Skip to content
কে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন? কে আমাকে সৃষ্টি করেছেন? এবং কেন সৃষ্টি করেছেন?

কে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন? কে আমাকে সৃষ্টি করেছেন? এবং কেন সৃষ্টি করেছেন?

এই কিতাবটি সৃষ্টিজগত ও মানুষের আদি-উৎপত্তি বিষয়ে আলোচনা করে এবং এ কথা নিশ্চিত করে যে, এর এক মহান স্রষ্টা আছেন—তিনি আল্লাহ—যিনি জীবনকে নিয়ন্ত্রণকারী বিধিবিধান নির্ধারণ করেছেন। এটি আল্লাহর গুণাবলি এবং রাসূলগণ ও আসমানী কিতাবসমূহের প্রতি ঈমানের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। এটি আরো নিশ্চিত করে যে, দুনিয়া ও আখিরাতে সত্যিকারের সুখ-সাফল্য অর্জনের জন্য ইসলামই হল সত্য ধর্ম।

Language: lang_bn
Prepared by: মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর দ্বীনি বিষয় সম্পর্কিত প্রেসিডেন্সির একাডেমিক কমিটি
Version: 2.0

কে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন? কে আমাকে সৃষ্টি করেছেন? এবং কেন সৃষ্টি করেছেন?

মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববীর দ্বীনি বিষয় সম্পর্কিত প্রেসিডেন্সির একাডেমিক কমিটি

আমি কি সঠিক পথে আছি?

আসমান-জমিন এবং এর মধ্যে যে বড় বড় মাখলুক আছে, যেগুলোকে পরিবেষ্টন করা যায় না, এগুলোকে কে সৃষ্টি করেছেন?

আসমান ও জমিনের এ সূক্ষ্ম ও সুনিপুণ ব্যবস্থা কে তৈরী করেছেন?

কে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি ও জ্ঞান প্রদান করেছেন এবং তাকে জ্ঞান লাভ করা ও বাস্তবতা বোঝার উপযুক্ত করেছেন?

তোমার শরীরের বিভিন্ন অংশে এই নিখুঁত কারুকার্য কে সৃজন করেছেন এবং কে তোমাকে সুন্দর অবয়ব দান করেছেন?

জীবজগতের বিভিন্ন পার্থক্য ও বৈচিত্রের দিকে খেয়াল কর, কে তাদেরকে এ সীমাহীন সৌন্দর্য সহকারে সৃষ্টি করেছেন?

যুগযুগ ধরে কিভাবে এই সুবিশাল মহাবিশ্ব তাকে নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণকারী নিয়মাবলিসহ স্থির রয়েছে ও পরিচালিত হচ্ছে।

কে সেই সত্তা, যিনি এমন ব্যবস্থাসমূহ তৈরি করেছেন, যা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে (জীবন, মৃত্যু, পুনর্জীবন , রাত, দিন, ঋতুর পরিবর্তন ইত্যাদি)?

এ বিশ্ব কি নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করেছে? নাকি এটি কোনো অস্তিত্বহীন বস্তু থেকে এসেছে? নাকি এটি হঠাৎ করে এমনিতেই সৃষ্টি হয়ে গেছে? আল্লাহ তা‘আলা বলেন: তারা কি স্রষ্টা ছাড়া সৃষ্টি হয়েছে, না তারা নিজেরাই স্রষ্টা? নাকি তারা আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টি করেছে? বরং তারা দৃঢ় বিশ্বাস করে না। [সূরা আত-তূর, আয়াত: ৩৫-৩৬]।

সুতরাং আমরা যদি নিজেরা নিজেদেরকে সৃষ্টি না করে থাকি, এবং আমাদের পক্ষে এমনিতেই ঘটনাচক্রে অথবা অনস্তিত্বশীল বস্তু থেকে আসা অসম্ভব হয়, তাহলে অনস্বীকার্য সত্য হচ্ছে, এ মহাবিশ্বের অবশ্যই একজন মহান এবং সক্ষম সৃষ্টিকর্তা রয়েছেন; যেহেতু এ মহাবিশ্ব নিজেই নিজেকে সৃষ্টি করা অথবা অনস্তিত্বশীল বস্তু থেকে অস্তিত্বে আসা অথবা এমনিতেই ঘটনাচক্রে সৃষ্টি হওয়া অসম্ভব!

কেন একজন ব্যক্তি এমন জিনিসের অস্তিত্বে বিশ্বাস করবে যা সে দেখতে পায় না, যেমন উপলব্ধি، বুদ্ধি، আত্মা، আবেগ এবং ভালোবাসা? এটাই কী কারণ নয় যে সে এগুলোর প্রভাব দেখে? তাহলে কীভাবে একজন ব্যক্তি এই মহাবিশ্বের একজন মহান স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করতে পারে, যখন তাঁর সৃষ্ট জীব বা মাখলুক, তাঁর কাজ এবং তাঁর রহমতের প্রভাব সে প্রত্যক্ষ করে?!

এ কথা কোন জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ বিশ্বাস করবে না যে, কেউ এ বাড়িটি তৈরি করা করা ছাড়াই বাড়িটি এমনিতেই অস্তিত্বে এসেছে অথবা যদি বলা হয় যে, এ বাড়িটিকে কোন অনস্তিত্বে থাকা ব্যক্তি তৈরি করেছে। তাহলে কিছু মানুষ কীভাবে এটা বিশ্বাস করতে পারে যে, এ মহাবিশ্ব একজন সৃষ্টিকর্তা ব্যতীতই অস্তিত্বে এসেছে? একজন বিবেকবান মানুষ কীভাবে এ কথা গ্রহণ করতে পারে যে, সৃষ্টিজগতের এসব সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম প্রক্রিয়াসমূহ এমনিতেই হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়ে গেছে?

