الإسلام - نبذة موجزة عن الإسلام (مشتملة على الأدلة)
আল-ইসলাম আল-কুরআনুল কারীম ও নবীর সুন্নাতের আলোকে ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচয় সন্নিবেশিত এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বই, যাতে ইসলামের মূল উৎস অর্থাৎ আল-কুরআনুল কারীম ও নবীর সুন্নাহ থেকে তার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি, শিক্ষা ও সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বইটি স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সকল পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে মুসলিম—অমুসলিম সকলের প্রতি দৃষ্টিপাত করে তাদের স্ব-স্ব ভাষায় রচনা করা হয়। (বইটিতে আল-কুরআনুল কারীম ও নবীর সুন্নাতের দলিল ভিত্তিক যা রয়েছে) ১- ইসলাম হচ্ছে সকল মানুষের প্রতি আল্লাহর বার্তা। কাজেই এটিই হলো আল্লাহ প্রদত্ত চিরন্তন ও পূর্ববর্তী সকল রিসালাতের…
This PDF is generated automatically from the book's text; its layout may differ from the printed edition.
আল-ইসলাম
আল-কুরআনুল কারীম ও নবীর সুন্নাতের আলোকে ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচয় সন্নিবেশিত এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বই, যাতে ইসলামের মূল উৎস অর্থাৎ আল-কুরআনুল কারীম ও নবীর সুন্নাহ থেকে তার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি, শিক্ষা ও সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বইটি স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সকল পরিস্থিতি ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করে মুসলিম—অমুসলিম সকলের প্রতি দৃষ্টিপাত করে তাদের স্ব-স্ব ভাষায় রচনা করা হয়।
(বইটিতে আল-কুরআনুল কারীম ও নবীর সুন্নাতের দলিল ভিত্তিক যা রয়েছে)
১- ইসলাম হচ্ছে সকল মানুষের প্রতি আল্লাহর বার্তা। কাজেই এটিই হলো আল্লাহ প্রদত্ত চিরন্তন ও পূর্ববর্তী সকল রিসালাতের পরিসমাপ্তকারী রিসালাত:
ইসলাম হচ্ছে সকল মানুষের প্রতি আল্লাহর রিসালাহ। তিনি বলেন: { وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا كَآفَّةٗ لِّلنَّاسِ بَشِيرٗا وَنَذِيرٗا وَلَٰكِنَّ أَكۡثَرَ ٱلنَّاسِ لَا يَعۡلَمُونَ} “আর আমি তো তোমাকে সমগ্ৰ মানুষের জন্যই সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [সাবা : ২৮] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { قُلْ يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا} “বল, হে মানব সম্প্রদায়, আমি তোমাদের সকলের নিকট আল্লাহর রাসূল।” [আল-আরাফ : ১৫৮] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُمُ الرَّسُولُ بِالْحَقِّ مِن رَّبِّكُمْ فَآمِنُوا خَيْرًا لَّكُمْ ۚ وَإِن تَكْفُرُوا فَإِنَّ لِلَّهِ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا} “হে লোকসকল! অবশ্যই রাসূল তোমাদের রবের কাছ থেকে সত্য নিয়ে এসেছেন; সুতরাং তোমরা ঈমান আন, এটা তোমাদের জন্য কল্যাণকর হবে। আর যদি তোমরা কুফরী কর তবে আসমানসমূহ ও জমিনে যা আছে সব আল্লাহরই এবং আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [আন-নিসা : ১৭০]
ইসলাম হচ্ছে চিরস্থায়ী ইলাহী বার্তা এবং এটিই আল্লাহ প্রদত্ত সকল রিসালাত সমাপ্তকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: ّ{مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا} “মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী। আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ।” [আল-আহযাব : ৪০]
২- ইসলাম কোনো সম্প্রদায় অথবা জাতির জন্য নির্দিষ্ট দীন নয়; বরং এটি সকল মানুষের জন্যে আল্লাহর দীন:
ইসলাম কোনো সম্প্রদায় অথবা জাতির জন্য নির্দিষ্ট দীন নয়; বরং এটি সকল মানুষের জন্যে আল্লাহর দীন। আল-কুরআনুল আযীমে সর্ব প্রথম নির্দেশ হচ্ছে, আল্লাহ তা‘আলার বাণী: {يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবের ‘ইবাদাত করো, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়ার অধিকারী হও।” [আল-বাকারা ২১] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا وَبَثَّ مِنْهُمَا رِجَالًا كَثِيرًا وَنِسَاءً } “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবের তাকওয়া অবলম্বন কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন ও তার থেকে তার স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের দুজন থেকে বহু নর-নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন।” [আন-নিসা : ১] ইবনে ‘উমার রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের দিন মানুষদের সম্বোধন করে বলেন: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَذْهَبَ عَنْكُمْ عُبِّيَّةَ الجَاهِلِيَّةِ وَتَعَاظُمَهَا بِآبَائِهَا فَالنَّاسُ رَجُلَانِ: بَرٌّ تَقِيٌّ كَرِيمٌ عَلَى اللَّهِ وَفَاجِرٌ شَقِيٌّ هَيِّنٌ عَلَى اللَّهِ وَالنَّاسُ بَنُو آدَمَ وَخَلَقَ اللَّهُ آدَمَ مِنْ تُرَابٍ قال الله:{يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ} [الحجرات:13] » “হে মানুষেরা! আল্লাহ তা'আলা তোমাদের হতে জাহিলি যুগের দম্ভ ও অহংকার এবং পূর্বপুরুষদের নিয়ে বড়াই করাকে দূর করে দিয়েছেন। সাধারণত মানুষ দুই ভাগে বিভক্ত। এক দল মানুষ নেককার, পরহেজগার, আল্লাহ তা'আলার নিকট সম্মানিত এবং অন্য দল পাপিষ্ঠ, দুর্ভাগা ও আল্লাহ তা'আলার নিকট লাঞ্ছিত। সকল মানুষই আদমের সন্তান। আর আল্লাহ তা'আলা আদমকে মাটি থেকে তৈরী করেছেন। আল্লাহ বলেনঃ “হে লোক সকল! তোমাদেরকে আমি একজন পুরুষ ও একজন নারী হতে সৃষ্টি করেছি, তারপর বিভিন্ন বংশ ও গোত্রে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি, তোমরা যাতে একে অন্যকে চিনতে পার। যে লোক তোমাদের মাঝে বেশি পরহেজগার অবশ্য সেই আল্লাহ তা'আলার নিকট বেশী মর্যাদার অধিকারী। আল্লাহ তা'আলা সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞাত, সব খবর রাখেন।" [আল-হুজুরাত : ১৩] তিরিমিযী (৩২৭০) আপনি আল-কুরআনুল আযীম ও রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশাবলীতে এমন কোনো বিধান পাবেন না, যা কোনো জাতি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে খাস, বা তাদের বংশ, তাদের জাতীয়তা বা তাদের কোন জাত বিবেচনা করে।
৩- ইসলাম হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত সেই ম্যাসেজ, যা সকল জাতির নিকট প্রেরিত পূর্বের নবী ও রাসূল ‘আলাইহিমুস সালাত ও সালামদের ম্যাসেজের পূর্ণতা দানকারী হিসেবে এসেছে।
ইসলাম হচ্ছে আল্লাহ প্রদত্ত এমন ম্যাসেজ, যা সকল জাতির নিকট প্রেরিত পূর্বের নবী ও রাসূল ‘আলাইহিমুস সালাত ও সালামদের ম্যাসেজের পূর্ণতা দানকারী হিসেবে এসেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { إِنَّا أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ كَمَا أَوْحَيْنَا إِلَىٰ نُوحٍ وَالنَّبِيِّينَ مِن بَعْدِهِ ۚ وَأَوْحَيْنَا إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَعِيسَىٰ وَأَيُّوبَ وَيُونُسَ وَهَارُونَ وَسُلَيْمَانَ ۚ وَآتَيْنَا دَاوُودَ زَبُورًا} “নিশ্চয়ই আমি তোমার নিকট ওহী পাঠিয়েছি, যেমন ওহী পাঠিয়েছি নূহ ও তার পরবর্তী নবীগণের নিকট এবং আমি ওহী পাঠিয়েছি ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়া‘কূব, তার বংশধরগণ, ঈসা, আইয়ূব, ইউনুস, হারূন ও সুলায়মানের নিকট এবং দাঊদকে প্রদান করেছি যাবূর।” [আন-নিসা ১৬৩] এই দীন যা আল্লাহ ওহী করেছেন রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি; তা মূলত সেই দীন যা তিনি পূর্ববর্তী নবীদের জন্যে প্রবর্তন করেছেন এবং তাদেরকে তার ওসিয়ত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {شَرَعَ لَكُم مِّنَ الدِّينِ مَا وَصَّىٰ بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَىٰ وَعِيسَىٰ ۖ أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ ۚ كَبُرَ عَلَى الْمُشْرِكِينَ مَا تَدْعُوهُمْ إِلَيْهِ ۚ اللَّهُ يَجْتَبِي إِلَيْهِ مَن يَشَاءُ وَيَهْدِي إِلَيْهِ مَن يُنِيبُ} “তিনি তোমাদের জন্য বিধি-ব্যবস্থা করেছেন সেই দীনের, যার নির্দেশ দিয়েছিলেন নূহকে, আর যা আমি ওহী করেছি তোমাকে এবং যার নির্দেশ দিয়েছিলাম ইবরাহীম, মূসা ও ‘ঈসাকে, এ বলে যে, তোমরা দীনকে(তাওহীদ) প্রতিষ্ঠিত কর এবং তাতে বিভেদ সৃষ্টি কর না। আপনি মুশরিকদেরকে যার প্রতি ডাকছেন তা তাদের কাছে কঠিন মনে হয়। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে তার দীনের জন্য চয়ন করেন এবং যে তাঁর অভিমুখী হয় তাকে তিনি দীনের দিকে হেদায়াত করেন।” [আশ-শুরা : ১৩] আল্লাহ তা‘আলা রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর ওই সব ওহীই নাযিল করেছেন যা মূলত তার পূর্বের আল্লাহ প্রদত্ত কিতাবসমূহের যেমন তাওরাত ও ইঞ্জিলের বিকৃত হওয়ার আগের সত্যায়ন পত্র। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ مِنَ الْكِتَابِ هُوَ الْحَقُّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ بِعِبَادِهِ لَخَبِيرٌ بَصِيرٌ } “আর আমি যে কিতাব আপনার প্রতি ওহী করেছি তা সত্য, এর আগে যা রয়েছে তার সত্যায়নকারী। নিশ্চয় আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের সম্পর্কে সম্যক অবহিত, সর্বদ্রষ্টা।” [ফাতির : ৩১]
৪- নবীগণ আলাইহিমুস সালামের দীন এক, তবে তাদের শরীয়ত ভিন্ন ভিন্ন:
নবীগণ ‘আলাইহিস সালামের দীন এক, তবে তাদের শরিয়ত ভিন্ন ভিন্ন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ ۖ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ ۚ لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا ۚ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَٰكِن لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ ۖ فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ ۚ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ } “আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি হক্বের সথে,যা তার পূর্বের কিতাবের সত্যায়নকারী ও সেগুলোর সংরক্ষক রূপে। সুতরাং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তুমি তার মাধ্যমে ফয়সালা কর এবং তোমার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ত্যাগ করে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমরা নির্ধারণ করেছি শরী‘আত ও স্পষ্ট পন্থা এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, তবে তোমাদেরকে এক উম্মত বানাতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং তোমরা ভাল কাজে প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহরই দিকে তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তনস্থল। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন, যা নিয়ে তোমরা মতবিরোধ করতে।” [আল-মায়িদাহ : ৪৮] আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «أَنَا أَوْلَى النَّاسِ بِعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ وَالْأَنْبِيَاءُ إِخْوَةٌ لِعَلَّاتٍ أُمَّهَاتُهُمْ شَتَّى وَدِينُهُمْ وَاحِدٌ» “আমিই মানুষের মাঝে দুনিয়া ও আখিরাতে ঈসা ইবনে মারয়ামের সবচেয়ে নিকটবর্তী। আর নবীগণ হলেন বৈমাত্রেয় ভাই স্বরূপ। তাদের মায়েরা বিভিন্ন, তবে তাদের দীন এক।” বর্ণনায় বুখারী (৩৪৪৩)।
৫- ইসলামও সেদিকেই আহ্বান করে যেমন আহ্বান করেছেন সকল নবী: নুহ, ইবরাহীম, মুসা, সুলাইমান, দাউদ ও ঈসা আলাইহিমুস সালাম। তাঁরা ঈমানের দিকে আহ্বান করেছেন যে,একমাত্র রব হচ্ছেন আল্লাহ,তিনিই একমাত্র সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা ও রাজত্বের মালিক। তিনিই সকল বিষয় পরিচালনা করেন। তিনি দয়াশীল ও মেহেরবান।
ইসলামও সেদিকেই আহ্বান করে যেমন আহ্বান করেছেন সকল নবী: নুহ, ইবরাহীম, মুসা, সুলাইমান, দাউদ ও ঈসা আলাইহিমুস সালাম।তাঁরা ঈমানের দিকে আহ্বান করেছেন যে,একমাত্র রব হচ্ছেন আল্লাহ,তিনিই সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা ও রাজত্বের মালিক। তিনিই সকল বিষয় পরিচালনা করেন। তিনিই দয়াশীল ও মেহেরবান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { يَا أَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ ۚ هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ۚ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ فَأَنَّىٰ تُؤْفَكُونَ } “হে মানুষ সকল! তোমাদের উপর আল্লাহর নিআমতকে তোমরা স্মরণ কর। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা আছে কি, যে তোমাদেরকে আসমান ও জমিন থেকে রিযিক দেয়? তিনি ছাড়া কোনো সত্য মাবূদ নেই। অতএব তোমারা কোথায় বিপথে চালিত হচ্ছো?” [ফাতির : ৩] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {قُلْ مَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّن يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَن يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَن يُدَبِّرُ الْأَمْرَ ۚ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ ۚ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ } “বল, ‘কে তোমাদেরকে আসমান ও জমিন থেকে জীবনোপকরণ সরবরাহ করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, কে জীবিতকে মৃত থেকে বের করেন এবং কে মৃতকে জীবিত হতে বের করেন এবং সব বিষয় কে নিয়ন্ত্রণ করেন?’ তখন তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ্’। সুতরাং বল, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?” [ইউনুস : ৩১] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {أَمَّن يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَمَن يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ۗ أَإِلَٰهٌ مَّعَ اللَّهِ ۚ قُلْ هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ} “নাকি তিনিই, যিনি প্রথম সৃষ্টি করেন, তারপর সেটার পুনরাবৃত্তি করবেন এবং যিনি তোমাদেরকে আসমান ও জমিন হতে রিযিক দান করেন! আল্লাহর সাথে অন্য কোনো মাবূদ আছে কি? বল, “তোমরা যদি সত্যবাদী হও তবে তোমাদের প্রমাণ পেশ কর।” [আন-নামল ৬৪]
সকল নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালাম এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে দাওয়াতসহ প্রেরিত হয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “আর অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর। অতঃপর তাদের কিছু সংখ্যককে আল্লাহ্ হিদায়াত দিয়েছেন, আর তাদের কিছু সংখ্যকের উপর পথভ্রান্তি সাব্যস্ত হয়েছিল; কাজেই তোমরা যমীনে পরিভ্রমন কর অতঃপর দেখে নাও মিথ্যারোপকারীদের পরিণাম কী হয়েছে।” [আন-নাহল ৩৬] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَمَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ مِن رَّسُولٍ إِلَّا نُوحِي إِلَيْهِ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُونِ } “আর তোমার পূর্বে আমি এমন কোনো রাসূল পাঠাইনি যার প্রতি এই ওহী নাযিল করিনি যে, ‘আমি ছাড়া কোনো সত্য মাবূদ নেই। সুতরাং তোমরা একমাত্র আমার এবাদত করো।” [আল-আম্বিয়া ২৫] আল্লাহ নূহ আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে. তিনি বলেছেন: {يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ} “হে আমার জাতি, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো সত্য মাবূদ নেই। নিশ্চয়ই আমি তোমাদের ওপর মহাদিনের আযাবের ভয় করছি’।” [আল-আরাফ ৫৯] আল্লাহ ইবরাহীম খলীল‘আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি বলেছেন: { وَإِبۡرَٰهِيمَ إِذۡ قَالَ لِقَوۡمِهِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَٱتَّقُوهُۖ ذَٰلِكُمۡ خَيۡرٞ لَّكُمۡ إِن كُنتُمۡ تَعۡلَمُونَ} “আর স্মরণ কর ইবরাহীমকে, যখন তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ‘ইবাদাত কর এবং তাঁর তাকওয়া অবলম্বন কর; তোমাদের জন্য এটাই উত্তম। যদি তোমরা জানতে !” [আল-আনকাবুত : ১৬] আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন যে, সালিহ ‘আলাইহিস সালাম বলেছেন: {قَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖ قَدْ جَاءَتْكُم بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ ۖ هَٰذِهِ نَاقَةُ اللَّهِ لَكُمْ آيَةً ۖ فَذَرُوهَا تَأْكُلْ فِي أَرْضِ اللَّهِ ۖ وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ} “সে বলল, ‘হে আমার জাতি, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো সত্য মাবূদ নেই। নিশ্চয় তোমাদের নিকট তোমাদের রবের পক্ষ থেকে স্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। এটি আল্লাহর উষ্ট্রী, তোমাদের জন্য নিদর্শনস্বরূপ। সুতরাং তোমরা তাকে ছেড়ে দাও, সে আল্লাহর জমিনে আহার করুক। আর তোমরা তাকে মন্দ দ্বারা স্পর্শ করো না। তাহলে তোমাদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব পাকড়াও করবে’।” [আল-আরাফ ৭৩] আল্লাহ সংবাদ দিয়েছেন যে, শুআইব আলাইহিস সালাম বলেছেন: {يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖ قَدْ جَاءَتْكُم بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ ۖ فَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ} “হে আমার জাতি, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো সত্য মাবূদ নেই। তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। সুতরাং তোমরা পরিমাণে ও ওজনে পরিপূর্ণ দাও এবং মানুষকে তাদের পণ্যে কম দেবে না; আর তোমরা জমিনে ফ্যাসাদ করবে না তা সংশোধনের পর। এগুলো তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা মুমিন হও।” [আল-আরাফ ৮৫]
আল্লাহ যখন প্রথমবার মুসা আলাইহিস সালামের সঙ্গে কথা বলেন, তখন তাকে তিনি বলেন: { وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَىٰ (13) “আর আমি তোমাকে মনোনীত করেছি, সুতরাং যা ওহীরূপে পাঠানো হচ্ছে তা মনোযোগ দিয়ে শুন। (১৩) إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي (14) } নিশ্চয় আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো সত্য মাবূদ নেই; সুতরাং আমার ইবাদাত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর।” (১৪) [ত্বহা ১৩-১৪] আল্লাহ মুসা ‘আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি আল্লাহর পানাহ চেয়েছেন এবং বলেছেন: {إِنِّي عُذْتُ بِرَبِّي وَرَبِّكُم مِّن كُلِّ مُتَكَبِّرٍ لَّا يُؤْمِنُ بِيَوْمِ الْحِسَابِ } “আমি আমার রব ও তোমাদের রবের নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন প্ৰত্যেক অহংকারী হতে যে বিচার দিনের উপর ঈমান রাখে না।” [গাফির ২৭] আল্লাহ ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি বলেছেন: { إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ ۗ هَٰذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيمٌ } “নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার রব এবং তোমাদের রব। সুতরাং তোমরা একমাত্র তাঁর ইবাদাত কর। এটাই সরল পথ।” [আলে ইমরান : ৫১] আল্লাহ তা‘আলা ঈসা ‘আলাইহিস সালাম সম্পর্কে আরও সংবাদ দিয়েছেন যে. তিনি বলেছেন: { إِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ ۗ هَٰذَا صِرَاطٌ مُّسْتَقِيمٌ } “হে ইসরাঈল-সন্তানগণ! তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব একমাত্র আল্লাহর ইবাদত কর। নিশ্চয়ই কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।” [আল-মায়েদাহ ৭২]
বরং খোদ তাওরাত ও ইঞ্জিল কিতাবদ্বয়েই এক আল্লাহর ইবাদতের ওপর গুরুত্ব এসেছে। যেমন উক্ত কিতাবের দ্বিতীয়তত্ত্ব বিবরণ অধ্যায়ে মূসা আলাইহিস সালামের বাণী উদ্ধৃত হয়েছে: “হে ইসরাঈল, শোন! রবই হলেন আমাদের একমাত্র মাবূদ, একমাত্র রব।” ইঞ্জিল মিরাক্কস এ তাওহীদের ওপর গুরুত্ব এসেছে, যেমন ঈসা আলাইহিস সালাম বলেছেন: (নিশ্চয় সর্বপ্রথম ওসিয়ত হচ্ছে: হে ইসরাঈল শোন, রবই হচ্ছেন আমাদের একমাত্র মাবূদ, একমাত্র রব।)
আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করেছেন যে, প্রত্যেক নবী গুরুত্বপূর্ণ এই দায়িত্বসহ প্রেরিত হয়েছেন। আর সেটি হচ্ছে তাওহীদের দিকে আহ্বান। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَّسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ ۖ فَمِنْهُم مَّنْ هَدَى اللَّهُ وَمِنْهُم مَّنْ حَقَّتْ عَلَيْهِ الضَّلَالَةُ } “আর অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত কর এবং তাগূতকে বর্জন কর। অতঃপর তাদের কিছু সংখ্যককে আল্লাহ্ হিদায়াত দিয়েছেন, আর তাদের কিছু সংখ্যকের উপর পথভ্রান্তি সাব্যস্ত হয়েছিল।” [আন-নাহল ৩৬] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: {قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَرُونِي مَاذَا خَلَقُوا مِنَ الأرْضِ أَمْ لَهُمْ شِرْكٌ فِي السَّمَاوَاتِ اِئْتُونِي بِكِتَابٍ مِنْ قَبْلِ هَذَا أَوْ أَثَارَةٍ مِنْ عِلْمٍ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ} “বল, ‘তোমরা দেখছো কি, তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক আমাকে দেখাও তো তারা জমিনে কী সৃষ্টি করেছে অথবা আসমানসমূহে তাদের কোনো অংশীদারিত্ব আছে কি? এর পূর্ববতী কোনো কিতাব অথবা পরম্পরাগত কোনো জ্ঞান থাকলে তা তোমরা আমার কাছে নিয়ে আস যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” [আল-আহকাফ ৪] শায়খ আস-সা‘দী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: (অতএব জানা গেল যে, মুশরিকদের তর্ক-বিতর্ক তাদের শিরকের পক্ষে কোনো দলিল ও প্রমাণের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং তারা কিছু মিথ্যা ধারণা, অলীক মতবাদ ও বিকৃত মস্তিষ্কের ওপর নির্ভর করেছে, আপনাকে তাদের বিকৃতি ও ভুলের প্রমাণ দিবে তাদের অবস্থার হিসাব-নিকাশ, তাদের জ্ঞান ও আমলের অনুসন্ধান এবং তাদের থেকে যারা গায়রুল্লাহের ইবাদতে নিজেদের জীবনকে নিঃশেষ করেছে তাদের অবস্থার প্রতি দৃষ্টিপাত যে, আল্লাহ ছাড়া এই উপাস্যরা দুনিয়া ও আখিরাতে তাদের কোনো উপকার করেছে কি?) তাইসীরুল কারীমিল মান্নান: ৭৭৯
৬- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলাই হলেন,একমাত্র সৃষ্টিকর্তা এবং তিনি একাই ইবাদতের হকদার। তার সঙ্গে অন্য কারো ইবাদত করা যাবে না।
আল্লাহ সেই সত্ত্বা যিনি হকদার যে, একমাত্র তারই ইবাদত করা হোক এবং তার সঙ্গে অন্য কারো ইবাদাত করা না হোক। আল্লাহ তাআলা বলেনঃ {يَا أَيُّهَا النَّاسُ اعْبُدُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ (21) “হে মানুষ জাতি! তোমরা তোমাদের সেই রবের একমাত্র ইবাদাত করো,যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। (২১) الَّذِي جَعَلَ لَكُمُ الْأَرْضَ فِرَاشًا وَالسَّمَاءَ بِنَاءً وَأَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَّكُمْ ۖ فَلَا تَجْعَلُوا لِلَّهِ أَندَادًا وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ (22) } যিনি তোমাদের জন্য জমিনকে বিছানা ও আসমানকে করেছেন ছাদ এবং আকাশ হতে পানি অবতীর্ণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। কাজেই তোমরা জেনে শুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় করিও না।” [আল-বাকারা ২১-২২] কাজেই যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন আমাদের পূর্বের প্রজন্মকে সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের জন্যে যমীনকে করেছেন বিছানা, আর আমাদের ওপর বর্ষণ করেছেন আসমান থেকে পানি, তার দ্বারা আমাদের রিযিক স্বরূপ বিভিন্ন ফল উৎপাদন করেছেন অতএব তিনি একাই ইবাদতের হকদার। আল্লাহ তাআলা বলেন: { يَا أَيُّهَا النَّاسُ اذْكُرُوا نِعْمَتَ اللَّهِ عَلَيْكُمْ ۚ هَلْ مِنْ خَالِقٍ غَيْرُ اللَّهِ يَرْزُقُكُم مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ ۚ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ فَأَنَّىٰ تُؤْفَكُونَ } “হে মানুষ সকল! তোমাদের উপর আল্লাহর নিআমতকে তোমরা স্মরণ কর। আল্লাহ ছাড়া আর কোনো স্রষ্টা আছে কি, যে তোমাদেরকে আসমান ও জমিন থেকে রিযিক দেয় ? তিনি ছাড়া কোনো সত্য মাবূদ নেই। অতএব তোমারা কোথায় বিপথে চালিত হচ্ছো?” [ফাতির : ৩] অতএব যিনি সৃষ্টি করেন ও রিযিক দান করেন একমাত্র তিনিই ইবাদতের হকদার। আল্লাহ তাআলা বলেন: { ذَٰلِكُمُ اللَّهُ رَبُّكُمْ ۖ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۖ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ فَاعْبُدُوهُ ۚ وَهُوَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ } “তিনিই আল্লাহ তোমাদের রব। তিনি ছাড়া কোনো সত্য মাবূদ নেই। তিনি প্রতিটি জিনিসের স্রষ্টা। সুতরাং তোমরা একমাত্র তাঁর ইবাদাত কর। আর তিনি প্রতিটি জিনিসের উপর তত্ত্বাবধায়ক।” [আল-আনআম: ১০২]
আর আল্লাহ ছাড়া যেসব বস্তুর ইবাদত করা হয়, তারা ইবাদতের হকদার নয়, কেননা সে আসমান ও জমিনে সরিষা পরিমাণ কোনো বস্তুর মালিক নয়। আর কোনো বস্তুতে সে আল্লাহর অংশীদার, সাহায্যকারী ও ভাগীদারও নয়। অতএব আল্লাহর সঙ্গে কিভাবে তাকে আহ্বান করা হয় অথবা কিভাবে তাকে আল্লাহর শরীক সাব্যস্ত করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: {قُلِ ادْعُوا الَّذِينَ زَعَمْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ ۖ لَا يَمْلِكُونَ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ فِي السَّمَاوَاتِ وَلَا فِي الْأَرْضِ وَمَا لَهُمْ فِيهِمَا مِن شِرْكٍ وَمَا لَهُ مِنْهُم مِّن ظَهِيرٍ } “বল, 'তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া যাদেরকে মাবূদ মনে করে ডাক; তারা আসমানসমূহে অণু পরিমাণ কিছুরও মালিক নয়, যমীনেও নয়। আর এ দু'টিতে তাদের কোনো অংশও নেই এবং তাদের মধ্য থেকে কেউ তাঁর সহায়কও নয়।” [সাবা : ২২]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলাই এসব মাখলুক সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে অস্তিত্বহীন থেকে অস্তিত্ব দান করেছেন,যা তাঁর অস্তিত্বে এবং তিনি তাঁর কর্মসমূহে ও যাবতিয় ইবাদতে তিনি একক তা প্রমাণ বহন করে। আল্লাহ তাআলা বলেন: { وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَكُم مِّن تُرَابٍ ثُمَّ إِذَا أَنتُم بَشَرٌ تَنتَشِرُونَ (20) “আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। তারপর এখন তোমরা মানুষ, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছ। (২০) وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ (21) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে জাতির জন্য, যারা চিন্তা করে। (২১) وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّلْعَالِمِينَ (22) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও তোমাদের বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয়ই এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য। (২২) وَمِنْ آيَاتِهِ مَنَامُكُم بِاللَّيْلِ وَالنَّهَارِ وَابْتِغَاؤُكُم مِّن فَضْلِهِ ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَسْمَعُونَ (23) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে রাতে তোমাদের নিদ্রা এবং দিনে তাঁর অনুগ্রহ থেকে তোমাদের (জীবিকা) অন্বেষণ। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে জাতির জন্য যারা শোনে। (২৩) وَمِنْ آيَاتِهِ يُرِيكُمُ الْبَرْقَ خَوْفًا وَطَمَعًا وَيُنَزِّلُ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَيُحْيِي بِهِ الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَعْقِلُونَ (24) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে তিনি তোমাদেরকে ভয় ও আশাস্বরূপ বিদ্যুৎ দেখান, আর আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা দ্বারা জমিনকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে জাতির জন্য যারা অনুধাবন করে। (২৪) وَمِنْ آيَاتِهِ أَن تَقُومَ السَّمَاءُ وَالْأَرْضُ بِأَمْرِهِ ۚ ثُمَّ إِذَا دَعَاكُمْ دَعْوَةً مِّنَ الْأَرْضِ إِذَا أَنتُمْ تَخْرُجُونَ (25) আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তাঁরই আদেশে আসমান ও যমীনের স্থিতি থাকে; তারপর আল্লাহ্ যখন তোমাদেরকে যমীন থেকে উঠার জন্য একবার ডাকবেন তখনই তোমরা বেরিয়ে আসবে। (২৫) وَلَهُ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ كُلٌّ لَّهُ قَانِتُونَ (26) আর আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে তা তাঁরই। সবকিছু তাঁরই অনুগত। (২৬) وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ } আর তিনি-ই, যিনি সৃষ্টিকে শুরুতে অস্তিত্বে এনেছেন, তারপর তিনি সেটা পুনরাবৃত্তি করবেন; আর এটা তাঁর জন্য অতি সহজ।” [আর-রূম ২০-২৭]
নামরুদ তার রবের অস্তিত্বকে অস্বীকার করেছিল, তখন ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তাকে বলেছিলেন, যেমন আল্লাহ তার সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন: {قَالَ إِبْرَاهِيمُ فَإِنَّ اللَّهَ يَأْتِي بِالشَّمْسِ مِنَ الْمَشْرِقِ فَأْتِ بِهَا مِنَ الْمَغْرِبِ فَبُهِتَ الَّذِي كَفَرَ ۗ وَاللَّهُ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ } “ইব্রাহীম বললেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ্ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদয় করান, তুমি সেটাকে পশ্চিম দিক থেকে উদয় করাও তো। এতে সে অবিশ্বাসকারী হতবুদ্ধি হয়ে পড়েছিল। আর আল্লাহ যালিম সম্প্রদায়কে হিদায়াত করেন না।” [আল-বাকারা : ২৫৮] অনুরূপভাবে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার জাতিরর বিপক্ষে প্রমাণ পেশ করেছেন যে, আল্লাহই তাকে হিদায়েত দিয়েছেন এবং তিনিই তাকে খাদ্য ও পানীয় দান করেছেন আর তিনি যখন অসুস্থ হন, তখন আল্লাহই তাকে সুস্থ করেন। আর তিনিই তাকে মৃত্যু দিবেন ও জীবিত করবেন। তিনি বলেন, যেমন আল্লাহ তার সম্পর্কে সংবাদ দিয়েছেন: {الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ (78) “যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন, তিনিই আমাকে হেদায়াত দিয়েছেন। (৭৮) وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ (79) আর ‘তিনিই আমাকে খাওয়ান ও পান করান। (৭৯) وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ (80) এবং রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন। (৮০) وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ (81) } আর তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন, তারপর আমাকে পুনর্জীবিত করবেন।” [আশ-শুআরা : ৭৮-৮১] আল্লাহ মুসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, তিনি ফিরআউনকে এই বলে ঘায়েল করেছেন যে, তার রব একমাত্র তিনিই: { الَّذِي أَعْطَىٰ كُلَّ شَيْءٍ خَلْقَهُ ثُمَّ هَدَىٰ} “যিনি প্রত্যেক বস্তুকে তার যোগ্য আকৃতি প্রদান করেছেন অতঃপর তাকে হিদায়াত দিয়েছেন।” [ত্বহা : ৫০]
আর আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু রয়েছে তার সব তিনি মানুষের জন্যে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তিনি তাদেরকে নি‘আমত দ্বারা বেষ্টন করে নিয়েছেন, যেন তারা আল্লাহর ইবাদত করে ও তার সাথে কুফরী না করে। আল্লাহ তাআলা বলেন: {أَلَمْ تَرَوْا أَنَّ اللَّهَ سَخَّرَ لَكُم مَّا فِي السَّمَاوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَأَسْبَغَ عَلَيْكُمْ نِعَمَهُ ظَاهِرَةً وَبَاطِنَةً ۗ وَمِنَ النَّاسِ مَن يُجَادِلُ فِي اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَلَا هُدًى وَلَا كِتَابٍ مُّنِيرٍ } “তোমরা কি দেখ না, নিশ্চয় আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে সবকিছুই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করেছেন? আর মানুষের মধ্যে কেউ কেউ কোনো জ্ঞান, কোনো পথনির্দেশ ও কোনো দীপ্তিমান কিতাব ছাড়াই আল্লাহ্ সম্বন্ধে বিতণ্ডা করে।” [লোকমান : ২০] আল্লাহ যেমনিভাবে আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু রয়েছে তার সব কিছু মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করে দিয়েছেন, তেমনিভাবে মানুষ যেসব উপায়-উপকরণের মুখাপেক্ষী হয় তাকে তার সবকিছু দিয়ে সৃষ্টি ও তৈরি করেছেন। যেমন কান, চোখ ও অন্তর, যেন সে এমন ইলম অর্জন করতে পারে যা তাকে উপকার করবে এবং তার মাওলা ও সৃষ্টিকর্তার পথ দেখাবে। আল্লাহ তাআলা বলেন: { وَاللَّهُ أَخْرَجَكُم مِّن بُطُونِ أُمَّهَاتِكُمْ لَا تَعْلَمُونَ شَيْئًا وَجَعَلَ لَكُمُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَالْأَفْئِدَةَ ۙ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ } “আর আল্লাহ্ তোমাদেরকে নির্গত করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমন অবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না এবং তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণশক্তি, দৃষ্টিশক্তি এবং হৃদয়, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” [আন-নাহাল : ৭৮]
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতালা এই জগতের সবকিছু সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষ যেসব অঙ্গ ও শক্তির মুখাপেক্ষী হয় তাকে তার সবকিছু দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর যেসব বস্তু তাকে আল্লাহর ইবাদত ও জমিন আবাদ করতে সাহায্য করবে, তার সব কিছু দিয়ে তাকে সাহায্য করেছেন। অতঃপর আসমানসমূহ ও জমিনে যা কিছু রয়েছে তার সবকিছু তার জন্যে নিয়োজিত করেছেন।
আল্লাহ তাআলা এই মহান জগত সৃষ্টি করার দ্বারা তিনি তাঁর যাবাতিয় কর্ম সম্পাদনে একক তার দলিল পেশ করেছেন, যা তার উলুহিয়্যাতকে অর্থাৎ তার একমাত্র উপাস্য হওয়াকে আবশ্যক করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {قُلْ مَنْ يَرْزُقُكُمْ مِنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ أَمَّنْ يَمْلِكُ السَّمْعَ وَالْأَبْصَارَ وَمَنْ يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَمَنْ يُدَبِّرُ الْأَمْرَ فَسَيَقُولُونَ اللَّهُ فَقُلْ أَفَلَا تَتَّقُونَ } “বলুন, ‘কে তোমাদেরকে আসমান ও যমীন থেকে জীবনোপকরণ সরবারহ করেন অথবা শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি কার কর্তৃত্বাধীন, কে জীবিতকে মৃত থেকে বের করেন এবং কে মৃতকে জীবিত হতে বের করেন এবং কে সব বিষয় নিয়ন্ত্রণ করেন?’ তখন তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ্’। সুতরাং বলুন, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?” [ইউনুস:৩১] আল হক্ব সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরও বলেন: {قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَا تَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَرُونِي مَاذَا خَلَقُوا مِنَ الْأَرْضِ أَمْ لَهُمْ شِرْكٌ فِي السَّمَاوَاتِ ائْتُونِي بِكِتَابٍ مِنْ قَبْلِ هَذَا أَوْ أَثَارَةٍ مِنْ عِلْمٍ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ} বলুন, ‘তোমরা দেখছো কি? তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক আমাকে দেখাও তো তারা যমীনে কী সৃষ্টি করেছে অথবা আসমানসমূহে তাদের কোনো অংশীদারিত্ব আছে কি? এর পূর্ববতী কোনো কিতাব অথবা পরম্পরাগত কোনো জ্ঞান থাকলে তা তোমরা আমার কাছে নিয়ে আস যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” [আল-আহকাফ ৪] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { خَلَقَ السَّمَاوَاتِ بِغَيْرِ عَمَدٍ تَرَوْنَهَا وَأَلْقَىٰ فِي الْأَرْضِ رَوَاسِيَ أَن تَمِيدَ بِكُمْ وَبَثَّ فِيهَا مِن كُلِّ دَابَّةٍ وَأَنزَلْنَا مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَنبَتْنَا فِيهَا مِن كُلِّ زَوْجٍ كَرِيمٍ. هَٰذَا خَلْقُ اللَّهِ فَأَرُونِي مَاذَا خَلَقَ الَّذِينَ مِن دُونِهِ بَلِ الظَّالِمُونَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ} “তিনি আসমানসমূহ নির্মাণ করেছেন খুঁটি ছাড়া, তোমরা এটা দেখতে পাচ্ছ; তিনিই যমীনে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা যাতে এটা তোমাদেরকে নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরনের জীব-জন্তু। আর আমি আকাশ হতে বারি বর্ষণ করি তারপর এতে উদ্গত করি সব ধরণের কল্যাণকর উদ্ভিদ। এটা আল্লাহর সৃষ্টি! সুতরাং তিনি ছাড়া অন্যরা কি সৃষ্টি করেছে আমাকে দেখাও। বরং যালিমরা স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে রয়েছে।” [লোকমান : ১০-১১] আল হক্ব সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরও বলেন: { أَمْ خُلِقُوا مِنْ غَيْرِ شَيْءٍ أَمْ هُمُ الْخَالِقُونَ (35) “তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? (৩৫) أَمْ خَلَقُوا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بَل لَّا يُوقِنُونَ (36) নাকি তারা আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না। (৩৬) أَمْ عِندَهُمْ خَزَائِنُ رَبِّكَ أَمْ هُمُ الْمُصَيْطِرُونَ (37) } আপনার রবের গুপ্তভাণ্ডার কি তাদের কাছে রয়েছে, নাকি তারা এ সবকিছুর নিয়ন্তা?” [আত-তুর ৩৫-৩৭] শায়খ আস-সা‘দী রহ. বলেন: ‘এটিএমন বিষয় দ্বারা তাদের বিপক্ষে দলিল পেশ করা, যার সামনে তাদের সত্যকে মেনে নেয়া ছাড়া কিংবা বিবেক ও দীনের দাবি থেকে বের হওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।’ [তাফসীরু ইবন সা‘দী :৮১৬]
৭- এই জগতে যা কিছু রয়েছে আমরা যা দেখি আর যা দেখি না; তার সবকিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তিনি ছাড়া সবকিছুই তার সৃষ্ট মাখলুক। তিনি ছয় দিনে আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন।
এই জগতে যা কিছু রয়েছে আমরা যা দেখি আর যা দেখি না তার সবকিছুর স্রষ্টা একমাত্র আল্লাহ তা‘আলা। তিনি ছাড়া সবকিছুই তার সৃষ্ট মাখলুক। তিনি ছয় দিনে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন: {قُلْ مَن رَّبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ قُلِ اللَّهُ ۚ قُلْ أَفَاتَّخَذْتُم مِّن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ لَا يَمْلِكُونَ لِأَنفُسِهِمْ نَفْعًا وَلَا ضَرًّا ۚ قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الْأَعْمَىٰ وَالْبَصِيرُ أَمْ هَلْ تَسْتَوِي الظُّلُمَاتُ وَالنُّورُ ۗ أَمْ جَعَلُوا لِلَّهِ شُرَكَاءَ خَلَقُوا كَخَلْقِهِ فَتَشَابَهَ الْخَلْقُ عَلَيْهِمْ ۚ قُلِ اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ الْوَاحِدُ الْقَهَّارُ } “বলুন, ‘কে আসমানসমূহ ও যমীনের রব?’ বলুন, ‘আল্লাহ্।’ বলুন, ‘তবে কি তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করেছ,যারা নিজেদের লাভ বা ক্ষতি সাধনে সক্ষম নয়?’ বলুন,‘অন্ধ ও চক্ষুষ্মান কি সমান হতে পারে? নাকি অন্ধকার ও আলো সমান হতে পারে?’ তবে কি তারা আল্লাহর এমন শরীক সৃষ্টি করেছে, যারা আল্লাহর সৃষ্টির মত সৃষ্টি করেছে, যে কারণে সৃষ্টি তাদের কাছে সদৃশ মনে হয়েছে? বলুন, ‘আল্লাহ্ সকল বস্তুর স্রষ্টা; আর তিনি এক, মহা প্রতাপশালী।” [আর-রা‘দ : ১৬] আল্লাহ আরও বলেন: { وَيَخْلُقُ مَا لَا تَعْلَمُونَ} “আর তিনি সৃষ্টি করেন এমন অনেক কিছু, যা তোমরা জান না।” [আন-নাহল : ৮]
আল্লাহ ছয় দিনে আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলেন: {هُوَ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَىٰ عَلَى الْعَرْشِ ۚ يَعْلَمُ مَا يَلِجُ فِي الْأَرْضِ وَمَا يَخْرُجُ مِنْهَا وَمَا يَنزِلُ مِنَ السَّمَاءِ وَمَا يَعْرُجُ فِيهَا ۖ وَهُوَ مَعَكُمْ أَيْنَ مَا كُنتُمْ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ بَصِيرٌ } “তিনি ছয় দিনে আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপরে হয়েছেন। তিনি জানেন যা কিছু যমীনে প্রবেশ করে এবং যা কিছু তা থেকে বের হয়, আর আসমান থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় এবং তাতে যা কিছু উত্থিত হয়। আর তোমরা যেখানেই থাক না কেন ইলেমের দিক দিয়ে তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন, আর তোমরা যা কিছু কর আল্লাহ তার সম্যক দ্রষ্টা।” [আল হাদীদ : ৪] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَلَقَدْ خَلَقْنَا السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ وَمَا مَسَّنَا مِن لُّغُوبٍ } “আর অবশ্যই আমি আসমানসমুহ, যমীন ও তাদের অন্তর্বর্তী সমস্ত কিছু সৃষ্টি করেছি ছয় দিনে; আর আমাকে কোনো ক্লান্তি স্পর্শ করেনি।” [ক্বাফ : ৩৮]
৮- আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতালার রাজত্বে অথবা তাঁর সৃষ্টিতে অথবা তাঁর পরিচালনায় অথবা তাঁর ইবাদাতে কোনো শরীক নেই।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা সকল রাজত্বের মালিক, তাঁর সৃষ্টিতে অথবা তাঁর রাজত্বে অথবা তাঁর পরিচালনায় তাঁর কোনো অংশীদার নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন: {قُلْ أَرَأَيْتُم مَّا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ أَرُونِي مَاذَا خَلَقُوا مِنَ الْأَرْضِ أَمْ لَهُمْ شِرْكٌ فِي السَّمَاوَاتِ ۖ ائْتُونِي بِكِتَابٍ مِّن قَبْلِ هَٰذَا أَوْ أَثَارَةٍ مِّنْ عِلْمٍ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ } “বলুন, ‘তোমরা দেখছো কি? তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যাদেরকে ডাক আমাকে দেখাও তো তারা যমীনে কী সৃষ্টি করেছে অথবা আসমানসমূহে তাদের কোনো অংশীদারিত্ব আছে কি? এর পূর্ববতী কোনো কিতাব অথবা পরম্পরাগত কোনো জ্ঞান থাকলে তা তোমরা আমার কাছে নিয়ে আস যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” [আল-আহকাফ ৪] শায়খ আস সা‘দী রাহিমাহুল্লাহ বলেন: ‘অর্থাৎ যারা মূর্তি ও দেবতাদের আল্লাহর সঙ্গে অংশী সাব্যস্ত করেছে তাদেরকে (বলুন), এসব কোনো উপকার, ক্ষতি, জীবন-মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মালিক নয়। আপনি তাদেরকে তাদের মূর্তিসমূহের অক্ষমতা এবং তারা যে কোনো ইবাদতের মালিক নয় তা প্রকাশ করে বলুন, (তোমরা আমাকে দেখাও তো তারা যমীনে কী সৃষ্টি করেছে অথবা আসমানসমূহে তাদের কোনো অংশীদারিত্ব আছে কি?) তারা কি আসমানসমূহ ও যমীনের কোনো অংশ সৃষ্টি করেছে? তারা কি পাহাড় সৃষ্টি করেছে? তারা কি নহর প্রবাহিত করেছে? তারা কি যমীনে প্রাণীদের বিচরণ করিয়েছে? তারা কি গাছ-পালা উদ্গত করেছে? এসব সৃষ্টিতে তাদের কোনো সাহায্য ছিল কি? না, এটি অন্যদের ব্যতিরেকে তাদের স্বীকারুক্তি দ্বারাই তাদের ওপর সাব্যস্ত হয়েছে। অতএব এটিই যৌক্তিক অকাট্য দলিল যে, আল্লাহ ছাড়া যাই রয়েছে তার ইবাদত করা বাতিল।’
অতঃপর তিনি বর্ণনাগত দলিল নেই উল্লেখ করে বলেন: {এর পূর্ববতী কোনো কিতাব নিয়ে আস} যে কিতাব শিরকের দিকে আহ্বান করে { অথবা জ্ঞানের কোনো নিদর্শন} যা রাসূলদের থেকে মিরাস সূত্রে পাওয়া এবং যা শিরকের নির্দেশ দেয়। জানা কথা যে, তারা একজন রাসূল থেকে এমন কোনো দলিল পেশ করতে পারবে না, যা শিরকের নির্দেশ দেয়।বরং আমরা নিশ্চিত ও দৃঢ় বিশ্বাসী যে,সকল রাসূল তাদের রবের তাওহীদের দিকে আহ্বান করেছেন এবং তারা তাঁর সঙ্গে শিরক করা থেকে নিষেধ করেছেন। বস্তুত তাদের থেকে যা পাওয়া যায় এটিই সবচেয়ে বড় ইলেম।) [তাফসীরু ইবনে সা‘দী : ৭৭৯]
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতালা হচ্ছেন রাজত্বের মালিক, তাঁর রাজত্বে তাঁর কোনো শরীক নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { قُلِ اللَّهُمَّ مَالِكَ الْمُلْكِ تُؤْتِي الْمُلْكَ مَن تَشَاءُ وَتَنزِعُ الْمُلْكَ مِمَّن تَشَاءُ وَتُعِزُّ مَن تَشَاءُ وَتُذِلُّ مَن تَشَاءُ ۖ بِيَدِكَ الْخَيْرُ ۖ إِنَّكَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} “বলুন, ‘হে আল্লাহ, রাজত্বের মালিক, আপনি যাকে চান রাজত্ব দান করেন, আর যার থেকে চান রাজত্ব কেড়ে নেন এবং আপনি যাকে চান সম্মান দান করেন। আর যাকে চান অপমানিত করেন, আপনার হাতেই কল্যাণ। নিশ্চয় আপনি সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” [আলু ইমরান : ২৬] আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন পরিপূর্ণ রাজত্ব একমাত্র তাঁর জন্যে স্পষ্ট করে বলেন: { يَوْمَ هُم بَارِزُونَ ۖ لَا يَخْفَىٰ عَلَى اللَّهِ مِنْهُمْ شَيْءٌ ۚ لِّمَنِ الْمُلْكُ الْيَوْمَ ۖ لِلَّهِ الْوَاحِدِ الْقَهَّارِ } “যেদিন তারা (লোকসকল) প্রকাশিত হবে সেদিন আল্লাহর কাছে তাদের কিছুই গোপন থাকবে না। আজ রাজত্ব কর্তৃত্ব কার? আল্লাহরই, যিনি এক, প্ৰবল প্ৰতাপশালী।” [গাফির ১৬]
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতালার রাজত্বে অথবা সৃষ্টিতে অথবা তার পরিচালনায় অথবা তার কোনো ইবাদতে কোনো শরীক নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন: { وَقُلِ الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي لَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكٌ فِي الْمُلْكِ وَلَمْ يَكُن لَّهُ وَلِيٌّ مِّنَ الذُّلِّ ۖ وَكَبِّرْهُ تَكْبِيرًا } “বলুন, ‘প্রশংসা আল্লাহরই যিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি, তাঁর সার্বভৌমত্বে কোনো অংশীদার নেই এবং তাঁর সৃষ্টির মধ্য থেকে সহযোগিতার জন্য কোন অভিভাবকের প্রয়োজন নেই। আর আপনি সসম্ভ্রমে তাঁর মাহাত্ম্য ঘোষণা করুন।” [আল-ইসরা : ১১১] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكٌ فِي الْمُلْكِ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا } “যিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী; তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি; সার্বভৌমত্বে তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ অনুপাতে।” [আল-ফুরকান : ২] তিনিই মালিক আর তিনি ছাড়া সবাই তার মালিকানাধীন। তিনিই স্রষ্টা আর তিনি ছাড়া সবাই তার সৃষ্ট-মাখলুক আর তিনি সবকিছু পরিকল্পনা ও পরিচালনা করেন। বস্তুত যিনি এমন গুণাবলির মালিক তার ইবাদত করাই ওয়াজিব;আর অন্যের ইবাদত করা হচ্ছে বিবেকের ত্রুটি এবং দুনিয়া ও আখিরাত বিনষ্টকারী শিরক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَقَالُوا كُونُوا هُودًا أَوْ نَصَارَىٰ تَهْتَدُوا ۗ قُلْ بَلْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۖ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ } “আর তারা বলে, ‘তোমরা ইয়াহূদী কিংবা নাসারা হয়ে যাও, হিদায়াত পেয়ে যাবে’। বলুন, ‘বরং আমরা ইবরাহীমের মিল্লাতের অনুসরণ করি, যে হকের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠ ছিল এবং যে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।” [আল-বাকারাহ : ১৩৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন: { وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۗ وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا} তার চেয়ে দীনে আর কে উত্তম;যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং হকের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের মিল্লাতকে অনুসরণ করে? আর আল্লাহ তো ইবরাহীমকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।” [আন-নিসা : ১২৫] আর আল-হক (আল্লাহ) সুবহানাহু স্পষ্ট করেছেন, যে ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালামের মিল্লাত ব্যতীরেকে অনুসরণ করল সে নিজেকে নিবোর্ধ বানাল। আল্লাহ তাআলা বলেন: {وَمَن يَرْغَبُ عَن مِّلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَن سَفِهَ نَفْسَهُ ۚ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا ۖ وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ } “আর যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ছাড়া ইব্রাহীম এর মিল্লাত হতে আর কে বিমুখ হবে ! দুনিয়াতে তাকে আমি মনোনীত করেছি; আর আখেরাতেও তিনি অবশ্যই সৎ কর্মশীলদের অন্যতম।” [আল-বাকারাহ : ১৩০]
৯- আল্লাহু সুবহানাহু কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি। আর তাঁর কোনো সমকক্ষ ও সাদৃশ্য নেই।
আল্লাহু সুবহানাহু কাউকে জন্ম দেননি এবং তাকেও জন্ম দেয়া হয়নি। আর তাঁর কোনো সমকক্ষ ও সাদৃশ্য নেই। আল-হক সুবহানাহু ওয়াতায়ালা বলেন: {قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ (1) “বলুন, ‘তিনি আল্লাহ্,এক-অদ্বিতীয় (১) اللَّهُ الصَّمَدُ (2) আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। (২) لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُولَدْ (3) তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি (৩) وَلَمْ يَكُن لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ (4)} এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।(৪)” [আল-ইখলাস ১-৪] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {رَّبُّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا فَاعْبُدْهُ وَاصْطَبِرْ لِعِبَادَتِهِ ۚ هَلْ تَعْلَمُ لَهُ سَمِيًّا} “তিনি আসমানসমূহ, যমীন ও তাদের অন্তর্বর্তী যা কিছু আছে, সে সবের রব। কাজেই একমাত্র তাঁর ইবাদাত কর এবং তাঁর ইবাদাতেই ধৈর্যশীল থাক।তুমি কি তাঁর সমনামগুণসম্পন্ন কাউকেও জান?” [মারয়াম : ৬৫] মহান আল্লাহ বলেন: {فَاطِرُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ جَعَلَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَمِنَ الْأَنْعَامِ أَزْوَاجًا ۖ يَذْرَؤُكُمْ فِيهِ ۚ لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ ۖ وَهُوَ السَّمِيعُ الْبَصِيرُ} “তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের সৃষ্টিকর্তা, তিনি তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং গৃহপালিত জন্তুর মধ্য থেকে সৃষ্টি করেছেন জোড়া। এভাবে তিনি তোমাদের বংশ বিস্তার করেন; কোনো কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্ৰষ্টা।” [আশ-শূরা : ১১]
১০- আল্লাহ সুবনাহু ওয়াতায়ালা কোনো বস্তুতে অনুপ্রবেশ করেন না এবং তার সৃষ্ট কোনো জিনিসের তিনি শরীর গ্রহণ করেন না:
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতাআলা কোনো জিনিসে অনুপ্রবেশ করেন না এবং তার মাখলুক হতে কোনো জিনিসের তিনি শরীর গ্রহণ করেন না। আর তিনি কোনো জিনিসের সঙ্গে একাকারও হন না। এটি এ কারণে যে, আল্লাহই হলেন স্রষ্টা, আর তিনি ছাড়া যা আছে সবই মাখলুক। তিনি চিরস্থায়ী, আর তিনি ছাড়া যা কিছু আছে সবই ধ্বংসশীল। প্রত্যেক বস্তুতেই তার রাজত্ব এবং তিনি তার মালিক। অতএব আল্লাহ তাঁর মাখলুকের কোনো কিছুতেই অনুপ্রবেশ করেন না এবং তার মাখলুকের কোনো বস্তু তার পবিত্র সত্ত্বায় অনুপ্রবেশ করে না। আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতাআলা সব বস্তু হতে বড় এবং সব কিছু হতে মহান। যে ধারণা করে যে, আল্লাহ তা‘আলা ঈসা মাসীর ভেতর অনুপ্রবেশ করেছে তাকে প্রত্যাখ্যান করে আল্লাহ তাআলা বলেন: {لَّقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ ۚ قُلْ فَمَن يَمْلِكُ مِنَ اللَّهِ شَيْئًا إِنْ أَرَادَ أَن يُهْلِكَ الْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَأُمَّهُ وَمَن فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا ۗ وَلِلَّهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ وَاللَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} “অবশ্যই তারা কুফরী করেছে যারা বলে ‘নিশ্চয় মারইয়াম পুত্র ঈসা-মাসীহই আল্লাহ’। বলুন, যদি আল্লাহ ধ্বংস করতে চান মারইয়াম পুত্র মাসীহকে ও তার মাকে এবং যমীনে যারা আছে তাদের সকলকে; ‘তাহলে কে আল্লাহর বিপক্ষে কোনো কিছুর ক্ষমতা রাখে? আর আসমানসমূহ, যমীন ও তাদের মধ্যবর্তী যা রয়েছে, তার রাজত্ব আল্লাহর জন্যই। তিনি যা ইচ্ছা তা সৃষ্টি করেন এবং আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” [আল-মায়েদাহ : ১৭] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَلِلَّهِ الْمَشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ ۚ فَأَيْنَمَا تُوَلُّوا فَثَمَّ وَجْهُ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ وَاسِعٌ عَلِيمٌ (115) “আর পূর্ব ও পশ্চিম আল্লাহরই সুতরাং যেদিকেই তোমরা মুখ ফিরাও না কেন, সেদিকই আল্লাহর কিবলা। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ প্রশস্থ দয়াবান, সর্বজ্ঞ। (১১৫) وَقَالُوا اتَّخَذَ اللَّهُ وَلَدًا ۗ سُبْحَانَهُ ۖ بَل لَّهُ مَا فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ كُلٌّ لَّهُ قَانِتُونَ (116) আর তারা বলে, ‘আল্লাহ্ সন্তান গ্রহণ করেছেন’। তিনি (তা থেকে) অতি পবিত্র। বরং আসমান ও যমীনে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর। সবকিছু তাঁরই একান্ত অনুগত। (১১৬) بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَإِذَا قَضَىٰ أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ (117) } তিনি আসমানসমূহ ও যমীনের অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে আনায়নকাী। আর যখন তিনি কোনো বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন, তখন কেবল বলেন ‘হও’ ফলে তা হয়ে যায়।” (১১৭) [আল-বাকারাহ ১১৫-১১৭] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَٰنُ وَلَدًا (88) “আর তারা বলে,‘দয়াময় সন্তান গ্রহণ করেছেন। (৮৮) لَّقَدْ جِئْتُمْ شَيْئًا إِدًّا (89) তোমরা তো এমন এক বড় জঘন্য বিষয়ের অবতারণা করছ; (৮৯) تَكَادُ السَّمَاوَاتُ يَتَفَطَّرْنَ مِنْهُ وَتَنشَقُّ الْأَرْضُ وَتَخِرُّ الْجِبَالُ هَدًّا (90) যাতে আসমানসমূহ বিদীর্ণ হয়ে যাবার উপক্রম হয়, আর যমীন খণ্ড-বিখণ্ড ও পর্বতমণ্ডলী চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে আপতিত হবে। (৯০) أَن دَعَوْا لِلرَّحْمَٰنِ وَلَدًا (91) এ জন্য যে, তারা পরম দয়াময়ের প্রতি সন্তান আরোপ করে। (৯১) وَمَا يَنبَغِي لِلرَّحْمَٰنِ أَن يَتَّخِذَ وَلَدًا (92) অথচ সন্তান গ্রহণ করা পরম করুণাময়ের জন্য শোভনীয় নয়।” (৯২) إِن كُلُّ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ إِلَّا آتِي الرَّحْمَٰنِ عَبْدًا (93) আসমান ও যমীনে এমন কেউ নেই, যে বান্দা হিসেবে পরম করুণাময়ের কাছে হাযির হবে না। (৯৩) لَّقَدْ أَحْصَاهُمْ وَعَدَّهُمْ عَدًّا (94) তিনি তাদের সংখ্যা জানেন এবং তিনি তাদেরকে বিশেষভাবে গুণে রেখেছেন। (৯৪) وَكُلُّهُمْ آتِيهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ فَرْدًا (95) } আর কিয়ামতের দিন তাদের সবাই তাঁর কাছে আসবে একাকি অবস্থায়। (৯৫)” [মারয়াম ৮৮-৯৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { ٱللَّهُ لَآ إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ٱلۡحَيُّ ٱلۡقَيُّومُۚ لَا تَأۡخُذُهُۥ سِنَةٞ وَلَا نَوۡمٞۚ لَّهُۥ مَا فِي ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَمَا فِي ٱلۡأَرۡضِۗ مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ يَعۡلَمُ مَا بَيۡنَ أَيۡدِيهِمۡ وَمَا خَلۡفَهُمۡۖ وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيۡءٖ مِّنۡ عِلۡمِهِۦٓ إِلَّا بِمَا شَآءَۚ وَسِعَ كُرۡسِيُّهُ ٱلسَّمَٰوَٰتِ وَٱلۡأَرۡضَۖ وَلَا يَـُٔودُهُۥ حِفۡظُهُمَاۚ وَهُوَ ٱلۡعَلِيُّ ٱلۡعَظِيمُ} “আল্লাহ্, তিনি ছাড়া কোনো সত্য মাবূদ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার রক্ষণা-বেক্ষণকারী। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়। আসমানসমূহে যা রয়েছে ও যমীনে যা রয়েছে সবই তাঁর। কে সে , যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর ‘কুরসী’ আসমানসমূহ ও যমীনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ সুমহান।” [আল-বাকারাহ : ২৫৫] অতএব,যার এই অবস্থা এবং যার সৃষ্টির এই অবস্থা তিনি কিভাবে তাদের কারো মাঝে প্রবেশ করবেন? অথবা তাদের কাউকে সন্তান হিসেবে গ্রহণ করবেন? অথবা তাদের কাউকে তাঁর সঙ্গে মাবূদ নির্ধারণ করবেন?
