মসজিদে নববীর ফযীলত ও আদবসমূহ এবং নবী (ﷺ ) ও তাঁর দুই সাহাবী (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর কবর যিয়ারতের বিধি-বিধান
এই গ্রন্থটিতে মসজিদে নববীর ফযীলত ও যিয়ারতের আদবসমূহ আলোচিত হয়েছে, অনুরূপভাবে নবী(ﷺ ) এবং তার সাহাবীদ্বয় রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমার কবর যিয়ারতের আদবও তুলে ধরা হয়েছে,সাথে এ মসজিদ যিয়ারতকালে গাম্ভীর্যতা ও পবিত্রতা রক্ষা করা এবং বিদ‘আতী কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
মসজিদে নববীর মর্যাদা ও আদব এবং নবী ﷺ ও তাঁর দুই সঙ্গীর (রাদিয়াল্লাহু আনহুমা) কবর যিয়ারতের বিধানসমূহ।
সংকলন:
মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর দ্বীনি বিষয়ক প্রেসিডেন্সির একাডেমিক কমিটি
১৪৪৭ হিজরী
ভূমিকা
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্বজগতের রব। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক তাঁর উপর যিনি বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপ প্রেরিত হয়েছেন এবং তার পরিবারবর্গ, সাহাবীগণ ও কিয়ামত অবধি যারা তাঁর আদর্শ অনুসরণ করবে ও তার পথনির্দেশ দ্বারা পরিচালিত হবে তাদের সবার উপর। অতঃপর:
এটি একটি সংক্ষিপ্ত প্রবন্ধ , যাতে মসজিদে নববীর গুরুত্বপূর্ণ ফযীলত, তা যিয়ারতের আদব এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার দুই সাহাবীর কবর যিয়ারতের আদবসমূহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমরা এটি মসজিদে নববীর যিয়ারতকারীদের জন্য সংকলন করেছি, যাতে তারা উম্মতের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মসজিদের ফযীলত এবং তা যিয়ারতের ও তাতে সালাত আদায়ের আদব সম্পর্কে জ্ঞান ও গভীর উপলব্ধি অর্জন করতে পারেন। আমরা মহিমান্বিত ও করুণাময় আল্লাহর নিকট আশা করি- তিনি যেন এর দ্বারা উপকৃত করেন, এটিকে সৎকর্ম হিসেবে কবুল করেন এবং তা যেন একমাত্র তাঁর চেহারা দর্শনের উদ্দেশ্যেই হয়; নিশ্চয় তিনিই সর্বোত্তম প্রার্থিত সত্তা এবং সবচেয়ে সম্মানিত আশার স্থান। (আল্লাহ তায়ালা কুরআন মাজীদে বহু আয়াতে নিজ সম্মানার্থে বহুবচন ব্যবহার করেছেন,যা মূলত আরাবী ভাষার একটি রীতি।বাংলায় এরীতির ব্যাবহার না থাকায় সে সব আয়াতের অনুবাদে পুস্তিকাটিতে একবচনই ব্যবহার করা হয়েছে।সম্পাদক,আব্দুর রব আফ্ফান)
একাডেমিক কমিটি
প্রথমত: মাসজিদে নববীর ফযীলতসমূহ
আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আর আপনার রব যা ইচ্ছে সৃষ্টি করেন এবং যা ইচ্ছে মনোনীত করেন, এতে তাদের কোনো ইখতিয়ার নেই। আল্লাহ্ পূত পবিত্র, মহান এবং তারা যা শরীক করে তা থেকে তিনি ঊর্ধ্বে!” [সূরা আল-কাসাস: ৬৮] আর আল্লাহ তা‘আলা এই স্থানকে তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদ হওয়ার জন্য নির্বাচন করেছেন এবং একে বহু ফযীলত দ্বারা বিশেষিত করেছেন, তন্মধ্যে কতিপয় হল:
যে তিনটি মসজিদের উদ্দেশ্যে সফর করা যায়, এটি তার একটি:
এ মর্মে আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো স্থানে (ইবাদতের উদ্দেশ্যে) সফর করা যাবে না: আমার এ মসজিদ (মসজিদে নববী), মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে আক্বসা।” [১] [১] হাদীসটি বুখারী (১১৮৯) ও মুসলিম (১৩৯৭) বর্ণনা করেছেন। হাদীসের শব্দাবলী ইমাম মুসলিমের।
এই মসজিদে সালাত আদায় করা অন্যান্য মসজিদের এক হাজার সালাতের চেয়ে উত্তম, তবে মাসজিদুল হারাম ব্যতীত:
এ মর্মে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “আমার এ মসজিদে সালাত আদায় করা অন্য মসজিদে এক হাজার সালাতের চেয়ে উত্তম, তবে মাসজিদুল হারাম ব্যতীত।” [২] [২] সহীহ বুখারী (হাদীস নং: ১১৯০), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ১৩৯৫)। হাদীসের শব্দাবলী ইমাম বুখারীর।
এটি সেই মসজিদ যার ভিত্তি প্রথম দিন থেকেই তাকওয়ার উপর স্থাপিত হয়েছে:
