Skip to content
তাওহীদের কতিপয় নিদর্শন

তাওহীদের কতিপয় নিদর্শন

পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে শুরু করছি সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। শুভপরিণাম মুত্তাকিদের জন্য। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তার উপর, তার পরিবারবর্গ ও সকল সাহাবীর উপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন। অতঃপর: তাওহীদই হল দ্বীনের প্রথম ও শেষ এবং এর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দিক। এটি রাসূলদের দাওয়াতের প্রথম ও শেষ। এটি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর মর্মার্থ। এ উদ্দেশ্যেই সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করা হয়েছে, রাসূলগণ প্রেরিত হয়েছেন এবং কিতাবসমূহ…

Language: lang_bn
Prepared by: আব্দুর রাজ্জাক বিন আব্দুল মুহসিন আল-বদর
Version: 1.0

তাওহীদের কতিপয় নিদর্শন

আব্দুর রাজ্জাক বিন আব্দুল মুহসিন আল-বদর

পরম করুণাময়, অতি দয়ালু আল্লাহ্‌র নামে শুরু করছি

সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। শুভপরিণাম মুত্তাকিদের জন্য। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ব্যতীত কোন সত্য ইলাহ নেই, তিনি এক, তাঁর কোন শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তার উপর, তার পরিবারবর্গ ও সকল সাহাবীর উপর সালাত ও সালাম বর্ষণ করুন। অতঃপর:

তাওহীদই হল দ্বীনের প্রথম ও শেষ এবং এর অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক দিক। এটি রাসূলদের দাওয়াতের প্রথম ও শেষ। এটি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ'-এর মর্মার্থ। এ উদ্দেশ্যেই সৃষ্টিকুলকে সৃষ্টি করা হয়েছে, রাসূলগণ প্রেরিত হয়েছেন এবং কিতাবসমূহ নাযিল করা হয়েছে। এর মাধ্যমেই মানুষ মুমিন ও কাফির, জান্নাতবাসী সুখী ও জাহান্নামবাসী দুর্ভাগা ভাগে বিভক্ত হয়েছে। এটি মুকাল্লাফের উপর প্রথম ওয়াজিব। এটি ইসলামের হাকীকত; যা ছাড়া আল্লাহ অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করবেন না। এর গুরুত্ব মহান ও অপরিসীম এবং প্রত্যেকেই একে স্মরণ ও উপলব্ধি করার মুখাপেক্ষী। 'মিন মা'আলিম আত-তাওহীদ' বা ‘তাওহীদের কতিপয় নির্দশন’ নামক এ পুস্তিকায় নিম্নলিখিত মাসয়ালাগুলোর মাধ্যমে তাওহীদের আলোকবর্তিকা ও নিদর্শনসমূহের কিছু ব্যাখ্যা করা হয়েছে:

প্রথম মাসয়ালা: তাওহীদের বৈশিষ্ট্যাবলী ও ফযীলত।

দ্বিতীয় মাসয়ালা: তাওহীদের সংজ্ঞা ও বাস্তবতা।

তৃতীয় মাসয়ালা: তাওহীদের বাস্তবায়ন ও পরিপূর্ণতা।

চতুর্থ মাসয়ালা: তাওহীদ ভঙ্গকারী ও তাতে ত্রুটি সৃষ্টিকারী বিষয়সমূহ।

পঞ্চম মাসয়ালা: তাওহীদের উৎস ও ভাণ্ডার।

ষষ্ঠ মাসয়ালা: তাওহীদের ফলাফল ও উপকারিতা।

এই ছয়টি মাসয়ালা নিয়ে এই পুস্তিকায় সংক্ষেপে আলোচনা করা হবে। এই মাসয়ালাগুলোর প্রতিটি মাসয়ালা বিস্তারিত ব্যাখ্যার দাবি রাখে, কিন্তু আমি -আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালার ইচ্ছায়- প্রয়োজনীয় অংশটুকু সংক্ষেপে আলোচনা করব যাতে উদ্দেশ্য হাসিল হয়। আর একমাত্র আল্লাহর কাছ থেকেই সাহায্য ও তাওফীক প্রার্থনা করা হয়।

প্রথম মাসয়ালা:

তাওহীদের বৈশিষ্ট্যাবলী ও ফযীলত

জেনে রাখুন! তাওহীদের অনেক বৈশিষ্ট্য ও ফযীলত রয়েছে, যা এর উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানিত অবস্থানের প্রমাণ বহন করে। আমি এখানে এর দশটি বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করব:

প্রথমত: এটি সেই লক্ষ্য, যার জন্য আমরা সৃষ্টি হয়েছি এবং তা বাস্তবায়নের জন্য আমাদেরকে অস্তিত্ব দেওয়া হয়েছে। যেমন আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার নিম্নোক্ত বাণী দ্বারা এটি প্রমাণিত হয়: ”আর আমি সৃষ্টি করেছি জিন এবং মানুষকে এজন্য যে, তারা কেবল আমার ইবাদত করবে।” [সূরা আয-যারিয়াত] আর (তারা কেবল আমার ইবাদত করবে) এর অর্থ হল: তারা যেন তাওহীদ বাস্তবায়ন করে। সুতরাং তাওহীদ হল সেই লক্ষ্য, যার জন্য আমাদেরকে এই জীবনে সৃষ্টি করা হয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেননি এবং আমাদের অযথা ছেড়েও দিবেন না। বরং তিনি সৃষ্টিকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের অস্তিত্ব দিয়েছেন যেন তারা তাঁর তাওহীদ বাস্তবায়ন করে। এটি তাওহীদের বিশাল মর্যাদা ও উচ্চ অবস্থানের জন্য যথেষ্ট প্রমাণ।

দ্বিতীয় বিষয়: তাওহীদ হল নবী ও রাসূলদের দাওয়াতের মৌলিক আলোচ্য বিষয়। অর্থাৎ, আল্লাহ তায়ালা যত নবী প্রেরণ করেছেন, তাদের সকলের দাওয়াত তাওহীদের নির্ভর ও তার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর অনেক প্রমাণ রয়েছে; তন্মধ্যে: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার বাণী: “আর অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্‌র ইবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর।” [আন-নাহল,, আয়াত: ৩৬] মহান আল্লাহ আরো বলেন: “আর আপনার পূর্বে আমি যে রাসূলই প্রেরণ করেছি তার কাছে এ ওহীই পাঠিয়েছি যে, আমি ব্যতীত অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই, সুতরাং তোমরা আমরাই ইবাদত কর।” [সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত: ২৫] তিনি আরো বলেন: “আর আপনার পূর্বে আমি আমার রাসূলগণ থেকে যাদেরকে প্রেরণ করেছিলাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, আমি কি রহমান ছাড়া ইবাদত করা যায় এমন কোন ইলাহ স্থির করেছিলাম?” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৪৫] তিনি আরো বলেন: “আর স্মরণ করুন, ‘আদ সম্প্রদায়ের ভাইয়ের কথা, যখন সে আহকাফে স্বীয় সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিল। যার আগে এবং পরেও সতর্ককারী এসেছিলেন (এ বলে) যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারোও ইবাদত করো না।” [সূরা আল-আহকাফ, আয়াত: ২১] আয়াতে উল্লেখিত (النُّذرُ) শব্দের অর্থ হল, রাসূলগণ; অর্থাৎ তার পূর্বের ও পরের সকল রাসূলগণ এই লক্ষ্যের ব্যাপারে একমত। (যে, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া কারোও ইবাদত করো না।’) সুতরাং তাওহীদই হল নবী ও রাসূলদের দাওয়াতের মূল ভিত্তি। এজন্যই নবীগণ তাদের সম্প্রদায়কে সর্বপ্রথম যে কথা শুনাতেন এবং আল্লাহর দিকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যা দ্বারা শুরু করতেন তা হল তাওহীদের দাওয়াত। কারণ, এটি হল সেই ভিত্তি, যার উপর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত। দ্বীনের উদাহরণ হল একটি গাছের মতো। আর এটি জানা কথা যে, গাছের একটি মূল ও শাখা-প্রশাখা রয়েছে। গাছের অস্তিত্ব মূল ছাড়া সম্ভব নয়, ঠিক তেমনই দ্বীনের অস্তিত্ব তার ভিত্তি ছাড়া সম্ভব নয়, যা হল তাওহীদ। “আপনি কি লক্ষ্য করেন না আল্লাহ্ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছ যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা উপরে বিস্তৃত।” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ২৪] যেমনভাবে গাছের মূল কেটে ফেললে তা মারা যায়, অনুরূপ দ্বীন যদি তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত না হয়, তবে তা থেকে কোন উপকার পাওয়া যায় না। তাই দ্বীনে তাওহীদের অবস্থান হল গাছের মূল এবং ঘরের খুটির মতো।

যে বিষয়টি প্রমাণ করে যে তাওহীদ ছিল নবী-রাসুলদের দাওয়াতের মৌলিক আলোচ্য বিষয় এবং তাদের বার্তার মূল ভিত্তি, তা হলো নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই বাণী যা তার থেকে বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত হয়েছে: "নবীগণ একই পিতার সন্তানের মতো, তাদের মাতারা ভিন্ন, কিন্তু তাদের দ্বীন এক।" [১] অর্থাৎ তাদের আকীদা এক, তারা সকলেই আল্লাহর তাওহীদের দিকে আহ্বানকারী। আর 'তাদের মায়েরা ভিন্ন' অর্থ হলো, তাদের শরীয়ত ভিন্ন ভিন্ন ছিল। “তোমাদের প্রত্যেকের জন্যই আমি একটা করে শরীয়ত ও স্পষ্টপথ নির্ধারণ করে দিয়েছি।” [সূরা আল-মায়িদাহ, আয়াত: ৪৮] [] সহীহ মুসলিম (২৩৬৫), আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীস।