১১- আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা নিজ বান্দাদের প্রতি দয়াশীল ও মেহেরবান। আর এই জন্যে তিনি রাসূলদের পাঠিয়েছেন ও কিতাবসমূহ নাযিল করেছেন।
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা স্বীয় বান্দাদের প্রতি দয়াশীল ও মেহেরবান। আর তাঁর রহমতের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে যে, তিনি বান্দাদের প্রতি রাসূল পাঠিয়েছেন ও কিতাব নাযিল করেছেন, যেন তিনি তাদেরকে কুফর ও শিরকের অন্ধকার থেকে তাওহীদ ও হিদায়েতের নূরের দিকে বের করে নিয়ে আসেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {هُوَ الَّذِي يُنَزِّلُ عَلَىٰ عَبْدِهِ آيَاتٍ بَيِّنَاتٍ لِّيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ ۚ وَإِنَّ اللَّهَ بِكُمْ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ } “তিনিই তাঁর বান্দার প্রতি সুস্পষ্ট আয়াত নাযিল করেন, তোমাদেরকে অন্ধকার হতে আলোতে আনার জন্য। আর নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি করুণাময়, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-হাদীদ ৯]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ } “আর আমি তো আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য শুধু রহমতরূপেই পাঠিয়েছি।” [আল-আম্বিয়া : ১০৭] আল্লাহ তাঁর নবীকে নির্দেশ দিয়েছেন যে, তিনি যেন বান্দাদের জানিয়ে দেন যে, কেবল আল্লাহ হলেন ক্ষমাশীল ও মহানদয়ালু। তিনি বলেন: { نَبِّئْ عِبَادِي أَنِّي أَنَا الْغَفُورُ الرَّحِيمُ} “আমার বান্দাদেরকে জানিয়ে দিন যে, নিশ্চয় আমিই পরম ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আল-হিজর : ৪৯] আল্লাহর অনুগ্রহ ও দয়ার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে তিনি মুসিবত দূর করেন এবং তাঁর বান্দাদের ওপর কল্যাণ বর্ষণ করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَإِن يَمْسَسْكَ اللَّهُ بِضُرٍّ فَلَا كَاشِفَ لَهُ إِلَّا هُوَ ۖ وَإِن يُرِدْكَ بِخَيْرٍ فَلَا رَادَّ لِفَضْلِهِ ۚ يُصِيبُ بِهِ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ۚ وَهُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ} “আর যদি আল্লাহ্ তোমাকে কোনো ক্ষতির স্পর্শ করান, তবে তিনি ছাড়া তা মোচনকারী আর কেউ নেই। আর যদি আল্লাহ্ আপনার মঙ্গল চান, তবে তাঁর অনুগ্রহ প্রতিহত করার কেউ নেই। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে তার কাছে সেটা পৌঁছান। আর তিনি পরম ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।” [ইউনুস : ১০৭]
১২- আল্লাহই হলেন একমাত্র দয়াশীল রব। কিয়ামদের দিন যখন সকল মাখলুককে তাদের কবর থেকে উত্থিত করবেন তখন তিনি একাই তাদের সবার হিসাব গ্রহণ করবেন। অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে ভালো অথবা মন্দ যা আমল করেছে তার প্রতিদান দিবেন। যে মুমিন অবস্থায় নেক আমলসমূহ আঞ্জাম দিয়েছে তার জন্যে রয়েছে স্থায়ী নিআমত,আর যে কুফরি করেছে ও খারাপ আমল করেছে আখিরাতে তার জন্যে রয়েছে ভয়াবহ আযাব।
আল্লাহই হলেন একমাত্র দয়াশীল রব। কিয়ামতের দিন যখন সকল মাখলুককে তাদের কবর থেকে উত্থিত করবেন তখন তিনি একাই তাদের সবার হিসাব গ্রহণ করবেন।অতঃপর প্রত্যেক ব্যক্তিকে ভালো অথবা মন্দ যাই করেছে তার প্রতিদান দিবেন।যে মুমিন অবস্থায় নেক আমলসমূহ আঞ্জাম দিয়েছে তার জন্যে রয়েছে স্থায়ী নিআমত; আর যে কুফরি করেছে ও খারাপ আমল করেছে কিয়ামতের দিন তার জন্যে রয়েছে মহান আজাব। মাখলুকের সঙ্গে আল্লাহর পরিপূর্ণ ইনসাফ, হিকমত ও রহমতের বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে তিনি এই দুনিয়াকে কর্মক্ষেত্র বানিয়েছেন; আর দ্বিতীয় আরেকটি জগত তৈরি করেছেন যেখানে বিনিময়, হিসাব ও সাওয়াব প্রদান করা হবে, যেন নেক-কার ব্যক্তি তার নেকীর সাওয়াব হাসিল করে আর বদ-কার, জালিম ও বিদ্রোহী ব্যক্তি তার জুলম ও বিদ্রোহের শাস্তি ভোগ করে। আর এই বিষয়টিকে অনেক মানুষের অন্তর অসম্ভব মনে করতে পারে বিধায়,কিয়ামত সত্য এবং তাতে কোনো সন্দেহ নেই তার ওপর আল্লাহ অনেক দলিল স্থাপন করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَمِنْ آيَاتِهِ أَنَّكَ تَرَى الْأَرْضَ خَاشِعَةً فَإِذَا أَنزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ ۚ إِنَّ الَّذِي أَحْيَاهَا لَمُحْيِي الْمَوْتَىٰ ۚ إِنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} “আর তাঁর একটি নিদর্শন এই যে, আপনি ভূমিকে দেখতে পান শুষ্ক ও ঊষর, অতঃপর যখন আমি তাতে পানি বর্ষণ করি তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয়। নিশ্চয় যিনি যমীনকে জীবিত করেন তিনি অবশ্যই মৃতদের জীবনদানকারী। নিশ্চযিই তিনি সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।” [ফুসসিলাত :৩৯] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّنَ الْبَعْثِ فَإِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن تُرَابٍ ثُمَّ مِن نُّطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ مِن مُّضْغَةٍ مُّخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ لِّنُبَيِّنَ لَكُمْ ۚ وَنُقِرُّ فِي الْأَرْحَامِ مَا نَشَاءُ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ثُمَّ نُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ ۖ وَمِنكُم مَّن يُتَوَفَّىٰ وَمِنكُم مَّن يُرَدُّ إِلَىٰ أَرْذَلِ الْعُمُرِ لِكَيْلَا يَعْلَمَ مِن بَعْدِ عِلْمٍ شَيْئًا ۚ وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ وَأَنبَتَتْ مِن كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ} “হে মানুষ! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক তবে নিশ্চয়ই জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্র থেকে, তারপর রক্তপিন্ড থেকে,তারপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট অথবা অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট গোশ্ত থেকে। তোমাদের নিকট বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করার নিমিত্তে। আর আমি যা ইচ্ছা করি তা একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত মাতৃগর্ভে অবস্থিত রাখি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, পরে যাতে তোমরা যৌবনে উপনীত হও। তোমাদের মধ্যে কারো কারো মৃত্যু দেয়া হয় এ বয়সেই, আবার কাউকে কাউকে ফিরিয়ে নেয়া হয় হীনতম বয়সে, যাতে সে জ্ঞান লাভের পরও কিছু না জানে। তুমি যমীনকে দেখতে পাও শুষ্কাবস্থায়, অতঃপর যখনই আমি তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদগত করে সকল প্রকার সুদৃশ্য উদ্ভিদ।” [আল-হাজ্জ : ৫] আল-হক্ব আল্লাহ তা‘আলা এই আয়াতে পুনরুত্থান প্রমাণকারী তিনটি বুদ্ধিবৃত্তিক দলিল উল্লেখ করেছেন। আর তা হচ্ছে:
১- আল্লাহ তা‘আলা প্রথমবার মানব জাতিকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন। আর যিনি তাকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন,যখন সে আবার মাটি হয়ে যাবে তখন পুনরায় তাকে জীবিত করতে সক্ষম।
২- নিশ্চয় যিনি বীর্য থেকে মানুষ সৃষ্টি করেছেন তিনি অবশ্যই মানুষকে তার মৃত্যুর পর পুনরায় জীবনে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম।
৩- নিশ্চয় যিনি যমীন মরে যাওয়ার পর বৃষ্টির দ্বারা তাকে জীবিত করেছেন; তিনি অবশ্যই মানুষদের মৃত্যুর পর পুনরায় তাদেরকে জীবিত করতে সক্ষম।অতএব এই আয়াতে কুরআন মু‘জিজ হওয়ার বড় দলিল রয়েছে যে, আয়াতটি কী চমৎকারভাবে—অথচ তা বড়ও নয়—একটি মহান মাসআলার ওপর তিনটি চমৎকার যুক্তিযুক্ত দলিল উপস্থাপন হয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيِّ السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ ۚ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ ۚ وَعْدًا عَلَيْنَا ۚ إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ } “সেদিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে ফেলব, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত দফতর; যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সুচনা করেছিলাম,সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব; এটা আমার কৃত প্রতিশ্রুতি, আর আমি তা পালন করবই।” [আল-আম্বিয়া : ১০৪] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { وَضَرَبَ لَنَا مَثَلًا وَنَسِيَ خَلْقَهُ ۖ قَالَ مَن يُحْيِي الْعِظَامَ وَهِيَ رَمِيمٌ (78) “আর সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে, অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়। সে বলে, 'কে হাড্ডিতে প্রাণ সঞ্চার করবে যখন তা পচে গলে যাবে?’ (৭৮) قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَأَهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ } “বলুন, 'তাতে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই,যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।” [ইয়াসীন : ৭৯] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { أَأَنتُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمِ السَّمَاءُ ۚ بَنَاهَا (27) “তোমাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিন, না আসমান সৃষ্টি? তিনিই তা নির্মাণ করেছেন। [২৭] رَفَعَ سَمْكَهَا فَسَوَّاهَا (28) তিনিই এর ছাদকে সুউচ্চ করেছেন ও সুবিন্যস্ত করেছেন। [২৮] وَأَغْطَشَ لَيْلَهَا وَأَخْرَجَ ضُحَاهَا (29) এবং তিনি এর রাতকে ঢেকে দিয়েছেন এবং প্রকাশ করেছেন তার দিনকে। (২৯) وَالْأَرْضَ بَعْدَ ذَٰلِكَ دَحَاهَا (30) আর যমীনকে এর পর বিস্তৃত করেছেন। [৩০] أَخْرَجَ مِنْهَا مَاءَهَا وَمَرْعَاهَا (31) তিনি তা থেকে বের করেছেন তার পানি ও তৃণভূমি। [৩১] وَالْجِبَالَ أَرْسَاهَا (32) } আর পর্বতমালাকে তিনি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। [৩২]” [আন-নাজিআত ২৭-৩২] আল্লাহ স্পষ্ট করলেন যে, আসমান, যমীন ও তাদের মধ্যবর্তী সবকিছু সৃষ্টি করার চেয়ে মানুষ সৃষ্টি করা বেশী কঠিন নয়। কাজেই যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টিতে সক্ষম তিনি দ্বিতীয়বার মানুষ সৃষ্টিতে অক্ষম নন।
১৩- আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া‘আতালা আদমকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার পরবর্তীতে তার সন্তানদের বর্ধনশীল করেছেন। অতএব সকল মানুষ তাদের মূলের বিবেচনায় সমান।আর তাকওয়া ছাড়া এক সম্প্রদায়ের ওপর অপর সম্প্রদায়ের এবং এক জাতির ওপর অপর জাতির কোনো শ্রেষ্টত্ব নেই।
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা আদমকে মাটি হতে সৃষ্টি করেছেন এবং তার পরবর্তীতে তার সন্তানদের বর্ধনশীল করেছেন। অতএব সকল মানুষ তাদের মূলের বিবেচনায় সমান আর তাকওয়া ছাড়া এক সম্প্রদায়ের ওপর অপর সম্প্রদায়ের এবং এক জাতির ওপর অপর জাতির কোনো শ্রেষ্টত্ব নেই। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: {يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ۚ إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِندَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ } “হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে; আর তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমারা একে অন্যের সাথে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সে ব্যাক্তিই বেশী মর্যাদাসম্পন্ন যে তোমাদের মধ্যে বেশী তাকওয়াসম্পন্ন। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ, সম্যক অবহিত।” [আল-হুজুরাত :১৩] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {وَاللَّهُ خَلَقَكُم مِّن تُرَابٍ ثُمَّ مِن نُّطْفَةٍ ثُمَّ جَعَلَكُمْ أَزْوَاجًا ۚ وَمَا تَحْمِلُ مِنْ أُنثَىٰ وَلَا تَضَعُ إِلَّا بِعِلْمِهِ ۚ وَمَا يُعَمَّرُ مِن مُّعَمَّرٍ وَلَا يُنقَصُ مِنْ عُمُرِهِ إِلَّا فِي كِتَابٍ ۚ إِنَّ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ } “আর আল্লাহ তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে তারপর শুক্রবিন্দু থেকে তারপর তোমাদেরকে নর-নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং নারী তার গর্ভে যা ধারণ করে আর যা প্রসব করে তা আল্লাহর জ্ঞাতসারেই হয়। আর কোনো বয়স্ক ব্যক্তির বয়স বাড়ানো হয় না কিংবা কমানো হয় না কিন্তু তা তো রয়েছে লাওহে মাহফূজে; নিশ্চেই তা আল্লাহর জন্য সহজ।” [ফাতির : ১১] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {هُوَ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن تُرَابٍ ثُمَّ مِن نُّطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ يُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ ثُمَّ لِتَكُونُوا شُيُوخًا ۚ وَمِنكُم مَّن يُتَوَفَّىٰ مِن قَبْلُ ۖ وَلِتَبْلُغُوا أَجَلًا مُّسَمًّى وَلَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ } “তিনিই তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে, পরে শুক্রবিন্দু থেকে, তারপর রক্তপিন্ড থেকে, তারপর তিনি তোমাদেরকে বের করেছেন শিশুরূপে, তারপর যেন তোমরা উপনীত হও তোমাদের যৌবনে, তারপর যেন তোমরা হয়ে যাও বৃদ্ধ। আর তোমাদের মধ্যে কারো মৃত্যু ঘটে এর আগেই,যাতে তোমরা নির্ধারিত সময়ে পৌঁছে যাও। আর যেন তোমরা বুঝতে পার।” [গাফির : ৬৭] আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, তিনি ঈসা মাসীহকে তাঁর সৃষ্টিগত আদেশে সৃষ্টি করেছেন,যেমন মাটি থেকে আদমকে সৃষ্টিগত আদেশে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { إِنَّ مَثَلَ عِيسَىٰ عِندَ اللَّهِ كَمَثَلِ آدَمَ ۖ خَلَقَهُ مِن تُرَابٍ ثُمَّ قَالَ لَهُ كُن فَيَكُونُ } “নিশ্চয় আল্লাহর নিকট ঈসার দৃষ্টান্ত আদমের মত, তিনি তাকে মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাকে বললেন, ‘হও’, ফলে সে হয়ে গেল।” [আলে ইমরান :৫৯] পূর্বে (২) নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছি যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট করেছেন মানুষেরা সবাই সমান।তাকওয়া ছাড়া একজনের ওপর অপরজনের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই।
১৪- সকল নবজাতক ইসলাম প্রকৃতির ওপর জন্ম গ্রহণ করে।
সকল নবজাতক ইসলামী প্রকৃতির ওপর জন্ম গ্রহণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا ۚ فِطْرَتَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَا ۚ لَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ } “অতএব আপনি একনিষ্ঠ হয়ে দীনের জন্য নিজকে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহর প্রকৃতি, যে প্রকৃতির উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল সঠিক দীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [আর-রূম : ৩০] আল হানীফিয়্যাহ হলো,একনিষ্ঠ দীন ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালামের দীন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { ثُمَّ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ أَنِ اتَّبِعْ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۖ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ} “তারপর আমি আপনার প্রতি ওহী করলাম যে, ‘আপনি একনিষ্ঠ ভাবে ইবরাহীমের দীনের অনুসরণ করুন;তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” [আন-নাহল : ১২৩] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «مَا مِنْ مَوْلُودٍ إِلَّا يُولَدُ عَلَى الفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ كَمَا تُنْتَجُ البَهِيمَةُ بَهِيمَةً جَمْعَاءَ هَلْ تُحِسُّونَ فِيهَا مِنْ جَدْعَاءَ» “প্রত্যেক সন্তানই ফিতরতের উপর ভূমিষ্ঠ হয়ে থাকে। তারপর তার মাতাপিতা তাকে ইয়াহুদী বানিয়ে দেয় অথবা নাসারা বানিয়ে দেয় কিংবা অগ্নি উপাসক বানিয়ে দেয়। যেভাবে পশু পূর্ণাঙ্গ পশুই প্রসব করে, তাতে তোমরা কোন কান কর্তিত দেখতে পাও কি?” অতঃপর আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন: {فِطْرَةَ اللَّهِ الَّتِي فَطَرَ النَّاسَ عَلَيْهَالَا تَبْدِيلَ لِخَلْقِ اللَّهِ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ وَلَكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ } “আল্লাহর প্রকৃতি(ইসলাম), যে প্রকৃতির উপর তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোনো পরিবর্তন নেই। এটাই সরল সঠিক দীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [আর-রূম : ৩০] [সহীহুল বুখারী ৪৭৭৫] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «أَلَا إِنَّ رَبِّي أَمَرَنِي أَنْ أُعَلِّمَكُمْ مَا جَهِلْتُمْ مِمَّا عَلَّمَنِي يَوْمِي هَذَا كُلُّ مَالٍ نَحَلْتُهُ عَبْدًا حَلَالٌ وَإِنِّي خَلَقْتُ عِبَادِي حُنَفَاءَ كُلَّهُمْ وَإِنَّهُمْ أَتَتْهُمُ الشَّيَاطِينُ فَاجْتَالَتْهُمْ عَنْ دِينِهِمْ وَحَرَّمَتْ عَلَيْهِمْ مَا أَحْلَلْتُ لَهُمْ وَأَمَرَتْهُمْ أَنْ يُشْرِكُوا بِي مَا لَمْ أُنْزِلْ بِهِ سُلْطَانًا » “মনে রাখো, তোমরা যা জান না তা শিক্ষা দিতে আমার রব আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন। আজকের এই দিনে তিনি আমাকে শিক্ষা দিয়েছেন যে, যেসব সম্পদ আমি কোনো বান্দাকে দিয়েছি তা হালাল। আমি আমার সব বান্দাকে নিরেট মুসলিম হিসেবে সৃষ্টি করেছি। আর শয়তান তাদের কাছে এসে তাদেরকে তাদের দীন থেকে বিচ্যুত করেছে এবং আমি তাদের জন্য যা হালাল করেছি তা সে তাদের ওপর হারাম করেছে এবং সে তাদেরকে নির্দেশ দিয়েছে যেন তারা আমার সাথে এমন কিছুকে শরীক করে,যার ব্যাপারে আমি কোনো দলীল নাযিল করিনি।” [হাদীসটি মুসলিম বর্ণনা করেছেন, হাদীস নং ২৮৬৫]
১৫- কোনো মানুষ অপরাধী হয়ে কিংবা অপরের অপরাধের উত্তরাধিকার হয়ে জন্ম গ্রহণ করে না:
কোনো মানুষ অপরাধী হয়ে কিংবা অপরের অপরাধের উত্তরাধিকার হয়ে জন্ম গ্রহণ করে না। আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সংবাদ দিয়েছেন যে, আদম আলাইহিস সালাম যখন আল্লাহর হুকুম অমান্য করে, তিনি ও তাঁর স্ত্রী হাওয়া ‘আলাইহিমুস সালাম গাছ থেকে ভক্ষণ করলেন।তারপর তিনি লজ্জিত হলেন ও তাওবাহ করলেন এবং আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইলেন। ফলে আল্লাহ তাকে কিছু পবিত্র বাক্য বলার ইলহাম (প্রত্যাদেশ) করলেন।তিনি তা বললেন, ফলে আল্লাহ তাদের তাওবা কবুল করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَقُلْنَا يَا آدَمُ اسْكُنْ أَنتَ وَزَوْجُكَ الْجَنَّةَ وَكُلَا مِنْهَا رَغَدًا حَيْثُ شِئْتُمَا وَلَا تَقْرَبَا هَٰذِهِ الشَّجَرَةَ فَتَكُونَا مِنَ الظَّالِمِينَ (35) “আর আমি বললাম, ‘হে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস কর এবং তা থেকে আহার কর স্বাচ্ছন্দ্যে, তোমাদের ইচ্ছানুযায়ী এবং এই গাছটির নিকটবর্তী হয়ো না, তাহলে তোমরা যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (৩৫) فَأَزَلَّهُمَا الشَّيْطَانُ عَنْهَا فَأَخْرَجَهُمَا مِمَّا كَانَا فِيهِ ۖ وَقُلْنَا اهْبِطُوا بَعْضُكُمْ لِبَعْضٍ عَدُوٌّ ۖ وَلَكُمْ فِي الْأَرْضِ مُسْتَقَرٌّ وَمَتَاعٌ إِلَىٰ حِينٍ (36) অবশেষে শয়তান দুজনকেই জান্নাত থেকে পদস্খলিত করল এবং তারা যাতে ছিল তা থেকে তাদেরকে বের করে দিল, আর আমি বললাম, ‘তোমরা নেমে যাও। তোমরা একে অপরের শত্রু। আর তোমাদের জন্য যমীনে রয়েছে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আবাস ও ভোগ-উপকরণ’। (৩৬) فَتَلَقَّىٰ آدَمُ مِن رَّبِّهِ كَلِمَاتٍ فَتَابَ عَلَيْهِ ۚ إِنَّهُ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ (37) “অতঃপর আদম তার রবের পক্ষ থেকে কিছু বাণী পেল, ফলে আল্লাহ তার তাওবা কবূল করে তাঁকে ক্ষমা করলেন। নিশ্চয় তিনি তাওবা কবূলকারী, অতি দয়ালু। (৩৭) قُلْنَا اهْبِطُوا مِنْهَا جَمِيعًا ۖ فَإِمَّا يَأْتِيَنَّكُم مِّنِّي هُدًى فَمَن تَبِعَ هُدَايَ فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ (38)} আমি বললাম, ‘তোমরা সকলে এখান থেকে নেমে যাও। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট কোনো হিদায়াত আসবে তখন যারা আমার হিদায়াত অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না।”(38) [আল-বাকারাহ : ৩৫-৩৮] যেহেতু আল্লাহ তা‘আলা আদম আলাইহিস সালামের তাওবা কবুল করেছেন, তাই তিনি পাপবহনকারী হিসেবে গণ্য হবেন না। ফলে তার সন্তানগণও পাপের ওয়ারিস হবে না, যা তাওবার ফলে দূরীভূত হয়ে গেছে। মূলনীতি হচ্ছে কোনো ব্যক্তি অপরের বোঝা বহন করবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَلَا تَكْسِبُ كُلُّ نَفْسٍ إِلَّا عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۚ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُم مَّرْجِعُكُمْ فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ } “আর প্রতিটি ব্যক্তি যা অর্জন করে,তা শুধু তারই উপর বর্তায়,আর কোনো ভারবহনকারী অন্যের ভার বহন করবে না। অতঃপর তোমাদের রবের নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তনস্থল। সুতরাং তিনি তোমাদেরকে সেই সংবাদ দেবেন, যাতে তোমরা মতবিরোধ করতে।” [আল-আনআম ; ১৬৪]
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {مَّنِ اهْتَدَىٰ فَإِنَّمَا يَهْتَدِي لِنَفْسِهِ ۖ وَمَن ضَلَّ فَإِنَّمَا يَضِلُّ عَلَيْهَا ۚ وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۗ وَمَا كُنَّا مُعَذِّبِينَ حَتَّىٰ نَبْعَثَ رَسُولًا } “যে সৎপথ অবলম্বন করবে সে তো নিজেরই মঙ্গলের জন্য সৎপথ অবলম্বন করে এবং যে পথভ্রষ্ট হবে সে তো পথভ্রষ্ট হবে নিজেরই ধ্বংসের জন্য। আর কোনো বহনকারী অন্য কারো ভার বহন করবে না। আর আমি রাসুল না পাঠানো পর্যন্ত শাস্তি প্রদানকারী নই।” [আল-ইসরা:১৫] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ ۚ وَإِن تَدْعُ مُثْقَلَةٌ إِلَىٰ حِمْلِهَا لَا يُحْمَلْ مِنْهُ شَيْءٌ وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَىٰ ۗ إِنَّمَا تُنذِرُ الَّذِينَ يَخْشَوْنَ رَبَّهُم بِالْغَيْبِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ ۚ وَمَن تَزَكَّىٰ فَإِنَّمَا يَتَزَكَّىٰ لِنَفْسِهِ ۚ وَإِلَى اللَّهِ الْمَصِيرُ } “আর কোনো বোঝা বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না এবং কোনো ভারাক্রান্ত ব্যক্তি যদি তার বোঝা বহনের জন্য কাউকে ডাকে তবে তার বোঝার কোনো অংশই বহন করা হবে না যদিও সে আত্মীয় হয়; তুমি কেবল তাদেরকেই সতর্ক করবে,যারা তাদের রবকে না দেখেও ভয় করে এবং সালাত কায়েম করে; আর যে ব্যক্তি পরিশুদ্ধি অর্জন করে সে নিজের জন্যই পরিশুদ্ধি অর্জন করে। আর আল্লাহর কাছেই প্রত্যাবর্তন।” [ফাতির : ১৮]
১৬- মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা:
আর মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ } “আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্যে যে,তারা কেবল আমারই ইবাদাত প্রতিষ্ঠা করবে।” [আয-যারিয়াত : ৫৬]
১৭- ইসলাম নারী ও পুরুষ নির্বিশেষে সকল মানুষকে সম্মানিত করেছে, আর তার পূর্ণ অধিকার ও প্রাপ্যের জিম্মাদারী গ্রহণ করেছে এবং তাকে তার সকল ইচ্ছা, আমল ও কর্ম সম্পর্কে দায়িত্বশীল বানিয়েছে। আর যে আমল তার নিজের অথবা অপরের ক্ষতির কারণ হবে তার দায়ভার তার ওপর চাপিয়েছে।
ইসলাম -নর-নারী সব মানুষকে সম্মানিত করেছে। আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন যেন তারা (একে অপরের) প্রতিনিধি হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً } “আর স্মরণ করুন, যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বললেন ‘নিশ্চয় আমি যমীনে খলীফা সৃষ্টি করছি।” [আল-বাকারা :৩০]
এই সম্মান প্রদান সকল আদম সন্তানকে অন্তর্ভুক্ত করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ وَحَمَلْنَاهُمْ فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ وَرَزَقْنَاهُم مِّنَ الطَّيِّبَاتِ وَفَضَّلْنَاهُمْ عَلَىٰ كَثِيرٍ مِّمَّنْ خَلَقْنَا تَفْضِيلًا } “আর অবশ্যই আমি আদম-সন্তানকে মর্যাদা দান করেছি; স্থলে ও সাগরে তাদের চলাচলের বাহন দিয়েছি এবং তাদেরকে উত্তম রিযক দান করেছি আর আমরা যাদেরকে সৃষ্টি করেছি তাদের অনেকের উপর তাদের শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছি।” [আল-ইসরা :৭০] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {لَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ فِي أَحْسَنِ تَقْوِيمٍ } “অবশ্যই আমি সৃষ্টি করেছি মানুষকে সুন্দরতম গঠনে।” [আত-তীন :৪]
আল্লাহ মানুষকে নিষেধ করেছেন যেন সে তার নফসকে আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য অথবা অনুসরণীয় কোনো ব্যক্তি অথবা অনুকরণীয় সত্ত্বার লাঞ্ছিত আনুগত্যকারী না বানায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَمِنَ النَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ اللَّهِ أَندَادًا يُحِبُّونَهُمْ كَحُبِّ اللَّهِ ۖ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِّلَّهِ ۗ وَلَوْ يَرَى الَّذِينَ ظَلَمُوا إِذْ يَرَوْنَ الْعَذَابَ أَنَّ الْقُوَّةَ لِلَّهِ جَمِيعًا وَأَنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعَذَابِ. إِذۡ تَبَرَّأَ ٱلَّذِينَ ٱتُّبِعُواْ مِنَ ٱلَّذِينَ ٱتَّبَعُواْ وَرَأَوُاْ ٱلۡعَذَابَ وَتَقَطَّعَتۡ بِهِمُ ٱلۡأَسۡبَابُ} “আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তারা তাদেরকে ভালবাসে আল্লাহর ভালবাসার মতই; পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহ্কে সর্বাধিক ভালবাসে। আর যারা যুলুম করেছে যদি তারা আযাব দেখতে পেত,(তবে তারা নিশ্চিত হত যে,) সমস্ত শক্তি আল্লাহরই। আর নিশ্চয় আল্লাহ্ শাস্তি দানে কঠোর। যখন, অনুসৃত , তারা অনুসারীদের থেকে আলাদা হয়ে যাবে এবং তারা আযাব দেখতে পাবে। আর তাদের মুক্তির সব উপায়-উপকরণ ছিন্ন হয়ে যাবে।” [আল-বাকারা : ১৬৫-১৬৬] আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামতের দিন অন্যায়ভাবে অনুসারী ও অনুসরণীয় ব্যক্তির অবস্থা বর্ণনা করে বলেন: { قَالَ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لِلَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا أَنَحْنُ صَدَدْنَاكُمْ عَنِ الْهُدَىٰ بَعْدَ إِذْ جَاءَكُم ۖ بَلْ كُنتُم مُّجْرِمِينَ (32) “যারা অহঙ্কারী ছিল তারা, তাদেরকে বলবে, যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল, তোমাদের কাছে হিদায়াত আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে তা থেকে বাধা দিয়েছিলাম? বরং তোমরাই ছিলে অপরাধী। (৩২) وَقَالَ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا بَلْ مَكْرُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِذْ تَأْمُرُونَنَا أَن نَّكْفُرَ بِاللَّهِ وَنَجْعَلَ لَهُ أَندَادًا ۚ وَأَسَرُّوا النَّدَامَةَ لَمَّا رَأَوُا الْعَذَابَ وَجَعَلْنَا الْأَغْلَالَ فِي أَعْنَاقِ الَّذِينَ كَفَرُوا ۚ هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (33) } আর যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছিল তারা, যারা অহংকার করেছিল তাদেরকে বলবে, 'প্রকৃতপক্ষে তোমরাই তো দিনরাত চক্রান্তে লিপ্ত ছিলে, যখন তোমরা আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছিলে যেন আমরা আল্লাহর সাথে কুফৱী করি এবং তাঁর জন্য সমকক্ষ (শির্ক) স্থাপন করি।' আর যখন তারা শাস্তি দেখতে পাবে, তখন তারা অনুতাপ গোপন রাখবে এবং যারা কুফরী করেছে আমি তাদের গলায় শৃঙ্খল পরাব। তারা যা করত তাদেরকে কেবল তারই প্রতিফল দেয়া হবে।” (৩৩) [সাবা : ৩২-৩৩]
আল্লাহ তাআলার পরিপূর্ণ ইনসাফের অংশ হচ্ছে, কিয়ামতের দিন তিনি (পাপের দিকে) আহ্বানকারী ও গোমরাহকারী ইমামদের ওপর তাদের নিজেদের পাপ ও যাদেরকে তারা বিনা ইলমে পথ ভ্রষ্ট করেছে তাদের পাপ বহন করাবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {لِيَحْمِلُوا أَوْزَارَهُمْ كَامِلَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۙ وَمِنْ أَوْزَارِ الَّذِينَ يُضِلُّونَهُم بِغَيْرِ عِلْمٍ ۗ أَلَا سَاءَ مَا يَزِرُونَ} “ফলে কিয়ামতের দিন তারা বহন করবে তাদের পাপের বোঝা পূর্ণ মাত্রায় এবং তাদেরও পাপের বোঝা,যাদেরকে তারা অজ্ঞতাবশত বিভ্রান্ত করেছে। দেখুন, তারা যা বহন করবে তা কত নিকৃষ্ট !” [আন-নাহল : ২৫]
ইসলাম দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের সকল হকের জিম্মাদার; আর সবচেয়ে বড় হক যার জিম্মাদারি ইসলাম গ্রহণ করেছে ও যা মানুষদের জন্যে বর্ণনা করেছে তা হচ্ছে মানুষের ওপর আল্লাহর হক ও আল্লাহর ওপর মানুষের হক। মু‘আয ইবনু জাবাল রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: أَنَا رَدِيفُ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «يَا مُعَاذُ» قُلْتُ: لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ ثُمَّ قَالَ مِثْلَهُ ثَلاَثًا: «هَلْ تَدْرِي مَا حَقُّ اللَّهِ عَلَى العِبَادِ» قُلْتُ: لاَ قَالَ: «حَقُّ اللَّهِ عَلَى العِبَادِ أَنْ يَعْبُدُوهُ وَلاَ يُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا» ثُمَّ سَارَ سَاعَةً فَقَالَ: «يَا مُعَاذُ» قُلْتُ: لَبَّيْكَ وَسَعْدَيْكَ قَالَ: "هَلْ تَدْرِي مَا حَقُّ العِبَادِ عَلَى اللَّهِ إِذَا فَعَلُوا ذَلِكَ: أَنْ لاَ يُعَذِّبَهُمْ » আমি একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গী ছিলাম। তিনি আমাকে ডাকলেন, “হে মুআয! আমি বললাম, লাব্বায়কা ওয়া সাদায়কা। তারপর তিনবার অনুরূপ ডাকলেন। “তুমি কি জানো যে, বান্দাদের উপর আল্লাহর হক কি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, বান্দাদের ওপর আল্লাহর হক হলো তারা একমাত্র তাঁর ইবাদত করবে,তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরীক করবে না। অতঃপর কিছুক্ষণ চললেন তারপর বললেন, হে মু‘আয! আমি জবাবে বাললাম, লাব্বায়কা ওয়া সাদায়কা। তিনি বললেন, তুমি কি জানো যে, বান্দারা যখন তা আঞ্জাম দিবে তখন আল্লাহর উপর বান্দাদের হক কি হবে? তা হল এই যে, তিনি তাদের আযাব দিবেন না।” [সহীহুল বুখারী: ৬৮৪০]
ইসলাম মানুষের জন্যে সত্য দীন, তার সন্তানাদি, তার সম্পদ ও তার সম্মানের জিম্মাদারী নিয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «فَإِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ دِمَاءَكُمْ وَأَمْوَالَكُمْ وَأَعْرَاضَكُمْ كَحُرْمَةِ يَوْمِكُمْ هَذَا فِي شَهْرِكُمْ هَذَا فِي بَلَدِكُمْ هَذَا» “নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের রক্ত, তোমাদের সম্পদ, তোমাদের ইজ্জত-আব্রূ তোমাদের এই মাসে ও এই শহরে এই দিনের সম্মানের ন্যায় হারাম (সম্মানিত) করে দিয়েছেন।” [সহীহুল বুখারী ৬৫০১] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মহান এই অঙ্গিকারটি বিদায় হজে ঘোষণা করেছেন, যেখানে এক লাখের বেশী সাহাবী উপস্থিত ছিলেন। একই হজের কুরবানীর দিন এমর্মকেই কয়েকবার উচ্চারণ করেছেন ও তার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
ইসলাম মানুষকে তার সকল ইচ্ছা, কর্ম ও কর্তৃত্বের জিম্মাদার করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَكُلَّ إِنسَانٍ أَلْزَمْنَاهُ طَائِرَهُ فِي عُنُقِهِ ۖ وَنُخْرِجُ لَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ كِتَابًا يَلْقَاهُ مَنشُورًا اقْرَأْ كِتَابَكَ كَفَى بِنَفْسِكَ الْيَوْمَ عَلَيْكَ حَسِيبًا } “আর প্রত্যেক মানুষের অর্জিত আমলকে আমি তার সাথে দৃঢ় ভাবে লাগিয়ে দিয়েছি এবং কিয়ামতের দিন আমি তার জন্য বের করব এক কিতাব,যা সে পাবে উন্মুক্ত। পাঠ কর তোমার কিতাব। আজ তুমি নিজেই তোমার হিসাব-নিকাশকারী হিসেবে যথেষ্ট হবে।” [আল-ইসরা : ১৩] অর্থাৎ সে ভালো অথবা মন্দ যা আমল করেছে আল্লাহ সেটিকে তার সঙ্গে লেপটে দিবেন, যা তাকে ছাড়া অপরের দিকে যাবে না। অতএব অপরের কর্মের কারণে তাকে এবং তার কর্মের কারণে অপরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الْإِنسَانُ إِنَّكَ كَادِحٌ إِلَىٰ رَبِّكَ كَدْحًا فَمُلَاقِيهِ} “হে মানুষ! তুমি তোমার রবের কাছে পৌঁছা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করবে, অতঃপর তুমি বদলা নেয়ার উদ্দেশ্যে তাঁর সাক্ষাত লাভ করবে।” [আল-ইনশিকাক: ৬] আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: { مَّنۡ عَمِلَ صَٰلِحٗا فَلِنَفۡسِهِۦۖ وَمَنۡ أَسَآءَ فَعَلَيۡهَاۗ وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّـٰمٖ لِّلۡعَبِيدِ} “যে সৎকাজ করে সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। আর আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুমকারী নন।” [ফুসসিলাত : ৪৬]
মানুষের যে কোনো আমল খোদ তাকে অথবা অপরকে ক্ষতিগ্রস্তত করবে ইসলাম তার দয়ভার তার ওপর চাপায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَمَن يَكْسِبْ إِثْمًا فَإِنَّمَا يَكْسِبُهُ عَلَىٰ نَفْسِهِ ۚ وَكَانَ اللَّهُ عَلِيمًا حَكِيمًا} “আর যে পাপ কামাই করবে, বস্তুত, সেতো নিজের বিরুদ্ধেই তা কামাই করবে। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [আন-নিসা : ১১১] আল্লাহ তা‘য়ালা আরো বলেন: { مِنْ أَجْلِ ذَٰلِكَ كَتَبْنَا عَلَىٰ بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَن قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا } “এ কারণেই বনী ইসরাঈলের উপর এ বিধান দিলাম যে, যে ব্যক্তি কোন ব্যক্তিকে হত্যা করে অন্য প্রাণের বিনিময় ব্যতীত বা যমীনে ধ্বংসাত্মক কাজ করার কারণ ছাড়া,তবে সে যেন সকল মানুষকেই হত্যা করল, আর কেউ কারো প্রাণ রক্ষা করলে সে যেন সকল মানুষের প্রাণ রক্ষা করল।” [আল-মায়েদাহ : ৩২] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «لَا تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الْأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا لِأَنَّهُ كَانَ أَوَّلَ مَنْ سَنَّ الْقَتْلَ» “যে কোনো প্রাণকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হবে, তার পাপের একটা অংশ আদমের প্রথম সন্তান (কাবীল) এর উপর বর্তাবে। কেননা, সে হত্যার রীতি চালুকারী প্রথম ব্যক্তি ছিল।” সহীহ মুসলিম (৫১৫০)
১৮- ইসলাম আমল, জবাবদিহিতা, বিনিময় ও সাওয়াবের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়কে সমান করেছে।
ইসলাম আমল, জবাবদিহিতা, বিনিময় ও সাওয়াবের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়কে সমান করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَمَن يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ مِن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ نَقِيرًا} “আর পুরুষ কিংবা নারীর মধ্য থেকে যে মু’মিন অবস্থায় নেককাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের প্রতি সামান্য পরিমাণও (খেজুরবীচির কণা সমপরিমাণও) যুলুম করা হবে না।” [আন-নিসা : ১২৪] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً ۖ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُم بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ } “মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, অবশ্যই আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব। আর অবশ্যই আমি তাদেরকে তারা যা করত তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেব।” [আন-নাহাল ৯৭] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { مَنْ عَمِلَ سَيِّئَةً فَلَا يُجْزَىٰ إِلَّا مِثْلَهَا ۖ وَمَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِّن ذَكَرٍ أَوْ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَٰئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ يُرْزَقُونَ فِيهَا بِغَيْرِ حِسَابٍ } “কেউ মন্দ কাজ করলে সে শুধু তার কাজের অনুরূপ শাস্তিই প্রাপ্ত হবে। আর যে পুরুষ কিংবা নারী মুমিন হয়ে সৎকাজ করবে তবে তারা প্ৰবেশ করবে জান্নাতে, সেখানে তাদেরকে দেয়া হবে অগণিত রিযিক।” [গাফির: ৪০] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { إِنَّ الْمُسْلِمِينَ وَالْمُسْلِمَاتِ وَالْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ وَالْقَانِتِينَ وَالْقَانِتَاتِ وَالصَّادِقِينَ وَالصَّادِقَاتِ وَالصَّابِرِينَ وَالصَّابِرَاتِ وَالْخَاشِعِينَ وَالْخَاشِعَاتِ وَالْمُتَصَدِّقِينَ وَالْمُتَصَدِّقَاتِ وَالصَّائِمِينَ وَالصَّائِمَاتِ وَالْحَافِظِينَ فُرُوجَهُمْ وَالْحَافِظَاتِ وَالذَّاكِرِينَ اللَّهَ كَثِيرًا وَالذَّاكِرَاتِ أَعَدَّ اللَّهُ لَهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا} “নিশ্চয় মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, অনুগত পুরুষ ও অনুগত নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, বিনীত পুরুষ ও বিনীত নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, সওম পালনকারী পুরুষ ও সওম পালনকারী নারী, যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী পুরুষ ও যৌনাঙ্গ হিফাজতকারী নারী, আল্লাহ্কে অধিক স্মরণকারী পুরুষ ও আল্লাহ্কে অধিক স্মরণকারী নারী, তাদের জন্য আল্লাহ রেখেছেন ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান।” [আল-আহযাব : ৩৫]
১৯- ইসলাম নারীদের সম্মানিত করেছে এবং নারীদেরকে পুরুষদের ভ্রাতৃপ্রতিম গন্য করে এবং পুরুষের ওপর নারীর ভরণ-পোষণ আবশ্যক করে দিয়েছে,যদি সে তার সক্ষমতা রাখে। অতএব মেয়ের ভরণ-পোষণ তার বাবার ওপর; মায়ের ভরণ-পোষণ তার সন্তানের ওপর ওয়াজিব, যদি তারা সাবালগ ও সক্ষম হয় এবং স্ত্রীর ভরণ-পোষণ তার স্বামীর ওপর।
ইসলাম নারীদেরকে পুরুষদের অংশীদার হিসেবে গণ্য করেছে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «إن النساء شقائق الرجال» “নিশ্চয় স্ত্রীলোকেরা পুরুষদেরই অংশ।” তিরমিযী : ১১৩।
ইসলামের নারীদেরকে সম্মানিত করার একটি নমুনা হচ্ছে ইসলাম সন্তানের ওপর তার মায়ের ভরণ-পোষণ ওয়াজিব করেছে, যদি সে সক্ষম হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «يَدُ الْمُعْطِي الْعُلْيَا أُمَّكَ وَأَبَاكَ وَأُخْتَكَ وَأَخَاكَ ثُمَّ أَدْنَاكَ أَدْنَاكَ» “দানশীলের হাত উঁচু আর তুমি যার ভরণ-পোষণ গ্রহণ করেছো তার থেকে শুরু করঃ তোমার মাতা, তোমার পিতা, তোমার বোন, তোমার ভাই অতঃপর তোমার ঘনিষ্টজন ও ঘনিষ্টজন।” ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেছেন। পিতা-মাতার মর্যাদার বর্ণনা ২৯ নং অনুচ্ছেদে শীঘ্রই আসবে। ইনশাআল্লাহা।
