন্য যমীনকে সুগম করে দিয়েছেন ; অতএব তোমরা এর দিক-দিগন্তে বিচরণ কর এবং তাঁর দেয়া রিযিক থেকে তোমরা আহার কর; আর পুনরুত্থান তো তাঁরই কাছে।” [আল-মুলক: ১৫]
তিনি আরো বলেন, “অতঃপর সালাত শেষ হলে তোমারা যমীনে ছড়িয়ে পড় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান কর ও আল্লহকে খুব বেশী স্মরণ কর, যাতে তোমারা সফলকাম হও।” [আল-জুমুআহ: ১০]
আল্লাহ তা‘আলা ইয়াকুব সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি তার সন্তানদের বলেছেন: “আর তিনি বললেন, ‘হে আমার পুত্ৰগণ! তোমরা এক দরজা দিয়ে প্রবেশ করো না, ভিন্ন ভিন্ন দরজা দিয়ে প্রবেশ করবে। আল্লাহর সিদ্ধান্তের বিপরীতে আমি তোমাদের জন্য কিছু করতে পারি না। হুকুমের মালিক তো আল্লাহ্ই। আমি তাঁরই উপর নির্ভর করি। আর আল্লাহরই উপর যেন নির্ভরকারীরা নির্ভর করে।” [ইউসূফ: ৬৭] সায়েব ইবনে ইয়াযীদ থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের যুদ্ধের দিন দু’টি লৌহবর্ম একটির উপর অপরটি পরিধান করেন।” {ইবনু মাজাহ (২৮০৬), সায়ীদ ইবনু মানসুর (২৮৫৮), আহমাদ (১৫৭২২), নাসায়ী, আল-কুবরা (৮৫২৯)} আল্লাহ তা‘আলা নূহ আলাইহিস সালামকে নৌকা তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন, যেমন তিনি মূসা আলাইহিস সালামকে সমুদ্রে আঘাত করতে নির্দেশ করেন এবং মারইয়াম আলাইহাস সালামকে খেজুর গাছের কাণ্ড ধরে নিজের দিকে হেলাতে বলেছেন, যেন তার ওপর তাজা খেজুর পতিত হয়। এছাড়া আরো ঘটনা রয়েছে যেখানে আল্লাহ উপকরণ গ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আর সবচেয়ে বড় উপকরণ হলো দোয়া। যেমন নুমান ইবনু বাশীর থেকে বর্ণিত, আল্লাহর নিম্নের বাণী প্রসঙ্গে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: {وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ} “আর তোমাদের রব বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের জন্য সাড়া দিবো।” তিনি বলেন: দোয়াই হচ্ছে ইবাদাত। তারপর তিনি পাঠ করলেন: {وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ} আয়াতটি {دَاخِرِين} পর্যন্ত।’’ (গাফির:৬০)।” {আবূ দাউদ (১৪৭৯), তিরমিযী (২৯৬৯), ইবনু মাজাহ (৩৮২৮)}
তাকদীরের আরেকটি উপকরণ হলো: চিকিৎসা গ্রহণ ও ঝাড়-ফুঁক করা। আবূ খিযামা হতে তার পিতার—রাদিয়াল্লাহু আনহু—সূত্রে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা যে ঝাড়ফুঁক করি, ঔষধ ব্যবহার করি এবং বিভিন্ন রকম সাবধানতা অবলম্বন করে থাকি, এগুলো কি আল্লাহ তা’আলার নির্ধারিত তাকদীরকে বাতিল করতে পারে? এ ব্যাপারে আপনার কী মত? তিনি বললেন: এগুলোও আল্লাহ্ তা’আলার নির্ধারিত তাকদীরের অন্তর্ভুক্ত।” {তিরমিযী (২০৬৫), ইবনু মাজাহ (৩৪৩৭), ইবনু ওয়াহাব, আল-জামি ফিল হাদীস (৬৯৯), আহমাদ (১৫৪৭২), ইবনু আবি আসিম, আল-আহাদ ওয়াল মাসানী (২৬১০)}
অধ্যায়: তাকদীর ইনসাফের পরিপন্থী নয়।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা ইনসাফ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং শরীয়ত, তাকদীর ও সাওয়াব দানের ক্ষেত্রে ইনসাফের ভিত্তিতে ফয়সালা করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণতা ও ইহসান (সদাচরণ) এর নির্দেশ দেন।” [আন-নাহল : ৯০] মহান আল্লাহ আরো বলেন, “আর আল্লাহ্ আরো উপমা দিচ্ছেন দু ব্যক্তির, তাদের একজন বোবা, কোনো কিছুরই শক্তি রাখে না এবং সে তার অভিভাকের উপর বোঝা; তাকে যেখানেই পাঠানো হোক না কেন সে কোনো কল্যাণ নিয়ে আসতে পারে না; সে কি সমান ঐ ব্যক্তির, যে ন্যায়ের নির্দেশ দেয় এবং যে আছে সরল পথের উপর?” [আন-নাহল: ৭৬] আবূ যার রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “ওহে আমার বান্দারা! আমি আমার নিজ সত্তার উপর অত্যাচারকে হারাম করে নিয়েছি এবং তোমাদের উপরও তা হারাম বলে ঘোষণা করছি। অতএব তোমরা একে অপরের উপর অত্যাচার করো না।” {মুসলিম: (২৫৭৭), তিরমিযী: (২৪৯৫)}
তিনি নিজের নফস থেকে জুলমকে না করেছেন, তিনি বলেন, “যে সৎকাজ করে সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। আর আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুমকারী নন।” [ফুসসিলাত : ৪৬] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করেন না। আর কোনো পূণ্য কাজ হলে আল্লাহ সেটাকে বহুগুণ বর্ধিত করেন।” [আন-নিসা : ৪০] তিনি আরো বলেন, “আর পুরুষ কিংবা নারীর মধ্য থেকে যে নেককাজ করবে এমতাবস্থায় যে, সে মুমিন, তাহলে তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি খেজুরবীচির আবরণ পরিমাণও যুলুম করা হবে না।” [আন-নিসা : ১২৪] তিনি আরো বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ্ মানুষের প্রতি কোন যুলুম করেন না। বরং মানুষই নিজেদের প্রতি যুলুম করে থাকে।” [ইউনূস: ৪৪] মহাসত্য আল্লাহ আরো বলেন, “কেউ কোন সৎকাজ করলে সে তার দশ গুণ পাবে। আর কেউ কোন অসৎ কাজ করলে তাকে শুধু তার অনুরূপ প্রতিফলই দেয়া হবে এবং তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।” [আল-আনআম: ১৬০] এছাড়া আরো অনেক আয়াত আল্লাহ তা‘আলার পরিপূর্ণ ইনসাফ ও তাঁর নফস থেকে জুলম না হওয়াকে প্রমাণ করে।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আগে থেকে তাকদীর ও ভাগ্য নির্ধারত হওয়ার ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার ওপর জুলম হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত হয় না। কারণ আল্লাহ কিতাব নাযিল করেছেন এবং রাসূলদের প্রেরণ করেছেন; যেন রাসূলদের পর মানুষদের জন্য আল্লাহর ওপর কোনো প্রমাণ বাকি না থাকে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণ আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আন-নিসা : ১৬৫]
তিনি তাকদীরকে গোপন রহস্য বানিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তিনিই গায়েবী বিষয়ের জ্ঞানী, তিনি তাঁর গায়েবের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না।” [আল-জিন: ২৬] তবে তিনি বান্দাদের জন্য ইচ্ছে ও ইখতিয়ার (স্বাধিনতা) তৈরি করেছেন। সম্মানিত মাওলা বলেন, “আর বলুন, ‘সত্য তোমাদের রব-এর কাছ থেকে; কাজেই যার ইচ্ছে ঈমান আনুক আর যার ইচ্ছে কুফরী করুক।” [আল-কাহাফ: ২৯] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “নিশ্চয় আমি তাকে পথ নির্দেশ দিয়েছি, হয় সে কৃতজ্ঞ হবে, না হয় সে অকৃতজ্ঞ হবে।” [আল-ইনসান: ৩] মহাসত্য আল্লাহ আরো বলেন, “তারপর তিনি তাকে তার সৎকাজের এবং তার অসৎ-কাজের জ্ঞান দান করেছেন।” [আশ-শামস: ৮]
অধ্যায়: তাকদীর দ্বারা দলিল পেশ করা প্রসঙ্গে।
আমরা ইমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ রাসূলদের প্রেরণ করেছেন এবং কিতাব নাযিল করেছেন, যেন মানুষদের জন্য আল্লাহর ওপর কোনো দলিল বাকী না থাকে। সম্মানিত মাওলা বলেন, “সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূল প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণ আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আন-নিসা : ১৬৫] আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তারা তাদের শিরকে লিপ্ত হওয়ার ওপর তাকদীরকে দলিল হিসেবে পেশ করেছে। ফলে আল্লাহ তাদের মিথ্যা প্রকাশ করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে তাঁর শাস্তি আস্বাদন করিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যারা শির্ক করেছে অচিরেই তারা বলবে, ‘আল্লাহ্ যদি ইচ্ছে করতেন তবে আমরা ও আমাদের পূর্বপুরুষগণ শির্ক করতাম না এবং কোন কিছুই হারাম করতাম না।’ এভাবে তাদের পূর্ববর্তীগণও মিথ্যারোপ করেছিল, অবশেষে তারা আমার শাস্তি ভোগ করেছিল। বলুন, ‘তোমাদের কাছে কি কোন জ্ঞান আছে, যা তোমরা আমাদের জন্য প্রকাশ করবে? তোমরা শুধু কল্পনারই অনুসরণ কর এবং মনগড়া কথা বল।” [আল-আনআম: ১৪৮] যদি তাদের শিরকের ওপর তাকদীর তাদের পক্ষে দলিল হত; আল্লাহ কখনো তাদেরকে তাঁর শাস্তি আস্বাদন করাতেন না।
’আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “একবার আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তার সঙ্গে ছিল একটুকরা খড়ি, যা দিয়ে তিনি মাটির উপর দাগ টানছিলেন। তিনি তখন বললেন: তোমাদের মাঝে এমন কোন লোক নেই যার ঠিকানা জাহান্নামে বা জান্নাতে লেখা হয়নি। লোকদের ভিতর থেকে এক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাহলে (এর উপর) নির্ভর করব না? তিনি বললেন: না, তোমরা ’আমল কর। কেননা, প্রত্যেকের জন্য ’আমল সহজ করে দেয়া হয়েছে। এরপর তিনি এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন: {فَأَمَّا مَن أَعْطَى وَاتَّقَى} “কাজেই কেউ দান করলে, তাকওয়া অবলম্বন করলে।” [লাইল:৫]” {বুখারী (৬৬০৫), মুসলিম (২৬৪৭), তিরমিযী (২১৩৬), ইবনু মাজাহ (৭৮)} কাজেই নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমল করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাকদীরের ওপর নির্ভর করে কর্ম ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, বান্দার জন্যে পাপ থেকে তাওবা করার পর এর ওপর তাকদীরকে দলিল হিসেবে পেশ করা বৈধ। যেমন হুমাইদ ইবন আব্দুর রহমান থেকে বণিত, আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আদম ও মূসা (পরস্পরে) বাদানুবাদ করেন। মূসা বলেন, হে আদম, আপনি আমাদের পিতা। আপনি আমাদেরকে বঞ্চিত করেছেন এবং জান্নাত থেকে আমাদেরকে বের করেছেন। আদম তাকে বললেন, হে মূসা! আল্লাহ্ আপনাকে তো নিজ কথার মাধ্যমে সম্মানিত করেছেন এবং আপনার জন্য নিজ হাত দ্বারা লিখেছেন। অতএব আপনি কি আমাকে এমন একটি কাজের ব্যাপারে তিরস্কার করছেন যা আমাকে সৃষ্টি করার চল্লিশ বছর পূর্বেই আল্লাহ্ নির্ধারিত করে রেখেছেন। তখন আদম মূসা-এর উপর বিতর্কে জয়ী হলেন। এ কথাটি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দু’বার বলেছেন।” {বুখারী : (৬৬১৪), মুসলিম (২৬৫২), আবূ দাউদ (৪৭০১), তিরমিযী (২১৩৪), ইবনু মাজাহ (৮০)}
মুতাররিফ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবন শিখখির রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “কুরআনে আমাদেরকে তাকদীরের ওপর সোপর্দ করা হয়নি, বরং কুরআনে আমাদেরকে সংবাদ হয়েছে যে, আমরা তাকদীরের দিকেই ফিরে যাবো।” আব্দুল্লাহ ইবনু আহমাদ, আস-সুন্নাহ (২/৪১২) মুহাম্মাদ ইবনু সিরীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “যদি কাদারিয়ারা আল্লাহর আয়াতসমূহ নিয়ে বিতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত না হয়, তবে আমি জানি না তারা কারা?” আব্দুল্লাহ ইবন আহমাদ, আস-সুন্নাহ (২/৪৩২), শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (৪/৬৯৬)
ইবনু ওয়াহাব ও আরো অনেকে বলেছেন, “মালিককে কাদারিয়াদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল: তাদের সাথে কথা বলা থেকে বিরত থাকা হবে? তিনি বললেন, হ্যাঁ, যদি তারা যে মতের ওপর রয়েছে সেটা জানে। তিনি বলেন, তবে তাকে সৎ কাজের আদেশ করবে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করবে, তাদেরকে তাদের বিরোধিতার খবর দেবে, তাদের সাথে নিম্নস্বরে কথা বলবে না, তাদের জানাযার নামাজ পড়বে না, তাদের জানাযায় অংশ গ্রহণ করবে না এবং তাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়াও বৈধ মনে করি না। অপর বর্ণনায় বাড়িয়ে বলেছেন যেম আল্লাহ বলেন, {وَلَعَبْدٌ مُّؤْمِنٌ خَيْرٌ مِّن مُّشْرِكٍ} “অবশ্যই মুমিন বান্দা মুশরিক বান্দা থেকে উত্তম।” [বাকারাহ: ২২১] ইবনু আশহাবের বর্ণনায় বলেছেন, তাদের পেছনে সালাত আদায় করা যাবে না, তাদের থেকে হাদীস গ্রহণ করা যাবে না, যদি তাদের সাথে কোনো সীমানা পাহাড়ায় সাক্ষাত কর, তাহলে তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দাও।” তারতীবুল মাদারিক ও তাকরীবুল মাসালিক (১/৯১)
আমরা ইমান আনয়ন করি যে, মুসিবতের ওপর তাকদীর দ্বারা দলিল পেশ করা বৈধ। যেমন আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “দুর্বল মুমিন থেকে শক্তিশালী মুমিন ভালো ও আল্লাহর নিকট বেশী প্রিয়। তবে সবার ভেতর কল্যাণ রয়েছে। তোমাকে যা উপকার করবে, তার প্রতি তুমি আগ্রহী হও এবং আল্লাহর সাহায্য গ্রহণ কর, তবে অক্ষম হয়ো না। আর যদি কোনো বিপদ তোমাকে স্পর্শ করে, বলো না: আমি যদি এরূপ করতাম, তাহলে এরূপ ও এরূপ হতো। তবে বলো: আল্লাহই নির্ধারণ করেছেন এবং তিনি যা চেয়েছেন করেছেন। কারণ, «لو» শব্দটি শয়তানের আমলকে উন্মুক্ত করে দেয়।” {মুসলিম: (২৬৬৪), ইবনু মাজাহ: (৭৯)}
ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর বাণী: {الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُواْ إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعون} “যারা তাদের ওপর বিপদ আসলে বলে, ‘আমরা তো আল্লাহরই। আর নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকেই প্রত্যাবর্তনকারী’। [আল-বাকারাহ: ১৫৬] এর ব্যাখ্যায় বলেন: আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন যে, মুমিন যখন বিষয়টি আল্লাহতে সোপর্দ করে এবং তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তন করে ও إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعون বলে, তখন তার তিনটি ভালো গুণ লিপিবদ্ধ করা হয়: আল্লাহর পক্ষ থেকে সালাত, রহমত ও হিদায়াতের পথ নিশ্চিত হয়।” রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি মুসিবতের সময় إِنَّا لِلّهِ وَإِنَّـا إِلَيْهِ رَاجِعون পড়ল; আল্লাহ তার মুসিবতের প্রতিবিধান করবেন এবং তার শেষ পরিণতি সুন্দর করবেন এবং তাকে এমন বিনিময় দেবেন যার প্রতি সে সন্তুষ্ট হবে।” {তাবারী, আত-তাফসীর (২/৭০৭), (৩/২২৩), ইবনু আবি হাতিম, আত-তাফসীর (১৪২১), তাবারানী, মুজাম কাবীর (১৩০২৭), বায়হাকি, শুআবুল ঈমান (৯২৪০)}
পর্ব: ইবাদাত
পর্বটির সারাংশ
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাঁর ইবাদতের জন্য মাখলূক সৃষ্টি করেছেন। আর আল্লাহ যে ইবাদতের নির্দেশ দিয়েছেন তা হলো একনিষ্ঠ ইবাদাত। আর এটাই ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মিল্লাত। আল্লাহ জিন ও মানব জাতীর সকলকেই এ নির্দেশই দিয়েছেন। ইবাদতের অনেক প্রকার রয়েছে, এগুলোর কোনটি গায়রুল্লাহর জন্য করা বৈধ নয়। ইবাদতের কিছু প্রকার হলো: দোয়া, তাওয়াক্কুল, ভয়, আশা, পানাহ চাওয়া, যবেহ করা, সাহায্য চাওয়া ও ফরিয়াদ করা।
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তাঁর ইবাদতের জন্যই মাখলূক তৈরি করেছেন। আমরা আরো জানি যে, কুরআনের প্রথম নির্দেশ হলো আল্লাহ ছাড়া সবাইকে ত্যাগ করে একমাত্র তাঁরই ইবাদত করা। প্রত্যেক নবীই তার কওমকে বলেছেন, “হে আমার কওম, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই।” [আল-আরাফ: ৬৫]
আমরা এও জানি যে, ইবাদাত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য একনিষ্টভাবে এবং সাইয়্যেদুল মুরসালীন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত মোতাবেক না হলে মাকবূল হবে না।
আর ইবাদতের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত একমাত্র আল্লাহ, যার কোনো শরীক নেই। আল্লাহু সুবহানাহু ছোট-বড় সব শিরক থেকে সতর্ক করেছেন। কাজেই যে একমাত্র আল্লাহর জন্য খালিসভাবে আমল করল, কিন্তু তা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত মোতাবেক হল না, তার আমল প্রত্যাখ্যাত। পক্ষান্তরে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়াত মোতাবেক আমল করল, কিন্তু তা একমাত্র আল্লাহর জন্য খালিস হল না, তার আমলও প্রত্যাখ্যাত।
আমরা জানি যে, ইবাদতের মূলনীতি হলো তিনটি: পরিপূর্ণ মহব্বত, পরিপূর্ণ আশা ও পরিপূর্ণ ভয়। বস্তুত নবী ও রাসূলগণ এর দ্বারা সবচেয়ে বেশী ভাগ্যবান ও সাফল্যমণ্ডিত হয়েছেন।
মুমিনগণ যা কিছু আশা করেন তন্মধ্যে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠতম হলো: আল্লাহর সম্মানিত চেহারার দর্শন লাভ। আল্লাহকে দেখা জান্নাতীদের সবচেয়ে মহান নিআমত, বরং তা তাদের নিআমতসমূহের ওপর অতিরিক্ত নিআমত। জান্নাতীরা যখন জান্নাতে প্রবেশ করবেন, আল্লাহ নিজের পক্ষ থেকে অনুগ্রহ ও দয়াস্বরূপ মুমিনদেরকে তাঁর দিকে দৃষ্টি দেওয়ার অনুমতি প্রদান করে তাদেরকে সম্মানিত করবেন এবং অনুগ্রহের সাথে আরো অনুগ্রহ বাড়িয়ে দিবেন। মুমিনদের জন্য সবচেয়ে বড় ভয়ের বিষয় হলো, তারা যেন এই নেয়ামতটি থেকে বঞ্চিত না হয় যা আল্লাহ তাঁর মুমিন বন্ধুগণকে দিয়েছেন এবং তাঁর শত্রুদের তা থেকে বঞ্চিত করেছেন। তার সকল শত্রু যেমন মুশরিক, ইহুদী, খ্রিস্টান, অগ্নীপূজক ও মুনাফিক তাঁর দিদার লাভ করা থেকে বঞ্চিত হবে।
উসীলা হলো, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা এমন সব কাজের দ্বারা যা তাকে সন্তুষ্ট করে, তা ফরজ হোক বা নফল। (উসীলা অন্য অর্থেও ব্যবহার হয়। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণীতে রয়েছে: “তোমরা আল্লাহর কাছে আমার জন্যে অসীলা প্রার্থনা কর।”)
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন আর কবুল করার অঙ্গীকার দিয়েছেন। আমরা জানি যে, আল্লাহর সুন্দর নাম এবং তাঁর মহান গুণাবলি দ্বারা তাঁর নিকট উসীলা গ্রহণ করা যায়। এ জন্য নবী ও রাসূলগণের দোয়াগুলো আল্লাহর সুন্দর নামসমূহের অসীলা দ্বারা ভরপুর। দোয়ার কতগুলো স্থান হলো: সালাতের শেষে, রাতের শেষ তৃতীয়াংশে, সিয়াম রেখে ইফতার করার সময়, তাওয়াফের ভেতর, সাফা ও মারওয়ার ওপরে, আরাফাত ও মুজদালিফায় এবং জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করার পর।
যেমনভাবে আল্লাহর প্রতি ঈমান দ্বারা উসীলা হয়, তেমনি বিভিন্ন প্রকার ইবাদত, নেক কাজ করার মাধ্যমেও আল্লাহর নিকট উসীলা গ্রহণ করা হয়। তদ্রুপভাবে স্বীয় অবস্থাকে উল্লেখ করে এবং আল্লাহর নিকট অভাবকে প্রকাশ করেও আল্লাহর নিকট অসীলা হয়। বস্তুত বান্দা সবসময় আল্লাহর সাহায্য ও রহমতের মুখাপেক্ষী। নেককার জীবিত উপস্থিত ব্যক্তির নিকট দোয়া প্রার্থনা করে মুসলিম ব্যক্তি অসীলা গ্রহণ করতে পারেন, যেমন ইউসূফের ভাইয়েরা নিজেদের জন্য তাদের বাবার কাছে ইস্তেগফার করার প্রার্থনা জানিয়েছেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পর বৃষ্টি তলব ও অসীলা গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তার পরিবর্তে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর দ্বারা অসীলা গ্রহণ করেছেন। কারণ, তারা জানতেন যে, এটা হলো বৈধ অসীলা।
আল্লাহ যা অনুমোদন দেননি তা দ্বারা অসীলা গ্রহণ করা যাবে না। জাহেলী যুগের লোকেরা তাদের মূর্তি ও ইলাহের অসীলায় আল্লাহর নৈকট্য তলব করতো।
অধ্যায়: আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্য যে, তারা কেবল আমারই ইবাদাত করবে।”
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাঁর ইবাদতের জন্যই জিন ও মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যই যে, তারা কেবল আমার ইবাদাত করবে।” [আয-যারিয়াত: ৫৬] অর্থাৎ তাদেরকে একমাত্র দু’জাহানের রব আল্লাহর জন্য ইবাদতকে একনিষ্ঠ করার নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। আল্লাহ যে ইবাদতের নির্দেশ প্রদান করেছেন তা হলো হানিফিয়্যাহ, অর্থাৎ একনিষ্ঠ। আর এটাই ইবরাহীম আলাইহিস সালামের মিল্লাত। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “বলুন, ‘নিশ্চয় আমার রব আমাকে সরল পথের হিদায়াত দিয়েছেন। তা সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন, ইবরাহীমের আদর্শ, সে ছিল একনিষ্ঠ এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না’।” [আল-আনআম : ১৬১]
আল্লাহ যেসব ইবাদতের নির্দেশ প্রদান করেছেন সেগুলোর অনেক প্রকার রয়েছে: এগুলোর কিছুই গায়রুল্লাহর জন্য সম্পাদন করা বৈধ নয়। আল্লাহ বলেন, “আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহর জন্য। কাজেই আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।” [আল-জিন : ১৮]
ইবাদতের একটি প্রকার হলো: দোয়া করা। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকে, এ বিষয়ে তার নিকট কোন প্ৰমাণ নেই; তার হিসাব তো তার রব-এর নিকটই আছে; নিশ্চয় কাফেররা সফলকাম হবে না।” [আল-মুমিনূন: ১১৭] তিনি আরো বলেন, “আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার 'ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।” [গাফির: ৬০]
আরেকটি ইবাদত হলো: তাওয়াক্কুল বা ভরসা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যদি মুমিন হও তাহলে আল্লাহর ওপরই ভরসা করো।” [আল-মায়েদা : ২৩] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “আর যে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।” [আত-তালাক : ৩]
আরেকটি ইবাদত হলো: আল্লাহর ভয় (খাশইয়াহ)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “কাজেই তাদেরকে ভয় করো না এবং আমাকেই ভয় কর।” [আল-বাকরাহ: ১৫০]
আরেকটি ইবাদত হলো: খাউফ (আশঙ্কা)। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সুতরাং তোমরা তাদেরকে ভয় করবে না, বরং আমাকে ভয় করবে, যদি তোমরা মুমিন হয়ে থাক।” [আলে ইমরান : ১৭৫]