এ মর্মে আবূ সা‘ঈদ আল-খুদরী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট তার কোনো এক স্ত্রীর ঘরে প্রবেশ করলাম। অতঃপর আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল, দুটি মসজিদের মধ্যে কোনটি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত?’ তিনি বলেন, তখন তিনি এক মুষ্টি কংকর হাতে নিয়ে তা দিয়ে মাটিতে মারলেন। অতঃপর বললেন: “এটি তোমাদের এ মসজিদ” (অর্থাৎ মদীনার মসজিদ)। [৩] [৩] সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ১৩৯৮)।
এ মসজিদে ইলম অন্বেষণকারীর সাওয়াব আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের সাওয়াবের সমতুল:
এ মর্মে আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: “যে আমার এই মসজিদে কোনো কল্যাণ শেখা বা শেখানোর জন্য আসল সে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদরত ব্যক্তির মর্যাদাসম্পন্ন। আর যে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে আসল, সে অপরের সম্পদে লোলুপ দৃষ্টি নিক্ষেপকারীর তুল্য।”[৪] [৪] সুনানে ইবনু মাজাহ (হাদীস নং: ২২৭), এর সনদ সহীহ।
এ মসজিদে রওজা শরীফ (রিয়াযুল জান্নাত) রয়েছে:
এ মর্মে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী(ﷺ ) বলেন: “আমার ঘর ও মিম্বার-এর মধ্যবর্তী স্থান জান্নাতের বাগানগুলোর একটি বাগান(রওজা শরীফ) এবং আমার মিম্বার আমার হাউয-এর ওপর।” [৫] [৫]মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী (হাদীস নং ১১৯৫) এবং মুসলিম (হাদীস নং ১৩৯০)।
দ্বিতীয়ত: পবিত্র মসজিদে নববী যিয়ারত করা মুস্তাহাব
এগুলো ও অন্যান্য আরো ফযীলতের কারণে মসজিদে নববীতে সলাত আদায় ও ইবাদত করার উদ্দেশ্যে সেখানে যিয়ারত করা মুস্তাহাব বা পছন্দনীয়।
- সুতরাং হাজী ও অন্যান্যদের জন্য হজের পূর্বে বা পরে মসজিদে নববী যিয়ারত করা সুন্নাত। এই যিয়ারত হজের শর্ত, রোকন বা ওয়াজিবের অংশ নয় এবং এর সাথে হজের কোনো সম্পর্কও নেই।
- নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মসজিদ যিয়ারতের জন্য নির্দিষ্ট সংখ্যক সালাত আদায় করা অথবা মদীনায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অবস্থান করা শর্ত নয়। বরং একটি মাত্র সালাত আদায়ের মাধ্যমেই যিয়ারত সম্পাদিত হয়ে যায়, তা ফরয হোক বা নফল। তবে সেখানে যত বেশি সালাত আদায় করা হবে, ছাওয়াবও তত বেশি হবে।
- মসজিদে নববীর যিয়ারতকারীর জন্য সেখানে সকল ফরয ও নফল সালাত আদায় করা মুস্তাহাব; কেননা সেখানে একটি সালাত মসজিদুল হারাম ব্যতীত অন্যান্য মসজিদে এক হাজার সালাতের চেয়ে উত্তম।
তৃতীয়ত: মসজিদে নববী যিয়ারতের আদাবসমূহ
যখন কোনো মুসলিম মসজিদে নববীতে আসেন, তখন তার জন্য সাধারণভাবে সকল মসজিদ এবং বিশেষভাবে মসজিদে নববী সংশ্লিষ্ট শরী‘আতসম্মত শিষ্টাচারগুলো পালন করা মুস্তাহাব। সেগুলো হলো:
স্থিরতা ও গাম্ভীর্যের সাথে, পবিত্র অবস্থায়, উত্তম পোশাকে এবং উত্তম সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে আসা। এ মর্মে, আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘‘যখন সালাতের জন্য ইক্বামত দেওয়া হয়, তখন তোমরা তাতে দৌড়ে আসবে না, বরং তোমরা গাম্ভীর্য-সহকারে আসবে। তারপর যতটা সালাত পাবে, পড়ে নেবে, আর যতটা ছুটে যাবে, ততটা (নিজে) পূরণ করে নেবে। কারণ, তোমাদের কেউ যখন সালাতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়, তখন সে সালাতের মধ্যেই থাকে।’’[৬], আর আবূ সাঈদ খুদরী রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “জুমু‘আর দিন প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তির জন্য গোসল করা ওয়াজিব (কর্তব্য)। আর মিস্ওয়াক করবে এবং সুগন্ধি পাওয়া গেলে তা ব্যবহার করবে।”[৭], আর নারী যখন মসজিদে আসবে, তখন তার উপর আবশ্যক হলো হিজাব দ্বারা নিজেকে আবৃত রাখা, এবং তার জন্য সুগন্ধি বা আতর ব্যবহার করা জায়েয নয়; এর দলীল হচ্ছে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: “যখন তোমাদের ( 00)কেউ মসজিদে আসবে, তখন সে যেন সুগন্ধি স্পর্শ না করে।” [৮] [৬] সহীহ বুখারী (হাদীস নং: ৬৩৬), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ৬০২)। [৭] মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী (হাদীস নং ৮৪৬) এবং মুসলিম (হাদীস নং ৮৫৮)। [৮] সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ৪৪৩)।