তৃতীয় বিষয়: তাওহীদের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হল, এটি مكلف (যার উপর শরিয়তের বিধান প্রযোজ্য) ব্যক্তির জন্য সর্বপ্রথম ওয়াজিব। এই দ্বীনে প্রবেশের জন্য মানুষের উপর প্রথম যে কর্তব্য বর্তায়, তা হল তাওহীদ। আর যখন কেউ আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয়, তখন তার দাওয়াতের প্রথম বিষয় হওয়া উচিত তাওহীদ। এর উপর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে, তার মধ্যে একটি হল: নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর এই বাণী: “আমি মানুষদের সাথে যুদ্ধ করতে আদিষ্ট হয়েছি যতক্ষণ না তারা এ সাক্ষ্য দিবে যে, আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো ইলাহ নেই।” হাদীসটি শেষ পর্যন্ত। [২[ তার মধ্যে আরেকটি হল: মুয়ায বিন জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ইয়ামানে পাঠানোর সময় নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর উক্তি: “তুমি আহলে কিতাবদের একটি কওমের কাছে যাচ্ছ, সুতরাং প্রথম যে বিষয়ে তুমি তাদেরকে দাওয়াত দিবে তা হচ্ছে: তারা যেন আল্লাহ তায়ালার ইবাদত করে।” হাদীসটির শেষ পর্যন্ত [৩] অপর বর্ণনায় এসেছে: “তুমি আহলে কিতাবদের একটি কওমের কাছে যাচ্ছ, সুতরাং প্রথম যে বিষয়ে তুমি তাদেরকে দাওয়াত দিবে তা হচ্ছে: তারা যেন আল্লাহ তায়ালার তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করে।”([৪]) অপর বর্ণনায় এসেছে: "তুমি আহলে কিতাবের একটি সম্প্রদায়ের কাছে যাচ্ছ, যখন তুমি তাদের কাছে পৌছাবে, তখন তাদেরকে এ সাক্ষ্য দেওয়ার দাওয়াত দেবে যে, আল্লাহ ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর রাসূল।" ([৫]) সুতরাং তাওহীদ হল মুকাল্লাফদের উপর প্রথম ওয়াজিব এবং এর মাধ্যমেই তাদের শুরু করা উচিত। এটি হল সেই প্রথম বিষয়, যার মাধ্যমে মানুষ এই দ্বীনে প্রবেশ করে। বস্তুত দ্বীন তাওহীদের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং এটি হল এমন ভিত্তি, যার উপর দ্বীন গড়ে উঠে। [] সহীহ বুখারী (২৫, ১৩৯৯) ও মুসলিম (২১, ২২), আবু হুরাইরা, ইবনে উমর ও অন্যান্য সাহাবাদের (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) থেকে বর্ণিত। [] সহীহ বুখারী (১৪৫৮), মুসলিম (১৯)। [] সহীহ বুখারী (৭৩৭২)। [] সহীহ বুখারী (১৪৯৬)।

চতুর্থ বিষয়: তাওহীদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল, এটি দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা ও হিদায়াতের কারণ। এটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার এই বাণীতে পড়ুন: “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে যুলুম (শির্ক) দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।” [সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৮২] বস্তুত নিরাপত্তা একমাত্র আল্লাহর হাতেই এবং তিনি এটি শুধুমাত্র সেই তাওহীদপন্থী বান্দাকে দেন যে আন্তরিকভাবে তার দ্বীনকে কেবল তাঁরই জন্য খালিস করে। যখন এই আয়াত অবতীর্ণ হলো—যেমনটি সহীহ হাদীসে এসেছে—তখন সাহাবীদের জন্য এর বিষয়টি কঠিন হয়ে গেল। তারা নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন: 'হে আল্লাহর রাসুল! আমাদের মধ্যে এমন কে আছে, যে কখনো নিজের ওপর যুলুম করেনি?' অর্থাৎ, আমাদের মধ্যে কেউ নেই, যে নিজের ওপর কোনো না কোনোভাবে যুলুম করেননি, অথচ আল্লাহ বলেন: “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের ঈমানকে যুলুম (শির্ক) দ্বারা কলুষিত করেনি, নিরাপত্তা তাদেরই জন্য এবং তারাই হেদায়েতপ্রাপ্ত।” তাহলে এর অর্থ দাঁড়ায়, আমাদের কারো জন্যই নিরাপত্তা ও হেদায়াতের কোনো নিশ্চয়তা নেই, কারণ আমরা সবাই নিজেদের প্রতি কোনো না কোনোভাবে যুলুম করেছি। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: ‘এটা সে যুলুম নয়’ অর্থাৎ এই আয়াতে উল্লেখিত ‘যুলুম’ ভিন্ন অর্থ বহন করে। তারপর তিনি বললেন: ‘তোমরা কি নেককার বান্দার (লোকমান হাকিমের) এই বাণী পড়নি: “নিশ্চয় শির্ক হল মহা যুলুম।” [সূরা লুকমান, আয়াত: ১৩] তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এই আয়াতে যুলুমের ব্যাখ্যা করেছেন শিরক (شرك) হিসেবে। এই প্রসঙ্গ থেকে বোঝা যায় যে, যে ব্যক্তি ঈমান এনেছে এবং শিরক করেনি, তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা ও হিদায়াত। এটি তাওহীদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য: যে ব্যক্তি মুওয়াহহিদ (তাওহীদবাদী) হবেন, আল্লাহ তায়ালা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা ও হিদায়াত দান করবেন।

পঞ্চম বিষয়: তাওহীদের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল, তাওহীদে অস্থিরতা বা স্ববিরোধিতা হতে মুক্তি রয়েছে, যা অন্যান্য ধর্মীয় মতবাদে পাওয়া যায়। সেগুলো অস্থিরতা ও স্ববিরোধিতায় পূর্ণ। এ বিষয়টি প্রমাণ করে আল্লাহ তায়ালার বাণী: “যদি তা আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো নিকট হতে আসত, তবে তারা এতে অনেক অসঙ্গতি পেত।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৮২] মানুষের তৈরি বা উদ্ভাবন করা বিশ্বাস ব্যবস্থাগুলোতে অনেক অস্থিরতা ও স্ববিরোধিতা থাকে। কিন্তু সঠিক ঈমান, সুস্থ বিশ্বাস এবং আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ থেকে গৃহীত মজবুত তাওহীদ এসব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।

ষষ্ঠত: তাওহীদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো যে, তা সুস্থ প্রকৃতি ও সঠিক বিবেক-বুদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাওহীদ হল ফিতরাতের উপর প্রতিষ্ঠিত দ্বীন। মানুষকে যদি তার ফিতরাত (স্বাভাবিক প্রকৃতি) এর সাথে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে সে তাওহীদ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করবে না; কারণ তাওহীদ ফিতরাতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বরং তা নিজেই ফিতরাত। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “কাজেই আপনি একনিষ্ঠ হয়ে নিজ চেহারাকে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত রাখুন। আল্লাহর ফিতরাত (স্বাভাবিক রীতি বা দ্বীন ইসলাম), যার উপর (চলার যোগ্য করে) তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই প্রতিষ্ঠিত দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৩০] পক্ষান্তরে শিরক হল, এই ফিতরাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া ও তা থেকে বিচ্যুত হওয়া। এ কারণে সহীহ মুসলিমে হাদীসে কুদসীতে এসেছে, আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আমি আমার সমস্ত বান্দাকে একনিষ্ঠ (মুসলিম) হিসেবে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর তাদের নিকট শয়তান এসে তাদেরকে দ্বীন হতে বিচ্যুত করে দেয়।” [৬] আমি আমার সমস্ত বান্দাদেরকে একনিষ্ঠ (মুসলিম) হিসাবে সৃষ্টি করেছি: অর্থাৎ তাওহীদের ফিতরাতের উপর সৃষ্টি করেছি, অতঃপর তাদের নিকট শয়তান এসে তাদেরকে দ্বীন হতে বিচ্যুত করে দিয়েছে। [] সহীহ মুসলিম (২৮৬৫), ইয়ায বিন হিমার আল-মুজাশী রাযিয়াল্লাহু আনহুর হাদীস।

সহীহ গ্রন্থে আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: কোন সন্তান যখন জন্মগ্রহণ করে, তখন সে স্বভাবধর্মের (ইসলাম) ওপরই জন্মগ্রহন করে। কিন্তু তার পিতা-মাতা (পরবর্তীতে) তাকে ইয়াহুদী বা নাসারা বানিয়ে দেয়। যেমন কোন চতুস্পদ প্রাণী যখন বাচ্চা প্রদান করে তখন কি কানকাটা (ত্রুটিযুক্ত) দেখতে পাও? যতক্ষণ না তোমরা তার কানকেটে ক্রটিযুক্ত করে দাও। [৭] অন্য বর্ণনায় এসেছে: প্রতিটি নবজাতকই ফিতরাতের উপর জন্মলাভ করে। এরপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহুদী, নাসারা বা মাজুসী (অগ্নিপূজারী) রূপে গড়ে তোলে। যেমন, চতুষ্পদ পশু একটি পূর্ণাঙ্গ বাচ্চা জন্ম দেয়। তোমরা কি তাদের মধ্যে কোন (জন্মগত) কানকাটা দেখতে পাও? [৮]। পশুটি তার মায়ের পেট থেকে সম্পূর্ণ অবস্থায় বের হয়, তার কান ও অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো সম্পূর্ণ থাকে। যদি তার কোনো পা, হাত, কান বা অনুরূপ কিছু কেটে দেয়া হয়, তবে তা তার মূল সৃষ্টি থেকে নয়; বরং এটি মানুষের কর্মের ফল, যা তার সম্পূর্ণ ও নিখুঁত অবস্থায় জন্মানোর পরে ঘটে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যতক্ষণ না তোমরা তার কানকেটে ক্রটিযুক্ত করে দাও।” ঠিক তেমনই প্রতিটি শিশু ফিতরাত (স্বাভাবিক প্রকৃতি) এর উপর জন্মগ্রহণ করে। যদি সে পরে নাসারা, ইহুদী, বা মাজুসি (অগ্নিপূজক) হয় অথবা কোনো ধরনের বিপথগামিতা, বক্রতা, পথভ্রষ্টতা ও বাতিল বিশ্বাসে পতিত হয়, তবে তা তার পিতা-মাতা বা তার চারপাশের পরিবেশের প্রভাবের কারণে হয়ে থাকে। [] সহীহ বুখারী (৬৫৯৯)। [] সহীহ বুখারী (১৩৫৮), মুসলিম (২৬৫৮)।

আমাদের মধ্যকার যুবকরা তার উপরেই বেড়ে ওঠে*** পিতা তাদেরকে যার উপর অভ্যস্ত করে তোলে।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “এরপর তার পিতা-মাতা তাকে ইয়াহুদী, নাসারা বা মাজুসী (অগ্নিপূজারী) রূপে গড়ে তোলে।" তিনি বলেননি, 'অথবা তারা তাকে মুসলিম বানায়', কেননা সে ফিতরাতের উপর জন্মগ্রহণ করেছে এবং বেড়ে উঠেছে। তাই তাওহীদ হলো ফিতরাতগত দ্বীন। আর শিরক এবং অন্যান্য গোমরাহী ও বাতিল মতবাদ সবই ফিতরাত বিরোধী এবং এর বিপরীত। আর এটি সুস্থ ও সঠিক বিবেকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কেননা, যে বিবেক সুস্থ ও সঠিক, যা বিচ্যুত বা বাঁকা হয়নি, তা তাওহীদ ব্যতীত অন্য কিছু মেনে নেয় না এবং তাওহীদ ছাড়া অন্য কিছু গ্রহণ করে না। তাহলে এমন কে আছে, যার সুস্থ বিবেক আছে অথচ সে একাধিক উপাস্য বা কবর, মাটি ইত্যাদির সাথে সম্পর্ক স্থাপনে রাজি হবে! “ভিন্ন ভিন্ন বহু রব উত্তম, না মহাপ্রতাপশালী এক আল্লাহ্‌?” “তাঁকে ছেড়ে তোমরা শুধু কতগুলো নামের ইবাদত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ; এগুলোর কোন প্রমাণ আল্লাহ পাঠাননি।” [সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৩৯]

জাহিলি যুগের একত্ববাদী যায়েদ বিন আমর বিন নুফাইল যখন তার সম্প্রদায়ের ধর্ম ত্যাগ করলেন, তখন বললেন [৯]: [] সিরাতু ইবনে ইসহাক (২/৯৬)

এক রব, না হাজার রব?*** যখন সব বিষয় বিভক্ত হয়, তখন আমি কার দ্বীন গ্রহণ করব?

