Skip to content
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি শীর্ষক বইটিতে সম্মানিত শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ. সহজ সাবলীল ও সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে বিশুদ্ধ দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করেছেন, যাতে এ বইটি একজন মুসলিমের সালাতের পথনির্দেশকারী হয়। এতে তিনি দলীল-প্রমাণসহ অযু থেকে শুরু করে সালাম ফেরানো পর্যন্ত সালাতের রুকন, সুন্নাত ইত্যাদি আদায়ের পদ্ধতি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। মানুষের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সালাত আদায় যেন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণে হয়ে থাকে, তিনি সে দিকে আহ্বান করেছেন।

Language: lang_bn
Prepared by: মাননীয় শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায
Version: 2.1

নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি

মাননীয় শাইখ

আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায

পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি

সকল প্রশংসা এক আল্লাহর জন্য, দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর বান্দা ও রাসূল আমাদের নবী মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার-পরিজন এবং সাহাবীদের প্রতি। অতঃপর:

এটি একটি সংক্ষিপ্ত পুস্তিকা, এতে আমি প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি বর্ণনা করতে ইচ্ছে করছি; যাতে করে যারাই এটা পাঠ করবেন তারাই সালাত আদায়ের ক্ষেত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করতে পারেন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "তোমরা সেভাবে সালাত আদায় কর, যেভাবে আমাকে সালাত আদায় করতে দেখেছ।"([১]) পাঠকের উদ্দেশ্যে তা তুলে ধরা হলো: () এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন (৬০৫)।

১- সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে অযু করবে, তথা মহান আল্লাহ যেভাবে অযু করতে নির্দেশ প্রদান করেছেন সেভাবে অযু করবে। আল্লাহ তা'আলা বলেন: { হে মুমিনগণ! যখন তোমরা সালাতের উদ্দেশ্যে দণ্ডায়মান হবে তখন তোমাদের মুখমন্ডল এবং হাতগুলোকে কনুই পর্যন্ত ধৌত কর, আর মাথা মাসেহ কর এবং টাখনু-সহ পা ধৌত কর।} ([২]) [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৬] .

এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “পবিত্রতা ব্যতীত সালাত কবুল হয় না।”([৩]) () এটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন (২২৪)।

তাছাড়া, যে ব্যক্তি সালাত আদায়ে ভুল করেছিল, তার উদ্দেশ্যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “যখন তুমি সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে দাঁড়াবে, তখন উত্তমরূপে অযু করে নিবে।” () এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন (৫৭৮২)।

২- সালাত আদায়কারী (মুসল্লী) যেখানেই থাকুক না কেন, পুরো শরীরকে কিবলা তথা কা'বা মুখী করবে। ফরয কিংবা নফল যে সালাত আদায়ের ইচ্ছা পোষণ করুক না কেন, মনে মনে সে সালাতের নিয়ত করবে, মুখে নিয়ত উচ্চারণ করবে না। কেননা মুখে উচ্চারণ করা শরী‘আতসম্মত নয়; বরং বিদয়াত। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা সাহাবীগণ-রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম- মুখে নিয়ত উচ্চারণ করেননি। ইমাম অথবা একাকী সালাত আদায়কারী সামনে সুতরা (আড়াল) রাখবে। আর কিবলামুখী হওয়া সালাতের জন্য শর্ত। তবে কতিপয় মাসয়ালা এর ব্যতিক্রম, যেগুলোর বিশদ বর্ণনা আলেমগণের কিতাবে রয়েছে।

৩- সিজদার দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে "আল্লাহু আকবার" বলে তাকবীরে তাহরিমা দিবে।

৪- তাকবীর দেয়ার সময় উভয় হাত কাঁধ অথবা কানের লতি বরাবর উঠাবে।

৫- এরপর তার দু'হাত বুকের উপর রাখবে। ডান হাতকে বাম হাতের তালু, কব্জি ও বাহুর উপর রাখবে; কেননা এভাবেই নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সাব্যস্ত হয়েছে।

৬- প্রারম্ভিক দু'আ বা সানা পাঠ করা সুন্নত, আর তা হলো: “হে আল্লাহ্! আমার এবং আমার গুনাহের মধ্যে এমন ব্যবধান করে দিন যেমন ব্যবধান করেছেন পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে। হে আল্লাহ আমাকে আমার গুনাহ হতে এমনভাবে পবিত্র করুন যেমন সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার হয়। হে আল্লাহ আমার গুনাহকে পানি, বরফ ও শিশির দ্বারা ধৌত করে দিন।”([৫]) (৪) সহীহ বুখারী (৭৪৪); সহীহ মুসলিম (৫৯৮)।