মসজিদে নববীতে ডান পা আগে দেওয়া ও মসজিদে প্রবেশের দোয়া পাঠ করা। যিয়ারতকারীর জন্য মুস্তাহাব হলো, তিনি অন্যান্য মসজিদের মতো মসজিদে নববীতে প্রবেশের সময় ডান পা আগে দেবেন এবং এই দোয়াটি পড়বেন: উচ্চারণ: বিসমিল্লাহ, ওয়াস্-সালামু ‘আলা রাসূলিল্লাহ, আল্লাহুম্মাগ্ফির্লী জুনূবী ওয়াফ্তাহ্ লী আবওয়াবা রহমাতিকা। অর্থ: “আল্লাহর নামে শুরু করছি, সালাম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, হে আল্লাহ! আপনি আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন এবং আমার জন্য আপনার রহমতের দরজাগুলো খুলে দিন।” [৯] অনুরূপভাবে তিনি আরও বলবেন: উচ্চারণ: আউযু বিল্লাহিল আযীম ওয়া বিওয়াজহিহীল কারীম, ওয়া সুলতানিহীল কাদীম মিনাশ শায়তনীর রজীম। অর্থ: আমি মহান আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাচ্ছি তাঁর সম্মানিত চেহারার উসিলায় এবং তাঁর অনাদি রাজত্বের উসিলায়—বিতাড়িত শয়তান থেকে।" [১০] [৯] ইবনে মাজাহ (হাদীস নং ৭৭১), এর সনদ সহীহ। [১০] সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং: ৪৬৬), এর সনদ সহীহ ।
তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায়: যে ব্যক্তি মসজিদে নববীতে সালাত আদায়ের জন্য প্রবেশ করবে, তার জন্য বসার পূর্বে দুই রাকাত তাহিয়্যাতুল মসজিদ আদায় করা সুন্নাত। এ মর্মে আবূ কাতাদাহ আল-হারিছ ইবন রিব‘ঈ আল-আনসারী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন তোমাদের কেউ মসজিদ প্রবেশ করবে, তখন সে যেন দুই রাকাত সালাত না পড়া পর্যন্ত না বসে।”[১১] [১১] মুত্তাফাকুন আলাইহি; বুখারী (হাদীস নং: ১১৭১) এবং মুসলিম (হাদীস নং: ৭১৪)।
প্রথম দিকের কাতারগুলোতে সালাত আদায়ের প্রতি যত্নবান থাকা; কেননা এতে রয়েছে মহা ফযীলত, আর তা আগে আগে যাওয়া ছাড়া সম্ভব নয়। আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “লোকেরা যদি আযান দেওয়া ও সালাতে প্রথম কাতারে দাঁড়ানোর ফযীলত জানত, আর এ ফযীলত অর্জন করার জন্য লটারি ব্যতীত অন্য কোনো (বিকল্প) ব্যবস্থা না পেত তাহলে অবশ্যই তারা লটারিই করত।” ([১২]), এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুম-কে বলেন: ‘‘তোমরা এগিয়ে এসো ও আমার অনুসরণ কর এবং তোমাদের পশ্চাতজনেরা যেন তোমাদের অনুসরণ করে। একদল লোক সর্বদা পিছিয়ে যেতে থাকে, শেষ পর্যন্ত আল্লাহ তাদেরকে পিছনে করে দেন।’’ ([১৩]) [১২] মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ বুখারী (হাদীস নং: ৬১৫) এবং সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ৪৩৭)। [১৩] সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ৪৩৮)।
আর মহিলাদের জন্য সর্বোত্তম হলো শেষের দিকের কাতারে সালাত আদায় করা এবং পুরুষদের থেকে দূরে থাকা। এ মর্মে আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “পুরুষদের কাতারের মধ্যে সর্বোত্তম কাতার হল প্রথম কাতার, আর নিকৃষ্টতম কাতার হল শেষ কাতার। আর মহিলাদের কাতারের মধ্যে সর্বোত্তম কাতার হল শেষ কাতার আর নিকৃষ্টতম কাতার হল প্রথম কাতার।”[১৪], কিন্তু যদি তারা পৃথকভাবে সালাত আদায় করে, অথবা তাদের ও পুরুষদের মধ্যে কোনো আড়াল থাকে, যেমনটি মসজিদে নববীতে রয়েছে, তাহলে তাদেরও উত্তম কাতার হলো প্রথমটি; কেননা এক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণটি দূরীভূত হয়েছে। [১৪] সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ৪৪০)।