আরেকটি ইবাদত হলো: আশা। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “তারা যাদেরকে ডাকে তারা নিজেরাই তো তাদের রবের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে কত নিকটতর হতে পারে, আর তারা তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয় আপনার রবের শাস্তি ভয়াবহ।” [আল-ইসরা : ৫৭] তিনি আরো বলেন, “বলুন, ‘আমি তো তোমাদের মত একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী হয় যে, তোমাদের ইলাহ একমাত্র সত্য ইলাহ। কাজেই যে তার রব-এর সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে ও তার রব-এর ‘ইবাদাতে কাউকেও শরীক না করে।” [আল-কাহাফ : ১১০]
আরেকটি ইবাদত হলো: আশ্রয় প্রার্থনা করা। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “বলুন, ‘আমি আশ্ৰয় প্রার্থনা করছি মানুষের রবের।” [আন-নাস: ১]
আরেকটি ইবাদত হলো: কুরবানী করা। মহা সত্য আল্লাহ বলেন, “বলুন, ‘আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।” [আল-আনআম: ১৬২]
আরেকটি ইবাদত হলো: সাহায্য প্রার্থনা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আমরা শুধু আপনারই ‘ইবাদাত করি, এবং শুধু আপনারই সাহায্য প্রার্থনা করি।” [আল-ফাতিহাহ: ৫]
আরেকটি ইবাদত হলো: উদ্ধার তলব করা। মহা সত্য আল্লাহ বলেন, “স্মরণ কর, যখন তোমরা তোমাদের রবের নিকটে উদ্ধার প্রার্থনা করছিলে, অত:পর তিনি তোমাদের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন যে, অবশ্যই আমি তোমাদেরকে সাহায্য করব এক হাজার ফিরিশতা দিয়ে, যারা একের পর এক আসবে।” [আল-আনফাল: ৯]
আমরা জানি যে, কুরআনে উল্লেখিত সর্বপ্রথম আদেশ হলো একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার আদেশ এবং তিনি ছাড়া কারো ইবাদত না করার বিষয়টি। মহানআল্লাহ বলেন, “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রব রবের ‘ইবাদাত করো যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও।” [আল-বাকারাহ: ২১] প্রত্যেক নবী তার কওমকে বলেছেন, “তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো ইলাহ নেই।” যেমন আল্লাহ তা‘আলা রাসূলদের প্রথম ব্যক্তি সম্পর্কে বলেন, “অবশ্যই আমি নূহ্কে পাঠিয়েছিলাম তার সম্প্রদায়ের কাছে। অতঃপর তিনি বলেছিলেন, 'হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদাত কর, তিনি ছাড়া তোমাদের অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই। নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর মহাদিনের শাস্তির আশংকা করছি।” [আল-আরাফ: ৫৯] আল্লাহ তা‘আলা তাদের সর্বশেষ রাসূল সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনিও তার কওমকে বলেছেন: “আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত করো এবং তাঁর সাথে কাউকে শরীক করো না।” [আন-নিসা : ৩৬] মহান আল্লাহ আরো বলেন, “আর আমি অবশ্যই প্রত্যেক জাতিতে একজন রাসূল প্রেরণ করেছি যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং পরিহার কর তাগূতকে।” [আন-নাহল: ৩৬]
আমরা জানি যে, যাবতীয় ইবাদাত আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের জন্য খালিস নিয়তে এবং সাইয়্যেদুল মুরসালীনের সুন্নাত মোতাবেক না হলে মাকবূল হয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে’।” [আল-কাহাফ : ১১০]
আমরা জানি যে, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলাই ইবাদতের উদ্দেশ্য হওয়া ওয়াজিব, যার কোনো শরীক নেই। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “নিশ্চয়ই প্রতিটি আমলের গ্রহণযোগ্যতা তার নিয়্যাতের উপর নির্ভরশীল। কোন ব্যক্তি তা-ই লাভ করবে যা সে নিয়্যাত করে থাকে। যে ব্যক্তি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে হিজরত করবে তার হিজরত আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকেই হবে। আর যার হিজরত দুনিয়া লাভের জন্য হবে অথবা কোন নারীকে বিয়ে করার জন্য হবে তার হিজরত সে উদ্দেশেই হবে যে জন্য সে হিজরত করেছে।” {বুখারী (৬৬৮৯), মুসলিম (১৯০৭), আবূ দাউদ (২২০১), তিরমিযী (১৬৪৭), নাসাঈ (৭৫), ইবনু মাজাহ (৪২২৭)}
আল্লাহু সুবহানাহু ছোট-বড় প্রত্যেক শিরক থেকে সতর্ক করেছেন। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রটনা করে।” [আন-নিসা : ৪৮] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহু তাবারাকা ওয়া তাআলা বলেন, ‘আমি সমস্ত অংশীদারদের চাইতে অংশীদারি [শিরক] থেকে অধিক অমুখাপেক্ষী। যদি কেউ এমন কাজ করে যাতে সে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, আমি তাকে ও তার শির্ককে বর্জন করি।” মুসলিম: (২৯৮৫)
অতএব যে ব্যক্তি একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর জন্য আমল করল, কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত অনুপাতে করল না, তার আমল প্রত্যাখ্যাত হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আর্দশ, তার জন্য যে আসা রাখে আল্লাহ্ ও শেষ দিনের এবং আল্লাহ্কে বেশী স্মরণ করে।” [আল-আহযাব: ২১] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে কেউ এমন আমল করল যা আমাদের শরী‘আতে নেই তা প্রত্যাখ্যাত।” মুসলিম: (১৭১৮) সম্মানিত আল্লাহ বলেছেন, “যারা তাঁর আদেশের বিপরীত করে তাদের এ ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত যে, যেন তাদেরকে কোন ফিতনা কিংবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি না পেয়ে বসে”। [আন-নূর: ৬৩] তিনি আরো বলেছেন, “বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আলে ইমরান: ৩১]
আমরা জানি যে, ইবাদতের তিনটি মূলনীতি রয়েছে: পরিপূর্ণ মহব্বত, পরিপূর্ণ আশা ও পরিপূর্ণ ভয়। নবীগণ এসব গুণে পরিপূর্ণরূপে গুণান্বিত ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা তাদের অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বলেন, “নিশ্চয় তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত, আর আমাকে আশা ও ভীতিসহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।” [আল-আম্বিয়া : ৯০] তিনি আরো বলেছেন, “আর যারা যা দেয়ার তা দেয় ভীত-কম্পিত হৃদয়ে, এজন্য যে তারা তাদের রব-এর কাছে প্রত্যাবর্তনকারী।* তারাই দ্রুত সম্পাদন করে কল্যাণকর কাজ এবং তারা তাতে অগ্রগামী হয়।” [আল-মুমিনূন: ৬০, ৬১] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরো বলেন, “তাদের পার্শ্বদেশ শয্যা হতে দূরে থাকে; তারা তাদের রবকে ডাকে আশংকা ও আশায় এবং আমি তাদেরকে যে রিযিক দান করেছি তা থেকে তারা ব্যয় করে।” [আস-সাজদাহ: ১৬] মহান আল্লাহ আরো বলেন, “যে ব্যক্তি রাতের বিভিন্ন প্রহরে সাজ্দাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে আনুগত্য প্রকাশ করে, আখিরাতকে ভয় করে এবং তার রবের অনুগ্রহ প্রত্যাশা করে, (সে কি তার সমান, যে তা করে না?)” [আয-যুমার : ৯]
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আল্লাহ্ ঘোষণা করেন, আমি সে রকমই যে রকম বান্দা আমার প্রতি ধারণা রাখে। আমি বান্দার সঙ্গে থাকি যখন সে আমাকে স্মরণ করে। যদি সে মনে মনে আমাকে স্মরণ করে; আমিও তাকে নিজে স্মরণ করি। আর যদি সে সমাবেশে আমাকে স্মরণ করে, তবে আমিও তাদের চেয়ে উত্তম সমাবেশে তাকে স্মরণ করি। যদি সে আমার দিকে এক বিঘত এগিয়ে আসে, আমি তার দিকে এক হাত এগিয়ে যাই, যদি সে আমার দিকে এক হাত অগ্রসর হয়, আমি তার দিকে দু’ হাত এগিয়ে যাই। আর সে যদি আমার দিকে হেঁটে আসে, আমি তার দিকে দৌড়ে যাই।” {বুখারী (৭৪০৫), মুসলিম (২৬৭৫), তিরমিযী (৩৬০৩), ইবনু মাজাহ (৩৮২২)}
মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে, যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তাদেরকে আল্লাহকে ভালবাসার মত ভালবাসে। আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহর জন্য ভালবাসায় দৃঢ়তর।” [আল-বাকারাহ: ১৬৫] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যার মধ্যে তিনটি গুণ থাকে সে এর দ্বারা ঈমানের মিষ্টতা লাভ করে: আল্লাহ ও তাঁর রাসূল তার কাছে অন্য সব কিছু থেকে অধিক প্রিয় হবে, কাউকে ভালোবাসলে কেবল আল্লাহর জন্যই ভালবাসবে, আর কুফরী থেকে তাকে আল্লাহর বাঁচানোর পর পুনরায় তাতে ফিরে যাওয়াকে এমন অপছন্দ করবে, যেমন সে নিজেকে আগুনে নিক্ষিপ্ত করাকে অপছন্দ করে।” {বুখারী (১৬), মুসলিম: (৪৩), তিরমিযি (২৬২৪), নাসাঈ (৪৯৮৭), ইবনু মাজাহ (৪০৩৩)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সেই আল্লাহর শপথ, যার হাতে আমার প্রাণ, তোমাদের কেউ প্রকৃত মু‘মিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার নিকট তার পিতা ও সন্তানাদির চেয়ে অধিক প্রিয় হই।” {বুখারী (১৪), নাসায়ী (৫০১৫)} বান্দা রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনুগত্য করা ছাড়া আল্লাহর মহব্বত লাভে সক্ষম হবে না। মহা সত্য আল্লাহ বলেন, “বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লহকে ভালবাস তবে আমাকে অনুসরণ কর, আল্লাহ্ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আলে ইমরান : ৩১]
মুমিনগণ সবচেয়ে মহান যা কামনা করে তা হলো আল্লাহর সম্মানিত চেহারার দর্শন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সেদিন কোনো কোনো মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হবে,* তারা তাদের রবের দিকে তাকিয়ে থাকবে।” [আল-কিয়ামাহ: ২২-২৩]
আল্লাহর দিদার জান্নাতীদের সবচেয়ে উঁচুমানের নিআমত হবে, বরং তা হলো তাদের নিআমতের ওপর অতিরিক্ত নিআমত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যারা ইহসানের সাথে আমল করে (উত্তমরূপে কাজ করে) তাদের জন্য আছে জান্নাত এবং আরো বেশী। কালিমা ও হীনতা তাদের মুখমন্ডলকে আছন্ন করবে না। তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।” [ইউনুস: ২৬]
সুহাইব রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “জান্নাতীগণ যখন জান্নাতে প্রবেশ করবে তখন আল্লাহ তা’আলা তাদেরকে বলবেন, তোমরা কি চাও আমি আরো অনুগ্রহ বাড়িয়ে দেই? তারা বলবে, আপনি কি আমাদের চেহারাগুলো আলোকজ্জ্বল করে দেননি, আমাদের জান্নাতে দাখিল করাননি এবং জাহান্নাম থেকে নাজাত দেননি? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এরপর আল্লাহ তা’আলা আবরণ তুলে নিবেন। বস্তুত আল্লাহর দর্শন লাভের চেয়ে অধিক পছন্দনীয় জিনিস আর কিছুই তাদের দেয়া হয়নি।” {মুসলিম (১৮১), তিরমিযী (২৫৫২), ইবনু মাজাহ (১৮৭)}
অধ্যায়: অসীলা গ্রহণ ও অসীলা প্রসঙ্গে
অসীলা হলো, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা এমন সব কাজ দ্বারা যা তাকে সন্তুষ্ট করে, তা ওয়াজিব হোক বা মুস্তাহাব।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তিনি তাদের দোয়ায় সাড়া প্রদানের ওয়াদা দিয়েছেন। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।” [গাফির: ৬০] মহা প্রশংসিত ও পবিত্র নামসমূহের অধিকারী সত্ত্বা আরো বলেন, “আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞেস করে, (তখন বলে দিন যে) নিশ্চয় আমি অতি নিকটে। আহবানকারী যখন আমাকে আহবান করে আমি তার আহবানে সাড়া দেই। কাজেই তারাও আমার ডাকে সাড়া দিক এবং আমার প্রতি ঈমান আনুক, যাতে তারা সঠিক পথে চলতে পারে।” [আল-বাকারাহ: ১৮৬]
আমরা জানি যে, আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ ও তাঁর সুউচ্চ সিফাত দ্বারা তার নিকট অসীলা গ্রহণ করা যায়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন, “আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাঁকে সেসব নামেই ডাক; আর যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন কর; তাদের কৃতকর্মের ফল অচিরেই তাদেরকে দেয়া হবে।” [আল আরাফ: ১৮০] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “বলুন, ‘তোমরা ‘আল্লাহ্’ নামে ডাক বা ‘রহমান’ নামে ডাক, তোমরা যে নামেই ডাক সকল সুন্দর নামই তো তাঁর। আর আপনি সালাতে স্বর খুব উচ্চ করবেন না আবার খুব ক্ষীণও করবেন না; বরং এ দুয়ের মধ্যপথ অবলম্বন করুন।” [আল-ইসরা: ১১০]
এজন্য নবী ও রাসূলগণের অধিকাংশ দোয়া হতো তাঁর সুন্দর নামসমূহের অসীলা দ্বারা। যেমন আল্লাহ তা‘আলা আদম ও তার স্ত্রী সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, তারা বলেছে: “হে আমাদের রব ! আমারা নিজেদের প্রতি যুলুম করছি। আর যদি আপনি আমাদেরকে ক্ষমা না করেন এবং দয়া না করেন, তবে অবশ্যই আমরা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হব।” [আল-‘আরাফ : ২৩] আর ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম বলেছেন, “হে আমার রব! আমাকে সালাত কয়েমকারী করুন এবং আমার বংশধরদের মধ্য হতেও। হে আমাদের রব! আর আমার দো’আ কবূল করুন।” [ইবরাহীম: ৪০] আর মূসা আলাইহিস সালাম বলেছেন, “হে আমার রব! আমাকে ও আমার ভাইকে ক্ষমা করুন এবং আমাদেরকে আপনার রহমতের মধ্যে প্রবিষ্ট করুন। আর আপনিই শ্রেষ্ঠ দয়ালু।” [আল-আরাফ: ১৫১]
অনুরূপভাবে আল্লাহর প্রতি ঈমান দ্বারাও অসীলা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে আমাদের রব! আপনি যা নাযিল করেছেন তার প্রতি আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা এ রাসূলের অনুসরণ করেছি। কাজেই আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।” [আলে ইমরান : ৫৩]
অনুরূপভাবে নেক আমল দ্বারা অসীলা হয়। যেমন তিনজন ব্যক্তির ঘটনা রয়েছে যারা গুহার মধ্যে আটকা পড়েছিল: আব্দুল্লাহ ইবন উমার রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “তোমাদের পূর্ববর্তীদের মধ্যে তিন ব্যক্তি সফরে বের হয়ে তারা রাত কাটানোর জন্য একটি গুহায় আশ্রয় নেয়। হঠাৎ পাহাড় থেকে এক খণ্ড পাথর পড়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। তখন তারা নিজেদের মধ্যে বলতে লাগল তোমাদের সৎকার্যাবলীর উসীলা নিয়ে আল্লাহর কাছে দো‘আ করা ছাড়া আর কোনো কিছুই এ পাথর থেকে তোমাদেরকে মুক্ত করতে পারে না। তখন তাদের মধ্যে একজন বলতে লাগল, হে আল্লাহ! আমার পিতা-মাতা খুব বৃদ্ধ ছিলেন। আমি কখনো তাদের আগে আমার পরিবার-পরিজনকে কিংবা দাস-দাসীকে দুধ পান করাতাম না। একদিন কিছু একটার তালাশ আমাকে অনেক দূর নিয়ে চলে যায়, কাজেই আমি তাদের ঘুমিয়ে পড়ার পূর্বে ফিরতে পারলাম না। আমি তাদের জন্য দুধ দোহায়ে নিয়ে এলাম। কিন্তু তাদেরকে ঘুমন্ত পেলাম। আমি তাদের জাগিয়ে দিতে এবং তাদের আগে আমার পরিবার-পরিজন ও দাস-দাসীকে দুধ পান করাতে অপছন্দ করলাম। তাই আমি তাদের জেগে উঠার অপেক্ষায় পেয়ালাটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। এভাবে ভোরের আলো ফুটে উঠল এবং বাচ্চারাও আমার পায়ের নিকট কাঁদতে ছিল। তারপর তারা জাগলেন এবং দুধ পান করলেন। হে আল্লাহ! যদি আমি তোমার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এ কাজ করে থাকি, তবে এ পাথরের কারণে আমরা যে বিপদে পড়েছি, তা আমাদের হতে দূর করে দাও। ফলে পাথর সামান্য সরে গেল, কিন্তু তাতে তারা বের হতে পারল না। দ্বিতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ! আমার এক চাচাতো বোন ছিল। সে আমার খুব প্রিয় ছিল। অন্য বর্ণনায় এসেছ: আমি তাকে এতখানি ভালোবাসতাম, যতখানি একজন পুরুষ কোনো নারীকে ভালোবাসতে পারে। আমি তার সাথে সঙ্গত হতে চাইলাম। কিন্তু সে বাধা দিল। তারপর এক বছর ভীষণ দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে সে আমার কাছে (সাহায্যের জন্য) এল। আমি তাকে একশ’ বিশ দিনার এ শর্তে দিলাম যে, সে আমার সাথে একান্তে মিলিত হবে, তাতে সে রাজি হলো। আমি যখন সম্পূর্ণ সুযোগ লাভ করলাম, তখন সে বলল, আমি তোমাকে অবৈধভাবে সিলমোহর ভাঙ্গার অনুমতি দিতে পারি না। অন্য বর্ণনায় এসেছে: যখন আমি তার দু’পায়ের মাঝে বসলাম তখন সে বলল, তুমি আল্লাহকে ভয় কর। ফলে সে আমার সর্বাধিক প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও আমি তার সাথে সঙ্গত হওয়া পাপ মনে করে তার কাছ থেকে ফিরে আসলাম এবং আমি তাকে যে স্বর্ণমুদ্রা দিয়েছিলাম, তাও ছেড়ে দিলাম। হে আল্লাহ! আমি যদি এ কাজ তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য করে থাকি, তবে আমরা যে বিপদে পড়ে আছি তা দূর কর। তখন সেই পাথরটি (আরো একটু) সরে পড়ল। কিন্তু তাতেও তারা বের হতে পারছিল না। আর তৃতীয় ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহ! আমি কয়েকজন মজদুর নিয়োগ করেছিলাম এবং আমি তাদেরকে তাদের মজুরীও দিয়েছিলাম, কিন্তু একজন তার প্রাপ্য না নিয়ে চলে গেল। আমি তার মজুরীর টাকা কাজে খাটিয়ে তা বাড়াতে লাগলাম। তাতে প্রচুর ধন-সম্পদ অর্জিত হলো। কিন্তু কিছুকাল পর সে আমার নিকট এসে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! আমাকে আমার মজুরী দিয়ে দাও। আমি তাকে বললাম, এসব উট, গরু, ছাগল ও গোলাম যা তুমি দেখতে পাচ্ছ, তা সবই তোমার মজুরী। সে বলল, হে আল্লাহর বান্দা! তুমি আমার সাথে বিদ্রূপ করো না। তখন আমি বললাম, আমি তোমার সাথে মোটেই বিদ্রূপ করছি না। তখন সে সব গ্রহণ করল এবং নিয়ে চলে গেল। তা থেকে একটাও ছেড়ে গেল না। হে আল্লাহ! আমি যদি তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য এ কাজ করে থাকি, তবে আমরা যে বিপদে পড়েছি, তা দূর কর। তখন ঐ পাথরটি সম্পূর্ণ সরে পড়ল। তারপর তারা বেরিয়ে এসে পথ চলতে লাগল।” {সহীহ বুখারী (২২৭২), মুসলিম (২৭৪৩)}
এছাড়াও বিভিন্ন প্রকার ইবাদত দ্বারা আল্লাহর নিকট অসীলা গ্রহণ করা যায়। তন্মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দোয়া। মহান আল্লাহ তাঁর নবীগণ সম্পর্কে বলেন, “নিশ্চয় তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতিসহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।” [আল-আম্বিয়া: ৯০] দোয়ার বিশেষ কিছু স্থান ও সময় হলো: সালাতের শেষে, রাতের শেষ তৃতীয়াংশ, সিয়াম রেখে ইফতারের সময়, তাওয়াফের সময়, সাফা ও মারওয়াতে, আরাফাতে, মুজদালিফায় ও জামারাতে পাথর নিক্ষেপের পর।
নিজের অবস্থাকে উল্লেখ করে এবং আল্লাহর কাছে অভাব প্রকাশ করার দ্বারাও অসীলা হয়। বস্তুত বান্দা আল্লাহর সাহায্য ও তাঁর রহমতের মুখাপেক্ষী। আল্লাহ তা‘আলা মূসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি বলেছেন: “হে আমার রব! আপনি আমার প্রতি যে অনুগ্রহ করবেন আমি তার মুখাপেক্ষী।” [আল-কাসাস: ২৪] প্রশংসিত আল্লাহ তাঁর নবী আইয়ূব আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন, তিনি দোয়া করে বলেছেন, “নিশ্চয় আমাকে কষ্ট স্পর্শ করেছে, আর আপনি তো সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু।” [আল-আম্বিয়া : ৮৩]
অনুরূপভাবে কোনো মুসলিম ব্যক্তি কর্তৃক অপর জীবিত উপস্থিত নেককার ব্যক্তির কাছে দোয়া চাওয়ার দ্বারাও অসীলা নেয়া যায়। যেমন ইউসূফের ভাইয়েরা নিজেদের জন্য তাদের বাবার কাছে ইস্তেগফার করার প্রার্থনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমাদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন; আমরা তো অপরাধী।” [ইউসূফ: ৯৭] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “যখন তারা নিজেদের প্রতি যুলুম করে তখন তারা আপনার কাছে আসলে ও আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করলে এবং রাসূলও তাদের জন্য ক্ষমা চাইলে তারা অবশ্যই আল্লাহকে পরম ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালুরূপে পাবে।” [আন-নিসা : ৬৪] আনাস ইবনু মালিক সূত্রে তার খালা উম্মু হারাম বিনতু মিলহান হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার নিকটবর্তী এক স্থানে শুয়েছিলেন, অতঃপর জেগে উঠে মুচকি হাসলেন। আমি বললাম, হাসলেন কেন? তিনি বললেন, আমার উম্মাতের এমন কিছু লোককে আমার সামনে উপস্থিত করা হলো যারা এই নীল সমুদ্রে আরোহণ করছে, যেমন বাদশাহ সিংহাসনে আরোহণ করে। উম্মু হারাম বললেন, আল্লাহর নিকট দুআ করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তার জন্য দুআ করলেন। অতঃপর দ্বিতীয়বার নিদ্রা গেলেন এবং আগের মতই করলেন। উম্মু হারাম আগের মতই বললেন এবং আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আগের মতই জবাব দিলেন। উম্মু হারাম বললেন, আল্লাহর নিকট দুআ করুন যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। আল্লাহর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন, তুমি প্রথম দলের অন্তর্ভুক্ত থাকবে।” {বুখারী (২৭৯৯), মুসলিম (১৯১২), আবূ দাউদ (২৪৯০), নাসায়ী (৩১৭২) ও ইবনু মাজাহ (২৭৭৬)}
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন বিনা হিসেবে জান্নাত প্রবেশকারী সত্তর হাজার লোকের বিবরণ দিলেন, তখন উক্কাশাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে বললেন, “আপনি আল্লাহর নিকট দোয়া করুন, তিনি যেন আমাকে তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন।” মুসলিম: (২১৮)