আমি লাত ও উজ্জা সকলকে পরিত্যাগ করেছি*** এভাবেই দৃঢ় ও ধৈর্যশীল ব্যক্তি কাজ করে।

আমি উজ্জার উপাসনা করব না, না তার দুই কন্যার*** আর না বনি আমরের দুটি মূর্তির উপাসনা করব।"

“তিনি কুরাইশের যবাইকৃত জন্তু সম্পর্কে তাদের উপর দোষারোপ করে বলতেন: বকরীকে সৃষ্টি করলেন আল্লাহ, তাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করলেন, ভূমি থেকে উৎপন্ন করলেন তৃণ-লতা, অথচ তোমরা আল্লাহ্ তায়ালার সমূহদান অস্বীকার করে প্রতিমার প্রতি সন্মান করে আল্লাহর নাম ছাড়া অন্যের নামে যবেহ করছ!” [১০] [] সহীহ বুখারী (৩৮২৬)।

বিবেকের কাছে এই বিশ্বজগতের স্রষ্টাকে পরিপূর্ণরূপে জানা এবং তাঁকে সকল ত্রুটি ও অপূর্ণতা থেকে মুক্ত ও পবিত্র জ্ঞান করা, আর একমাত্র তাঁকেই বিনয় ও আনুগত্যের জন্য নির্ধারণ করার চেয়ে স্পষ্ট ও পরিস্কার কিছু নেই। রাসূলগণ এই জ্ঞানের স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন এবং এটিকে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং তাওহীদের সৌন্দর্য এবং শিরকের কদর্যতা বিবেক ও ফিতরাতের মধ্যে সুপ্রতিষ্ঠিত। যে ব্যক্তির জীবন্ত হৃদয়, সুস্থ বিবেক এবং সঠিক ফিতরাত আছে, তার নিকট এটি সুস্পষ্ট।"

সপ্তম বিষয়: তাওহীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, তাওহীদই হলো প্রকৃত, স্থায়ী এবং অবিচ্ছিন্ন বন্ধন, যা দুনিয়া ও আখিরাতে বিদ্যমান। মানুষের মধ্যে তাওহীদের মতো এমন কোনো বন্ধন নেই; কেননা তাওহীদ ও ঈমানের অধিকারীদের মধ্যে এই বন্ধন দুনিয়া ও আখিরাতে স্থায়ী, অবিচ্ছিন্ন এবং চিরন্তনভাবে থাকবে। “বন্ধুরা সেদিন হয়ে পড়বে একে অন্যের শত্ৰু, মুত্তাকীরা ছাড়া।” [সূরা আয-যুখরুফ, আয়াত: ৬৭] তিনি অন্য আয়াতে বলেন: “আর তাদের পারস্পরিক সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাবে।” [সূরা আল-বাকারাহ, আয়াত: ১৬৬] অর্থাৎ, সকল সম্পর্ক ও বন্ধন; কাজেই প্রতিটি সম্পর্কই বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে, প্রতিটি ভালবাসাই বিলীন হয়ে যাবে এবং প্রতিটি সংযোগই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে, কেবল তাওহীদ ও আল্লাহ তায়ালার প্রতি ঈমানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা ভালবাসা, সম্পর্ক ও সংযোগ ছাড়া। যা আল্লাহর জন্য হয়, তা স্থায়ী হয় ও অবিচ্ছিন্ন থাকে, আর যা তাঁর জন্য নয়, তা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং সংযোগহীন হয়ে যায়। সুতরাং কোনো বন্ধন যতই শক্তিশালী হোক না কেন এবং কোনো সম্পর্ক যতই গভীর হোক না কেন, তা শেষ হয়ে যাবে দুনিয়াতে হোক বা আখিরাতে—নিঃসন্দেহে—কিন্তু সেই সম্পর্ক ছাড়া, যা আল্লাহ তায়ালার তাওহীদ ও তাঁর প্রতি উত্তম ঈমানের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। এই সম্পর্কই দুনিয়া ও আখিরাতে স্থায়ী, অবিচ্ছিন্ন এবং চিরন্তন থাকে।"

অষ্টম বিষয়: তাওহীদের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হলো এর উৎসের বিশুদ্ধতা। এটি একটি সুস্বাদু ঝরনা এবং নির্মল প্রস্রবণ থেকে গৃহীত। এটি মহান আল্লাহর কিতাব (কুরআন) এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ থেকে নেওয়া হয়েছে; যিনি কখনো নিজের ইচ্ছা থেকে কথা বলেন না, বরং তা কেবলই ওহী, যা তার কাছে প্রেরণ করা হয়। এই দিকটি পরে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

নবম বিষয়: তাওহীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এর স্থায়িত্ব ও সংরক্ষণ। আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা এই তাওহীদ এবং এই দ্বীনকে সংরক্ষণ করার ও এর স্থায়িত্বের দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “তিনিই তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হেদায়াত ও সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীনের উপর তাকে বিজয়ী করার জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে।” [সূরা আত-তাওবা, আয়াত: ৩৩] তিনি আরো বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের পক্ষ থেকে প্রতিরোধ করেন।” [সূরা আল-হাজ, আয়াত: ৩৮] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরো বলেন: “আর আমার দায়িত্ব তো মুমিনদের সাহায্য করা।” [সূরা আর-রূম, আয়াত: ৪৭] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: “যারা ঈমান এনেছে, আল্লাহ্ তাদেরকে সুদৃঢ় বাক্যের দ্বারা দুনিয়ার জীবনে ও আখিরাতে সুপ্রতিষ্ঠিত রাখবেন।” [সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ২৭]

দশম বিষয়: তাওহীদের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল, এর মধ্যে দুনিয়া ও আখিরাতে বহু সুফল, অসংখ্য মর্যাদা এবং নানা ধরনের প্রভাব নিহিত রয়েছে। এই বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা এই কিতাবের শেষদিকে উল্লেখ করা হবে।

দ্বিতীয় মাসয়ালা:

তাওহীদের সংজ্ঞা ও বাস্তবতা

তাওহীদ: এটি '(وحَّد يوحِّد توحيدًا)' ক্রিয়ামূল থেকে উদ্ভূত। এটি এমন একটি মূলনীতি যা একক অর্থ প্রকাশ করে। তাওহীদ হলো আল্লাহকে একক ও স্বতন্ত্র হিসেবে স্বীকার করা এবং তাঁর অধিকার ও বিশেষ গুণাবলীতে তাঁর কোনো শরীক নেই বলে সাব্যস্ত করা। সুতরাং তাঁর কোনো বিশেষ গুণাবলী বা বান্দাদের উপর তাঁর অধিকারে তাঁর কোনো শরীক নেই।

কাজেই রুবুবিয়্যাহ হল, এই বিশ্বজগতের সৃষ্টি, রিজিক প্রদান, জীবন দান, মৃত্যু দান এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য—এটি আল্লাহ তায়ালার বিশেষ গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত।

আর তাঁর সুন্দর নামসমূহ (আসমাউল হুসনা), উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন গুণাবলী, কার্যকর ইচ্ছা, সর্বব্যাপী ক্ষমতা, ব্যাপক জ্ঞান এবং তাঁর নাম ও গুণাবলীতে পরিপূর্ণতা—এগুলো আল্লাহ তায়ালার বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং যে ব্যক্তি কোনো সৃষ্টির জন্য আল্লাহর বিশেষ গুণাবলীর কিছু অংশ নির্ধারণ করে, সে এর মাধ্যমে তার তাওহীদকে বিনষ্ট করে।

আর আল্লাহ তায়ালার বান্দাদের উপর যে অধিকার রয়েছে, তা হল, তারা শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করবে এবং তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না, যেমনটি মুয়ায রাদিয়াল্লাহু আনহুর হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে বলেছিলেন: “হে মুয়ায! তুমি কি জানো বান্দার উপর আল্লাহর হক কী এবং আল্লাহর উপর বান্দার হক কী? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ভাল জানেন। রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেন: বান্দার উপর আল্লাহর হক হল, তারা আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুকে শরীক করবে না। আর আল্লাহর উপর বান্দার হক হল, যে তাঁর সঙ্গে শরীক করবে না, তাকে তিনি শাস্তি দিবেন না।” [১১] কাজেই ইবাদত হল আল্লাহর হক, যে কেউ এর কিছু অংশ গাইরুল্লাহর জন্য নিবেদিত করবে, সে এর মাধ্যমে তার তাওহীদ বিনষ্ট করে ফেলবে। [] সহীহ বুখারী (২৮৫৬, ৫৯৬৭), মুসলিম (৩০)।

সুতরাং তাওহীদ হল: আল্লাহ তায়ালার অধিকার ও বিশেষ গুণাবলীতে তাঁকে একক হিসেবে স্বীকার করা। আর শিরক হল, আল্লাহ তায়ালার অধিকার বা বিশেষ গুণাবলীতে অন্য কাউকে তাঁর সমতুল্য সাব্যস্ত করা। তাওহীদের প্রকৃত অর্থ এটাই যে: আমরা আল্লাহ তায়ালাকে একক হিসেবে স্বীকার করব এবং তাঁর সাথে কোনো শরীক স্থির করব না, যেমনটি তিনি নিজেই বলেছেন: “আর তোমরা আল্লাহর ইবাদাত কর এবং কোন কিছুকে তাঁর সাথে শরীক করো না।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৩৬] তিনি আরো বলেন: “আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তিনি ছাড়া অন্য কারো 'ইবাদত করো না।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ২৩] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরো বলেন: “আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে।” [সূরা আল-বায়্যিনাহ, আয়াত: ৫] এই অর্থে আরও অসংখ্য আয়াত রয়েছে।

এর মাধ্যমে স্পষ্ট হল যে, তাওহীদ তিন প্রকার: তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ, তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত এবং তাওহীদে উলুহিয়্যাহ।

তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ হল, আল্লাহ তায়ালাকে একক হিসেবে স্বীকার করা এই বিশ্বাসে যে, তিনিই একমাত্র স্রষ্টা, রিযিকদাতা, মালিক, অনুগ্রহকারী এবং পরিচালক, যার এসব ক্ষেত্রে কোনো শরীক নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “বলুন, কে আসমানসমূহ ও যমীনের রব? বলুন, আল্লাহ।” [সূরা আর-রা‘দ, আয়াত: ১৬] তিনি আরো বলেন: “বলুন, ‘যমীনে এবং এতে যা কিছু আছে এগুলো কার? যদি তোমরা জান (তবে বল)।* অবশ্যই তারা বলবে, ‘আল্লাহর।’ বলুন, ‘তবুও কি তোমরা শিক্ষা গ্রহণ করবে না?* বলুন, ‘সাত আসমান ও মহা-‘আরশের রব কে?’* অবশ্যই তারা বলবে, ‘আল্লাহ্।’ বলুন, ‘তবুও কি তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করবে না?* বলুন, ‘কার হাতে সমস্ত বস্তুর কর্তৃত্ব? যিনি আশ্রয় প্রদান করেন অথচ তাঁর বিপক্ষে কেউ কাউকে আশ্রয় দিতে পারে না, যদি তোমরা জান (তবে বল)।’* অবশ্যই তারা বলবে, ‘আল্লাহ্‌।’ বলুন, ‘তাহলে কোথা থেকে তোমরা যাদুগ্রস্থ হচ্ছো?” [সূরা আল-মুমিনূন: ৮৪-৮৯] তিনি আরো বলেন: “তিনিই হলেন তোমাদের রব, কাজেই জগতসমূহের রব কতই না বরকতময়।” [সূরা গাফির] তিনি আরো বলেন: “আল্লাহ সব কিছুর স্রষ্টা এবং তিনি সমস্ত কিছুর তত্ত্বাবধায়ক।” [সূরা আয-যুমার] এ ছাড়া আরো অনেক আয়াত রয়েছে।

দ্বিতীয় প্রকার: তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত: এটি হল, আল্লাহ তায়ালাকে তাঁর সুন্দর নামসমূহ এবং উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন গুণাবলীতে একক হিসেবে স্বীকার করা, যা তাঁর কিতাব (কুরআন) এবং তাঁর নবীর সুন্নাহতে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “আল্লাহ্ , তিনি ছাড়া অন্য কোন সত্য ইলাহ নেই , সুন্দর নামসমূহ তাঁরই।” [সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ৮] আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আরো বলেন: “বলুন, ‘তোমরা ‘আল্লাহ্’ নামে ডাক বা ‘রহমান’ নামে ডাক, তোমরা যে নামেই ডাক সকল সুন্দর নামই তো তাঁর।” [সূরা আল-ইসরা, আয়াত: ১১০] মহান আল্লাহ আরো বলেন: “তিনিই আল্লাহ, তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। তিনি গায়েব ও উপস্থিত বিষয়াদির জ্ঞানী; তিনি দয়াময়, পরম দয়ালু।* তিনি আল্লাহ্‌, তিনি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই। তিনিই অধিপতি, মহাপবিত্র, শান্তি-ক্রটিমুক্ত, নিরাপত্তা বিধায়ক, রক্ষক, পরাক্রমশালী, প্রবল, অতীব মহিমান্বিত। তারা যা শরীক স্থির করে আল্লাহ্‌ তা হতে পবিত্র।* তিনিই আল্লাহ সৃজনকর্তা, উদ্ভাবন কর্তা, তাঁরই সকল উত্তম নামসমূহ। আসমানসমূহ ও যমীনে যা কিছু আছে, সবকিছুই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। তিনি পরক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” [সূরা আল-হাশর, আয়াত: ২২-২৪]

তৃতীয় প্রকার: তাওহীদে উলুহিয়্যাহ: এটি হল, আল্লাহ তায়ালাকে ইবাদতের ক্ষেত্রে একক হিসেবে স্বীকার করা, যেমন দুআ, আশা, ভয়, মান্নত, কুরবানি, সালাত, সিয়াম ইত্যাদি সকল প্রকার ইবাদতের ক্ষেত্রে। আর দ্বীনকে তাঁর জন্য একনিষ্ঠ করা এবং শিরক থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত থাকা, যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেছেন: “আর তাদেরকে কেবল এ নির্দেশই প্রদান করা হয়েছিল যে, তারা যেন আল্লাহর ইবাদত করে তাঁরই জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করে।” আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: “জেনে রাখ, বিশুদ্ধ দ্বীন আল্লাহরই।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৩] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: “বলুন, ‘আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মরণ সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহরই জন্য।* তাঁর কোন শরীক নেই। আর আমাকে এরই নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।” [সূরা আল-আন‘আম] আর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “যে ব্যক্তি এ অবস্থায় মারা গেল যে, সে আল্লাহকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো শরীককে ডাকে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” [১২] এটাই হল তাওহীদ এবং এটাই হল তার হাকীকত। [] সহীহ বুখারী (৪৪৯৭) হাদীসের শব্দগুলো বুখারী থেকে নেয়া, সহীহ মুসলিম (৯২), আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত।

এই তিনটি প্রকারের প্রতিটিরই একটি বিপরীত দিক রয়েছে। 'যখন আপনি জানবেন যে, তাওহীদে রুবুবিয়্যাহ হল, এই স্বীকারোক্তি প্রদান যে, আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র স্রষ্টা, রিজিকদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, সমস্ত বিষয়ের পরিচালক এবং তাঁর সকল সৃষ্টির উপর ক্ষমতাবান, তাঁর রাজত্বে তাঁর কোনো শরীক নেই; তখন এর বিপরীত হল, বান্দার এই বিশ্বাস যে, আল্লাহ ছাড়াও তাঁর সাথে অন্য কেউ নিয়ন্ত্রক রয়েছে; এমন বিষয়ে যা একমাত্র আল্লাহ তায়ালাই করতে সক্ষম।

আর যখন আপনি জানবেন যে, তাওহীদে আসমা ওয়াস সিফাত হল, আল্লাহকে সেই নামে ডাকা, যে নামে তিনি নিজেকে নামকরণ করেছেন, এবং তাঁকে সেই গুণাবলী দ্বারা বর্ণনা করা, যেভাবে তিনি নিজেকে বর্ণনা করেছেন এবং তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বর্ণনা করেছেন, আর তাঁর থেকে সাদৃশ্য ও উপমা নাকচ করা; তাহলে এর বিপরীত হল দুটি বিষয় এবং এ দুটিকে সাধারণভাবে 'ইলহাদ' বলা হয়:

এর মধ্যে একটি হল: আল্লাহ তায়ালার থেকে তাঁর গুণাবলীর অস্বীকৃতি, এবং কুরআন ও সুন্নাহতে প্রমাণিত তাঁর পরিপূর্ণ গুণাবলী ও মহিমান্বিত বৈশিষ্ট্যসমূহকে অকার্যকর করা।

দ্বিতীয়টি হল: আল্লাহর গুণাবলীকে মাখলুকের গুণাবলীর সাথে সাদৃশ্য দেওয়া। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন: “কোন কিছুই তাঁর সদৃশ নয়, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।” [সূরা আশ-শুরা] তিনি আরো বলেন: “তাদের সম্মুখে ও পশ্চাতে যা কিছু আছে , তা তিনি অবগত, কিন্তু তারা জ্ঞান দ্বারা তাঁকে বেষ্টন করতে পারে না।” [সূরা ত্ব-হা, আয়াত: ১১০]

আর যখন আপনি জানবেন যে, তাওহীদে উলুহিয়্যাহ হল, আল্লাহ তায়ালাকে সকল প্রকার ইবাদতের ক্ষেত্রে একক হিসেবে স্বীকার করা এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু থেকে ইবাদতকে নাকচ করা; তখন এর বিপরীত হল, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো উদ্দেশ্যে কোনো প্রকার ইবাদত নিবেদন করা। আর এটিই সাধারণ মুশরিকদের মধ্যে প্রচলিত। এটিই সকল রাসূল ও তাদের উম্মতের মধ্যে বিরোধের মূল কারণ। [১৩] [] মায়ারিজুল কাবুল, শায়খ হাফেয আল-হাকামী (১/৪১৮)।

তৃতীয় মাসয়ালা:

তাওহীদের বাস্তবায়ন ও পরিপূর্ণতা

তাওহীদের বাস্তবায়ন একটি উচ্চ মর্যাদা, মহান স্তর এবং সম্মানজনক পদ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উল্লেখ করেছেন যে, কিয়ামতের দিন এই স্তরের লোকেরা কোনো হিসাব ও শাস্তি ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে, যেমনটি ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু এবং অন্যান্যদের বর্ণিত প্রসিদ্ধ হাদীসে এসেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “এদের মধ্যে সত্তর হাজার লোক রয়েছে যারা বিনা হিসেবে এবং বিনা আযাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে।” তারপর তাদের উল্লেখ করলেন এই বলে: “তারা হচ্ছে ঐসব লোক যারা ঝাড়-ফুঁক করে না। পাখি উড়িয়ে ভাগ্যের ভাল-মন্দ যাচাই করে না। শরীরে ছেক বা দাগ দেয় না। আর তাদের রবের উপর তারা ভরসা করে।” [১৪] এটি হল তাওহীদের একটি উচ্চ মর্যাদা, এবং এটাই তাওহীদের বাস্তবায়ন ও পূর্ণতার মর্মার্থ। [] সহীহ বুখারী (৫৭০৫), মুসলিম (২২০)।

তাওহীদের বাস্তবায়ন বলতে বোঝায়: তাওহীদকে পরিপূর্ণ করা, এর পূর্ণতা অর্জন এবং তাওহীদকে শিরক, বিদআত ও পাপ থেকে পরিশুদ্ধ করা। এই তিনটি বিষয়কে আলিমগণ 'বাধা' বলে অভিহিত করেন, যা পথিককে আল্লাহ ও আখিরাতের পথে চলার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে: শিরকের বাধা, বিদআতের বাধা এবং পাপের বাধা।

শিরকের বাধা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়; তাওহীদকে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য একনিষ্ঠ করে নেওয়ার মাধ্যমে। বিদআতের বাধা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়; সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুসরণ ও তাঁর পথে চলার মাধ্যমে। আর পাপের বাধা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়; পাপ থেকে দূরে থাকা, পাপে পতিত হওয়া থেকে সতর্ক থাকা এবং যদি কোনো গুনাহ বা পাপে পতিত হয়, তবে আল্লাহ তায়ালার কাছে খাঁটি তাওবা করার মাধ্যমে। যখন বান্দা এই স্তরে পৌঁছে যায়, তখন সে তাওহীদের বাস্তবায়ন অর্জনের স্তরে পৌছে যায়।

তাওহীদের বাস্তবায়নেরও দুটি স্তর রয়েছে: ওয়াজিব বাস্তাবায়ন এবং মুস্তাহাব বাস্তাবায়ন। এই দুটি স্তরের সকল মানুষই কিয়ামতের দিন হিসাব ও শাস্তি ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে।