ইসলাম কর্তৃক নারীদের সম্মানিত করার অন্তর্ভুক্ত হলো,ইসলাম স্বামী সামর্থবান হলে তার উপর স্ত্রীর ভরণপোষণ বাধ্য করেছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: { لِيُنفِقْ ذُو سَعَةٍ مِّن سَعَتِهِ ۖ وَمَن قُدِرَ عَلَيْهِ رِزْقُهُ فَلْيُنفِقْ مِمَّا آتَاهُ اللَّهُ ۚ لَا يُكَلِّفُ اللَّهُ نَفْسًا إِلَّا مَا آتَاهَا ۚ سَيَجْعَلُ اللَّهُ بَعْدَ عُسْرٍ يُسْرًا} “বিত্তবান নিজ সামৰ্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে এবং যার জীবনোপকরণ সীমিত, সে আল্লাহ যা দান করেছেন তা থেকে ব্যয় করবে। আল্লাহ যাকে যে সামর্থ্য দিয়েছেন তার চেয়ে গুরুতর বোঝা তিনি তার উপর চাপান না। অবশ্যই আল্লাহ কষ্টের পর দেবেন স্বস্তি।” [আত-তালাক : ৭] জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, স্বামীর ওপর স্ত্রীর হক কী? তিনি বললেন: «تُطْعِمُهَا إِذَا طَعِمْتَ وَتَكْسُوهَا إِذَا اكْتَسَيْتَ وَلَا تَضْرِبِ الْوَجْهَ وَلَا تُقَبِّحْ» “তুমি যখন খাবে তোমার স্ত্রীকেও খাওয়াবে, তুমি যখন পরিধান করবে তখন তাকেও পরিধান করাবে আর চেহারায় মারবে না এবং তাকে খারাপ বলবে না।” ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বামীদের ওপর নারীদের কতক হক বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: «وَلَهُنَّ عَلَيْكُمْ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ» “আর তোমাদের ওপর নারীদের জন্যে রয়েছে সুন্দরভাবে রিযক ও পোশাকের দায়িত্ব।” সহীহ মুসলিম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন: «كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ» “ব্যক্তির পাপ হিসেবে এটিই যথেষ্ট যাকে সে খাওয়ায় সে তাকে নষ্ট করে” ইমাম আহমাদ এটি বর্ণনা করেছেন। খাত্তাবী রহ. বলেন: (রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী : "من يقوت" (যে খায়) দ্বারা উদ্দেশ্য এমন ব্যক্তি যার খাবারের দায়িত্ব তার ওপর আবশ্যক। অর্থাৎ যেন তিনি সদকাকারীকে বলেছেন, তোমার পরিবারের খাবারের অতিরিক্ত না হলে সাওয়াবের আশায় সদকা করবে না। কেননা যখন তাদেরকে অবহেলা করবে তখন এটিই পাপ হিসেবে পরিগণিত হবে।)
ইসলামে নারীদেরকে সম্মানিত করার অন্তর্ভুক্ত হলো,ইসলাম মেয়ের ভরণপোষণ তার পিতার ওপর ওয়াজিব করেছে।আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ ۖ لِمَنْ أَرَادَ أَن يُتِمَّ الرَّضَاعَةَ ۚ وَعَلَى الْمَوْلُودِ لَهُ رِزْقُهُنَّ وَكِسْوَتُهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ} “আর জননীগণ তাদের সস্তানদেরকে পূর্ণ দু’বছর স্তন্য পান করাবে, এটা তার জন্য, যে স্তন্যপান কাল পূর্ণ করতে চায়। পিতার কর্তব্য যথাবিধি তাদের (মাতাদের) ভরণ-পোষণ করা।” [আল-বাকারাহ : ২৩৩] অতএব, আল্লাহ বর্ণনা করেছেন যে, জন্মদাতা পিতার ওপর যথাযথভাবে তার সন্তানের খাবার ও পোষাকের দায়িত্ব রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলার আরও বাণী: { فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ } “অতঃপর যদি তারা তোমাদের সন্তানদেরকে স্তন্য দান করে তবে তাদেরকে পারিশ্রমিক দেবে।” [আত-তালাক : ৬] অতএব আল্লাহ সন্তানের দুগ্ধপানের পারিশ্রমিক পিতার ওপর ওয়াজিব করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, সন্তানের খরচ তার পিতার ওপর। আর সন্তান ছেলে-মেয়ে উভয়কে শামিল করে। আর নিম্নের হাদীস প্রমাণ করে যে, স্ত্রী ও তার সন্তানের ভরণ-পোষণ পিতার ওপর ওয়াজিব। আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, হিন্দ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, আবু সুফিয়ান খুব কৃপণ লোক, আমি তার সম্পদ থেকে নিতে বাধ্য হই। তিনি বললেন: «خُذِي مَا يَكْفِيكِ وَوَلَدَكِ بِالْمَعْرُوفِ» “তোমার ও তোমার সন্তানের জন্যে যতটুকু প্রয়োজন তা নিয়মমাফিক নাও।” এটি বুখারী বর্ণনা করেছেন। নবী কারীম মেয়ে ও বোনদের ওপর খরচ করার ফজিলত বর্ণনা করেছেন। যেমন রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «مَنْ عَالَ ابْنَتَيْنِ أَوْ ثَلَاثَ بَنَاتٍ أَوْ أُخْتَيْنِ أَوْ ثَلَاثَ أَخَوَاتٍ حَتَّى يَبِنَّ أَوْ يَمُوتَ عَنْهُنَّ كُنْتُ أَنَا وَهُوَ كَهَاتَيْنِ. وَأَشَارَ بِأُصْبُعَيْهِ السَّبَّابَةِ وَالْوُسْطَى» “যে ব্যক্তি দু’জন অথবা তিনজন মেয়ের অথবা দু’জন অথবা তিনজন বোনের ভরণ-পোষণ গ্রহণ করল তাদের বিবাহ অথবা মৃত্যুর ফলে পৃথক হওয়ার আগ পর্যন্ত অথবা এমন অবস্থায় সে তাদের থেকে মারা গেল, তাহলে আমি ও সে এরূপ হবো, তখন তিনি তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল দ্বারা ইশারা করলেন।” সিলসিলাতুস সাহীহা : ২৯৬।
২০- মৃত্যু মানে স্থায়ীভাবে নিঃশেষ হওয়া নয়; বরং তা হলো কর্মের জগত থেকে কর্ম-ফলের জগতে প্রত্যাপর্ণ করা মাত্র। মৃত্যু শরীর ও রূহ উভয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। রূহের মৃত্যু মানে শরীর থেকে তার বিচ্ছিন্ন হওয়া, অতঃপর কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান শেষে তার কাছে ফিরে আসবে। মৃত্যুর পর রূহ অন্য কোনো শরীরে স্থানান্তরিত হয় না এবং অন্য কোনো শরীরের রূপও গ্রহণ করে না।
মৃত্যু মানে স্থায়ীভাবে নিঃশেষ হওয়া নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {قُلْ يَتَوَفَّاكُم مَّلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَىٰ رَبِّكُمْ تُرْجَعُونَ} “বলুন, তোমাদেরকে মৃত্যু দেবে মৃত্যুর ফেরেশতা যাকে তোমাদের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে। তারপর তোমাদের রবের নিকট তোমাদেরকে ফিরিয়ে আনা হবে।” [আস-সাজদাহ : ১১] মৃত্যু শরীর ও রূহ উভয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। রূহের মৃত্যু মানে শরীর থেকে তার বিচ্ছিন্ন হওয়া অতঃপর কিয়ামতের দিন পুনরুত্থান শেষে তার কাছে ফিরে আসবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { اللَّهُ يَتَوَفَّى الْأَنفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا ۖ فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَىٰ عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الْأُخْرَىٰ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ۚ إِنَّ فِي ذَٰلِكَ لَآيَاتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ} “আল্লাহ্ই জীবসমূহের প্রাণ হরণ করেন তাদের মৃত্যুর সময় এবং যাদের মৃত্যু আসেনি তাদের প্রাণও নিদ্রার সময়। তারপর তিনি যার জন্য মৃত্যুর সিদ্ধান্ত করেন তার প্রাণ তিনি রেখে দেন এবং অন্যগুলো ফিরিয়ে দেন, এক নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে এমন সম্প্রদায়ের জন্য, যারা চিন্তা করে।” [আয-যুমার : ৪২] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «إِنَّ الرُّوحَ إِذَا قُبِضَ تَبِعَهُ الْبَصَرُ» “নিশ্চয়ই রূহকে যখন কবজ করা হয় তখন দৃষ্টি তার পিছু নেয়।” [মুসলিম: ৯২০] আর রূহ মৃত্যুর পর কর্মের জগত থেকে কর্ম-ফলের জগতে প্রত্যাপর্ণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { إِلَيْهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا ۖ وَعْدَ اللَّهِ حَقًّا ۚ إِنَّهُ يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ لِيَجْزِيَ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ بِالْقِسْطِ ۚ وَالَّذِينَ كَفَرُوا لَهُمْ شَرَابٌ مِّنْ حَمِيمٍ وَعَذَابٌ أَلِيمٌ بِمَا كَانُوا يَكْفُرُونَ } “তাঁরই কছে তোমাদের সকলের ফিরে যাওয়া; আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। সৃষ্টিকে তিনিই প্রথম অস্তিত্বে আনেন, তারপর সেটার পুনরাবৃত্তি ঘটাবেন যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদেরকে ইনসাফপূর্ণ প্রতিফল প্রদানের জন্য। আর যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য রয়েছে অত্যন্ত গরম পানীয় ও অতীব কষ্টদায়ক শাস্তি; কারণ তারা কুফরী করত।” [ইউনুস : ৪]
রূহ মৃত্যুর পর অন্য কোনো শরীরে স্থানান্তরিত হয় না এবং কোনো রূপও গ্রহণ করে না। কেননা স্থানান্তরিত হওয়ার দাবি বিবেক ও ইন্দ্রিয় কোনোটিই সমর্থন করে না। তাছাড়া নবীগণ আলাইহিমুস সালাম থেকেও এমন কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না, যা এই আকিদাকে সমর্থন করে।
২১- ইসলাম ঈমানের বড় বড় রুকনের মাধ্যমে ঈমানের দিকে আহ্বান করে, আর সেগুলো হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ঈমান,তার ফেরেশ্তাদের প্রতি ঈমান, আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান, যেমন বিকৃত হওয়ার পূর্বের তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবূরের প্রতি এবং কুরআনের প্রতি ঈমান। আর সকল নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালামের ওপর ঈমান আনা এবং তাদের সর্বশেষ নবীর প্রতি ঈমান আনা। আর তিনি হলেন নবী ও রাসূলগণের সর্বশেষ আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ। আর আখিরাতের প্রতি ঈমান আনা। আমরা জানি যে, দুনিয়ার জীবনই যদি সর্বশেষ ও চূড়ান্ত জীবন হত, তাহলে এই জীবন ও অস্তিত্ব নিরেট অর্থহীন হত। আরও ঈমান আনা তাকদীরের ভালো মন্দের ওপর।
ইসলাম ঈমানের বড় বড় রুকনের মাধ্যমে ঈমানের দিকে আহ্বান করে, যার দিকে সকল নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালাম আহ্বান করেছেন। আর তা হচ্ছে:
প্রথমঃ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা এভাবে যে, তিনি এই জগতের রব, সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা ও পরিচালনাকারী। আর একমাত্র তিনিই ইবাদতের উপযুক্ত, তিনি ছাড়া সব কিছুর ইবাদত বাতিল। তিনি ছাড়া সকল মাবুদ বাতিল। কাজেই তিনি ছাড়া কারো জন্যেই ইবাদত প্রযোজ্য নয় এবং তিনি ছাড়া কারো জন্যেই ইবাদত বিশুদ্ধ নয়। এই মাসআলার দলিল ৮নং অনুচ্ছেদে আলোচনা করা হয়েছে।
আল্লাহ তা‘আলা আল-কুরআনুল কারীমের অনেক জায়গায় বিভিন্ন আয়াতে এসব গুরুত্বপূর্ণ রুকন উল্লেখ করেছেন। যেমন আল্লাহ তা‘আলার বাণী: {آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ ۚ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ۚ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ } “রাসূল তার রবের পক্ষ থেকে যা তার কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশ্তাসমূহ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে: আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল।” [আল বাকারাহ : ২৮৫] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { لَّيْسَ الْبِرَّ أَن تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَٰكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَىٰ حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا ۖ وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ ۗ أُولَٰئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا ۖ وَأُولَٰئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ } “ভালো কাজ শুধুএটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং মৌলিক ভালো কাজ হল যে ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশ্তাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি এবং যে সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও নিকটাত্মীয়গণকে, ইয়াতীম, অসহায়, মুসাফির ও অভাবে প্রার্থনাকারীকে এবং বন্দিমুক্তিতে এবং যে সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করে, যারা ধৈর্যধারণ করে কষ্ট ও দুর্দশায় ও যুদ্ধের সময়ে। তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাকী।” [আল-বাকারাহ : ১৭৭] আল্লাহ তা‘আলা এই রুকনসমূহের প্রতি ঈমান আনায়ন করতে আহ্বান করেছেন। আর তিনি বর্ণনা করেছেন যে, যে ব্যক্তি এগুলোকে অস্বীকার করল সে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত হল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنزَلَ مِن قَبْلُ ۚ وَمَن يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا} “হে মুমিনগণ, তোমরা ঈমান আনয়ন করো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং সে কিতাবের প্রতি যা তিনি তাঁর রাসূলের উপর নাযিল করেছেন এবং সে কিতাবের প্রতি যা তিনি পূর্বে নাযিল করেছেন। আর যে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশ্তামন্ডলী, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং শেষ দিনকে অস্বীকার করবে, সে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত হবে।” [আন-নিসা : ১৩৬] উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন: (بَيْنَمَا نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ذَاتَ يَوْمٍ إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا رَجُلٌ شَدِيدُ بَيَاضِ الثِّيَابِ شَدِيدُ سَوَادِ الشَّعَرِ لَا يُرَى عَلَيْهِ أَثَرُ السَّفَرِ وَلَا يَعْرِفُهُ مِنَّا أَحَدٌ حَتَّى جَلَسَ إِلَى النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَسْنَدَ رُكْبَتَيْهِ إِلَى رُكْبَتَيْهِ وَوَضَعَ كَفَّيْهِ عَلَى فَخِذَيْهِ وَقَالَ: يَا مُحَمَّدُ أَخْبِرْنِي عَنِ الْإِسْلَامِ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «الْإِسْلَامُ أَنْ تَشْهَدَ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَتُقِيمَ الصَّلَاةَ وَتُؤْتِيَ الزَّكَاةَ وَتَصُومَ رَمَضَانَ وَتَحُجَّ الْبَيْتَ إِنِ اسْتَطَعْتَ إِلَيْهِ سَبِيلًا» قَالَ: صَدَقْتَ قَالَ: فَعَجِبْنَا لَهُ يَسْأَلُهُ وَيُصَدِّقُهُ قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنِ الْإِيمَانِ قَالَ: «أَنْ تُؤْمِنَ بِاللهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَتُؤْمِنَ بِالْقَدَرِ خَيْرِهِ وَشَرِّهِ» قَالَ: صَدَقْتَ قَالَ: فَأَخْبِرْنِي عَنِ الْإِحْسَانِ قَالَ: «أَنْ تَعْبُدَ اللهَ كَأَنَّكَ تَرَاهُ فَإِنْ لَمْ تَكُنْ تَرَاهُ فَإِنَّهُ يَرَاكَ» “একদা আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে ছিলাম। এমন সময় একজন লোক আমাদের কাছে এসে হাযির হলেন। তাঁর পরিধানের কাপড় ছিল সা’দা ধবধবে, মাথার কেশ ছিল কাল কুচকুচে। তাঁর মধ্যে সফরের কোনো চিহ্ন ছিল না। আমরা কেউ তাঁকে চিনিও না। তিনি নিজের দুই হাঁটু নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই হাঁটুর সাথে লাগিয়ে বসে পড়লেন।তারপর তার দুই হাত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দুই উরুর উপর রাখলেন। তারপর তিনি বললেনঃ হে মুহাম্মাদ! আমাকে ইসলাম সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইসলাম হল, তুমি এ কথার সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো সত্য মাবূদ নেই এবং নিশ্চয়ই মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসুল, সালাত কায়েম করবে, যাকাত আদায় করবে, রামাযানের সিয়াম পালন করবে এবং বায়তুল্লাহ পৌছার সামর্থ্য থাকলে হাজ্জ পালন করবে। আগন্তুক বললেনঃ আপনি ঠিকই বলেছেন। তার কথা শুনে আমরা বিষ্মিত হলাম যে, তিনই প্রশ্ন করেছেন আর তিনিই-তা সত্যায়িত করছেন। আগন্তুক বললেনঃ আমাকে ঈমান সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি ঈমান আনবে আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশ্তাদের প্রতি, তাঁর কিতাবসমূহের প্রতি, তাঁর রাসুলগণের প্রতি এবং আখিরাতের প্রতি,আরও ঈমান আনবে তাকদিরের ভালমন্দের প্রতি। আগন্তুক বললেনঃ আপনি ঠিকই বলেছেন। তারপর বললেনঃ আমাকে ইহসান সম্পর্কে অবহিত করুন। রাসূলসাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ ইহসান হলো, তুমি এমনভাবে ইবাদত করবে যেন আল্লাহকে দেখছ, যদি তাকে নাও দেখ, তাহলে অবশ্যই তিনি তোমাকে দেখছেন।” [সহীহ মুসলিম: ৮] এই হাদীসে রয়েছে যে, জিবরীল আলাইহিস সালাম রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসেছেন এবং তাঁকে দীনের স্তরসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছেন। আর তা হচ্ছেঃ ইসলাম, ঈমান ও ইহসান। রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে উত্তর দিলেন, অতঃপর তিনি তাঁর সাহাবীদের বললেন যে, ইনি হলেন জিবরীল আলাইহিস সালাম। তাদের কাছে এসেছেন তাদেরকে তাদের দীন শিক্ষা দিতে। এটিই হচ্ছে ইসলাম, আল্লাহর রিসালাহ (বার্তা)। জিবরীল তা (আল্লাহর কাছ থেকে) নিয়ে এসেছেন, আর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। আর তার সাহাবীগণ তা হিফয ও সংরক্ষণ করেছেন এবং তার পরে তারা তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
দ্বিতীয়ঃ ফেরেশ্তাদের প্রতি ঈমান। তারা হলো এক অদৃশ্য জগত। আল্লাহ তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাদেরকে নির্দিষ্ট আকৃতিতে বানিয়েছেন এবং তাদেরকে অনেক বড় বড় আমলের দায়িত্ব প্রদান করেছেন। তাদের সবচেয়ে বড় কাজের অন্যতম হলো রাসূল ও নবীগণ আলাইহিমুস সালামের নিকট আল্লাহর রিসালাত পৌঁছে দেয়া।ফেরেশ্তাদের মাঝে সবচেয়ে বড় জিবরীল আলাইহিস সালাম। রাসূলদের নিকট জিবরীল আলাইহিস সালামের ওহী নিয়ে আসা তা প্রমাণ করে। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: { يُنَزِّلُ الْمَلَائِكَةَ بِالرُّوحِ مِنْ أَمْرِهِ عَلَىٰ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ أَنْ أَنذِرُوا أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاتَّقُونِ } “তিনি তাঁর রাসূল বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছে স্বীয় নির্দেশে ওহীসহ ফেরেশ্তা পাঠান এ বলে যে, তোমরা সতর্ক কর, ‘নিশ্চয় আমি ছাড়া কোনো সত্য মাবূদ নেই; কাজেই তোমরা আমার ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন কর।” [আন-নাহলঃ ২] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ (192) “আর নিশ্চয় এটা (আল-কুরআন) সৃষ্টিকুলের রব হতে নাযিলকৃত। (১৯২) نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ (193) বিশ্বস্ত রূহ (জিবরাঈল) তা নিয়ে নাযিল হয়েছেন। (১৯৩) عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنذِرِينَ (194) আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হন। (১৯৪) بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُّبِينٍ (195) সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। (১৯৫) وَإِنَّهُ لَفِي زُبُرِ الْأَوَّلِينَ (196) } আর পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে অবশ্যই এর উল্লেখ আছে। (১৯৬)” [আশ-শু‘আরাঃ ১৯২-১৯৬]
তৃতীয়ঃ আল্লাহর পাঠানো কিতাবসমূহের প্রতি ঈমান আনা, যেমন তাওরাত, ইঞ্জিল ও যাবূর -এগুলো বিকৃত হওয়ার পূর্বের- এবং কুরআন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنزَلَ مِن قَبْلُ ۚ وَمَن يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا} “হে মুমিনগণ, তোমরা ঈমান আনয়ন করো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং সে কিতাবের প্রতি যা তিনি তাঁর রাসূলের উপর নাযিল করেছেন এবং সে কিতাবের প্রতি যা তিনি পূর্বে নাযিল করেছেন। আর যে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশ্তামন্ডলী, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং শেষ দিনকে অস্বীকার করবে, সে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত হবে।” [আন-নিসা : ১৩৬] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {نَزَّلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ وَأَنزَلَ التَّوْرَاةَ وَالْإِنجِيلَ (3) “তিনি সত্যসহ আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন, পূর্বে যা এসেছে তার সত্যতা প্রতিপন্নকারীরুপে। আর তিনি নাযিল করেছিলেন তাওরাত ও ইঞ্জীল। (৩) مِن قَبْلُ هُدًى لِّلنَّاسِ وَأَنزَلَ الْفُرْقَانَ ۗ إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِآيَاتِ اللَّهِ لَهُمْ عَذَابٌ شَدِيدٌ ۗ وَاللَّهُ عَزِيزٌ ذُو انتِقَامٍ (4) } ইতোপূর্বে মানুষের জন্য হেদায়াতস্বরূপ; আর তিনি ফুরকান নাযিল করেছেন। নিশ্চয় যারা আল্লাহর আয়াতসমূহে কুফরী করে তাদের জন্য রয়েছে কঠোর শাস্তি। আর আল্লাহ্ মহা-পরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী। (৪)” [আলে-ইমরানঃ ৩-৪] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { ءَامَنَ ٱلرَّسُولُ بِمَآ أُنزِلَ إِلَيۡهِ مِن رَّبِّهِۦ وَٱلۡمُؤۡمِنُونَۚ كُلٌّ ءَامَنَ بِٱللَّهِ وَمَلَـٰٓئِكَتِهِۦ وَكُتُبِهِۦ وَرُسُلِهِۦ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّن رُّسُلِهِۦۚ وَقَالُواْ سَمِعۡنَا وَأَطَعۡنَاۖ غُفۡرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيۡكَ ٱلۡمَصِيرُ } “রাসূল তাঁর রবের পক্ষ থেকে যা তাঁর কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশ্তাগণ,তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে: আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল।” [আল বাকারাহ : ২৮৫] আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: { قُلۡ ءَامَنَّا بِٱللَّهِ وَمَآ أُنزِلَ عَلَيۡنَا وَمَآ أُنزِلَ عَلَىٰٓ إِبۡرَٰهِيمَ وَإِسۡمَٰعِيلَ وَإِسۡحَٰقَ وَيَعۡقُوبَ وَٱلۡأَسۡبَاطِ وَمَآ أُوتِيَ مُوسَىٰ وَعِيسَىٰ وَٱلنَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمۡ لَا نُفَرِّقُ بَيۡنَ أَحَدٖ مِّنۡهُمۡ وَنَحۡنُ لَهُۥ مُسۡلِمُونَﱞ} “বলুন, ‘আমরা আল্লাহর ওপর এবং আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং ইব্রাহীম, ইসমা’ঈল, ইসহাক, ইয়া’কূব ও তাঁর বংশধরগণের প্রতি যা নাযিল হয়েছিল এবং যা মূসা, ‘ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে তাঁদের রবের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়েছিল তাতে ঈমান এনেছি; আমরা তাঁদের কারও মধ্যে কোনো তারতম্য করি না। আর আমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণকারী।” [আলে ইমরানঃ ৮৪]
চতুর্থঃ সকল নবী ও রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনয়ন করা। কাজেই সকল নবী ও রাসূলগণের প্রতি ঈমান আনা ওয়াজিব এবং এই বিশ্বাস করা যে, তারা সবাই আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূল। তারা তাদের উম্মাতের নিকট আল্লাহর রিসালাত, তার দীন ও শরীয়ত পৌঁছিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { قُولُوا آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَىٰ وَعِيسَىٰ وَمَا أُوتِيَ النَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ } “তোমরা বল, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর এবং যা নাযিল করা হয়েছে আমাদের উপর ও যা নাযিল করা হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাদের সন্তানদের উপর আর যা প্রদান করা হয়েছে মূসা ও ঈসাকে এবং যা প্রদান করা হয়েছে তাদের রবের পক্ষ হতে নবীগণকে। আমরা তাদের কারো মধ্যে তারতম্য করি না। আর আমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণকারী ।” [আল বাকারাহ : ১৩৬] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ ۚ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ۚ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ } “রাসূল তার রবের পক্ষ থেকে যা তাঁর কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশ্তাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলেঃ আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল।” [আল বাকারাহ : ২৮৫] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { قُلْ آمَنَّا بِاللَّهِ وَمَا أُنزِلَ عَلَيْنَا وَمَا أُنزِلَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَالْأَسْبَاطِ وَمَا أُوتِيَ مُوسَىٰ وَعِيسَىٰ وَالنَّبِيُّونَ مِن رَّبِّهِمْ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّنْهُمْ وَنَحْنُ لَهُ مُسْلِمُونَ } “বল, ‘আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর প্রতি এবং যা নাযিল করা হয়েছে আমাদের উপর, আর যা নাযিল হয়েছে ইবরাহীম, ইসমাঈল, ইসহাক, ইয়াকূব ও তাদের সন্তানদের উপর। আর যা দেয়া হয়েছে মূসা, ঈসা ও অন্যান্য নবীকে তাদের রবের পক্ষ থেকে, আমরা তাদের কারো মধ্যে পার্থক্য করি না এবং আমরা তারই প্রতি আত্মসমর্পণকারী।” [আলে ইমরান : ৮৪]
তাঁদের সর্বশেষের প্রতি ঈমান আনবে। আর তিনি হলেন আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ। সকল নবী ও রাসূলগণের সর্বশেষ- তাদের সবার ওপর সালাত ও সালাম-। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { إِذۡ أَخَذَ ٱللَّهُ مِيثَٰقَ ٱلنَّبِيِّـۧنَ لَمَآ ءَاتَيۡتُكُم مِّن كِتَٰبٖ وَحِكۡمَةٖ ثُمَّ جَآءَكُمۡ رَسُولٞ مُّصَدِّقٞ لِّمَا مَعَكُمۡ لَتُؤۡمِنُنَّ بِهِۦ وَلَتَنصُرُنَّهُۥۚ قَالَ ءَأَقۡرَرۡتُمۡ وَأَخَذۡتُمۡ عَلَىٰ ذَٰلِكُمۡ إِصۡرِيۖ قَالُوٓاْ أَقۡرَرۡنَاۚ قَالَ فَٱشۡهَدُواْ وَأَنَا۠ مَعَكُم مِّنَ ٱلشَّـٰهِدِينَ} “আর স্মরণ করুন, যখন আল্লাহ নবীদের অংগীকার নিয়েছিলেন যে, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত যা কিছু দিয়েছি; তারপর তোমাদের কাছে যা আছে তার সত্যায়নকারীরূপে যখন একজন রাসূল আসবে– তখন তোমরা অবশ্যই তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে।’ তিনি বললেন, ‘তোমরা কি স্বীকার করলে এবং এর উপর আমার অংগীকার কি তোমরা গ্রহণ করলে?’ তারা বললঃ ‘আমরা স্বীকার করলাম’। তিনি বললেন, ‘তবে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম।” [আলে ইমরান : ৮১]
কাজেই ইসলাম সাধারণভাবে সকল নবী ও রাসূলের প্রতি ঈমানকে ওয়াজিব করে এবং তাদের সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর ঈমানকেও ওয়াজিব করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لَسْتُمْ عَلَىٰ شَيْءٍ حَتَّىٰ تُقِيمُوا التَّوْرَاةَ وَالْإِنجِيلَ وَمَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ } “বলুন, ‘হে কিতাবীরা! তাওরাত, ইঞ্জীল ও যা তোমাদের রবের কাছ থেকে তোমাদের প্রতি নাযিল হয়েছে তা প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত তোমরা কোনো ভিত্তির উপর নও।” [আল-মায়েদাহ : ৬৮] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ۚ فَإِن تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ } “বল, ‘হে কিতাবীগণ, তোমরা এমন কথার দিকে আস, যেটি আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি। আর তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ ছাড়া রব হিসাবে গ্রহণ না করি’। তারপর যদি তারা বিমুখ হয় তবে বল, ‘তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম’।” [আলে ইমরান : ৬৪]
আর যে একজন নবীর সঙ্গে কুফরী করল সে সকল নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালামের সঙ্গে কুফরি করল। আর এই জন্যই আল্লাহ তা‘আলা নূহ আলাইহিস সালামের কওমের ওপর তার হুকুম সম্পর্কে বলেন: { كَذَّبَتْ قَوْمُ نُوحٍ الْمُرْسَلِينَ } “নূহের সম্প্রদায় রাসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল।” [আশ-শুআরা : ১০৫] জানা কথা যে,নূহ আলাইহিস সালামের পূর্বে অবশই কোন রাসূল গত হননি, তা সত্বেও যখন তাঁর জাতি তাঁকে মিথ্যারোপ করেছে,তখন তাদের পক্ষ থেকে তাঁকে মিথ্যারোপ করাই হলো সকল নবী ও রাসূলকে মিথ্যারোপ করা, কেননা তাঁদের দাওয়াত ও উদ্দশ্য এক ও অভিন্ন ছিল।
পঞ্চমঃ পরকাল দিবসের প্রতি ঈমান। আর সেটি হচ্ছে কিয়ামত দিবস। এই দুনিয়ার সর্বশেষ হায়াতে আল্লাহ তা‘আলা ফিরিশতা ইসরাফিল আলাইহিস সালামকে নির্দেশ দিবেন, ফলে তিনি বেহুশ হওয়ার ফু দিবেন, আর আল্লাহ যাদের ব্যাপারে চাইবেন তারা সবাই বেহুশ হবে ও মারা যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَن فِي السَّمَاوَاتِ وَمَن فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَن شَاءَ اللَّهُ ۖ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَىٰ فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنظُرُونَ } “আর শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে আসমানসমূহে যারা আছে ও যমীনে যারা আছে তারা সবাই বেহুশ হয়ে পড়বে, যাদেরকে আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া। তারপর আবার শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে তৎক্ষণাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।” [আয-যুমার ৬৮] আর যখন আসমানসমূহে ও জমিনে যারা আছে, যাদেরকে আল্লাহ ইচ্ছা করেন তারা ছাড়া তারা সবাই ধ্বংস হয়ে যাবে,, তখন আল্লাহ আসমানসমূহ ও জমিন ভাঁজ করে নিবেন। যেমন আল্লাহর নিম্নের বাণীতে রয়েছে: {يَوْمَ نَطْوِي السَّمَاءَ كَطَيِّ السِّجِلِّ لِلْكُتُبِ ۚ كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُّعِيدُهُ ۚ وَعْدًا عَلَيْنَا ۚ إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ } “সেদিন আমি আসমানসমূহকে গুটিয়ে ফেলব, যেভাবে গুটানো হয় লিখিত দফতর; যেভাবে আমি প্রথম সৃষ্টির সুচনা করেছিলাম সেভাবে পুনরায় সৃষ্টি করব; এটা আমার কৃত প্রতিশ্রুতি, আর আমি তা পালন করবই।” [আল-আম্বিয়া : ১০৪] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { وَمَا قَدَرُوا اللَّهَ حَقَّ قَدْرِهِ وَالْأَرْضُ جَمِيعًا قَبْضَتُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَالسَّمَاوَاتُ مَطْوِيَّاتٌ بِيَمِينِهِ ۚ سُبْحَانَهُ وَتَعَالَىٰ عَمَّا يُشْرِكُونَ } “তারা আল্লাহকে মর্যাদা দেয়নি তাঁর যথোচিত মর্যাদা, অথচ কিয়ামতের দিন গোটা পৃথিবী থাকবে তাঁর মুঠোর ভেতর এবং আকাশমণ্ডলী গুটানো অবস্থায় থাকবে তাঁর ডান হাতে। তিনি পবিত্র এবং তারা যে শিরক করে তা থেকে তিনি বহু ঊর্ধ্বে।” [আয-যুমার : ৬৭] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «يَطْوِي اللهُ عَزَّ وَجَلَّ السَّمَاوَاتِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثُمَّ يَأْخُذُهُنَّ بِيَدِهِ الْيُمْنَى ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ أَيْنَ الْجَبَّارُونَ؟ أَيْنَ الْمُتَكَبِّرُونَ. ثُمَّ يَطْوِي الْأَرَضِينَ بِشِمَالِهِ ثُمَّ يَقُولُ: أَنَا الْمَلِكُ أَيْنَ الْجَبَّارُونَ؟ أَيْنَ الْمُتَكَبِّرُونَ؟» “কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর আকাশমণ্ডলীকে গুটিয়ে ফেলবেন। অতঃপর স্বীয় ডান হাত দ্বারা তা ধরবেন। তারপর তিনি বলবেন, আমিই অধিপতি, প্রতাপশালীরা কোথায়? দাম্ভিকেরা কোথায়? তারপর তিনি যমীনসমূহকে তার বাম দ্বারা গুটিয়ে নিবেন। তারপর তিনি বলবেন, আমি অধিপতি, প্রতাপশালীরা কোথায়? দাম্ভিকেরা কোথায়?” মুসলিম এটি বর্ণনা করেছেন।
তারপর আল্লাহ ফিরিশতা (ইসরাফিল ‘আলাইহিস সালাম) কে নির্দেশ দিবেন, ফলে সে দ্বিতীয়বার সিঙ্গায় ফূঁ দিবে। আর তৎক্ষণাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَىٰ فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنظُرُونَ} “তারপর আবার শিংগায় ফুঁক দেয়া হবে, ফলে তৎক্ষণাৎ তারা দাঁড়িয়ে তাকাতে থাকবে।” [আয-যুমার ৬৮] আল্লাহ মাখলুককে যখন উত্থিত করবেন, তখন তাদেরকে হিসাবের জন্যে হাজির করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَوْمَ تَشَقَّقُ الْأَرْضُ عَنْهُمْ سِرَاعًا ذَلِكَ حَشْرٌ عَلَيْنَا يَسِيرٌ} “যেদিন তাদের থেকে যমীন বিদীর্ণ হবে এবং লোকেরা ত্ৰস্ত-ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করবে, এটা এমন এক সমাবেশ যা আমাদের জন্য অতি সহজ।” [কাফ : ৪৪] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {يَوْمَ تَشَقَّقُ الْأَرْضُ عَنْهُمْ سِرَاعًا ذَلِكَ حَشْرٌ عَلَيْنَا يَسِيرٌ} “যেদিন তারা প্রকাশ্যভাবে সমবেত হবে, সেদিন আল্লাহর কাছে তাদের কিছুই গোপন থাকবে না। আজ কর্তৃত্ব কার? আল্লাহরই, যিনি এক, প্ৰবল প্ৰতাপশালী।” [গাফির: ১৬] এই দিন আল্লাহ সকল মানুষের হিসেব নিবেন এবং প্রত্যেক মাজলুমের জন্যে জুলুমকারী থেকে কিসাস গ্রহণ করবেন এবং প্রত্যেক মানুষকে তার আমলের বিনিময় দিবেন যা সে করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { الْيَوْمَ تُجْزَىٰ كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ ۚ لَا ظُلْمَ الْيَوْمَ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ} “আজ প্রত্যেককে তার অর্জন অনুসারে প্রতিফল দেয়া হবে; আজ কোনো যুলুম নেই। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসেব গ্রহণকারী।” [গাফির:১৭] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ ۖ وَإِن تَكُ حَسَنَةً يُضَاعِفْهَا وَيُؤْتِ مِن لَّدُنْهُ أَجْرًا عَظِيمًا} “নিশ্চয় আল্লাহ অণু পরিমাণও যুলুম করেন না। আর কোনো পূণ্য কাজ হলে আল্লাহ সেটাকে বহুগুণ বর্ধিত করেন এবং তিনি নিজের কাছ থেকে মহাপুরস্কার প্রদান করেন।” [আন-নিসা : ৪০] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ (7) “যে কেউ অনূ পরিমাণ ভালো কাজ করবে সে তা দেখবে। (৭) وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ (8)} আর কেউ অণু পরিমাণ অসৎকাজ করলে সে তাও দেখবে। (৮)” [আয-যাল যালাহ ৭-৮] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا ۖ وَإِن كَانَ مِثْقَالَ حَبَّةٍ مِّنْ خَرْدَلٍ أَتَيْنَا بِهَا ۗ وَكَفَىٰ بِنَا حَاسِبِينَ} “আর কিয়ামতের দিনে আমি ন্যায়বিচারের পাল্লাসমূহ স্থাপন করব, সুতরাং কারো প্রতি কোনো যুলুম করা হবে না এবং কাজ যদি শস্য দানা পরিমাণ ওজনেরও হয় তবুও তা আমি উপস্থিত করব; আর হিসেব গ্রহণকারীরূপে আমিই যথেষ্ট।” ]আল-আম্বিয়া : ৪৭]
পুনরুত্থান ও হিসাবের পর প্রতিফল প্রদানের পালা হবে। কাজেই যে ভালো কাজ করেছে তার জন্যে রয়েছে স্থায়ী নিআমত, যা কখনো নিঃশেষ হবে না। আর যে খারাপ ও কুফরী করেছে, তার জন্যে রয়েছে শাস্তি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { الْمُلْكُ يَوْمَئِذٍ لِّلَّهِ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ ۚ فَالَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ (56) “সেদিন আল্লাহরই আধিপত্য; তিনিই তাদের মাঝে বিচার করবেন। অতঃপর যারা ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করেছে, তারা নেয়ামত পরিপূর্ণ জান্নাতে অবস্থান করবে। (৫৬) وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا فَأُولَٰئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُّهِينٌ (57) } আর যারা কুফরী করে এবং আমাদের আয়াতসমূহকে অস্বীকার করে, তাদের জন্যেই রয়েছে অপমানজনক আযাব। (৫৭)” [হজ্জ : ৫৬-৫৭] আমরা জানি যে, যদি দুনিয়ার জীবনই সর্বশেষ ও চূড়ান্ত হত, তাহলে এই জীবন ও অস্তিত্ব নিরেট নিরর্থক হত। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ } “তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমরা তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?” [আল-মুমিনুন : ১১৫]
ষষ্ঠঃ তাকদীরের ভালো মন্দের প্রতি ঈমান। আর তা হচ্ছে এই জগতে যা কিছু হয়েছে, যা কিছু হচ্ছে ও যা কিছু হবে তা সব আল্লাহ জানেন এবং তিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টির পূর্বে এসব কিছু লিখে রেখেছেন। এই বিষয়ের ওপর ঈমান আনা ওয়াজিব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَعِندَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ ۚ وَيَعْلَمُ مَا فِي الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ۚ وَمَا تَسْقُطُ مِن وَرَقَةٍ إِلَّا يَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّةٍ فِي ظُلُمَاتِ الْأَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَلَا يَابِسٍ إِلَّا فِي كِتَابٍ مُّبِينٍ } “আর গায়েবের চাবি তাঁরই কাছে রয়েছে, তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না।স্থল ও সমুদ্রের অন্ধকারসমূহে যা কিছু আছে তা তিনিই অবগত রয়েছেন, তাঁর অজানায় একটি পাতাও পড়ে না। মাটির অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণাও অংকুরিত হয় না বা রসযুক্ত কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।” [আল-আনআম : ৫৯] আর আল্লাহ তা‘আলা প্রত্যেক বস্তুকে তার জ্ঞান দ্বারা বেষ্টন করে নিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ سَبْعَ سَمَاوَاتٍ وَمِنَ الْأَرْضِ مِثْلَهُنَّ يَتَنَزَّلُ الْأَمْرُ بَيْنَهُنَّ لِتَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ وَأَنَّ اللَّهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْمًا} “তিনি আল্লাহ্, যিনি সৃষ্টি করেছেন সাত আসমান এবং অনুরূপ যমীন, তাদের মধ্যে নেমে আসে তাঁর নির্দেশ; যাতে তোমরা জানতে পার যে, আল্লাহ সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান এবং ইলেমের দিক দিয়ে আল্লাহ্ সবকিছুকে পরিবেষ্টন করে আছেন।” [আত-তালাক : ১২] আর আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন, যা চান, যা সৃষ্টি করেন ও যার উপকরণ সহজ করেন সেগুলো ছাড়া কিছৃুই এই জগতে সংঘটিত হয় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {الَّذِي لَهُ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَلَمْ يَتَّخِذْ وَلَدًا وَلَمْ يَكُن لَّهُ شَرِيكٌ فِي الْمُلْكِ وَخَلَقَ كُلَّ شَيْءٍ فَقَدَّرَهُ تَقْدِيرًا } “যিনি আসমানসমূহ যমীনের সার্বভৌমত্বের অধিকারী; তিনি কোনো সন্তান গ্রহণ করেননি; সার্বভৌমত্বে তাঁর কোনো শরীক নেই। তিনি সবকিছু সৃষ্টি করেছেন অতঃপর তা নির্ধারণ করেছেন যথাযথ অনুপাতে।” [আল-ফুরকান : ২] আর তাতেই রয়েছে চূড়ান্ত হিকমত, যা মানুষে বেষ্টন করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {حِكْمَةٌ بَالِغَةٌ ۖ فَمَا تُغْنِ النُّذُرُ} “এটা পরিপূর্ণ হিকমত, কিন্তু ভীতিপ্রদর্শন তাদের কোনো কাজে লাগেনি।” [আল-কামার : ৫] আল্লাহ তা‘য়ালা আরো বলেন: {وَهُوَ الَّذِي يَبْدَأُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ وَهُوَ أَهْوَنُ عَلَيْهِ وَلَهُ الْمَثَلُ الْأَعْلَى فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ} “আর তিনি-ই, যিনি সৃষ্টিকে শুরুতে অস্তিত্বে আনয়ন করেন, তারপর তিনি সেটা পুনরাবৃত্তি করবেন; আর এটা তাঁর জন্য অতি সহজ। আসমানসমূহ ও যমীনে সর্বোচ্চ গুনাবলী তাঁরই এবং তিনিই পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান।” [আর-রূম : ২৭] আল্লাহ তা‘আলা নিজেকে হিকমত দ্বারা বিশেষিত করেছেন, আর নিজের নামকরণ করেছেন হাকীম (প্রজ্ঞাবান)। আল্লাহ তাআলা বলেন: {شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ ۚ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ} “আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) মাবূদ নেই, আর ফেরেশ্তা ও জ্ঞানীগণও।এও সাক্ষ্য দেন যে,তিনি ন্যায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) মাবূদ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আলু ইমরান : ১৮] আল্লাহ তা‘আলা ঈসা আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, তিনি কিয়ামতের দিন আল্লাহকে সম্বোধন করে বলবে: {إِن تُعَذِّبْهُمْ فَإِنَّهُمْ عِبَادُكَ ۖ وَإِن تَغْفِرْ لَهُمْ فَإِنَّكَ أَنتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ} “আপনি যদি তাদেরকে শাস্তি দেন তবে তারাতো আপনারই বান্দা, আর যদি তাদেরকে ক্ষমা করেন তবে আপনি তো পরাক্রমশালী,প্রজ্ঞাময়।” [আল-মায়েদাহ : ১১৮] যখন মূসা আলাইহিস সালাম তূর পাহাড়ের পার্শ্বে থেকে আল্লাহকে আহ্বান করেছেন তখন আল্লাহ তাকে বলেছেন: {يَا مُوسَىٰ إِنَّهُ أَنَا اللَّهُ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ} “হে মূসা, নিশ্চয় আমিই আল্লাহ, মহাপরাক্রমশালী, মহাপ্রজ্ঞাময়।” [আন-নামল : ৯]
আর কুরআনুল কারীমকে হিকমত দ্বারা বিশেষিত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {الر ۚ كِتَابٌ أُحْكِمَتْ آيَاتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِن لَّدُنْ حَكِيمٍ خَبِيرٍ} “আলিফ–লাম-রা, এ কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত সত্তার কাছ থেকে।” [হুদ : ১] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: { ذَٰلِكَ مِمَّا أَوْحَىٰ إِلَيْكَ رَبُّكَ مِنَ الْحِكْمَةِ ۗ وَلَا تَجْعَلْ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ فَتُلْقَىٰ فِي جَهَنَّمَ مَلُومًا مَّدْحُورًا} “আপনার রব ওহীর দ্বারা আপনাকে যে হিকমত দান করেছেন এগুলো তার অন্তর্ভুক্ত। আর আল্লাহর সাথে অন্য মাবূদ স্থির করো না, করলে নিন্দিত ও বিতাড়িত অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।” [আল-ইসরা : ৩৯]