এর সব কিছুই আমাদের কেবল একটি ফলাফলের দিকেই নিয়ে যায়: তা হলো, এই মহাবিশ্বের অবশ্যই একজন মহান-সক্ষম রব আছেন, যিনি এটি পরিচালনা করেন আর তিনি একমাত্র ইবাদাত পাওয়ার হকদার। তিনি ব্যতীত অন্য যা কিছুর ইবাদাত করা হয় তা সম্পূর্ণ বাতিল। (তিনি ব্যতীত) কোন কিছুই ইবাদাতের হকদার হতে পারে না।

রব হচ্ছেন মহান সৃষ্টিকর্তা

তিনি একক সৃষ্টিকর্তা রব। তিনিই মালিক, পরিচালনাকারী, রিযিকদাতা। তিনিই জীবন দান করেন এবং মৃত্যু দেন। তিনিই পৃথিবীকে সৃষ্টি ও অনুগত করেছেন এবং এটিকে স্বীয় সৃষ্টিজীবের জন্য উপযোগী করেছেন। তিনিই আসমানসমূহ ও তাতে যে মহান ও বড় বড় সৃষ্টি রয়েছে তার সবই সৃষ্টি করেছেন। তিনিই সূর্য, চন্দ্র, রাত ও দিনের সুনির্দিষ্ট ক্রম স্থাপন করেছেন, যা তাঁর মহত্ত্বের প্রমাণ বহন করে।

তিনিই সেই সত্তা, যিনি বায়ুকে আমাদের বশীভূত করেছেন, যা ছাড়া আমরা জীবন ধারণ করতে পারি না। আর তিনিই আমাদের উপরে বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং আমাদের জন্য সাগর ও নদীকে বশীভূত করেছেন। তিনিই আমাদের খাদ্যদান করেন এবং আমাদেরকে রক্ষা করেন যখন আমরা কোন শক্তি ছাড়াই আমাদের মায়ের গর্ভে ভ্রূণ হিসেবে ছিলাম। তিনিই আমাদের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের শিরায় রক্ত সঞ্চালন করেন।

এই সৃষ্টিকর্তা, রিযিকদাতা রবই হলেন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা‘আলা।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: নিশ্চয় তোমাদের রব আল্লাহ্ যিনি আসমানসমূহ ও যমীন ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন; তারপর তিনি ‘আরশের উপর উঠেছেন। তিনিই দিনকে রাত দিয়ে ঢেকে দেন, তাদের একে অন্যকে দ্রুতগতিতে অনুসরণ করে। আর সূর্য,চাঁদ ও নক্ষত্ররাজি, যা তাঁরই হুকুমের অনুগত, তা তিনিই সৃষ্টি করেছেন।জেনে রাখ, সৃজন ও আদেশ তাঁরই। সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্‌ কত বরকতময়! [আল-আরাফ, আয়াত: ৫৪]

আমরা মহাবিশ্বের যা কিছু দেখি এবং যা দেখি না আল্লাহই হচ্ছেন সবকিছুর রব এবং সৃষ্টিকর্তা। তিনি ব্যতীত সবকিছুই তাঁর সৃষ্টির মধ্য হতে একটি সৃষ্টি মাত্র। একমাত্র তিনিই ইবাদাত পাওয়ার একক হকদার এবং তার সাথে অন্য কারো ইবাদাত করা যাবে না। রাজত্ব, সৃষ্টি, পরিচালনায় অথবা ইবাদাতে তাঁর কোনো অংশীদার নেই।

তর্কের খাতিরে যদিও মেনে নেওয়া হয় যে, মহা সম্মানিত আল্লাহর সাথে আরো অনেক ইলাই আছে, তাহলে এ পৃথিবী অনেক আগেই ধ্বংস হয়ে যেত; কেননা দুইজন ইলাহ একই সময়ে মহাবিশ্বের কার্যাদি পরিচালনা করতে পারে না। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: যদি এতদুভয়ের (আসমান ও যমীনের) মধ্যে আল্লাহ্ ব্যতীত আরো অনেক ইলাহ থাকত, তাহলে উভয়ই বিশৃংখল হত... [আল-আম্বিয়া: ২২]

মহান সৃষ্টিকর্তা রবের সিফাতসমূহ

মহিমান্বিত রবের রয়েছে অগণিত সুন্দর সুন্দর নাম। তাঁর আরো রয়েছে অসংখ্য সুমহান ও সুউচ্চ গুণাবলী, যেগুলো তাঁর পরিপূর্ণতার প্রমাণ বহন করে। তাঁর নামসমূহের মধ্যে রয়েছে: আল-খালিক বা সৃষ্টিকর্তা এবং “আল্লাহ”। আর “আল্লাহ” নামের অর্থ হচ্ছে: এমন সত্তা যিনি ইবাদাতের একমাত্র উপযুক্ত সত্তা, যার কোন শরীক নেই। তাঁর নামসমূহের মধ্যে আরো রয়েছে আল-হাই তথা: চিরঞ্জীব, আল-কাইয়ূম বা মহাপরিচালক, আর-রহীম বা পরম দয়াময়, আর-রাযিক্ব বা রিযিকদাতা এবং আল-কারীম বা মহাসম্মানিত। মহিমান্বিত কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “আল্লাহ্‌, তিনি ছাড়া কোনো সত্য ইলাহ নেই। তিনি চিরঞ্জীব, সর্বসত্তার ধারক। তাঁকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না, নিদ্রাও নয়। আসমানসমূহে যা রয়েছে ও যমীনে যা রয়েছে সবই তাঁর। কে সে, যে তাঁর অনুমতি ব্যতীত তাঁর কাছে সুপারিশ করবে? তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন। আর যা তিনি ইচ্ছে করেন তা ছাড়া তাঁর জ্ঞানের কোনো কিছুকেই তারা পরিবেষ্টন করতে পারে না। তাঁর ‘কুরসী’ আসমানসমূহ ও যমীনকে পরিব্যাপ্ত করে আছে; আর এ দুটোর রক্ষণাবেক্ষণ তাঁর জন্য বোঝা হয় না। আর তিনি সুউচ্চ সুমহান।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৫৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেছেন: বলুন, ‘তিনি আল্লাহ্, এক-অদ্বিতীয়,’ ‘আল্লাহ্ হচ্ছেন ‘সামাদ'। (তিনি কারো মুখাপেক্ষী নন, সকলেই তাঁর মুখাপেক্ষী); তিনি কাউকেও জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেয়া হয়নি। ‘এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।’ [সূরা আল-ইখলাস, আয়াত ১-৪]।

মা‘বূদ (ইবাদাতের উপযুক্ত) রব অবশ্যই পূর্ণতার সকল গুণে গুণান্বিত হওয়া প্রয়োজন।

আল্লাহ তা‘আলার সিফাতের মধ্যে রয়েছে: তিনিই হচ্ছেন একমাত্র ইবাদাত ও উপাসনা প্রাপ্তির অধিকারী। তিনি ব্যতীত যা কিছু আছে সব কিছুই মাখলূক তথা: সৃষ্ট সত্তা, জবাবদিহি ও আদেশ শক্তির অধীন।