তাওহীদ বাস্তবায়নের প্রথম স্তর হলো মুকতাসিদীন (মধ্যপন্থীদের) স্তর। মুকতাসিদ হল সেই ব্যক্তি, যে ওয়াজিব কাজগুলো সম্পাদন করে এবং হারাম কাজগুলো বর্জন করে। যদি কোনো বান্দা এই অবস্থায় থাকে, অর্থাৎ ওয়াজিব ও ফরয কাজগুলো যথাযথভাবে পালন করে এবং হারাম, কবিরা গুনাহ ও পাপগুলো থেকে দূরে থাকে, তবে সে তাওহীদের ওয়াজিব স্তর বাস্তবায়ন সম্পন্ন করেছে এবং মুকতাসিদীনদের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তারা এমন লোক, যারা বিনা হিসাব ও শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। এটি হলো একটি স্তর।

দ্বিতীয় স্তরটি এই স্তর থেকে উচ্চতর, আর তা হল: মুস্তাহাব তাওহীদ বাস্তবায়ন। এটি হলো সাবিকুন বিল-খাইরাত (সৎকর্মে অগ্রগামীদের) স্তর। তারা এমন লোক, যারা ওয়াজিব ও ফরয কাজগুলো যথাযথভাবে পালন করা এবং কবিরা গুনাহ ও হারাম থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি নফল, মুস্তাহাব ও অতিরিক্ত ইবাদতের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করে।

তাওহীদের এই দুটি স্তর (মুকতাসিদীন ও সাবিকুন বিল-খাইরাত) বাস্তবায়নকারীগণ সবাই কিয়ামতের দিন বিনা হিসাব ও শাস্তিতে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “তারপর আমি কিতাবের অধিকারী করলাম তাদেরকে, যাদেরকে আমার বান্দাদের মধ্য থেকে আমি মনোনিত করেছি; তবে তাদের কেউ নিজের প্রতি অত্যাচারী, কেউ মধ্যমপন্থী এবং কেউ আল্লাহর ইচ্ছায় কল্যাণের কাজে অগ্রগামী। এটা তো মহাঅনুগ্রহ।* স্থায়ী জান্নাত, যাতে তারা প্রবেশ করবে।" [সূরা ফাতির] অর্থাৎ জান্নাতে প্রবেশ করবে তিন ধরনের মানুষ: নিজের প্রতি যুলুমকারী, মুকতাসিদ ও সাবিকুন বিল-খাইরাত।

তবে মুকতাসিদ ও সাবিকুন বিল-খাইরাত; শুরুতেই হিসাব ছাড়াই জান্নাতে প্রবেশ করবে।

আর যে ব্যক্তি শিরক ছাড়া অন্যান্য গুনাহের মাধ্যমে নিজের উপর যুলুম করে, সেও জান্নাতে প্রবেশ করবে। তবে সে মুকতাসিদ ও সাবিকুন বিল-খাইরাতের মতো বিনা হিসাব ও শাস্তিতে সরাসরি জান্নাতে প্রবেশ করবে না; বরং তার জন্য শাস্তি ও হিসাবের সম্ভাবনা থাকবে। সে আল্লাহর ইচ্ছার অধীন থাকবে; যদি তিনি চান, তাকে শাস্তি দেবেন, আর যদি চান, তাকে ক্ষমা করে দেবেন।

চতুর্থ মাসয়ালা:

তাওহীদ ভঙ্গকারী ও তাতে ত্রুটি সৃষ্টিকারী বিষয়সমূহ

তাওহীদের ভঙ্গকারী ও তাতে ত্রুটি সৃষ্টিকারী অনেক বিষয় রয়েছে। তাওহীদ ভঙ্গকারী হল সেই বিষয়গুলো, যা আমল বিনষ্ট করে এবং পুরো দ্বীনকে বাতিল করে দেয়। এগুলো হলো আল্লাহর সাথে কুফরি, শিরক ও খাঁটি নিফাক (মুনাফিকি)। কুফরির সকল প্রকার, শিরকের সকল প্রকার এবং বড় নিফাক (নিফাকে আকবর) এর সকল প্রকার—এগুলো সবই তাওহীদ ভঙ্গকারী, যা তাওহীদকে মূল থেকে ভেঙে দেয় এবং এর ভিত্তি ধ্বংস করে দেয়। কাজেই শিরকে আকবর, কুফরে আকবর এবং নিফাকে আকবর-এর সকল প্রকার তাওহীদকে ভঙ্গকারী এবং এর ভিত্তি ধ্বংসকারী। আল্লাহ তাআলা বলেন: “নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ১৪৫] তিনি আরো বলেন: “আর কেউ ঈমানের সাথে কুফরী করলে তার কর্ম অবশ্যই নিষ্ফল হবে।” [আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৫] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: “আর আপনার প্রতি ও আপনার পুর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী করা হয়েছে যে, 'যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল নিষ্ফল হবে এবং অবশ্যই আপনি হবেন ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত।” [সূরা আয-যুমার] সুতরাং তাওহীদ বাতিল, ধ্বংস এবং নিষ্ফল হয়ে যায় বড় শিরকের বিভিন্ন প্রকারের কারণে, বড় মুনাফিকির বিভিন্ন প্রকারের কারণে এবং বড় কুফরের বিভিন্ন প্রকারের কারণে। আর এই বাক্যের ব্যাপারে আলোচনা এবং এর বিস্তারিত উল্লেখের জন্য দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন।

আর তাওহীদে ত্রুটি সৃষ্টিকারী বিষয়সমূহ হলো সেসব বিষয়, যা তাওহীদকে হ্রাস করে কিন্তু তা সম্পূর্ণ বাতিল করে না বা এর ভিত্তি ধ্বংস করে না। এর মধ্যে রয়েছে ছোট কুফরি (কুফরে আসগর) এবং আমলগত নিফাক (নিফাকে আমলী)। যেমন এ সম্পর্কে হাদিসে বর্ণিত হয়েছে: “মুনাফিকের আলামত তিনটি: যখন সে কথা বলে, তখন মিথ্যা বলে, যখন সে ওয়াদা করে, তখন তা ভঙ্গ করে, আর যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন সে তাতে খিয়ানাত করে।”[১৫] এগুলো তাওহীদের অপূর্ণতা; যদি কোনো বান্দার মধ্যে এগুলো পাওয়া যায়, তাহলে তার তাওহীদ অপূর্ণ হয় এবং তার ঈমান হ্রাস পায়। তদ্রূপ ছোট শিরক এবং শিরকী বাক্যসমূহ, মানুষ যেগুলোর প্রকৃত অর্থ উদ্দেশ্য না করেই উচ্চারণ করে, সেগুলোও তার তাওহীদকে হ্রাস করে। তবে, যদি কেউ সেগুলোর প্রকৃত অর্থে বিশ্বাস করে, তাহলে তা তাওহীদকে ধ্বংসকারী বড় শিরকের অন্তর্ভুক্ত হবে। [] সহীহ বুখারী (৩৩), মুসলিম (৫৮), আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত।

এ কারণে একজন মুমিনের উচিত তার তাওহীদের প্রতি যত্নশীল হওয়া এবং তা সংরক্ষণের ব্যাপারে মনোযোগী থাকা; তাওহীদ বাতিলকারী ও তাতে ত্রুটি সৃষ্টিকারী সবকিছু থেকে দূরে থাকার মাধ্যমে।

শায়খ আব্দুর রহমান বিন হাসান বলেন: তাওহীদের বিপরীত হল শিরক, আর তা তিন প্রকার, যথা: শিরকে আকবার, শিরকে আসগার ও শিরকে খাফী।

শিরকে আকবারের দলীল হল, আল্লাহ তায়ালার বাণী: “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে শির্ক করাকে ক্ষমা করেন না; আর তার থেকে ছোট গোনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেবেন, আর যে কেউ আল্লাহর সাথে শির্ক করে সে ভীষণভাবে পথ ভ্রষ্ট হয়।” [সূরা আন-নিসা] আল্লাহর আরেকটি বাণী: “আর মসীহ বলেছিলেন, ‘হে ইসরাঈল-সন্তানগণ! তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদত কর’। নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিয়েছেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালেমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই।” [সূরা আল-মায়িদাহ]

শিরকে আকবার চার প্রকারের:

প্রথম প্রকার: দোয়া বা আহ্বান করার শিরক। এর দলীল হল আল্লাহ তায়ালার বাণী: “অতঃপর তারা যখন নৌযানে আরোহণ করে, তখন তারা আনুগত্যে বিশুদ্ধ হয়ে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ্কে ডাকে। তারপর তিনি যখন স্থলে ভিড়িয়ে তাদেরকে উদ্ধার করেন, তখন তারা শির্কে লিপ্ত হয়।* আমি তাদেরকে যা দিয়েছি, তার সাথে কুফরী করার এবং ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকার উদ্দেশ্যে; সুতরাং শীঘ্রই তারা জানতে পারবে।” [সূরা আল-আনকাবূত]

দ্বিতীয় প্রকার: নিয়তের শিরক, আর তা হল ইচ্ছা ও উদ্দেশ্যের শিরক। এর দলীল হল আল্লাহ তায়ালার বাণী: “যে কেউ দুনিয়ার জীবন ও তার শোভা কামনা করে, দুনিয়াতে আমি তাদের কাজের পূর্ণ ফল দান করি এবং সেখানে তাদেরকে কম দেয়া হবে না।* তাদের জন্য আখিরাতে আগুন ছাড়া অন্য কিছুই নেই এবং তারা যা করেছিল আখিরাতে তা নিস্ফল হবে। আর তারা যা করত তা ছিল নিরর্থক।” [সূরা হূদ]

তৃতীয় প্রকার: আনুগত্যের শিরক। এর দলীল হল আল্লাহ তায়ালার বাণী: “তারা আল্লাহ্‌ ব্যতীত তাদের পন্ডিত ও পুরোহিতদেরকে তাদের রবরূপে গ্রহন করেছে এবং মারয়াম-পুত্র মসীহ্ কেও। অথচ এক ইলাহের ‘ইবাদত করার জন্যই তারা আদিষ্ট হয়েছিল। তিনি ব্যতীত অন্য কোন সত্য ইলাহ্ নাই। তারা যে শরীক করে তা থেকে তিনি কতই না পবিত্র!” [সূরা আত-তাওবা] এর সন্দেহাতীত ব্যাখ্যা হলো: আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা'আলার অবাধ্যতায় আলেম ও ইবাদতগুজারদের আনুগত্য করা—তাদেরকে ডাকা নয়। যেমন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম আদি ইবনু হাতিমকে এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছিলেন, যখন তিনি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তখন সে বলেছিল: "আমরা তো তাদের ইবাদত করি না।" তখন নবী সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম তাকে বুঝিয়ে দিলেন যে, তাদের ইবাদত হল তাদেরকে পাপের ক্ষেত্রে অনুসরণ করা।