২২- নবীগণ আলাইহিমুস সালাম আল্লাহর পক্ষ হতে যা কিছু পৌঁছান সে ব্যাপারে তারা নির্ভুল-নিষ্পাপ এবং যা কিছু বিবেক বিরোধী অথবা সুস্থ্স্বভাব যা প্রত্যাখ্যান করে তা থেকেও তারা মুক্ত ও নিষ্পাপ। নবীগণই আল্লাহর নির্দেশসমূহ তার বান্দাদের নিকট পৌঁছানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত। রুবুবিয়্যাত অথবা ইবাদত পাওয়ার হক যা একান্তই আল্লাহর, এতে নবীগণের কোনো হক নেই; বরং তারা সকল মানুষের মতই মানুষ, তবে তাঁদের প্রতি আল্লাহ স্বীয় রিসালাত অহী করেন।
নবীগণ আলাইহিমুস সালাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যা পৌঁছান সে ব্যাপারে তারা নির্ভুল। কেননা আল্লাহ তার সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুককে স্বীয় রিসালাত পৌঁছানোর জন্যে নির্বাচন করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {اللَّهُ يَصْطَفِي مِنَ الْمَلَائِكَةِ رُسُلًا وَمِنَ النَّاسِ ۚ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ بَصِيرٌ} “আল্লাহ্ ফেরেশ্তাদের মধ্য থেকে মনোনীত করেন রাসূল এবং মানুষের মধ্য থেকেও; নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সম্যক দ্রষ্টা।” [আল-হজ্জ : ৭৫] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: { إِنَّ ٱللَّهَ ٱصۡطَفَىٰٓ ءَادَمَ وَنُوحٗا وَءَالَ إِبۡرَٰهِيمَ وَءَالَ عِمۡرَٰنَ عَلَى ٱلۡعَٰلَمِينَ} “নিশ্চয় আল্লাহ্ আদম, নূহ ও ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে সমগ্র সৃষ্টিজগতের উপর মনোনীত করেছেন।” [আলু ইমরান : ৩৩] আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: { قَالَ يَٰمُوسَىٰٓ إِنِّي ٱصۡطَفَيۡتُكَ عَلَى ٱلنَّاسِ بِرِسَٰلَٰتِي وَبِكَلَٰمِي فَخُذۡ مَآ ءَاتَيۡتُكَ وَكُن مِّنَ ٱلشَّـٰكِرِينَ} “তিনি বললেন, ‘হে মূসা! আমি আপনাকে আমার রিসালাত ও বাক্যালাপ দিয়ে মানুষের উপর বেছে নিয়েছি; কাজেই আমি আপনাকে যা দিলাম তা গ্রহণ করুন এবং শোকর আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হোন।” [আল-আরাফ : ১৪৪] রাসূল আলাইহিমুস সালামগণ জানেন যে, তাদের প্রতি যা নাজিল করা হয় তা আল্লাহর ওহী এবং তারা ফেরেশ্তাদেরকে ওহী নিয়ে নাজিল হতে দেখেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { عالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِ أَحَدًا (26) “তিনিই গায়েবী বিষয়ের জ্ঞানী, তিনি তাঁর গায়েবের জ্ঞান কারও কাছে প্রকাশ করেন না। (২৬) إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِن رَّسُولٍ فَإِنَّهُ يَسْلُكُ مِن بَيْنِ يَدَيْهِ وَمِنْ خَلْفِهِ رَصَدًا (27) তবে তাঁর মনোনীত রাসূলদের মধ্যে যাঁকে ইচ্ছা তাঁকে যতটুকু চান অবগত করেন। সে ক্ষেত্রে আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের সামনে এবং পিছনে প্রহরী নিয়োজিত করেন। (২৭) لِّيَعْلَمَ أَن قَدْ أَبْلَغُوا رِسَالَاتِ رَبِّهِمْ وَأَحَاطَ بِمَا لَدَيْهِمْ وَأَحْصَىٰ كُلَّ شَيْءٍ عَدَدًا (28)} যাতে রাসূল জানতে পারেন যে,তাঁর পূর্বের রাসূলগণ তাদের রবের রিসালাত পৌছে দিয়েছেন। আর তাদের কাছে যা আছে তা তিনি জ্ঞানে পরিবেষ্টন করে রেখেছেন এবং তিনি প্রতিটি বস্তু গণনা করে হিসেব রেখেছেন। (২৮)” [আল-জিন : ২৬-২৮] এবং আল্লাহ তাদেরকে তাঁর রিসালতসমূহ প্রচার করার নির্দেশ দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা বলেন: {يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ ۚ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ} “হে রাসূল! আপনার রবের কাছ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা প্রচার করুন; যদি না করেন তবে তো আপনি তাঁর বার্তা প্রচার করলেন না। আর আল্লাহ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না।” [আল-মায়েদাহ : ৬৭] আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: {رُّسُلٗا مُّبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ لِئَلَّا يَكُونَ لِلنَّاسِ عَلَى ٱللَّهِ حُجَّةُۢ بَعۡدَ ٱلرُّسُلِۚ وَكَانَ ٱللَّهُ عَزِيزًا حَكِيمٗا} “সুসংবাদদাতা ও সাবধানকারী রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছি, যাতে রাসূলগণ আসার পর আল্লাহর বিরুদ্ধে মানুষের কোনো অভিযোগ না থাকে। আর আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আন-নিসা : ১৬৫]
রাসূল আলাইহিমুস সালামগণ আল্লাহকে সবচেয়ে বেশী ভয় করেন। তারা আল্লাহর সর্বাধিক তাকওয়া অবলম্বন করেন, ফলে তারা তার রিসালাতে বৃদ্ধি ও হ্রাস করেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا بَعْضَ الْأَقَاوِيلِ (44) “তিনি যদি আমার নামে কোনো কথা রচনা করে চালাতে চেষ্টা করতেন (৪৪) لَأَخَذْنَا مِنْهُ بِالْيَمِينِ (45) তবে অবশ্যই আমি তাকে পাকড়াও করতাম ডান হাত দিয়ে, (৪৫) ثُمَّ لَقَطَعْنَا مِنْهُ الْوَتِينَ (46) তারপর অবশ্যই আমি কেটে দিতাম তার হৃদপিণ্ডের শিরা, (৪৬) فَمَا مِنكُم مِّنْ أَحَدٍ عَنْهُ حَاجِزِينَ (47)} অতঃপর তোমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই, যে তাঁকে রক্ষা করতে পারে। (৪৭)” [আল-হাক্কাহ : ৪৪-৪৭] ইবনু কাসীর রাহিমাহুল্লাহ বলেন: আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَلَوْ تَقَوَّلَ عَلَيْنَا} “যদি আমার নামে কোনো কথা রচনা করে” অর্থাৎ তারা যেরূপ ধারনা করে সেরূপ যদি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ওপর মিথ্যা রচনা করে রিসালাতে বৃদ্ধি করে অথবা তার থেকে হ্রাস করে অথবা তার নিজের থেকে কোনো কথা বলে আমার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে—অথচ এরূপ নয়—তাহলে আমি দ্রুতই তাকে শাস্তি প্রদান করতাম। আর এ জন্যেই বলেছেনঃ “তবে অবশ্যই আমি তাকে পাকড়াও করতাম ডান হাত দিয়ে”। আর কেউ বলেছেন, আমি তার ডান হাত পাকড়াও করতাম। আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন: {وَإِذۡ قَالَ ٱللَّهُ يَٰعِيسَى ٱبۡنَ مَرۡيَمَ ءَأَنتَ قُلۡتَ لِلنَّاسِ ٱتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَٰهَيۡنِ مِن دُونِ ٱللَّهِۖ قَالَ سُبۡحَٰنَكَ مَا يَكُونُ لِيٓ أَنۡ أَقُولَ مَا لَيۡسَ لِي بِحَقٍّۚ إِن كُنتُ قُلۡتُهُۥ فَقَدۡ عَلِمۡتَهُۥۚ تَعۡلَمُ مَا فِي نَفۡسِي وَلَآ أَعۡلَمُ مَا فِي نَفۡسِكَۚ إِنَّكَ أَنتَ عَلَّـٰمُ ٱلۡغُيُوبِ . مَا قُلۡتُ لَهُمۡ إِلَّا مَآ أَمَرۡتَنِي بِهِۦٓ أَنِ ٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمۡۚ وَكُنتُ عَلَيۡهِمۡ شَهِيدٗا مَّا دُمۡتُ فِيهِمۡۖ فَلَمَّا تَوَفَّيۡتَنِي كُنتَ أَنتَ ٱلرَّقِيبَ عَلَيۡهِمۡۚ وَأَنتَ عَلَىٰ كُلِّ شَيۡءٖ شَهِيدٌ} “আরও স্মরণ করুন, আল্লাহ্ যখন বলবেন, ‘হে মারইয়াম –তনয় ‘ঈসা! আপনি কি লোকদেরকে বলেছিলেন যে, তোমরা আল্লাহ্ ছাড়া আমাকে ও আমার জননীকে দুই মাবূদরূপে গ্রহণ কর? ‘তিনি বলবেন, ‘আপনিই পূত-পবিত্র! যা বলার অধিকার আমার নেই তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়। যদি আমি তা বলতাম তবে আপনি তো তা জানতেন। আমার অন্তরের কথাতো আপনি জানেন, কিন্তু আপনার অন্তরের কথা আমি জানি না; নিশ্চয় একমাত্র আপনিই অদৃশ্য সম্বদ্ধে সব কিছু জানেন।’ ‘আপনি আমাকে যে আদেশ করেছেন তা ছাড়া তাদেরকে আমি কিছুই বলিনি, তা এই যে, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহরই ইবাদত কর এবং যতদিন আমি তাদের মধ্যে ছিলাম ততদিন আমি ছিলাম তাদের কাজ-কর্মের সাক্ষী, কিন্তু যখন আপনি আমাকে তুলে নিলেন তখন আপনিই তো ছিলেন তাদের কাজ-কর্মের তত্ত্বাবধায়ক এবং আপনিই সব বিষয়ে সাক্ষী।” [আল-মায়েদাহ : ১১৬-১১৭]
নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালামদের ওপর আল্লাহর অনুগ্রহ হচ্ছে যে, তিনি তাদেরকে তাঁর রিসালাত পৌঁছানোর ক্ষেত্রে স্থীর ও দৃঢ়পদ রাখেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {قَالَ إِنِّي أُشْهِدُ اللَّهَ وَاشْهَدُوا أَنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تُشْرِكُونَ (54) مِنْ دُونِهِ فَكِيدُونِي جَمِيعًا ثُمَّ لَا تُنْظِرُونِ (55) “তিনি বললেন, ‘নিশ্চয় আমি আল্লাহকে সাক্ষী করছি এবং তোমারাও সাক্ষী হও যে, নিশ্চয় আমি তা থেকে মুক্ত যাকে তোমরা শরীক কর, (৫৪) ‘আল্লাহ ছাড়া। সুতরাং তোমরা সবাই আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কর; তারপর আমাকে অবকাশ দিও না। (৫৫) إِنِّي تَوَكَّلْتُ عَلَى اللَّهِ رَبِّي وَرَبِّكُمْ مَا مِنْ دَابَّةٍ إِلَّا هُوَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا إِنَّ رَبِّي عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمٍ} আমি তো নির্ভর করি আমার ও তোমাদের রব আল্লাহর উপর; এমন কোনো জীব-জন্তু নেই, যে তাঁর পূর্ণ আয়াত্তাধীন নয়; নিশ্চয় আমার রব আছেন হক ও ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত।” [হুদ ; ৫৪-৫৬] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {وَإِن كَادُوا لَيَفْتِنُونَكَ عَنِ الَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ لِتَفْتَرِيَ عَلَيْنَا غَيْرَهُ ۖ وَإِذًا لَّاتَّخَذُوكَ خَلِيلًا (73) “আর আমি আপনার প্রতি যা ওহী করেছি তা থেকে ওরা আপনাকে পদস্খলন ঘটাবার চেষ্টা প্রায় চূড়ান্ত করেছিল, যাতে আপনি আমার উপর সেটার বিপরীত মিথ্যা রটাতে পারেন; আর নিঃসন্দেহে তখন তারা আপনাকে বন্ধুরুপে গ্রহণ করত। (৭৩) وَلَوْلَا أَن ثَبَّتْنَاكَ لَقَدْ كِدتَّ تَرْكَنُ إِلَيْهِمْ شَيْئًا قَلِيلًا (74) আর আমি অবিচলিত না রাখলে আপনি অবশ্যই তাদের দিকে প্রায় কিছুটা ঝুঁকে পড়তেন; (৭৪) إِذًا لَّأَذَقْنَاكَ ضِعْفَ الْحَيَاةِ وَضِعْفَ الْمَمَاتِ ثُمَّ لَا تَجِدُ لَكَ عَلَيْنَا نَصِيرًا (75)} তাহলে অবশ্যই আমি আপনাকে ইহজীবনে দ্বিগুণ ও পরজীবনে দিগুণ শাস্তি আস্বাদন করাতাম; তখন আমার বিরুদ্ধে আপনার জন্য কোনো সাহায্যকারী পেতেন না। (৭৫)” [আল-ইসরা : ৭৩-৭৫] এই আয়াতগুলো ও তার পূর্বে যা রয়েছে তা সাক্ষ্য ও দলিল যে, জগতসমূহের রবের পক্ষ থেকে আল-কুরআনুল কারীম নাযিলকৃত। কেননা যদি এটি রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে হত, তাহলে তাকে লক্ষ্য করে এসব কথা তাতে উল্লিখিত হত না।
আর আল্লাহ তা‘আলা তাঁর রাসূলদেরকে মানুষ থেকে রক্ষা করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { يَا أَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ ۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُ ۚ وَاللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ النَّاسِ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الْكَافِرِينَ } “হে রাসূল! আপনার রবের কাছ থেকে আপনার প্রতি যা নাযিল হয়েছে তা প্রচার করুন; যদি না করেন তবে তো আপনি তাঁর বার্তা প্রচার করলেন না। আর আল্লাহ আপনাকে মানুষ থেকে রক্ষা করবেন। নিশ্চয় আল্লাহ কাফের সম্প্রদায়কে হেদায়াত করেন না।” [আল-মায়েদাহ : ৬৭] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ نُوحٍ إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ يَا قَوْمِ إِن كَانَ كَبُرَ عَلَيْكُم مَّقَامِي وَتَذْكِيرِي بِآيَاتِ اللَّهِ فَعَلَى اللَّهِ تَوَكَّلْتُ فَأَجْمِعُوا أَمْرَكُمْ وَشُرَكَاءَكُمْ ثُمَّ لَا يَكُنْ أَمْرُكُمْ عَلَيْكُمْ غُمَّةً ثُمَّ اقْضُوا إِلَيَّ وَلَا تُنظِرُونِ } “আর তাদেরকে নূহ্-এর বৃত্তান্ত শোনান। তিনি তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আমার অবস্থিতি ও আল্লাহর আয়াতসমূহ দ্বারা আমার উপদেশ প্রদান তোমাদের কাছে যদি দুঃসহ হয় তবে আমি তো আল্লাহর উপর নির্ভর করি। সুতরাং তোমরা তোমাদের কর্তব্য স্থির করে নাও এবং তোমরা যাদেরকে শরীক করেছ তাদেরকেও ডাক, পরে যেন কর্তব্য বিষয়ে তোমাদের কোনো অস্পষ্টতা না থাকে। তারপর আমার সমন্ধে তোমাদের কাজ শেষ করে ফেল এবং আমাকে অবকাশ দিও না।” [ইউনুস : ৭১] আর আল্লাহ তা‘আলা মূসা আলাইহিস সালামের কথা সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন: {قَالَا رَبَّنَآ إِنَّنَا نَخَافُ أَن يَفۡرُطَ عَلَيۡنَآ أَوۡ أَن يَطۡغَىٰ - قَالَ لَا تَخَافَآۖ إِنَّنِي مَعَكُمَآ أَسۡمَعُ وَأَرَىٰ} “তারা উভয়ে বলল, ‘হে আমাদের রব! আমরা আশংকা করি সে আমাদের উপর বাড়াবাড়ি করবে অথবা অন্যায় আচরণে সীমালংঘন করবে। তিনি বললেন, ‘আপনারা ভয় করবেন না, আমি তো সাহায্য দ্বারা আপনাদের সংগে আছি, আমি শুনি ও আমি দেখি।” [ত্বহা : ৪৫-৪৬] এমনকি আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি তাঁর রাসূলগণ আলাইহিমুস সালামের শত্রু হতে নিরাপত্তাদানকারী, কাজেই তারা তাদের পর্যন্ত কোনো অকল্যাণ পৌঁছাতে সক্ষম নয়। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআলা আরও সংবাদ দিয়েছেন যে, তিনি তার ওহীকে সংরক্ষণ করেন, ফলে তাতে বৃদ্ধি করা যাবেনা এবং তা থেকে হ্রাসও করা যাবেনা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ} “নিশ্চয় আমিই কুরআন নাযিল করেছি এবং আমি অবশ্যই তার সংরক্ষক।” [আল-হিজর : ৯]
নবীগণ আলাইহিমুুস সালাম বিবেক ও সচ্চরিত্র বিরোধী সবকিছু হতে পবিত্র। আল্লাহ তা‘আলা স্বীয় নবী মুহাম্মাদকে পবিত্র ঘোষণা করে বলেন: { وَإِنَّكَ لَعَلَى خُلُقٍ عَظِيمٍ} “আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন।” [আল-কালাম : ৪] তাঁর সম্পর্কে তিনি আরও বলেন: {وَمَا صَاحِبُكُم بِمَجۡنُون} “আর তোমাদের সাথী উন্মাদ নন।” [আত-তাকবীর : ২২] আর তা,তাঁরা যেন উত্তমভাবে রিসালত আদায়ের দায়িত্ব পালন করতে পারেন।আর নবীগণ আ: আল্লাহর নির্দেশসমূহ তাঁর বান্দাদের নিকট পৌঁছাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত,তাঁদের মধ্যে রবের কোন বৈশিষ্ট অথবা কোন ইবাদত পাওয়ার বৈশিষ্ট নেই,বরং তারা অন্যান্য মানুষের মতই মানুষ,তাদের নিকট আল্লাহ স্বীয় রিসালত ওহী করেন।আল্লাহ তায়ালা বলেন: { قَالَتْ لَهُمْ رُسُلُهُمْ إِن نَّحْنُ إِلَّا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ يَمُنُّ عَلَىٰ مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ۖ وَمَا كَانَ لَنَا أَن نَّأْتِيَكُم بِسُلْطَانٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۚ وَعَلَى اللَّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ} “তাদের রাসূলগণ তাদেরকে বললেন, ‘সত্য বটে, আমরা তোমাদের মত মানুষই কিন্তু আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে অনুগ্রহ করেন এবং আল্লাহর অনুমতি ছাড়া তোমাদের কাছে প্রমাণ উপস্থিত করার সাধ্য আমাদের নেই।আর আল্লাহর উপরই মুমিনগণের নির্ভর করা উচিত।” [ইবরাহীম : ১১] আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, তিনি যেন তার জাতিকে বলেন: {قُلْ إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِّثْلُكُمْ يُوحَىٰ إِلَيَّ أَنَّمَا إِلَٰهُكُمْ إِلَٰهٌ وَاحِدٌ ۖ فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا} “বলুন, আমি তোমাদের মতই একজন মানুষ। আমার নিকট অহী প্রেরণ করা হয় যে, তোমাদের মাবূদই একমাত্র মাবূদ। সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম করে এবং তার রবের ইবাদাতে কাউকে শরীক না করে।” [আল-কাহাফ : ১১০]
২৩- ইসলাম বড় বড় মৌলিক ইবাদতের মাধ্যমে এক আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করে, আর তা হচ্ছে সালাত অর্থাৎ কিয়াম, রুকু, সাজদাহ, আল্লাহর যিকর, সানা ও দোআর সমন্বিত ইবাদত, যা প্রত্যেক ব্যক্তি দিনে পাঁচবার আদায় করে। এতে ধনী-গরীব, প্রধান অপ্রধান সবাই এক কাতারে অবস্থান করে কোনো তারতম্য থাকে না। আর যাকাত, তা হচ্ছে সামান্য পরিমাণ অর্থ, যা কতক শর্ত ও আল্লাহ যে পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন তার অনুপাতে ধনীদের সম্পদে ওয়াজিব হয়, যা বছরে একবার ফকির ও অন্যদের প্রদান করা হয়। আর সিয়াম, তা হচ্ছে নফসের ভেতর ইচ্ছা ও সবরকে লালন করে রমযান মাসের দিনে খাদ্য জাতাীয় বস্তু হতে বিরত থাকা। আর হজ্জ, তা হচ্ছে সক্ষম ও সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর জীবনে একবার মক্কাতে অবস্থিত আল্লাহর ঘরের ইচ্ছা করা। এই হজে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করার ক্ষেত্রে সবাই সমান। এতে বিভেদ ও সম্পর্কের বৈষম্য দূর হয়ে যায়।
ইসলাম বড় বড় ও বিভিন্ন ধরনের ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদতের দিকে আহ্বান করে। আর এসব মহান ইবাদতসমূহ আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালামের ওপর ওয়াজিব করেছেন।আর বড় বড় ইবাদত হলো:
প্রথমতঃ সালাত,আল্লাহ এটি সকল মুসলিমের ওপর ফরয করেছেন, যেমন তা ফরয করেছেন সকল নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালামের ওপর। আর আল্লাহ স্বীয় নবী ইবরাহীম খলিল আলাইহিস সালামকে তাওয়াফকারী এবং রুকু ও সাজদাকারী মুসল্লিদের জন্যে তাঁর ঘরকে পবিত্র করতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَإِذْ جَعَلْنَا الْبَيْتَ مَثَابَةً لِّلنَّاسِ وَأَمْنًا وَاتَّخِذُوا مِن مَّقَامِ إِبْرَاهِيمَ مُصَلًّى ۖ وَعَهِدْنَا إِلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَإِسْمَاعِيلَ أَن طَهِّرَا بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْعَاكِفِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ} “আর স্মরণ কর, যখন আমি কাবাকে মানুষের জন্য মিলনকেন্দ্র ও নিরাপদ স্থান বানালাম এবং (আদেশ দিলাম যে,) ‘তোমরা মাকামে ইবরাহীমকে সালাতের স্থানরূপে গ্রহণ কর’। আর আমি ইবরাহীম ও ইসমাঈলের কাছে অঙ্গীকার নিয়েছিলাম যে, ‘তোমরা আমার গৃহকে তাওয়াফকারী, ‘ইতিকাফকারী ও রুকূকারী-সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র কর’।” [আল-বাকারাহ : ১২৫] আল্লাহ তা‘আলা প্রথম সম্বোধনেই মূসা আলাইহিস সালামের ওপর সালাত ওয়াজিব করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { إِنِّي أَنَا رَبُّكَ فَاخْلَعْ نَعْلَيْكَ ۖ إِنَّكَ بِالْوَادِ الْمُقَدَّسِ طُوًى (12) “নিশ্চয় আমি তোমার রব, অতএব তোমার জুতা জোড়া খুলে ফেল, কারণ তুমি পবিত্র ‘তুওয়া’ উপত্যকায় রয়েছো। (১২) وَأَنَا اخْتَرْتُكَ فَاسْتَمِعْ لِمَا يُوحَىٰ (13) আর আমি তোমাকে মনোনীত করেছি, সুতরাং যা ওহীরূপে পাঠানো হচ্ছে তা মনোযোগ দিয়ে শুন। (১৩) إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي (14) } নিশ্চয় আমি আল্লাহ, আমি ছাড়া কোনো সত্য মাবূদ নেই; সুতরাং আমার ইবাদাত কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাত কায়েম কর।” (১৪) [ত্বহা ১২-১৪] ঈসা মাসীহ আলাইহিস সালাম সংবাদ দিয়েছেন যে, আল্লাহ তা‘আলা তাকে সালাত ও যাকাতের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর সংবাদ অনুযায়ী তিনি বলেছেন: { وَجَعَلَنِي مُبَارَكًا أَيْنَ مَا كُنتُ وَأَوْصَانِي بِالصَّلَاةِ وَالزَّكَاةِ مَا دُمْتُ حَيًّا } “যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন, তিনি আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন যতদিন জীবিত থাকি ততদিন সালাত ও যাকাত আদায় করতে।” [মারয়াম : ৩১] ইসলামে সালাত হচ্ছে যথাযথ দাঁড়াানো, রুকু, সাজদাহ, আল্লাহর যিকর-সানা ও দোআর সমষ্টি, যা মানুষ প্রতি দিন পাঁচবার আদায় করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { حَافِظُوا عَلَى الصَّلَوَاتِ وَالصَّلَاةِ الْوُسْطَىٰ وَقُومُوا لِلَّهِ قَانِتِينَ } “তোমরা সালাতসমূহ ও মধ্যবর্তী সালাতের হিফাযত কর এবং আল্লাহর জন্য দাঁড়াও বিনীত হয়ে।” [আল-বাকারাহ : ২৩৮] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {أَقِمِ الصَّلَاةَ لِدُلُوكِ الشَّمْسِ إِلَىٰ غَسَقِ اللَّيْلِ وَقُرْآنَ الْفَجْرِ ۖ إِنَّ قُرْآنَ الْفَجْرِ كَانَ مَشْهُودًا} “সূর্য হেলে পড়ার পর থেকে রাতের ঘন অন্ধকার পর্যন্ত সালাত কায়েম করুন এবং ফজরের সালাত। নিশ্চয় ফজরের সালাত উপস্থিতির সময়।” [আল-ইসরা : ৭৮] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন: (فَأَمَّا الرُّكُوعُ فَعَظِّمُوا فِيهِ الرَّبَّ عَزَّ وَجَلَّ وَأَمَّا السُّجُودُ فَاجْتَهِدُوا فِي الدُّعَاءِ فَقَمِنٌ أَنْ يُسْتَجَابَ لَكُمْ) “আর রুকু, তাতে তোমরা আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ঘোষণা কর, আর সাজদাতে তোমরা খুব বেশি দো‘আ কর, তোমাদের দো‘আ কবুল হওয়ার উপযোগী।” [সহীহ মুসলিম]
দ্বিতীয়ত: যাকাত, এটি আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদের ওপর ফরয করেছেন, যেমন তা ফরয করেছিলেন পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলগণ আলাইহিস সালামের ওপর। আর তা হচ্ছে সামান্য পরিমাণ অর্থ, যা কতক শর্ত ও আল্লাহ যে পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন তার অনুপাতে ধনীদের সম্পদে ওয়াজিব হয়, যা বছরে একবার ফকির ও অন্যদের প্রদান করা হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ ۖ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَّهُمْ ۗ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ } “আপনি তাদের সম্পদ থেকে ‘সাদকা’ গ্রহণ করুন। এর দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র করবেন এবং পরিশোধিত করবেন। আর আপনি তাদের জন্য দো’আ করুন। আপনার দো’আ তো তোদের জন্য প্রশান্তিকর। আর আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” [তাওবাহ : ১০৩] আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুয়ায ইবনে জাবাল রদিয়াল্লাহু ‘আনহুকে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তাকে বলেন: «إِنَّكَ تَأْتِي قَوْمًا أَهْلَ كِتَابٍ فَادْعُهُمِ الَى شَهَادَةِ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللهِ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ فَإِنْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِي أَمْوَالِهِمْ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ فِي فُقَرَائِهِمْ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوكَ لِذَلِكَ فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَالِهِمْ وَاتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ فَإِنَّهَا لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ حِجَابٌ» “এমন একটি জাতির নিকটে তুমি যাচ্ছ যারা আহলে কিতাব। তাদেরকে তুমি আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত আর কোনো সত্য মা'বূদ নেই এবং আমি (মুহাম্মাদ) আল্লাহর রাসূল সাক্ষ্য দেয়ার প্রতি আহবান কর। এটা তারা, মেনে নিলে তাদেরকে জানিয়ে দাও- অবশ্যই তাদের উপর আল্লাহ তা‘আ’লা দিন-রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তারা এটাও মেনে নিলে তাদেরকে জানিয়ে দাও- তাদের ধন-দৌলতে আল্লাহ তা'আলা যাকাত ফরয করে দিয়েছেন, যা তাদের ধনীদের মধ্য হতে গ্রহণ করা হবে ও তাদের গরীবদের মাঝে বণ্টন করা হবে। তারা যদি এটিও মেনে নেয় তাহলে সাবধান! তাদের উত্তম মাল (যাকাত হিসাবে) নেয়া হতে বিরত থাকবে। নিজেকে নিপীড়িতদের অভিশাপ হতে দূরে রাখ। কেননা, তার আবেদন এবং আল্লাহ্ তা'আলার মাঝে কোনো প্রতিবন্ধক নেই।” [তিরিমিযী : ৬২৫]
তৃতীয়ত: সিয়াম, এটি আল্লাহ মুসলিমদের ওপর ফরয করেছেন যেমন ফরয করেছিলেন পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলগণ আলাইহিস সালামের ওপর। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ} “হে মুমিনগণ ! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।” [আল-বাকারাহ : ১৮৩] আর তা হচ্ছে রমযান মাসের দিনে সিয়াম ভঙ্গের কারণগুলো থেকে বিরত থাকা। সিয়াম মানুষের অন্তরে ইচ্ছা ও সবরকে প্রতিপালন করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «يَقُولُ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ: الصَّوْمُ لِي وَأَنَا أَجْزِي بِهِ يَدَعُ شَهْوَتَهُ وَأَكْلَهُ وَشُرْبَهُ مِنْ أَجْلِي وَالصَّوْمُ جُنَّةٌ وَلِلصَّائِمِ فَرْحَتَانِ: فَرْحَةٌ حِينَ يُفْطِرُ وَفَرْحَةٌ حِينَ يَلْقَى رَبَّهُ» “আল্লাহ্ তা’আলা বলেনঃসওম আমার জন্য আর আমিই তার প্রতিদান দেব। সে আমারই জন্য তার প্রবৃত্তি, আহার ও পানীয় ত্যাগ করে। সওম হল ঢাল। আর সওম পালনকারীর জন্য দু’টি খুশী রয়েছে, এক খুশী যখন সে ইফতার করে, আরেকটি খুশী যখন সে তার রবেবর সঙ্গে মিলিত হবে।” [সহীহুল বুখারী ৭৪৯২]
চতুর্থত: হজ্জ, এটি আল্লাহ মুসলিমদের ওপর ফরয করেছেন যেমন ফরয করেছিলেন পূর্ববর্তী নবী ও রাসূলগণ আলাইহিস সালামের ওপর। আর আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালামকে হজের ঘোষণা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَأَذِّن فِي النَّاسِ بِالْحَجِّ يَأْتُوكَ رِجَالًا وَعَلَىٰ كُلِّ ضَامِرٍ يَأْتِينَ مِن كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ } “আর মানুষের নিকট হজ্জের ঘোষণা দাও;তারা তোমার কাছে আসবে পায়ে হেঁটে এবং সর্বপ্রকার কৃশকায় উটে চড়ে দূর পথ পাড়ি দিয়ে।” [হজ্জ : ২৭] আল্লাহ তাকে হাজীদের জন্যে পুরনো ঘর পবিত্র করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَإِذْ بَوَّأْنَا لِإِبْرَاهِيمَ مَكَانَ الْبَيْتِ أَن لَّا تُشْرِكْ بِي شَيْئًا وَطَهِّرْ بَيْتِيَ لِلطَّائِفِينَ وَالْقَائِمِينَ وَالرُّكَّعِ السُّجُودِ } “আর স্মরণ করুন যখন আমি ইবরাহীমের জন্য নির্ধারণ করে দিয়েছিলাম ঘরের স্থান, তখন বলেছিলাম, ‘আমার সাথে কোনো কিছু শরীক করবেন না এবং আমার ঘরকে তাওয়াফকারী, সালাতে দণ্ডায়মান এবং রুকু ও সিজদাকারীদের জন্য পবিত্র রাখুন।” [আল-হজ্জ : ২৬]
আর হজ্জ হচ্ছে, সক্ষম সামর্থবান ব্যক্তির জীবনে একবার নির্দিষ্ট আমলের উদ্দেশ্যে মক্কা মুকাররামায় অবস্থিত বায়তুল্লাহ গমণ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا ۚ وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ } “এবং সামর্থ্যবান মানুষের উপর আল্লাহর জন্য বায়তুল্লাহর হজ্জ করা ফরয। আর যে কুফরী করে, তবে আল্লাহ তো নিশ্চয় সৃষ্টিকুল থেকে অমুখাপেক্ষী।” [আলে ইমরান : ৮] হজে পবিত্র স্রষ্টা আল্লাহর জন্যে একনিষ্ঠভাবে ইবাদত আঞ্জাম দিতে হজপালনকারী মুসলিমগণ একই স্থানে সমবেত হয়। আর সকল হাজী সাদৃশ্যপূর্ণ নিয়মে হজের বিধানগুলো আঞ্জাম দেন, ফলে তাতে পরিবেশ, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার তারতম্য দূর হয়ে যায়।
২৪- আর ইসলামের ইবাদতগুলোকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী স্বাতন্ত্রপূর্ণ করে, সেটি হচ্ছে তার ধরন, সময় ও শর্তসমূহ, যা আল্লাহ তা‘আলা অনুমোদন করেছেন আর তা পৌঁছিয়েছেন তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ তাতে হ্রাস ও বৃদ্ধির হস্তক্ষেপ করতে পারেনি। বড় বড় এসব ইবাদতের দিকেই সকল নবী আলাইহিমুস সালাম আহ্বান করেছেন।
আর ইসলামের ইবাদতগুলোকে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশী স্বাতন্ত্রপূর্ণ করে, সেটি হচ্ছে তার ধরন, সময় ও শর্তসমূহ, যা আল্লাহ তাআলা অনুমোদন করেছেন আর তা পৌঁছিয়েছেন তার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আজ পর্যন্ত কোনো মানুষ তাতে হ্রাস ও বৃদ্ধির হস্তেক্ষপ করতে পারেনি আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { ٱلۡيَوۡمَ أَكۡمَلۡتُ لَكُمۡ دِينَكُمۡ وَأَتۡمَمۡتُ عَلَيۡكُمۡ نِعۡمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ ٱلۡإِسۡلَٰمَ دِينٗاۚ} “আজ আমি তোমাদের জন্যে তোমাদের দীনকে সম্পূর্ণ করলাম আর তোমাদের ওপর আমার নিআমত পূর্ণ করলাম এবং তোমাদের জন্যে ইসলামকে দীন হিসেবে পছন্দ করলাম।” [আল-মায়েদা : ৩] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: {فَٱسۡتَمۡسِكۡ بِٱلَّذِيٓ أُوحِيَ إِلَيۡكَۖ إِنَّكَ عَلَىٰ صِرَٰطٖ مُّسۡتَقِيمٖ} “কাজেই আপনার প্রতি যা ওহী করা হয়েছে তা দৃঢ়ভাবে অবলম্বন করুন। নিশ্চয় আপনি সরল সঠিক পথে রয়েছেন।” [আয-যুখরূফ : ৪৩] আল্লাহ তা‘আলা সালাত সম্পর্কে বলেন: {فَإِذَا قَضَيْتُمُ الصَّلَاةَ فَاذْكُرُوا اللَّهَ قِيَامًا وَقُعُودًا وَعَلَىٰ جُنُوبِكُمْ ۚ فَإِذَا اطْمَأْنَنتُمْ فَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ ۚ إِنَّ الصَّلَاةَ كَانَتْ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ كِتَابًا مَّوْقُوتًا} “অতঃপর যখন তোমরা সালাত পূর্ণ করবে তখন দাঁড়ানো, বসা ও শোয়া অবস্থায় আল্লাহর স্মরণ করবে। অতঃপর যখন নিশ্চিন্ত হবে তখন সালাত (পূর্বের নিয়মে) কায়েম করবে। নিশ্চয় সালাত মুমিনদের উপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরয।” [আন-নিসা : ১০৩] আল্লাহ তা‘আলা যাকাতের খাত সম্পর্কে বলেন: { إِنَّمَا ٱلصَّدَقَٰتُ لِلۡفُقَرَآءِ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡعَٰمِلِينَ عَلَيۡهَا وَٱلۡمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمۡ وَفِي ٱلرِّقَابِ وَٱلۡغَٰرِمِينَ وَفِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِۖ فَرِيضَةٗ مِّنَ ٱللَّهِۗ وَٱللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٞ} “সদকা তো শুধু ফকীর, মিসকীন ও সদকা আদায়ের কাজে নিযুক্ত কর্মচারীদের জন্য, যাদের অন্তর আকৃষ্ট করতে হয় তাদের জন্য, দাসমুক্তিতে, ঋণ ভারাক্রান্তদের জন্য, আল্লাহর পথে ও মুসাফিরদের জন্য। এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।” [আত-তাওবাহ : ৬০] আল্লাহ তা‘আলা সিয়াম সম্পর্কে বলেন: { شَهۡرُ رَمَضَانَ ٱلَّذِيٓ أُنزِلَ فِيهِ ٱلۡقُرۡءَانُ هُدٗى لِّلنَّاسِ وَبَيِّنَٰتٖ مِّنَ ٱلۡهُدَىٰ وَٱلۡفُرۡقَانِۚ فَمَن شَهِدَ مِنكُمُ ٱلشَّهۡرَ فَلۡيَصُمۡهُۖ وَمَن كَانَ مَرِيضًا أَوۡ عَلَىٰ سَفَرٖ فَعِدَّةٞ مِّنۡ أَيَّامٍ أُخَرَۗ يُرِيدُ ٱللَّهُ بِكُمُ ٱلۡيُسۡرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ ٱلۡعُسۡرَ وَلِتُكۡمِلُواْ ٱلۡعِدَّةَ وَلِتُكَبِّرُواْ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمۡ وَلَعَلَّكُمۡ تَشۡكُرُونَ} “রমাদান মাস, এতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের হেদায়াতের জন্য এবং হিদায়াতের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যাসত্যের পার্থক্যকারীরূপে। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে এ মাস পাবে সে যেন এ মাসে সিয়াম পালন করে। তবে তোমাদের কেউ অসুস্থ থাকলে বা সফরে থাকলে অন্য দিনগুলোতে এ সংখ্যা পূরণ করবে। আল্লাহ্ তোমাদের জন্য সহজ চান এবং তোমাদের জন্য কষ্ট চান না। আর যাতে তোমরা সংখ্যা পূর্ণ কর এবং তিনি তোমাদেরকে যে হিদায়াত দিয়েছেন সে জন্য তোমরা আল্লাহর মহিমা ঘোষণা কর এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।” [আল-বাকারা : ১৮৫] আল্লাহ তা‘আলা হজ্ব সম্পর্কে বলেন: { ٱلۡحَجُّ أَشۡهُرٞ مَّعۡلُومَٰتٞۚ فَمَن فَرَضَ فِيهِنَّ ٱلۡحَجَّ فَلَا رَفَثَ وَلَا فُسُوقَ وَلَا جِدَالَ فِي ٱلۡحَجِّۗ وَمَا تَفۡعَلُواْ مِنۡ خَيۡرٖ يَعۡلَمۡهُ ٱللَّهُۗ وَتَزَوَّدُواْ فَإِنَّ خَيۡرَ ٱلزَّادِ ٱلتَّقۡوَىٰۖ وَٱتَّقُونِ يَـٰٓأُوْلِي ٱلۡأَلۡبَٰبِ} “হজ্ব হয় সুবিদিত মাসগুলোতে। তারপর যে কেউ এ মাসগুলোতে হজ্ব করা স্থির করে সে হজ্বের সময় স্ত্রী-সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহ-বিবাদ করবে না। আর তোমরা উত্তম কাজ থেকে যা-ই কর আল্লাহ্ তা জানেন আর তোমরা পাথেয় সংগ্রহ কর। নিশ্চয় সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া। হে বোধসম্পন্ন ব্যক্তিগণ ! তোমরা আমারই তাকওয়া অবলম্বন কর।” [আল-বাকারাহ : ১৯৭] সকল নবী আলাইহিস সালামই এসব মহান ইবাদতের প্রতি আহ্বান করেছেন।
২৫- ইসলামের রাসূল মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ হলেন ইসমাইল ইবনে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বংশধর। ৫৭১খৃস্টাব্দে মক্কায় জন্ম গ্রহণ করেন এবং সেখানেই তাকে প্রেরণ করা হয় অতঃপর সেখান থেকে মদিনায় হিজরত করেন। তিনি কখনো তাঁর জাতির সঙ্গে প্রতিমা পূজা সংক্রান্ত কোনো কর্মে অংশ গ্রহণ করেননি, তবে তাদের সঙ্গে বড় বড় কর্মে অংশ গ্রহণ করতেন। তাঁকে নবী হিসেবে প্রেরণ করার পূর্বে তিনি মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তাঁর জাতি তাকে আল-আমীন বলে ডাকত। যখন তার বয়স চল্লিশ হলো তখন তাকে নবী হিসেবে প্রেরণ করা হলো। আল্লাহ তাকে বড় বড় অনেক মুজিযাহ (অলৌকিক ঘটনাবলী) দ্বারা শক্তিশালী করেছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় নিদর্শন হচ্ছে আল-কুরআনুল কারীম। এটিই হচ্ছে নবীগণের সবচেয়ে বড় নিদর্শন। নবীগণের নিদর্শন হতে এটিই আজ পর্যন্ত অবশিষ্ট রয়েছে। যখন আল্লাহ তাঁর দীনকে পূর্ণ করলেন এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও তা পরিপূর্ণভাবে পৌঁছালেন তখন তিষট্টি বছর বয়সে তিনি মারা যান। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শহর মদীনায় তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন নবী ও রাসূলগণের সর্বশেষ। আল্লাহ তাঁকে হিদায়াত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, যেন মানুষকে মূর্তি পূজা, কুফর ও মূর্খতার অন্ধকার থেকে তাওহীদ ও ঈমানের নূরে বের করে নিয়ে আসেন। আল্লাহ নিজেই সাক্ষ্য দিয়েছেন যে, তিনি তাঁকে স্বীয় অনুমতিতে তার দিকেই আহ্বানকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন।
ইসলামের রাসূল মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল্লাহ হলেন ইসমাইল ইবনে ইবরাহীম আলাইহিস সালামের বংশধর। ৫৭১খৃস্টাব্দে মক্কায় জন্ম গ্রহণ করেন আর সেখানেই তাঁকে প্রেরণ করা হয় এবং মদিনায় হিজরত করেন। তার জাতি তাকে আল-আমীন বলে ডাকত। তিনি কখনো তার জাতির সঙ্গে মূর্তি পূজা সংক্রান্ত কোনো কর্মে অংশ গ্রহণ করেননি, তবে বড় বড় কর্মে তাদের সঙ্গে অংশ গ্রহণ করতেন। তাঁকে নবী হিসেবে প্রেরণ করার পূর্বে তিনি মহান চরিত্রের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। তার রব তাকে মহান চরিত্র দ্বারা ভূষিত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা তার সম্পর্কে বলেন: {وَإِنَّكَ لَعَلَىٰ خُلُقٍ عَظِيمٍ } “আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন।” [আল-কালাম : ৪] যখন তিনি চল্লিশ বছরে উপনীত হলেন আল্লাহ তাকে নবী হিসেবে প্রেরিত করলেন এবং বড় বড় অনেক নির্দশন দ্বারা তাকে শক্তিশালী করলেন, তন্মধ্যে সবচেয়ে বড় নিদর্শন হচ্ছে আল-কুরআনুল কারীম। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «مَا مِنَ الأَنْبِيَاءِ نَبِيٌّ إِلَّا أُعْطِيَ مَا مِثْلهُ آمَنَ عَلَيْهِ البَشَرُ وَإِنَّمَا كَانَ الَّذِي أُوتِيتُ وَحْيًا أَوْحَاهُ اللَّهُ إِلَيَّ فَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَكْثَرَهُمْ تَابِعًا يَوْمَ القِيَامَةِ» “প্রত্যেক নবীকে তাঁর যুগের প্রয়োজন মুতাবিক কিছু মুজিযা দান করা হয়েছে, যা দেখে লোকেরা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে। আমাকে যে মুজিযা দেয়া হয়েছে তা হচ্ছে, ওয়াহী- যা আল্লাহ্ আমার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। কাজেই আমি আশা করি, কিয়ামতের দিন অনুসারীদের অনুপাতে আমিই অধিক হবে।” [সহীহুল বুখারী] আল-কুরআনুল কারীম হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি আল্লাহ তা‘আলার ওহী। আল্লাহ তা‘আলা এ সম্পর্কে বলেন: { ذَٰلِكَ الْكِتَابُ لَا رَيْبَ ۛ فِيهِ ۛ هُدًى لِّلْمُتَّقِينَ } “এই সেই কিতাব, যাতে কোনো সন্দেহ নেই, মুত্তাকীদের জন্য হিদায়াত।” [আল-বাকারা : ২] আল্লাহ তা‘আলা তাতে বলেন: {أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا} “তবে কি তারা কুরআনকে গভীরভাবে অনুধাবন করে না? যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত, তবে তারা এতে অনেক অসঙ্গতি পেত।” [আন-নিসা : ৮২] আর আল্লাহ তা‘আলা জিন ও মানুষের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যে, তারা তাঁর (আল-কুরআনুল কারীমের) মত নিয়ে আসুক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {قُل لَّئِنِ اجْتَمَعَتِ الْإِنسُ وَالْجِنُّ عَلَىٰ أَن يَأْتُوا بِمِثْلِ هَٰذَا الْقُرْآنِ لَا يَأْتُونَ بِمِثْلِهِ وَلَوْ كَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضٍ ظَهِيرًا} “বলুন, ‘যদি কুরআনের অনুরুপ কুরআন আনার জন্য মানুষ ও জিন সমবেত হয় এবং যদিও তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর অনুরুপ আনতে পারবে না।” [আল-ইসরা : ৮৮] আল্লাহ তাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যে, তারা কুরআনুল কারীমের মত দশটি সূরা নিয়ে আসুক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ ۖ قُلْ فَأْتُوا بِعَشْرِ سُوَرٍ مِّثْلِهِ مُفْتَرَيَاتٍ وَادْعُوا مَنِ اسْتَطَعْتُم مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ } “নাকি তারা বলে, ‘সে এটা নিজে রটনা করেছে?’ বলুন, ‘তোমরা যদি (তোমাদের দাবীতে) সত্যবাদী হও তবে তোমরা এর অনুরূপ দশটি সূরা রচনা করে নিয়ে আস এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য যাকে পার (এ ব্যাপারে সাহায্যের জন্য) ডেকে নাও।” [হুদ : ১৩] বরং আল্লাহ তাদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যে, তারা কুরআনুল কারীমের মত একটি সূরা নিয়ে আসুক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ إِن كُنتُمْ صَادِقِينَ} “আর আমি আমার বান্দার উপর যা নাযিল করেছি, যদি তোমরা সে সম্পর্কে সন্দেহে থাক, তবে তোমরা তার মত একটি সূরা নিয়ে আস এবং আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সাক্ষীসমূহকে ডাক; যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” [আল-বাকারা : ২৩]
আল-কুরআনুল আযীম নবীগণের নিদর্শনসমূহ থেকে একমাত্র নিদর্শন যা আজ পর্যন্ত অবশিষ্ট রয়েছে। আর যখন আল্লাহ তা‘আলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্যে দীনকে পূর্ণ করলেন এবং তিনিও তা সম্পূর্ণরূপে পৌঁছালেন, তখন তিনি তেষট্টি বছর বয়সে মারা যান এবং তাঁকে মদিনায় দাফন করা হয়।
রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন নবী ও রাসূলগণের সর্বশেষ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { مَّا كَانَ مُحَمَّدٌ أَبَا أَحَدٍ مِّن رِّجَالِكُمْ وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ ۗ وَكَانَ اللَّهُ بِكُلِّ شَيْءٍ عَلِيمًا} “মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো পুরুষের পিতা নয়; তবে আল্লাহর রাসূল ও সর্বশেষ নবী। আর আল্লাহ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞ।” [আল-আহযাব : ৪০] আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «إِنَّ مَثَلِي وَمَثَلَ الأَنْبِيَاءِ مِنْ قَبْلِي كَمَثَلِ رَجُلٍ بَنَى بَيْتًا فَأَحْسَنَهُ وَأَجْمَلَهُ إِلَّا مَوْضِعَ لَبِنَةٍ مِنْ زَاوِيَةٍ فَجَعَلَ النَّاسُ يَطُوفُونَ بِهِ وَيَعْجَبُونَ لَهُ وَيَقُولُونَ هَلَّا وُضِعَتْ هَذِهِ اللَّبِنَةُ؟ قَالَ: فَأَنَا اللَّبِنَةُ وَأَنَا خَاتِمُ النَّبِيِّينَ» “আমার ও আমার পূর্ববর্তী নবীদের উপমা হচ্ছে সে লোকের মতো যে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করলো। আর প্রাসাদটি খুব সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন করল, তবে তার একপার্শ্বে মাত্র একটি ইটের স্থান খালী রেখে দিলো। লোকেরা প্রাসাদটির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এর প্রশংসা করতে লাগলো এবং বলতে লাগলো, কেন এ ইটটি স্থাপন করা হলো না? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আমি হলাম সেই ইট। আমিই সর্বশেষ নবী।” [সহীহুল বুখারী] ইঞ্জিল গ্রন্থে এসেছে, ঈসা আলাইহিস সালাম রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে সুসংবাদ দিয়ে বলেছেন: ‘নির্মাতারা যে পাথরটিকে বাদ দিয়েছিল তা কোণার প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে, তোমরা কি বইসমূহে কখনও পড়নি: ইয়াসূ (যীশু) তাদেরকে প্রভুর তরফ থেকে বলেছিলেন, তা এটিই ছিল এবং এটি আমাদের চোখে খুব চমৎকার।’ আর বর্তমান বিদ্যমান তওরাত গ্রন্থের ‘আদি পুস্তক’ অংশে মূসা আলাইহিস সালামকে কেন্দ্র করে আল্লাহর বাণী বর্ণিত হয়েছে: (আমি তোমার মতো তাদের ভাইদের মধ্য থেকে একজন নবীকে দাঁড় করব এবং আমার কথা তাঁর মুখে রাখব এবং আমি তাকে যাই নির্দেশ দিব সে তাদেরকে তা বলবে।)
রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তা‘আলার হিদায়েত ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন। আর আল্লাহ সাক্ষী দিয়েছেন যে, তিনি হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত আছেন এবং তিনি তাকে নিজ অনুমতিতে তার দিকেই আহ্বানকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {لَّٰكِنِ اللَّهُ يَشْهَدُ بِمَا أَنزَلَ إِلَيْكَ ۖ أَنزَلَهُ بِعِلْمِهِ ۖ وَالْمَلَائِكَةُ يَشْهَدُونَ ۚ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ شَهِيدًا} “কিন্তু আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন, যা তোমার নিকট তিনি নাযিল করেছেন তার মাধ্যমে। তিনি তা নাযিল করেছেন নিজ জ্ঞানে এবং ফেরেশতারাও সাক্ষ্য দিচ্ছে। আর আল্লাহই সাক্ষীরূপে যথেষ্ট।” [আন-নিসা : ১৬৬] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَىٰ وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ ۚ وَكَفَىٰ بِاللَّهِ شَهِيدًا} “তিনিই তাঁর রাসূলকে পথনির্দেশ ও সত্য দীনসহ প্রেরণ করেছেন, অন্য সমস্ত দীনের উপর একে জয়যুক্ত করার জন্য। আর সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট।” [আল-ফাতহ : ২৮] আল্লাহ তাঁকে হিদায়েত দিয়ে প্রেরণ করেছেন যেন তিনি মানুষদেরকে মূর্তিপূজা, কুফর ও মূর্খতার অন্ধকার থেকে তাওহীদ ও ঈমানের নূরে বের করে আনতে পারেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَهْدِي بِهِ اللَّهُ مَنِ اتَّبَعَ رِضْوَانَهُ سُبُلَ السَّلَامِ وَيُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِهِ وَيَهْدِيهِمْ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ} “এর মাধ্যমে আল্লাহ তাদেরকে শান্তির পথ দেখান, যারা তাঁর সন্তুষ্টির অনুসরণ করে এবং তাঁর অনুমতিতে তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করেন। আর তাদেরকে সরল পথের দিকে হিদায়াত দেন।” [আল-মায়েদা : ১৬] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {الر ۚ كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ إِلَيْكَ لِتُخْرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ بِإِذْنِ رَبِّهِمْ إِلَىٰ صِرَاطِ الْعَزِيزِ الْحَمِيدِ } “আলিফ-লাম-রা, এ কিতাব, আমি এটা আপনার প্রতি নাযিল করেছি যাতে আপনি মানুষদেরকে তাদের রবের অনুমতিক্রমে বের করে আনতে পারেন অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, পরাক্রমশালী, সর্বপ্রশংসিত পথের দিকে।” [ইবরাহীম : ১]
২৬- ইসলামী শরীয়ত, যেটি রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়ে এসেছেন,সেটি আল্লাহর সর্বশেষ বার্তা ও শরীয়ত। আর এটিই পরিপূর্ণ শরীয়ত, তাতে মানুষের দীন ও দুনিয়ার কল্যাণ রয়েছে।এই শরীয়ত সর্বোচ্চ পর্যায়ে যা হেফাজত করে তা হলো: মানুষের দীনসমূহ,তাদের রক্ত,মালসমূহ,বিবেক ও সন্তানাদির।এটি পূর্বের সকল শরীয়ত বিলুপ্তকারী।যেমন পূর্বের শরীয়তগুলো একটি অপরটিকে রহিত করেছে।
ইসলামের যে শরীয়ত নিয়ে রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এসেছেন,সেটিই হচ্ছে আল্লাহর রিসালতসমূহ এবংরব্বানী শরীয়তসমূহের পরিসমাপ্তকারী। আল্লাহ এই রিসালত দ্বারাই দীনকে পূর্ণ করেছেন। আর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করার দ্বারা মানুষের উপর নিয়ামত পূর্ণ হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: {الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِي وَرَضِيتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِينًا} “আজকের দিন আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপূর্ণ করছি। আর তোমাদের ওপর আমার নিআমতকে সম্পন্ন করেছি। আর ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন হিসেবে মনোনিত করেছি।” [আল-মায়েদা : ৩]
বস্তুত ইসলামের শরীয়তই হচ্ছে পূর্ণতার শরীয়ত। আর তাতে রয়েছে মানুষের দীন ও দুনিয়ার কল্যাণ। কারণ এটি পূর্বের শরীয়তসমূহে যা এসেছে তার সব কিছুকে জমা করেছে এবং তাকে পূর্ণ ও সম্পন্ন করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَهْدِي لِلَّتِي هِيَ أَقْوَمُ وَيُبَشِّرُ الْمُؤْمِنِينَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ الصَّالِحَاتِ أَنَّ لَهُمْ أَجْرًا كَبِيرًا } “নিশ্চয়ই এ কুরআন হেদায়াত করে সে পথের দিকে যা সরল, সুদৃঢ় এবং সৎকর্মপরায়ণ মুমিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।” [আল-ইসরা : ৯] ইসলামের শরীয়ত মানুষ থেকে সেসব বোঝাকে অপসারণ করেছে যা পূর্বের উম্মতের ওপর ছিল। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ ۚ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} “যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী; যার গুণাবলী তারা নিজদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল- যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং তার উপর নাযিলকৃত যে আলোকময় কুরআন নাযিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।” [আল-আরাফ : ১৫৭]
ইসলামের শরীয়ত পূর্বের সকল শরীয়ত রহিত ও বিলুপ্তকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ ۖ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ ۚ لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا ۚ وَلَوْ شَاءَ اللَّهُ لَجَعَلَكُمْ أُمَّةً وَاحِدَةً وَلَٰكِن لِّيَبْلُوَكُمْ فِي مَا آتَاكُمْ ۖ فَاسْتَبِقُوا الْخَيْرَاتِ ۚ إِلَى اللَّهِ مَرْجِعُكُمْ جَمِيعًا فَيُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ } “আর আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যথাযথভাবে, এর পূর্বের কিতাবের সত্যায়নকারী ও এর উপর তদারককারীরূপে। সুতরাং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, আপনি তার মাধ্যমে ফয়সালা করুন এবং আপনার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ত্যাগ করে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি নির্ধারণ করেছি শরী‘আত ও স্পষ্ট পন্থা এবং আল্লাহ যদি চাইতেন, তবে তোমাদেরকে এক উম্মত বানাতেন। কিন্তু তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন, তাতে তোমাদেরকে পরীক্ষা করতে চান। সুতরাং তোমরা ভাল কাজে প্রতিযোগিতা কর। আল্লাহরই দিকে তোমাদের সবার প্রত্যাবর্তনস্থল। অতঃপর তিনি তোমাদেরকে অবহিত করবেন, যা নিয়ে তোমরা মতবিরোধ করতে।” [আল-মায়িদাহ : ৪৮] অতএব যে আল-কুরআনুল কারীম শরীয়তকে অন্তর্ভুক্ত করেছে তা তার পূর্বের সকল আল্লাহ প্রদত্ত কিতাবকে সত্যায়নকারী, তার ওপর বিচারক ও তাকে রহিতকারী হিসেবে এসছে।
২৭- আল্লাহ সুবহানাহু অতাআলা তার রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত ইসলাম ছাড়া আর কোনো দীন গ্রহণ করবেন না। অতএব যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করবে সেটি তার থেকে কখনো গ্রহণ করা হবে না।
আল্লাহ সুবহানাহু তা‘আলা তার রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করার পর ইসলাম ছাড়া আর কোনো দীন গ্রহণ করবেন না, যা নিয়ে এসছেন রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আর যে কেউ ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম গ্রহণ করবে সেটি তার থেকে কখনো গ্রহণ করা হবে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَمَن يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَن يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ} “আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [আলু ইমরান : ৮৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { إِنَّ الدِّينَ عِندَ اللَّهِ الْإِسْلَامُ ۗ وَمَا اخْتَلَفَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ إِلَّا مِن بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْعِلْمُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ ۗ وَمَن يَكْفُرْ بِآيَاتِ اللَّهِ فَإِنَّ اللَّهَ سَرِيعُ الْحِسَابِ} “নিশ্চয় ইসলামই আল্লাহর নিকট একমাত্র দীন। আর যাদেরকে কিতাব দেয়া হয়েছিল তারা কেবলমাত্র পরস্পর বিদ্বেষবশতঃ তাদের নিকট জ্ঞান আসার পর মতানৈক্য ঘটিয়েছিল। আর যে আল্লাহর আয়াতসমূহে কুফরী করবে, তবে নিশ্চয় আল্লাহ্ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী।” [আলু ইমরান : ১৯] আর এই ইসলামই হলো ইবরাহীম খলীল আলাইহিস সালামের ধর্ম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَمَن يَرْغَبُ عَن مِّلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَن سَفِهَ نَفْسَهُ ۚ وَلَقَدِ اصْطَفَيْنَاهُ فِي الدُّنْيَا ۖ وَإِنَّهُ فِي الْآخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ} “আর যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ছাড়া ইব্রাহীম এর মিল্লাত হতে আর কে বিমুখ হবে ! দুনিয়াতে তাকে আমরা মনোনীত করেছি; আর আখেরাতেও তিনি অবশ্যই সৎ কর্মশীলদের অন্যতম।” [আল-বাকারাহ : ১৩০] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَمَنْ أَحْسَنُ دِينًا مِّمَّنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ وَاتَّبَعَ مِلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۗ وَاتَّخَذَ اللَّهُ إِبْرَاهِيمَ خَلِيلًا} “তার চেয়ে দীনে আর কে উত্তম যে সৎকর্মপরায়ণ হয়ে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করে এবং একনিষ্ঠভাবে ইবরাহীমের মিল্লাতকে অনুসরণ করে? আর আল্লাহ ইবরাহীমকে অন্তরঙ্গ বন্ধুরূপে গ্রহণ করেছেন।” [আন-নিসা : ১২৫] আল্লাহ তা‘আলা রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে নির্দেশ দিয়েছেন: {قُلْ إِنَّنِي هَدَانِي رَبِّي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ دِينًا قِيَمًا مِّلَّةَ إِبْرَاهِيمَ حَنِيفًا ۚ وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ} “বলুন, ‘নিশ্চয় আমার রব আমাকে সোজা পথের হিদায়াত দিয়েছেন। তা সুপ্রতিষ্ঠিত দীন, ইবরাহীমের আদর্শ, সে ছিল একনিষ্ঠ এবং সে মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল না।” [আল-আনআম : ১৬১]
২৮- আল-কুরআনুল কারীম এমন এক গ্রন্থ যা আল্লাহ তাআলা রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে অহী করেছেন। এটিই হচ্ছে রাব্বুল আলামীনের কালাম। আল্লাহ তা‘আলা মানুষ ও জিনের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন যে, তারা এর মত গ্রন্থ অথবা তার একটি সূরার মত সূরা নিয়ে আসুক। আজ পর্যন্ত সেই চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান আছে। আল-কুরআনুল কারীম অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দেয়, যা লক্ষ লক্ষ মানুষকে অবাক করে দিয়েছে। আল-কুরআনুল আযীম আজ পর্যন্ত আরবী ভাষায় সংরক্ষিত, যেই ভাষায় এটি নাযিল হয়েছে, তার থেকে একটি হরফও হ্রাস পায়নি। এটি প্রকাশিত ও মুদ্রিত। এটি অলৌকিক মহান কিতাব, যা পাঠ করা অথবা তার অর্থানুবাদ পাঠ করা খুবই জরুরি। যেমনিভাবে নির্ভরযোগ্য রাবীদের (বর্ণনাকারীদের) পরম্পরায় রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত, তার শিক্ষা ও তার জীবনী সংরক্ষিত ও বর্ণিত রয়েছে। এটিও আরবী ভাষায় মুদ্রিত, যে ভাষায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কথা বলেছেন। এটিও অনেক ভাষায় অনুবাদিত। আল-কুরআনুল কারীম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত দুটোই ইসলামের বিধি-বিধান ও তার শরীয়তের একমাত্র উৎস। অতএব ইসলাম ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের আচরণ থেকে গ্রহণ করা যাবে না, বরং সেটি গ্রহণ করতে হবে আল্লাহর অহীঃ আল-কুরআনুল আযীম ও নবীর সুন্নাত থেকে।
আল-কুরআনুল কারীম এমন এক গ্রন্থ যা আল্লাহ তাআলা আরবী রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে আরবী ভাষায় অহী করেছেন। আর তাই হচ্ছে রাব্বুল আলামীনের কালাম। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَإِنَّهُ لَتَنزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ (192) “আর নিশ্চয় এটা (আল-কুরআন) সৃষ্টিকুলের রব হতে নাযিলকৃত। (১৯২) نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ (193) বিশ্বস্ত রূহ (জিবরাঈল) তা নিয়ে নাযিল হয়েছেন। (১৯৩) عَلَىٰ قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنذِرِينَ (194) আপনার হৃদয়ে, যাতে আপনি সতর্ককারীদের অন্তর্ভুক্ত হন। (১৯৪) بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُّبِينٍ (195)} সুস্পষ্ট আরবী ভাষায়। (১৯৫)” [আশ-শু‘আরা : ১৯২, ১৯৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { وَإِنَّكَ لَتُلَقَّى الْقُرْآنَ مِن لَّدُنْ حَكِيمٍ عَلِيمٍ } “আর নিশ্চয় আপনি আল-কুরআন প্রাপ্ত হচ্ছেন প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞের নিকট থেকে।” [আন-নামাল : ৬] এই কুরআন আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত এবং তার পূর্বের আল্লাহ প্রদত্ত কিতাবের সত্যায়নকারী। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَمَا كَانَ هَٰذَا الْقُرْآنُ أَن يُفْتَرَىٰ مِن دُونِ اللَّهِ وَلَٰكِن تَصْدِيقَ الَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَتَفْصِيلَ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِن رَّبِّ الْعَالَمِينَ} “আর এ কুরআন আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো রচনা হওয়া সম্ভব নয়। বরং এর আগে যা নাযিল হয়েছে এটা তার সত্যায়ন এবং সেগুলোর বিশদ ব্যাখ্যা দানকারী। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এটা সৃষ্টিকুলের রবের পক্ষ থেকে।” [ইউনুস : ৩৭] ইহুদী ও খ্রীস্টানেরা তাদের দীনের ব্যাপারে যেসব মাসআলায় মত বিরোধ করেছে তার অধিকাংশ মাসআলায় আল-কুরআনুল আযীম সঠিক সিদ্ধান্ত পেশ করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {إِنَّ هَٰذَا الْقُرْآنَ يَقُصُّ عَلَىٰ بَنِي إِسْرَائِيلَ أَكْثَرَ الَّذِي هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ } “নিশ্চয় এ কুরআন তাদের কাছে বর্ণনা করছে, বনী ইসরাঈল যেসব বিষয়ে বিতর্ক করে তার অধিকাংশই।” [আন-নামাল : ৭৬] আল-কুরআনুল আযীম আল্লাহ তাআলা এবং তাঁর দীন ও পুরষ্কার সম্পর্কিত হাকিকত (বাস্তবতা) জানার এমন সব দলিল ও প্রমাণ অন্তর্ভুক্ত করেছে যার ফলে মানুষের ওপর প্রমাণ সাব্যস্ত হয়ে যায়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَلَقَدْ ضَرَبْنَا لِلنَّاسِ فِي هَٰذَا الْقُرْآنِ مِن كُلِّ مَثَلٍ لَّعَلَّهُمْ يَتَذَكَّرُونَ} “আর অবশ্যই আমরা এ কুরআনে মানুষের জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত উপস্থিত করেছি, যাতে তারা উপদেশ গ্ৰহণ করে।” [আয-যুমার : ২৭] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: {وَنَزَّلۡنَا عَلَيۡكَ ٱلۡكِتَٰبَ تِبۡيَٰنٗا لِّكُلِّ شَيۡءٖ وَهُدٗى وَرَحۡمَةٗ وَبُشۡرَىٰ لِلۡمُسۡلِمِينَ} “আর আমি আপনার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি প্রত্যেক বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যাস্বরূপ, পথনির্দেশ, রহমত ও মুসলিমদের জন্য সুসংবাদস্বরূপ।” [আন-নাহাল : ৮৯]
আল-কুরআনুল কারীম অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর প্রদান করে, যা লক্ষ লক্ষ মানুষকে অবাক করে দিয়েছে। যেমন আল্লাহ আসমান ও জমিন কিভাবে সৃষ্টি করেছেন কুরআনুল কারীম তার ব্যাখ্যা প্রদান করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {أَوَلَمْ يَرَ الَّذِينَ كَفَرُوا أَنَّ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ كَانَتَا رَتْقًا فَفَتَقْنَاهُمَا ۖ وَجَعَلْنَا مِنَ الْمَاءِ كُلَّ شَيْءٍ حَيٍّ ۖ أَفَلَا يُؤْمِنُونَ } “যারা কুফরী করে তারা কি দেখে না যে, আসমানসমূহ ও যমীন মিশে ছিল ওতপ্রোতভাবে,তারপর আমি উভয়কে পৃথক করে দিলাম এবং যত প্রাণী ও উদ্ভিদ সৃষ্টি করলাম পানি থেকে; তবুও কি তারা ঈমান আনবে না?” [আল-আম্বিয়া : ৩০] আর আল্লাহ তা‘আলা কিভাবে মানুষ সৃষ্টি করেছেন, তিনি বলেন: { يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّنَ الْبَعْثِ فَإِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن تُرَابٍ ثُمَّ مِن نُّطْفَةٍ ثُمَّ مِنْ عَلَقَةٍ ثُمَّ مِن مُّضْغَةٍ مُّخَلَّقَةٍ وَغَيْرِ مُخَلَّقَةٍ لِّنُبَيِّنَ لَكُمْ ۚ وَنُقِرُّ فِي الْأَرْحَامِ مَا نَشَاءُ إِلَىٰ أَجَلٍ مُّسَمًّى ثُمَّ نُخْرِجُكُمْ طِفْلًا ثُمَّ لِتَبْلُغُوا أَشُدَّكُمْ ۖ وَمِنكُم مَّن يُتَوَفَّىٰ وَمِنكُم مَّن يُرَدُّ إِلَىٰ أَرْذَلِ الْعُمُرِ لِكَيْلَا يَعْلَمَ مِن بَعْدِ عِلْمٍ شَيْئًا ۚ وَتَرَى الْأَرْضَ هَامِدَةً فَإِذَا أَنزَلْنَا عَلَيْهَا الْمَاءَ اهْتَزَّتْ وَرَبَتْ وَأَنبَتَتْ مِن كُلِّ زَوْجٍ بَهِيجٍ } “হে মানুষ! যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক তবে নিশ্চয়ই জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্র থেকে, তারপর তা পরিণত হওয়া জমাট রক্ত থেকে, তারপর পূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট অথবা অপূর্ণাকৃতিবিশিষ্ট গোশ্ত থেকে। তোমাদের নিকট বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করার নিমিত্তে। আর আমি যা ইচ্ছা করি তা একটি নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত মাতৃগর্ভে অবস্থিত রাখি। অতঃপর আমি তোমাদেরকে শিশুরূপে বের করি, পরে যাতে তোমরা যৌবনে উপনীত হও। তোমাদের মধ্যে কারো কারো মৃত্যু দেয়া হয় এ বয়সেই, আবার কাউকে কাউকে ফিরিয়ে নেয়া হয় হীনতম বয়সে, যাতে সে জ্ঞান লাভের পরও কিছু না জানে। তুমি জমিনকে দেখতে পাও শুষ্কাবস্থায়, অতঃপর যখনই আমি তাতে পানি বর্ষণ করি, তখন তা আন্দোলিত ও স্ফীত হয় এবং উদগত করে সকল প্রকার সুদৃশ্য উদ্ভিদ।” [আল-হাজ্জ: ৫] এই জীবনের পর মানুষের প্রত্যাবর্তন কোথায় এবং নেককার ও বদকারের প্রতিদান কী তাও বর্ণনা করে। এই বিষয়ের দলিল (২০) নং অংশে উল্লেখ হয়েছে। আর এই অস্তিত্ব এমনিতেই এসছে নাকি কোনো গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে তাও বর্ণনা করে? আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { أَوَلَمْ يَنظُرُوا فِي مَلَكُوتِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ مِن شَيْءٍ وَأَنْ عَسَىٰ أَن يَكُونَ قَدِ اقْتَرَبَ أَجَلُهُمْ ۖ فَبِأَيِّ حَدِيثٍ بَعْدَهُ يُؤْمِنُونَ} “তারা কি দৃষ্টিপাত করেনি আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্বে এবং আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার প্রতি? আর (এর প্রতি যে) হয়তো তাদের নির্দিষ্ট সময় নিকটে এসে গিয়েছে? সুতরাং তারা এ কুরআনের পর আর কোন কিতাবের প্রতি ঈমান আনবে।“ [আল-আরাফ : ১৮৫] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: { أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ} “তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?” [আল-মুমিনুন : ১১৫]
আল-কুরআনুল আযীম যে ভাষাতে নাযিল হয়েছে আজ পর্যন্ত সে ভাষাতেই সংরক্ষিত রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ } “নিশ্চয় আমি কুরআন নাযিল করেছি এবং আমি অবশ্যই তার সংরক্ষক।” [আল-হিজর : ৯] কুরআন থেকে একটি হরফও হ্রাস পায়নি, বস্তুতে তাতে বৈপরীত্ব অথবা ত্রুটি অথবা বিকৃতি ঘটা অসম্ভব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا} “তবে কি তারা কুরআনকে গভীরভাবে অনুধাবন করে না? যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত, তবে তারা এতে অনেক অসঙ্গতি পেত।” [আন-নিসা : ৮২] কুরআন প্রকাশিত ও মুদ্রিত কিতাব। এটি অলৌকিক মহান কিতাব, যা পাঠ করা অথবা তার দিকে মনোনিবেশ করা অথবা তার অর্থানুবাদ পাঠ করা খুবই জরুরি। যেমনিভাবে নির্ভরযোগ্য রাবীদের (বর্ণনাকারীদের) পরম্পরায় রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত, তার শিক্ষা ও তার জীবনী আরবী ভাষায় সংরক্ষিত ও বর্ণিত রয়েছে, যে ভাষায় কথা বলেছেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তা অনেক ভাষায় অনূদিত।আল-কুরআনুল কারীম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত দুটোই ইসলামের বিধি-বিধান ও তার শরীয়তের একমাত্র উৎস।অতএব ইসলাম ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গের আচরণ থেকে গ্রহণ করা যাবে না, বরং সেটি গ্রহণ করতে হবে আল্লাহর নির্ভুল অহী থেকেঃ আল-কুরআনুল আযীম ও নববী সুন্নাত। আল্লাহ তা‘আলা কুরআন প্রসঙ্গে বলেন: { إِنَّ ٱلَّذِينَ كَفَرُواْ بِٱلذِّكۡرِ لَمَّا جَآءَهُمۡۖ وَإِنَّهُۥ لَكِتَٰبٌ عَزِيزٞ - لَّا يَأۡتِيهِ ٱلۡبَٰطِلُ مِنۢ بَيۡنِ يَدَيۡهِ وَلَا مِنۡ خَلۡفِهِۦۖ تَنزِيلٞ مِّنۡ حَكِيمٍ حَمِيدٖ} “নিশ্চয় যারা তাদের কাছে কুরআন আসার পর তার সাথে কুফরী করে (তাদেরকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে); আর এ তো অবশ্যই এক সম্মানিত গ্রন্থ। বাতিল এতে অনুপ্রবেশ করতে পারে না সামনে থেকেও না, পিছন থেকেও না। এটা প্রজ্ঞাময়, চিরপ্ৰশংসিতের কাছ থেকে নাযিলকৃত।” [ফুসসিলাত : ৪১-৪২] আর নবীর সুন্নাত এবং তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অহী হওয়া প্রসঙ্গে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَمَآ ءَاتَىٰكُمُ ٱلرَّسُولُ فَخُذُوهُ وَمَا نَهَىٰكُمۡ عَنۡهُ فَٱنتَهُواْۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ شَدِيدُ ٱلۡعِقَابِ} “আর রাসূল তোমাদেরকে যা দেয় তা তোমারা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ্ শাস্তি দানে কঠোর।” [আল-হাশর : ৭]
২৯- ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণ করার প্রতি নির্দেশ দেয়, যদিও তারা অমুসলিম হয় এবং সন্তানদের প্রতি হিতকামনার উপদেশ প্রদান করে।
ইসলাম পিতা-মাতার প্রতি সদাচারণ করার নির্দেশ প্রদান করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَقَضَىٰ رَبُّكَ أَلَّا تَعْبُدُوا إِلَّا إِيَّاهُ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ۚ إِمَّا يَبْلُغَنَّ عِندَكَ الْكِبَرَ أَحَدُهُمَا أَوْ كِلَاهُمَا فَلَا تَقُل لَّهُمَا أُفٍّ وَلَا تَنْهَرْهُمَا وَقُل لَّهُمَا قَوْلًا كَرِيمًا } “আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন একমাত্র তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদাত না করতে ও পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদেরকে 'উফ' বল না এবং তাদেরকে ধমক দিও না; তাদের সাথে সম্মানসূচক কথা বল।” [আল-ইসরা : ২৩] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ وَهْنًا عَلَىٰ وَهْنٍ وَفِصَالُهُ فِي عَامَيْنِ أَنِ اشْكُرْ لِي وَلِوَالِدَيْكَ إِلَيَّ الْمَصِيرُ } “আর আমি মানুষকে তার মাতাপিতার ব্যাপারে (সদাচরণের) নির্দেশ দিয়েছি। তার মা কষ্টের পর কষ্ট ভোগ করে তাকে গর্ভে ধারণ করেছে। আর তার দুধ পান শেষ করিয়েছে দুবছরে; সুতরাং আমার ও তোমার পিতা-মাতার শুকরিয়া আদায় কর। প্রত্যাবর্তন তো আমার কাছেই।” [লুকমান : ১৪] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَوَصَّيْنَا الْإِنسَانَ بِوَالِدَيْهِ إِحْسَانًا ۖ حَمَلَتْهُ أُمُّهُ كُرْهًا وَوَضَعَتْهُ كُرْهًا ۖ وَحَمْلُهُ وَفِصَالُهُ ثَلَاثُونَ شَهْرًا ۚ حَتَّىٰ إِذَا بَلَغَ أَشُدَّهُ وَبَلَغَ أَرْبَعِينَ سَنَةً قَالَ رَبِّ أَوْزِعْنِي أَنْ أَشْكُرَ نِعْمَتَكَ الَّتِي أَنْعَمْتَ عَلَيَّ وَعَلَىٰ وَالِدَيَّ وَأَنْ أَعْمَلَ صَالِحًا تَرْضَاهُ وَأَصْلِحْ لِي فِي ذُرِّيَّتِي ۖ إِنِّي تُبْتُ إِلَيْكَ وَإِنِّي مِنَ الْمُسْلِمِينَ } “আর আমি মানুষকে তার মাতা -পিতার প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করে কষ্টের সাথে এবং প্রসব করে কষ্টের সাথে, তাকে গর্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্য ছাড়াতে লাগে ত্ৰিশ মাস, অবশেষে যখন সে পূর্ণ শক্তিপ্রাপ্ত হয় এবং চল্লিশ বছরে উপনীত হয়, তখন সে বলে ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন, যাতে আমি আপনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, আমার প্রতি ও আমার পিতা-মাতার প্রতি আপনি যে অনুগ্রহ করেছেন, তার জন্য এবং যাতে আমি এমন সৎকাজ করতে পারি যা আপনি পছন্দ করেন; আর আমার জন্য আমার সন্তান–সন্ততিদেরকে সংশোধন করে দিন, নিশ্চয় আমি আপনারই অভিমুখী হলাম এবং নিশ্চয় আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত ।” [আল-আহকাফ : ১৫] আর আবু হুরাইরাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন: جَاءَ رَجُلٌ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَحَقُّ النَّاسِ بِحُسْنِ صَحَابَتِي؟ قَالَ: «أُمُّكَ» قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «ثُمَّ أُمُّكَ» قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «ثُمَّ أُمُّكَ» قَالَ: ثُمَّ مَنْ؟ قَالَ: «ثُمَّ أَبُوكَ» জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহর রাসূল! মানুষের মধ্যে আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সর্বাধিক অধিকারী ব্যক্তি কে? তিনি বললেন, “তোমার মা।” সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, “তোমার মা।” সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, “তারপরও তোমার মা।” সে বলল, তারপর কে? তিনি বললেন, “তোমার পিতা।” [সহীহ মুসলিম]
পিতা-মাতা মুসলিম হোক কিংবা অমুসলিম তাদের উভয়ের প্রতি সদ্ব্যবহারের এই নির্দেশ সমানভাবে প্রযোজ্য। আসমা বিনত আবু বকর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: (قَدِمَتْ أُمِّي وَهِيَ مُشْرِكَةٌ فِي عَهْدِ قُرَيْشٍ وَمُدَّتِهِمْ إِذْ عَاهَدُوا النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَعَ ابْنِهَا فَاسْتَفْتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقُلْتُ: إِنَّ أُمِّي قَدِمَتْ وَهِيَ رَاغِبَةٌ، أَفَأَصِلُهَا؟ قَالَ: «نَعَمْ صِلِي أُمَّكِ» “আমার মা মুশরিক অবস্থায় কুরাইশদের যুগে এবং তাদের সময়ে, যেহেতু তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল, তার ছেলের সঙ্গে আমার কাছে আগমন করেন। ফলে আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট ফতোয়া তলব করলাম এবং বললাম, আমার মা আমার নিকট এসছেন এবং তিনি আত্মিয়তার প্রতি আগ্রহী, আমি কী তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখবো ? তিনি বললেন, হ্যাঁ, তোমার মার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো।” [সহীহুল বুখারী] বরং যদি পিতা-মাতা উভয় সন্তানকে ইসলাম থেকে কুফরে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা ও তদবির করে, তখন -এই অবস্থাতে ইসলাম তাকে নির্দেশ দেয় যে, তাদের অনুসরণ করবে না আর আল্লাহর প্রতি ঈমানদার হিসেবে অবস্থান করবে এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করবে ও তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَإِن جَٰهَدَاكَ عَلَىٰٓ أَن تُشۡرِكَ بِي مَا لَيۡسَ لَكَ بِهِۦ عِلۡمٞ فَلَا تُطِعۡهُمَاۖ وَصَاحِبۡهُمَا فِي ٱلدُّنۡيَا مَعۡرُوفٗاۖ وَٱتَّبِعۡ سَبِيلَ مَنۡ أَنَابَ إِلَيَّۚ ثُمَّ إِلَيَّ مَرۡجِعُكُمۡ فَأُنَبِّئُكُم بِمَا كُنتُمۡ تَعۡمَلُونَ} “আর তোমার পিতা-মাতা যদি তোমাকে আমার সাথে শির্ক করার জন্য পীড়াপীড়ি করে, যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তাহলে তুমি তাদের কথা মেনো না এবং দুনিয়াতে তাদের সাথে বসবাস করবে সদ্ভাবে আর যে আমার অভিমুখী হয়েছে তার পথ অনুসরণ কর। তারপর তোমাদের ফিরে আসা আমারই কাছে, তখন তোমরা যা করতে সে বিষয়ে আমি তোমাদেরকে অবহিত করব।” [লুকমান : ১৫]
ইসলাম মুসলিমকে তার মুশরিক আত্মীয়-স্বজনের প্রতি অথবা অনাত্বীয় মুশরিকদের প্রতি যদি তারা তার সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত না হয় তবে তাদের সাথে সদ্ব্যবহার করতে নিষেধ করে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { لَّا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُم مِّن دِيَارِكُمْ أَن تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ } “দীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে স্বদেশ থেকে বহিস্কার করেনি তাদের প্রতি মহানুভবতা দেখাতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণদেরকে ভালবাসেন।” [আল-মুমতাহিনা : ৮]
ইসলাম সন্তানদের প্রতি হিতাকাঙ্খী হওয়ার নির্দেশ দেয়,আর ইসলাম পিতাকে সবচেয়ে বড় নির্দেশ এই দেয় যে, সে যেন তার সন্তানদের ওপর তাদের রবের হকসমূহ শিক্ষা দেয়। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার চাচাতো ভাই আব্দুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে বলেছেন: «يَا غُلامُ أَوْ يَا غُلَيِّمُ أَلا أُعَلِّمُكَ كَلِمَاتٍ يَنْفَعُكَ اللهُ بِهِنَّ؟ فَقُلْتُ: بَلَى. فَقَالَ: "احْفَظِ اللهَ يَحْفَظْكَ احْفَظِ اللهَ تَجِدْهُ أَمَامَكَ تَعَرَّفْ إِلَيْهِ فِي الرَّخَاءِ يَعْرِفْكَ فِي الشِّدَّةِ وَإِذَا سَأَلْتَ فَاسْأَلِ اللهَ وَإِذَا اسْتَعَنْتَ فَاسْتَعِنْ بِاللهِ» “হে বৎস অথবা হে কচি ছেলে, আমি কি তোমাকে কিছু বাক্য শিক্ষা দেব না যার দ্বারা আল্লাহ তোমাকে উপকৃত করবেন ? আমি বললাম, অবশ্যই। তিনি বললেন, তুমি আল্লাহকে হিফাযত কর আল্লাহ তোমাকে হিফাযত করবেন। তুমি আল্লাহকে হিফাযত কর তোমার সামনেই তাঁকে পাবে। তুমি স্বাচ্ছন্দে তাঁকে স্মরণ করলে তিনি মুসিবতে তোমাকে স্মরণ করবেন। আর যখন চাইবে তখন আল্লাহর নিকট চাইবে,আর যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে তখন আল্লাহর নিকট সাহায্য প্রার্থনা করবে।” [হাদীসটি আহমাদ বর্ণনা করেছেন : ৪/২৮৭]
আল্লাহ তাআলা পিতা-মাতাকে তাদের সন্তানদের এমন কিছৃু শিখাতে নির্দেশ দিয়েছেন যা তাদের দীনি ও দুনিয়াবী বিষয়ে তাদের উপকার করবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ قُوٓاْ أَنفُسَكُمۡ وَأَهۡلِيكُمۡ نَارٗا وَقُودُهَا ٱلنَّاسُ وَٱلۡحِجَارَةُ عَلَيۡهَا مَلَـٰٓئِكَةٌ غِلَاظٞ شِدَادٞ لَّا يَعۡصُونَ ٱللَّهَ مَآ أَمَرَهُمۡ وَيَفۡعَلُونَ مَا يُؤۡمَرُونَ} “হে ইমানদারগণ! তোমারা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে রক্ষা কর আগুন থেকে, যার ইন্ধন হবে মানুষ এবং পাথর, যাতে নিয়োজিত আছে নির্মম, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ, যারা অমান্য করে না তা, যা আল্লাহ তাদেরকে আদেশ করেন। আর তারা যা করতে আদেশপ্ৰাপ্ত হয় তা-ই করে।” [তাহরীম : ৬] আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে আল্লাহর বাণী সম্পর্কে বর্ণিত আছে: {قُوا أَنفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا } “তোমরা নিজেদেরকে ও তোমাদের পরিবারকে আগুন থেকে বাঁচাও।” তিনি বলতেন, ”তাদেরকে আদব ও ইলম শিক্ষা দাও।” আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও পিতার প্রতি তার সন্তানকে সালাত শিক্ষা দিতে নির্দেশ দিয়েছেন যেন সে সালাতে অভ্যস্ত হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (مُرُوا أولاكمِ بالصلاةِ وهم أبناءُ سبعِ سِنينَ) “তোমরা তোমাদের সন্তানদেরকে সালাতের নির্দেশ দাও, যখন তারা সাত বছরের হয়।” [হাদীসটি আবু দাঊদ বর্ণনা করেছেন] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরও বলেন: «كُلُّكُمْ رَاعٍ وَكُلُّكُمْ مَسْؤولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ الإِمَامُ رَاعٍ وَمَسْؤولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالرَّجُلُ رَاعٍ فِي أَهْلِهِ وَهُوَ مَسْؤولٌ عَنْ رَعِيَّتِهِ وَالمَرْأَةُ رَاعِيَةٌ فِي بَيْتِ زَوْجِهَا وَمَسْؤولَةٌ عَنْ رَعِيَّتِهَا والخادمُ راعٍ في مالِ سيِّدِه ومسؤولٌ عن رعيَّتِه وكلُّكم راعٍ ومسؤولٌ عن رعيَّتِه» “তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল আর তোমরা প্রত্যেকে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ইমাম দায়িত্বশীল, সে তার প্রজাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। ব্যক্তি তার পরিবারে দায়িত্বশীল, সে তার দায়িত্ সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। নারী তার স্বামীর ঘরে দায়িত্বশীল, সে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। খাদিম তার মনিবের সম্পদে দায়িত্বশীল, সে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। বস্তুত তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল আর তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” [সহীহ ইবন হিব্বান ৪৪৯০]
ইসলাম পিতাকে তার সন্তানাদি ও পরিবারের ওপর খরচ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর কিছু বিষয় (১৮) নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়েছে আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানদের ওপর খরচ করার ফজিলত বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন: «أَفْضَلُ دِينَارٍ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ: دِينَارٌ يُنْفِقُهُ عَلَى عِيَالِهِ وَدِينَارٌ يُنْفِقُهُ الرَّجُلُ عَلَى دَابَّتِهِ فِي سَبِيلِ اللهِ وَدِينَارٌ يُنْفِقُهُ عَلَى أَصْحَابِهِ فِي سَبِيلِ اللهِ». قَالَ أَبُو قِلَابَةَ: " وَبَدَأَ بِالْعِيَالِ ثُمَّ قَالَ أَبُو قِلَابَةَ: وَأَيُّ رَجُلٍ أَعْظَمُ أَجْرًا مِنْ رَجُلٍ يُنْفِقُ عَلَى عِيَالٍ صِغَارٍ يُعِفُّهُمْ أَوْ يَنْفَعُهُمُ اللهُ بِهِ وَيُغْنِيهِمْ" “সর্বোত্তম দীনার (টাকা-পয়সা) যা ব্যক্তি খরচ করে: এমন দীনার যা ব্যক্তি তার পরিবার-পরিজনের ওপর খরচ করে এবং এমন দীনার যা ব্যক্তি আল্লাহর পথে (অর্থাৎ জিহাদের উদ্দেশে) তার বাহনের ওপর খরচ করে এবং এমন দীনার যা সে আল্লাহর পথে তার সঙ্গীসাথীদের ওপর খরচ করে। আবূ কিলাবাহ বলেন, তিনি পরিবারের লোকজন দিয়ে শুরু করেছেন। অতঃপর আবূ কিলাবাহ বলেন, ঐ ব্যক্তির চেয়ে আর কে বেশী সাওয়াবের অধিকারী যে তার ছোট সন্তানদের জন্য খরচ করে এবং আল্লাহ তা'আলা এর বিনিময়ে তাদেরকে পবিত্র রাখেন, উপকৃত করেন এবং অভাব মুক্ত রাখেন।” [সহীহ মুসলিম ৯৯৪]
৩০- ইসলাম কথা ও কর্মে ইনসাফ করার নির্দেশ দেয়, এমনকি শত্রুর সঙ্গেও।
আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতাআলা স্বীয় কর্মে ও বান্দাদের মাঝে তার পরিকল্পনায় ইনসাফ ও ন্যায়ের গুণেগুণান্বিত। তিনি যা নির্দেশ দিয়েছেন ও যা থেকে নিষেধ করেছেন এবং তিনি যা সৃষ্টি করেছেন ও যা নির্ধারণ করেছেন সব ক্ষেত্রেই সঠিক ও সোজা পথের ওপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ ۚ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ } “আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) মাবূদ নেই, আর ফেরেশ্তা ও জ্ঞানীগণও। তিনি ন্যায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) মাবূদ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আলু ইমরান : ১৮] আল্লাহ ইনসাফ করার নির্দেশ দেন, আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {قُلْ أَمَرَ رَبِّي بِالْقِسْطِ} “বলুন, ‘আমার রব নির্দেশ দিয়েছেন ন্যায়বিচারের।” [আল-আরাফ : ২৯] প্রত্যেক রাসূল ও নবী আলাইহিমুস সালাম ইনসাফ সঙ্গে করেই এসছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ } “অবশ্যই আমি আমার রাসূলগণকে পাঠিয়েছি স্পষ্ট প্রমাণসহ এবং তাদের সঙ্গে দিয়েছি কিতাব ও ন্যায়ের পাল্লা, যাতে মানুষ সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে।” [আল-হাদীদ: ২৫] মিযান হচ্ছে কথা ও কর্মে ন্যায়পরায়নতা।
ইসলাম কথা ও কর্মে ইনসাফের নির্দেশ দেয় এমনকি শত্রুর সঙ্গেও। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَىٰ أَنفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ ۚ إِن يَكُنْ غَنِيًّا أَوْ فَقِيرًا فَاللَّهُ أَوْلَىٰ بِهِمَا ۖ فَلَا تَتَّبِعُوا الْهَوَىٰ أَن تَعْدِلُوا ۚ وَإِن تَلْوُوا أَوْ تُعْرِضُوا فَإِنَّ اللَّهَ كَانَ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرًا} “হে মুমিনগণ, তোমরা ন্যায়ের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত থাকবে আল্লাহর জন্য সাক্ষীরূপে। যদিও তা তোমাদের নিজদের কিংবা পিতা-মাতার অথবা নিকটাত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়। যদি সে বিত্তশালী হয় কিংবা দরিদ্র, তবে আল্লাহ উভয়ের ঘনিষ্ঠতর। সুতরাং ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে তোমরা প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। আর যদি তোমরা ঘুরিয়ে- পেঁচিয়ে কথা বল কিংবা এড়িয়ে যাও তবে আল্লাহ তোমরা যা কর সে বিষয়ে সম্যক অবগত।” [আন-নিসা : ১৩৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَن صَدُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَن تَعْتَدُوا ۘ وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ ۖ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ ۚ وَاتَّقُوا اللَّهَ ۖ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ} “তোমাদেরকে মসজিদুল হারামে প্রবেশে বাঁধা দেয়ার কারণে কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনই সীমালঙ্ঘনে প্ররোচিত না করে। নেককাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পর সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালংঘনে একে অন্যের সাহায্য করবে না। আর আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।” [আল-মায়েদাহ : ২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوَّامِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ ۖ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ} “হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দন্ডায়মান হও। কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে, তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ কর,তা তাকওয়ার নিকটতর।” [আল-মায়েদাহ : ৮] আপনি কি বর্তমান যুগের জাতিসমূহ অথবা মানুষের ধর্মসমূহের নিয়ম-কানুনে নিজের এবং পিতমাতা-আত্মীয়-স্বজনের বিপক্ষে হলেও সত্য সাক্ষী প্রদান করা ও সত্য কথা বলার এরূপ নির্দেশ এবং দোস্ত ও দুশমন সবার সঙ্গে ইনসাফ করার এরূপ আদেশ দেখতে পাবেন!