যদি সে ইচ্ছা করে, এর পরিবর্তে নিচের দু‘আও পড়তে পারে: “হে আল্লাহ! প্রশংসা ও পবিত্রতা আপনারই, আপনার নাম বরকতময়, আপনি সম্মানিত, আপনি ছাড়া সত্য কোন ইলাহ নেই।”([৬]) পূর্বের দু'আ দু'টি ছাড়াও যদি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অন্যান্য যে সকল দু'আ সানা বলে প্রমাণিত, তা পাঠ করতে কোনো বাধা নেই। কিন্তু উত্তম হলো কখনও এটি আবার কখনও অন্যটি পড়া। কেননা, এর মাধ্যমে সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণ করা হবে। অতঃপর বলবে: আউযু বিল্লাহি মিনাশ শায়তানির রাজীম, বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম। তারপর সূরা ফাতিহা পাঠ করবে। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি সূরা ফতিহা পাঠ করল না, তার কোন সালাত নেই।”([৭]) সূরা ফাতিহা পাঠ শেষে জাহরী সালাতে (মাগরিব, এশা ও ফজর) উচ্চস্বরে আমীন বলবে, আর সিররি সালাতে (জোহর ও আসর) মনে মনে আমীন বলবে। এরপর পবিত্র কুরআন থেকে যে পরিমাণ সহজসাধ্য হয় তা পাঠ করবে। উত্তম হলো এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদীস অনুযায়ী আমলস্বরুপ সূরা ফাতিহার পরে জোহর, আসর এবং এশার সালাতে কুরআন মাজীদের আওসাতে মুফাস্সাল (মধ্যম ধরনের সূরা) এবং ফজরের সালাতে তিওয়াল (লম্বা সূরা) আর মাগরিবের সালাতে কখনও তিওয়াল (লম্বা সূরা) আবার কখনও কিসার (ছোট সূরা) পাঠ করবে। () এটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন (৩৯৯)। () এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন (৭৫৬)।

৭- উভয় হাত দু'কাঁধ অথবা কান বরাবর উঠিয়ে আল্লাহু আকবার বলে রুকুতে যাবে। মাথাকে পিঠ বরাবর রাখবে এবং উভয় হাতের আঙ্গুলগুলোকে খোলাবস্থায় উভয় হাটুর উপরে রাখবে। রুকুতে স্থিরতা অবলম্বন করবে। এরপর বলবে: سبحان ربي العظيم. "আমি আমার মহান রবের মহিমা প্রকাশ করছি।" উত্তম হলো দু'আটি তিন বা ততোধিক বার পড়া। এ ছাড়াও এর সাথে নিম্নের দু'আটি পাঠ করা মুস্তাহাব: "হে আল্লাহ! তুমি ত্রুটিমুক্ত; প্রশংসা সবই তোমার। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দাও।"([৮]) () সহীহ বুখারী (৮১৭), সহীহ মুসলিম (৪৮৪)।

৮- রুকু থেকে মাথা উঠাবে, উভয় হাত কাঁধ অথবা কান বরাবর উঠিয়ে এই বলে: "সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ।" অর্থ: আল্লাহ তার কথা শুনেছেন, যে তাঁর প্রশংসা করেছে। ইমাম হিসেবে বা একাকী সালাত আদায়কারী উভয়ই দু'আটি পাঠ করবে। রুকু থেকে দাঁড়িয়ে বলবে: "হে আমাদের রব! সমস্ত প্রশংসা তোমার জন্যই। তোমার প্রশংসা অসংখ্য, উত্তম ও বরকতময়, যা আকাশ ভর্তি করে দেয়, যা পৃথিবী পূর্ণ করে দেয়, উভয়ের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ করে এবং এগুলো ছাড়া তুমি অন্য যা কিছু চাও তাও পূর্ণ করে দেয়।”([৯]) () সহীহ বুখারী (৭১১), সহীহ মুসলিম (৫৯৮)।