তাঁর গুণাবলীর মধ্যে আরো রয়েছে: তিনি চিরঞ্জীব (الحي), মহা-পরিচালনাকারী (القيوم)। পৃথিবীর প্রতিটি জীবকেই আল্লাহ তা‘আলা জীবন দিয়েছেন এবং অনস্তিত্ব থেকে অস্তিত্বে এনেছেন। তিনিই সেসব প্রাণীর অস্তিত্ব প্রদান, রিযিকের ব্যবস্থা ও উপযোগিতা নিশ্চিত করেন। সুতরাং রব হচ্ছেন চিরঞ্জীব যিনি কখনও মৃত্যুবরণ করেন না এবং তাঁর অস্তিত্ব বিলীন হওয়া অসম্ভব। তিনি সুমহান পরিচালক, যিনি কখনও ঘুমান না। বরং তন্দ্রা ও নিদ্রা তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না।

তাঁর গুণাবলীর মধ্যে আরো রয়েছে, তিনি সর্বজ্ঞ (العليم), যার কাছে আসমান-যমীনের কোন কিছুই গোপন থাকে না।

তাঁর গুণাবলীর মধ্যে আরো রয়েছে, তিনি হচ্ছেন সর্বশ্রোতা-সর্বদ্রষ্টা (السميع البصير), যিনি প্রতিটি বস্তুই শুনতে পান, প্রতিটি সৃষ্টবস্তুকেই দেখতে পান, নফস যেসব বিষয়ে ওয়াসওয়াসা প্রদান করে এবং অন্তর যা কিছু গোপন করে সেগুলোও তিনি জানেন। আসমান-যমীনের মধ্যকার কোন বস্তুই তাঁর সুমহান সত্তার কাছে গোপন থাকে না।

তাঁর গুণাবলীর মধ্যে আরো রয়েছে, তিনি হচ্ছেন সর্বশক্তিমান (القدير), যাকে কোন কিছুই অক্ষম করতে পারে না এবং তাঁর ইচ্ছাকেও কেউ খণ্ডন করতে পারে না, তিনি যা ইচ্ছা করেন, যা ইচ্ছা তা বাধা দেন, তিনি অগ্রসর করান এবং তিনিই পিছিয়ে দেন। আর তাঁরই রয়েছে পরিপূর্ণ হিকমাত (প্রজ্ঞা)।

তাঁর গুণাবলীর মধ্যে আরো রয়েছে, তিনি সৃষ্টিকর্তা (الخالق ), রিযিকদাতা (الرازق), পরিচালনাকারী (المدبر), যিনি সৃষ্টিজগতকে সৃষ্টি করে তা পরিচালনা করছেন। সৃষ্টিজগত তাঁর হাতের মুঠোয় এবং তাঁর ক্ষমতার অধীন।

তাঁর গুণাবলীর মধ্যে আরো রয়েছে যে, তিনি নিরুপায় ব্যক্তির ডাকে সাড়া দেন, দুঃখ ভারাক্রান্তকে সাহায্য করেন এবং দুর্দশা দূর করেন। যখনই কোন সৃষ্টি বিপদ বা অসুবিধার সম্মুখীন হয়, তখন সে অবধারিতভাবে তাঁর দিকেই ফিরে যায়।

ইবাদাত শুধু আল্লাহ তা‘আলার জন্যই হতে হবে, শুধু তিনিই এর পরিপূর্ণ হকদার, আর কেউ নয়। তিনি ব্যতীত আর যারই ইবাদাত করা হোক না কেন, সে বাতিল উপাস্য, আর তার অবশ্যই ঘাটতি রয়েছে এবং সে ধ্বংস ও মৃত্যুর সম্মুখীন হবে।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা আমাদের এমন বিবেক দিয়েছেন যা তাঁর মহত্ত্বের উপলব্ধি করতে পারে। এছাড়াও তিনি আমাদের মধ্যে একটি সহজাত স্বভাব (ফিতরাত) স্থাপন করেছেন যা ভালোকে পছন্দ করে,  মন্দকে ঘৃণা করে এবং প্রশান্তি পাই যখন তা বিশ্বজগতের রব আল্লাহর দিকে ফিরে যায়। এই সহজাত স্বভাব (ফিতরাত) তাঁর পরিপূর্ণতার এবং সেই সুমহান সত্তাকে কোন ধরনের ঘাটতিরি দ্বারা গুণান্বিত করা যায় না; এর প্রমাণ বহন করে।

একজন পরিপূর্ণ সত্তা ব্যতীত কারো ইবাদাত (উপাসনা) করা কোন বিবেকবান ব্যক্তির জন্য শোভনীয় নয়। তাহলে তার মত (সৃষ্ট মানুষ) বা তার চেয়েও নিকৃষ্ট মাখলুকের ইবাদাত (উপাসনা) কীভাবে করা যায়?

মা‘বূদ (ইবাদাত পাওয়ার অধিকারী সত্তা) কখনো মানুষ, মূর্তি, গাছ অথবা কোন প্রাণী হতে পারে না!

রব আসমানসমূহের উপর, তাঁর ‘আরশের উপরে আসীন রয়েছেন। আর তিনি তাঁর সৃষ্ট বস্তু থেকে আলাদা। তাঁর সত্তার মধ্যে তাঁর সৃষ্টির কিছু নেই এবং তাঁর সত্তার কোন কিছু তাঁর সৃষ্টিতেও নেই। তিনি তাঁর সৃষ্ট বস্তুর মধ্যে অবতরণ করেন না এবং কারো রূপ ধারণ করেন না।

মহান রবের সাথে কোন কিছুর সাদৃশ্য নেই, আর তিনিই সর্বদ্রষ্টা ও সর্বশ্রোতা। তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই। তিনি তাঁর সৃষ্টিজগৎ থেকে অমুখাপেক্ষী, তিনি ঘুমান না, খাদ্য গ্রহণও করেন না। তিনি সুমহান, তাঁর কোন স্ত্রী অথবা সন্তান থাকা সম্ভব নয়; কেননা সৃষ্টিকর্তার মহত্ত্বের গুণাবলী রয়েছে, তাঁকে কখনোই কোন কমতি অথবা প্রয়োজনের দ্বারা বিশেষায়িত করা যায় না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “হে মানুষ! একটি উপমা দেয়া হচ্ছে, মনোযোগের সাথে তা শোন: তোমরা আল্লাহ্‌র পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা তো কখনো একটি মাছিও সৃষ্টি করতে পারবে না, এ উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্র হলেও এবং মাছি যদি কিছু ছিনিয়ে নিয়ে যায় তাদের কাছ থেকে, এটাও তারা তার কাছ থেকে উদ্ধার করতে পারবে না। অন্বেষণকারী ও অন্বেষণকৃত কতই না দুর্বল; তারা আল্লাহকে যথাযোগ্য মর্যাদা দেয়নি যেমন মর্যাদা দেয়া উচিত ছিল, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ ক্ষমতাবান, পরাক্রমশালী।” [সূরা আল-হাজ্জ, আয়াত: ৭৩-৭৪]।

কেন এই মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের সৃষ্টি করেছেন? এবং তিনি আমাদের কাছ থেকে কি চান?