ইমামের পিছনে সালাত আদায় করা এবং তাঁর চেয়ে এগিয়ে যাওয়া থেকে সতর্ক থাকা; কারণ আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত আছে যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “ইমাম তো এজন্য নিযুক্ত হয়েছেন যাতে তার অনুসরণ করা হয়।” [১৫] [১৫] সহীহ বুখারী (হাদীস নং: ৭২২), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ৪১৭)।
কোনো মুসল্লির জন্য ইমামের সামনে সালাত আদায় করা জায়েয নয়, তবে এমন জরূরী অবস্থা ব্যতীত, যখন মসজিদ মুসল্লিতে পরিপূর্ণ হয়ে যাওয়ার কারণে ইমামের সামনে ছাড়া সালাত আদায়ের অন্য কোনো স্থান পাওয়া যায় না।
কাতারের মধ্যবর্তী ফাঁকা জায়গা ও শূণ্যস্থান পূরণ করা এবং কাতারগুলো সোজা করার প্রতি যত্নশীল হওয়া। কিন্তু মানুষকে ভিড়ের মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া, তাদের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে যাওয়া এবং মুসল্লিদের সামনে দিয়ে অতিক্রম করা থেকে সতর্ক থাকতে হবে; কারণ তা তাকে গুনাহে লিপ্ত করে।
সম্ভব হলে রওজা শরিফে সালাত আদায় করা; কারণ আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: “আমার ঘর ও মিম্বার-এর মধ্যবর্তী স্থান জান্নাতের(রওজাগুলোর) বাগানগুলোর একটি(রওজা) বাগান, এবং আমার মিম্বার আমার হাউযের উপর।” [১৬] [১৬] মুত্তাফাকুন আলাইহি; সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১১৯৫) এবং মুসলিম (হাদীস নং ১৩৯০)।
রওজাতে সালাত আদায়ের ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনো ফযীলত বর্ণিত হয় নি, তবে এটি সাব্যস্ত যে, তা জান্নাতের বাগানসমূহের একটি বাগান—যেমনটি আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বর্ণিত পূর্বের হাদীসটি দ্বারা প্রমাণিত আর ইবাদাতসমূহ সময় ও স্থানের ফযীলতের কারণে অধিক ফযীলতপূর্ণ হয়।
যিয়ারতকারীর উচিত রওজাতে সালাত আদায়ের জন্য এমন উপযুক্ত সময় বেছে নেওয়া, যখন ভিড় কম থাকে। সেখানে সালাত আদায়ের জন্য মুসলিম ভাইদের সাথে ধাক্কাধাক্কি করা, মানুষের ঘাড় ডিঙ্গিয়ে যাওয়া কিংবা মুসল্লিদের সামনে দিয়ে অতিক্রম করা জায়েয নেই। কেননা রওজাতে সালাত আদায় একটি নফল ইবাদত, যা কোনো হারাম পন্থায় হাসিল করা উচিত নয়। অনুরূপভাবে যিয়ারতকারী রওজাতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়মকানুন ও ব্যবস্থাপনা মেনে চলবেন, উপযুক্ত সময় নির্বাচন করবেন এবং যিয়ারতকারীদের প্রবেশ সুশৃঙ্খল করার দায়িত্বে নিয়োজিতদেরকে সহযোগিতা করবেন।
এ মসজিদে বেশি বেশি সৎকর্মের মাধ্যমে সময়কে কাজে লাগানো, যা বান্দাকে তার মহান স্রষ্টার নিকটবর্তী করে; যেমন: সালাত, কুরআন পাঠ, যিকির, দু‘আ, যিকিরের মজলিস ও ইলমি দরস এবং কুরআন কারীম শিক্ষার হালাকায় অংশগ্রহণ করা, ইত্যাদি।
মহান আল্লাহর কিতাবকে সম্মান করা এবং এর পাতা নিয়ে অনর্থক নাড়াচাড়া করা, এর উপর লেখা, অথবা এর পাশে জুতা রাখা, একে যমীনে রাখা ও এ জাতীয় কাজ থেকে একে রক্ষা করা, কেননা আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “এটাই আল্লাহর বিধান এবং কেউ আল্লাহর নিদর্শনাবলীকে সম্মান করলে এ তো তার হৃদয়ের তাকওয়াপ্রসূত।” [সূরা আল-হাজ্জ: ৩২]
আল্লাহ তা‘আলা যা কিছু হারাম করেছেন, তা থেকে দৃষ্টি সংযত রাখা। অতএব, মসজিদে নববীর যিয়ারতকারীর ওপর কর্তব্য হলো, যা দেখা তার জন্য বৈধ নয়, তা থেকে দৃষ্টিকে সংযত রাখবে। তার এ-ও জেনে রাখা উচিত যে, এই পবিত্র স্থানগুলোতে গুনাহ করা কতটা গুরুতর এবং এর ফলে কী শাস্তি হতে পারে। কারণ, সময় ও স্থানের মাহাত্ম্যের কারণে পাপের ভয়াবহতা আকার ও পরিমাণের দিক থেকে বৃদ্ধি পায়, অনুরূপভাবে ইবাদতের সওয়াবও বৃদ্ধি পায়। মুসলিম নারীদের শরঈ হিজাব পালনে যত্নশীল হওয়া এবং সাজসজ্জা পরিহার করা উচিত, যাতে পুরুষরা ফিতনায় পতিত না হয়। কেননা এর গুনাহ অত্যন্ত গুরুতর।