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করার নির্দেশ দিয়েছেন। আমির থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নুমান ইবন বাশির রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে মিম্বারের ওপর বলতে শুনেছি, আমার বাবা আমাকে একটি হাদিয়া দিয়েছেন, তখন আমরাহ বিনত রাওয়াহাহ বলল, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সাক্ষী না বানানো পর্যন্ত সন্তুষ্ট হব না। ফলে সে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বলল, আমরাহ বিনত রাওয়াহার গর্ভের আমার ছেলেকে আমি একটি হাদিয়া দিয়েছি, হে আল্লাহর রাসূল, ফলে সে আপনাকে সাক্ষী বানাতে আমাকে নির্দেশ দিয়েছে। তিনি বললেন: «أَعْطَيْتَ سَائِرَ وَلَدِكَ مِثْلَ هَذَا؟» قَالَ: لاَ قَالَ: «فَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلاَدِكُمْ» قَالَ: فَرَجَعَ فَرَدَّ عَطِيَّتَهُ) “তুমি কি তোমার সকল সন্তানকে এরূপ দিয়েছো?” সে বলল, না। তিনি বললেন, “আল্লাহকে ভয় কর এবং তোমাদের সন্তানদের মাঝে ইনসাফ কর।” সে বলল, তিনি ফিরে এলেন ও তার হাদিয়া ফিরত নিলেন। [সহীহুল বুখারী: ২৫৮৭]
এটি এ জন্যে যে,মানুষ ও রাষ্ট্রসমূহের বিষয়াদি ইনসাফ ছাড়া ঠিক থাকে না এবং ইনসাফ ছাড়া মানুষ তাদের দীন, রক্ত, সন্তানাদি, সম্মান, সম্পদ ও দেশের ব্যাপারে নিরাপদ নয়। এই জন্যে দেখি যখন মক্কার কাফিররা মক্কাতে মুসলিমদের ওপর সংকীর্ণতা করেছিল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদেরকে হাবশায় হিজরত করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তার কারণ বর্ণনা করেছেন যে, সেখানে একজন ইনসাফকারী বাদশাহ রয়েছে যার নিকট কেউ জুলমের শিকার হয় না।
৩১-ইসলাম সকল সৃষ্টির প্রতি সদাচারণ করার নির্দেশ দেয় এবং উত্তম চরিত্র ও সুন্দর আমলের প্রতি আহ্বান করে।
ইসলাম সকল সৃষ্টির প্রতি সদাচারণ করার নির্দেশ প্রদান করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ } “নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণতা,সদাচরণ ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন।” [আন-নাহল : ৯০] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ} “যারা সচ্ছল ও অসচ্ছল অবস্থায় ব্যয় করে, যারা ক্রোধ সংবরণকারী এবং মানুষের প্রতি ক্ষমাশীল;আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদেরকে ভালবাসেন।” [আলে ইমরান :১৩৪] আর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: « إنَّ اللَّهَ كَتَبَ الإحْسَانَ علَى كُلِّ شيءٍ، فَإِذَا قَتَلْتُمْ فأحْسِنُوا القِتْلَةَ، وإذَا ذَبَحْتُمْ فأحْسِنُوا الذَّبْحَ، وَلْيُحِدَّ أَحَدُكُمْ شَفْرَتَهُ، فَلْيُرِحْ ذَبِيحَتَهُ » “নিশ্চয় আল্লাহ প্রতিটি বস্তুতে সদাচরণকে জরুরী করে দিয়েছেন। সুতরাং তোমরা যখন হত্যা করবে,তখন ভালভাবে হত্যা করো এবং যখন জবাই করবে, তখন ভালভালে জবাই করো। তোমাদের প্রত্যেকে যেন নিজ ছুরি ধারাল করে নেয় এবং যবেহকৃত পশুকে আরাম দেয়।” [সহীহ মুসলিম: ১৯৫৫]।
ইসলাম সম্মানজনক আচরণ ও সুন্দর আমলের দিকে আহ্বান করে। আল্লাহ তাআলা পূর্বের কিতাবসমূহে রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গুণাবলী প্রসঙ্গে বলেছেন: {الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ ۚ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنزِلَ مَعَهُ ۙ أُولَٰئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ} “যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী; যার গুণাবলী তারা নিজদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল- যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে। সুতরাং যারা তার প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং তার উপর নাযিলকৃত যে আলোকময় কুরআন নাযিল করা হয়েছে তা অনুসরণ করে তারাই সফলকাম।” [আল-আরাফ : ১৫৭] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «يَا عَائِشَةُ إِنَّ اللهَ رَفِيقٌ يُحِبُّ الرِّفْقَ وَيُعْطِي عَلَى الرِّفْقِ مَا لَا يُعْطِي عَلَى الْعُنْفِ وَمَا لَا يُعْطِي عَلَى مَا سِوَاهُ» “হে আয়িশাহ্! আল্লাহ তা’আলা নম্র ব্যবহারকারী। তিনি নম্রতাকে পছন্দ করেন। তিনি নম্রতার ওপর যা দান করেন তা কঠোরতা ও অন্য কোনো কিছুর ওপর দান করেন না।” [সহীহ মুসলিম: ২৫৯৩]। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «إِنَّ اللَّهَ حَرَّمَ عَلَيْكُمْ: عُقُوقَ الأُمَّهَاتِ وَوَأْدَ البَنَاتِ وَمَنَعَ وَهَاتِ وَكَرِهَ لَكُمْ قِيلَ وَقَالَ وَكَثْرَةَ السُّؤَالِ وَإِضَاعَةَ المَالِ» “আল্লাহ তা‘আলা তোমাদের উপর মায়ের নাফরমানী করা, কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেয়া এবং কারো প্রাপ্য না দেয়া ও অন্যায়ভাবে কিছু চাওয়াকে হারাম করেছেন আর তোমাদের জন্যে অপছন্দ করেছেন অনর্থক কথা বলা, অতিরিক্ত প্রশ্ন করা ও মাল বিনষ্ট করাকে।” [সহীহুল বুখারী ২৪০৮] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «لَا تَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَوَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى شَيْءٍ إِذَا فَعَلْتُمُوهُ تَحَابَبْتُمْ؟ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ» “তোমরা ঈমান না আনা পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না আর তোমাদের ঈমান আনা হবে না যতক্ষণ না তোমরা একে অপরকে মহব্বত করবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন জিনিস বলে দিব না, যখন তোমরা তা করবে একে অপরকে মহব্বত করবে? তোমরা পরস্পরের মাঝে সালামের প্রসার কর।” [সহীহ মুসলিম: ৫৪]
৩২- ইসলাম প্রসংশিত চরিত্রের নির্দেশ দেয়, যেমন সততা, আমানতদারী, পবিত্রতা, লজ্জাশীলতা, বীরত্ব, দানশীলতা, বদান্যতা, অভাবীদের সাহায্য করা, ফরিয়াদ প্রার্থীর প্রয়োজন পূরণ করা, ক্ষুধার্তদের খাবার খাওয়ানো, প্রতিবেশীর সঙ্গে সুন্দর আচরণ করা, আত্মীয়তা রক্ষা করা ও জীব-জন্তুর সঙ্গে নরম আচরণ করা।
ইসলাম প্রসংশিত আচরণের নির্দেশ দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (إِنَّمَا بُعِثْتُ لِأُتَمِّمَ صَالِحَ الْأَخْلَاقِ) “আমি তো প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দান করার জন্যে।” [সহীহুল আদাবুল মুফরাদ: ২০৭] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (إن من أحبِّكم إليَّ ، وأقربِكم مني مجلسًا يومَ القيامةِ أحاسِنُكم أخلاقًا ، وإنَّ أبغضَكم إليَّ وأبعدَكم مني مجلسًا يومَ القيامةِ الثَّرثارونَ ، والمُتشدِّقونَ ، والمُتفيهقونَ ، قالوا : قد علِمْنا الثرثارونَ و المتشدِّقونَ ، فما المتفيهقونَ ؟ قال : المُتكبِّرونَ) “নিশ্চয় কিয়ামতের দিন তোমাদের থেকে আমার নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয় এবং মজলিসে আমার সবচেয়ে কাছের সেই হবে যে তোমাদের ভেতর চরিত্রের বিচারে সবচেয়ে সুন্দর। পক্ষান্তরে কিয়ামতের দিন তোমাদের থেকে আমার নিকট সবচেয়ে বেশি গোস্বার ও মজলিজসে আমার থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করবে ইনিয়ে-বিনিয়ে কথকেরা ও বাচালরা এবং মুতাফায়হিকুনরা। তারা বললেন, আমরা তো ইনিয়ে-বিনিয়ে কথক ও বাচালদের চিনলাম, কিন্তু মুতাফায়হিকুন কারা? তিনি বললেন, অহংকারীরা।” [সিলসিলাতুস সাহিহা : ৭৯১] আবদুল্লাহ ইবন ‘আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: " لَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا" وَكَانَ يَقُولُ: (إِنَّ مِنْ خِيَارِكُمْ أَحْسَنَكُمْ أَخْلاَقًا) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশ্লীল ভাষী ও অসদাচারী ছিলেন না। তিনি বলতেন, “তোমাদের মধ্যে সে ব্যক্তিই সর্বশ্রেষ্ঠ যে চরিত্রে সর্বোত্তম।” [সহীহুল বুখারী: ৩৫৫৯] এ ছাড়া আরও আয়াত ও হাদীস প্রমাণ করে যে, ইসলাম সাধারণভাবে সম্মানজনক আখলাক ও সুন্দর আচরণের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে।
ইসলাম আরও যেসব বিষয়ের নির্দেশ দেয়, তন্মধ্যে একটি হচ্ছে সততা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: (عَلَيْكُمْ بِالصِّدْقِ فَإِنَّ الصِّدْقَ يَهْدِي إِلَى الْبِرِّ وَإِنَّ الْبِرَّ يَهْدِي إِلَى الْجَنَّةِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَصْدُقُ وَيَتَحَرَّى الصِّدْقَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ صِدِّيقًا) “তোমরা সত্যকে আঁকড়ে ধর। কেননা সততা নেক কর্মের দিকে পথপ্রদর্শন করে, আর নেককর্ম জান্নাতের দিকে পথপ্রদর্শন করে। কোনো ব্যক্তি সর্বদা সত্য কথা বললে ও সত্য বলার চেষ্টায় রত থাকলে, অবশেষে আল্লাহর নিকটে সে সত্যবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।” [সহীহ মুসলিম ২৬০৭]
ইসলাম আরও যেসব বিষয়ের নির্দেশ দেয়, তন্মধ্যে আরেকটি হচ্ছে আমানত আদায় করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَن تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا} “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন আমানত তার হকদারকে ফিরিয়ে দিতে।” [আন-নিসা : ৫৮]
ইসলাম আরও যেসব বিষয়ের নির্দেশ দেয়, তন্মধ্যে আরেকটি হচ্ছে পবিত্রতা- সতীত্ব। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «ثلاثة حق على الله عونهم: وذكر منهم: والناكح الذي يريد العفاف» “তিনজনকে সাহায্য করা আল্লাহর জিম্মাদারী। তাদের ভেতর ঐ বিবাহকারীকে উল্লেখ করেছেন যে সতীত্বতার ইচ্ছা করে।” [সুনানুত তিরমিযী: ১৬৫৫] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দোয়ার অংশ ছিল, তিনি বলতেন: «اللهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى» “হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট হেদায়াত, তাকওয়া, অশ্লীলতা হতে পবিত্রতা এবং সচ্ছলতা প্রার্থনা করি।” [সহীহ মুসলিম ২৭২১]
ইসলাম আরও যেসব বিষয়ের নির্দেশ দেয়, তন্মধ্যে আরেকটি হচ্ছে লজ্জাশীলতা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «الْحَيَاءُ لَا يَأْتِي إِلَّا بِخَيْرٍ» “লজ্জা মঙ্গল ছাড়া কিছুই বয়ে আনে।” [সহীহুল বুখারী: ৬১১৭] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «لِكُلِّ دِينٍ خُلُقٌ وَخُلُقُ الْإِسْلَامِ الْحَيَاءُ» “প্রত্যেক দীনের কিছু চরিত্র রয়েছে। আর ইসলামের চরিত্র হচ্ছে লজ্জাশীলতা।” [বায়হাকী শুআবুল ঈমান গ্রন্থে হাদীসটি উল্লেখ করেছেন। ৬/২৬১৯]
ইসলাম আরও যেসব বিষয়ের নির্দেশ দেয়, তন্মধ্যে আরেকটি হচ্ছে বীরত্ব। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: «كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَحْسَنَ النَّاسِ وَأَشْجَعَ النَّاسِ وَأَجْوَدَ النَّاسِ وَلَقَدْ فَزِعَ أَهْلُ المَدِينَةِ فَكَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ سَبَقَهُمْ عَلَى فَرَسٍ» “নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সর্বাপেক্ষা সুশ্রী, সাহসী ও দানশীল ছিলেন। মদিনাবাসীগণ একবার ভীত-শংকিত হয়ে পড়ল। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঘোড়ায় চড়ে সবার আগে এগিয়ে গেলেন।” [সহীহুল বুখারী: ২৮২০] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভীরুতা থেকে পানাহ চাইতেন, ফলে তিনি বলতেন: «اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الجُبْنِ» “হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে ভীরুতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।” [সহীহুল বুখারী: ৬৩৭৪]
ইসলাম আরও যেসব বিষয়ের নির্দেশ দেয়, তন্মধ্যে রয়েছে দানশীলতা ও বদান্যতা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ ۗ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ } “যারা নিজেদের ধন সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করে তাদের উপমা একটি বীজের মত, যা সাতটি শীষ উৎপাদন করে, প্রত্যেক শীষে একশ শস্যদানা। আর আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছে বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেন। আল্লাহ্ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।” [আল-বাকারাহ : ২৬১] নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চরিত্র ছিল বদান্যত। যেমন ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: «كَانَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَجْوَدَ النَّاسِ بِالخَيْرِ وَكَانَ أَجْوَدُ مَا يَكُونُ فِي رَمَضَانَ حِينَ يَلْقَاهُ جِبْرِيلُ وَكَانَ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ يَلْقَاهُ كُلَّ لَيْلَةٍ فِي رَمَضَانَ حَتَّى يَنْسَلِخَ يَعْرِضُ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ القُرْآنَ فَإِذَا لَقِيَهُ جِبْرِيلُ عَلَيْهِ السَّلاَمُ كَانَ أَجْوَدَ بِالخَيْرِ مِنَ الرِّيحِ المُرْسَلَةِ» “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধন-সম্পদ ব্যয় করার ব্যাপারে সকলের চেয়ে দানশীল ছিলেন। রমাযানে জিবরাঈল যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন, তখন তিনি আরো অধিক দান করতেন। রমাযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি রাতেই জিবরাঈল তাঁর সঙ্গে একবার সাক্ষাত করতেন। আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে কুরআন শোনাতেন। জিবরাঈল যখন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাত করতেন তখন তিনি (রহমতসহ) প্রেরিত বায়ুর চেয়ে অধিক বদান্য হয়ে যেতেন।” [সহীহুল বুখারী: ১৯০২]
ইসলাম আরও যেসব বিষয়ের নির্দেশ দেয়, তন্মধ্যে হচ্ছে ফরিয়াদকারীদের সাহায্য করা, ক্ষুধার্তদের খাবার দেয়া, প্রতিবেশীর সঙ্গে সদাচারণ করা, আত্মীয়তা রক্ষা করা ও পশু-পাখীর সঙ্গে নরম আচরণ করা। আব্দুল্লাহ ইবন ‘আমর রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত: أَنَّ رَجُلًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ الإِسْلاَمِ خَيْرٌ؟ قَالَ: «تُطْعِمُ الطَّعَامَ وَتَقْرَأُ السَّلاَمَ عَلَى مَنْ عَرَفْتَ وَمَنْ لَمْ تَعْرِفْ» জনৈক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করল, ‘ইসলামের কোন কাজটি উত্তম?’ তিনি বললেন, “খানা খাওয়াবে এবং পরিচিত ও অপরিচিত সবাইকে সালাম দিবে।” [সহীহুল বুখারী: ১২] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «بَيْنَمَا رَجُلٌ يَمْشِي بِطَرِيقٍ اشْتَدَّ عَلَيْهِ العَطَشُ فَوَجَدَ بِئْرًا فَنَزَلَ فِيهَا فَشَرِبَ ثُمَّ خَرَجَ فَإِذَا كَلْبٌ يَلْهَثُ يَأْكُلُ الثَّرَى مِنَ العَطَشِ فَقَالَ الرَّجُلُ: لَقَدْ بَلَغَ هَذَا الكَلْبَ مِنَ العَطَشِ مِثْلُ الَّذِي كَانَ بَلَغَ بِي فَنَزَلَ البِئْرَ فَمَلَأَ خُفَّهُ ثُمَّ أَمْسَكَهُ بِفِيهِ فَسَقَى الكَلْبَ فَشَكَرَ اللَّهُ لَهُ فَغَفَرَ لَهُ» قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَإِنَّ لَنَا فِي البَهَائِمِ أَجْرًا؟ فَقَالَ: «نَعَمْ فِي كُلِّ ذَاتِ كَبِدٍ رَطْبَةٍ أَجْرٌ» “একদা এক ব্যক্তি রাস্তায় চলছিল, ইতোমধ্যে তার পিপাসা কঠিন আকার ধারণ করল। সে একটি কূপ পেয়ে তাতে নামল ও পানি পান করল। অতঃপর বের হয়ে এসে দেখল একটি কুকুর হাপাচ্ছে এবং পিপাসায় ভেঁজা মাটি লেহন করছে। তখন লোকটি বলল, আমাকে যেরূপ পিপাসায় পেয়েছিল সেরূপ পিপাসা কুকুরটিকেও পেয়েছে। ফলে সে কূপে নেমে তার মোজা পানিতে পূর্ণ করল এবং তার মুখে সেটি ধারণ করলো। তারপর কুকুরকে পানি পান করাল। আল্লাহ তার কৃতজ্ঞতা আদায় করলেন, ফলে তাকে ক্ষমা করে দিলেন। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল, চতুষ্পদ জন্তুর ক্ষেত্রেও কি আমাদের সাওয়াব রয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। প্রত্যেক ভেঁজা অন্তরের ক্ষেত্রেই সাওয়াব রয়েছে।” [সহীহ ইবন হিব্বান: ৫৪৪] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «السَّاعِي عَلَى الأَرْمَلَةِ وَالمِسْكِينِ كَالْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ أَوِ القَائِمِ اللَّيْلَ الصَّائِمِ النَّهَارَ» “বিধবা ও মিসকীন-এর জন্য চেষ্টারত ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের মত অথবা রাতে সালাত আদায়কারী ও দিনে সিয়াম পালকারীর মত।” [সহীহুল বুখারী: ৫৩৫৩]
ইসলাম আত্মীয়তার হকের ওপর গুরুত্ব দেয় এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখাকে ওয়াজিব করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {النَّبِيُّ أَوْلَىٰ بِالْمُؤْمِنِينَ مِنْ أَنفُسِهِمْ ۖ وَأَزْوَاجُهُ أُمَّهَاتُهُمْ ۗ وَأُولُو الْأَرْحَامِ بَعْضُهُمْ أَوْلَىٰ بِبَعْضٍ فِي كِتَابِ اللَّهِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُهَاجِرِينَ إِلَّا أَن تَفْعَلُوا إِلَىٰ أَوْلِيَائِكُم مَّعْرُوفًا ۚ كَانَ ذَٰلِكَ فِي الْكِتَابِ مَسْطُورًا} “নবী মুমিনদের কাছে তাদের নিজেদের চেয়ে ঘনিষ্ঠতর। আর তার স্ত্রীগণ তাদের মাতাস্বরূপ। আর আল্লাহর বিধান অনুসারে মুমিন ও মুহাজিরদের তুলনায় আত্নীয় স্বজনরা একে অপরের নিকটতর। তবে তোমরা যদি বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ভালো কিছু করতে চাও (তা করতে পার)। এটা কিতাবে লিপিবদ্ধ আছে।” [আল-আহযাব : ৬] তিনি আত্মীয়তা ছিন্ন করা থেকে সতর্ক করেছেন এবং তাকে জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করার সঙ্গে তুলনা করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {فَهَلْ عَسَيْتُمْ إِن تَوَلَّيْتُمْ أَن تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَتُقَطِّعُوا أَرْحَامَكُمْ (22) “সুতরাং অবাধ্য হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলে সম্ভবত তোমরা যমীনে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্নীয়তার বন্ধন ছিন্ন করবে। (২২) أُولَٰئِكَ الَّذِينَ لَعَنَهُمُ اللَّهُ فَأَصَمَّهُمْ وَأَعْمَىٰ أَبْصَارَهُمْ (23) } এরাই তারা, যাদেরকে আল্লাহ লা'নত করেছেন, ফলে তিনি তাদের বধির করেন এবং তাদের দৃষ্টিসমূহকে অন্ধ করেন। (২৩)” [মুহাম্মাদ : ২২-২৩] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَاطِعُ رَحِمٍ» “আত্মীয়তা ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না।” [সহীহ মুসলিম ২৫৫৬] যেসব আত্মীয়দের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা ওয়াজিব তারা হলেন: পিতা-মাতা, ভাই-বোন, চাচা-চাচী ও খালা-মামা।
ইসলাম প্রতিবেশীর হকের প্রতি গুরুত্বারেপ করে যদিও সে কাফির হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ۖ وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَىٰ وَالْيَتَامَىٰ وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا} “তোমরা একমাত্র ইবাদাত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকট আত্মীয়ের সাথে, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট আত্মীয়- প্রতিবেশী, অনাত্মীয়- প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী।” [আন-নিসা : ৩৬] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (مَا زَالَ جِبْرِيلُ يُوصِينِي بِالْجَارِ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ سَيُوَرِّثُهُ) “সর্বদা জিবরীল আমাকে প্রতিবেশীর ব্যাপারে অসীয়ত করছিলেন, এমনকি আমি ধারণা করলাম শীঘ্রই তাকে ওয়ারিস করে দেওয়া হবে।” [সহীহ আবূ দাউদ : ৫১৫২]
৩৩- ইসলাম খাবার ও পানীয় থেকে কেবল পবিত্র বস্তুই হালাল করেছে এবং অন্তর, শরীর ও গৃহ পরিষ্কার করার নির্দেশ দিয়েছে। আর এ জন্যেই বিবাহ হালাল করেছে। অনুরূপভাবে নবীগণও এর নির্দেশ দিয়েছেন। বস্তুত তারা প্রত্যেক পবিত্র বস্তুরই নির্দেশ প্রদান করেন।
ইসলাম খাদ্য ও পানীয় থেকে কেবল পবিত্র বস্তুই হালাল করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلاَّ الطَّيِّبَ وإِنَّ اللَّهَ أَمَرَ الْمُؤْمِنِينَ بِمَا أَمَرَ بِهِ الْمُرْسَلِينَ قَالَ تعالى: {يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ} وَقَالَ تعالى: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طِيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ واشكروا لله إن كنتم إياه تعبدون} الآية قَالَ: ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ: يَا رَب يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَغُذِّيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لِذَلِكَ؟!» “হে লোক সকল! আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করেন না। আর আল্লাহ মু’মিনদেরকে সেই কাজের নির্দেশ দিয়েছেন, যার নির্দেশ নবীদেরকে দিয়েছেন। সুতরাং মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে রাসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু হতে আহার কর এবং সৎকর্ম কর।নিশ্চই আমি তোমরা যা করো তা সম্পর্কে পূর্ণ অবগত। (মু’মিনূন : ৫১) তিনি আরো বলেন, ‘হে বিশ্ববাসীগণ! আমি তোমাদেরকে যে রুযী দিয়েছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর এবং আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর; যদি তোমরা শুধু তাঁরই উপাসনা করে থাক।” (বাকারাহ : ১৭২) অতঃপর তিনি সেই লোকের কথা উল্লেখ ক’রে বললেন, যে এলোমেলো চুলে, ধূলামলিন পায়ে সুদীর্ঘ সফরে থেকে আকাশ পানে দু’ হাত তুলে ‘ইয়া রব্ব্! ‘ইয়া রব্ব্!’ বলে দু‘আ করে। অথচ তার খাদ্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম এবং হারাম বস্তু দিয়েই তার শরীর পুষ্ট হয়েছে। কাজেই কিভাবে তার দু‘আ কবূল করা হবে?” [সহীহ মুসলিম : ১০১৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ ۚ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ ۗ كَذَٰلِكَ نُفَصِّلُ الْآيَاتِ لِقَوْمٍ يَعْلَمُونَ} “বলুন, ‘কে হারাম করেছে আল্লাহর সৌন্দর্যোপকরণ, যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং পবিত্র রিযিক’? বলুন, ‘তা দুনিয়ার জীবনে মুমিনদের জন্য, বিশেষভাবে কিয়ামত দিবসে’। এভাবে আমি আয়াতসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করি এমন জাতির জন্য, যারা জানে।” [আল-আরাফ : ৩২]
ইসলাম অন্তর, শরীর ও গৃহ পরিষ্কার করার নির্দেশ দিয়েছে। আর এ জন্যেই বিবাহ হালাল করেছে। নবী ও রাসূলগণও এর নির্দেশ দিয়েছেন। বস্তুত তারা প্রত্যেক পবিত্র বস্তুরই নির্দেশ প্রদান করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَاللَّهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ بَنِينَ وَحَفَدَةً وَرَزَقَكُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ أَفَبِالْبَاطِلِ يُؤْمِنُونَ وَبِنِعْمَتِ اللَّهِ هُمْ يَكْفُرُونَ} “আর আল্লাহ্ তোমাদের থেকেই তোমাদের জোড়া সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদের যুগল থেকে তোমাদের জন্য পুত্র-পৌত্রাদি সৃষ্টি করেছেন এবং তোমাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছেন। তবুও কি তারা বাতিলের স্বীকৃতি দেবে [ আর তারা আল্লাহর অনুগ্রহ অস্বীকার করবে?” [আন-নাহাল : ৭২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ (4) “আর তোমার পোশাক-পরিচ্ছদ পবিত্র কর। (৪) وَالرُّجْزَ فَاهْجُرْ (5) } আর মূর্তি-অপবিত্রতা বর্জন কর। (৫)” [আল-মুদ্দাসসির : ৪-৫] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (لَا يَدْخُلُ الْجَنَّةَ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ كِبْرٍ. قَالَ رَجُلٌ: إِنَّ الرَّجُلَ يُحِبُّ أَنْ يَكُونَ ثَوْبُهُ حَسَنًا وَنَعْلُهُ حَسَنَةً قَالَ: إِنَّ اللهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ الْكِبْرُ بَطَرُ الْحَقِّ وَغَمْطُ النَّاسِ) “সে জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্তরে অণুপরিমাণ অহংকার থাকবে। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, মানুষ চায় যে, তার পোশাক সুন্দর হোক, তার জুতা সুন্দর হোক, এ-ও কি অহঙ্কার? তিনি উত্তর দিলেন, আল্লাহ সুন্দর, তিনি সুন্দরকে ভালোবাসেন। প্রকৃতপক্ষে অহংকার হচ্ছে দম্ভভরে সত্য ও ন্যায় অস্বীকার করা এবং মানুষকে ঘৃণা করা।” [সহীহ মুসলিম: ৯১]
৩৪- ইসলাম মৌলিক নিষিদ্ধ বস্তুসমূহকে হারাম করেছে, যেমন আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, কুফরী করা ও প্রতিমার ইবাদত করা, না জেনে আল্লাহর ওপর কথা বলা, সন্তানদের হত্যা করা, সম্মানীত নফসকে হত্যা করা, জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করা এবং যাদু, প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য অশ্লীলতা, যেনা ও সমকামিতা। আরও হারাম করেছে সুদ, মৃত জন্তু ভক্ষণ করা এবং মূর্তি ও প্রতিমার নামে যবেহকৃত পশু। অনুরূপভাবে শূকরের গোস্ত এবং সকল নাপাক ও খারাপ বস্তুও হারাম করেছে। ইয়াতিমের মাল ভক্ষণ করা, মাপে ও ওজনে কম দেয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম করেছে। সব নবীই এসব বস্তু হারাম হওয়ার ব্যাপারে একমত।
ইসলাম মৌলিক নিষিদ্ধ বস্তুসমূহকে হারাম করেছে, যেমন আল্লাহর সঙ্গে শরীক করা, কুফরী করা ও প্রতিমার ইবাদত করা, না জেনে আল্লাহর ওপর কথা বলা ও সন্তানদের হত্যা করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { قُلۡ تَعَالَوۡاْ أَتۡلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمۡ عَلَيۡكُمۡۖ أَلَّا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡـٔٗاۖ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗاۖ وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُم مِّنۡ إِمۡلَٰقٖ نَّحۡنُ نَرۡزُقُكُمۡ وَإِيَّاهُمۡۖ وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلۡفَوَٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَمَا بَطَنَۖ وَلَا تَقۡتُلُواْ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِي حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ “বলুন, ‘এস, তোমাদের রব তোমাদের উপর যা হারাম করেছেন তা তিলাওয়াত করি, তা হচ্ছে , ‘তোমরা তাঁর সাথে কোনো শরীক করবে না, পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্রের ভয়ে তোমরা তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, আমি তোমাদেরকে ও তাদেরকে রিযক দিয়ে থাকি। প্রকাশ্যে হোক কিংবা গোপনে হোক, অশ্লীল কাজের ধারে-কাছেও যাবে না। আল্লাহ্ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তোমরা তাকে হত্যা করবে না।’ তোমাদেরকে তিনি এ নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা বুঝতে পার। وَلَا تَقۡرَبُواْ مَالَ ٱلۡيَتِيمِ إِلَّا بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ حَتَّىٰ يَبۡلُغَ أَشُدَّهُۥۚ وَأَوۡفُواْ ٱلۡكَيۡلَ وَٱلۡمِيزَانَ بِٱلۡقِسۡطِۖ لَا نُكَلِّفُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۖ وَإِذَا قُلۡتُمۡ فَٱعۡدِلُواْ وَلَوۡ كَانَ ذَا قُرۡبَىٰۖ وَبِعَهۡدِ ٱللَّهِ أَوۡفُواْۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُونَ} আর তোমরা ইয়াতীমের সম্পদের নিকটবর্তী হয়ো না, সুন্দর পন্থা ছাড়া। যতক্ষণ না সে পরিণত বয়সে উপনীত হয়, আর পরিমাপ ও ওযনে ইনসাফের সাথে পরিপূর্ণ দেবে। আমি কাউকে তার সাধ্য ছাড়া দায়িত্ব অর্পণ করি না। আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ইনসাফ কর, যদিও সে আত্মীয় হয় এবং আল্লাহর ওয়াদা পূর্ণ কর। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর।” [আল-আনআম : ১৫১-১৫২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَن تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَن تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ} “বলুন,‘ নিশ্চয় আমার রব হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা। আর পাপ ও অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন এবং কোনো কিছুকে আল্লাহর শরীক করা- যার কোনো সনদ তিনি নাযিল করেননি। আর আল্লাহ সম্বন্ধে এমন কিছু বলা যা তোমারা জান না।” [আল-আরাফ : ৩৩]
ইসলাম সম্মানিত নফসকে হত্যা করা হারাম করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَلَا تَقۡتُلُواْ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِي حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّۗ وَمَن قُتِلَ مَظۡلُومٗا فَقَدۡ جَعَلۡنَا لِوَلِيِّهِۦ سُلۡطَٰنٗا فَلَا يُسۡرِف فِّي ٱلۡقَتۡلِۖ إِنَّهُۥ كَانَ مَنصُورٗا} “আর আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করো না! কেউ অন্যায়ভাবে নিহত হলে তার উত্তরাধিকারীকে তো আমি তার প্রতিকারের অধিকার দিয়েছি; কিন্তু হত্যার ব্যাপারে সে যেন বাড়াবাড়ি না করে; সে তো সাহায্য প্রাপ্ত হয়েছেই।” আল-ইসরা : ৩৩] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَٰهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ وَلَا يَزْنُونَ ۚ وَمَن يَفْعَلْ ذَٰلِكَ يَلْقَ أَثَامًا } “আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য মাবূদকে ডাকে না এবং যারা আল্লাহ যে নাফসকে হত্যা করা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না। আর যারা ব্যভিচার করে না। আর যে তা করবে সে আযাবপ্রাপ্ত হবে।” [আল-ফুরকান : ৬৮]
ইসলাম জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করাকে হারাম করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا} “আর যমীনে শান্তি স্থাপনের পর তোমরা সেখানে বিপর্যয় সৃষ্টি করো না।” [আল-আরাফ : ৫৬] আল্লাহ তাআলা নবী শুআইব আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন যে, তিনি তার জাতিকে বলেছেন: {يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ مَا لَكُم مِّنْ إِلَٰهٍ غَيْرُهُ ۖ قَدْ جَاءَتْكُم بَيِّنَةٌ مِّن رَّبِّكُمْ ۖ فَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا ۚ ذَٰلِكُمْ خَيْرٌ لَّكُمْ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ} “হে আমার জাতি, তোমরা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত কর। তিনি ছাড়া তোমাদের কোনো সত্য মাবূদ নেই। তোমাদের রবের পক্ষ থেকে তোমাদের নিকট স্পষ্ট প্রমাণ এসেছে। সুতরাং তোমরা পরিমাণে ও ওজনে পরিপূর্ণ দাও এবং মানুষকে তাদের পণ্যে কম দেবে না; আর তোমরা যমীনে ফাসাদ করবে না তা সংশোধনের পর। এগুলো তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা মুমিন হও।” [আল-আরাফ ৮৫]
ইসলাম যাদুকে হারাম করেছে। হক সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা বলেন: { وَأَلۡقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلۡقَفۡ مَا صَنَعُوٓاْۖ إِنَّمَا صَنَعُواْ كَيۡدُ سَٰحِرٖۖ وَلَا يُفۡلِحُ ٱلسَّاحِرُ حَيۡثُ أَتَىٰ} “আর আপনার ডান হাতে যা আছে তা নিক্ষেপ করুন, এটা তারা যা করেছে তা খেয়ে ফেলবে। তারা যা করেছে তা তো শুধু জাদুকরের কৌশল। আর জাদুকর যেখানেই আসুক, সফল হবে না।” [ত্বহা : ৬৯] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «اجْتَنِبُوا السَّبْعَ المُوبِقَاتِ قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا هُنَّ؟ قَالَ: الشِّرْكُ بِاللَّهِ وَالسِّحْرُ وَقَتْلُ النَّفْسِ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالحَقِّ وَأَكْلُ الرِّبَا وَأَكْلُ مَالِ اليَتِيمِ وَالتَّوَلِّي يَوْمَ الزَّحْفِ وَقَذْفُ المُحْصَنَاتِ المُؤْمِنَاتِ الغَافِلاَتِ» “সাতটি ধ্বংসকারী বিষয় থেকে তোমরা বিরত থাকবে। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেগুলো কী? তিনি বললেন, ১. আল্লাহর সাথে শরীক করা ২. যাদু ৩. আল্লাহ তা‘আলা যাকে হত্যা করা হারাম করেছেন, শরী‘আতসম্মত কারণ ব্যতিরেকে তাকে হত্যা করা ৪. সুদ খাওয়া ৫. ইয়াতীমের মাল গ্রাস করা ৬. রণক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া এবং ৭. সরল স্বভাব সতী-সাধ্বী মুমিন নারীদের অপবাদ দেওয়া।” [সহীহুল বুখারী: ৬৮৫৭]
ইসলাম প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল অশ্লীলতা এবং যিনা ও সমকামিতা হারাম করেছে। এসব বিষয়ের হারাম হওয়ার দলিল এই অনুচ্ছেদের শুরুতে গত হয়েছে। আর ইসলাম সুদকেও হারাম করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ (278) “হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও যদি তোমরা মুমিন হও। (২৭৮) فَإِن لَّمْ تَفْعَلُوا فَأْذَنُوا بِحَرْبٍ مِّنَ اللَّهِ وَرَسُولِهِ ۖ وَإِن تُبْتُمْ فَلَكُمْ رُءُوسُ أَمْوَالِكُمْ لَا تَظْلِمُونَ وَلَا تُظْلَمُونَ (279)} অতঃপর যদি তোমরা না কর তবে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসুলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও। আর যদি তোমরা তাওবা কর তবে তোমাদের মূলধন তোমাদেরই। তোমরা যুলুম করবে না এবং তোমাদের উপরও যুলুম করা হবে না।” [আল-বাকারাহ : ২৭৮-২৭৯] আল্লাহ কোনো পাপীকে যুদ্ধের হুমকি প্রদান করেননি যেমন সুদ খোরকে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছেন। কেননা সুদে রয়েছে ধর্ম, দেশ, সম্পদ ও নফসের ধ্বংস।
ইসলাম মৃত পশু এবং যা মূর্তির জন্যে যবেহ করা হয়েছে তা খাওয়া হারাম করেছে। আর শূকরের গোস্তও হারাম করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {حُرِّمَتْ عَلَيْكُمُ الْمَيْتَةُ وَالدَّمُ وَلَحْمُ الْخِنزِيرِ وَمَا أُهِلَّ لِغَيْرِ اللَّهِ بِهِ وَالْمُنْخَنِقَةُ وَالْمَوْقُوذَةُ وَالْمُتَرَدِّيَةُ وَالنَّطِيحَةُ وَمَا أَكَلَ السَّبُعُ إِلَّا مَا ذَكَّيْتُمْ وَمَا ذُبِحَ عَلَى النُّصُبِ وَأَن تَسْتَقْسِمُوا بِالْأَزْلَامِ ۚ ذَٰلِكُمْ فِسْقٌ } “তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে মৃত প্রাণী, রক্ত ও শূকরের গোশত এবং যা আল্লাহ ভিন্ন কারো নামে যবেহ করা হয়েছে; গলা চিপে মারা জন্তু, প্রহারে মরা জন্তু, উঁচু থেকে পড়ে মরা জন্তু, অন্য প্রাণীর শিঙ্গের আঘাতে মরা জন্তু এবং যে জন্তুকে হিংস্র প্রাণী খেয়েছে- তবে যা তোমরা যবেহ করে নিয়েছো তা ছাড়া, আর যা মূর্তি পূঁজার বেদিতে বলি দেয়া হয়েছে এবং জুয়ার তীর দ্বারা বণ্টন করা হয়, এগুলোহ গুনাহ।” [আল-মায়েদা : ৩]
ইসলাম মদ পান করা এবং সকল নাপাক ও অপবিত্র বস্তু হারাম করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِّنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (90) “হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, পূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণয় করার শর তো কেবল ঘৃণার বস্তু, শয়তানের কাজ। কাজেই তোমরা সেগুলোকে বর্জন কর –যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। (৯০) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَن يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَن ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ ۖ فَهَلْ أَنتُم مُّنتَهُونَ (91)} শয়তান তো চায়, মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ ঘটাতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও সালাতে বাঁধা দিতে। তবে কি তোমরা বিরত হবে না? (৯১)” [আল-মায়েদাহ : ৯০-৯১] আর (৩১) নং অনুচ্ছেদে গত হয়েছে যে, আল্লাহ তা‘আলা তাওরাতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সিফাত সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি তাদের ওপর অপবিত্র বস্তু হারাম করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِندَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنجِيلِ يَأْمُرُهُم بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ ۚ} “যারা অনুসরণ করে রাসূলের, যে উম্মী নবী; যার গুণাবলী তারা নিজদের কাছে তাওরাত ও ইঞ্জিলে লিখিত পায়, যে তাদেরকে সৎ কাজের আদেশ দেয় ও বারণ করে অসৎ কাজ থেকে এবং তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করে আর অপবিত্র বস্তু হারাম করে। আর তাদের থেকে বোঝা ও শৃংখল- যা তাদের উপরে ছিল- অপসারণ করে।” [আল-আরাফ : ১৫৭]
ইসলাম ইয়াতিমের সম্পদ খাওয়াকে হারাম করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَآتُوا الْيَتَامَىٰ أَمْوَالَهُمْ ۖ وَلَا تَتَبَدَّلُوا الْخَبِيثَ بِالطَّيِّبِ ۖ وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُمْ إِلَىٰ أَمْوَالِكُمْ ۚ إِنَّهُ كَانَ حُوبًا كَبِيرًا} “আর তোমরা ইয়াতীমদেরকে তাদের ধন-সম্পদ দিয়ে দাও এবং তোমরা অপবিত্র বস্তুকে পবিত্র বস্তু দ্বারা পরিবর্তন করো না এবং তাদের ধন-সম্পদকে তোমাদের ধন-সম্পদের সাথে খেয়ো না। নিশ্চয় তা বড় পাপ।” [আন-নিসা : ২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {إِنَّ الَّذِينَ يَأْكُلُونَ أَمْوَالَ الْيَتَامَىٰ ظُلْمًا إِنَّمَا يَأْكُلُونَ فِي بُطُونِهِمْ نَارًا ۖ وَسَيَصْلَوْنَ سَعِيرًا} “নিশ্চয় যারা ইয়াতীমদের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করে তারা তো তাদের পেটে আগুন খাচ্ছে; আর অচিরেই তারা প্রজ্জ্বলিত আগুনে প্রবেশ করবে।” [আন-নিসা : ১০]
ইসলাম মাপে ও ওজনে কম দেয়াকে হারাম করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَيْلٌ لِّلْمُطَفِّفِينَ (1) “দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়, (১) الَّذِينَ إِذَا اكْتَالُوا عَلَى النَّاسِ يَسْتَوْفُونَ (2) যারা লোকদের কাছ থেকে মেপে নেয়ার সময় পূর্ণমাত্রায় গ্রহণ করে, (২) وَإِذَا كَالُوهُمْ أَو وَّزَنُوهُمْ يُخْسِرُونَ (3) আর যখন তাদেরকে মেপে দেয় অথবা ওজন করে দেয়, তখন কম দেয়। (৩) أَلَا يَظُنُّ أُولَٰئِكَ أَنَّهُم مَّبْعُوثُونَ (4)} তারা কি বিশ্বাস করে না যে, তারা পুনরুথিত হবে। (৪)” [আল-মুতাফফিফিন : ১-৪]
ইসলাম আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করাকে হারাম করেছে। আর এ সম্পর্কিত আয়াত ও হাদীস (৩১) নং অনুচ্ছেদে গত হয়েছে। বস্তুত সকল নবী ও রাসূল আলাইহিমুস সালাম এসব নিষিদ্ধ বস্তুর হারাম হওয়ার ওপর একমত।
৩৫- ইসলাম খারাপ চরিত্র থেকে বারণ করে, যেমন মিথ্যা, ঠকানো, ধোঁকা, খিয়ানত, প্রতারণা, হিংসা, খারাপ ষড়যন্ত্র, চুরি, সীমালঙ্ঘন, যুলম এবং প্রত্যেক খারাপ স্বভাব থেকেই নিষেধ করে।
ইসলাম ব্যাপকভাবে সকল নিন্দিত স্বভাব ও আচরণ থেকে বারণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَلَا تُصَعِّرۡ خَدَّكَ لِلنَّاسِ وَلَا تَمۡشِ فِي ٱلۡأَرۡضِ مَرَحًاۖ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ كُلَّ مُخۡتَالٖ فَخُورٖ} “আর তুমি মানুষের প্রতি অবজ্ঞাভরে তোমার গাল বাঁকা কর না এবং যমীনে উদ্ধতভাবে বিচরণ কর না; নিশ্চয় আল্লাহ্ কোনো উদ্ধত, অহংকারীকে পছন্দ করেন না।” [লুকমান : ১৮] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: « إنَّ من أحبِّكم إليَّ وأقربكم منِّي مجلسًا يومَ القيامةِ أحاسنَكُم أخلاقًا وإنَّ أبغضَكم إليَّ وأبعدَكم منِّي مجلسًا يومَ القيامةِ الثَّرثارونَ والمتشدِّقونَ والمتفَيهِقون قالوا يا رسولَ اللَّهِ قد علِمنا الثَّرثارونَ والمتشدِّقونَ فما المتفَيهِقونَ قالَ المتكبِّرونَ » “নিশ্চয় কিয়ামতের দিন তোমাদের থেকে আমার নিকট সবচেয়ে বেশি প্রিয় এবং মজলিসে আমার সবচেয়ে কাছের সেই হবে, যে তোমাদের ভেতর চরিত্রের বিচারে সবচেয়ে সুন্দর। পক্ষান্তরে কিয়ামতের দিন তোমাদের থেকে আমার নিকট সবচেয়ে বেশি গোস্বার ও মজলিসে আমার থেকে সবচেয়ে দূরে অবস্থান করবে ইনিয়ে-বিনিয়ে কথকেরা ও বাচালেরা এবং মুতাফায়হিকুনরা। তারা বললেন, আমরা তো ইনিয়ে-বিনিয়ে কথক ও বাচালদের চিনলাম, কিন্তু মুতাফায়হিকুন কারা? তিনি বললেন, অহংকারীরা।” [সিলসিলাতুস সাহিহা : ৭৯১]
ইসলাম মিথ্যা থেকে বারণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهۡدِي مَنۡ هُوَ مُسۡرِفٞ كَذَّابٞ} “নিশ্চয় আল্লাহ্ তাকে হেদায়াত দেন না, যে সীমালংঘনকারী, মিথ্যাবাদী।” [গাফির: ২৮] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «وَإِيَّاكُمْ وَالْكَذِبَ فَإِنَّ الْكَذِبَ يَهْدِي إِلَى الْفُجُورِ وَإِنَّ الْفُجُورَ يَهْدِي إِلَى النَّارِ وَمَا يَزَالُ الرَّجُلُ يَكْذِبُ وَيَتَحَرَّى الْكَذِبَ حَتَّى يُكْتَبَ عِنْدَ اللهِ كَذَّابًا» “মিথ্যাকে পরিহার করা তোমাদের একান্ত কর্তব্য। কেননা মিথ্যা পাপ কর্মের পথ দেখায়, আর পাপ কর্ম জাহান্নামের পথ দেখায়। আর কোনো ব্যক্তি সর্বদা মিথ্যা বললে ও মিথ্যা বলার চেষ্টায় রত থাকলে, অবশেষে আল্লাহর নিকটে সে মিথ্যাবাদী হিসেবে লিপিবদ্ধ হয়।” [সহীহ মুসলিম ২৬০৭] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «آيَةُ المُنَافِقِ ثَلاَثٌ: إِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا وَعَدَ أَخْلَفَ وَإِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ» “মুনাফিকের চিহ্ন তিনটি: যখন সে কথা বলে, তখন মিথ্যা বলে, যখন সে ওয়াদা করে, তখন তা ভঙ্গ করে, আর যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন সে তাতে খিয়ানাত করে।” [সহীহুল বুখারী: ৬০৯৫]
ইসলাম ঠকাতে (ধোকা দিতে) নিষেধ করে। হাদীসে এসছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শস্যের এক স্তুপের পাশ দিয়ে অতিক্রম করলেন এবং তাতে তিনি হাত প্রবেশ করালেন। ফলে তার হাত ভেঁজা স্পর্শ করল। তখন তিনি বললেন: «مَا هَذَا يَا صَاحِبَ الطَّعَامِ؟» قَالَ أَصَابَتْهُ السَّمَاءُ يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ: أَفَلَا جَعَلْتَهُ فَوْقَ الطَّعَامِ كَيْ يَرَاهُ النَّاسُ مَنْ غَشَّ فَلَيْسَ مِنِّي» “হে শস্যওয়ালা, এটি কী? সে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, তাতে বৃষ্টি পৌঁছেছে। তিনি বললেন, কেন তা শস্যের ওপর রাখলে না, যেন মানুষ তা দেখতে পায়। যে ধোকা দেয় সে আমার (দল) থেকে নয়।” [সহীহ মুসলিম: ১০২]