এটা কি যৌক্তিক যে আল্লাহ তা‘আলা কোন উদ্দেশ্য ছাড়াই এই সমস্ত সৃষ্টজীবকে সৃষ্টি করেছেন? মহাজ্ঞানী ও প্রজ্ঞাময় হওয়া সত্ত্বেও তিনি কি এগুলোকে নিরর্থক সৃষ্টি করেছেন?

এটা কি যুক্তিযুক্ত যে যিনি আমাদেরকে এত নিপুণতা ও দক্ষতার সাথে সৃষ্টি করেছেন এবং আমাদের জন্য নভোমন্ডল ও পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে বশীভূত করেছেন, তিনি আমাদের উদ্দেশ্য ছাড়াই সৃষ্টি করবেন বা আমাদেরকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলির উত্তর ছাড়াই ছেড়ে দিবেন, যেমন: আমরা এখানে কেন? মৃত্যুর পর কী হবে? আমাদেরকে সৃষ্টির উদ্দেশ্য কী?

এটা কি যুক্তিযুক্ত যে অন্যায়কারীর জন্য কোন শাস্তি নেই এবং সৎকর্মপরায়ণ ব্যক্তির জন্য কোন পুরস্কার নেই?

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: ‘তোমরা কি মনে করেছিলে যে, আমি তোমাদেরকে অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে আমার কাছে ফিরিয়ে আনা হবে না?’ [আল-মু’মিনুন: ১১৫]।

বরং আল্লাহ রাসূলদেরকে পাঠিয়েছেন আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত করার জন্য। তাছাড়া আমরা কীভাবে তাঁর ইবাদাত করব, তাঁর নৈকট্য লাভ করব, তিনি আমাদের কাছ থেকে কী চান এবং কীভাবে আমরা তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে পারি পথনির্দেশ দিয়েছেন। আর আমাদের মৃত্যুর পরে কী পরিণাম হবে সে বিষয়ে সংবাদ দিয়েছেন।

আল্লাহ রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন আমাদেরকে এ সংবাদ দেওয়ার জন্য যে, আল্লাহ তা‘আলা-ই একমাত্র ইবাদতের উপযুক্ত, এবং আমরা যেন জানতে পারি কীভাবে তাঁর ইবাদত করতে হবে, এবং তাঁর আদেশসমূহ ও নিষেধসমূহ আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য, এবং আমাদেরকে উন্নত মূল্যবোধ শিক্ষা দেওয়ার জন্য, যেগুলো আমরা গ্রহণ করলে আমাদের জীবন সুন্দর, কল্যাণকর ও বরকতময় হবে।

আল্লাহ তা‘আলা অসংখ্য রাসূল পাঠিয়েছেন, যেমন: নূহ, ইবরাহীম, মূসা এবং ঈসা (আলাইহিমুস সালাম), তাদেরকে তিনি নিদর্শন ও মুজিযাসমূহের মাধ্যমে শক্তিশালী করেছেন, যেগুলো তাদের সত্যতার প্রতি এবং তারা যে আল্লাহ তা‘আলার কাছ থেকে প্রেরিত, তার প্রমাণ বহন করে। আর তাদের শেষ রাসূল হচ্ছেন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম।

রাসূলগণ আমাদেরকে সুস্পষ্টভাবে সংবাদ দিয়েছেন যে, এ জীবন হচ্ছে পরীক্ষা মাত্র আর প্রকৃত জীবন হবে মৃত্যুর পরে।

যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদাত করেছে, যার কোন শরীক নেই এবং সকল রাসূলদের উপরে ঈমান এনেছে, এমন মুমিনদের জন্য রয়েছে জান্নাত। আর যারা আল্লাহর সাথে অন্যান্য ইলাহের উপাসনা করেছে অথবা আল্লাহর রাসূলদের মধ্য হতে কোন একজন রাসূলকে অস্বীকার করেছে, এমন কাফিরদের জন্য আল্লাহ জাহান্নাম প্রস্তুত করে রেখেছেন।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “হে বনী আদম! যদি তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য থেকে রাসূলগণ আসেন, যারা আমার আয়াতসমূহ তোমাদের কাছে বিবৃত করবেন, তখন যারা তাকওয়া অবলম্বন করবে এবং নিজেদের সংশোধন করবে, তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা চিন্তিতও হবে না। আর যারা আমার আয়াতসমূহে মিথ্যারোপ করেছে এবং তার ব্যাপারে অহংকার করেছে, তারাই জাহান্নামবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে।” [আল-আরাফ, আয়াত22: ৩৫-৩৬]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: “হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সেই রবের ‘ইবাদাত করো যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অধিকারী হও। যিনি যমীনকে তোমাদের জন্য বিছানা ও আসমানকে করেছেন ছাদ এবং আকাশ হতে পানি অবতীর্ণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। কাজেই তোমরা জেনে-শুনে কাউকে আল্লাহ্‌র সমকক্ষ দাঁড় করিও না। আর আমি আমার বান্দার প্রতি যা নাযিল করেছি তাতে তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তোমরা এর অনুরূপ কোনো সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহ্‌ ব্যতীত তোমাদের সকল সাক্ষী-সাহায্যকারীকে আহ্বান কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও। অতএব, যদি তোমরা তা করতে না পারো আর কখনই তা করতে পারবে না, তাহলে তোমরা সে আগুন থেকে বাঁচার ব্যবস্থা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর, যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে কাফেরদের জন্য। আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎ কাজ করেছে তাদেরকে  সুসংবাদ দিন যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত, যার তলদেশে নদী প্রবাহিত। যখনই তাদেরকে ফলমুল খেতে দেয়া হবে তখনই তারা বলবে, ‘আমাদেরকে পূর্বে জীবিকা হিসেবে যা দেয়া হত এতো তাই’। আর তাদেরকে তা দেয়া হবে সাদৃশ্যপূর্ণ করেই এবং সেখনে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র সঈিনী। আর তারা সেখানে স্থায়ী হবে।” [সূরা আল-বাকারাহ: ২১-২৫]।

অসংখ্য রাসূল কেন?