মোবাইলে ছবি তোলা বা ছবি ও ভিডিও দেখায় ব্যস্ত হওয়া থেকে সতর্ক থাকতে হবে। আর এই ছবি ও ভিডিওগুলো হারাম বিষয়ে হলে, সেটি আরও মারাত্মক হয়ে যায়।
মসজিদে নববীকে ঝগড়া-বিবাদ, উচ্চস্বরে কথা বলা, হারানো জিনিসের ঘোষণা দেওয়া, বেচা-কেনা এবং এ জাতীয় অন্যান্য বিষয় যা এ মসজিদে এবং অন্যান্য মসজিদে করা অনুচিত, সেগুলো থেকে পবিত্র রাখা; কারণ আবূ হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যখন কাউকে মসজিদে বেচা-কেনা করতে দেখবে তখন বলবে, আল্লাহ তোমার এ ব্যবসা লাভজনক না করুন। আর কাউকে যখন দেখবে মসজিদে কোন জিনিস হারানোর ঘোষণা দিতে তখন বলবে, আল্লাহ তোমার জিনিসটি ফেরত না দিন।”[১৭] [১৭] সুনানে তিরমিযী (হাদীস নং: ১৩২১), সহীহ ইবনে খুযাইমাহ (হাদীস নং: ১৩০৫), এর সনদ সহীহ।
ব্যক্তিগত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার প্রতি যত্নবান থাকা এবং রসুন, পেঁয়াজ, বিড়ি-সিগারেট, ঘাম ও এ জাতীয় দুর্গন্ধ যা তার মুসল্লী ভাইদের কষ্টের কারণ হয়, তা থেকে সতর্ক থাকা; জাবের ইবন আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি রসুন অথবা পিঁয়াজ খায়, সে আমাদের থেকে দূরে অবস্থান করবে—অথবা তিনি বলেছেন: আমাদের মসজিদ থেকে দূরে থাকবে—এবং সে তার ঘরে অবস্থান করবে।”[১৮] [১৮] সহীহ বুখারী (হাদীস নং: ৭৩৫৯), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ৫৬৪)।
মসজিদে নববীর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা রক্ষার প্রতি সচেষ্ট থাকা এবং মসজিদের ভেতরে ও এর প্রাঙ্গণে বর্জ্য পদার্থ নিক্ষেপ না করা যেমন খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ ও ইফতারের দস্তরখান (বিশেষ করে রমযান মাসে), অথবা চলাচলের পথ ও প্রাঙ্গণে থুথু এবং এ জাতীয় জিনিস না ফেলা।
চলাচলের পথ, দরজার প্রবেশমুখ এবং ভিড়ের জায়গাগুলোতে সালাত আদায় করা পরিহার করা, কারণ এর ফলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, রাস্তাঘাট বন্ধ হয় এবং মুসলিমদের কষ্ট দেওয়া হয়।
মসজিদে নববীর ভেতরে অথবা এর চত্বরসমূহে পুরুষ ও মহিলারা তাদের নিজ নিজ নির্ধারিত স্থানে সালাত আদায় করবে। পুরুষ মহিলার পাশে এবং মহিলা পুরুষের পাশে সালাত আদায় করবে না। আর যথাসম্ভব ইমামের চেয়ে অগ্রবর্তী হওয়া থেকে সতর্ক থাকবে।
মসজিদ থেকে বের হওয়ার সময় বাম পা আগে দেওয়া এবং বের হওয়ার সময় এই দোয়া বলা: উচ্চারণ: ”আল্লহুম্মা ইন্নী আসআলুকা মিন ফাযলিকা” অর্থ: “হে আল্লাহ আমি আপনার কাছে আপনার অনুগ্রহ প্রার্থনা করছি।”[১৯] অথবা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর দরুদ পাঠ করবে এবং বলবে: উচ্চারণ: ”রব্বিগফিরলী যুনুবী, ওয়াফতাহলী আবওয়াবা ফাযলিকা” অর্থ: “হে আমার রব! আমার গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং আমার জন্য আপনার অনুগ্রহের দরজাসমূহ খুলে দিন।”[২০] [১৯] সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ৭১৩)। [২০] সুনানে তিরমিযী (হাদীস নং: ৩১৪), এর সনদ সহীহ।
চতুর্থত: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর ঘনিষ্ট সঙ্গীদয় রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কবর যিয়ারাতের আহকাম ও আদব
* নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর এবং তাঁর দুই সঙ্গী: আবু বকর ও উমর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমার কবর যিয়ারত করা মদীনাবাসী এবং সেখানে আগমনকারী প্রতিনিধি ও যিয়ারতকারীদের জন্য মুস্তাহাব; আর তা কবর যিয়ারত শরীয়তসম্মত হওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত সাধারণ দলীলসমূহের ভিত্তিতে; তন্মধ্যে অন্যতম হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই বাণী: “আমি তোমাদেরকে কবর যিয়ারত করতে নিষেধ করেছিলাম, তবে এখন তা যিয়ারত করতে পারো।”[২১] [২১] সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ৯৭৭)।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইন্তেকালের পর তাঁর ওপর সালামের ফযীলতের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “কোন মুসলিম আমার উপর সালাম দিলে আল্লাহ তা‘আলা আমার নিকট আমার রূহটি ফেরত দেন, যাতে আমি তার সালামের উত্তর দিতে পারি”। [২২] [২২] মুসনাদে আহমাদ (হাদীস নং ১০৮১৫), এর সনদ হাসান।