চতুর্থ প্রকার: মহব্বতের ক্ষেত্রে শিরক। এর দলীল হল আল্লাহ তায়ালার বাণী: “আর মানুষের মধ্যে এমনও আছে যারা আল্লাহ্‌ ছাড়া অন্যকে আল্লাহ্‌র সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে, তারা তাদেরকে ভালবাসে আল্লাহ্‌র ভালবাসার মতই; পক্ষান্তরে যারা ঈমান এনেছে তারা আল্লাহ্কে সর্বাধিক ভালবাসে। আর যারা যুলুম করেছে যদি তারা আযাব দেখতে পেত, (তবে তারা নিশ্চিত হত যে,) সমস্ত শক্তি আল্লাহ্‌রই। আর নিশ্চয় আল্লাহ্‌ শাস্তি দানে কঠোর।" আল্লাহর এ বাণী পর্যন্ত: "তারা কখনো জাহান্নাম থেকে বের হতে পারবে না।” [সূরা আল-বাকারা]

শিরকের দ্বিতীয় প্রকার হল: শিরকে আসগার বা ছোট শিরক, আর তা হল রিয়া বা লৌকিকতা। এর দলীল হল, আল্লাহ তায়ালার বাণী: “কাজেই যে তার রব-এর সাক্ষাত কামনা করে, সে যেন সৎকাজ করে ও তার রব-এর ‘ইবাদাতে কাউকেও শরীক না করে।” [সূরা আল-কাহফ]

শিরকের তৃতীয় প্রকার হল: শিরকে খাফী। এর দলীল হল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের বাণী: “নিশ্চয় শিরক অন্ধকার রাত্রীতে কালো পাথরের উপর কালো পিপীলিকার পদচারণা থেকেও সন্তর্পণে এই উম্মতের মাঝে লুকিয়ে থাকে।” আর এর কাফ্ফারা হল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের শিখানো এ দোয়া বলা: অর্থ: “হে আল্লাহ! জেনে শুনে কোন কিছুকে আপনার সাথে শরীক করা থেকে আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং না জেনে পাপ হয়ে গেলে তা থেকে আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।”

কুফুর দুই প্রকার, যথা:

এমন কুফুর যা মিল্লাত থেকে বের করে দেয়। এটি আবার পাঁচ প্রকার:

প্রথম প্রকার: মিথ্যাপ্রতিপন্ন করার কুফরী। এর দলীল হল, আল্লাহ তায়ালার বাণী: “আর যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করে অথবা তাঁর কাছ থেকে সত্য আসার পর তাতে মিথ্যারোপ করে, তার চেয়ে বেশি যালিম আর কে? জাহান্নামের মধ্যেই কি কাফিরদের আবাস নয়?” [সূরা আল-আনকাবূত]

দ্বিতীয় প্রকার: সত্যায়নের পরেও অহঙ্কার ও প্রত্যাখ্যানের কুফরী। এর দলীল হল, আল্লাহ তায়ালার বাণী: “আর স্মরণ করুন, যখন আমি ফেরেশতাদের বললাম, আমাকে সিজদা করো, তখন ইবলিশ ছাড়া সকলেই সিজদা করলো; সে অস্বীকার করলো ও অহংকার করলো। আর সে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হলো।” [সূরা আল-বাকারা]

তৃতীয় প্রকার: সন্দেহের কুফরী, আর তা হল, ধারণাবশত কুফরী। এর দলীল হল, আল্লাহ তায়ালার বাণী: “আর সে তার বাগানে প্রবেশ করল নিজের প্রতি* জুলুম করে। সে বলল, ‘আমি মনে করি না যে, এটা কখনো ধ্বংস হয়ে যাবে;* আর আমি মনে করি না যে, কেয়ামত সংঘটিত হবে। আর আমাকে যদি আমার রব-এর কাছে ফিরিয়ে নেয়াও হয়, তবে আমি তো নিশ্চয় এর চেয়ে উৎকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল পাব।* তার বন্ধু বিতর্কমুলকভাবে তাকে বলল, ‘তুমি কি তাঁর সাথে কুফরি করছ যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি ও পরে বীর্য থেকে এবং তারপর পূর্ণাঙ্গ করেছেন পুরুষ আকৃতিতে?’।” [সূরা আল-কাহফ]

চতুর্থ প্রকার: মুখ উপেক্ষাজনিত কুফরী। এর দলীল হল, আল্লাহ তায়ালার বাণী: “আর যারা কুফরী করেছে, তাদেরকে যে বিষয়ে ভীতিপ্ৰদৰ্শন করা হয়েছে তা থেকে মুখ ফিরিয়ে আছে।” [সূরা আল-আহকাফ]

পঞ্চম প্রকার: নেফাকের কুফরী। এর দলীল হল, আল্লাহ তায়ালার বাণী: “এটা এজন্য যে, তারা ঈমান আনার পর কুফরী করেছে। ফলে তাদের হৃদয় মোহর করে দেয়া হয়েছে; তাই তারা বুঝতে পারছে না।” [সূরা আল-মুনাফিকূন]

আর ছোট কুফুরী ইসলাম থেকে বের করে দেয় না, তা হল নিয়ামেতর অস্বীকৃতি। এর দলীল হল, আল্লাহ তায়ালার বাণী: “আর আল্লাহ্‌ দৃষ্টান্ত দিচ্ছেন এক জনপদের যা ছিল নিরাপদ ও নিশ্চিন্ত, যেখানে আসত সবদিক থেকে তার প্রচুর জীবনোপকরণ। তারপর সে আল্লাহ্‌র অনুগ্রহ অস্বীকার করল, ফলে তারা যা করত সে জন্য আল্লাহ্‌ সেটাকে আস্বাদন করালেন ক্ষুধা ও ভীতির আচ্ছাদনের।” [সূরা আন-নাহল: ১১২] তাঁর আরেকটি বাণী: “নিশ্চয় মানুষ অতি মাত্রায় যালিম, অকৃতজ্ঞ।” [সূরা ইবরাহীম]

আর নিফাক দুই প্রকার: বিশ্বাসগত নিফাক এবং আমলগত নিফাক।

নিফাকে ইতিকাদী বা বিশ্বাসগত নিফাক:

এটি ছয় ধরনের:

রাসূলকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করা, বা রাসূলের আনিত কিছু বিষয়কে মিথ্যা বলা, বা রাসূলকে ঘৃণা করা, বা রাসূলের আনিত কতিপয় বিষয়কে ঘৃণা করা, বা রাসূলের দ্বীনের অবনতিতে আনন্দিত হওয়া, বা রাসূলের দ্বীনের বিজয়কে অপছন্দ করা—এই ছয় প্রকারের মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরের অধিবাসী। -আমরা আল্লাহর কাছে মতবিরোধ ও মুনাফিকি থেকে আশ্রয় চাই।-

নিফাকে আমালী বা আমলগত নিফাক:

এটি পাঁচ ধরনের:

যখন সে কথা বলে তখন মিথ্যা বলে, যখন সে ঝগড়া করে তখন অশ্লীল শব্দ প্রয়োগ করে, কোন প্রতিশ্রুতি দিলে তা ভঙ্গ করে, যখন তার কাছে আমানত রাখা হয় তখন সে তাতে খিয়ানাত করে, আর যখন সে ওয়াদা করে তখন তা ভঙ্গ করে।” -আল্লাহ তায়ালা-ই অধিক অবগত- [১৬] [] আদ-দুরার আস-সানিয়্যা (৩/৬৬)।

পঞ্চম মাসয়ালা:

তাওহীদের উৎস ও ঝর্ণা

তাওহীদ হল বিশুদ্ধ দ্বীন ও সঠিক ঈমান, যা আল্লাহর কিতাব ও তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম-এর সুন্নাহ থেকে উৎসারিত। এটিই একমাত্র দ্বীন, যা আসমান থেকে ওহির মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়েছে। আর মানুষের কাছে যে সকল তাওহীদ বিরোধী ও বিপরীত আকীদা রয়েছে, সেগুলো পৃথিবীতে উৎপন্ন হয়েছে; মানুষই সেগুলো উদ্ভাবন ও সৃষ্টি করেছে। সুতরাং তাওহীদই একমাত্র আকীদা, যা আল্লাহর ওহির মাধ্যমে আসমান থেকে নাযিল হয়েছে এবং এটিই আল্লাহর দ্বীন; যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য পছন্দ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর আমি তোমাদের জন্যে ইসলামকে দ্বীন হিসেবে পছন্দ করেছি।” [সূরা আল-মায়েদা: ৩] আল্লাহ আরো বলেন: “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন অন্বেষণ করবে, তার কাছ থেকে তা কখনোই গ্রহণ করা হবে না।” [সূরা আলে ইমরান: ৮৫] আল্লাহ আরো বলেন: “যে নিজেকে নির্বোধ করেছে সে ছাড়া ইবরাহীমের মিল্লাত হতে আর কে বিমুখ হবে !” [সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১৩০] তিনি আরো বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহর কাছে একমাত্র দ্বীন হচ্ছে ইসলাম।” [সূরা আলে ইমরান: ১৯] সুতরাং তাওহীদ হল মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি, যা তিনি তাঁর বান্দাদের জন্য নাযিল করেছেন। এটিই আল্লাহর দ্বীন, যার জন্য তিনি সৃষ্টিকূলকে সৃষ্টি করেছেন এবং এর বাস্তবায়নের জন্য তাদেরকে অস্তিত্ব দান করেছেন। এ কারণেই আমরা এই বাণী নিয়ে আলোচনা করেছি: “আর অবশ্যই আমি প্রত্যেক জাতির মধ্যে রাসূল পাঠিয়েছিলাম এ নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহ্‌র ইবাদত কর এবং তাগুতকে বর্জন কর।” [সূরা আন-নাহল: ৩৬] “আল্লাহ্‌র আদেশ আসবেই; কাজেই তা তাড়াতাড়ি পেতে চেয়ো না। তিনি মহিমান্বিত এবং তারা যা শরীক করে তিনি তা থেকে উর্ধ্বে।* তিনি তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার প্রতি ইচ্ছে স্বীয় নির্দেশে রূহ- ওহীসহ ফিরিশতা- পাঠান এ বলে যে, তোমরা সতর্ক কর, ‘নিশ্চয় আমি ছাড়া কোন সত্য ইলাহ নেই; কাজেই তোমরা আমার ব্যাপারে তাকওয়া অবলম্বন কর।” [সূরা আন-নাহাল]