আল্লাহ তা‘আলা বিভিন্ন জাতির কাছে তাঁর রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন। প্রতিটি জাতির কাছেই আল্লাহ তা‘আলা রাসূল পাঠিয়েছেন, যাতে তারা তাদেরকে তাদের রব আল্লাহর ইবাদাতের দিকে আহ্বান করতে পারেন, এবং তাদের কাছে তাঁর আদেশ ও নিষেধ পৌঁছে দিতে পারেন, তাদের সকলেরই দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্য ছিল: মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তা‘আলার ইবাদাত। যখনই কোন উম্মত তাদের রাসূল কর্তৃক আনিত আল্লাহর তাওহীদকে পরিত্যাগ করেছে অথবা তা বিকৃত করে ফেলেছে, তখনই আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে সঠিক পথ নির্দেশের জন্য, আল্লাহর তাওহীদ এবং তাঁর অনুসরণের মাধ্যমে মানুষকে সঠিক ফিতরাতের (স্বভাবের) উপরে ফিরিয়ে আনতে অন্য একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন।

এমনকি আল্লাহ তা‘আলা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাধ্যমে রাসূলদের করেছেন ধারাবাহিকতা সমাপ্ত করেছেন। যিনি পূর্ণাঙ্গ দ্বীন ও কিয়ামাত পর্যন্ত সকল মানুষের জন্য প্রযোজ্য স্থায়ী শরী‘আত ব্যবস্থা নিয়ে এসেছিলেন, যে শরী‘আত পূর্বের সকল শরী‘আতসমূহকে পূর্ণতা দানকারী এবং রহিতকারী। সুমহান রব আল্লাহ কিয়ামাত পর্যন্ত এ দ্বীনের স্থায়িত্ব এবং টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেছেন।

সকল রাসূলদের উপরে ঈমান আনা ব্যতীত কেউ মুমিন হতে পারে না

আল্লাহই সেই সত্তা যিনি রাসূলদেরকে পাঠিয়েছেন এবং তিনি তাঁর সমস্ত সৃষ্টিকে তাদের আনুগত্য করার নির্দেশ দিয়েছেন। যে কেউ তাদের একজনের রিসালাতকে অস্বীকার করল, সে তাদের সকলকেই অস্বীকার করলো। মহান আল্লাহ তা‘আলার অহীকে প্রত্যাখ্যান করার চেয়ে মানুষের আর কোনো বড় পাপ নেই। কাজেই জান্নাতে প্রবেশের জন্য সকল রাসূলের প্রতি ঈমান আনা আবশ্যক।

সুতরাং এ সময়ে প্রত্যেকের জন্য আল্লাহর প্রতি এবং সমস্ত রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস করা আবশ্যক। আর এটি কেবল সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর বিশ্বাস এবং তার অনুসরণের মাধ্যমেই হতে পারে, যিনি চিরস্থায়ী মু‘জিযা কুরআন কারীমের মাধ্যমে সাহায্যপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। কুরআন সংরক্ষণের দায়িত্ব স্বয়ং আল্লাহ তা‘আলা নিজে নিয়েছেন, যতদিন পৃথিবী এবং পৃথিবীতে বসবাসকারী লোকজন অবশিষ্ট থাকবে।

আল্লাহ তা‘আলা কুরআনুল কারীমে উল্লেখ করেছেন যে, যে কেউ তাঁর রাসূলদের মধ্য হতে কোন একজনকে অস্বীকার করবে, সে আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাসী ও তাঁর অহীকে অস্বীকারকারী। মহান আল্লাহ বলেছেন: “নিশ্চয় যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের সাথে কুফরী করে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলগণের মধ্যে (ঈমানের ব্যাপারে) তারতম্য করতে চায় এবং বলে, ‘আমরা কতক-এর উপর ঈমান আনি এবং কতকের সাথে কুফরী করি’। আর তারা মাঝামাঝি একটা পথ অবলম্বন করতে চায়, তারাই প্রকৃত কাফির। আর আমি প্রস্তুত রেখেছি কাফিরদের জন্য লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৫০-১৫১]।

আর এ কারণেই আমরা মুসলিমরা যেভাবে আল্লাহর প্রতি, আখিরাত দিবসের প্রতি - যেমনটি আল্লাহ আদেশ করেছেন- ঈমান রাখি, সেভাবে সকল নবী ও পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের প্রতিও ঈমান রাখি। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “রাসূল তার প্রভুর পক্ষ থেকে যা তার কাছে নাযিল করা হয়েছে তার উপর ঈমান এনেছেন এবং মুমিনগণও। প্রত্যেকেই ঈমান এনেছে আল্লাহ্‌র উপর, তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাবসমূহ এবং তাঁর রাসূলগণের উপর। আমরা তাঁর রাসূলগণের কারও মধ্যে তারতম্য করি না। আর তারা বলে: আমরা শুনেছি ও মেনে নিয়েছি। হে আমাদের রব! আপনার ক্ষমা প্রার্থনা করি এবং আপনার দিকেই প্রত্তাবর্তনস্থল।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ২৮৫]।

কুরআনুল কারীম কী?

মহিমান্বিত কুরআন হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী এবং তাঁর অহী, যা তিনি সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাযিল করেছেন। এটি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সর্বশ্রেষ্ঠ অলৌকিক ঘটনা বা মু‘জিযা, যা তার নবুওয়াতের সত্যতা প্রমাণ করে। কুরআনুল কারীম তার বিধানের ক্ষেত্রে হক এবং সংবাদের ব্যাপারে সত্য।

আল্লাহ তা‘আলা মিথ্যা প্রতিপন্নকারীদেরকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন এর মত একটি সূরা আনতে। কিন্তু তারা তা করতে অক্ষম হয়েছিলো, এর বিষয়বস্তুর মাহাত্ম্য এবং এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়ের ব্যাপকতার কারণে, যা ইহকাল ও পরকালের মানব জীবনের সাথে সম্পর্কিত সবকিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। এতে ঈমান বা বিশ্বাস-সম্পর্কিত এমন সকল তথ্য রয়েছে, যার প্রতি ঈমান রাখা আবশ্যক।

এমনিভাবে এতে এমন সব আদেশসমূহ ও নিষেধাজ্ঞাসমূহ রয়েছে যা মানুষকে তার ও তার রবের মধ্যকার, তার ও তার নিজের মধ্যকার অথবা তার ও বাকি সৃষ্টির সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যাবশ্যক বিষয়াবলীর নির্দেশনা দেয়। এ সকল কিছুই বাগ্মিতা এবং স্পষ্টতার একটি উচ্চ শৈলীতে বর্ণনা করা হয়েছে।

এতে অসংখ্য যৌক্তিক প্রমাণ এবং বৈজ্ঞানিক তথ্য রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, এই কিতাবটি মানুষের রচিত কোন কিতাব হতে পারে না; বরং এটি মানবজাতির রব মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার বাণী।

ইসলাম কী?