আনাস রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, মদিনাবাসী যখন দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হতো, তখন ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আব্বাস ইবন আব্দুল মুত্তালিবের অসীলা দ্বারা বৃষ্টি প্রার্থনা করতেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ, আমরা আপনার নিকট আমাদের নবী দ্বারা অসীলা গ্রহণ করতাম, ফলে আপনি আমাদের বৃষ্টি দান করতেন। আর এখন আমরা আমাদের নবীর চাচার দ্বারা অসীলা গ্রহণ করছি, অতএব আমাদেরকে বৃষ্টি দান করুন। ফলে তাদের বৃষ্টি দান করা হত।” বুখারী (১০১০) কাজেই সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম বৃষ্টি তলব ও অসীলা গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের দোয়ার পরিবর্তে—যেহেতু তিনি মারা গেছেন—আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর দোয়ার অসীলা গ্রহণ করেছেন। কারণ, তারা জানতেন যে, এটা হলো বৈধ অসীলা। ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু আব্বাস-এর দোয়া দ্বারা অসীলা গ্রহণ করেছেন, আব্বাসের ব্যক্তিসত্ত্বা দ্বারা নয়। কারণ, আব্বাসের ব্যক্তিসত্ত্বা দ্বারা অসীলা গ্রহণ উদ্দেশ্য হতো তাহলে ব্যক্তিসত্ত্বা হিসেবে তার চেয়ে বেশী উপযুক্ত ছিলেন নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম।
আল্লাহ যা অনুমোদন দেননি তা দ্বারা অসীলা গ্রহণ করা বৈধ নয়। জাহেলী যুগের লোকেরা তাদের মূর্তি ও ইলাহর অসীলা নিয়ে আল্লাহর নৈকট্য তলব করতো। আল্লাহ তা‘আলা তাদের এ নিকৃষ্ট কর্ম সম্পর্কে বলেন, “আর যারা আল্লাহ ছাড়া অন্যদেরকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা কেবল এ জন্যই তাদের ইবাদাত করি যে, তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেবে।” [আয-যুমার : ৩]
পর্ব: ঈমানের মৌলিক ভিত্তি অথবা এর পূর্ণতার পরিপন্থী বিষয়সমূহ।
পর্বটির সারাংশ
আমরা জানি যে, ঈমানের বিপরীত বিষয়সমূহের একটি হলো: আল্লাহর সাথে কুফরী করা।
কুফরী বড় ও ছোট হয়। বড় কুফরী মিল্লাত তথা দ্বীন থেকে খারিজ করে দেয়। আল্লাহ তায়ালা বড় কুফরীতে লিপ্ত ব্যক্তির ফরয ও নফল কিছুই কবুল করবেন না। এটা সকল আমলকে বরবাদ করে দেয়। আর কাফির ব্যক্তি চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী হবে। পক্ষান্তরে ছোট কুফরী ঈমানের পূর্ণতার পরিপন্থী।
আমরা জানি যে, বড় কুফর কয়েক প্রকার: আল্লাহ তাঁর কিতাবে সে সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কাফিরদের কুফরী কখনো হয় অস্বীকারবশত, কখনো হয় সত্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা ও অহংকারবশত, কখনো হয় মিথ্যারোপবশত, মৌখিক মিথ্যারোপ বা অন্তরে মিথ্যারোপ করার মাঝে কোনো তফাৎ নেই। আবার কখনো হয় সন্দেহ ও ধারণাবশত, সে সত্য বিষয়ে সন্দিহান এবং পুনরুত্থান ও আল্লাহর সাক্ষাতের ব্যাপারে সন্দেহপোষণকারী। আবার কখনো হয় গালমন্দ ও উপহাসবশত, কখনো হয় আল্লাহর রাস্তা থেকে বিরত থেকে ও বিরত রেখে, কখনো হয় সত্যকে অপছন্দ করার কারণে।
আমরা জানি যে, বড় কুফরের চেয়ে ছোট আরেক প্রকার কুফর রয়েছে। তা মূল ঈমানের বিপরীত নয়, তবে তার পরিপূর্ণতার বিপরীত। এটি ব্যক্তিকে চিরস্থায়ীভাবে জাহান্নামী করবে না এবং তার সকল আমলও ধ্বংস করে না। এর অনেক প্রকার রয়েছে।
তন্মধ্যে: মুসলিমের সাথে যুদ্ধ করা। এই কুফরী ব্যক্তিকে মিল্লাত (দ্বীন) থেকে বের করবে না এবং তাকে জাহান্নামে স্থায়ী করবে না। কারণ, আল্লাহ যুদ্ধরত মুমিনদেরকে ভাই ভাই বলেছেন। তারা যুদ্ধরত থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে মুমিন নামকরণ করেছেন।
আমরা জানি যে, আল্লাহর প্রতি ঈমানের পরিপন্থী বিষয়সমূহের অন্যতম হলো: মহান আল্লাহর সাথে শিরক করা। আর শিরক হলো সবচেয়ে বড় জুলম,এটা সকল আমলকে বরবাদ করে দেয়। শিরক এমন পাপ যদি তাওবা না করাবস্থায় মারা যায় আল্লাহ মুশরিককে ক্ষমা করবেন না। কাজেই মুশরিক তাওবা না করে মারা গেলে তার ওপর জান্নাত হারাম এবং তার ঠিকানা হলো জাহান্নাম। সেখানেই সে স্থায়ী হবে।
আল্লাহ শিরককে বাতিল ঘোষণা করেছেন এবং মুশরিকদের ওপর তাদের শিরকের তিরস্কার করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, তাদের গ্রহণ করা শরীকগণ অসার এবং তারা উপকার বা ক্ষতি করতে পারে না। যেমন কখনো বর্ণনা করেছেন যে, এসব শরীক শোনে না, যদিও শোনে যারা তাদেরকে ডাকে সাড়া দেয় না। কখনো তিনি বর্ণনা করেছেন যে, এসব শরীক উপকার ও ক্ষতি করে না এবং জীবন ও মৃত্যুর মালিক নয়। কখনো তিনি বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহ ছাড়া এসব উপাস্য যারা তাদের উপাসনা করে তাদের চেয়েও অধম। কারণ, তারা চলতে, ধরতে, শুনতে ও দেখতে পারে না। কখনো সম্মানিত রব এসব উপাস্যের অক্ষমতা ও দুর্বলতা প্রকাশ করেছেন। কখনো তিনি তার ওপর অভাব ও দৈন্যতা এবং আসমান ও জমিনে অনু পরিমাণ কোনো বস্তুর পূর্ণ মালিক না হওয়ার ফয়সালা করেছেন এবং তার কোনো জিনিসে তাদের কোনো অংশী নেই। জগতের কোনো জিনিসই আল্লাহ তা‘আলার সাহায্যকারী ও মদদকারী নয় এবং তার কাছে সুপারিশকারীও নয়। কখনো পবিত্র সত্ত্বা বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর সাথে আরো উপাস্য থাকা বিবেক দ্বারা অস্বীকৃত ও পার্থিব নীতি অনুযায়ী অসম্ভব এবং শরীয়তের দৃষ্টিকোন থেকেও বাতিল।
আমরা জানি যে, বড় শিরক অনেক রকমের:
তন্মধ্যে: আল্লাহর সাথে তাঁর রবুবিয়্যাত, সৃষ্টি, মালিকানা, রিযিক ও পরিচালনায় শরীক সাব্যস্ত করা। অথচ আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, তিনিই সৃষ্টি ও আদেশের হকদার।
তন্মধ্যে: বান্দা কর্তৃক আল্লাহর সন্তান সাব্যস্ত করা। অথচ আল্লাহ সন্তান গ্রহণ করা থেকে পবিত্র ও মহান।
তন্মধ্যে: তারকারাজির প্রতি ঈমান আনয়ন করা ও এগুলোর পূজা করা। এর অন্তর্ভুক্ত হলো: তারকারাজির মাধ্যমে বৃষ্টি তলব করা এবং বিশ্বাস করা যে, তা রিযিক নিয়ে আসে।
তন্মধ্যে: আল্লাহু সুবহানাহুর নাম ও সিফাতসমূহে শরীক স্থাপন করা। যেমন ধারণা করা যে, আল্লাহ ছাড়া কেউ গায়েব জানেন। বস্তুত আল্লাহর যেসব নাম আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো জন্য উপযুক্ত নয়, যেমন “আল্লাহ” শব্দ অথবা রহমান শব্দ দ্বারা যে কেউ নিজের নামকরণ বা অন্য কারো নামকরণ করবে তার জন্য কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে।
তন্মধ্যে: বিশ্বাস করা যে, মাখলূকের মধ্য থেকেও কেউ কেউ উলূহিয়্যাতের পরিপূর্ণতায় বিশেষিত, অথবা সে প্রত্যেক বস্তুর ওপর ক্ষমতাবান! এটা কিভাবে সম্ভব?! অথচ আল্লাহ তা‘আলা তিনি ছাড়া সকল উপাসক ও উপাস্যদের পরিপূর্ণ অক্ষমতাকে প্রকাশ করেছেন।
তন্মধ্যে: আল্লাহর সাথে অন্য আরো ইলাহ সাব্যস্ত করা।
তন্মধ্যে: গায়রুল্লাহর জন্য ইবাদত বা ইবাদতের অংশবিশেষ পালন করা।
তন্মধ্যে: নৈকট্য অর্জনের লক্ষ্যে গায়রুল্লাহর জন্য যবেহ করা, যেমন মূর্তিদের জন্য যবেহ করা অথবা মৃত ব্যক্তিদের নৈকট্য হাসিলের জন্য তাদের উদ্দেশ্যে যবেহ করা।
তন্মধ্যে: গায়রুল্লাহর জন্য মানত করা। মানত একটি ইবাদত যা আল্লাহ ছাড়া কারো জন্যই নিবেদন করা বৈধ নয়। এ কারণে আল্লাহ মান্নত পূরণকারী মুমিনদের প্রশংসা করেছেন।
তন্মধ্যে: গায়রুল্লাহর কাছে পানাহ/আশ্রয় চাওয়া।
তন্মধ্যে: যেসব বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া কেউ ক্ষমতাবান নয় যেসব বিষয়ে গায়রুল্লাহর কাছে সাহায্য ও ফরিয়াদ তলব করা অথবা গায়রুল্লাহকে আহবান করা।
তন্মধ্যে: গায়রুল্লাহর জন্য আনুগত্যের শিরিক করা। আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, কিতাবীরা তাদের আলেম ও সন্ন্যাসীদেরকে এমন রব হিসেবে গ্রহণ করেছে যারা তাদের জন্য শরীয়ত নির্ধারণ করতো এবং আল্লাহ তাদের জন্য যা হালাল করেছেন তা তাদের ওপর হারাম করতো।
তন্মধ্যে: সালাত, রুকু, সাজদা ও তাওয়াফে শিরক করা। কারণ, এসব ইবাদত ও এর মত অন্যান্য ইবাদত গায়রুল্লাহর জন্য ব্যয় করা বৈধ নয়। আল্লাহ তাঁর খলীল আলাইহিস সালামকে রুকুকারী, সাজদাকারী, ইতেকাফকারী ও তাওয়াফকারীদের জন্য তাঁর ঘরকে পবিত্র করার নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেছেন যে, অহংকারকারীদের ছাড়া কেউ তাঁর ইবাদত থেকে বিমুখ হয় না এবং সকল মাখলূক আল্লাহর জন্য সাজদা করে।
তন্মধ্যে: আল্লাহ যা নাযিল করেননি তা দ্বারা বিচার করা এবং গায়রুল্লাহর কাছে বিচারপ্রার্থী হওয়া, যেমনটি করেছে আহলে কিতাব ও অন্যরা। যেমন তারা এমন কতককে আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করেছে যারা তাদের জন্য বিধান রচনা করতো। এটি এক দৃষ্টিকোন থেকে কুফরী অপর দৃষ্টিকোন থেকে জুলম এবং আবার অন্য দিক থেকে অবাধ্যতা।
তন্মধ্যে: মহব্বতের শিরক, আর তা হলো যখন একজন ব্যক্তি কোনো সৃষ্টিকে এমনভাবে ভালোবাসে, যা অবমাননা, শ্রদ্ধা এবং বিনয়ের সংমিশ্রণে হয়।
তন্মধ্যে: ভয় ও আতঙ্কজনিত শিরক, আর তা হলো কোনো মাখলূককে বিনয় (আত্মসমর্পণ), হীনতা ও ভক্তিজড়িত ভয় করা। যেন এমন বিশ্বাস নিয়ে ভয় করছে যে, সে তার ওপর বিপদ নিয়ে আসতে পারে বা তার থেকে কল্যাণকে প্রতিহত করতে পারে, অথবা তার জন্য সে কোনো ওয়াজিব ছেড়ে দিতে পারে অথবা তার জন্য কোনো হারাম কাজ করতে পারে। মহা সম্মানিত আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, তার অলীগণ আল্লাহু সুবহানাহু ছাড়া কাউকে ভয় করে না।
তন্মধ্যে: আশাজনিত শিরক, আর তা হলো যেমন কেউ জীবিত বা মৃত সৃষ্টির কাছে এমন কিছু আশা করে, যা আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ তা করতে সক্ষম নয়, অথবা মৃতদের কাছে বিপদ মুক্তি, প্রয়োজন মেটানো এবং কিয়ামতের দিনে শাফায়াত আশা করা।
তন্মধ্যে রয়েছে: যাদু।
তন্মধ্যে: ভবিষ্যদ্বাণী ও গণকবৃত্তি। কারণ, এর দাবিদার মূলত গায়েবী ইলমের দাবিদার।
আমরা জানি যে, শিরকের মধ্যে ছোট শিরক রয়েছে যা দ্বীন থেকে খারিজ করে না এবং মূল ঈমানের বিপরীতও নয়, তবে ঈমানের পূর্ণতার বিপরীত। আর তা ব্যক্তিকে জাহান্নামে স্থায়ী করে না এবং সকল আমলকে বরবাদও করে না। এর অনেক প্রকার রয়েছে:
তন্মধ্যে: শুভ-অশুভ লক্ষণ গ্রহণ করা। আর এর সংজ্ঞা হলো- যেমন হাদীসে আছে - যা তোমাকে পরিচালিত করে অথবা বিরত রাখে।
তন্মধ্যে: তাবীজ ঝুলানো।
তন্মধ্যে: অল্প রিয়া বা লৌকিকতা; তবে যার অন্তর রিয়াতে পূর্ণ এবং যে নেক কাজগুলো নিয়ত ছাড়া, ঈমান ছাড়া ও ভয় ছাড়াই সম্পাদন করে সে তো খালিস মুনাফিক। তার আমল বরবাদ, পরিত্যাজ্য ও অগ্রহণযোগ্য। রাসূলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটাকে গোপন শিরক নামকরণ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, রিয়া হলো খুবই গোপন। তিনি তার উম্মতের ওপর মাসীহ দাজ্জাল থেকেও রিয়া বা লৌকিকতার বেশী ভয় করেছেন।
তন্মধ্যে: মানুষের তার আমল দ্বারা দুনিয়া উদ্দেশ্য করা। এটি বান্দার অবস্থা ভেদে কখনো বড় শিরক ও কখনো ছোট শিরক হয়।
তন্মধ্যে: জ্যোতিষশাস্ত্র। অন্তরের অবস্থাভেদে জোতিষশাস্ত্র কখনো বড় শিরক কখনো ছোট শিরক হয়।
তন্মধ্যে: কোনো ব্যক্তির এ কথা বলা: ما شاء الله وشئت (আল্লাহ ও তুমি যা চেয়েছো) এবং এ জাতীয় শব্দাবলী।
তন্মধ্যে: গায়রুল্লাহর নামে কসম খাওয়া।
আমরা জানি যে, আল্লাহর প্রতি ঈমানের পরিপন্থী বিষয়গুলোর একটি হলো: নিফাকী। তা হলো ইসলাম প্রকাশ করা ও কুফরী গোপন রাখা। আর তা বড় ও ছোট উভয়ই হয়। বস্তুত নিফাকী হলো এক প্রকার কুফরী। অর্থাৎ আল্লাহর সাথে কুফরী করা ও গায়রুল্লাহের ইবাদত করা এবং প্রকাশ্যে ইসলামকে জাহির করা। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের মুনাফিকগণ ছিলো। বড় নিফাকী ইসলাম থেকে খারিজ করে দেয়। আমরা আল্লাহর সাক্ষ্যতে সাক্ষ্য প্রদান করি যে, মুনাফিকরা তাদের ঈমানের দাবিতে মিথ্যাবাদী।
আল্লাহ মুনাফিকের ফরয ও নফল কোনো ইবাদত কবুল করবেন না। মুনাফিকের ভবিষ্যত হলো—যদি নিফাকের ওপর মারা যায়—স্থায়ীভাবে জাহান্নাম।
আমরা জানি যে, বড় নিফাক হলো সত্যের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ ও সত্যকে অপছন্দ করা; ইসলাম ও মুসলিমদের পরাজয়ে খুশি হওয়া, ইসলামের বিজয় দেখে হতাশ হওয়া; ঈমানের পর কুফরী করা, শরীয়তের ফয়সালা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা, আল্লাহর সাথে খারাপ ধারণা করা যে, তিনি তাঁর দ্বীন ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাহায্য করবেন না, সত্য ও সত্যের ধারকদের সাথে ঠাট্টা করা এবং তাদেরকে গালমন্দ ও উপহাস করা, ইশারা-ইঙ্গিতে মুসলিমদের বদনাম করা; মুমিনদেরকে ধোঁকা দেওয়া ও আমলসমূহ প্রদর্শন করা, ইত্যাদি সবই বড় নিফাকী।
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী ও মুমিনদেরকে মুনাফিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আমরা জানি যে, ছোট নিফাকী দ্বীন থেকে খারিজ করে না, আমলকে বরবাদ করে না, তাতে লিপ্ত ব্যক্তি জাহান্নামে স্থায়ী হবে না এবং তা মূল ঈমানের বিপরীত নয়, তবে এর পূর্ণতার বিপরীত। নিফাকীর চারটি শাখা রয়েছে, এই চারটি যার ভেতর থাকবে সে মুনাফিক। আর যার ভেতর চারটি থেকে একটি স্বভাব থাকবে তার ভেতর একটি স্বভাব থাকবে- তা না ছাড়া পর্যন্ত: কথা বললে মিথ্যা বলে, ওয়াদা করলে তা ভঙ্গ করে, চুক্তি করলে খেলাফ করে এবং ঝগড়া করলে অশ্লীল কথা বলে।
*সকল বিদআতই গোমরাহী।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করে দিয়েছেন এবং আমাদের নিআমত সম্পূর্ণ করেছেন। ঈমানের পূর্ণতার বিপরীত হলো দ্বীনের ভেতরকার বিদআত। আমরা জানি যে, আল্লাহ বিভক্তি ও বিরোধ থেকে নিষেধ করেছেন।
আমরা জানি যে, কবরসমূহকে সম্মান করা ও তার ওপর নির্মাণ করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত, যা কখনো শিরক পর্যন্ত পৌঁছায়। আরো কিছু বিদআত হলো, নেককার লোকদের মৃত্যুর পর তাদের অনুসরণ করার নিমিত্তে তাদের প্রতিকৃতি তৈরি করা।
আমরা জানি যে, নিকৃষ্ট বিদআত হলো: বিভিন্ন বিদআতী অনুষ্টান করা এবং কাফিরদের অনন্দ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা।
আমরা জানি যে, নিকৃষ্ট কিছু বিদআত হলো: আল্লাহ যাকে বরকতের উপায় করেননি তা থেকে বরকত তলব করা। এটি কখনো শিরকের কারণ হয়।
অধ্যায়: আল্লার সাথে কুফরী করা।
আমরা জানি যে, আল্লাহর প্রতি ঈমানের বিপরীত হলো: আল্লাহর সাথে কুফরী করা। কুফরী ছোট ও বড় হয়। বড় কুফরী মূল ঈমানের বিপরীত, আর ছোট কুফরী ঈমানের পূর্ণতার বিপরীত। বড় কুফরী দ্বীন থেকে খারিজ করে দেয় এবং বড় কুফরীতে লিপ্ত ব্যক্তির ফরয ও নফল কিছুই কবূল করা হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [আলে ইমরান : ৮৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে এবং কাফেররূপে মৃত্যু ঘটেছে তাদের কারো কাছ থেকে যমীনভরা সোনা বিনিময়স্বরূপ প্রদান করলেও তা কখনো কবুল করা হবে না। এরাই তারা, যাদের জন্য মর্মন্তুদ শাস্তি রয়েছে; আর তাদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।” [আলে ইমরান : ৯১] তিনি আরো বলেন, “আর তোমরা সেদিনকে ভয় করো যেদিন কেউ কারও কোন কাজে আসবে না, আর কারও সুপারিশ গ্রহন করা হবে না এবং কারো কাছ থেকে বিনিময় গৃহীত হবে না। আর তারা সাহায্য প্রাপ্তও হবে না।” [আল-বাকারাহ: ৪৮] কুফরী সকল আমলকে বরবাদ করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর কেউ ঈমানের সাথে কুফরী করলে তার কর্ম অবশ্যই নিস্ফল হবে এবং সে আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।” [আল-মায়েদাহ: ৫] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর বাণী: { وَمَن يَكْفُرْ بِالإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ} “আর কেউ ঈমানের সাথে কুফরী করলে তার কর্ম অবশ্যই নিস্ফল হবে।” সম্পর্কে বলেন: “আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন যে, ঈমান হলো মজবুত রশি এবং এই রশি ছাড়া আল্লাহ কারো আমল গ্রহণ করবেন না এবং যে তা পরিত্যাগ করবে তাকে ছাড়া কারো ওপরই জান্নাত হারাম করবেন না।” {তাফসীর তাবারী (৩/১১৩) এবং (৯/৫৯৩), ইবনু আবি হাতিম, আত-তাফসীর (১৩০৭) তবে তা এই আয়াতের তাফসীরে রয়েছে {فَإِنْ آمَنُواْ بِمِثْلِ مَا آمَنتُم بِهِ }
আর কাফির হলো চিরস্থায়ী জাহান্নামী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় যারা কুফরী করেছে ও যুলুম করেছে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে কোনো পথও দেখাবেন না, জাহান্নামের পথ ছাড়া; সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে এবং এটা আল্লাহর পক্ষে সহজ।” [আন-নিসা: ১৬৮,১৬৯]
বড় কুফরী কয়েক প্রকার: আল্লাহ এগুলো সম্পর্কে নিজ কিতাবে সংবাদ দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, কাফিরদের কুফরী কখনো হয় অস্বীকারবশত। যেমন তিনি বলেন, “আমি অবশ্যই জানি যে, তারা যা বলে তা আপনাকে নিশ্চিতই কষ্ট দেয়; কিন্তু তারা আপনার প্রতি মিথ্যারোপ করে না, বরং যালিমরা আল্লাহর আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে।” [আল-আনআম: ৩৩] তিনি আরো বলেন, “আর শুধু বিশ্বাসঘাতক, কাফির ব্যক্তিই আমার নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে।” [লুকমান: ৩২] মহান আল্লাহ আরো বলেছেন, “আর তারা অন্যায় ও উদ্ধতভাবে নিদর্শনগুলো প্রত্যাখ্যান করল, যদিও তাদের অন্তর এগুলোকে নিশ্চিত সত্য বলে গ্ৰহণ করেছিল। সুতরাং দেখুন, বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল!” [আন-নামল: ১৪]
কখনো বড় কুফরী হয় হককে অস্বীকার করা ও অহংকারের কারণে। আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের সর্দার ইবলীস সম্পর্কে বলেন, “আর স্মরণ করুন, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, আদমকে সিজদা করো, তখন ইবলীস ছাড়া সকলেই সিজদা করলো; সে অস্বীকার করলো ও অহংকার করলো। আর সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হলো।” [আল-বাকারাহ: ৩৪] নূহ আলাইহিস সালাম বলেন, “আমি যখনই তাদেরকে ডাকি যাতে আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন, তারা নিজেদের কানে আঙ্গুল দিয়েছে, কাপড় দ্বারা ঢেকে দিয়েছে নিজেদেরকে এবং জেদ করতে থেকেছে, আর খুবই ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে।” [নূহ : ৭]
কখনো মিথ্যারোপ করে কুফরী হয়। যেমন পূর্বের উম্মত সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তাদের অভ্যাস ফির’আউনী সম্প্রদায় ও তাদের পূর্ববর্তীদের অভ্যাসের ন্যায়, তারা আমার আয়াতগুলোতে মিথ্যারোপ করেছিল, ফলে আল্লাহ্ তাদের পাপের জন্য তাদেরকে পাকড়াও করেছিলেন। আর আল্লাহ্ শাস্তিদানে অত্যন্ত কঠোর।” [আলে ইমরান : ১১] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “বরং কাফিররা মিথ্যারোপ করে।” [আল-ইনশিকাক: ২২] মিথ্যারোপ করা মুখে হোক বা অন্তরে হোক তাতে কোনো পার্থক্য নেই। আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের ব্যাপারে বলেন, “আপনি কি মুনাফিকদেরকে দেখেননি? তারা কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে তাদের সেসব ভাইকে বলে, ‘তোমরা যদি বহিস্কৃত হও, আমরা অবশ্যই তোমাদের সাথে দেশত্যাগী হব এবং আমরা তোমাদের ব্যাপারে কখনো কারো কথা মানবো না এবং যদি তোমরা আক্রান্ত হও আমরা অবশ্যই তোমাদেরকে সাহায্য করব।’ আর আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী “ [আল-হাশর: ১১] মহা সম্মানীত আল্লাহ আরো বলেন, “যখন মুনাফিকরা আপনার কাছে আসে তখন তারা বলে, ‘আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি নিশ্চয় আল্লাহর রাসূল।’ আর আল্লাহ জানেন যে, আপনি নিশ্চয় তাঁর রাসূল এবং আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।” [আল-মুনাফিকুন: ১]
কখনো সন্দেহ ও ধারনা পোষণের কারণে কুফরী হয়। আর তা হলো সত্য বিষয়ে দোদুল্যমান থাকা। পুনরুত্থান ও আল্লাহর সাক্ষাতে সন্দেহ পোষণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বাগানের এক মালিক সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, সে বলেছিল: “আমি মনে করি না যে, কেয়ামত সংঘটিত হবে। আর আমাকে যদি আমার রব-এর কাছে ফিরিয়ে নেয়াও হয়, তবে আমি তো নিশ্চয় এর চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল পাব।” [আল-কাহাফ: ৩৬] তদুত্তরে তার মুমিন বন্ধু তাকে বলল, “তুমি কি তাঁর সাথে কুফরি করছ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি ও পরে বীর্য থেকে এবং তারপর পূর্ণাঙ্গ করেছেন পুরুষ আকৃতিতে?” [আল-কাহাফ: ৩৭]
কখনো গালমন্দ ও উপহাস করার দরুন কুফরী হয়। যেমন সম্মানিত আল্লাহ কাফিরদের সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, “আর আপনার আগে অনেক রাসূলকে নিয়েই তো ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা হয়েছে। ফলে রাসূলদের সাথে বিদ্রুপকারীদেরকে তারা যা নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করছিল তা-ই পরিবেষ্টন করেছে।” [আল-আনআম: ১০] আল্লাহ তা‘আলা নূহের কওম ও তার সাথে তাদের ঠাট্টা করা সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, “আর তিনি নৌকা নির্মাণ করতে লাগলেন এবং যখনই তার সম্প্রদায়ের নেতারা তার পাশ দিয়ে যেত, তাকে নিয়ে উপহাস করত; তিনি বললেন, ‘তোমরা যদি আমাদেরকে নিয়ে উপহাস কর, তবে নিশ্চয় আমরাও তোমাদেরকে উপহাস করব, যেমন তোমরা উপহাস করছ।” [হুদ: ৩৮]
কখনো মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ও আল্লাহর রাস্তা থেকে বিরত রাখাও কুফরী হয়। আল্লাহ তা‘আলা কাফিরদের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া প্রসঙ্গে বলেন, “তারা কি তাকে ছাড়া অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছে? বল, ‘তোমাদের প্রমাণ নিয়ে আস। আমার সাথে যারা আছে এটি তাদের জন্য উপদেশ এবং আমার পূর্বে যারা ছিল তাদের জন্যও এটাই ছিল উপদেশ।’ কিন্তু তাদের বেশীরভাগই প্রকৃত সত্যকে জানে না; তাই তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়।” [আল-আম্বিয়া: ২৪] মহা প্রশংসিত ও পবিত্র নামসমূহের অধিকারী সত্ত্বা আরো বলেন, “আসমানসমূহ, যমীন ও এ দু’য়ের মধ্যবর্তী সমস্ত কিছুই আমি যথাযথভাবে ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সৃষ্টি করেছি। আর যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে যে বিষয়ে ভীতিপ্ৰদৰ্শন করা হয়েছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে।” [আল-আহকাফ: ৩]