আর যদি মুক্তাদি হয়, তবে তিনি মাথা উঠানোর সময় বলবেন: রাব্বানা ওয়ালাকাল হামদু... থেকে বাকী অংশ। যদি পূর্বের দু'আটির পরে (ইমাম হিসেবে সালাত আদায়কারী, একাকী সালাত আদায়কারী কিংবা মুক্তাদি হিসেবে সালাত আদায়কারী) সবাই যদি নিম্নের দু'আটিও পাঠ করে: "হে আল্লাহ! তুমিই প্রশংসা ও মর্যাদার হক্কদার, বান্দা যা বলে তার চেয়েও তুমি অধিকতর হকদার এবং আমরা সকলে তোমারই বান্দা। হে আল্লাহ! তুমি যা দান করেছো, তার প্রতিরোধকারী কেউ নেই। আর তুমি যা নিষিদ্ধ করেছো তা প্রদানকারীও কেউ নেই এবং কোনো সম্মানী ব্যক্তি তার উচ্চ মর্যাদা দ্বারা তোমার দরবারে উপকৃত হতে পারবে না।"([১০]) তবে এটাও ভালো; কেননা এটিও রাসূূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সাব্যস্ত আছে। () এটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন (৪৭৭)।

রুকু থেকে মাথা উঠানোর পর ইমাম ও মুক্তাদী সকলের জন্য দাঁড়ানো অবস্থায় যেভাবে উভয় হাত বুকের উপর ছিল সেভাবে বুকের উপর উভয় হাত রাখা মুস্তাহাব। কারণ; নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে ওয়ায়েল ইবন হুজর এবং সাহল ইবন সা'দ রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বর্ণিত হাদীস থেকে এর প্রমাণ রয়েছে।

৯- আল্লাহু আকবার বলে, যদি কষ্ট না হয় তাহলে উভয় হাতের আগে দুই হাটু মাটিতে রেখে সিজদায় যাবে। আর যদি কষ্ট হয় তাহলে উভয় হাত হাটুর পূর্বে মাটিতে রাখবে। আর তখন হাত ও পায়ের আঙ্গুলগুলো কিবলামুখী থাকবে এবং হাতের আঙ্গুলগুলো মিলিত ও প্রসারিত হয়ে থাকবে। আর সিজদা হবে সাতটি অঙ্গের উপর। অঙ্গগুলো হলো: নাকসহ কপাল, দুই হাত, উভয় হাঁটু এবং উভয় পায়ের আঙ্গুলের ভিতরের অংশ। সিজদায় গিয়ে বলবে: "سبحان ربي الأعلى" "আমার সমুন্নত রবের মহিমা প্রকাশ করছি।" সুন্নাহ হচ্ছে তিন বা ততোধিকবার তা পুনরাবৃত্তি করা। আর এর সাথে নিম্নের দু'আটি পড়া মুস্তাহাব: "হে আমাদের রব আল্লাহ! তুমি ত্রুটিমুক্ত; প্রশংসা সবই তোমার। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করে দাও।" সিজদায় বেশি বেশি দু'আ করবে; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "তোমরা রুকু অবস্থায় মহান রবের শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্ব বর্ণনা কর এবং সিজদারত অবস্থায় অধিক দু’আ করতে চেষ্টা কর, কেননা তা তোমাদের দু’আ কবুল হওয়ার অধিক উপযোগী অবস্থা।"([১১]) () এটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন (৪৭৯)।

সিজদায় তার রবের কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ প্রার্থনা করবে। ফরয কিংবা নফল উভয় সালাতেই সিজদায় দু'আ করবে। আর সিজদার সময় উভয় বাহুকে পার্শ্বদেশ থেকে, পেটকে উরু থেকে এবং উভয় উরু পদনালী থেকে আলাদা রাখবে এবং উভয় বাহু মাটি থেকে উপরে রাখবে। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "তোমরা সিজদায় বরাবর সোজা থাকবে। তোমাদের কেউ যেন তার উভয় হাতকে কুকুরের ন্যায় বিছিয়ে প্রসারিত না রাখে।"([১২]) () সহীহ বুখারী (৭৮৮), সহীহ মুসলিম (৪৯৩)।

১০- আল্লাহু আকবার বলে (সিজদা থেকে) মাথা উঠাবে। বাম পা বিছিয়ে দিয়ে তার উপর বসবে এবং ডান পা খাড়া করে রাখবে। দু'হাত তার উভয় রান ও হাঁটুর উপর রাখবে এবং নিম্নের দু'আটি বলবে: "রাব্বিগফিরলী, ওয়ারহামনী ওয়াহদিনী ওয়ারযুকনী ওয়া আ'ফিনী ওয়াজবুরনী।" অর্থ: "হে রব্ব, আমাকে ক্ষমা কর, আমাকে রহম কর, আমাকে হিদায়েত দান কর, আমাকে রিযিক দান কর, আমাকে সুস্থ্যতা দান কর এবং আমার ক্ষয়ক্ষতি পূরণ কর।"([১৩]) এই বৈঠকে স্থিরতা অবলম্বন করবে। এটি তিরমিযী (২৮৪), আবূ দাউদ (৮৫০), ইবন মাজাহ (৮৯৮) বর্ণনা করেছেন।