আর তাওহীদ ছাড়া অন্যান্য আকীদাগুলো হলো এমন আকীদা, যা পৃথিবীতে উদ্ভূত হয়েছে এবং মানুষই তা উদ্ভাবন ও সৃষ্টি করেছে। এজন্যই নবীদের পদ্ধতির একটি অংশ ছিল মানুষের মধ্যে প্রচলিত আকীদাগুলোর—যেমন শিরক, কুফর, নিফাক এবং অন্যান্য বিভ্রান্তির—অসারতা প্রমাণ করা, এই স্পষ্ট ব্যাখ্যার মাধ্যমে যে, এগুলোর কোনটিই আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহির মাধ্যমে অবতীর্ণ হয়নি। এ প্রসঙ্গে, আমাদের নিকট পূর্বে আলোচিত হয়েছে ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)-এর সেই বাণী; যা তিনি কারাগারে তার দুই সঙ্গীকে বলেছিলেন: “ভিন্ন ভিন্ন বহু রব উত্তম, না মহাপ্রতাপশালী এক আল্লাহ্‌?* তাঁকে ছেড়ে তোমরা শুধু কতগুলো নামের ইবাদত করছ, যে নামগুলো তোমাদের পিতৃপুরুষ ও তোমরা রেখেছ; এগুলোর কোন প্রমাণ আল্লাহ পাঠাননি।” [সূরা ইউসুফ] আল্লাহ তায়ালা সূরা আন-নাজমের মধ্যে বলেন: “অতএব, তোমরা আমাকে জানাও ‘লাত’ ও ‘উযযা' সম্পর্কে,* এবং তৃতীয় আরেকটি ‘মানাত’ সম্পর্কে?* তবে কি তোমাদের জন্য পুত্ৰ সন্তান এবং আল্লাহর জন্য কন্যা সন্তান?* এ রকম বন্টন তো অসঙ্গত।* এগুলো কিছু নাম মাত্র যা তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষরা রেখেছ, যার সমর্থনে আল্লাহ্ কোন দলীল-প্রমাণ নাযিল করেননি।” [সূরা আন-নাজম] আর হুদ আলাইহিস সালাম তার সম্প্রদায়কে বলেছিলেন: “তবে কি তোমারা আমার সাথে বিতর্কে লিপ্ত হতে চাও এমন কতগুলো নাম সম্বন্ধে যেগুলোর নাম তোমরা ও তোমাদের পিতৃপুরুষরা রেখেছে, যে সম্বন্ধে আল্লাহ্‌ কোন সনদ নাযিল করেননি? কাজেই তোমরা প্রতীক্ষা কর, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষায় রইলাম।” [সূরা হূদ]

সুতরাং, তাওহীদের উৎস ও ভাণ্ডার হলো আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর নবী সাঃ-এর সুন্নাহ। এটি এই নির্মল উৎস ও বিশুদ্ধ ঝর্ণা থেকে গৃহীত। অপরদিকে মানুষের কাছে যে সমস্ত আকীদা রয়েছে, সেগুলোর উৎস: হয় তাদের বিকৃত বুদ্ধি ও ত্রুটিপূর্ণ মতামত, অথবা সেগুলো হলো তাদের পথভ্রষ্ট শয়তানদের পক্ষ থেকে প্রেরিত ওহি। আর ওহি দুই প্রকার: একটি হলো রাহমানের পক্ষ থেকে ওহি, আর অন্যটি হলো শয়তানের পক্ষ থেকে ওহি। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন: “নিশ্চয়ই শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদ করতে প্ররোচনা দেয়; আর যদি তোমরা তাদের আনুগত্য কর, তবে তোমরা অবশ্যই মুশরিক।” [সূরা আল-আন‘আম] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: “আর এভাবেই আমরা মানব ও জিনের মধ্য থেকে শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবীর শক্র করেছি, প্রতারণার উদ্দেশ্যে তারা একে অপরকে চমকপ্রদ বাক্যের কুমন্ত্রণা দেয়।” [সূরা আল-আনআম: ১১২] তিনি আরো বলেন: “তোমাদেরকে কি আমি জানাব কার কাছে শয়তানরা নাযিল হয়?।” [সূরা আশ-শুআরা] মুখতার বিন আবু উবাইদ এই ধরনের লোকদের অন্তর্ভুক্ত ছিল, এমনকি ইবনে উমর ও ইবনে আব্বাসের কাছে এটি বলা হয়েছিল। তাদের একজনকে বলা হলো: "সে বলে যে, তার প্রতি ওহি নাযিল হয়!" তখন তিনি বললেন: “নিশ্চয়ই শয়তানরা তাদের বন্ধুদেরকে তোমাদের সাথে বিবাদ করতে প্ররোচনা দেয়;” অপরজনকে বলা হলো, সে বলে যে, তার উপর ওহি অবতীর্ণ হয়; তখন তিনি বললেন: “তোমাদেরকে কি আমি জানাব কার কাছে শয়তানরা নাযিল হয়?।” [১৭] [] মাজমুউল ফাতাওয়া, ইবনে তাইমিয়া (১৩/৭৫)।

সুতরাং শয়তান পথভ্রষ্ট লোকদের প্রতি -বিভিন্ন আকীদা, চিন্তা, কুমন্ত্রণা ও কল্পনার ওহি পাঠায়, তারপর সেগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে। এরপর তারা সেই শয়তানি ওহির ভিত্তিতে মানুষকে সে দিকে আহ্বান জানায়। অথবা, কেউ কেউ তাদের বিকৃত রুচির মাধ্যমে কিছু ধারণায় পৌঁছে, যা থেকে বিভিন্ন আমল, ইবাদত ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান সৃষ্টি করা হয়। তারা এগুলোর প্রমাণ হিসেবে বলে: "আমরা পরীক্ষা করে দেখেছি" বা "আমাদের শাইখরা পরীক্ষা করেছেন"; যদিও দ্বীন কোনো পরীক্ষার ওপর ভিত্তি করে গৃহীত হয় না। অথবা, কেউ স্বপ্নের ভিত্তিতে কোনো আমল গ্রহণ করে, যেমন বলে: "আমি স্বপ্নে এমন এমন জিনিস দেখেছি"—তারপর সে সেই স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে একটি দ্বীন বা আকীদা গঠন করে। এভাবেই মানুষ বিভিন্ন উৎস থেকে আকীদা গ্রহণ করে, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাবারাকা ওয়া তায়ালা কোনো দলীল নাযিল করেননি।

সুতরাং বরকতময় আকীদা হলো তাওহীদের আকীদা—যেটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার দ্বীন, এবং তিনি এ দ্বীন ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন গ্রহণ করবেন না। এটি এমন এক আকীদা, যা নির্মল উৎস ও স্বচ্ছ ঝর্ণা থেকে উদ্ভূত। যে ব্যক্তি প্রথম ও বিশুদ্ধ উৎস থেকে পান করবে, সে দেখতে পাবে যে, অন্যান্য সব উৎসই ময়লাযুক্ত ও দূষিত। তবে, মানুষ তখনই এসব উৎসের দূষণ বুঝতে পারবে, যখন সে এই নির্মল ও বিশুদ্ধ উৎসকে চিনতে পারবে—যা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার ওহি ও তাঁর নাযিলকৃত দ্বীন। এ কারণেই বহু মুশরিক যখন হিদায়াত পেয়ে তাওহীদে প্রবেশ করে, তখন তারা উপলব্ধি করে যে, তারা পূর্বে এমন এক জাতি ছিল যারা কিছুই বুঝত না। অথচ, নিজেদের পথভ্রষ্টতা, শিরক ও বাতিল অবস্থায় তারা মনে করত যে, সেটিই ছিল বিশুদ্ধ জ্ঞান ও সঠিক দ্বীন।

এ কারণেই কিছু সাহাবী মাঝে মাঝে বসে নিজেদের শিরকে নিমজ্জিত থাকা অবস্থায় অদ্ভুত কাহিনি স্মরণ করতেন এবং সেই আল্লাহর প্রশংসা করতেন, যিনি তাদেরকে ইসলাম ও তাওহীদের দিকে পথ দেখিয়েছেন। আবু উসমান আন-নাহদী (যিনি জাহেলিয়াত যুগ পেয়েছিলেন, তবে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লামের যুগে ইসলাম গ্রহণ করলেও তাঁকে দেখার সৌভাগ্য হয়নি) বর্ণনা করেন: "আমরা জাহেলিয়াত যুগে একটি পাথর পূজা করতাম। একদিন শুনলাম একজন ঘোষণাকারী বলছে: 'হে সম্প্রদায়! তোমাদের রব তো বিনষ্ট হয়ে গেছে, এখন নতুন রব খুঁজে নাও!'—অর্থাৎ, যে পাথরটিকে তারা উপাস্য হিসেবে পূজা করছিল, সেটি হারিয়ে গিয়েছিল। তিনি বলেন: "আমরা তখন পাহাড়-পর্বত অতিক্রম করে আমাদের সেই উপাস্য খুঁজতে বের হলাম। তখন হঠাৎ শুনতে পেলাম আরেকজন ঘোষণাকারী চিৎকার করে বলছে: ‘আমরা তোমাদের রবকে পেয়েছি, অথবা তার মতো কিছু পেয়েছি!’ আমরা সেখানে পৌঁছে দেখি, একটি পাথর পাওয়া গেছে। তখন আমরা সেই পাথরের সামনে উট কোরবানি করলাম।"[১৮] তারা আগের পাথরটির মত অথবা তার কাছাকাছি আকৃতির একটি পাথর পেল। এরপর তারা সেই পাথরকে নিয়ে এসে উপাস্য বানিয়ে তার দিকে মুখ ফিরিয়ে ইবাদত করতে লাগল, তার কাছে আশা করতে লাগল এবং তার উদ্দেশ্যে দোয়া, নিবেদন ও কোরবানী করতে লাগল! এসব মানুষের বুদ্ধি কোথায় ছিল?! [] মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা (৩৩৯১৪), ত্ববাকাতু ইবনে সা’দ (৭/৯৭), আবু নুয়াইম রচিত মারেফাতুস সাহাবা (৪৭০৭)। এর সনদ হাসান।

যদিও তারা এমন কাজ ও উপাসনার চর্চা করছিল, তবুও তারা আল্লাহর নবী ও রাসূলদেরকে পাগল বলে অভিহিত করত এবং নিজেদেরকে বুদ্ধিমান ভাবত! কিন্তু যখন আল্লাহ তায়ালা তাওহীদ ও ঈমানের মাধ্যমে অন্তর্দৃষ্টিকে আলোকিত করেন এবং ইসলামের দিকে হৃদয়কে হিদায়াত দান করেন, তখন মানুষের নিকট স্পষ্ট হয় যে, মুশরিকরা যেসব বিশ্বাস ও কার্যকলাপের ওপর ছিল, তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর, তখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে, তাদের অনুসৃত সব উৎসই ছিল সকল ধরনের মিথ্যা ও পথভ্রষ্টতা দ্বারা মিশ্রিত। আর তার নিকট পরিষ্কার হয় যে, প্রত্যেক মুশরিকই প্রকৃতপক্ষে বিকৃত বিবেক-বুদ্ধির অধিকারী!