কখনো সত্যকে ঘৃণা করাও কুফরী হয়। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “এটা এজন্য যে, আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তারা তা অপছন্দ করেছে। কাজেই তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।” [মুহাম্মাদ: ৯]
আমরা জানি যে, বড় কুফরীর চেয়ে কিছু নিম্ন স্তরের কুফরীও রয়েছে। আর তা হলো ছোট কুফরী; যা মূল ঈমানের বিপরীত নয়, তবে এর পূর্ণতার বিপরীত। এই কুফরে লিপ্ত ব্যক্তি জাহান্নামে স্থায়ী হবে না এবং তা সকল আমলকে বরবাদ করবে না। এর অনেক প্রকার রয়েছে:
যেমন এর অন্তর্ভুক্ত হলো নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “মুসলিমকে গালি দেওয়া পাপাচার এবং তাকে হত্যা করা কুফরী।” {বুখারী (৪৮), মুসলিম: (৬৪), তিরমিযী (১৯৮৩), নাসাঈ (৪১০৮), ইবনু মাজাহ (৬৯)} এরকম আরেকটি হলো নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “মানুষের মধ্যে দু’টি স্বভাব আছে: সে দু’টি স্বভাবে তাদের ভেতর কুফুরী হয়; বংশের বদনাম করা এবং মৃতের ওপর কান্নাকাটি করা।” মুসলিম: (৬৭) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরেকটি বাণী: “আমার পরে তোমরা একে অপরের গর্দান কাটাকাটি করে কাফির (এর মত) হয়ে যেও না।” “বুখারী (১২১), মুসলিম (৬৫), নাসাঈ (৪১৩১), ইবনু মাজাহ (৩৯৪২)”
এ ধরনের কুফরী ব্যক্তিকে মিল্লাত (দ্বীন) থেকে বের করে দেয় না এবং তাকে জাহান্নামেও স্থায়ী করবে না। কারণ, আল্লাহ যুদ্ধরত মুমিনদেরকে ভাই ভাই বলেছেন। যেমন তিনি বলেন: “আর মুমিনদের দু’দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলে তোমরা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।” [আল-হুজুরাত: ৯] অতএব, তারা যুদ্ধরত থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে মুমিন নামকরণ করেছেন তিনি। আহলুস সুন্নাহদের ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বল—রাহিমাহুল্লাহ— এই হাদীস ও এ জাতীয় বেশ কিছু হাদীস উল্লেখ করার পর বলেন, “আর এসব হাদীস যেখানে এসেছে: “তিনটি স্বভাব যার ভেতর থাকবে সে মুনাফিক।” এগুলো কঠোর সতর্কতার জন্য বলা হয়েছে। আমরা এগুলো যেভাবে এসেছে সেভাবেই বর্ণনা করি এবং এর ব্যাখ্যা করি না... এবং এ ধরনের হাদিস, যা সহীহ এবং সংরক্ষিত রয়েছে, আমরা তা মেনে নিই, যদিও এর ব্যাখ্যা জানা না থাকে। এ বিষয়ে কথা বলা বা বিতর্ক করা যাবে না। আর এসব হাদীস যেভাবে এসেছে সেভাবে ছাড়া তা ব্যাখ্যাও করা যাবে না।” শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলিস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ: (১/১৮২)
অধ্যায়: আল্লাহর সাথে শিরক করা।
আমরা জানি যে, আল্লাহর প্রতি ঈমান আনয়নের বিপরীত হলো: মহান আল্লাহর সাথে শিরক করা। শিরক বড় ও ছোট হয়। বড় শিরক মূল ঈমানের বিপরীত, আর ছোট শিরক ঈমানের পূর্ণতার বিপরীত। বড় শিরক সবচেয়ে বড় জুলম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর স্মরণ করুন যখন লুকমান উপদেশ দিতে গিয়ে তার পুত্রকে বলেছিল, 'হে আমার বৎস! আল্লাহর সাথে কোন শির্ক করো না। নিশ্চয় শির্ক বড় যুলুম।” [লুকমান : ১৩] বড় শিরক সকল আমল ধ্বংস করে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর আপনার প্রতি ও আপনার পুর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী করা হয়েছে যে, 'যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল নিষ্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [আয-যুমার: ৬৫], তিনি আরো বলেছেন, “এটা আল্লাহর হিদায়াত, স্বীয় বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে তিনি এ দ্বারা হিদায়াত করেন। আর যদি তারা শির্ক করত তবে তদের কৃতকর্ম নিস্ফল হত।” [আল-আনআম: ৮৮]
ব্যক্তি যদি বড় শিরক করে এবং তাওবা না করে মারা যায়, তাহলে তাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এ মর্মে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করাকে ক্ষমা করেন না। এছাড়া অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছে ক্ষমা করেন। আর যে-ই আল্লাহর সাথে শরীক করে, সে এক মহাপাপ রটনা করে।” [আন-নিসা : ৪৮] মুশরিক যদি তাওবা না করে মারা যায়, তাহলে তার ওপর জান্নাত হারাম এবং তার ঠিকানা জাহান্নাম, সেখানে সে চিরস্থায়ী হবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম।” [আল-মায়েদাহ: ৭২]
জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক ব্যক্তি আসলেন এবং বললেন, “হে আল্লাহর রাসূল, দুটি ওয়াজিবকারী বিষয় কী? তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করা অবস্থায় মারা যাবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবে, আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করা অবস্থায় মারা যাবে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” মুসলিম: (৯৩)
আল্লাহ তা‘আলা শিরককে বাতিল ঘোষণা করেছেন, মুশরিকদের শিরকের নিন্দা করেছেন এবং তাদের শরীক গ্রহণ করার বাতুলতা প্রকাশ করেছেন যে, তা উপকার ও অপকার করে না। কখনো বলেছেন এসব শরীকরা শোনে না, যদিও শোনে যারা তাদেরকে ডাকে সাড়া দেয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া যাদেরকে ডাকো তারা কোন কিছুরই মালিক নয়।* তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না। আর তোমরা তাদেরকে যে শরীক করেছ তা তারা কিয়ামতের দিন অস্বীকার করবে।” [ফাতির: ১৩-১৪] কাজেই আল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, তারা কোনো কিছুর মালিক নয় এবং যারা তাদেরকে ডাকে তাদের ডাক তারা শোনে না এবং কিয়ামতের দিন তাদের শিরক করাকে অস্বীকার করবে।
কখনো মহাসত্য আল্লাহ বর্ণনা করেন যে, এসব শরীকরা কোনো উপকার ও অপকার করে না এবং তারা জীবন ও মৃত্যুর মালিক নয়। যেমন আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর তারা তাঁর পরিবর্তে ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে অন্যদেরকে, যারা কিছুই সৃষ্টি করে না, বরং তারা নিজেরাই সৃষ্ট এবং তারা নিজেদের অপকার কিংবা উপকার করার ক্ষমতা রাখে না। আর মৃত্যু, জীবন ও উত্থানের উপরও কোনো ক্ষমতা রাখে না।" [সূরা আল-ফুরকান: ৩] মহা সম্মানিত আল্লাহ আরো বলেন, “তিনি বললেন, ‘তোমরা যখন আহ্বান কর তখন তারা তোমাদের আহ্বান শোনে কি?* ‘অথবা তারা কি তোমাদের উপকার কিংবা অপকার করতে পারে?” [আশ-শুআরা: ৭২, ৭৩]
কখনো মহান আল্লাহ বর্ণনা করেন যে, এসব উপাস্য তাদের উপাসনাকারীদের চেয়ে অনেক বড় ত্রুটিপূর্ণ। কারণ, এরা চলে না, ধরে না, শোনে না এবং দেখেও না। কাজেই তারা যেসব উপকরণ দ্বারা উপকার হাসিল ও ক্ষতি থেকে দূরে থাকা যায় তার থেকে একেবারেই খালি। তাফসীরুত তাবারী (১৩/৩২২) আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তাদের কি পা আছে যা দিয়ে ওরা চলে? তাদের কি হাত আছে যা দিয়ে ওরা ধরে ? তাদের কি চোখ আছে যা দিয়ে ওরা দেখে? কিংবা তাদের কি কান আছে যা দিয়ে ওরা শুনে? বলুন, ‘তোমরা যাদেরকে আল্লাহর শরীক করেছো তাদেরকে ডাক তারপর আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কর এবং আমাকে অবকাশ দিও না।” [আল-আরাফ: ১৯৫]
কখনো আল্লাহ তা‘আলা এসব উপাস্যের অপারগতা ও দুর্বলতা বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মানুষ! একটি উপমা দেয়া হচ্ছে, মনোযোগের সাথে তা শোনঃ তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্র হলেও। এবং মাছি যদি কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের কাছ থেকে, এটাও তারা তার কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষণকারী ও অন্বেষণকৃত কতই না দুর্বল।” [আল-হাজ্জ: ৭৩] তিনি আরো বলেছেন, “আর আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে ডাক তারা তো তোমাদেরকে সাহায্য করতে পারে না এবং তারা তাদের নিজেদেরকেও সাহায্য করতে পারে না।” [আল-আরাফ: ১৯৭]
কখনো আল্লাহ তাদের উপাস্যদেরকে ফকীর ও অভাবী বলে সম্বোধন করেছেন। এবং তারা আসমান ও জমিনে বিন্দু পরিমাণ কোনো বস্তুর পরিপূর্ণ মালিক নয় এবং তার কোনো জিনিসে তারা অংশী নয়। তাদের কেউ আল্লাহর সাহায্যকারী ও সহযোগী নয় এবং তাঁর কাছে সুপারীশকারী নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বলুন, 'তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া যাদেরকে ইলাহ্ মনে করতে তাদেরকে ডাক। তারা আসমানসমূহে অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়, যমীনেও নয়। আর এ দু'টিতে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তার সহায়কও নয়।* আর কোনো সুপারিশ তাঁর কাছে তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনো উপকার করবে না।” [সাবা: ২২-২৩]
কখনো আল্লাহ বর্ণনা করেন যে, আল্লাহর সাথে অন্যান্য ইলাহ থাকা বিবেকগত দিক থেকে অযৌক্তিক এবং পার্থিক নীতিতে অসম্ভব, আর শরীয়তের দৃষ্টিতেও বাতিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যদি এতদুভয়ের (আসমান ও যমীনের) মধ্যে আল্লাহ্ ব্যতীত আরো অনেক ইলাহ থাকত, তাহলে উভয়ই বিশৃংখল হত। অতএব, তারা যা বর্ণনা করে তা থেকে আরশের অধিপতি আল্লাহ্ কতই না পবিত্র।” [আল-আম্বিয়া: ২২] মহা সম্মানিত, মহা রাজত্ব ও প্রতাপের অধিকারী আল্লাহ বলেন, “বলুন, ‘যদি তাঁর সাথে আরও ইলাহ থাকতো যেমন তারা বলে, তবে তারা ‘আরশ-অধিপতির (নৈকট্য লাভের) উপায় খুঁজে বেড়াত।” [আল-ইসরা: ৪২] তিনি আরো বলেন, “আল্লাহ্ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই; যদি থাকত তবে প্রত্যেক ইলাহ স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যে গুণে তাকে গুণান্বিত করে তা থেকে আল্লাহ্ কত পবিত্র- মহান!” [আল-মুমিনুন: ৯১]
আমরা জানি যে, বড় শিরক অনেক প্রকার:
যেমন তার কয়েকটি প্রকার হলো: আল্লাহর রুবুবিয়্যাত, সৃষ্টি, রাজত্ব, রিযিক ও তার পরিকল্পনায় কাউকে শরীক স্থির করা। মহান আল্লাহ তাদের শিরক সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, “তবে কি তারা আল্লাহর এমন শরীক স্থির করেছে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মত সৃষ্টি করেছে, যে কারণে সৃষ্টি তাদের কাছে সদৃশ মনে হয়েছে? বলুন, ‘আল্লাহ্ সকল বস্তুর স্রষ্টা; আর তিনি এক, মহা প্রতাপশালী।” [আর-রা‘দ: ১৬] আল্লাহ তা'আলা তাদের তিরস্কার করেছেন যারা এমন সৃষ্ট জীবকে আল্লাহর অংশীদার করেছে, যা নিজেই সৃষ্ট এবং কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। এ মর্মে তিনি বলেছেন: “এটা আল্লাহর সৃষ্টি! সুতরাং তিনি ছাড়া অন্যরা কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও। বরং যালিমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।” [লুকমান: ১১] মহাসত্য আল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি একাই সৃষ্টি ও নির্দেশের মালিক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য, চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন। জেনে রাখ , সৃজন ও আদেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ কত বরকতময়!” [আল-আ’রাফ : ৫৪]
বড় শিরকের আরেকটি ধরণ হলো: আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করা—আল্লাহ তার থেকে অনেক পবিত্র— সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “আর ইয়াহূদীরা বলে, ‘উযাইর আল্লাহর পুত্র’, এবং নাসারারা বলে, ‘মসীহ্ আল্লাহর পুত্র।’ এটা তাদের মুখের কথা, আগে যারা কুফরী করেছিল তারা তাদের মত কথা বলে। আল্লাহ্ তাদেরকে ধ্বংস করুন। কোন্ দিকে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে!” [আত-তাওবাহ: ৩০] সম্মানিত আল্লাহ আরো বলেছেন, “আর তারা জিনকে আলাহর সাথে শরীক সাব্যস্ত করে, অথচ তিনিই এদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর তারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহর প্রতি পুত্র ও কন্যা আরোপ করে; তিনি পবিত্র –মহিমান্বিত! এবং তারা যা বলে তিনি তার উর্ধ্বে।” [আল-আনআম: ১০০] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরো বলেন, “আর তারা তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে তাঁর অংশ সাব্যস্ত করেছে। নিশ্চয়ই মানুষ স্পষ্ট অকৃতজ্ঞ।* নাকি তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তা হতে কন্যা সন্তান গ্ৰহণ করেছেন এবং তোমাদেরকে বিশিষ্ট করেছেন পুত্ৰ সন্তান দ্বারা?” [আয-যুখরুফ: ১৫-১৬]
বড় শিরকের আরো কিছু প্রকার হলো: নক্ষত্রের প্রতি ঈমান আনয়ন করা ও এর পূজা করা। আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, তিনি তার কওমের সাথে নক্ষত্রের ইবাদত বিষয়ে তর্ক করেছেন: “এভাবে আমি ইবরাহীমকে আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্ব দেখাই, যাতে তিনি নিশ্চিত বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হন।* তারপর রাত যখন তাকে আচ্ছন্ন করল তখন তিনি তারকা দেখে বললেন, ‘এ আমার রব ।’ তারপর যখন সেটা অস্তমিত হল তখন তিনি বললেন, ‘যা অস্তমিত হয় তা আমি পছন্দ করি না।* অতঃপর যখন তিনি চাঁদকে সমুজ্জ্বলরূপে উঠতে দেখলেন তখন বললেন, ‘এটা আমার রব।’ যখন সেটাও অস্তমিত হল তখন বলেন, ‘আমাকে আমার রব হিদায়াত না করলে আমি অবশ্যই পথভ্রষ্টদের শামিল হব।* অতঃপর যখন তিনি সূর্যকে দীপ্তিমানরূপে উঠতে দেখলেন তখন বললেন, ‘এটা আমার রব, এটা সবচেয়ে বড়।’ যখন এটাও অস্তমিল হল, তখন তিনি বললেন, হে আমার সম্প্রদায় ! তোমরা যাকে আল্লাহর শরীক কর তার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।* আমি একনিষ্টভাবে তাঁর দিকে মুখ ফিরাচ্ছি যিনি আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন এবং আমি মুশরিককদের অন্তর্ভুক্ত নই।* আর তার সম্প্রদায় তার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হল। তিনি বললেন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্ সম্বদ্ধে আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হচ্ছো, অথচ তিনি আমাকে হিদায়েত দিয়েছেন? আমার রব অন্য কোন ইচ্ছে না করলে তোমরা যাকে তাঁর শরীক কর তাকে আমি ভয় করি না। আমার রব জ্ঞান দ্বারা সবকিছু পরিব্যাপ্ত করে আছেন। তবে কি তোমরা উপদেশ গ্রহণ করবে না?* আর তোমরা যাকে আল্লাহর শরীক কর আমি তাকে কিরূপে ভয় করব? অথচ তোমরা ভয় করছ না যে, তোমরা আল্লাহর সাথে শরীক করছ এমন কিছু, যার পক্ষে তিনি তোমাদের কাছে কোন প্রমাণ নাযিল করেননি। কাজেই যদি তোমরা জান তবে বল, দু’দলের মধ্যে কোন দল নিরাপত্তা লাভের বেশী হকদার।” [আল-আনআম: ৭৫-৮১]
শিরকের আরেকটি প্রকার হলো: তারকারাজির দ্বারা বৃষ্টি তলব করা এবং বিশ্বাস করা যে, তা রিযিক আনয়নকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, {আর তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের রিযিক করে নিয়েছো!} [আল-ওয়াকিয়াহ: ৮২] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় লোকদের উপর বৃষ্টি হলে তিনি বললেন, “ভোরবেলা কতক লোক (আল্লাহর) শোকরগুজার ও কৃতজ্ঞ হয় এবং তাদের কতক আবার অকৃতজ্ঞ হয়ে যায়। তাদের কিছু সংখ্যক বলে এটা (বৃষ্টি) আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ ও রহমতে বর্ষিত হয়েছে। আর তাদের কতক লোক বলে, অমুক অমুক নক্ষত্ৰ সত্যে প্রমাণিত হলো।” বর্ণনাকারী বলেন, এর পরিপ্রেক্ষিতে এ আয়াত নাযিল হলো: {فَلاَ أُقْسِمُ بِمَوَاقِعِ النُّجُوم} “না, আমি শপথ করছি তারকাসমূহের অবস্থিতির”, এখান থেকে {وَتَجْعَلُونَ رِزْقَكُمْ أَنَّكُمْ تُكَذِّبُون} "তোমরা মিথ্যারোপকেই তোমাদের রিযিক করে নিয়েছো!" (আল-ওয়াকি’আহ: ৭৫-৮২) পর্যন্ত।” {মুসলিম (৭৩), তাবারানী, আত-তাফসীর: (২৩/১৫৪)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “জাহেলী যুগের চারটি কুস্বভাব আমার উম্মতের মধ্যে বিদ্যমান থাকবে, যা তারা পুরোপুরি পরিত্যাগ করতে পারবেনা। এক : আভিজাত্যের অহংকার করা, দুই : বংশের বদনাম গাওয়া, তিন : নক্ষত্রের মাধ্যমে বৃষ্টির পানি কামনা করা, এবং চার : মৃত ব্যাক্তির জন্য বিলাপ করা।” {মুসলিম (৯৩৪), ইবনু মাজাহ: (১৫৮১)}
যায়েদ বিন খালেদ আল-জুহানী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুদাইবিয়াতে আমাদেরকে নিয়ে ফজরের নামাজ পড়লেন। সে রাতে আকাশটা মেঘাচ্ছন্ন ছিলো। নামাজান্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লোকদের দিকে ফিরে বললেন, ‘তোমরা কি জানো তোমাদের প্রভু কি বলেছেন? লোকেরা বললো, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। তিনি বললেন, “(আল্লাহ বলেছেন যে,) আমার বান্দাদের মধ্যে কেউ আমার প্রতি ঈমানদার হিসেবে আবার কেউ কাফের হিসেবে ভোর করলো। যে ব্যক্তি বলেছে, ‘আল্লাহর ফজল ও রহমতে বৃষ্টি হয়েছে, সে আমার প্রতি ঈমান এনেছে আর নক্ষত্রকে অস্বীকার করেছে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি বলেছে, অমুক অমুক নক্ষত্রের ওসীলায় বৃষ্টিপাত হয়েছে, সে আমাকে অস্বীকার করেছে আর নক্ষত্রের প্রতি ঈমান এনেছে।’’ {বুখারী (৮৪৬), মুসলিম (৭১), আবূ দাউদ (৩৯০৬), নাসাঈ (১৫২৫)}
শিরকের আরেকটি প্রকার হলো: আল্লাহর নাম ও সিফাতসমূহে তাঁর শরীক সাব্যস্ত করা। যেমন কেউ ধারণা করল যে, আল্লাহ ছাড়াও কেউ কেউ গায়েব জানে। অথচ আল্লাহ তাঁর নবীকে বলতে নির্দেশ দিয়েছেন: “বলুন, ‘আমি তোমাদেরকে বলি না যে, আমার নিকট আল্লাহর ভান্ডারসমূহ আছে, আর আমি গায়েবও জানি না এবং তোমাদের এও বলি না যে, আমি ফিরিশতা, আমার প্রতি যা অহীরূপে প্রেরণ করা হয় আমি তো শুধু তারই অনুসরণ করি। বলুন, ‘অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে?’ তোমরা কি চিন্তা কর না?” [আল-আনআম: ৫০] মহান আল্লাহ আরো বলেন, “নিশ্চয় গায়েব আল্লাহর জন্য।” [ইউনুস: ২০] আবূ হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি গণকের নিকট গেলো, -বর্ণনাকারী মূসা তার হাদীসে বলেন- এবং তার কথা বিশ্বাস করলো, -তারপর (মূসা ও মুসাদ্দাদ) উভয় বলেন-, অথবা ঋতুবতী স্ত্রীর নিকট গমন করলো, -বর্ণনাকারী মুসাদ্দাদ বলেন, তার ঋতুবতী স্ত্রীর সাথে সহবাস করলো-, অথবা স্ত্রীর পশ্চাৎ দ্বারে সংগম করলো, -মুসাদ্দাদ বলেন, নিজ স্ত্রীর পশ্চাৎ দ্বারে গমণ করলো-, সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর যা অবতীর্ণ হয়েছে, তা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করলো।” {আবূ দাউদ (৩৯০৪), তিরমিযী (১৩৫), ইবনু মাজাহ (৬৩৯), ফাদল ইবনু দুকাইন, আস-সালাহ (১৫), ইসহাক ইবনু রাহওয়েহ (৪৮২), আহমাদ (৯৫৩৬)} যে ব্যক্তি নিজেকে বা অন্য কাউকে আল্লাহর নামগুলোর মধ্যে এমন কোনো নামে নামকরণ করল, যা কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই উপযুক্ত, যেমন: "আল্লাহ" বা "আর-রহমান"—তার বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির হুঁশিয়ারি এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর আল্লাহর জন্যই রয়েছে সুন্দর সুন্দর নাম। অতএব তোমরা তাকে সেসব নামেই ডাক; আর যারা তাঁর নাম বিকৃত করে তাদেরকে বর্জন কর; তাদের কৃতকর্মের ফল অচিরেই তাদেরকে দেয়া হবে।” [আল আরাফ : ১৮০] আল্লাহ আরো বলেন, “আল্লাহ্, তিনি ছাড়া অন্য কোনো সত্য ইলাহ নেই, সুন্দর নামসমূহ তাঁরই।” [ত্বহা: ৮] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহ তা’আলার কাছে কিয়ামতের দিনে ঐ লোকের নাম সবচেয়ে ঘৃণিত, যে তার নাম রেখেছে (মালিকুল আমলাক) তথা ’রাজাদের রাজা’।” {বুখারী (৬২০৫), মুসলিম (২১৪৩), আবূ দাউদ (৪৯৬১), তিরমিযী (২৮৩৭)}
আবূ উবাইদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “সূফিয়ান ইবনু উয়াইনা (মালিকুল আমলাক) এর ব্যাখ্যায় বলতেন, এটি হলো তাদের এ কথার ন্যায়: শাহেনশাহ, অর্থাৎ তিনি বাদশাহদের বাদশাহ। সুফিয়ান ছাড়া অন্যরা বলেন: বরং এর অর্থ হলো আল্লাহর নামে ব্যক্তির নামকরণ করা, যেমন: আর-রাহমান, আল-জাব্বার, আল-আজীজ। তিনি বলেন, কেবল আল্লাহই হলেন, মালিকুল আমলাক; তিনি ছাড়া অন্য কাউকে এই নামে নামকরণ করা বৈধ নয়।” কাসিম ইবনু সালাম, গারীবুল হাদীস (২/১৮)
শিরকের আরেক প্রকার হলো: এ বিশ্বাস করা যে, কোনো সৃষ্ট জীব আল্লাহর পূর্ণতার বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, বা সে সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান। অথচ আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।” [আল-ইখলাস: ৪] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আরো বলেন, “তিনি আসমানসমূহ, যমীন ও এ দুয়ের অন্তর্বর্তী যা কিছু আছে, সেসবের রব। কাজেই তাঁরই ইবাদাত করুন এবং তাঁর ইবাদাতে ধৈর্যশীল থাকুন। আপনি কি তাঁর সমনাম গুণসম্পন্ন কাউকেও জানেন?” [মারইয়াম: ৬৫] আল্লাহ তা‘আলা তাঁর পরিপূর্ণ ক্ষমতার সংবাদ দিয়ে বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাশীল।” [আল-বাকারাহ: ১৪৮] তিনি আরো বলেন, “আর আল্লাহ্ এমন নন যে, তাঁকে অক্ষম করতে পারে কোনো কিছু আসমানসমূহে আর না যমীনে। নিশ্চয় তিনি সর্বজ্ঞ, ক্ষমতাবান।” [ফাতির: ৪৪] আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া যেসব উপাস্য ও উপাসক রয়েছে তাদের পরিপূর্ণ অক্ষমতা বর্ণনা করে তিনি বলেন, “হে মানুষ! একটি উপমা দেয়া হচ্ছে, মনোযোগের সাথে তা শোনঃ তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্র হলেও। এবং মাছি যদি কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের কাছ থেকে, এটাও তারা তার কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষণকারী ও অন্বেষণকৃত কতই না দুর্বল।” [আল-হাজ্জ: ৭৩]