১১- আল্লাহু আকবার বলে দ্বিতীয় সিজদা করবে এবং এখানে তাই করবে, প্রথম সেজদায় যা করেছিল।

১২- সিজদা থেকে আল্লাহু আকবার বলে মাথা উঠাবে। ক্ষণিকের জন্য বসবে, যেভাবে উভয় সিজদার মধ্যবর্তী সময়ে বসেছিল। এ ধরনের পদ্ধতিতে বসাকে "জালসায়ে ইসতেরাহা" বা আরামের বৈঠক বলা হয়। এটা মুস্তাহাব এবং তা ছেড়ে দিলেও কোনো দোষ নেই। এখানে পড়ার জন্য কোনো যিকির বা দু'আ নেই। অতঃপর দ্বিতীয় রাকাতের জন্য যদি কষ্ট না হয় তাহলে হাঁটুতে ভর করে উঠে দাঁড়াবে, আর কষ্ট হলে মাটিতে ভর করে দাঁড়াবে। এরপর সূরা ফাতিহা পড়বে। সূরা ফাতিহার পর কুরআন হতে যতটুকু তার পক্ষে সহজ ততটুকু পড়বে। অতঃপর প্রথম রাকাতে যেভাবে করেছে ঠিক সেভাবেই দ্বিতীয় রাকাতেও করবে।

১৩- সালাত যদি দুই রাকাত বিশিষ্ট হয় যেমন: ফজর, জুমু'আ ও দুই ঈদের সালাত, তাহলে দ্বিতীয় সিজদা থেকে মাথা উঠিয়ে ডান পা খাড়া করে বাম পা বিছিয়ে বসবে। ডান হাত ডান উরুর উপর রেখে শাহাদাত আঙ্গুলি ছাড়া সমস্ত আঙুল মুষ্টিবদ্ধ করে তা দ্বারা তাওহীদের ইশারা করবে। যদি ডান হাতের কনিষ্ঠা ও অনামিকা বন্ধ রেখে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি মধ্যমাঙ্গুলির সাথে মিলিয়ে গোলাকার করে শাহাদাত বা তর্জনী দ্বারা ইশারা করে তবে তাও ভালো। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে দু’ধরনের বর্ণনা প্রমাণিত। উত্তম হলো যে, কখনও এভাবে এবং কখনও ওভাবে করা। আর বাম হাত বাম উরু ও হাঁটুর উপর রাখবে। অতঃপর এই বৈঠকে তাশাহহুদ (আত্তাহিয়্যাতু..) পড়বে। তাশাহহুদ বা আত্তাহিয়্যাতু হলো: “সব ধরনের বড়ত্ব সম্মান, প্রশংসা ও পবিত্রতা আল্লাহর জন্য। হে নবী! আপনার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে শান্তি-নিরাপত্তা, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক। সালাম শান্তি-নিরাপত্তা আমাদের এবং আল্লাহর নেক বান্দাদের উপর বর্ষিত হোক। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো মা‘বূদ নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল।” অতঃপর বলবে: “হে আল্লাহ! আপনি মুহাম্মাদের ওপর এবং মুহাম্মাদের বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করুন, যেরূপ আপনি ইবরাহীম এবং ইবরাহীমের বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করেছেন। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী। হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ ও মুহাম্মাদের বংশধরদের ওপর তেমনি বরকত দান করুন যেমনি আপনি বরকত দান করেছেন ইবরাহীম এবং ইবরাহীমের বংশধরদের ওপর। নিশ্চয়ই আপনি অতি প্রশংসিত, অতি মর্যাদার অধিকারী।”([১৪]) () সহীহ বুখারী (৭৯৭), সহীহ মুসলিম (৪০২)।

- আর চারটি বস্তু থেকে আশ্রয় চাইবে ও বলবে, “হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি জাহান্নাম ও কবরের আযাব থেকে, জীবন ও মৃত্যুর ফিতনা থেকে এবং কানা দাজ্জালের ফিতনার অনিষ্ট থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি।”([১৫]) () সহীহ বুখারী (১৩১১), সহীহ মুসলিম (৫৮৮)।