ইসলাম হলো তাওহীদ সহকারে আল্লাহ তা‘আলার কাছে নিজেকে সমর্পণ করা, আনুগত্য সহকারে তাঁর নিকট বশ্যতা স্বীকার করা এবং সন্তুষ্টি ও কবুলের সাথে তাঁর শরী‘আতকে পালন করা। তাছাড়া মহান আল্লাহ ব্যতীত অন্য যাদের ইবাদাত করা হয়, তাদেরকে অস্বীকার করা।

আল্লাহ তা‘আলা সকল রাসূলকে একই রিসালাত সহকারে প্রেরণ করেছেন। তা হল: এক আল্লাহর ইবাদাত করা, তাঁর সাথে কাউকে শরীক না করা এবং আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদাত করা হয়, তাদেরকে অস্বীকার করা।

ইসলামই হচ্ছে সকল নবীদের দ্বীন (ধর্ম)। সুতরাং তাদের দাওয়াত এক, তবে শরী‘আত ভিন্ন ভিন্ন। মুসলিমরাই আজকের দিনে একমাত্র সঠিক ধর্মকে মেনে চলছে, যে দ্বীন সহকারে সমস্ত নবীগণ আগমন করেছিলেন। এ যুগে ইসলামের বাণীই হচ্ছে হক। আর এটিই মানবতার প্রতি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে চূড়ান্ত রিসালাত।

যে রব ইবরাহীম, মূসা এবং ঈসা আলাইহিস সালামকে পাঠিয়েছিলেন, সে রবই সকল রাসুলদের শেষ রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রেরণ করেছেন। আর ইসলামী শরী‘আত এসেছে এর পূর্বে আগমনকারী সকল শরী‘আতকে রহিতকারী হিসেবে।

ইসলাম ছাড়া আজ যে সমস্ত ধর্ম মানুষ অনুসরণ করে, সেগুলো হয় মানবসৃষ্ট ধর্ম অথবা এমন ধর্ম যা মূলত ইলাহী ধর্ম ছিল; কিন্তু তা মানুষের হাতে বিকৃত হয়েছে। ফলে তাতে মিশ্রিত হয়েছে রাশি রাশি কুসংস্কার, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কল্প-কাহিনী এবং মানুষের বানানো বিষয়াদি।

মুসলিমদের ধর্ম একটি স্পষ্ট এবং অপরিবর্তনীয় ধর্ম। অনুরূপভাবে, একমাত্র আল্লাহ তা‘আলার জন্য নিবেদিত তাদের ইবাদাতের কাজগুলোও অভিন্ন। সুতরাং তারা সবাই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করে, সম্পদের যাকাত দেয় এবং রমযান মাসে সিয়াম পালন করে। তুমি তাদের সংবিধান নিয়ে চিন্তা করলে দেখবে, তাদের সংবিধান হচ্ছে: কুরআনুল কারীম। এটি পৃথিবীর সকল দেশে একই রকম কিতাব। মহান আল্লাহ বলেছেন: “আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম, আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম। অতঃপর কেউ পাপের দিকে না ঝুঁকে ক্ষুধার তাড়নায় বাধ্য হলে তবে নিশ্চয় আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” [সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ০৩]

কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “বলুন, ‘আমরা আল্লাহ্‌ ও আমাদের প্রতি যা নাযিল হয়েছে এবং ইব্‌রাহীম, ইসমা’ঈল, ইসহাক, ইয়া’কূব ও তাঁর বংশধরগণের প্রতি যা নাযিল হয়েছিল এবং যা মূসা, ‘ঈসা ও অন্যান্য নবীগণকে তাঁদের রবের পক্ষ থেকে প্রদান করা হয়েছিল তাতে ঈমান এনেছি; আমরা তাঁদের কারও মধ্যে কোনো তারতম্য করি না। আর আমরা তাঁরই কাছে আত্মসমর্পণকারী।’ আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত। [সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ৮৪-৮৫]।

সুতরাং ইসলাম ধর্ম হলো জীবনের একটি সামগ্রিক পদ্ধতি, যা সহজাত প্রকৃতি এবং যুক্তির সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। যাকে অবিকৃত আত্মা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করে থাকে। এটি মহান সৃষ্টিকর্তা তাঁর সৃষ্টিজগতের জন্য আইন হিসেবে প্রণয়ন করেছেন। এটি দুনিয়া ও আখিরাতে সকল মানুষের জন্য কল্যাণ ও সুখের ধর্ম। এটি একটি জাতিকে অন্য জাতি থেকে আলাদা করে না, এক রঙের লোককে অন্য রঙের লোকে থেকে পার্থক্য করে না; বরং এতে মানুষ পরস্পর সমান। ইসলামে কেউ তার ভালো কাজের পরিমাণ ব্যতীত কারো থেকে বেশী মর্যাদা পায় না।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: “মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, অবশ্যই আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব। আর অবশ্যই আমি তাদেরকে তারা যা করত তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেব “ [আন-নাহাল, আয়াত: ৯৭]

ইসলাম হচ্ছে সৌভাগ্যের পথ

ইসলাম হচ্ছে সমস্ত নবীগণের দ্বীন। এটি হচ্ছে সমগ্র মানুষের জন্য আল্লাহ তা‘আলার মনোনীত দ্বীন। এটি শুধু আরবদের ধর্ম নয়।

ইসলামই হচ্ছে দুনিয়াতে প্রকৃত সৌভাগ্য এবং আখিরাতে চিরস্থায়ী নি‘আমাতের পথ।

ইসলামই একমাত্র দ্বীন (ধর্ম), যা আত্মা ও শরীরের চাহিদা পূরণ করে এবং মানবিক সকল সমস্যার সমাধান করে। মহান আল্লাহ বলেছেন: “তিনি বললেন, ‘তোমরা উভয়ে একসাথে জান্নাত থেকে নেমে যাও। তোমরা পরস্পর পরস্পরের শত্রু। পরে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের নির্দেশ আসলে যে আমার প্রদর্শিত সৎপথের অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না ও দুঃখ-কষ্ট পাবে না। ‘আর যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ থাকবে, নিশ্চয় তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন জমায়েত করব অন্ধ অবস্থায়।” [সূরা ত্বহা, আয়াত: ১২৩-১২৪]।

একজন মুসলমান দুনিয়া ও আখিরাতে কী উপকার হাসিল করে?

ইসলামের অনেক উপকারিতা রয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো:

- আল্লাহ তা‘আলার বান্দা হয়ে পার্থিব জীবনে সফলতা ও সম্মান অর্জন ও সফল হওয়া। অন্যথায় মানুষ শয়তান ও কামনা-বাসনার গোলাম হয়ে যায়।

- পরকালে সফলতা। আর তা এভাবে যে, আল্লাহ বান্দাকে ক্ষমা করবেন, তার প্রতি সন্তুষ্টি হবেন এবং তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যেখানে সে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং চিরস্থায়ী নি‘আমাত লাভ করবে এবং সে জাহান্নামের শাস্তি থেকে রক্ষা পাবে।

- মুমিন ব্যক্তি কিয়ামাতের দিন নবী, সত্যবাদী, শহীদ এবং নেককারদের সাথে থাকবে। আর এমন সাহচর্য কতই না সুন্দর! পক্ষান্তরে যারা ঈমান আনবে না, তারা ত্বাগুত, দুষ্ট, অপরাধী ও বিশৃঙ্খলাকারীদের সাথে থাকবে।

- আল্লাহ যাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন তারা মৃত্যু, অসুস্থতা, বেদনা, বার্ধক্য বা চিন্তিত হওয়া ছাড়াই অনন্ত সুখে বসবাস করতে থাকবে। তারা যা চাইবে সে অনুযায়ী তাদের আকাঙ্ক্ষাসমূহ পূর্ণ করা হবে। আর যারা জাহান্নামে প্রবেশ করবে, তারা চিরস্থায়ী ও নিরবচ্ছিন্ন শাস্তি ভোগ করতে থাকবে; যা কখনো শেষ হবে না।

- জান্নাতে এমন আনন্দ রয়েছে, যা কোন চোখ দেখেনি, কোন কান শোনেনি এবং কোন মানুষের অন্তরে তা কল্পনাও করতে পারে না। এর একটি প্রমাণ হল আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, অবশ্যই আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব। আর অবশ্যই আমি তাদেরকে তারা যা করত তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেব।” [আন-নাহাল, আয়াত: ৯৭]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: “অতএব কেউই জানে না তাদের জন্য চোখ জুড়ানো কী লুকিয়ে রাখা হয়েছে তাদের কৃতকর্মের পুরস্কারস্বরূপ!” [আস-সাজদাহ, আয়াত: ১৭]

অমুসলিম কী হারায়?

- (ইসলাম না মানলে) মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞান ও শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হবে, তা হল আল্লাহ সংক্রান্ত জ্ঞান ও অনুধাবন। এছাড়াও সে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস হারাবে; যা এই দুনিয়াতে নিরাপত্তা ও প্রশান্তি দান করে এবং আখিরাতে (পরকালে) অনন্ত নি‘আমাত (সুখ) দান করে।

আল্লাহ মানবজাতির জন্য যে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ অবতীর্ণ করেছেন, এ মহৎ গ্রন্থের উপর বিশ্বাস করা ও এর অনুসরণ করা থেকে তারা বঞ্চিত হবে।

- তারা সম্মানিত নবীদের প্রতি ঈমান আনার সুযোগ হারাবে, অনুরূপভাবে তারা কিয়ামাতের দিনেও তাদের সঙ্গী হওয়ার সুযোগ হারাবে। বরং এর পরিবর্তে তারা জাহান্নামের আগুনে শয়তান, অপরাধী এবং তাগুতদের সঙ্গী হবে। আর তাদের আবাসস্থল ও সাহচর্য কতই না নিকৃষ্ট!

আল্লাহ তা‘আলা বলেন: 'বলুন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত তারাই যারা কিয়ামতের দিন নিজেদের ও নিজেদের পরিজনবর্গের ক্ষতিসাধন করে। জেনে রাখ, এটাই সুস্পষ্ট ক্ষতি।' তাদের জন্য থাকবে তাদের উপরের দিকে আগুনের আচ্ছাদন এবং নিচের দিকেও আচ্ছাদন। এ দ্বারা আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে সতর্ক করেন। হে আমার বান্দাগণ! তোমরা আমারই তাকওয়া অবলম্বন কর। [আয-যুমার, আয়াত: ১৫-১৬]

যে ব্যক্তি আখিরাতে নাজাত বা মুক্তি চায়, তার উপরে আবশ্যক হল, সে আল্লাহর অনুগত একজন মুসলিম হবে এবং আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ করবে।

নবী ও রাসূলদের (আলাইহিমুস সালাম) দ্বারা সর্বসম্মতভাবে স্বীকৃত একটি সত্য হল, আখেরাতে শুধু মুসলিমরাই মুক্তি পাবে, যারা আল্লাহ তা‘আলাকে বিশ্বাস করে, তাঁর সাথে ইবাদাতে কাউকে শরীক করে না এবং যারা সমস্ত নবী ও রাসূলদের উপর বিশ্বাস রাখে। প্রত্যেক রাসূল ও নবীর সকল মু’মিন অনুসারী যারা তাদেরকে সত্যায়ন করেছেন, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাবে।

সুতরাং যারা নবী মূসার সময়ে ছিলেন এবং তার প্রতি ঈমান এনেছিলেন এবং তার শিক্ষার অনুসরণ করেছিলেন তারাই নেককার মুমিন ও মুসলিম। কিন্তু আল্লাহ তা‘আলা ঈসা আলাইহিস সালামকে নবী হিসেবে পাঠানোর পরে মূসার অনুসারীদেরকে অবশ্যই ঈসাকে বিশ্বাস করতে হবে এবং তাকে অনুসরণ করতে হবে।

সুতরাং যারা ঈসার প্রতি ঈমান এনেছিল, তারা নেককার মুসলিম। আর যারা তার প্রতি ঈমান আনতে অস্বীকার করেছিল এবং বলেছিল যে, আমরা মূসার ধর্মের অনুসারী হিসেবেই থাকব, তারা মুমিন (ঈমানদার) নয়। কারণ তারা আল্লাহ তা‘আলার প্রেরিত একজন নবীর প্রতি ঈমান আনতে অস্বীকার করেছিল।

তারপর আল্লাহ তা‘আলার সর্বশেষ রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাঠানোর পর সকলের জন্য তার উপর ঈমান আনা আবশ্যক হয়ে গেল। সুতরাং যিনি মূসা ও ঈসা আলাইহিস সালামকে প্রেরণ করেছিলেন, তিনিই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শেষ রাসূল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। কাজেই যে ব্যক্তি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতকে অস্বীকার করবে আর বলবে যে, আমি মূসা অথবা ঈসা আলাইহিমাস সালামের অনুসারী হিসেবেই থাকবো, সে মুমিন নয়।

কোনো ব্যক্তির জন্য শুধু মুসলিমদেরকে সম্মান প্রদর্শনের দাবি করা যথেষ্ট নয়। তাছাড়া আখিরাতে তার নাজাতের জন্য দান-সদকা করা এবং দরিদ্রদের সাহায্য করাও যথেষ্ট নয়; বরং আল্লাহ তা‘আলা, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান আনা তার জন্য আবশ্যক। যাতে আল্লাহ তাঁর কাছ থেকে সেটি গ্রহণ করেন। সুতরাং আল্লাহ তা‘আলার সাথে শরীক করা, তাঁর সাথে কুফরী করা, তাঁর নাযিলকৃত অহী প্রত্যাখ্যান করা বা তাঁর শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুওয়াতকে অস্বীকার করার চেয়ে বড় কোন পাপ নেই।

সুতরাং ইয়াহুদী, খ্রিষ্টান এবং অন্যান্য যারা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের নবুয়ত প্রাপ্তির কথা শুনে তার উপরে ঈমান আনার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ইসলাম ধর্মে প্রবেশ করতে অস্বীকার করেছে, তারা অচিরেই জাহান্নামের আগুনে প্রবেশ করবে এবং সেখানে তারা স্থায়ীভাবে থাকবে। আর এটা আল্লাহ তা‘আলার বিধান; কোন মানুষের বিধান নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন: “নিশ্চয় কিতাবীদের মধ্যে যারা কুফরি করেছে তারা এবং মুশরিকরা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে; তারাই সৃষ্টির অধম।” [আল-বাইয়িনাহ, আয়াত: ০৬]

যেহেতু আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য শেষ নবুয়তী বাণী অবতীর্ণ হয়েছে, তাই প্রত্যেক ব্যক্তির উপর আবশ্যক যারা ইসলাম এবং সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রিসালাতের কথা শুনবে, তারা তার প্রতি ঈমান আনবে, তার শরী‘আত অনুসরণ করবে এবং তার আদেশ ও নিষেধের আনুগত্য করবে। অতএব, যে ব্যক্তি এই শেষ নবুয়তী বাণী শুনার পরও তা প্রত্যাখ্যান করবে, মহান আল্লাহ তার কাছ থেকে কিছুই গ্রহণ করবেন না এবং আখিরাতে তাকে শাস্তি দেবেন।

এ কথার দলীল হচ্ছে আল্লাহ তা‘আলার বাণী: “আর কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো তার পক্ষ থেকে কবুল করা হবে না এবং সে হবে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [আলে ইমরান, আয়াত : ৮৫]

আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন: “আপনি বলুন। ‘হে আহ্‌লে কিতাবগণ! এস সে কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা একমাত্র আল্লাহ্‌ ছাড়া কারো ইবাদাত না করি, তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক না করি এবং আমাদের কেউ আল্লাহ্‌ ছাড়া একে অন্যকে রব হিসেবে গ্রহণ না করি। ’ তারপর যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তাহলে তোমরা বল, তোমরা সাক্ষী থাক যে, নিশ্চয় আমরা মুসলিম।” [আলে ইমরান, আয়াত: ৬৪]

মুসলিমের উপর কী আবশ্যক?

একজন মুসলিমের জন্য এই ছয়টি রুকনের উপরে ঈমান আনা আবশ্যক:

সৃষ্টিকর্তা (الخالق ), রিযিকদাতা (الرازق), পরিচালনাকারী (المدبر) এবং মালিক (المالك) হিসাবে আল্লাহ তা‘আলার প্রতি বিশ্বাস রাখা। তাঁর মত কিছুই নেই এবং তাঁর কোন স্ত্রী বা সন্তানও নেই। তিনিই একমাত্র ইবাদাত পাওয়ার যোগ্য, এবং তাঁর সাথে কারো ইবাদাত করা যাবে না। এছাড়াও এ দৃঢ় বিশ্বাস রাখা যে, তাঁকে ছাড়া অন্য যা কিছুর ইবাদাত করা করা হয়, তা বাতিল।

ফিরিশতাদের প্রতি ঈমান রাখা এই হিসেবে যে, তারা আল্লাহর দাস, যাদেরকে তিনি নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তাদের উপর যে কাজসমূহ অর্পণ করেছেন, তার মধ্যে রয়েছে: তারা আল্লাহর নবীদের কাছে অহী নিয়ে অবতরণ করেন।

আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক তাঁর নবীদের প্রতি অবতীর্ণ সমস্ত কিতাব (যেমন: তাওরাত এবং ইঞ্জিল তাদের বিকৃতির আগে) এবং সর্বশেষ কিতাব আল- কুরআনুল কারীমের উপর বিশ্বাস করা।

সকল নবীদের প্রতি ঈমান রাখা। যেমন নূহ, ইবরাহীম, মূসা, ঈসা এবং শেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তারা সকলেই মানুষ ছিলেন, তাদেরকে অহী দ্বারা সাহায্য করা হয়েছিল এবং তাদেরকে দেওয়া হয়েছিল এমন নিদর্শন এবং মু‘জিযাসমূহ যা তাদের সত্যতা প্রমাণ করে।

আখিরাত দিবসে বিশ্বাস করা। যখন আল্লাহ তা‘আলা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকল মানুষকে পুনরুত্থিত করবেন এবং তাঁর সৃষ্টি জগতের মধ্যে বিচার-ফয়সালা করবেন। তিনি মুমিনদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন এবং কাফিরদেরকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।

তাকদীর এর উপরে বিশ্বাস করা। অতীতে যা কিছু ঘটেছে এবং ভবিষ্যতে যা ঘটবে, তার সবই আল্লাহ জানেন। সেগুলো আল্লাহর জ্ঞানে ছিল, তিনি তা লিখে রেখেছেন এবং ইচ্ছা করেছেন ও সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।

এবং আল্লাহ যে ইবাদতসমূহ শরীয়তসিদ্ধ করেছেন—সালাত, যাকাত ও সিয়াম—সেগুলোর মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করবেন, এবং সামর্থ্য থাকলে হজ করবেন। এরপর আপনার উপর আবশ্যক হলো আপনার দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করা, যা দুনিয়ায় আপনার সুখের উৎস এবং আখিরাতে আপনার নাজাতের মাধ্যম।