ইসলাম ধোকা, খিয়ানত ও প্রতারণা থেকে নিষেধ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَخُونُوا اللَّهَ وَالرَّسُولَ وَتَخُونُوا أَمَانَاتِكُمْ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ } “হে ইমানদারগণ! জেনে –বুঝে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের খেয়ানত করো না এবং তোমাদের পরস্পরের আমানতেরও খেয়ানত করো না।” [আল-আনফাল : ২৭] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: { ٱلَّذِينَ يُوفُونَ بِعَهۡدِ ٱللَّهِ وَلَا يَنقُضُونَ ٱلۡمِيثَٰقَ} “যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে এবং প্রতিজ্ঞা ভংগ করে না।” [আর-রা‘দ : ২০] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সৈন্যবাহিনী বের হলে তিনি তাদেরকে বলতেন: «اغْزُوا وَلَا تَغُلُّوا وَلَا تَغْدِرُوا وَلَا تَمْثُلُوا وَلَا تَقْتُلُوا وَلِيدًا» “তোমরা জিহাদ কর, তবে খিয়ানত কর না, প্রতারণা কর না, বিকৃত কর না এবং বাচ্চাকে হত্যা কর না।” [সহীহ মুসলিম: ১৭৩১] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «أَرْبَعٌ مَنْ كُنَّ فِيهِ كَانَ مُنَافِقًا خَالِصًا وَمَنْ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنْهُنَّ كَانَتْ فِيهِ خَصْلَةٌ مِنَ النِّفَاقِ حَتَّى يَدَعَهَا: إِذَا اؤْتُمِنَ خَانَ وَإِذَا حَدَّثَ كَذَبَ وَإِذَا عَاهَدَ غَدَرَ وَإِذَا خَاصَمَ فَجَرَ» “চারটি স্বভাব যার মধ্যে বিদ্যমান সে খাঁটি মুনাফিক। যার মধ্যে এর কোনো একটি স্বভাব থাকবে, তা পরিত্যাগ না করা পর্যন্ত তার মধ্যে মুনাফিকের একটি স্বভাব থাকেব। ১. আমানত রাখা হলে খিয়ানত করে; ২. কথা বললে মিথ্যা বলে; ৩. অঙ্গীকার করলে ভঙ্গ করে এবং ৪. বিবাদে লিপ্ত হলে অশ্লীলভাবে গালাগালি দেয়।” [সহীহুল বুখারী: ৩৪]
ইসলাম হিংসা থেকে বারণ করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: {أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَىٰ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ۖ فَقَدْ آتَيْنَا آلَ إِبْرَاهِيمَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَآتَيْنَاهُم مُّلْكًا عَظِيمًا} “বরং তারা কি লোকদেরকে হিংসা করে, আল্লাহ স্বীয় অনুগ্রহে তাদেরকে যা দিয়েছেন তার কারণে? তাহলে তো আমি ইবরাহীমের বংশধরকে কিতাব ও হিকমত দান করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি বিশাল রাজত্ব।” [আন-নিসা : ৫৪] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُم مِّن بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِّنْ عِندِ أَنفُسِهِم مِّن بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ ۖ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّىٰ يَأْتِيَ اللَّهُ بِأَمْرِهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ} “আহলে কিতাবের অনেকেই চায়, যদি তারা তোমাদেরকে ঈমান আনার পর কাফির অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে পারত! সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর তাদের পক্ষ থেকে হিংসাবশত (তারা এরূপ করে থাকে)। সুতরাং তোমরা ক্ষমা কর এবং এড়িয়ে চল, যতক্ষণ না আল্লাহ তাঁর নির্দেশ দেন। নিশ্চয় আল্লাহ সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান।” [আল-বাকারাহ : ১০৯] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «دَبَّ إِلَيْكُمْ دَاءُ الأُمَمِ قَبْلَكُمْ: الحَسَدُ وَالبَغْضَاءُ هِيَ الحَالِقَةُ لَا أَقُولُ تَحْلِقُ الشَّعَرَ وَلَكِنْ تَحْلِقُ الدِّينَ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لَا تَدْخُلُوا الجَنَّةَ حَتَّى تُؤْمِنُوا وَلَا تُؤْمِنُوا حَتَّى تَحَابُّوا أَفَلَا أُنَبِّئُكُمْ بِمَا يُثَبِّتُ ذَلِكَ لَكُمْ؟ أَفْشُوا السَّلَامَ بَيْنَكُمْ» “তোমাদের আগেকার উম্মাতদের রোগ তোমাদের মধ্যেও সংক্রমিত হয়েছে,তা হলোঃ হিংসা-বিদ্বেষ ও ঘৃণা। আর এই রোগ মুণ্ডন করে দেয়। আমি বলছি না যে, চুল মুণ্ডন করে দেয়, বরং এটা দীনকে মুণ্ডন (বিনাশ) করে দেয়। সেই মহান সত্তার শপথ, যার হাতে আমার জীবন! তোমরা ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না। আর তোমরা পরস্পরকে না ভালবাসা পর্যন্ত ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদেরকে বলবো না যে, পারস্পরিক ভালবাসা কোন কাজের মাধ্যমে মজবুত হয়? তোমরা তোমাদের মাঝে সালামের বিস্তার ঘটাও।” [সুনানুত তিরমিযী : ২৫১০]
ইসলাম খারাপ কৌশল থেকে বারণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَكَذَٰلِكَ جَعَلْنَا فِي كُلِّ قَرْيَةٍ أَكَابِرَ مُجْرِمِيهَا لِيَمْكُرُوا فِيهَا ۖ وَمَا يَمْكُرُونَ إِلَّا بِأَنفُسِهِمْ وَمَا يَشْعُرُونَ} “আর এভাবে আমি প্রতিটি জনপদে তার অপরাধীদের সর্দারদেরকে ছেড়ে দিয়েছি, যাতে তারা সেখানে চক্রান্ত করে।িএতে তারা শুধু নিজেদের সাথেই চক্রান্ত করে অথচ তারা উপলব্ধি করে না।” [আল-আনআম : ১২৩] আল্লাহ তাআলা সংবাদ দিয়েছেন যে, ইহুদীরা মাসীহ আলাইহিস সালামকে হত্যা করার চেষ্টা করেছে ও খারাপ কৌশল করেছে, কিন্তু আল্লাহও তাদের সঙ্গে জবাবে কৌশল করেছেন এবং আল্লাহ স্পষ্ট করেছেন যে, খারাপ কৌশল খোদ ব্যক্তিকে ধ্বংস করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {فَلَمَّا أَحَسَّ عِيسَىٰ مِنْهُمُ الْكُفْرَ قَالَ مَنْ أَنصَارِي إِلَى اللَّهِ ۖ قَالَ الْحَوَارِيُّونَ نَحْنُ أَنصَارُ اللَّهِ آمَنَّا بِاللَّهِ وَاشْهَدْ بِأَنَّا مُسْلِمُونَ (52) “অতঃপর যখন ঈসা তাদের পক্ষ হতে কুফরী উপলব্ধি করল, তখন বলল, ‘কে আল্লাহর জন্য আমার সাহায্যকারী হবে’? হাওয়ারীগণ বলল, ‘আমরা আল্লাহর সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনি সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলিম। (৫২) رَبَّنَا آمَنَّا بِمَا أَنزَلْتَ وَاتَّبَعْنَا الرَّسُولَ فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ (53) হে আমাদের রব! আপনি যা নাযিল করেছেন তার প্রতি আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা এ রাসূলের অনুসরণ করেছি। কাজেই আমাদেরকে সাক্ষ্যদানকারীদের তালিকাভুক্ত করে নিন।’ (৫৩) وَمَكَرُوا وَمَكَرَ اللَّهُ ۖ وَاللَّهُ خَيْرُ الْمَاكِرِينَ (54) আর তারা কুটকৌশল করেছিল,জবাবে আল্লাহ্ও কৌশল করেছিলেন; আর আল্লাহ্ শ্রেষ্ঠতম কৌশলী। (৫৪) إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَىٰ إِنِّي مُتَوَفِّيكَ وَرَافِعُكَ إِلَيَّ وَمُطَهِّرُكَ مِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا وَجَاعِلُ الَّذِينَ اتَّبَعُوكَ فَوْقَ الَّذِينَ كَفَرُوا إِلَىٰ يَوْمِ الْقِيَامَةِ ۖ ثُمَّ إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأَحْكُمُ بَيْنَكُمْ فِيمَا كُنتُمْ فِيهِ تَخْتَلِفُونَ (55) } স্মরণ কর, যখন আল্লাহ বললেন, ‘হে ঈসা, নিশ্চয় আমি তোমাকে পরিগ্রহণ করব, তোমাকে আমার দিকে উঠিয়ে নেব এবং কাফিরদের থেকে তোমাকে পবিত্র করব। আর যারা তোমার আনুগত্য করেছে তাদেরকে কিয়ামত পর্যন্ত অবিশ্বাসীদের উপরে প্রাধান্য দেব। অতঃপর আমার নিকটই তোমাদের প্রত্যাবর্তন হবে। তখন আমি তোমাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেব, যে ব্যাপারে তোমরা মতবিরোধ করতে’। (৫৫)” [আলে-ইমরান : ৫২-৫৫] আল্লাহ আরও সংবাদ দিয়েছেন যে, নবী সালিহ আলাইহিস সালামের জাতি প্রতারণামূলকভাবে তাকে হত্যা করার ইচ্ছা করে এবং কঠিন কুটকৌশল গ্রহণ করে, ফলে জবাবে আল্লাহও তাদের সঙ্গে কৌশল করেন এবং তাদেরকে ও তাদের জাতির সবাইকে ধ্বংস করেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {قَالُوا تَقَاسَمُوا بِاللَّهِ لَنُبَيِّتَنَّهُ وَأَهْلَهُ ثُمَّ لَنَقُولَنَّ لِوَلِيِّهِ مَا شَهِدْنَا مَهْلِكَ أَهْلِهِ وَإِنَّا لَصَادِقُونَ (49) “তারা বলল, ‘তোমরা পরস্পর আল্লহর নামে শপথ গ্রহণ কর, ‘আমরা রাতেই শেষ করে দেব তাকে ও তার পরিবার-পরিজনকে; তারপর তার অভিভাবককে নিশ্চিত করে বলব যে, ‘তার পরিবার-পরিজন হত্যা আমরা প্রত্যক্ষ করিনি; আর আমরা অবশ্যই সত্যবাদী।’ (৪৯) وَمَكَرُوا مَكْرًا وَمَكَرْنَا مَكْرًا وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (50) আর তারা এক চক্রান্ত করেছিল এবং জবাবে আমরাও এক অভিনব কৌশল অবলম্বন করলাম, অথচ তারা উপলব্ধিও করতে পারেনি। (৫০) فَانظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ مَكْرِهِمْ أَنَّا دَمَّرْنَاهُمْ وَقَوْمَهُمْ أَجْمَعِينَ (51) } অতএব দেখুন, তাদের চক্রান্তের পরিণাম কি হয়েছে,আমি তো তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়ের সকলকে ধ্বংস করেছি। (৫১)” [আন-নামাল : ৪৯-৫১]
ইসলাম চুরি থেকে নিষেধ করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «لاَ يَزْنِي الزَّانِي حِينَ يَزْنِي وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَسْرِقُ حِينَ يَسْرِقُ وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَشْرَبُ حِينَ يَشْرَبُهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ وَالتَّوْبَةُ مَعْرُوضَةٌ بَعْدُ» “যিনাকারী যিনা করার সময় মু’মিন থাকে না। চোর চুরি করার সময় মু’মিন থাকে না। মদপানকারী মদ পান করার সময় মু’মিন থাকে না। তবে তারপরও তওবা উন্মুক্ত।” [সহীহুল বুখারী ৬৮১০]
ইসলাম সীমালঙ্ঘন থেকে বারণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِ ۚ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ } “নিশ্চয় আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণতা, ইহসান (সদাচরণ) ও আত্মীয়-স্বজনকে দানের নির্দেশ দেন এবং তিনি অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন; তিনি তোমাদেরকে উপদেশ দেন যাতে তোমরা শিক্ষা গ্রহণ কর।” [আন-নাহল : ৯০] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «إنَّ الله أوحى إليَّ أن تَواضَعُوا حتى لا يَبغِي أحدٌ على أحدٍ ولا يفخَرَ أحدٌ على أحدٍ» “আল্লাহ তা‘আলা আমার নিকট অহী পাঠালেন যে, তোমরা পরষ্পর বিনয়ী হও, যেন কেউ কারো ওপর সীমালঙ্ঘন না করে এবং কেউ কারো ওপর অহঙ্কার না করে।” [সহীহ আবূ দাউদ : ৪৮৯৫]
ইসলাম জুলম থেকে বারণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَٱللَّهُ لَا يُحِبُّ ٱلظَّـٰلِمِينَ} “আর আল্লাহ্ যালেমদেরকে পছন্দ করেন না।” [আলে ইমরান : ৫৭] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: { إِنَّهُۥ لَا يُفۡلِحُ ٱلظَّـٰلِمُونَ} “নিশ্চয় যালিমরা সাফল্য লাভ করতে পারে না।” [আল-আনআম : ২১] আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: { وَٱلظَّـٰلِمِينَ أَعَدَّ لَهُمۡ عَذَابًا أَلِيمَۢا} “কিন্তু যালেমরা- তাদের জন্য তিনি প্ৰস্তুত রেখেছেন যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [আন-নিসা : ৩১] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «ثَلَاثَةٌ لَا تُرَدُّ دَعْوَتُهُمْ: الْإِمَامُ الْعَادِلُ وَالصَّائِمُ حَتَّى يُفْطِرَ وَدَعْوَةُ الْمَظْلُومِ تُحْمَلُ عَلَى الْغَمَامِ وَتُفْتَحُ لَهَا أَبْوَابُ السَّمَاوَاتِ وَيَقُولُ الرَّبُّ عَزَّ وَجَلَّ: وَعِزَّتِي لَأَنْصُرَنَّكَ وَلَوْ بَعْدَ حِينٍ» “তিনজনের দু’আ ফিরিয়ে দেয়া হয় না: ন্যায়পরায়ণ শাসকের দু’আ, রোযাদারের ইফতারের সময়কালীন দু’আ এবং মাযলুমের দু'আ। একে (মাযলুমের দু'আকে) মেঘমালার উপর তুলে নেয়া হয়, তার জন্য আকাশের দরজাসমূহ উন্মুক্ত হয়ে যায় এবং আল্লাহ তা'আলা বলেনঃ আমার ইজ্জাত ও সম্মানের শপথ! কিছু দেরিতে হলেও আমি তোমাকে সাহায্য করবোই।” [সামান্য পরিবর্তনসহ মুসলিম : (২৭৪৯), সামান্য পরিবর্তনসহ তিরমিযী (২৫২৬) এবং আহমাদ (৮০৪৩), শব্দ আহমাদ থেকে গৃহীত] রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুয়াযকে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তাকে যা বলেছিলেন তাতে ছিল: «وَاتَّقِ دَعْوَةَ المَظْلُومِ فَإِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَهُ وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ» “আর তুমি মাজলুমের বদদোয়াকে ভয় কর। কেননা তার মাঝে ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।” [সহীহুল বুখারী: ১৪৯৬] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «أَلَا مَن ظَلم مُعاهِداً أو انتَقصَهُ أو كلَّفَهُ فوقَ طاقَتِه أو أخَذ منهُ شيئاً بِغيرِ طِيبِ نَفسِ فأنا حَجِيجُهُ يوم القيامةِ» “সাবধান! যে ব্যক্তি চুক্তিবদ্ধ সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তির উপর যুলম করবে বা তার প্রাপ্য কম দিবে কিংবা তাকে তার সামর্থের বাইরে কিছু করতে বাধ্য করবে অথবা তার সন্তুষ্টিমূলক সম্মতি ছাড়া তার কাছ থেকে কিছু গ্রহণ করবে, কিয়ামতের দিন আমি তার বিপক্ষে বাদী হবো।” [সুনান আবু দাঊদ: ৩০৫২] আপনি দেখলেন যে, ইসলাম সকল প্রকার খারাপ চরিত্র অথবা অন্যায় ও বেইনসাফ লেন-দেন থেকে নিষেধ করে।
৩৬- ইসলাম এমন অর্থনৈতিক লেনদেন থেকে নিষেধ করে, যাতে রয়েছে সুদ অথবা ক্ষতি অথবা ধোকা অথবা জুলম অথবা প্রতারণা, অথবা যা সামাজে, গোষ্ঠীতে ও ব্যক্তিতে ব্যাপক ক্ষতি ও দুর্যোগ সৃষ্টি করে।
ইসলাম এমন অর্থনৈতিক লেনদেন থেকে নিষেধ করে, যাতে রয়েছে সুদ অথবা ক্ষতি অথবা ধোকা অথবা জুলম অথবা প্রতারণা, অথবা যা সামাজে, গোষ্ঠীতে ও ব্যক্তিতে ব্যাপক ক্ষতি ও দুর্যোগ সৃষ্টি করে। যেসব আয়াত ও হাদীস সুদ অথবা জুলুম অথবা ধোকা অথবা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করাকে হারাম করে তার উল্লেখ এই অনুচ্ছেদের শুরুতে গত হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَالَّذِينَ يُؤْذُونَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ بِغَيْرِ مَا اكْتَسَبُوا فَقَدِ احْتَمَلُوا بُهْتَانًا وَإِثْمًا مُّبِينًا} “আর যারা মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারীদেরকে কষ্ট দেয় যা তারা করেনি তার জন্য; নিশ্চয় তারা অপবাদ ও স্পষ্ট পাপের বোঝা বহন করলো।” [আল-আহযাব : ৫৮] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {مَّنْ عَمِلَ صَالِحًا فَلِنَفْسِهِ ۖ وَمَنْ أَسَاءَ فَعَلَيْهَا ۗ وَمَا رَبُّكَ بِظَلَّامٍ لِّلْعَبِيدِ} “যে সৎকাজ করে সে তার নিজের কল্যাণের জন্যই তা করে এবং কেউ মন্দ কাজ করলে তার প্রতিফল সে-ই ভোগ করবে। আর আপনার রব তাঁর বান্দাদের প্রতি মোটেই যুলুমকারী নন।” [ফুসসিলাত : ৪৬] আর হাদীসে এসেছে: «أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَضَى أَنْ لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ» রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফয়সালা করেছেন যে, “ইচ্ছা ও অনিচ্ছায় ক্ষতি সাধন করা যাবে না।” [সুনানু আবি দাঊদ] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: « مَن كانَ يُؤْمِنُ باللَّهِ والْيَومِ الآخِرِ فلا يُؤْذِي جارَهُ، ومَن كانَ يُؤْمِنُ باللَّهِ والْيَومِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، ومَن كانَ يُؤْمِنُ باللَّهِ والْيَومِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا، أوْ لِيسْكُتْ. وفي روايةٍ: فَلْيُحْسِنْ إلى جارِهِ. » “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান (খাতির যত্ন) করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন ভালো কথা বলে, নচেৎ চুপ থাকে।” অপর বর্ণনায় এসছে, সে যেন তার প্রতিবেশীর প্রতি সুন্দর আচরণ করে।” [সহীহ মুসলিম: ৪৭] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «عُذِّبَتِ امْرَأَةٌ فِي هِرَّةٍ سَجَنَتْهَا حَتَّى مَاتَتْ فَدَخَلَتْ فِيهَا النَّارَ لَا هِيَ أَطْعَمَتْهَا وَسَقَتْهَا إِذْ هِيَ حَبَسَتْهَا وَلَا هِيَ تَرَكَتْهَا تَأْكُلُ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ» “এক নারীকে একটি বিড়ালের ব্যাপারে শাস্তি দেয়া হয়েছে, সে তাকে বন্ধি করে রেখেছিল, ফলে সেটি মারা যায়, তার কারণে সে জাহান্নামে প্রবেশ করে। সে যখন তাকে আটকে রেখেছিল, তাকে খাবার দেয়নি এবং পানীয় পান করায়নি আর তাকে জমিনের খড়কুটা খেতে ছেড়েও দেয়নি।” [সহীহুল বুখারী: ৩৪৮২] এটি যে একটি বিড়ালকে কষ্ট দিয়েছে তার ক্ষেত্রে। কাজেই যে মানুষকে কষ্ট দেয় তার বিষয়টি কেমন হবে। ইবন ওমর থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মিম্বারে ওঠে উচ্চ স্বরে আওয়াজ দিয়ে বললেন| (يَا مَعْشَرَ مَنْ أَسْلَمَ بِلِسَانِهِ وَلَمْ يُفْضِ الإِيمَانُ إِلَى قَلْبِهِ لاَ تُؤْذُوا الْمُسْلِمِينَ وَلاَ تُعَيِّرُوهُمْ وَلاَ تَتَّبِعُوا عَوْرَاتِهِمْ فَإِنَّهُ مَنْ تَتَبَّعَ عَوْرَةَ أَخِيهِ الْمُسْلِمِ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ وَمَنْ تَتَبَّعَ اللَّهُ عَوْرَتَهُ يَفْضَحْهُ وَلَوْ فِي جَوْفِ رَحْلِهِ قَالَ: وَنَظَرَ ابْنُ عُمَرَ يَوْمًا إِلَى البَيْتِ أَوْ إِلَى الكَعْبَةِ فَقَالَ: مَا أَعْظَمَكِ وَأَعْظَمَ حُرْمَتَكِ وَالمُؤْمِنُ أَعْظَمُ حُرْمَةً عِنْدَ اللهِ مِنْكِ) “হে ঐ জামাআত, যারা মুখে ইসলাম কুবুল করেছ কিন্তু অন্তরে এখনো ঈমান মাজবুত হয়নি। তোমরা মুসলিমদের কষ্ট দিবে না, তাদের লজ্জা দিবে না এবং তাদের গোপন দোষ অনুসন্ধান করবে না। কেননা, যে তার মুসলিম ভাইয়ের গোপন দোষ অনুসন্ধান করবে আল্লাহ তার গোপন দোষ অনুসন্ধান করবেন। আর আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করবেন তাকে তিনি অপমান করে ছাড়বেন, যদিও সে তার উটের হাওদার ভিতরে অবস্থান করে। বর্ণনাকারী (নাফি) বলেন, ইবন ওমর একদা বায়তুল্লাহর দিকে অথবা কাবার দিকে দৃষ্টি দিলেন এবং বললেন, তুমি কী মহান এবং কী মহান তোমার সম্মান, কিন্তু মুমিন আল্লাহর নিকট তোমার চেয়েও বেশী সম্মানিত।” [তিরমিযী : ২০৩২, ইবন হিব্বান : ৫৭৬৩] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন: (مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلاَ يُؤْذِ جَارَهُ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ وَمَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَاليَوْمِ الآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ) “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার প্রতিবেশীকে কষ্ট না দেয়। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান (খাতির যত্ন) করে। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে সে যেন ভালো কথা বলে, নচেৎ চুপ থাকে।” [সহীহুল বুখারী: ৬০১৮] আবূ হুরাইরাহ সূত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: " هَلْ تَدْرُونَ مَنِ الْمُفْلِسُ؟ " قَالُوا: الْمُفْلِسُ فِينَا يَا رَسُولَ اللهِ مَنْ لَا دِرْهَمَ لَهُ وَلَا مَتَاعَ. قَالَ: " إِنَّ الْمُفْلِسَ مِنْ أُمَّتِي مَنْ يَأْتِي يَوْمَ الْقِيَامَةِ بِصِيَامٍ وَصَلَاةٍ وَزَكَاةٍ وَيَأْتِي قَدْ شَتَمَ عِرْضَ هَذَا وَقَذَفَ هَذَا وَأَكَلَ مَالَ هَذَا فَيُقْعَدُ فَيَقُصُّ هَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ وَهَذَا مِنْ حَسَنَاتِهِ فَإِنْ فَنِيَتْ حَسَنَاتُهُ قَبْلَ أَنْ يَقْضِيَ مَا عَلَيْهِ مِنَ الْخَطَايَا أُخِذَ مِنْ خَطَايَاهُمْ فَطُرِحَتْ عَلَيْهِ ثُمَّ طُرِحَ فِي النَّارِ) ‘‘তোমরা কি জান, নিঃস্ব কে?’’ তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, ‘আমাদের মধ্যে নিঃস্ব ঐ ব্যক্তি, যার কাছে কোনো দিরহাম এবং কোনো আসবাব-পত্র নেই।’ তিনি বললেন, ‘‘আমার উম্মতের মধ্যে (আসল) নিঃস্ব তো সেই ব্যক্তি,যে কিয়ামতের দিন সালাত, সিয়াম ও যাকাত নিয়ে হাযির হবে; কিন্তু সে আসবে এ অবস্থায় যে, এর সম্মানহানী করেছে এবং একে অপবাদ দিয়েছে ও এর মাল (অবৈধরূপে) ভক্ষণ করেছে। ফলে তাকে বসানো হবে এবং এই ব্যক্তি তার নেকী থেকে বিনিময় গ্রহণ করবে এবং এই ব্যক্তি তার নেকী থেকে বিনিময় গ্রহণ করবে। যদি তার ওপর যে হক রয়েছে তা আদায় করার আগেই তার নেকী শেষ হয়ে যায়, তাহলে তাদের পাপ থেকে গ্রহণ করে তার ওপর নিক্ষেপ করা হবে। অতঃপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” [মুসলিম : (২৫৮১), তিরমিযী : (২৪১৮), আহমাদ : (৮০২৯), হাদীসের শব্দ আহমাদ থেকে গৃহীত]
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন: (كَانَ عَلَى الطَّرِيقِ غُصْنُ شَجَرَةٍ يُؤْذِي النَّاسَ فَأَمَاطَهَا رَجُلٌ فَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ) “এক রাস্তার উপর একটি গাছের ডাল এসে পড়েছিল যা মানুষকে কষ্ট দিতো। এক ব্যক্তি তা সরিয়ে ফেলল, ফলে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হল।” বুখারী : (৬৫২), মুসলিম (১৯১৪), ইবন মাজাহ : (৩৬৮২), আহমাদ : (১০৪৩২) হাদীসের শব্দ ইবন মাজাহ ও আহমাদ থেকে গৃহীত। অতএব রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা যদি জান্নাতে প্রবেশ করায়, তাহলে যে মানুষকে কষ্ট দেয় ও তাদের জীবন নষ্ট করে তার বিষয়টি কেমন হবে।
ইসলাম বিবেককে সুরক্ষা দিতে এবং যা কিছু বিবেক বিনষ্ট করে তা সব হারাম করতে এসেছে, যেমন মদ পান করা। ইসলাম বিবেকের বিষয়টিকে উচ্চে উঠিয়েছে এবং তাকে দায়িত্ব প্রদানের মূল হিসেবে স্থির করেছে আর তাকে কুসংস্কারের বোঝা ও প্রতিমা পূজা থেকে মুক্তি দিয়েছে। ইসলামে এমন কোনো গোপন ভেদ নেই , যা এক গোষ্ঠী বাদে অপর গোষ্ঠীর সঙ্গে খাস। তার প্রত্যেক বিধান ও শরীয়ত বিশুদ্ধ বিবেক মোতাবেক এবং তা ইনসাফ ও হিকমতের দাবি মোতাবেকও।
ইসলাম বিবেককে সুরক্ষা দিতে এসছে এবং তার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا } “নিশ্চয় কান, চোখ, হৃদয়- এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।” [আল-ইসরা : ৩৬] অতএব মানুষের ওপর ওয়াজিব হচ্ছে তার বিবেককে হিফাযত করা। আর এই জন্যেই ইসলাম মদ ও নেশা জাতীয় বস্তু হারাম করেছে। আমি মদ হারাম হওয়ার বিষয়টি (৩৪) নং অনুচ্ছেদে উল্লেখ করেছি। বস্তুত আল-কুরআনুল কারীমের অনেক আয়াত শেষ করা হয়েছে আল্লাহর নিম্নের বাণী দ্বারা: {لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ} “যাতে তোমরা বুঝতে পার।” [আল-বাকারা : ২৪২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَمَا الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلَّا لَعِبٌ وَلَهْوٌ ۖ وَلَلدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِّلَّذِينَ يَتَّقُونَ ۗ أَفَلَا تَعْقِلُونَ } “আর দুনিয়ার জীবন তো খেল –তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের আবাসই উত্তম; অতএব, তোমারা কি অনুধাবন কর না?” [আল-আনআম : ৩২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { إِنَّا أَنزَلْنَاهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لَّعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ } “নিশ্চয় আমি এটা নাযিল করেছি কুরআন হিসেবে আরবি ভাষায় যাতে তোমরা বুঝতে পারো।” [সূরা ইউছুফ : ২] আল্লাহ তা‘আলা আরো বর্ণনা করেছেন যে, হিদাযেত ও হিকমত দ্বারা বিবেকিরা ছাড়া কেউ উপকৃত হয় না, বস্তুত তারাই হলো বুদ্ধিমান। আল্লাহ তা‘আলা বলনে: {يُؤْتِي الْحِكْمَةَ مَن يَشَاءُ ۚ وَمَن يُؤْتَ الْحِكْمَةَ فَقَدْ أُوتِيَ خَيْرًا كَثِيرًا ۗ وَمَا يَذَّكَّرُ إِلَّا أُولُو الْأَلْبَابِ } “তিনি যাকে ইচ্ছে হেকমত দান করেন। আর যাকে হেকমত প্রদান করা হয় তাকে তো প্রভূত কল্যাণ দান করা হয় এবং বিবেকসম্পন্নগণই শুধু উপদেশ গ্রহণ করে।” [আল-বাকারাহ : ২৬৯]
এই জন্যে ইসলাম বিবেককে দায়িত্ব প্রদানের মূল হিসেবে নির্ধারণ করেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «رُفِعَ الْقَلَمُ عَنْ ثَلَاثٍ: عَنِ النَّائِمِ حَتَّى يَسْتَيْقِظَ وَعَنِ الصَّبِيِّ حَتَّى يَحْتَلِمَ وَعَنِ الْمَجْنُونِ حَتَّى يَعْقِلَ» “তিনজন থেকে কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে: নিদ্রিত ব্যক্তি, যতক্ষণ না সে জাগ্রত হয়, নাবালেগ, যতক্ষণ না সে বালেগ হয় এবং পাগল, যতক্ষণ না সে সুস্থ হয়।” বুখারী তা‘লীক হিসেবে ৫২৬৯ নং হাদীসের পূর্বে এরূপ উল্লেখ করেছেন। আর আবু দাউদ এটি উল্লেখ করেছেন মুত্তাসিল সনদে (৪৪০২), হাদীসের শব্দ তার থেকেই গৃহীত। তিরমিযি : (১৪২৩), নাসাঈ ফিল কুবরা : (৭৩৪৬), সামান্য ভিন্নতাসহ আহমাদ : (৯৫৬) ও ইবন মাজাহ (২০৪২) সংক্ষেপে উল্লেখ করেছেন। ইসলাম বিবেককে কুসংস্কার ও মূর্তিপূজা থেকে মুক্ত করেছে। আল্লাহ তাআলা পূর্বের উম্মতসমূহের নিজ নিজ কুসংস্কারকে আকড়ে ধরা এবং যে হক আল্লাহর কাছ থেকে এসছে তা প্রত্যাখ্যান করার স্বভাব সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন: {وَكَذَٰلِكَ مَا أَرْسَلْنَا مِن قَبْلِكَ فِي قَرْيَةٍ مِّن نَّذِيرٍ إِلَّا قَالَ مُتْرَفُوهَا إِنَّا وَجَدْنَا آبَاءَنَا عَلَىٰ أُمَّةٍ وَإِنَّا عَلَىٰ آثَارِهِم مُّقْتَدُونَ} “আর এভাবেই আপনার পূর্বে কোনো জনপদে যখনই আমি কোনো সতর্ককারী পাঠিয়েছি তখনই তার বিলাসপ্রিয়রা বলেছে, ‘নিশ্চয় আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে এক মতাদর্শে পেয়েছি এবং আমরা তাদেরই পদাংক অনুসরণ করে থাকব।” [আয-যুখরুফ : ২৩] আল্লাহ তা‘আলা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সম্পর্কে সংবাদ দিয়ে বলেন, তিনি তার জাতিকে বলেছেন: {مَا هَٰذِهِ التَّمَاثِيلُ الَّتِي أَنتُمْ لَهَا عَاكِفُونَ (52) “এ মূর্তিগুলো কী? যাদের পুজায় তোমরা রত রয়েছ!’ (৫২) قَالُوا وَجَدْنَا آبَاءَنَا لَهَا عَابِدِينَ (53) } তারা বলল, আমরা আমাদের পিতৃ পুরুষদেরকে এদের ‘ইবাদত করতে দেখেছি। (৫৩)” [আল-আম্বিয়া : ৫২-৫৩] ইসলাম এসে মানুষকে মূর্তির ইবাদত ছাড়তে, বাপ-দাদা থেকে প্রাপ্ত কুসংস্কার থেকে মুক্ত হতে ও রাসূল আলাইহিমুস সালামদের রাস্তা অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছে।
ইসলামে এমন কোনো ভেদ বা বিধান নেই, যা এক শ্রেণী বাদে অপর শ্রেণীর সঙ্গে খাস। سُئل علي بن أبي طالب رضي الله عنه وهو ابن عم رسول الله صلى الله عليه وسلم وزوج ابنته: أَخَصَّكُمْ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَيْءٍ؟ فَقَالَ: «مَا خَصَّنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِشَيْءٍ لَمْ يَعُمَّ بِهِ النَّاسَ كَافَّةً إِلَّا مَا كَانَ فِي قِرَابِ سَيْفِي هَذَا قَالَ: فَأَخْرَجَ صَحِيفَةً مَكْتُوبٌ فِيهَا: لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ وَلَعَنَ اللهُ مَنْ سَرَقَ مَنَارَ الْأَرْضِ وَلَعَنَ اللهُ مَنْ لَعَنَ وَالِدَهُ وَلَعَنَ اللهُ مَنْ آوَى مُحْدِثًا» ‘আলী ইবন আবু তালিবকে প্রশ্ন করা হলো, যিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চাচাতো ভাই এবং তার মেয়ের স্বামী। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি কোনো জিনিস দিয়ে আপনাদেরকে খাস করেছেন? তিনি বললেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সব মানুষকে দেননি এমন কোনো জিনিস দ্বারা আমাদেরকে খাস করেননি, তবে আমার এই তলোয়ারের খাপে যা আছে তা ছাড়া। রাবী বলেন, তারপর তিনি তার তরবারির খাপ থেকে একটি সহীফাহ (লিখিত ছোট পুস্তিকা) বের করলেন, যাতে লেখা ছিল “আল্লাহ অভিসম্পাত করেন সে ব্যক্তিকে, যে আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নামে যবেহ করে, আল্লাহ অভিসম্পাত করেন সে লোককে, যে জমিনের সীমানা চিহ্নসমূহ চুরি করে, আল্লাহ অভিসম্পাত করেন সে ব্যক্তিকে, যে তার পিতাকে অভিসম্পাত করে। আল্লাহ অভিসম্পাত করেন সে ব্যক্তিকে, যে কোনো বিদ'আতীকে আশ্রয় দেয়।” [সহীহ মুসলিম: ১৯৭৮] ইসলামের সকল বিধান ও শরীয়ত বিশুদ্ধ বিবেক মোতাবেক এবং তা ইনসাফ ও হিকমতের দাবী মোতাবেকও।
৩৮- বাতিল দীনগুলোর অনুসারীরা যখন তার অভ্যন্তরীণ বৈপরীত্য ও বিবেক বর্হিঃভূত বিষয়গুলো সামাল দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তার ধর্মীয় ব্যক্তিরা তাদের অনুসারীদের বুঝায় যে, দীন হলো বিবেকের উর্ধ্বে আর দীন বুঝা ও তা আয়াত্ত্বে আনা বিবেকের কাজ নয়। পক্ষান্তরে ইসলাম দীনকে এক আলোক জ্ঞান করে যা বিবেকের সামনে তার পথকে আলোকিত করে দেয়। কাজেই বাতিল দীনের অনুসারীরা চায় মানুষ নিজদের বিবেক ছেড়ে তাদের অনুসরণ করুক। আর ইসলাম মানুষের কাছে চায়, সে তা বিবেককে সজাক করুক, যেন সে প্রত্যেক বস্তুর বাস্তবতা যেমন আছে তেমন বুঝতে সক্ষম হয়।
বাতিল দীনগুলোর অনুসারীরা যখন তার ভেতরকার বৈপরীত্য ও বিবেক বর্হিঃভূত বিষয়গুলো সামাল দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তার ধর্মীয় ব্যক্তিরা তাদের অনুসারীদের বুঝায় যে, দীন হলো বিবেকের উর্ধ্বে আর দীন বুঝা ও তা আয়াত্বে আনা বিবেকের কাজ নয়। পক্ষান্তরে ইসলাম দীনকে এক আলোক জ্ঞান করে যা বিবেকের সামনে তার পথকে আলোকিত করে দেয়। কাজেই বাতিল দীনের অনুসারীরা চায় মানুষ নিজদের বিবেক ছেড়ে তাদের অনুসরণ করুক। আর ইসলাম মানুষের কাছে চায়, সে তা বিবেককে সজাক করুক, যেন সে গবেষণা ও চিন্তা করে এবং প্রত্যেক বস্তুর বাস্তবতা যেমন আছে তেমন বুঝতে সক্ষম হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَكَذَٰلِكَ أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ رُوحًا مِّنْ أَمْرِنَا ۚ مَا كُنتَ تَدْرِي مَا الْكِتَابُ وَلَا الْإِيمَانُ وَلَٰكِن جَعَلْنَاهُ نُورًا نَّهْدِي بِهِ مَن نَّشَاءُ مِنْ عِبَادِنَا ۚ وَإِنَّكَ لَتَهْدِي إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ } “আর এভাবে আমি আপনার প্রতি আমার নির্দেশ থেকে রূহকে ওহী করেছি; আপনি তো জানতেন না কিতাব কি এবং ঈমান কি! কিন্তু আমি এটাকে করেছি নূর, যা দ্বারা আমি আমার বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছে হেদায়াত দান করি; আর আপনি তো অবশ্যই সরল পথের দিকে দিকনির্দেশনা করেন।” [আশ-শুরা : ৫২] বস্তুত আল্লাহর ওহী অনেক দলিল ও প্রমাণ অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা বিশুদ্ধ বিবেককে এমন বাস্তবতার দিকে ধাবিত করে, যা জানতে ও যার প্রতি ঈমান আনতে বিশুদ্ধ বিবেক উদগ্রীব হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَا أَيُّهَا النَّاسُ قَدْ جَاءَكُم بُرْهَانٌ مِّن رَّبِّكُمْ وَأَنزَلْنَا إِلَيْكُمْ نُورًا مُّبِينًا} “হে লোকসকল! তোমাদের রবের কাছ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ এসেছে এবং আমি তোমাদের প্রতি স্পষ্ট জ্যোতি নাযিল করেছি।” [আন-নিসা : ১৭৪] আল্লাহু সুবহানাহু ওয়াতালা মানুষের জন্যে চান যে, সে হিদায়েত, ইলম ও বাস্তবতার আলোকে জীবন-যাপন করুক, পক্ষান্তরে শয়তান ও তাগুতরা মানুষের জন্যে চায় যে, সে কুফরি, মূর্খতা ও গোমরাহীর অন্ধকারে অবস্থান করুক। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {اللَّهُ وَلِيُّ الَّذِينَ آمَنُوا يُخْرِجُهُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ ۖ وَالَّذِينَ كَفَرُوا أَوْلِيَاؤُهُمُ الطَّاغُوتُ يُخْرِجُونَهُم مِّنَ النُّورِ إِلَى الظُّلُمَاتِ} “যারা ঈমান এনেছে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে বের করে আনেন। আর যারা কুফরী করে, তাদের অভিভাবক হল তাগূত। তারা তাদেরকে আলো থেকে বের করে অন্ধকারে নিয়ে যায়।” [আল-বাকারাহ : ২৫৭]
৩৯- ইসলাম সঠিক ইলমকে সম্মান করে এবং প্রবৃত্তিহীন বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে। আর আমাদের নিজেদের মধ্যে ও আমাদের পার্শবর্তী জগতে নজর দিতে আহ্বান করে। বস্তুত বৈজ্ঞানিক বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় না।
ইসলাম সঠিক ইলমকে সম্মান করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ } “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ্ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন; আর তোমরা যা কর আল্লাহ্ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।” [আল-মুজাদালাহ : ১১] আল্লাহ তাআলা সবচেয়ে বড় সাক্ষ্যের বস্তুতে নিজের সাক্ষ্য ও তাঁর ফেরেশ্তাগণের সাক্ষ্যের সঙ্গে আলেমদের সাক্ষ্যকে যুক্ত করেছেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ ۚ لَا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ } “আল্লাহ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) মাবূদ নেই, আর ফেরেশ্তা ও জ্ঞানীগণও। তিনি ন্যায় দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। তিনি ছাড়া কোনো (সত্য) মাবূদ নেই। তিনি পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [আলু ইমরান : ১৮] এটি ইসলামে আলেমদের অবস্থানকে স্পষ্ট করে। আর আল্লাহ তা‘আলা তার নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইলম ছাড়া আর কোনো জিনিস বেশী তলব করতে নির্দেশ দেননি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَقُل رَّبِّ زِدْنِي عِلْمًا } “আর তুমি বল, হে আমার রব,আমার ইলম বৃদ্ধি করে দিন।” [ত্বহা : ১১৪] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَلْتَمِسُ فِيهِ عِلْمًا سَهَّلَ اللَّهُ لَهُ طَرِيقًا إِلَى الْجَنَّةِ وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا رِضًا لِطَالِبِ الْعِلْمِ وَإِنَّ طَالِبَ الْعِلْمِ يَسْتَغْفِرُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ حَتَّى الْحِيتَانِ فِي الْمَاءِ وَإِنَّ فَضْلَ الْعَالِمِ عَلَى الْعَابِدِ كَفَضْلِ الْقَمَرِ عَلَى سَائِرِ الْكَوَاكِبِ إِنَّ الْعُلَمَاءَ وَرَثَةُ الْأَنْبِيَاءِ إِنَّ الْأَنْبِيَاءَ لَمْ يُوَرِّثُوا دِينَارًا وَلَا دِرْهَمًا إِنَّمَا وَرَّثُوا الْعِلْمَ فَمَنْ أَخَذَهُ أَخَذَ بِحَظٍّ وَافِرٍ» “যে ব্যক্তি ইলম অর্জনের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্যে জান্নাতের পথ সহজ করে দেন। আর ফেরেশ্তাগণ ইলম অন্বেষণকারীর সন্তুষ্টির জন্য নিজেদের ডানা বিছিয়ে দেন। ইলম অন্বেষীর জন্য আসমান ও যমীনে যারা আছে তারা আল্লাহর নিকট ক্ষমা ও দু‘আ প্রার্থনা করে, এমন কি পানির গভীরে বসবাসকারী মাছও। আর আবেদ (সাধারণ ইবাদাতগুজারী) ব্যক্তির উপর ‘আলিমের ফাযীলত হলো,যেমন সমস্ত তারকার উপর পূর্ণিমার চাঁদের ফজিলত। আলেমরা হলেন নবীদের উত্তরসুরি। নবীগণ কোনো দীনার বা দিরহাম মীরাসরূপে রেখে যান না; তারা উত্তরাধিকার সূত্রে রেখে যান শুধু ইলম। সুতরাং যে ইলম অর্জন করেছে সে পূর্ণ অংশ গ্রহণ করেছে।” আবূ দাউদ : ৩৬৪১, তিরমিযী : ২৬৮২, ইবন মাজাহ : ২২৩, হাদীসের শব্দ ইবন মাজাহ থেকে গৃহীত। আহমাদ : ২১৭১৫।
ইসলাম প্রবৃত্তি মুক্ত গবেষণার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং আমাদের নিজেদের মধ্যে ও আমাদের পার্শবর্তী সৃস্টি জগতে দৃষ্টি দিতে ও গবেষণা করতে আহ্বান করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {سَنُرِيهِمْ آيَاتِنَا فِي الْآفَاقِ وَفِي أَنفُسِهِمْ حَتَّىٰ يَتَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُ الْحَقُّ ۗ أَوَلَمْ يَكْفِ بِرَبِّكَ أَنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ شَهِيدٌ} “অচিরেই আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাব, বিশ্ব জগতের প্রান্তসমূহে এবং তাদের নিজেদের মধ্যে; যাতে তাদের কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠে যে, অবশ্যই এটা (কুরআন) সত্য। এটা কি আপনার রবের সম্পর্কে যথেষ্ট নয় যে, তিনি সব কিছুর উপর সাক্ষী?” [ফুসসিলাত : ৫৩] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {أَوَلَمْ يَنظُرُوا فِي مَلَكُوتِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ مِن شَيْءٍ وَأَنْ عَسَىٰ أَن يَكُونَ قَدِ اقْتَرَبَ أَجَلُهُمْ ۖ فَبِأَيِّ حَدِيثٍ بَعْدَهُ يُؤْمِنُونَ} “তারা কি দৃষ্টিপাত করেনি আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্বে এবং আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার প্রতি? আর (এর প্রতি যে) হয়তো তাদের নির্দিষ্ট সময় নিকটে এসে গিয়েছে? সুতরাং তারা কুরআনের পর আর কোন্ কিতাবের প্রতি ঈমান আনবে?” [আল-আরাফ : ১৮৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {أَوَلَمْ يَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَيَنظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلِهِمْ ۚ كَانُوا أَشَدَّ مِنْهُمْ قُوَّةً وَأَثَارُوا الْأَرْضَ وَعَمَرُوهَا أَكْثَرَ مِمَّا عَمَرُوهَا وَجَاءَتْهُمْ رُسُلُهُم بِالْبَيِّنَاتِ ۖ فَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَٰكِن كَانُوا أَنفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ} “তারা কি জমিনে ভ্রমন করে না? তাহলে তারা দেখত যে, তাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কেমন হয়েছিল। তারা শক্তিতে তাদের চেয়েও প্রবল ছিল। আর তারা জমি চাষ করত এবং তারা এদের আবাদ করার চেয়েও বেশী আবাদ করত। আর তাদের কাছে তাদের রাসূলগণ সুস্পষ্ট প্রমানাদিসহ এসেছিল। বস্তুতঃ আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তাদের প্রতি যুলুম করবেন, কিন্তু তারা নিজেরাই নিজদের প্রতি যুলম করত।” [আর-রূম : ৯]
বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিশুদ্ধ ফল ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় না। শুধু একটি উদাহরণ উল্লেখ করব। যার সূক্ষ্ণ বর্ণনা এক হাজার চৌদ্দশত বছর আগেই আল-কুলআনুল কারীম পেশ করেছে, আর আধুনিক বিজ্ঞান তা জেনেছে অনেক পরে। ফলে আল-কুরআনুল আযীমে যেমন রয়েছে, বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলও তেমনি এসেছে। আর সেটি হচ্ছে মায়ের পেটে বাচ্চার সৃষ্টি। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن سُلَالَةٍ مِّن طِينٍ (12) “আর অবশ্যই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মাটির উপাদান থেকে (১২) ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ (13) তারপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করি এক নিরাপদ ভাণ্ডার জরায়ুতে (১৩) ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً فَخَلَقْنَا الْمُضْغَةَ عِظَامًا فَكَسَوْنَا الْعِظَامَ لَحْمًا ثُمَّ أَنشَأْنَاهُ خَلْقًا آخَرَ ۚ فَتَبَارَكَ اللَّهُ أَحْسَنُ الْخَالِقِينَ (14)} পরে আমি শুক্রবিন্দুকে পরিণত করি জমাট রক্তে,অতঃপর জমাট রক্তকে পরিণত করি গোশতপিণ্ডে, অতঃপর গোশতপিণ্ডকে পরিণত করি শক্ত হাড়ে; অতঃপর শক্ত হাড়কে ঢেকে দেই গোশত দিয়ে; তারপর তাকে গড়ে তুলি অন্য এক সৃষ্টিরূপে। অতএব (দেখে নিন) সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ্ কত বরকতময়! (১৪)” [আল-মুমিনূন : ১২-১৪]
৪০- যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে ও তার আনুগত্য করেছে, এবং তাঁর রাসূল আলাইহিমুস সালামদের সত্যারোপ করেছে তার ছাড়া আর কারো থেকেই কোনো আমল আল্লাহ গ্রহণ করবেন না এবং আখিরাতে তার ওপর সাওয়াবও প্রদান করবেন না। আর তিনি যে ইবাদতের অনুমোদন দিয়েছেন তা ছাড়া কিছুই গ্রহণ করবেন না।সুতরাং মানুষারা কিভাবে আল্লাহর সঙ্গে কুফরী করে তার প্রতিদান আশা করে? আর আল্লাহ কোনো মানুষেরই ঈমান গ্রহণ করবেন না যতক্ষণ না সকল নবী আলাইহিমুস সালামের প্রতি ঈমান ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের প্রতি ঈমান না আনবে।
যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে ও তাঁর আনুগত্য করেছে এবং তাঁর রাসূল আলাইহিমুস সালামদের সত্যারোপ করেছে তার ছাড়া আর কারো থেকেই কোনো আমল আল্লাহ গ্রহণ করবেন না এবং আখিরাতে তার ওপর সাওয়াবও প্রদান করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {مَّن كَانَ يُرِيدُ الْعَاجِلَةَ عَجَّلْنَا لَهُ فِيهَا مَا نَشَاءُ لِمَن نُّرِيدُ ثُمَّ جَعَلْنَا لَهُ جَهَنَّمَ يَصْلَاهَا مَذْمُومًا مَّدْحُورًا (18) “কেউ দুনিয়ার সুখ-সম্ভোগ কামনা করলে আমি যাকে যা ইচ্ছে এখানেই সত্ত্বর দিয়ে থাকি; পরে তার জন্য জাহান্নাম নির্ধারিত করি যেখানে সে শাস্তিতে দগ্ধ হবে নিন্দিত ও অনুগ্রহ হতে দূরীকৃত অবস্থায়' (১৮) وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَىٰ لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَٰئِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُورًا (19) } আর যে আখিরাত চায় এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে মুমিন অবস্থায়, তাদের চেষ্টা হবে পুরস্কারযোগ্য।” (১৯) [সূরা আল-ইসরা : ১৮-১৯] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { فَمَن يَعْمَلْ مِنَ الصَّالِحَاتِ وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَا كُفْرَانَ لِسَعْيِهِ وَإِنَّا لَهُ كَاتِبُونَ} “কাজেই কেউ যদি মুমিন হয়ে সৎকাজ করে তার প্রচেষ্টা অস্বীকার করা হবে না এবং আমি তো তার লিপিবদ্ধকারী।” [আল-আম্বিয়া : ৯৪] আর আল্লাহ যে ইবাদতের অনুমোদন দিয়েছেন তা ছাড়া কিছুই গ্রহণ করবেন না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { فَمَن كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ رَبِّهِ فَلْيَعْمَلْ عَمَلًا صَالِحًا وَلَا يُشْرِكْ بِعِبَادَةِ رَبِّهِ أَحَدًا } “সুতরাং যে তার রবের সাক্ষাৎ কামনা করে,সে যেন সৎকর্ম(নবীর তরীকমত) করে এবং তার রবের ইবাদতে কাউকে শরীক না করে’।” [আল-কাহাফ : ১১০] অতএব তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, আমল যে পর্যন্ত আল্লাহ যার অনুমোদন দিয়েছেন তার অন্তর্ভুক্ত না হবে,নেক ও সালিহ হবে না। আর অবশ্যই আমলকারীকে আল্লাহর প্রতি ঈমানদার এবং তার নবী ও রাসূলগণ আলাইহিমুস সালামদের সত্যারোপকারী অবস্থায় নিজ আমল আল্লাহর জন্যে খালিস ও একনিষ্ঠ করতে হবে। আর এর বাইরে যার আমল হবে তার সম্পর্কে আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَقَدِمْنَا إِلَىٰ مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَّنثُورًا } “আর তারা যে আমল করেছে আমি সেদিকে অগ্রসর হব। অতঃপর তাকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দেব।” [আল-ফুরকান : ২৩] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: { وُجُوهٌ يَوْمَئِذٍ خَاشِعَةٌ (2) “সেদিন অনেক চেহারা হবে অবনত (২) عَامِلَةٌ نَّاصِبَةٌ (3) ক্লিষ্ট, ক্লান্ত (৩), تَصْلَىٰ نَارًا حَامِيَةً (4) } তারা প্রবেশ করবে জ্বলন্ত আগুনে (৪)” [আল-গাশিয়াহ ২-৪] অতএব এসব চেহারা ভীত ও আমল করে ক্লান্ত, কিন্তু তাদের আমল আল্লাহর হিদায়েতবিহীন হওয়ার কারণে আল্লাহ তার পরিণতি জাহান্নাম করেছেন। কেননা সে শুধু আল্লাহর অনুমোদনহীন আমল করেনি, বরং সে বাতিল ইবাদতে ইবাদত করেছে এবং গোমরাহীর নেতৃ-বৃন্দের অনুসরণ করেছে, যারা তাদের জন্যে বাতিল ধর্মসমূহ রচনা করত। কাজেই তা-ই আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য নেক আমল হবে, যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আনীত শরীয়ত মোতাবেক হবে। অতএব মানুষ কিভাবে আল্লাহর সঙ্গে কুফরি করে আবার তার বিনিময়ও আশা করে?