এরপর দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করে নিজের পছন্দমত যে কোনো দু'আ করবে। যদি তার পিতা-মাতা ও অন্যান্য মুসলিমদের জন্য দু'আ করে তাতে কোনো দোষ নেই, - হোক তা ফরজ সালাতে কিংবা নফল সালাতে -; কেননা ইবন মাসউদ রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথায় ব্যাপকতা রয়েছে। যখন তিনি তাকে তাশাহহুদ শিক্ষা দিচ্ছিলেন তখন বলেছিলেন: "অতঃপর তার কাছে যে দু'আ পছন্দনীয়, তাই নির্বাচন করে দু'আ করবে।" ([১৬]) অন্য শব্দে এসেছে যে, তিনি বলেছেন: "অত:পর ইচ্ছানুযায়ী যা যাওয়ার তা আল্লাহর কাছে চাইবে।" ([১৭]) () এটি নাসাঈ বর্ণনা করেছেন (১২৯৮) । () এটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন (৪০২)।

এটা বান্দার দুনিয়া ও আখিরাতের যাবতীয় উপকারী বিষয়ের দু'আকে শামিল করে। - তারপর আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, বলে ডানে ও বামে সালাম ফিরাবে।

১৪- সালাত যদি তিন রাকাত বিশিষ্ট হয়, যেমন মাগরিবের সালাত, অথবা চার রাকাত বিশিষ্ট হয় যেমন যোহর, আসর ও এশার সালাত, তাহলে পূর্বোল্লিখিত "তাশাহহুদ” পাঠ করবে এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দুরূদও পাঠ করবে। অতঃপর আল্লাহু আকবার বলে হাটুতে ভর করে (সোজা হয়ে) দাঁড়িয়ে উভয় হাত কাঁধ অথবা কান বরাবর উঠিয়ে পূর্বের ন্যায় বুকের উপর রাখবে এবং শুধু সূরা ফাতিহা পড়বে। যদি কেউ যোহরের তৃতীয় ও চতুর্থ রাকআতে মাঝে মধ্যে সূরা ফাতিহাসহ অতিরিক্ত অন্য কোনো সূরা পড়ে তাতে কোনো অসুবিধা নেই। কেননা আবু সা'ঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু কর্তৃক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীসে এমনটি প্রমাণিত। অতঃপর মাগরিবের সালাতের তৃতীয় রাকাত এবং যোহর, আসর ও এশার সালাতের চতুর্থ রাকআতের পর তাশাহহুদ পড়বে, যেমনটি দু'রাকা'আত বিশিষ্ট সালাতের ক্ষেত্রে ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।‌ অতঃপর ডানদিকে ও বামদিকে সালাম ফিরাবে। (সালামের পর) তিনবার "আস্তাগফিরুল্লাহ্" (আমি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি) পড়বে। অতঃপর বলবে: “হে আল্লাহ আপনি শান্তি, আপনার থেকেই শান্তি, আপনি রবকতময়, হে মহিমান্বিত ও সম্মানের অধিকারী।”([১৮]) ইমাম হলে মুসল্লিদের দিকে মুখ ফিরানোর পূর্বেই এই দোয়া পড়বে। অতঃপর পাঠ করবে: "আল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোনো মা'বুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো অংশীদার নেই, সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই এবং তিনি সব কিছুর উপরেই ক্ষমতাশালী। আল্লাহ ছাড়া কোন শক্তি ও সামর্থ্যও নেই। হে আল্লাহ! তুমি যা দান করেছো, তার প্রতিরোধকারী কেউ নেই। আর তুমি যা নিষিদ্ধ করেছো তা প্রদানকারীও কেউ নেই এবং কোনো সম্মানী ব্যক্তি তার উচ্চ মর্যাদা দ্বারা তোমার দরবারে উপকৃত হতে পারবে না। আল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোনো মা'বুদ নেই। আমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করি, নিয়ামতসমূহ তাঁরই, অনুগ্রহও তাঁর এবং উত্তম প্রশংসা তাঁরই। আল্লাহ ছাড়া কোনো (সত্য) মা'বুদ নেই। আমরা তাঁর দেওয়া জীবন বিধান একমাত্র তাঁর জন্য একনিষ্ঠভাবে পালন করি, যদিও কাফিরদের নিকট তা অপছন্দনীয়।([১৯]) () এটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন (৫৯১)। () এটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন (৪০২)।