* আর মহিলাদের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর কিংবা অন্য কোনো মুসলিমের কবর যিয়ারত করা শরীয়তসম্মত নয়। কেননা কবর যিয়ারত পুরুষদের ক্ষেত্রেই শরীয়তসিদ্ধ, আর মহিলাদেরকে কবর যিয়ারত থেকে নিষেধ করা হয়েছে। এ মর্মে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু ‘আনহুমা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারাতকারীনী, তার উপর মসজিদ নির্মাণকারী এবং তাতে বাতি প্রজ্জ্বলিতকারীদেরকে অভিসম্পাত করেছেন।” [২৩] আর আবূ হুরাইরা রদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারাতকারী নারীদেরকে লা’নত করেছেন।”[২৪] [২৩] সুনানে আবু দাউদ (হাদীস নং ৩২৩৬), তিরমিযী (হাদীস নং ৩২০), এবং নাসায়ী (হাদীস নং ২০৪৩)। [২৪] সুনানে তিরমিযী (হাদীস নং: ১০৫৬), সুনানে ইবনে মাজাহ (হাদীস নং: ১৫৭৬), এর সনদ হাসান।
* নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা জায়েয নয়, এভাবে যে সফরের নিয়ত কেবল কবর যিয়ারত করাই হবে। বরং সফর করতে হবে মসজিদে নববী যিয়ারত ও তাতে সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে। অতঃপর মদিনায় পৌঁছে গেলে তার জন্য কবর যিয়ারত করা শরীয়তসিদ্ধ, যেমনটি মদিনার অধিবাসীদের জন্য শরীয়তসিদ্ধ। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো স্থানে (ইবাদতের উদ্দেশ্যে) সফর করা যাবে না: আমার এ মসজিদ (মসজিদে নববী), মসজিদুল হারাম এবং মসজিদে আক্বসা।” [২৫] [২৫] সহীহ বুখারী (হাদীস নং: ১১৮৯), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং: ১৩৯৭)। হাদীসের শব্দাবলী ইমাম মুসলিমের।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর এবং তাঁর দুই সঙ্গী রাদিয়াল্লাহু আনহুমার কবর যিয়ারতের শরয়ী আদবসমূহ
যিয়ারতকারী নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের সামনে কবরের দিকে মুখ করে দাঁড়াবে, তারপর আদবের সাথে ও নিচুস্বরে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দিবে, সে বলবে: (السلامُ عليك يا رسول الله، ورحمة الله وبركاته) আস্সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহি ওয়ারহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ, আর যদি সে এর সাথে অতিরিক্ত বলে: (أشهد أنك قد بلغت الرسالة، وأديت الأمانة، ونصحت الأمة، وجاهدت في الله حق الجهاد) (উচ্চারণ: আশহাদু আন্নাকা কদ বাল্লাগতার রিসালাহ, ওয়াত আদ্দায়তাল আমানাহ, ওয়ানাসাহতাল উম্মাহ ওয়াজাহাদতা ফিল্লাহি হাক্কাল জিহাদ) “আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আপনি রিসালাত পৌঁছে দিয়েছেন, আমানত আদায় করেছেন, উম্মাতকে উপদেশ দিয়েছেন এবং আল্লাহর পথে যথাযথভাবে সংগ্রাম করেছেন” তাহলে এতে কোনো সমস্যা নেই; কারণ, এইবাক্যগুলো সবই সত্য।
এরপর ডান দিকে এক কদম সরে আবু বকর সিদ্দীক রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর কবরের মুখোমুখি হয়ে বলবে: "আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা বকরিস সিদ্দীক, আসসালামু আলাইকা ইয়া খলীফাতা রাসূলিল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, রাদিয়াল্লাহু আনকা ওয়া আরদাকা, ওয়া জাযাকা আন উম্মাতি মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইরা।" অর্থাৎ হে আবু বকর সিদ্দীক, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলিফা! আপনার উপর সালাম বর্ষিত হোক, আল্লাহ আপনার উপর সন্তুষ্ট হোন ও আপনাকেও সন্তুষ্ট করুন এবং আপনাকে উম্মতে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