শিরকের আরেকটি প্রকার হলো: আল্লাহর সাথে অন্যান্য ইলাহ স্থির করা। যেমন আল্লাহ ইবরাহীম আলাইহস সালামের কওম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তারা আল্লাহ ছাড়া অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছিলো। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর স্মরণ করুন, যখন ইবরাহীম তার পিতা আযরকে বলেছিলেন, ‘আপনি কি মূর্তিকে ইলাহরূপে গ্রহণ করেন? আমি তো আপনাকে ও আপনার সম্প্রদায়কে স্পষ্ট ভ্রষ্টতার মধ্যে দেখছি।” [আল-আনআম: ৭৪] মহাসত্য আল্লাহ আসহাবুল কাহাফ সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তাদের কওম আল্লাহ ছাড়া অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছিলো, তাই তারা তাদের থেকে পৃথক হয়ে গেছেন। পবিত্র ও সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “আমাদের এ স্বজাতিরা, তারা তাঁর পরিবর্তে অনেক ইলাহ গ্রহণ করেছে। এরা এসব ইলাহ সম্বন্ধে স্পষ্ট প্রমাণ উপস্থিত করে না কেন? অতএব যে আল্লাহ্ সম্বন্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে তাঁর চেয়ে অধিক জালেম আর কে?” [আল-কাহাফ: ১৫] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা মূসা আলাইহিস সালামের কওমের ব্যাপারে বলেছেন যে, তারা মুসার নিকট মুশরিকদের যেমন ইলাহ রয়েছে তেমন ইলাহ তাদের জন্যও সাব্যস্ত করার দাবি করেছিলো: “আর আমি বনী ইসরাঈলকে সাগর পার করিয়ে দেই; তারপর তারা মূর্তিপূজায় রত এক জাতির কাছে উপস্থিত হয়। তারা বলল, ‘হে মূসা! তাদের মা’বুদদের ন্যায় আমাদের জন্যও একজন মা’বুদ স্থির করে দাও। তিনি বললেন, ‘তোমরা তো এক জাহিল সম্প্রদায়।* এসব লোক যাতে লিপ্ত রয়েছে তা তো বিধ্বস্ত করা হবে এবং তারা যা করছে তাও অমূলক।” [আল-আরাফ: ১৩৮-১৩৯] আল্লাহ তা‘আলা তিনি ছাড়া সকল মাবূদের ইবাদতকে বাতিল সাব্যস্ত করে বলেন, “আল্লাহ্ কোন সন্তান গ্রহণ করেননি এবং তাঁর সাথে অন্য কোন ইলাহও নেই; যদি থাকত তবে প্রত্যেক ইলাহ স্বীয় সৃষ্টি নিয়ে পৃথক হয়ে যেত এবং একে অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করত। তারা যে গুণে তাকে গুণান্বিত করে তা থেকে আল্লাহ্ কত পবিত্র- মহান “ [আল-মুমিনুন: ৯১]
শিরকের আরেকটি প্রকার হলো: পূর্ণ ইবাদত কিংবা ইবাদতের কিছু অংশ গায়রুল্লাহকে সোপর্দ করা। আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের অবস্থা স্পষ্ট করে বলেন, “আল্লাহ যে শস্য ও গবাদি পশু সৃষ্টি করেছেন সে সবের মধ্য থেকে তারা আল্লাহর জন্য এক অংশ নির্দিষ্ট করে এবং নিজেদের ধারণা অনুযায়ী বলে, ‘ এটা আল্লাহর জন্য এবং এটা আমাদের শরীকদের জন্য’। অতঃপর যা তাদের শরীকদের অংশ তা আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না এবং যা আল্লাহর অংশ তা তাদের শরীকদের কাছে পৌছায়, তারা যা ফয়সালা করে তা কতই না নিকৃষ্ট!” [আল-আনআম: ১৩৬] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহু তাবারাকা ওয়া তাআলা বলেন, ‘আমি সমস্ত অংশীদারদের চাইতে অংশীদারি [শিরক] থেকে অধিক অমুখাপেক্ষী। যদি কেউ এমন কাজ করে যাতে সে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, আমি তাকে ও তার শির্ককে বর্জন করি।” মুসলিম: (২৯৮৫)
শিরকের আরেকটি প্রকার হলো: গায়রুল্লাহর নৈকট্য হাসিল করার জন্য যবেহ করা। যেমন কেউ মূর্তীর জন্য যবেহ করল অথবা মৃতদের নৈকট্য হাসিল করার জন্য যবেহ করল। যবেহ করা আল্লাহ তা‘আলা ছাড়া কারো জন্যই বৈধ নয় স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “বলুন, ‘আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।” [আল-আনআম: ১৬২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “আল্লাহ্ তো শুধু মৃত জন্তু, রক্ত , শূকর-মাংস এবং যা যবেহকালে আল্লাহর পরিবর্তে অন্যের নাম নেয়া হয়েছে তা-ই হারাম করেছেন, কিন্তু কেউ অবাধ্য বা সীমালংঘনকারী না হয়ে নিরুপায় হলে আল্লাহ্ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আন-নাহাল: ১১৫] আবূ তুফায়ল হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমরা আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বললাম, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আপনাকে গোপনে যা জানিয়েছেন সে বিষয়ে আমাদের কিছু বলুন। তিনি বললেন, মানুষের নিকট গোপন রেখেছেন এমন কিছুই তিনি আমার নিকট একান্তে বলেননি। তবে আমি তাকে বলতে শুনেছি, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে যাবাহ করে আল্লাহ তাকে লা’নাত করেন।” {মুসলিম (১৯৭৮), নাসায়ী (৪৪২২)} কারণ, এটি অনেক বড় বিষয়। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেখানে গায়রুল্লাহর জন্য যবেহ করা হয় সেখানে আমাদেরকে যবেহ করতে নিষেধ করেছেন। যেমন সাবিত ইবনু যাহহাক রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে এক ব্যক্তি মানত করে যে, সে বুওয়ানা নামক স্থানে একটি উট যাবাহ করবে। সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললো, আমি বুওয়ানা নামক স্থানে একটি উট কুরবানী করার মানত করেছি। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: সেখানে কি জাহিলী যুগের কোনো মূর্তি রয়েছে? লোকেরা বললো, না। তিনি পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন: সেখানে কি তাদের কোনো মেলা বসতো? লোকেরা বললো, না। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমার মানত পূর্ণ করতে পারো। কেননা আল্লাহর নাফরমানীমূলক কাজের জন্য কৃত মানত পূর্ণ করা জায়িয নয় এবং আদম সন্তান যে জিনিসের মালিক নয় তারও কোনো মানত নেই।” আবূ দাউদ (৩৩১৩)
শিরকের আরেকটি প্রকার হলো: গায়রুল্লাহর জন্য মানত করা। মানত একটি ইবাদত যা আল্লাহ ছাড়া কারো জন্যই নিবেদন করা বৈধ নয়। এ কারণে আল্লাহ মান্নত পূরণকারী মুমিনদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তারা মানত পূর্ণ করে এবং সে দিনের ভয়ে করে, যে দিনের অকল্যাণ হবে ব্যাপক।” [আল-ইনসান: ৭] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “আর যা কিছু তোমরা ব্যয় কর অথবা যা কিছু তোমরা মানত কর নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা জানেন। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” [আল-বাকারাহ: ২৭০] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করার মান্নত করবে, সে যেন তার পালন করে। আর যে তাঁর নাফরমানি করার মান্নত করবে, সে যেন তাঁর নাফরমানি না করে।” {বুখারী (৬৬৯৬), আবূ দাউদ (৩২৮৯), তিরমিযী (১৫২৬), নাসাঈ (৩৮০৬), ইবনু মাজাহ (২১২৬)}
বড় শিরকের মধ্যে আরো রয়েছে: গায়রুল্লাহর নিকট পানাহ চাওয়া। ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “জাহেলী যুগে অনেক মানুষ এমন ছিল যে, তাদের কেউ উপত্যকায় অবস্থান করার সময় বলতেন, “এই উপত্যকার অধিপতির নিকট পানাহ চাই, ফলে তা তাদের আরো পাপ বাড়িয়ে দিত।” তাবারী, আত-তাফসীর: (২৩/৩২২) জাহেলী যুগের লোকদের অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “এও যে, কিছু মানুষ কিছু জিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।” [আল-জিন: ৬] নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংবাদ দিয়েছেন যে, যে ব্যক্তি কোথাও অবতরণ করে বলল: “أعوذ بكلمات الله التَّامَّات من شرِّ ما خلَق, যতক্ষণ পর্যন্ত সে জায়গা থেকে ফিরে না আসে ততক্ষণ পর্যন্ত কোন কিছুই তার ক্ষতি করতে পারবে না।” {মুসলিম (২৭০৮), তিরমিযী (৩৪৩৭), ইবনু মাজাহ (৩৫৪৭)}
এর আরেকটি প্রকার হলো: যেসব বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া কেউ ক্ষমতাবান নয় যেসব বিষয়ে গায়রুল্লাহর কাছে সাহায্য ও ফরিয়াদ তলব করা অথবা গায়রুল্লাহকে আহ্বান করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।” [আল-জিন: ১৮] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না। আর তোমরা তাদেরকে যে শরীক করেছ তা তারা কিয়ামতের দিন অস্বীকার করবে। সর্বজ্ঞ আল্লাহর মত কেউই আপনাকে অবহিত করতে পারে না।” [সূরা ফাতির: ১৪] মুশরিকদেরকে যখন কোনো অনিষ্ট স্পর্শ করত তখন তারা আল্লাহর নিকট পানাহ চাইতো। তারপর আল্লাহ যখন তাদেরকে নাজাত দিতেন, তারা তাদের শিরকে ফিরে যেতো। আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে তা উল্লেখ করে বলেন: “অতঃপর তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা আনুগত্যে বিশুদ্ধ হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্কে ডাকে। তারপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়।” [আল-আনকাবূত : ৬৫] তিনি আরো বলেন, “তার চেয়ে অধিক পথভ্রষ্ট আর কে, যে আল্লাহর পরিবর্তে এমন কাউকে ডাকে, যে কিয়ামত দিবস পর্যন্তও তার ডাকে সাড়া দেবে না? আর তারা তাদের আহ্বান সম্পর্কে উদাসীন।” [আল-আহকাফ : ৫] আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্টভাবে বলেন যে, তিনিই নিরুপায়ের ডাকে সাড়া দেন এবং বিপদ দূর করেন: “(তোমাদের উপাস্যরা উত্তম) নাকি তিনি যিনি নিরুপায়কে সাড়া দেন যখন সে তাকে ডাকে এবং বিপদ দূরীভূত করেন আর তোমাদেরকে জমিনের প্রতিনিধি বানান। আল্লাহর সাথে কোনো ইলাহ আছে কি? তোমরা উপদেশ অতি সামান্যই গ্রহণ করে থাকো।” [আন-নামাল : ৬২]
বড় শিরকের আরেকটি প্রকার হলো: গায়রুল্লাহর জন্য আনুগত্যের শিরিক করা। আহলে কিতাবরা তাদের আলেম ও সন্ন্যাসীদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে যারা তাদের জন্য শরীয়ত নির্ধারণ করতো এবং আল্লাহ তাদের জন্য যা হালাল করেছেন তা তাদের ওপর হারাম করতো। এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলা সংবাদ দিয়ে বলেন: “তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও ধর্ম যাজকদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোনো (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র।” [সূরা তাওবাহ : ৩১] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক রয়েছে, যারা এদের জন্য দ্বীন থেকে শরীআত প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি?” [আশ-শুরা: ২১] আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় বান্দাদেরকে তাঁর প্রতি ঈমান আনতে ও তাঁর শরীয়তের ফয়সালার স্মরণাপন্ন হতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং বর্ণনা করেছেন যে, শয়তান তাদের থেকে চায় যে, তারা যেন তাগুতের কাছে ফয়সালার জন্য যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আপনি কি তাদেরকে দেখেননি যারা দাবি করে যে, আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা নাযিল হয়েছে তাতে তারা ঈমান এনেছে, অথচ তারা তাগূতের কাছে বিচারপ্রার্থী হতে চায়, যদিও সেটাকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর শয়তান তাদেরকে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট করতে চায়?” [আন-নিসা: ৬০] আদী ইবনু হাতিম রাদিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি গলায় স্বর্ণের ক্রুশ পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এলাম। তিনি বললেন: হে আদী! তোমার গলা হতে এই প্রতিমা সরিয়ে ফেল। (এই বলে) আমি তাকে সূরা বারাআতের নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করতে শুনলাম: {اتَّخَذُواْ أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللّهِ} “তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও ধর্ম যাজকদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।" (আত-তওবাহ: ৩১)। তারপর তিনি বললেন: তারা অবশ্য তাদের পূজা করত না; তবে তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হালাল বলত তখন সেটাকে তারা হালাল বলে মেনে নিত। আবার তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হারাম বলত তখন নিজেদের জন্য সেটাকে হারাম বলে মেনে নিত।” {তিরমিযী (৩০৩৫), ইবনু সাদ (৬/২০৯), ইবনু আবূ হাতীম, আত-তাফসীর (১০০৫৭), তাবারানী, আল-কাবীর (১৭/৯২/২১৮)}
শিরকের আরেকটি প্রকার হলো: সালাত, রুকু, সাজদাহ ও তাওয়াফে শিরক করা। কারণ, এসব ইবাদাত ও এরকম অন্যান্য ইবাদাত গায়রুল্লাহকে সোপর্দ করা বৈধ নয়। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর খলীল আলাইহিস সালামকে তাওয়াফকারী, ইতেকাফকারী, রুকুকারী ও সাজদাকারীদের জন্য বায়তুল্লাহকে পবিত্র করতে বলেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর স্মরণ করুন যখন আমি ইবরাহীমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম ঘরের স্থান, তখন বলেছিলাম, ‘আমার সাথে কোনো কিছু শরীক করবেন না এবং আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, সালাতে দণ্ডায়মান এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখুন।” [আল-হজ্জ : ২৬] আল্লাহ তা‘আলা নির্দেশ দিয়েছেন যেন একমাত্র তাঁর জন্যই সাজদাহ করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তোমরা সূর্যকে সিজ্দা করো না, চন্দ্রকেও নয়; আর সিজ্দা কর আল্লাহ্কে, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা কেবলমাত্র তাঁরই ইবাদত কর।” [ফুসসিলাত: ৩৭] অহংকারকারীরা ছাড়া কেউ তার ইবাদতে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে না। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা বলেন, “হে ইবলীস! আমি যাকে আমার দু'হাতে সৃষ্টি করেছি, তার প্রতি সিজদাবনত হতে তোমাকে কিসে বাধা দিল? তুমি কি ঔদ্ধত্য প্রকাশ করলে, না তুমি অধিকতর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন?” [সোয়াদ: ৭৫] আল্লাহ তা‘আলা উল্লেখ করেছেন যে, সকল মাখলূক তাকে সাজদাহ করে। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “আর আল্লাহ্কেই সিজদা করে যা কিছু আছে আসমানসমূহে ও যমীনে, যত জীবজন্তু আছে সেসব এবং ফিরিশতাগণও, তারা অহংকার করে না।” [আন-নাহল: ৪৯] জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে রয়েছে, তিনি নাজ্জাশীর নিকট গমন করে বললেন: “আজকে আমিই তোমাদের (পক্ষে) বক্তব্য দিব, ফলে তারা সবাই তার অনুসরণ করলো এবং নাজ্জাশীর কাছে উপনীত হলো। কিন্তু তারা তাকে সাজদা করলো না। তিনি বললেন, কী ব্যাপার, তোমরা বাদশাহকে সাজদা করছো না কেনো? তখন তিনি বললেন, আল্লাহ আমাদের কাছে তাঁর নবীকে প্রেরণ করেছেন। তিনি আমাদেরকে নির্দেশ করেছেন যে, আমরা যেন আল্লাহ ছাড়া কাউকে সাজদা না করি।” {মুসনাদে তায়ালিসী (৩৪৪), সুনানে সাঈদ ইবন মানসুর (২৪৮১), আহমাদ (৪৪০০), লুওয়েন, আল-জুয (৪), তাহাভী, আহকামুল কুরআন (৪১৮)}
শিরকের মধ্যে আরো রয়েছে: আল্লাহ যা নাযিল করেননি তার মাধ্যমে ফয়সালা করা এবং গায়রুল্লাহর নিকট ফয়সালা নিয়ে যাওয়া। আল্লাহ নিজেই ওই ব্যক্তির হুকুম বর্ণনা করেছেন যে আল্লাহ যা নাযিল করেননি তার মাধ্যমে ফয়সালা করল। এ মর্মে আল্লাহ বলেন, “আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, জেনে রেখ, তারাই হচ্ছে কাফির।” [আল-মায়িদাহ: ৪৪] তিনি আরো বলেন, “আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, তারাই হচ্ছে জালেম।” [আল-মায়েদাহ: ৪৫] তিনি আরো বলেন, “আর যারা আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তার মাধ্যমে ফয়সালা করে না, জেনে রেখ, তারাই হচ্ছে ফাসিক।” [আল-মায়েদাহ: ৪৭] এটা এ জন্য যে, সকল নির্দেশ একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য। মহা সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “জেনে রাখ, সৃষ্টি ও নির্দেশ তাঁরই। আল্লাহ মহান, যিনি সকল সৃষ্টির রব।” [আল-আরাফ : ৫৪] আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর যারা শির্ক করেছে, তারা বলল, আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে আমরা ও আমাদের পিতৃপুরুষেরা তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো কিছুর ইবাদাত করতাম না। আর কোন কিছু তাঁকে ছাড়িয়ে হারামও ঘোষণা করতাম না। তাদের পূর্ববর্তীরা এরূপ করত। রাসূলদের কর্তব্য কি শুধু সুস্পষ্ট বাণী পৌছে দেয়া নয়?” [আন-নাহাল: ৩৫]
কিতাবীরা যেহেতু তাদের আলেম ও সন্ন্যাসীদের শরীয়ত নিধারণকারী রব হিসেবে গ্রহণ করেছে, তাই আল্লাহ তাদের ধ্বংস হওয়ার খবর দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক ইলাহের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোনো (হক) ইলাহ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র।” [আত-তাওবাহ : ৩১] মহান আল্লাহ আরো বলেন, “নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক রয়েছে, যারা এদের জন্য দ্বীন থেকে শরীআত প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি?” [আশ-শুরা: ২১] আদী ইবনু হাতিম রাদিয়াল্লাহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি গলায় স্বর্ণের ক্রুশ পরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে এলাম। তিনি বললেন: হে আদী! তোমার গলা হতে এই প্রতিমা সরিয়ে ফেল। (এই বলে) আমি তাকে সূরা বারাআতের নিম্নোক্ত আয়াত পাঠ করতে শুনলাম: {اتَّخَذُواْ أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللّهِ} “তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও ধর্ম যাজকদেরকে রব হিসেবে গ্রহণ করেছে।" (আত-তওবাহ: ৩১)। তারপর তিনি বললেন: তারা অবশ্য তাদের পূজা করত না; তবে তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হালাল বলত তখন সেটাকে তারা হালাল বলে মেনে নিত। আবার তারা কোন জিনিসকে যখন তাদের জন্য হারাম বলত তখন নিজেদের জন্য সেটাকে হারাম বলে মেনে নিত।” {তিরমিযী (৩০৩৫), ইবনু সাদ (৬/২০৯), ইবনু আবি হাতীম, আত-তাফসীর (১০০৫৭), তাবারানী, আল-কাবীর (১৭/৯২/২১৮)}
কিতাবীরা এ বিষয়ে মুশরিকদের মত ছিল যাদের ব্যাপারে আল্লাহ বলেছেন, “আর যারা শির্ক করেছে, তারা বলল, আল্লাহ্ ইচ্ছে করলে আমরা ও আমাদের পিতৃপুরুষেরা তাঁকে ছাড়া অন্য কোনো কিছুর ইবাদাত করতাম না। আর কোন কিছু তাঁকে ছাড়িয়ে হারামও ঘোষণা করতাম না। তাদের পূর্ববর্তীরা এরূপ করত। রাসূলদের কর্তব্য কি শুধু সুস্পষ্ট বাণী পৌছে দেয়া নয়?” [আন-নাহাল: ৩৫]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “কিন্তু না, আপনার রবের শপথ! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তারা নিজেদের বিবাদ-বিসম্বাদের বিচার ভার আপনার উপর অর্পণ না করে; অতঃপর আপনার মীমাংসা সম্পর্কে তাদের মনে কোনো দ্বিধা না থাকে এবং সর্বান্তকরণে তা মেনে নেয়।” [আন-নিসা : ৬৫] তিনি আরো বলেছেন, “নাকি তাদের এমন কতগুলো শরীক রয়েছে, যারা এদের জন্য দ্বীন থেকে শরীআত প্রবর্তন করেছে, যার অনুমতি আল্লাহ্ দেননি?” [আশ-শুরা: ২১] তিনি আরো বলেন, “তবে কি তারা জাহেলিয়াতের বিধি-বিধান কামনা করে? আর দৃঢ় বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য বিধান প্রদানে আল্লাহর চেয়ে আর কে শ্রেষ্ঠতর?” [আল-মায়েদা: ৫০]
এর আরেকটি প্রকার হলো: মহব্বতে শিরক। আর তা হলো কোনো মাখলূককে লাঞ্ছনা, সম্মান ও বিনয়ভাব নিয়ে মহব্বত করা। আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের তাদের শরীকদের মহব্বত করার ব্যাপারে বলেন, ‘‘মানুষের মধ্যে এমন মানুষও রয়েছে যারা আল্লাহ ব্যতীত অপরকে সদৃশ স্থির করে, আল্লাহকে ভালবাসার ন্যায় তাদেরকে ভালবাসে। [আল-বাকারাহ: ১৬৫] উবাইদুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলাম: কোন পাপ সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, তোমার আল্লাহর জন্য অংশী সাব্যস্ত করা; অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন...”। {বুখারী (৪৪৭৭), মুসলিম (৮৬), আবূ দাউদ (২৩১০), তিরমিযী (৩১৮২), নাসায়ী (৪০১৩)}
শিরকের আরেকটি ধরণ হলো: ভীতি ও আশঙ্কাজনিত শিরক। আর তা হলো কোনো মাখলূককে এমন ভয় বা আশঙ্কা পোষণ করা যা বিনয়, আত্মসমর্পণ ও শ্রদ্ধার সাথে মিশ্রিত থাকে। যেমন, সে আশঙ্কা করে যে ঐ সৃষ্টির মাধ্যমে তার উপর বিপদ আসবে, বা তার থেকে কল্যাণ রুদ্ধ হবে, অথবা তার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কোনো হারাম কাজ সম্পাদন করা। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, "সে তো শয়তান। সে তোমাদেরকে তার বন্ধুদের ভয় দেখায়; কাজেই যদি তোমরা মুমিন হও তবে তাদেরকে ভয় করো না, আমাকেই ভয় কর।" [আলে ইমরান : ১৭৫] মুশরিকরা বিশ্বাস করে যে, তাদের ইলাহ ক্ষতি করে ও উপকার করে। আর এই জন্য তারা ধারণা করেছিলো যে, তাদের ইলাহগণ আল্লাহর নবী হুদ আলাইহিস সালামকে অনিষ্টের দ্বারা স্পর্শ করেছে, যেমন তারা বলেছেন: "আমরা তো এটাই বলি, আমাদের উপাস্যদের মধ্যে কেউ তোমাকে অশুভ দ্বারা আবিষ্ট করেছে।‘ তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহ্কে সাক্ষী করছি এবং তোমারাও সাক্ষী হও যে, নিশ্চয় আমি তা থেকে মুক্ত যাকে তোমরা শরীক কর।" [হুদ: ৫৪] মুজাহিদ বলেন, “আমাদের উপাস্যদের মধ্যে কেউ তোমাকে অশুভ দ্বারা আবিষ্ট করেছে।” তিনি বলেন: এভাবে যে, মূর্তিরা তোমাকে পাগলামো দ্বারা স্পর্শ করেছে। তাবারী, আত-তাফসীর (১৫/৩৬১) আল্লাহ তা‘আলা হানিফী মিল্লাতের অধিকারী ইবরাহীম আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বলেন, তিনি বলেছেন: “আর তোমরা যাকে আল্লাহর শরীক কর আমি তাকে কিরূপে ভয় করব? অথচ তোমরা ভয় করছ না যে, তোমরা আল্লাহর সাথে শরীক করছ এমন কিছু, যার পক্ষে তিনি তোমাদের কাছে কোন প্রমাণ নাযিল করেননি। কাজেই যদি তোমরা জান তবে বল, দু’দলের মধ্যে কোন দল নিরাপত্তা লাভের বেশী হকদার।” [আল-আনআম: ৮১]