ষষ্ঠ মাসয়ালা:

ষষ্ঠ মাসয়ালা: তাওহীদের ফলাফল ও উপকারিতা

তাওহীদের অসংখ্য ফলাফল এবং অগণিত উপকারিতা রয়েছে। এ বিষয়ে ইঙ্গিত পেতে আল্লাহ তায়ালার এই বাণীর প্রতি লক্ষ্য করুন: “আপনি কি লক্ষ্য করেন না আল্লাহ্ কিভাবে উপমা দিয়ে থাকেন? সৎবাক্যের তুলনা উৎকৃষ্ট গাছ যার মূল সুদৃঢ় ও যার শাখা-প্রশাখা উপরে বিস্তৃত।?* যা সব সময়ে তার ফলদান করে তার রবের অনুমতিক্রমে।” [সূরা ইবরাহীম] অর্থাৎ তার ফল ও উপকারিতা।

তাওহীদের উপকারিতা ও ফলাফল একজন বান্দার দুনিয়া ও আখিরাতে এত বিশাল যে, তার কোনো সীমা ও ইয়ত্তা নেই। বরং, আমরা সার্বিকভাবে এ কথা বলতে পারি যে:

বান্দা দুনিয়া ও আখিরাতে যে কল্যাণ লাভ করে এবং যে অকল্যাণ থেকে মুক্তি পায়, সবই তাওহীদের ফল ও প্রভাবের অন্তর্ভুক্ত। যদি আমরা তাওহীদের ফলাফল ও প্রভাব সম্পর্কে কিছু বিস্তারিত আলোচনা করি, তাহলে বলা যায় যে, তাওহীদের সর্বোত্তম ফলাফল ও প্রভাবগুলোর মধ্যে একটি হলো এটি আমলকে শুদ্ধ করে এবং পরিশুদ্ধ করে। কারণ, কোনো আমলই— তা যেকোন ধরনেরই হোক না কেন—তাওহীদ ছাড়া বিশুদ্ধ হবে না এবং তা বান্দার থেকে গ্রহণ করাও হবে না। সুতরাং তাওহীদ আমলের জন্য ভবনের ভিত্তি মতো এবং গাছের জন্য মূলের মতো। এ কারণেই আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর যে মুমিন হয়ে আখিরাত কামনা করে করে এবং আখিরাতের জন্য যথাযথ চেষ্টা করে তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য।” [সূরা আল-ইসরা] আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন: “মুমিন হয়ে পুরুষ ও নারীর মধ্যে যে কেউ সৎকাজ করবে, অবশ্যই আমি তাকে পবিত্র জীবন দান করব। আর অবশ্যই আমি তাদেরকে তারা যা করত তার তুলনায় শ্রেষ্ঠ প্রতিদান দেব।” [সূরা আন-নাহাল] কাজেই তাওহীদই আমলকে সহীহ ও পরিশুদ্ধ করে। যদি কোন মানুষের কাছে অসংখ্য আমল ও বিপুল পরিমাণ ইবাদতও থাকে, তবুও সেগুলো তখনই গ্রহণযোগ্য হবে, যখন তা তাওহীদের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আর তাদের অর্থসাহায্য গ্রহণ করা নিষেধ করা হয়েছে এজন্যই যে, তারা আল্লাহ্‌ ও তাঁর রাসূলের সাথে কুফরী করেছে।” [সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত: ৫৪] আল্লাহ আরো বলেন: “আর কেউ ঈমানের সাথে কুফরী করলে তার কর্ম অবশ্যই নিষ্ফল হবে।” [সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৫] তিনি আরো বলেছেন: “আর আপনার প্রতি ও আপনার পুর্ববর্তীদের প্রতি অবশ্যই ওহী করা হয়েছে যে, 'যদি আপনি শির্ক করেন তবে আপনার সমস্ত আমল নিষ্ফল হবে।” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ৬৫] অতএব তাওহীদ আমলসমূহকে বিশুদ্ধ করে এবং তাওহীদ ব্যতীত আমল বিশুদ্ধ হয় না।

প্রকৃতপক্ষে তাওহীদ হল দুনিয়া ও আখেরাতে সফলতা ও উন্নতি লাভের মাধ্যম। “তারাই তাদের রব-এর নির্দেশিত হেদায়েতের উপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম।” [সূরা আল-বাকারা] সুতরাং তাওহীদের অনুসারীরাই প্রকৃত হিদায়াতপ্রাপ্ত ও সফলকাম। "ফলাহ" (সফলতা)—এটি সর্বোত্তম শব্দ যা সমস্ত কল্যাণ অর্জনের অর্থ বহন করে। কাজেই "মুফলিহ" (সফলকাম) হল সেই ব্যক্তি, যিনি দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ অর্জন করেছেন। কিন্তু দুনিয়া ও আখেরাতে এই কল্যাণ অর্জিত হয় না এবং এর সফলতা পাওয়া যায় না, যদি না বান্দা আল্লাহর জন্য তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করে এবং তাঁর জন্য দ্বীনকে পরিপূর্ণভাবে একনিষ্ঠ করে।

তাওহীদের অন্যতম ফল হলো: এটি আল্লাহর অনুগ্রহ ও জান্নাত লাভের উপায় এবং এটি আল্লাহর শাস্তি ও ক্রোধ থেকে মুক্তির মাধ্যম। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে তাওহীদপন্থী অবস্থায় সাক্ষাৎ করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। আর যে ব্যক্তি শিরকের অবস্থায় আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে-আল্লাহ আমাদেরকে তা থেকে রক্ষা করুন-, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে এবং চিরকাল সেখানে অবস্থান করবে। মহান আল্লাহ বলেন: “নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সাথে কৃত শিরককে ক্ষমা করবেন না, আর এ ছাড়া সকল কিছুই যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করে দিবেন।” [সূরা আন-নিসা, আয়াত: ৪৮] সুতরাং তাওহীদের অন্যতম প্রভাব ও ফল হলো: জান্নাত লাভের সফলতা এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি।

যদি কেউ তাওহীদকে সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করে—তা হোক ওয়াজিব পর্যায়ের বা মুস্তাহাব পর্যায়ের—তাহলে সে জাহান্নামে প্রবেশ থেকেই মুক্তি পাবে। কিন্তু যদি কেউ তাওহীদপন্থী হয়, তবে সে শিরক ব্যতীত কিছু গুনাহ ও পাপও করে, তাহলে সে জাহান্নামে চিরস্থায়ী হওয়া থেকে মুক্তি পাবে। কেননা শুধুমাত্র মুশরিকরাই জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে।যেমনটি হাদিসে এসেছে: “তিনি তাদের মধ্যকার শিরকমুক্তদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে দেয়ার জন্য ফেরেশতাদেরকে নির্দেশ দিবেন। তারাই হচ্ছে ওসব বান্দা যাদের উপর আল্লাহ রহমত করবেন, যারা সাক্ষ্য দিয়েছে যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্য কোন ইলাহ নেই।” [১৯] [] সহীহ বুখারী (৭৪৩৭), মুসলিম (১৮২), আবু হুরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত।

তাওহীদের আরেকটি সুফল হলো, এটি অন্তরের প্রশস্ততার সবচেয়ে বড় কারণ। তাওহীদের পরিপূর্ণতা, দৃঢ়তা ও বৃদ্ধির অনুপাতেই এর অনুসারীর হৃদয় প্রশস্ত হবে।

আল্লাহ তায়ালা বলেন: “আল্লাহ ইসলামের জন্য যার বক্ষ উন্মুক্ত করে দিয়েছেন ফলে সে তার রবের দেয়া নূরের উপর রয়েছে, সে কি তার সমান যে এরূপ নয়?” [সূরা আয-যুমার, আয়াত: ২২] আল্লাহ আরো বলেন: “সুতরাং আল্লাহ্ কাউকে সৎপথে পরিচালিত করতে চাইলে তিনি তার বক্ষ ইসলামের জন্য প্রশস্ত করে দেন এবং কাউকে বিপদ্গামী করতে চাইলে তিনি তার বক্ষ সংকীর্ণ করে দেন; মনে হয় যেন সে কষ্ট করে আকাশে উঠেছে।” [সূরা আল-আনআম, আয়াত: ১২৫] সুতরাং হেদায়াত ও তাওহীদ হল অন্তরের প্রশস্ততার সবচেয়ে বড় কারণ। আর শিরক ও পথভ্রষ্টতা হল অন্তরের সংকীর্ণতার অন্যতম প্রধান কারণ।

তাওহীদের আরেকটি ফলাফল হলো, আল্লাহ তাওহীদের অনুসারীদের জন্য দুনিয়ায় সম্মান ও বিজয়ের, যমীনে তাদেরকে প্রতিষ্ঠা করা এবং তাদের অবস্থা সংশোধন করে দেয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে আল্লাহ তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, তিনি অবশ্যই তাদেরকে যমীনে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন, যেমন তিনি প্রতিনিধিত্ব দান করেছেন তাদের পূর্ববর্তীদেরকে এবং তিনি অবশ্যই তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত করবেন তাদের দ্বীনকে যা তিনি তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির পরে তাদেরকে নিরাপত্তা দান করবেন। তারা আমার ইবাদত করবে, আমার সাথে কোন কিছুকে শরীক করবে না। আর এরপর যারা কুফরী করবে তারাই ফাসিক।” [সূরা আন-নূর]

তাওহীদের আরেকটি ফল হলো, এটি বান্দার জন্য কল্যাণ, খুশি, সুখ, আনন্দ, পরিতৃপ্তি ও প্রশান্তির দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “যারা ঈমান আনে এবং আল্লাহ্‌র স্মরণে যাদের মন প্রশান্ত হয়; জেনে রাখ, আল্লাহ্‌র স্মরণেই মন প্রশান্ত হয়;” [সূরা আর-রা‌’দ] আল্লাহ আরো বলেন: “পরে আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে সৎপথের নির্দেশ আসলে যে আমার প্রদর্শিত সৎপথের অনুসরণ করবে সে বিপথগামী হবে না ও দুর্ভাগা হবে না।* আর যে আমার স্মরণ থেকে বিমুখ থাকবে, নিশ্চয় তার জীবন-যাপন হবে সংকুচিত এবং আমি তাকে কিয়ামতের দিন জমায়েত করব অন্ধ অবস্থায়।” [সূরা ত্ব-হা]

পরিশেষে, এগুলো ছিল এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কিত সামান্য কিছু নিদর্শনাবলী। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন এই শিক্ষার দ্বারা আমাদের সবাইকে উপকৃত করেন, এটিকে আমাদের পক্ষে হুজ্জাত (প্রমাণ) হিসেবে গ্রহণ করেন, আমাদের বিরুদ্ধে নয় এবং তিনি যেন আমাদের সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করেন।

আল্লাহই অধিক জ্ঞানী, আর সালাত ও সালাম নাযিল হোক আল্লাহর বান্দা ও রাসূল, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর, তার পরিবারবর্গ ও সমস্ত সাহাবীর ওপর।