Skip to content
হেরা গুহা যিয়ারত

হেরা গুহা যিয়ারত

‘হেরা গুহা যিয়ারত’ বইটিতে সেই ঐতিহাসিক স্থান সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যা নবুওয়তের সূচনা স্থান ও কুরআনের প্রথম আয়াত অবতরণস্থল। এতে এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে যে, মক্কায় শরীয়তসম্মত ইবাদতগুলো শুধু মসজিদুল হারাম ও হজের নির্দিষ্ট পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বইটিতে হেরা গুহার মত শরীয়ত কর্তৃক অনির্ধারিত স্থানে বা বস্তুতে বরকত ও সাহায্য প্রার্থনার সকল বিদআতকে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ থেকে বিচ্যুত হওয়ার বিরুদ্ধে সতর্ক করা হয়েছে এবং খাঁটি তাওহীদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যেন সমস্ত ইবাদত শুধু আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট থাকে। বইটিতে…

Language: lang_bn
Prepared by: বিভিন্ন ভাষায় ইসলামী বিষয়বস্তুর সেবা সংস্থার একাডেমিক কমিটি
Version: 1.0

হেরা গুহা যিয়ারত

বিভিন্ন ভাষায় ইসলামী বিষয়বস্তুর সেবা সংস্থার একাডেমিক কমিটি

হেরা গুহাটি মক্কা মুকাররমার উত্তর-পূর্বে জাবালে নূরের চূড়ায় অবস্থিত। এই পাহাড়ের উচ্চতা আনুমানিক ৬৩৪ মিটার।

গুহাটি অত্যন্ত সংকীর্ণ, যেখানে ৩ জনের বেশি লোকের বসার মতো জায়গা নেই।

আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির আগে এখানে একাকী ধ্যানমগ্ন থাকতেন, বিশেষ করে রামাদান মাসে মানুষের কোলাহল থেকে দূরে আল্লাহর সৃষ্টি জগৎ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার জন্য। নির্জনতা তার খুবই পছন্দ ছিল।

এই স্থানের কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো:

এটি মানুষের কোলাহল ও বিরক্তিকর পরিবেশ থেকে দূরে, কারণ পাহাড়টিতে আরোহণ করা কঠিন এবং এর পথ দুর্গম। এটি কাবা থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। পূর্বে গুহার পশ্চিম দিকে একটি ছিদ্র ছিল, যেখান থেকে পবিত্র কাবা দেখা যেত। তাই এটি চিন্তা-ভাবনার জন্য অনুপ্রেরণাদায়ক ছিল।

এই নির্জন স্থানে এবং এই দুর্গম পাহাড়ের চূড়ায় আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাহর নবুওয়াতের সূচনা হয় এবং এখানেই তার উপর কুরআনের সর্বপ্রথম এই আয়াত নাযিল হয়: “পড়ুন আপনার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন (১)” [আল-আলাক, আয়াত: ১]

তারপর তিনি যা দেখেছিলেন তার ভয়াবহতা থেকে ভীত-সন্ত্রস্ত অবস্থায় খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে ফিরে এলেন এবং বলছিলেন: ’আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর’, ’আমাকে চাদর দ্বারা আবৃত কর।’[১] আল্লাহ তার উপর, তার পরিবার ও সাহাবাদের উপরে কিয়ামাত পর্যন্ত সালাত ও অসংখ্য সালাম নাযিল করুন।

প্রিয় মুসলিম ভাই ও বোন: (হেরা গুহা পরিদর্শনকারীগণ) [১] সহীহ বুখারী, অধ্যায়: তাফসীর, হাদীস নং (৪৬৪২); মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, পরিচ্ছেদ: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ওহী নাযিলের সূচনা, হাদীস নং (১৬০)।

মুসলিমের জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাত অধ্যয়ন ও তা জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সকল অবস্থা ও বিষয়ে আমরা তার জীবনাদর্শকে অনুসরণ করতে পারি। তবে কিছু দর্শনার্থী -আল্লাহ আমাদেরকে ও তাদেরকে হিদায়াত দিন- এমন কিছু কাজ করেন যা দ্বীনের অংশ নয়, বরং তা নিষিদ্ধ। যেমন: পাথর স্পর্শ করে বরকত নেওয়া, গাছ বা অন্যান্য বস্তুকে চুমু দেওয়া বা লেহন করা, কিংবা অন্যান্য নিন্দনীয় কাজ।

আসলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি এমন কিছু করেছেন, অথবা এর নির্দেশ দিয়েছেন, অথবা তার পরে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম কি এমন কিছু করেছেন? কখনই না! হাজারবার না! এর চেয়েও বড় পাপ হলো যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে সাহায্য চায়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমাকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন: “হে বালক! তুমি আল্লাহকে (বিধানসমূহকে) রক্ষা কর তাহলে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি আল্লাহর হকসমূহ রক্ষা কর, তাহলে তুমি তাঁকে তোমার সম্মুখে পাবে। যখন তুমি চাইবে, তখন আল্লাহর কাছেই চাইবে। আর যখন তুমি প্রার্থনা করবে, তখন একমাত্র আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করবে।...”[২]

এজন্যই আমাদের সকলের উপর তাদেরকে নসিহত করা এবং তাদের ভুল কাজের প্রতিবাদ করা অপরিহার্য। কারণ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোনো গর্হিত কাজ দেখবে, সে যেন তা নিজ হাত দ্বারা পরিবর্তন করে। যদি (তাতে) ক্ষমতা না রাখে, তাহলে নিজ যবান দ্বারা (উপদেশ দিয়ে পরিবর্তন করবে)। যদি (তাতেও) সামর্থ্য না রাখে, তাহলে অন্তর দ্বারা (ঘৃণা করে)। আর এটা হল সবচেয়ে দুর্বল ঈমান।” সহীহ মুসলিম [৩]। [2] সুনান তিরমিযী: অধ্যায়: কিয়ামতের অবস্থা, উপদেশ ও পরহেযগারিতা, হাদীস নং (২৫১৬); মুসনাদ আহমাদ: মুসনাদ উসমান ইবন আফফানের, হাদীস নং (২৭৬৩)

এটি এক মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের হক এবং বান্দার জন্য তার রবের আদেশ পালনের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তা'আলা সূরা আল-আসরে বলেন: "কিন্তু তারা নয়, যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে, আর পরস্পরকে উপদেশ দিয়েছে হকের এবং উপদেশ দিয়েছে ধৈর্যের। (৩)” [সূরা আল-‘আসর, আয়াত: ৩] [৩] সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: ঈমান, পরিচ্ছেদ: অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা ঈমানের অংশ, আর ঈমান বাড়ে ও কমে এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ করা ওয়াজিব, হাদীস নং (৪৯)।

কিছু লোক হজ বা উমরা বা অন্য কোনো উদ্দেশ্যে মক্কা আসার পর হেরা গুহা দেখার জন্য যায়, কষ্ট স্বীকার করে, কঠিন পথ অতিক্রম করে এবং নিজেকে এমন কাজে ক্লান্ত করে যা তারা আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করে। কিন্তু বাস্তবে তা নয়, বরং এমন ব্যক্তি নিজেকে এমন কাজে কষ্ট দেয় যাতে কোনো সাওয়াব বা আল্লাহর আনুগত্য নেই, বরং সে আল্লাহর নিষেধকৃত কাজে জড়িয়ে পড়ে।

আর কিছু মানুষ আছে -আল্লাহ তাদেরকে হিদায়াত করুন- তারা এমন কিছু কাজ করে যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের তাওহীদের দাওয়াতের সাথে সাংঘর্ষিক, অথবা তারা এমন কিছু বিদআতি কাজে লিপ্ত হয় যা ঈমানের পরিপূর্ণতায় দোষ সৃষ্টি করে।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওহী নাযিল হওয়ার পূর্বে হেরা গুহায় আল্লাহর ইবাদত করতেন। কিন্তু ওহী অবতরণ শুরু হওয়ার পর তিনি আর সেখানে গমন করেননি - না দোয়ার জন্য, না নামাযের জন্য, না অন্য কোনো ইবাদতের জন্য।

আর তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মক্কায় প্রায় ১৩ বছর অবস্থান করেছেন; কিন্তু তার থেকে প্রমাণিত হয়নি যে তিনি হেরা গুহা বা অন্য কোনো স্থান পরিদর্শন করেছেন; যেখানে কিছু মানুষ মনে করে যে সেগুলো পরিদর্শন করা মুস্তাহাব এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায়।

মক্কার একমাত্র যে স্থানে ইবাদত, সালাত ও দোয়ার জন্য যাওয়া শরীয়তসম্মত তা হল শুধুমাত্র মসজিদুল হারাম।

তাছাড়া হজের সময় হাজীগণ যেসব পবিত্র স্থানে হজের কার্যাদি সম্পাদন করে- আরাফাহ, মিনা ও মুযদালিফা - এগুলোতে শুধু হজের নির্দিষ্ট দিনগুলোতেই যাওয়া প্রত্যেক মুসলিমের জন্য শরীয়তের বিধান। এটি কেবল নির্ধারিত দিনগুলোতেই করা যায়, আল্লাহর নির্দেশিত সময় অনুযায়ী- না আগে, না পরে। আর শুধু মসজিদুল হারামেই সারা বছর যাওয়া যায়, যার জন্য কোনো সময়সীমা নেই, যেমনটি সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। “হে ’আবদ মানাফ-এর সন্তানেরা! তোমরা কাউকে এ ঘরের (কাবা‘র) তাওয়াফ করতে এবং রাত-দিনের যে সময় ইচ্ছা হয় এতে সালাত আদায় করতে নিষেধ করো না। এটি চারজন সুনান গ্রন্থকার বর্ণনা করেছেন।[৪]