জাহেলী যুগের লোকেরা জিনদের সরদারদের নিকট তাদের বেকুবদের ভয়ে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, ‘‘এও যে, কিছু মানুষ কিছু জিনের আশ্রয় নিত, ফলে তারা জিনদের আত্মম্ভরিতা বাড়িয়ে দিয়েছিল।” [আল-জিন: ৬]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “অতঃপর যখন তাদেরকে যুদ্ধের বিধান দেয়া হল তখন তাদের একদল মানুষকে ভয় করছিল আল্লাহকে ভয় করার মত অথবা তার চেয়েও বেশী।” [আন-নিসা: ৭৭] মহা সত্য আল্লাহ বলেন যে, তাঁর অলীগণ আল্লাহকে ছাড়া কাউকে ভয় করেন না। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “তারা আল্লাহর বাণী প্রচার করত, আর তাকে ভয় করত এবং আল্লাহ্কে ছাড়া অন্য কাউকেও ভয় করত না। আর হিসাব গ্রহণকারীরুপে আল্লাহ্ই যথেষ্ট।” [আল-আহযাব: ৩৯] তিনি আরও বলেন, “তারাই তো আল্লাহর মসজিদের আবাদ করবে, যারা ঈমান আনে আল্লাহ্ ও শেষ দিনের প্রতি, সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাউকে ভয় করে না। অতএব আশা করা যায়, তারা হবে সৎপথ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত “ [আত-তাওবাহ: ১৮] তিনি আরো সংবাদ দিয়েছেন যে, যাদুকররা ঈমান আনয়ন করার পর ফিরআউন ও তার নির্যাতনের ভয়ের ওপর আল্লাহর ভয়কে প্রধান্য দিয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা তাদের কথোপকথন সম্পর্কে বলেন, “তারা বলল, ‘আমাদের কাছে যে সকল স্পষ্ট নিদর্শন এসেছে তার উপর এবং যিনি আমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর উপর তোমাকে আমরা কিছুতেই প্রাধান্য দেব না। কাজেই তুমি যা সিদ্ধান্ত নেবার নিতে পার। তুমি তো শুধু এ দুনিয়ার জীবনের উপর কতৃত্ব করতে পার।* আমরা নিশ্চয় আমাদের রব এর প্রতি ঈমান এনেছি, যাতে তিনি ক্ষমা করেন আমাদের অপরাধ এবং তুমি আমাদেরকে যে জাদু করতে বাধ্য করেছ তা। আর আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠ ও স্থায়ী।” [ত্বহা: ৭২,৭৩]
এর আরেকটি প্রকার হলো: আশা-জনিত শিরক, যার অর্থ হলো এমন কোনো সৃষ্ট জীব থেকে এমন কিছু আশা করা যা শুধুমাত্র আল্লাহর ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। অথবা মৃতদের কাছ থেকে দুঃখ-কষ্ট দূর করা, চাহিদা পূরণ করা বা কিয়ামতের দিন সুপারিশ করার আশা করা। আল্লাহ তা‘আলা মুশরিকদের তাদের উপাস্যদের ইবাদত করার কারণ সম্পর্কে বলেন, “এদের এবাদত এ জন্যেই করি, যেন তারা আমাদেরকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে দেয়।” [আয-যুমার : ৩] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনবে না এবং শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেবে না। আর তোমরা তাদেরকে যে শরীক করেছ তা তারা কিয়ামতের দিন অস্বীকার করবে। সর্বজ্ঞ আল্লাহর মত কেউই আপনাকে অবহিত করতে পারে না।” [সূরা ফাতির: ১৪] আল্লাহ তা‘আলা বর্ণনা করেছেন যে, এসব শরীক কোনো কিছুরই মালিক নয়। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “বলুন, 'তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে তোমাদের যেসব শরীকদের ডাক, তাদের কথা ভেবে দেখেছ কি? তারা যমীনে কিছু সৃষ্টি করে থাকলে আমাকে দেখাও; অথবা আসমানের সৃষ্টিতে তাদের কোন অংশ আছে কি? না কি আমি তাদেরকে এমন কোন কিতাব দিয়েছি যার প্রমাণের উপর তারা নির্ভর করে?' বরং যালিমরা একে অন্যকে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুরই প্রতিশ্রুতি দেয় না।” [ফাতির: ৪০] আল্লাহ তা‘আলা অনুসারীদের ব্যাপারে বলেছেন যে, তাদেরকে কিয়ামতের দিন বলা হবে: “তোমাদের তোমাদের দেবতাগুলোকে ডাক। তখন তারা ওদেরকে ডাকবে। কিন্তু ওরা এদের ডাকে সাড়া দেবে না। আর তারা শাস্তি দেখতে পাবে। হায়! এরা যদি সৎপথ অনুসরণ করত।” [আল-কাসাস: ৬৪] মুশরিকদের স্বীয় উপাস্যদেরকে ডাকা সম্পর্কিত যা কুরআনে উল্লেখ হয়েছে তা সবই তাদের আশা-জনিত শিরকের ওপর দলিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “নিঃসন্দেহ যে, তোমরা আমাকে যার দিকে ডাকছ, সে দুনিয়া ও আখিরাতে কোথাও ডাকের যোগ্য নয়। আর আমাদের ফিরে যাওয়া তো আল্লাহর দিকে এবং নিশ্চয় সীমালংঘনকারীরা আগুনের অধিবাসী।” [গাফির: ৪৩] যদি তারা এ ধারণা না করত যে তাদের উপাস্যরা তাদের ডাকে সাড়া দেবে, তবে ফেরাউনের পরিবার থেকে ঈমানদার ব্যক্তি এ বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করতেন না।
বড় শিরকের আরেকটি প্রকার হলো: যাদু; আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বরং শয়তানরাই কুফরী করেছিল; তারা মানুষকে শিক্ষা দিত যাদু এবং যা বাবিল শহরে হারূত ও মারূত ফিরিশতাদ্বয়ের উপর নাযিল হয়েছিলো। তারা উভয়েই এই কথা না বলে কাউকে শিক্ষা দিত না যে, ‘আমরা নিছক একটি পরীক্ষা ; কাজেই তুমি কুফরী করো না।” [আল-বাকারাহ: ১০২] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী? তিনি বললেন, ১. আল্লাহর সাথে শরীক করা ২. যাদু ৩. আল্লাহ তা‘আলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরী‘আতসম্মত কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করা ৪. সুদ খাওয়া ৫. ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা ৬. রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং ৭. সরল স্বভাবওয়ালা সতী-সাধ্বী মুমিনাদের অপবাদ দেওয়া।” {বুখারী (২৭৬৬), মুসলিম (৮৯), আবূ দাউদ (২৮৭৪), নাসাঈ (৩৬৭১)}
আমর ইবনু দিনার থেকে বর্ণিত, তিনি বাজালা-কে আমর ইবন আউস ও আবূ শা‘সাকে বলতে শুনেছেন, তিনি বলেন, আমি ছিলাম আহনাফ ইবনু কায়িসের চাচা জাযই ইবনু মু’আবিয়ার সচিব। ’উমার -এর মৃত্যুর এক বছর পূর্বে তার লেখা একটি পত্র আমাদের কাছে আসে। পত্রের বিষয়বস্তু এরূপ: ’’প্রত্যেক যাদুকরকে হত্যা করবে...” {আবূ দাউদ (৩০৪৩), আব্দুর রাজ্জাক (৯৯৭২), সাঈদ ইবনু মানসূর (২১৮০), আহমাদ (১৬৫৭)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি জ্যোতিষবিদ্যার কিছু শিক্ষা করলো, সে যেন যাদুবিদ্যার একটা শাখা আয়ত্ত করলো। জ্যোতিষবিদ্যা যত বাড়বে যাদু বিদ্যাও তত বাড়বে।” {আবূ দাউদ (৩৯০৫), ইবনু মাজাহ (৩৭২৬), ইবনু আবি শায়বাহ (২৬১৫৯), আহমাদ (২০০০), আব্দ ইবনু হুমাইদ (৭১৪)}
এর আরেকটি প্রকার হলো: গনক ও ভবিষ্যতদ্বানী, কারণ যে তা দাবি করবে সে ইলমুল গায়েবকে দাবি করল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “তিনিই গায়েবী বিষয়ের জ্ঞানী, তিনি তাঁর গায়েবের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না,* তাঁর মনোনীত রাসূল ছাড়া। সে ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের সামনে এবং পিছনে প্রহরী নিয়োজিত করেন।” [আল-জিন: ২৬,২৭] সাফিয়্যা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক স্ত্রীর সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: “যে লোক গণকের নিকট গেল এবং তাকে কোন ব্যাপারে প্রশ্ন করল, চল্লিশ রাত্রি তার কোন সালাত গ্রহণযোগ্য হবে না।” মুসলিম (২২৩০)
আবূ হুরায়রা ও হাসান রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি কোন গনক বা ভবিষ্যতদ্বানী করা লোকের কাছ আসে, আর সে যা বলে তা সত্য বলে মনে করে, তাহলে মুহাম্মাদের উপরে যা কিছু নাযিল হয়েছে, সে তার পুরোটাই অস্বীকার করে।” {মুসনাদে আহমাদ (৯৫৩৬), আবূ হুরায়রা ও হাসান থেকে। তাছাড়া আবূ দাউদ (৩৯০৪), তিরমিযী (১৩৫), ইবনু মাজাহ (৬৩৯), ইবনু আবি শায়বাহ (১৭০৭৭), ইসহাক ইবনু রাহওয়েহ (৪৮২), আহমাদ (৯২৯০), সকলেই আবূ হুরায়রা থেকে।}
আমরা জানি যে শিরকের একটি প্রকার হলো ছোট শিরক (শিরকে আসগর), যা মানুষকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেয় না, তার স্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকার কারণ হয় না এবং তার সমস্ত আমল ধ্বংস করে দেয় না। এর অনেক প্রকার রয়েছে:
তন্মধ্যে: শুভ-অশুভ লক্ষণ নির্ধারণ করা, আর এর সংজ্ঞা হলো যা তোমাকে চালিত করে অথবা তোমাকে বিরত রাখে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “অতঃপর যখন তাদের কাছে কোন কল্যাণ আসত, তখন তারা বলত, ‘এটা আমাদের পাওনা।’ আর যখন কোন অকল্যাণ পৌঁছত তখন তারা মূসা ও তার সাথীদেরকে অলক্ষুণে গণ্য করত। সাবধান! তাদের অকল্যাণ তো কেবল আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে; কিন্তু তাদের অনেকেই জানে না।” [আল-আরাফ : ১৩১] মহান আল্লাহ আরো বলেন, “তারা বললো, তোমাদের অমঙ্গল তোমাদেরই সাথে; এটা কি এজন্যে যে, তোমাদেরকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে? বরং তোমরা এক সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।” [সূরা ইয়াছিন : ১৯] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “রোগের সংক্রমণ, অশুভ লক্ষণ, অশুভ পেঁচা ও সফর মাসের অনিষ্ট বলতে কিছু নেই।” {বুখারী (৫৭০৭), মুসলিম (২২২০), আবু দাউদ (৩৯১১)}
উরওয়া ইবনু আমির রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট শুভ-অশুভ লক্ষণ সম্পর্কে আলোচনা করা হলে তিনি বললেন: “এগুলোর মধ্যে সর্বোত্তম হচ্ছে ‘ফাল’ তথা সুধারণা। কুলক্ষণ কোন মুসলমানকে স্বীয় কর্তব্য পালনে বাধাগ্রস্ত করতে পারে না। তোমাদের কেউ যদি অপছন্দনীয় কোন কিছু প্রত্যক্ষ করে তখন সে যেন বলে, ‘‘হে আল্লাহ তুমি ছাড়া কেউ কল্যাণ দিতে পারে না। তুমি ছাড়া কেউ অকল্যাণ ও দূরাবস্থা দূর করতে পারে না। ক্ষমতা ও শক্তির আধার একমাত্র তুমিই।’’ {আবূ দাউদ (৩৯১৯), ইবনু আবি শায়বাহ, আল-মুসান্নাফ (২৬৯২০), আল-আদাব (১৬২), খাল্লাল, আস-সুন্নাহ (১৪০৫)}
আব্দুল্লাহ ইবন আমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তিকে অশুভ লক্ষণ কোনো প্রয়োজন থেকে বিরত রাখল সে শিরক করল। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, তার কাফফারা কী? তিনি বললেন, তাদের কারো এ কথঅ বলা যে, হে আল্লাহ, তোমার কল্যাণ ছাড়া কোনো কল্যাণ নেই, তোমার লক্ষণ ছাড়া কোনো লক্ষণ নেই এবং তুমি ছাড়া কোনো ইলাহ নেই।” {ইবনু ওহাব, আল-জামি (৬৫৮), আহমাদ (৭০৪৫), হদিসের শব্দ মুসনাদে আহমাদ থেকে গৃহীত, তাবারানী আল-কাবীর (১৪৬২২), ইবনু সুন্নী, আমাল ইওয়াম ওয়া লায়লাহ (২৯২)}
তন্মধ্যে: তাবিজ ঝুলানো। আবূ বাশীর আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহ হতে বর্ণিত, “কোন এক সফরে তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে ছিলেন। (রাবী) ‘আবদুল্লাহ্ বলেন, আমার মনে হয়, তিনি (আবূ বাশীর আনসারী) বলেছেন যে, মানুষ শয্যায় ছিল। তখন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সংবাদ বহনকারীকে পাঠালেন যে, কোন উটের গলায় যেন ধনুকের রশির মালা কিংবা মালা না ঝুলে, আর ঝুললে তা যেন কেটে ফেলা হয়।” {বুখারী (৩০০৫), মুসলিম (২১১৫), আবু দাউদ (২৫৫২)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “মন্ত্র, তাবিজ, গিটযুক্ত মন্ত্রের সূতা হলো শির্ক।” {আবূ দাউদ (৩৮৮৩), ইবনু মাজাহ (৩৫৩০), মা‘মার বিন রাশেদ, আল-জামি (২০৩৪৩), ইবনু আবি শায়বাহ (২৩৯২৪), আহমাদ (৩৬১৫)}
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন, “যে ব্যক্তি কোনো কিছু ঝুলালো তাকে তার দিকে সপর্দ করা হবে।” {তিরমিযী (২০৭২), ইবনু আবি শায়বাহ, আল-মুসান্নাফ (২৩৯২৩) এবং আল-মুসনাদ (৭৮৬), আহমাদ (১৮৭৮১)}
তন্মধ্যে: অল্প রিয়া; তবে যার অন্তর রিয়াতে পূর্ণ হয়ে গেল ফলে কোনো নিয়ত, ঈমান ও ভয় ছাড়াই নেক কাজগুলো করতে লাগল সে খালিস মুনাফিক এবং তার আমল বাতিল, প্রত্যাখ্যাত ও অগ্রহণযোগ্য হবে। মহান আল্লাহ বলেন: “সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে।” [আল-কাহাফ : ১১০] রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আল্লাহু তাবারাকা ওয়াতাআলা বলেন, ‘আমি সমস্ত অংশীদারদের চাইতে অংশীদারি [শিরক] থেকে অধিক অমুখাপেক্ষী। যদি কেউ এমন কাজ করে যাতে সে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, আমি তাকে ও তার শির্ককে বর্জন করি।” মুসলিম: (২৯৮৫)
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যার বিচার করা হবে, সে হচ্ছে একজন শহীদ। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং আল্লাহ তার নিয়ামাতরাশির কথা তাকে বলবেন এবং সে সবটাই চিনতে পারবে। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এর বিনিময়ে কী আমল করেছিলে? সে বলবে, আমি তোমারই পথে যুদ্ধ করেছি এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি বরং এ জন্যই যুদ্ধ করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে বলে, তুমি বীর। তা বলা হয়েছে, এরপর নির্দেশ দেয়া হবে, সে মতে তাকে উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার করা হবে যে জ্ঞানার্জন ও বিতরণ করেছে এবং কুরআন মাজীদ অধ্যয়ন করেছে। তখন তাকে হাযির করা হবে। আল্লাহ তা’আলা তাঁর প্রদত্ত নি’আমাতের কথা তাকে বলবেন এবং সে তা চিনতে পারবে। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এত বড় নি’আমাত পেয়ে বিনিময়ে তুমি কী করলে? জবাবে সে বলবে, আমি জ্ঞান অর্জন করেছি এবং তা শিক্ষা দিয়েছি এবং তোমারই সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশে কুরআন অধ্যয়ন করেছি। জবাবে আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছো। তুমি তো জ্ঞান অর্জন করেছিলে এজন্য যাতে লোকে তোমাকে জ্ঞানী বলে। কুরআন তিলাওয়াত করেছিলে এ জন্য যাতে লোকে বলে, তুমি একজন কারী। তা বলা হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে, সে মতে তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। তারপর এমন এক ব্যক্তির বিচার হবে যাকে আল্লাহ তা’আলা সচ্ছলতা এবং সর্ববিধ বিত্ত-বৈভব দান করেছেন। তাকে উপস্থিত করা হবে এবং তাকে প্রদত্ত নিআমাতসমূহের কথা তাকে বলবেন। সে তা চিনতে পারবে। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এসব নি’আমাতের বিনিময়ে তুমি কী আমল করেছো? জবাবে সে বলবে, সম্পদ ব্যয়ের এমন কোন খাত নেই যাতে সম্পদ ব্যয় করা তুমি পছন্দ কর, আমি সে খাতে তোমার জন্য ব্যয় করেছি। তখন আল্লাহ তা’আলা বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছে। তুমি বরং এ জন্য তা করেছিলে যাতে লোকে তোমাকে ’দানবীর’ বলে অভিহিত করে। তা বলা হয়েছে। তারপর নির্দেশ দেয়া হবে, সে মতে তাকেও উপুড় করে হেঁচড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” {মুসলিম (১৯০৫), তিরমিযী (২৩৮২), নাসায়ী (৩১৩৭)}
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “যে ব্যক্তি লোক শোনানো ’ইবাদাত করে আল্লাহ্ এর বিনিময়ে তার ’লোক-শোনানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন’। আর যে ব্যক্তি লোক-দেখানো ’ইবাদাত করবে আল্লাহর এর বিনিময়ে তার ’লোক দেখানোর উদ্দেশ্য প্রকাশ করে দেবেন’।” {বুখারী (৬৪৯৯), মুসলিম (২৯৮৭), ইবনু মাজাহ (৪২০৭)}
ইবনু ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “যে ব্যক্তি তার আমল মানুষদের শোনালো, আল্লাহ্ তার আমল স্বীয় মাখলূকের মাঝে প্রকাশ করে দিবেন এবং তাকে ছোট করবেন ও লাঞ্ছিত করবেন।” {ইবনুল মুবারাক, আয-যুহদ (১৪১), ইবনু আবি শায়বাহ (৩৬৪৪৮), হান্নাদ, আয-যুহদ (৮৭২), আহমাদ (৬৫০৯), আয-যুহদ (২৩৮)}
আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট এসে বলল, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে যুদ্ধ কোনটি? কেননা আমাদের কেউ লড়াই করে রাগের বশবর্তী হয়ে, আবার কেউ লড়াই করে প্রতিশোধ নেয়ার জন্য। তিনি তার দিকে মাথা তুলে তাকালেন। বর্ণনাকারী বলেন, তার মাথা তোলার কারণ ছিল যে, সে ছিল দাঁড়ানো। অতঃপর তিনি বললেনঃ “আল্লাহর বাণী বিজয়ী করার জন্য যে যুদ্ধ করে তার লড়াই আল্লাহর পথে হয়।” {বুখারী (১২৩), মুসলিম (১৯০৪), আবূ দাউদ (২৫১৭), তিরমিযী (১৬৪৬), নাসাঈ (৩১৩৬), ইবনু মাজাহ (২৭৮৩)}
আমরা জানি যে, রাসূলূ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রিয়া-কে গোপন শিরক নামকরণ করেছেন। মাহমূদ ইবন লাবিদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “সাবধান, গোপন শিরক থেকে তোমরা সতর্ক থাকো। তারা বললেন, গোপন শিরক কী? তিনি বললেন, তোমাদের কারো স্বীয় সালাতে দাঁড়িয়ে তা সুন্দর করার খুব চেষ্টা করা; যেন মানুষ তার দিকে তাকায়। আর এটাই হলো গোপন শিরক।” ইবনু আবি শায়বাহ (৮৪৮৯), ইবনু খুযায়মাহ (৯৩৭), তাবারানী, আল-কাবীর (৪৩০১), বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা (৩৬২৯), শুআবুল ঈমান (২৮৭২)}
তিনি বর্ণনা করেছেন যে, রিয়া খুব গোপন বিষয়। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উম্মাতের ওপর মাসীহ দাজ্জালের চেয়েও এ বিষয়টির বেশী ভয় করেছেন, যেমন তিনি বলেছেন, “আমি কি তোমাদের এমন বিষয় অবহিত করবো না, যা আমার মতে তোমাদের জন্য মসীহ দাজ্জালের চেয়েও ভয়ংকর? রাবী বলেন, আমরা বললাম, হাঁ, অবশ্যই। তিনি বলেনঃ গুপ্ত শিরক; তা এরূপ যে, মানুষ নামায পড়তে দাঁড়ায় এবং লোকের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য সুন্দরভাবে নামায পড়ে।” {ইবনু মাজাহ (৪২০৪), আহমাদ (১১২৫২), হাম্বল ইবনু ইসহাক, আল-ফিতান (৩০), তবারী, তাহযীবুল আসার (১১১৭)}
অনুরূপভাবে ছোট শিরকের অন্তর্ভুক্ত হলো, আমল দ্বারা দুনিয়া অর্জনের ইচ্ছা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যে কেউ আখিরাতের ফসল কামনা করে তার জন্য আমি তার ফসল বাড়িয়ে দেই এবং যে কেউ দুনিয়ার ফসল কামনা করে আমি তাকে তা থেকে কিছু দেই। আর আখেরাতে তার জন্য কিছুই থাকবে না।” [আশ-শুরা: ২০] তিনি আরো বলেন, “যে কেউ দুনিয়ার জীবন ও তার শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমি তাদের কাজের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেখানে তাদেরকে কম দেয়া হবে না।” [হুদ: ১৫] এটি বান্দার কলবের অবস্থা ভেদে ছোট শিরক ও বড় শিরক হয়। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, “কেউ আশু সুখ-সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে যা ইচ্ছে এখানেই সত্ত্বর দিয়ে থাকি; পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি যেখানে সে শাস্তিতে দগ্ধ হবে নিন্দিত ও অনুগ্রহ হতে বিতাড়িত অবস্থায়।” [আল-ইসরা: ১৮]
আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ব্যক্তি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট এসে বলল: “কোন ব্যক্তি গনীমতের জন্য, কোন ব্যক্তি প্রসিদ্ধ হওয়ার জন্য এবং কোন ব্যক্তি বীরত্ব দেখানোর জন্য জিহাদে শরীক হলো। তাদের মধ্যে কে আল্লাহর পথে জিহাদ করল? তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কলিমা বুলন্দ রাখার উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করল, সে-ই আল্লাহর পথে জিহাদ করল।” “বুখারী (২৮১০), মুসলিম (১৯০৪), আবূ দাউদ (২৫১৭), নাসায়ী (৩১৩৬)} যে ব্যক্তির একমাত্র লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ও চিন্তা দুনিয়াকেন্দ্রিক, তার ওপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বদ দোয়া করেছেন, বলেছেন: “দীনার, দিরহাম, রেশমী চাদর, পশমী কাপড়ের দাসরা ধ্বংস হোক। ওদের এসব দেয়া হলে খুশি থাকে আর দেয়া না হলে নাখোশ হয়।” {বুখারী (২৮৮৬), ইবনু মাজাহ (৪১৩৫)}
আরো ছোট শিরক হলো, কোনো ব্যক্তির এ জাতীয় কথা: ‘আল্লাহ এবং আপনি যা চেয়েছেন তাই’। যেমন ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আল্লাহ এবং আপনি যা চেয়েছেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বললেন, “তুমি কি আমাকে আল্লাহর বরাবর করছো, বরং (বলো) একা আল্লাহ যা চেয়েছেন তাই হয়েছে।” {ইবনু আবি শায়বাহ (২৭২২৭), আহমাদ (১৮৩৯), বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ (৭৮৩), ইবনু আবিদ দুনিয়া, আস-সামত (৩৪২), আল-বাগিন্দী, আমালী (৩৬)} এ জাতীয় কথার অনুরুপ হলো: ‘এটা আল্লাহ ও আপনার পক্ষ থেকে’, এবং ‘যদি আল্লাহ ও অমুক না থাকতেন এরূপ হতো না।’
তন্মধ্যে: গায়রুল্লাহর নামে কসম করা। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যদি তোমাদের কসম করতে হয় তাহলে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো নামে কসম কারো না। কুরাইশ লোকজন তাদের বাপ-দাদার নামে কসম করত। তিনি বললেন, সাবধান! বাপ-দাদার নামে কসম করো না।” {বুখারী: (৩৮৩৬), মুসলিম: (১৬৪৬), নাসাঈ: (৩৭৬৪)} ইবনু ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “যে ব্যক্তি গাইরুল্লাহর নামে শপথ করল, সে কুফুরী অথবা শির্ক করল।” {তিরমিযী (১৫৩৫), আহমাদ (৬০৭২), মুস্তাখরাজ আবি আওয়ানাহ (৬৪০১), হাকিম (৭৮৯৫)}