অতঃপর ডান দিকে এক কদম সরে উমার ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু-এর কবরের মুখোমুখি হয়ে বলবেন: "আসসালামু আলাইকা ইয়া উমারাল ফারূক, রাদিয়াল্লাহু আনকা ওয়া আরদাকা, ওয়া জাযাকা আন উম্মাতি মুহাম্মাদিন সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইরা।" অর্থাৎ হে উমার ফারূক! আপনার উপর সালাম বর্ষিত হোক, আল্লাহ আপনার উপর সন্তুষ্ট হোন ও আপনাকেও সন্তুষ্ট করুন এবং আপনাকে উম্মতে মুহাম্মাদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
ইবনু উমার রদিয়াল্লাহু আনহুমা যখন সফর থেকে ফিরতেন, তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের নিকট এসে বলতেন: “আস-সালামু আলাইকা ইয়া রাসূলাল্লাহ, আস-সালামু আলাইকা ইয়া আবা বাকর, আস-সালামু আলাইকা ইয়া আবাতাহ।” অর্থ: “হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপর সালাম বর্ষিত হোক, হে আবু বকর, আপনার উপর সালাম বর্ষিত হোক, হে আমার প্রিয় পিতা, আপনার উপর সালাম বর্ষিত হোক।” অতঃপর তিনি চলে যেতেন।[২৬] [২৬] বাইহাকী, আস-সুনানুল কুবরা (হাদীস নং ১০২৭১), এর সনদ সহীহ।
কবরের দেওয়াল বা বেষ্টনী স্পর্শ করবে না এবং সেগুলোকে চুম্বনও করবে না:
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: "নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দেওয়ার সময় কবরের দিকে মুখ করে দাঁড়াবে; কিবলার দিকে নয়। অতঃপর নিকটবর্তী হবে ও সালাম দিবে এবং হাত দ্বারা কবর স্পর্শ করবে না। [২৭]" [২৭] কাজী আয়াযের আশ-শিফা (২/১৯৯)।
ইমামগণ একমত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবর হাত দ্বারা স্পর্শ করা এবং তাতে চুমু দেওয়া যাবে না।
কবরের পাশে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়াবে না, বরং সালাম প্রদান শেষে ফিরে যাবে।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: "আমার মতে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের কাছে দাঁড়িয়ে কেউ দোয়া করবে না, বরং সালাম দিয়ে চলে যাবে" [২৮]। [২৮] আশ-শিফা লিলকাদি ইয়াদ (২/১৯৯)।
নাফি রাহিমাহুল্লাহ বলেনঃ "ইবনু উমার রদিয়াল্লাহু আনহুমা কবরের কাছে সালাম প্রদান করতেন। আমি তাকে একশ’রও বেশি বার কবরের কাছে এসে বলতে দেখেছি: “নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর সালাম, আবূ বকরের ওপর সালাম, আমার পিতার ওপর সালাম।” অতঃপর তিনি চলে যেতেন।" [২৯] [২৯] আল-আজুররী, “আশ-শারীয়াহ” (৫/২৩৭৪, হাদীস নং: ১৮৫৩)।
কিছু যিয়ারতকারী নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের নিকট উচ্চস্বরে যা করেন এবং সেখানে যে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকেন, তা শরীয়ত পরিপন্থী।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা অন্য কোনো সৃষ্টির কাছে কোনো উপকার লাভ বা ক্ষতি দূর করা, প্রয়োজন পূরণ, সংকট দূরীকরণ, রোগ নিরাময়, সুপারিশ প্রার্থনা, আযাব থেকে মুক্তি অথবা এ জাতীয় অন্য কোনো কিছুর জন্য দু‘আ করা জায়েয নেই। কেননা, যে বিষয়ে আল্লাহ ছাড়া আর কেউ সক্ষম নয়, এমন বিষয়ে আল্লাহ ব্যতীত অন্যকে আহবান করা হারাম এবং বড় শিরক। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আর তোমাদের রব বলেছেন, 'তোমরা আমাকে ডাক, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব। নিশ্চয় যারা অহংকারবশে আমার 'ইবাদাত থেকে বিমুখ থাকে, তারা অচিরেই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে।” [সূরা গাফির: ৬০] তিনি আরো বলেছেন: “আল্লাহ ছাড়া তোমরা যাদেরকে আহবান কর তারা তো তোমাদেরই মত বান্দা; সুতরাং তোমরা তাদেরকে ডাক, অতঃপর তারা যেন তোমাদের ডাকে সাড়া দেয়, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।” [সূরা আল-আরাফ: ১৯৪] মহান আল্লাহ আরো বলেন: “আর নিশ্চয় মসজিদসমূহ আল্লাহরই জন্য। কাজেই আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেকো না।” [সূরা আল-জিন: ১৮]