প্রিয় মুসলিম ভাই, যেহেতু আল্লাহ তা'আলা কর্তৃক নির্ধারিত তিনটি ইবাদতস্থল - আরাফাহ, মিনা ও মুযদালিফা এবং জামারাত (পাথর নিক্ষেপের স্থান) যা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম এর সময় থেকে, কিংবা আদম আলাইহিস সালাম এর যুগ থেকে নির্দিষ্ট সময় ও অবস্থার সাথে সংশ্লিষ্ট, তাহলে কিভাবে মানুষের পক্ষে অন্য স্থান উদ্ভাবন করা জায়েজ হবে যেখানে তারা ইবাদত ও নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে যায় এবং যেকোনো সময়ে সেগুলো পরিদর্শনকে সাওয়াবের কারণ মনে করে, যেমন হেরা গুহা ও অন্যান্য স্থান? [৪] তিরমিযী, অধ্যায়: হজ, পরিচ্ছেদ: তাওয়াফকারীর জন্য তাওয়াফের ক্ষেত্রে আসর ও ফজরের পরে সালাতুল তাওয়াফ আদায় করা, হাদীস নং (৮৬৮); নাসায়ী, অধ্যায়: সালাতের ওয়াক্তসমূহ, পরিচ্ছেদ: মক্কায় সব সময় সালাতের অনুমতি প্রদান, হাদীস নং (৫৮৫)।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের পর মক্কা শরীফে বহুবার গিয়েছেন; কিন্তু কখনো হেরা গুহায় যাননি। যদি এটি শরীয়তসম্মত ও নেকীর কাজ হত, তাহলে তিনি অবশ্যই সেখানে যেতেন। বস্তুত তিনিই ছিলেন হেরা গুহা যাওয়ার সবচেয়ে বেশি হকদার - কারণ নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে তিনি সেখানে ইবাদত করতেন এবং তার সাথে এই গুহার এমন স্মৃতিবিজড়িত সম্পর্ক ছিল যা আগে-পরে অন্য কারো জন্য কখনো ঘটেনি।

এটা সুবিদিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজের সময় তার চতুর্থ উমরা সম্পন্ন করেছিলেন। এ সময় মুসলিমদের বিশাল জনতা তার সাথে হজে অংশগ্রহণ করেছিল। আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করেছেন তারা ছাড়া কেউই তার সাথে হজ থেকে পিছিয়ে থাকেনি। এই সমস্ত সময়ে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অথবা তার সাহাবীগণ রাদিয়াল্লাহু আনহুম এর কেউই হেরা গুহায় আরোহণ করেননি, সেটি পরিদর্শনও করেননি, কিংবা মক্কার আশেপাশের অন্য কোনো স্থানেও যাননি। ইবাদত কেবল মসজিদুল হারামে, সাফা-মারওয়া, মিনা, মুযদালিফা এবং আরাফাতেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে খুলাফায়ে রাশেদীন ও প্রাথম যুগের সালাফগণও হেরা গুহা বা অনুরূপ স্থানে সালাত, দোয়া বা বরকত লাভের উদ্দেশ্যে যেতেন না।

যদি এটি শরীয়তসম্মত বিধান ও মুস্তাহাব হত, যার জন্য আল্লাহ সওয়াব দিবেন, তাহলে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামই এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জানতেন এবং পরবর্তীদের চেয়ে তিনিই এতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হতেন। অতএব, যখন তারা এ কাজ করেননি, তখন জানা গেল যে এটি নিষিদ্ধ বিদআতের অন্তর্ভুক্ত, শরীয়ত ও দীনের দৃষ্টিতে যা বর্জনীয়। যে ব্যক্তি এ সতর্কতা সত্ত্বেও এটিকে ইবাদত, নৈকট্য ও আনুগত্যের মাধ্যম বানায়, সে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরামের পথ ছেড়ে অন্য পথ অবলম্বন করে এবং দীনে এমন বিষয় প্রবর্তন করে যার অনুমতি আল্লাহ দেননি। আল্লাহ তাআলা বলেন: “অবশ্যই তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আর্দশ, তার জন্য যে আশা রাখে আল্লাহ ও শেষ দিনের এবং আল্লাহকে বেশী স্মরণ করে।”[২১] [আল-আহযাব, আয়াত: ২১]