এবং "সুবহানাল্লাহ” ৩৩ বার, "আলহামদুলিল্লাহ্” ৩৩ বার, "আল্লাহু আকবার” ৩৩ বার পড়বে। আর একশত পূর্ণ করতে নিম্নের দো'আটি পড়বে: لا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ ؛ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلَّ شَيْءٍ قَدِيرًا "আল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোনো মা'বুদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। সকল বাদশাহী ও সকল প্রশংসা তাঁরই জন্য। তিনিই সবকিছুর ওপর ক্ষমতাশালী।" সেই সাথে প্রত্যেক সালাতের পর আয়াতুল কুরসী, সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পড়বে। মাগরিব ও ফজর সালাতের পরে এই সূরা তিনটি (ইখলাস, ফালাক এবং নাস) তিনবার করে পুনরাবৃত্তি করা মুস্তাহাব; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ সম্পর্কে সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। এই সমস্ত যিকির বা দু'আ পাঠ করা সুন্নাহ, ফরজ নয়।

প্রত্যেক মুসলিম নারী ও পুরুষের জন্য যোহর সালাতের পূর্বে ৪ রাকাত এবং পরে ২ রাকাত, মাগরিবের সালাতের পর ২ রাকাত, এশার সালাতের পর ২ রাকাত এবং ফজরের সালাতের পূর্বে ২ রাকাত- মোট ১২ রাকাত সালাত পড়া শরী‘আতসম্মত। এই ১২ (বার) রাকাত সালাতকে সুন্নতে রাতেবা বলা হয়; কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উক্ত রাকাতগুলো মুকীম অবস্থায় নিয়মিত যত্ন সহকারে আদায় করতেন। আর এগুলোর মধ্যে সফর অবস্থায় ফজরের সুন্নত ও (এশা পরবর্তী) বিতর ব্যতীত অন্যান্যগুলো ছেড়ে দিতেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফর এবং মুকীম উভয় অবস্থায় উক্ত ফজরের সুন্নাত ও বিতর নিয়মিত আদায় করতেন। উত্তম হলো এই সকল সুন্নতে রাতেবা এবং বিতরের সালাত ঘরে পড়া। যদি কেউ তা মসজিদে পড়ে তাতে কোনো দোষ নেই। এ সম্পর্কে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: "ফরজ সালাত ব্যতীত মানুষের অন্যান্য সালাত নিজ ঘরে পড়া উত্তম।"([২০]) () এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন (৬৮৬০)।

এই রাকাতগুলো (১২ রাকাত সালাত) নিয়মিত যত্ন সহকারে আদায় করা জান্নাতে প্রবেশের একটি মাধ্যম। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "যে ব্যক্তি দিনে ও রাতে ১২ রাকাত সালাত (সুনানে রাওয়াতিব) আদায় করবে, আল্লাহ্‌ তা‘আলা তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর বানাবেন।"([২১]) () এটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন (৭২৮)।

যদি কেউ আসরের সালাতের পূর্বে ৪ রাকাত এবং মাগরিবের সালাতের পূর্বে ২ রাকাত এবং এশার সালাতের পূর্বে ২ রাকাত পড়ে, তাহলে তা উত্তম; কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এর স্বপক্ষে বিশুদ্ধ দলীল আছে। তাছাড়া যদি যোহরের ফরজের পরে ৪ রাকাত এবং যোহরের ফরজের পূর্বে ৪ রাকাত সালাত আদায় করে, তবে তাও তার জন্যে উত্তম। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি যোহরের পূর্বে চার রাকাত এবং পরে চার রাকাত সালাতের হিফাযত করবে (নিয়মিত আদায় করবে), আল্লাহ তার জন্য জাহান্নাম হারাম করে দিবেন।([২২]) অর্থাৎ যোহরের পরের ২ রাকাত সুন্নাতে রাতিবার অতিরিক্ত ২ রাকাত সালাত আদায় করবে। কেননা যোহরের পূর্বে ৪ রাকাত ও পরে ২ রাকাত সুন্নাতে রাতিবাহ। সুতরাং যে ব্যক্তি উক্ত ২ রাকাত সুন্নাতে রাতিবার সাথে আরো ২ রাকাত পড়বে, যা উপরোক্ত উম্মে হাবিবা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহার হাদীসে এসেছে, সে উক্ত মর্যাদা লাভ করবে। () হাদীসটি আহমাদ (২৫৫৪৭), তিরমিযী (৩৯৩) ও আবূ দাউদ (১০৭৭) বর্ণনা করেছেন।

আল্লাহই তাওফীকদাতা। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক, আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবীগণের প্রতি এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা তার অনুসারী তাদের প্রতিও।