আল্লাহ কোনো মানুষের ঈমান গ্রহণ করবেন না,যে পর্যন্ত সকল নবী আলাইহিমুস সালাম ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের ওপর ঈমান না আনবে। ইতোপূর্বে (২০) নং অনুচ্ছেদে এর ওপর কিছু দলিল উল্লেখ করেছি। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন: {آمَنَ الرَّسُولُ بِمَا أُنزِلَ إِلَيْهِ مِن رَّبِّهِ وَالْمُؤْمِنُونَ ۚ كُلٌّ آمَنَ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ لَا نُفَرِّقُ بَيْنَ أَحَدٍ مِّن رُّسُلِهِ ۚ وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا ۖ غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ} “রাসূল তার প্রভুর পক্ষ থেকে যা তার কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহর উপর, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে, আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল।” [আল বাকারাহ : ২৮৫] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا آمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي نَزَّلَ عَلَىٰ رَسُولِهِ وَالْكِتَابِ الَّذِي أَنزَلَ مِن قَبْلُ ۚ وَمَن يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلَائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا} “হে মুমিনগণ, তোমরা ঈমান আনয়ন করো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রাসূলের প্রতি এবং সে কিতাবের প্রতি যা তিনি তাঁর রাসূলের উপর নাযিল করেছেন এবং সে কিতাবের প্রতি যা তিনি পূর্বে নাযিল করেছেন। আর যে আল্লাহ, তাঁর ফেরেশ্তামন্ডলী, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং শেষ দিনকে অস্বীকার করবে, সে ঘোর বিভ্রান্তিতে বিভ্রান্ত হবে।” [আন-নিসা : ১৩৬] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّينَ لَمَا آتَيْتُكُم مِّن كِتَابٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقٌ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنصُرُنَّهُ ۚ قَالَ أَأَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَىٰ ذَٰلِكُمْ إِصْرِي ۖ قَالُوا أَقْرَرْنَا ۚ قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُم مِّنَ الشَّاهِدِينَ } “আর স্মরণ কর, যখন আল্লাহ নবীদের অঙ্গীকার নিয়েছেন- আমি তোমাদেরকে যে কিতাব ও হিকমাত দিয়েছি, অতঃপর তোমাদের সাথে যা আছে তা সত্যায়নকারীরূপে একজন রাসূল তোমাদের কাছে আসবে- তখন অবশ্যই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনবে এবং তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেন, ‘তোমরা কি স্বীকার করেছ এবং এর উপর আমার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করেছ’? তারা বলল, ‘আমরা স্বীকার করলাম’। আল্লাহ বললেন, ‘তবে তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও তোমাদের সাথে সাক্ষী রইলাম।” [আলে ইমরান : ৮১]
৪১- সকল আল্লাহ প্রদত্ত রেসালাতের উদ্দেশ্য হচ্ছে,সত্যদীন নিয়ে মানুষ উচ্চে উঠবে,যেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একনিষ্ঠ বান্দাতে পরিণত হয়। আর তাকে মানুষের দাসত্ব অথবা বস্তুর দাসত্ব অথবা কুসংস্কারের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে। অতএব ইসলাম (আপনি যেমন দেখছেন) ব্যক্তিদের নির্ভেজাল-পবিত্র জানে না এবং তাদেরকে তাদের মর্যাদার উর্ধ্বে তুলে না এবং তাদেরকে রব ও মাবূদ বানায় না।
সকল আল্লাহ প্রদত্ত রেসালাতের উদ্দেশ্য হচ্ছে,সত্যদীন নিয়ে মানুষ উচ্চে উঠবে, যেন আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের একনিষ্ঠ বান্দাতে পরিণত হয়। বস্তুত ইসলাম মানুষকে বস্তুর দাসত্ব অথবা কুসংস্কারের দাসত্ব থেকে মুক্ত করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: «تَعِسَ عَبْدُ الدِّينَارِ وَالدِّرْهَمِ وَالقَطِيفَةِ وَالخَمِيصَةِ إِنْ أُعْطِيَ رَضِيَ وَإِنْ لَمْ يُعْطَ لَمْ يَرْضَ» “দীনার, দিরহাম, রেশমী চাদর ও পশমী কাপড়ের দাসরা ধ্বংস হোক। ওদের এসব দেয়া হলে খুশি থাকে আর দেয়া না হলে নাখোশ হয়।” [সহীহুল বুখারী: ৬৪৩৫] একজন স্বাভাবিক মানুষ আল্লাহ ছাড়া কারো জন্যে বিনীত হয় না। সম্পদ অথবা সম্মান অথবা পদ অথবা বংশ তাকে দাসে পরিণত করতে পারে না। এর দ্বারা পাঠকের নিকট ফুটে উঠে যে,মানুষ রিসালাতের পূর্বে কেমন ছিল আর তারপর কেমন হয়েছে?
যখন প্রথম মুসলিমগণ হাবশায় হিজরত করল এবং সে সময়কার হাবশার বাদশাহ নাজ্জাশী তাদেরকে জিজ্ঞাসা করল ও বলল: “এই দীন কী, যার কারণে তোমরা তোমাদের জাতিকে ত্যাগ করেছ এবং তোমরা আমার দীনে ও এসব জাতির কোনো দীনে প্রবেশ করনি?” তখন জাফর ইবন আবু তালিব তাকে বললেন: হে বাদশাহ মহোদায়! আমরা জাহেলী জাতি ছিলাম, মূর্তি পূজা করতাম ও মৃত প্রাণী খেতাম, বিভিন্ন অশ্লীলতায় অংশ নিতাম, আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন ও প্রতিবেশীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতাম। আমাদের শক্তিশালীরা দুর্বলদের খেত। আমরা তার ওপরই ছিলাম, অবশেষে আল্লাহ আমাদের কাছে আমাদের থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করলেন, আমরা তার বংশ, সততা, আমানতদারি ও পবিত্রতা সম্পর্কে জানি। তিনি আমাদের আল্লাহর দিকে আহ্বান করলেন, যেন আমরা তাঁকেই একমাত্র মাবূদ জানি, তাঁরই ইবাদত করি এবং আমরা ও আমাদের বাপ-দাদারা আল্লাহকে ছাড়া যেসব পাথর ও মূর্তির ইবাদত করতাম সেসব ত্যাগ করি। তিনি আমাদেরকে সত্য কথা, আমানত আদায়, আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন ও প্রতিবেশীর সঙ্গে সুন্দর আচরণ করার নির্দেশ দেন এবং হারাম ও রক্তপাত থেকে নিষেধ করেন। তিনি আমাদেরকে অশ্লীলতা, মিথ্যা কথা, ইয়াতীমদের মাল ভক্ষণ ও সতী নারীদের অপবাদ দিতে নিষেধ করলেন। তিনি আমাদেরকে এক আল্লাহরই ইবাদত এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক না করতে নির্দেশ দিলেন। তিনি আমাদেরকে সালাত, যাকাত ও সিয়ামের নির্দেশ দিলেন। বর্ণনাকারী বলেন, তিনি ইসলামের বিষয়গুলো তার কাছে গুণে-গুণে তুলে ধরলেন। কাজেই আমরা তাকে বিশ্বাস করলাম এবং তার প্রতি ঈমান আনলাম এবং তিনি যা নিয়ে এসেছেন তাতে তার অনুসরণ করলাম। ফলে আমরা এক আল্লাহরই ইবাদত করি, তার সঙ্গে কাউকে শরীক করি না এবং তিনি যা আমাদের ওপর হারাম করেছেন তা হারাম আর যা হালাল করেছেন তা হালাল জানি।’ [সামান্য পরিবর্তনসহ আহমাদ : ১৭৪০, আবু নুআইম -হিলয়াতুল আউলিয়া- ১/১১৫, সংক্ষেপিত] আপনি দেখছেন যে, ইসলাম- মানুষকে একেবারে পবিত্র সত্ত্বা জানে না এবং তাদেরকে তাদের মর্যাদার ওপরে তুলে না এবং তাদেরকে রব ও মাবূদ বানায় না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {قُلْ يَا أَهْلَ الْكِتَابِ تَعَالَوْا إِلَىٰ كَلِمَةٍ سَوَاءٍ بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ أَلَّا نَعْبُدَ إِلَّا اللَّهَ وَلَا نُشْرِكَ بِهِ شَيْئًا وَلَا يَتَّخِذَ بَعْضُنَا بَعْضًا أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ ۚ فَإِن تَوَلَّوْا فَقُولُوا اشْهَدُوا بِأَنَّا مُسْلِمُونَ} “বল, ‘হে কিতাবীগণ, তোমরা এমন কথার দিকে আস, যেটি আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে সমান যে, আমরা একমাত্র আল্লাহ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি। আর তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ কাউকে আল্লাহ ছাড়া রব হিসাবে গ্রহণ না করি’। তারপর যদি তারা বিমুখ হয় তবে বল, ‘তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম।” [আলে ইমরান : ৬৪] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَلَا يَأْمُرَكُمْ أَن تَتَّخِذُوا الْمَلَائِكَةَ وَالنَّبِيِّينَ أَرْبَابًا ۗ أَيَأْمُرُكُم بِالْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنتُم مُّسْلِمُونَ} “অনুরূপভাবে ফেরেশ্তাগণ ও নবীগণকে রবরূপ গ্রহণ করতে তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দেন না। তোমাদের মুসলিম হওয়ার পর তিনি কি তোমাদেরকে কুফরীর নির্দেশ দেবেন?” [আলু ইমরান: ৮০] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «لاَ تُطْرُونِي كَمَا أَطْرَتْ النَّصَارَى ابْنَ مَرْيَمَ فَإِنَّمَا أَنَا عَبْدُهُ فَقُولُوا عَبْدُ اللَّهِ وَرَسُولُهُ» “তোমরা আমার বিষয়ে বাড়াবাড়ি করো না, যেমনটি খৃষ্টানরা ইবন মারইয়্যাম সম্পর্কে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি কেবল বান্দা। তাই তোমরা বল, আল্লাহর বান্দা ও তার রাসূল।” [সহীহুল বুখারী: ৩৪৪৫]
৪২- আল্লাহ তাআলা ইসলামে তাওবার বিধান রেখেছেন, আর তা হচ্ছে: মানুষের তার রবের প্রতি নিবিষ্ট হওয়া ও পাপ পরিহার করা। বস্তুত ইসলাম কবূল তার পূর্বেকার সকল পাপ নিঃশেষ করে দেয়, অনুরূপভাবে তাওবাও তার পূর্বেকার সকল পাপ মুছে দেয়। কাজেই মানুষের সামনে পাপ স্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই।
আল্লাহ ইসলামে তাওবার বিধান রেখেছেন, আর তা হচ্ছে মানুষের তার রবের দিকে মনোনিবেশ করা ও পাপ পরিহার করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَتُوبُوا إِلَى اللَّهِ جَمِيعًا أَيُّهَ الْمُؤْمِنُونَ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ} “হে মুমিনগণ! তোমরা সবাই আল্লাহর দিকে ফিরে আস, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” [আন-নুর : ৩১] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {أَلَمْ يَعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ هُوَ يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَأْخُذُ الصَّدَقَاتِ وَأَنَّ اللَّهَ هُوَ التَّوَّابُ الرَّحِيمُ } “তারা কি জানে না যে, নিশ্চয় আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের তাওবাহ্ কবুল করেন এবং ‘সদকা’ গ্রহণ করেন, আর নিশ্চয় আল্লাহ্ তাওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু?” [আত-তাওবাহ : ১০৪] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {وَهُوَ الَّذِي يَقْبَلُ التَّوْبَةَ عَنْ عِبَادِهِ وَيَعْفُو عَنِ السَّيِّئَاتِ وَيَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ } “আর তিনিই তাঁর বান্দাদের তাওবা কবুল করেন ও পাপসমূহ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন।” [আশ-শুরা : ২৫] রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: «لَلَّهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ عَبْدِهِ الْمُؤْمِنِ مِنْ رَجُلٍ فِي أَرْضٍ دَوِّيَّةٍ مَهْلِكَةٍ مَعَهُ رَاحِلَتُهُ عَلَيْهَا طَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَنَامَ فَاسْتَيْقَظَ وَقَدْ ذَهَبَتْ فَطَلَبَهَا حَتَّى أَدْرَكَهُ الْعَطَشُ ثُمَّ قَالَ: أَرْجِعُ إِلَى مَكَانِيَ الَّذِي كُنْتُ فِيهِ فَأَنَامُ حَتَّى أَمُوتَ فَوَضَعَ رَأْسَهُ عَلَى سَاعِدِهِ لِيَمُوتَ فَاسْتَيْقَظَ وَعِنْدَهُ رَاحِلَتُهُ وَعَلَيْهَا زَادُهُ وَطَعَامُهُ وَشَرَابُهُ فَاللهُ أَشَدُّ فَرَحًا بِتَوْبَةِ الْعَبْدِ الْمُؤْمِنِ مِنْ هَذَا بِرَاحِلَتِهِ وَزَادِهِ» “আল্লাহ তা’আলা তার মু’মিন বান্দার তাওবার কারণে ঐ ব্যক্তির চেয়েও অধিক আনন্দিত হন, যে লোক ছায়াপানিহীন আশঙ্কাপূর্ণ বিজন মাঠে ঘুমিয়ে পড়ে এবং তার সাথে থাকে খাদ্য পানীয়সহ একটি সওয়ারী। এরপর ঘুম হতে সজাগ হয়ে দেখে যে, সওয়ারীটি কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। তারপর সে সেটি খুঁজতে খুঁজতে তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়ল এবং বলে, আমি আমার পূর্বের জায়গায় গিয়ে চিরনিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে মারা যাব। (এ কথা বলে) সে মৃত্যুর জন্য বাহুতে মাথা রাখল। কিছুক্ষণ পর জাগ্রত হয়ে সে দেখল, পানাহার সামগ্রী বহনকারী সওয়ারীটি তার কাছে। (সওয়ারী এবং পানাহার সামগ্ৰী পেয়ে) লোকটি যে পরিমাণ আনন্দিত হয়, মু’মিন বান্দার তাওবার কারণে আল্লাহ তার চেয়েও বেশি আনন্দিত হন।” [সহীহ মুসলিম: ২৭৪৪]
ইসলাম তার পূর্বের সকল পাপ ধ্বংস করে দেয় আর তাওবাহ তার পূর্বের সকল পাপ মূছে দেয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { قُل لِّلَّذِينَ كَفَرُوا إِن يَنتَهُوا يُغْفَرْ لَهُم مَّا قَدْ سَلَفَ وَإِن يَعُودُوا فَقَدْ مَضَتْ سُنَّتُ الْأَوَّلِينَ } “যারা কুফরী করে তাদেরকে বলুন, ‘যদি তারা বিরত হয় তবে যা আগে হয়ে গেছে আল্লাহ তা ক্ষমা করবেন; কিন্তু তারা যদি অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি করে তবে পুর্ববর্তীদের রীতি তো গত হয়েছেই।” [আল-আনফাল : ৩৮] আল্লাহ তাআলা খৃস্টানদের তাওবার জন্যে আহ্বান করেছেন। তিনি বলেন: { أَفَلَا يَتُوبُونَ إِلَى اللَّهِ وَيَسْتَغْفِرُونَهُ ۚ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ } “তবে কি তারা আল্লাহর দিকে ফিরে আসবে না ও তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আল-মায়েদাহ : ৭৪] আল্লাহ সকল পাপী ও অপরাধীকে তাওবার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেন: { قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ ۚ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا ۚ إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ } “বলুন, 'হে আমার বান্দাগণ! তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয় আল্লাহ সমস্ত গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [আয-যুমার : ৫৩] আমর ইবনুল আস যখন ইসলাম গ্রহণ করার দৃঢ় ইচ্ছা করলেন এবং আশঙ্কা করলেন যে, ইসলামের পূর্বে কৃত তার পাপগুলো ক্ষমা করা হবে না। তিনি তার এই অবস্থানকে ব্যাখ্যা করে বলেন: (لَمَّا أَلْقَى الله عَزَّ وَجَلَّ فِي قَلْبِي الْإِسْلَامَ قَالَ: أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لِيُبَايِعَنِي فَبَسَطَ يَدَهُ إِلَيَّ فَقُلْتُ: لَا أُبَايِعُكَ يَا رَسُولَ اللهِ حَتَّى تَغْفِرَ لِي مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِي قَالَ: فَقَالَ لِي رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يَا عَمْرُو أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ الْهِجْرَةَ تَجُبُّ مَا قَبْلَهَا مِنَ الذُّنُوبِ يَا عَمْرُو أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ الْإِسْلَامَ يَجُبُّ مَا كَانَ قَبْلَهُ مِنَ الذُّنُوبِ) ‘আল্লাহ যখন আমার অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করালেন,তিনি বলেনঃ তখন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে উপস্থিত হলাম, যেন তিনি আমাকে বাই‘আত করে নেন। ফলে তার হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন, তখন আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমার পূর্বের পাপ ক্ষমা না করা পর্যন্ত আমি আপনার কাছে বাই‘আত গ্রহণ করব না। তিনি বলেন, আমাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হে ‘আমর! তুমি কি জান না যে, হিজরত তার পূর্ববর্তী সকল পাপ মিটিয়ে দেয়। হে ‘আমর! তুমি কি জান না যে, ইসলাম তার পূর্ববর্তী সকল পাপ মিটিয়ে দেয়?’ [অনুরূপ হাদীস দীর্ঘভাবে বর্ণনা করেছেন মুসলিম : (১২১), আহমাদ : (১৭৮২৭), হাদীসের শব্দ আহমাদ থেকে গৃহীত]
৪৩- ইসলামে মানুষ ও আল্লাহর মাঝে সম্পর্ক হয় সরাসরি। অতএব তুমি এমন কারো মুখাপেক্ষী নও, যে তোমার ও আল্লাহর মাঝে মধ্যস্থতাকারী হবে। বস্তুত ইসলাম আমাদের নিষেধ করে মানুষকে মাবূদ বানাতে অথবা আল্লাহর জন্য নির্ধারিত কর্মসমূহে বা কোন ইবাদতে তাঁর অংশীদার বানাতে।
ইসলামে মানুষের সামনে মানুষের পাপ স্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই। ইসলামে মানুষের মাঝে ও আল্লাহর মাঝে সম্পর্ক হয় সরাসরি। অতএব তুমি তোমার ও আল্লাহর মাঝে মধ্যস্থতার জন্যে কারো মুখাপেক্ষী নও। যেমন (৩৬) নং অনুচ্ছেদে গত হয়েছে যে, আল্লাহ তাআলা সকল মানুষকে তাওবা ও তার দিকে নিবিষ্ট হতে আহ্বান করেছেন। একিভাবে তিনি তার মাঝে ও তার বান্দাদের মাঝে নবীগণ ও ফেরেশ্তাজণকে মধ্যস্থতাকারী বানাতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেন: { وَلَا يَأْمُرَكُمْ أَن تَتَّخِذُوا الْمَلَائِكَةَ وَالنَّبِيِّينَ أَرْبَابًا ۗ أَيَأْمُرُكُم بِالْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنتُم مُّسْلِمُونَ } “আর তিনি ফেরেশ্তাগণ ও নবীগণকে রবরূপ গ্রহণ করতে তোমাদেরকে নির্দেশ দেন না। তোমাদের মুসলিম হওয়ার পর তিনি কি তোমাদেরকে কুফরীর নির্দেশ দেবেন?” [আলু ইমরান : ৮০] তুমি দেখলে যে, ইসলাম আমাদেরকে নিষেধ করে মানুষকে মাবূদ বানাতে অথবা আল্লাহর জন্য নির্ধারিত কর্মসমূহে অথবা তাঁর ইবাদতে অন্যকে অংশী বানাতে। আল্লাহ তা‘আলা খৃস্টানদের সম্পর্কে বলেন: {اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِّن دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَٰهًا وَاحِدًا ۖ لَّا إِلَٰهَ إِلَّا هُوَ ۚ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ } “তারা আল্লাহকে ছেড়ে তাদের পন্ডিত ও সংসার-বিরাগীদের রব হিসেবে গ্রহণ করেছে এবং মারইয়ামপুত্র মাসীহকেও। অথচ তারা এক মাবূদের ইবাদত করার জন্যই আদিষ্ট হয়েছে, তিনি ছাড়া কোনো (হক) মাবূদ নেই। তারা যে শরীক করে তিনি তা থেকে পবিত্র।” [তাওবাহ : ৩১] আল্লাহ কাফিরদের প্রতিবাদ করেছেন যে, তারা তাদের মাঝে ও আল্লাহর মাঝে মধ্যস্থতাকারী নির্ধারণ করে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {أَلَا لِلَّهِ الدِّينُ الْخَالِصُ ۚ وَالَّذِينَ اتَّخَذُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ مَا نَعْبُدُهُمْ إِلَّا لِيُقَرِّبُونَا إِلَى اللَّهِ زُلْفَىٰ إِنَّ اللَّهَ يَحْكُمُ بَيْنَهُمْ فِي مَا هُمْ فِيهِ يَخْتَلِفُونَ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي مَنْ هُوَ كَاذِبٌ كَفَّارٌ} “জেনে রাখুন, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। আর যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যদেরকে অভিভাবকরূপে গ্রহণ করে তারা বলে, 'আমরা তো এদের ইবাদত এ জন্যে করি যে, এরা আমাদেরকে পরিপূর্ণভাবে আল্লাহর সান্নিধ্যে এনে দেবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে নিশ্চয় আল্লাহ তাদের মধ্যে সে ব্যাপারে ফয়সালা করে দেবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির, নিশ্চয় আল্লাহ তাকে হিদায়াত দেন না।” [আয-যুমার : ৩] আল্লাহ আরো স্পষ্ট করেছেন যে, -জাহিলী যুগের- মূর্তিপূঁজকরা তাদের মাঝে ও আল্লাহর মাঝে অংশী নির্ধারণ করত এবং বলত: তারা তাদেরকে আল্লাহর নৈকট্যে পৌঁছে দিবে।
আল্লাহ যখন মানুষকে নিষেধ করেছেন তাঁর ও তাঁর বান্দাদের মাঝে নবীগণ বা ফেরেস্তাদের কে মধ্যস্থতাকারী গ্রহণ করতে,তখন অন্যদের কে মধ্যস্থতাকারী গ্রহণ করা আরও বেশী নিষেধ। কি ভাবে হয় যেখানে নবীগণ ও রাসূলগণ আলাইহিমুস সালাস আল্লাহর নৈকট্য লাভে প্রতিযোগিতা করেন, আল্লাহ তায়ালা নবীগণ ও রাসূলগণ আলাইহিমুস সালাম এর অবস্থা সম্পর্কে খবর দিয়ে বলেন: {إِنَّهُمْ كَانُوا يُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَيَدْعُونَنَا رَغَبًا وَرَهَبًا ۖ وَكَانُوا لَنَا خَاشِعِينَ } “নিশ্চয় তারা সৎকাজে প্রতিযোগিতা করত। আর আমাকে আশা ও ভীতিসহকারে ডাকত। আর তারা ছিল আমার নিকট বিনয়ী।” [আল-আম্বিয়া : ৯০] আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: {أُولَٰئِكَ الَّذِينَ يَدْعُونَ يَبْتَغُونَ إِلَىٰ رَبِّهِمُ الْوَسِيلَةَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ وَيَرْجُونَ رَحْمَتَهُ وَيَخَافُونَ عَذَابَهُ ۚ إِنَّ عَذَابَ رَبِّكَ كَانَ مَحْذُورًا} “তারা যাদেরকে ডাকে তারাই তো তাদের রবের নৈকট্য লাভের উপায় সন্ধান করে যে, তাদের মধ্যে কে কত নিকটতর হতে পারে, আর তারা তাঁর দয়া প্রত্যাশা করে এবং তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। নিশ্চয় আপনার রবের শাস্তি ভয়াবহ।” [আল-ইসরা : ৫৭] অর্থাৎ তোমরা আল্লাহ ছাড়া -নবীগণ ও নেককার লোকদের থেকে- যাদেরকে আহ্বান কর তারা নিজেরাই আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করে এবং তাঁর রহমত আশা করে ও তাঁর শাস্তিকে ভয় করে। কাজেই তাদেরকে আল্লাহ ছাড়া কিভাবে আহ্বান করা যেতে পারে!
৪৪- এই কিতাবের শেষে আমরা স্মরণ করছি যে, মানুষেরা তাদের যুগ, জাতি ও দেশের ভিত্তিতে, বরং পুরো মানব সমাজ নিজ নিজ চিন্তাতে ও স্বার্থে একেকরকম এবং পরিবেশ ও কর্মে একে অপরের বিপরীত। কাজেই তাদের এমন একজন পথ প্রদর্শকের প্রয়োজন, যে তাদেরকে পথ দেখাবে এবং এমন এক নীতি-আদর্শের মুখাপেক্ষী যা তাদের সবাইকে এক করবে এবং এমন এক শাসকের মুখাপেক্ষী যা তাদের সবাইকে সুরক্ষা দিবে। বস্তুত সম্মানীত রাসূলগণ -তাদের ওপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক- আল্লাহর ওহীর দ্বারা এসব দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। তারা মানুষদেরকে কল্যাণ ও সৎ-কর্মের পথ দেখান, আল্লাহর শরীয়তে সবাইকে জমায়েত করেন এবং তাদের মাঝে সঠিকভাবে ফয়সালা করেন। ফলে তারা এসব রাসূলদের ডাকে যতটুকু সাড়া দেয় ও আল্লাহর রিসালাতের যুগের যতটুকু নিকটবর্তী থাকে, তার অনুপাতে তাদের কর্মগুলো সঠিক ও সুচারুরূপে পরিচালিত হয়। আর আল্লাহ তাআলা রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাত দ্বারা সকল রিসালাতের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন এবং তার জন্যে স্থায়ীত্ব অবধারিত করেছেন এবং তাকে মানুষের জন্যে হিদায়েত, রহমত, নূর ও আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছানোর পথ বানিয়েছেন।
এই কিতাবের শেষে আমরা স্মরণ করছি যে, মানুষেরা তাদের যুগ, জাতি ও দেশের ভিন্নতার কারণে, বরং পুরো মানব সমাজই নিজ নিজ চিন্তাতে ও স্বার্থে একেক রকম এবং পরিবেশ ও কর্মে একে অপরের বিপরীত। কাজেই তারা এমন একজন পথ প্রদর্শকের প্রয়োজন, যে তাদেরকে দিক নির্দেশনা দিবে এবং এমন এক নীতি-আদর্শের মুখাপেক্ষী যা তাদের এক করবে এবং এমন এক শাসকের মুখাপেক্ষী যে তাদেরকে সুরক্ষা দিবে। বস্তুত সম্মানীত রাসূলগণ -তাদের ওপর দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক- আল্লাহর ওহীর দ্বারা এসব দায়িত্ব আঞ্জাম দিতেন। তারা মানুষদেরকে কল্যাণ ও সঠিক পথের দিশা দেন, আল্লাহর শরীয়তে সবাইকে একত্রিত করেন এবং তাদের মাঝে সত্যের দ্বারা ফয়সালা করেন। ফলে তারা যতটুকু এসব রাসূলের ডাকে সাড়া দেয় এবং তাদের যুগ যতটুকু আল্লাহর রিসালাতের নিকটবর্তী, তার অনুপাতে তাদের কর্মগুলো সঠিক ও সুচারুরূপে পরিচালিত হয়। আর যখন গোমরাহী বেড়ে গেল, মূর্খতা ব্যাপক আকার ধারন করল এবং মূর্তি পূঁজা শুরু হল, তখন আল্লাহ হিদাযেত ও সত্য দীনসহ স্বীয় নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করলেন, যেন তিনি মানুষদেরকে কুফর, মূর্খতা ও মূর্তি পূঁজার অন্ধকার থেকে ঈমান ও হিদায়েতের দিকে বের করে নিয়ে আসেন।
৪৫- কাজেই হে মানব, আমি তোমাকে আহ্বান করছি যে, তুমি অভ্যাস ও অনুকরণ মুক্ত হয়ে আল্লাহর জন্যে দণ্ডায়মান হও। আর জেনে রাখ যে, তুমি মৃত্যুর পর অবশ্যই তোমার রবের কাছে ফিরে যাবে। তুমি তোমার নিজের নফসে ও তোমার পাশের দিগন্তে দৃষ্টি দিয়ে দেখ, অতঃপর ইসলাম গ্রহণ কর, তাহলেই তুমি তোমার দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হবে। আর যদি তুমি ইসলামে প্রবেশ করতে চাও, তাহলে তুমি এতটুকু সাক্ষ্য দাও যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল। আর আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করা হয় তাদের থেকে ছিন্নতা ঘোষণা কর। বিশ্বাস কর যে, যারা কবরে রয়েছে আল্লাহ তাদের সবাইকে ওঠাবেন। হিসাব ও প্রতিদান সত্য। যখন তুমি এই সাক্ষ্য দিলে, তখন তুমি মুসলিম হয়ে গেলে। অতএব তারপর তোমার দায়িত্ব হচ্ছে, আল্লাহ যেসব ইবাদত অনুমোদন করেছেন, যেমন সালাত, যাকাত, সিয়াম ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে হজ, তার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত আঞ্জাম দাও।
কাজেই হে মানুষ, আমি তোমাকে আহ্বান করছি যে, তুমি অভ্যাস ও অনুকরণ মুক্ত হয়ে আল্লাহর জন্যে সত্যিকারভাবে দণ্ডায়মান হও, যেভাবে দাড়াতে আল্লাহ তার বাণীতে তোমাকে আহ্বান করেছেন: {قُلْ إِنَّمَا أَعِظُكُم بِوَاحِدَةٍ ۖ أَن تَقُومُوا لِلَّهِ مَثْنَىٰ وَفُرَادَىٰ ثُمَّ تَتَفَكَّرُوا ۚ مَا بِصَاحِبِكُم مِّن جِنَّةٍ ۚ إِنْ هُوَ إِلَّا نَذِيرٌ لَّكُم بَيْنَ يَدَيْ عَذَابٍ شَدِيدٍ} “বলুন, আমি তো তোমাদেরকে একটি বিষয়ে উপদেশ দিচ্ছি, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে দুজন অথবা এক একজন করে দাঁড়িয়ে যাও, অতঃপর চিন্তা করে দেখ, তোমাদের সাথীর মধ্যে কোনো পাগলামী নেই। সে তো আসন্ন কঠোর আযাব সম্পর্কে তোমাদের একজন সতর্ককারী বৈ কিছু নয়।” [সাবা : ৪৬] আর বিশ্বাস কর যে, মৃত্যুর পর অবশ্যই তুমি তোমার রবের নিকট ফিরে যাবে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَأَن لَّيْسَ لِلْإِنسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ (39) আর এই যে, মানুষ তাই পায় যা সে চেষ্টা করে, (৩৯) وَأَنَّ سَعْيَهُ سَوْفَ يُرَىٰ (40) আর এই যে, তার প্রচেষ্টার ফল শিঘ্রই দেখা যাবে (৪০) ثُمَّ يُجْزَاهُ الْجَزَاءَ الْأَوْفَىٰ (41) তারপর তাকে দেয়া হবে পূর্ণ প্রতিদান (৪১) وَأَنَّ إِلَىٰ رَبِّكَ الْمُنتَهَىٰ (42) } আর এই যে, সবার শেষ গন্তব্য তো আপনার রবের কাছে। (৪২)” [আন-নাজম : ৩৯-৪২] আর তুমি তোমার নফসে ও তোমার পাশের দিগন্তে দৃষ্ট দাও। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { أَوَلَمْ يَنظُرُوا فِي مَلَكُوتِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَمَا خَلَقَ اللَّهُ مِن شَيْءٍ وَأَنْ عَسَىٰ أَن يَكُونَ قَدِ اقْتَرَبَ أَجَلُهُمْ ۖ فَبِأَيِّ حَدِيثٍ بَعْدَهُ يُؤْمِنُونَ} “তারা কি দৃষ্টিপাত করেনি আসমানসমূহ ও যমীনের রাজত্বে এবং আল্লাহ যা কিছু সৃষ্টি করেছেন তার প্রতি? আর(এর প্রতি যে)হয়তো তাদের নির্দিষ্ট সময় নিকটে এসে গিয়েছে? সুতরাং তারা এ কুরআনের পর আর কোন কিতাবের প্রতি ঈমান আনবে “ [আল-আরাফ : ১৮৫]
অতএব আপনি ইসলাম গ্রহণ করুন,তবেই আপনি আনার দুনিয়া আখিরাতে সৌভাগ্যবান হবেন। আর যদি তুমি ইসলামে প্রবেশ করার ইচ্ছা কর, তাহলে তোমার আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মাবূদ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল সাক্ষ্য দেয়া ছাড়া আর কিছুই করতে হবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মুয়াযকে ইসলামের দিকে আহ্বানকারীরূপে ইয়ামানে প্রেরণ করেন তখন তাকে বলেন: «إِنَّكَ تَأْتِي قَوْمًا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ فَادْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنَّ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَأَنِّي رَسُولُ اللهِ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ فَتُرَدُّ فِي فُقَرَائِهِمْ فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ فَإِيَّاكَ وَكَرَائِمَ أَمْوَالِهِمْ» “তুমি কিতাবিদের একটি জাতির নিকট যাচ্ছ। কাজেই তাদেরকে ’আল্লাহ তাআলা ছাড়া সত্য কোনো মা'বূদ নেই এবং আমি (মুহাম্মাদ) আল্লাহর রাসূল’ সাক্ষ্যের দিকে আহ্বান কর। যদি তারা এটা মেনে নেয়, তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, অবশ্যই তাদের উপর আল্লাহ তাআ’লা প্রতি দিন ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। যদি তারা এটা মেনে নেয়, তাদেরকে জানিয়ে দাও যে, তাদের ধন-দৌলতে আল্লাহ তা'আলা যাকাত ফরয করে দিয়েছেন, যা তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করা হবে আর তাদের গরীবদের মাঝে বণ্টন করা হবে। তারা যদি এটি মেনে নেয় তাহলে সাবধান! তাদের উত্তম মাল (যাকাত হিসাবে) নেয়া হতে বিরত থাকবে।” [সহীহ মুসলিম : ১৯] আর আল্লাহ ছাড়া যারই ইবাদত করা হয় তুমি তাদের থেকে মুক্ত হও। আর আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত করা হয় সেসব থেকে মুক্ত হওয়াই ইবরাহিম আলাইহিস সালামের ধর্ম হানিফিয়্যাহ। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: { قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِن دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّىٰ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَهُ } “অবশ্যই তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার সাথে যারা ছিল তাদের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। যখন তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, ‘তোমাদের হতে এবং তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে যার ‘ইবাদাত কর তা হতে আমরা সম্পর্কমুক্ত। আমরা তোমাদেরকে অস্বীকার করি। তোমাদের ও আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হল শক্ৰতা ও বিদ্বেষ চিরকালের জন্য; যতক্ষণ না তোমরা এক আল্লাহ্তে ঈমান আন।” [আল-মুমতাহিনাহ : ৪] আর ঈমান আন যে, কবরে যেই রয়েছে আল্লাহ তাকে ওঠাবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {ذَٰلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ هُوَ الْحَقُّ وَأَنَّهُ يُحْيِي الْمَوْتَىٰ وَأَنَّهُ عَلَىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (6) “এটি এজন্য যে, আল্লাহই সত্য এবং তিনিই মৃতকে জীবন দান করেন এবং তিনিই সব কিছুর উপর ক্ষমতাবান। (৬) وَأَنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ لَّا رَيْبَ فِيهَا وَأَنَّ اللَّهَ يَبْعَثُ مَن فِي الْقُبُورِ (7) } এবং এ কারণে যে, কেয়ামত আসবেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই এবং যারা কবরে আছে তাদেরকে নিশ্চয় আল্লাহ্ পুনরুত্থিত করবেন। (৭)” [আল-হাজ্জ : ৬-৭] আর হিসাব ও প্রতিদান সত্য। আল্লাহ তা‘আলা বলেন: {وَخَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ بِالْحَقِّ وَلِتُجْزَىٰ كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ وَهُمْ لَا يُظْلَمُونَ } “আর আল্লাহ্ আসমানসমূহ ও যমীনকে সৃষ্টি করেছেন যথাযথভাবে এবং যাতে প্রত্যেক ব্যাক্তিকে তার কাজ অনুযায়ী ফল দেয়া যেতে পারে। আর তাদের প্রতি যুলুম করা হবে না।” [আল-জাসিয়াহ : ২২]
যখন তুমি এই সাক্ষ্য প্রদান করলে তখন তুমি মুসলিম হলে। কাজেই তারপর থেকে তোমার ওপর ওয়াজিব হচ্ছে আল্লাহ যে সালাত, যাকাত, সিয়াম ও সামর্থ্যের ভিত্তিতে হজ্জ প্রভৃতি ফরয করেছেন তার দ্বারা আল্লাহর ইবাদাত আঞ্জাম দেয়া।
মূল কপি লিপির তারিখ ১৯-১১-১৪৪১হি.
গ্রন্থকার ডক্টর মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ সুহাইম।
আকিদার অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ (প্রাক্তন)
শিক্ষা অনুষদ, কিং সঊদ বিশ্ববিদ্যালয়।
রিয়াদ, সৌদি আরব
Related books
All books
আল-কুরআনুল কারীম ও নবীর সুন্নাতের আলোকে ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি59 ভাষাআল-কুরআনুল কারীম ও নবীর সুন্নাতের আলোকে ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি
পরম করুণাময় অতি দয়ালু আল্লাহর নামে আল-ইসলাম (দলিল বিযুক্ত সংস্করণ) [১] [১] এই বার্তার আরেকটি সংস্করণ পাওয়া যায় এর প্রত্যেক মাসআলায় আল-কুরআনুল কারীম ও নববী সুন্নাহের দলিল সমৃদ্ধ। সেটি দেখার জন্যে নিচের লিংকটি দেখুন। https://islamhouse.com/ar/books/2830071. ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচয় সন্নিবেশিত এটি এমন এক গুরুত্বপূর্ণ বই, যাতে ইসলামের মূল উৎস অর্থাৎ আল-কুরআনুল কারীম ও নবীর সুন্নাহ থেকে তার গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি, শিক্ষা ও সৌন্দর্যের বর্ণনা দেয়া হয়েছে। বইটি স্থান-কাল পাত্র ভেদে সকল পরিস্থিতি ও প্রয়োজনিয়তা বিবেচনা করে মুসলিম—অমুসলিম সকলের প্রতি দৃষ্টিপাত করে তাদের স্ব-স্ব ভাষায় রচনা করা হয়। ১- ইসলাম…
ইসলামের ফজিলত11 ভাষাইসলামের ফজিলত
ইমাম মুহাম্মাদ ইবন আব্দুল ওয়াহ্হাব অধ্যায়: ইসলাম গ্রহণ করা ওয়াজিব। আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [১] [আলে-ইমরান : ৮৫] আর আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “আর এ পথই আমার সরল পথ। কাজেই তোমরা এর অনুসরণ কর এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না, করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে।” [২] [আল-আন‘আম : ১৫৩] [২] সূরা আল-আন‘আম : ১৫৩। [১] সূরা আলে ইমরান: আয়াত : ৮৫। মুজাহিদ বলেন: ‘সুবুল অর্থ: বিদ‘আত ও সন্দেহসমূহ। ‘আয়িশা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি…
ইসলামী আক্বীদার সংক্ষিপ্ত বিবরণ47 ভাষাইসলামী আক্বীদার সংক্ষিপ্ত বিবরণ
কিতাবটি ঈমানের রুকনসমূহ ব্যাখ্যা করেছে—যা আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতা, তাঁর কিতাব, তাঁর রাসূলগণ, শেষ দিবস এবং তাকদীরের ভালো ও মন্দের উপর ঈমান-কে অন্তর্ভুক্ত করে। এছাড়া এতে এমন মৌলিক নীতিসমূহ উপস্থাপিত হয়েছে, যেগুলোর প্রতি একজন মুসলিমের বিশ্বাস করা ও সে অনুযায়ী আমল করা আবশ্যক। একই সঙ্গে ইসলামী আকিদাকে গভীরভাবে অনুধাবনের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে সম্পর্ক সুদৃঢ় করার গুরুত্বও এতে তুলে ধরা হয়েছে।
কিতাবুত তাওহীদ14 ভাষাকিতাবুত তাওহীদ
যা বান্দার ওপর আল্লাহর হক রচনায়: শাইখুল ইসলাম মুহাম্মাদ ইবন আব্দুর রাহমান আত-তামীমী, ১২০৬ হিজরী তত্ত্বাবধানে: