إعداد خطيب ماهر
রহীম-রহমান আল্লাহর নামে শুরু করছি নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য চাই এবং তাঁর কাছেই ইস্তেগফার করি। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের নফসের অনিষ্টসমূহ এবং আমাদের কর্মের অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহ তা‘আলা যাকে হেদায়াত দান করেন, তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে পথ প্রদর্শনকারীও কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তার ওপর, তার পরিবার ও সকল সাহাবীর ওপর এবং যারা তাদের ইহসানের সঙ্গে অনুসরণ করবে তাদের…
This PDF is generated automatically from the book's text; its layout may differ from the printed edition.
রহীম-রহমান আল্লাহর নামে শুরু করছি
নিশ্চয়ই সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য। আমরা তাঁর প্রশংসা করি, তাঁর কাছে সাহায্য চাই এবং তাঁর কাছেই ইস্তেগফার করি। আমরা আল্লাহর কাছে আমাদের নফসের অনিষ্টসমূহ এবং আমাদের কর্মের অকল্যাণ থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করি। আল্লাহ তা‘আলা যাকে হেদায়াত দান করেন, তাকে পথভ্রষ্টকারী কেউ নেই আর তিনি যাকে পথভ্রষ্ট করেন, তাকে পথ প্রদর্শনকারীও কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোনো ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মাদ তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তার ওপর, তার পরিবার ও সকল সাহাবীর ওপর এবং যারা তাদের ইহসানের সঙ্গে অনুসরণ করবে তাদের সবার ওপর অসংখ্য সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
অতঃপর, মানুষ যেহেতু সর্বদা এমন বিষয়ের মুখাপেক্ষী, যার মাধ্যমে তাদের অবস্থা সংশোধিত ও সুশৃঙ্খল হয়, তাই শরিয়তও তাদের এ প্রয়োজন পূরণে উপযোগী বিধি-বিধান নিয়ে এসেছে। এর অন্তর্ভুক্ত হলো জুমার খুতবা-সংক্রান্ত বিষয়াবলি। এ কারণে জুমার খতিবের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মহান। আর এ গুরুত্বের কারণেই আমরা “المختصر المفيد للمؤذن والإمام والخطيب وأحكام المساجد” (মুয়াজ্জিন, ইমাম, খতিব ও মসজিদ-সংক্রান্ত বিধিবিধানের সংক্ষিপ্ত ও উপকারী গ্রন্থ) [১] শিরোনামে একটি গ্রন্থ প্রণয়ন এবং তা বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদের উদ্যোগ নিয়েছি। গ্রন্থটিতে বেশ কয়েকটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: - https://islamcontent.com/ar/single-content/74839.
জুমু‘আর সালাত, এর পরিচিতি, সময় এবং মুকাল্লাফের (শরী‘আতের বিধান যার ওপর প্রযোজ্য) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু বিধান; অনুরূপভাবে জুমু‘আর খুতবা, এর হুকুম, শর্তাবলি, রুকনসমূহ, সুন্নাতসমূহ ও খুতবার অনুবাদ। এতে আরও আলোচিত হয়েছে খতীবের মধ্যে থাকা প্রয়োজনীয় ইলমী ও চারিত্রিক যোগ্যতাসমূহ, খুতবা ও খতীবের আদব, খুতবার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য এবং খুতবা প্রস্তুতের পদ্ধতি।
বিষয়টি যেহেতু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, তাই পূর্ববর্তী গ্রন্থটির সম্প্রসারণ ও পরিপূরক হিসেবে (إعداد خطيب ماهر) ‘দক্ষ খতিব প্রস্তুতি’ নামে এই দ্বিতীয় গ্রন্থটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমাদের আমলকে নেক আমল করেন, একমাত্র তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য একনিষ্ঠ করেন এবং তাতে বরকত দান করেন। আর আল্লাহই সর্বাধিক জ্ঞানী। আমাদের নবী মুহাম্মাদ ﷺ-এর প্রতি আল্লাহর সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক।
(খুতবার গুরুত্ব)
জুমার খুতবার মিম্বর: মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তারের অন্যতম শক্তিশালী—বরং সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী—মাধ্যম, যদি সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়। কেননা, খতিব প্রতি সপ্তাহে একবার করে, কম-বেশি বহু বছর ধরে মানুষের উদ্দেশে বক্তব্য রাখেন। এ সময় তারা তাঁর প্রতি নিজেদের মনোযোগ নিবদ্ধ করে এবং তাঁর কথা গ্রহণের জন্য নিজেদের অন্তর উন্মুক্ত করে দেয়। খুতবার সময় তারা এমনকি কঙ্কর নিয়ে নাড়াচাড়াও করে না। বরং তারা তাঁর কাছ থেকে বারবার ও ধারাবাহিকভাবে উপদেশ, নসিহত, শিক্ষা ও শিক্ষণীয় বিষয় আগ্রহভরে গ্রহণ করতে থাকে।
আর সফল ও তাওফীকপ্রাপ্ত সেই খতিব, যাকে আল্লাহ তাআলা প্রভাবশালী বক্তব্যশৈলী এবং শক্তিশালী বর্ণনাভঙ্গি দান করেছেন—তিনি নিঃসন্দেহে মানুষের ওপর গভীর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবেন। অনেক সময় তাঁর প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপর একজন শিক্ষকের প্রভাবের চেয়েও বেশি ও শক্তিশালী হতে পারে; এমনকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাবের চেয়েও তা অধিক প্রবল হতে পারে। এর কারণ হলো, খুতবা একটি মহান ইবাদত—সালাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। তাছাড়া সুবক্তা, কল্যাণকামী ও বাগ্মী খতিব সরাসরি মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে তাদের উদ্দেশে কথা বলেন। তারা তাঁর মুখের অভিব্যক্তি ও চোখের দৃষ্টি প্রত্যক্ষ করে। ফলে তিনি শ্রবণ ও দৃষ্টির মাধ্যমে তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করেন, তাদের হৃদয় ও বুদ্ধিকে স্পর্শ করেন। খুতবার পুরো সময় তারা তাঁর বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শ্রবণ করে। তিনি তাদের সামনে যুক্তিনির্ভর ও শরিয়তসম্মত দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করেন, যার মাধ্যমে তিনি—আল্লাহর অনুমতিক্রমে—তাদের বোঝাতে এবং তাদের ভুল ধারণাগুলো সংশোধন করতে সক্ষম হন।
সফল ও তাওফিকপ্রাপ্ত খতিব হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি মিম্বরকে কল্যাণ ও ইলম প্রচারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং শুধু মিম্বরের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কল্যাণ ও সৎকর্মের প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁর অংশগ্রহণ ও অবদান রয়েছে। যেখানেই কল্যাণ রয়েছে, আপনি তাকে এর অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে পাবেন, আর যেখানেই আল্লাহর জন্য ত্যাগের প্রয়োজন রয়েছে, আপনি তাকে এর অন্যতম সৈনিক হিসেবে পাবেন।
সুতরাং এই খতীব: তিনিই হলেন এমন ব্যক্তি যিনি আল্লাহর দিকে দাওয়াত এবং মুসলিমদের কল্যাণের প্রতি যত্নবান হন —যেমনটি ছিলেন নবী ও রাসূলগণ (আলাইহিমুস সালাতু ওয়াস সালাম) এবং ইসলামী উম্মাহর প্রতি একনিষ্ঠ আলেম ও দায়ীগণ— যিনি তার শ্রোতাদের মাঝে নতুনত্ব, আকর্ষণ ও উদ্দীপনা সৃষ্টিতে সচেষ্ট থাকেন।
এখানে অনেক এমন খতিব রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে একজন খতিবের প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও গুণাবলি বিদ্যমান; কিন্তু তাঁদের খুতবা থেকে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জিত হয়নি—যেভাবে একজন খতিবের কাছ থেকে প্রত্যাশা করা হয়, যিনি সততা ও নিষ্ঠার সাথে দ্বীনের বার্তা বহন করেন।
আর প্রত্যেক জুমু‘আয় তাদের সামনে এমন বিষয় উপস্থাপন করেন, যা তাদের অনুভূতি ও প্রয়োজনকে স্পর্শ করে এবং তাদের হৃদয়কে আকৃষ্ট করে। আর এক বছরে তিনি তাদের সাথে পঞ্চাশ বার সাক্ষাৎ করেন। তাহলে এ মাধ্যমের চেয়ে অধিক প্রভাবশালী আর কোনো মাধ্যম আছে কি?
কাজেই এতে আশ্চর্যের কিছু নেই যে, জুম‘আর খুতবা ইসলামের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এবং আল্লাহর দিকে দাওয়াত, তাঁর শরী‘আতের প্রচার ও তাঁর বান্দাদের ওপর হুজ্জত কায়েম করার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এটি এমন এক বিষয় যা ইসলামের শত্রুরাও কামনা করে যে, তাদের ধর্মেও এর সমতুল্য কিছু থাকুক। এমনকি ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত দলগুলোর জনৈক নেতা বলেছে: “আহ! আমার কাছে যদি এসব মিম্বারের মতো কিছু থাকত?!”
«ইলম ও প্রায়োগিক বিদ্যাসমূহ ঠিক ততটুকুই মর্যাদাপূর্ণ, যতটুকু মর্যাদাপূর্ণ তাদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য। আর খুতবা বা ভাষণের রয়েছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি উদ্দেশ্য; তা হলো মানুষকে সত্যের পথনির্দেশ দেওয়া এবং এই জীবন ও সেই পরকালীন জীবনে যা তাদের উপকারে আসবে, তার প্রতি তাদেরকে উৎসাহিত করা।
আর বক্তৃতাশিল্প নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গণ্য হয়।
অতএব খুতবা প্রদানের রয়েছে মহান মর্যাদা, আর এর মর্যাদা এতেই যে, এর দায়িত্ব পালনকারীকে বিচক্ষণ, জ্ঞানী ও বাগ্মী হতে হবে» ([2])। - "আল-খাতাবাহ ‘ইনদাল ‘আরাব", লেখক: মুহাম্মাদ আল-খিদর হুসাইন: ১৭৮-১৭৯।
হে আমার খতীব ভাই! শরী‘আতপ্রণেতা মুসল্লির ওপর ওয়াজিব করেছেন যে, আপনার খুতবার সময় সে যেন মনোযোগসহকারে নীরবে শ্রবণ করে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: “জুম‘আর দিন ইমামের খুতবা প্রদানকালে যদি তুমি তোমার সাথীকে বলো: ‘চুপ করো’ তাহলে তুমি অনর্থক কাজ করলে।” মুত্তাফাকুন ‘আলাইহি ([৩]) ‘লাগাওতা’ (তুমি অনর্থক কাজ করলে)-এর অর্থ হলো: তুমি জুম‘আহর সাওয়াব লাভ করবে না। - বুখারী: ৯৩৪; মুসলিম: ৮৫১।
বরং, মানুষের জন্য সুন্নাত হলো তারা আপনার দিকে তাদের চেহারা ফেরাবে। ইমাম নববী, ইবনুল মুনযির এবং ইবনু আবদুল বার্র —তাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হোক— এটি মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে ইজমা বর্ণনা করেছেন ([4])। - "আল-মাজমূ‘": ৪/৪৪৭।
(রহমানের ফিরিশতাগণ মনোযোগের সাথে আপনার কথা শুনেন, অতএব, আপনি তাদের যথাযথ মর্যাদা দিন।)
হে জুম‘আর খতিব! আপনার জন্য এই সম্মান ও গৌরবই যথেষ্ট যে, রহমানের ফিরিশতারা আপনার খুতবা ও নসিহত শোনার জন্য আপনার নিকট উপস্থিত হন। সহীহাইনে ([৫]) যেমনটি এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন: "যখন জুমু'আর দিন হয় তখন মসজিদের প্রত্যেক দরজায় ফিরিশতাগণ অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁরা সালাতে আগমনকারীদের নাম যথাক্রমে লিখতে থাকেন। তারপর ইমাম যখন খুৎবার জন্য মিম্বরে বসে পড়েন তখন তাঁরা তাদের ফাইল গুটিয়ে নেন এবং খুৎবা শুনার জন্য মনোনিবেশ করেন।" - সহীহ বুখারী, হাদীস (৩২১১); সহীহ মুসলিম, হাদীস (৮৫০)।
আর যখন আপনি এটি অনুভব করবেন: আপনার অন্তরে খুতবার মর্যাদা অপরিসীম হবে এবং সত্য কথা বলা, আমানত আদায় করা ও মানুষকে নসীহত করার প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে, আর তাদের পরোয়া করা ও তোষামোদ করা থেকে আপনি বিরত থাকবেন।
সুতরাং আপনার মতো আর কে আছে - হে বরকতময় খতীব -?
আল্লাহ মানুষের উপর আপনার কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং আপনার কথার সময় চুপ থাকা অপরিহার্য করেছেন; এমনকি আপনার কথা চলাকালীন তিনি তাদেরকে পাথরকুচি নাড়াচাড়ার মতো কাজেও ব্যস্ত হতে এবং অন্যায় কাজে বাধা দিতে নিষেধ করেছেন। আর তিনি তাঁর ফেরেশতাদেরকেও আপনার কথার শ্রবণকারী বানিয়েছেন!
আর এটি আপনার ওপর অপরিহার্য করে দেয় যে, আপনি আল্লাহ তা‘আলার জন্য একনিষ্ঠ হবেন এবং আপনার খুতবাহ ও নসীহতসমূহে সর্বোচ্চ কল্যাণকামিতা প্রদর্শন করবেন। আর আপনার খুতবাহর উদ্দেশ্য হবে আল্লাহ তা‘আলার স্মরণ, মানুষকে নসীহত করা, তাদের দ্বীনের বিষয়াদি সম্পর্কে তাদেরকে সচেতন করা এবং তাদের দুনিয়াবী জীবনে যা তাদের সংশোধন ও কল্যাণ সাধন করবে সে বিষয়ে দিক-নির্দেশনা প্রদান করা।
***
(কোনটি উত্তম: তাৎক্ষণিকভাবে খুতবা দেওয়া, নাকি কাগজ দেখে খুতবা পাঠ করা?)
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, খতীবের কাগজ দেখে পাঠ করার মাঝে অনেক ফায়দা রয়েছে এবং উপস্থিত বলার চেয়ে অনেক খতীব ও বক্তার জন্য তা আরও বেশি উপযোগী হতে পারে। আর এটি একটি দৃশ্যমান ও বাস্তব বিষয়।
তাৎক্ষণিকভাবে বক্তব্য উপস্থাপন করার ফলে খতীবের সক্রিয় সম্পৃক্ততা ও উদ্দীপনা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। আর এর প্রভাব নিঃসন্দেহে শ্রোতাদের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়—তাঁরা অধিক প্রভাবিত, উৎসাহিত ও আবেগাপ্লুত হন। পক্ষান্তরে, এর বিপরীত অবস্থায় ফলও বিপরীত হয়ে থাকে।
আর এ কথা সর্বজনবিদিত যে, কোনো বিষয় গ্রহণের ক্ষেত্রে শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তি যখন একসঙ্গে সক্রিয় থাকে, তখন শুধু একটি ইন্দ্রিয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করার তুলনায় তা অনুধাবন, প্রভাবিত হওয়া এবং তথ্যের মনে গভীরভাবে গেঁথে যাওয়ার ক্ষেত্রে অধিক কার্যকর হয়। সুতরাং যে খতীব স্বতঃস্ফূর্তভাবে খুতবা দেন, মানুষের মুখোমুখি হন এবং চোখে চোখ রেখে তাদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁর বক্তব্যের প্রভাব সেই খতীবের তুলনায় অধিক হয়, যিনি কাগজ দেখে খুতবা দেন এবং যাঁর কাছ থেকে মানুষ কেবল শ্রবণের মাধ্যমেই বক্তব্য গ্রহণ করে। এমনকি এভাবে শুধু শ্রবণের মাধ্যমে গ্রহণ করাও সেই মাত্রায় কার্যকর হয় না, যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে খুতবা প্রদানকারী খতীবের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে; কারণ তাঁর কণ্ঠস্বর অধিক শক্তিশালী এবং তাতে পারস্পরিক ভাববিনিময় ও প্রাণবন্ততা বেশি প্রকাশ পায়।
আর যে ব্যক্তি বারবার উপস্থিত বক্তৃতা দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং দেখেছে যে, উপস্থিত বক্তৃতার সময় তার মধ্যে প্রচুর দ্বিধা, জড়তা, তোতলামি, ভুলে যাওয়া, ভয় কিংবা তীব্র মানসিক চাপ দেখা দেয়; অথচ দিন অতিবাহিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এবং বারবার উপস্থিত বক্তৃতার অনুশীলন করার পরও এসব সমস্যা কমছে না, সে যেন লিখিত খুতবা দেখে পাঠ করে। কারণ, সবাই উপস্থিত বক্তৃতা দেওয়ার তাওফিক লাভ করে না। আল্লাহ তাআলা যেমন মানুষের মধ্যে বস্তুগত রিযিক বণ্টন করেছেন, তেমনি তাদের মধ্যে অবস্তুগত রিযিকও বণ্টন করেছেন—যেমন উত্তম চরিত্র, যোগ্যতা, প্রতিভা ও মনোবল।
(খুতবা ও বক্তৃতায় সফলতার পথকে সহজ ও সুগম করার আটটি পদক্ষেপ)
প্রথমত: এ ব্যাপারে সাহায্য চেয়ে আন্তরিক দু‘আ করা এবং ইখলাস ও কাকুতি-মিনতির সাথে আল্লাহ তা‘আলার শরণাপন্ন হওয়া।
দ্বিতীয়ত: এ বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলার উপর সত্যিকার তাওয়াক্কুল করা এবং তাঁর উপর উত্তমরূপে নির্ভর করা। আর বান্দা আল্লাহর সম্পর্কে যেমন ধারণা পোষণ করে, তিনি তার সাথে তেমনই আচরণ করেন। আর যে ব্যক্তি তাঁর উপর তাওয়াক্কুল করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট এবং তার যাবতীয় চিন্তা ও চাওয়ার ক্ষেত্রে তিনিই তার জন্য যথেষ্ট হয়ে যান।
তৃতীয়ত: বিশিষ্ট খতিবদের বক্তব্য শোনা এবং তাদের অভিজ্ঞতা থেকে উপকৃত হওয়া।
চতুর্থত: একাকী খুতবা প্রদান করা; আর তা যদি মসজিদে অভ্যন্তরীণ মাইকের মাধ্যমে হয়, তবে তা উত্তম। আর যদি তা মিম্বারের উপর হয়, তবে তা আরও বেশি উত্তম।
পঞ্চমত: অনুভূতি প্রকাশ এবং আবেগ সুদৃঢ় করার অনুশীলন করা।
বক্তৃতা, উপস্থাপনা ও প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে যাঁরা অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছেন, তাঁদের সাফল্যের গভীরতম রহস্য নিয়ে আমি চিন্তা-ভাবনা করেছি। তখন আমার কাছে প্রতীয়মান হয়েছে যে, আল্লাহর তাওফীকের পর তাঁদের সাফল্যের প্রধান রহস্য ও কারণ হলো—তাঁদের প্রবল আবেগ এবং নিজেদের অনুভূতিগুলোকে সংক্ষেপে নয়, বরং বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করার সক্ষমতা; আর তা সবই শরী‘আতের নির্ধারিত সীমারেখার মধ্যে।
কেননা আবেগের শক্তি বাগ্মীকে তা ব্যক্ত ও প্রকাশ করতে এবং প্রজ্ঞাবানকে তার প্রজ্ঞা প্রকাশ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে এর জাদুকরী প্রভাবে হৃদয়গুলো আকৃষ্ট হয় এবং এর সৌন্দর্য ও নৈপুণ্যে বুদ্ধিগুলো মুগ্ধ ও বশীভূত হয়। আর যার আবেগ দুর্বল, তার আবেগের মৃত্যু হলে তার বহু জ্ঞানও নিষ্প্রভ হয়ে যায়; আর তার অনুভূতির মৃত্যু হলে মানুষের ওপর তার প্রভাবও বিলীন হয়ে যায়।
"কাজেই খতীবের জন্য আবশ্যক হলো: তিনি যে বিষয়ের দিকে আহ্বান করছেন তাতে প্রবল উদ্দীপনায় পরিপূর্ণ থাকা এবং এর সত্যতার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা; কেননা যা অন্তর থেকে নির্গত হয়, তা অন্তরেই প্রবেশ করে। তাই খতীবের উদ্দীপনা অবশ্যই তার শ্রোতাদের উদ্দীপনার চেয়ে অধিক প্রবল হতে হবে; যাতে তা তাদের মাঝে সঞ্চারিত হয় এবং তাদের তৃষ্ণা নিবারণ করে। অন্যথায় তারা তার মানসিক নিস্তেজতা অনুভব করবে, ফলে তার বক্তব্যের প্রভাব হারিয়ে যাবে।"
এ জন্য বেশি বেশি অনুশীলন করা অপরিহার্য—নিজের চিন্তা ও অনুভূতিগুলো লিখে রাখা, সেগুলো একান্তে নিজে নিজে বলা, অতঃপর কোনো প্রিয়জনের কাছে তা প্রকাশ করার মাধ্যমে।
আর আবেগ-অনুভূতিকে যখনই অবরুদ্ধ ও বন্দি করে রাখা হয়, তখনই তা শুকিয়ে যায় ও নিঃশেষ হয়ে যায়। পক্ষান্তরে, যখনই তা মুক্ত থাকে—তবে শর্ত হলো, তা যেন শরিয়তসম্মত নীতিমালার অধীন থাকে—তখনই তা উৎসারিত ও প্রবাহিত হয়। ফলে তা লেখালেখি ও গ্রন্থরচনার মাধ্যমে কাগজকে, বক্তৃতা ও বয়ানের মাধ্যমে মিম্বরকে এবং ভালোবাসা ও স্নেহ-মমতার মাধ্যমে মানুষকে সিক্ত করে।
তাই, হে আমার খতিব ভাই! আপনার আবেগ-অনুভূতিকে মুক্ত করে দিন; যাতে আপনার নিজের মধ্যে এবং অন্যদের মধ্যেও জীবনের প্রাণশক্তি, সৃজনশীলতা, জাগরণ, বিকাশ ও মমতার চেতনা সজীব হয়ে ওঠে।
সুতরাং যার অনুভূতি মহৎ হয়: তার আখলাক উত্তম হয়, তার আত্মা সম্ভ্রান্ত হয়, তার প্রিয়জনের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়, তার শত্রু হ্রাস পায়, তার যুক্তি সুস্পষ্ট হয়, তার বাগ্মিতা শক্তিশালী হয় এবং তার বাকপটুতা বৃদ্ধি পায়।
ষষ্ঠত: এমন সত্যবাদী, বুদ্ধিমান, অভিজ্ঞ ও হিতাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তির নিকট নসীহত চাওয়া, যিনি তাকে তার দোষ-ত্রুটিগুলো দেখিয়ে দেবেন যাতে সে সেগুলো থেকে দূরে থাকতে পারে এবং তার উত্তম গুণাবলিগুলোও দেখিয়ে দেবেন যাতে সে সেগুলোর ওপর অবিচল থাকতে পারে এবং তা আরও বৃদ্ধি হয়।
সপ্তমত: আগেভাগে খুতবা প্রস্তুত করা।
অষ্টমত: খুতবা প্রস্তুতকরন ও উপস্থাপন পদ্ধতি সম্পর্কিত বইসমূহ অধ্যয়ন করা ([৬])। - দেখুন: মুয়াজ্জিন, ইমাম, খতিব ও মসজিদ-সংক্রান্ত বিধিবিধানের সংক্ষিপ্ত ও উপকারী গ্রন্থ: ৯৫, https://islamcontent.com/ar/single-content/74839.
(খুতবা প্রদানের শুরুতে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা একটি পরিচিত ও স্বাভাবিক বিষয়।)
খুতবা প্রদানের প্রথম দিকে আপনি উদ্বেগ ও ভয় অনুভব করবেন, আর এটি সকল মানুষের স্বভাবজাত বিষয়। হয়তো আপনার এমন অনুভূতি হতে পারে যে, এটি আপনার প্রতি মানুষের দৃষ্টিপাত এবং আপনার জ্ঞানগত দুর্বলতা সম্পর্কে আপনার ধারণার প্রভাব।
আপনার উদ্বেগ আরও বেড়ে যেতে পারে আপনার এই অনুভূতির কারণে যে, লোকেরা এটি বুঝতে পারছে এবং খতিবের নিকট হতে তা অপছন্দ করছে। আর এটিই আপনার থেকে তাদের দূরে সরে যাওয়ার কারণ হতে পারে।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আল্লাহর সাথে আপনার গভীর সম্পৃক্ততা, তাঁর ওপর তাওয়াক্কুল, একনিষ্ঠ দু‘আ এবং দীর্ঘ অনুশীলনের ফলে ভয় পুরোপুরি দূর হয়ে যাবে; এমনকি আপনি খুতবায় আনন্দ উপভোগ করার পর্যায়ে পৌঁছে যাবেন এবং খুতবা প্রদানের স্বাদ আস্বাদন করার জন্য জুমু‘আর দিনের অপেক্ষায় থাকবেন।
সুতরাং প্রয়োজন কেবল ধৈর্য ধারণ করে থাকা—যতক্ষণ না মানুষের জন্য তাওফীকের ভাণ্ডারসমূহ এবং মহামহিম মহাদাতা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার অনুগ্রহের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত হয়ে যায়।
সুতরাং শুরুতে কঠোর প্রচেষ্টার সংকীর্ণতা সহ্য করতে হবে, যাতে পরিণামে পরম সুখ, মর্যাদা ও সৌভাগ্যের প্রশস্ততা লাভ করা যায়।
আর আপনি মনে মনে বলবেন: কষ্টের পর স্বস্তি এবং সংকটের অবসান অবশ্যই রয়েছে, আর ক্লান্তির পর প্রশান্তিই রয়েছে। এ তো কেবল এক মুহূর্তের ধৈর্য। অতএব আপনি ধৈর্যধারণ করুন এবং ধৈর্যে অটল থাকুন, যাতে আপনি মিম্বরসমূহে উঠতে পারেন এবং আল্লাহর দিকে দাওয়াতের বাণী প্রকাশ্যে প্রচার করতে পারেন। কথায় আল্লাহর চেয়ে অধিক সত্যবাদী আর কেউ নেই, আল্লাহ সত্যই বলেছেন: “আর যারা আমাদের পথে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, অবশ্যই আমরা তাদেরকে আমাদের পথে পরিচালিত করবো।” [আল-আনকাবূত: ৬৯]।
কাতাদাহ রহিমাহুল্লাহ কতই না সুন্দর বলেছেন: «হে আদমসন্তান! যদি তুমি কেবল তখনই কল্যাণকর কাজে আত্মনিয়োগ করতে চাও, যখন তোমার মধ্যে উদ্যম ও উৎসাহ থাকবে, তবে জেনে রাখো—তোমার নফস স্বভাবতই ক্লান্তি, অবসাদ ও একঘেয়েমির দিকে ঝোঁকপ্রবণ। কিন্তু প্রকৃত মুমিন সে-ই, যে নিজেকে কষ্ট সহ্য করিয়ে হলেও সৎকর্মে অবিচল থাকে; প্রকৃত মুমিন সে-ই, যে নিজের শক্তি সঞ্চয় করে এগিয়ে চলে; আর প্রকৃত মুমিন সে-ই, যে দৃঢ়তা, অধ্যবসায় ও অটল সংকল্পের সঙ্গে আমলের পথে অবিচল থাকে।» ([7])। আর 'মুতাশাদ্দিদ' বলতে উদ্দেশ্য হলো: অর্থাৎ নেক আমলসমূহ আদায়ে যত্নশীল থাকা এবং তার ওপর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে নিজেকে বাধ্য করা। - "তাফসীরুল কুরতুবী": (১/২৫১)। আর কাতাদাহ রহিমাহুল্লাহ-এর আছারটি বর্ণনা করেছেন আবুল কাসিম ইবনু বিশরান আল-বাগদাদী (মৃত্যু: ৪৩০ হি.), তাঁর "আমালী" গ্রন্থে: (১৪৫৪)।
(বক্তৃতা প্রদানের অতিরিক্ত ভয় থেকে মুক্তির উপায়সমূহ)
ভয়- বিশেষ করে শুরুতে-: পূর্বে যেমনটি বলা হয়েছে, এটি অত্যন্ত পরিচিত ও স্বাভাবিক একটি বিষয়; বরং এটি ইতিবাচক, যা খুতবার প্রতি যত্নবান হতে এবং এর প্রস্তুতি গ্রহণে সাহায্য করে। আর এটি নিজের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের লাগাম টেনে ধরে, যা মানুষকে অবমূল্যায়ন করার এবং ইলমি বিষয়বস্তুর মান, উপযুক্ত শব্দ ও অর্থ চয়নের প্রতি অবহেলা সৃষ্টির দিকে পরিচালিত করে।
কিন্তু প্রত্যেক খুতবায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভয় অব্যাহত থাকা একটি নেতিবাচক বিষয়—আধুনিক যুগে যাকে সামাজিক ভীতি বলা হয়—: তা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার উপায় অবলম্বন করা আবশ্যক, আর এর মধ্যে কতিপয় হলো:
প্রথমত: আল্লাহ তা‘আলার প্রতি ইখলাস, আল্লাহ তা‘আলার শরণাপন্ন হওয়া এবং বেশি বেশি দুআ করা, যেন তিনি আপনাকে প্রশান্তি দান করেন এবং আপনার অন্তরে সাকিনাহ অবতীর্ণ করেন।
দ্বিতীয়ত: খুতবার পূর্বে পুদিনা বা এ জাতীয় কিছু প্রশান্তিদায়ক পানীয় পান করা, কারণ উদ্বেগ ও ভয় প্রশমিত করতে এর প্রভাব রয়েছে।
তৃতীয়ত: সমালোচনা শোনায় নিজেকে অভ্যস্ত করা এবং তাতে আনন্দিত হওয়া; যাতে তা অগ্রগতি ও সৃজনশীলতার সোপান হতে পারে এবং ভুলের ভয় না করা।
চতুর্থত: আগেভাগে উপস্থিত হওয়া। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, যে খতীব সময়মতো পৌঁছানোর জন্য তাড়াহুড়ো করে আসেন, তাঁর মন অস্থির হয়ে ওঠে, অন্তর বিচলিত হয় এবং তাঁকে এমন উদ্বেগ ও মানসিক চাপ গ্রাস করে, যা খুতবা চলাকালীনও তাঁর সঙ্গে অব্যাহত থাকে।
পঞ্চমত: মানুষকে দেখার জন্য মাথা উঁচু করুন এবং মাঝে মাঝে না দেখেই কথা বলুন। যদিও শুরুতে আপনার কাছে তা কঠিন মনে হয় এবং ভুল ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা দেয়; তবুও কাগজে যা আছে তার বাইরে না যাওয়ার অভ্যাস বজায় রাখা এবং সাহসের সাথে শ্রোতাদের দিকে না তাকানো আপনার কথার প্রতি শ্রোতাদের আগ্রহ নষ্ট করে দেয় এবং আপনাকে মিম্বারের ভয়-ভীতির মাঝেই আবদ্ধ রাখে।
এমন কিছু খতীব, যাদের খুতবা প্রদানের বহু বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে, কিন্তু তারা কাগজে লিখিত বক্তব্যের বাইরে যান না এবং শ্রোতাদের দিকে দৃষ্টিপাত করেন না, তারা ব্যক্ত করেছেন যে, তারা প্রতিটি খুতবার সময় ভয় ও উদ্বেগ অনুভব করেন। বরং তাদের কেউ এমনও বলেন: "দুশ্চিন্তা ও ভীতির কারণে প্রতিটি খুতবাতেই আমার এমন মনে হয় যেন আমি প্রথমবারের মতো খুতবা দিচ্ছি!"
তবে আপনার খুত্ববার শুরুতে লোকদের চেহারার দিকে তাকাবেন না। কেননা, এমন কারো ওপর আপনার দৃষ্টি পড়তে পারে যাকে আপনি সমীহ করেন; ফলে আপনি বিচলিত হয়ে পড়বেন। তাছাড়া আপনার দিকে লোকদের দৃষ্টিপাতও আপনাকে ঘাবড়ে দিতে পারে। বরং নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তি ও তাদের চোখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ না করে তাদের মাথার দিকে তাকান।
ষষ্ঠত: মিম্বরে আরোহণের সময় কী কী নেতিবাচক পরিস্থিতি বা ভুলত্রুটি ঘটতে পারে—এসব নিয়ে চিন্তা করবেন না। বরং আল্লাহর ইচ্ছায় আপনার খুতবার মাধ্যমে যে ইতিবাচক ফলাফল অর্জিত হবে এবং যে বিপুল উপকার আপনি লাভ করবেন, সেগুলো নিয়ে চিন্তা করুন। যেমন—মানুষের উপকার করা, আল্লাহর পক্ষ থেকে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করার মহান বিধান বাস্তবায়নের তাওফিক লাভ করা এবং এর প্রতি মানুষকে আহ্বান করা।
সপ্তমত: খুতবার পূর্বে সঠিক পদ্ধতিতে শ্বাস-প্রশ্বাস নিন। এর পদ্ধতি হলো—নাক দিয়ে গভীরভাবে শ্বাস গ্রহণ করুন, তারপর অল্প কিছুক্ষণ শ্বাস ধরে রাখুন এবং ধীরে ধীরে তা বের করে দিন। মানসিক চাপ দূর করতে এই শ্বাস-প্রশ্বাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিদগণ উল্লেখ করেছেন যে, স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে মস্তিষ্কে সাত থেকে দশ লিটার অক্সিজেন পৌঁছে, পক্ষান্তরে সঠিক পদ্ধতিতে শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করলে প্রায় পঁচাত্তর লিটার অক্সিজেন পৌঁছে। এর ফলে উদ্বেগ ও মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী হরমোনের মাত্রা কমে যায়। এটি পরীক্ষিত; অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মানসিক চাপ, দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ দূর করতে এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে।
আর খুতবার সময় এমনভাবে গভীর শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা করবেন, যাতে উপস্থিত লোকদের দৃষ্টি সেদিকে আকৃষ্ট না হয়। এজন্য উপযুক্ত বিরতির সময় মুখ অথবা নাক দিয়ে দ্রুত ও বেশি পরিমাণে শ্বাস গ্রহণ করবেন। এরপর শ্বাস নেওয়ার পর বক্তব্য চালিয়ে যাবেন। প্রায় প্রতিটি বিরতির সময়ই এভাবে করার চেষ্টা করবেন।
(আপনার বিরুদ্ধে করা ভুল সমালোচনার সর্বোত্তম জবাব)
যদি আপনি— হে আমার খতীব ভাই— চিন্তাভাবনা, গভীর পর্যালোচনা এবং অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ গ্রহণের পর আপনার গৃহীত কোনো সিদ্ধান্তে, অথবা আপনার পছন্দকৃত কোনো পদ্ধতিতে, অথবা আপনার অবলম্বিত কোনো পথে সন্তুষ্ট হন, তাহলে সমালোচক ও নিন্দুকদের প্রতি ভ্রূক্ষেপ করবেন না। কারণ, কেউ যা-ই করুক না কেন এবং তার মর্যাদা যত উঁচুই হোক না কেন, সে কখনোই মানুষের সমালোচনা থেকে মুক্ত হতে পারবে না।
আর যদি আপনি তাদের সমালোচনার প্রতি ভ্রূক্ষেপ করেন, তাহলে আপনার মনোবল দুর্বল হয়ে পড়বে, আপনার অন্তর সংকুচিত হয়ে যাবে এবং উন্নয়ন ও সৃজনশীলতার স্পৃহা আপনি হারিয়ে ফেলবেন।
এমন কোনো বই, প্রবন্ধ বা কাজ নেই, যার দোষত্রুটি ধরার এবং সমালোচনা করার মতো কেউ নেই।
আপনার উচিত সমালোচকদের সাথে নম্রতা ও সম্মানের সাথে আচরণ করা, উত্তম পন্থায় তাদের জবাব দেওয়া এবং তাদের কাছে থাকা সত্যকে গ্রহণ করা। আর এতে অহংকার না করা; যদিও সমালোচক আপনার দৃষ্টিতে কোনো উচ্চ মর্যাদার অধিকারী না হন।
(খুতবার আগে খতীবের জন্য কিছু পরামর্শ)
হে আমার খতীব ভাই, আপনার উচিত খুতবার পূর্বে কয়েকটি বিষয় সম্পন্ন করা, আল্লাহ তা‘আলার পর আপনি যেগুলোর সাহায্যে মিম্বরে দাঁড়াতে এবং আপনার খুতবা প্রদান করতে পারেন। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
প্রথমত: স্মরণে রাখুন যে, আপনি আল্লাহর বাণীসমূহ পৌঁছে দিতে এবং তাঁর দিকে দাওয়াত দিতে যাচ্ছেন। আর মাঝে মাঝে আল্লাহ তাআলার এই বাণী পাঠ করুন: “যারা আল্লাহর বাণী পৌঁছিয়ে দেয় ও তাঁকে ভয় করে এবং আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করে না,” কখনো আল্লাহর এই বাণী পাঠ করুন: “আর তার চেয়ে কার কথা উত্তম, যে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দেয়, সৎকর্ম করে এবং বলে, ‘অবশ্যই আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত?’” [ফুসসিলাত: ৩৩]
কখনো আল্লাহর এই বাণী পাঠ করুন: “(হে রাসূল! তুমি সবাইকে) বলো: ‘এটা আমার পথ। আমি জ্ঞানের ভিত্তিতে মানুষকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিই এবং যারা আমার অনুসরণ করেছে তারাও। আর আল্লাহ পবিত্র মহান এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই।’” [ইউসূফ: ১০৮]
এটি আপনাকে অধিকতর ইখলাস, উদ্যম ও নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুকরণ করতে এবং খুতবার সর্বশ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্যকে স্মরণ রাখতে উদ্বুদ্ধ করবে, যার জন্য আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নবী ও রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন। তা হলো, দীনের প্রচার ও প্রসার করা। আর এটিই দুনিয়ার সর্বশ্রেষ্ঠ পদমর্যাদা।
দ্বিতীয়ত: মিম্বারে উঠার ঠিক পূর্বে আল্লাহর কাছে দু‘আ করুন, যেন তিনি আপনাকে ইখলাস, তাওফীক ও সঠিক পথের দিশা দান করেন এবং আপনি যা বলবেন তার মাধ্যমে যেন তিনি আপনাকে ও অন্যদেরকে উপকৃত করেন। কেননা এমন অনেক খতীব ও বক্তা রয়েছেন, যারা নিজেদের কথায় নিজেরা উপদেশ গ্রহণ করেন না। আর যদি উপদেশ গ্রহণ করেও থাকেন, তবে খুব দ্রুতই তারা নিজেদের বলা কথা ভুলে যান, বিশেষ করে যখন দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হয়ে যায়।
এবং সর্বদা আল্লাহ তা‘আলার নিকট প্রার্থনা করুন, তিনি যেন আপনাকে বাকপটুতা ও বর্ণনাশক্তি দান করেন।
তৃতীয়ত: সাধারণত আপনার খুতবা উপস্থাপনের দীর্ঘ সময় পূর্বেই বেশ কয়েকটি খুতবা প্রস্তুত করা; আর এগুলো প্রস্তুত করা এবং উপস্থাপন করার মাঝে কয়েক মাস বা কয়েক বছরের ব্যবধানও হতে পারে।
আর তা হলো, যখন আপনার মনে কোনো বিষয়ের উদয় হয়, অথবা পড়ার সময় কোনো মূল্যবান শিক্ষণীয় বিষয় আপনার সামনে আসে, অথবা কোনো হাদিস আপনাকে ভাবিয়ে তোলে, অথবা কোনো আয়াত নিয়ে আপনি গভীরভাবে চিন্তা করেন: তখন বিলম্ব না করে তাৎক্ষণিকভাবে তা লিখে রাখুন, কারণ তখন অনুভূতিগুলো প্রবল থাকে এবং চিন্তাভাবনাগুলো উপস্থিত ও সুসংবদ্ধ থাকে। আর যদি তখন লিখতে বিলম্ব করেন, তাহলে চিন্তা ও ভাবনাগুলো হারিয়ে যাবে এবং সেগুলো মনে রাখা ও স্মরণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। তারপর আপনার মনে যা উদয় হয় তা লিখে ফেলুন। এরপর কোনো প্রকার কৃত্রিমতা ছাড়াই কুরআন ও সুন্নাহ এবং আলেমদের বক্তব্য থেকে ইলমী উপাদান সংগ্রহ করা শুরু করুন, যাদের বক্তব্য তাদের গ্রন্থাবলি অথবা তাদের থেকে উদ্ধৃত গ্রন্থাবলি পাঠ করার সময় আপনার নজরে এসেছে। আর প্রয়োজনে মাকতাবা শামেলা কিংবা ইন্টারনেটে অনুসন্ধান করুন।
আর কুরআনের আয়াতসমূহ, নববী হাদীসসমূহ, সালাফে সালিহীনের বাণী ও তাঁদের জীবনচর্চার নিদর্শনসমূহ, ইতিহাস এবং সমকালীন রব্বানী আলিমদের বক্তব্যের প্রতি বিশেষ যত্নশীল হোন; বিশেষত উদ্ভূত নতুন মাসআলা ও সমসাময়িক ঘটনাবলির ক্ষেত্রে।
সুতরাং খুত্ববার বিষয়বস্তুর সাথে সম্পর্কিত যা কিছু পাবেন: তা গ্রহণ করবেন এবং কোনো বিন্যাস ও যাচাই-বাছাই ছাড়াই কম্পিউটারের একটি ফাইলে রাখবেন।
যেসব বিষয়বস্তু ও ফায়দা আপনার মনে উদিত হয় বা সামনে আসে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সর্বদা এভাবেই করবেন। আর তখন চিন্তায় যা আসে তা লিখে রাখবেন এবং সাধ্যমতো অনুসন্ধান করবেন ও লিখবেন। তারপর তা রেখে দিন এবং আপনার নিয়মিত পাঠ চালিয়ে যান। অতঃপর আপনি যদি এমন কোনো ফায়দা, আয়াত অথবা হাদীস পান যা সম্পূর্ণ বা আংশিক লেখা কোনো খুত্ববার সাথে সম্পর্কিত, তবে তা তাতে যুক্ত করুন।
হতে পারে খুতবাটি আপনার কাছে বেশ কয়েক বছর ধরে সংরক্ষিত থাকবে, আপনি সেটি আপনার দরস, বক্তৃতা বা আলোচনাগুলোতে পেশ করবেন; ফলে সেগুলোর ফাঁকে আপনার সামনে এমন সব সূক্ষ্ম বিষয় ও ফায়দা উন্মোচিত হবে, যা এর আগে আপনার ধারণাতেও আসেনি। আপনি ভুলে যাওয়া অনেক বিষয় স্মরণ করতে পারবেন এবং যখন আপনি সেটি জুমার খুতবায় পেশ করবেন, তখন তা—যথাসম্ভব—প্রস্তুত ও পূর্ণাঙ্গ থাকবে।
চতুর্থত: মসজিদে বা আপনার ব্যক্তিগত মজলিসগুলোতে বক্তব্যের মাধ্যমে তা পূর্ণাঙ্গরূপে অথবা খণ্ড খণ্ড করে পেশ করুন, আর এর উদ্দেশ্য হলো:
ক- তথ্যগুলো সুদৃঢ়ভাবে সংরক্ষণ করা ও মুখস্থ করা।
খ- মানুষের মাঝে তা প্রচার করা, বিশেষ করে এমন সব মসজিদে, যেগুলো আপনি যে জামে মসজিদে খুতবা প্রদান করেন, তার কাছাকাছি নয়। সাধারণত আপনার জামাতের লোকেরা সেখানে আপনার খুতবা শুনতে উপস্থিত হন না।
গ- বিষয়টি অধিকতর ব্যাপকভাবে অনুসন্ধান করা: সাধারণত আপনি যখন তা উপস্থাপন করবেন, তখন বক্তব্য চলাকালে কিংবা বক্তব্য শেষ হওয়ার পর আপনার কাছে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠবে, যেগুলো নিয়ে আলোচনা করা প্রয়োজন। অথবা যারা আপনার কাছ থেকে বক্তব্যটি শুনেছে, তাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা আসতে পারে।
পঞ্চমত: জুমার দিন খুতবার সময়ের প্রায় দুই ঘণ্টা পূর্বে তা এমনভাবে প্রদান করুন, ঠিক যেভাবে আপনি খুতবায় তা প্রদান করবেন।
ষষ্ঠত: গবেষণা ও প্রস্তুতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কৃত্রিমতা বা বাড়াবাড়ি করবেন না। আপনার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত—প্রথমে এমন উপাদান সংগ্রহ করা, যা আপনার নিজের উপকারে আসে; অতঃপর তা শ্রোতাদের বিভিন্ন স্তরের মানুষের উপকারে আসে।
আমি দেখেছি, যে কোনো বিষয়ে কৃত্রিমতা ও সাধ্যের অতিরিক্ত চেষ্টা ক্ষতিকর ও কষ্টকর; আর তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে কাজ ছেড়ে দেওয়া, অথবা বিরক্তি ও উদ্যমহীনতার দিকে নিয়ে যায়।
(খুতবা প্রদানকালে খতীবের জন্য উপদেশাবলী)
খুতবা প্রদানকালে আপনার বেশ কয়েকটি বিষয় পালন করা উচিত, তার মধ্যে কয়েকটি হলো:
প্রথমত: গল্পের ঘটনাবলি, পরিস্থিতি ও শিক্ষণীয় বিষয়গুলো অনুভব করার সময় আপনি আবেগ-অনুভূতির ভান করার বা তা গোপন করার চেষ্টা করবেন না, বরং প্রসঙ্গ অনুযায়ী আপনার চেহারার অভিব্যক্তি, চোখের ভাষা এবং কণ্ঠস্বরের ওঠানামার মাধ্যমে নিজের আবেগ প্রকাশ করুন।
আর জেনে রাখুন যে, আপনার বক্তব্য প্রদান যত বেশি স্বাভাবিক হবে এবং তা কষ্টকল্পিত হবে না, তা তত বেশি প্রভাব সৃষ্টিকারী হবে। সুতরাং আপনি আপনার সেই সহজাত স্বভাবের উপরই অটল থাকুন, যার উপর আপনি বেড়ে উঠেছেন এবং খুতবা ব্যতীত অন্যান্য সময় কথাবার্তায় আপনি যে পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তা-ই অবলম্বন করুন। তবে সেই সাথে কণ্ঠস্বর এবং সুন্দরভাবে বক্তব্য প্রদানের প্রতিও লক্ষ্য রাখবেন।
আর অনেক খতীব খুতবার জন্য তাঁর অভ্যস্ত বাচনভঙ্গি থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রীতি অবলম্বন করেন; যেন তিনি মনে করেন, খুতবা প্রদানের একটি গৎবাঁধা রীতি এবং এর নিজস্ব একটি বিশেষ ধারা রয়েছে। অথচ এর ফলে শ্রোতাদের ওপর প্রভাব বিস্তার এবং তাদের হৃদয়ে পৌঁছানোর সক্ষমতা তিনি হারিয়ে ফেলেন।
দ্বিতীয়ত: খুতবাকে একটানা পাঠ করবেন না এবং এমন দ্রুতগতিতে পড়বেন না, যা শ্রোতাদের পূর্ণরূপে শোনার ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটায়। বরং ধীরস্থিরভাবে খুতবা প্রদান করবেন এবং প্রয়োজনে সামান্য বিরতি নিবেন। আর উপযুক্ত স্থান অনুযায়ী কণ্ঠস্বরের মাত্রার প্রতি গুরুত্বারোপ করবেন; সুতরাং পরিস্থিতি দাবি করলে আওয়াজ উঁচু করবেন এবং দ্রুত কথা বলবেন।
তৃতীয়ত: খুতবার সময় সঠিকভাবে হিসাব করুন এবং প্রয়োজন ব্যতীত খুতবা দীর্ঘায়িত করবেন না।
চতুর্থত: খুতবা চলা অবস্থায় মুসল্লীদের পক্ষ থেকে যখন কিছু লঙ্ঘন সংঘটিত হতে দেখবেন, তখন নম্রতার সাথে সে বিষয়ে সতর্ক করবেন; যেমন, খুতবা চলা অবস্থায় কাউকে কথা বলতে দেখলে, এ ভুলের বিষয়ে সাধারণভাবে সতর্ক করবেন।
(খুতবার পর খতীবের জন্য কিছু পরামর্শ)
খুতবার পর আপনার বেশ কয়েকটি কাজ করা উচিত, তার মধ্যে অন্যতম হলো:
প্রথমত: খুতবা আদায়ের তৌফিক দান করে তিনি আপনার প্রতি যে অনুগ্রহ করেছেন, তার ওপর আল্লাহ তাআলার প্রশংসা জ্ঞাপন করা।
দ্বিতীয়ত: খুত্ববা দেওয়ার পর নিজের খুত্ববা শোনা, যার উদ্দেশ্য হলো ইতিবাচক দিকগুলো খুঁজে বের করে তা আরও সুদৃঢ় ও মজবুত করা এবং নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার ও বর্জন করা।
আর এসবই হলো:
প্রথমত: খুতবার মর্যাদার প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে, কেননা ইসলামে এর গুরুত্ব ও মর্যাদা রয়েছে।
দ্বিতীয়ত: যে মুসল্লিগণ তাদের রবের আনুগত্য করে, তাদের স্রষ্টার ডাকে সাড়া দিয়ে এবং আপনার কথা শোনার মহব্বতে এসেছেন, তাদের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা।
অনুরূপভাবে, আপনি তা একজন আন্তরিক শুভাকাঙ্ক্ষীর নিকট পেশ করতে পারেন, যাতে তিনি এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো আপনাকে দেখিয়ে দিতে পারেন।
অনুরূপভাবে সম্ভব হলে তা রেকর্ড করা ও প্রকাশ করা, বিশেষ করে যেসব দেশে খতীবের সংখ্যা কম, সেখানে তা প্রচার করা, যাতে আপনার সাথে যারা সালাত আদায় করে না এমন সাধারণ মানুষও তার দ্বারা উপকৃত হতে পারে। আর তা অডিও ও লিখিত আকারে প্রচার করা।
আর যদি তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পেজ এবং পাশাপাশি একটি নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি করে, তবে এটাও ভালো।
অনুরূপভাবে, খুতবা প্রকাশকারী ওয়েবসাইটগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করা এবং সেসব ওয়েবসাইটে তার খুতবা প্রকাশ করা; বিশেষত অনূদিত খুতবাগুলো, যেগুলোর সংখ্যা খুবই কম।
(খতীব ও আল্লাহর দিকে দা‘ওয়াতদানকারীর জন্য সাধারণ নসীহত)
হে আমার জুমু‘আর খতীব ভাই! আপনার উদ্দেশ্যে এই নসিহতগুলো পেশ করছি—যেগুলো মূলত আমাদের নিজেদের জন্যই একটি স্মরণিকা মাত্র:
[১] (সুসংবাদ দাও, দূরে ঠেলে দিও না)
একজন তাওফীকপ্রাপ্ত ও সফল খতীব হলেন তিনি, যিনি সুসংবাদ প্রদান করেন এবং বীতশ্রদ্ধ করেন না; মানুষের মাঝে আশাবাদ ও প্রত্যাশার এমন উদ্দীপনা ছড়িয়ে দেন, যা নিরাশা ও অলসতার ধুলো দূরীভূত করে এবং অধ্যাবসায় ও কর্মতৎপরতায় উদ্বুদ্ধ করে।
হে খতীব ভাই! সাবধান—আপনার খুতবাগুলোর বিষয়বস্তু যেন শুধু মর্মান্তিক ঘটনা, বিপদ-আপদ এবং নেতিবাচক বিষয়কে ঘিরে না থাকে, যেগুলো যেকোনো সময় ও যেকোনো স্থানে ঘটতে পারে। বরং আপনার অধিকাংশ খুতবার বিষয়বস্তু যেন থাকে শুভ প্রত্যাশা এবং নৈতিকতা, আচরণ ও ব্যক্তিত্বের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তসমূহ তুলে ধরার ওপর। যাতে মানুষ এসব নৈতিকতা, উত্তম আচরণ ও মহান ব্যক্তিত্বকে নিজেদের জন্য আদর্শ ও পথপ্রদর্শক হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।
আর আপনি যদি কোনো ভুল দেখেন, তবে শরয়ী পন্থায় ও উপযুক্ত পদ্ধতিতে সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এবং তা থেকে মানুষকে সতর্ক করতে কোনো দোষ নেই।
[২] (সাধারণ মানুষকে আপনার চোখের সামনে রাখুন।)
আল্লাহ আপনার হেফাযত করুন— আপনি সাধারণ মানুষকে আপনার চোখের সামনে রাখুন: কেননা তারাই আপনার খুতবা ও ওয়াজের অধিক হকদার ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত; যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উসমান ইবনে আবিল আস রাদিয়াল্লাহু আনহু-কে বলেছিলেন, যখন তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের ইমাম বানানো হয়েছিল: “আর তাদের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল ব্যক্তির অনুসরণ কর।” ([৮]) - হাদীসটি বর্ণনা করেছেন আবু দাউদ: (৫৩১), ইবনে মাজাহ: (৯৮৭) এবং আহমাদ: (১৭৯০৬) ও অন্যান্যরা। আর আলবানী এটিকে সহীহ বলেছেন।
অর্থাৎ সবচেয়ে দুর্বলের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য রাখো এবং এমনভাবে সালাত আদায় করো যা তাদের জন্য কষ্টসাধ্য না হয়। আর শারীরিকভাবে দুর্বলদের প্রতি লক্ষ্য রাখার চেয়ে বোধশক্তিতে দুর্বলদের প্রতি লক্ষ্য রাখা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।
আর যদি আপনি তাদের গণ্যমান্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ এবং আপনার অনুরাগী ও ছাত্রদের প্রতিই লক্ষ্য রাখেন এবং সাধারণ মানুষের প্রতি গুরুত্ব না দেন: তবে তা আপনাকে বেশ কয়েকটি বিপদের দিকে পরিচালিত করবে:
প্রথম: শব্দচয়নে কৃত্রিমতা অবলম্বন করা, জোর করে ছন্দময় বাক্য তৈরি করা এবং এমন সব বিষয় নির্বাচন করা, যা সাধারণ মানুষ ও তাদের মতো অধিকাংশ শ্রোতার মানের উপযোগী নয়।
দ্বিতীয়: এর ফলে সাধারণ মানুষ এমন উপদেশ, নসীহত এবং সামাজিক সমস্যাবলির কার্যকর সমাধান থেকে বঞ্চিত হয়, যা তাদের জন্য সত্যিই উপকারী। কারণ, আপনি এমন সব বিষয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন, যা মূলত শিক্ষিত বা বুদ্ধিবৃত্তিক শ্রেণির মানুষের আগ্রহের বিষয়। তারা জ্ঞানের সূক্ষ্ম আলোচনা, নতুন নতুন গবেষণালব্ধ বিশ্লেষণ, অভিনব তথ্য কিংবা দুর্লভ বিষয় শুনতে আগ্রহী। আবার তাদের কেউ কেউ রাজনীতি বা সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহের দীর্ঘ আলোচনাই শুনতে পছন্দ করেন। অথচ এসব আলোচনা তাদের দ্বীন কিংবা দুনিয়ার প্রকৃত কল্যাণে তেমন কোনো উপকার বয়ে আনে না।
তৃতীয়: নিয়তের ত্রুটি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য একনিষ্ঠ হওয়ার পরিবর্তে তা আপনার ভক্ত-অনুরাগীদের সন্তুষ্টির প্রতি নিবদ্ধ হয়ে পড়েছে; তারা কোন বিষয় পছন্দ করে এবং কোন বিষয়ে সন্তুষ্ট হয়, সেদিকেই আপনি দৃষ্টি দিতে শুরু করেছেন।
সুতরাং যখন আপনি আপনার খুতবার প্রতি মানুষের মুগ্ধতা এবং তাতে উপস্থিত হতে ও তা শুনতে তাদের প্রতিযোগিতা দেখবেন, তখন নিঃসন্দেহে আপনি তাদের প্রতি লক্ষ্য রাখবেন এবং যা তাদেরকে সন্তুষ্ট করে এমন বিষয়ে খুতবা দিবেন।
আর তখন আল্লাহ তা‘আলা আপনার কাছ থেকে বরকত, গ্রহণযোগ্যতা, উপকার ও ফায়দা কেড়ে নেবেন।
সাধারণ মানুষের উপকারের প্রতি খতীবের গুরুত্ব দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, তিনি এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করবেন না যা হয়তো তাদের অনেকের স্তরের ঊর্ধ্বে হতে পারে এবং যা থেকে কিছু বিশেষজ্ঞ যেমন: শিক্ষার্থী, দায়িত্বশীল ও তাদের মতো ব্যক্তিবর্গ উপকৃত হতে পারেন; তবে তা প্রয়োজন অনুযায়ী হতে হবে।
[৩] (নিজের গুণে মুগ্ধ হওয়া কিংবা মানুষ আপনার প্রশংসা করলে তাতে আত্মমুগ্ধ হয়ে পড়া থেকে বিরত থাকুন।)
জুম‘আর খতীব যখন মিম্বারে ওঠেন এবং দেখতে পান যে, বিপুল জনতা তার নিকট উপস্থিত হয়েছে, তাকে উদ্দেশ্য করে এসেছে এবং তার দিকে মনোনিবেশ করেছে; আর তিনি তাদের মাঝে আলেম, চিকিৎসক, বয়োজ্যেষ্ঠ, বিচারক, ধনী ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দেখতে পান, তখন তার অন্তরে আত্মগর্ব প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে যখন তিনি জানতে পারেন যে, তাদের অনেকেই তার জন্যই উপস্থিত হয়েছে। তাই প্রজ্ঞাবান খতীবের জন্য অপরিহার্য হলো, তিনি যেন আত্মগর্ব ও অহংকার থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন এবং আত্মগর্ব ও নিজেকে বড় মনে করার প্রবণতা থেকে মুক্ত হতে প্রতি জুম‘আয় নিজের নফসের সাথে সংগ্রাম করেন। আর সকল অনুগ্রহ আল্লাহ তা‘আলার দিকেই ফিরিয়ে দেন, যিনি মানুষকে তার দিকে ধাবিত করেছেন।
কতক সালাফ বলেছেন: “যখন আপনি লোকদের সামনে বসবেন, তখন আপনি আপনার অন্তর ও নফসের উপদেশদাতা হোন, আর আপনাকে ঘিরে তাদের সমাগম যেন আপনাকে ধোঁকায় না ফেলে; কেননা তারা আপনার বাহ্যিক দিক পর্যবেক্ষণ করে, আর আল্লাহ আপনার অভ্যন্তরীণ দিক পর্যবেক্ষণ করেন।” ([৯]). - "মাদারিজুস সালিকীন বাইনা মানাযিলি ইয়্যাকা না‘বুদু ওয়া ইয়্যাকা নাসতা‘ঈন": (২/৬৬)।
সুতরাং আপনি আল্লাহ তা‘আলার জন্যে ইখলাস অবলম্বন করুন এবং আপনার ঈমানকে সুদৃঢ় করুন। আর আপনার প্রতি মানুষের প্রশংসায় আত্মতুষ্টি থেকে বেঁচে থাকা উচিত; কারণ, অনেক মানুষ যখন প্রশংসা করে তখন তারা বাড়াবাড়ি করে, আর আপনি নিজের সম্পর্কে অধিক অবগত!
ইবনুল জাওযী রাহিমাহুল্লাহু বলেছেন: "সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো সাধারণ মানুষের প্রশংসা, তা কত মানুষকেই না ধোঁকায় ফেলেছে!" [১০] - "সাইদুল খাতির": ৬৭.
আপনার অথবা আপনার খুতবার ব্যাপারে মানুষের প্রশংসায় আনন্দিত হওয়া কোনো দোষের বিষয় নয়। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো, সেই ব্যক্তি সম্পর্কে আপনার কী অভিমত, যে নেক আমল করে এবং লোকেরা তার প্রশংসা করে? তিনি বললেন, "এটি মুমিনের নগদ সুসংবাদ" [১১]। - সহীহ মুসলিম: (২৬৪২)।
সুতরাং মুমিন ব্যক্তি যখন আমল করে «আমল একমাত্র মহান আল্লাহর জন্য খালেস হওয়ার পর, আল্লাহ তা‘আলা মুমিনদের অন্তরে তার জন্য উত্তম প্রশংসা সৃষ্টি করে দেন, ফলে সে আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতের কারণে আনন্দিত হয় এবং এতে সুসংবাদ লাভ করে, তা তার কোনো ক্ষতি করে না» ([১২])। - "জামেউল উলুম ওয়াল হিকাম", ইবনে রজব: ১/৮৪।
প্রকৃতপক্ষে দোষ ও পাপ তখনই, যখন তাদের প্রশংসায় আপনার অন্তরে আত্মম্ভরিতা প্রবেশ করে; ফলে আপনি নিজের প্রচেষ্টা ও কর্ম নিয়ে আনন্দিত হন এবং এর কৃতিত্ব নিজের দিকে সম্বন্ধ করেন। অথচ আপনার আনন্দ হওয়া উচিত ছিল আল্লাহর অনুগ্রহ, তাঁর রহমত ও তাঁর দানশীলতার কারণে—যিনি আপনার জন্য এই কল্যাণ পৌঁছে দিয়েছেন, সেটিকে আপনার কাছে প্রিয় করে দিয়েছেন এবং আপনার জন্য তা সহজ করে দিয়েছেন।
আর আপনার উযব (আত্মগর্ব) ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার লক্ষণ হলো: সমালোচনা থেকে বিমুখ হওয়া এবং উপদেশদাতার উপদেশ অপছন্দ করা।
[৪](এমন কথা বলবে যা তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারে আসে)
আপনার নিকট যারা শুনতে এসেছে, তাদেরকে এমন কিছু শোনান যা তাদের দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারে আসবে। আর প্রস্তুতি গ্রহণের সময় নিজেকে প্রশ্ন করুন: মানুষ যখন মসজিদ থেকে বের হবে, তখন তাদের দ্বীন ও আখলাকের ক্ষেত্রে আমি তাদেরকে কী উপকার পৌঁছাব?
আর যা থেকে তারা উপকৃত হয়নি, তার আলোচনা করবেন না।
উদাহরণস্বরূপ, আপনি যদি রাজনীতির সূক্ষ্ম বিষয়াদি নিয়ে কথা বলেন, অথবা মুসলিমদের বিপদাপদ সম্পর্কে অতিরিক্ত আলোচনা করেন, তাহলে তারা এতে কী উপকৃত হবে?
আর আমার এমন কোনো বিষয় উপস্থাপনের দ্বারা তারা কী উপকারিতা লাভ করবে, যা এর স্পর্শকাতরতা এবং নিজের ওপর ক্ষতির আশঙ্কায় তা স্পষ্টভাবে প্রকাশ করার ভয়ের কারণে অস্পষ্টতায় ঘেরা থাকে, যার ফলে আমি এমন সব ইঙ্গিত ও পরোক্ষ কথার আশ্রয় নিই যা অতি বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারে না?
আমি যখন সাধারণ জনগণের সামনে সুস্পষ্টভাবে অথবা ইঙ্গিতে শাসককে নসীহত পেশ করব, তখন এতে তারা কী উপকৃত হবে? আর শাসককে প্রকাশ্যে নসীহত করার ব্যাপারে সালাফে সালেহীন নিষেধ করেছেন; কারণ তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফিতনার সৃষ্টি করে এবং খতীবের ক্ষতিসাধন করে।
[৫] (খুতবা চলাকালীন নীরবতা বজায় রাখতে সচেষ্ট হওয়া)
খুতবা প্রদানের সময় আপনাকে অবশ্যই শান্ত থাকতে হবে। আবেগ যেন আপনাকে পেয়ে না বসে, যার ফলে আপনি মূল বিষয়বস্তু থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন অথবা এমন কোনো কথা বলে ফেলেন, যার কারণে পরবর্তীতে আপনাকে অনুতপ্ত হতে হয়। আর খতীবের আবেগ যখন তীব্র হয়, তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তিনি তার মনোযোগ ও কথার ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং কখনো কখনো তার আওয়াজ এতটা বেড়ে যায়, যা অনেক শ্রোতার জন্য কষ্টকর হয়।
[৬] খুতবা দীর্ঘায়িত করা থেকে বিরত থাকা
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুতবা সংক্ষিপ্ত করতেন এবং তাঁর সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম ও তাঁদের পরবর্তী উম্মাতের সালাফগণ রাহিমাহুমুল্লাহু তা‘আলাও অনুরূপ করতেন।
আবূ ওয়ায়েল রাহিমাহুল্লাহ বলেন: আম্মার রাদিয়াল্লাহু আনহু আমাদেরকে খুতবা দিলেন, যা ছিল সংক্ষিপ্ত ও সারগর্ভ। অতঃপর তিনি যখন নিচে নামলেন, তখন আমরা বললাম: হে আবু ইয়াকযান! আপনি তো সারগর্ভ ও সংক্ষিপ্ত খুতবা দিলেন, আপনি যদি তা আরেকটু দীর্ঘ করতেন! তিনি বললেন: আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি: "“নিশ্চয় কোনো ব্যক্তির সালাত দীর্ঘ হওয়া এবং তার খুতবা সংক্ষিপ্ত হওয়া তার ফিকহ (জ্ঞান)-এর পরিচায়ক। অতএব, তোমরা সালাত দীর্ঘ কর এবং খুতবা সংক্ষিপ্ত কর। আর নিশ্চয় কোনো কোনো বয়ান জাদুর মত।” ([১৩]) - হাদীসটি মুসলিম (৮৬৯) বর্ণনা করেছেন।
তাঁর উক্তি: (تَنَفَّسْتَ) অর্থাৎ: আপনি খুতবা দীর্ঘ করেছেন।
তাঁর বাণী: (مَئِنَّةٌ): তথা: নিদর্শন, (مِنْ فِقْهِهِ): «অর্থ: যা দ্বারা ব্যক্তির ফিকহ জানা যায়, আর প্রত্যেক জিনিস যা কোনো কিছুর প্রমাণ বহন করে, তা তার আলামত।
খুতবা সংক্ষিপ্ত হওয়ার মধ্যে তিনটি মূল্যবান ফায়দা রয়েছে:
প্রথমত: সুন্নাহর অনুসরণ করা।
দ্বিতীয়ত: খুতবা প্রস্তুত করা সহজ হওয়া এবং তা প্রস্তুত করার সময়, খুতবা প্রদানকালে ও তা শেষ করার পর মানসিক প্রশান্তি অর্জন করা।
অনেক খতীব জুমু‘আর ফজর বা তারও আগে থেকে খুতবা নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকতেন এবং এর প্রস্তুতির জন্য মানসিকভাবে ব্যস্ত থাকতেন। আর যখন তারা খুতবা সংক্ষিপ্ত করলেন এবং তাতে দশ মিনিটের বেশি সময় নিলেন না, তখন তাদের সমস্ত দুশ্চিন্তা বা এর অধিকাংশই দূর হয়ে গেল।
তৃতীয়ত: শ্রোতাদের ওপর কষ্ট কমানো। কেননা যিনি তাঁর খুতবা সংক্ষিপ্ত করেন, তাঁর প্রতি স্বস্তি বোধ করা এবং যিনি তা দীর্ঘায়িত করেন, তাঁর প্রতি বিরক্তি বোধ করার বিষয়ে প্রায় সকল মানুষই একমত।
খতীব ও শ্রোতাদের জন্য উপযুক্ত সময় হলো আনুমানিক দশ থেকে পনেরো মিনিটের মধ্যে; কেননা মানুষ প্রায় এ বিষয়ে একমত যে, খুতবা দীর্ঘ হওয়ার চেয়ে তা সংক্ষিপ্ত হওয়া তাদের কাছে অধিক প্রিয় এবং তাদের জন্য সহজতর।
[৭] (অপ্রচলিত কথাবার্তা থেকে দূরে থাকবে)
অপ্রচলিত ও দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকুন; কারণ, মানুষ আপনার কাছ থেকে এ ধরনের কথার প্রয়োজন বোধ করবে না এবং এতে তাদের কোনো উপকারও হবে না। বরং এ ধরনের শব্দ পরিবেশন করা ও বেশি বেশি ব্যবহার করার মধ্যে প্রবৃত্তির জন্য আত্মতুষ্টির কিছু সুযোগ থাকতে পারে।
গ্রহণযোগ্য সাহিত্যিক ও সুবক্তাগণ দুর্বোধ্য কথা বলা থেকে সতর্ক করেছেন।
[৮] কৃত্রিম ছন্দ প্রয়োগ থেকে বিরত থাকবে।
(السَّجْعُ) বা ছন্দ: এর সংজ্ঞা হলো—“গদ্যভাষণের বাক্যগুলোর শেষাংশ একই ওজনে মিলিত হওয়া।” প্রজ্ঞাময় শরিয়ত কৃত্রিমভাবে ছন্দ করার ব্যাপারে নিষেধ করেছে। সাহিত্যিক ও বাগ্মীরাও কৃত্রিম ছন্দ অপছন্দ করেছেন; “কারণ, ছন্দ এমন কৃত্রিম শব্দচয়ন থেকে মুক্ত নয়, যা শ্রোতাদের মনকে অর্থের পূর্ণ উপলব্ধি থেকে আড়াল করে রাখে। তবে ছন্দের ক্ষেত্রে যদি কোনো কিছু ক্ষমাযোগ্য ধরা হয়, তাহলে তা হলো এমন ছন্দ, যা অনায়াসে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রকাশ পায়, কোনো কৃত্রিমতা ছাড়াই। অর্থাৎ এমন ছন্দ, যা বক্তার বক্তব্যের অনুসরণে আসে; এমন ছন্দ নয়, যার অনুসরণে বক্তা বক্তব্য সাজান।” ([14]) - ইবনু আশূর, “উসূলুল ইনশা ওয়াল খিতাবাহ” (পৃ.১২৬)।
অতএব, ছন্দ মেলানোর কৃত্রিম চেষ্টা পরিহার করুন; কারণ তা করতে গেলে আপনাকে তা রচনার কষ্ট করতে হবে এবং শ্রোতাদেরও তা বোঝার কষ্ট করতে হবে। তবে যদি তা আপনার মনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসে যায়, এর শব্দগুলো আপনার জিহ্বায় সাবলীলভাবে উচ্চারিত হয় এবং শ্রোতার কাছে তা সহজবোধ্য হয়, তাহলে এতে কোনো দোষ নেই।
[৯](বাহ্যিক সৌন্দর্যের প্রতি যত্নবান হওয়া)
খতীবের বাহ্যিক অবয়বের পরিশুদ্ধতার প্রতি যত্নবান হওয়া তার অভ্যন্তরীণ দিকের প্রতি যত্নবান হওয়ার চেয়ে কম নয়। বাহ্যিক দিকের পরিশুদ্ধতা বা কলুষতা মূলত অভ্যন্তরীণ দিকের পরিশুদ্ধতা বা কলুষতারই ফলাফল। আর খতীবের বাহ্যিক অবয়বের পরিশুদ্ধতা নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর মাধ্যমে হয়ে থাকে:
প্রথম: বাড়াবাড়ি বা অপচয় না করে তার পোশাকের সৌন্দর্য ও পরিচ্ছন্নতা।
দ্বিতীয়: পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা ও সুগন্ধি ব্যবহারের মাধ্যমে শরীরের সৌন্দর্য বজায় রাখা এবং গোঁফ মুণ্ডানো বা খাটো করা ও দাড়ি লম্বা রাখা।
তৃতীয়ত: মসজিদের বাইরে মানুষের সাথে সালাম বিনিময়ের সময়, খুতবার জন্য প্রবেশের সময় এবং তা শেষ হওয়ার পর হাস্যোজ্জল চেহারা ও হাসির মাধ্যমে নিজের চেহারার সৌন্দর্য প্রকাশ করা; কেননা আন্তরিক হাসি, হাসিমুখ এবং উত্তম হাস্যোজ্জলতা খতীবের প্রতি এবং তার খুতবা ও উপদেশাবলীর প্রতি মানুষের মাঝে ভালোবাসা সৃষ্টি করে। আর যে ব্যক্তি এতে আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ হয়, তার জন্য এটি একটি ইবাদত। এটিই মানুষের বিবেক ও অন্তর জয় করে নেয়। হাস্যোজ্জল চেহারার অধিকারী ব্যক্তির কাজ প্রশংসনীয় হয় এবং তার ছোটখাটো ত্রুটিগুলো ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখা হয়। পক্ষান্তরে গোমড়ামুখো ও ভ্রুকুটি প্রদর্শনকারী ব্যক্তির বিষয়টি এর বিপরীত; সে এমন ব্যক্তি যার থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করা হয় এবং তার সাথে সাক্ষাতে অন্তরে বিষণ্ণতা ও সংকীর্ণতা ছেয়ে যায়।
তাই হে আমার খতিব ভাই! আপনি হাস্যোজ্জ্বল ও প্রফুল্ল চেহারার অধিকারী হোন। তাহলে আপনি দেখতে পাবেন—আপনার অন্তর প্রশান্ত হচ্ছে, মানুষ আপনার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে, তাদের কাছে আপনার সুনাম হচ্ছে, তারা আপনার দিকনির্দেশনা ও ওয়াজ-নসিহত গ্রহণ করছে এবং আপনার ভুল-ত্রুটি ও পদস্খলনের জন্য তারা ওজর খুঁজে নিচ্ছে।
চতুর্থ: হাঁটা, মিম্বারে উঠা এবং তাতে বসার সময় তার বিনয় ও আদব এবং বসা ও খুতবা দেওয়ার সময় তার উত্তমরূপে মানুষের অভিমুখী হওয়া।
একটি লক্ষণীয় বিষয় হলো: কিছু খতীব খুতবার পূর্বে এমনভাবে বসেন, যা দেখে মনে হয় তিনি মানুষের প্রতি উদাসীন এবং তিনি মানুষের চেহারা পর্যবেক্ষণে ব্যস্ত থাকেন। আর যখন তিনি খুতবা শুরু করেন, তখন মানুষের দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকান যা থেকে মনে হয় যে, তিনি তাদের প্রতি ভ্রুক্ষেপহীন ও পরোয়াহীন; যেন তিনি তাদেরকে বোঝাতে চান যে, তিনি সাহসী ও নির্ভীক। তিনি তাদের উদ্দেশ্যে রুক্ষ ও উচ্চস্বরে কথা বলেন এবং সরাসরি আদেশ ও নিষেধ প্রদান করেন। মানুষের মন এ ধরনের পদ্ধতি মেনে নেয় না; বরং তা থেকে বিমুখ হয়।
পঞ্চম: বিনা প্রয়োজনে দাড়িতে হাত বুলানো ও তা স্পর্শ করা এবং বিশেষ করে মিম্বরে বসা অবস্থায় অতিরিক্ত এদিক-ওদিক তাকানো থেকে বিরত থাকা; কেননা তা খতীবের গাম্ভীর্য হ্রাস করে, অথবা তার সামনের লোকদের প্রতি তার উদাসীনতার ইঙ্গিত দেয়।
ষষ্ঠ: নম্রতা ও আদবের সাথে মেসওয়াক করা। কিছু খতীব— আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াত দান করুন— যখন মসজিদে প্রবেশ করেন, তখন দৃষ্টিকটুভাবে মেসওয়াক করতে করতে প্রবেশ করেন। তাদের কেউ কেউ খুতবা শুরু করার ঠিক পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মেসওয়াক করতে থাকেন, ফলে তার মুখে মেসওয়াকের কিছু অংশ অবশিষ্ট থেকে যায়। অতঃপর খুতবা দেওয়া অবস্থায় তিনি সেই অবশিষ্টাংশ বের করতে থাকেন। এটি একটি নিন্দনীয় বিষয় এবং তা উপস্থিত মানুষ ও খুতবার মহান মর্যাদার প্রতি তার অবজ্ঞার ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
সপ্তম: পোষাকের ক্ষেত্রে টাখনুর নিচে কাপড় না ঝুলিয়ে এবং দাড়ির ক্ষেত্রে তা লম্বা রাখার মাধ্যমে সুন্নাতের অনুসরণ করা। কেননা খতীব হলেন একজন আদর্শ, আর মানুষ কীভাবে এমন ব্যক্তির অনুসরণ করবে যার কাজ তার কথার পরিপন্থী? এবং মানুষ কীভাবে এমন ব্যক্তির কথায় প্রভাবিত হবে, যার কথা তার নিজের ওপরই কোনো প্রভাব ফেলে না?!
অষ্টম: কথা বলার সময় দেহের স্থিরতা; কারণ তা অন্তরের স্থিরতার প্রমাণ।
[১০] খুতবা প্রস্তুতের সময়ের তারতম্য
খুতবা প্রস্তুত করার সময়: খতীবের সংস্কৃতি ও জ্ঞান অনুযায়ী এবং তিনি যে বিষয়বস্তু উপস্থাপন করবেন তার ওপর ভিত্তি করে এটি ভিন্ন হয়ে থাকে, আর বিষয়বস্তুটি দুটি প্রকারের বাইরে নয়:
প্রথম: খুতবাটি ইলমী বা জ্ঞানভিত্তিক হওয়া; যেমন ফিকহী বা আকীদা-বিষয়ক মাসআলা এবং সেগুলোর মূলনীতি ও ভিত্তি। সুতরাং এগুলোকে এর মর্যাদা অনুযায়ী উপযুক্ত সময় দেওয়া জরুরি। এগুলোকে অবহেলা করা কিংবা খুতবার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে প্রস্তুত করা উচিত নয়।
দুই: খুতবাটি ওয়াজমূলক, সামাজিক অথবা এ জাতীয় বিষয় ভিত্তিক হওয়া, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর প্রস্তুতির সময় সংক্ষিপ্ত হয়।
খুতবা প্রদানের ক্ষেত্রে নতুনদের প্রতি আমার উপদেশ হলো—যাদের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান নেই—তারা যেন শুরুতে তাদের পূর্বসূরিদের খুতবা থেকে উপকৃত হয়। আর তারা যার কাছ থেকে উপকৃত হবে, তার খুতবায় তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে:
প্রথম: খুতবাটি সংক্ষিপ্ত হওয়া, যাতে তা প্রদান করা তার জন্য কষ্টকর না হয়।
দুই: খুতবাটি ব্যাকরণগত ও জ্ঞানগত দিক থেকে নির্ভুল হওয়া।
তিন: খুতবাটির শব্দ ও অর্থের দিক থেকে কৃত্রিমতা থেকে দূরে থাকা।
আর সময়ের পরিক্রমায় তিনি যা উপযুক্ত মনে করবেন, তা পরিমার্জন বা সংযোজন করাতে কোনো অসুবিধা নেই। অতঃপর তিনি তার পূর্ববর্তীদের থেকে উপকৃত হয়ে নিজেই খুতবা লেখার চেষ্টা করবেন।
[১১] (শ্রোতাদের সরাসরি নির্দেশ প্রদান থেকে বিরত থাকা)
এমন শব্দসমূহ পরিহার করুন - আল্লাহ আপনাকে হিফাযত করুন এবং সঠিক পথে পরিচালিত করুন - যাতে বক্তাকে বাদ দিয়ে কেবল শ্রোতাদের জন্য আদেশসমূহ থাকে, যেমন: 'তোমরা কর' অথবা 'তোমরা করো না'। এর পরিবর্তে ব্যবহার করুন: 'আমরা যেন করি' এবং 'আমরা যেন বর্জন করি' ইত্যাদি। কেননা এই বাচনভঙ্গি শ্রোতাদেরকে আপনার বিনয় এবং নিজের জন্য যেমন কল্যাণ পছন্দ করেন তাদের জন্যও তেমন কল্যাণ কামনার অনুভূতি দেয়। আর উপলব্ধি করায় যে, দ্বীন ও চরিত্রের দিক দিয়ে আপনি তাদের ঊর্ধ্বে নন।
আর তাওফিকপ্রাপ্ত খতীব: অন্যের উদ্দেশ্যে কথা বলার পূর্বে নিজের উদ্দেশ্যে কথা বলেন এবং অন্যকে উপদেশ দেওয়ার পূর্বে নিজেকে উপদেশ দেন। ফলে খুতবায় তার বক্তব্য মানুষের উদ্দেশ্যে নিবদ্ধ করার পূর্বে প্রথমত তার নিজের প্রতি নিবদ্ধ থাকে। আর তিনি যদি এমনটি করেন, তবে আল্লাহ তার মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন, তার বক্তব্যের দ্বারা তাকে উপকৃত করবেন এবং তার হেদায়েত, গ্রহণযোগ্যতা ও সত্যনিষ্ঠা বাড়িয়ে দেবেন।
[১২](খুতবায় অনুকরণ কখন উত্তম ও নিন্দনীয় হয়?)
কোনো নির্দিষ্ট খতীবের বাচনভঙ্গি বা বিষয়বস্তুর অনুকরণ করবেন না, কেননা তার জন্য যা উপযুক্ত তা আপনার জন্য উপযুক্ত নাও হতে পারে। আর অনুকরণ আপনার সৃজনশীলতা ও প্রতিভাকে নষ্ট করে দেয়। সুতরাং আপনার রব আপনাকে যে সক্ষমতা, প্রতিভা ও জ্ঞান দান করেছেন, সে অনুযায়ী খুতবা প্রদান করুন।
আর প্রাথমিক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে: পদ্ধতি ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে অন্যের কাছ থেকে উপকৃত হতে কোনো অসুবিধা নেই। তবে তার হুবহু প্রতিলিপি হওয়া সমীচীন নয়, বরং নিজেকে উন্নত করার জন্য তাকে সহায়ক হিসেবে গ্রহণ করা উচিত।
[১৩] (আপনার নিকট উপস্থিতির স্বল্পতায় দুঃখ করবেন না এবং তাদের আধিক্যেও আনন্দিত হবেন না।)
আপনি জেনে রাখবেন— আল্লাহ আপনার দ্বারা কল্যাণ সাধন করুন— যে, মানুষের মন অধিক সংখ্যক শ্রোতা ও উপস্থিতির কামনা করে, বিশেষ করে আপনার নিকটাত্মীয় ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্য থেকে। আর হয়তো আপনি তাদের উপস্থিতির বিষয়ে খোঁজ নেবেন, অথবা তাদের কারো উপস্থিত না হওয়ার কারণে অনুযোগ করবেন— এমনকি তা মনে মনে হলেও। সুতরাং এই ব্যাধি থেকে নিজেকে মুক্ত করার জন্য আপনি নিজের নফসের সাথে সংগ্রাম করুন। কেননা আপনার নিকট তার উপস্থিত না হওয়ার অর্থ এই নয় যে, আপনি দুর্বল; বরং এর কারণ হতে পারে যে, সে অন্য খতীবের কাছে প্রশান্তি ও উপকার লাভ করে অথবা তা তার বাড়ির কাছাকাছি হওয়ার কারণে, অথবা অন্য কোন কারণে।
আর সত্যবাদী খতীব: তিনি আনন্দিত হন যখন শোনেন যে, মানুষেরা অন্য কারো নিকট উপস্থিত হচ্ছে এবং তিনি তার জন্য আল্লাহর কাছে সঠিকতা ও কল্যাণের দোয়া করেন, আর তার সম্পর্কে ভালো কিছু জানতে পারলে তার প্রশংসা করেন।
যখন আপনি দেখবেন যে আপনার নিকট উপস্থিতি কম এবং মানুষ আপনার নিকট থেকে বিমুখ হচ্ছে, তখন আপনি নিজের আত্মসমালোচনা করুন; কেননা ত্রুটি আপনার মাঝেই থাকতে পারে; হতে পারে তা আপনার উপস্থাপন শৈলীর দুর্বলতার কারণে, অথবা আপনি যে বিষয়বস্তু পেশ করছেন তার দুর্বলতার কারণে, অথবা আপনার খুতবা দীর্ঘ করার কারণে, অথবা আপনার ইখলাসের দুর্বলতার কারণে, কিংবা অন্য কোনো কারণে।
সত্যনিষ্ঠ ও হিতাকাঙ্ক্ষী ভাইদের কাছে পরামর্শ চান এবং তাদেরকে আপনার নিকট উপস্থিত হতে অথবা আপনার খুতবা শুনতে অনুরোধ করুন। আর তাদের কাছে আন্তরিকভাবে অনুরোধ করুন যেন তারা আপনাকে তাদের মন্তব্য ও মতামত প্রদান করে। তাহলে আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছায় আপনি উপকারী ফলাফল লাভ করবেন।
[১৪](উত্তম প্রস্তুতির গুরুত্ব)
আপনি যদি এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হন যারা উপস্থিতভাবে খুতবা প্রদান করেন: তবে আপনার উচিত খুতবাটি উত্তমরূপে প্রস্তুত করা এবং এ বিষয়ে কখনোই অবহেলা না করা; যদিও আপনার কাছে মনে হয় যে বিষয়টি সহজ ও সরল এবং পূর্বেও আপনি এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
উত্তম প্রস্তুতি: খতীবদের নিকট সবচেয়ে আনন্দদায়ক বিষয়গুলোর একটি; বরং তারা যা প্রস্তুত করেছেন এবং যার পেছনে পরিশ্রম করেছেন, তা উপস্থাপন করার জন্য জুমু‘আর দিনের অধীর অপেক্ষায় থাকেন।
নিয়মিত প্রস্তুতি গ্রহণ না করা এবং অন্যদের খুতবাকেই যথেষ্ট মনে করার মধ্যে অনেক নেতিবাচক দিক রয়েছে, তন্মধ্যে:
প্রথমত: এটি মনোবল দুর্বল করে, সংকল্পকে শিথিল করে এবং আত্মমর্যাদাবোধ নষ্ট করে দেয়; কারণ ব্যক্তি অন্যদের অনুকরণ করেই সন্তুষ্ট থাকে।
দ্বিতীয়ত: এটি আপনার উদ্দীপনা, কর্মচাঞ্চল্য ও আনন্দ-অনুভূতি নষ্ট করে দেয়। ফলে বিষয়টি এমন এক বোঝায় পরিণত হয়, যা আপনি নিজের থেকে সরিয়ে ফেলতে চান। আর এর প্রভাব পড়ে আপনার উপস্থাপনার ধরন এবং মানুষের কাছে আপনার গ্রহণযোগ্যতার ওপর।
তৃতীয়ত: অনেক মানুষই অনুভব করেন যে, খতীব নিজে খুতবা প্রস্তুত করেননি, বরং তিনি তা অন্যের কাছ থেকে নকল করেছেন। আর এর কারণ হলো, খুতবার শৈলী ও বিষয়বস্তুর সাথে তার নিজস্ব শৈলী ও মানের ভিন্নতা। ফলে তাদের কাছে খুতবার কোনো গ্রহণযোগ্যতা থাকে না।
চতুর্থত: আপনি এর থেকে উপকৃত হবেন না; আর যদি উপকৃত হয়েও থাকেন, তবে তা হবে অতি সামান্য। কেননা, যে কাজে এর সম্পাদনকারী গবেষণা ও প্রস্তুতির জন্য পরিশ্রম করেন না, সে কাজ খুব দ্রুতই বিস্মৃত ও বিলীন হয়ে যায়।
আল্লাহ তা‘আলার ইচ্ছা ব্যতীত আপনি অগ্রসর হতে পারবেন না, আপনার উচ্চাকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি পাবে না, আপনার হিম্মত সুদৃঢ় হবে না এবং আপনার ইলম দ্বারা কেউ উপকৃত হতেও পারবে না।
এজন্য আপনি যে খুতবাটি উত্তমরূপে প্রস্তুত করেছেন, সেটির দিকে লক্ষ্য করুন; দেখতে পাবেন, আপনি তা ভুলে যাননি। এমনকি কয়েক বছর পরও যদি আপনি সেটির দিকে ফিরে তাকান, তাহলে এর মধ্যে কী কী বিষয় রয়েছে, তা আপনার জানা থাকবে—যেন অল্প কিছুদিন আগেই আপনি তা পেশ করেছিলেন।
পক্ষান্তরে যেসব খুতবা আপনি অন্যের থেকে গ্রহণ করেছেন, তা আপনি খুব দ্রুতই ভুলে যাবেন। আর তা পরীক্ষা করে দেখুন, চার বা পাঁচ বছর অতিবাহিত হওয়া খুতবাগুলোর দিকে ফিরে যান, আপনি দেখতে পাবেন যে, আপনি তা ভুলে গেছেন অথবা তাতে যা এসেছে তার সামান্য অংশই কেবল স্মরণ করতে পারছেন।
তাছাড়া এর উপাদানসমূহ একত্র করে এমন একটি উপকারী কিতাব প্রস্তুত করার ক্ষেত্রেও আপনি তা দ্বারা উপকৃত হতে পারবেন না।
সুতরাং খুতবা প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে এমনভাবে সচেষ্ট হোন যেন আপনি তা একটি বই আকারে প্রকাশ করবেন। অতএব, হাদীসগুলোর তাখরীজ করুন এবং কতক মুহাদ্দিসের বক্তব্যের সহায়তায় সেগুলোর বিশুদ্ধতার স্তর বর্ণনা করুন, আপনার ব্যবহৃত উৎস ও তথ্যসূত্রগুলো যাচাইপূর্বক উল্লেখ করুন এবং এর ব্যাকরণগত, বানানগত ও ভাষাগত বিশুদ্ধতার প্রতি গুরুত্বারোপ করুন।
[১৫] (বিরামচিহ্নের প্রতি লক্ষ্য রাখা)
আপনি যখন খুতবা পাঠ করবেন, তখন বিরাম ও যতিচিহ্ন, যেমন কমা ও এ জাতীয় চিহ্নের প্রতি গুরুত্বারোপ করুন এবং নিজের শ্বাস-প্রশ্বাসের প্রতি লক্ষ্য রেখে থামার জন্য নিজস্ব কিছু বিশেষ চিহ্ন নির্ধারণ করুন, যাতে অনুপযুক্ত স্থানে বারবার থামার কারণে আপনাকে বিব্রত হতে না হয়।
[১৬] (বিষয়বস্তু ও উপস্থাপনার ধরন বৈচিত্র্যময় করার গুরুত্ব)
বিষয়বস্তু উপস্থাপনে বৈচিত্র্য আনুন এবং একটিমাত্র রীতিতে সীমাবদ্ধ থাকবেন না। যেমন- আপনার খুতবাগুলো কেবল অন্তরের অবস্থা সম্পর্কে হওয়া, অথবা উম্মাহর সাধারণ বিষয়াবলি সম্পর্কে হওয়া কিংবা এ জাতীয় অন্য কোনো বিষয়ে হওয়া। বরং মানুষের দ্বীন ও দুনিয়ার প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রাখুন।
বরং প্রচুর বৈচিত্র্য আনবেন; যাতে মানুষের অন্তরে আপনার খুতবার প্রতি আগ্রহ জাগাতে পারেন।
আর যদি আপনি খুতবাগুলোকে পরস্পর সংযুক্ত একটি ধারাবাহিকতায় সাজান, তবুও প্রয়োজনের সময় সে ধারাবাহিকতা ভেঙে দিতে কোনো বাধা নেই।
জেনে রাখুন, কিতাব, সহীহ সুন্নাহ এবং সম্মানিত সাহাবীগণ—রাদিয়াল্লাহু আনহুম—এর বাণী থেকে গৃহীত গল্পগুলোর প্রভাব শ্রোতাদের ওপর সর্বাধিক। এতে রয়েছে মহান শিক্ষা ও উপদেশ, নসীহত এবং অমূল্য রত্ন। সুতরাং এগুলোর প্রতি এবং আকর্ষণীয় পদ্ধতিতে তা উপস্থাপনের ব্যাপারে যত্নবান হোন। আর তা থেকে ফায়দা ও শিক্ষা আহরণ করুন।
আর আপনার খুতবাকে বিভিন্ন ঘটনা, কাহিনী, বাস্তব উদাহরণ ইত্যাদির উল্লেখ থেকে শূন্য রাখবেন না; যাতে খুতবাগুলো একঘেয়ে ও ভারী না হয়ে যায়।
আর কাহিনী ও ঘটনাবলী উপস্থাপনার ক্ষেত্রে সর্বোত্তম পদ্ধতি অবলম্বনে আপনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন এবং নিজের হৃদয় দিয়ে সেগুলোর সাথে একাত্ম হবেন; তা যেন আপনার চেহারার অভিব্যক্তি ও কণ্ঠস্বরে প্রকাশ পায়।
আর আপনি মানুষের বাস্তব অবস্থা ও তাদের দুঃখ-কষ্টের মাঝে জীবনযাপন করতে সচেষ্ট হোন, যাতে আপনি এক জগতে আর তারা অন্য জগতে না থাকে।
[১৭] (বক্তৃতা প্রদান ও প্রভাব বিস্তারের দক্ষতা এবং কলাকৌশল অর্জনের গুরুত্ব)
বক্তৃতা প্রদানের দক্ষতা ও কলাকৌশল অর্জনের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে খতীবই সর্বাধিক যোগ্য। কেননা খতীবের প্রয়োজন হয় মানুষকে বোঝানো এবং তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা, যাতে তিনি তাদের উদ্দেশ্যে যা বলেন তা তারা গ্রহণ করতে পারে।
আর শক্তিশালী বাচনভঙ্গি ও চমৎকার উপস্থাপনার অধিকারী খতীবের মাধ্যমে মানুষ —সাধারণত— এমন ব্যক্তির চেয়ে বেশি উপকৃত হয়, যার মাঝে এই বৈশিষ্ট্য নেই, এমনকি সে যদি অধিক ইলম ও উচ্চতর পদমর্যাদার অধিকারীও হয়।
সুতরাং খতীবের উচিত বক্তৃতাশিল্প বিষয়ক দরসসমূহ শ্রবণ করা, আর যদি তিনি সেগুলোতে উপস্থিত হন তবে তা অধিক উত্তম, অথবা এ সংশ্লিষ্ট বইসমূহ পাঠ করা।
আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে সত্যবাদী হয় এবং নিজের নফস ও সময়কে তাঁর জন্য উৎসর্গ করে, আল্লাহ তাকে তাঁর দয়া ও অনুগ্রহ থেকে এমন কিছু দান করেন, যা তার ধারণাতেও ছিল না এবং তার কল্পনায়ও আসেনি। আর যে ব্যক্তি আল্লাহকে তা প্রদান করে যা তিনি ভালোবাসেন, আল্লাহ তাকে তার পছন্দের চেয়েও অধিক দান করেন। আর যে ব্যক্তি নিজের নফসকে আল্লাহর জন্য নিয়োজিত করে, আল্লাহ তাঁর সৃষ্টিকে তার অনুগত করে দেন এবং তার জন্য সৌভাগ্য, মর্যাদা ও প্রতিষ্ঠার উপায়সমূহকে নিয়োজিত করে দেন।
আপনার ও মহান রবের অনুগ্রহসমূহ লাভের মাঝে কেবল এতটুকুই ব্যবধান—সত্যনিষ্ঠ সংকল্প, আল্লাহর জন্য দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি, আপনি যা ভালোবাসেন ও কামনা করেন তা বর্জন করে আল্লাহ যা ভালোবাসেন ও যাতে তিনি সন্তুষ্ট হন, তা গ্রহণ করা; আর তাঁর দীন ও শরিয়তের মর্যাদা সমুন্নত করার জন্য নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া—যদিও এর ফলে দুনিয়াদার, প্রবৃত্তির অনুসারী ও পদমর্যাদাপ্রত্যাশীদের কাছে আপনার মর্যাদা হ্রাস পায়।
[১৮] সংস্কারের সূচনা
নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা মানুষকে অধিকতর উত্তম কিছুর দিকে পরিবর্তন ও নতুনত্বের প্রতি অনুরাগী করে সৃষ্টি করেছেন। ফলে দেখা যায়, মানুষ এক অবস্থায় স্থির থাকে না এবং জীবনে যখনই নতুন কিছুর উদ্ভব হয়, সামর্থ্য অনুযায়ী তারা তা অর্জনে দ্রুত অগ্রসর হয়।
সুতরাং আজকের মানুষ আর দশ বছর আগের মতো নেই; বরং আজ আপনি তাকে দেখতে পাবেন—সে তার জীবনযাপন, যানবাহন ও বাড়িঘরের বাহ্যিক অবস্থা পরিবর্তন ও নবায়ন করে সেগুলোকে আরও উন্নত করেছে।
জুম‘আর খতীব: নিজের উপস্থাপনা-শৈলী নবায়ন ও উন্নত করা এবং বক্তব্য উপস্থাপন ও প্রভাব বিস্তারের দক্ষতা বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য ব্যক্তিদের অন্যতম। কেননা, তিনি যদি খুতবার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে যে ধারায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন, সেই একই ধারায় চলতে থাকেন, তাহলে নিঃসন্দেহে তিনি আরও উত্তম ও শ্রেয়তর অবস্থার দিকে অগ্রসর হতে পারবেন না; বরং তাঁর অবনতি ঘটবে। কারণ, মানুষের স্বভাবই এমন যে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার উদ্যম ও কর্মতৎপরতা দুর্বল হয়ে পড়ে, তার প্রাণশক্তি ম্লান হয়ে আসে এবং তার প্রভাব কমে যায়। তাই তার এমন কিছুর প্রয়োজন, যা তাকে সক্রিয় ও সতেজ করবে, তার উদ্যম ও প্রাণশক্তিকে শক্তিশালী করবে এবং তার দক্ষতা ও উপস্থাপনা-পদ্ধতিগুলোকে বিকশিত করবে; যাতে তার ওপর, তার ইন্দ্রিয়সমূহে এবং তার উদ্যমে এসে পড়া দুর্বলতাগুলো সে কাটিয়ে উঠতে পারে।
আর অধিকাংশ খতীবের মাঝে খুতবা প্রদান শুরু করার পর থেকে সুস্পষ্ট কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। তাহলে এর অর্থ কি এই যে, তাঁরা শুরু থেকেই পূর্ণতা অর্জন করেছিলেন?
না।
তাহলে কেনইবা সে তার অভ্যস্ত রীতির উপর অটল থাকে, আর নিজের পদ্ধতি ও উপস্থাপনার ব্যাপারে যত্নবান হয় না এবং উন্নয়ন, নবায়ন ও সৃজনশীলতার ক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে না; অথচ সে তার জীবনজীবিকা ও দুনিয়াবী বিষয়াদির উন্নতিসাধনে কঠোর প্রচেষ্টা চালিয়েছে?
আর তিনি কীভাবে এর জন্য সচেষ্ট হবেন না, অথচ তাঁর জীবনে সম্পাদিত সর্বাধিক সম্মানিত ও মহান কাজগুলোর অন্যতম হলো খুতবার দায়িত্ব পালন?
[১৯] (প্রভাব বিস্তারের দুটি উপকরণের প্রতি যত্ন নেওয়া: কণ্ঠস্বর ও দৃষ্টি।)
সফল খতীবের এই দুটি উপকরণ ব্যবহার করা অত্যন্ত প্রয়োজন:
১- কন্ঠস্বর, এটি প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম। আর নিম্নোক্ত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখার মাধ্যমে এর প্রভাব পূর্ণতা লাভ করে:
ক- উঁচু-নিচু এবং দ্রুত ও ধীর হওয়ার ক্ষেত্রে কণ্ঠস্বরের মাত্রা মধ্যম পর্যায়ের হওয়া। সুতরাং তা এমন নিচু বা ধীর হবে না, যা শ্রোতাদের মাঝে একঘেয়েমি ও ক্লান্তি সৃষ্টি করে এবং এমন উঁচু বা দ্রুতও হবে না, যা তাদের জন্য বিরক্তির কারণ হয় অথবা তাদের মনোযোগ ও অনুধাবনের সক্ষমতাকে ব্যাহত করে।
খ- কণ্ঠস্বর একঘেয়ে না হওয়া; কেননা কোনো কোনো খতীবের কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ খুতবায় একই রকম থাকে, ফলে তা দুর্বল হলে শ্রোতাদের ক্লান্ত করে তোলে, আর জোরালো ও উঁচু হলে তাদের বিরক্ত করে।
একই স্বরে বক্তব্য প্রদান: এর ফলে খতীবের বক্তব্যের সঙ্গে শ্রোতাদের সম্পৃক্ততা নষ্ট হয়ে যায়; কারণ গুরুত্বপূর্ণ ও অন্যান্য বক্তব্যের মধ্যে তারা কোনো পার্থক্য করতে পারবে না। আর এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী বক্তব্যের ক্ষেত্রে কথার গতি বাড়ানোর সঙ্গে আওয়াজ উল্লেখযোগ্যভাবে উঁচু করা, অথবা কথার গতি কমানোর সঙ্গে আওয়াজ নিচু করা প্রয়োজন।
গ- বাক্যের অবস্থান অনুযায়ী তার স্বরবিন্যাস করা; সুতরাং তা যদি প্রশ্নবোধক হয়, তবে তা প্রশ্নকারীর ভঙ্গিতে উপস্থাপন করুন, আর তা যদি বিস্ময়বাচক হয়, তবে তা বিস্ময় প্রকাশকারীর ভঙ্গিতে উপস্থাপন করুন, আর এভাবেই অন্যান্যগুলো।
ঘ- স্বাভাবিক কথাবার্তার চেয়ে মুখ কিছুটা বেশি উন্মুক্ত রাখুন; কারণ এটি হরফসমূহের মাখরাজ সুস্পষ্ট করতে, সেগুলো একে অপরের সাথে জড়িয়ে যাওয়া রোধ করতে এবং কণ্ঠস্বর নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। তবে তা যেন অতিরঞ্জিত না হয়; কেননা মুখ খোলার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা হলে তা মাত্রাতিরিক্ত উত্তেজনার দিকে নিয়ে যায় এবং খতীবের জন্য একটি অশোভন দৃশ্যের অবতারণা করে।
ঙ- আপনার স্বাভাবিক স্বরে খুতবা প্রদান করুন এবং খুতবার জন্য বিশেষ কোনো স্বর ও বাচনভঙ্গি অবলম্বন করবেন না। কেননা, তা আপনার ও মানুষের মাঝে দূরত্ব সৃষ্টির কারণ হবে এবং শ্রোতাদের ওপর প্রভাব বিস্তারের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যমগুলো হারানোর কারণ হবে।
যেসব ক্ষেত্রে থামা সমীচীন, সেসব ক্ষেত্রে সামান্য বিরতি দেওয়া। সুতরাং খতীব যখন এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উপনীত হন যা তিনি তার শ্রোতাদের মনে গেঁথে দিতে চান: তখন তিনি তাদের দিকে মনোনিবেশ করবেন এবং কোনো কথা না বলেই এক মুহূর্তের জন্য সরাসরি তাদের চোখের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করবেন।
আর এই হঠাৎ চুপ থাকা তাদের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলে, যার ফলে তা তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে এবং তাদের প্রত্যেককে সেই চুপ থাকার পর যা আসবে তার জন্য মনোযোগী ও প্রস্তুত করে তোলে।
তবে বিরতি দীর্ঘ ব্যবধান এবং কৃত্রিমতা ছাড়া হওয়া আবশ্যক।
এর উদাহরণ: (আলী —রাযিয়াল্লাহু আনহু— নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে কিছু সোনা পাঠিয়েছিলেন, অতঃপর তিনি তা তাঁর কিছু সাহাবীর মাঝে বণ্টন করে দিলেন।
অতঃপর এক ব্যক্তি এসে বলল: আল্লাহকে ভয় করুন, হে আল্লাহর রাসূল! (...)
সত্যবাদী বিশ্বস্ত সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি এ কী চরম ধৃষ্টতা!!
আর সেকারণেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ধৃষ্টতায় বিস্মিত হয়ে বললেন: (...) “আমি যদি অবাধ্যতা করি, তাহলে কে আল্লাহর আনুগত্য করবে? আল্লাহ আমাকে যমীনবাসীর ব্যাপারে বিশ্বস্ত মনে করেছেন, অথচ তোমরা আমাকে বিশ্বস্ত মনে করছ না?)
দুই বন্ধনীর মাঝের অংশ সামান্য বিরতি নির্দেশ করে; কারণ শ্রোতাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে এবং এরপর যা বলা হবে তার প্রতি তাদের আগ্রহ জাগিয়ে তুলতে পরিস্থিতি তা দাবি করে।
আর প্রথম বাক্যটি: “সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি এমন ধৃষ্টতা—কী চরম ধৃষ্টতা!!”—এটি ছিল একটি বিস্ময়সূচক বাক্য। তাই প্রেক্ষাপটের দাবি ছিল, তিনি বাক্যটিকে বিস্ময় প্রকাশের ভঙ্গিতে রচনা করবেন।
আর দ্বিতীয় বাক্যটি হলো: (আমি যদি অবাধ্য হই, তবে কে আল্লাহর আনুগত্য করবে? আল্লাহ আমাকে পৃথিবীবাসীর ব্যাপারে বিশ্বস্ত মনে করেন, অথচ তোমরা আমাকে বিশ্বস্ত মনে করছ না?), এটি ছিল একটি অস্বীকৃতিমূলক প্রশ্নবোধক শৈলী, সুতরাং প্রেক্ষাপটের দাবি হলো, তিনি একে একজন অস্বীকৃতিজ্ঞাপক প্রশ্নকারীর রূপেই গঠন করবেন।
২- দৃষ্টিপাত: আর তা হলো সকল শ্রোতার প্রতি দৃষ্টি ছড়িয়ে দেয়া এবং তুমি যে কথা বলছ তার সাথে চোখের মাধ্যমে ভাববিনিময় করা, আর তা নিম্নরূপ:
ক- ডানে-বামে সামান্য মুখ ঘোরানো; তবে দ্রুততার সঙ্গে বা বারবার মুখ ঘোরানোর ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি না করা। কেননা, বিশেষ করে খতীবের জন্য এটি বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ, এটি খতীবের আবেগকে প্রাধান্য দেওয়া এবং সেই আবেগের তার ওপর আধিপত্য বিস্তারের নির্দেশ করে। আর এর ফলে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করার ক্ষেত্রে যথাযথতা নষ্ট হয়।
খ- চোখ খোলা কিংবা তাতে সামান্য চাপ দেওয়ার মাধ্যমে; কারণ উপস্থিত ব্যক্তিদের ওপর চোখের নড়াচড়ার গভীর প্রভাব রয়েছে। তারা চোখের এসব ভঙ্গি থেকে এমন অনেক তাৎপর্য বুঝে নেয়, যা হয়তো মুখের ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব হয় না।
আর কণ্ঠস্বর ও দৃষ্টি—এ দুটি শ্রোতাদের ওপর খতীবের প্রভাব বিস্তারের দুটি মৌলিক স্তম্ভ। এ দুটি ছাড়া তিনি যা চান, তা তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা হারান; তাদেরকে বোঝানো, তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করা এবং তাদের মধ্যে উদ্দীপনা ও কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি করার ক্ষমতাও হারান।
আর প্রত্যেক খতীবের পক্ষেই কোনো রকম দ্বিধা ও কৃত্রিমতা ছাড়াই উভয়টি ব্যবহার করা সম্ভব, তবে কোনো রকম বাড়াবাড়ি ছাড়া। কারণ, এ ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করা চপলতা ও অস্থিরতার পরিচায়ক। তেমনিভাবে গাম্ভীর্য ও স্থিরতার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করাও একঘেয়েমি ও বিরক্তির উদ্রেক করে। আর সকল কাজের মধ্যে মধ্যমপন্থাই সর্বোত্তম।
এমন কিছু উপকরণও রয়েছে, যা জুমুআর খতীবের জন্য উপযুক্ত নয়। এর মধ্যে রয়েছে:
১- দুই হাত নাড়ানো।
০২- বিশ্ত বা পাগড়ি নাড়ানো, মাইক্রোফোন নিয়ে অযথা নাড়াচাড়া করা, সামনে-পেছনে এগোনো ও পিছিয়ে আসা ইত্যাদি।
[২০] (এমন কোনো নির্দিষ্ট শব্দাবলি বা পদ্ধতি অপরিহার্য করে নেবেন না, যা সহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়)
সহীহ সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হওয়া ছাড়া নির্দিষ্ট কোনো শব্দাবলি অপরিহার্য করে নেওয়া উচিত নয়, যাতে তা সুন্নাত বলে ধারণা করা না হয়, যেমন প্রথম খুতবার শেষে বলা: "আল্লাহ আমার ও আপনাদের জন্য মহা কুরআনে বরকত দান করুন.."
প্রায়ই কিছু খতীব খুতবার শেষে একটি নির্দিষ্ট দোয়াই নিয়মিত পড়েন, যার বাইরে তাঁরা প্রায় যানই না। আবার তাঁদের কেউ কেউ এই বারবার পড়া দোয়াটিও দীর্ঘ করেন। এমনকি খতীব যখন দোয়া শুরু করেন, তখন অনেক মানুষই অস্বস্তি ও বিরক্তি বোধ করেন; কারণ তাঁরা একই দোয়া এমন এক পদ্ধতিতে বারবার পড়তে শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন, যেখানে একটানা বর্ণনা করে যাওয়াই প্রাধান্য পায় এবং দোয়ায় কাঙ্ক্ষিত আন্তরিকতা ও ভাব-অনুভূতির প্রকাশ থাকে না।
[২১] (হরফসমূহের মাখরাজের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং সেগুলোকে পরস্পর মিশিয়ে না ফেলা)
হরফগুলোকে তাদের মাখরাজ থেকে সঠিকভাবে উচ্চারণ করার ব্যাপারে যত্নবান হোন; কেননা বিশুদ্ধতা, সুস্পষ্টতা এবং কথার শক্তিমত্তার ক্ষেত্রে এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে।
খতীবের যেসব ত্রুটি ধরা হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো—তাড়াহুড়ো করে শব্দ উচ্চারণ করা; ফলে প্রথম অক্ষর বা শব্দটি তার যথাস্থানে স্থির হওয়ার আগেই পরবর্তী অক্ষর বা শব্দের সঙ্গে তা যুক্ত হয়ে যায়। আর সুন্দর শিষ্টাচার হলো—অক্ষরগুলোকে যথাযথভাবে স্পষ্ট করে উচ্চারণ করা এবং শব্দগুলোকে পরস্পর থেকে সুস্পষ্টভাবে পৃথক করা ([১৫])। - "আল-খাতাবাহ ইন্দাল আরব", মুহাম্মাদ আল-খিদর হুসাইন রচিত: ১৮৯।
আর সৃষ্টিকুলের সর্বাধিক বিশুদ্ধভাষী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কথাও এমনই ছিল।
উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশাহ রদিয়াল্লাহু আনহা বলেন: “নিশ্চয় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের কথা বলার মত করে কথা বলতেন না।” ([১৬])। - এটি বুখারী (৩৫৬৮) ও মুসলিম (২৪৯৩) বর্ণনা করেছেন।
[২২] খুতবার উদ্দেশ্য এবং সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ, যা খতীবের অবশ্যই আলোচনা করতে হবে।
খতীবের উচিত মানুষকে পার্থিব জগৎ, এর দুশ্চিন্তা ও ঘটনাবলী থেকে আখিরাতের জগৎ এবং তার জন্য প্রস্তুতির দিকে নিয়ে যাওয়া। আর মসজিদ কোনো প্রচারমঞ্চ হওয়া উচিত নয়, যেখানে খতীব রাজনৈতিক বিষয়াবলি নিয়ে আলোচনা করবেন এবং এমনসব বিষয়ে লিপ্ত হবেন, যা শ্রোতাদের দ্বীন বা দুনিয়ার কোনো উপকারে আসে না।
আর তাওফীকপ্রাপ্ত খতীবের অধিকাংশ খুতবা এমন বিষয়ে হয়ে থাকে, যা ঈমান ও আল্লাহ তা‘আলার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে। কেননা মানুষের ঈমান যখন বৃদ্ধি পায় এবং তাদের রবের সাথে তাদের সম্পর্ক সুদৃঢ় হয়, তখন এটিই তাদের পাপাচার ও তুচ্ছ বিষয়াবলি বর্জনের সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আর খতীবের যে সমস্ত বিষয়বস্তু সম্পর্কে উদাসীন হওয়া উচিত নয় এবং সর্বদা তা পুনরাবৃত্তি করা আবশ্যক, তার মধ্যে অন্যতম হলো:
তাওহীদ ও ইসলামের রুকন।
সালাতের পদ্ধতি এবং তাতে বিনয়াবনতার গুরুত্ব।
মৌসুমকেন্দ্রিক বিষয়সমূহ; যেমন—রমাদান মাসের সময় এলে এর ফযীলত সম্পর্কে আলোচনা করা।
ফিতনা থেকে সতর্কীকরন এবং তা মোকাবিলার পদ্ধতি।
বিদ‘আত হতে সতর্কীকরণ।
শয়তানের ষড়যন্ত্র ও তার প্ররোচনার পথসমূহ থেকে সতর্কীকরন।
আখলাক ও আদব এবং তৎসংশ্লিষ্ট বিষয়াবলী।
আর যেসব বিষয় ঈমান ও আল্লাহ তা‘আলার সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে, তন্মধ্যে অন্যতম:
১- মানুষের অন্তরে তাঁর গুণাবলী ও নিয়ামতসমূহ স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহর মহিমা ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করা।
২- আল-কুরআনকে সম্মান করা, যা তাঁরই বাণী।
৩- নবীগণ আলাইহিমুস সালাম—যাঁদের শীর্ষে রয়েছেন তাঁদের সর্বশেষ নবী, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এবং সম্মানিত সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের ঘটনাবলি উল্লেখ করা।
০৪- জান্নাতের গুণাবলি ও এতে প্রবেশের কারণসমূহ এবং অনুরূপভাবে জাহান্নামের আলোচনা।
৫- অন্তরের ইবাদাতের প্রতি যত্নবান হওয়া, যেমন: তাওয়াক্কুল, প্রত্যাবর্তন, তাওবা, ভয় ও খুশু।
ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন: «যে ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের খুতবাসমূহ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা করবে, সে দেখতে পাবে যে, সেগুলো হিদায়াত ও তাওহীদ, রব—জাল্লা জালালুহু—এর সিফাত, ঈমানের সামগ্রিক মূলনীতিসমূহ এবং আল্লাহর পথে দাওয়াতের বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার জন্য যথেষ্ট। পাশাপাশি তাতে রয়েছে আল্লাহ তা‘আলার সেসব নি‘আমতের বর্ণনা, যা তাঁকে তাঁর সৃষ্টির কাছে প্রিয় করে তোলে; তাঁর সেসব দিনসমূহের বর্ণনা, যা তাদেরকে তাঁর শাস্তির ভয় দেখায়; এবং তাঁর যিকির ও শুকরিয়া আদায়ের নির্দেশ, যা তাদেরকে তাঁর প্রিয় করে তোলে। তাঁরা আল্লাহর মহত্ত্ব, তাঁর সিফাত ও তাঁর নামসমূহের এমন বিষয় উল্লেখ করতেন, যা তাঁকে তাঁর সৃষ্টির কাছে প্রিয় করে তোলে। আর তাঁর আনুগত্য, তাঁর শুকরিয়া আদায় ও তাঁর যিকিরের এমন নির্দেশ দিতেন, যা তাদেরকে তাঁর প্রিয় করে তোলে। ফলে শ্রোতারা এমন অবস্থায় ফিরে যেত যে, তারা আল্লাহকে ভালোবেসেছে এবং আল্লাহও তাদেরকে ভালোবেসেছেন।»
“অতঃপর দীর্ঘকাল অতিবাহিত হলো এবং নবুওয়াতের নূর ম্লান হয়ে গেল। শরীআত ও বিধানসমূহ এমন কিছু আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হলো, যা সেগুলোর প্রকৃত তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য বিবেচনা না করেই পালন করা হতে লাগল। ফলে তারা সেগুলোর বাহ্যিক রূপটুকু বজায় রাখল এবং নানা উপায়ে সেগুলোকে সজ্জিত করল। অতঃপর তারা এসব আনুষ্ঠানিকতা ও রীতিনীতিকে এমন সুন্নাতে পরিণত করল, যা লঙ্ঘন করা উচিত নয়; অথচ তারা সেই উদ্দেশ্য ও মর্মগুলোই নষ্ট করল, যেগুলো নষ্ট করা কোনোভাবেই উচিত ছিল না। ফলে তারা খুতবাগুলোকে ছন্দময় বাক্য এবং অলংকারশাস্ত্রের নানা কৌশল দ্বারা সুসজ্জিত করল। এতে খুতবাগুলো থেকে অন্তরসমূহের প্রাপ্তি কমে গেল; বরং তা একেবারেই বিলুপ্ত হয়ে গেল এবং খুতবার মাধ্যমে যে উদ্দেশ্য সাধন করা হয়েছিল, তা ব্যর্থ হয়ে গেল।” সমাপ্ত [১৭]। - "যাদুল মা'আদ ফি হাদয়ি খাইরিল ‘ইবাদ": ১/৪০৯-৪১০।
তিনি—রাহিমাহুল্লাহ—খুতবার উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যে বলেন: “খুতবা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—আল্লাহর প্রশংসা ও তাঁর গুণগান করা, তাঁর একত্বের সাক্ষ্য দেওয়া এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রিসালাতের সাক্ষ্য দেওয়া; বান্দাদেরকে তাঁর দিনসমূহ স্মরণ করিয়ে দেওয়া; তাঁর শাস্তি ও গজব সম্পর্কে তাদের সতর্ক করা; তাদেরকে এমন বিষয়ের উপদেশ দেওয়া, যা তাদেরকে তাঁর এবং তাঁর জান্নাতের নিকটবর্তী করে; আর এমন বিষয় থেকে তাদের নিষেধ করা, যা তাদেরকে তাঁর অসন্তুষ্টি ও জাহান্নামের নিকটবর্তী করে। সুতরাং এটিই হলো খুতবার এবং এর জন্য সমবেত হওয়ার উদ্দেশ্য।” সমাপ্ত। ([১৮]) - "প্রাগুক্ত": ১/৩৮৬।
আর খতীবের উচিত, আক্বীদা, ইবাদাত, আখলাক, পারস্পরিক লেনদেন, জীবনযাপন, লালন-পালন এবং অনুরূপ বিষয়ে মানুষের মাঝে প্রচলিত ভুলভ্রান্তি সম্পর্কে তাদেরকে সচেতন করা, ফিতনায় জড়িয়ে পড়া থেকে তাদেরকে সতর্ক করা এবং তাদেরকে তাদের দ্বীনের বিষয়াদি শিক্ষা দেওয়া।
আল্লাহই অধিক অবগত। আর আল্লাহ আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তাঁর পরিবার-পরিজন এবং তাঁর সকল সাহাবির ওপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন।
Related books
All books
মুয়াজ্জিন, ইমাম, খতীব এবং মসজিদ বিষয়ক পুস্তিকা36 ভাষামুয়াজ্জিন, ইমাম, খতীব এবং মসজিদ বিষয়ক পুস্তিকা
এই কিতাবটি আযান ও ইকামত, সালাতের ইমামতি, জুমু‘আর খুতবা এবং মসজিদের আদব সম্পর্কিত বিধানসমূহের সার্বিক ধারণা প্রদান করে। কিতাবটিতে মুয়াজ্জিন, ইমাম ও খতীবদের কর্তব্যসমূহ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং এসব দায়িত্ব সঠিকভাবে সম্পাদন নিশ্চিত করার জন্য এ সম্পর্কিত শর‘ঈ বিধানসমূহ জানার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ ও সেগুলোর ব্যাখ্যাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যাতে এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়।
ইসলাম আল্লাহর রাসূলগণের ধর্ম85 ভাষাইসলাম আল্লাহর রাসূলগণের ধর্ম
ইসলাম হলো বিশ্বজগতের স্রষ্টা ও নির্বাহক আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করা এবং ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার সাথে তাঁর জন্য অনুগত হওয়া। ইসলামের ভিত্তি হল আল্লাহতে ঈমান আনয়ন করা, তিনিই হলেন স্রষ্টা এবং তিনি ব্যতীত অন্য সব কিছু সৃষ্ট মাখলূক। একমাত্র তিনি ইবাদতের হকদার, তাঁর কোনো অংশীদার নেই। তিনি ছাড়া কেউ সত্যিকারের মাবূদ (উপাস্য) নেই। তাঁর রয়েছে সবচেয়ে সুন্দরতম নামসমূহ এবং সুউচ্চ গুণাবলি। তাঁর রয়েছে নিঃশর্ত পরিপূর্ণতা, এতে কোন অপূর্ণতা নেই। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি। তাঁর সমকক্ষ ও সমতুল্য কেউ নেই। তিনি তাঁর কোন সৃষ্টির কোনো জিনিসের মধ্যে প্রবেশ করেন না এবং সৃষ্টিকুলের শরীরও গ্রহণ করেন…
الإسلام دين رب العالمين
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি79 ভাষানবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি
নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি শীর্ষক বইটিতে সম্মানিত শাইখ আব্দুল আযীয বিন বায রহ. সহজ সাবলীল ও সূক্ষ্ম পদ্ধতিতে বিশুদ্ধ দলীল প্রমাণের ভিত্তিতে নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের সালাত আদায়ের পদ্ধতি সংক্ষিপ্তাকারে বর্ণনা করেছেন, যাতে এ বইটি একজন মুসলিমের সালাতের পথনির্দেশকারী হয়। এতে তিনি দলীল-প্রমাণসহ অযু থেকে শুরু করে সালাম ফেরানো পর্যন্ত সালাতের রুকন, সুন্নাত ইত্যাদি আদায়ের পদ্ধতি বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। মানুষের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত সালাত আদায় যেন নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণে হয়ে থাকে, তিনি সে দিকে আহ্বান করেছেন।