অধ্যায়: নিফাকী (কপটতা)।
আর যেসব বিষয় আল্লাহর প্রতি ইমানের বিপরীত তন্মধ্যে হলো: বড় নিফাক। তা হলো ইসলাম জাহির করা ও কুফর গোপন করা। এটি বড় ও ছোট উভয় প্রকার হয়। বড় নিফাক মূল ঈমানের বিপরীত আর ছোট নিফাক ঈমানের পূর্ণতার বিপরীত। যেমন ইমাম আহমাদ “উসূলুস সুন্নাহ” গ্রন্থে বলেছেন, “নিফাক হলো কুফর; আল্লাহর সাথে কুফরী করা, গায়রুল্লাহর ইবাদত করা ও প্রকাশ্যে ইসলাম জাহির করা। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের মুনাফিকরা ছিল।” (আহমাদ ইবনু হাম্বল, উসূলুস সুন্নাহ (পৃ.৫৫)। বড় নিফাক দ্বীন থেকে বহিষ্কার করে দেয়।
আমরা আল্লাহর সাক্ষীর কারণে সাক্ষ্য প্রদান করি যে, মুনাফিকরা তাদের ঈমানের দাবিতে মিথ্যাবাদী। সম্মানিত ও রাজত্বের অধিকারী আল্লাহ বলেন, “আর যারা মসজিদ নির্মাণ করেছে ক্ষতিসাধন, কুফরী ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং এর আগে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে গোপন ঘাটিস্বরূপ ব্যবহারের উদ্দেশ্যে, আর তারা অবশই শপথ করবে, ‘ আমরা কেবল ভালো চেয়েছি। আর আল্লাহ্ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, অবশ্যই তারা মিথ্যাবাদী।” [আত-তাওবাহ : ১০৭] তিনি আরো বলেছেন, “আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, নিশ্চয় মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী।” [মুনাফিকুন: ১]
আল্লাহ মুনাফিকদের থেকে ফরয ও নফল গ্রহণ করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “বলুন, ‘তোমার ইচ্ছাকৃত ব্যয় কর অথবা অনিচ্ছাকৃত, তোমাদের কাছ থেকে তা কিছুতেই গ্রহণ করা হবে না; নিশ্চয় তোমরা হচ্ছ ফাসিক সম্প্রদায়।* আর তাদের অর্থসাহায্য গ্রহন করা নিষেধ করা হয়েছে এজন্য যে, তারা আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে এবং সালাতে উপস্থিত হয় কেবল শৈথিল্যের সাথে, আর অর্থসাহায্য করে কেবল অনিচ্ছাকৃতভাবে।” [আল-ফুরকান: ৫৩,৫৪]
মুনাফিকদের পরিণতি হলো—যদি নিফাকের ওপর মারা যায়—স্থায়ীভাবে জাহান্নাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “মুনাফিকরা তো জাহান্নামের নিম্নতম স্তরে থাকবে এবং তাদের জন্য আপনি কখনো কোন সহায় পাবেন না।” [আন-নিসা: ১৪৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “মুনাফেক পুরুষ, মুনাফেক নারী ও কাফেরদেরকে আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন জাহান্নামের আগুনের, যেখানে তারা স্থায়ী হবে, তিনি তাদেরকে লা’নত করেছেন এবং তাদের জন্য রয়েছে স্থায়ী শাস্তি।” [আত-তাওবাহ: ৬৮]
আমরা জানি যে, বড় নিফাক হলো: সত্যের প্রতি বিদ্বেষ ও সত্যকে অপছন্দ করা। আল্লাহ তা‘আলা মুনাফিকদের অবস্থা সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, “এটা এজন্য যে, তারা এমন সব বিষয় অনুসরণ করেছে যা আল্লাহর অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে এবং তারা তাঁর সন্তুষ্টিকে অপছন্দ করেছে ; সুতরাং তিনি তাদের আমলসমূহ নিষ্ফল করে দিয়েছেন।* নাকি যাদের অন্তরে রোগ আছে তারা মনে করে যে, আল্লাহ কখনো তাদের বিদ্বেষভাব প্ৰকাশ করে দেবেন না?* আর আমি ইচ্ছে করলে আপনাকে তাদের পরিচয় দিতাম; ফলে আপনি তাদের লক্ষণ দেখে তাদেরকে চিনতে পারতেন। তবে আপনি অবশ্যই কথার ভঙ্গিতে তাদেরকে চিনতে পারবেন। আর আল্লাহ তোমাদের যাবতীয় আমল সম্পর্কে জানেন।” [মুহাম্মাদ: ২৮-৩০]
বড় নিফাকী হলো সেটাই যে, তারা ইসলাম ও মুসলিমদের পরাজয়ে খুশি হয় এবং ইসলামের জয় দেখলে আফসোস করে। মহান আল্লাহ তাদের অন্তরের গোপন বিষয় প্রকাশ করে বলেন, “আপনার মঙ্গল হলে তা তাদেরকে কষ্ট দেয়, আর আপনার বিপদ ঘটলে তারা বলে, ‘ আমরা তো আগেই আমাদের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম’ এবং তারা উৎফুল্ল চিত্তে মুখ ফিরিয়ে নেয়।” [আত-তাওবাহ: ৫০]
বড় নিফাক হলো ঈমানের পর কুফরী করা এবং শরীয়তের ফয়সালা মেনে নেওয়া থেকে পিছু হটা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর তারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনলাম এবং আমরা আনুগত্য করেছি।’ এরপর তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়; আসলে তারা মুমিন নয়।* আর যখন তাদেরকে ডাকা হয় আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের দিকে, তাদের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করে দেয়ার জন্য, তখন তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নেয়।” [আন-নুর: ৪৭-৪৮]
বড় নিফাক হলো আল্লাহ সম্পর্কে খারাপ ধারনা করা যে, তিনি তাঁর নবী ও দ্বীনকে সাহায্য করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর স্মরণ কর, যখন মুনাফিকরা ও যাদের অন্তরে ছিল ব্যাধি, তারা বলছিল, 'আল্লাহ্ এবং তাঁর রাসূল আমাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তা প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়।” [আল-আহযাব: ১২]
বড় নিফাকী হয় সত্য ও সত্যের ধারকদের সাথে উপহাস করা এবং তাদেরকে গালমন্দ করা ও তাদের সাথে উপহাস করার মাধ্যমেও। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “মুনাফিকরা ভয় করে যে, তাদের বিষয়ে এমন একটি সূরা অবতীর্ণ হবে, যা তাদের অন্তরের বিষয়গুলি জানিয়ে দেবে। বলুন, ‘তোমরা বিদ্রূপ করতে থাক; তোমরা যা ভয় কর নিশ্চয় আল্লাহ্ তা বের করে দেবেন।* আর আপনি তাদেরকে প্রশ্ন করলে অবশ্যই তারা বলবে, ‘আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও খেলা-তামাশা করছিলাম।‘ বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ্, তাঁর আয়াতসমূহ ও তাঁর রাসূলকে বিদ্রূপ করছিলে?” [আত-তাওবাহ: ৬৪-৬৫]
এটা মুসলিমদের দোষারোপ করার মাধ্যমেও হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “মুমিনদের মধ্যে যারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সদকা দেয় এবং যারা নিজ শ্রম ছাড়া কিছুই পায় না, তাদেরকে যারা দোষারোপ করে। অতঃপর তারা তাদের নিয়ে উপহাস করে, আল্লাহ্ তাদেরকে নিয়ে উপহাস করেন; আর তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [আত-তাওবাহ: ৭৯]
বড় নিফাকী ঈমানদারদের ধোকা দেওয়া এবং আমল দেখানোর মাধ্যমেও হয়। আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ্ এবং মুমিনদেরকে তারা প্রতারিত করে। বস্তুতঃ তারা নিজেদেরকেই নিজেরা প্রতারিত করছে, অথচ তারা তা বুঝে না।” [আল-বাকারা: ৯] তিনি আরও বলেন, “নিশ্চয় মুনাফিকরা আল্লাহর সাথে ধোঁকাবাজি করে; বস্তুতঃ তিনি তাদেরকে ধোঁকায় ফেলেন। আর যখন তারা সালাতে দাঁড়ায় তখন শৈথিল্যের সাথে দাঁড়ায়, শুধুমাত্র লোক দেখানোর জন্য এবং আল্লাহকে তারা অল্পই স্মরণ করে “ [আন-নিসা: ১৪২] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “ঐ সালাতই মুনাফিকের সালাত, যে বসে বসে সূর্যের প্রতি তাকাতে থাকে আর যখন তা অস্তপ্রায় হয়ে যায় তখন উঠে গিয়ে চারবার ঠোকর মেরে আসে। এভাবে সে আল্লাহকে কমই স্মরণ করতে পারে।” {মুসলিম (৬২২), আবূ দাউদ (৪১৩), তিরমিযী (১৬০), নাসায়ী (৫১১)}
আব্দুল্লাহ ইবনু মাস‘ঊদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, “আমরা আমাদেরকে দেখেছি যে, মুনাফিক যার নিফাক স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল সে ছাড়া কেউ সালাতের জামা’আত পরিত্যাগ করে না।” {মুসলিম (৬৫৪), আবু দাউদ (৫৫০), নাসাঈ (৮৪৯), ইবনু মাজাহ (৭৭৭)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ঐ সত্তার কসম! যার হাতে আমার জীবন! চন্দ্ৰ-সূৰ্য কোন একটি দেখতে তোমাদের যেরূপ কষ্ট হয় না, তোমাদের রবকেও দেখতে তোমাদের ঠিক তদ্রুপ কষ্ট হবে না। আল্লাহর সাথে বান্দার সাক্ষাৎ হবে। তখন তিনি বললেন, ... ... তারপর তৃতীয় অপর এক ব্যক্তির আল্লাহর সাথে দেখা হবে। এরপর তিনি আগের মতো অবিকল বলবেন। তখন লোকটি বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমি আপনার প্রতি এবং কিতাব ও রসূলগণের প্রতি ঈমান এনেছি। আমি সালাত আদায় করেছি, সাওম পালন করেছি এবং সাদাকা করেছি। এমনিভাবে সে যথাসাধ্য নিজের প্রশংসা করবে। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা’আলা বলবেন, এখনই তোমার মিথ্যা প্রকাশিত হয়ে যাবে। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ তারপর তাকে বলা হবে, এখনই আমি তোমার উপর আমার সাক্ষী উপস্থিত করব। তখন বান্দা মনে মনে চিন্তা করতে থাকবে যে, কে তার বিপক্ষে সাক্ষী দিবে? তখন তার জবান বন্ধ করে দেয়া হবে এবং তার উরু, মাংস ও হাঁড়কে বলা হবে, তোমরা কথা বলো। ফলে তার উরু, মাংস ও হাঁড় তার আমলের ব্যাপারে বলতে থাকবে। এ ব্যবস্থা এজন্য করা হবে যেন, আত্মপক্ষ সমর্থন করার কোন সুযোগ তার অবশিষ্ট না থাকে। এ ব্যক্তি হচ্ছে মুনাফিক যার প্রতি আল্লাহ তা’আলা অসন্তুষ্ট।” মুসলিম: (২৯৬৮)
আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও মুমিনদেরকে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার নির্দেশ দিয়েছেন। সম্মানিত আল্লাহ বলেন, “হে নবী ! কাফের ও মুনাফেকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করুন, তাদের প্রতি কঠোর হোন; এবং তাদের আবাসস্থল জাহান্নাম, আর তা কত নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তন স্থল!* তারা আল্লাহর শপথ করে যে, তারা কিছু বলেনি; অথচ তারা তো কুফরী বাক্য বলেছে এবং ইসলাম গ্রহণের পর তারা কুফরী করেছে; আর তারা এমন কিছুর সংকল্প করেছিল যা তারা পায়নি। আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করেছিলেন বলেই বিরোধিতা করেছিল। অতঃপর তারা তাওবাহ্ করলে তা তাদের জন্য ভাল হবে, আর তারা মুখ ফিরিয়ে নিলে আল্লাহ্ দুনিয়া ও আখেরাতে তাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দেবেন; আর যমীনে তাদের কোন অভিভাবক নেই এবং কোন সাহায্যকারীও নেই।” [আত-তাওবাহ: ৭৩,৭৪]
আমরা জানি যে, ছোট নিফাকী দ্বীন থেকে বের করে দেয় না, সকল আমল বরবাদ করে না এবং ব্যক্তিকে চিরস্থায়ী জাহান্নামী বানায় না। নিফাকের অনেক শাখা রয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে হচ্ছে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থেকে যায়। ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে; এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়।” {বুখারী (৩৪), মুসলিম (৫৮), আবূ দাউদ (৪৬৮৮), তিরমিযী (২৬৩২), নাসায়ী (৫০২০)}
আবূ মূসা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ঐ মু’মিন যে কুরআন পাঠ করে এবং সে অনুযায়ী ’আমল করে, তাঁর দৃষ্টান্ত ঐ লেবুর মত যা খেতে সুস্বাদু এবং গন্ধে চমৎকার। আর ঐ মু’মিন যে কুরআন পাঠ করে না; কিন্তু এর অনুসারে ’আমল করে তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ খেজুরের মত যা খেতে সুস্বাদু কিন্তু সুগন্ধ নেই। আর মুনাফিক যে কুরআন পাঠ করে; তার উদাহরণ হচ্ছে, ঐ রায়হানের মত, যার মন মাতানো খুশবু আছে, অথচ খেতে একেবারে বিস্বাদ। আর ঐ মুনাফিক যে কুরআন পাঠ করে না, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে ঐ মাকাল ফলের মত, যা খেতে বিস্বাদ এবং গন্ধে দুর্গন্ধময়।” {বুখারী (৫০৫৯), মুসলিম: (৭৯৭), তিরমিযি (২৮৬৫), নাসাঈ (৫০৩৮), ইবনু মাজাহ (২১৪)}
অধ্যায়: বিদআত।
আমরা জানি যে, কিছু বিদআত আছে যা মূল ঈমানের পরিপন্থী আর কিছু আছে ঈমানের পূর্ণতার পরিপন্থী। শিরকী ও কুফরী বিদআত মূল ঈমানের পরিপন্থী আর যেসব বিদআত শিরক ও কুফর থেকে ছোট তা ঈমানের পূর্ণতার পরিপন্থী।
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, আল্লাহ আমাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করেছেন এবং আমাদের ওপর তাঁর নিআমতকে সম্পূর্ণ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, “আজকের দিন আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করছি। আর তোমাদের ওপর আমার নিআমতকে সম্পন্ন করছি। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনিত করছি।” [আল-মায়েদা : ৩] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি আমাদের এ দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করল যা তাতে নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।” {বুখারী (২৬৯৭), মুসলিম (১৭১৮), আবূ দাউদ (৪৬০৬), ইবনু মাজাহ (১৪)}
আমরা জানি যে, যেসব বিদআত ঈমানের পূর্ণতার বিপরীত তন্মধ্যে হলো দ্বীনের ভেতরকার বিদআত। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা সাবধান থাকো! (ধর্মে) প্রতিটি নব আবিষ্কার সম্পর্কে! কারণ প্রতিটি নব আবিষ্কার হলো বিদ’আত এবং প্রতিটি বিদ’আত হলো ভ্রষ্টতা।” {আবূ দাউদ (৪৬০৭), তিরমিযী (২৬৭৬), ইবনু মাজাহ (৪২), আহমাদ (১৭১৪৪), ইবনু আবি আসিম, আস-সুন্নাহ (২৬), ইবনু ওয়াদ্দাহ, আল-বিদা’ (৫৪)}
আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে লোক সঠিক পথের দিকে ডাকে তার জন্য সে পথের অনুসারীদের প্রতিদানের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে তাদের প্রতিদান হতে সামান্য ঘাটতি হবে না। আর যে লোক বিভ্রান্তির দিকে ডাকে তার উপর সে রাস্তার অনুসারীদের পাপের অনুরূপ পাপ বর্তাবে। এতে তাদের পাপরাশি সামান্য হালকা হবে না।” {মুসলিম (২৬৭৪), আবু দাউদ (৪৬০৯), তিরমিযী (২৬৭৪), ইবনু মাজাহ (২০৬)}
ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ তার “সহীহ” গ্রন্থে একটি অধ্যায় রচনা করেছেন, তা হলো: “অধ্যায়: যে ব্যক্তি কোনো গোমরাহীর দিকে আহ্বান করল, অথবা কোনো খারাপ রীতি চালু করল তার পাপ”। তাতে তিনি নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিম্নের বাণীটি উল্লেখ করেছেন: “যে কোন ব্যক্তিকেই অন্যায়ভাবে কতল করা হয়, তার পাপের ভাগ আদম (আঃ)-এর প্রথম (হত্যাকারী) পুত্রের উপরও পড়বে। -রাবী সুফ্ইয়ান ‘তার রক্তপাত করার অপরাধ তার উপরেও পড়বে’ উল্লেখ করেছেন।- কারণ সে-ই প্রথমে হত্যার রীতি চালু করেছে।” {বুখারী (৭৩২১), মুসলিম: (১৬৭৭), তিরমিযি (২৬৭৩), নাসাঈ (৩৯৮৫), ইবনু মাজাহ (২৬১৬)}
আবূ সাঈদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু সূত্রে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীদের পন্থা পুরোপুরি অনুসরণ করবে, প্রতি বিঘতে বিঘতে এবং প্রতি গজে গজে। এমনকি তারা যদি গো সাপের গর্তেও ঢুকে তবে তোমরাও তাতে ঢুকবে। আমরা বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কি ইয়াহূদী ও নাসারার কথা বলছেন? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে আর কারা কথা?” {বুখারী (৩৪৫৬), মুসলিম (২৬৬৯)}
আমরা জানি যে, আল্লাহ বিছিন্নতা ও ইখতিলাফ থেকে নিষেধ করেছেন। সম্মানিত ও পবিত্র নামসমূহের মালিক বলেন, “তোমরা তাদের মত হয়ো না, যারা তাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ আসার পর বিচ্ছিন্ন হয়েছে ও নিজেদের মধ্যে মতান্তর সৃষ্টি করেছে। আর তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি।” [আলে ইমরান : ১০৫] তিনি আরো বলেছেন, “যারা তাঁর আদেশের বিপরীত করে তাদের এ ব্যাপারে অবশ্যই সতর্ক থাকা উচিত যে, যেন তাদেরকে কোন ফিতনা কিংবা যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি না পেয়ে বসে।” [আন-নুর: ৬৩]
আমরা জানি যে, কিছু বিদআত হলো: কবরসমূহকে সম্মান করা ও তার ওপর স্থাপনা নির্মাণ করা, যা কখনো শিরক পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়। আরো কিছু বিদআত হলো, নেককার লোকদের মৃত্যুর পর তাদের অনুসরণ করার নিমিত্তে তাদের মূর্তি ও প্রতিকৃতি বানিয়ে রাখা। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “... জেনে রাখো! তোমাদের পূর্ববর্তী লোকেরা তাদের নবী ও নেককার লোকদের কবরগুলোকে মসজিদ বানাতো। খবরদার, তোমরা কবরগুলোকে মসজিদ বানাবে না, আমি তোমাদেরকে তা থেকে নিষেধ করছি।” মুসলিম: (৫৩২)
‘আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত যে, উম্মু হাবীবা ও উম্মু সালামা হাবশায় তাদের দেখা একটা গির্জার কথা বলেছিলেন, যাতে বেশ কিছু মূর্তি ছিল। তারা উভয়ে বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট বর্ণনা করলেন। তিনি ইরশাদ করলেনঃ তাদের অবস্থা ছিল এমন যে, কোন সৎ লোক মারা গেলে তারা তার কবরের উপর মসজিদ বানাতো। আর তার ভিতরে ঐ লোকের মূর্তি তৈরি করে রাখতো। কিয়ামত দিবসে তারাই আল্লাহর নিকট সবচাইতে নিকৃষ্ট সৃষ্টজীব বলে পরিগণিত হবে।” {বুখারী: (৪২৭), মুসলিম: (৫২৮), নাসাঈ: (৭০৪)}
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম মূর্তিসমূহকে মিশিয়ে দিতে ও কবরসমূহকে বরাবর করে দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আবূল হাইয়্যাজ আল আসাদী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আলী ইবনু আবি তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাকে বললেন, আমি কি তোমাকে এমন কাজে পাঠাব না, যে কাজে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাকে পাঠিয়েছিলেন? তা হচ্ছে কোন (জীবের) প্রতিকৃতি বা ছবি দেখলে তা চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিবে এবং কোন উঁচু কবর দেখলে তা বরাবর করে দিবে।” {মুসলিম (৯৬৯), আবূ দাউদ (৩২১৮), তিরমিযী (১০৪৯), নাসায়ী (২০৩১)}
আমরা জানি যে, নিকৃষ্ট বিদআত হলো: বিদআতী অনুষ্ঠান উদযাপন করা ও কাফিরদের অনন্দ উৎসবে তাদের সাথে অংশ গ্রহণ করা। আনাস ইবনু মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনাতে এসে দেখেন, মদীনাবাসীরা নির্দিষ্ট দু’টি দিনে খেলাধুলা ও আনন্দ করে থাকে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেনঃ এ দু’টি দিন কিসের? সকলেই বললো, জাহিলী যুগে আমরা এ দু’দিন খেলাধুলা করতাম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মহান আল্লাহ তোমাদের এ দু’দিনের পরিবর্তে উত্তম দু’টি দিন দান করেছেন। তা হলো, ঈদুল আযহা ও ঈদুল ফিত্বরের দিন।” {আবূ দাউদ (১১৩৪), নাসাঈ (১৫৫৬), আহমাদ (১২৮২৭), আবদ ইবনু হুমাইদ (১৩৯২)}
মহান আল্লাহ বলেন, “আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য নির্ধারিত করে দিয়েছি ইবাদাত পদ্ধতি যা তারা পালন করে। কাজেই তারা যেন এ ব্যাপারে আপনার সাথে বিতর্ক না করে। আর আপনি আপনার রব-এর দিকে ডাকুন, আপনি তো সরল পথেই প্রতিষ্ঠিত।” [আল-হাজ্জ: ৬৭] ইবনু আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে আল্লাহর বাণী: {لِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنسَكًا هُمْ نَاسِكُوهُ} সম্পর্কে বর্ণিত যে, “মানসাক অর্থ হলো: ঈদ “ {তাফসীরে তাবারী: (১৮/৬৭৯), ইবনু আবি হাতিম, আত-তাফসীর: (১৪৭১৮)} রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “প্রত্যেক কওমের জন্যে ঈদ রয়েছে, আর এটা হলো আমাদের ঈদ।” {বুখারী (৯৫২), মুসলিম (৮৯২), আবূ দাউদ (১৫৯৩), ইবনু মাজাহ (১৮৯৮)}
আমরা জানি যে, নিকৃষ্টি একটি বিদআত হলো: আল্লাহ যাকে বরকতের উপায় করেননি তা থেকে বরকত তলব করা। এটি কখনো শিরকের কারণ হয়। আবূ ওয়াকিদ আল-লাইসী হতে বর্ণিত আছে, হুনাইনের উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যাত্রা শুরু করলেন। তিনি মুশরিকদের একটি গাছের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই গাছটিকে যাতু আনওয়াত’ বলা হতো। তারা এর মধ্যে তাদের অস্ত্রসমূহ লটকিয়ে রাখত। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! তাদের যাতু আনওয়াতের মতো আমাদের জন্য একটা যাতু আনওয়াতের ব্যবস্থা করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ সুবহানাল্লাহ! এটা তো মূসা (আঃ)-এর উন্মাতের কথার মতো হলো। তারা বলেছিল, কাফিরদের যেমন অনেক উপাস্য রয়েছে তদ্রুপ আমাদেরও উপাস্যের ব্যবস্থা করে দিন। সেই সত্তার শপথ যার হাতে আমার প্রাণ! তোমরা অবশ্যই তোমাদের পূর্ববর্তীগণের নীতি অবলম্বন করবে।” {তিরমিযী (২১৮০), মা‘মার বিন রাশেদ, আল-জামি (২০৭৬৩), আব্দুর রাজ্জাক, আত-তাফসীর (৯৩১), ইবনু আবি শায়বাহ (৩৮৫৩০)}
অধ্যায়: কবিরা গুনাহসমূহ।
আমরা জানি যে, গুনাহের ভেতর ছোট ও বড় রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “যারা বিরত থাকে গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কাজ থেকে, ছোটখাট অপরাধ ব্যতীত।” [আন-নাজম: ৩২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “তোমদেরকে যা নিষেধ করা হয়েছে তার মধ্যে যা কবীরা গোনাহ্ তা থেকে বিরত থাকলে আমি তোমাদের ছোট পাপগুলো ক্ষমা করব এবং তোমাদেরকে সম্মানজনক স্থানে প্রবেশ করাব।” [আন-নিসা: ৩১]
’আবদুল্লাহ ইবনু মাস’ঊদ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি জিজ্ঞেস করলামঃ হে আল্লাহর রাসূল! কোন্ গুনাহ সব চেয়ে বড়? তিনি বললেনঃ কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ গণ্য করা, অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বললেনঃ তারপরে কোনটি? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার সাথে খাবে, এ আশঙ্কায় তোমার সন্তানকে হত্যা করা। তিনি বললেনঃ তারপরে কোনটি? নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে যিনা করা। তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথার সত্যতা প্রতিপন্ন করে অবতীর্ণ হলোঃ {وَالَّذِينَ لاَ يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلاَ يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ وَلاَ يَزْنُونَ} “এবং তারা আল্লাহর সাথে কোনো ইলাহকে ডাকে না। আর আল্লাহ্ যার হত্যা নিষেধ করেছেন, যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না। আর তারা ব্যভিচার করে না।” (সূরা আল-ফুরক্বান: ৬৮)।” {সহীহ বুখারী (৬০০১), মুসলিম (৮৬)}