কবরের নিকট আল্লাহর কাছে দু‘আ করবে না। বরং দু‘আ করার ইচ্ছা হলে কবর থেকে সরে গিয়ে কিবলামুখী হয়ে দু‘আ করবে। আর করবমুখী হয়ে দুআ করবে না।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “আমার মতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে দোয়া করা উচিৎ নয়।”
মসজিদে প্রবেশ বা বের হওয়ার সময় কবরের কাছে ঘন ঘন যাতায়াত করা জায়েয নয়, তা মদিনাবাসী হোক বা বহিরাগত যিয়ারতকারী। কারণ এতে কবরকে উৎসবের স্থানে পরিণত করার আশঙ্কা রয়েছে।
আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা থেকে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন: "“আমার কবরকে উৎসবস্থল হিসেবে গ্রহণ করো না এবং তোমাদের ঘরগুলোকে কবরে পরিণত করো না। আর তোমরা যেখানেই থাকো না কেন, আমার উপর দরুদ পাঠ করো, কেননা তোমাদের দরুদ আমার কাছে পৌঁছে যায়।” [৩০]" [৩০] মুসনাদে আহমাদ (হাদীস নং ৮৮০৪), এর সনদ হাসান।ঊর্ধ্বে
“তোমরা আমার কবরকে উৎসবস্থল হিসেবে গ্রহণ করো না”-এর অর্থ হলো, কোনো নির্দিষ্ট সময়ে বা বিশেষ অবস্থায় সেখানে বারবার যাওয়া। যেমন, প্রত্যেক দিন, সপ্তাহ বা মাসে তার যিয়ারতকে নির্দিষ্ট করে নেওয়া। অথবা কোনো নির্দিষ্ট অবস্থায় সেখানে যিয়ারত করা। আর বলা হয়েছে: অর্থাৎ তোমরা সেটিকে এমন কোনো মৌসুমে পরিণত করো না, যেখানে তোমরা একত্রিত হও।[৩১] [৩১] দেখুন: রাগেব ইসফাহানীর আল-মুফরাদাত (পৃষ্ঠা: ৫৯৪) এবং ইমাম শাওকানীর শারহুস সুদূর বিতাহরীমি রাফ‘ইল কুবূর (পৃষ্ঠা: ১৬)।
ইমাম মালিক রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: “মসজিদে প্রবেশ ও প্রস্থানকারী মদিনার অধিবাসীদের জন্য কবরের পাশে দাঁড়ানো আবশ্যক নয়, বরং এটি বহিরাগতদের জন্য।”[৩২] [৩২] আশ-শিফা লিল কাযী ইয়াদ (২/২০৪), আল-মাদখাল লিল ইবনিল হাজ্জ (১/২৬২)।
ইমাম মালেক রহিমাহুল্লার উক্তি: “এটা কেবল বহিরাগতদের জন্য”: অর্থাৎ সাধারণ যিয়ারত উদ্দেশ্য, প্রবেশ ও প্রস্থানের সময় বারবার যিয়ারত উদ্দেশ্য নয়।
কবরের সামনে সালাত আদায়কারীর ন্যায় বুকের উপর বা তার নিচে এক হাত অন্য হাতের উপর রেখে দাঁড়াবে না; কেননা এই অবস্থাটি কেবল সালাতের জন্যই নির্দিষ্ট, আর এটি এমন অবনমন ও আত্মসমর্পণের অবস্থা যা একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার জন্যই উপযুক্ত।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সালাম দেওয়ার জন্য দূরবর্তী স্থান থেকে কবরমুখী হবে না, যেমনটি কিছু মানুষ করে থাকে; কারণ এই কাজটি সাহাবা রাদিয়াল্লাহু আনহুম এবং চার ইমাম ও অন্যান্য সালাফে সালিহীনগণ করতেন না।
কোনো দিক থেকেই কবর শরীফের দিকে মুখ করে দু‘আ, কুরআন তিলাওয়াত বা অনুরূপ কোনো কাজ করা যাবে না, কেননা এটি পূর্ববর্তী উদাহরণের মতোই একটি বিদ‘আত। মুসলিমের জন্য এটি জায়েয নেই যে, সে তার দ্বীনে এমন কিছু তৈরি করবে যা আল্লাহ অনুমোদন করেননি। ইমাম মালিক রহিমাহুল্লাহ অনুরূপ কাজগুলোকে অপছন্দ করেছেন এবং বলেছেন: “এই উম্মাতের শেষের লোকদের সংশোধন একমাত্র ঐ বিষয়গুলোর মাধ্যমেই সম্ভব, যেগুলো দ্বারা এই উম্মাতের প্রথম লোকদের সংশোধন হয়েছিল”[৩৩]। [৩৩] মাজমুউ ফাতাওয়া বিন বায (১৬/ ১১০)।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর সালাম পেশ করার সময় ছবি তোলা ও লাইভ করাতে ব্যস্ত না থাকা।
নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার এবং সাহাবীদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলা সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।