আমরা জানি যে, ঈমান বাড়ে ও কমে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “আর যখনই কোন সূরা নাযিল হয়। তখন তাদের কেউ কেউ বলে, ‘এটা তোমাদের মধ্যে কার ঈমান বৃদ্ধি করল? অতঃপর যারা মুমিন এটা তাদেরই ঈমান বৃদ্ধি করে এবং তারাই আনন্দিত হয়।” [আত-তাওবাহ: ১২৪] বস্তুত আনুগত্য ঈমানকে বৃদ্ধি ও প্রতিষ্ঠিত করে, আর পাপ ঈমানকে হ্রাস ও দুর্বল করে। কুফর ও শিরক থেকে ছোট পাপগুলো ঈমানের পরিপূর্ণতার বিপরীত। আর কবিরা গুনাহকারী থেকে সাধারণ ঈমান হরণ করা হয় না এবং সে ব্যাপক ঈমানের বিশেষণে বিশেষিত হওয়ারও উপযুক্ত নয়। কারণ, সে ঈমান হ্রাসকারী বিষয় সংঘটিত করেছে। এ জন্য নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কোন ব্যভিচারী মু’মিন অবস্থায় ব্যভিচার করে না এবং কোন মদ্যপায়ী মু’মিন অবস্থায় মদ পান করে না। কোন চোর মু’মিন অবস্থায় চুরি করে না। কোন লুটতরাজকারী মু’মিন অবস্থায় এরূপ লুটতরাজ করে না যে, যখন সে লুটতরাজ করে তখন তার প্রতি লোকজন চোখ তুলে তাকিয়ে থাকে।” {সহীহ বুখারী (২৪৭৫), মুসলিম (৫৭)} রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন করে দেয়। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ যবান দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তরের দ্বারা পরিবর্তন করবে (ঘৃণা করে)। আর এ হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।” মুসলিম: (৪৯) নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের দিন যা সংঘটিত হবে তা সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন: “...তারপর আল্লাহ তা‘আলা বলবেন, তোমরা যাও এবং যার অন্তরে দিনার পরিমাণ ঈমান পাবে তাকে বের করে নিয়ে আসো...” {সহীহ বুখারী (৭৪৯৩), মুসলিম (১৮৩)} এসব হাদীস প্রমাণ করে যে, পাপ ঈমানকে দুর্বল করে দেয়।
যে ব্যক্তি কবিরা গুনাহ করে সে তার কবিরা গুনাহের কারণে শাস্তির হুমকিপ্রাপ্ত যতক্ষণ না সে তা থেকে তাওবা করে, অথবা তার ওপর হদ (শাস্তি) প্রয়োগ করা হবে- যদি কবিরা গুনাহটি হদ যোগ্য পাপ হয়; অথবা আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন ক্ষমার কোনো একটি কারণের মাধ্যমে। বস্তুত পাপ মোচনকারী কারণ অনেক। আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে কৃত শিরককে ক্ষমা করবেন না, আর এছাড়া সকল কিছুই যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে দিবেন।” [আন-নিসা : ৪৮]
পর্ব: সাহাবী ও নেতৃত্ব।
অধ্যায়: সাহাবী এবং আহলে বাইতগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম।
আমি বিশ্বাস করি যে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা তাঁর নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবিদের নির্বাচিত করেছেন এবং তাঁদেরকে নবীদের পর তাঁর সৃষ্টির মধ্যে শ্রেষ্ঠতর বানিয়েছেন। তাওরাত ও ইঞ্জিলে তাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন ও তাদের প্রশংসা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; আর তার সহচরগণ কাফেরদের প্রতি কঠোর, তাদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় আপনি তাদেরকে রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবেন। তাদের লক্ষণ তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার প্রভাবে সুস্পষ্ট; এটাই তাওরাতে তাদের দৃষ্টান্ত। আর ইঞ্জীলে তাদের দৃষ্টান্ত হচ্ছে এমন একটি চারাগাছ, যা থেকে নিৰ্গত হয় কচিপাতা, তারপর তা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে যা চাষীর জন্য আনন্দদায়ক। এভাবে আল্লাহ মুমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান আনে এবং সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহা প্রতিদানের।” [আল-ফাতহ: ২৯] আল্লাহ তাদের ওপর নিজের সন্তুষ্টির কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, “আর মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা ইহসানের সাথে তাদের অনুসরণ করে আল্লাহ্ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন। আর তিনি তাদের জন্য তৈরী করেছেন জান্নাত, যার নিচে নদী প্রবাহিত, সেখানে তারা চিরস্থায়ী হবে। এ তো মহাসাফল্য।” [আত-তাওবাহ: ১০০]
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন যে, সম্মানিত সাহাবীগণ সাধারণভাবে সর্বযুগের মানুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। যেমন আবদুল্লাহ্ (ইবনু মাস’ঊদ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে একবার জিজ্ঞেস করা হল, কোন্ মানুষ সর্বোত্তম? তিনি বললেনঃ আমার সময়ের মানুষ। এরপর তাদের পরবর্তী লোকেরা, এরপর তাদের পরবর্তী লোকেরা।” {সহীহ বুখারী (৬৬৫৮), মুসলিম (২৫৩৩), তিরমিযী (৩৮৫৯), ইবনু মাজাহ (২৩৬২)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, মুহাজিরগণ আনসার রাদিয়াল্লাহু আনহুম থেকে উত্তম। এই জন্যই আল্লাহ তা‘আলা তাঁর মুহকাম কিতাবে তাদেরকে আগে উল্লেখ করেছেন, যেমন সূরা তাওবার পূর্বোক্ত আয়াতে রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা মুহাজিরদের প্রশংসা করে বলেন, “এ সম্পদ নিঃস্ব মুহাজিরদের জন্য যারা নিজেদের বাড়িঘর ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সস্তুষ্টির অন্বেষণ করে এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সাহায্য করে। এরাই তো সত্যাশ্রয়ী।” [আল-হাশর: ৮]
আর আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা আনসারদের সম্পর্কে বলেছেন, “আর তাদের জন্যও, মুহাজিরদের আগমনের আগে যারা এ নগরীকে নিবাস হিসেবে গ্রহণ করেছে ও ঈমান গ্রহণ করেছে, তারা তাদের কাছে যারা হিজরত করে এসেছে তাদের ভালবাসে এবং মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে তার জন্য তারা তাদের অন্তরে কোন (না পাওয়া জনিত) হিংসা অনুভব করে না, আর তারা তাদেরকে নিজেদের উপর অগ্ৰাধিকার দেয় নিজেরা অভাবগ্ৰস্ত হলেও। বস্তুতঃ যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে, তারাই সফলকাম।” [আল-হাশর: ৯]
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পর এই উম্মতের সর্বোত্তম ব্যক্তি হলো: আবূ বকর, তারপর ওমর, তারপর উসমান, তারপর আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদার ক্রম তেমনি যেমন তাদের খিলাফতের ক্রম।
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেমন দশজন সাহাবীর ব্যাপারে জান্নাতের সুসংবাদ প্রদান করেছেন আমরাও তাদের জান্নাতের ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “আবূ বকর জান্নাতী, উমার জান্নাতী, উসমান জান্নাতী, আলী জান্নাতী, তলহা জান্নাতী, যুবাইর জান্নাতী, ’আবদুর রহমান ইবনু আওফ জান্নাতী, সা’দ ইবনু আবী ওয়াক্কাস জান্নাতী, সাঈদ জান্নাতী এবং আবূ উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ জান্নাতী।” {তিরমিযী (৩৭৪৭), আহমাদ, আল-মুসনাদ (১৬৭৫) এবং ফাযায়েলুস সাহাবাহ (২৭৮), ইবনু আবি আসিম, আল-আহাদ ওয়াল-মাসানি (২৩২)}
আমরা ঈমান আনয়ন করি যে, বদরী সাহাবীগণের যে ফজিলত রয়েছে তা অন্য সাহাবীদের নেই। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীসে বলেছেন, “... তোমার হয়ত জানা নেই, আল্লাহ্ তা‘আলা বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারীদের ব্যাপারে অবহিত আছেন। তাই তাদের উদ্দেশ্য করে বলেছেন, তোমরা যা ইচ্ছা আমল কর। আমি তোমাদেরকে ক্ষমা করে দিয়েছি।” {বুখারী (৩০০৭), মুসলিম (২৪৯৪), আবূ দাউদ (২৬৫০), তিরমিযী (৩৩০৫)}
মুয়ায ইবনু রিফাআহ ইবন রাফি আয-যারকী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত—তার বাবা বদরী ছিলেন—তিনি বলেন, জিবরীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট আসলেন এবং বললেন, আপনারা বদর যুদ্ধে যোগদানকারী মুসলিমদেরকে কিরূপ গণ্য করেন? তিনি বললেন, তারা সর্বোত্তম মুসলিম অথবা (বর্ণনাকারীর সন্দেহ) এরূপ কোন শব্দ তিনি বলেছিলেন। জিবরীল বললেন, মালায়িকাদের মধ্যে বদর যুদ্ধে যোগদানকারীগণও তেমনি মর্যাদার অধিকারী।” সহীহ বুখারী (৩৯৯২)
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বায়আতে রিদওয়ানে অংশ গ্রহণকারী সাহাবীদের জন্য যা সাক্ষ্য দিয়েছেন আমরাও তা সাক্ষ্য প্রদান করি। তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যেসব ব্যক্তি (হুদাইবিয়ার প্রান্তরে) গাছের নীচে শপথ গ্রহণ করেছে তাদের কেউই জাহান্নামে যাবে না।” {আবূ দাউদ (৪৬৫৩), তিরমিযী (৩৮৬০), আবূল জাহম, আল-জুজ (১), আহমাদ (১৪৭৭৮), নাসাঈ, আল-কুবরা (১১৪৪৪)} তারা তাদের এই বায়আত দ্বারা সফলকাম হয়েছেন, এমন কি আল্লাহ তাদের ব্যাপারে বলেছেন, “নিশ্চয় যারা আপনার কাছে বায়আত করে তারা তো আল্লাহরই হাতে বায়আত করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর।” [আল-ফাতহ: ১০] আমরা জানি যে, আল্লাহ তা‘আলা তাদের ওপর নিজের সন্তুষ্টি অবধারিত করে দিয়েছেন। যেমন আল্লাহ তাঁর মুহকাম কিতাবে বলেছেন, “অবশ্যই আল্লাহ মুমিনগণের উপর সন্তুষ্ট হয়েছেন, যখন তারা গাছের নীচে আপনার কাছে বায়আত গ্ৰহণ করেছিল, অতঃপর তাদের অন্তরে যা ছিল তা তিনি জেনে নিয়েছেন; ফলে তিনি তাদের উপর প্রশান্তি নাযিল করলেন এবং তাদেরকে আসন্ন বিজয়ে পুরস্কৃত করলেন।” [আল-ফাতহ: ১৮]
আমরা বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ তা‘আলা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিবারকে অনেক ফজিলত ও অধিকার দ্বারা বিশেষিত করেছেন। যার ফলে তাদেরকে মহব্বত করা, তাদের সাথে বন্ধুত্ব করা, তাদের হক আদায় করা ওয়াজিব। তাদের কিছু হক হলো: আল্লাহ তাদের জন্য (গণিমতের) এক পঞ্চমাংশে ও সন্ধিতে লব্দ সম্পদে হক রেখেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের ওপর সালাত প্রেরণ করার সাথে সাথে তাদের ওপরও সালাত পাঠ করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “তোমরা বলো: للهم صل على محمد وعلى آل محمد، كما صليت على آل إبراهيم إنك حميد مجيد. وبارك على محمد وعلى آل محمد كما باركت على آل إبراهيم إنك حميد مجيد “হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদের উপর এবং মুহাম্মাদের বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করুন, যেরূপ আপনি ইবরাহীম এবং ইবরাহীমের বংশধরদের উপর রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী। হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের বংশধরদের উপর তেমনি বরকত দান করুন যেমনি আপনি বরকত দান করেছেন ইবরাহীম এবং ইবরাহীমের বংশধরদের উপর। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অতি মর্যাদার অধিকারী।”
তাদের একটি ফজিলত হলো: যা আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বাণীতে উল্লেখ করেছেন: “হে নবীর পত্নিগণ! তোমরা অন্য নারীদের মত নও; যদি তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর তাহলে পর-পুরুষের সাথে কমল কন্ঠে এমন ভাবে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে ব্যাধি আছে, সে প্রলুব্ধ হয়। আর তোমরা ন্যায়সংগত কথা বলবে।* আর তোমরা নিজ ঘরে অবস্থান করবে এবং প্রাচীন জাহেলী যুগের প্রদর্শনীর মত নিজেদেরকে প্রদর্শন করে বেড়াবে না। আর তোমরা সালাত কায়েম কর, যাকাত প্রদান কর এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের অনুগত থাক। আল্লাহ্ তো শুধু চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।” [আল-আহযাব: ৩২,৩৩] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়েও ঘনিষ্টতর এবং তাঁর স্ত্রীগণ তাদের মা।” [আল-আহযাব : ৬]
আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহুা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সকালে বের হলেন। তার পরনে ছিল কালো নকশী দ্বারা আবৃত একটি পশমী চাদর। হাসান ইবনু আলী এলেন, তিনি তাকে চাদরের ভেতর প্রবেশ করিয়ে নিলেন। হুসায়ন ইবনু আলী এলেন, তিনিও চাদরের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লেন। ফাতিমা এলেন, তাকেও ভেতরে ঢুকিয়ে ফেললেন। তারপর ’আলী এলেন তাকেও ভেতরে ঢুকিয়ে নিলেন। তারপরে বললেনঃ «إِنَّمَا يُرِيدُ اللهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ البَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا» "হে আহলে বাইত! আল্লাহ তা’আলা তোমাদের হতে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করে তোমাদের পবিত্র করতে চান"।” মুসলিম: (২৪২৪)
ওয়াসিলাহ ইবনু আসকা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “মহান আল্লাহ ইসমাঈল এর সন্তানদের থেকে কিনানাহ-কে চয়ন করে নিয়েছেন, আর কিনানাহ’র (বংশ) হতে কুরায়শ’কে বাছাই করে নিয়েছেন, আর কুরায়শ (বংশ) হতে বানু হাশিমকে বাছাই করে নিয়েছেন এবং বানু হাশিম হতে আমাকে বাছাই করে নিয়েছেন।” মুসলিম: (২২৭৬)
যায়দ ইবনু আরকাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন মক্কা ও মদীনার মাঝামাঝি খুম্ম’ নামক স্থানে দাঁড়িয়ে আমাদের সামনে বক্তব্য দিলেন। আল্লাহর প্রশংসা ও সানা বর্ণনা শেষে ওয়ায-নাসীহত করলেন। অতঃপর বললেন, হুঁশিয়ার, হে লোক সকল! আমি একজন মানুষ, অতি সত্ত্বরই আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফেরেশতা আসবে, আর আমিও তার আহানে সাড়া দিব। আমি তোমাদের নিকট ভারী দুটাে জিনিস রেখে যাচ্ছি। এর প্রথমটি হলো আল্লাহর কিতাব। এতে হিদায়াত এবং আলোকবর্তিকা আছে। অতএব তোমরা আল্লাহর কিতাবকে অনুসরণ করো, একে শক্ত করে আঁকড়ে রাখো। তারপর তিনি কুরআনের প্রতি উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিলেন।এরপর বলেন, আর দ্বিতীয়টি হলো আমার আহলে বাইত। আর আমি আহলে বায়তের বিষয়ে তোমাদের আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি। আহলে বাইতের ব্যাপারে তোমাদের আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি, আহলে বাইতের বিষয়ে তোমাদের আল্লাহর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছি।” সহীহ মুসলিম: (২৪০৮)
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামমের সাহাবীগণ তার সঙ্গে তাদের ঘনিষ্টতার কারণে তাদের হক ও শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা প্রদান করেছেন। এমন কি আবূ বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেন, “ওই সত্তার কসম, যার হাতে আমার নফস! নিশ্চয় আমার আত্মীয়দের চেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের আত্মীয়গণ আমার সেবা পাওয়ার বেশী হকদার।” {বুখারী (৩৫০৮), মুসলিম (১৭৫৯)}
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবীগণকে গালমন্দ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন, “তোমরা আমার সাহাবীগণকে গালমন্দ কর না। তোমাদের কেউ যদি উহুদ পর্বত পরিমাণ সোনা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় কর, তবুও তাদের এক মুদ বা অর্ধ মুদ-এর সমপরিমাণ সওয়াব হবে না।” {বুখারী (৩৬৭৩), মুসলিম (২৫৪১), আবূ দাউদ (৪৬৫৮), তিরমিযী (৩৮৬১)} নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছেন যে, আনসারগণকে মহব্বত করা ঈমানের আলামত, আর তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা নিফাকের আলামত। তিনি সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “ঈমানের আলামত হল আনসারকে ভালবাসা এবং মুনাফিকীর চিহ্ন হল আনসারের প্রতি শত্রুতা পোষণ করা।” {বুখারী: (১৭), মুসলিম: (৭৪), নাসাঈ: (৫০১৯)}
সাঈদ ইবন জায়েদ ইবন আমর ইবন নুফাইল রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তাদের কোনো একজনের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহচর্য লাভ, যে সাহচর্যে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন না তাও তোমাদের কোনো ব্যক্তির সারা জীবনের আমলের চেয়ে উত্তম, যদিও সে নূহ (আঃ)-এর মতো দীর্ঘ আয়ু পায়।” আবূ দাউদ (৪৬৫০)
অধ্যায়: রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের আনুগত্য করা ওয়াজিব।
আমরা জানি যে, মুসলিমদের শাসকদের কথা শোনা ও আনুগত্য করা ওয়াজিব। কারণ, আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “হে মুমিনগণ ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর এবং রাসূলের আনুগত্য কর, আর তোমাদের শাসকদেরও।” [আন-নিসা: ৫৯] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত শাসকের কথা শোনা ও তার আদেশ মানা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না।” {বুখারী (২৯৫৫), মুসলিম (১৮৩৯)}
সহীহ বুখারী ও মুসলিমে উবাদাহ ইবনু সামিত রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমরা রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে বাই’আত হলাম এ মর্মে যে, আমরা শুনবো ও মানবো, সংকটের সময় ও স্বাচ্ছন্দ্যের সময়, খুশীর অবস্থায় ও অপছন্দের অবস্থায় এবং আমাদের উপর অন্যদেরকে প্রাধান্য দিলেও। আর এ মর্মে যে, আমরা যোগ্য ব্যক্তির নেতৃত্ব বরণ করে নিতে কোনরূপ কোন্দল করবো না। আর এ মর্মে যে, আমরা যেখানেই থাকবো হক কথা বলব। আল্লাহর ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবো না।” {সহীহ বুখারী (৭০৫৫), মুসলিম (১৭০৯)}
আবূ যুরআহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “... আমরা প্রত্যেক যুগে ও কালে মুসলিমদের শাসকদের সাথে হজ ও ফরয জিহাদে অংশ গ্রহণ করবো, আমরা শাসকদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ও ফিতনার সময় যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করা বৈধ জানি না এবং আল্লাহ যাকে আমাদের অভিভাবক নির্বাচন করেন আমরা তার কথা শুনবো ও মানব এবং তার আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নেব না। আমরা সুন্নাত ও জামাতের অনুসরণ করবো।” ইমাম আল-লালেকায়ী, শারহু উসূলি ই‘তিকাদি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ (৫/১৭৫)
ভালো কাজে শাসকদের আনুগত্য করা ওয়াজিব আর খারাপ কাজে হারাম। কারণ, পূর্বে বর্ণিত ইবনু ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “পাপ কাজের আদেশ না করা পর্যন্ত ইমামের কথা শোনা ও তার আদেশ মানা অপরিহার্য। তবে পাপ কাজের আদেশ করা হলে তা শোনা ও আনুগত্য করা যাবে না।” তাছাড়া নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “খারাপ কাজে কোনো আনুগত্য নেই, আনুগত্য হলো ভালো কাজে।” {বুখারী (৭২৫৭), মুসলিম (১৮৪০)}
ইমাম আবূ ইবরাহীম আল-মুজানী বলেন, “আল্লাহর নিকট সন্তুষ্টজনক বিষয়ে শাসকদের আনুগত্য করা এবং আল্লাহর নিকট অসন্তুষ্টজনক বিষয়ে তাদের আনুগত্য পরিহার করা, তাদের সীমালঙ্ঘন ও জুলমের সময় বিদ্রোহ না করা এবং আল্লাহর নিকট তাওবা করা জরুরি; যেন তিনি শাসকদেরকে প্রজাদের ওপর দয়াশীল করে দেন।” আল-মুজানী, শারহুস সুন্নাহ (পৃ.৮৪)
পরিশিষ্ট:
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য যার অনুগ্রহে সকল নেক-কাজ পূর্ণ হয় এবং আমরা সালাত ও সালাম প্রেরণ করি জগতের জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরিত নবীর ওপর। আর আমরা এই বরকতময় মহান কিতাবটি সম্পূর্ণ করার তাওফিক দানের ওপর সম্মানিত মাওলার শোকর আদায় করছি। আর জান্নাতীদের বক্তব্যের ন্যায় আমরাও বলছি: “সকল প্রশংসা সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহর প্রাপ্য।” [ইউনুস: ১০] এবং যেমনভাবে আমাদের সম্মানিত রব আমাদেরকে আদেশ করেছেন: “বলুন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহরই এবং শান্তি তাঁর মনোনীত বান্দাদের প্রতি!’ শ্রেষ্ঠ কি আল্লাহ্, নাকি তারা যাদেরকে তারা শরীক স্থাপন করে?” [আন-নামাল: ৫৯]
আমরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি যে, তিনি এই কাজটিকে একমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির জন্য কবুল করুন এবং এটাকে রাসূলদের সরদার সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের হিদায়েতের মোতাবেক এবং তাঁর বান্দাদের জন্য উপকারী ও কিয়ামতের দিন আমাদের জন্য সুপারিশকারী করে দিন।
আমরা জানি যে, আমরা যত চেষ্টাই করি এই পবিত্র বিষয়কে সম্পূর্ণরূপে আয়ত্তে আনতে পারব না। কারণ, এটি হলো আল্লাহ, তাঁর মালায়েকা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ, পরকাল দিবস, তাকদীর ও ভাগ্য সম্পর্কে আলোচনা। তবে আমরা মহান ও সম্মানিত সত্তা আল্লাহর উক্তি দ্বারা কিতাবটি সমাপ্ত করছি: {وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّماوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَى عَمَّا يُشْرِكُون} “আর তারা আল্লাহকে যথোচিত সম্মান করেনি অথচ কিয়ামতের দিন সমস্ত যমীন থাকবে তাঁর হাতের মুঠিতে এবং আসমানসমূহ থাকবে ভাঁজ করা অবস্থায় তাঁর ডান হাতে। পবিত্র ও মহান তিনি, তারা যাদেরকে শরীক করে তিনি তাদের উর্ধ্বে।” [আয-যুমার: ৬৭]